কালি ও কলম এখন মোবাইলে


আপনার স্মার্টফোনে কালি ও কলম অ্যাপ ব্যবহার করতে চাইলে প্রথমেই গুগল প্লেস্টোর অথবা অ্যাপল স্টোর থেকে বিনামূল্যের কিউআর সফটওয়্যার>(যেমন : I-NIGMA BARCODE SCANNER) ইনস্টল করুন। এরপর সফটওয়্যারটি চালু করুন এবং আপনার মোবাইল ফোনের ক্যামেরা অন করে কিউআর কোডের ওপর ধরে থাকুন। এর ফলে কিছুণের মধ্যে আপনি কালি ও কলম ডাউনলোডের ওয়েবসাইটে পৌঁছে যাবেন।

পুরনো সংখ্যা

শব্দ নদী নন্দিনী

মোহাম্মদ আযাদShapdoNadi

ভীষণ ফাঁপরে পড়ে যাই। এ কেমন কৌতূহল শুরু হলো। কিছুতেই দমানো যায় না। পলকে পলকে চোখের সামনে শুধু ম্যাডামের মুখ ভেসে ওঠে। চোখদুটিতে জোড়া জোড়া ঘটনাপুঞ্জের স্তব্ধঘোর, নয়তো উত্তাপ। দুঠোঁটে অপ্রকাশের দহন, যা অনুবাদ করলে হয়তো একটি কথাই উঠে আসবে, আমাকে জানার চেষ্টা করো।

কীভাবে জানবো, কতটুকু জানবো? অপ্রতিরোধ্যে ইচ্ছার কাছে ঋজু বনে ফ্যালফ্যাল করে তাকাই। একের পর এক এসএমএস করতে থাকি। ভাবনাকে চটকে দিয়ে একদিন ম্যাডামের কল এলো। কী বলবো বুঝতে পারি না। কিছুটা ভড়কে যাই। কৌতূহলের পাশাপাশি যুক্তি-বুদ্ধির প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলি :

কেমন আছেন?

আপনার সমস্যাটা কোথায়? ঘনঘন এসএমএস -

জানতে ইচ্ছা করে।

কী?

আপনার দুঃখবোধ।

আপনাকে বলবো কেন?

জীবনবোধের পার্থক্য কখনো কখনো ঈর্ষা জাগায় যে -

ভালোই তো কথা বলেন দেখছি, কী করেন?

এরকম কমন প্রশ্ন সবাই করে, আপনি না হয় অন্য কিছু বলুন।

আচ্ছা বলবো, এখন রাখি। জরুরি একটা কল আসবে। কেটে দেওয়ার পর ভীষণ ঝরঝরে লাগে, এটা কি ঈর্ষার শিল্পিত বোধ থেকে, কিংবা অন্যভাবে যদি বলি, সবকিছুর ভেতরই থাকে অপার শূন্য এক মহাজাগতিক দোলা, মানুষকে ক্রমশ নিয়ে যায় প্রাপ্তির আস্বাদে!

কতদিন যে স্বপ্ন দেখেছি, কোনো এক মহাসত্যির আবেষ্টনী থেকে বুঝি ছিটকে যাচ্ছি। থরথর করে কাঁপে গোটা গা। চোখের পলকে পলকে তো আছেই দৃষ্টিপাতের ধোঁয়াশা। দুর্বোধ্য লাগে সব। অনেকটা অ্যারিস্টারকাসে ‘অন দ্য সাইজ অ্যান্ড ডিসট্যান্স অব দ্য সান অ্যান্ড মুন’। এখন জীবনের কথা পুরনো লাগে বলেই হয়তো জীবনবোধে এসেছে নব্য আধুনিকতা। মেকি বলি কিংবা বিকৃতি বলি, টলমল জলপ্রপাতের উৎসমুখে সবটাই গা-সওয়া। সবটাই শীতল একটি প্রবণতা।

তবু যতদূর মনে পড়ে, কোনো এক নির্জন গলির একপাশে দাঁড়িয়ে একজন বুড়ো জ্যোতিষ নিজের কুঁচকানো ঠোঁটে পানের চিপটি ছিটিয়ে বলেছিল, ‘রোমান্স শুভ’। সেই বুড়ো জ্যোতিষ তার চাপা কাঁধ আর নাতিদীর্ঘ হাত পেছনে জড়ো করে গুটিগুটি পায়ে গলিমুখে মিলিয়ে যাওয়ার পর, শুভ কিংবা অশুভ রোমান্স ঘিরে অদ্ভুত মৌনতায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলাম। আহা! অপস্রিয়মাণ বৈকালিক আলো সেই নির্জন গলিপথটুকু -

ম্যাডামকে আরেক দিন মোবাইল করতেই পাওয়া গেলো।

কেমন আছেন ম্যাডাম?

কে, ওহ্ আপনি, কাল টিভিতে আমার অনুষ্ঠান দেখেছেন?

দেখেছি।

কেমন লাগলো?

রোমান্স শুভ!

কিছুক্ষণ চুপ করে বললো, আমার কথাগুলো কেমন লাগলো?

মনে নেই।

কেন?

একই রকম কথা বারবার শুনি বলেই হয়তো -

অথচ জানেন, কত যে কল, কত যে এসএমএস পাচ্ছি।

আপনার কি মনে হয় না ওগুলো সস্তা স্ত্ততি?

নিজের ওজন দিয়ে সবাইকে মাপবেন না। আপনি কি বলতে চান রাজনীতি ফিলোসফি নিয়ে আলোচনা করা যাবে না?

নিশ্চয়ই যাবে।

তো -

উত্তরটা অনেক বড়, মোবাইলে ডিটেল করা যাবে না।

এরকম উদ্ভট মানসিকতা সচরাচর দেখা যায় না।

কী বললেন, উদ্ভট!

চাপা হাসি দিতেই ম্যাডাম এক ধমকে থামিয়ে দেয়। হাসির রেশটা তবু ঠোঁটে নিয়ে বলি, এটা ভালো বলেছেন, উদ্ভট। বর্তমান সময়টাকে আপনি কাল আলোচনার বৈঠকে কি যেন... কি যেন বললেন, ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, যুগ-সন্ধিক্ষণের। কিন্তু কোপারনিকাসের অ্যান্ড দ্য রেভল্যুশন অব দ্য হেভেনলি স্ফিয়ার্স পড়লে মনে হয়, যুগ-সন্ধিক্ষণটা কেমন বেঁকে যায় উদ্ভট রহস্যের দিকে।

অন্য কিছু বলার থাকলে বলুন।

অনুষ্ঠানের পুরো সময়টুকু আপনার দিকে তাকিয়েছিলাম।

পারভারটেড!

জি?

আর কখনো আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না।

ঝট করে কেটে দেয়। মাত্রাজ্ঞানহীনভাবে টলতে টলতে অনুভব করি, চোখের সামনে বর্ধিত হচ্ছে অসিত্মত্বের নতুন মাত্রা। অতিক্ষুদ্র। .০১ হলেও সহজে মুছে ফেলার নয়।

মাঝরাতে হাওয়া জাগলো। নির্জন রাস্তায় তাকাতেই গভীর অন্যমনস্কতা পেয়ে বসে। যতদূর চোখ যায়, শুধু প্রাণহীন অসারতা। সেই সঙ্গে হাওয়ার শোঁ-শোঁ শব্দ। মনে হলো, বিপদ আসন্ন। তবু ভালো লাগে। মানুষের দুর্গতি, নয়তো ধসে-যাওয়া জনপথ ঘিরে আর যাই হোক, বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাসটুকু মোচড় দিয়ে ওঠে। এক জোড়া স্থির চোখে উঠে আসে টলমল সমুদ্র, নয়তো পাহাড়ের স্তব্ধতা। কোনো মানুষের মুখ উঠে আসে না, হাওয়ার সঙ্গে কেঁপে কেঁপে নিমিষে মিশে যায় মানুষের ছায়া -

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ভাবি, আর হয়তো কিছুই দেখার নেই। মহাবিপদকে নিকেশ করে মানুষেরা বুঝি আঁকড়ে ধরেছে রোমান্টিক প্রকৃতি, নিশ্বাস ফেলছে ঘন ঘন, আড়ালে হলেও সশব্দে। আর তাই হাওয়ার ঘুরপাকে গলে-পড়া অন্ধকারে, অবিরাম তাকিয়ে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, আমি হয়তোবা এতোদিনে আমার বয়সটাকে টের পাচ্ছি। বয়সের অভিজ্ঞতায় কত যে ফাঁক, কত যে প্রেমহীন কান্না, দেহ-মন মথিত করে দুঠোঁটে পিছলে পিছলে যায় জাতীয় কবির লেখা - নিরজনে প্রভু কিংবা আনমনে প্রভু... বিশ্বলয়ে... প্রভু...

আহা! এমনই চরম আক্ষেপ যে, কতদিন বুঝি আমার ফুলদানিটি মোছা হয়নি। অযত্ন-অবহেলায় নয়তো অন্তর্গত দীনহীনতায়। নিজের বয়সটা নিজেকেই আমূল চমকে দিয়ে সপাটে জড়িয়ে কানে কানে বলে, ‘বয়স কিংবা বিপদ কোনোটাই বাড়ে না।’ শরীর নিয়ে বয়সের যে খেলা, তার হাত-পা থাকলেও বিপদের কোনো হাত-পা নেই, তবে চোখ আছে। বুকের ভেতর যুদ্ধের অবিরাম শব্দ তোলা কটমটে চোখ। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে আজ সন্ধ্যায় একজনকে বলেছি, উপকূলে নাকি সাত নম্বর বিপদসংকেত! ও হেসে বলে, সমস্যা কী, আমরা তো অনুকূলে -

এটা শোনার পর ওকে মনে হচ্ছিল ঘোরপ্যাঁচহীন সরল বালক। পুনঃপুন চিমত্মা কিংবা সমালোচনার স্টাইলবাজ কোনো ভ- নয়। সেই যে নির্জন গলিপথে জ্যোতিষ বুড়ো একদিন ‘রোমান্স শুভ’ বলে দৃশ্যান্তর হলো, সাত নম্বর বিপদসংকেতের পর সেই স্মৃতিলগ্ন গলিপথে এখন ধপ্ করে জেগে ওঠে সামুদ্রিক ফেনিল ঢেউ। আপাত ঘোরের ভেতর মাথা নুয়ে সমুদ্রকেই ভাবতে গিয়ে চোখে পড়ে উপকূল, আত্মসচেতনহীন একদল জেলে মরণফাঁদের অভিজ্ঞতায়, গ্রীবা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রোমান্স কিংবা রোমান্টিকতার ভেতরও দিকনির্দেশনাহীন। পাড়ে থেকেও অপার, নিশ্বাসে নিশ্বাসে কেমন দ্বিরুক্তিহীন নিশ্চুপ, আর কিছু অনুভব করা যায় কি? জানালা দিয়ে সুচালো হাওয়া ঢোকে।

কখন যে ফুঁড়ি ফুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ম্যাডামকে মনে পড়ল। মধ্যরাতের বৃষ্টি-হাওয়ায় ম্যাডামের মুখটাকে কেন যেন মনে হচ্ছে সমসাময়িক কিংবা ভাবনাগুলোর অনুষঙ্গ। কোথাকার কে আমি নামগন্ধহীন, অপরিচয়ের ধাঁধায় কিছুটা হলেও তাকে বৃত্তাবদ্ধ করতে পেরেছি কি, কী জানি -

কেমন আছেন ম্যাডাম?

আপনি এতো রাতে কল দিলেন কেন?

আপনি হাঁপাচ্ছেন?

হ্যাঁ হাঁপাচ্ছি, তো -

ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বুঝি -

এতো কথা আপনাকে বলতে যাবো কেন, আপনি কে রে মশাই।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টিগুলো হাওয়ার সঙ্গে কেমন দুলে দুলে পড়ছে। কোনো একজন শিল্পী শূন্য ক্যানভাসে তুলির আঁচড় বসাচ্ছে যেন। জীবনের মূল্যবোধ কখনো যদি শিল্পের রূপক হয়ে যায়, প্রাত্যহিক চলাচলের ছন্দে তখন কতটুকু জাগবে পরিবর্তনের খেলা। কী সমাজ, কী রাষ্ট্র। সবকিছুর অন্তর্গত নির্যাসে কেবল দুরন্ত ধোঁয়াশা -

গাঢ় নিশ্বাস ফেলে ম্যাডামকে বললাম, সবাই কি আপনার মতো বলুন, মানুষের ভালো-মন্দ নিয়ে আপনি একটু বেশি কনসাস কিনা, জানেন তো উপকূলে আজ সাত নম্বর -

ম্যাডাম চড়া স্বরে ক্ষেপে যায়, আপনি থামবেন! আর কখনো এমন ডিস্টার্ব করবেন না।

কী করবো তবে, নিজের ওপর কন্ট্রোলিং সেন্সটা কাজ করে না যে। কেটে দেয়। বৃষ্টির খেলা শুরু হলো বেশ, বৃষ্টির ভেতর হাওয়ার দ্রম্নত সঞ্চালনের কি অদ্ভুত ফোঁসফোঁস শব্দ!

এরপর কত দিন, কত সময় যে গড়াল।

এই যে চারপাশ, রাস্তাঘাট, সর্বত্র লোলিত অভিব্যক্তির আঁচড় নিয়ে কোথায় যে শুরু হয় সত্যের চাষবাস, আদৌ সম্ভব কি? চোখে কেবল বিস্ময়। ক্রিকেট বিশ্বের চার-ছক্কার সঙ্গে অর্ধনগ্ন যুবতীদের ডানে-বাঁয়ে দেহ দোলানোর মতো পৃথিবীটাও যেন দুলছে। এরকম ভেদবুদ্ধিহীন অস্থির সময়ের সঙ্গে পালস্না দিয়ে নিজেকেও ছুটতে হয় কিংবা ছোটাতে হয়। হয়তো বহুদূর, নয়তো দূরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বৈষম্য, কোনটা যে ঠিক।

মনে পড়ে, কোনো এক অভিজাত পলস্নীর অতীতে একদিন, আমাদের আবাদি জমি ও দিঘিগুলোর বুকে কি অদ্ভুত ধ্যানমগ্ন রহস্য ছিল। কত আনন্দ জমির আইল ধরে খোলামনে, উন্মুক্ত হাওয়ার দোলায় হেঁটে হেঁটে কত যে ভারমুক্ত মনে হতো নিজেকে, প্রকৃতির স্বপ্নপুরুষ হয়ে চকিতে চিমত্মার জগতে জেগে উঠতো আত্মবিশ্বাস।

দিঘির ওপাশে মাস্টারবাড়ির ছোটবউ উঠোনের ঢালু বেয়ে যখন এক কলস পানি নিয়ে হ্যাঁচকা টানে শিশুকে কোলে নেওয়ার মতো কোমরে নিয়ে বেঁকে বেঁকে ফের ওপরে উঠতো, সেই ঘোমটাটানা লাজুক মুখের হাসিটি ছিল অকস্মাৎ পত্রপলস্নবে চমকে ওঠা রোদের মতো কোনো কৃষক স্বসিত্মর বিড়িটি টেনে গলগল ধোঁয়া ছেড়ে দিলে যা হয় -­

সেই মাস্টারবাড়ির কামলা মোতালেব ছিল একটু উজবুক স্বভাবের। কথা বলতো তোতলাতে তোতলাতে, একটু থেমে থেমে। কখনোবা শহুরে জীবনের অবিরাম তোলপাড় থেকে এক-আধটু গ্রামে গেলে প্রায়ই বাজারে মোতালেবকে দেখা যেত। হাটকালার মতো ঘাড় নিচু করে হাঁটছে, কিংবা নিজের অগ্র-পশ্চাৎ বেমালুম ভুলে অপার যুবকের মতো বাকরুদ্ধ মুখে বিরক্তি নিয়ে নেশাবালকের মতো টলছে। মুখোমুখি হলেই বলতাম, মোতাল চাচা -­

মুহূর্তেই মুচকি হেসে চটুল ঢংয়ে বলতো, অ্যাঁ তাচা -­

তখনই মনে পড়ে মাস্টারবাড়ির কথা। প্রগাঢ় উদ্যম নয়তো চাপা শয়তানির মতো ইনিয়ে-বিনিয়ে, কিছুটা দুর্বোধ্য ঘ্যানঘ্যান করার পর চিকন স্বরে বলতাম, কেমন আছে-এ-এ-এ একবার যাব কি ম্যাডামের বাসায়? মন তড়পায়, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন ধৃষ্টতায় সাময়িক বীরপুরুষ সাজলেও এক অর্থে, এরকম অর্বাচীন ইচ্ছার কোনো মানে নেই। তাছাড়া নানারকম প্রটোকল, জিজ্ঞাসা, অতঃপর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে হয়তোবা উন্মুক্ত দরজা। সবচেয়ে বড় কথা, ম্যাডাম সত্যির সংকোচন নীতিটা বোঝে, কিন্তু মানে না। তাতেই বুঝি আমার কৌতূহল, এভাবেই চলতে থাক -­

এরই মধ্যে একদিন গ্রামে যেতে হলো। মোতালেব চাচাকে দেখলাম না। বাজারে মোটামুটি সরব আলোচনা। লেংটা শাহ্র মাজারে যাওয়ার পর থেকে সে লাপাত্তা। বিষয়টি উপলব্ধির আওতায় যত না প্রভাব ফেলে, তার চেয়ে বেশি স্মৃতিলগ্ন করে ওর আচরণগত সতত চলার দৃশ্যগুলো। বড় হওয়ার পর কোনোদিন মাস্টারবাড়ি যাওয়া হয়নি। দিঘির পাশ দিয়ে ধীরগতিতে ওদের উঠোনে দাঁড়ালাম। ছোটবউ প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ম্যাক্সি গুটিয়ে গুঁড়া মাছ কাটছে। দ্রম্নত ওড়না টেনে-টুনে ভেতরে চলে যায়। ভরদুপুর। কাউকে তেমন চোখে পড়ছে না। মাঝবয়সী একজন মহিলা গ্রাম্য শালীনতায় উৎসুক মুখে বলে, কেডায় গো?

এক গস্নাস পানি খাবো।

মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে খলখল করে বলে, তুমি বড়বাড়ির পোলা না?

চুপ করে থাকি, মহিলা ভেতরে তাকিয়ে হাঁক দিলো, বউ পানি আন, শরমের কিছু নাই, পুরানা কুটুম।

ছোটবউ পানি নিয়ে এলো। বেশ জড়সড়। মুখটা বাঁকিয়ে রেখেছে, যেন সামনের বিসত্মৃত পথে দেখতে পাচ্ছে পথশ্রমের ক্লামিত্ম। এই মোবাইল-ইন্টারনেট যুগের বিপরীতে, আপন সত্তার লজ্জাজড়িত খোলসটা যুগ-যুগামেত্মর সংকোচন বা প্রসারণ নীতির কাছে বেমালুম বাকরুদ্ধ, কেবল সরল প্রবণতায় একটু আধুনিকতার কৌতূহলী ম্যাক্সিটাই বুঝি সর্বস্ব, এরপর আয়তলোচন চোখে যা কিছু দৃশ্যমান, সবটাই দৃশ্যপটের সরল কিংবা নির্মল আনন্দ। গস্নাসটা হাতে নিয়ে বলি, তোমার ম্যাক্সিটা সুন্দর।

শরীরটা আরেকটু বেঁকে গেল। সঙ্গের মহিলা বললো, চাইট্টা খায়া যাইবা।

মোতালেব চাচার খবর কী?

ও, হ, লেংটার মাজারে ওরস অইছিল, ওইখানে গিয়া আর ফিরত আহে নাই। এবার ছোটবউ ভালো করে তাকাল। আড়ষ্টতায় ফাটল ধরিয়ে সম্ভবত মোতালেবের জন্য তার মুখটাও এখন গভীর ছায়াপাতে অধীর। চোখজোড়া আমার দিকে স্থির, সম্ভবত  ইহজাগতিকতা ভুলে আমাকে বাস্তবে নয়, দেখতে পাচ্ছে স্বপ্নে। আমার তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে বুড়িগঙ্গার কথা। হায়রে নদী! দুপাশের ইট-কাঠ-কংক্রিটের ক্রমবিস্তারে নদীর সৌন্দর্য এখন নারী অসিত্মত্বের বাঁক, অজস্র কথার অব্যক্ত দহন নিয়ে প্রসবিনী নারীর মতো ধারণ করছে আরেকটা অগভীর প্রতিবন্ধী শিশুনদ। শূন্যতার আবর্তে যাকে বোঝা যায়, কিন্তু ধরা যায় না।

বলি, মোতালেব চাচা এলে আমার কথা বলো।

ও মাথা নেড়ে সায় দিলো।

তোমার স্বামী উজ্জ্বল কি এখনো মালেক মহাজনের ক্যাডার।

কথা বলে না। একঝলক হাওয়ায় স্রোতের বিপরীতে ঢেউ যেমন কেঁপে ওঠে, ওর ঠোঁটজোড়া তেমনি একটু নড়লো কেবল। সঙ্গের মহিলা ঘড়ঘড় করে বলে যেতে থাকে উজ্জ্বলের কুকীর্তি। কথা না বাড়িয়ে হাঁটা দিই। ও ক্ষীণস্বরে বলে, খাইবেন না?

না।

এরপর হাউজিং এস্টেট কোম্পানি বুড়িগঙ্গায় ড্রেজিং লাগিয়ে গোটা গ্রাম বালুতে ঢেকে ফেলার পর সেখানে তেমন একটা যাওয়া হয়নি। তবে শুনেছি, অনেক বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট উঠেছে, বালুর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে অনেক লাশও পড়ে থেকেছে। মোতালেবের কাছে একটি ম্যাক্সির ব্যাখ্যা যদি হয় পায়ের গোড়ালি দেখার মতো নাক সিটকানো, তবে পরিবর্তনের খেলায় এসব উঁচু-নিচু বিল্ডিংয়ের পাশে পড়ে থাকা লাশগুলোর ব্যাখ্যা কী হতে পারে? এখন অনেক মোতালেবকেই দেখা যায়। অনুভূতিগত পার্থক্য থাকলেও মূল বিন্দুতে আজো অবিচ্ছিন্ন। একদিন ম্যাডামকে কল দিয়ে বলি, আমি খুব বিপদে আছি।

আমি কী করব?

আমার বিপদ নিয়ে যদি একটা গল্প লিখে দিতেন।

আপনি কি অপ্রকৃতিস্থ?

হ্যাঁ।

ঠিক আছে, সুন্দর একটা গল্প লিখে আপনাকে জানাবো।

ধন্যবাদ।

এখনো বলতে কি, নানারকম বিপদসংকেত সমূলে আঁকড়ে প্রতিদিন আমি-আমরা নিশ্বাস ফেলছি, ঢোক গিলছি। অন্যরকম বেঁচে থাকার স্বসিত্ম, হয়তোবা স্বসিত্মর অনুকূলে বেঁচে থাকার ভিন্ন রসাস্বাদন। পার্থক্য কেবল ফলাফল নিয়ে কাউকে দোষী জেনেও দোষী করা যায় না। নীরবে একটা প্রশ্নবোধক দাগ থেকেই যায়। বুকে বুক মিলিয়ে কবে কোন ভদ্রলোক যে গলগল করে ছেড়ে দিয়েছিল মেকি আন্তরিকতা, সেই ক্ষণিক মুহূর্তের পর, সময়টা কিছু সময়ের আনন্দে ফুলে-ফেঁপে উঠলেও পদে পদে মিশে থাকে অনুভূতির বিষক্রিয়া। দুর্বৃত্তের ছোঁয়ায় মিশে থাকা রক্তের তাৎক্ষণিক একটা হিসাব হয়তো মিলে যায়। অথচ রক্তরেখাহীন জীবনের জোড়া জোড়া হাততালির ভেতর জন্ম নেওয়া উচ্চাভিলাষটুকু এমনই দুর্বোধ্য যে, মহাপ্রলয় ঘটিয়ে দিলেও কিছু বলা যায় না। হয়তোবা ভুলবশত দেখা হয়ে যায় কোনো পুরনো বন্ধুর সঙ্গে, সপাটে হাসি দিয়ে বলে, কেমন আছিস?

সেই একই ব্যাপার, পুরনো হিসাব-নিকাশ, একটু শুধু আধুনিকতায় গাঁথা, এই তো ফলাফল, মোবাইলে তাকিয়ে দেখি নতুন কোনো মিসড কল এলো কিনা -­

এখন গ্যাপে গ্যাপে ম্যাডামের সঙ্গে দেখা হয়। কখনো স্পর্শে, কখনো স্পর্শহীন। প্রতি-তুলনা করলে দুটোই আন্তরিক। গল্প-কবিতা ফিলোসফি-রাজনীতি ইত্যাদি ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায় তার চশমা-চেইন-শাড়ি কিংবা অসিত্মত্ব আলগা হওয়ার মতো। এরপর আলো-অন্ধকারের যুগল সন্ধিক্ষণে আমার, নয়তো তার, নয়তো দুজনার কণ্ঠস্বরে নদীর মতো বাঁক আসে, ঢেউ আসে। শতভাগ আন্তরিকতায় পূর্বাপর অনেক কিছু ভুলে নির্মাণ করি কিছু নতুন অক্ষর...

প্রতিটি আঙুলের নীরব রক্তক্ষরণ নিয়ে ফের তাকালে, ম্যাডাম বজ্রপাতের মতো আক্রোশে বলে বসে, কে তুই!

আমি তখন চোখ বন্ধ করে বুড়িগঙ্গা নদীকে দেখি। r

Leave a Reply