সফিউদ্দীন স্যার

লেখক:

Fishing - 1958 - Shafiuddin Ahmed
Fishing - 1958 - Shafiuddin Ahmed

 

সুবীর চৌধুরী

এ দেশের শিল্পকলা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন সফিউদ্দীন আহমেদ। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের প্রধান সহযোগী ছিলেন তিনি। এদেশে ছাপাই ছবির জনকও ছিলেন শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ। প্রয়াত হয়েছেন ২০ মে ২০১২-এ।

আমার শিক্ষক সফিউদ্দীন স্যারকে জানি ১৯৬৯ সাল থেকে। ঢাকায় চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় থেকে তাঁকে জানার সুযোগ হয়েছিল। প্রথম দুই বছর তাঁকে দূর থেকেই দেখেছি। প্রতিদিন কলেজে আসতেন ইস্ত্রি করা শার্ট-প্যান্ট বা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে। কখনই তাঁর কাপড়ের ইস্ত্রির ভাঁজ নষ্ট হতে দেখিনি। যদিও স্যার ছাপচিত্র বিভাগে ছাপার কালি নিয়ে নাড়াচাড়া করতেন। তিনি ছিলেন খুবই পরিচ্ছন্ন এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক মানুষ। ছাত্র-শিক্ষক সকলেই তাঁকে সমীহ করে চলতেন।

তৃতীয় বর্ষে ছাপচিত্র আমার ঐচ্ছিক বিষয় ছিল। তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর ছাপচিত্রের ক্লাস করার সুবাদে পর সফিউদ্দীন স্যারের কাছাকাছি আসার সুযোগ ঘটে। তিনি ছাত্রদের শেখানোর বিষয়ে খুবই আন্তরিক ছিলেন। তাঁর ক্লাসে ফাঁকি দেবার কোনো সুযোগ ছিল না।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর শুরুতে অর্থাৎ ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে আমি শিল্পকলা একাডেমীর চারুকলা বিভাগে যোগদান করি। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই শিল্পকলা একাডেমী হয়ে ওঠে দেশের চারুকলা বিষয়ক সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। শিল্পকলা একাডেমীতে চারুকলা বিভাগে কাজ করার ফলে সফিউদ্দীন স্যারের সঙ্গে আমার একটি ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। কোনো প্রদর্শনীতে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন খুবই যত্নবান ও সিরিয়াস। আমার মনে আছে ১৯৭৫-এর ১৫ মার্চ থেকে আয়োজিত প্রথম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে স্যার দুটি তেলরং চিত্র দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী। তাই তিনি বারবার ভেবেছেন তাঁর কাজ জাতীয় প্রদর্শনীর উপযোগী হচ্ছে কিনা। দর্শক তাঁর কাজ ভালোভাবে গ্রহণ করবে কিনা ইত্যাদি নানা চিন্তা তাঁর মনের ভেতর ঘুরপাক খেত। দীর্ঘ সময় ধরে দিনের পর দিন তিনি ছবির সামনে বসে থাকতেন। এ-বিষয়ে তিনি একবার কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘আমার তো কারো সাথে বিশেষ কথা বলা হয় না, তবে আমি কথা বলি, আমার ছবির সঙ্গে – ঘণ্টার পর ঘণ্টা।’ প্রথম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে দেওয়া তাঁর দুটি পেইন্টিংই ছিল বড় আকৃতির। একটির নাম ছিল ‘মাছ ধরার জাল’। দুটি কাজই ছিল অসাধারণ। তাঁর উল্লেখযোগ্য তেলরঙের কাজ। বর্তমানে কাজ দুটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সংগ্রহে রয়েছে।

তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার টিটোগ্রাদে জোটনিরপেক্ষ দেশসমূহের জন্য স্থাপিত আর্ট গ্যালারিতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে দুজন শিল্পীর দুটি চিত্রকর্ম যাবে। শিল্পকলা একাডেমী থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো শিল্পী কামরুল হাসান এবং শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের কাজ পাঠানো হবে। সফিউদ্দীন স্যারকে যখন জানালাম তখন তিনি খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। বললেন, ‘বিশ্বের নামকরা শিল্পীদের কাজের পাশে আমার কাজ থাকবে। খুব ভেবেচিন্তে দিতে হবে। আমাকে কয়েক দিন সময় দাও।’ জোটনিরপেক্ষ দেশসমূহের গ্যালারির জন্য স্যার তাঁর খুবই সমাদৃত ছবি ‘বিক্ষুব্ধ মাছ’ শীর্ষক এচিং দিয়েছিলেন। স্যার কখনই তাঁর ছবি বিক্রি করতে উৎসাহিত বোধ করেননি। তবে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রদর্শনীর জন্যে যখনই তাঁর কাছে ছবি চেয়েছি স্যার তাঁর ভালো কাজটিই দিয়েছেন।

সফিউদ্দীন স্যার সবসময়েই ছিলেন প্রচারবিমুখ। তিনি অনুষ্ঠানাদিতে খুব একটা যেতেন না, বা গেলেও কখনো প্রধান অতিথি বা অতিথি হতে চাইতেন না। একবার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের একটি অনুষ্ঠানে এবং আরেকবার রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের এক বার্ষিক অধিবেশনে তাঁকে জোর করেই প্রধান অতিথি করা হয়েছিল। শর্ত ছিল, তিনি কোনো কথা বলবেন না। ঢাকে কাঠির টোকা দিয়ে স্যার অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করেছিলেন।

১৯৯৭ সালের ২৩ জুন ছিল স্যারের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী। ঠিক হলো এবার তাঁকে জনসমক্ষে নিয়ে আসা হবে। বেশ ঘটা করে স্যারের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করা হবে। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এবং শিল্পী আবুল বারক আলভী ছিলেন সফিউদ্দীন স্যারের খুবই আস্থাভাজন প্রিয় ছাত্র এবং পরবর্তীকালে সহকর্মী। কাইয়ুম স্যার ও আলভী ভাইকে সঙ্গে নিয়ে স্যারের স্বামীবাগের বাসায় গেলাম। গেটে টোকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেলাম একসঙ্গে কয়েকটি কুকুরের গর্জন। তাঁর বাসায় বেশ কয়েকটি পোষা কুকুর ছিল। সে-সময়ে কুকুরগুলো শেকলে বাঁধা ছিল না। বুঝতে পারলাম বাসায় কেউ কুকুরগুলোকে খাঁচার ভেতরে নিচ্ছে। গেট খোলার পর ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর স্যার এলেন। কুশলবিনিময়ের পর আমরা তাঁকে আমাদের আগ্রহের কথা – ৭৫তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের কথা জানালাম। স্যার তো শুনে আকাশ থেকে পড়লেন। প্রথমেই বলে দিলেন, ‘জন্মদিন করার মতো কোনো বিখ্যাত কেউ আমি নই। আমি কোথাও যেতে পারবো না। একেবারে না।’ আমরাও নাছোড়বান্দা। নানা যুক্তি দিয়ে স্যারকে অনুরোধ করতেই থাকলাম। একপর্যায়ে মনে হলো তাঁর মনের ভেতর কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। তারপরও বললেন, ‘আমাকে ভাবার জন্য দুদিন সময় দাও।’ আমরা প্রস্ত্ততি নিতে থাকলাম। অবশেষে তিনি রাজি হলেন। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে সভাপতি করে একটি নাগরিক কমিটি গঠন করা হলো। তাঁর জন্মদিনকে ঘিরে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ সাড়া পড়ে যায়। আমাদের ইচ্ছা ছিল ৭৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর একটি প্রদর্শনী আয়োজন করা, যদিও প্রস্ত্ততির জন্য সময় খুব বেশি ছিল না। প্রদর্শনীর প্রস্তাবে তাঁর একেবারে ‘না’ জবাব। রাজি হলেন ১৬টি ছাপচিত্রের একটি ফোলিও প্রকাশের  প্রস্তাবে। সংবাদের তৎকালীন সাহিত্যসম্পাদক আবুল হাসনাত বরাবরই সফিউদ্দীন স্যারের খুব প্রিয় ছিলেন। তিনি তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। হাসনাতভাইকে দায়িত্ব দেওয়া হলো ফোলিওর জন্য স্যারের ওপর ছোট একটি লেখা এবং জন্মদিনের ব্রোশিওরের জন্য বড় একটি লেখার জন্য। স্যার ফোলিওর জন্য ১৬টি প্রিন্ট বাছাই করেছিলেন। ছাপার উদ্দেশ্যে প্রিন্টগুলো সরাসরি স্ক্যান করার জন্য পুরানা পল্টনে নিয়ে যেতে হবে। বাসার বাইরে কাজগুলো নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্যারের মনে দ্বিধা ছিল – ঠিকভাবে ফেরত আসবে কি-না। অধিকাংশ কাজই গত শতাব্দীর চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের। তাই কাজগুলো তিনি যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছিলেন। অবশেষে আবুল বারক আলভী ও পুত্র খোকনের দায়িত্বে কাজগুলো স্ক্যান করার জন্য দেওয়া হলো। তারপরও শর্ত জুড়ে দিলেন, সকালে নিয়ে গিয়ে স্ক্যান করে রাতেই তাঁকে কাজগুলো ফেরত দিতে হবে। স্যারের নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হলো। সফিউদ্দীন আহমেদের ছাপচিত্র শিরোনামে ফোলিও ছাপার কাজ শেষ হলো। এটিই ছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী-প্রকাশিত প্রথম ফোলিও। ২৩ জুন ১৯৯৭ সকাল থেকেই সবার ভেতর ভীষণ উত্তেজনা। চারিদিকে সাজসাজ রব। শিল্পকলা একাডেমীর তৎকালীন টিনশেডের মিলনায়তনের মঞ্চ সাজানো হয়েছিল ভিন্ন আঙ্গিকে, যা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সকালেই শিল্পকলা একাডেমী এবং চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাপচিত্র বিভাগের পক্ষ থেকে স্যারের স্বামীবাগের বাসভবনে স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হলো। বিকেলে শিল্পকলা একাডেমীতে মূল অনুষ্ঠান। বরের গাড়ির বহর যেভাবে বিয়ের আসরে প্রবেশ করে, সেভাবেই সফিউদ্দীন স্যারকে নিয়ে গাড়ির বহর শিল্পকলা একাডেমীতে প্রবেশ করল। আগে থেকেই চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা ফুল নিয়ে দুই লাইনে দাঁড়িয়েছিল তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। আর ছিল ১০টি ঢাক। পুষ্পবৃষ্টি, ঢাকের শব্দ ও মিলনায়তন-ভর্তি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সুধীজনের করতালির মধ্যে সফিউদ্দীন স্যারকে বরণ করে নেওয়া হলো। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। স্যার ও ভাবির মাথায় ফুলের মুকুট পরিয়ে দেওয়া হলো। তাঁরা মঞ্চে আসন নিলেন। ছায়ানটের শিল্পীদের সমবেত সংগীত পরিবেশনের ভেতর দিয়ে সফিউদ্দীন স্যারের ৭৫তম জন্মবার্ষিক অনুষ্ঠানের সূচনা হলো। স্বাগত বক্তব্য রাখলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর তৎকালীন মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। সম্মাননাপত্র পাঠ করলেন সন্জীদা খাতুন। অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ও শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। এরপর ব্যক্তি- প্রতিষ্ঠান-সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হলো। আর যেন শেষ হয় না। সমস্ত মঞ্চ পুষ্পস্তবকে ঢেকে যায়। ঢাকা শহরের সকল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জড়ো হয়েছিলেন শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে। নিভৃতচারী এই শিল্পীকে একনজর দেখতে, শ্রদ্ধা জানাতে। এ-যাবৎ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে যত অনুষ্ঠান হয়েছে এর ভেতর সফিউদ্দীন স্যারের ৭৫তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটিই ছিল আমার জানামতে শ্রেষ্ঠ। এমন বিপুলভাবে ও রুচি-স্নিগ্ধতায় আর কারো জন্মদিন উদ্যাপিত হয়েছে বলে মনে পড়ে না। সফিউদ্দীন স্যারের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এভাবে সাড়া জাগাবে তা স্যার ভাবতেই পারেননি, আমরাও পারিনি। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়েছিলেন।

এই জন্মবার্ষিক অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে আমরা স্যারের আরো কাছাকাছি চলে আসি এবং আরো আস্থা অর্জন করতে পারি। এ সুযোগে শিল্পকলা একাডেমী থেকে তাঁর ওপর বড় ধরনের একটি রঙিন সচিত্রগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। দৈনিক সংবাদের তৎকালীন সাহিত্যসম্পাদক এবং বর্তমানে কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাতকে গ্রন্থের জন্য স্যারের ওপর লেখার অনুরোধ জানানো হলে তিনি সানন্দে সম্মতি জানান।  ১৯৯৭-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে হাসনাতভাইকে সঙ্গে নিয়ে সফিউদ্দীন স্যারের বাসায় যাই। তাঁর ওপর বই প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জানাই। প্রস্তাবে তিনি খুশি হন, তবে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সত্যিই কি তাঁর ওপর বই বের হবে? হাসনাতভাই ও আমি প্রতি সপ্তাহেই ছুটির দিনে ঘনঘন সফিউদ্দীন স্যারের বাসায় যাওয়া শুরু করলাম। তিনি বইয়ের লেখার জন্য তথ্যাদি না দিয়ে অন্যসব প্রসঙ্গে আলাপ করে চা-নাস্তা খাইয়ে আমাদের বিদায় করতেন। তবে আমরা কখনোই হাল ছাড়িনি। অবশেষে একসময়ে আমরা ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাঁর আস্থা অর্জনে সমর্থ হলাম যে, সত্যি সত্যিই তাঁর সম্পর্কে শিল্পকলা একাডেমী থেকে গ্রন্থ প্রকাশিত হবে। তাঁর বাল্যকাল, কলকাতা আর্ট স্কুল, ’৪৭-এ দেশবিভাগের পর ঢাকায় আসা, ১৯৪৮-এ ঢাকায় আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ১৯৫৭ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন গমন, ঢাকায় ফিরে আসা – সবই তিনি একে একে বলতে লাগলেন। হাসনাতভাই কিছু বক্তব্য টেপে ধারণ করলেন, কিছু বক্তব্য নোট করে নিলেন। স্যার খুবই গোছানো ছিলেন। চল্লিশের দশকে ছাত্রাবস্থায় বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের ক্যাটালগ, কলকাতায় পুরস্কারপ্রাপ্তির পেপার কাটিং, লন্ডনে থাকাকালীন প্রদর্শনীর পেপার কাটিং ইত্যাদি ডকুমেন্ট এবং ছাত্রাবস্থার ও কলকাতা পর্বের কাজগুলো পর্যন্ত তিনি যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছিলেন, যদিও ১৯৮৮-র বন্যায় তাঁর বেশকিছু মূল্যবান কাজ ও ডকুমেন্ট নষ্ট হয়।

স্যার এতো সময় দিয়েছেন যে, তাঁর বক্তব্য নোট নেওয়া এবং সকল কাজ ও ডকুমেন্ট দেখে তথ্যসংগ্রহ করতেই হাসনাতভাইয়ের প্রায় দু বছর লেগে যায়। এরপর হাসনাতভাই পান্ডুলিপি প্রস্ত্তত শুরু করেন। এর ভেতরও কখনো কোনো নতুন তথ্য স্যারের মনে এলে সেই তথ্যটি হাসনাতভাইকে জানানোর জন্য তিনি অস্থির হয়ে যেতেন। এভাবেই বেশ সময় পার হয়ে যায় বইটির পান্ডুলিপির কাজ শেষ হতে।

২০০২ সালের ২৩ জুন স্যারের ৮০তম জন্মবার্ষিকীও শিল্পকলা একাডেমীতে ঘটা করে উদ্যাপিত হয়। ইচ্ছা ছিল ৮০তম জন্মবার্ষিকীতে স্যারের একক প্রদর্শনী আয়োজন করার। তাঁকে রাজি করানো যায়নি। প্রদর্শনীর কথা বললেই বলতেন, ‘এখনো আমার অনেক কাজ করার বাকি। প্রদর্শনীর সময় এখনো হয়নি। আমাকে আরো অনেক কাজ করতে হবে’ ইত্যাদি।

অবশেষে ২০০৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর চারুকলা বিভাগ থেকে সফিউদ্দীন আহমেদ শিরোনামে গ্রন্থটি প্রকাশিত হলো। বইটির প্রকাশনা উৎসব হলো। শিল্পী  মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম ও রফিকুন নবী বইটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বইটি ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায় ছিল। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ইংরেজি অনুবাদ করেন। গ্রন্থ প্রকাশ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমীতে স্যারের প্রদর্শনী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবারো আমরা তাঁকে রাজি করাতে পারিনি। ইতোমধ্যে ২০০৪-এর ১ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে আমি বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টসে যোগদান করি। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরের সঙ্গে সফিউদ্দীন স্যারের খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার শিল্পীদের নিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন-আয়োজিত আর্ট ক্যাম্পে স্যার অংশ নিয়েছিলেন। এই ক্যাম্পটিই ছিল সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম আর্ট ক্যাম্প। সে-সময়ে স্যারকে দেখেছি পশ্চিম বাংলার প্রবীণ শিল্পী পরিতোষ সেনের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দিতে।

আমি বেঙ্গলে যোগ দেওয়ার পরও আমার মিশন অব্যাহত ছিল – কীভাবে স্যারকে একক প্রদর্শনীর জন্য রাজি করানো যায়। ইতোমধ্যে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর জীবনে এক দুঃখজনক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এক সকালে তিনি স্বামীবাগের বাসার ঘরের বাইরের সিঁড়িতে তিনি পড়ে যান। এতে তাঁর পায়ের হাঁটুর হাড় ভেঙে যায়। হাঁটুতে অপারেশন করা হয়। কিন্তু অপারেশনের কাজটি ভালোভাবে সম্পন্ন না হওয়ায় এবং সে-সময়ে তাঁর  যে-ধরনের সেবা শুশ্রূষা যত্ন প্রয়োজন ছিল, তা না পাওয়ায় তাঁর হাঁটাচলা করার শক্তি ক্রমেই লোপ পেতে থাকে এবং একসময়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। সত্যি কথা বলতে কী, সে-সময়টাতে আমরা কেউই তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর রাখতে পারিনি। স্বামীবাগের বাসার পেছনের দিকে যে ছোট কামরাটিতে স্যার থাকতেন সেই কক্ষটি ছিল শেওলাধরা, ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে। দীর্ঘ প্রায় নয় মাসের অধিক সময় সেখানে বিছানায় শুয়ে সময় কাটিয়েছেন তিনি। ফলে স্যার চলাফেরা করার শক্তি একেবারেই হারিয়ে। ইতোমধ্যে ধানমন্ডিতে স্যারের ফ্ল্যাটের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর ছেলে খোকন এবং পুত্রবধূ শারমিন ঠিক করলেন, স্যারকে ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবেন এবং সেখানেই ৮৫তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হবে। প্রথমে স্যার স্বামীবাগের বাড়ি ছেড়ে আসতে রাজি ছিলেন না। ২২ জুন ২০০৭ সালে অ্যাম্বুলেন্সে করে স্যারকে ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে (পাঁচতলায়) নিয়ে আসা হয়। ২৩ জুন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তাঁর ফ্ল্যাটেই ৮৫তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিবরিয়া স্যার অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ অবস্থাতেই  কিবরিয়া স্যারকে নিয়ে আসেন মাহমুদ স্যার। চারুকলা ইনস্টিটিউটে ছাপচিত্র বিভাগে সফিউদ্দীন ও কিবরিয়া স্যার দীর্ঘকাল একসঙ্গে কাটিয়েছেন। দুজনই পাশাপাশি বসতেন। দুজনই দুজনকে খুব শ্রদ্ধা ও সম্মান করতেন। সফি স্যার কিবরিয়া স্যারকে কাছে পেয়ে খুবই আপ্লুত হয়ে পড়েন। সফি স্যার বরাবরই সংগীত, বিশেষত ধ্রুপদী ও রবীন্দ্রসংগীত খুব পছন্দ করতেন। তাঁর সংগ্রহে প্রচুর এল পি রেকর্ড ছিল। জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তাঁর প্রিয় শিল্পী শামা রহমান, অদিতি মহসিন ও লুভা নাহিদ চৌধুরী গান গেয়ে শোনান।

ধানমন্ডিতে আসার পর আমাদের সবারই আশা ছিল ভালো সেবা-যত্ন এবং ফিজিওথেরাপি নিলে স্যার আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন, চলাফেরা করতে পারবেন। এর মধ্যে একদিন কাইয়ুম স্যার ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান ফিজিওথেরাপিস্ট কেরালার মি. মানিককে সঙ্গে নিয়ে স্যারের বাসায় এলেন। তাঁকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখলেন, তাঁকে দাঁড় করিয়ে হাঁটানোর চেষ্টা করা হলো। ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী খুবই আশাবাদী হয়ে বললেন, ঠিকমতো ফিজিওথেরাপি নিলে আগামী তিন মাসের ভেতর তিনি ভালো হয়ে যাবেন এবং নিজে নিজেই হাঁটতে পারবেন। আমরা সবাই আশান্বিত হলাম। স্যারের মুখমন্ডলেও খুশি ও আশার ছাপ দেখতে পেলাম। তিনি কয়েকবার উচ্চারণ করলেন, ‘আপনারা বলছেন আমি আবার হাঁটতে পারবো – আমি আবার হাঁটতে পারবো।’ গণস্বাস্থ্যের ফিজিওথেরাপিস্ট কয়েকদিন বাসায় এসে স্যারকে ফিজিওথেরাপি দিলেন। এরপর প্রতি সপ্তাহে দু-একদিন করে তাঁকে ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নগর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হলো। কিন্তু কেন জানি না মাঝপথে একসময়ে ফিজিওথেরাপি প্রদানের বিষয়টি অনিয়মিত হয়ে যায়। ফলে স্যারের শারীরিক অবস্থার বিশেষ কোনো উন্নতি লক্ষ করা যায়নি।

২০০৭-এর সেপ্টেম্বর মাসে জাপানের ফুকুওকা সিটি থেকে ফুকুওকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামের একজন কিউরেটর ঢাকায় আসেন মিউজিয়ামের স্থায়ী সংগ্রহে বাংলাদেশের প্রধান শিল্পীদের চিত্রকর্ম নেওয়ার জন্যে। ফুকুওকা মিউজিয়াম থেকে আমাকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। শিল্পী জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ প্রধান শিল্পীর পেইন্টিংয়ের ইমেজ সংগ্রহ করা হবে। ভয় ছিল সফিউদ্দীন স্যার ছবি দিতে রাজি হবেন কি না। ফুকুওকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামের নাম শুনে একবারেই তিনি রাজি হয়ে যান। ফুকুওকা মিউজিয়ামের কিউরেটর তাঁর পছন্দমতো পেইন্টিংয়ের ডিজিটাল ইমেজ সঙ্গে করে নিয়ে যান। তিন সপ্তাহের ভেতরই ফুকুওকা থেকে মেইল আসে, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন স্যার, কিবরিয়া স্যার, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম স্যার ও রশিদ চৌধুরীর চিত্রকর্ম ফুকুওকায় স্থায়ী সংগ্রহের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। সফিউদ্দীন স্যার সাধারণত ছবি বিক্রি করতে কিংবা কাউকে দিতে চান না। মিউজিয়ামে সংগ্রহে স্থায়ীভাবে থাকবে, তাই তিনি রাজি হলেন। তাঁর ‘LEMONA DE STAND-2’ শীর্ষক ১৯৮৮ সালে অাঁকা তেলরং চিত্রটি ফুকুওকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়াম ২০ হাজার মার্কিন ডলারে সংগ্রহ করে।

আবারো স্যারকে অনুরোধ জানালাম একক প্রদর্শনীর জন্য। তাঁর একই কথা ‘আমার আরো অনেক কাজ করার আছে। আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি।’ তাঁকে জোর দিয়ে বললাম, ‘স্যার বিক্ষিপ্তভাবে আপনার কয়েকটি কাজ ছাড়া আপনার সমগ্র কাজ দেখার সুযোগ কারোরই হয়নি। আপনি কেন দেশবাসীকে, সুধীজনকে, শিল্পীদেরকে আপনার সামগ্রিক কাজ দেখা থেকে বঞ্চিত করবেন।’ এরপর তিনি হ্যাঁ বা না কিছুই বললেন না।

ছেলে খোকন ও পুত্রবধূ শারমিনকে বললাম, এবার তোমরা দুজন স্যারকে একটু বুঝিয়ে বললেই স্যার রাজি হয়ে যাবেন। পরের দিন সকালে খোকন আমাকে ফোন করে জানালো, তিনি প্রদর্শনী করতে রাজি হয়েছেন।

সঙ্গে সঙ্গেই ঠিক করে ফেললাম ২৩ জুন ২০০৮ স্যারের ৮৬তম জন্মবার্ষিকীতে ৮৬টি চিত্রকর্ম দিয়ে বাংলাদেশে স্যারের প্রথম একক প্রদর্শনীটি আয়োজিত হবে। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করা হলো তাঁর আরেক স্নেহভাজন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক এই প্রথম প্রদর্শনীর ব্রোশিওরের জন্য লিখবেন। আজিজুল হক সানন্দে রাজি হলেন। পরপর কয়েকদিন স্যারের সঙ্গে আলাপ করলেন। খোকন জানালো, বাসায় ড্রইং, প্রিন্টস, জলরং, তেলরং সব মিলিয়ে স্যারের মোট কাজের সংখ্যা হবে চার শতাধিক। শিল্পকলা একাডেমীর বইটি প্রকাশকালে তাঁর দুই শতাধিক কাজের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এখন চার শতাধিক কাজের বিশাল ভান্ডারের সন্ধান পাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবেই ঠিক করা হলো সকল কাজের ডিজিটাল ফটোগ্রাফ তোলা হবে এবং সকল কাজ নিয়ে বড় আকারের একটি বই বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশ করা হবে। আজিজুল হক বইয়ের পান্ডুলিপি প্রস্ত্তত করবেন। আলোকচিত্রী ইন্দ্রনীলকে দায়িত্ব দেওয়া হলো চিত্রকর্মের ছবি তোলার। প্রায় দুই মাস সময় নিয়ে ইন্দ্রনীল চার শতাধিক চিত্রকর্মের ডিজিটাল ছবি তোলার কাজ শেষ করলেন।

ইতোমধ্যে স্যার বললেন, প্রথম প্রদর্শনীটি শুধুমাত্র ড্রইংয়ের হবে। কিছুটা হোঁচট খেলাম। তিনি যদি আবার বেঁকে বসেন তাই শুধু ড্রইংয়ের প্রদর্শনীতেই রাজি হয়ে গেলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়েই স্যার একে একে তাঁর প্রায় দুই শতাধিক ড্রইং থেকে ৮৬টি ড্রইং প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচন করেন। সঙ্গে ছিলেন ছেলে খোকন এবং সৈয়দ আজিজুল হক। ১৯৪৫ সালের ড্রইং ‘শান্তিনিকেতনের দৃশ্যপট’ থেকে শুরু করে শেষ ছবি ২০০৮ সালে চারকোল ও ক্রেয়ন দিয়ে আঁকা ‘মুরগিশূন্য খাঁচা’ প্রদর্শনীর জন্য বাছাই করা হয়।

দেশের শিল্পীমহলে তথা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা, বেঙ্গল গ্যালারিতে শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। এটি এদেশের শিল্পকলা অঙ্গনের জন্য এক  ঐতিহাসিক ঘটনা। সৈয়দ আজিজুল হক প্রদর্শনীর নাম দিলেন ‘রেখার অশেষ আলো’।

২৩ জুন ২০০৮ সন্ধ্যায় বেঙ্গল শিল্পালয়ে ৮৬তম জন্মবার্ষিকীতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। অসুস্থতার কারণে স্যার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। তবে প্রদর্শনী উদ্বোধনের পরপরই বিচারপতি হাবিবুর রহমান, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের প্রমুখ ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে গিয়ে স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। গুণিজন সে-সময় তাঁর ভেতর চরম উত্তেজনা লক্ষ করা যায়। স্যার সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্রদর্শনী কেমন হয়েছে … খারাপ বলবে না তো … সবাই ভালোভাবে নেবে তো -।’ সবাই তাঁকে আশ্বস্ত করলেন, অভিনন্দন জানালেন সুন্দর একটি প্রদর্শনী দেশবাসীকে উপহার দেওয়ার জন্য।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী দিনে আসতে না পারলেও শেষদিন ফাঁকি দিয়ে তাঁকে গ্যালারিতে নিয়ে আসেন পুত্রবধূ নাহিদা শারমিন। দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে তিনি প্রদর্শনীর সব ছবি ঘুরে ঘুরে দেখেন। দেশে জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনী দেখে তিনি আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন।

এদিকে আজিজুল হক প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দু-একদিন করে স্যারের কাছে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে বইয়ের জন্য তথ্য উপাদান সংগ্রহ করেন। প্রায় প্রতিটি চিত্রকর্ম নিয়েই আজিজুল হক তাঁর সঙ্গে বিশেষভাবে আলোচনা করে নোট নেন। চার শতাধিক চিত্রকর্ম নিয়ে আলোচনা করতেই দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়।

ইতোমধ্যে কলকাতার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেন্টার স্যারের ড্রইংয়ের প্রদর্শনী আয়োজনের ইচ্ছা প্রকাশ করে। ২০০৯-এর ১৫ মার্চ থেকে আই সি সি আর কলকাতা এবং বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টসের যৌথ উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেন্টারের যামিনী রায় গ্যালারিতে ড্রইংয়ের প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। ঢাকার প্রদর্শনীর ৮৬টি ড্রইং থেকে বাছাই করা ৫৬টি ড্রইং কলকাতায় প্রদর্শিত হয়।

সফিউদ্দীন স্যারের জন্ম হয়েছিল কলকাতার ভবানীপুরে নন্দন সড়কের বেচু ডাক্তার লেনের পৈতৃক বসতভিটায় ১৯২২ সালে। বেচু ডাক্তার ছিলেন তাঁর দাদা। স্যার ১৯৩৬-৪২ কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে অধ্যয়ন করেন এবং এরপর ১৯৪৬ থেকে ’৪৭-এর দেশ বিভাগের সময় পর্যন্ত একই আর্ট স্কুলে শিক্ষকতা করেন। কলকাতায় তাঁর ড্রইং প্রদর্শনীতে কলকাতা পর্বের বেশ কিছু কাজ ছিল। কলকাতার প্রদর্শনী স্থানীয় শিল্পী ও সুধী মহলে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়। কলকাতার প্রদর্শনী উপলক্ষে সৈয়দ আজিজুল হক, স্যারের পুত্রবধূ নাহিদা শারমিন ও আমি কলকাতায় যাই।

প্রদর্শনী উদ্বোধনের পরদিনই শারমিনের আগ্রহে ভবানীপুরে যাই স্যারের জন্মভিটার সন্ধানে। অনেক অলিগলি ঘুরতে থাকি। তাঁর দাদা বেচু ডাক্তার ছিলেন এই এলাকার নামকরা ডাক্তার। বেচু ডাক্তার এখনো ওই এলাকায় বেশ পরিচিত। বেচু ডাক্তারের নাম বলতেই কয়েকজন আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেলেন বেচু ডাক্তার লেনে। অবশেষে আমরা সফি স্যারের জন্মভিটা জরাজীর্ণ দোতলা ভবনের সন্ধান পেলাম। স্যারের কাছে শারমিন বাড়ির যে-বর্ণনা শুনেছিলেন তার সঙ্গে মিলিয়ে আমরা মোটামুটি নিশ্চিত হলাম, বেচু ডাক্তার লেনের প্রথম বাড়িটিতেই আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে তাঁর জন্ম হয়েছিল। নিচতলা ও দোতলায় এখন কয়েকটি পরিবার বসবাস করছেন। ১৯৪৭-এ স্যার এ-বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময়ে যেরকম ছিল এখনও ঠিক সেরকমই রয়েছে। এই দীর্ঘ সময় বাড়িটিতে বিশেষ কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। পরে ঢাকায় ফিরে স্যারকে বাড়িটির ছবি ও ভিডিও দেখানো হলে তিনি নিশ্চিত করেন এ-বাড়িতেই তাঁর জন্ম হয়েছে এবং শৈশব ও কৈশোরকাল কেটেছে।

কলকাতার প্রদর্শনীশেষে এবার স্যারকে বললাম, ২০১০-এর ২৩ জুন ৮৮তম জন্মবার্ষিকীতে সকল কাজ নিয়ে রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনীর আয়োজন করবো। প্রদর্শনী একই সঙ্গে বেঙ্গল গ্যালারি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর গ্যালারি বা জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে আয়োজিত হবে। স্যার রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনীতে এবার সত্যি সত্যি সম্মত হলেন। তিনি  নিজেই বুঝতে পারছিলেন যে, ‘আর পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে – আর ছবি অাঁকতে – পারবেন না।’ জুন মাসে খারাপ আবহাওয়ার কথা চিন্তা করে নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্রদর্শনী আয়োজন করার সম্ভাব্য সময় ঠিক করা হলো। প্রদর্শনীর জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এবং জাতীয় জাদুঘরের প্রদর্শনী গ্যালারি বুক করে রাখা হলো (যে-কোনো একটি গ্যালারি ব্যবহার করা হবে)। শারমিন ঠিক করলেন ২০১০-এর ২৩ জুন স্যারের ৮৮তম জন্মবার্ষিকী সাভারে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের বংশীবাড়িতে উদযাপন করা হবে। স্যারকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হবে। ইফ্ফাত আরা দেওয়ান গান গাইবেন। সকল প্রস্ত্ততিই সম্পন্ন করা হলো। ২৩ জুন বিকেলে স্যার বেঁকে বসলেন। কোনোভাবেই তিনি বাড়ির বাইরে যেতে রাজি হলেন না। অবশেষে সকল আয়োজন বাড়িতেই করা হলো।

প্রদর্শনীর বিষয়ে হঠাৎ একসময় স্যার আবার বেঁকে বসলেন। বললেন, শিল্পকলা একাডেমী বা জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে প্রদর্শনী করবেন না। শুধু বেঙ্গল শিল্পালয়ের গ্যালারিতেই প্রদর্শনী আয়োজন করতে হবে। আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম, বেঙ্গলে সকল চিত্রকর্মের স্থান সংকুলান হবে না। কী করা যায়? স্যারের সিদ্ধান্তের বাইরেও যাওয়া যাবে না। অবশেষে অনেক চিন্তা-ভাবনার পর প্রদর্শনীটি দুই পর্বে করার সিন্ধান্ত হলো।

সফিউদ্দীন স্যারের সৃষ্টিসমগ্র (retrospective) নিয়ে ২০১০-এর ২৬ নভেম্বর থেকে ৯ ডিসেম্বর প্রথম পর্বে শুধুমাত্র ছাপচিত্র এবং ১০ থেকে ২৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় পর্বে ড্রইং, জলরং ও তেলরংচিত্র প্রদর্শিত হয়। প্রথম পর্বের প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং দ্বিতীয় পর্বের প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম।

২০০৮-এ বাংলাদেশে সফিউদ্দীন স্যারের প্রথম প্রদর্শনী হিসেবে শুধুমাত্র ড্রইংয়ের প্রদর্শনী আয়োজনের পর এবার দুই পর্বে সকল মাধ্যমের নির্বাচিত কাজের প্রদর্শনী আয়োজন সত্যিকারভাবেই বাংলাদেশের শিল্পকলাজগতে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা। স্যারের চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ড্রইং, ছাপচিত্র, জলরং ও তেলরঙের কাজগুলো দেখার সুযোগ পাওয়া আমাদের সকলের জন্যই, বিশেষ করে তরুণ শিল্পী ও চারুকলার শিক্ষার্থীদের জন্য, ছিল এক দুর্লভ প্রাপ্তি। শারীরিক অবস্থা ভালো না থাকায় স্যারকে কোনোভাবেই বেঙ্গলে এ দুটি প্রদর্শনীতে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।

ইতোমধ্যে সৈয়দ আজিজুল হক বইয়ের পান্ডুলিপির কাজ শেষ করেন। চার শতাধিক চিত্রকর্মের ডিজিটাল ছবি তোলার কাজ আগেই শেষ হয়েছিল। সফিউদ্দীন স্যারের ওপর ৪০০ পৃষ্ঠার আন্তর্জাতিক মানের একটি গ্রন্থ মুদ্রণের প্রস্ত্ততি পর্বের কাজ প্রায় শেষ।

ঢাকার ভালো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের খোঁজখবর করা হচ্ছে। ঠিক এই সময় দেবদূতের মতো ইতালির একটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা ‘স্কিরা’র ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন এডিটর মিজ রোজা মারিয়া ফালভো ঢাকায় আসেন। ‘স্কিরা’ বাংলাদেশের শিল্পকলা-বিষয়ক প্রকাশনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। এ-বিষয়ে স্কিরার পক্ষে মিজ রোজার সঙ্গে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। এরই পরিপ্রক্ষিতে ৬ মার্চ ২০১১-য় যৌথ প্রকাশনার বিষয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা স্কিরার সঙ্গে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ১০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তিপত্র সম্পাদিত হয়।

দশ বছর মেয়াদি এ-কার্যক্রমের আওতায় প্রথমবারের মতো দেশবরেণ্য শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে বিশ্বমানের বই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে। এই বইগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতরণ করবে আন্তর্জাতিক পুস্তক পরিবেশক ’রিৎজোলি’ (Rizzoli) এবং ‘টেমস অ্যান্ড হাডসন’ (Thames & Hudson)। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও স্কিরার যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত গ্রন্থাবলি বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশের শিল্প ও শিল্পী সম্পর্কে একটি ধারণা জন্মাবে বিশ্ববাসীর মাঝে, যা এদেশের শিল্প ও শিল্পীর ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরো গতিশীল ও মহিমান্বিত করার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করবে।

গ্রন্থের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার জন্যে ইতালির মিলানে স্কিরার ব্যবস্থাপনায় মুদ্রণের কাজ সমাপ্ত করা হবে। ইতালির প্রকাশনা সংস্থা স্কিরার সঙ্গে প্রথমেই একটি আলোকচিত্র ও দুটি চারুকলাবিষয়ক বই হাতে নেওয়া হয়। চারুকলাবিষয়ক প্রথম বইটির নাম গ্রেটমাস্টার্স অব বাংলাদেশ : সফিউদ্দীন আহমেদ এবং দ্বিতীয় বইটির নাম কনটেম্পরারি মাস্টার্স অব বাংলাদেশ : কাজী গিয়াসউদ্দীন।

সফিউদ্দীন স্যারের ওপর সৈয়দ আজিজুল হকের বাংলা লেখাটি দ্রুত ইংরেজি অনুবাদ করানো হয়। এছাড়া গ্রন্থে আবুল হাসনাতের নেওয়া সফিউদ্দীন স্যারের সাক্ষাৎকার এবং অধ্যাপক কায়সার হকের সফিউদ্দীন স্যারের কলকাতা পর্বের কাজের ওপর বিশ্লেষণমূলক ছোট একটি লেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গ্রন্থের লেখা এবং পেইন্টিংয়ের ডিজিটাল ইমেজ মিলানে পাঠানো হয়। উল্লেখ্য, গ্রন্থের বুক  ডিজাইন, মুদ্রণ, বাঁধাই ইত্যাদি সব কাজই সম্পন্ন হবে ইতালির মিলানে স্কিরার তত্ত্বাবধানে। স্কিরার ডিজাইন শাখা থেকে জানানো হয় যে, সফিউদ্দীন স্যারের পেইন্টিংয়ের যে-ইমেজ (১০ মেগাপিক্সেল – megapixel) পাঠানো হয়েছে সেগুলো মানসম্মত উন্নত ছাপার উপযোগী নয়। ন্যূনতম ৪০ মেগাপিক্সেল রেজুলুশনে পেইন্টিংগুলোর ছবি তুলতে হবে। আবার হোঁচট খেতে হলো। ঢাকায় সম্ভবত দৃক পিকচার গ্যালারির কাছে ৪০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা রয়েছে। ছবি তোলার বিষয়ে দৃকের সঙ্গে আলাপ করা হলো। দৃকের মাধ্যমে প্রায় ৪০০টি চিত্রকর্মের ৪০ মেগাপিক্সেলের এ-ছবি তোলার কাজটি ছিল খুবই ব্যয়বহুল। হিসাব করে দেখা গেল, দৃকের মাধ্যমে ছবি তোলার যে-ব্যয় হবে তা দিয়ে ৪০ মেগাপিক্সেলের নতুন ক্যামেরা ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনা যাবে। আলোকচিত্রী ডা. শহিদুল আলম এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ডিজাইনার আর এ কে রিপনের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত সিঙ্গাপুর থেকে ৪০ মেগাপিক্সেলের Hasselblad ক্যামেরা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম আনা হলো। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের রিপনকেই দায়িত্ব দেওয়া হলো ব্যয়বহুল এই ক্যামেরা হ্যান্ডল করার। সফিউদ্দীন স্যারের প্রায় সকল চিত্রকর্মই প্রদর্শনীর জন্যে ফ্রেম করা হয়েছিল। আবার তাঁর বাসায় স্টুডিও স্থাপন করে চিত্রকর্মগুলোর গ্লাসফ্রেম খুলে ছবি তোলার কাজ বেশ কয়েকদিন সময় নিয়ে সম্পন্ন করা হয়।

সবসময়েই আমাদের চেষ্টা ছিল সফিউদ্দীন স্যার যেন তাঁর বইটি দেখে যেতে পারেন। বইয়ের মুদ্রণকাজের বিষয়ে স্কিরার মিজ রোজা মারিয়ার সঙ্গে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে কাজের সমন্বয় করেন। এর মধ্যে ডিজাইনার রিপনও মিলানে গিয়ে মুদ্রণ কাজের অগ্রগতি তদারক করে আসেন। অবশেষে ডিসেম্বর ২০১১-এ বইটির মুদ্রণ কাজ শেষ হয়। জানুয়ারি ২০১২-এ কয়েকটি বই আমাদের হাতে এসে পৌঁছে। বই হাতে পেয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়েরসহ আমরা সবাই ভীষণ উত্তেজনা অনুভব করি। এই প্রথম বাংলাদেশ থেকে কোনো একক শিল্পী সম্পর্কে পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানের একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হলো। বইটি প্রকাশের জন্য সম্মিলিতভাবে একটি টিম কাজ করেছে। সকলেই প্রশংসার দাবিদার। তবে সবচেয়ে বেশি যার প্রশংসা করতে হয় তিনি হলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বইটির প্রকাশক আবুল খায়ের। তাঁর সমর্থন না পেলে এই ব্যয়বহুল প্রকাশনার কাজটি করা কখনই সম্ভব হতো না।

৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২ গ্রেট মাস্টার্স অব বাংলাদেশ : সফিউদ্দীন আহমেদ শীর্ষক বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের দিন ঠিক হলো। প্রকাশনা অনুষ্ঠানের পূর্বেই সফিউদ্দীন স্যারকে বইটি দেখানো দরকার। ঠিক হলো ৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তাঁর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বইটি তুলে দেওয়া হবে।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, মাহমুদুল হক, মনিরুল ইসলাম, আবুল বারক আলভী এবং সমালোচক আবুল হাসনাত ও সৈয়দ আজিজুল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদের হাতে বইটি তুলে দিলেন। একটি একটি করে পাতা উলটিয়ে পুরো বইটি তাঁকে দেখানো হলো।  তিনি বইটি হাতে পেয়ে খুশিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আবুল খায়েরের হাত ধরে তাঁকে উদ্দেশ করে সফি স্যার বারবার উচ্চারণ করলেন, ‘আপনি মহান – কী করে পারলেন এই কাজটি করতে, আর তো কেউ পারল না, শুধু আপনিই পারলেন -।’

৪ ফেব্রুয়ারি স্যার যেভাবে বড় বড় চোখে সবার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখনই মনে হয়েছে স্যারের সময় বুঝি শেষ হয়ে আসছে। আমার দেখা শিল্পী-সাহিত্যিক অনেককেই চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কেন জানি না শিল্পগুরু সফিউদ্দীন স্যারকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে সরকারিভাবে বা পারিবারিকভাবে বা সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে কখনই কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সবসময়েই আমাদের বিশ্বাস ছিল, যদি তাঁকে সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হতো তাহলে হয়তো তিনি আবার সুস্থ হয়ে উঠতেন, আবার ছবি অাঁকতে পারতেন।

৪ ফেব্রুয়ারির পর কাজের ব্যস্ততার দরুন স্যারকে আর দেখতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মাঝে কয়েকদিন শারমিন ফোন করেছিলেন বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানের ভিডিওর জন্য – স্যারকে দেখাবেন। এডিটিং না হওয়ার কারণে ভিডিওর কপি শারমিনকে দেওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে ৯ বা ১১ মে হঠাৎ শারমিনের ফোন পেলাম। বললেন, স্যারের অবস্থা খুব ভালো মনে হচ্ছে না – একবার কাইয়ুম স্যারকে সঙ্গে নিয়ে এসে যেন দেখে যাই। তাৎক্ষণিক আমি কাইয়ুম স্যারকে জানালাম। ওইদিন আর যাওয়া হলো না। সম্ভবত ১২ মে সন্ধ্যার পর কাইয়ুম স্যার ও তাহেরা ভাবিকে সঙ্গে নিয়ে আমি স্যারকে দেখতে গেলাম। তিনি এক-কাত হয়ে শুয়ে আছেন, আধা তন্দ্রাচ্ছন্ন। শারমিন তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন, বাবা, কাইয়ুম স্যার এসেছেন, সুবীরদা এসেছেন। স্যার চোখ মেলে তাকালেন। একটা হাত একটু ওঠালেন। হাত চেপে ধরলাম। কাইয়ুম স্যার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। অন্য সময় এলে স্যার যেভাবে কথা বলতেন, আজ কোনো কথাও বলতে পারলেন না। শুধু দু-একটা শব্দ উচ্চারণ বললেন। ঠিক বোঝা গেল না কী বলতে চাচ্ছিলেন। মনে হলো, তাঁর সমস্ত শরীরটাই বিছানার সঙ্গে মিশে গেছে। সত্যি তাঁকে আজ একেবারেই অন্যরকম মনে হলো। অন্য সময়ে আমরা নাস্তা খেলে তিনিও একটু-আধটু খেতেন। শারমিন জানালেন, কয়েকদিন থেকে স্যার কিছুই খেতে পারছেন না। মাঝে মাঝে তরল খাবার চামচ দিয়ে মুখে দেওয়া হচ্ছে। শারমিন জানালেন, ১৭ মে ওর ছেলের পরীক্ষা শেষ হলে স্যারকে হাসপাতালে ভর্তি করাবেন চেকআপের জন্য।

আমরা প্রায় দুই ঘণ্টা স্যারের বাসায় ছিলাম। বলতে খারাপ শোনালেও বাস্তবতা মেনে ফেরার সময়ে কাইয়ুম স্যারকে বললাম, আগামী ২৩ জুন নববইতম জন্মবার্ষিকীতে বোধহয় এবার স্যারকে আমরা পাবো না। স্যারের কবরের জন্যে ভালো একটা জায়গা এখনই দেখা দরকার। কিবরিয়া স্যারের কবরের জন্যে ভালো জায়গা পাওয়া যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল সমাধি কমপ্লেক্সে কামরুল হাসানের কবরের পাশের খালি জায়গাটা যদি সফি স্যারের জন্য পাওয়া যায় তাহলে খুব ভালো হবে। আগরতলা থেকে ফিরেই ভিসির সঙ্গে কথা বলতে হবে। কাইয়ুম স্যার আমার কথায় সায় দিলেন। ১৪ মে পাঁচদিনের জন্য ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়েল আমন্ত্রণে ৩০ সদস্যের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল নিয়ে আগরতলা রওনা হলাম। সঙ্গে ছিলেন কাইয়ুম স্যার, নবী স্যার, মাহমুদুল হক স্যার, তাহেরা ভাবি, হাসনাত ভাই প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ অনুষ্ঠানের জন্যে আমাদের আগরতলায় যাওয়া।

১৬ মে সকালে ঢাকা থেকে লুভা নাহিদ চৌধুরীর ফোন পেয়ে জানলাম, আগের দিন (১৫ মে) সন্ধ্যায় সফিউদ্দীন স্যারকে  স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শারমিন আমার খোঁজ করছেন, আমি যেন শারমিনের সঙ্গে কথা বলি। বুঝতে আর বাকি রইলো না, স্যারের অবস্থা মোটেই ভালো নেই। সেই সময়েই কিবরিয়া স্যারের কথা মনে হলো। কিবরিয়া স্যারের মৃত্যুর সময়ে আমি দেশের বাইরে ছিলাম। তাঁকে আমার শেষবারের মতো দেখা হয়নি।

তাঁর শারীরিক অবস্থা যে আশঙ্কাজনক সে-কথা কাইয়ুম স্যার, নবী স্যারসহ সবাইকে জানালাম। তিনি যে স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর মুখোমুখি সে-কথাও জানালাম। সবাই স্যারের জন্যে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। দুপুরেই শারমিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হলো। বললাম, শুক্রবার আমরা ফিরছি। আমরা আসা পর্যন্ত স্যারকে সামলে রাখুন। ১৬ মে রাতে ঢাকা থেকে খবর পেলাম, ওঁর অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। আই সি সি ইউতে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।

শারমিনকে রাতেই টেলিফোনে বললাম, স্যার যদি চলে যান তবু শুক্রবার আমরা ঢাকায় পৌঁছার আগে পর্যন্ত লাইফ সাপোর্ট খুলবেন না। শিল্পগুরুকে নিয়ে আমাদের অন্যরকম চিন্তা আছে। ঢাকায় ফেরার পর আমাদের দুদিন সময় পেতে হবে। শিল্পীদের বিশেষ করে চিত্রশিল্পীদের খুবই আপনজন পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েসকে ফোনে ওঁর শারীরিক অবস্থার কথা জানালাম। তাঁকে বললাম, সফিউদ্দীন স্যারের মৃত্যুর পর তাঁর দাফনের জন্য আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কামরুল হাসান ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কবরের পাশের জায়গা পেতে চাই। আপনি শিক্ষা সচিব কবি কামাল চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে রাখুন। আমরা শুক্রবার ঢাকায় ফিরেই এ-বিষয়ে উদ্যোগ নেব। আমার এই উদ্যোগের কথা শুনে আগরতলাতেও অনেকে সংশয় প্রকাশ করে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনোভাবেই কবরের জন্য জায়গা পাওয়া যাবে না। সফি স্যারের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ এবং তাঁর অবদানের কথা মনে করেই কেন জানি না আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, তাঁর জন্যে ওই জায়গা অবশ্যই পাওয়া যাবে। শুধু যথার্থ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ওই জায়গাটাই তাঁর সমাধির উপযুক্ত স্থান।

১৫, ১৬ ও ১৭ মে আগরতলাতে আমাদের অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানের ব্যস্ততার মাঝেও আমরা সার্বক্ষণিক ঢাকায় যোগাযোগ রাখছি – সফিউদ্দীন স্যারের সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্যে। ১৮ মে আমরা আগরতলা থেকে সরাসরি বাসে না ফিরে ঢাকায় খবর দিলাম একটি এসি বাস ভাড়া করে ভোরে বর্ডারে পাঠানোর জন্য। সরাসরি বাস আগরতলা থেকে ছেড়ে যায় দুপুরে এবং ঢাকায় পৌঁছতে রাত ৮টা-৯টা হয়ে যায়। ১৮ মে সকালেই মাইক্রোবাসে করে আগরতলা বর্ডারে পৌঁছলাম। ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় অংশের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমরা বাংলাদেশ সীমান্ত (আখাউড়া) থেকে রওনা হলাম। পথে দুপুরের খাবারের যাত্রাবিরতি দিয়ে বিকেল সাড়ে ৩টা নাগাদ আমরা ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে পৌঁছলাম। সেখান থেকে আমরা সরাসরি গেলাম স্কয়ার হাসপাতালে। হাসপাতালে নেমেই শিল্পী মনিরুজ্জামানের সঙ্গে দেখা। তাকে এক কর্নারে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চারুকলা অনুষদের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তোমার কেমন প্রভাব আছে? সফি স্যারকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কামরুল-জয়নুলের পাশে কবর দেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের সাপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে।’ মুনির বলল, ‘কোনো অসুবিধা হবে না, ছাত্রছাত্রীদের ফুল সাপোর্ট পাওয়া যাবে।’ মুনিরের কথায় আমি কিছুটা মনোবল পেলাম। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিকীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বললাম; আমরা সাক্ষাৎ করতে চাই, সময় দেওয়ার জন্যে। কাইয়ুম স্যারও কথা বললেন। ভিসি সন্ধ্যা ৬টায় আমাদের তাঁর বাসায় যেতে বললেন। আমরা চারতলায় উঠলাম। আই সি সি ইউতে  সে-সময়ে প্রবেশের সময় পার হয়ে গেছে। বিশেষ অনুমতি নিয়ে আমি ও কাইয়ুম স্যার একসঙ্গে স্যারকে দেখতে গেলাম। মনে হলো, তিনি মাঝে মাঝে চোখ খুলে আমাদের দেখছেন।

হাসপাতালে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে রওনা হলাম ভিসির বাসার দিকে। সঙ্গে সকল সংকটে আমাদের সহায় কাইয়ুম চৌধুরী, আবুল হাসনাত ও চিত্রকের মুনিরুজ্জামান। আলভী ভাইকে ফোন করা হলো ভিসির বাসায় যাওয়ার জন্য। ভিসির বাসায় আমাদের বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আলভী ভাইকে যখন আমাদের অভিপ্রায়ের কথা জানালাম, তিনি ওই জায়গা না পাওয়ার সম্ভাবনার কথাই বেশি বললেন। যা-ই হোক উপাচার্য এলেন। তাঁকে আমাদের অভিপ্রায় জানানোর পর তিনি সম্পূর্ণ পজিটিভ মনোভাব দেখালেন। আমরা তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, কীভাবে এগোলে আইনগতভাবেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও পটুয়া কামরুল হাসানের সতীর্থ শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদকে জয়নুল-কামরুলের পাশে দাফন করা যেতে পারে। ভিসি আমাদের বললেন, এ-ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি বা আচার্যই প্রধান ব্যক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে যদি আমরা লিখিয়ে আনতে পারি তাহলে তাঁর পক্ষে অনুমতি দেওয়া সহজ হবে। তিনি একই সঙ্গে চারুকলা অনুষদের একটি প্রস্তাবও তাঁকে দেওয়ার জন্যে বললেন। ভিসির বক্তব্যে আমরা আশান্বিত হলাম। আলভীভাইকে দায়িত্ব দেওয়া হলো ডিনের সঙ্গে কথা বলে আগামীকালই চারুকলা অনুষদের সভা করে প্রস্তাবগ্রহণের জন্যে। রাতেই নবী স্যার, শারমিন, খোকন ও স্যারের বড় ছেলে স্বপনকে আমাদের অগ্রগতির কথা জানালাম। হাসনাতভাইকে বললাম, পরদিন সকালে রাষ্ট্রপতি বরাবরে আবেদন করার জন্যে একটি চিঠির খসড়া তিনি যেন রাতেই প্রস্ত্তত করে দেন। ১৯ মে দুপুরের ভেতর দেশের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে লেখা পত্র চূড়ান্ত করা হলো। এর ভেতর মাঝে মাঝে খোকনের টেলিফোন আসতে লাগল যে, ডাক্তারা জানিয়েছেন যে-কোনো সময়ে স্যারের হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমি খোকনকে বললাম, যেভাবেই হোক স্যারকে আগামীকাল পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টে রাখতে হবে। আমরা তাঁকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে দাফনের জন্য যে-কাজে নেমেছি সে-কাজ সম্পন্ন করতে আগামীকাল রোববার সারাদিন সময় লেগে যাবে। হাসপাতাল থেকে বলা হলো, লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। এরই মধ্যে মুনির টেলিফোনে জানাল, যদি কিছু ঘটে যায়, তাহলে লাইফ সাপোর্ট রাখার দরকার নেই, আমরা দেহ হিমঘরে রেখে দেব।

বিকেলে প্রথমে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের স্বাক্ষর নেওয়া হলো। এরপর ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের বাসায় গিয়ে তাঁর স্বাক্ষর গ্রহণ করলাম। এরপর অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের স্বাক্ষর নেওয়া হলো। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম স্যারের কাছে শুনলাম ১৯৭৬ সালে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সমাহিত করা হয়। কেউই যখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না তখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজলের প্রস্তাব-অনুসারে কাজী নজরুল ইসলামকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে দাফন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে সেখানে দাফনে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে শিল্পী কামরুল হাসানকে দাফনে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সম্মত ছিল না। কেননা, আগেই সিদ্ধান্ত ছিল যে, আর কাউকে এই স্থানে সমাধিস্থ করার অনুমতি দেওয়া হবে না। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কর্মিবাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কবর খোঁড়া শুরু করে তখন চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কামরুল হাসানের দাফনের  বিষয়ে সম্মতি প্রদান করে।

নবী স্যারকে স্বাক্ষরের জন্য ফোন করা হলে স্যার বললেন উত্তর বাড্ডায় নবনির্মিত এথেনা গ্যালারিতে আসতে। এথেনা গ্যালারিতে যেতে যেতে রাত ৮টা হয়ে গেল। সেখানে রফিকুন নবী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরের স্বাক্ষর নেওয়া হলো। সেখান থেকে সরাসরি গেলাম কাইয়ুম চৌধুরীর বাড়িতে। কাইয়ুম স্যারের স্বাক্ষর যখন নিলাম যখন তখন প্রায় রাত ১০টা বাজে। পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েসকে ফোন করলাম। তিনি তখনো অফিসে। শেষ স্বাক্ষর হিসেবে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হলো ১০ নম্বরে। কীভাবে আগামীকাল মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দের চিঠি পৌঁছানো হবে – কায়েস ভাই ফোনে কথা বললেন শিক্ষা সচিব কামাল চৌধুরীর সঙ্গে। শিক্ষাসচিব বললেন, তিনি কুমিল্লায় থাকবেন। বললেন রাষ্ট্রপতির সচিবের সঙ্গে কথা বলতে। রাষ্ট্রপতির সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সঙ্গে কায়েস ভাই সব বিষয় জানিয়ে কথা বললেন। ২০ মে দুপুর ১২টায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব এবং আমার সাক্ষাতের সময় ঠিক হলো। তখন প্রায় রাত পৌনে ১২টা বাজে। আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বের হয়ে কিছুদূর এগিয়েছি, খোকনের ফোন পেলাম। হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে, স্যার সম্ভবত আর নেই। আমি সরাসরি চলে গেলাম স্কয়ার হাসপাতালে। তখনো লাইফ সাপোর্ট খোলা হয়নি। তখন হাসপাতালে পরিবারের কেউই ছিলেন না। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। আমি কর্তব্যরত ডাক্তারকে বললাম, তাঁর ছেলে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছবেন, আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। কায়েস ভাইকে ফোনে জানালাম বাসায় না গিয়ে হাসপাতালে আসতে। এরই মধ্যে সফিউদ্দীন স্যারের ছেলে খোকন ও পুত্রবধূ নাহিদা শারমিন হাসপাতালে চলে এসেছেন। তাঁদের উপস্থিতিতে ও সম্মতিতে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হলো। তখন রাত ১২টা ২০ মিনিট। এই সময়টাকেই শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদের মৃত্যুর সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে মুনির এবং বড় ছেলে স্বপন এসে পৌঁছালেন। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল, মৃতদেহ হিমঘরে রেখে দেওয়া হবে এবং পরের দিন অর্থাৎ ২১ মে সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। হাসপাতালে কঠোর নিয়ম, রোগী যত রাতেই মারা যাক না কেন, বকেয়া সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা না হলে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে না। মুনির গভীর রাতেই নগদ টাকা জোগাড় করে হাসপাতালের সব বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করল। এরপর স্যারের দেহ গোসল করানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্সে মোহাম্মদপুর মসজিদে নিয়ে যাওয়া হলো। গোসল শেষে মরদেহ আবার স্কয়ার হাসপাতালে এনে হিমঘরে যখন রাখা হলো তখন বাইরের আকাশ প্রায় ফর্সা হতে শুরু করেছে।

২০ মে রোববার সকাল ১১টায়ই পররাষ্ট্র সচিবের দফতরে উপস্থিত হলাম। কায়েস ভাই জানালেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় পরিবর্তিত হয়ে দুপুর ১টায় নির্ধারিত হয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টায় পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূতের বৈঠক ছিল। সেই বৈঠক শেষ হলো দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে। পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে রওনা হলাম বঙ্গভবনের উদ্দেশে। ট্রাফিক জ্যামের কারণে বঙ্গভবনে যখন পৌঁছলাম তখন দুপুর ১টা ৪০ মিনিট হবে। সরাসরি গেলাম রাষ্ট্রপতির সচিবের কক্ষে। আমাদের দেখেই সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বললেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আপনাদের জন্য আধঘণ্টা অপেক্ষা করে দুপুর দেড়টায় ভেতরে চলে গেছেন। আপনারা আগামীকাল আসুন। আমার মাথায় তো বাজ পড়ার উপক্রম। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে কায়েসভাইকে বললাম, রাষ্ট্রপতি ও আপনার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। আপনার কথা শুনলে নিশ্চয়ই ভেতরে ডাকবেন। রাষ্ট্রপতির সচিব ছিলেন কায়েস ভাইয়ের ব্যাচমেট। তিনি আমাদের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন, আচ্ছা বসুন, দেখি কী করা যায়। রাষ্ট্রপতিকে পররাষ্ট্রসচিবের আগমনের কথা জানানো হলে তিনি আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে বললেন। কিছুটা আশ্বস্ত হলাম, হয়তো আমাদের মিশন সফল হবে। রাষ্ট্রপতির সচিব বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদসংলগ্ন কাজী নজরুল সমাধি কমপ্লেক্সে শিল্পী কামরুল হাসান ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সমাধির পাশে শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদের দাফনের প্রস্তাবে শিক্ষাসচিব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতামত জানার জন্যে তাঁদের দুজনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে নিলেন। দুজনই ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। প্রায় ৩০ মিনিট পর মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাসা থেকে ডাক এলো। আমরা বাসায় ড্রইংরুমে বসলাম। রাষ্ট্রপতির সচিব বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দের আবেদনপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে গেলেন। আমরা গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর রাষ্ট্রপতির সচিব শফিউল আলম এসে বললেন, কাজ হয়ে গেছে। এখন ভেতরে যেতে পারেন। পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কুশলবিনিময় করে তাঁর হাতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন-প্রকাশিত গ্রেট মাস্টার্স অব বাংলাদেশ : সফিউদ্দীন আহমেদ শীর্ষক গ্রন্থটি প্রদান করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন শিল্পগুরুর দাফনের বিষয়ে সম্মতি প্রদানের জন্যে।

বঙ্গভবন থেকেই খোকন এবং মুনিরকে টেলিফোনে জানালাম যে, মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি যাতে এখনই কাউকে না জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির সচিব মহোদয় নিজ হাতে চিঠির খসড়া তৈরি করে তাঁর কম্পিউটারে কম্পোজ করালেন এবং দ্রুত আমাদের দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তখন ঘড়িতে ৩টার বেশি বাজে। কারোই দুপুরের খাওয়া হয়নি। মিজারুল কায়েস বরাবরই ভোজনবিলাসী। তিনি সচিবকে বললেন, বঙ্গভবন থেকে কি আমাদের না খাইয়েই বিদায় করবেন? সচিব মহোদয় একটু লজ্জা পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ড্রাইভার পাঠালেন খাবার আনার জন্য। মধ্যাহ্নভোজশেষে রাষ্ট্রপতির সম্মতিসূচক চিঠি হাতে নিয়ে বঙ্গভবন ত্যাগ করলাম। কায়েসভাই চলে গেলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। আমি সরাসরি উপাচার্যের দফতরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যকে লেখা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ২০ মে ২০১২ তারিখের চিঠিতে উল্লেখ ছিল :

বিষয় : শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমদেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি কমপ্লেক্সে দাফনে সম্মতি।

 

উল্লিখিত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষে প্রফেসর আনিসুজ্জামানসহ ১০ জনের আবেদন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি সমীপে উপস্থাপিত হলে তিনি ‘বিধি অনুসারে আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালন সাপেক্ষে দাফনে সম্মতি দেয়া হলো’ মর্মে সানুগ্রহ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

২। উক্ত সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি কমপ্লেক্সে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শিল্পী কামরুল হাসানের কবরের পাশে দাফনের পরবর্তী আশু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদনের প্রতিলিপি এ-সঙ্গে প্রেরিত হলো।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের পত্র হাতে পেয়ে উপাচার্য মহোদয় বললেন, ভালো একটি কাজ আপনারা করলেন। বাকিটা আমি দেখছি। চতুর্দিক থেকে সবাই জানতে চাচ্ছিল সফিউদ্দীন স্যারকে কোথায় দাফন করা হবে। কিন্তু ২০ তারিখে আমরা দাফনের স্থান সম্পর্কে জানাইনি। শুধু বলেছি, উপযুক্ত সম্মানজনক জায়গার চেষ্টা করা হচ্ছে। সন্ধ্যার পর মুনির এবং আলভীভাই গেলেন সরেজমিন দাফনের স্থান দেখার জন্যে। কিছুক্ষণ পর মুনির আমাকে টেলিফোনে জানাল যে, কামরুল হাসানের কবরের পাশে খালি জায়গায় কংক্রিটের ঢালাই করে সিরামিক ইটের সোলিং করা হয়েছে। কোনোভাবেই এখানে কবর খোঁড়া সম্ভব হবে না।

ঘাটে তরি ভেড়ার পর নৌকাডুবির মতো অবস্থা। আমি মুনির ও আলভী ভাইকে অপেক্ষা করতে বলে দ্রুত সেখানে পৌঁছলাম। কাজী নজরুলের সমাধি কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হওয়ার পর আমার সেখানে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সম্পূর্ণ জায়গাই সিরামিক ইটে ঢাকা। জয়নুল আবেদিনের কবরের পর সীমানা প্রাচীর পর্যন্ত কিছু অংশে কংক্রিট বা ইটের সোলিং নেই। অবশেষে জয়নুল আবেদিনের কবরের পর সীমানা প্রাচীর বরাবর খালি অংশ সফিউদ্দীন স্যারকে দাফনের জন্যে স্থান চূড়ান্ত করা হলো।

উপাচার্য ২০ মে রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের জরুরি সভা আহবান করে সফিউদ্দীন স্যারকে দাফনের বিষয়টি অনুমোদন করিয়ে নিলেন। সিন্ডিকেটের একজন সদস্য ফোনে জানালেন, এখন আপনাদের কংক্রিট ভেঙেও কবর খুঁড়তে কোনো বাধা নেই। আমরা কোনো ঝামেলায় না গিয়ে খালি জায়গাটাই শ্রেয় মনে করলাম।

২১ মে সকাল সাড়ে ৮টায় স্যারের মরদেহ ধানমন্ডি বাসভবনে (পুরনো চিত্রক) নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আত্মীয়স্বজন শেষবারের মতো স্যারকে শ্রদ্ধা জানালেন। তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ এলেন শ্রদ্ধা জানাতে। তিনি স্যারের দুই ছেলের সঙ্গে কথা বললেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে স্যারের চিত্রকর্ম সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিলেন। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরীও এলেন ধানমন্ডির বাসায় স্যারকে শেষবারের মতো দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে। লুভা নাহিদ চৌধুরী একজন ভালো স্থপতি। তাঁকে দেখেই বললাম, এখনই আমার সঙ্গে চলুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি কমপ্লেক্সে। সফি স্যারের কবরের জায়গার বিষয়ে আপনার পরামর্শ প্রয়োজন। লুভা কবরের জায়গাটি দেখে ফিতা নিয়ে মাপজোখ করলেন এবং কবরটি যাতে কামরুল হাসান ও শিল্পাচার্যের কবরের সমান্তরাল এবং একই ডিজাইনের হতে পারে, সে-অনুযায়ী কবর খোঁড়ার জন্য স্থান চিহ্নিত করে দিলেন। এর মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম সমাধি কমপ্লেক্সের স্থপতির সঙ্গেও কথা বলে নেওয়া হলো।

ধানমন্ডির বাসভবন থেকে সফিউদ্দীন স্যারকে সকাল ১০টায় নেওয়া হলো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য।

সফিউদ্দীন স্যারের শিক্ষাজীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে শাহবাগের চারুকলা ইনস্টিটিউটে – বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। চারুকলার শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য দুপুর ১২টায় শহীদ মিনার থেকে স্যারের মরদেহ নিয়ে আসা হয় চারুকলা অনুষদপ্রাঙ্গণে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ ও জানাজা শেষে স্যারের দেহ নিয়ে আসা হয় বহু-প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদসংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি কমপ্লেক্সে। সেখানে শিল্পগুরু সফিউদ্দীনকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, হাশেম খান, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, মাহমুদুল হকসহ তাঁর অসংখ্য ছাত্র এবং চারুকলা শিক্ষালয়সহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে এদেশে প্রথম আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রধান ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান ও শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদ। ছাপচিত্রের শিক্ষক হিসেবে আর্ট ইনস্টিটিউটের যে-কক্ষটিতে সফিউদ্দীন বসতেন, সেখান থেকে মাত্র ৫০-৬০ ফুট দূরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শিল্পী কামরুল হাসানের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি কমপ্লেক্সে শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার অনুমতি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান শিল্পগুরুর প্রতি যে-সম্মান প্রদর্শন করেছেন সেজন্যে জাতি তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

আমরা আরো কৃতজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, রাষ্ট্রপতির সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, শিক্ষাসচিব ও কবি কামাল চৌধুরী, শিল্প-সমালোচক ও পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস এবং দশ বিশিষ্ট নাগরিকের প্রতি, যাঁরা মহামান্য রাষ্ট্রপতি বরাবর আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন।

সফিউদ্দীন স্যার চিরদিন বেঁচে থাকবেন – বর্তমান প্রজন্মের কাছে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে, তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে – তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য সৃষ্টকর্মের জন্যে। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply