সীমার মাঝে অসীম তুমি

লেখক:

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

রবীনন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন, ‘বিশ্বশক্তি যদি আমার কল্পনায় আমার জীবনে এমন বাণীরূপে উচ্চারিত হইয়া থাকেন যাহা অন্যের পক্ষে দুর্বোধ তবে আমার কাব্য আমার জীবন পৃথিবীর কাহারও কোনো কাজে লাগিবে না – সে আমারই ক্ষতি, আমারই ব্যর্থতা।’ তাঁর গ্রন্থের ভূমিকায়, প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে, অধ্যাপনায়, বক্তৃতায়-ভাষণে সারা জীবন ধরে রবীন্দ্রনাথ নিজের রচনার ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন। তিনি বলতেন, ‘পরিচয় সম্বন্ধে কোনো ভুল রেখে দেওয়া নিজের প্রতি ও অন্যের প্রতি অন্যায় আচরণ করা। কারণ যেটা নিয়ে অন্যের সঙ্গে ব্যবহার চলছে, যার প্রয়োজন এবং মূল্য সত্যভাবে স্থির হওয়া উচিত, সেই নিয়ে যাচনদার যদি এমন কিছু বলেন যা আমার মতে সংগত নয়, তবে চুপ করে গেলে নিতান্ত অবিনয় হবে।’
একদিকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘নিজের রচনা উপলক্ষে আÍবিশ্লেষণ শোভন হয় না। তাকে অন্যায় বলা যায় এই জন্যে যে, নিতান্ত নৈর্ব্যক্তিকভাবে এ কাজ করা অসম্ভব – এইজন্য নিষ্কাম বিচারের লাইন ঠিক থাকে না।’ আবার অপরদিকে নিজের লেখা সম্পর্কে ওকালতি করা ভদ্ররীতি নয় জেনেও প্রয়োজনে সেই প্রথার খাতিরে ঔদাসীনের ভান করা তাঁর দ্বারা হয়ে ওঠেনি। নিজের রচনা সম্বন্ধে বিচারক হওয়া বেদস্তুর উদ্ধৃতির শেষ কোথায়? জেনেও তিনি বলেছেন, দায়ে পড়লে ওকালতি করা চলে। আর বিপন্ন বোধ করলে ও তিনি বেশ কোমর বেঁধেই ওকালতি করেছেন।’
রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতার কোনো বিগ্রহ বা প্রতিমা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ পৌত্তলিক ছিলেন না, কাব্যের উপমায় রূপকে তার কিছু নিদর্শন থাকলেও। তিনি জীবনদেবতাকে আদর করে ডেকেছেন সখা, পরান-সখা, বন্ধু, নয়নভুলানো, চিরসাথি ইত্যাদি সম্বোধনে এবং সমীহ করেছেন কর্ণধার, মুক্তিদাতা, রাজন, রাজা বা মহারাজা হিসেবে। এসব তার সীমার মাঝে অসীমের উপলব্ধি থেকে উৎসারিত। কাঠামোগত কোনো তেমন তত্ত্বকথা নেই।
৫ ফাল্গুন ১৩০৯ সালে মোহিত চন্দ্র সেনকে লেখা এক পত্রে বলেন : ‘আমার নিগূঢ়তার মধ্যে যে একটি বৃহৎ অতি পুরাতন ‘আমি’ আছে – যে বিশেষরূপে আমার জীবনের দেবতা – যাহার গভীর গোপন আবির্ভাবের দ্বারাই আমি বিশেষভাবে দেবতাÍা যে অতিজগতে বাস করিয়া আমাকে জগতে সঞ্চালন করিতেছে, নানা সুখদুঃখ অনুকূলতা-প্রতিকূলতার ভিতর দিয়া আমাকে সার্থক করিয়া সার্থকতা লাভ করিবার জন্য যাহার অহরহ চেষ্টা – যে আমার মধ্যে কখনো বিফল কখনো সফল হইয়াও এক মুহূর্ত আমাকে পরিত্যাগ করিতেছে না – যাহার মধ্যস্থতায় ঈশ্বরের সহিত আমার যোগ, – ঈশ্বরের বার্ত্তা, আদেশ ও আনন্দ যে আমার মধ্যে আনয়ন ও সঞ্চয় করিবার চেষ্টা করিতেছে, আমার পাপকে দাহন করিয়া আমার পুণ্যকে উজ্জ্বল করিবার জন্য যাহার অহরহ প্রয়াস, আমাকে গড়িয়া তুলিয়া যে সম্পূর্ণতা লাভ করিবে – যাহার শক্তিতে আমি মঙ্গলের মধ্যে অগ্রসর এবং আমার মঙ্গলভাবেই যাহার বলবৃদ্ধি – যে আমার বাহ্যচেতনার অন্তরালে অন্তঃপুরে অবস্থান করিয়া গৃহিণীর ন্যায় আপন গুপ্ত ভাণ্ডারে ক্রমাগতই গ্রহণ-বর্জন করিতেছে তাহার সহিত প্রেমের আনন্দে যুক্ত হইয়া পরস্পরকে সম্পূর্ণ করিয়া তুলিতে পারিলে তবেই অতিজগতের সহিত জগতের নিত্য প্রেমের সম্বন্ধ আপনার মধ্যেই বুঝিতে পারিব। তখন ঈশ্বর আমাদের নিকট হইতে কোনো অবস্থাতেই ব্যবহিত হইয়া থাকিবে না। আমাদের প্রত্যেকের জীবনদেবতা বিশ্বদেবতার সহিত আমাদের মিলন সাধনের চেষ্টা করিতেছে – নানা ঘটনা সুখদুঃখসূত্রে সে সেই মিলনপাশ বয়ন করিতেছে – মাঝে মাঝে ছিন্ন হইয়া যায় আবার সে জোড়া দেয়, মাঝে মাঝে জটা পড়িয়া যায়, আবার সে ধীরে ধীরে মোচন করিতে থাকে – আমার সেই চিরসহিষ্ণু, চিরন্তন সহচরটির সহিত – এই সূর্যলোকে, এই সমীরণে, এই আকাশের নীলিমা ও ধরাতলের শ্যামলতার মাঝখানে, এই জনতাপূর্ণ বিচিত্র কলরবমুখর মানবসভা-প্রাঙ্গণে এই জীবনেই যেন আমার শুভপরিণয় সম্পূর্ণভাবে সমাধা হইয়া যায় – আমি যেন তাহাকে প্রত্যক্ষভাবে চিনি ও তাহার দক্ষিণ করতলে আমার দক্ষিণ হস্ত সমর্পণ করি – সে আমাকে যেখানে বহন করিয়া লইয়া যাইবে সেখানে নির্ভয়ে আনন্দের সঙ্গে যেন যাই – তাহাকে পদে পদে বাধা দিয়া আমাদের মহাযাত্রাকে যেন ব্যাঘাতদুঃখে নিয়ত পীড়িত না করিয়া তুলি। আমার মধ্যে আমার এই চিরসঙ্গীর ছদ্মলীলাই আমার কবিতায় নানা সুরে নানাভাবে বর্ণিত হইয়াছে – তখন তাহা কিছুই জানিতাম না, এখন তাহা ক্রমে ক্রমে বুঝিতেছি। সেই চিরসঙ্গীই আমার অত্যন্ত অপরিণত বয়সেও বিশ্বপ্রকৃতির সহিত আমার দীর্ঘকালের একান্ত আÍীয়তার পরিচয় কেমন করিয়া বুঝাইয়া দিয়াছিল এবং চিরসঙ্গীই সমস্ত সুখদুঃখ বিচ্ছেদমিলনের মধ্যে এই পরিণত বয়সে পরমাÍার সহিত আমার সম্বন্ধ বুঝাইবার নানা প্রকার চেষ্টা করিতেছে। সে আছে, সে আমাকে ভালোবাসে, তাহার ভালোবাসার দ্বারাই ঈশ্বরের ভালোবাসা আমি লাভ করিতেছি। জগতে যেমন পিতাকে মাতাকে বন্ধুকে প্রিয়াকে পাইয়াছি – তাহারা যেমন জগতের দিক হইতে ঈশ্বরের দিকে আমাকে কল্যাণসূত্রে বাঁধিতেছে – তেমনি আমার জীবনের দেবতা আমার অতিজগতের সহচর একটি অপূর্ব্ব নিত্য প্রেমের সূত্রে ঈশ্বরের সহিত আমার একটি পরম রহস্যময় আধ্যাÍিক মিলনের সেতু রচনা করিতেছে। ঠিক বুঝাইলাম কিনা জানি না, বলিতে গিয়া ভুল করিলাম কিনা জানি না – কিন্তু আমার কাব্যমেঘকে নানা স্থানেই বিচ্ছুরিত করিয়া এই রকমের কী একটা কথা নানা বর্ণের রশ্মিতে আপনাকে প্রকাশ করিবার চেষ্টা করিয়াছে – আমি তাহাকেই ধরিয়া ফেলিবার চেষ্টায় উদয়াচল হাতড়াইয়া বেড়াইতেছি।’
তাঁর আÍপরিচয়ে কবি বলছেন : ‘আমার সুদীর্ঘকালের কবিতা লেখার ধারাটাকে পশ্চাৎ ফিরিয়া যখন দেখি তখন ইহা স্পষ্ট দেখিতে পাই – এ একটা ব্যাপার, যাহার উপরে আমার কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। যখন লিখিতেছিলাম তখন মনে করিয়াছি, আমিই লিখিতেছি বটে, কিন্তু আজ জানি কথাটা সত্য নহে। কারণ, সেই খণ্ড কবিতাগুলিতে আমার সমগ্র কাব্যগ্রন্থের তাৎপর্য সম্পূর্ণ হয় নাই – সেই তাৎপর্যটি কী তাহাও আমি পূর্বে জানিতাম না। এইরূপে পরিণাম না জানিয়া আমি একটির সহিত একটি কবিতা যোজনা করিয়া আসিয়াছি – তাহাদের প্রত্যেকের যে ক্ষুদ্র অর্থ কল্পনা করিয়াছিলাম, আজ সমগ্রের সাহায্যে নিশ্চয় বুঝিয়াছি, সে-অর্থ অতিক্রম করিয়া একটি অবিচ্ছিন্ন তাৎপর্য তাহাদের প্রত্যেকের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইয়া আসিয়াছিল।…
বিশ্ববিধির একটা নিয়ম এই দেখিতেছি যে, যেটা আসন্ন, যেটা উপস্থিত তাহাকে সে খর্ব করিতে দেয় না। তাহাকে এ-কথা জানিতে দেয় না যে, সে একটা সোপানপরম্পরার অঙ্গ। তাহাকে বুঝাইয়া দেয় যে, সে আপনাতে আপনি পর্যাপ্ত।
কাব্যরচনা সম্বন্ধেও সেই বিশ্ববিধানই দেখিতে পাই – অন্তত আমার নিজের মধ্যে তাহা উপলব্ধি করিয়াছি। যখন যেটা লিখিতেছিলাম তখন সেইটেকেই পরিণাম বলিয়া মনে করিয়াছিলাম। এইজন্য সেইটুকু সমাধা করার কাজেই অনেক যতœ ও অনেক আনন্দ আকর্ষণ করিয়াছি। আমিই যে তাহা লিখিতেছি এবং একটা-কোনো বিশেষ ভাব অবলম্বন করিয়া লিখিতেছি, এ সম্বন্ধেও সন্দেহ ঘটে নাই। কিন্তু আজ জানিয়াছি, সে সকল লেখা উপলক্ষমাত্র – তাহারা যে অনাগতকে গড়িয়া তুলিতেছে সেই অনাগতকে তাহারা চেনেও না। তাহাদের রচয়িতার মধ্যে আর একজন কে রচনাকারী আছেন, যাহার সম্মুখে সেই ভাবী তাৎপর্য প্রত্যক্ষ বর্তমান।… শুধু কি কবিতা-লেখার একজন কর্তা কবিকে অতিক্রম করিয়া তাহার লেখনী চালনা করিয়াছেন? তাহা নহে। সেইসঙ্গে ইহাও দেখিয়াছি যে, জীবনটা যে গঠিত হইয়া উঠিতেছে, তাহার সমস্ত সুখদুঃখে, তাহার সমস্ত যোগবিয়োগের বিচ্ছিন্নতাকে কে একজন একটি অখণ্ড তাৎপর্যের মধ্যে গাঁথিয়া তুলিতেছেন। সকল সময়ে আমি তাহার আনুকূল্য করিতেছি কি না জানি না, কিন্তু আমার সমস্ত বাধা-বিপত্তিকেও, আমার সমস্ত ভাঙাচোরাকেও তিনি নিয়তই গাঁথিয়া জুড়িয়া দাঁড় করাইতেছেন। কেবল তাই নয়, আমার স্বার্থ, আমার প্রবৃত্তি, আমার জীবনকে যে অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ করিতেছে তিনি বারে বারে সে সীমা ছিন্ন করিয়া দিতেছেন – তিনি সুগভীর বেদনার দ্বারা, বিচ্ছেদের দ্বারা, বিপুলের সহিত, বিরাটের সহিত তাহাকে যুক্ত করিয়া দিতেছেন।…
যিনি আমার সমস্ত ভালোমন্দ, আমার সমস্ত অনুকূল ও প্রতিকূল উপকরণ লইয়া আমার জীবনকে রচনা করিয়া চলিয়াছেন, তাহাকেই আমার কাব্যে আমি ‘জীবনদেবতা’ নাম দিয়াছি। তিনি যে কেবল আমার এই ইহজীবনের সমস্ত খণ্ড তাকে ঐক্যদান করিয়া বিশ্বের সহিত তাহার সামঞ্জস্যস্থাপন করিতেছেন, আমি তাহা মনে করি না। আমি জানি, অনাদিকাল হইতে বিচিত্র বিস্মৃত অবস্থার মধ্য দিয়া তিনি আমাকে আমার এই বর্তমান প্রকাশের মধ্যে উপনীত করিয়াছেন – সেই বিশ্বের মধ্য দিয়া প্রবাহিত অস্তিত্বধারার বৃহৎ স্মৃতি তাহাকে অবলম্বন করিয়া আমার অগোচরে আমার মধ্যে রহিয়াছে। সেইজন্য এই জগতের তরুলতা – পশুপক্ষীর সঙ্গে এমন একটা পুরাতন ঐক্য অনুভব করিতে পারি, সেইজন্য এতবড়ো রহস্যময় প্রকাণ্ড জগৎকে অনাÍীয় ও ভীষণ বলিয়া মনে হয় না।’

মানুষের ধর্মে কবি বলেন, ‘দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে সেদিন দেখছিলুম, সামনের আকাশে নববর্ষার জলভারনত মেঘ, নিচে ছেলেদের মধ্যে দিয়ে প্রাণের তরঙ্গিত কল্লোল। আমার মন সহসা আপন খোলা দুয়ার দিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে সুদূরে। অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আমার অন্তরে একটা অনুভূতি এলো, সামনে দেখতে পেলুম নিত্যকালব্যাপী একটি সর্বানুভূতির অনবচ্ছিন্ন ধারা, নানা প্রাণের বিচিত্র লীলাকে মিলিয়ে নিয়ে একটি অখণ্ড  লীলা।… এতকাল নিজের জীবনে সুখদুঃখের যেসব অনুভূতি একান্তভাবে আমাকে বিচলিত করেছে, তাকে দেখতে পেলুম দ্রষ্টারূপে এক নিত্যসাক্ষীর পাশে দাঁড়িয়ে।
এমনি করে আপনা থেকে বিবিক্ত হয়ে সমগ্রের মধ্যে খণ্ডকে স্থাপন করবামাত্র নিজের অস্তিত্বের ভার লাঘব হয়ে গেল।… একটা মুক্তির আনন্দ পেলুম।… চোখ দিয়ে জল পড়ছে তখন, ইচ্ছে করছে, সম্পূর্ণ আÍনিবেদন করে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করি কাউকে। কে সেই আমার পরম অন্তরঙ্গ সঙ্গী যিনি আমার সমস্ত ক্ষণিককে গ্রহণ করছেন তার নিত্যে। তখনই মনে হলো, আমার এক দিক থেকে বেরিয়ে এসে আর এক দিকের পরিচয় পাওয়া গেল। এষোহস্য পরম আনন্দ। আমার মধ্যে এ এবং সে – এই এ যখন সেই সের দিকে এসে দাঁড়ায় তখন তার আনন্দ।
সেদিন হঠাৎ অত্যন্ত নিকটে জেনেছিলুম, আপন সত্তার মধ্যে দুটি উপলব্ধির দিক আছে। এক, যাকে বলি আমি আর তারই সঙ্গে জড়িয়ে মিশিয়ে যা-কিছু -যেমন আমার সংসার, আমার দেশ, আমার ধনজনমান, এই যা-কিছু নিয়ে মারামারি কাটাকাটি ভাবনাচিন্তা। কিন্তু পরমপুরুষ আছেন সেই সমস্তকে অধিকার করে এবং অতিক্রম করে, নাটকের স্রষ্টা ও দ্রষ্টা যেমন আছে নাটকের সমস্তটাকে নিয়ে এবং তাকে পেরিয়ে। সত্তার এ দুই দিককে সব সময় মিলিয়ে অনুভব করতে পারিনে। একলা আপনাকে বিরাট থেকে বিচ্ছিন্ন সুখে-দুঃখে আন্দোলিত হই। তার মাত্রা থাকে না, তার বৃহৎ সামঞ্জস্য দেখিনে। কোনো-এক সময়ে সহসা দৃষ্টি ফেরে তার দিকে, মুক্তির স্বাদ পাই তখন। যখন অহং আপন ঐকান্তিকতা ভোলে তখন দেখে সত্যকে। আমার এই অনুভূতি কবিতাতে প্রকাশ পেয়েছে জীবনদেবতা শ্রেণির কাব্যে।
ওগো অন্তরতম,
মিটেছে কি তব সকল তিয়াস
আসি অন্তরে মম।
আমি যে পরিমাণে পূর্ণ অর্থাৎ বিশ্বভূমীন সেই পরিমাণে আপন করেছি তাঁকে, ঐক্য হয়েছে তাঁর সঙ্গে। সেই কথা মনে করে বলেছিলুম, তুমি কি খুশি হয়েছ আমার মধ্যে তোমার লীলার প্রকাশ দেখে।
বিশ্বদেবতা আছেন, তাঁর আসন লোকে, গ্রহচন্দ্রতারায়। জীবনদেবতা বিশেষভাবে জীবনের আসনে, হƒদয়ে হƒদয়ে তাঁর পীঠস্থান, সকল অনুভূতি সকল অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। বাউল তাঁকেই বলেছে মনের মানুষ। এই মনের মানুষ, এই সর্বমানুষের জীবনদেবতার কথা বলবার চেষ্টা করেছি Religion of Man বক্তৃতাগুলিতে। …মানবনাট্যমঞ্চের মাঝখানে যে- লীলা তার অংশের অংশ আমি। সব জড়িয়ে দেখলুম সকলকে। এই যে দেখা একে ছোটো বলব না। এও সত্য। জীবনদেবতার সঙ্গে জীবনকে পৃথক করে দেখলেই দুঃখ, মিলিয়ে দেখলেই মুক্তি।’

তাঁর জীবনস্মৃতিতে সীমার মধ্যে মিলনসাধনের পালাকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্য রচনার একটি মাত্র পালা বলে অভিহিত করেছেন:…‘আমার শিশুকালই বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে আমার খুব একটি সহজ এবং নিবিড় যোগ ছিল। …তাহার পর একদিন যখন যৌবনের প্রথম উšে§ষে হƒদয় আপনার খোরাকের দাবি করিতে লাগিল, তখন বাহিরের সঙ্গে জীবনের সহজ যোগটি বাধাগ্রস্ত হইয়া গেল। তখন ব্যথিত হƒদয়টাকে ঘিরিয়া ঘিরিয়া নিজের মধ্যেই নিজের আবর্তন শুরু হইল, চেতনা তখন আপনার ভিতরের দিকেই আবদ্ধ হইয়া রহিল। এইরূপে রুগ্ণ হƒদয়টার আবদারে অন্তরের সঙ্গে বাহিরের যে-সামঞ্জস্যটা ভাঙিয়া গেল, নিজের চিরদিনের যে সহজ অধিকারটি হারাইলাম, সন্ধ্যাসংগীতে তাহার বেদনা ব্যক্ত হইতে চাহিয়াছে। অবশেষে একদিন সেই রুদ্ধদ্বার জানি না কোন ধাক্কায় হঠাৎ ভাঙিয়া গেল, তখন যাহাকে হারাইয়াছিলাম তাহাকে পাইলাম। শুধু পাইলাম তাহা নহে, বিচ্ছেদের ব্যবধানের ভিতর দিয়া তাহার পূর্ণতর পরিচয় পাইলাম। সহজকে দুরূহ করিয়া তুলিয়া যখন পাওয়া যায় তখনই পাওয়া সার্থক হয়। এইজন্য আমার শিশুকালের বিশ্বকে প্রভাতসংগীতে যখন আবার পাইলাম তখন তাহাকে অনেক বেশি পাওয়া গেল। এমনি করিয়া প্রকৃতির সঙ্গে সহজ মিলন বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনে জীবনের প্রথম অধ্যায়ের একটা পালা শেষ হইয়া গেল। শেষ হইয়া গেল বলিলে মিথ্যা বলা হয়। এই পালাটাই আবার আরো একটু বিচিত্র হইয়া শুরু হইয়া, আমার আরো একটা দুরূহতর সমস্যার ভিতর দিয়া বৃহত্তর পরিণামে পৌঁছিতে চলিল। বিশেষ মানুষ জীবনে বিশেষ একটা পালাই সম্পূর্ণ করিতে আসিয়াছে – পর্বে পর্বে তাহার চক্রটা বৃহত্তর পরিধিকে অবলম্বন করিয়া বাড়িতে থাকে – প্রত্যেক পাককে হঠাৎ পৃথক বলিয়া ভ্রম হয় কিন্তু খুঁজিয়া দেখিলে দেখা যায়, কেন্দ্রটা একই।
আমার নিজের প্রথম জীবনে আমি যেমন একদিন আমার অন্তরের একটা অনির্দেশ্যতাময়, অন্ধকার গুহার মধ্যে প্রবেশ করিয়া বাহিরের সহজ অধিকারটি হারাইয়া বসিয়াছিলাম, অবশেষে সেই বাহির হইতেই একটি মনোহর আলোক হƒদয়ের মধ্যে প্রবেশ করিয়া আমাকে প্রকৃতির সঙ্গে পরিপূর্ণ করিয়া মিলাইয়া দিল – এই প্রকৃতির প্রতিশোধ সেই ইতিহাসটিই একটু অন্য রকম করিয়া লিখিত হইয়াছে। পরবর্তী আমার সমস্ত কাব্যরচনার ইহাও একটা ভূমিকা। আমার তো মনে হয়, আমার কাব্যরচনার এই একটিমাত্র পালা। সে পালার নাম দেওয়া যাইতে পারে, সীমার মধ্যেই অসীমের সহিত মিলন-সাধনের পালা। এই ভাবটাকেই আমার শেষ বয়সের একটি কবিতার ছত্রে প্রকাশ করিয়াছিলাম-বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়।’
১৩১৯ সালে পথের সঞ্চয়ের সীমার সার্থকতায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘উপনিষৎ বলিয়াছেন : মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্ধনম।’ কাহারো ধনে লোভ করিয়ো না। অর্থাৎ, তোমার সীমার বাহিরে যাহা আছে তাহার পশ্চাতে চিত্তকে ও চেষ্টাকে ধাবিত করিয়ো না।
কেন করিব না ওই শ্লোকে সে-কথাটাও বলা আছে। ‘উপনিষৎ বলিতেছেন, তিনিই সমস্তকে আচ্ছন্ন করিয়া আছেন; অতএব, যাহার মধ্যে তিনি আছেন, যাহা তাহার দান, তাহার মধ্যে কোনো অভাবই নাই। নিজের মধ্যে যখন ঐশ্বর্যকে উপলব্ধি করি না তখনই মনে করি, ঐশ্বর্য পরের মধ্যেই আছে। কিন্তু, যে দীনতাবশত ঐশ্বর্যকে নিজের মধ্যে পাই নাই সেই দীনতাবশতই তাহাকে অন্যত্র পাইবার আশা নাই।’
১৩১১ সালে তাঁর আÍপরিচয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমি, কি আÍার মধ্যে কি বিশ্বের মধ্যে, বিস্ময়ের অন্ত দেখি না। আমি জড় নাম দিয়া, সসীম নাম দিয়া, কোনো জিনিসকে একপাশে ঠেলিয়া রাখিতে পারি নাই। এই সীমার মধ্যেই, এই প্রত্যক্ষের মধ্যেই, অনন্তের যে প্রকাশ তাহাই আমার কাছে অসীম বিস্ময়াবহ। আমি এই জলস্থল তরুলতা পশুপক্ষী চন্দ্রসূর্য দিনরাত্রির মাঝখান দিয়া চোখ মেলিয়া চলিয়াছি, ইহা আশ্চর্য।’
ওই সময় কবি আরো বলেন, ‘প্রকৃতি তাহার রূপরস বর্ণগন্ধ লইয়া, মানুষ তাহার েস্নহপ্রেম লইয়া, আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে – সেই মোহকে আমি অবিশ্বাস করি না, সেই মোহকে আমি নিন্দা করি না। তাহা আমাকে বদ্ধ করিতেছে না, তাহা আমাকে মুক্তই করিতেছে; তাহা আমাকে আমার বাহিরেই ব্যাপ্ত করিতেছে। নৌকার গুণ নৌকাকে বাঁধিয়া রাখে নাই, নৌকাকে টানিয়া টানিয়া লইয়া চলিয়াছে। জগতের সমস্ত আকর্ষণপাশ আমাদিগকে তেমনি অগ্রসর করিতেছে। কেহ-বা দ্রুত চলিতেছে বলিয়া সে আপন গতি সম্বন্ধে সচেতন, কেহ-বা মন্দগমনে চলিতেছে বলিয়া মনে করিতেছে। বুঝি-বা সে এক জায়গায় বাধা পড়িয়াছে। কিন্তু সকলকেই চলিতে হইতেছে – সকলই এই জগৎসংসারের নিরন্তর টানে প্রতিদিনই ন্যুনাধিক পরিমাণে আপনার দিক হইতে ব্রহ্মের দিকে ব্যাপ্ত হইতেছে। আমরা যেমনই মনে করি, আমাদের ভাই, আমাদের প্রিয়, আমাদের পুত্র আমাদিগকে একটি জায়গায় বাঁধিয়া রাখে নাই; যে-জিনিসটাকে সন্ধান করিতেছি, দীপালোক কেবলমাত্র সেই জিনিসটাকে প্রকাশ করে তাহা নহে, সমস্ত ঘরকে আলোকিত করে – প্রেম প্রেমের বিষয়কে অতিক্রম করিয়াও ব্যাপ্ত হয়। জগতের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়া, প্রিয়জনের মাধুর্যের মধ্য দিয়া ভগবানই আমাদিগকে টানিতেছেন – আর কাহারো টানিবার ক্ষমতাই নাই। পৃথিবীর প্রেমের মধ্যে দিয়াই সেই ভূমানন্দের পরিচয় পাওয়া, জগতের এই রূপের মধ্যেই সেই অপরূপকে সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করা, ইহাকেই তো আমি মুক্তির সাধনা বলি। জগতের মধ্যে আমি মুগ্ধ, সেই মোহেই আমার মুক্তিরসের আস্বাদন।

সীমা আছে এই কথা যেমন নিশ্চিত, অসীম আছেন এ-কথা তেমনি সত্য। আমরা উভয়কে যখন বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখি তখনই আমরা মায়ার ফাঁদে পড়ি। তখনই আমরা এমন একটা ভুল করিয়া বসি যে, আপনার সীমাকে লঙ্ঘন করিলেই বুঝি আমরা অসীমকে পাইব – যেন আÍহত্যা করিলেই অমরজীবন পাওয়া যায়। যেন আমি না হইয়া আর কিছু হইলেই আমি ধন্য হইব। কিন্তু, আমি হওয়াও যা আর-কিছু হওয়া যে তাহাই, সে কথা মনে থাকে না। আমার এই আমির মধ্যে যদি ব্যর্থতা থাকে তবে অন্য কোনো আমিত্ব লাভ করিয়া তাহা হইতে নিষ্কৃতি পাইব না। আমার ঘটের মধ্যে ছিদ্র থাকাতে যদি জল বাহির হইয়া যায়, তবে সে জলের দোষ নহে। দুধ ঢালিলেও সেই দশা হইবে, এবং মধু ঢালিলেও তথৈবচ।’
ওই সালে ‘সীমা ও অসীমতা’য় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :
‘ধর্ম শব্দের গোড়াকার অর্থ, যাহা ধরিয়া রাখে। religion শব্দের ব্যুৎপত্তি আলোচনা করিলে বুঝা যায় তাহারও মূল অর্থ, যাহা বাঁধিয়া তোলে।
অতএব, একদিক দিয়া দেখিলে দেখা যায়, মানুষ ধর্মকে বন্ধন বলিয়া স্বীকার করিয়াছে। ধর্মই মানুষের চেষ্টার ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করিয়া সংকীর্ণ করিয়া তুলিয়াছে। এই বন্ধনকে স্বীকার করা, এই সীমাকে লাভ করাই মানুষের চরম সাধনা।
কেননা, সীমাই সৃষ্টি। সীমারেখা যতই সুবিহিত সুস্পষ্ট হয় সৃষ্টি ততই সত্য ও সুন্দর হইতে থাকে। আনন্দের স্বভাবই এই, সীমাকে উদভিন্ন করিয়া তোলা।
বিধাতার আনন্দ বিধানের সীমায় সমস্ত সৃষ্টিকে বাঁধিয়া তুলিতেছে। কর্মীর আনন্দ, কবির আনন্দ, শিল্পীর আনন্দ – কেবলই স্ফুটতররূপে সীমা রচনা করিতেছে।
ধর্মও মানুষের মনুষ্যত্বকে তাহার সত্য সীমার মধ্যে স্ফুটতর করিয়া তুলিবার শক্তি। সেই সীমাটি যতই সহজ হয়, যতই সুব্যক্ত হয়, ততই তাহা সুন্দর হইয়া উঠিতে থাকে। মানুষ ততই শক্তি ও স্বাস্থ্য ও ঐশ্বর্য লাভ করে, মানুষের মধ্যে আনন্দ ততই প্রকাশমান হইয়া ওঠে।
ধর্মের সাহায্যে মানুষ আপনার সীমা খুঁজিতেছে, অথচ সেই ধর্মের সাহায্যেই মানুষ আপনার অসীমকে খুঁজিতেছে। ইহাই আশ্চর্য। বিশ্বসংসারে সমস্ত পূর্ণতার মূলেই আমরা এই দ্বন্দ্ব দেখিতে পাই। যাহা ছোটো করে তাহাই বড়ো করে যাহা পৃথক করিয়া দেয় তাহাই এক করিয়া আনে, যাহা বাঁধে তাহাই মুক্তিদান করে; অসীমই সীমাকে সৃষ্টি করে এবং সীমাই অসীমকে প্রকাশ করিতে থাকে। বস্তুত এই দ্বন্দ্ব যেখানেই সম্পূর্ণরূপে একত্র হইয়া মিলিয়াছে সেইখানেই পূর্ণতা। যেখানে তাহাদের বিচ্ছেদ ঘটিয়া একটা দিকই প্রবল হইয়া উঠে সেইখানেই যত অমঙ্গল। অসীম যেখানে সীমাকে ব্যক্ত করে না সেখানে তাহা শূন্য, সীমা যেখানে অসীমকে নির্দেশ করে না সেখানে তাহা নিরর্থক। মুক্তি যেখানে বন্ধনকে অস্বীকার করে সেখানে তাহা উš§ত্ততা, বন্ধন যেখানে মুক্তিকে মানে না সেখানে তাহা উৎপীড়ন। আমাদের দেশে মায়াবাদে সমস্ত সীমাকে মায়া বলিয়াছে। কিন্তু, আসল কথা এই, অসীম হইতে বিযুক্ত সীমাই মায়া।। তেমনি ইহাও সত্য, সীমা হইতে বিযুক্ত অসীমও মায়া।
যে গান আপনার সুরের সীমাকে সম্পূর্ণরূপে পাইয়াছে সে গান কেবলমাত্র সুরসমষ্টিকে প্রকাশ করে না – সে আপনার নিয়মের দ্বারাই আনন্দকে, সীমার দ্বারাই সীমার চেয়ে বড়োকে ব্যক্ত করে। গোলাপ-ফুল সম্পূর্ণরূপে আপনার সীমাকে লাভ করিয়াছে বলিয়াই সেই সীমার দ্বারা সে একটি অসীম সৌন্দর্যকে প্রকাশ করিতে থাকে। এই সীমার দ্বারা গোলাপ ফুল প্রকৃতিরাজ্যে একটি বস্তুবিশেষ, কিন্তু ভাবরাজ্যে আনন্দ। এই সীমাই তাহাকে এক দিকে বাঁধিয়াছে, আর-এক দিকে ছাড়িয়াছে।
এইজন্যই দেখিতে পাই, মানুষের সকল শিক্ষারই মূলে সংযমের সাধনা। মানুষ আপনার চেষ্টাকে সংযত করিতে শিখিলেই তবে চলিতে পারে, ভাবনাকে বাঁধিতে পারিলে তবেই ভাবিতে পারে। সেই কারুকরই সুনিপুণ যে লোক কর্মের সীমাকে অর্থাৎ নিয়মকে সম্পূর্ণরূপে জানিয়াছে এবং মানিয়াছে। সেই লোকই নিজের জীবনকে সুন্দর করিতে পারিয়াছে যে তাহাকে সংযত করিয়াছে। এবং সতী স্ত্রী যেমন সতীত্বের সংযমের দ্বারাই আপনার প্রেমের পূর্ণ চরিতার্থতাকে লাভ করে, তেমনি যে মানুষ পবিত্রচিত্ত, অর্থাৎ যে আপনার ইচ্ছাকে সত্য সীমায় বাঁধিয়াছে, সেই তাহাকে পায় যিনি সাধনার চরম ফল, যিনি পরম আনন্দস্বরূপ।
এই ধর্মকে বন্ধনরূপে দুঃখরূপে স্বীকার করা হইয়াছে; বলা হইয়াছে, ধর্মের পথ শাণিত ক্ষুরধারের মতো দুর্গম। সে-পথ যদি অসীমবিস্তৃত হইত তবে সকল মানুষই যেমন-তেমন করিয়া চলিতে পারিত, কাহারো কোথাও কোনো বাধাবিপত্তি থাকিত না। কিন্তু, সে-পথ সুনিশ্চিত নিয়মের সীমায় দৃঢ়রূপে আবদ্ধ, এই জন্যই তাহা দুর্গম। ধ্র“বরূপে এই সীমা-অনুসরণের কঠিন দুঃখকে মানুষের গ্রহণ করিতেই হইবে। কারণ, এই দুঃখের দ্বারাই আনন্দ প্রকাশমান হইতেছে। এইজন্যই উপনিষদে আছে, তিনি তপস্যার দুঃখের দ্বারাই এই যাহা কিছু সমস্ত সৃষ্টি করিয়াছেন।
কবি কিট্স্ বলিয়াছেন, সত্যই সৌন্দর্য এবং সৌন্দর্যই সত্য। সত্যই সীমা, সত্যই নিয়ম, সত্যের দ্বারাই সমস্ত বিধৃত হইয়াছে; এই সত্যের অর্থাৎ সীমার ব্যতিক্রম ঘটিলেই সমস্ত উচ্ছৃঙ্খল হইয়া বিনাশ প্রাপ্ত হয়। অসীমের সৌন্দর্য এই সত্যের সীমার মধ্যে প্রকাশিত।
সীমা ও অসীমতাকে যদি পরস্পর-বিচ্ছিন্ন ও বিরুদ্ধ করিয়া দেখি তবে মানুষের ধর্মসাধনা একেবারেই নিরর্থক হইয়া পড়ে। অসীম যদি সীমার বাহিরে থাকেন তবে জগতে এমন কোনো সেতু নাই যাহার দ্বারা তাহাকে পাওয়া যাইতে পারে। তবে তিনি আমাদের পক্ষে চিরকালের মতোই মিথ্যা।
কিন্তু মানুষের ধর্ম মানুষকে বলিতেছে, ‘তুমি আপনার সীমাকে পাইলে অসীমকে পাইবে। তুমি মানুষ হও; সেই মানুষ হওয়ার মধ্যেই তোমার অনন্তের সাধনা সফল হইবে।’ এইখানেই আমাদের অভয়, আমাদের অমৃত। যে সীমার মধ্যে আমাদের সত্য সেই সীমার মধ্যেই আমাদের চরম পরিপূর্ণতা। এইজন্যই উপনিষৎ বলিয়াছেন, ইনিই ইহার পরমা গতি, ইনিই ইহার পরমা সম্পৎ, ইনিই ইহার পরম আশ্রয়, ইনিই ইহার পরম আনন্দ। অসীমতা এবং সীমা, ইনি এবং এই – একেবারেই কাছাকাছি; দুই পাখি একেবারে গায়ে গায়ে সংলগ্ন।
আমাদের দেশে ভক্তিতত্ত্বের ভিতরকার কথা এই যে, সীমার সঙ্গে অসীমের যে যোগ তাহা আনন্দের যোগ অর্থাৎ প্রেমের যোগ। অর্থাৎ, সীমাও অসীমের পক্ষে যতখানি অসীমও সীমার পক্ষে ততখানি, উভয়ের উভয়কে নহিলে নয়।
মানুষ কখনো কখনো ঈশ্বরকে দূর স্বর্গরাজ্যে সরাইয়া দিয়াছে। অমনি মানুষের ঈশ্বর ভয়ংকর হইয়া উঠিয়াছে। এবং সেই ভয়ংকরকে বশ করিবার জন্য ভয়গ্রস্ত মানুষ নানা মন্ত্রতন্ত্র আচার-অনুষ্ঠান পুরোহিত ও মধ্যস্থের শরণাপন্ন হইয়াছে। কিন্তু, মানুষ যখন তাহাকে অন্তরতর করিয়া জানিয়াছে তখন তাহার ভয় ঘুচিয়াছে, এবং মধ্যস্থকে সরাইয়া দিয়া প্রেমের যোগে তাহার সঙ্গে মিলিতে চাহিয়াছে।
মানুষ কখনো কখনো সীমাকে সকলপ্রকার দুর্নাম দিয়া গালি পাড়িতে থাকে। তখন সে-স্বভাবকে পীড়ন করিয়া ও সংসারকে পরিত্যাগ করিয়া, অসম্ভব ব্যায়ামের দ্বারা অসীমের সাধনা করিতে প্রবৃত্ত হয়। মানুষ তখন মনে করে, সীমা জিনিসটা যেন তাহার নিজেরই জিনিস, অতএব তাহার মুখে চুনকালি মাখাইলে সেটা আর কাহারো গায়ে লাগে না। কিন্তু, মানুষ এই সীমাকে কোথা হইতে পাইল। এই সীমার অসীম রহস্য সে কীই বা জানে। তাহার সাধ্য কী সে এই সীমাকে লঙ্ঘন করে।
মানুষ যখন জানিতে পারে সীমাতেই অসীম, তখনই মানুষ বুঝিতে পারে – এই রহস্যই প্রেমের রহস্য; এই তত্ত্বই সৌন্দর্যতত্ত্ব; এইখানেই মানুষের গৌরব; আর, যিনি মানুষের ভগবান, এই গৌরবেই তাহারও গৌরব। সীমাই অসীমের ঐশ্বর্য, সীমাই অসীমের আনন্দ; কেননা সীমার মধ্যেই তিনি আপনাকে দান করিয়াছেন এবং আপনাকে গ্রহণ করিতেছেন।’

১৯৩৬ সালে শ্যামলীর ‘আমি’ কবিতায় কবি বলেন, অসীম মানুষের সীমানা সাধনায় ব্যস্ত :
মানুষের অহংকার – পটেই
বিশ্বকর্মার বিশ্বশিল্প।
তত্ত্বজ্ঞানী জপ করছেন নিশ্বাসে প্রশ্বাসে
না, না, না –
না-পান্না, না-চুন্নি, না-আলো, না-গোলাপ
না-আমি, না তুমি।
ওদিকে, অসীম যিনি তিনি স্বয়ং করছেন সাধনা
মানুষের সীমানায়
তাকেই বলে ‘আমি’।
১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানুষের ধর্ম গ্রন্থে লিখেছেন : ‘মানুষের আলো জ্বালায় তার আÍা, তখন ছোটো হয়ে যায় তার সঞ্চয়ের অহংকার। জ্ঞানে-প্রেমে-ভাবে বিশ্বের মধ্যে ব্যাপ্তি দ্বারাই সার্থক হয় সেই আÍা। সেই যোগের বাধাতেই তার অপকর্ষ, জ্ঞানের যোগে বিকার ঘটায় মোহ, ভাবের যোগে অহংকার, কর্মের যোগে স্বার্থপরতা। ভৌতিক বিশ্বে সত্য আপন সর্বব্যাপক ঐক্য প্রমাণ করে, সেই ঐক্য-উপলব্ধিতে আনন্দিত হয় বৈজ্ঞানিক।’
রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাষায় :
মহাবিশ্বজীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতে
নির্ভয়ে ছুটিতে হবে, সত্যেরে করিয়া ধ্র“বতারা।
…কে সে। জানি না কে। চিনি নাই তারে।
শুধু এইটুকু জানি, তারি লাগি রাত্রি অন্ধকারে
চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানে,
ঝড়ঝঞ্ঝা-বজ্রপাতে, জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে
অন্তর প্রদীপ-খানি
কে সে, চিনি নাই তারে।

সীমা ও অসীমের কথা বলতে রানী মহলানবীশকে লিখেছিলেন : ‘আজকাল রেখায় আমাকে পেয়ে বসেছে। তার হাত ছাড়াতে পারছিনে। কেবলই তার পরিচয় পাচ্ছি নতুন নতুন ভঙ্গির মধ্যে দিয়ে। তার রহস্যের শেষ নেই। যে বিধাতা ছবি আঁকেন এতদিন পরে তার মনের কথা জানতে পেরেছি। অসীম অব্যক্ত রেখায় রেখায় আপন নতুন নতুন সীমা রচনা করছেন যে-সীমা ক্রমেই প্রসারিত, বৈচিত্র্যে অন্তহীন, সুনির্দিষ্ট ও যথাযথভাবে সম্পূর্ণ। ছবিতে যে আনন্দ পাই তা হচ্ছে রেখার সংযমে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট। মন বলে ওঠে, নিশ্চিত করে দেখতে পেলুম তা সে যাই দেখি না কেন – এক টুকরো পাথর একটা কাটা গাছ, একজন বুড়ি-যাই হোক, সেখানেই অসীমকেও স্পর্শ করি, আনন্দিত হই।’
কবির সীমায় অসীমের যে প্রকাশ সে-কথা বলা হয়েছে গীতাঞ্জলির ১২০ সংখ্যক কবিতায়। দুঃখ-তাপে, বঞ্চনায়, কবির প্রার্থনা এটি নয়, সান্ত্বনা নয় অসীমের প্রতি যেন সংশয় না হয় সে-কথা বলা হয়েছে হলো গীতাঞ্জলির ৪ সংখ্যক কবিতায়।
মানুষ যখন মর্ত্যসীমা চূর্ণ করবে, কবি প্রশ্ন করেন, তখন কি দেবে না দেখা দেবতার অমর মহিমা?
‘মৃত্যুর অন্তরে পশি অমৃত না পাই যদি খুঁজে
সত্য যদি নাহি মেলে দুঃখ সাথে যুঝে,
পাপ যদি নাহি মরে যায়
আপনার প্রকাশ লজ্জায়,
অহঙ্কার ভেঙ্গে নাহি পড়ে আপনার অসহ্য সজ্জায়,
তবে ঘর ছাড়া সবে
অন্তরের কি আশ্বাস রবে
মরিতে ছুটিছে শত শত
প্রভাত আলোর পানে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের মতো?
বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্র“ধারা
এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা?
রাত্রির তপস্যা সে কি আনিবে না দিন?
নিদারুণ-দুঃখরাতে
মৃত্যুঘাতে
মানুষ চূর্ণিল যবে নিজ মর্ত্যসীমা
তখন দিবে না দেখা দেবতার অমর মহিমা?

৪ অক্টোবর ১৯২৪ পূরবী¬র লিপি কবিতায় কবির প্রশ্ন
হে ধরনি, কেন প্রতিদিন
তৃপ্তিহীন
একই লিপি পড় ফিরে ফিরে?
তাঁর কথা :
কত শিল্পী, কত কবি তোমার সে লিপির লিখনে
বসে গেছে একমনে।
শিখিতে চাহিছে এর ভাষা,
বুঝিতে চাহিছে তব অন্তরের আশা।
তোমার মনের কথা আমারি মনের কথা টানে।
চাও মোর পানে।
মোর ছন্দে দাও ঢেলে তারি রিনিরিনি
ওগো বিরহিণী।
দূর হতে আলোকের বরমাল্য এসে
খসিয়া পড়িল তব কেশে,
স্পর্শে তারি কভু হাসি কভু অশ্র“জলে
উৎকণ্ঠিত আকাক্সক্ষায় বক্ষতলে
ওঠে যে ক্রন্দন,
মোর ছন্দে চিরদিন দোলে যেন তাহারি স্পন্দন।
স্বর্গ হতে মিলনের সুধা
মর্তের বিচ্ছেদপাত্রে সংগোপনে রেখেছ, বসুধা;
তারি লাগি নিত্যক্ষুধা,
বিরহিণী অয়ি,
মোর সুরে হোক জ্বালাময়ী।
ওই পূরবী কাব্যগ্রন্থের ‘কঙ্কাল’ কবিতায় কবির কথা
আমার মনের নৃত্য, কতবার জীবন-মৃত্যুরে
লঙ্ঘিয়া চলিয়া গেছে চিরসুন্দরের সুরপুরে।
চিরকাল-তরে সে কি থেমে যাবে শেষে
কঙ্কালের সীমানায় এসে।
যে আমার সত্য পরিচয়
মাংসে তার পরিমাপ নয়;
পদাঘাতে জীর্ণ তারে নাহি করে দণ্ড পলগুলি –
সর্বস্বান্ত নাহি করে পথপ্রান্তে ধূলি।
আমি যে রূপের পদ্মে করেছি অরূপমধু পান,
দুঃখের বক্ষের মাঝে আনন্দের পেয়েছি সন্ধান,
অনন্ত মৌনের বাণী শুনেছি অন্তরে,
দেখেছি জ্যোতির পথ শূন্যময় আঁধারপ্রান্তরে।
নহি আমি বিধির বৃহৎ পরিহাস,
অসীম ঐশ্বর্য দিয়ে রচিত মহৎ সর্বনাশ।

একটি শিশিরবিন্দুর সীমার ওপরে অসীমের প্রতিফলনকে ইঙ্গিত করে কবি ৮ বছরের সত্যজিতের জন্য লিখে দিয়েছিলেন যে-কবিতাটি তা আমি সত্যজিৎ রায়ের কথায় বর্ণনা করছি : ‘উত্তরায়ণে গিয়ে দেখা করলাম তাঁর সঙ্গে। জানালার দিকে পিঠ করে চেয়ারে বসে আছেন, সামনে টেবিলের উপর বই আর খাতা, চিঠিপত্রের বিরাট অগোছালো স্তূপ। আমি তখন দেশ-বিদেশের ডাকটিকিট জমাতে শুরু করেছি আর এখানে চোখের সামনে দেখছি  রংবেরঙের টিকিট লাগানো বিদেশি চিঠির খামগুলো এখান-সেখান থেকে উঁকি মারছে। মনে মনে ভাবলাম, আমার যদি বিদেশ থেকে এত চিঠি আসত তাহলে টিকিটের জন্য আর অন্যের কাছে হাত পাততে হতো না। অটোগ্রাফের খাতাটা আমি এগিয়ে দিলেও, কবিতার ফরমাশটা এলো মায়ের কাছ থেকেই। আমি ছিলাম বেজায় মুখচোরা, বিশেষ করে রবিবাবুর সামনে ত বটেই। কিন্তু কই-তখন-তখন তো লিখলেন না কবিতা। তাতে যে একটু নিরাশও হয়েছিলাম সেটাও মনে আছে। বললেন, ‘কাল সকালে এসে নিয়ে যেও।’
গেলাম পরদিন সকালে। বুকের ভিতরে টিপটিপ করছে; এত কাজের মধ্যে আমার খাতায় কবিতা লেখার কথা কি আর মনে থাকবে? বললেন, ‘লেখা হয়ে গেছে, তবে খাতাটা কোথায় রেখেছি সেটাই হল প্রশ্ন।’ মিনিট দশেক খোঁজাখুঁজি করে ছোট্ট বেগুনি খাতাটা বেরোলো একরাশ বই আর খাতার নিচ থেকে। সেই খাতার প্রথম পাতা খুলে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এর মানে আরেকটু বড় হলে বুঝবে।’ দেখলাম খাতার পাতায় লেখা একটা আট লাইনের কবিতা। সেটা সেইদিন থেকে প্রায় বারো বছর অবধি ছিল আমার একার জিনিস। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেটা পত্রিকা আর বইয়ের পাতায় ছাপা হওয়ার ফলে হয়ে গেল সকলের। কবিতাটি হলো :
‘বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্ব্বতমালা
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু।’

সেই অসীমের ইশারা মেলেনি রোগশয্যায় ভোরের চড়–ই পাখির ডাকে
ওগো আমার ভোরের চড়–ই পাখি
একটুখানি আঁধার থাকতে বাকি
ঘুমঘোরের অল্প অবশেষে
শাসির ’পরে ঠোকর মারো এসে,
দেখ কোনো খবর আছে নাকি।
তাহার পরে কেবল মিছিমিছি
যেমন খুশি নাচের সঙ্গে
যেমন খুশি কেবল কিচিমিচি;
নির্ভীক ওই পুচ্ছ
সকল বাধা শাসন করে তুচ্ছ।
যখন প্রাতে দোয়েলরা দেয় শিস
কবির কাছে পায় তারা বকশিশ;
সারা প্রহর একটানা এক পঞ্চম সুর সাধি
লুকিয়ে কোকিল করে কী ওস্তাদি –
সকল পাখি ঠেলে
কালিদাসের বাহবা সেই পেলে।
তুমি কেয়ার করো না তার কিছু,
মানো নাকো স্বরগ্রামের কোনো উঁচু নিচু।
কালিদাসের ঘরের মধ্যে ঢুকে
ছন্দভাঙা চেঁচামেচি
বাধাও কী কৌতুকে।
নবরতœসভায় কবি যখন করে গান
তুমি তারি থামের মাথায় কী কর সন্ধান।
কবিপ্রিয়ার তুমি প্রতিবেশী,
সারা মুখর প্রহর ধ’রে তোমার মেশামেশি।
বসন্তেরই বায়না-করা
নয় তো তোমার নাট্য,
যেমন-তেমন নাচন তোমার –
নাইকো পারিপাট্য।
অরণ্যেরই গাহন-সভায় যাও না সেলাম ঠুকি,
আলোর সঙ্গে গ্রাম্য ভাষায় আলাপ মুখোমুখি;
কী যে তাহার মানে
নাইকো অভিধানে –
স্পন্দিত ওই বক্ষটুকু তাহার অর্থ জানে।
ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে কী কর মস্করা,
অকারণে সমস্ত দিন কিসের এত ত্বরা।
মাটির ’পরে টান,
ধুলায় কর ম্লান –
এমনি তোমার অযতেœরই সজ্জা
মলিনতা লাগে না তায়, দেয় না তারে লজ্জা।
বাসা বাঁধো বাজার ঘরের ছাদের কোণে –
লুকোচুরি নাইকো তোমার মনে।

অনিদ্রাতে যখন আমার কাটে দুখের রাত
আশা করি দ্বারে তোমার প্রথম চঞ্চুঘাত।
অভীক তোমার, চটুল তোমার,
সহজ প্রাণের বাণী
দাও আমারে আনি –
সকল জীবের দিনের আলো
আমারে লয় ডাকি,
ওগো আমার ভোরের চড়–ই পাখি।

জোড়াসাঁকো
১১ নভেম্বর ১৯৪০। প্রাতে

রোগশয্যায়ের ২১ সংখ্যক কবিতায় সেই অসীমের কথাই কবিকে মনে করিয়ে দিল এক গোলাপ ফুলে :
সকালে জাগিয়া উঠি
ফুলধানে দেখিনু গোলাপ;
প্রশ্ন এল মনে –
যুগ-যুগান্তের আবর্তনে
সৌন্দর্যের পরিণামে যে শক্তি তোমারে আনিয়াছে
অপূর্ণের কুৎসিতের প্রতি পদে পীড়ন এড়ায়ে,
সে কি অন্ধ, সে কি অন্যমনা,
সেও কি বৈরাগ্যব্রতী সন্ন্যাসীর মতো
সুন্দরে ও অসুন্দরে ভেদ নাহি করে –
শুধু জ্ঞানক্রিয়া, শুধু বলক্রিয়া তার,
বোধের নাইকো কোনো কাজ?
কারা তর্ক করে বলে, সৃষ্টির সভায়
সুশ্রী কুশ্রী বসে আছে সমান আসনে –
প্রহরীর কোনো বাধা নাই।
আমি কবি তর্ক নাহি জানি,
এ বিশ্বেরে দেখি তার সমগ্র স্বরূপে –
লক্ষকোটি গ্রহতারা আকাশে আকাশে
বহন করিয়া চলে প্রকা  সুষমা,
ছন্দ নাহি ভাঙে তার সুর নাহি বাধে,
বিকৃতি না ঘটায় স্ফলন;
ঐ তো আকাশে দেখি স্তরে স্তরে পাপড়ি মেলিয়া
জ্যোতির্ময় গোলাপ।

উদয়ন
২৪ নভেম্বর ১৯৪০। প্রাতে
কবির কাছে গোলাপের উপমাটি বড় প্রিয় ছিল যার কথা তিনি তাঁর দুটো প্রবন্ধে ‘সীমার সার্থকতা’ ও ‘সীমা ও অসীমতা’য় বলেছেন।
আর আরোগ্যর ৭ সংখ্যক কবিতায় যখন শেষ বয়সের কালিমার আক্রমণে হার মানে মন তখন কবির বিশ্বাসে দেখা দেয় দিনের পতাকাখানি স্বর্ণকিরণের রেখা-আঁকা :
হিংস্র রাত্রি আসে চুপে চুপে,
গতবল শরীরের শিথিল অর্গল ভেঙে দিয়ে
অন্তরে প্রবেশ করে,
হরণ করিতে থাকে জীবনের গৌরবের রূপ –
কালিমার আক্রমণে হার মানে মন।
এ পরাভবের লজ্জা এ অবসাদের অপমান
যখন ঘনিয়ে ওঠে সহসা দিগন্তে দেখা দেয়
দিনের পতাকাখানি স্বর্ণকিরণের রেখা-আঁকা;
আকাশের যেন কোন্ দূর কেন্দ্র হতে
উঠে ধ্বনি ‘মিথ্যা মিথ্যা’ বলি।
প্রভাতের প্রসন্ন আলোকে
দুঃখবিজয়ীর মূর্তি দেখি আপনার
জীর্ণদেহদুর্গের শিখরে।

উদয়ন
২৭ জানুয়ারি ১৯৪১। সকাল
কবির কাছে মৃত্যু কখনো চরম সত্য নয়। মৃত্যু জীবনের পরম পরিপূর্ণতা। সেই মৃত্যুর মধ্যে ডুব দিয়ে সীমা পায় অসীমত্বের অমৃত আশীর্বাদ। মৃত্যুই জরাজীর্ণ জীবনকে বারবার মুক্তি দেয় নতুন করে।
সীমা ছাড়া অসীমের প্রকাশ অসম্ভব। আবার একটা বিশেষ সীমার মধ্যে অসীম-প্রকাশের সার্থকতা নেই। কবি নিজের সত্তায় বিশ্বের সত্তা অনুভব করেন। তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন না। তিনিই অসীমের মধ্যে দুঃখ-সুখের তরঙ্গ তুলেছেন। কবি আছেন বলেই এপারে-ওপারে যোগাযোগের সম্ভাবনা হয়েছে। গীতাঞ্জলির ১২১ সংখ্যক কবিতায় তাই তিনি বলেছেন :
আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর
তোমার প্রেম হোতো যে মিছে।
অসীমের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলেই কবি মনে করেন তিনি বুদ্ধি ও চৈতন্যের জগৎকে উপলব্ধি করতে পারেন। মানুষ মর্তসীমাকে অধিকার করেই আজ না সব বাধা অতিক্রম করছে। কবির ‘আমি-তুমি’র একত্রকরণ বা একত্রীভবনের ওপর বাউল-সুফিদের ছায়া পড়েছে। তিনি মনসুর হাল্লাজের মতোই প্রায় বলে ফেলেছেন, ‘আনাল হক’ – ‘আমিই সত্য।’ ‘হক’ শব্দটি আল্লাহর নিরানব্বইটি সুন্দর নামের একটি। এ-ধরনের একীভবনের মধ্যে যেমন রয়েছে ঈশ্বরের কাছে আÍসমর্পণ বা তাঁর প্রতি পরম আস্থা-ভরসা তেমনি রয়েছে ঈশ্বর-প্রেম-উত্তরণের এমন এক অহংকার যার বলে অহং বলতে পারে ‘সোহহম্।’
‘মানুষের ধর্মে’ কবি বললেন, ‘মানুষ আছে তার দুই ভাবকে নিয়ে, একটা তার জীবভাব, আর-একটা বিশ্বভাব। জীব আছে আপন উপস্থিতকে আঁকড়ে, জীব চলছে আশু প্রয়োজনের কেন্দ্র প্রদক্ষিণ করে। মানুষের মধ্যে সে-জীবকে পেরিয়ে গেছে যে সত্তা সে আছে আদর্শকে নিয়ে। এই আদর্শ অন্নের মতো নয়, বস্ত্রের মতো নয়। এ আদর্শ একটা আন্তরিক আহ্বান। এ আদর্শ একটা নিগূঢ় নির্দেশ। কোন্ দিকে নির্দেশ। যে দিকে সে বিচ্ছিন্ন নয়, যে দিকে তার পূর্ণতা, যে দিকে ব্যক্তিগত সীমাকে সে ছাড়িয়ে চলেছে, যে দিকে বিশ্বমানব।’
কবির ধারণা, ‘মানুষও আপন অন্তরের গভীরতর চেষ্টার প্রতি লক্ষ করে অনুভব করেছে যে, সে তবু ব্যক্তিগত মানুষ নয়, সে বিশ্বগত মানুষের একাÍ। সেই বিরাট মানব ‘অবিভক্তঞ্চ ভূতেষু বিভক্তমিব চ স্থিতম্’। সেই বিশ্বমানবের প্রেরণায় ব্যক্তিগত মানুষ এমন-সকল কাজে প্রবৃত্ত হয় যা তার ভৌতিক সীমা অতিক্রমণের মুখে। যাকে সে বলে ভালো, বলে সুন্দর, বলে শ্রেষ্ঠ – কেবল সমাজরক্ষার দিক থেকে নয় – আপন আÍার পরিপূর্ণ পরিতৃপ্তির দিক থেকে।
ডিমের ভিতরে যে পাখির ছানা আছে তার অঙ্গে দেখতে পাই ডানার সূচনা। ডিমে বাঁধা জীবনে সেই ডানার কোনো অর্থই নেই। সেখানে আছে ডানার অবিচলিত প্রতিবাদ। এই অপরিণত ডানার সংকেত জানিয়ে দেয়, ডিমের বাইরে সত্যের যে পূর্ণতা আজো তার কাছে অপ্রত্যক্ষ সেই মুক্ত সত্যে সঞ্চরণেই পাখির সার্থকতা। তেমনিই মানুষের চিত্তবৃত্তীয় যে ঔৎসুক্য মানুষের পূর্ণ সত্যের সাক্ষ্য দেয় সেইখানেই অনুভব করি তার ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য থেকে মুক্তি। সেইখানে সে বিশ্বাভিমুখী।’

আমাদের বাউলদের কথা উল্লেখ করে কবি বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশের বাউল বলেছে –
মনের মানুষ মনের মাঝে করো অন্বেষণ।…
একবার দিব্যচক্ষু খুলে গেলে দেখতে পাবি সর্বঠাঁই।
সেই মনের মানুষ সকল মনের মানুষ, আপন মনের মধ্যে তাঁকে দেখতে পেলে সকলের মধ্যেই তাঁকে পাওয়া হয়। এই কথাই উপনিষদ বলেছেন, যুক্তাÍানঃ সর্বমেবাবিশন্তি। বলেছেন, তং বেদ্যং পুরুষং বেদ – যিনি বেদনীয় সেই পূর্ণ মানুষকে জানো; অন্তরে আপনার বেদনায় যাঁকে জানা যায় তাঁকে সেই বেদনায় জানো, জ্ঞানে নয়, বাইরে নয়।
আমাদের শাস্ত্রে সোহহম্ বলে যে তত্ত্বকে স্বীকার করা হয়েছে তা যত বড়ো অহংকারের মতো শুনতে হয় আসলে তা নয়। এতে ছোটোকে বড়ো বলা হয়নি, এতে সত্যকে ব্যাপক বলা হয়েছে। আমার যে ব্যক্তিগত আমি তাকে ব্যপ্ত করে আছে বিশ্বগত আমি। মাথায় জটা ধারণ করলে, গায়ে ছাই মাখলে, বা মুখে এই শব্দ উচ্চারণ করলেই সোহহম্-সত্যকে প্রকাশ করা হলো, এমন কথা যে মনে করে সেই অহংকৃত। যে আমি সকলের সেই আমিই আমারও এটা সত্য, কিন্তু এই সত্যকে আপন করাই মানুষের সাধনা। মানুষের ইতিহাসে চিরকাল এই সাধনাই নানা রূপে নানা নামে নানা সংকল্পের মধ্য দিয়ে চলেছে। যিনি পরম আমি, যিনি সকলের আমি, সেই আমিকেই আমার বলে সকলের মধ্যে জানা যে পরিমাণে আমাদের জীবনে আমাদের সমাজে উপলব্ধ হচ্ছে সেই পরিমাণেই আমরা সত্য মানুষ হয়ে উঠছি। মানুষের রিপু মাঝখানে এসে এই সোহহম্-উপলব্ধিকে দুই ভাগ করে দেয়, একান্ত হয়ে ওঠে অহম্।’
কবি বলেন, ‘সোহহম্ সমস্ত মানুষকে সম্মিলিত অভিব্যক্তির মন্ত্র, কেবল একজনের না। ব্যক্তিগত শক্তিতে নিজে কেউ যতটুকু মুক্ত হচ্ছে সেই মুক্তি তার নিরর্থক যতক্ষণ সে তা সকলকে না দিতে পারে।’
কবির শেষ কথা, ‘দুঃখ আসে তো আসুক, মৃত্যু হয় তো হোক, ক্ষতি ঘটে তো ঘটুক – মানুষ আপন মহিমা থেকে বঞ্চিত না হোক, সমস্ত দেশ সকলকে ধ্বনিত করে বলতে পারুক ‘সোহহম্।’
এ এক এমন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যা বোঝানো যায় না, হয়তো উপলব্ধি করা যায়। যিনি এই উপলব্ধি অর্জন করেন তার পক্ষেও সেই উপলব্ধির ওপর ভর করে কোনো ধর্ম প্রবর্তনা করা সহজ নয়। কবি সহজভাবে তাঁর ধর্মকে বলেছেন, মানুষের ধর্ম।
রবীন্দ্রনাথের মানুষের ধর্ম (১৯৩৩) তাঁর ইংরেজি গ্রন্থ ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ (১৯৩০)-এর অনুবাদ, সার সংকলন বা সম্প্রসারণ বাংলা গ্রন্থ নয়, যদিও উভয়ের নাম ও আলোচ্য বিষয় একই। ইংরেজি গ্রন্থের ভূমিকা [These)] contain also the gleanings of my thoughts on the same subject from the harvest of many lectures and addresses delivered in different countries of the would over a considerable period of my life.
The fact that one theme runs through all only proves to me that the Religion of Man has been growing within my mind as a religious experience and not merely as a philosophical subject, In fact, a very large portion of my writings, beginning from the earlier products of my immature youth down to the present time, carry an almost continuous trace of the history works I have started and the words I have uttered are deeply linked by a unity of inspiration whose proper definition has often remained unrevealed to me.
সহজ বাংলা অনুবাদে ওই কথাগুলো দাঁড়ায় : ‘জীবনের বেশ কিছু সময় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রদত্ত আমার একাধিক বক্তৃতা ও ভাষণের কথা থেকে কুড়োনো শস্যকণা রয়েছে আমার এসব  চিন্তায়। সত্য এই, একই বিষয় সকলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই প্রমাণ করে যে রিলিজিন অব ম্যান আমার মনে গড়ে ওঠে শুধু একটা দার্শনিক বিষয় হিসেবে নয় বরং এক ধর্মীয় অভিজ্ঞতায়। বস্তুত, যৌবনের পূর্বেকার রচনার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমার রচনার বৃহদংশ এই গড়ে ওঠার ইতিহাসে একটা ক্রমাগত রেশ রয়ে গেছে। আজ আমি এ ব্যাপারে সচেতন। যে-কাজ আমি শুরু করি এবং যে-শব্দ আমি উচ্চারণ করি সবই গভীরভাবে যুক্ত একই প্রেরণার ঐক্য যার যথার্থ সংজ্ঞা আমার কাছে প্রায়শ অজানা রয়ে গেছে।’
রবীন্দ্রনাথের সীমা-অসীম বিভাজনের পশ্চাতে রয়েছে নানা প্রভাব। জন্মান্তরবাদ, ব্রহ্মচেতনা, প্রকৃতির জ্ঞান ও সংসারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলেছে তাঁর কবিকল্পনা, বিশ্ববোধ ও মানবহিতৈষা। গীতার প্রতি কবির তেমন আকর্ষণ ছিল না। তাঁর টান উপনিষদের প্রতি। সেই বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিষদ তাঁর কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। বাস্তবকে যথার্থ অবধান ও অনুসন্ধানের জন্য তিনি প্রেম ও ভক্তির প্রয়োজন অনুভব করেন।
কল্প থেকে কল্পান্তরে জন্ম থেকে জন্মান্তরে কবি অসীমের সঙ্গে সীমার এক গভীর যোগ অনুভব করেন।
উপমহাদেশের মরমী কবি, বাউল-ফকির এবং মুসলিম সুফিদের প্রভাব ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিমনে। বর্তমানে মুসলিমবিশ্বে সুফিমতবাদীরা আত্মরক্ষায় তটস্থ। সুফিদের ধারণা, সৃষ্টিকর্তা ও তাঁর সৃষ্টি এক বেদনার বাঁধনে বাঁধা। একাদশ শতাব্দীর মরমীর এক কাহিনিতে বলা হয়েছে যে এক সুফির প্রার্থনাকালে আল্লাহ তাঁকে বললেন, ‘ওহে, আবুল হোসেন, তুমি কী চাও যে তোমার পাপের কথা সকলকে আমি বলে দিই যাতে লোকে পাথর মেরে তোমার প্রাণ নেয়?’
প্রার্থনাকারী ফিসফিস করে বলেন, ‘প্রভু তুমি কী চাও যে তোমার কথা আমি যা জানি তা লোককে বলে দিব, যাতে তোমাকে সিজদা করতে কেউ যেন নিজেকে বাধ্য মনে না করে?’
আল্লাহ তাঁর কণ্ঠস্বর নিচু করে বললেন, ‘তোমার গোপন কথা তুমি গোপন রাখ, আমারটা আমি গোপন রাখব।’
এই সুফি ধারণা ইবনে তাইমিয়ার (১২৬৩-১৩২৮) প্রেরণায় বর্তমান কালের তালেবান ও সালাফিরা সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে। ইবনে তাইমিয়ার মতে আল্লাহকে প্রেমের দৃষ্টিতে দেখা অন্যায় নয়। কিন্তু তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য আরো বড় কথা। আর প্রকৃত মুসলমানকে হজরত মুহাম্মদ (দ.)-এর মৃত্যু-পরবর্তী তিন প্রজন্মের সালাফ বা পূর্বপুরুষদের রীতিনীতিকে বাধ্যতামূলক ভেবে মেনে চলতে হবে। সুফিদের উদ্ভট, উচ্ছৃঙ্খল এবং কখনো কখনো অঘোরন্থাকে বেদতি জেনে সমূলে উৎখাত করতে হবে।
আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি, চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রের পরিক্রমা, দিন ও রাত্রির পরিবর্তন, ঊষার উন্মেষ, মৃত ধরিত্রীর পুনরুজ্জীবন, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জীবনোপকরণ-প্রেরণ ইত্যাদির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, এসবের মধ্যে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছেন। ওইসব চিন্তাশীল ব্যক্তির জন্য রবীন্দ্রনাথের সীমাসীম তত্ত্ব নিশ্চয় কৌতূহলোদ্দীপক হবে।
আর যাঁরা পরকালে বিশ্বাস করেন না, জন্মান্তরবাদ মানেন না, ইহকালই যাদের জন্য শুরু ও শেষ, জীবন যাদের কাছে এক অর্থহীন যন্ত্রণা যা কেবলই বিশেষ মূল্যদানে অর্থপূর্ণ ও সার্থক হয়ে ওঠে, তাদের কাছে কবির তত্ত্বকথা বায়বীয় ও উদ্বায়ী মনে হতে পারে, তবে কবিকল্পনার উপমা- রূপক, উপমান ও উপমেয়ের মাঝের অভেদ কল্পনা মনোমুগ্ধকর ও আকর্ষণীয়ও মনে হতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার