সুবর্ণ-রেখা সীতার ছিন্নমূল যাত্রা

লেখক:

সর্বশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ঋত্বিক ঘটক ১৯৬২ সালে তৈরি করলেন সুবর্ণ-রেখা (The Golden Thread)। সাধারণত গল্পের বিশেষ পক্ষপাতী না হয়েও আমরা  তাঁকে গল্প বলতে দেখলাম, কিন্তু তিনি এমনভাবে গল্প বললেন যে, তাঁর হাত ধরে অনেক কাকতালীয়তার মধ্যেও আমরা ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করলাম। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘…আজ স্পষ্টই বোঝা যায় ঋত্বিক ঘটকের পক্ষে এই ছবি ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব চুক্তিপত্র… তাঁর সব ছবিতেই শিকড়ে ফিরে যাবার টান আছে, কিন্তু মহাপ্রস্থানের পরে স্বর্গারোহণ পর্বে মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি চেতনার এত তীব্র  জ্যা-বদ্ধ টান আর কোথাও নেই।’১ ছবি শুরু হয় এভাবে যে, ভারতের স্বাধীনতার পর পাবনা থেকে আসা এক নিম্নমধ্যবিত্ত উদ্বাস্ত্ত পরিবার নতুন করে কলকাতায় এসে জীবন গড়ে তুলতে চাইছে, নতুন কলোনির নাম ‘নব জীবন কলোনী’। এই কলোনির লোকেরা ‘বন্দে মাতরম’ বলে জালিয়ানওয়ালাবাগ দিবসে কলোনির উদ্বোধন করে, শিক্ষাই এদের মেরুদ- কিন্তু আবার ঢাকা-পাবনা বিভেদও এদের মধ্যে স্পষ্ট। তাই ঢাকার বাগদী-বউ কৌশল্যা (অভিনয়ে গীতা দে), অভিরামের মাকে যখন জমিদারের লোকেরা সকলের সামনে ধরে নিয়ে যায় তখন তাকে রক্ষা করার জন্য সকলকে একজোট হতে দেখা যায় না। আমরা ভাবতে বাধ্য হই যে, উদ্বাস্ত্তর মধ্যেও উদ্বাস্ত্ত হতে হয়, যেমন হয়েছে কৌশল্যা। এরপর অনাথ অমত্ম্যজ-অভিরামের দায়িত্ব নেয় ঈশ্বর চক্রবর্তী নামে নবজীবন কলোনির মাস্টারমশাই। ঈশ্বর চক্রবর্তী (অভি ভট্টাচার্য) এবং তাঁর বোন সীতা (অভিনয়ে মাধবী মুখার্জি) দেশভাগের সময় বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছে। সীতা তাই বালিকাবস্থা থেকেই এক প্রকার ছিন্নমূল, যদিও সে অভিভাবকরূপে তার থেকে অনেক বড় দাদা ঈশ্বরকে পেয়েছে। ঈশ্বর চক্রবর্তী একদিন তাঁর প্রাক্তন বন্ধু রামবিলাসের ঘাটশিলার কাছে ছাতিমপুরে একটি কোম্পানিতে কাজ পায় এবং সীতা ও অভিরামকে (সতীন্দ্র ভট্টাচার্য) নিয়ে সেখানে চলে যায়, আপাতভাবে অবশ্য ঈশ্বর তার কলোনির অপর সংগঠক হরপ্রসাদকে (অভিনয়ে বিজন ভট্টাচার্য) জানায় যে, সীতার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সে কলোনি ছেড়ে দূরে চাকরি করতে চলেছে। ছাতিমপুরে অভিরাম আর সীতা ছিল খেলার সাথি। একদিন সীতা আর অভিরাম খেলতে-খেলতে পরিত্যক্ত বিমানপোতে এসে পড়ে, এবং ছোট্ট মেয়ে সীতা বহুরূপী কালীর (মহাকাল) মুখোমুখি হয় এবং ভয় পেয়ে যায়। তারপর অবশ্য সীতা জানতে পারে যে, পয়সার জন্য মানুষ ওইরূপ ‘বহুরূপী’ সেজেছিল। পরিচালক বলেন, আমরাও জীবনপ্রবাহে চলার পথে ওই প্রকার মহাকালের মুখোমুখি হয়ে পড়ি। ছাতিমপুরে যাওয়ার পর অভিরামকে হোস্টেলে রেখে পড়ানো হয়। ছাতিমপুরে ঈশ্বর ও সীতা পরস্পরকে নির্ভর করে দিন অতিবাহিত করতে থাকে। ছোট্ট মেয়ে সীতা ধীরে-ধীরে বড় হয়, ‘দাদামণি’র সে এখন অভিভাবক হয়ে ওঠে। ঈশ্বর চক্রবর্তী সীতার মধ্যে তার আচরণ-স্বভাবে নিজের মাকে দেখতে পায় এবং সীতাও জানায় যে, সেও তার দাদামণির মা। কিন্তু বিষয়টি শুধু এভাবেই দেখেননি চলচ্চিত্র সমালোচক-অধ্যাপক মৈনাক বিশ্বাস। তাঁর মতে, চলচ্চিত্রে ওই দৃশ্যেই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত ছিল। তিনি বলেন, – ‘As

the director keeps playing with his favourite low-angle shots the impending destruction comes to be signaled through the image. Iswar draws Sita close to him, asks her low how she could exactly be like the mother she has never seen. Sita leans forward, caresses his forehead and whispers in his ear that she is his mother. We see the two of them in an extreme low-angle shot that takes in part of the fan whirling on the celling. The strain on the limits of the frame begins to point to the breaching of the borders of named relations. Later, after Sita’s desertion, the frame will be repeated :  Iswar would try to hang himself from the hook

where the fan was hanging in the earlier scene.’২ বর্তমানে গবেষক অবশ্য এই মত পোষণ করেন না, কারণ শুধু-শুধু একটি সাধারণ বিষয়কে জটিল করা হয়েছে, ভারতীয় তথা বাঙালির সামাজিক-পারিবারিক জীবনযাপন পদ্ধতিতে বিষয়টি ঈশ্বরের দিক থেকে এক ধরনের নস্টালজিয়া (পরিণত সীতাকে দেখে মায়ের স্মৃতি রোমন্থন) ভাবা যেতে পারে, সীতার দিক থেকে বিষয়টি হলো যে তখনো পর্যন্ত বাসত্মবে মা না হয়ে থাকলেও সীতা এবং সীতারা যুগ-যুগ ধরে মাতৃত্বের ভাবকে অবচেতন সত্মরে পালন করে এসেছে। চলচ্চিত্রে আমরা সীতাকে পুতুল খেলতে দেখি না, কারণ ছোট থেকেই সে বাসত্মবিকই সংসার দেখেছে। সীতার ছোটবেলায় ঈশ্বর যদি তার বাবার ভূমিকা পালন করে থাকেন, সীতা কি পরিণত বয়সে ঈশ্বরের মায়ের ভূমিকা পালন করতে পারে না? বরং গভীর নির্ভরতা আর মমত্বে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক হঠাৎই প্রশ্নের সম্মুখীন হলো, যখন অভিরাম লেখাপড়া শেষ করে ফিরে আসার পর সীতা আর অভিরাম উভয়েই বুঝতে পারল যে, তারা পরস্পরকে ভালোবাসে। অভিরাম লেখক, সে মানুষের
দুঃখ-জ্বালা-যন্ত্রণার কথা লেখে এবং স্বপ্ন দেখে একদিন লেখক হিসেবে সে প্রতিষ্ঠিত হবে। অভিরামের এই সাহিত্যচর্চা ঈশ্বরের কাছে অর্থহীন মনে হয়, কারণ এই ধরনের দুঃখবাদী সাহিত্য কোনো কারণেই অর্থকরী হয়ে উঠবে না; কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য অর্থ প্রয়োজন। ঈশ্বর অভিরামকে বোঝায় যে জার্মানিতে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আসাটাই তার ভবিষ্যতের পক্ষে বাসত্মববাদী সিদ্ধান্ত হবে। অভিরাম সীতাকে ছেড়ে দীর্ঘ চার বছরের জন্য জার্মানি যেতে দ্বিধান্বিত হয়। এরপর এক গ্রামীণ সাঁওতালি মেলায় অভিরাম সীতার জন্য মালা কিনে দেয়। মেলায় অভিরাম আর সীতাকে দূর থেকে একসঙ্গে দেখতে পায় ঈশ্বর, এই প্রথম সে বুঝতে পারে যে সীতা-অভিরাম পরস্পরের সঙ্গে অন্য এক সম্পর্কে আবদ্ধ, যা কখনো তার অভিপ্রেত নয়। এখানেই ঈশ্বর-সীতার সম্পর্কে ঈশ্বরের দিক থেকে এক যন্ত্রণা শুরু হয়। এই যন্ত্রণা সীতাকে অন্যের কাছে পাঠিয়ে দিতে হলে যে একাকিত্বের কষ্ট তার থেকেও বেশি। কারণ এই যন্ত্রণা হলো তীব্র অধিকারবোধের যন্ত্রণা। এতদিন ঈশ্বর ভেবে এসেছে যে, সেই-ই সীতার ভালো-মন্দের নিয়ন্ত্রক যেমন মহাকাব্যে ঘটেছিল (রামচন্দ্রের ওপর নির্ভর করেছিল সীতার ভবিষ্যৎ)। আজ সীতা স্বাধীনভাবে নিজের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নেবে – এ-ভাবনা ঈশ্বরের কাছে বজ্রাঘাতের মতো মনে হয়েছিল, নিজের কর্তৃত্বের প্রশ্নই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সমকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে পিতা বা জ্যেষ্ঠ ভাই-ই তো কন্যা-ভগ্নিদের সাধারণত বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতেন। সুতরাং চলচ্চিত্র অনুসারে সীতা ঈশ্বরের পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে একদিন সংসার করতে অন্যত্র চলে গেলেও ঈশ্বর একা হয়ে যেতেন। পার্থক্য হতো এটাই যে, সেখানে ঈশ্বরের কর্তৃত্ব বজায় থাকত। তাই চলচ্চিত্রে ঈশ্বরের যে-অস্থিরতা আমরা প্রত্যক্ষ করি তার কারণ অন্যত্র খুঁজতে হবে। ইতোমধ্যে রামবিলাস, যে ঈশ্বরকে চাকরি দিয়েছিল, সে ঈশ্বরকে কোম্পানির ব্যবসার অংশীদার করতে চায়, কিন্তু যখন শোনে যে, ঈশ্বর বাড়িতে নিচুজাতের ছেলেকে আশ্রয় দিয়েছে, তখন সে ঈশ্বরকে স্পষ্টভাবেই জানায় যে, জাতের প্রশ্নটা তার কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর বুঝতে পারে যে, তার এতদিনের শ্রম ব্যর্থ হতে চলেছে, সীতা আর অভিরামের সম্পর্ক না ভাঙতে পারলে তার পক্ষে  হয়তো আর কোম্পানির দুই ভাগ মালিকানা পাওয়া হয়ে উঠবে না। ঈশ্বর সীতার অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করলে সীতা বিয়ের দিনই অভিরামের সঙ্গে কলকাতায় চলে যায় ও সংসার শুরু করে। কিন্তু এই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কি সীতা খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিল? না, তা সে বাধ্য হয়েই নিয়েছিল, যখন তার দাদা সীতার অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল – আর এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অভিরামকে নিয়ে বিবাহিত জীবনের স্বপ্ন দেখলেও সীতা কি এক প্রকারের ছিন্নমূল হয়নি? সীতা তো দাদাকে ভালোবাসত, শ্রদ্ধা করত, তাই দাদাকে ছেড়ে যেতে কি সীতার কম যন্ত্রণা হয়েছিল? অন্যদিকে ঈশ্বর সীতার এই চলে যাওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে, পাগলের মতো জীবনযাপন শুরু করে সে। সীতার গোপনে চলে যাওয়ার পর ঈশ্বরের যে রিক্ততা তা শুধু সীতার  বিয়ে হয়ে যাওয়ার জন্য নয়, এ হলো ঈশ্বরকে অস্বীকারের যে যৌক্তিক স্পর্ধা সীতা দেখিয়েছিল, তাকে না মেনে নিতে পারার যে পরাজয় তার যন্ত্রণা। এ-সময় ঈশ্বরের এতদিনের পরিশ্রম-অর্জিত মান-সম্মান, অর্থ, ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সবই বিদ্রূপ হয়ে ফিরে আসে নিজের কাছে। এই মহাশূন্যতা আর যা-ই হোক কোনো সম্পর্কের সীমা অতিক্রমের পরিণতি বলে গবেষকের মনে হয়নি।

ইতিমধ্যে একটি পুত্রের জন্ম দেয় সীতা, নাম বিনু। কিন্তু সীতা-অভিরামের সংসারে ছিল তীব্র অর্থাভাব। যেহেতু সীতা খুব সুন্দর গান করত, পাশের প্রতিবেশী মহিলা গান গেয়ে অর্থ রোজগারের প্রস্তাব দেয় সীতাকে। এইভাবে অর্থ রোজগারের পশ্চাতে যে-ইঙ্গিত ছিল তা সীতা বুঝতে না পারলেও অভিরাম পেরেছিল এবং সেজন্যই যখন সে বুঝল যে তার সাহিত্য, সাধারণভাবে প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব তখন সে নিজের সঙ্গে প্রতারণা না করে সংসার বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে এক বাসচালকের চাকরি জোগাড় করে। কিন্তু প্রথম দিনই বাসের ব্রেক ঠিক না থাকায় অভিরাম একটি শিশুকে চাপা দিলে উত্তেজিত জনতা অভিরামকে হত্যা করে। সীতা আরো একবার ছিন্নমূল হলো – সে তার সকল যন্ত্রণার সাথিকে বাসত্মবিকভাবে হারাল – শুরু হলো তার একক সংগ্রামের জীবন। এই পরিস্থিতিতে ওই পূর্বের প্রতিবেশিনীর কথায় সীতা নিজের ও সমত্মানের জন্য গান শুনিয়ে রোজগার করার কথা ভাবতে বাধ্য হয়। এই সময় হরপ্রসাদের (অভিনয়ে বিজন ভট্টাচার্য) সঙ্গে পুনরায় ঈশ্বরের দেখা হয়। এই হরপ্রসাদ ছিল ‘নবজীবন কলোনী’র আর এক প্রধান সদস্য; কিন্তু তার স্ত্রীও আত্মহত্যা করেছিল অভাবের তাড়নায়। হরপ্রসাদ জীবন দিয়ে বুঝেছিল যে, কঠিন বাসত্মবের পরিপ্রেক্ষেতে আদর্শ কত মিথ্যা মায়া। হরপ্রসাদ একদিন ঈশ্বরের কাছে যায়। জানতে পারে, ঈশ্বরও আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছে। এ সবকিছুই হরপ্রসাদের কাছে পরাজয় মনে হয়, কারণ এই মৃত্যু নতুন কোনো পথ দেখাবে না। তার থেকে আর পাঁচজনের মতো স্রোতে গা ভাসানোই ভালো। হরপ্রসাদ ঈশ্বরকে কলকাতায় নিয়ে আসে, সেখানে তারা রেসের মাঠে যায়, তারপর যায় পানশালায়, সেখানে দুজনেই মদ্যপান করে, যখন আকণ্ঠ মদ্যপানে ঈশ্বর বেসামাল সেই সময় তার চশমাটি চোখ থেকে পড়ে যায়, (ক্যামেরা আমাদের পানাসক্ত ঈশ্বরের অন্তর্দৃষ্টি-হীনতার প্রতি আকর্ষণ করে)। ঈশ্বরের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। ওই অবস্থায় হরপ্রসাদ তাকে গান শুনতে নিয়ে আসে। প্রশ্ন জাগে যে, সেই সময় কি ঈশ্বর আদৌ স্বাভাবিক ছিল? দৃষ্টি ও মন উভয়ই স্বাভাবিক ছিল না। তার একটু আগেই পানশালায় হরপ্রসাদ ঈশ্বরকে পৌরাণিক কাহিনি থেকে জানায় যে, নচিকেতার আত্মজ্ঞান লাভ নিষিদ্ধ ছিল। এখানেই চূড়ান্ত ঘটনা ঘটে, গান শুনতে গিয়ে সে নিজের বোন সীতার মুখোমুখি হয়। উলেস্নখ্য যে, সীতার প্রতিবেশিনী তার কিছু আগেই সীতাকে জানায়, গ্রাম থেকে একজন গান শুনতে এসেছে, গান শুনেই চলে যাবে, খুশি হলে অনেক টাকাও দেবে। সীতা ওই অবস্থাতেও কিন্তু নিজের সম্ভ্রম রক্ষার কথা ভেবেছে, কারণ গান শোনানোর প্রকৃত অর্থ কী হতে পারে তা নিয়ে সীতার মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল, তাই সীতাকে আমরা গান শোনানোর পূর্বেই দেখি ‘বঁটি’কে হাতের সামনে রাখতে। ঈশ্বর প্রথমে বুঝতেই পারেনি সে কোথায়-কার ঘরে এসেছে, কারণ সে প্রকৃতিস্থ ছিল না, কিন্তু সীতা যখন বুঝতে পারল তার গান শুনিয়ে অর্থ রোজগারের প্রথম অতিথিটি তার দাদামণি ঈশ্বর চক্রবর্তী, এবং সে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই তখন তার নিজের প্রতি অথবা দাদামণির প্রতি এবং নিজের প্রতি লজ্জা আর অপমানবোধ এতটাই তীব্র হয়েছিল যে, এরপরও বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন সে অনুভব করেনি, তাই সীতা বঁটি তুলে নেয় এবং আত্মহত্যা করে। ঈশ্বর সীতার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে, দায়ী করে আমাদের সমাজকে, শেষ পর্যন্ত সকলকে।

চলচ্চিত্রে সীতার শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার সিদ্ধান্তটি সম্পর্কে একটি বিশেষ বক্তব্য রেখেছেন পরিচালকেরই এক ছাত্র কুমার
শাহানি; কিন্তু সেই বক্তব্যটিও গবেষকের মতে সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। Kumar Shahani বলেন, ‘… exposes a ‘general’ pathology, the self-destructive incestuous drive of a class, which is mirrored here in the relationship between lswar and Sita. What is more interesting to note in the lswar-Sita relationship, however is not incestuous drive, but something within the kinship bond… . which defies social naming, pre-exists known sexual elaborations including incest.’৩ মৈনাক বিশ্বাস তাঁর লেখায় কুমার শাহানিকে উলেস্নখ করেন যেখানে শাহানি আবার বলেছেন – ‘We are made to face our self-destructive incestuous longings which are otherwise so delicately camouflaged by both our sophisticated and vulgar filmmakers.’ ৪ প্রশ্নটা এখানেই যে, তাহলে কি ঈশ্বর আর সীতার সম্পর্কের মধ্যে বাসত্মবিক কোনো যৌন সম্পর্কজনিত অপবিত্রতার মাত্রা যোগ হলো? না তারা ভাইবোন বলেই? আর যদি সীতার পরিবর্তে অন্য কেউ থাকত তাহলে আমরা অন্য কিছু দেখতাম? বিষয়টির কি অতি সরলীকরণ হয়ে যায় না? আসলে পরিচালক ইচ্ছে করেই চূড়ান্ত মুহূর্তটি তুলে ধরার জন্যই এই ধরনের co-incidence ব্যবহার করেছেন। এ-বিষয়ে পরিচালক নিজেই তাই বলেছেন যে, ‘সুবর্ণ-রেখায় প্রচুর পরিমাণে co-incidence ব্যবহার করা হয়েছে – এ-কথা আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়েছে। সত্যিই ছবিটিতে co-incidence-এর সংখ্যা ভয়ংকর বেশি। কিন্তু ছবির যেটা প্রধান ঘটনা – ভাই একদিন বেশ্যাবাড়ি যাবে বলে বোনের ঘরে গিয়ে উঠল – সেটাই এত বড় co-incidence যে, আমি co-incidence-টাকেই একটা ফর্ম হিসেবে এ-ছবিতে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। গোড়া থেকেই co-incidence কোথায় কোথায় আসছে, সেটা দর্শককে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এরকম করেই একটা formal co-incidence-গুলোর মধ্যে অন্য দ্যোতনা

ঢুকিয়ে তাদেরকে গর্ভবতী করার চেষ্টা করেছি। যেমন ধরুন, ভাইয়ের বোনের ঘরে যাওয়া, গল্পে যেটা প্রতিপাদ্য বিষয় সেটাকে মনে রাখলে বুঝতে হবে যে, ওই ভাই যে কোনো মেয়ের ঘরেই যেত, সেও কিন্তু ওর বোনই হতো। এখানে খালি সেটা যান্ত্রিক সত্মরে টেনে দেখানো হয়েছে। এখানেও বিশেষের মধ্যে সামান্যের ব্যঞ্জনা দেওয়াই অন্বিষ্ট’৫। তাহলে পরিচালক তো মূল আঘাত চেয়েছেন ঈশ্বর বা ঈশ্বরদের সেই বোধের ওপর যে, নারী কখনোই পরিস্থিতির শিকার হয়ে পুরুষের ভোগ্যপণ্য হতে পারে না। পরিচালকের বক্তব্য অনুসারে যে-কোনো নারী-ই যদি ঈশ্বরের বোন হতে পারে, তাহলে শুধু রক্তের সম্পর্কযুক্ত সমাজস্বীকৃত ভাইবোনের ক্ষেত্রেই এ-সম্পর্ক নিষিদ্ধ-অপবিত্র নয়, অন্য কোনো নারী ও অপর কোনো ঈশ্বরের কাছে সীতাই হয়ে উঠবে – ভাইবোনের প্রসঙ্গটি এখানে বক্তব্যকে সাধারণীকরণ করতে হলে যে শক্ত নৈতিক ভিত্তি অনেক সময় ব্যবহার করা হয়, সেজন্যই গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া আরো একটি বিষয় বলা প্রয়োজন যে, ঈশ্বর কি খুব সচেতন ছিল, কলকাতায় এসে যখন গড্ডলিকা স্রোতে তার জীবনটা একদিনের মধ্যেই নানা ঘটনায় উদ্ভ্রামেত্মর মতো ভেসে চলছিল? পতিতালয়ে গিয়েই ঈশ্বর আনন্দ খুঁজতে চেয়েছিল? তাই যদি হতো তাহলে রেসকোর্স, হোটেলে মদ্যপান, নেশাসক্ত হওয়া – এসবের তো প্রয়োজন ছিল না। আসলে সীতা তার সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে চলে যাওয়ার পর ঈশ্বর তার পরিকল্পিত জীবন থেকে আকস্মিকভাবে চ্যুত হয়েছিল এবং সেজন্যই সে যে-কোনো উপায়ে নিজের অর্থহীন জীবনটাকে কোনোক্রমে বয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল – আত্মহত্যা আর তথাকথিত আনন্দের চোরা স্রোতে গা ভাসানো দুটোই তার কাছে সমান। ঈশ্বর তো নেশাসক্ত হয়ে, চশমা হারিয়ে প্রায় অন্ধের মতোই দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। তার আদৌ জানা ছিল না যে, সে কোথায় বা কেন যাচ্ছে – তাই ‘ভাই’ ‘বোনের’ ঘরে উপস্থিত হয়েছিল অজ্ঞানের মতোই, ঈশ্বরের বোধ জেগেছে অনেক পরে, সীতা যখন তার সামনেই আত্মহত্যা করেছে, ধীরে-ধীরে ঈশ্বরের ঝাপসা দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়েছে, তখনই ঈশ্বর ঘটনার গুরুত্ব অনুভব করে শিউরে উঠেছে, নেপথ্যে কে যেন বলে উঠেছে ‘হায় রাম!’ ঈশ্বরেরও মোক্ষ লাভ ঘটেছে। বরং সজ্ঞানে ছিল সীতা, কিন্তু ওইদিনটিই ছিল প্রথম দিন যেদিন সীতা ছেলেকে মানুষ করার জন্য, সংসার চালানোর জন্য, গান গেয়ে প্রথম অর্থ রোজগারের কথা ভেবেছিল। সীতা গান করে অর্থ রোজগার সম্পর্কের সঠিক অর্থ যে অন্য কিছুও হতে পারে সে-বিষয়ে সাবধান থাকার জন্যই কি বঁটিটা হাতের সামনে রাখেনি? সে তো ঈশ্বরের কথা আদৌ জানত না, তাহলে কেন তার এই সাবধানতা? সে কি যে-কোনো রাবণের স্পর্শ থেকেই তার সতীত্ব রক্ষার চেষ্টা করত না? সীতারা তো স্বামী ভিন্ন যে-কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হলে মুহূর্তে অপবিত্র হয়ে যায়, যদিও পুরুষেরা তা হয় না, কারণ সেটাই আমাদের সামাজিক নির্মাণ। সুতরাং সীতা শেষ পর্যন্ত আদৌ ‘পতিতা’ হতো কিনা তা আমাদের জানা নেই বরং এ-বিষয়ে তাকে আমরা যথেষ্ট সচেতন থাকতে দেখি – গান শোনানো আর পতিতা হওয়া নিশ্চয়ই এক নয় – যদিও আমরা তার পার্থক্য করতে শিখিনি, কিন্তু সীতা তার নিজের মতো করেই বিষয়টি বুঝেছিল। আসলে সীতার কাছে ঈশ্বরের আবির্ভাব সম্পূর্ণভাবে অপ্রত্যাশিত ছিল, তার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার ‘দাদামণি’ যখন অভিরাম আর তার সম্পর্ক স্বীকার করেনি তখন সে স্পষ্ট ভাষায় ঈশ্বরকে জানিয়েছিল যে, তার দাদামণি অন্যায় করছেন, কিন্তু এক্ষেত্রে সীতার কাছে তার চিরকালের
আদর্শ-পিতৃতুল্য দাদামণি ঈশ্বরের এই অবক্ষয়ের জন্য নিজের মৃত্যু ছাড়া প্রতিবাদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। মহাকাব্যে সীতাকে রামচন্দ্রের প্রতি বিশ্বসত্মতা প্রমাণের জন্য অগ্নিপরীক্ষা দিয়েও রক্ষা করা যায়নি, অপমান থেকে মুক্তি পেতে পৃথিবীর কন্যা পৃথিবীতেই ফিরে যান, আর আধুনিক সীতা ঈশ্বররূপী মানুষের বা মানুষরূপী ঈশ্বরের তীব্র অধিকারবোধ, অহংকার, খেয়ালিপনা এবং শেষ পর্যন্ত তার নিজেরই ব্যর্থতা, অসহায়তার যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে না, আর সেজন্যই নিজে আত্মহত্যা করে ঈশ্বরকে মুক্তি দেয়। আধুনিক সীতা কোনো অপরাধ করেই নি, অপরাধ না করেই সে চিরতরে জীবন থেকে ছিন্নমূল হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আসলে রূপকের হাত ধরে পরিচালক আমাদের অসিত্মত্বের সংকটকে তুলে ধরেছেন।

সুবর্ণ-রেখা তাই শুধু ভৌগোলিক সত্মরে দেশ ভাঙনের কথা বলে না, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু বলে যা শুধু দেশ ভাঙা বা না ভাঙার ওপর নির্ভর করে না – এ আমাদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট যা চূড়ান্ত পরিণতি পায় বুর্জোয়া-নাগরিক জীবনের পঙ্কিল আবর্তে। আসলে বৃহত্তর অর্থে আমরা সবাই কোথাও না কোথাও, কোনো না কোনোভাবে উদ্বাস্ত্ত – সব সময় হয়তো তা দৃশ্যগ্রাহ্য নাও হতে পারে। সুবর্ণরেখা সম্পর্কে পরিচালক নিজেই বলেন, ‘প্রত্যক্ষ সত্মরে সুবর্ণরেখা ছবিতে উপস্থাপিত সংকট উদ্বাস্ত্ত সমস্যাকে অবলম্বন করে আছে। কিন্তু উদ্বাস্ত্ত বা বাস্ত্তহারা বলতে এ-ছবিতে কেবল পূর্ববঙ্গের বাস্ত্তহারাদেরই বোঝাচ্ছে না – ওই কথাটির সাহায্যে আমি অন্যতর ব্যঞ্জনা দিতে চেয়েছি। আমাদের দিনে আমরা সকলেই জীবনের মূল হারিয়ে বাস্ত্তহারা হয়ে আছি – এটাও আমার বক্তব্য। ‘বাস্ত্তহারা’ কথাটিকে এইভাবে বিশেষ ভৌগোলিক সত্মর থেকে সামান্য সত্মরে উন্নীত করাই আমার অন্বিষ্ট। ছবিতে হরপ্রসাদের মুখের সংলাপে (আমরা ‘বায়ুভূত, নিরাবলম্ব’) কিংবা ছবির প্রথমেই প্রেসে একজন সাংবাদিকের মুখে, ‘উদ্বাস্ত্ত। কে উদ্বাস্ত্ত নয়?’ এই কথায় সেই ঈঙ্গিত-ই দেওয়া হয়েছে।’৬ উপরোক্ত বক্তব্যেরই সমর্থন শুনি পরবর্তীকালে চিত্র-সমালোচকের মুখে – ‘We all are refugees in different senses and in different ways. The world around us are so bizarre and queer that we discover ourselves as strangers in a second world. But we have no memory of our first world because it doesn’t exist. So always feeling like a stranger and getting in effect the purposelessness of our previous experiences we feel ourselves residing in a world which is absurd and alien. The journalist of Subarnarekha warns to sense us like that kind of absurdity.’৭

 

তথ্যসূত্র

১।     সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, ‘ভারতচরিতমানস সুবর্ণ রেখা’, অন্যান্য ও ঋত্বিকতন্ত্র, চলচ্ছবি, কলকাতা, ২০০৫, পৃ ৪৪-৪৫।

২।     Mainak Biswas, Her Mother’s Son : Kinship and History in Ritwik Ghatak, Rouge Press, p 5. Web accessed on 04.01.15.

৩।    lbid.

৪।     lbid, (মূল রচনা ‘Violence and Responsibility’, GHATAK-ARGUMENTS/ STORIES, p 62).

৫।     ঋত্বিককুমার ঘটক, চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৪১৩, পৃ ১৫৪।

৬।    ঋত্বিককুমার ঘটক, চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৪১৩, পৃ ১৫৩।

৭।             ‘Absurdity and lts cinematic Consequences’, Focus on Postmodernism and Cinema, Satyajit Ray, VIEWS REVIEWS interviews, A Journal of Cine Society, vol 15, 1997 Mosabani, p 79 for Subarnarekha.

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার