শওকত ওসমান শতাব্দী

লেখক:

আন্দালিব রাশদী

বাংলাদেশের বয়স তখন কুড়ি বছর। বয়সের হিসেবে শওকত ওসমানের চেয়ে পঞ্চান্ন বছরের ছোট।
১৩৯৭-এর ১৮ পৌষ পঁচাত্তরতম জন্মদিনে শওকত ওসমান নিজে যা অনুধাবন করেছেন এবং দেশবাসীকে যা জানানো প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন দেশবাসীর উদ্দেশে বিস্তারিত একটি চিঠিতে তা জানিয়েছেন। তার একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা আবশ্যক মনে করছি :
* ব্রিটিশ আমলে গোলাম নাগরিক হিসেবে পাড়াগাঁয়ে জন্ম নিয়ে ১৯৪৭-এ একবার, ১৯৭১-এ একবার – দুবার স্বাধীন হয়ে তিনি এটাই বুঝতে পেরেছেন যে মানুষের সামনে কোনো জগদ্দলই অনড় নয়। জগদ্দল প্রতিবন্ধকতা হঠানোই মানব-অস্তিত্ব বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত।
* ১৯৪৭-এর ভারত বিভাজিত স্বাধীনতার বুনিয়াদ ছিল পলকা। ধর্মের লেবেল এঁটে মানুষ চেনানোর ব্রত নিলে আধুনিক রাষ্ট্রের বুনিয়াদ কমজোর হয়ে যায়। বড় ঝড় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পাকিস্তান ভেঙে দুটুকরো হয়ে তা প্রমাণ করল। এখানেই শেষ নয়, পাকিস্তান হিসেবে যেটুকু টিকে রইল, সেখানে একই ধর্মাবলম্বী বেলুচ, পাঠান, সিন্ধি, পাঞ্জাবি এবং ভারত থেকে হিজরত করা বিহারি আত্মঘাতী কলহে লিপ্ত রইল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম, শওকত ওসমান মনে করেন সাম্প্রদায়িকতা থেকে, বর্ণবিদ্বেষ থেকে।
* রাষ্ট্রের বয়স কুড়ি হলেও ভালো করে চোখ ফোটেনি। ধর্মের ধুয়া তুলে এই পতন নিশিগ্রস্ত হয়ে এলেবেলে হেঁটে বেড়ায়, গন্তব্য চেনে না। ইহলৌকিক সমৃদ্ধির বদলে পারলৌকিক ভিক্ষাবৃত্তির মিশন কবুল করে নেয়। ধর্মীয় ও জীবনাচরণের অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কার বৈরী-শক্তি হিসেবে সামাজিক অগ্রগতি প্রতিহত করে। কোনো ভাবাদর্শের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে এটি সমাজের আনাচে-কানাচে ঘাপটি মেরে থেকে সমাজের এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
* গণদুশমনরা মানুষের গ্রাস শুধু কেড়ে নেয় না; এই বঞ্চনার সমর্থনে নানা রকম ইচ্ছাপূরণের গালগল্প পরিবেশন করে রাখে, যেন তাদের ভাতের থালা দেখে অন্য কেউ চোখ না টাটায়।
* পারলৌকিকতার তীব্র টান জাতিকে বেদিশা করে ফেলতে পারে। ইংরেজি ভাষা মুসলমানের জন্য হারাম এই নসিহত কবুল করে মুসলমান সমাজ
জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে এতোটাই পিছিয়ে পড়ল যে, এগোতে হলে প্রতিটি পদক্ষেপেই ইহুদি-নাসারার শরণ মাগতে হবে।
* বিগত বছরগুলোতে সামাজিক সম্পদ বৃদ্ধি না পেয়ে বেড়েছে ব্যক্তির বৈভব। বৈভবে ঠেস দিয়ে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ার হর-ওয়াক্ত নেশাগ্রস্ততা মানুষকে তার চারপাশের জনমানুষ সম্পর্কে একেবারে নির্বিকার করে ফেলল। সবারই যে মানোন্নয়ন ঘটতে পারে এই বোধটিই অননুভূত শেষ পর্যন্ত রয়ে গেল।
* কথিত স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে একজন রাষ্ট্রপ্রধান দেশের প্রত্যন্ত মসজিদে সালাত কায়েম করে যে ফেরেশতাপনা জাহির করতে চেয়েছেন তাতে রাষ্ট্র হয়েছে ভাঁওতাবাজির শিকার এবং হেলিকপ্টারের জ্বালানিতে জনগণের অর্থের অগ্ন্যুৎসব।
* বড্ড অসোয়াস্তির ভেতর দিয়ে পঁচাত্তরতম জন্মদিন ছুঁয়ে তিনি প্রত্যাশা করছেন তাঁর দেশ যেন নরাকার অমানুষমুক্ত হয়, স্বৈরাচার যেন ধূলিসাৎ হয়ে যায়, চেতনার ফুৎকারে সম্প্রদায়ের বহিরাবরণ যেন সম্প্রীতির পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
শওকত ওসমান শতায়ু হননি; যদি হতেন এবং শততম জন্মদিবসে জাতির উদ্দেশে যদি কিছু নসিহত করতে চাইতেন হয়তো সিকি শতক আগেকার কথারই পুনরাবৃত্তি করতেন। কারণ মানুষের ও মনুষ্য সমাজের মনোলোকের সমীক্ষক হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই দেখেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছাড়া মানুষের তেমন বিশেষ কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। কসমেটিক প্রলেপে শোষকের চেহারা খানিকটা বদলেছে, শোষিতের অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি।
অশুভের জয়জয়কার অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে, মন্দের প্রতি যূথবদ্ধ ঘৃণা লোপ পেতে বসেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে দুষ্টের প্রতিপালন সাধারণ মানুষকে আরো বিপদাপন্ন করে তুলেছে।
শওকত ওসমান শতায়ু না হয়েও বিংশ শতাব্দীর বিশ্বাসযোগ্য স্মৃতির বোঝা, সম্ভবত আর সবার চেয়ে বেশি, একাই বহন করেছেন।

তাঁর লেখাতেই হাবশি জল্লাদ মস্রুর খলিফা হারুনর রশিদকে বলেছেন :
স্মৃতি সমস্ত কওমকে জিন্দা করে তুলতে পারে, জনাব। কিন্তু আলামপনা, সকলের স্মৃতিশক্তি থাকে না। হাবা, বোবারা যেমন। তবে অতীতের কথা অনেকে বলে। সে ত এগোতে না পেরে, দুঃসহ বর্তমান থেকে পালানোর কুস্তিপ্যাচ মাত্র। ও এক রকমের ভেল্কি, জীবনীশক্তির লক্ষণ নয়। বলিষ্ঠ মানুষেরই স্মৃতিশক্তির প্রয়োজন হয় সামনে পা ফেলার জন্য।
খলিফাও অনুধাবন করেছেন, লাশ কবরে শুয়ে থাকে না, লাশ কথা বলে, স্মৃতি লাশে প্রাণসঞ্চার করতে পারে। ‘জেন্দা মানুষের কণ্ঠ যেখানে ক্ষীণ ফিসফিসানি’ লাশের সেখানে বজ্রকণ্ঠ। লেখক যদি বলিষ্ঠ হন, তাঁকে বহন করতে হয় তাঁর সৃষ্ট সকল চরিত্রের স্মৃতির দুর্ভার বোঝা। শওকত ওসমানই তা পারেন।
তারুণ্যেও স্মৃতিভ্রংশ বিমারগ্রস্ত জাতিকে বার্ধক্যে নিয়ে যেতে পারে, তাঁর মতো লেখকরাই এই বিমারের শ্রেষ্ঠ দাওয়াই দিতে পারেন। তাঁরাই জাতিকে দেখিয়ে দিতে পারেন কোথায় পচন ধরেছে, মস্তিষ্কে না হৃৎপি-ে? রোগগ্রস্ত জাতির জন্য তারাই শেফাউল ওয়াতান, শেফাউল মুল্ক।

দুই
তখন প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে, ১৯১৪ থেকে ১৯১৯। এটাই নতুন শতাব্দীর প্রথম প্রধান ঘটনা।
শওকত ওসমানের জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯১৭, মহারণের কালেই, পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার খানাকুল থানার সবলসিংহপুর গ্রামে। এই গ্রাম এবং গ্রামের চারদিকে কল্পনার যতটুকু প্রসার শৈশব থেকেই তিনি তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন এবং আগামীর স্মৃতি হিসেবে অনপনেয় কালিতে কোথাও লিখে রেখেছেন, সেখান থেকেই রিপ্রডিউস করেছেন – পুনর্জন্ম দিয়েছেন রাহনামা।
বাবার দেওয়া নাম শেখ আজিজুর রহমান শেষ পর্যন্ত তাঁর লেখক নামের কাছে মার খেয়ে যায়। তিনি অত্যন্ত আধুনিক এবং ইসলামিক নাম শওকত ওসমানকে জাঁকিয়ে তোলেন, নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সনাতন মুসলমানি নামের গ-ি থেকে বের হওয়া ‘শওকত ওসমান’ নামটি পরবর্তীকালে বাঙালি মুসলমানের নামায়নে বেশ প্রভাব বিস্তার করে।
১৯১৭-এর দ্বিতীয় প্রধান ঘটনা রুশ বিপ্লব পৃথিবীকে ভয়ঙ্কর নাড়া দেয়। শোষিতের উত্থানের কাহিনি একটি সর্বজনীন স্বপ্ন হয়ে বিরাজ করতে থাকে। জন্মবছরের সঙ্গে কাকতালীয় মিল থাকলেও ১৯১৭-এর বিপ্লব শওকত ওসমান বেশ আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা যখন সোভিয়েত কাঠামোর খোলনলচে পালটে দিলো, গণতন্ত্রের আবরণে ধনবাদের বিজয় উদযাপিত হলো, শওকত ওসমান বিচলিত হলেন; কিন্তু সমাজতান্ত্রিক যৌক্তিকতা ও বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন না।
১৯১৭ বাংলা কথাসাহিত্যের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য বছর। এ-বছর তখনকার প্রধান কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চারটি আলোচিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয় – দেবদাস, শ্রীকান্ত (প্রথম খ-), চরিত্রহীন ও নিষ্কৃতি। সে-বছরই কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর সদস্য হয়ে চলে যান মেসোপোটেমিয়া রণাঙ্গনে।
তখন স্বদেশি আন্দোলনের (১৯০৫-১৯১৭) শেষ বছর। এর পরপরই আন্দোলনের চারিত্রিক বদল ঘটে, আন্দোলনের নেতৃত্ব মহাত্মা গান্ধীর হাতে চলে যায়। তখন পদাধিকারবলে পরাধীন ভারতের রাজা যিনি তিনি ব্রিটেনেরই রাজা – পঞ্চম জর্জ, ভারতের ভাইসরয় ফ্রেডরিখ থিইজার, ভিসকাউন্ট অব চেমসফোর্ড আর পুনরায় অখ- বাংলার (১৯০৫ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত এবং ১৯৪৭-এর পর বাংলা খ-িত) গভর্নর টমাস গিবসন-কারমাইকেল, সে-বছরই নতুন গভর্নর লরেন্স ডুনডাস বাংলার ছোট লাট হিসেবে যোগ দেন।
জীবনের প্রথম বারো বছর তাঁর কেটে যায় সবলসিংহপুর মক্তবে ও মাদ্রাসায়। ১৯২৯ সালে চলে এলেন কলকাতায়, ভর্তি হলেন আলিয়া মাদ্রাসায়। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু তখন মুক্তির নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন – মিডলক্লাস রেডিক্যালিজম ভিত গাড়তে শুরু করেছে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ আইন অমান্য করার আন্দোলনের কাল। দারিদ্র্য, দুঃশাসন, সামাজিক প্রতিকূলতা ঠেলে হুগলি জেলার পাড়াগাঁয়ের তরুণ তখন কলকাতায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে, ভিন্ন ধাঁচে গড়া শহুরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। সর্বস্বান্ত এক মোল্লা আতাউল হকের কথা বলতে গিয়ে শওকত ওসমান বললেন ১৯২৯-এর বৈশ্বিক মহামন্দার ঢেউ লেগেই তার এই দশা।
ততদিনে অনেক বাধা পেরিয়ে পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, সে-সময় জর্জ হ্যারিস ল্যাঙ্গলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। ওদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছেন ভাইস চ্যান্সেলর ডব্লিউ সি. কুরহার্ট। ৬৮ বছর বয়স্ক রবীন্দ্রনাথ প্রায় পাঁচ মাস যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জাপানে কাটিয়ে শান্তিনিকেতন ফিরলেন। সাহিত্যের স্বরূপ ও সাহিত্যের বিচার নিয়ে ট্যাগোর সোসাইটিতে বক্তৃতা দিলেন, শান্তিনিকেতনে করলেন হলকর্ষণ উৎসব।
এ সময়ের দুটি ঘটনা শওকত ওসমানের মানস গঠনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে। বিপ্লবী ভগৎ সিং এবং তাঁর সহযোগী দিল্লিতে সেন্ট্রাল অ্যাসেম্বলিতে বোমাবর্ষণ করেন। দুবছরের মধ্যে ভগৎ সিং ফাঁসির দড়ি চুম্বন করে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’ সেøাগান দিয়ে ফাঁসি গলায় পরে নেন। ১৯২৯-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা : চাকরিচ্যুতি ও বাড়তি কর্মঘণ্টা বাতিলের দাবিতে পাটকল শ্রমিকদের প্রথম ধর্মঘট। শুরুটা আলমনগর ও বেরানগরে হলেও বাংলার দু-লাখ পাটকল শ্রমিক একাত্ম হয়ে যায়। পেছনে সমর্থন জোগায় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি। এই আন্দোলনের বাঙালি নেতাদের মধ্যে ছিলেন মণি সিংহ, আবদুল মতিন, আবদুর রেজ্জাক খান, কালি সেন ও বঙ্কিম মুখার্জি।
সে বছর স্বদেশী কোম্পানির ক্যানভাস তিনি শুনেছেন খদ্দর পরিহিত যুবক ও বয়স্কদের বক্তৃতায় :
ভাইসব, শত শত বছর শোষণ করে চলেছে বিদেশি কোম্পানি। অথচ আপনারা তা চোখে দেখেন না। এই শোষণের ফলেই এ দেশের লোক গরিব। আমাদের গরুছাগলের মতো দিন কাটাতে হয়।…

আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হলেন ‘ডিসেম্বর মাস ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ, অকুস্থল ১১৯ নং ধর্মতলা স্ট্রিট। এইখান থেকে শুরু হয়েছিল আমার বিদ্যা অর্জনের যাত্রা।’
১১৯ নম্বরের কুঠির গেটের মাথায় বিরাট সাইনবোর্ড ছিল ইংরেজিতে লেখা : খধৎিবহপব ধহফ ঈড়সঢ়ধহু লরেন্স অ্যান্ড কোম্পানি। পরে ছোট অক্ষরে লেখা আন্ডারটেকার। আন্ডারটেকার মানে কী? কালুচাচা জবাব দিয়েছিলেন, মুদ্দোফরাস। মুদ্দোফরাস আবার কী? তাও তো ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।
আন্ডারটেকার শব্দের অর্থ যারা মুর্দা বা লাশের সৎকার করে। তিনি অবাক হন, গ্রামে এদের উপাধি ডোম। ‘কিন্তু শহরের ডোম এত ধনী! কুঠি ভাড়া নিয়ে থাকে। ওদের নিজস্ব ঘোড়ার গাড়ি আছে, যাতায়াত করে।’
শওকত ওসমানের মনে খটকা লাগতে শুরু করে। লরেন্স সাহেবরা খাস ইংরেজ নন, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। এই কিশোরের আড়চোখের দৃষ্টি যায় মেমদের ওপর। ‘প্রথমে চোখ ফিরিয়ে নিতে হতো। স্ত্রীলোক তা যুবতী বা বৃদ্ধ যাই হোক না কেন হাঁটু পর্যন্ত উদোম! তার চেয়ে বিস্ময় আর কি থাকতে পারে।’

মাদ্রাসা হলেও ইংরেজি বিভাগ থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৬-এ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করে, বিএ ডিগ্রিও এখান থেকে। ১৯৪১-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ তাঁকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কাল এবং বাংলার মন্বন্তর অতিক্রম করতে হয়েছে।
তারপর কর্মক্ষেত্র – প্রচারপত্র লেখক, কেরানি, প্রভাষক। অধ্যাপক থেকে অকাল-অবসর নেন ১৯৭২-এ। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধকালে কলকাতায় জ্যেষ্ঠ কলমসৈনিকদের একজন। ১৯৭৫-এ পটপরিবর্তনের পর আবার ঢাকা ছেড়ে চলে যান। কিন্তু স্থিতধী হতে পারেননি। তিনি ফিরে আসেন নিজস্ব পরিম-লে। আত্মজীবনী রাহনামায় হাত দেন। শেষ করতে পারেননি। ১৪ মে ১৯৯৮-তে শওকত ওসমান মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুকে এড়ানো যায় না। শওকত ওসমানের বেলায় মৃত্যুর তারিখ আর কটা দিন পেছাতে পারলে ভালো হতো। তিনিও বলেছিলেন, ‘অন্তত রাহনামা শেষ না করা পর্যন্ত আমার বেঁচে থাকা দরকার।’
তিন
বার্ধক্যের ছদ্মবেশধারণকারী শওকত ওসমানকে তরুণ হুমায়ুন আজাদ জিগ্যেস করলেন, বার্ধক্য আপনার কেমন লাগছে? যৌবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে?
শওকত ওসমান বললেন, বার্ধক্য পড়ন্ত বিকেলের মতো। এখানে এক রকমের আমেজ আছে। ক্লান্ত বলদ পা ফেলে, কিন্তু তাতে দৃঢ়তার ভার – ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্টেডি’।
পরের প্রশ্নটির জবাবে বলেননি, হ্যাঁ আমার ইচ্ছে করে কিংবা জবাব এড়িয়েও যাননি।
শুধু বলেছেন, ‘যৌবনে ফিরে যাওয়ার মতো ভীমরতি বার্ধক্যে এখনো পৌঁছাইনি।’
মানস-যৌবন যার অবলম্বন, শরীরী যৌবন তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, সে যৌবনের জন্য তার হাহাকারও থাকার কথা নয়। বিশেষ করে শওকত ওসমানকে যৌবনে যারা দেখেছেন বার্ধক্যেও তাঁর উচ্ছ্বাস স্তিমিত হতে দেখেননি, কৈশোরে যারা তাঁকে সংগ্রাম করতে দেখেছেন, যৌবন কিংবা বার্ধক্যে তিনি তাঁদের কাছে অবসরপ্রাপ্ত সংগ্রামী হয়ে যাননি; আমরা যারা তাঁকে ষাটোর্ধ্ব বয়স থেকে দেখেছি, তাঁর আধেক বয়সী অনেককেই তাঁর চেয়ে বেশি বুড়ো মনে হয়েছে, তিনি তরুণতরই রয়ে গেছেন আজীবন। তিনি বুড়োর ছদ্মবেশধারী তরুণ।
তাঁর অভ্যুদয় শক্তিশালী কথাশিল্পী হিসেবেই – প্রবল দাপটের সঙ্গেই বাংলা সাহিত্যের একটি বড় পরগনার রাজত্ব করে গেছেন তিনি।
হুমায়ুন আজাদ তাঁকে জিগ্যেস করেছিলেন, একটি অসামান্য সূর্যাস্তের দৃশ্য এবং একজন রূপসীর সৌন্দর্য আপনাকে কেমনভাবে আলোড়িত করে?
শওকত ওসমান ঈর্ষণীয় দক্ষতায় নারীর বর্ণনা দিয়েছেন, জীবনসায়াহ্নের ছবিও এঁকেছেন কুশলী শিল্পীর মতোই। যৌবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে কিনা – এ প্রশ্নটি একটি ফাঁদে আমন্ত্রণ জানানোর মতোই। তখনই যৌন তৎপরতাসহ যাবতীয় সাহসী অভিযান স্মৃতিতে ঝলসে ওঠার কথা। শওকত ওসমান মনে করিয়ে দিলেন ভীমরতি ধরা বুড়োর কথা, যৌবনে ফিরে যাবার দুর্দমনীয় বাসনা তাঁরই থাকার কথা। বয়স তাঁর মধ্যে অবস্থান যত দীর্ঘজীবীই করুক না কেন তিনি যে দীপ্যমান – সেই দীপ্তি এতটুকুও হ্রাস পেতে দেননি। তিনি যৌক্তিক মানুষ – র‌্যাশনাল বিয়িংই রয়ে গেছেন।
সূর্যাস্তের দৃশ্য ও রমণীর রূপমাধুর্য তাঁকে নাড়া দেয় –
এই প্রশ্নের জবাব নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। ভাববাদীর কাছে সৌন্দর্য মনের ব্যাপার, জড়বাদীর বস্তুর ব্যাপার। আমার কাছে ব্যাপারটা দ্বান্দ্বিক। রোমান্টিকদের মতো প্রকৃতি নিয়ে হৈচৈ একসময় করতাম। এখন প্রকৃতি আর আমাকে তেমন টানে না। বয়সের সঙ্গে একসময় রমণীও অবান্তর হয়ে যায়।

এর নামই তো শিল্পীর সততা – নিরাবরণ, নিরাভরণ স্বীকারোক্তি। বয়সের সঙ্গে, তিনি ঠিকই বলেছেন, বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়। ‘তাই দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার জন্যে আর কৌতূহল থাকে না। বরং মানুষই আমার কাছে চিত্তগ্রাহী।’
কুড়ি বছর বয়সের মুগ্ধতা ষাট বছরে অটুট থাকার কথা নয়। তখন একদা বিস্মিত করা ঘটনাগুলোও নিবিড় পর্যবেক্ষণ, তুলনামূলক আলোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের উপাদান হিসেবে উপস্থিত হয়।
বয়সের সঙ্গে কেবল রমণীই অবান্তর হয় না, শওকত ওসমানের সংগ্রামী নারীর কাছে একসময় পুরুষও অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় দুর্ভার বোঝা।
স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘আব্বাস’ নামের গল্পটি নিয়ে প্রশ্ন করা যায় এ কি চৌদ্দ বছরের বালকের গল্প না চৌত্রিশের কোনো পরিণত পুরুষের?
চামড়ার কারখানার শিশুশ্রমিক আব্বাস মোটেও শ্রমবিমুখ নয়, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ। এই বালক পথের ডাক শুনেছে। সড়কের ইশারায় পথ চলতে শিখেছে, জুলুম থেকে বাঁচার নিশান তার হাতে।
শওকত ওসমানের তরুণ নায়ক মুরারি বহু বিশেষণে অলংকৃত মায়াবী ঈশ্বরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামে।
মুরারিকে সতর্কও করা হয়, ‘অসম প্রতিযোগিতা আসলে ভালো নয়, ঈশ্বরের সঙ্গে বেয়াদবি পাপ। তা আখেরে সর্বনাশ ডেকে আনে।’
সর্বনাশ হয় হোক – প্রতিদ্বন্দ্বিতাই তো স্বাধীনতা। যে মানুষ প্রতিযোগিতায় নেই, ভেতরে ও বাইরে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই সে তো তাহলে ঈশ্বরের মতো একঘেয়ে। তাছাড়া ঈশ্বর নিরাকার, তাঁর পক্ষে সর্বত্র বিরাজমান থাকা সম্ভব, কিন্তু মানুষের যে আকার আছে – এটাই বড় সীমাবদ্ধতা; তার পক্ষে অমনি প্রেজেন্ট – সর্বত্র হাজির হওয়া সম্ভব নয়। ঈশ্বরের বিরুদ্ধে খামাখা লড়ে লাভ নেই। ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের পেরে ওঠার কথা নয়। শওকত ওসমানের সেই কিশোর মুরারি তবুও বলে, কিন্তু চেষ্টা করে দেখা উচিত।
পরিণতি ভালো হয়নি সত্য, মুরারি চেষ্টা করেছে।
শওকত ওসমানও পরিণতির অঙ্ক কখনো করেননি, তাঁর মনে হয়েছে রাষ্ট্রের, প্রতিষ্ঠানের, সংস্থার, সমাজের, ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত, তিনি দাঁড়িয়ে গেছেন।
আবার তিনি লিখেছেন : মনুষ্যত্বে বিশ্বাস রাখা বিপজ্জনক, পরক্ষণেই বলেছেন, মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ। লেখককে এই দ্বন্দ্বের সিনথিসিস করতে করতেই এগোতে হয়, শওকত ওসমান তা করেছেন দক্ষতার সঙ্গে, মিহিন দাগে, শিল্পকে রাজনৈতিক সেøাগান না বানিয়ে।

চার
এমন অদম্য প্রাণশক্তি, এত তারুণ্য, এত উদ্যম
শওকত ওসমানকে নিয়ে হাসান আজিজুল হক লিখেছেন : ‘এমন অদম্য প্রাণশক্তি, এত তারুণ্য, এত উদ্যম কম মানুষেরই দেখেছি।’
যাঁরা শওকত ওসমানকে কাছে থেকে দেখেছেন তাঁরা সাক্ষ্য দেবেন এই বর্ণনায় এতটুকুও বাহুল্য নেই।
প্রাণশক্তি, তারুণ্য, উদ্যম যে কেবলই বয়সের অবদান তিনি এই মিথটিকে ভেঙে দিয়েছেন।
প্রাণশক্তি, তারুণ্য, উদ্যমে তৈরি ভিতের যে প্রকৃত উচ্চতা তিনি বেঁধে দিয়েছেন, গত পাঁচ দশকে সে উচ্চতা কে ডিঙিয়ে গেছেন? কিংবা ডিঙিয়ে যাবেন আমাদের জানা এমন কোনো সের্গেই বুবকার আবির্ভাবের পদধ্বনি শোনা যায়নি। কয়েক প্রজন্ম অপেক্ষা করার পরও পদধ্বনি অশ্রুতই রয়ে গেল।
শওকত ওসমানের প্রভাবটা কেমন? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছেন : তাঁকে পড়ার প্রস্তুতিও দরকার।
একটার পর একটা ছবি, ধারাবাহিক সব ছবি ৩০-৩৫ বছর ধরে যিনি পাঠকের চোখের সামনে সেঁটে ধরে রাখতে পারেন, পাঠকের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছবিগুলো ঝাপসা না হয়ে দিন দিন বরং টাটকা হতে থাকে, তিনি তো কম বড়লোক নন। আব্বাস, জুনু আপা, গেহু, ইমারত এইসব গল্প যখন পড়ি তখন লেখক নিয়ে কৌতূহল ছিল না, গল্পের লোকজন নিয়েই বুঁদ হয়েছিলাম। এর পরপরই স্কুলে থাকতে জননী পড়ি, অতটা সাড়া পাইনি। পরে বুঝেছি বইটা পড়ার জন্য একটু প্রস্তুতি দরকার।
কবি আবুল হোসেন তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন দুর্ভাগ্য কেমন করে একজন সৃষ্টিমুখর মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
১৯৭১-এর বিপর্যয় তাঁকে টেনে নিয়ে ফেলল পশ্চিমবঙ্গে। নিঃস্ব উদ্বাস্তু করে। দারুণ দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে দেশ যখন স্বাধীন হলো, সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্বপ্নবিভোর, শওকতের চেনাজানারা অনেকেই ওপরে উঠেছেন, অধ্যাপক থেকে উপাচার্য হচ্ছেন, জাতীয় অধ্যাপক হচ্ছেন, মন্ত্রী হচ্ছেন, আমাদের বন্ধু দেশে ফিরে এসে হুট করে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বসল। পেনশনের হাজার টাকাও নয়। আবার (পঁচাত্তরে স্বেচ্ছানির্বাসন) মুক্তিযুদ্ধকালের উদ্বাস্তু জীবনে ফিরে যাওয়া, এবার মাত্র নয় মাস নয়, অনেক বছর।
তাঁর কৃচ্ছ্রতা, অনটন ও নৈঃসঙ্গ্যের সাক্ষ্য রয়েছে, আবার যখন নিজ দেশে ফিরে আসেন তখনো অন্য এক ধরনের উদ্বাস্তু। তারপরও ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাণশক্তি কখনো সে হারায়নি।’
আহমদ রফিক দেখেছেন শওকত ওসমানের হাতের ধারালো ছুরিটা, স্যাটায়ারে মোড়া। এই অস্ত্রটির ব্যবহার যখন প্রয়োজন, তিনি তখনই সময়ের আহ্বান শুনেছেন, সাড়া দিয়েছেন। তিনি শিল্পের জন্য শিল্প – এই তালিকাভুক্ত ছিলেন না, সামাজিক দায়বদ্ধতাকে তিনি এড়াতে চেষ্টা করেননি, বরং আগ বাড়িয়ে দায়বদ্ধতার মানচিত্রটিকে সম্প্রসারিত করেছেন।
আহমদ রফিক বেছে নিয়েছেন শওকত ওসমানের একটি উদ্ধৃতি : ‘মননের সড়ক মাড়ানর তকলীফ নিতে কবিরা আর সাহস করে না। এখন তো সরিসৃপের যুগ চলছে – সবাই বুকে হাঁটার দলে ইমেজ আর শব্দ গড়ার গতিময়তা উপজীব্য। মগজ পরিত্যক্ত।’

এটাকে ভালোই বলি না মন্দই বলি সত্যটা হচ্ছে, শওকত ওসমান তাঁর নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে লুকোতে পারেননি। এই অস্থিরতা সৃজনশীলতার, কল্যাণচিন্তার এবং আরো প্রতিবাদী না হতে পারার।
জার্মানির কবি রাইনার মারিয়া রিলকের সঙ্গে কোনো ধরনের তুলনায় না গিয়ে দুজনের স্বভাবের একটি ঐক্য তুলে ধরেছেন কবি শামসুর রাহমান।
রিলকে, আমরা জানি, সর্বক্ষণ লেখার কথা ভাবতেন। যখন কবিতা লিখছেন, কোনও বই পড়ছেন, কাউকে চিঠি লিখছেন, ভ্রমণ করছেন, বিশ্রামের জন্য বিছানায় গা ঢেলে দিচ্ছেন কিংবা কবিতা লিখতে বা পড়বার অস্থির সময় যাপন করছেন – যত সময়েই সেই লেখা আর লিখতে না পারার ভাবুক।
এদিক থেকে মহৎ কবি রিলকের সঙ্গে শওকত ওসমানের সাদৃশ্য পাব আমরা। তিনিও সর্বক্ষণ লেখার চিন্তায় বিভোর ছিলেন… একালের তৃতীয় বিশ্বের বাসিন্দা হিসেবে মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, কূপম-ূকতা, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লিখেছেন। বারবার শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে হয়েছে, নান্দনিকতাবর্জিত প্রচুর নিবন্ধ এবং শেখের সম্বরা জাতীয় লেখা লিখতে হয়েছে জনসাধারণের ঘুমিয়ে পড়া চেতনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য। তৃতীয় বিশ্বের লেখকদের এই ট্র্যাজেডি বিষয়ে সচেতন ছিলেন শওকত ভাই।
আবুল আহসান চৌধুরীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নজরুল সম্পর্কে বলতে গিয়ে মূলত অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথাই বলেছেন : অসাম্প্রদায়িকতা ছাড়া এই দেশের মুক্তি নেই। নজরুলের সমস্ত শিল্প-সাহিত্য সাধনার মূলে এই চিন্তা ছিল বললে ভুল বলা হবে না। কাজেই আমরা তো ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি আরো এ জন্য যে কোনো বাঙালি মুসলমান ভবিষ্যতে তাঁর ওই জায়গা নিতে পারবে কিনা আমি জানি না। আজকের এই ১৯৯৬ সালেও আজও চ-ীম-প থেকে, পূজার ম-প থেকে যে গান হয় মা কালীই হোন আর মা দুর্গাই হোন আর শ্যামাই হোন, সেই গানের রচয়িতা একজন মুসলমান – তাঁর নাম কাজী নজরুল ইসলাম।
…রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ছিলেন তাই বোধহয় এইদিকে নজর দেননি। আমি মনে করি এই একজন লোক তিনি ইসলামি গানও লিখেছেন, তেমনি আবার অন্য গানও লিখেছেন। এবং এই যে ঐতিহ্য এই ঐতিহ্য গর্ব করার মতো। …এই আদর্শে গত আটশো বছরে ওই একজন মডেল বাঙালি জন্মেছেন।
নজরুলকে নিয়ে তাঁর দারুণ উচ্ছ্বাস, মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করা হবে, সব প্রস্তুত তবুও দেরি করা হলো – শুরুটা হোক নজরুলের জন্মদিনে। ‘সে জন্য আমরা পাঁচ-ছয়দিন অপেক্ষা করেছিলাম। পৃথিবীর কোনো কবির ভাগ্যে এই জাতীয় সম্মান তুমি কল্পনা করো।’
‘যে মুসলমান মা কালীর গান লেখে সে তো আর মুসলমান থাকে না’ – শওকত ওসমান এই সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লিখেছেন। নজরুলের এই সর্বধর্মীয় সাংস্কৃতিক চর্চার মডেলটিই শওকত ওসমান আত্তীকরণ করে নিয়েছেন। এই কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটেছে।’ এই পৌনঃপুনিকতায় তাঁকে গালমন্দ করার মতো কিছু বান্ধবও জুটেছেন, বৈরিতাও কম হয়নি। দুজনের সাহিত্যকর্মের ধরনে মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। কিন্তু শওকতের চেতনার আকাশ ছিল নজরুলের আলোতে উদ্ভাসিত। ২১ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন :
সন্ধ্যায় নজরুলকে দেখতে গিয়েছিলাম। ছোট ছোট কামরার ফ্ল্যাট। তারি এক কোণে শুয়ে আছেন পুরুষসিংহ। সেই অপূর্ব চোখ কেমন যেন দিশেহারাভাবে নিষ্প্রভ।
তিন মিনিটের বেশি দাঁড়াতে পারলাম না। চোখে পানি এসে গেল। তাড়াতাড়ি বসার ঘরে পালিয়ে বাঁচলাম। এই দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।
দরিদ্র, কুসংস্কার-আচ্ছন্ন মুসলমান সমাজ। তারই ভেতর থেকে এমন একটি মানুষ জন্মেছিল বলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে কত সহায়তা না পেল।
বাংলার ঐতিহ্য স্তম্ভ হয়েছিল যার মধ্যে তার এই দশা আমি দেখতে পারব না।

‘শওকত ওসমান কোনোদিন কোনো মুখোশ পরতেন না’ – এই একটি বাক্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কথাশিল্পীর অন্তরলোককে সঠিকভাবে পরিচিত করিয়েছেন। মুখোশপরা লেখক শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যান।
‘আমি বাংলা সাহিত্যের দিনমজুর মাত্র এবং স্বধর্মচ্যুত নই’ তাঁর এ কথার উদ্ধৃতি দিয়ে মুস্তাফা নূরউল ইসলাম আলোকসম্পাত করেছেন স্বধর্মচ্যুতির ওপর।

পাঁচ
কেমন আছেন শওকত ওসমান?
মৃত্যুর দশ বছর আগে শওকত ওসমান নিজেকে যে পত্রটি লিখেছেন ধ্রুপদ মর্যাদা হতে পারে এটির।
জনাব শওকত ওসমান সাহেব,
অনেক দিন আপনার কোনো সিরিয়াস লিখা আমার চোখে পড়ে না। ব্যাপার কী? আপনার ইঞ্জিনে কি তেল খতম? তাই যদি হয়, আপনি আপনার পাঠকদের নিকট জানিয়ে দিন। আমরা আর সেদিকে ফিরে চাইব না। কিন্তু আপনার নিকট আমাদের প্রত্যাশা ছিল। এই ভাগ্যহত দেশ যখন ক্রমশ নিচের দিকে কমতে শুরু করেছে, আমরা ভাবতাম, এই দেশে অন্তত একটি লোক আছেন যিনি এই রসাতলের পথে বাঁধ দিতে বদ্ধ-পরিকর।
ওসমান সাহেবকে লেখা শওকত ওসমানের এই চিঠিতে অত্যন্ত নির্মম সমালোচকের বিষদন্ত তাঁকে বিবস্ত্র করে কামড় বসিয়েছে। তিনি চেষ্টা করেছেন প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরির, পারেননি। চিঠিতে রয়েছে :
শেকসপীয়ার ইমারতে থাকত না কুঁড়ে ঘরে থাকত তা তাঁর নাটক আর কাজের বিচারে অবান্তর। সুতরাং ব্যক্তিজীবনে আপনার সুবিধা অসুবিধা নিয়ে আমরা কি ধুয়ে খাব? ছুতো নানা রকম। এসব ছুতো ভীরু মানুষের লুকানোর ফন্দিফকির। আপনি যে শাসকদের মোকাবিলায় বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারেননি, তা নিয়ে আলোর মত স্পষ্ট।
নিজেকে কাটাছেঁড়া করার উদারতা ও দুঃসাহস অন্তত এই চিঠিতে শওকত ওসমান যেভাবে নিজেকে আক্রমণ করেছেন, বাংলাদেশে এ রকম দ্বিতীয় কেউ করেননি। ভারতীয় লেখক খুশবন্ত সিং নিজেকে নিয়ে খুব ঠাট্টা-মশকরা করেছেন তাঁর ‘পোসথিউমাস’ গল্পে।
নির্বাসিতের জীবন কখনোই সুখকর নয়। সংকটের ও উপেক্ষার। শওকত ওসমান তাঁর রসবোধটি হ্রস্ব হতে দেননি।
ব্যক্তিগত সংকট ও দাঁতের ব্যথার মতো শারীরিক যন্ত্রণায়ও তিনি তাঁর অননুকরণীয় রসবোধ ধরে রেখেছেন :
দাঁতে ব্যথা। দন্তোৎপাটন প্রয়োজন। ইঞ্জিনিয়ার আলি ভাই খোট আমাকে পার্শি মহিলা ডেনটিস্টের কাছে নিয়ে গেলেন। নাম মিসেস মোতিওয়ালা। শান্ত সুন্দরী গৌরাঙ্গিনী। পূর্বে অনেকের হৃদয় উৎপাটন করে থাকলে বিস্ময়ের কিছু নেই। দাঁত বিসর্জন দিয়ে ফিরে এলাম।

প্রবল প্রলোভনেও তিনি বিচ্যুত হননি, সৎসাহসী তো বরাবরই ছিলেন, দুঃসাহসও দেখিয়েছেন অনেক সময়। ক্রীতদাসের হাসি তো দুঃসাহসেরই এক উপাখ্যান। ঘাড়ের ওপর যখন একনায়কের নিঃশ্বাস তাতারীর অট্টহাস্যই একই সঙ্গে মারণাস্ত্র ও রক্ষাবর্ম।
১৯৭৫-এ প্রকাশিত নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত গ্রন্থে শওকত ওসমান তাঁর মৃত্যুর একটি নৈর্ব্যক্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন – এ ধরনের ঠাট্টা তাঁকেই মানায়।
কাল মারা গেছেন শওকত ওসমান
(ইন্নালিল্লাহে … রাজেউন) রবিবার তেইশে অঘ্রান ইমশাল। ইং…
ডাংগুলির ভাষায় ফিরে গেছে প্যাভিলিয়নে ক্লান্ত ব্যাট কাঁধে
সমস্ত জীবন যা ঘুরিয়েছে অবাধে লেটকাটে পাকা – এবার সত্যি আউট।
মরহুমের বয়স নিয়ে ঝুটমুট গবেষণা। কেউ বলে ত্রিশ, কেউ বাহাত্তর,
কেউ যোগ করে আরো ছিল, ছিল ক্ষুর লেজ অপি-শতাধিক
বয়সের ফল মানরত বাধ্য, বার্ধক্যেও ভীষণ চঞ্চল।
অদম্য প্রাণশক্তি না থাকলে নিজেকে আক্রমণ যায় না, রসবোধের ঘাটতি থাকলে খোঁচানো যায় না, নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা তো নয়ই, আর কলমের জোর না থাকলে লেখা যায় না এমন অবিচুয়ারি।

শওকত ওসমান যাদের না-পছন্দ তাদের অভিযোগ, সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলে তিনি ইসলামের অবমাননা করেছেন।
এটাও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। তিনি যে যুগের, তাঁর জন্ম ও কৈশোর যেখানে কেটেছে সে সময় ও সে স্থান ইসলাম-প্রাধান্যের জয়গানের নয়। সে সময় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য মুসলমান ইউসুফ খানকে নিজ নাম ভুলে দিলীপ কুমার হতে হয়েছে, বিকল্প আরো একটি নাম তাঁর জন্য প্রস্তাবিত ছিল – বাসুদেব; মুমতাজ বেগম জাহান দেহলভি হয়েছেন মধুবালা, মাহজাবিন বানু হয়েছেন মীনা কুমারী, বদরুদ্দিন জামালউদ্দিন কাজী হয়েছেন জনি ওয়াকার। আর তিনি হয়েছেন শওকত ওসমান – শ্যামলকান্তি কিংবা শ্যামসুন্দর তিনিও তো হতে পারতেন। হননি, শ্রুতিমধুর ইসলামি নামই নিয়েছেন এবং সে নামকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, এদিকটা সম্ভবত আমরা এড়িয়েই গেছি।
বাঙালি মুসলমান আবার লিখতে জানে নাকি? শওকত ওসমানকে শুরু করতে হয়েছে এমনই এক সময়, যখন এ রকম প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল, প্রশ্নটি তাচ্ছিল্যের হতে পারে,
যৌক্তিকতাবর্জিত তো নয়। যে সময় মনীষ ঘটকের মতো সমালোচক আবুল ফজলের উপন্যাসকে অপাঠ্য বলে উড়িয়ে দেন, মুসলমান লেখকদের মধ্যে এমনকি সেক্যুলার ও প্রগতিপন্থীদের রচনাও ধর্মীয় পরিচিতির কারণে অস্পৃশ্যই রয়ে যায়, আমাদের স্মরণ রাখতে হবে শওকত ওসমানের লড়াইয়ের শুরুটা কিন্তু তখনই – তাঁর লড়াইটা যতটা না ছিল খেয়ে-পরে বাঁচার লড়াই, তার চেয়ে বেশি ছিল ঘরের ভেতরের ধর্মীয় মৌলবাদ এবং ঘরের বাইরের সাংস্কৃতিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে।

পিতৃতান্ত্রিকতা ও ধর্মীয় অনাচারের বিরুদ্ধে
ধর্মব্যবসায়ী শক্তির বিরুদ্ধে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র লাল সালু অনেক বড় কীর্তি সন্দেহ নেই, কিন্তু যা অব্যক্ত রয়ে গেছে তা হচ্ছে এই শক্তির বিরুদ্ধে শওকত ওসমান কশাঘাত করেছেন লাল সালুরও অনেক আগে, গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে অন্তত দশটি রচনায়।
বনী আদম কি জননী এই প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিরুদ্ধে আসলে আমাদের পথিকৃৎ উপন্যাস। যে-কজন বাঙালি মুসলমান কথাসাহিত্যিকের হাতে আধুনিক ভাষা ও মুসলমান সমাজের দ্বন্দ্বসংকুল ভেতর কাহিনি পরিমিত ভাবাবেগের মধ্য দিয়ে উপন্যাসে উঠে এসেছে শওকত ওসমান তাঁদের অন্যতম পথিকৃৎ।
তাঁর জননীর রচনাকাল ১৯৪০ থেকে, আংশিক প্রকাশনা সওগাতের ১৯৪৪-৪৫ সালে, জিন্দান নামে। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতে দেরি হয়ে যায় ১৯৬১-তে।
বনী আদম প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ থেকে ঈদসংখ্যা আজাদ পত্রিকায়। গ্রন্থাকারে ১৯৪৮ সালে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দুটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখেন কুড়ি থেকে তিরিশ বছরের মধ্যে। পরবর্তী সময় এই তারুণ্যের নিষ্ক্রিয়তা তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে :
কি যে দিন ছিল ২৫ বছরের
দেহে ও মনে হয় ফিডার বেবি
ছেলে বড় হয় না, পাকে না
ফল দেবে কী?

নারী, মাতৃত্ব, দারিদ্র্য ও স্খলনের এক অসামান্য উপন্যাস জননী। দরিয়া বিবি কেবল একটি কাহিনির জননী নন, জননী শোষিত সমাজের, জননী বাংলা সাহিত্যের। পৌনে এক শতাব্দী আগে কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরের তরুণ শওকত ওসমান সংষভাঙ্গা গ্রামের যে দরিয়া বিবিকে নির্মাণ করেছেন কিংবা যে দরিয়া বিবিকে জ্যান্ত তুলে এনেছেন, বিস্ময়করই মনে হয়।
দরিয়া বিবি আজহার, ইয়াকুব, চন্দ্রকোটাল সব মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছে, সংগ্রামী জীবনের একটি কোলাজ। দারিদ্র্য দরিয়াকে একটুখানি বেপথু করেছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেখিয়েছেন ম্যাক্সিম গোর্কির মাদার (১৯০৬ সালে প্রকাশিত)-এর মা নিলোভনা এবং পার্ল এস বাকের দ্য গুড আর্থের মা ও-লানের চেয়ে ভিন্ন ধরনের মা শওকত ওসমানের জননীর দরিয়া বিবি। তিনি লিখেছেন :
জননী উপন্যাসের নায়িকা দরিয়া বিবি বাঙালি সমাজের গরীব ঘরের মায়েদের একজন প্রতিনিধি। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকেও বঙ্গভূমি শ্রেণিতেই বিভক্ত ছিল। দরিয়া বিবি প্রান্তিক কৃষিজীবী শ্রেণির মানুষ। স্নেহ-ভালোবাসা, স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা এবং সর্বোপরি দুঃখ ও যন্ত্রণায় দরিয়া বিবি দরিদ্র মায়েদেরই একজন। দরিয়া বিবি সর্বংসহা।… শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতাটাই প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

দরিয়া বিবি একটি প্রায় অনিবার্য ধর্ষণ এড়াতে পারে না। তিনি লিখেছেন :
অবৈধ সন্তানের মাতৃত্বজনিত অপরাধবোধ ও গ্লানি বহন করতে সে সম্মত নয়। তার চরিত্রে আত্মসমর্পণ নেই, দাসত্ব তার স্বভাববিরুদ্ধ। মুক্তির একটি মাত্র পথই তার জন্য উন্মুক্ত ছিল।
দরিয়া বিবির পেটে বিয়ে-বহির্ভূত সন্তান। সেই সন্তান প্রসবের বর্ণনা :
অসহ্য বেদনায় দরিয়া বিবি এই প্রথম মুখ কুঞ্চন করিল। মাদুরে হাত পিছলাইয়া যায়, তাই একটু আগাইয়া সে মাটি আঁকড়াইয়া ধরিল। মাটির কন্যা জননীর আশ্রয় ছাড়া কোথায় তাকৎ পাইবে? ত্বরান্বিত হোক হে আদিম শিশু তোমার আগমন। আজ বিজয়িনীর মত দরিয়া বিবি ধাত্রী ও প্রসূতি হইয়া যায় একত্রে।
দরিয়া বিবি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। ‘দড়ির ফাঁসের দিকে দরিয়া বিবি তাকাইল। সারাজীবন কত উদ্বেগ, কত সংগ্রামজনিত ক্লান্তি – সব ওইখানে ঝুলাইয়া রাখিয়া সে নিশ্চিত হইতে চায়। তার আগে দরিয়া বিরিডিপা নিবাইয়া ঘর অন্ধকার করিয়া দিল।’
বনী আদমের প্রেক্ষাপট গ্রাম ও নগরের বস্তিজীবন, এখানে টিকে থাকার সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে রূপ নেয় এবং শ্রেণিহীন সমাজ সৃষ্টির স্বপ্ন দেখায়।
শওকত ওসমানের প্রিয় বিষয় দেশ, একদা ভারত, তারপর পাকিস্তান অতঃপর বাংলাদেশ। পাকিস্তানের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ নিয়ে তিনি কখনো আবেগ-বিহ্বল ছিলেন না, বরং পাকিস্তানের দুই অংশের বন্ধনের দৃঢ়তা নিয়ে সন্দিহানই ছিলেন। ভৌগোলিকভাবে সন্নিহিত না হওয়াসহ দুই অংশেরই পরস্পরকে আবিষ্ট করে রাখার মতো উপাদানের ঘাটতি থাকায় তিনি রাষ্ট্রটিকে তাত্ত্বিকভাবেই বিকলাঙ্গ মনে করেছেন। কোনো রচনাতেই তিনি পাকিস্তান নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন না। তাঁর একাত্তরের ডায়েরি স্মৃতিখ- মুজিবনগরে লিখছেন :
বিসমিল্লায় গলদ ছিল। তবে ধর্মের বন্ধনও কম শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু দেখা গেল ধর্ম এক হলেও চেতনার স্বরূপ এক নয়। ভাষা এক নয়। চাল-চলন, আচার-ব্যবহারে প্রচ- ফারাক। ভাষা, আচার-ব্যবহার যুগ-যুগান্তের ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বন্ধন ইত্যাদি সব মিলে জাতীয়তার ভাবমূর্তি তৈরি হয়। এখানে তেমন ঐক্য অনুপস্থিত। আরো দেখা গেল, সামাজিক কাঠামো পর্যন্ত বেশ পৃথক।… পশ্চিমে মধ্যবিত্ত নেই। সেখানে হুজুর এবং মজুর দুই শ্রেণী। সামন্ত জমিদারি প্রথা পশ্চিমের সামাজিক বুনিয়াদ রক্ষার মূল স্তম্ভ।… রাজনৈতিক ধারায় পরাধীনতার মুখে বৃটিশ আমলে শুধু ধর্মের জিগিরের জোরে দুই অঞ্চলে রাখীবন্ধন হয়।

কিন্তু সে বন্ধন টেকার নয়, টেকেনি। আরো আগে ১৯৭১-এ তিনি বুদ্ধিমুক্তি আন্দোলনের শীর্ষ সারথি কাজী আবদুল অদুদ প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, তিনি বেঁচে থাকলে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর সাফল্য দেখে যেতে পারতেন যে ধর্ম কোনোদিন রাষ্ট্রপত্তনের ভিত্তি হতে পারে না।
পাকিস্তান ভেঙে যাচ্ছে, শওকত ওসমান নিজেকে দেখতে চেয়েছেন রণাঙ্গনে, ‘বাংলাদেশে জন্মানোই যেন অপরাধ। অপমৃত্যুর কতো রকম সংবাদই না প্রত্যহ পাওয়া যায়। তখন মনে হয় হাতিয়ার হাতে যারা দানবদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারাই ভাগ্যবান, প্রকৃত মানুষ।’
৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ তিনি লিখছেন : বাংলাদেশ মুক্ত হতে আর বেশিদিন লাগবে না। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর চাপে থেৎলে যাবে পাকিস্তান বাহিনী। কিন্তু বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ অবাঙ্গালী আছে এবং যারা মুসলিম ওয়াতান-এর মরীচিকার পেছনে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এখানে এসে জুটেছিল উজ্জ্বল স্বপ্ন চোখে, আজ এই পরিণাম।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম উঠে এসেছে জাহান্নাম হইতে বিদায়, দুই সৈনিক ও নেকড়ে অরণ্য এবং জলাঙ্গী উপন্যাসে। এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার অবকাশ রয়ে গেছে। তাঁর হাতে মুক্তিযুদ্ধের ধ্রুপদ উপন্যাস হতে পারত, এ আফসোস আমাদের রয়েছে, তাঁরও ছিল। কিশোর উপন্যাস মুজিবনগরের সাবু সকলকেই দেশপ্রেমের সবক দেয়। একাত্তরের ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হয়ে গেল – ‘যুদ্ধ শেষ হলে মেশিনগান কোনো কাজে লাগে না’; কয়েক দিনের মধ্যেই ক্যাম্প উঠে যাবে, তার মানে ‘এলেমজির কাজ শেষ’। এবার শহরে যাবে সাবুর দলের যোদ্ধারা। কিন্তু সাবু ফিরে যাবে গাবতলী। মা যদিও প্রয়াত তবুও সেখানে উঠানে, পথেঘাটে মা তো দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে গাবতলীর গাছপালা, পশুপাখি খাল-বিল-নালা-নর্দমা সব আছে, সবাই সাবুকে চেনে। কোন দুঃখে তাদের ফেলে সে শহরে যাবে।
তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে সমাগম, চৌরসন্ধি, রাজসাক্ষী, পতঙ্গ পিঞ্জর, আর্তনাদ, পিতৃপুরুষের পক্ষ, নষ্টতান অষ্টভান। ক্রীতদাসের হাসি তো বাংলা সাহিত্যের এক মাইলফলক।
শওকত ওসমান মনে করেন বাংলা উপন্যাস ইউরোপীয় সভ্যতার দান। সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারত যখন ব্রিটিশ শাসনের কিংবা সাম্রাজ্যবাদের ইস্পাত কাঠামোতে আটকে পড়ে, ইউরোপীয় আদলের উপন্যাস নিয়ে আবির্ভূত হন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ইউরোপীয় উপন্যাসে তাঁর চোখ পড়েছে ডিকেন্সীয় ভাবালুতা, লরেন্সীয় উপজ্ঞাচারী দেহ-সর্বস্বতা, জয়েসীয় নৈরাজ্যবাদী অবচেতনের পশ্চাৎভ্রমণ, উলফীয় নৈরাশ্য। তারা ব্রিটিশমানস ও সমাজব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করেন, সমগ্র ইউরোপকে নয়।
উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় আত্মকেন্দ্রিকতার আদর্শে আত্মহারা বঙ্কিমচন্দ্রের সার্থক আবির্ভাব তখনই। উপনিবেশের মধ্যবিত্ত উকিল ডেপুটি মুৎসুদ্দি কেরাণী দোকানদার ছোট ব্যবসায়ী সাম্রাজ্যবাদীদের খানার টেবিল থেকে ছুড়ে দেওয়া হাড়গোড়ে তার উদরপূর্তি। সেখানে অপরিচ্ছন্নতা ও অ্যানিমিয়া রোগ স্বাভাবিক। তার জাতীয়তাবাদ শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হয়। কারণ মধ্যবিত্ত আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টির জন্য প্রতিবেশী ছাড়া আর কিছুই দেখে না। কেরাণী প্রফেসর কি এই জাতীয় জীব তার প্রতিবেশী কেরাণী কি অধ্যাপকের উন্নতিতে হিংসাপরায়ণ।
মধ্যবিত্তের শিরদাঁড়াহীনতা তিনি সঠিকভাবেই শনাক্ত করেছেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণি দু-মুখো। বঙ্কিমচন্দ্রকে তিনি পাল্লায় তুলেছেন –
প্রবন্ধ সাহিত্যের বঙ্কিমচন্দ্র বৈজ্ঞানিক চেতনাসম্পন্ন মনীষী। উপন্যাসে তিনি ভাটিপাড়া নিবাসী প-িত যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র। অবশ্য মধ্যবিত্তের পূর্ণ বিকাশক্ষণে উপন্যাসের নায়ক কত শৌর্যদীপ্ত, পরবর্তী ক্ষয়ের যুগে নায়ক ভাবালুতাচারী মেরুদ-হীন জীব। শরৎচন্দ্রের নায়করা তো দশম-দশায় মূর্ছিত বৈষ্ণব।
শওকত ওসমান নিজে কোন পথে এগোবেন সে সিদ্ধান্ত তাঁর মানস গঠনপর্বেই নিয়ে নিয়েছেন, সেখানে কার্ল মার্কসের দার্র্শনিকী প্রভাবই মুখ্য বলে মনে হয়, ম্যাক্সিম গোর্কিকে তিনি মনে করেন অন্যতম আরাধ্য। ১৯১৭-র বিপ্লবকে যেভাবে তুলে এনেছেন গোর্কি, অস্ত্রভস্কি, পাস্তেরনাক, মায়াকোভস্কি, ইয়েসেনিন, যোশচেঙ্কো, বুলগাকভ, আখমাতোভা শওকত ওসমানের মানস গড়ে উঠেছে সেই আদলে। তাছাড়া গত শতকের তিরিশ ও চল্লিশের দশকের তারুণ্য সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়েই বেড়ে উঠেছে। শওকত ওসমানের বেলায় আমজনতার উঠে দাঁড়ানোর সংকটগুলো তো তাঁর নিজেরই জীবনের, অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর ও তাঁর স্বজনদের। সব মিলিয়ে শিল্পচর্চার লক্ষ্য ঠিক করতে তাকে অন্ধকারে হাতড়াতে হয়নি। তার সেরা কাহিনির পাত্রপাত্রীর আপ্রাণ প্রচেষ্টা – একটি সমতাভিত্তিক, ন্যায়ানুগ, উৎপাদনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা।
শওকত ওসমানের ১৪টি গল্পগ্রন্থ। তাঁর ছোটগল্পও পৃথক আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর গল্পগ্রন্ধগুলো হচ্ছে : পিজরাপোল, জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প, সাবেক কাহিনী, উভশৃঙ্গ, প্রস্তর ফলক, উপলক্ষ্য, নেত্রপথ, জন্ম যদি তব বঙ্গে, এবং তিন মীর্যা, বিগত কালের গল্প, মনিব ও তাহার কুকুর, পুরাতন খঞ্জর ও হন্তারক। ১৯৭৪-এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠগল্প সংকলন, ১৯৮৪-তে শওকত ওসমানের নির্বাচিত গল্প।
তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : সমুদ্র নদী সমর্পিত, ভাব-ভাষা-ভাবনা, ইতিহাসে বিস্তারিত, সংস্কৃতির চড়াই উৎরাই, নিঃসঙ্গ নির্মাণ, মুসলমান মানসের রূপান্তর, পূর্ণ স্বাধীনতা চূর্ণ স্বাধীনতা, ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী ও উপদেশ কমদেশ।
শিশুসাহিত্যে তিনি বড় নাম – ওটেন সাহেবের বাংলো কিংবা পঞ্চসঙ্গী কিংবা ডাক্তার আবদুল্লাহর কারখানা যে-কোনো বয়সী পাঠকের জন্য স্মরণীয় পাঠ।
শওকত ওসমানের স্মৃতিখ-গুলো কালের সাক্ষী, সময়ের বিশ্বস্ত দলিল।
শওকত ওসমান বড় কাজে হাত দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি মনে করেন সে হাত গুটানোই রয়ে গেছে। ২৭ জানুয়ারি ১৯৭৬ স্বেচ্ছানির্বাসিত দিনগুলোর একদিন লিখলেন :
গত পাঁচ মাস এক লাইনও লিখিনি। মাঝে মাঝে স্মৃতিলিপি আর চিঠিপত্রের অছিলা ছাড়া। এভাবে কদ্দিন চলবে? ভেতরে আত্মধিক্কার বেশ গুঁতো মারছে। কিন্তু নানা সমস্যা জর্জরিত মন বেঁকে বসে আছে। ভেবেছিলুম কর্ম থেকে অবসরপ্রাপ্ত, মোটামুটি সংসারের অনটনমুক্ত এবার আর প্রশান্তির অভাব হবে না কোনো বড় কাজে হাত দিতে। কিন্তু বদনসীব, সব ভেস্তে গেছে।

জন্ম যদি তব বঙ্গে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত। ওয়াগন ব্রেকার লুৎফর ওরফে লাতু অপরাধ জগৎ থেকে ফিরে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। তার লড়াইটা সাহসী মানুষের, যার কোনো পিছুটান নেই – সামান্য একটাই তো জীবন, কোরবানি দিতে সমস্যা কোথায়।
যখন ঢাকা ফিরে আসে জানতে পারে তার সহযোদ্ধারা কেউ কেউ টাকার লোভে ডাকাত-বেন্ডিট হয়ে গেছে। যোগ হয়েছে সনদধারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, সে তার সহযোদ্ধাদের গাল দেয়; … পুতেরা টাকা ছাড়া দুনিয়ায় ভালো আর কিছু জানে না।
সে গ্রামে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কিন্তু গ্রামে যাওয়া হয় না – বরং তার বৃদ্ধ পিতা ছেলের সন্ধানে ঢাকা আসে। শহরের সহিংস জীবনে লাতুরও দাফন হয় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে।
কোন কবরটা? বাপ জিগ্যেস করেন।
লাতুর এক সহযোদ্ধা সেই বাবাকে বলে, যুদ্ধের কাজ তো ফুরিয়ে গেছে। আমরা তখন বেওয়ারিশ।
মোগল হেরেমের অন্দরের গল্প হন্তারক একটি একক গ্রন্থ। খানিকটা নাটক, খানিকটা ইতিহাসের কেচ্ছা – সব মিলিয়ে ক্রীতদাসের হাসি ধাঁচের একটি কাহিনি।
গল্পের শুরুতে ও শেষে মোগল হেরেমের দুই খোজা প্রহরীর কথোপকথন, মাঝখানে ধর্মদ্রোহী শাহজাদা দারাশুকোর শির-েদ কাহিনি। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে বাহাসে দারাকে বলতে শোনা যায় :
খামুশ, আওরঙ্গজেব! শুনে রাখো তোমাদের ব্যাকরণে ক্রিয়াপদেও একটিমাত্র কর্তা থাকে – যেমন বিশ্বের স্রষ্টা। কিন্তু পৃথিবীতে এক ক্রিয়ার বহু ধরনের কর্তা থাকা সম্ভব। দৃশ্য, অদৃশ্য, পরোক্ষ, অপরোক্ষ, মুখ্য, গৌণ ইত্যাদি। খোজাপ্রথা চালিয়ে বেশ নিশ্চিন্তে ছিলে। অন্তপুরে আর কোনো হারামজাদা পয়দা হবে না।
সাধু ভাষায় লিখিত চারটে গল্প শেঠজী, চুহা চরিত, ব্যবধান ও মূল্যদান নিয়ে একটি বই – বিগত কালের গল্প। সাধু ভাষার দক্ষ ব্যবহার কাহিনিকে কখনো জোরদারও করে, মানুয়ের শোষণ ও শঠতার কাহিনিতে চুহা-ইঁদুর হয়ে উঠে প্রধান চরিত্র। যে অঞ্চলে চুহার অধিবাস পঞ্চাশের মন্বন্তরে সেখানে পনেরো হাজার মুসলমান দুর্ভিক্ষে মারা গেছে। চুহার জবানি :
বাংলার ১৩৫০ তেরশ পঞ্চাশ সন খতম হইবার উপক্রম। তাহার আগে বহু মানুষ খতম হইয়া গেণ। আমার ভাঁড়ারে অন্ন অঢেল। তবু সাধ মিটাইতে পারিলাম না। চারিদিকে লাশের দুর্গন্ধ, কান্নার শব্দ। মানুষের কণ্ঠস্বর বিড়ালের ডাকের মতো শোনাইত। আহারে আনন্দ ছিলো না। লঙ্গরখানার আশপাশ ঘুরিয়া গর্ব অনুভব করিতাম। ইহাদের আক্কেল নাকি বেশি। তাদের চেয়ে আমি বরং ভালো খাই। অথচ মানুষের আক্কেল নাকি বেশি।

সংকট আমরা কাটাতে চেষ্টা করিনি, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বেওয়ারিশ হয়ে রইলেন আর লড়াই না করে এবং এমনকি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেও যারা সনদ বাগাতে পেরেছেন, হুঙ্কার তাদেরই শোনা যায়, তাদের কণ্ঠেই বেশি শোনা যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নসিহত। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য লড়াই করেননি, সনদকে লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারও করেননি, অথচ নিজেদের সুবিধাবাদী ভূমিকা আড়াল করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে মুখে ফেনা কম তোলেননি। তারা বেওয়ারিশ হয়ে দৃশ্যপট থেকে সরে গেছেন। এসব পীড়িত করেছে তাঁকে, একাত্তরের প্রত্যাশা না মেটায় একটি গভীর ক্ষত রয়ে গেছে শওকত ওসমানের মনে।
আবু রুশ্দ, আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুস এবং শওকত ওসমান – এই চারজন একইসঙ্গে সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন প্রায় আশি বছর আগে। ‘জীবনস্রোতে আমরা ভেসে গেছি নানা দিকে, দেশবিভাগ আর এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার উৎস। ব্যক্তিগত পর্যায়ে রুশদ আর আবুল এখনও বড় কাছাকাছি। যদিও আমাদের মানস-জগতে বিচ্ছেদ বহু।’
১৯৪৭-এর দেশভাগ বাস্তুত্যাগী মানুষের জন্য রেখে গেছে দাঙ্গার অনপনেয় স্মৃতি। নির্বাসিত জীবনে শওকত ওসমান লিখছেন : ‘কী হবে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার কথা স্মরণ করে? পুরাতন ঘায়ে হাত দিয়ে আরো যন্ত্রণা বাড়ানো। আলীগড়, জামশেদপুর আবার-আবার রক্তকলঙ্কিত। এবার পশ্চিম বঙ্গে দু’দিন থেকে নদীয়া জেলায় দাঙ্গা শুরু হয়েছে। বহু সহস্র মানুষ সর্বস্বান্ত, গৃহহীন। বহু মুসলমান বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।’
সীমান্তের দু-পারেই আমরা জাতীয়তার যত বাগাড়ম্বরই করি না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে ধর্মীয় অধিষ্ঠানভিত্তিক ভৌগোলিক রেখাই বলে দেয়, দুই সম্প্রদায়ের উদারতা ও সহিষ্ণুতার বাদ্য সবটাই সঠিক নয়, ঢোলের কাঠি ধর্মীয় সন্ত্রাসীর হাতে পড়ে ভ্রাতৃঘাতী মারণাস্ত্রে পরিণত হয়, আর এটাই অনিবার্য – দাঙ্গায় হিন্দু যাবে ভারতে, মুসলমান পাকিস্তান ও ভারতে। শওকত ওসমান ১৯৭৯ সালের জামশেদপুর দাঙ্গা প্রসঙ্গ উত্থাপন করে এর তাৎক্ষণিক তা-ব প্রভাব এবং দীর্ঘ মেয়াদে মূলোৎপাটিত মানুষের যন্ত্রণার দিকে আলোকসম্পাত করেছেন।

ছয়
হাসি মানুষের আত্মার প্রতিধ্বনি
ক্রীতদাসের হাসি আংশিক উপন্যাস, আংশিক প্রধানত নাটক। খলিফা হারুনর রশীদের একটি বাগদাদ কাহিনিকে শওকত ওসমান ষাটের দশকের পাকিস্তানি সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে একে তাচ্ছিল্য করার জন্য পুনর্নির্মাণ করেছেন। সামরিক শাসন, ছদ্ম-সামরিক শাসন বারবার এসেছে। এতে যে ব্যক্তির আত্মার মৃত্যু ঘটে শওকত ওসমান তা ভালো করেই জেনেছেন। বু্িদ্ধজীবীরা তাদের প্রতিশ্রুত সততা পাশ কাটিয়ে আত্মার মৃত্যু উপভোগ করেছেন, কেউ কেউ হয়ে উঠেছেন সমরশাসনের দোসর। তারা ঠাট্টা করেও তো বলতে পারতেন বীর সৈনিকরা শেষ পর্যন্ত তাদের মাতৃভূমি জয় করেছে। ঠাট্টা শওকত ওসমান করেছেন, হাতে চাবুক নিয়ে।
ক্ষমতার দুর্লঙ্ঘ্য প্রভাব মানুষকে দুর্বিনীত করে তোলে। হারুনর রশীদ ক্ষমতাসীন, তিনি খেলাফত পেয়েছেন। তিনি সরল স্বীকারোক্তি করেছেন জল্লাদ মশরুরের কাছে :
মশরুর খেলাফত তো পাওনি, বুঝবে না রাজত্বের লোভ কতো। এই লোভের আগুনের কাছে হাবিয়া দোজখ সামাদানের ঝিলিক মাত্র। বিবেক, ক্ষমতা, মনুষ্যত্ব – সব পুড়ে যায় সেই আগুনে।
হাবশি গোলাম তাতারী খলিফার স্ত্রী বেগম জুবায়দার বাঁদী মেহেরজানের প্রেমে মগ্ন। নিজের নৈঃসঙ্গ্যের হাহাকার আড়াল করে বেগম মেহেরজান ও তাতারীর ভালোবাসার পথ সুগম করে দেন। নিত্যকার রাতের সফরে তাতারী ও মেহেরজানের প্রাণখোলা হাসির শব্দ তাকে উতলা করে তোলে। তিনি শোনেন :
আবার সেই উতরোল হাসি ওঠে এই জীর্ণ গৃহের মধ্যে। ফিরদৌস তো দূরে নয়। বুকের কপাট খুললে যে হাওয়া বেরোয় তারই স্নিগ্ধতা আর শীতলতা দিয়েই বেহেশত তৈরি।
ভালোবাসার হাসি সহজে থামা জানে না।
খলিফা হাসিতে বিচলিত।
মশরুর, শুনেছো এমন হাসি? কে হাসছে আমার মহলের দেওয়ালের ওদিকে? এ হাসি ঠোঁট থেকে উৎসারিত হয় না। এর উৎস সুখ ডগমগ হৃদয়ের নিভৃত প্রদেশ। ঝর্ণা যেমন নির্জন পাহাড়ের উৎসঙ্গ দেশ থেকে বেরিয়ে আসে উপল-বিনুনী পাশে ঠেলে ঠেলে-বিজন পথভ্রষ্ট তৃষ্ণা পথিককে সঙ্গীতে আমন্ত্রণ দিতে – এ হাসি তেমনই বক্ষ-ঝর্ণা উৎসারিত। কিন্তু কে এই সুখীজন-আমার হিংসা হচ্ছে মশরুর। আমি বাগদাদ-অধীশ্বর সুখ ভিক্ষুক। সে ত আমার তুলনায় বাগদাদ-ভিক্ষুক, তবু সুখের অধীশ্বর। কে সে?
হাবশি যুবক মেহেরজানকে বুকে জড়িয়ে শূন্যে তুলে নিয়ে এসে আলতোভাবে আগলে রাখলে, তারপর বাতি নিভিয়ে দিলে। অন্ধকারে সেই হাসির অনুরণন।
মেহেরজানকে বিচ্ছিন্ন করে হারুনর রশীদ গোলামকে মুক্তি দিলেন বিনিময়ে বাদশাহ সেই হাসি শুনতে চান, গোলামকে হাসির নির্দেশ দিলেন।
তাতারী নির্বাক। যে বুসায়নার পায়ে মাথা লুটিয়ে দিতে প্রস্তুত সুরম্য বাগদাদের সমর্থ তার পুরুষ, তাতারীর মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে সেই রঙ্গদেবীর নিরাবরণ দেহ যখন প্রত্যাখ্যাত হয়, সকল প্রচেষ্টা বিফল হয়ে যায় যখন তাতারী বলে :
নারীর বিবসনা হওয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সে কেবল প্রেম। নারীর নির্লজ্জ হওয়ার অধিকার আছে। তা-ও শুধু প্রেমে… তোমার দেহের দিকে তাকাও, ও তো সওদাগরের দোকান লেবাস আর জেওরে ঠাসা। দিরহাম দিলেই পাওয়া যায়। নারীর মূল্য অত সস্তা নয় যে নারী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবজাতির শিশুকে পৃথিবীতে আমন্ত্রণ দিয়ে আনে – যে নারী শাশ্বত মানবতার জননী – বসুন্ধরার অনন্ত অঙ্গীকার, সে অত সস্তা হয় না। বুসায়না। তুমি ভুল ঠিকানায় এসেছো। যারা তোমাকে পাঠিয়েছে তারাও পৃথিবীর ঠিকানা জানে না।
তখন বুসায়নার কাতর মিনতি তাতারী যেন তাকে প্রত্যাখ্যান না করে, বেইজ্জতি না করে। জবাবে তাতারী বলল :
না, বুসায়না। প্রতিদিন কিছু দিরহাম ছুঁড়ে ফেলে যারা তোমাকে বেইজ্জত করে, আমি তাদের মতো তোমাদের অসম্মান করতে শিখিনি। আমি গোলাম। দিরহাম দিয়ে সব কিছু কেনার পাগলামি থেকে অন্তত আল্লাহ আমাকে রেহাই দিয়েছেন।
আমির-ওমরাহদের কাঁচা দিরহাম ও কাঁচা গোশতের খরিদ্দার বলে গাল দেওয়া তাতারীরই সাজে। কোড়াদার বাদশাহি নির্দেশে তাতারীর ওপর কোড়া চালিয়ে যাচ্ছে; রক্তাক্ত তাতারী বলছে :
শোন হারুন রশীদ, দিরহাম দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস গোলাম কেনা যায়। বান্দী কেনা সম্ভব। কিন্তু – কিন্তু ক্রীতদাসের হাসি – না-না-না-না।
মৃত তাতারীর পতন। কবি নওয়াস খলিফাকে শোনান : আমিরুল মুমেনীন, হাসি মানুষের আত্মারই প্রতিধ্বনি।
খলিফা হারুনর রশীদ হাবশি জল্লাদ মশরুরকে বলছেন : স্মৃতি লাশ জেন্দা করে তোলে।
জবাবে মশরুর বলে :
স্মৃতি সমস্ত কওমকে জেন্দা করে তুলতে পারে জনাব।… বলিষ্ঠ মানুষেরই স্মৃতিশক্তির প্রয়োজন হয় সামনে পা ফেলার জন্য।
খলিফা তো বলিষ্ঠ মানুষ, কিন্তু তিনি কী চান?
মশরুর, আমি স্মৃতি উপড়ে ফেলতে চাই, সমস্ত স্মৃতি।
সে স্মৃতি আব্বাসার, খলিফার সগ্গা সহোদর বোন, খেলাফতি নির্দেশ অমান্য করে তার প্রণয়ী জাফরের সঙ্গে রসুমৎ ঘটিয়ে যৌবন উদযাপনের অপরাধে খলিফা তাকে ঘরের মধ্যে জ্যান্ত কবর দিলেন। সেই স্মৃতি দুর্ভার, খেলাফতের তাবত তাকত প্রয়োগ করলেও এ-স্মৃতি মূলোৎপাটিত হওয়ার নয়।
তখতে তাউস ঘিরে রাখে খলিফার উঞ্ছভোজী স্তাবক কবি, খলিফার বর্জ্যওে কবি পায় পুষ্প সৌরভ, লেহনেও তৃপ্তির ঢেকুর তোলে, খলিফাকে সন্তুষ্ট করতে তার পূর্বপুরুষের মহিমাকীর্তন করে, তাঁর নামে পদ্য রচনা করে অমরত্বের লোভ দেখায়। তারা খলিফার চোখ দিয়ে দেখে, নিজের চোখ ব্যবহার করার সুযোগ হয়ে ওঠে না।
আমরা বলে আসছি, শওকত ওসমান দুঃশাসনের বলি বাগদাদকে ঢাকায় প্রতিস্থাপন করেছেন, স্বৈরাচারের সামনে একটি নগরের আরশি মেলে ধরেছেন। এই প্রতীকী বাগদাদ যে কোনো দেশের, কোনো কালের তাতারী-অধ্যুষিত নগরী। বোধোদয় হোক একালের খলিফারও। শুধু সামরিক শাসনে নয়, ছদ্মগণতান্ত্রিক ও অপশাসনেও তাতারীরা খলিফার মুখে থু থু ছিটিয়ে দেওয়ার সাহস রাখে। সে কারণে শওকত ওসমানের প্রয়োজনটা সার্বক্ষণিক। বুড়োর ছদ্মবেশধারী অফুরন্ত তারুণ্যের অধিকারী সেই মানুষটিই প্রাসঙ্গিক যিনি উলঙ্গ রাজাকে বলতে পারেন, রাজা তুই নেংটা।
ক্রীতদাসের হাসির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এর ভাষা। ১৯৭৪-এ প্রকাশিত ভাব ভাষা ভাবনা গ্রন্থে শওকত ওসমান বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন : ভাষার আসল বনিয়াদ তো ভাব-প্রকাশে। আর আমরা যে ভাব প্রকাশ করি, তার অর্থ থাকে। এখন এই অর্থের স্বরূপ কী? ভাবের সঙ্গে তার যোগাযোগ কোথায়? কীভাবে এই যোগাযোগ স্থাপিত হয়? ‘কুকুর’ শব্দ উচ্চারণ করলে ‘মুরগি’ বোঝায় না কেন?
তিনি ভাষা-দর্শনের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্টুয়ার্ড চেসের ‘টাইরেনি অব ওয়ার্ডস’ – শব্দের স্বৈরাচারিতার সূত্র ধরে উল্লেখ করেছেন :
বর্তমান পৃথিবী নানা সমস্যায় পীড়িত। শোরগোল খুন-খারাবির অন্ত নেই কোথাও। যার একমাত্র কারণ ভাষার অপব্যবহার। মানুষ যদি শব্দের নিয়ম-কানুন জানত তাহলে বিশ্বের বহু সামাজিক অনাচার থেকে মানুষ রেহাই পেত। মানুষ শুধু অর্থহীন আজেবাজে কথা বলে না, বরং আবেগের সুতোয় এমন জড়িয়ে পড়ে শেষে হাতাহতির দিকে এগিয়ে যায়। যত গ-গোলের সূত্রপাত তো সেইখানে।
পরিমিত এবং যথাশব্দ ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ক্রীতদাসের হাসি।
ক্রীতদাসের হাসির পর শওকত ওসমান যদি লেখালেখি ছেড়ে দিতেন আমরা কি তাঁর সুকৃতির নান্দীপাঠ কম করতাম? ততদিনে জননীর মতো উপন্যাস, ‘জুনু আপা’র মতো গল্প কথাশিল্পীদের অনেকেরই ঈর্ষার কারণ।
মাইলফলক ধরনের সৃষ্টির পর সৃজনশীল লেখকদের সৃষ্টি থেমে যেতেই আমরা বেশি দেখেছি। শওকত ওসমানের সঙ্গে যারা শুরু করেছিলেন, আক্ষরিক অর্থেই হোক কি প্রতীকী অর্থে তাদের সৃজনশীলতার মৃত্যু হয়েছে আগেই। ১৯৬২-র জুলাই ক্রীতদাসের হাসি প্রকাশিত হয়। তাঁর সাহিত্যকর্মের অন্তত ষাটভাগ প্রকাশিত হয় এই প্রকাশনার পরে।

মলিয়রের মতোই মুরতাদ
ফরাসি নাট্যকার মলিয়র মৃত্যুবরণ করেন ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৬৭৩। নাটক রচনা করা ছাড়াও তিনি মঞ্চে অভিনয় করতেন, নাটক পরিচালনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ফরাসি এলিটরা সাধারণভাবে মঞ্চনাটকের ভক্ত। এ সময়কার ফরাসি বিধিবিধান ও রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনুশাসন অনুযায়ী অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ‘শয়তানের হাতিয়ার’। তাদের পবিত্র
ভূমিতে অর্থাৎ চার্চের সিমেট্রিতে সমাহিত করা যাবে না। এই অনুশাসন মলিয়রের বেলায়ও প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হলো। নাট্যকারের স্ত্রী আরমান্দে রাজা চতুর্দশ লুইয়ের কাছে আবেদন করলেন তার স্বামীকে যেন খ্রিষ্টীয় কবরস্থানে শায়িত রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। রাজার হস্তক্ষেপে আর্চবিশপ অব প্যারিস তার আওতাধীন সিমেট্রিতে ব্যাপটাইজড হওয়ার আগে মৃত্যুবরণকারী শিশুদের কবরের জন্য নির্ধারিত স্থানে কথিত ধার্মিকদের দৃষ্টির আড়ালে রাতের বেলা সমাহিত হন মলিয়র।
শওকত ওসমান যদি শিক্ষক না হতেন এবং মৃত্যুকালীন পরিবেশটি প্রতিকূল হতো, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং প্রতীকী অর্থে উগ্র ক্যাথলিসিজম তাঁকে সমাহিত করতেও আপত্তি জানাত।
সেই মলিয়রের বাছাই করা পাঁচটি নাটক অনুবাদ করেন শওকত ওসমান। প্রতিটি নাটকই সমাজের অসংগতি, অবিচার, ক্ষমতাবানদের ভ-ামি এবং ক্যাথলিক চার্চের ধর্মগুরুদের বাণীর অসারতা নিয়ে লেখা ঠাট্টাই তার গণসংযোগের হাতিয়ার। দ্য মাইজার, তার্তুফ, দ্য মিস অ্যানথ্রোপ, দ্য স্কুল অব হাজব্যান্ডস – প্রতিটি নাটকেই মলিয়ের আসলে আগামীর শওকত ওসমানের ভেতরের কথাগুলো বলতে চেয়েছেন।
ঢাকার মঞ্চ মলিয়রের নাটকের জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য দেয়। ঢাকার নাট্যাঙ্গনের রমরমা বিকাশ মূলত বিদেশি নাট্যকারদের নাটকে। শওকত ওসমানের আধুনিক অনুবাদে বাংলা নাটকে উঠে এসেছেন মলিয়র। এর ওপর ভিত্তি করে মঞ্চোপযোগী টেইলরিংও অভিযোজন করা হয়েছে। বাংলাদেশের মলিয়র ও ফরাসি নাটক পাঠ মূলত শওকত ওসমানের অবদান। বাংলা নাটকের আলোচনায় তাই শওকত ওসমানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আন্দালুশিয়া সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কখনো কখনো আমাদের সাহিত্যজ্ঞানের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬৫ সালে প্রকাশ করেছেন ঢাউস গ্রন্থ স্পেনের ছোট গল্প। তাঁর অনুবাদে তলস্তয়ের পাঁচটি কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫৯ সালে। শওকত ওসমানের নাটক তস্কর লস্কর, আমলার মামলা, কাঁকরমনি, জন্ম-জন্মান্তর, এতিমখানা, তিনটি ছোট্ট নাটক, ডাক্তার আবদুল্লাহর কারখানা সুখপাঠ্য ও মঞ্চোপযোগী।
কেবল অনুবাদের শওকত ওসমানকেও যদি বিবেচনা করা হয়, সেকালে তাঁর সমকক্ষ অনুবাদক হাতেগোনা কজন। কেবল মলিয়র, স্পেনের গল্প কিংবা তলস্তয় নয়, এইচ জি ওয়েলশ, লুই মামফোর্ড ও অমৃতা প্রীতমকেও তিনিই বাংলাদেশের পাঠকের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন।

শাহনামা আর রাহনামা
মহাকবি ফেরদৌসি পারস্যের রাজকাহিনি ছন্দোবদ্ধ করেছেন শাহনামা। ব্যাপারটা রাজকীয়। রোমান নাগরিকরাও তাদের সভ্যতার সূচনায় প্যাট্রিশিয়ান-উঁচু খান্দান এবং প্লেবিয়ান-ইতরজনাতে বিভক্ত ছিল। আশরাফ ও আতরাফ বিভাজনের প্রকটতা ভারতবর্ষেও ছিল। বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত বিভাজন তো বিশ্বজুড়ে।
শওকত ওসমান প্যাট্রিশিয়ান নন, আশরাফ নন, বুর্জোয়া নন, তিনি ছিলেন পথের মানুষ। তাঁর স্মৃতি পথের স্মৃতি। তিনি আমজনতার অংশ। তিনি প্লেবিয়ান, তিনি আতরাফ, তিনি প্রলেতারিয়েত।
শওকত ওসমান তাঁর আত্মজীবনী কিংবা তাঁর চলার পথের বিবরণ লিখে যাচ্ছিলেন, যেটি শেষ করতে পারেননি। যেটুকু লিখেছেন, দুখ-ে ৮০০ পৃষ্ঠা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যেভাবে এগোচ্ছিলেন তাঁর পূর্ণাঙ্গ রাহনামা হয়তো ২০০০ পৃষ্ঠা হতো। কিংবা আরো বেশি। ১৮৮ কিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থাকারে পরিবেশিত হয়েছে ২০০৭-এ তাঁর মৃত্যুর ৯ বছর পর। লেখা শুরু করে একসময় তিনি বেশ বুঝতে পেরেছিলেন যে সুচারু বিবরণ দিয়ে পথের কাহিনী লিখতে শুরু করেছেন, সময় তাঁকে শেষ করার সুযোগ দেবে না। এতটা সময় লাগবে যদি জানতেন তাহলে আর ‘শীতলপাটি বুনতে বসতেন না, বুনতেন হোগলার মাদুর’।
অবশ্য তারও আগে সত্তরের দশকের স্বেচ্ছা-নির্বাসিত জীবনের ডায়েরিতে ১৩ নভেম্বর, ১৯৭৬ লিখেছিলেন :
দান্তে নির্বাসনের দু-দশক পরে স্বদেশে ফিরেছিলেন। ভিক্টর হিউগো চব্বিশ বছর পরে। কবি ওভিদ নির্বাসনে থাকাকালে মারা যান। আমার আর চার পাঁচ বছর বাঁচা দরকার। গত ষাট বছরের প্রস্তুতি এবার রচনায় রেখে যেতে চাই। জানি সে ভবিষ্যত কিভাবে বর্তমান হয়।
তাঁর প্রার্থিত পাঁচ বছরের পরও তিনি আরো সতেরো বছর কাজ নিয়েই বেঁচেছিলেন, তারপরও তিনি ভেবেছেন, ভেবেছি আমরা সবাই অন্তত আরো পাঁচটি বছর তো মঞ্জুর হতে পারত।
হতে পারে এটা শওকত ওসমানের আত্মজীবনী, আমার কাছে মনে হয়েছে এটা বাংলার অন্তত অর্ধশতকের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। আত্মজীবনীকার রচনাকালীন ম্যাগালোম্যানিয়া।
‘আমি’-সর্বস্ব আত্মজীবনী তলিয়ে যেতে সময় লাগে না। কিন্তু ‘আমি’ যদি হীনজন সেজে কিছুটা নিচে থেকে নিজেকে কিছুটা আড়ালে রেখে তার কালের দৃশ্যপটগুলোকে নির্বিকারভাবে লিপিবদ্ধ করে যেতে পারেন, তা আত্মজীবনীকে ছাপিয়ে সময়ের ইতিহাস ও পরিসরের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে।
শওকত ওসমানের রাহনামা তা-ই।
তখন তাঁর বাস ধুকারিয়া বাগানে। একজন জোহরা খারা বললেন, ‘আরে ছেলে তুই জওয়ান হয়ে গেছিস।’
যৌবনপ্রাপ্ত এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই। ধুকারিয়া বাগানের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তা আরো উপলব্ধি করতাম। মেয়েরা খিস্তি করে, কোনোদিন গ্রামে থাকতে কল্পনায়ও আসেনি। সেখানে কাইজ্যা হয়। কিন্তু অশ্লীল বুলি মেয়েদের মধ্যে উচ্চারিত হতে কোনোদিন শুনিনি। এখানে সন্ধ্যার পর বা গোধূলি বেলায় বারবধূরা সেজেগুজে দাঁড়িয়ে যেত খরিদ্দারের আশায়। প্রথম প্রথম আমি মাথা নিচু করে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে যেতাম। ওরা কী বলে, তা ঠিকমতো কানে পড়ত না।
রাহনামা প্রথম খ-ে তিনি তার শৈশবের বন্ধু ও স্বজনদের এক এক করে তুলে এনেছেন, এমনকি তাঁর দ্বিগুণ বয়সী আবদুল হক, যার পিতা অপরাধী হিসেবে আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হয়ে সেখানেই নারী-সান্নিধ্যে আসেন এবং আবদুল হকের জন্ম হয়। শৈশবের এমন বিস্তৃত বিবরণ বাংলা ভাষায় লিখিত আর কোনো আত্মজীবনীতে আমার চোখে পড়েনি, সম্ভবত নেই-ই।
আলিয়া মাদ্রাসায় লাইব্রেরি তাঁকে বিস্মিত করেছিল। প্রায় নব্বই বছর আগে মাদ্রাসার একটি বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা কল্পনা করুন : ক্লাস সেভেনের শওকত ওসমান যুদ্ধ ও শান্তি এ নিয়ে বাংলায় বিতর্ক করছেন ক্লাস টেনের ছাত্রের সঙ্গে, আর তাকে হারিয়ে পুরস্কার পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের চয়নিকা, যা এখন সঞ্চয়িতা নামে খ্যাত; এটি সংকলনটির আদি অবস্থা। তিনি ইংরেজি বিতর্কও ছেড়ে দেননি, জিতে নিয়েছেন তৃতীয় পুরস্কার মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট, তিনি তর্জমা করে বলেছেন হারানো বেহেশত। হাতে রবীন্দ্রনাথের চয়নিকা পেয়ে তাঁর মনে হলো স্বর্গ তো হাতের মুঠোতে, চয়নিকা তাকে স্বর্গসুখ দিয়েছিল।
যে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ক্লাস সেভেনের কিশোরের হাতে চয়নিকা আর প্যারাডাইস লস্ট তুলে দিতে পারে, সেই শিক্ষাব্যবস্থাটি কি আমাদের একালের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উত্তম ছিল না? বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তিনি তো আরবি, ফার্সি ও উর্দুতে জবান পোক্ত করে নিতে পেরেছেন। ক্লাস সেভেনের শওকত ওসমান চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিলেন আমাদের শিক্ষার আস্ফালনটি কত ঠুনকো, কত মিথ্যা, কত অসার।

সাত
শওকত ওসমানের জার্নাল
স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবনে ১৯৭৬-এর একদিন শওকত ওসমান ডায়েরিতে লিখলেন। ছাগল, শুয়োর, মুরগি ইত্যাদি পরিচর্যা মারফত বেশ মোটাতাজা করে তোলা হয়। উদ্দেশ্য জবাই। এখানে দেখছি বেশ কিছু সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী আরাম-ইজারায় বন্দি। ওরা যদি জানতে লেখক হিসেবে পরিণতি কী, তাহলে মনিব ও ছাগ-শূকরের সম্পর্ক মনে রাখত।
আরো মোটাদাগে বাঙালি মুসলমানের আত্মসম্মান আছে বলে তাঁর মনে হয়নি। পাকিস্তানের হাতে এত মার খাওয়ার পরও যখন পাকিস্তানি বেরাদানে মিল্লাতকে পেয়ে গদগদ হয়ে পুরনো পিরিতি ঝালিয়ে নিতে চায়, পাকিস্তানি বলেন :
অ্যায়সে মিঠি মিঠি বাত মাত কিজিয়ে। আপলোগ জানতে হাম কিয়া হ্যায়, হামলোগ জানতে আপ কিয়া – এসব মিষ্টি কথা বলবেন না। আমরা জানি আপনারা কী, আপনারা জানেন আমরা কী।

সব দেশে সব আমলেই আমলের গুণকীর্তন করার জন্য উচ্ছিষ্টভোগী কিছু সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী বিনা দাওয়াতেই যে ক্ষমতাকাঠামোর চৌহদ্দির চারপাশে ঘুরঘুর করেন, ছুড়ে ফেলা মাংসহীন হাড়ের জন্যই সারমেয় দৌড়ে অংশগ্রহণ করেন এবং একসময় তারা যে ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত হন শওকত ওসমান তা ভালো জানতেন। এই কীর্তনিয়াদের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি একটি ফ্ল্যাট, কারো একটি বিদেশ সফর, কারো স্বজনের জন্য একটি করণিকের চাকরি। সেই লোভনীয় আমন্ত্রণ কখনো কবুল করেননি বাংলা সাহিত্যের এই শক্তিমত্ত কথাশিল্পী। মেরুদ- বিগলিত কবি ও বুদ্ধিজীবীদের তিনি চিহ্নিত করেছেন সরীসৃপ যুগের বাসিন্দা হিসেবে। এখন তো ‘সরীসৃপ যুগ’ চলছে – সবাই বুকে হাঁটার দলে, ইমেজ আর শব্দগড়ার গীতিময়তা উপজীব্য। মগজ পরিত্যক্ত।’
কথা দিনলিপি সংকলন উত্তরপর্ব মুজিবনগর থেকে সাহিত্যসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ের উদ্ধৃতিতে জননী ও ক্রীতদাসের হাসির শওকত ওসমান কেমন ছিলেন তার প্রাণবন্ত একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
শওকত ওসমান যৌক্তিকীকরণ করেছেন এভাবে – কেঁচো হয়ে বাংলাদেশে হয়তো বাইরে থাকতে পারতাম, ফ্যাসিস্টদের জেলে না গিয়ে। কিন্তু তা এই বয়সে শরীর ধরে নিশ্চয়ই টান মারত। তার চেয়ে বর্তমান জীবনযাত্রা নিশ্চয়ই কষ্টদায়ক নয়।
১০ আগস্ট ১৯৭৬ পাবলো নেরুদার জর্নাল থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ‘সহ্য এবং সংগ্রাম করার সুযোগ আমার হয়েছে। সুযোগ পেলেই ভালবাসব আর গান করব।
জয়-পরাজয়, রুটী এবং রক্ত – উভয়ের স্বাদ আমি পেয়েছি। চোখের জল থেকে চুমু, নিঃসঙ্গতা থেকে আমার দেশের লোকের বন্ধুত্ব – সব পরিপূর্ণভাবে আমার কবিতায় বেঁচে আছে। কবিতা দিয়েছে আমাকে সংগ্রামের প্রেরণা।’
সহ্য এবং সংগ্রাম করার সুযোগ – এই শব্দগুলো বারবার তাঁর কানে ধাক্কা দিতে থাকে – তিনি জানেন এবং বলেন, এমন মন্ত্র দিয়েই সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলতে হবে।
কবিতা পাবলো নেরুদার মতো শক্তি জুগিয়েছে শওকত ওসমানকেও। তাঁর ডায়েরির শুরুতে ফিরে আসেন রবীন্দ্রনাথ – ‘হেথা নয় অন্য কোনখানে’ – কিন্তু কোথায়? নির্বাসনে। ভারতে।
রবীন্দ্রনাথের গানের অন্তর্গত পঙ্্ক্তি ‘নির্মল দুঃখ যে সেই মুক্তি/ নির্মল শূন্যের প্রেমে’ বারবার দোলা দেয় তাঁর মনে।

২৩ ডিসেম্বর ১৯৭৬ শওকত ওসমান লিখছেন : ঢাকা দেশের রাজধানী হলেও এঁদো পাড়াগাঁ বইয়ের ক্ষেত্রে। ’৭৩-এ নোবেল প্রাইজধারী প্যাট্রিক হোয়াইটের (চধঃৎরপশ ডযরঃব) কোনো বই আজ পর্যন্ত পড়িনি। পুরনো বইয়ের দোকান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে বেশ কয়েকটি আছে। একটির মধ্যে পূর্বোক্ত লেখকের ঞযব ঊুব ড়ভ ঃযব ঝঃড়ৎস পেয়ে গেলাম। পেপারব্যাকে সাড়ে উনিশ রুপি দাম। পুরনো বই হিসেবে সাড়ে সাত রুপিতে রফা। বৈদেশিক মুদ্রা চলে গেল। দিন চালানোর প্রশ্ন আছে।
বৈদেশিক মুদ্রা হাত গলিয়ে যেমন বেরিয়ে গেছে, শওকত ওসমান পেয়েছেনও। এ মুদ্রা উঞ্ছবৃত্তির নয়, দাসত্বের নয়, করুণার নয় – পুরোপুরি অর্জিত, স্বেদসিক্ত। লেখার বিনিময়ে প্রাপ্য অর্থ।

৬ আগস্ট, ১৯৭৬ :
হিন্দ পকেট বুক একটা চেক পাঠিয়েছে, ক্রীতদাসের হাসির ইংরেজি ভাষা : অ ঝষধাব খধঁমযং বাবদ। বন্ধু কর্তার সিং ডুগগালকে ধন্যবাদ। এই শিখসন্তান যে হৃদ্যতার পরিচয় দিচ্ছে নির্বাসিত জীবনে তেমন আর কারো কাছে পাইনি।
কর্তার সিং প্রসঙ্গ বেশ কবার তাঁর ডায়েরিতে এসেছে। ২০ অক্টোবর, ১৯৭৫ লিখছেন দুপুরে পাঞ্জাবি ভাষার লেখক কর্তার সিং ডুগগালের বাসায়। এই শিখসন্তান অদ্ভুত এক হৃদয়ের অধিকারী। ওর স্ত্রী মুসলমান। পূর্ব পাঞ্জাব থেকে ভারত বিভাগের স্রোতে ছিটকে পড়েছিলেন। ডুগগালেরও সেই দশা। রিফিউজি হিসেবেই সাক্ষাৎ এবং পরিচয় প্রেমে পরিণত। সালমা ডুগগাল চিকিৎসক। লাঞ্চ আহারের সময় অনেক কাহিনি শোনা গেল।
৯ নভেম্বর, ১৯৭৫ লিখছেন : শিখ লেখক বন্ধু কর্তার সিং ডুগগালের বাড়ি। ’৭১ সালে বাংলাদেশের ওপর বহু লেখা লিখেছেন। এমনকি গল্প পর্যন্ত বাদ দেননি। সাদা দাড়ি আর লম্বা চুলে সন্ত-সন্ত ভাব দেখায়। উদার শিল্পীজনোচিত মনের অধিকারী। নানা কথা। আহার। বিকালে অমৃতা প্রীতমের সঙ্গে সাক্ষাৎ। বব চুল, হাস্যময়ী অবয়বে এক আস্ত রমণী। এই অমৃতা প্রীতম এবং খুশবন্ত (খুশওয়ান্ত) সিং প্রসঙ্গ একাধিক দিন লিপিবদ্ধ করেছেন। ইসমত চুঘতাই এবং কুররাতুল আইন হায়দারের সঙ্গে সাক্ষাতের জীবন্ত বিবরণী রয়েছে দিনলিপিতে।
আবার অমৃতা প্রীতম। ৮ এপ্রিল, ১৯৭৬ লিখলেন : পাঞ্জাবি লেখিকা অমৃতা প্রীতমের অনুবাদ উপন্যাসখানা ঞযধঃ গধহ বড় ভালো লেগেছিল। নিজ ভাষায় এই লেখিকার নিজস্ব গীতিময় শৈলী আছে। ধর্ম সম্পর্কে আশ্চর্য এক শ্লেষময় ভঙ্গি। বইটা অনুবাদ করা দরকার। ধর্মান্ধতা এই উপমহাদেশের সব দুর্দশার সূত্রপাত – তা আর কারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন নেই। (অমৃতা প্রীতমের সন্তানের স্বীকারোক্তি শওকত ওসমানের হাতেই বাংলায় অনূদিত।)
ঢাকা ও কলকাতা বাঙালির দুই ফুসফুস – পূর্ব ও পশ্চিম। দুই নগরীর অভিজ্ঞতা শওকত ওসমানের – একসময় আক্ষেপ করেছেন বাঙালির কোনো চার্লস ডিকেন্স নেই, যিনি দুই নগরীর গল্প শোনাবেন। অ ঞধষব ড়ভ ঞড়ি ঈরঃরবং হয়তো পরবর্তীকালের কোনো ঔপন্যাসিক লিখবেন এ কালে লেখা না হলেও।
৬ এপ্রিল নিজের কথা লিখলেন : অর্থ নিঃশেষ। সেও এক সংকট। পা-ুলিপি আছে। অমৃত পত্রিকায় বেরুনোর জন্য মহাপতঙ্গ (পরে বদলানো নাম পতঙ্গপিঞ্জর) উপন্যাসখানা দেওয়া। ওই পারিশ্রমিক কবে পাব ঠিক নেই। এইভাবে সংকট ঘিরে ধরছে।
২২ জুলাই, ১৯৭৬, লেখকদের যন্ত্রণার কথাই। অমৃত অফিসে বিকাল। লেখকদের পারিশ্রমিক ব্যাপারে এক দেশ ও আনন্দবাজার ছাড়া সব জায়গায় ঔদাসীন্য একই ধরনের। অমৃত এক মাসে লিখলে পরের মাসে বিল হয়। ততদিন যে লেখক, বায়ু ভক্ষণ করো। পুঁজিবাদের গোড়ার দিকে যে ছ্যাঁচড়ামি থাকে, আমার মনে হয় গোটা ভারতে তা-ই চলছে। দেড় মাস হয়ে গেল ঞযব ওষষঁংঃৎধঃবফ ডববশষু-র টাকা পাইনি। ভাবছি, দিন কী করে চলবে, এমন অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে?

৭ জুন, ১৯৭৮
বাংলাদেশে অনির্বাচিত সরকারের স্তাবকতায় আনন্দবাজার, শওকত ওসমান গাল দিতে কসুর করেননি।
গৌরকিশোর ঘোষ সতীপনা বর্তমানে বন্ধ রেখেছেন কী? প্রভুদের নিমক খেতে খেতে গোলামও ভাবে সে প্রভু বনে গেছে। এসব শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা জানে না ঝষধাব চিরকালই ঝষধাব থাকে। যদিও বৈষ্ণব সাজে ভদ্রলোক হিসেবে পরিগণিত হতে ওদের ফবভবহংব সবপযধহরংস গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে।

আরো কয়েকটি সাহিত্যবিধৌত দিনপঞ্জি
৩০ আগস্ট, ১৯৭৫ : ‘ডিউক রেস্তোরাঁয়’ আজ স্বর্গীয় গল্পকার নরেন্দ্রনাথ মিত্রের শোকসভা অনুষ্ঠিত হলো। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন চক্রবর্তী, ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ বক্তৃতা দিলেন। অনেকদিন পরে জনসমক্ষে আমিও কিছু বললুম। স্বর্গীয় লেখকের সঙ্গে কয়েকবার সাক্ষাৎ ঘটেছে। বন্ধু শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সে-ও পরলোকে। আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯ অক্টোবর, ১৯৭৫
সকাল।
বেরিয়ে পড়লাম।
দেখা গেল সম্রাট হুমায়ুনের স্মৃতিসৌধ।
পরে বু-হালিম গ্রামে গালিবের মাজার জিয়ারত। মৃত্যুহীন গালিব।
৭ নভেম্বর, ১৯৭৫।
ভোরে উঠে অমৃতা প্রীতমের একটা ছোট উপন্যাস পড়লুম। ঞযব ঊীরষব. গীতিময় আবহাওয়ার মধ্যে দীর্ঘ নকশা। বইটা সুখপাঠ্য রমণীর রমণীয় বচন।
২৩ নভেম্বর লিখেছেন – ঠিক সতেরো বছর পরে উর্দু সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখিকা কুররাতুল আইন হায়দারের সঙ্গে দেখা। শেষ সাক্ষাৎ করাচি শহরে ১৯৫৮ সালে। ডাকনাম অ্যানি। আগ কা দরিয়া নামক উপন্যাস লিখে পাকিস্তান ত্যাগ করেছিল। ত্যাগ নয়, পলায়ন। আজো সোজা বললে, ‘নানা অঘটন ঘটবে ওই রাষ্ট্রে। কারণ মূলে উই রাষ্ট্রের কোনো জধঃরড়হধষ নেই।… ’
পলাতক জীবন : ইসমেৎ চুগতাই উর্দু সাহিত্যে সেই কবে থেকে আসর জাঁকিয়ে বসে আছেন। দেখা করতে গেলাম। ম্যারিন ড্রাইভ এলাকায় বাড়ি। দশাসই বপু। বব কাটা চুল। ‘লেফাফ’ গল্প রচয়িত্রী। সেই চারের দশক আর তরুণী নন। চল্লিশ সনের কথা আজও কথায় কথায় এগিয়ে এলো। আলাপচারিতা নানা খাতে। ম্যানসনের নাম ইন্ডাস কোর্ট। দুপুরের আহার নয়, শুধু ঢালা আমন্ত্রণ দিলেন, যে-কদিন আছি যেন ঢুঁ দিতে সঙ্কোচ না থাকে।

২৬ নভেম্বর বাংলাদেশের কবি আবুল হাসান অত্যন্ত তরুণ বয়সে মৃত্যুবরণ করলেন। শওকত ওসমান জানলেন ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৫। তিনি লিখছেন :
কবি আবুল হাসান মারা গেছে।
সংবাদপত্রে তারিখ অকুস্থল কিছু নেই।
আবুল হাসান।
আবুল হাসান।
আমার ডাকে তুমি কোনোদিন কি নিরুত্তর থাকতে পারতে, ভাই? পলাতকের জীবন।
তোমার মরা মুখ দেখা থেকেও বঞ্চিত রইলুম।
আরো দুটি মৃত্যু আপ্লুত করেছে তাঁকে।
২৭ জানুয়ারি, ১৯৭৬
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত পরলোকে।
সচল ছিলেন শেষ দিন অবধি সাহিত্যকর্মে। সেই তিরিশ থেকে যাত্রাবস্থায় ওঁর রচনার সঙ্গে যোগাযোগ। দেশবিভাগের পর রচনার পারম্পর্য সম্পর্কে প্রায় কোনো সংবাদ রাখতে পারিনি। কলকাতায় আছি। এবার ফাঁক পূর্ণ করব ভাবছিলুম। হঠাৎ এই মৃত্যুসংবাদ বড় বিষয় করে তুলল।
৭ ফেব্রুয়ারি চলে গেলেন বাঙালির স্বজন ঋত্বিক ঘটক। তিনি লিখছেন :
ঋত্বিক ঘটককে পিজি হাসপাতালের মর্গে দেখে এলাম। চির প্রশান্তির ঘুমে শয়ান।
মীরার কাছে লিখা বাবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি চিঠির অংশবিশেষের উদ্ধৃতি দেন ১ জানুয়ারি, ১৯৭৬ – ‘ব্যক্তিগত জীবনটাকে অন্যসব কিছুর উপরে প্রত্যক্ষ করে তোলাই আত্মাবমাননা।’
শওকত ওসমানের এই ডায়েরি ১৭ এপ্রিল, ১৯৮১ পর্যন্ত সময়কে ধরে রেখেছে। কোথাও তিনি আত্মাবমাননার গ্লানিকর পথটিকে বেছে নেননি।
১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬ শওকত ওসমান লিখেছেন :
অনিশ্চিত কতো কাল এই নির্বাসিতের জীবন চলবে? জীবিকার ধান্দা অবাস্তব লেখার উপর নির্ভর করতে হবে। ভেতরে তাগিদের অভাব নেই। কিন্তু শরীর বেঁকে বসে আছে। অন্ধ অনুপ্রেরণার চাবুকই শেষ হয়। কবে চেয়ার টেবিল জুড়ে বসব? এমন প্রশ্ন উঠলেই আর সঙ্কল্প এগোয় না। চায়কভস্কি (রুশ সুরকর্তা) বলেছিলেন, অনুপ্রেরণার জন্য আপন করা অনুচিত। কাজের মধ্যেই তার দেখা মেলে। আমার কেস বিপরীত।
শওকত ওসমানের শেষ কথাটি হয়তো ‘লিখতে হবে তাই লিখেছেন’। অনুপ্রেরণা অনুকূল প্রপঞ্চের অংশ। কিন্তু শওকত ওসমান, আপনি তো প্রেরণার জন্য অপেক্ষা করেননি। বরাবরই প্রতিকূলতা ঠেলেই এগিয়েছেন। প্রতিকূলতার মধ্যেই রচিত হয়েছে আপনার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো।

বিবিধ
১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র স্ত্রীর পত্র পেলেন। নয় বছর বয়সী মেয়ে সিমিন ও তিন বছর বয়সী ছেলে ইরাজকে রেখে অকালে চলে গেলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক প্যারিসবাসী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। তাঁকে ইংরেজিতে লিখা আন ম্যারির চিঠির একাংশের অনুবাদ করেছেন শওকত ওসমান : ‘… কিন্তু তবুও আমরা হৃদয়ের অন্তস্তলে জানতাম, আমাদের বসবাস একটি অগ্নিগিরির উপর। আমি অনুভব করতাম আগুনের এই পাহাড় তোমার জীবনের মত আমাদের জীবনকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমি ঘুণাক্ষরেও কী জানতাম না এই পথ ধরে আসবে। উদ্বেগ যদি ওয়ালীর অকাল মৃত্যুও জন্য দায়ী হয়, তাহলে সেও বাংলাদেশের সর্বনাশের বলি।… আমি জানিনে কোথায় আমার ঠাঁই? ওয়ালী ছাড়া ফ্রান্স আমার কাছে কিছুই না।’
শওকত ওসমানের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা তাঁকে আংশিক পাঠ করেছেন।
২৬ আগস্ট, ১৯৭১, শওকত ওসমান লিখছেন :
এক ছাত্রনেতার বিয়ে হয়েছে। বৌভাত হচ্ছে কোন পশ হোটেলে। তার আগেকার বৌ আছে। পুলিশ সূত্রে খবর সে নাকি নিষিদ্ধ আলয়ে গমন করে। সংগ্রামের এক কুরুক্ষেত্রে নানা ধরনের লোক জমায়েত হয়। মার বেইজ্জতির সামনে সন্তান রুখে ওঠে। সন্তানদের মধ্যে দুর্জন-দুরাচারও থাকতে পারে সজ্জনের পাশাপাশি।
কিন্তু সংগ্রামের নেতাদের এই যদি চেহারা হয়, আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের কয়েকজন এমপি সম্পর্কে ইংরেজদের ভাষা ধার করে বলছেন, ‘লোকাল লায়ন’ তারা রাজনীতি করবেন, এমপি হবেন। তার বেশি দেশপ্রেমের কোনো গন্ধ নেই ওদের লেবাসে।
পূর্ণ সামরিক শাসন কিংবা ছদ্ম সামরিক শাসন যাই হোক – এই একটি বিষয়ে বাংলাদেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা মাথাটা কচ্ছপের মতো খোলের ভেতর ঢুকিয়ে রাখেন। দুনিয়ার তাবৎ বিষয়ে তাঁদের বলার আছে। এই একটি কেবল ট্যাবু। হয়তো সামরিক শাসনের তকমা তাদের স্পর্শ করে না অথবা সঙ্গোপনে তারা হাত মিলিয়ে নেন। কিন্তু শওকত ওসমান এতে পীড়িত হতেন এবং প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করতেন।
সামরিক শাসনের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অভিসন্দর্ভ রচনার সময় কি এখনো আসেনি!
শওকত ওসমান এ দেশের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট – সামাজিক ও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যাদাতা ও ভাষ্যকার। পাকিস্তান আমলের শেষদিকে সরকারের আচরণের একটি চিত্র ও যৌক্তিকতা উদ্ধৃত করছি তাঁর পূর্ণ স্বাধীনতা চূর্ণ স্বাধীনতা গ্রন্থ থেকে :
বাংলাদেশের হাড় মাংসে স্ফিত উদর পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতিগোষ্ঠী যখন সাবালক হয়ে উঠল, তখন তারা বড় তরফ অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদীদের কনুই ধাক্কা দিতে সমাজতন্ত্রী দেশের সঙ্গ আশনাইয়ের জন্য ফষ্টিনষ্টি শুরু করল। আসল মতলব অবিশ্যি আরো টাটকাপুঁজি সংগ্রহ। পুঁজিবাদের সচলতা রক্ষার জন্যে যে সূত্র চালু তার মনস্তাত্বিক প্রতিরূপ আছে বৈকি। আইয়ুব খান চীনের সঙ্গে পীরিতের জন্যে রোমিও সেজে বসলেন। পাকিস্তানের বামপন্থীবর্গ আইয়ুব খানের ফ্যাসিস্ট শাসনকে সমর্থন দিলেন, একদম পাৎলুন খুলে। যুক্তিটা এই : যা চীনের জন্যে ভাল – তা দুনিয়ার পক্ষে, সুতরাং পাকিস্তানের পক্ষে। পাকিস্তানের বামপন্থীরা পায়ের তলার মাটির খোঁজ রাখেন না। ফলে মাথা সেখানে গিয়ে ঠেকতে বাধ্য।
৯ ডিসেম্বর, ১৯৭৫ শওকত ওসমান লিখছেন :
চৈনিক রাজনীতি আর নৈতিকতার নমুনা দ্যাখো।
অপর দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ’তেনারা’ হস্তক্ষেপ করেন না-তা বুক ঠুকে প্রচারিত হয়। কিন্তু বেচারা বাংলাদেশ! অনেক রক্তক্ষয়ের পর দেশটা স্বাধীন হলো। চৈনিক সমর্থন ছিল না তখন। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি তাদের অসম্মানকর উক্তির পুনরুত্থাপন এখানে নিষ্প্রয়োজন। মোট কথা অন্য দেশের মঙ্গলামঙ্গল বিচারের ভার সে দেশের অধিবাসীর নয়। সমাজতান্ত্রিক চীনের দায়িত্ব গোটা মানবতা রক্ষার। অতএব তাদের মুরুব্বিপনা করা নীতিসিদ্ধ। হিটলারের তত্ত্ব এখন দেখা যায় (???) সমাজতান্ত্রিক (?) দেশও গ্রহণ করেছে।
হায় মার্কস, কবরের ভেতর উলটপালট করছ কি না তুমি, কেন্দ্র জানে?
ঠিক এক বছর এক মাস পর ৯ জানুয়ারি, ১৯৭৬ সকালের সংবাদপত্রে যখন চৌ-এন লাই-এর মৃত্যুসংবাদ দেখলেন, তাঁর মনে হলো ‘বাংলাদেশের সংগ্রামকালে ওরা খুনীদের সাঙ্গাৎ (হায় সাম্যবাদ!) ছিল’, নিপীড়িতের পক্ষে মোটেও নয়, তিনি লিখলেন :
যৌবনে আমাদের ‘হীরো’ ছিলেন মানবত্রাণকারী হিসেবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন-কালে নেতাদের ঘৃণ্য সুরত দেখে আঁৎকে উঠলুম। মত যখন মন্ত্রে পরিণত হয়, তখন সব আদর্শই ভেস্তে যায়।…
সন্ধ্যায় মনে হলো কোনো মৃতজনের প্রতি ঊনষাট বছর বয়সে উষ্মা প্রদর্শন কি অশোভন নয়?
এ প্রশ্ন করেও তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে নেন না, বরং আরো একদফা নিন্দা জানান। একাত্তরের দিনগুলোতে চীন ছিল খুনিদের সাঙাত। ’চৌ-এন লাই যদিও শ্রমিক শ্রেণির নেতা কিন্তু গোড়ায় তিনি ম্যান্ডারিনের সন্তান, কাজেই পুরোনো পিতৃ খাসলত থেকে বেরোবেন কেমন করে।’
চীন ও আমেরিকার নতুন সম্পর্ককে শওকত ওসমান দেখছেন এভাবে : মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং চৈনিক সাম্রাজ্যবাদ এখন বিবাহ-বন্ধনের পূর্বে পূর্বরাগে আবদ্ধ।

শেখের সম্বরা : দোসরা বালাম
এই কিতাবখানা লিখার কী দরকার ছিল, গুরুভার বুদ্ধিজীবীদের আপত্তি ছিল, এসব শওকত ওসমানকে মানায় না। এতে শওকত ওসমানের ভার কমে যাবে, ভাঁড়ামির মতো মনে হবে এসর পদ্যচর্চা। কিছুটা হালকা না হয় হলেনই। তিনি ঠাট্টার যে ভাষা দিয়ে এই সমাজের গ-ারত্বক চাবকেছেন, সে ভাষাও বুদ্ধিজীবীর অপছন্দ হওয়ার কথা।
শেখের (তিনি তো শেখই, শেখ আজিজুর রহমান) সম্বরাতে তিনি লিখেছেন :
যে ইলেমের সাথে নেই জীবনের যোগ
তা চিরকাল জাতির জন্য দুর্ভোগ।
তিনি অনুৎপাদনশীল ও অনাধুনিক মাদ্রাসা শিক্ষার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
মোনাজাত বনাম মগজ এপিসোডে তিনি লিখেছেন : ‘বর্তমান দুনিয়ার সভ্যতা ইহুদি-নাসারার মেধা ও মেহনতের ফল। ওদের আবিষ্কৃত গ্যাস, মোটর, টেলিফোন, এরোপ্লেন ইত্যাদি – এমনকি দৈনন্দিন তৈজসপত্র ব্যবহারে মুসলমানদের লজ্জা হয় না’ অথচ মোনাজাতে ইহুদি-নাসারা জোটের গোষ্ঠী উদ্ধার নিত্যকার রুটিন।
শওকত ওসমান যা বলতে চেয়েছেন কখনো সরাসরি, কখনো শিল্পের আভরণে বলে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলার প্রতি কোনো অনীহা কিংবা অশ্রদ্ধায় নয়, জাতীয় সংগীতের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত পক্ষপাত ছিল ‘ধনধান্য পুষ্পভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা… ’ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানটির প্রতি।
শওকত ওসমান আরো লিখতে চেয়েছেন
শওকত ওসমান একটি উপন্যাস লিখতে চেয়েছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর কুকুর ভেলীকে নিয়ে। শরৎচন্দ্র ভেলীর মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। লোমশ আদর অনেক সময় লেখকের অন্তরাত্মার অস্থিরতা প্রশমন করে আর তিনি মনে করেন ভেলী ছিল শরৎচন্দ্রের কাছে দুস্থ মানবতার প্রতীক। এবার কলকাতায় আছি। মাল-মসলা জোগাড় করা কঠিন হবে না। তবে ঝামেলা অনেক। ভেলীর জীবিতকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের সব রচনার পটভূমি জানা দরকার। বইটার নামও ঠিক করেছিলুম। জিয়া-ভেলী। শরৎচন্দ্রের ভাইপোরা ওকে ‘জিয়া’ বলে ডাকতেন। জিয়া মানে প্রাণ। ভেলী ব্রজবুলিতে প্রাপ্তি। নামটা উপন্যাসের ভালোই হতো। (উত্তরখ- মুজিবনগর)
এই উপন্যাস বলা যায় স্বপ্নাদিষ্ট, একাত্তরের আগস্টে শরৎচন্দ্রকে স্বপ্নে দেখলেন, ভেলীকে নিয়ে উপন্যাস লিখলে তাঁর কোনো আপত্তি থাকবে কিনা জানতে চাইলে তিনি মাথা নাড়লেন, নেই। তখন লিখলেন : কিন্তু এই বই আমার পক্ষে লেখা সম্ভব হবে না, শুধু পরিশ্রমের অভাবে। শরৎচন্দ্রের ক্রমশ জীবনী, তাঁর গল্প-উপন্যাসের কালানুক্রমিক ছবি একদম চোখের সামনে থাকা উচিত। আমার কি সময় হবে হাজার ঝঞ্ঝাটের মধ্যে? এই বয়সে বাসনা যথাস্থানেই গুমরে গুমরে স্তব্ধ হবে।

‘উপন্যাস লিখলে অবাঙালী কিছু চরিত্র আঁকতে হবে’ – শওকত ওসমান তার ভ্রাতৃপ্রতিম শরফুদ্দীনকে স্মরণ করলেন, সেই কলকাতা থেকে তাঁর সহকর্মী। শরফুদ্দিনের পিতামহ পাটনা হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন, অবস্থাপন্ন এই পরিবার দেশভাগের কারণে পাটনার বাড়ি জলের দামে বেচে চট্টগ্রাম এসে বসতি স্থাপন করেছিল। কিন্তু এই অবাঙালি পরিবারের ভবিষ্যৎ কী? শওকত ওসমান অসহায় অবাঙালিদের কথা ভেবে একাত্তরেই কলম ধরেছেন, দুর্ভাগ্য আমরা অর্ধশতকেও ভাবতে পারিনি।
একাত্তরে তিনি যখন পূর্ব পাকিস্তানে হিজরত করা তাঁর অবাঙালি বন্ধুদের জন্য আতঙ্কিত, পাকিস্তানের গণমাধ্যমের ভারত-বিদ্বেষ হিন্দু-বিদ্বেষে পরিণত হয়েছে, কিন্তু হিন্দু-বিদ্বেষ ছড়ালে ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা আরো সঙ্গীন হয়ে উঠবে, সেদিকে নজর নেই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের।
দুবারের স্বাধীন স্বদেশ তাঁর সামনে মেলে ধরেছে অতিকায় ইজেল। একাত্তরের ডিসেম্বরে তিনি লিখছেন :
টলস্টয়ের নভেলের চেয়েও বিশাল পটভূমি চোখের উপর দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে। কী করে আঁকব এই ব্যাপক ঘূর্ণিঝড়ের চিত্র? তাই মনে এত অস্থিরতার কল্লোল। সহজে এ ঠায় বসে থাকাও দায়। অনেক হাঁটলুম বিকেলে। খ- খ- ছবি হাতছানি দিয়ে পালায়। এই সামাজিক হিমবাহী ঝড়ের বিশালত্ব কী দিয়ে ধরব? দিশেহারার মতো তাকাই চতুর্দিকে। কিন্তু আমি ছাড়া আর এই দায়িত্ব কে-ইবা পালন করবে? এই মুহূর্তে কাউকে চোখের সামনে পাচ্ছিনে। তাই আরো অস্থিরতা।
একাত্তরের নভেম্বরে একদিন লিখলেন :
উপন্যাস রচনার কথা ভাবি।
এই বিরাট সমাজ কল্লোলের সকল ক্রেঙ্কার কি দিয়ে ধরব অক্ষরের জালে। মাঝে মাঝে গত দু’মাস সে চিন্তায় বেশ বিব্রত। কতো না মানুষ জড়িত এই সামাজিক ঝটিকার মধ্যে। শত শত মানুষ, তাদের জীবনপ্রবাহ, নানা দ্বন্দ্ব, সৌজন্য ভ-ামি, আত্মত্যাগ, হাসি কান্না-দৈনন্দিনতা – এত বিচিত্র সমাহার। কল্পনা এগোয় না। ভয়ে পিছিয়ে যেতে হয় প্রতিদিন। অথচ দেশবাসীর সামনে তাদের চেতনা গঠনে এসব তুলে ধরার দায়িত্ব প্রত্যেক দেশপ্রেমিক লেখকের ওপর বর্তায়। বড় বিপন্নবোধ করছি এমন বিরাট কর্তব্যের সামনে।
সহিংসতা নিয়ে আরো বড় ক্যানভাসে তিনি এই সমাজের ছিদ্র আঁকতে চেয়েছেন।
‘সহিংসতা বা চন্ডাচার নিয়ে তিন বছর পূর্বেই লিখেছিলুম উপন্যাস : রাজা উপাখ্যান। আবার নতুন করে অন্য কাহিনী মারফৎ ব্যাপারটা তুলে ধরতে হবে।
ঢাকা ও কলকাতা দুটোই তাঁর নিজের শহর। তাঁর ভাষায় বাঙালির দুই ফুসফুস। এই দুই শহরকে নিয়ে তাঁর হাতেই হতে পারত অ্য টেইল অব টু সিটিজ, শওকত ওসমানের আত্মজৈবনিক লেখাতে, ডায়েরিতে এরকম একটি আফসোস আঁচ করা যায়। ১৯৭৬-এ নির্বাসনের দিনগুলোতে লিখেছেন, অ ঞধষব ড়ভ ঞড়ি ঈরঃরবং হয়তো পরবর্তীকালের কোনো ঔপন্যাসিক লিখবেন, একালে লেখা না হলেও। সেই চার্লস ডিকেন্সের প্রতীক্ষা সবারই।
তিনি আরো নিবিড়ভাবে একাত্তরের নির্মমতার ছবি আঁকতে চেয়েছেন, অন্তরাত্মার ক্রন্দন প্রতিধ্বনিত করতে চেয়েছেন। ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তিনি লিখেছেন, ‘খুলনার গল্লামারীর বিল এলাকায় অবাঙ্গালি জল্লাদেরা কী ভাবে শত শত অসহায় নরনারীকে কেবল জবাই করেছে, আজ হাড়ের বিপুল স্তূপ তার সাক্ষ্য… এই হাড়ের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে স্বজনহারা জনেরা।’
ঠিক একদিন আগে তিনি লিখেছেন, ‘এই সব কলঙ্ক ও অন্যান্য তান্ডব-কাহিনীর মধ্যে মাঝে মাঝে আলোর রেশও দেখা যায়… বেলুচ সৈন্যরা কোথাও কোথাও মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের অর্থ-সাহায্য দিয়েছে অথবা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়। এই সান্ত¡না নিয়ে বাঁচব। মানুষে বিশ্বাস হারাব না কোনদিন।’

কেন এই নির্বাসন?
১৯৭৬-এর শুরুতে তিনি একদিন লিখলেন, বাংলাদেশ কোথায় এসে দাঁড়াল? ভুলের মাশুল দিতে হয়।

আমার পক্ষে ওদেশের বর্তমান আবহাওয়া ক্রমশ শ্বাসরোধী হয়ে উঠছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিতে হোলো। যদি কিছু লিখতে হয়, অন্য পরিবেশে চলে যাওয়া উচিত।
২৮ মার্চ, ১৯৭৬ লিখলেন, এক হপ্তা হয়ে গেল। ঊংপধঢ়রংঃ -এর মত এই চধংঃড়ৎধষ আবহাওয়ার মধ্যে। বাংলাদেশের খবর কিছু পাইনি। তাই তাড়াতাড়ি ফিরতে চাই। জন্মভূমি গ্রামের বুকে আবদ্ধ হয়ে তো থাকতে পারে না। এই দোটানা জীবন-দোলাচল তিরিশ বছর কল্পনাশক্তি ক্ষয় করে দিলো। সাংস্কৃতিক জীবন-বিকাশের জন্য তাত্ত্বিকেরা ঝঃধনরষরঃু-র উপর এত জোর দেন।
তাঁর অস্থিরতার সাক্ষ্য দেন এক সপ্তাহের মধ্যেই : এই কলকাতা শহর আর মাতৃক্রোড় নয়। সংশয়াপন্ন জীবন নিয়ে চলাফেরা কি সুখের?

পাদটীকা :
বঙ্কিমচন্দ্রকে উদ্ধৃত করে ৭১-এর ডায়েরিতে শওকত ওসমান লিখেছেন : বাঙালি যখন একা লড়ে সে একশজনের মতো লড়ে আর যখন একশজন লড়ে তখন একজনের সমানও সক্রিয় নয়।
শওকত ওসমান একাই একশজনের লড়াই করেছেন।
২ জানুয়ারি, ১৯১৭ সবলসিংহপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া সিংহশাবকটি যে শেষ পর্যন্ত সবলসিংহ হয়েই টিকেছিল, একালের উত্তরসূরিদের মতো মিউ মিউ করেননি, আমরা তাঁর গর্জনই শুনেছি।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার