অদ্বিতীয় অদ্বৈত মল্লবর্মণ

লেখক: আশরাফ আহমেদ

হরিশংকর জলদাসের সুন্দর একটি ছোটগল্প পড়লাম কালি ও কলমের অনলাইন সংস্করণে। বছরখানেক আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থানার গোকর্ণ গ্রামের দাঙ্গার ঘটনাকে সামনে রেখে লেখা। ঘটনাটি ছিল সাম্প্রদায়িক, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, দলগত এবং স্বার্থগত কারণে একদল লোক সেখানকার জেলেপল্লিতে অগ্নিসংযোগ, ধ্বংস এবং লুটপাট করেছিল। গল্পে জেলেদের জীবন নিয়ে প্রণীত কালজয়ী তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নিয়ে আসা হয়েছে তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখতে। এ সুযোগে আমিও তাঁর মুখদর্শন করার লোভ সামলাতে পারলাম না। নাসিরনগর থানার গোকর্ণ গ্রামে আমার দাদার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু অদ্বৈতবাবুর পিছু পিছু গিয়ে দেখলাম, তাঁর মেছোপাড়াটি ছিল আমার নিজের জন্মস্থানের খুব কাছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে মাত্র তিন-চার মাইল দূরে, গোকর্ণ ঘাটে। আমি গেছি তো সেখানে শিশুবাল্যকালে, আর শেষবার ১৯৭১ সালে! নস্টালজিক অনুভূতি পেয়ে বসল। তাই অদ্বৈতবাবুর পিছু আর ছাড়লাম না।

গত তিনদিন থেকে একনাগাড়ে পড়ে বইয়ের একটি পিডিএফ কপি আজ শেষ করলাম। কলকাতার পুঁথিঘর-প্রকাশিত ‘প্রথম সংস্করণ হইতে পুনর্মুদ্রিত’ ৩৫০ পৃষ্ঠার তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের কোথাও এর প্রকাশকালের উল্লেখ নেই। তবে অন্য কোথাও দেখেছি লেখকের মৃত্যুর তিন বছর পর, ১৯৫৪ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। উপন্যাসটি মোট চারটি খ-ে বিভক্ত। কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চরিত্রগুলো কোথাও তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেনি। খ- খ- ঘটনা পারস্পরিক সাযুজ্যও হারিয়ে ফেলেনি। শুধু বৃদ্ধ রামপ্রসাদের ভাবনায় প্রকাশ পাওয়া অকাল-বিধবা মালিনী কীভাবে প্রেতাত্মায় পরিণত হলো, পরবর্তীকালে তার হদিস পাওয়া যায় না। ছোট্ট একটি বুদ্বুদের মতো দেখা দিয়েই ভাবনাটি সুবিশাল উপন্যাসটিতে মিলিয়ে গেছে। তবু দুজনের জন্যই রেখে গেছে এক সীমাহীন ভালোবাসার রেশ।

বিদেশ ভ্রমণে বের হয়ে জেলেপল্লির এক কিশোরের দূরের গ্রামের কিশোরীর প্রেমে পড়া, বিয়ে করা, স্ত্রী হারানো এবং নিজের পাগল হয়ে যাওয়া দিয়ে মূল কাহিনির শুরু। এরপর শিশুসন্তানসহ স্ত্রীর সঙ্গে পাগলের মিলন এবং দুজনের মৃত্যু। সন্তানহীন অন্য দুই নারীর মাতৃস্নেহে বেড়ে উঠতে উঠতে সেই শিশুর দেখা অতীব সুন্দর প্রকৃতি ও পৃথিবী এবং সমাজের চিত্র। সদ্য মা-মরা শিশু এবং স্থিরদৃষ্টিতে চোখের দিকে চেয়ে থাকা ক্ষুধার্ত অনন্তর হাতে দয়ালু এক বিক্রেতা আলু তুলে দিলেও ওর চেয়ে থাকাতে কোনো পরিবর্তন হয় না। কারণ কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টির পর আকাশে যে অপরূপ রংধনুর সৃষ্টি হয়েছে সে অবাক বিস্ময়ে তাই দেখছে। পেটের খিদে মনের খিদের কাছে পরাস্ত হয়েছে। সৌন্দর্যপিপাসু এই ছেলের চোখেই উপন্যাসের অপূর্ব সব শিল্পকর্ম পাঠকের কাছে ধরা দিয়েছে।

প্রথম অধ্যায় শেষ করলাম এক অসম্ভব ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে। এরপর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৎস্যজীবীদের একটি শ্রেণি, বইটিতে যাদের মালো বলা হয়েছে, মালোপাড়ার সেই অধিবাসীর জীবনধারার মায়াময় জীবনের বর্ণনা রয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে। সেই বর্ণনাগুলো এসেছে চার বছর বয়সের শিশু থেকে বয়স্ক-প্রবীণ নারী-পুরুষের কথোপকথন এবং অনুভূতির প্রকাশ থেকে। অতিসহজ সেই জীবনযাত্রার আরো সহজ প্রকাশভঙ্গি পাঠকের অন্তরকে তিতাসের শীতল জলে স্নান করিয়ে স্নিগ্ধ করে তোলে।  তৃতীয় অধ্যায়ে দেখা দিয়েছে তিতাসতীরে পার্শ্ববর্তী গ্রামের কৃষিজীবী মুসলমান সম্প্রদায়ের। বিশ্বাস ও সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও আবহমান মনুষ্যত্বের অভিন্নতার ফলে মালোদের মতোই সহজ তাদের জীবন, সহজ তাদের ভাষা। একটি শিশুর অনুভূতিতে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি ঘটনাপ্রবাহের নিষ্কলুষ বর্ণনা।

তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায়ে আবির্ভাব হয় শহুরে ‘শিক্ষিৎ’ বাবুদের নতুন সংস্কৃতি এবং কূটিকতা। এর সঙ্গে যোগ হয় প্রাকৃতিক কারণে তিতাসের স্রোতের ভিন্নমুখী গতি। এই দুয়ের সমন্বিত আক্রমণ প্রতিরোধ করতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী দুই সম্প্রদায় একত্রে সংগ্রাম করে প্রাণপণে। কিন্তু জয়ী হতে পারে না। ক্ষয় হতে হতে মৎস্যজীবী মালোপাড়া এবং কৃষিজীবী মুসলমান গ্রামের আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না, দুজন ছাড়া।

উপন্যাসের শেষে মৃত্যুর সময় এক নারীর চোখে ভেসে ওঠে ওর শিশুকাল থেকে দেখা জীবনের কোমল ও সংঘাতময় ঘটনার প্রতিটি দৃশ্য। চার বছরের অনাথ যে-শিশুটিকে সে মাতৃস্নেহে লালন করেছিল, বড় ও ‘শিক্ষিৎ’ হয়ে সে মড়ার মতো বেঁচে থাকা উপোসীদের মাটির মালসায় লঙ্গরখানা-রিলিফের ভাত তুলে দিচ্ছিল। চিনে ফেলতে পারে ভেবে বিপ্লবী চেতনার সেই অভিমানী এবং পরাজয় না-মানা নারী খালি হাতে ফিরে এলো।

তারপর ‘… সে মালোপাড়া আর নাই। শূন্য ভিটাগুলাতে গাছ-গাছড়া হইয়াছে। তাতে বাতাস লাগিয়া শোঁ শোঁ শব্দ হয়। এখানে পড়িয়া যারা মরিয়াছে, সেই শব্দে তারাই বুঝি বা নিঃশ্বাস ফেলে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাঠকও। উপন্যাসের শুরুতে পাঠক ডুব দিয়েছিল বর্ষার তিতাসের গহিন জলে। উপন্যাসের শেষে গ্রীষ্মে সেই পাঠকই এবার হু হু করা হৃদয় নিয়ে মুখ লুকালো তিতাসের বুকে জেগে ওঠা ধু ধু করা মরুভূমির মতো বালুর চরে।

 

দুই

অদ্বৈত মল্লবর্মণ বেঁচেছিলেন খুব অল্পদিন, মাত্র সাঁইত্রিশ বছর। তাঁর জীবনী সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। সম্প্রতি প্রয়াত, ঢাকা কলেজে আমার সতীর্থ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের প্রাক্তন শিক্ষক শান্তনু কায়সার তাঁর জীবনী উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছিলেন। সেটি পড়ার সৌভাগ্য হয়নি এখনো। খুব অল্প বয়সেই মা-বাবা হারিয়ে দারিদ্র্যের মধ্যেই অদ্বৈত বড় হয়েছিলেন। লেখাপড়ায় ছিলেন খুবই আগ্রহী। আমার প্রায় বত্রিশ বছর আগে, আমারই পড়া অন্নদা হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হলেও আর পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু মৃত্যুকালে তাঁর সংগ্রহে বইয়ের সংখ্যা ছিল সহস্রাধিক! তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ১৯৫১ সালে, আমি জন্মেছিলাম যে-বছর।

১৯৩১ সালে পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। হয়তো অর্থকষ্টের কারণে। বইটি পড়ে আমার মাথায় অন্য একটি কারণও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ১৯৩১ সালের অনেক আগে ‘অসহযোগ আন্দোলন’ শেষ হলেও ভারতের স্বাধীনতার জন্য গোপনীয় ও বিপ্লবী কার্যকলাপ থেমে যায়নি, বরং বাংলায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জনপ্রিয়তা ছিল অনেক উচ্চে।

একটি শিক্ষিত শ্রেণির কাছে সর্বহারাদের কমিউনিস্ট আন্দোলনও জনপ্রিয় ছিল। ওরা সনাতন প্রথা ছেড়ে মানবিক ও বৈপ্লবিক সামাজিক রীতি সৃষ্টিতে আগ্রহী ছিল। এমন কী হতে পারে যে, অদ্বৈত মল্লবর্মণ সেসব বিপ্লবী চেতনার অনুসারী হয়ে তেমন গোপন কোনো দলের প্রয়োজনে ভিক্টোরিয়া কলেজ ছেড়ে কলকাতা পাড়ি দিয়েছিলেন? তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসে মালোদের অতিসহজ জীবনধারণের পরিচয় দিলেও বইয়ের বিভিন্ন স্থানে কিছু কিছু কথোপকথন ও বর্ণনা সেই চেতনার ইঙ্গিত দেয় বলে আমার মনে হয়েছে। সে-বই থেকে উদ্ধৃত নিচের কয়েকটি উদাহরণ লক্ষ করুন।

‘মালিকেরা চতুর মানুষ। তারা নিজে কিছু না করিয়া যাকে জন খাটাইতে নিয়াছে বিপদ আপদের কাজগুলি সব তাদের দিয়াই করায়।’ কিন্তু বাসন্তী নামের ‘সুবলার বৌ এর মধ্যে এক বিপ্লবী নারী বাস করে।’ ফলে ‘বাসন্তী কল্পনা করিতে চেষ্টা করে একটা মনিবের অসংগত আদেশ আর একটা নিরুপায় ভৃত্যের তাহা পালনের জন্য মৃত্যুর মুখে তাহা পালনের দৃশ্যটা।’ অল্প বয়সে বিধবা হয়ে সুবলার বউ অতি নিরুস্তাপ সমাজে একদিন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ‘তোমরা কি বুঝবা আমার দুঃখের গাং কত গহীন। আমার বুঝি সাধ আহ্লাদ নাই। আমার বুঝি কিছুই দরকার লাগে না।’ একপর্যায়ে ‘সভ্যতা’র আলোবিবর্জিত মালোপাড়াতেও কলকাতার সুধীসমাজে প্রচলিত বিবাহ বিধবার মতো আলোচনা শুনতে পাই। কিন্তু পুরোহিতের মুখে নরকে যাওয়ার ভয়ে সমাজপতিরা তা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

‘সেই গাঁয়ে আর মালো নাই, খালি কৈবর্তরা থাকে’ – এই উক্তি থেকে বোঝা যায় সেকালের অতিদরিদ্র জেলেদের মধ্যেও শ্রেণিভেদ ছিল। লেখক মানুষের সমাজে এই সামান্য ভেদাভেদটুকুও তুলে ধরতে ভোলেননি।

অগাধ টাকাওয়ালা এক লোক সুতা কাটতে থাকা মালো-বউদের ‘বে-আব্রু’ ঊরুতে কুদৃষ্টি দেয়। সুবলার বউয়ের উদ্যোগে মালোপাড়ার যুবকরা তাকে ‘গলা টিপিয়া মারিয়া, নৌকায় তুলিয়া বার-গাঙ্গে নিয়া ছাড়িয়া দিল।’ শেষে উচ্চশ্রেণির ‘বামুন, সাহা, তেলি, নাপিত’ যুক্তি করে প্রস্তাব করে, ‘মালোদের নৌকাগুলি এক রাতে দড়ি কাটিয়া ভাসাইয়া নিয়া তলা ফুটাইয়া দেওয়া হোক। আর জালগুলি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হোক।’ পৃথিবীর সব সমাজে শোষণকারী ও নারীলিপ্সু ধনিক শ্রেণি দ্বারা খেটে-খাওয়া লোকদের অত্যাচারের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ যেন। এরপর মেয়েমানুষ হয়ে সে কী করতে পারে এই প্রশ্নের উত্তরে সুবলার বউ বলে, ‘আমি নি বাজাইরা লোকেরে ডরাই গো।’ ‘আমি সব পারি। আর কিছু না পারি আগুন লাগাইয়া গাঁও জ্বালাইয়া দিতে পারি।’

ধনী ও শিক্ষিত শ্রেণির প্রতি মালো এবং মুসলমান প্রবীণদের একই মনোভাব। ছেলেকে ‘ইস্কুলে পাঠাইলে … শাশুড়ীর বিছানায় বউকে, আর বৌয়ের বিছানায় শাশুড়ীকে শোয়াইয়া দিয়া দূরে সরিয়া ঘুষের পয়সা গুণিতে পারিবে।’

বিভিন্ন বিষয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণের যে অগাধ জ্ঞান ছিল, সে-ইঙ্গিত পাওয়া যায় বইয়ের প্রথম থেকেই। কিন্তু সেই জ্ঞানের ‘ছটা’ বইয়ের কোথাও বিন্দুমাত্র নেই। আছে শুধু অসীম জীবনবোধ। ‘ভূগোলের পাতায় তাহার নাম’ না থাকলেও প্রায় একশ বছর আগেও অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস সম্পর্কে লিখেছেন, ‘অনেক দূর-পাল্লার পথ বাহিয়া ইহার দুই মুখ মেঘনায় মিশিয়াছে। পল্লীরমণীর কাঁকনের দুই মুখের মধ্যে যেমন একটু ফাঁক থাকে, তিতাসের দুই মুখের মধ্যে রহিয়াছে তেমনি একটুখানি ফাঁক – কিন্তু কাঁকনের মতোই তার বলয়াকৃতি।’ আকাশের অনেক ওপর থেকে না দেখে তিতাসের গঠনের এত স্বচ্ছ ভৌগোলিক বিবরণ দিতে পারা তাঁর অসীম জ্ঞানভাণ্ডারের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। আজ গুগল ম্যাপের দিকে তাকালে তাঁর বর্ণনার যথার্থতা আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন।

বইটির সর্বত্র, বিশেষ করে শেষের দুই অধ্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শুধু মৎস্যজীবী মালো সম্প্রদায়ের মাঝে প্রচলিত গীত-সংগীতের যে সমাহার, তা ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা ব্রাহ্মণবাড়িয়া বইয়ের পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সংগৃহীত লোকসংগীত থেকে কোনো অংশে কম ‘মোটা’ মনে হয়নি। তাতে বোঝা যায়, শুধু শৈশবস্মৃতি থেকে অদ্বৈত মল্লবর্মণ বইটি লেখেননি – অনেক গবেষণা, অনেক পড়াশোনা তাঁকে করতে হয়েছিল। মালোপাড়ার সবাই সমস্বরে যেসব গীত গাইত, বেঁচে থাকলেও এখন তার বেশিরভাগই মূক হয়ে গেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রাণহীন ফসিলের মতো পুস্তকের পাতায় চ্যাপ্টা হয়ে লেগে আছে মাত্র!

 

তিন

নমস্য অদ্বৈত মল্লবর্মণ, আজ আপনি নেই। আপনার সেই মালোপাড়াও নেই। কিন্তু এখনো রয়ে গেছে আপনার মোহনীয় ভাষায় বর্ণিত ‘ভৈরব বাজার’, ‘জগত বাজার’, ‘আনন্দ বাজার’, ‘কুড়–লিয়া খাল’ এবং ‘নৌকাবাইচ’। নৌকাবাইচ এখন আর হয় কি না জানি না। প্রকৃতির নিয়মে একদিন এর সবই বিলুপ্ত হবে। যেমন আপনার দেখা ‘তিতাসের তেরো মাইল দূরে’র ‘বিজয় নদী’টির কথা কেউ আর জানে না। যেমন আপনার ব্যবহৃত ‘উদারচন’, ‘পরস্তাব’, ‘গেরাপী’ শব্দগুলোও আর কেউ উচ্চারণ করে না। এসবের অর্থও কোনো অভিধানে হয়তো পাওয়া যায় না। তার বদলে তিতাসের বুকে জেগে-ওঠা নতুন চরের মতোই জন্ম নেবে নতুন গ্রাম, নতুন কোনো ‘বাইচ’ এবং নতুন অনেক শব্দের। কিন্তু আপনি বেঁচে থাকবেন আরো অনেক, অনেক বেশিদিন।

তারপরও ‘কিন্তু সে কি আজকের কথা? কেউ মনেও করে না কিসে তা উৎপত্তি হইল। শুধু জানে সে একটি নদী’ – অসীম

মায়া-জাগানিয়া আপনার সেই অনুভবের মতোই ছোট হতে হতে আপনার আজকের কালজয়ী উপন্যাসটিও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে  একদিন।

কিন্তু ‘সত্যিই কি’ তাই? আপনার উত্তরসূরি হরিশংকর জলদাস ইতোমধ্যেই আপনাকে কি স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে নিয়ে আসেননি?

Leave a Reply

%d bloggers like this: