স্তব্ধতাই কীভাবে কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে’

লেখক:

শঙ্খ ঘোষ

সাক্ষাৎকার গ্রহণে দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ

প্রশ্ন : পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গ-কবিতাটি কি স্বপ্নে-পাওয়া কবিতা?

উত্তর : অনুমানটা ঠিকই। বেশ কয়েকটি লেখা আমার আছে, যা স্বপ্ন থেকে শুরু, কয়েকটির পুরোটাই স্বপ্ন। যেমন এই একটা।

প্রশ্ন : ভিন্ন অর্থে এই কাব্যগ্রন্থে আপনাকে সঞ্জয়ের মতো মনে হয় আমাদের, যিনি নামহারা গহ্বরের  দিকে ফিরে ক্রমাগত মৃত্যুচেতনার ধারাভাষ্য দিয়ে চলেছেন।

প্রিয় মানুষদের স্মৃতিঘেরা অনেক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলতে বলতে, তাদের সঙ্গে যাপিত যৌথ দিনগুলির আভাস দিতে দিতে এই কাব্যগ্রন্থের ‘আমি’ নিছক একজন মুক্ত ভাষ্যকার হয়ে থাকতে পারে না একসময়, সে নিজেও কখন ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়; একজন সহ-মৃতের ভূমিকায় তার নিজেরও অন্তর্জগতের কম্পন তুলে এনে এই যে কথা-বলে ওঠা, সেটা কি পা-ুলিপিতে প্রথম থেকেই ছিল, নাকি দর্শক হিসেবে দেখতে শুরু করে ‘আমি’ ক্রমশ সংযুক্ত হতে থাকে?

উত্তর : না, এর মধ্যে ‘ক্রমশ সংযুক্ত’ হবার মতো কোনো ক্রমিকতা নেই। এই একটি বই, যার পা-ুলিপিতে বা মুদ্রণকালে কোনো অদলবদল করতে হয়নি। সেইসঙ্গে একথা বলব যে, এই প্রশ্নে কবিতায় প্রচ্ছন্ন যে মানসিক জগতের আভাস বলা হলো, তাতে এর লেখক হিসেবে নিজেকে চরিতার্থ মনে হচ্ছে। মনোজগতের কম্পনটা তাহলে অন্তত একজন পাঠকের কাছে ঠিকভাবেই পৌঁছেছে।

প্রশ্ন : প্রকাশিত হওয়ার পর গত ৩৫ বছর ধরে এই কবিতাগুচ্ছের আমি এবং তুমি-কে ঘিরে অজস্র অনুচ্চারিত জিজ্ঞাসা সম্ভবত জমা হয়েছে। প্রথমত, ‘বসতি ফুরিয়ে যাওয়া জলজগুল্মের ভারে’ শরীর নুয়ে-পড়া যে-‘আমার বুকের কাছে নিশ্চিন্ত শকুন ডানা ঝাড়ে’, সেই ‘আমি’ কি মৃত? তবে যে ‘এসো ভালোবাসো, এসো, সন্দেহ কোরো না, ভালোবাসো, আমার কপালে আঁকো বেঁচে থাকা, চন্দন, আকাশ’, এমন সব অভিলাষ উচ্চারিত হয়!

দ্বিতীয়ত, ‘হীনতম অপব্যয়ে ফেলে রেখে গেছ এইখানে’ বলে যে-তুমিকে অনুযোগ জানানো চলে, যে-‘তোমার মুখের দিকে… নেমে আসে মুখ’, কবিতা থেকে কবিতায় সেই তুমিও যেন বদলে যায়। কখনো সদর্থক, কখনো নঞর্থক মনে হয় তাকে; কখনো সে নিছক একজন মানবী, কখনো তার সত্তা মহাজাগতিক।

 

* তোমার আঙুলে আমি ঈশ্বর দেখেছি কাল রাতে

(৫০ নম্বর কবিতা)

* তুমি এসে হাত পাতো, হাত রাখো পাথরে ধুলায়/ গাছ হয়ে যাবে সব গাছের শিরার মতো হবে (৪৮ নম্বর)

* আজও কেন নিয়ে এলে ভ্রষ্ট এই অন্ধ মৃত্যুজপ              (৫২ নম্বর)

*  তোমার ধ্যানের পুঞ্জ উঠেছিল আকাশের দিকে             (২৫ নম্বর)

এই কবিতাগুচ্ছ কি স-বিরতি একটি দীর্ঘ কবিতা? এখানে আমি এবং তুমির অবস্থান অবিচ্ছিন্ন কিনা, তাদের অভিমুখ একই দিকে কিনা জেনে নিতে চাই আপনার কাছ থেকে।

উত্তর : একাধিক প্রশ্ন বা ভাবনা জড়িয়ে আছে এখানে। শেষের কথাটা দিয়েই শুরু করি। হ্যাঁ, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দকে আমি একইসঙ্গে একটি দীর্ঘ কবিতা আর চৌষট্টিটি হ্রস্ব কবিতার সমাহার হিসেবে দেখতে পাই, দেখতে চাই। লেখাগুলি যখন শুরু হয়েছিল, তখন টুকরো টুকরো চার লাইনের স্বয়ংসম্পূর্ণ লেখা হিসেবেই আসছিল। কিন্তু পারম্পর্যে গ্রথিত হতে হতে যখন একদিন ‘এ আমার আলস্যপুরাণ’ কথাটিতে (৬৪-সংখ্যক) পৌঁছলাম, মনে  হলো কোনো সমে পৌঁছেছি। আশ্চর্য যে এরপর ওই পর্বে ঠিক                     এ-রকমভাবে আর আসেনি কোনো লেখা।

কিন্তু এখানে বড় প্রশ্নটা হলো আমি-তুমির অবস্থান নিয়ে। এটা ঠিকই যে, সে-অবস্থান এখানে চতুষ্কে চতুষ্কে বদলে গেছে। সেখানে কোনো ধারাবাহিকতায় নয়, প্রতিটি চতুষ্ক তার নিজের দাবিমতো তৈরি করে তুলেছে আমি-তুমির চরিত্র। তুমি-কে এই যে কোথাও সদর্থক কোথাও নঞর্থক লাগে, কোথাও মহাজাগতিক কোথাও মানবিক, কোথাও মৃত্যু কোথাও জীবন, তা যে আমার এই বইটিতেই কেবল আছে তা নয়, হয়তো আমার সব বইতেই আছে। এমনকি, আমার ধারণা, অনেক কবিরই লেখায় এই সঞ্চরণশীলতা আছে। চার দশকেরও বেশি আগে ‘কবিতার তুমি’ নামে ছোট একটি লেখায় এ-নিয়ে কিছু কথাও একবার বলেছিলাম।

প্রশ্ন : বিভিন্ন সময় আপনি জানিয়েছেন, ‘অসচেতন একটা ধাক্কা না থাকলে’ আপনি ছোট-বড় কোনো কবিতাই লিখতে পারেন না। এই কাব্যগ্রন্থটিকে সামনে রেখে আমার প্রশ্ন, প্রাথমিক এই অসচেতনতা থেকে রচিত কোনো কোনো কবিতা বা তার অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কি অন্য আরেকরকম সত্যি হয়ে ওঠে?

উত্তর : হ্যাঁ, সে তো হতেই পারে। কবিতার তো এই ‘সর্বনাম’ত্ব আছেই। সময়ভেদের সঙ্গে সঙ্গে – এমনকি পাঠকভেদের সঙ্গে সঙ্গে – তা ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রতিভাত হতেই পারে, হয়েই থাকে।

প্রশ্ন : কয়েকটি কবিতায় যেন স্বেচ্ছামৃত্যুর এক দীর্ঘ ছায়া এসে পড়েছে। ‘হাজার সিøপিং পিল মাথার ভিতরে আত্মহারা’, এই ধরনের কোনো কোনো পঙ্ক্তি থেকে ১৭, ১৯, ৪০ বা ৫২ নম্বর কবিতায় তেমন একটা আভাস  যেন পাওয়া যায়।

উত্তর : ৫২ নম্বর কবিতায়, ঠিক স্বেচ্ছামৃত্যুর কথা না হলেও, একটা মৃত্যুজপের কথা আছে, আছে এমনকি সিøপিং পিলের কথাও, কিন্তু তাহলেও এ-প্রশ্নে উল্লিখিত ওই টুকরোগুলিতে যা আছে তা মূলত এক অবসাদভার, হৃৎপি-ে অন্ধকারের বোধ, শাপগ্রস্ত দিনের ব্যর্থতার বোধ। সে-বোধ তো মনে হয় আমার লেখায় আগাগোড়াই ছড়ানো আছে। জীবনের খুব কাছে যেতে গেলে এ-বোধ তো প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। অন্তত আমার কাছে।

প্রশ্ন :  কোনো মুসলমান আত্মীয়ার মৃত্যুর ছায়া পড়েছে কি ৮, ১১ বা আরো কোনো কোনো কবিতায়? কিছু যদি জানান ওই কবিতা দুটো সম্পর্কে।

উত্তর : এটা ঠিক যে, কোনো কোনো নিকটজনের মৃত্যু-অভিঘাত এ-বইয়ের লেখাগুলির পটভূমিতে আছে, খুব প্রত্যক্ষে না হলেও, পরোক্ষে। বিশেষ যে-দুটি কবিতার কথা এখানে উঠে এলো, তারও মধ্যে পরোক্ষ তেমন কোনো ছায়া থাকা সম্ভব। যদিও তেমন কোনো সচেতনতায় আমি লিখিনি। কবিতাগুলি লেখা শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালে। তার ঠিক আগের বছরে আমার কিশোর বয়সের ফেলে-আসা জায়গা পাকশীতে গিয়েছিলাম, বাংলাদেশ হবার পর সেই প্রথম। গিয়ে শুনছিলাম রাজাকার আর পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচার আর হত্যাকা-ের কিছু মর্মান্তিক বিবরণ। আমি খোঁজ নিচ্ছিলাম আমার পুরনো বন্ধুদের, বিশেষত ঘনিষ্ঠতম এক বন্ধুর। তাকে যাঁরা জানতেন তাঁরা স্তব্ধ রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর জানালেন : ‘এই যেখানে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, তার নীচেই আছে এক গণকবর। সেইখানে সেও।’ শিউরে-ওঠা সেই মুহূর্তটা ভুলতে পারিনি অনেকদিন। হতে পারে তারও কোনো ছায়া রয়ে গেছে কোথাও। অবশ্য রবিউল ছিল না তার নাম।

প্রশ্ন : ‘আর্তনাদ করে ওঠে, দুহাত বাড়িয়ে বলে : এসো’; এই আহ্বান কে জানাচ্ছেন? মৃত্যু? (৬ নম্বর)

উত্তর : এই কথাটার কোনো উত্তর দেব না, দেওয়া যায় না। একটাই শুধু কথা বলি : কোনো বিশেষ একটা প্রতিশব্দ দিয়ে কোনো কবিতাকে ধরতে পারা মুশকিল।

প্রশ্ন : এই কবিতাগুচ্ছ কাব্যগ্রন্থে সাজানোর সময় ক্রম-নির্ধারণ এবং ৬৪টি কবিতার এই যে পরিক্রমা, তার কোরক-ভাবটি নিয়ে আপনি নিজেও কিছু যদি বলেন ভালো হয়।

উত্তর : তাহলে তো নিজের কবিতার নিজেই ব্যাখ্যা করতে হয়। কোরক-ভাব বিষয়ে তেমন-কিছু বলতে পারব না। বা, এই শুধু বলতে পারি যে, পাঠকের কাছে যে-ভাবটি পৌঁছচ্ছে (যদি কিছু পৌঁছয়) – সেটাই তার কোরক। আর অন্য একটা কথা বোধহয় আগেই বলেছি যে, বইতে সাজাবার সময়ে স্বতন্ত্র কোনো ক্রম-নির্ধারণ করেছি বলে মনে পড়ে না।

প্রশ্ন : ‘সবুজ, সবুজ হয়ে শুয়ে ছিল প্রাকৃত পৃথিবী/ ভিতরে ছড়িয়ে আছে খুঁড়ে-নেওয়া হৃৎপি-গুলি’ (৪১ নম্বর)

এই পঙ্ক্তি-দুটির অনুষঙ্গে জানতে চাইব, সহজে যা দেখতে পাওয়া যায় না, দেখার অবতলে তেমন চাপ-চাপ অভিজ্ঞতার অজানা কোনো সংশ্লেষ অথবা বিরোধাভাস থেকেই কি কবিতার জন্ম হয়?

উত্তর : বেশির ভাগ সময়েই তা-ই হয়। তবে কবিতার জন্ম-বিষয়ে কোনো একক পথ বা পদ্ধতির কথা আমি মানি না। নানা স্তরের কবিতার নানা রকম জন্মমুহূর্ত। যা সহজেই দেখতে পাওয়া যায়, অথচ যার বিষয়ে সবসময়ে আমি তত সচেতন থাকি না, তেমন কোনো দেখার আকস্মিক উদ্ভাস থেকেও ভালো কবিতার জন্ম হতে পারে অনেক সময়েই।

প্রশ্ন : কোনো কোনো পাঠক কবিতা বুঝতে চান তার অর্থ দিয়ে, অর্থ তেমন পরিষ্কার না হলে তার কাছে সেই কবিতা প্রথমে দুরূহ এবং শেষে পরিত্যক্ত। অনেক পাঠক আবার কবিতাকে ছুঁতে চায় সম্ভবত অর্থ পেরিয়ে-যাওয়া এক সংবেদ দিয়ে; ধরা যাক, এই কাব্যগ্রন্থের ৩৭ নম্বর কবিতাটি গোটা আবহের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে এই মুহূর্তে বুঝে ওঠা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। তবু, ‘এক মুহূর্তের তাপে কেন্দ্র ও পরিধি কাছাকাছি/ যা ছিল যা হবে তার দুই মুখ কথা বলে এসে…’, দ্বিতীয় ও তৃতীয় এই দুটি পঙ্ক্তি ঘুরেফিরে হাঁটতে-চলতে ফিরে আসছে আমার কাছে। আমার সঙ্গে কীভাবে যেন আত্মীয়তা গড়ে উঠছে তাদের। বাইরে থেকে গোটা কবিতাটিকে বুঝতে না-পারার যে নিরুপায়তা তার সঙ্গেই মিশে যাচ্ছে তাকে দুরূহ বলে পেরিয়ে যেতে না পারাও। কবিতা বুঝতে চাওয়ার, কবিতা ভালোবাসার এই দ্বিতীয় পথটির কি কোনোরকম সম্ভাবনা বা মান্যতা আছে?

উত্তর : শুধু যে মান্যতা আছে তা নয়। অনেক সময়ে দ্বিতীয় সেই পথটিরই সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বা মান্যতা। কবিতার ‘অর্থ’ বলতে কী বোঝায় কতদূর বোঝায়, এ নিয়ে দেশে-বিদেশে কথার কোনো অন্ত নেই। এক সময়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার ‘অর্থ’ বা ‘অর্থহীনতা’ নিয়ে তর্কবিবাদ হয়েছে বিস্তর, অনেক বিশিষ্টজনই সন্দেহ করেছেন সেসব কবিতার কবিত্বে। অস্পষ্টতার অভিযোগে আক্রমণাত্মক প্রবন্ধ লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলালের মতো লেখকেরা। উলটোদিকে প্রথম যৌবনে আমরা প্রায়ই আওড়াতাম ‘অৎং চড়বঃরপধ’ নামে আর্চিবল্ড্ ম্যাকলিসের একটি কবিতার শেষ দুটি লাইন। ‘অ ঢ়ড়বস ংযড়ঁষফ হড়ঃ সবধহ/ ইঁঃ নব.’ সরলার্থের বাইরে চলে-যাওয়া এই প্রবণতার ফলে হয়তো একরকম দুরূহতার সঞ্চার হয় কবিতায়। দুরূহতাই কবিতা নয়, কিন্তু কবিতা অনেক সময়েই গূঢ়ার্থে দুরূহ। এমনও ঘটতে পারে যে, স্বয়ং কবিকে তা ব্যাখ্যা করতে বললে তিনিও হয়তো অপারগ হবেন। যেমন, এই মুহূর্তে, উদ্ধৃত ওই লাইন দুটির কোনো অর্থ-দায়িত্ব আমিও নিতে পারব না।

 

গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ

প্রশ্ন : ‘কে আমাকে ডাকল, আমি জেগে উঠলাম’, এই বিভাব কবিতাটি যেন কবিতার সৃষ্টি-মুহূর্তের উন্মাদনার স্বরলিপি।

সেদিনের কথা, সেই মুহূর্তের কথা আমাদের বলুন না। শিমলায় সেই ভ্রমণের দিনগুলিতে পুরাণ বা ওই ধরনের কোনো প্রাচীন বইপত্র পড়ছিলেন? এই ধসনরবহপব গড়ে উঠল কীভাবে বুঝতে চাইছি।

উত্তর : কবিতার প্রথম ওই লাইনটি ঘটনাক্রমে আক্ষরিক সত্য। গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ লেখা শুরু হয়েছিল কীভাবে, বইটির কয়েক লাইনের ‘সূচনাকথা’য় তা বলা আছে। শিমলায় তখন আমি ছিলাম পাহাড়চুড়োয় অপরূপ এক প্রাসাদশীর্ষে, রাতের বেলায় সে-বাড়িতে সম্পূর্ণ একা। তার সঙ্গে মেলানো ছিল দিনরাতজোড়া ঘনমেঘে ঘিরে থাকা – দূরের পাহাড়গুলি থেকে নিজের ঘরের অভ্যন্তর পর্যন্ত। মূল ‘ধসনরবহপব’ এইটেই।

সে-সময়ে যে বিশেষ কোনো প্রাচীন বইপত্র পড়ছিলাম তা নয়। অবসর ছিল অবশ্য অবাধ আর দায়হীন। তখন পড়ছিলাম ইকবাল। তাঁর জাভিদনামা বইটির ইংরেজি অনুবাদ পড়তে পড়তে এতটাই আচ্ছন্ন লাগছিল যে অনুবাদ করবারও ইচ্ছে জাগে। ফারসি জানা একজন কারো সাহায্য নিয়ে সে-অনুবাদ-কাজে লিপ্ত হবার কথা ভাবি। অনুক্ষণ ওই বইটার সান্নিধ্য ছাড়া আর কোনো পুরাণপ্রসঙ্গের কথা মনে পড়ে না। তবে ওই বইটির সূত্রে অনেক ইসলামি ইতিহাস, বা ভারতীয় পুরাণের আনাগোনা ছিল মনে।

প্রশ্ন : ১৯৯৩-তে লাইনেই ছিলাম বাবা প্রকাশিত হবার পরের বছরেই গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ প্রকাশিত হয়। প্রথমটিতে, ‘পুলিশ কখনো কোনো অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ’ (ন্যায়-অন্যায় জানিনে) এবং দ্বিতীয়টিতে ‘পিঁপড়ের মতন মুখোমুখি/ চকিত আদর রেখে চকিতে পিছনে ফেলে যাওয়া/ মুহূর্তের স্বাদে গড়া ছোটো ছোটো চিনির বেসাতি -/ এসব তো খুব হলো’ (২৩ নম্বর) – ‘ধ্বংসাবশেষের শ্বাস শোনা’ সমানে চলতে থাকে এখানেও। তবে এই দুই কাব্যগ্রন্থে কবিতার স্থাপত্যস্বভাব সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী – প্রথমটি যেন ওপরের তলের আর দ্বিতীয়টি ভিতর-তলের। লাইনেই ছিলাম বাবা প্রকাশিত হবার পরের বছরেই গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ কি সচেতন কোনো ভাবনা থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল?

উত্তর : না, সচেতন কোনো ভাবনা ছিল না এর পিছনে, এ একটা নিরুপায় সংঘটন। বস্তুত প্রকাশ পারম্পর্যে লাইনেই ছিলাম বাবা অগ্রবর্তী হলেও, দু-একটি লেখা ছাড়া গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছর লেখাগুলিই অনেক আগেকার, তার সূচনা হয়েছিল ১৯৮৭-৮৮ সালে। আর অন্য বইটির লেখা শুরু ১৯৯১-তে। গান্ধর্বর প্রকাশে অনেকটা দেরি হবার কারণ নিতান্তই একটা প্রকাশক-ঘটিত জটিলতা। একজনকে কথা দিয়েছিলাম বইটি দেব বলে, অন্য একজন বিজ্ঞাপন দিয়ে বসেছিলেন বইটির, দুজনেই আমার স্নেহভাজন কাছের মানুষ। সাময়িকভাবে তাই বই প্রকাশটাই বন্ধ রাখি, এইমাত্র ব্যাপার।

প্রশ্ন : ১৯৮১ সালে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘প্রতিমুহূর্তে সতর্ক না থাকলে নিজের বিষয়ে কতগুলি মূর্খ ধারণা তৈরি হবার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়।’ এই কাব্যগ্রন্থের ২২ নম্বর কবিতায় দেখতে পাই, ‘তুমি দিয়েছিলে গোপনতা/ যেটুকু না হলে ফ্লুরোসেন্ট সাজানো বাজারে/ নিজেরই পালকগুলি নিজের শিখরে গুঁজে গুঁজে/ সখের মোরগ হয়ে ছিঁড়ে যেতে হতো অপঘাতে…’

আপনার নিজের ক্ষেত্রে কবিতায়-বলা জীবনটা বেঁচে থাকার পরিসর কি এইভাবে ছুঁয়ে গেল?

উত্তর : সেটা তো হওয়াই সম্ভব। তবে, বিস্মিত হচ্ছি এই ভেবে যে, সচেতন কোনো পাঠক কীভাবে অত দূরবর্তী একটা মন্তব্যের সঙ্গে এমন পরবর্তী কোনো কবিতার লাইনকে জড়িয়ে নিয়ে ভাবতে পারেন। এই যোগাযোগটা আমার পক্ষেও কিন্তু একটা আবিষ্কার।

প্রশ্ন : ‘তোমার সমস্ত গানে ডানা ভেঙে পড়ে বক।… প্রতি রাতে মরি তাই, প্রতিদিন আমি হন্তারক।’ (৪ নম্বর)

১৯৯৪ তে যখন এই কবিতাগুলি প্রকাশিত হয়, গানের দেবতা ছিলেন প্রখর সময়ের কাছে পরাজিত, ‘ভিখিরির মতো অন্ধ গলিতে রকের পাশে একা’। তার ‘উঠে এসো গান গাও বাঁচো’ বলবার ক্ষমতাটুকু ছিল না তখন। এই বইমেলায় কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হলে এই পঙ্ক্তিগুলো অপরিবর্তিত থাকতো কিনা জানতে ইচ্ছে করে। (১০, ১২ নম্বর)

উত্তর : সময়ের বাইরের চেহারাটাই, খ- চেহারাটাই যে ধরা থাকে কবিতায়, তা তো নয়। তাই কবিতার লাইনকে বছরে বছরে পালটাবার কথা তেমন ওঠে না। গানের দেবতা একই সঙ্গে পরাভবের বেদনা বুকে ধরতে পারেন, আবার হয়ে উঠতে পারেন উজ্জীবক। কিন্তু নিছক খ- সময়ের কথাও যদি হতো, ২০১৩ সালের এমন কী স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য? আরো পরাভব? না কিছু উজ্জীবন? কীভাবে, বা কেন পালটাতাম লাইনগুলি?

প্রশ্ন : আমার প্রশ্নে হতাশার দিকটাই উঠে এসেছে। আমার জানবার ইচ্ছে ছিল, সময়ের বাইরের যে-ক্ষত এই কাব্যগ্রন্থের বেশ কিছু জায়গায় স্পষ্ট হয়েছে, ওই বইমেলায় প্রথমবারের জন্য বইটি প্রকাশিত হলে তা কি কিছুটা আশাব্যঞ্জক বাঁক নিতে পারত?

উত্তর : মনে হয় না তা। এমনকি বাইরের অর্থেও সেই সময়টাকে আমার বাড়তি কিছু আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়নি। কথাটা বোধহয় আরেকটু খুলে বলা দরকার। আগেকার প্রশ্নে যে-লাইনগুলির প্রসঙ্গ ছিল, তার অন্তর্গত হতাশার (হতাশা না বলে বিষাদ বলতে আমি পছন্দ করব) কারণ হিসেবে লেখার সমসাময়িক বিপর্যস্ত বাস্তবতার কথা – রাজনৈতিক সামাজিক নষ্টামির কথা – কারো মনে হতে পারে। এসবের কিছুমাত্র চিহ্ন কবিতাগুলির মধ্যে নেই, তা হয়তো বলা যায় না। কিন্তু সেইটেই এর মূল স্পর্শ নয়। প্রতিমা-প্রতীক হিসেবে ওগুলি ওঠে আসে। গোটা জীবনকে দেখতে দেখতে চলা মানুষের কোনো অস্তিত্বিক বেদনা দিয়ে দেখতে পেলেই কবিতাগুলির কাছে পৌঁছনো যায় বলে আমার মনে হয়। আর সেই জন্যই দশকুড়ি বছরে এ-মনোভাবের বদল হওয়া শক্ত। কোনো রাজনৈতিক পালাবদলে এ-হতাশার থেকে উত্তরণ সহজে সম্ভব নয়। কখনো কখনো অবশ্য সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় কোনো কোনো কবিতা লিখেছি, কিন্তু গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ ঠিক সেরকম কোনো বই নয়। অন্তত আমি তো সেইরকম ভাবি।

প্রশ্ন : যখন ‘উড়ন্ত ভস্মের কণা হাতেমুখে মুছে নিতে নিতে/ শ্মশানের পাশে বসে অ আ শেখে পাঁচ-ছটি শিশু -/ তুচ্ছ করে দিয়ে সব ইহ-চরাচর প্রেতযোনি…’, জট-লাগা মৃতদেহের মিছিলের মধ্যেও কি তখন একফোঁটা জাদু-বাস্তবতা তৈরি হয়ে যায়? মনে হয়, অন্তত ‘দুমুহূর্ত… আজ সমস্ত উড়িয়ে’ বেঁচে থাকা যায়? (৩৪ নম্বর, ৩৫ নম্বর)

উত্তর : আমাদের বাস্তব চরাচরই হঠাৎ-হঠাৎ জাদু-বাস্তবতা পেয়ে যায়। উদ্ধৃত কবিতাটিতে যে-ছবিটা আছে, তা একেবারেই প্রত্যক্ষ-করা ছবি, সচল জীবনযাপনের মধ্যে নিজেরই চোখে দেখা। ঠিকই, সেই দেখাটা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জীবনের জন্য নতুন একটা মায়া তৈরি করে, তখনই সমস্ত ক্ষয় উড়িয়ে দিয়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে, চোখে যদিও এনে দেয় জল।

প্রশ্ন : ‘অমৃত পাহাড় থেকে সাগরের তরল গরল’ অবধি স্তরে-স্তরে গড়িয়ে-যাওয়া এই কবিতাগুলোতে শূন্যের একটা স্থিরনিশ্চিত ভূমিকা আছে বলে মনে হয় :

* দুয়ের মধ্যে শূন্য আসে বিশ্বভুবনজোড়া (বিভাব কবিতা)

* আর তুমি/ শূন্যের ভিতরে ওই বিষণœ প্রতিভাকণা নিয়ে… (১ নম্বর কবিতা)

* শূন্য মাটি সপ্ততল এক সূত্রে বেঁধেছে এ-বুকে (২ নম্বর কবিতা)

* শূন্য থেকে নেমে এসে কারুকাজে-কাঠের কিনারে (৩ নম্বর কবিতা)

* শূন্যের পূর্ণতা নিয়ে ভরে আছে ইবাদতখানা (২৫ নম্বর কবিতা)

* তখনি শূন্যের থেকে ঝাঁপ দেয় লক্ষ লক্ষ তারা (৩৬ নম্বর কবিতা)

এখানে ‘শূন্য’ কি নিরাশা আর অবনমনের ধ্বনি-পুত্র?

উত্তর : ‘শূন্য’ শব্দটা দুই ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা যায়, করা হয়। ‘কিছুই-না’-এর প্রতিশব্দ শূন্য। কিন্তু সেই একই সঙ্গে ‘শূন্য’ মানে গোটা ংঢ়ধপব, তার বিশাল অবাধ বিস্তার। বিশ্বভুবন জুড়ে দিচ্ছে যে শূন্য, সে তো নিরাশা বা অবনমনের অনেক দূরবর্তী অস্তিত্ব। উদ্ধৃত অন্য লাইনগুলিতেও প্রায়শ কি সেটাই নেই? প্রতিটিতেই তো কোনো-না-কোনো ইতিবাচক শব্দের যোগ আছে। প্রতিভাকণা, একসূত্রে বাঁধা, কারুকাজ, লক্ষ লক্ষ তারা, কিংবা ‘শূন্যের পূর্ণতা’। এসবেরই মধ্যে জড়ানো একটা বিষাদবোধ অবশ্য থাকতে পারে। বিষাদ আর নৈরাশ্য ঠিক এক জিনিস নয় কিন্তু।

 

জল

প্রশ্ন : পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ কবিতা ৭ – ‘আচম্বিত জলস্রোতে সমস্ত বৃত্তের অবসান’ – এখানে জল যেন মৃত্যুর প্রতিরূপ হয়ে এসেছে। শবের উপরে শামিয়ানা কাব্যগ্রন্থেও ‘থাকা’, ‘ওলটকমল’ বা অন্য অনেক কবিতায় বন্যাকবলিত অঞ্চলের অসহায়তা ফুটে ওঠে। ‘জলেভাসা খড়কুটো’র বিভাব অংশটুকু প্রথম থেকে সপ্তম গুচ্ছ পর্যায়ক্রমে বন্যা এবং তার পরবর্তী ত্রাণকে ঘিরে বঞ্চিত মানুষের আরো আরো বঞ্চিত হতে থাকার এক কাব্য-দলিল মনে হয়। এছাড়াও এই পঙ্ক্তিগুলি দেখতে পাই আমরা –

* একাকার মুছে আছে শহরসীমান্ত আর গ্রাম/ …/ আর এই মিলনের সীমান্তবিহীন দেশকালে/ এখনও জ্বরের ঘোরে হাড় কাঁপে, এসো, ভেজা যাক।

* এর কোনো শেষ নেই, এ আবাদ, এই জলাজমি/ এই রাত দুপ্রহরে ঢল, এই বানভাসি ভোর… (‘থাকা’, শবের উপরে শামিয়ানা)

* জল নেমে যায় বটে, জলের অন্যায়/ তখনও নামে না। (‘জলস্রোত বিভাব অংশ’, তুমি তো তেমন গৌরী নও)

* তেমনই দূরের জলে দিয়ে আসি মৃত গাভী গলিত শূকর আর তোমাকেও মা (‘আরুণি উদ্দালক’, তুমি তো তেমন গৌরী নও)

আপনার কবিতায় জলের একটা সংহারমূর্তি বারেবারে দেখতে পাওয়া যায় – এর পিছনে আপনার যেসব ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার ভার কাজ করেছে তা কি একটু জানাবেন আমাদের?

উত্তর : কবিতা লিখবার সময়ে কত দিনের কত অভিজ্ঞতা যে মিলেমিশে জড়িয়ে থাকে, তার কোনো হিসাব করা মুশকিল। গোটা জীবনই তার মধ্যে জড়িয়ে যায়। বছর দশেক বয়সে একটা পুকুরে তলিয়ে গিয়েছিলাম অনেকটা, হাঁসফাঁস করছিলাম, জলে ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে চুলের মুঠি ধরে আমাকে তুলে এনেছিল এক তুতো দিদি। পরে অবশ্য সেই দিদিরই হাত ধরে শিখেছি সাঁতার। ঠাট্টা করে কেউ বলতে পারেন, ওইটেই হয়তো সমস্ত সংহারমূর্তির উৎস। তবে পরিহাসকথা ছেড়ে দিয়ে বলি, উদ্ধৃত লাইনগুলির মধ্যে তুমি তো তেমন গৌরী নও-এর কবিতার কথাও আছে বলে বিশেষ একটা অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানাতে হয়। ১৯৬৮ সালের পূজাবকাশের সময়ে জলপাইগুড়ি শহর আর গ্রামাঞ্চলে বিকট একটা প্লাবনে যে ভয়ানক ধ্বংসকা- ঘটেছিল, জলবন্দি হয়ে তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলাম সেই দিনগুলিতে। এটা ঠিক যে ‘আরুণি উদ্দালক’ আর ‘জলস্রোত’ কবিতাগুচ্ছে সরাসরি তার দাগ লেগে আছে।

 

ছন্দ

প্রশ্ন : ‘ঘুম’ কবিতাটিকে মুক্ত ছন্দে ভাবা যায়? প্রহর জোড়া ত্রিতাল কাব্যগ্রন্থে ‘অবিশ্বাস’ এবং ‘প্রান্তিক’ বা ‘জ্যামে’র পাশাপাশি ‘ফেরা’ এবং ‘ঘুম’ লিখছেন – যেন একটা আসা-যাওয়া বা কাছে-দূরের সম্পর্ক চলেছে ছন্দের সঙ্গে।

উত্তর : ঠিকই, ‘ঘুম’ বা ‘ফেরা’ মুক্তছন্দেই লেখা, ওই একই বইতে যেমন আরো আছে ‘বাবা’ কিংবা ‘পটভূমি’। খোলা ছন্দ থেকে বাঁধা ছন্দে যাওয়া-আসার প্রবণতা আমার বেশকিছু লেখাতেই আছে। কোনো কোনো পাঠকের কানে যে সেটা ধরা পড়ছে, এ-কথা জেনে ভালো লাগে।

প্রশ্ন : ছন্দ থেকে অছন্দে সহজে যাতায়াত করা যাবে, এমন এক মুক্তির কথা আপনি বলেছিলেন ছন্দের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে। ‘গভীর ঘুমের মধ্যে/ হাসিখুশি মুখে সর্বনাশ সামনে এসে দাঁড়ায়’ কি তেমনি এক খোলা-বারান্দা?

উত্তর : হ্যাঁ, তা বলা যায়। তবে, এ-কবিতাটিতে ছন্দ থেকে অছন্দে নয়, যাওয়া আছে অছন্দ থেকে ছন্দে। এসবের মধ্যে একটা আলগা ভঙ্গি এসে যায়।

প্রশ্ন : ধুম লেগেছে হৃৎকমলে কাব্যগ্রন্থের ‘ক্যান্সার হাসপাতাল’ কবিতাটিতে প্রতি পরিচ্ছেদ তিনটি করে লাইন নিয়ে তৈরি হয়েছে। আবার প্রতি পরিচ্ছেদের তৃতীয় লাইনটি সামান্য ছোট হয়ে পরের পরিচ্ছেদের প্রথম লাইন হয়ে ফিরে আসছে – এটি কি কোনো বিশেষ ছন্দ?

উত্তর : এখানে বোধহয় ‘স্তবক’ বা ংঃধহুধ অর্থে ‘পরিচ্ছেদ’ শব্দটা এসে গেছে। না, এ যে বিশেষ কোনো ছন্দোবদ্ধ, বিশেষ কোনো রূপ, তা নয়। আমিও আর অন্য কোথাও ব্যবহার করেছি বলে মনে পড়ে না। তবে ঠিক একই রকম না হলেও, লাইন ফিরিয়ে আনবার এই ধাঁচটা আগেকার একটি লেখা ‘ভিখিরির আবার পছন্দ’র মধ্যেও আছে। বিশেষ কোনো কারণবশত এ-রকম হয়, তাও বলা যায় না। লেখার চালে আপনি চলে আসে।

 

সমসাময়িকতা ইত্যাদি…

প্রশ্ন : আপনি লিখেছেন : রক্তে তো ইংরেজি নেই, বাঁচবে কীভাবে পৃথিবীতে! (রক্তের দোষ/ ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার) – কোনো কোনো সাক্ষাৎকারেও আপনি বিদেশি ভাবনার ওপর আমাদের এই নির্ভরশীলতার কথা জানিয়েছেন। আমি জানতে চাইব, আজকের দিনে আমাদের দেশীয় প্রেক্ষিতে ভাবগত এবং শৈলীগত বা যে-কোনো একটি দিক থেকে কাকে সমসাময়িক কবিতা বলব আমরা?

উত্তর : কবিতা লিখবার জন্য বিশেষ কোনো দেশীয় প্রেক্ষিত ভাবতে হবে, এটা আমি মনে করি না। সে-প্রেক্ষিত তো আপনিই এসে যাবার কথা তার ভাষাগুণে, তার অভিজ্ঞতাসূত্রে। সমসাময়িক হবার জন্য কোনো স্বতন্ত্র চেষ্টার বা স্বতন্ত্র রূপের দরকার আছে বলে মনে হয় না। যে-কোনো সত্যাশ্রয়ই কবিতাকে সমসাময়িকতা দেয় চিরন্তনের অভিমুখে। ‘রক্তে তো ইংরেজি নেই’ কথাগুলি বলতে হয়েছিল অন্য একটা কারণে। ভুবনায়নের দাপটে ইংরেজিসর্বস্বতাকে আমরা শিল্প-সাহিত্যের একমাত্র লক্ষ্যবিন্দু বলে ভাবতে শুরু করেছি আর অনেক সময়ে সেইটেকেই ভাবছি সমসাময়িকতার দাবি, যে-দাবিতে যে-কোনো দেশীয় ভাষা তুচ্ছ বলে গণ্য হতে শুরু করেছে। এই নিয়েই তির্যক ওই লাইনটি এসে গিয়েছিল।

প্রশ্ন : অরুণ কোলাৎকারের কবিতা আপনার ভালো লাগে বলে জেনেছি। তাঁর জেজুরি অথবা নৌকোভ্রমণ এবং অন্যান্য কবিতার গঠন এবং ভাবগত নিস্পৃহতা বা নৈর্ব্যক্তিকতা (অথবা একসঙ্গে দুটিই) কি পশ্চিমি আধুনিকতার অবদান?

উত্তর : ‘অবদান’ শব্দটা হয়তো একটু বেশি ভারী হয়ে যাবে এখানে, যদিও কোলাৎকার নিজেই বলেছিলেন যে, আমেরিকান লোকগানের প্রভাব তাঁর লেখায় আছে। কোলাৎকার ছিলেন দ্বিভাষী কবি, ইংরেজি আর মারাঠি দু-ভাষাতেই লিখতেন সবসময়ে। মজা করে বলতেন, তাঁর একটা দুদিক-কাটা পেনসিল আছে, একদিক দিয়ে লিখলে মারাঠি আর অন্যদিকে ইংরেজি হয়ে যায়। ইংরেজিকে নিজের প্রকাশবাহন করে নিলে পশ্চিমি আধুনিকতার প্রভাব এড়িয়ে চলা শক্ত ঠিকই। তবে সেইসঙ্গে এ-ও মনে রাখতে হবে যে, কোলাৎকার ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন নামদেব একনাথ বা তুকারামের – বিশেষত তুকারামের ভক্তিগীতি, যার ভাব আর রূপের সঙ্গে আমেরিকার গণগীতির কিছু মিল খুঁজে পেতেন তিনি। ব্লুদের সঙ্গে কোলাৎকারের কবিতার ভাবরূপের সাদৃশ্য নিয়ে

কথাবার্তাও হয়েছে কিছু – জনজীবনগত ভাবভাষার কথা।

প্রশ্ন : আপনার লেখা ‘কপিকল’ (শবের উপরে শামিয়ানা) কবিতাটিতে দেখি (উদাহরণ হিসেবে) একটা কার্যকারণের পরম্পরা সবসময় বজায় থাকছে। প্রায় একই সময় ভাস্কর চক্রবর্তীর নীল রঙের গ্রহ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে ‘হাতবোমা নয়’, ‘কে জানলা খুললো’, ‘মরুপ্রদীপ ১’, ‘চল্লিশ’ – এই সমস্ত কবিতায় পঙ্ক্তির মধ্যের জোড়গুলি যেন আলগা হয়ে গেছে মনে হয়।

ভাস্করের এই কার্যকারণ ক্ষয়ে-যাওয়া, আলগা-শুনতে-লাগা ভাষা কি বিদ্রƒপ, অসুস্থতাবোধ আর সর্বনাশের আশঙ্কায়-মোড়া ঊীঢ়ৎবংংরড়হরংস কাব্য-আন্দোলনের ভাষা-শৈলীর আদলে গড়ে উঠেছিল? (ঞযব ঢ়ড়বসং… ধৎব ফরংঃরহমঁরংযবফ নু ধহ রৎড়হু যিরপয যধং ঃযব ফঁধষ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ড়ভ ংধঃরৎরুরহম ঃযব পড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু পরারষরংধঃরড়হ ধহফ বীঢ়ৎবংংরহম ধ সধষধরংব, ধ ঢ়ৎবসড়হরঃরড়হ ড়ভ ফড়ড়স, যিরপয ধিং ড়হব ড়ভ ঃযব পড়সসড়হ ঢ়ৎবসরংবং ড়ভ ধষষ ঃযব বধৎষু বীঢ়ৎবংংরড়হরংঃং. (অ চৎড়ষরভবৎধঃরড়হ ড়ভ ঢ়ৎড়ঢ়যবঃং, গ. ঐধসনঁৎমবৎ)

ভাস্করের এই ভাষা আগামী দিনে বাংলা কবিতার ভাষা হয়ে উঠতে পারে?

উত্তর : নির্দিষ্ট কোনো আন্দোলনের ভাষা-শৈলীর আদলে ভাস্করের ভাষা গড়ে উঠেছিল বলে মনে হয় না, ওর ভাষার আদল একেবারেই ওর নিজস্ব। একটা সাক্ষাৎকারে ভাস্কর বলেছিল : ‘এই আকস্মিকতা যে কীভাবে আসে তা আমি নিজেও জানি না।’ বা ‘যুক্তির থেকে অনেক দূরে সরে থাকি।’ এই স্বভাবসিদ্ধতা থেকেই ওর ভাষার উদ্ভব। আগামী দিনের বাংলা কবিতার এইটেই একমাত্র ভাষাভঙ্গি হবে না, কিন্তু অন্যতম তো হবারই কথা।

বস্তুত, আগামী দিনে কেন, এরই মধ্যে কারো কারো হাতে কবিতার এ-ভাষাভঙ্গি চলে এসেছে। কিন্তু এর জন্য  ঊীঢ়ৎবংংরড়হরংঃ-দের উৎসমূলে যাবার দরকার করে না, আর ওই ‘ংধঃরৎরুরহম’ ‘ঢ়ৎবসড়হরঃরড়হ ড়ভ ফড়ড়স’ ভাস্করের কবিতার ঐকান্তিক লক্ষণও নয়। পরিব্যাপ্ত এক বিষাদবোধের সঙ্গে গাঢ় এক জীবনানন্দও ওর কবিতার স্তরে স্তরে মেলানো, একথা মনে রাখতে হবে। নিজের জীবন বা কবিতা নিয়ে যখনই কথা বলেছে ভাস্কর, তখনই এই আনন্দবোধের কথাটা কোনো-না-কোনোভাবে উচ্চারণ করেছে সে। বিদেশের কাব্যান্দোলন বা কবিদের কথা যদি তুলতেই হয়, তবে মনে রাখা ভালো যে, ভাষা আর ভাবের দিক থেকে মনের অনুকূলে জীবনের শেষার্ধে কিছু পোলিশ কবির মানসিক সান্নিধ্যে ও পৌঁছেছিল, বিশেষত তাদেউশ রুজেভিচ, যাঁর কবিতা পড়ে ওর মনে হয়েছিল ‘দমবন্ধকরা পৃথিবীর সামনে এক টুকরো শান্তি, স্বস্তি একটু’। নিজের কবিতা-চরিত্রের সঙ্গে এইখানে সেটা মিলে গিয়েছিল।

প্রশ্ন :  ‘খোশমেজাজে’ কবিতাটিতে ভাস্কর খুব সম্ভবত ওঁর কবিতার ব্যক্তিকাল বা মানবকালের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব-স্থায়িত্বের প্রশ্নভারাতুর আত্মজিজ্ঞাসা থেকে আপনার কাছে জানতে চেয়েছেন – ‘বর্তমান কি চিরকালকে ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে?’ (নীল রঙের বই)। ওঁর হয়ে আপনার কাছে এই প্রশ্নটা রাখছি।

উত্তর : ভাস্কর নিজে এটা জিজ্ঞেস করলে (মানে, কবিতার বাইরে, সরাসরি) ওকে হয়তো বললাম : ‘তা যদি না হবে, তবে           স্তব্ধতাই কীভাবে কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে? ভাষা বর্তমানের, কিন্তু ইচ্ছে করলে সে ধরে রাখতে পারে চিরকালের স্তব্ধতাকে।’ আর ভাস্করের বাইরে, এইখানে বলি : বর্তমানের মধ্যে চিরকালকে ধারণ করবার মুহূর্তটাই যথার্থ সুন্দরের মুহূর্ত, সুন্দরের বোধ। সে-বোধে কখনো কখনো আমরা পৌঁছই, পৌঁছতে পারি।

প্রশ্ন : ধুম লেগেছে হৃৎকমলে কাব্যগ্রন্থে ‘শিশুরাও জেনে গেছে, যন্ত্রের এপার থেকে, ভালোবাসা অর্ধেক স্থপতি, তাই এত শুকনো হয়ে আছো, টল্মল্ পাহাড়, সৈকত,’ এইসব অসাধারণ কবিতা বা তারও অনেক আগে ‘বিপুলা পৃথিবী’ বা ‘মিলন’ (নিহিত পাতালছায়া), এই সমস্ত গদ্য-কবিতা অন্য প্রথাগত গড়নের কবিতার মতোই কি পাঠকের সমান প্রিয় হয়ে উঠেছে?

উত্তর :  সে-কথা আমি কেমন করে বলব? পাঠকের প্রিয়তা অর্জনের কথা দূরে থাক, পাঠকেরা আদৌ এগুলিকে লক্ষ করেছেন কিনা, তাও-বা জানব কেমন করে? এই প্রশ্নে অন্তত বোঝা গেল ভালো হোক মন্দ হোক, একজন পাঠক এ-কটি কবিতার অস্তিত্ব বিষয়ে জেনেছেন।

প্রশ্ন : কোথাও পড়েছিলাম জয় গোস্বামী লিখছেন, হাসপাতাল বা নার্সিং-হোমে থাকবার সময় একজন সেবিকার সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। তার কাছে আপনার কবিতা শুনে বিহ্বল জয়দা আপনাকে জানান সেই কথা। হয়তো প্রশ্নটা করা এইসব মাথায় রেখেই।

উত্তর : হ্যাঁ জয়ের বলা সেই ঘটনার কথাটা আমার বেশ মনে আছে। কেবল সেইটেই নয়, এ-রকম আরো কয়েকটা অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, সবারই নিশ্চয় হয়। কেবল একটি-দুটি কবিতা বা কবিতা-বইয়ের প্রতিক্রিয়া অনেক সময়ই পাঠকেরা জানাতে চান, জানান। তেমন অসামান্য কিছু অভিজ্ঞতামুহূর্ত আমার সঞ্চয়ে আছে। তা থেকে কিন্তু বোঝা যায় না যে, যে-কবিতার বিষয়ে আমার কাছে কোনো প্রতিক্রিয়া পৌঁছল না, কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি তার। সেইজন্য, বিভিন্ন লেখার সমান-প্রিয়তার বিচার করা কোনো লেখকের পক্ষে মুশকিল হতে পারে।

প্রশ্ন : ফরাসি কবিতায় একসময় খুব চল ছিল টানা গদ্যে লেখা কবিতার; বাঙালি পাঠকের মানসিকতায় এক্ষেত্রে কোথাও কি সহজাত কোনো দূরত্ববোধ কাজ করে?

উত্তর : মনে তো হয় না। তাহলে কি অরুণ মিত্রের কবিতা এতো লোকের ভালো লাগত? কেবল অরুণ মিত্র কেন, ও-রকম টানা গদ্যে লেখা কবিতা আরো অনেকের তো আছে। এসব কবিতার তেমন আবৃত্তিধন্যতা হয়তো নেই, কিন্তু যথার্থ কবিতার পক্ষে সেটা খুব বড় কথা নয়।

 

অন্যান্য

প্রশ্ন : ‘বাবুমশাই’ (মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়), ‘অগস্ত্যযাত্রা’, ‘চ-ীমঙ্গল’ (বন্ধুরা মাতি তরজায়), ‘লজ্জা’, ‘ভিখিরির আবার পছন্দ’ (মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে), ‘অন্ধবিলাপ’ (ধুম লেগেছে হৃৎকমলে), ‘গানের মতো, শ্যামা’ (লাইনেই ছিলাম বাবা) – এই সমস্ত কবিতাতে হয় একটি ছড়ার ছন্দ, নাহলে একটি শ্যামাসংগীত, লোকসংগীত অথবা মহাভারতের কোনো একটি চেনা অংশের আদল চোখে পড়ে।

এটি কি শেষে প্রকাশ করবার প্রয়োজনে, নাকি যারা ততটা কবিতা পড়েন না অথচ প্রতিদিন শোষিত হচ্ছেন, তাদের কাছেও দ্রুত পৌঁছিয়ে দেবার একটা ভাবনা ছিল এর মধ্যে?

উত্তর : দ্রুত বা বিলম্বিত – কোনোভাবেই পাঠকের কাছে পৌঁছবার কথা ভেবে কবিতার রূপ তৈরি হয় না। অন্তত আমার তা হয়নি কখনো। এমনকি, মনোভঙ্গি বা বিষয়ের প্রয়োজনটাও সচেতন কোনো কাজ করে না। কবিতা লেখার সময়ে প্রাথমিক যে ধাক্কাটা আসে, সেটা কোনো ভাবনায় নয়, অনুভবে। আর সেই অনুভব আচমকা একটা লাইন তুলে আনে, কোনো বিশেষ ছন্দে বা ছন্দহীনতায়। তারপর সেই চালেই চলতে থাকে কবিতাটি। অর্থাৎ রচনাক্রমটা এ-রকম নয় যে, এবার একটু শেষ করা যাক কিংবা অনেক পাঠকের বা বিশেষ ধরনের পাঠকদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করা যাক, আর সেইজন্য এবার ছড়ার ছন্দ ধরা যাক কিংবা লোকসংগীত বা পৌরাণিক আখ্যান।

যে কবিতাগুলির কথা বলা হলো এখানে, তার মধ্যে ‘ভিখিরির আবার পছন্দ’ কিন্তু ছ-মাত্রার চালে লেখা, ছড়ার ছন্দে নয়।

‘থাক সে পুরনো কাসুন্দি/ যুক্তিতর্ক চুলোয় যাক/ যেতে বলছ তো যাচ্ছি চলে/ ভাববার শুধু সময় চাই।’ এভাবে  এগোতে এগোতে ‘ভিখিরির আবার পছন্দ’ লাইনটা পড়ার টানে কথ্য চালে স্বভাবতই হয়ে যায় ‘ভিখিরিরাবার পছন্দ’। এইভাবে এখানে প্রতিটি লাইনেই প্রথম পর্বটি ছ-মাত্রার, শেষটি অপূর্ণ, চার কিংবা পাঁচ।

প্রশ্ন : ভাবগত বা শৈলীগত কোনোরকম পূর্ব-ভাবনাই থাকছে না তাহলে? তবে কি একে আমরা স্বতঃস্ফূর্ত রচনা বা ধঁঃড়সধঃরপ ৎিরঃরহম বলতে পারি?

উত্তর : না, এ বোধহয় ঠিক  ধঁঃড়সধঃরপ ৎিরঃরহম-এর কথা নয়। সেখানে থাকে সম্পূর্ণ অবচেতনার উৎসার। সেখানে প্রায়ই আচ্ছন্ন দশায় লেখার একটা ব্যাপার থাকে। অনেক সময়ে খঝউ জাতীয় মাদকসেবনে চেতনাকে দূরে সরাবার একটা ব্যবস্থাও থাকে। গিন্স্বার্গেরা যেমন করতেন। আগে-পরে এ-রকম আরো অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। আমি যেটার কথা বলছিলাম তা হলো প্রাক্-পরিকল্পনাহীন আকস্মিকতায় কোনো লাইন এসে যাওয়া। এই এসে যাওয়াটার পিছনে মনের ভিতরে অনেকদিনের ভাবভাবনার, অনেকদিনের অভিজ্ঞতার মিশেল থাকতে পারে। কিন্তু সেটা সেই মুহূর্তের বিশেষ কোনো ভাবনা থেকে হয়তো আসছে না সচেতনভাবে। ব্যক্তিগত একটা উদাহরণ দিয়ে কথাটা বলতে পারি। বহুকাল আগে একদিন চৌরঙ্গী অঞ্চলের একটা বাড়িতে এক আমন্ত্রণসভায় যাচ্ছি, তার উলটো ফুটপাথে পৌঁছে গেছি, ফুটপাথ থেকে পা নামাতে গিয়েই আবার তুলে নিতে হলো, কেননা                যান-চলাচল শুরু হয়ে গেছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে অকারণেই একটা লাইন মাথায় এলো : ‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়’। বুঝতে পারলাম আরো কিছু কথা আসবার সম্ভাবনা এখন। সভায় না গিয়ে এলোমেলো হাঁটতে শুরু করলাম রাস্তায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল ‘সঙ্গিনী’ নামে বারো লাইনের একটা কবিতা, পূর্ব পরিকল্পনাহীন। ভাবনাসূত্র যে কোথাও থাকে না তা নয়, থাকে না কেবল প্রাক্-পরিকল্পনা। অন্তত আমার ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন : ধুম লেগেছে হৃৎকমলে কাব্যগ্রন্থটির ‘মেয়েদের পাড়ায় পাড়ায়’ বা ‘আশি বছরের মুখে’ কবিতা-দুটির মতো বেশ কিছু কবিতায় ঘটনার সঙ্গে আত্মীয়তা চোখে পড়ার মতো – তেমন যে-কোনো একটি কবিতা সামনে রেখে ঘটনা থেকে কবিতায় যাবার মধ্যে কেমন সব গ্রহণ-বর্জনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় আপনাকে, জানতে চাইব।

উত্তর : এই গ্রহণ-বর্জনের সুনির্দিষ্ট কোনো ধরন আছে বলে তো মনে হয় না। যে-দুটি কবিতার কথা উঠল এখানে, সে-দুটির পিছনে প্রত্যক্ষ কোনো ঘটনা আছে তা ঠিক। কিন্তু দু-রকমের প্রত্যক্ষ সেটা। ‘আশি বছরের  মুখে’র মধ্যে নদীবিশারদ আর অচউঅ-সংগঠনের একসময়কার প্রধান কপিল ভট্টাচার্যের ছবি আছে। তাঁর ছেলে প্রদ্যুম্ন আমার দীর্ঘকালের বন্ধু, আর সেই সুবাদে আমি ওঁর স্নেহভাজন। উদ্ধৃতিচিহ্নিত সংলাপটি প্রায় আক্ষরিক বসানো আছে কবিতায়। ‘প্রায়’ বলছি এইজন্য যে বলেছিলেন তিনি আরো কিছু শব্দ, তার কিছুটা বর্জিত হয়ে স্মৃতিতে ধরা বাকি অংশটা এসেছে এখানে। মধ্যবর্তী আমার প্রশ্নগুলিকে ছেড়ে দিয়ে, আর কথাক্রমকে হয়তো একটু ভেঙে দিয়ে। সংলাপ অংশের পরবর্তী চারটি লাইনই কিন্তু কবিতাটাকে টেনে এনেছিল, কেননা ঘর ছেড়ে পথে বেরোনোর পর রাস্তার ধারে বসা শীতের সবজিওয়ালাদের পণ্যসম্ভারের উজ্জ্বলতা দেখে মনে পড়ে গিয়েছিল ওঁর মুখের উজ্জ্বল আশ্বাসের কথা, শারীরিক শীর্ণতা সত্ত্বেও আত্মপ্রত্যয়বান উজ্জ্বল হাসির কথা। পথেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল লেখাটি।

আর ‘মেয়েদের পাড়ায় পাড়ায়’ লেখা হয়েছিল কাগজের এক-লাইন খবর পড়ে। কবিতাটির শিরোনামের পরে অংশত সেটি উল্লেখ করাও আছে। গ্রামীণ একটি যুবতী বধূ তার আট মাস বয়সের মেয়েটিকে জলে ভাসিয়ে দিয়ে নিজেও ডুব দিয়ে মরে, এই ছিল খবর। অদেখা সেই বধূটির কথা মনে পড়তে থাকে শুধু, তার সঙ্গে মিলে যেতে থাকে দেখা-না-দেখা আরো অনেক নির্যাতিতার ছবি, তাদের কেউ-বা আত্মহত্যা করেছে, কেউ-বা জীবনের মধ্যেই নিহত। তারপর কবিতার শব্দগুলি আসতে থাকে তার নিজের চালে।

প্রশ্ন : শবের উপরে শামিয়ানা কাব্যগ্রন্থে ‘জলেভাসা খড়কুটো’ বিভাব অংশে প্রথমগুচ্ছের ‘তুমি’ এবং দ্বিতীয়গুচ্ছের ‘তুমি’ একই অস্তিত্ব? প্রথম গুচ্ছের ‘তুমি’, ‘গান গাইবার সময়ে… সুরের কালো হাওয়া’ আবার দ্বিতীয়গুচ্ছের, ‘তুমি এলে/ শূন্য থেকে শূন্যে ঝরে রুপোলি প্রপাত।’ প্রথম গুচ্ছে ‘তুমি’-কি সভ্যতা? ৪৭ নম্বর কবিতায় ‘তুমি’ কি নিয়তি বা ভবিষ্যৎ (‘আমার সর্বনাশের পাশে তোমাকে বসিয়েছি…’)?

উত্তর : বিশেষ কোনো প্রতিশব্দ দিয়ে কবিতাকে – বা তার অন্তর্গত কোনো প্রতিমা-প্রতীককে সুচিহ্নিত করবার বিপদ আছে। কবিতাটা আটকে যায় তাতে। ও-রকমভাবে হয়তো পড়া যায়, যদি পুরোপুরি একটা ধষষবমড়ৎু-র ব্যবহার হয় লেখায়। না, এখানে তেমন কোনো ধষষবমড়ৎু নেই। শুধু প্রথম গুচ্ছ দ্বিতীয়গুচ্ছ নয়, ‘জলেভাসা খড়কুটো’র সবকটা গুচ্ছেই ‘তুমি’র একটা সমতা আছে মোটের ওপর, নিজে একে আমি প্রেমের কবিতা হিসেবেই জানি। তবে, সেই প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশকাল ইতিহাস ভূগোল, তাই সেখানে নানারকমের হৃদয়ভাবের ওঠাপড়া যাওয়া-আসা আছে, কোনো সরলরেখায় বা একক শব্দে তাকে পাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন : শবের উপরে শামিয়ানা কাব্যগ্রন্থে ‘জলেভাসা খড়কুটো’ বিভাব অংশের ৪৫ নম্বর কবিতাটিতে কি অবিভক্ত বাংলাদেশের কোনো ইঙ্গিত থাকছে? ‘ – কতদিন, কতদিন আর মানুষ এ-রকম থাকতে পারে-! আঃহা, বলতে তো ভুলেই গেছি পঞ্চাশ বছর আগে আমরা কী ভেবেছিলাম!’

উত্তর : ইঙ্গিতটা বিভক্ত বাংলাদেশেরই। তবে সেই সূচনাসময়টার কথা যখন আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম যে এই বিভাজন স্থায়ী হবে না, হতে পারে না, অচিরেই দূর হবে বিভেদ। কিন্তু এই কথাগুলির ঠিক আগেই আছে ঘোর বর্তমানের কথা, ‘জলেরও কোনো ভাগবাটোয়ারা নেই’ – ধরনের আকস্মিক উচ্চারণ। বস্তুত, পূর্ব পাকিস্তান ‘বাংলাদেশ’ হয়ে উঠবার পরে আমাদের অনেকের কাছেই হয়তো মিলন-বিচ্ছেদ-পুনর্মিলন একাকার হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : ‘একদিন ছিল, আজ সে-জলের তল থেকে দেখি/ মাটির উপরে সেই স্থলপদ্ম পরিত্যক্ত বাড়ি’ (‘স্থলপদ্ম’, ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার) – এ কি আপনার ছোটবেলার স্মৃতিজড়িত বসতবাড়ি?

উত্তর : একেবারেই তাই। দেশ ছাড়বার ঠিক পঞ্চাশ বছর পর সেই বাড়ির কাছে একবার যেতে পেরেছিলাম। ফিরে আসার পর বেশ কয়েকটা লেখাতেই ঘুরে ঘুরে এসেছে সেই বাড়ির ভিতর-বাহিরের পরিব্যাপ্ত ছায়া।

প্রশ্ন : এর আগে আমরা পেয়েছি, ‘…সেই/ স্মৃতি আমার শহর, আমার এলোমেলো হাতের খেলা,/ তোমায় আমি বুকের ভিতর নিইনি কেন রাত্রিবেলা?’ (‘অলস জল’, নিহিত পাতালছায়া) – সেটা কি দেশভাগের সময় ছেড়ে আসা বাংলাদেশের স্মৃতি?

উত্তর : কবিতাটির প্রথমাংশে যে ছবিগুলি আছে তার পুরোটাই ছেড়ে আসা দেশের, তারপর সেটা স্মৃতি হয়ে জড়াতে চায় যে-শহরে, সে তো আমার ছিন্নমূল অবস্থান। আর, একেবারে শেষ লাইনটায় সেসব ছাড়িয়ে এটা চলে যেতে চায় অপূর্ণতার সংশয়ে আতুর এক প্রেমানুভবে।

প্রশ্ন : আপনার অনেক কবিতায় আত্মঘাত, বিশ্বাসভঙ্গ, বন্ধুকে হারানোর মতো বিষয়গুলো লেখার নিচে বয়ে যেতে যেতে একটা অন্তরঙ্গ ব্যথার ভার তুলে আনে :

* ছাড়া পেয়ে চলে যায় বন্ধুবিচ্ছেদের মতো সটান রেখায় (‘১৭ নম্বর কবিতা’, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ)

* …তুমি কি শুনেছ?/ তোমার আলোর কোনো ব্যূহমুখ নেই। কীভাবে বা/ খুলে নিয়ে আসি তার এমন একাকী ঘের থেকে… কিংবা

* আমি সেই স্তবে ভরা নীরব পলের পাশাপাশি/ কিছুই-না এর প্রেমে অবলীন ধীর হয়ে আছি।

* তারও পর যতটুকু বাকি থাকে তারই নাম চুপ/ তোমার আমার মধ্যে সেই নীল অতিকায় কূপ। (‘যথাক্রমে ব্যূহমুখ’, ‘অবলীন, অতিকায় কূপ’, শবের উপরে শামিয়ানা)।

উত্তর : ধারাবাহিক বন্ধুবিচ্ছেদই তো জীবনের অন্য নাম। সে-বন্ধুর অবশ্য নানা রূপ, নানা পরিচয়।

শেষ করবার আগে একটা কথা বলি। অনেকেই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নানা সময়। কিন্তু এত বেশি নিবিড়ভাবে কবিতাকেন্দ্রিক প্রশ্ন খুব বেশি লোকের কাছে পাইনি আগে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply