অন্ধ-পাখি উড়ুক

লেখক:

অমর মিত্র

স্ট্রেইট আইল্যান্ড থেকে লোকটা একটি পানসি করে আর কয়েকজন গ্রেট আন্দামানি কিংবা জারোয়া উপজাতির সঙ্গে কি এই লঞ্চে এসে উঠেছিল? লঞ্চ উপজাতিদের সেই দ্বীপে নোঙর করেনি। অনেক দূরে সমুদ্রের ভিতরে দাঁড়িয়েছিল। প্রশাসন বিলুপ্তপ্রায় ওই জনজাতির কাছে আমাদের নিয়ে যেতে চায় না। স্ট্রেইট আইল্যান্ড থেকে মানুষ তুলে এবং ওখানে মানুষ পাঠিয়ে দিয়ে যাত্রা করতেই সমুদ্রের চেহারা বদলে যেতে লাগল। আমিও দেখতে পেলাম লোকটাকে। উপজাতিদের লঞ্চের মাথায় রাখে এরা, যাতে আমরা না দেখতে পাই। এই মানুষটি তা নয় হয়তো। কিন্তু কীভাবে অবাক চোখে সমুদ্রে চোখ মেলে আছে। ওই চেয়ে থাকা কত দূর অতীতের যেন।

এতক্ষণ সমুদ্র ছিল নিরীহ দুর্বল প্রকৃতির, ওই দরজার ধারে বসে থাকা ঘোর কালো ছোটখাটো মানুষটার মতো, হয়ে উঠল জোয়ান মরদ। কী তার তেজ আর ফোঁসানি। সমুদ্রে এমন হয়। আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে বদল হয়। কদিন সমুদ্র আর দ্বীপে ঘোরা আমাকে চিনিয়েছে সব। সকালের সেই ধারাল রোদ আচমকা সে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। হ্যাঁ তাই, ওই দূর-বহুদূরে সমুদ্রের কালো জলে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে আরো দূরে চলে যাচ্ছে রোদ। যেন ফিরছে তার ফেলে আসা সময়ের দিকে। আমরা এখন পড়ে গেছি ওপেন সি-তে। মুক্ত সমুদ্র। দিগ-দিগন্তহীন তেপান্তর যেমন হয়। কিন্তু এ তো শুধুই শূন্য। আকাশ আর জল। এত সময় এই যাত্রাপথে দ্বীপ ছিল হয় পুবে, না হয় পশ্চিমে। লঞ্চ থেকে তটরেখা দেখতে দেখতে এসেছি। এখন আর দিক নেই। এই ভরা গাঙের কূল নেই। কখন আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে, তা খেয়াল করিনি। আমি তাকিয়ে ছিলাম সেই নিকষ কালো লোকটির দিকে। লঞ্চের খালাসি একবার তার কাছে গেল, কী বলল, চলে গেল। মনে হচ্ছিল তার কাছে যাই। নিরীহ মুখ, অতি খর্বকায়, সাড়ে চার থেকে পৌনে পাঁচ ফুট হবে, গায়ে একটা লাল জামা, কোমরে লুঙ্গির মতো কিছু। একেবারে আলাদা কেউ যেন। আচমকা আমার মনে হলো, সুনীলের খোঁজ সে রাখতে পারে। রঙ্গতের যাত্রী তো। আর আমি সব সময় ভয়ে আছি, কী জানি কী হয়, ধরা না পড়ে যাই। স্ট্রেইট আইল্যান্ড থেকেই তো এলো মনে হয়। কত বয়স হবে? বছর চল্লিশ। বয়স চল্লিশ হতে পারে, ষাট হতে পারে। আবার তিরিশ-পঁয়ত্রিশ হতে পারে। কিছু মানুষ এমনি হয়। জন্ম থেকে আধবুড়ো। সে বসে ছিল লঞ্চের দোরগোড়ায়। আমাকে কেন জানি না ডাকল হাতছানি দিয়ে, পরিষ্কার বাংলায়, ইদিকে আস, আয় ইদিকে।

কথা কী বলল সে? নাকি ডাকল হাতছানিতেই শুধু। বসলাম মাটিতে মানে লঞ্চের কাঠের মেঝেতে। সমুদ্র তো মনোটোনাস। বৈচিত্র্য কই? শুধু বসে থাকা না-হয় ডেকে দাঁড়িয়ে একই দৃশ্য দেখে যাওয়া। ওয়াটার ওয়াটার ওয়াটার, না আমাদের মতো অতিসাধারণ মানুষের ভিতর কবি কোলরিজের সেই প্রাচীন নাবিকের দুঃখ নেই। আমরা কেউ ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সির সেই বুড়ো মৎস্যজীবীও নই। আমরা তিতাসে ভাসা সুবল কিশোর তিলকচাঁদ নই, তিতাস থেকে কূলহীন সেই বিপুলা মেঘনার ভিতর গিয়ে পড়িনি। সমুদ্রে আমার মন নেই, সুনীল বিশ্বাসের কাছে পৌঁছতে পারলে হয়; কিন্তু সমুদ্র আমাকে তার দিকে ফেরাল। এই লোকটা কি দরজায় আলাদা হয়ে বসে গোটা সমুদ্রকে ডাকল এত সময় ধরে। সে পরিষ্কার বাংলায় বলল, আমি তো আমি, আমার নাম গাঙে দিয়েছি বাবু।

আমি তার পাশে বসলাম। তার পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল কি কুমিল্লা? কুমিল্লা মানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া? নাকি কুমিল্লা শহর? হ্যাঁ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম কি তার শোনা? তার বাবার হাত ধরে ঠাকুদ্দা গিয়েছিলেন কি ত্রিপুরা? ত্রিপুরা থেকে বহু ঘাটের জল খেয়ে এখানে? গতকাল হ্যাভলক আইল্যান্ডে তাই বলেছে একজন। অনেকটা এমনি ছিল সে। তার জন্ম এখানে। সে কখনো পশ্চিমবঙ্গে যায়নি। কলকাতা দ্যাখেনি। মেইন ল্যান্ডে তার আকর্ষণ কম। তুমি তিতাস নদীর কথা জানো? মালোর ছেলে অদ্বৈত মল্লবর্মণের নাম শুনেছ? না, সে শোনেনি। তারা ছিল চাষা। চাষবাসে কাটত জীবন। মালো – মৎস্যজীবী নয়। তিতাস, ভৈরব আর মেঘনার জলে জলে ঘুরেছে অদ্বৈতর উপন্যাসের সুবল, কিশোর আর তিলক। তাহলে এই লোকটা কি ফরিদপুরের? সাতক্ষীরের? নাকি এই দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটিতে সাতপুরুষের বাস।

এ কিছুই জানে না। যেমন কাল রাতে হ্যাভলকে আলাপ হওয়া সেই লোকটাও জানত না। তার বাপ-ঠাকুদ্দার গাঁয়ের কথাও না। সে জানে শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর কুমিল্লার নাম। সে অবশ্য এই সমুদ্রকে জানে। জানে সমুদ্রের নানা খেয়ালের কথা। এক সময় বোটে কাজও করেছে, না পোষানোয় ছেড়ে দিয়েছে। ওই দেখুন বৃষ্টি আসছে। ওই যে সবকিছু ঝাপসা করে ছুটে আসছে সহস্রদল। এর নাম ওপেন সি। এখানে হাওয়া খুব। ঢেউ খুব। জল আর জল। উত্তাল এই ঢেউয়ের নাম হালফা। হ্যাঁ, দূর থেকে ভয়ংকর এক নৈঃশব্দ্যে ছুটে আসছে বৃষ্টি। বন থেকে পাহাড় থেকে শনশন ছুটে আসছে তীর। সমুদ্রে ঢেউ তুলেছে সে এত সময় ধরে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে এত বড় লঞ্চ দুলছে। সমুদ্র ফোঁস করছে কালো আকাশের দিকে। খোলা সমুদ্র আমাদের চোখের সামনে। জলের ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিলো আমাদের। সমুদ্র যেন উঠে আসবে লঞ্চের ভিতর। আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে আছি। সে সমুদ্রের দিকে হাতছানি দিচ্ছিল, আয় আয়। আমার ভয় করছে। এলাম কেন এখানে? ও আমায় ডাকল কেন? আমার নানাবিধ ভয় আছে। তার সঙ্গে এখন মিলেছে সমুদ্র। সমুদ্র যেন পাগল হয়ে উঠেছে। সে সমুদ্র থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখল, বলল, সুনামির পর থেকে সমুদ্র বে-খেয়ালি হয়ে গেছে। আগে একে অাঁচ করা যেত। এখন আর ধরাই যায় না কখন কী হবে। তবে সে চেষ্টা করছে বুঝে নিতে। আর ধরতে পারছে, কিসে কী হচ্ছে। তবে বেখেয়ালিকে খেয়ালে বাঁধা খুব সহজ নয়। গাঙে ঘুরতে হবে অনেক।

গাঙে গাঙে ঘুরলে গাঙ চেনা যায় মনে হয়। আমি বলেছিলাম হ্যাভলকের সমুদ্রতীরে বসে গত সন্ধ্যায় তাকে। সেই একজনকে। যার কাছে সুনীল বিশ্বাসের খোঁজ নিয়েছিলাম। সে হ্যাভলক থেকে রঙ্গতে গেছে সে-খবরই তো গিয়েছিল। তাই রঙ্গত যাত্রা আমার।

সে বলেছিল, গাঙে ঘুরলেই কি হয় বাবু, এ-গাঙ কত বড়! এখেনে এক তো ওখেনে আরেক, খুব সহজ না বোঝা। বলে থেমেছিল সে। তারপর বলেছিল, আমরা কতটা আর দেখি বলুন, আর পাখিরা কতটা দ্যাখে।

আমি ঘাড় কাত করেছিলাম, সত্যি।

তবে পাখিরাও বেশিদূর যায় না, বসবে কোথায়, শুধু নোনা পানি, হাঁসপাখিদের একজাত সমুদ্র পার হয়ে যায়, তারা কিছুটা জানতে পারে, আর জানে… সে থেমে গিয়েছিল অন্ধকারে। তখন আধখাওয়া চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে তার সববনাশী রূপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। আমাদের দেখছিল উপর থেকে। সেই চোখ এই দিবসে আঁধারকরা সমুদ্র থেকে আমাকে দেখছে যেন। এই লোকটা।

আমি আধময়লা চামড়ার মানুষ, হাইট পাঁচ ফুট চার, মাথার চুল আচমকা পেকে গেছে মসলন্দপুরের ঝামেলায়, ভয়ে, উদ্বেগে। চোখে চশমা আছে। এটি খুব দামি ফ্রেম, বিদেশি। তখন কাঁচা টাকা আসছে, আমার যা কিছু সব বিদেশি। এই জিন্স, শার্ট, শু্য, সব। তখন তো ৫৫৫ ছাড়া কোনো সিগারেট মুখে রুচত না। মদেও তাই। আর ছিল কত মেয়েমানুষ। ভার্জিন চাই ভার্জিন। এক ঝটকায় সব গেছে। টাইফুন কিংবা সুনামি একে বলে। তাতে এরকম হয়। ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায় শুনেছিলাম।

এই বড় গাঙ, সাগরের কথা জানে আদিবাসী জারোয়ারা। সে আমাকে দেখতে দেখতে বলেছিল, তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, একা একা ঘুরতে এয়েছ বাবু, বউ-ছেলেমেয়েরা কই?

আমার কেউ নেই। ধীরে ধীরে বলেছিলাম।

ও। লোকটি কেমন অদ্ভুত চোখে দেখেছিল আমাকে। বিশ্বাস করেছিল বলে মনে হয় না। আমার ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখছিল লোকটা। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, ঝাড়া হাত-পা?

বলতে পারো। আমি অস্ফুট জবাব দিয়েছিলাম।

আগে এয়েচ আন্দামান?

না।

ও। ওই কথাও যেন বিশ্বাস করেছিল বলে মনে হয় না। চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, তোমাকে আমি যেন দেখেছি বাবু, চেনা মনে হচ্ছে।

আমার ভিতরটা গুরুগুরু করে উঠেছিল। লোকটা কি সম্প্রতি গিয়েছিল মেইন ল্যান্ড, পশ্চিমবঙ্গে? মসলন্দপুর, হাবড়া, বনগাঁ, গাইঘাটা, বাগদা, শিমুলে, ট্যাংরা কলোনি। গিয়ে শুনে এসেছে সব? এজেন্ট পালিয়েছে লাখ লাখ টাকা তুলে। বেশি সুদের লোভ দেখিয়ে চাষাভুষো, সবজিওয়ালা, মাছওয়ালা, ইস্কুল মাস্টার, কেরানি, ছুটকো কারবারি সবার কাছ থেকে টাকা তুলে পালিয়েছে। তার বউ কোথায় আছে সে জানে না। পুরনো ফোনের সিম বদলে ফেলেছে। ধরেই নিয়েছে ওই পর্ব শেষ। এই বউ ছিল ভাগিয়ে আনা। আগের বউকে ত্যাগ করেছিল কবে। সে থাকে রানাঘাট। এই বউ অস্বীকার করেছে বিয়ের কথা। এই অবধি জানি আমি। আর আগের বউ তো কথাই বলেনি, আমার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই হলো আমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। কিন্তু হ্যাভলকে মেঘ চুঁইয়ে আসা ফিকে আলোয় আমার মুখ দেখতে দেখতে বলেছিল, আমায় দেখেছে কোথাও।

দম বন্ধ করে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি তো মেইন ল্যান্ডে যাওনি, কী করে দেখবে?

হু। অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিয়েছিল সে। সমুদ্র আছড়ে পড়ল লঞ্চের গায়ে। লঞ্চ টাল খেয়ে সোজা হলো আবার। দেখছিলাম ভিতরে কেউ-কেউ চোখ বুজে ফেলেছে। এই লোকটা না সেই লোকটা গত রাতের অন্ধকার থেকে বলল, এই ঢেউ কিছু না, এ তো কাত্তিক মাসের সাগর, চৈত, বোশেখে একেকদিন যা হয় বাবু, আমি জানি কী হয়।

কী হয়?

সে আর শুনতে হবে না, তোমাকে আমি দেখিছি কোথায় বাবু, কতবার এয়েচ ইদিকে?

এই প্রথম। আমি বলেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল লোকটি একটি খোঁচড় হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ খবর পাঠিয়েছে এইদিকে। আমাকে পুলিশ ধরবে রঙ্গতে পা দিলেই। তার ইঙ্গিত বুঝি পেয়ে গেছি। পুলিশ ছবি পাঠিয়েছে নাকি, ছবি দেখেছে লোকটা? তা হতে পারে। এদিকের কাগজ তো দেখা হয় না। তবে টেলিভিশনও দেখাতে পারে। ভয় করল। আমি মাথা নামালাম। এই লোকটাও যেন মনে করতে চাইছে কোথায় দেখেছে আমাকে। কোথায় হতে পারে। আচমকা যদি মনে পড়ে যায়, আমি আমার মুখ লুকোতে চাইছি। এখন আর উপায় নেই। কিন্তু যদি আমাকে ধরতে চায়, আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দেব।

সুনামির খবর তারা আগে জেনে গিয়েছিল। কেন জানো বাবু?

কারা জেনে গিয়েছিল?

লোকটা বলেছিল, তারা।

তারা কারা?

জারোয়ারা, জারোয়া দেখেছ?

আমি মাথা নেড়েছিলাম, বলেছিলাম, দেখা তো বারণ।

হু। লোকটা তাকিয়ে ছিল অন্ধকার সমুদ্রে। বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। আমি তাকাতে পারলাম না। চোখ তুলে লোকটাকে দেখলাম। পাঁচ ফুটেরও বেশ কম। ঘোর কালো। মুখখানি থ্যাবড়া। ভাঙাচোরা শরীর। সে তার মাথা দোলাচ্ছে নিজ মনে।

কেন? আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

বাবু, ওরা হলো পাখির জাত।

পাখির জাত! সমুদ্র যেন আছড়ে পড়ল আমার ওপর।

হ্যাঁ বাবু, ওদের সঙ্গে ভগবানের যোগাযোগ আছে, সে জন্য ওদের কারোর কিছু হয় নাই, আগে জেনে গিয়েছিল সব।

তুমি বলছ!

হ্যাঁ বাবু, ওরা পারে না, এমন কোনো কাজ নেই।

কী পারে ওরা?

পাখি হয়ে আকাশে উড়তে পারে, মাছ হয়ে সমুদ্দুরে ঘুরতে পারে, আর বনের কী না জানে।

এই কথা কে বলেছে তাকে? কেউ বলেনি, তার মনে হয় এই রকম। সে এই সমুদ্রেই জন্মেছে যেন। সমুদ্রজলেই ভেসেছিল ভ্রূণ হয়ে। জলে আর স্থলে জন্ম থেকেই ঘুরছে। লঞ্চের ড্রাইভার ছিল বেশ কিছুদিন। সারেং ছিল। সে সমুদ্র ভালো চেনে। অন্ধকারেও সে ঠিকপথে লঞ্চ নিয়ে যেতে পারে। দিক ভুল হবে না। কম্পাস লাগে না। আকাশ চেনে যে ভালো করে। ভোর পুয়াতি তারা, সন্ধেতারা চেনে। একই তারা সারারাত ধরে পশ্চিম থেকে পুবে যায়। সমুদ্রের এদিক থেকে ওদিকে। জল থেকে উঠে জলেই ডুবে যায়।

তুমি জানো, সেই সুনীল বিশ্বাস রঙ্গতে থাকে?

হ্যাঁ, রঙ্গতে তারে দেখেছি।

রঙ্গতে তোমার ঘর?

আঁজ্ঞে ভ্যানে নেবুতলা থেকে এক ঘণ্টা পশ্চিমে, গাবতলা।

সুনীল বিশ্বাসকে ভালো করে চেন?

পাঁচটা সুনীল বিশ্বাসকে চিনি বাবু, লঞ্চে আছে এক খালাসি, সেও সুনীল, তবে মন্ডল।

সেই লোকটি একটু বেশি কথা বলে। কিন্তু সে-ই আমাকে সাতক্ষীরের সুধীর বিশ্বাসের ছেলে সুনীলের খবর দিলো তো। সুনীল থাকত হ্যাভলকে। আমার কাছে ঠিকানা ছিল। ফোন নম্বর ছিল। আমি এসে শুনি সে আর থাকে না ওখেনে। রঙ্গত চলে এসেছে। আমি তার খোঁজে সেই দ্বীপে চলেছি। তার কাছে নিজেকে লুকোব। বছরখানেক কি তার বেশিও আত্মগোপন করে থাকতে হবে হয়তো। মসলন্দপুর ফিরলে পিটুনি খেয়ে মরব। সাধের দালান ভেঙেছে পাবলিক। বুড়ো মা-বাপ ছিল তাই, একেবারে গুঁড়িয়ে দেয়নি। পিছনের বাগানের সাতটা আমগাছ কেটে নিয়েছে, একটা মেহগিনি চারা উৎপাটিত করেছে। মত্ত হাতির মতো পাবলিক রাগ মিটিয়েছে। তাদের গেছে অনেক। কত টাকা যে বেশি সুদের লোভ দেখিয়ে তুলেছিলাম লোকের কাছ থেকে। কোম্পানি উঠে গেছে। মালিক পালিয়েছে বাংলাদেশে। আমি এজেন্ট ওদিকে না যেতে পেরে এইদিকে। আমি এককালে তিতাস পড়েছি, কারো তা বিশ্বাস হবে না। আমি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দি সি পড়েছি, কারো মনে হবে না যে, আমি সত্যি বলছি। আমি কোম্পানির হয়ে টাকা তুলতাম আর কমিশন পেতাম। সব টাকা জমাও দিতাম না। নিজের ঘরে রাখতাম। নিজের অ্যাকাউন্টেও ফেলতাম। কিন্তু টাকা ফেরত দিতে গিয়ে ধরা পড়তে লাগলাম। শেষমেশ পালিয়ে আসতে হলো। হাজার টাকার ক’বান্ডিল এনেছিও। লোকের টাকা, আমার নয়, কিন্তু আমার হয়ে গেছে। সুনীল বিশ্বাস আমার পিসির ছেলে। অনেকদিন আগে যখন আমি কিছুই করতে পারছিলাম না, সে একবার মসলন্দপুর গিয়েছিল ঠাকুরনগরে মতুয়ার মেলা উপলক্ষে এসে। বলেছিল, আন্দামান আয়, বেঁচে যাবি। সে পাঁচ বছর আগের কথা। তারপর তো রেনেসাঁর সব হলাম। রেনেসাঁ ইনভেস্টমেন্ট টাকা তুলতে লাগল। রাতারাতি আমি অবস্থা বদলে ফেললাম। সুনীল বিশ্বাসই এখন ভরসা। তার হাতে টাকা দিয়ে বলব, রাখ, আমায় একটা কিছু করে দে, নতুন করে বাঁচি, আমি আর ফিরব না।

লোকটা আমাকে বলেছিল, তাহলে হয়তো দেখিনি, এক একজনকে দেখে মনে হয় না এমন, যেন কতবার দেখেছি, কতদিনের চেনা।

হ্যাঁ। আমি মৃদু গলায় বললাম।

সে বলেছিল, গলার স্বরটাও চেনা।

তাই! আমি চাপা গলায় বলেছিলাম। তখন অন্ধকারে শনশনে বৃষ্টি নেমেছিল আবার। রাধানগর বিচের ধারে চালাঘরে অন্ধকারে বসেছিলাম আমরা। চাদ্দিক নিঃঝুম তখন।

তুমি যখন ওখানে বসে ছিলে একা, তখন থেকে দেখছি বাবু, হাতছানি দিতেই তুমি নিজে আমার কাছে এসে বসলে, মনে হচ্ছে, চেনাটা ভুল না।

আমি বলেছিলাম, আমি কিন্তু আজই দেখলাম তোমাকে।

হুঁ, ওই দেখুন, ওই দূরে…! এই লোকটি হাত লম্বা করে সমুদ্রের দিকে বাড়িয়ে দিল। আমাকে দূর সমুদ্রে ছায়া-ছায়া একটি দ্বীপের আভাস দেখাল, বলল, কছুয়া টিকরি। কচ্ছপরা ডিম পাড়ে ওখানে। ওখানে গিয়ে কচ্ছপ ধরত দ্বীপের মানুষ। এখন সরকার নিষেধ করে দিয়েছে। কচ্ছপ ধরলে পুলিশ ধরবে। বেশ করেছে সরকার।

কছুয়া টিকরির কথা গত রাত্রিতে সে বলেছিল। অন্ধকার সমুদ্রে বসে সমুদ্রকে চিনিয়েছিল সমস্ত রাত যেন। সমস্ত রাত সমুদ্র সাক্ষী করে আমরা কথা বলেছিলাম।

কছুয়া – কচ্ছপ – কাছিম মানুষের কত উপকার করে কে জানে? সমুদ্দুরে যদি নৌকো-বোটডুবি হয়, তবে কচ্ছপ মানুষকে তার পিঠে বসিয়ে নিয়ে কোনো না কোনো দ্বীপে পৌঁছে দেয়। এমন কত হয়েছে। কচ্ছপ আর ডলফিন উদ্ধার করেছে ভেসে যাওয়া মানুষকে। সে বলেছিল, ডলফিন ঠিক থাকবে সঙ্গে। ওরা বোটের সঙ্গে চলে জলে জলে। জলে মানুষ তো অসহায়। মানুষের যতো কেদ্দানি ল্যান্ডে। আকাশে পাখি আর জলে কচ্ছপ আর ডলফিন হলো ভগবান। কী করে উদ্ধার করে শুনবে তুমি বাবু? আমি অবাক হয়ে অন্ধকারে মিশে থাকা মানুষটার দিকে তাকিয়েছিলাম। আছিও। সমুদ্রে খুব বৃষ্টি নেমেছে। ঢেউ আছড়ে পড়ছে লঞ্চের গায়ে। একটু ভয়-ভয় করছে বটে, কিন্তু সে যেন টের পেয়ে বলল, এ আর কী বাবু, কিছুই না, চৈত-বোশেখে যা হয়। এখন তো কাত্তিক মাস। এখন সমুদ্দুর হীনবল। তখন এমন হয় এই পথে যে, লোকে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। বমি করতে করতে শেষে রক্তবমি করে দেয়। ভগবান ছাড়া তখন কে বাঁচায়? আর ভগবানের শক্তি এসে যায় সারেং ড্রাইভারের ভিতর।

হু, কী বলছিলে তুমি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। মাথায় ঢুকছে না। লোকটা আমাকে চেনে, এইটা আমার কাছে সমস্যা। এখন যদি ঝড়-জলে এই লঞ্চ ডুবেও যায়, আমার মন সেদিকে যাবে না। আমি যে কেন তার হাতছানিতে তার কাছে এসে বসলাম। কেন তা ধরতে পারছি না। পাঁচ ফুটের কম লোকটাকে খুবই নিরীহ প্রকৃতির মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন যে অন্যরকম মনে হচ্ছে। তেজ ফুটে বেরুচ্ছে যেন।

ডলফিনের কথা বলছিলাম বাবু, সমুদ্দুরে যদি বোট বা নৌকোডুবি হয়, তখন কছুয়া আর ওই ডলফিন বাঁচায়। ডলফিন ডুব দিয়ে গিয়ে ভেসে-যাওয়া মানুষের দুপায়ের ফাঁকে গিয়ে মানুষটাকে পিঠে তুলে নেয়। তারপর তাকে পৌঁছে দেয় কোনো না কোনো দ্বীপে।

এমন হয়েছে?

কত হয়েছে বাবু, আমাদের নীল আইল্যান্ডে চারটে বুড়ো আছে, তারা সাক্ষী দেবে, আর এই আমি সাক্ষী দিচ্ছি।

তুমি সাক্ষী দিচ্ছ মানে?

মানে তুমি বুঝে নাও বাবু।

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। আমি কী বুঝব? সে ডুবে যাচ্ছিল, তাকে কচ্ছপ বা ডলফিন উদ্ধার করে দ্বীপে পৌঁছে দিয়েছিল! তাকে জিজ্ঞেস করতে সে জবাব দেয়নি। মৃদু হেসেছিল। হালফা-ওঠা সমুদ্রে তাকিয়ে থাকল, তারপর আবার বলল, জারোয়ারা সব মানুষকে চেনে।

কী করে চেনে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।

বলেছিলাম না, ওরা পাখির জাত, উড়তে পারে ভগবানের সিংহাসন অবধি।

ওদের ভগবানের নাম কী? আমি জিজ্ঞেস করি।

ভগবানের কি নাম হয়? ভগবান ভগবানই।

তারপর?

সে বলেছিল, ভগবানের চর ওরা, খবর নিয়ে যায়।

কী খবর?

অনাচার-অবিচার, জগতে খবরের অভাব!

জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী করে জানলে?

জানি। সে অন্ধকার সমুদ্র থেকে চোখ সরাচ্ছে না।

তুমি সেই কছুয়াটিকরি গিয়েছ?

হ্যাঁ।

তুমি বনের ভিতর গিয়েছ?

হ্যাঁ। বলে সে আমার দিকে সরাসরি ফেরে, বলে এই সমুদ্র, দ্বীপ, জঙ্গল, পাহাড় – কোনো কিছুই বাদ নেই আমার, সব জায়গায় যেতে পারি, গিয়েচিও, কিন্তু আমার কথা ঠিক, আমি ভুল বলচিনে।

কী ভুলের কথা বলছ?

তোমাকে দেকেচি বাবু, কোনো ভুল নেই। এই লোকটি এই যেন প্রথম কথাটি বলল, দেকেচি বলেই তো দেকেচি।

আমি বললাম, মোটেই দ্যাখো নি, কী করে দেখবে?

জারোয়ারা যেভাবে দ্যাখে, সুনামিতে বেঁচে গেল, আগে দেখে ফেলে। বিড়বিড় করল সে। আমি দেকেচি, কিন্তু বলতে পারচিনে কোথায়, জারোয়া হলে পেরে যেত। তারা উড়ে উড়ে দেখে আসে রাতের অন্ধকারে, ভগবানকে সব বলে এসে নিজেদের শোনায়।

কথা বলতে বলতে দেখি বৃষ্টি কমে আসতে আসতে একেবারে কমে এলো। সমুদ্র শান্ত হয়ে আসতে লাগল। তাতে আমার ভয় কমতে লাগল। রঙ্গতে বাড়ি আর দোকান করেছে সুনীল, ঠিক পেয়ে যাব। লঞ্চ ভোঁ দিতে লাগল। লোকটি বলল, লং আইল্যান্ড এলো। এখেনে তেল নামবে শুনেছি, তেল নামা মানে ঘণ্টাখানেক, অন্ধকার হয়ে যাবে পৌঁছতে, এখনই কত ময়লা হয়ে গেছে সব।

এখন বেলা চারটে। পাঁচটার আগে ছাড়বে না লঞ্চ, তখন অন্ধকার। কিছু মানুষ এই লং আইল্যান্ডে নেমে গেল। এখানে নেমে ভ্যান রিকশা আর কীসব করে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে গন্তব্যে। রঙ্গত নেমে গেলে সুবিধে হতো সত্যি, কিন্তু এখানে এক ঘণ্টা বসে থেকে রঙ্গতে যখন পৌঁছবে তারা এই জলযানে, তার আগেই এই পথে তারা পৌঁছে যাবে নিজ নিজ গাঁয়ে। খাওয়া নেই, স্নান নেই, সমুদ্রের উত্তেজনা অন্তর্হিত, আবার আলো ফুটেছে, কিন্তু তা বড় মলিন, বেলা যে পড়ে এলো। পৃথিবীটা বড় দুঃখী মুখ নিয়ে চেয়ে আছে সবদিকে।

আমি আর লোকটা সেখানেই বসে আছি। সে হলো সমুদ্রচরা মানুষ। দ্বীপচরা মানুষ, মানুষচরা মানুষ। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। অন্ধকার হয়ে আসছে ক্রমশ।

তেল নেমে গেল। আবার ভোঁ বাজল। আমাদের জলযান ছাড়ল। তারপরও আরো একঘণ্টা গেলে আমরা পৌঁছলাম লেবুতলা ঘাটে, তখন অন্ধকার। রঙ্গত দ্বীপে প্রবেশের দুয়ার এইটা। সে আচমকা অন্ধকারে আমার হাত ধরল, বলল, আমাদের গাবতলাতেও এক সুনীল বিশ্বাস আছে, চলো বাবু।

না।

না কেন, হ্যাঁ করো, এই অন্ধকারে যাবে কোথায়, চারদিক সমুদ্রে ঘেরা, উপায় নেই তোমার, জারোয়ারা উড়তে বেরিয়েচে, খুঁজে পাবে তোমারে।

তুমি কে?

অাঁজ্ঞে স্যার বিশ্বেস, সন অফ বিশ্বেস, কুমিল্লা থেকে আন্দামান।

আমায় দেখলে কোথায়?

আকাশ থেকে।

তুমি দেখেছ?

না জারোয়া বুড়ো, হাজার হাজার বছর পেছন থেকে।

তাহলে তুমি জানলে কী করে?

জানতে পারি। সে অস্ফুট গলায় বলল।

আমি মরিয়া হয়ে উঠলাম, জিজ্ঞেস করলাম, হাজার বছর পেছন থেকে তারা সামনে তাকিয়েছিল, তা হতে পারে?

হয়, ভগবান অমনি করেছে, পারা যায়।

তুমি পারলে কী করে?

ওদের বংশ তো স্যার।

কাদের বংশ?

চলো চলো, সুনীল বিশ্বেস আমার বাবাও বটে, গাঙে ভেসে থাকত, এখন ঘরে বসে থাকে, কী খাটনিই না খাটত, পাথুরে জমি ভেঙে ভেঙে নরম করেছিল।

সে নয়, অন্য সুনীল। আমি বললাম।

আর একজনও আছে তুমার বইসি হবে, সুপুরিবাগান তার দশ বিঘে, সাতক্ষীরের লোক ছিল তারা, তাদের একজন সুনামিতে ভেসে গিয়ে কছুয়া দ্বীপে গিয়ে পড়েছিল।

আমি অন্ধকারে তাকিয়ে আছি লোকটার দিকে। মাথার উপরের আকাশ আবার ঢেকে গেছে মেঘে। যে-তারারা মুখ দেখিয়েছিল এতটুকু সময়, সব ঢেকে গেল। বৃষ্টি নামল বলে। অন্ধকারে সে আমাকে হাতছানি দেয়, এসো।

না।

আসতি তুমারে হবেই, এসো।

না।

আমি তুমারে চিনি, এসো। হাতছানি দেয় সে, গরগর গলায় বলে, আমি জানি তুমি যাবাই যাবা, দেখছি লঞ্চে ওঠার পর থেকে। বলে লোকটা লেংচে লেংচে হেঁটে একটু এগিয়ে গিয়ে সেই প্রাচীন, হাজার বছরের প্রাচীন অন্ধকার থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আকাশের তারার মতো তার দুচোখ দপদপ করতে লাগল। জারোয়া বুড়ো! অনাদি-অনন্তকাল ধরে বেঁচে আছে জারোয়া বুড়ো! অন্ধকারে এই ভূ-মন্ডলে আর কেউ কোথাও নেই। সে তাকিয়ে আছে দশ হাজার বছর দূর অতীত থেকে। সে আর আমি। বললাম, আমি সুনীলের খোঁজ চাই, থাকতে এসেছি।

সে চাপা গলায় বলল, জানি তো, পালিয়ে থাকতেই তো আসে, হয় খুন করে, না-হয় চুরি করে এখেনে এসে মুখ লুকোয়, আয়, আয় বলছি।

আমি ব্যাগ থেকে সামান্য কিছু নোট বের করে অন্ধকারে উচ্ছিষ্টের মতো ছুড়ে দিলাম, নে নে দেখি।

সঙ্গে সঙ্গে জাদু হয়ে গেল। সেই প্রাচীন পুরুষ, আমার পিতামহ, প্রপিতামহ, প্র-প্রপিতামহ… তার অনন্ত অতীত ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে এসে পড়ল অন্ধকারে, কোথায়, কোথায় দিলি রে?

আমার কাজ মিটেছে। আমি চললাম। চললাম। জারোয়ার চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। অন্ধ পাখি আকাশে উড়ুক, বনে ঘুরুক, জলে ভাসুক, আমাকে সে আর দেখতে পাবে না। এবার আমি বন আর সমুদ্রের দখল নেব।