অপরাহ্ণের নীল কষ্ট

লেখক:

শহীদ খান

এই যে ভাই আপনার…। আমার পেছনে ঠিক ঘাড়ের ওপর একজন মহিলার কণ্ঠস্বর। আমি ঘাড় ফিরিয়ে দেখি। আমার ঘাড়ের ওপর ঝুলছে একটি হাস্যোজ্জ্বল মুখ। মনে হচ্ছে একতোড়া সাদা গোলাপ মহিলাটির মুখজুড়ে ছড়িয়ে আছে। ফর্সা মুখের হাসিটা চারপাশে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখেই আমি মুখ ফিরিয়ে নিই। আমি সুন্দরী মেয়েদের দিকে তাকাই না। সে যতো সুন্দরীই হোক। ঘটনাটি ঘটে আমার মহল্লার মুদির দোকানে। আজকাল প্রচুর মহিলা কাঁচাবাজারে, মুদির দোকানে যাচ্ছে। সর্বত্রই মেয়েদের চলাচল আছে। এটা শুভ লক্ষণ। মেয়েদের ঘরে বসে থাকার দিন শেষ। মেইন রোড ধরে কয়েক পা এগিয়েই আমার সেই মহিলার মুখটি মনে পড়ল। এই যে ভাই আপনার…। তারপর মহিলাটি কী বলতে চেয়েছিল আমার জানার খুব আগ্রহ
হচ্ছে। মহিলাটি নিশ্চয়ই এখনো দোকানে আছে। আমি ফিরে যাই। না মহিলাটি এখন আর দোকানে নেই। বের হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কিছু কিনতে এসেছিল। তার কেনা হয়ে গেছে তাই চলে গেছে।
স্যার কিছু ভুলে রাইখ্যা গেছেন? দোকানের একটা ছেলে জিজ্ঞেস করে।
না কিছু রেখে যাইনি। আচ্ছা একটু আগে আমি যখন দোকানের ভেতর ছিলাম তখন একজন মহিলা আমাকে কী যেন বলতে চাইছিলেন। মহিলাটিকে চেনো তোমরা?
কোন মহিলার কথা বলতাছেন স্যার? আপনে যখন দোকানে ছিলেন তখন তো দুইজন মহিলা ছিল।
আমি ফর্সা সুন্দরী মহিলাটির কথা জিজ্ঞেস করছি।
ও বুঝতে পারছি সুন্দরী আপার কথা জিজ্ঞেস করছেন। ওনার হাসিটা কিন্তু খুব সুন্দর। উনি ইচ্ছা করলে নায়িকা হইতে পারতেন। উনি তো রানি হাউসের তিনতলায় থাকেন।
উনার নামটা জানো?
না স্যার, নাম জানি না। তবে মাস ছয়েক ধইরা এই বাসায় আছে। আমার দোকানের কাস্টমার। কেন স্যার কোনো সমস্যা হইছে? আপা খুব ভালো।
না, কোনো সমস্যা হয়নি। বলে আমি বের হয়ে আসি দোকান থেকে। আমার মুখের ওপর ঝুলছে হাসিটা। আমি ভুলতে পারছি না। এই হাসি, এই মুখ তো মুখর ছাড়া আর কারো হতে পারে না। আমার এখন নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে। কেন আমি ভালো করে মুখটা দেখলাম না। মুখরের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আমি আর কোনো নারীর মুখের দিকে ভালো করে তাকাই না।
মুখর যখন রানি হাউসে বাসা ভাড়া নিয়েছে তখন ওর দেখা আবার পাবো। ওকে আমার পেতেই হবে। যেভাবেই হোক ওকে আমি খুঁজে বের করবো। আমি তো বিগত পাঁচটি বছর ধরে মুখরকেই খুঁজছি। অথচ আজ হাতছাড়া হয়ে গেল। নিশ্চয়ই মুখর ইচ্ছা করে দ্রুত সরে পড়েছে।
আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। কেন আমি এতো বড় ভুলটা করলাম। ভুল তো আমার জীবনের সঙ্গী হয়ে গেছে। আসলে আমার পুরো জীবনটাই একটা ভুলের সমাহার। মুখর জানে না সেদিনের ভুলের কী খেসারত আমি দিচ্ছি।
শোনো তমাল। মুখর আমাকে ডাকে। পাঁচ বছর আগের কথা। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাইরের দিকে পা বাড়াচ্ছি। মানে আমাদের পড়ালেখা শেষ। ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে।আমরা দুজন ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছিলাম ডাসের সামনে বসে। ডাসের চারপাশে তখন অনেক ছেলেমেয়ে।
কী বলো। আমি মুখরের একটা হাত ধরি।
এখন থেকে তো আর হলে থাকা যাবে না। আর চাকরি-বাকরি যে কবে পাবো তাও জানি না। দেখা যাবে একসময় তুমি আমি ছিটকে পড়বো।
তা হবে কেন? আমরা কোনো দিনও একে অপরের কাছ থেকে ছিটকে পড়বো না। আমি মুখরের হাতে চুমু খেয়ে বলি।
কল্পনার কথা নয়, বাস্তব কথা বলো। আমার ফ্যামিলি থেকে আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এটাকে ঠেকানোর কোনো উপায় আমার নেই। একমাত্র উপায় তুমি যদি আমাকে বিয়ে করো।
বিয়ে তো করতে চাই। কিন্তু তোমাকে খাওয়াবো কী? বলো। আমার তো চালচুলো কিছু নেই।
তাহলে আর কী করা, চলো আমরা অতীতের সব ভুলে যাই। এই যে আমাদের দীর্ঘদিনের প্রেম সেটাকে ভুলে যেতে হবে। মনে করতে হবে, সেটা ছিল আমাদের বন্ধুত্ব। যদিও আমার খুব কষ্ট হবে। কথাগুলো বলে মুখর থামে। ওর চোখে জল। ওড়না দিয়ে চোখ মোছে। তোমার কী হবে জানি না।
মুখর এতো ভেঙে পড়ো না। একটা চাকরি-বাকরি তো আজ হোক কাল হোক হবেই। তখন আমরা ঘরসংসার করবো।
এভাবে আমাদের সমাজে একটা ছেলে অপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু একটা মেয়ের পক্ষে তা সম্ভব নয়। শোনো আমাকে আমার পরিবারের লোকজন জিজ্ঞেস করেছিল কারো সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। আমি তোমার ব্যাপারটা খুলে বলেছি। তাদের অভিমত, তুমি বেকার ছেলে, তারপর তোমার ফ্যামিলিটাও তো সলভেন্ট নয়। তোমার অনেক ভাইবোন। তোমার বাবা দরিদ্র কৃষক। তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তুমি চাকরি করে তাদের সাহায্য করবে। এটাই তো স্বাভাবিক। এগুলোকে আমার ফ্যামিলি মেনে নেবে। কিন্তু তুমি চাকরি না পেলে তো তারা আমার অন্যত্র বিয়ের ব্যবস্থা করবে। তখন আমার করার কিছুই থাকবে না। তাই আমি কী করব ভাবতে পারছি না। আমার ফ্যামিলি থেকে ছয় মাসের সময় বেঁধে দিয়েছে। তোমাকে তো আগেই বলেছি যে, এতোদিন আমি আমার পড়ালেখার কথা বলে বিয়েটা ঠেকিয়ে রেখেছিলাম। আর পারবো না।
আমি কেবল মুখরের কথা শুনছিলাম। মুখরের কথার মাঝখানে কখন যে ঝরঝর বৃষ্টি নেমে পড়ে আমার চেতনায় নেই। অবিরল ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। আমি বসে থাকি। ভাবছি, এ সমস্যার সমাধান কোথায়? সমাধান তো একটি চাকরি। খুব সহসা চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এই তমাল বৃষ্টিতে ভিজো না। চলো ডাসের ছাদের নিচে যাই।
আমি বসে থাকি। ভাবনা আমাকে কাবু করে ফেলে। সকালে বাড়ি থেকে মায়ের চিঠি পেয়েছি।

বাবা তমাল,
আশা করি খোদার অশেষ রহমতে ভালোই আছো। এতোদিনে মনে হয় তোমার পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আল্লাহ তোমাকে অনেক বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়েছেন। নিজের চেষ্টা আর মেধার জোরে তুমি এতোটা লেখাপড়া করতে পেরেছো। এখন একটা চাকরি-বাকরি হলে আমরা বেঁচে যাই। যদি পারো তবে সামনের মাসে হাজার পাঁচেক টাকা পাঠিয়ে দাও। কারণ নিহালের ফরম ফিলআপ করতে হবে। আর সংসারের কথা কী বলবো। সবই তো তোমার জানা। প্রভার জন্য একটা ভালো পাত্র পাওয়া গেছে। আশা করি বিয়েটা হবে। ছেলের পক্ষ ওকে খুব পছন্দ করেছে। তবে সেটা যেমন খুশির ব্যাপার তেমনি আবার একটু কষ্টেরও। একটা বিয়ের খরচ মানে তো বুঝতেই পারো।
আরো অনেক কথা মায়ের চিঠিতে। মা খুব সুন্দর চিঠি লিখতে পারে। মায়ের হাতের লেখাও খুব সুন্দর। বসে বসে বৃষ্টিতে ভিজছি আর এসব কথা ভাবছি। মুখর আমার পাশে নেই। ও চলে গেছে ডাসের শেডের নিচে। একটু পর বৃষ্টির মধ্যে মুখর ফিরে আসে। আমার হাত ধরে টানে। চলো শেডের নিচে যাই।
তুমি যাও। আমার এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে। একদিকে মুখর। অন্যদিকে প্রভার বিয়ে। নিহালের ফরম ফিলআপের পাঁচ হাজার টাকা। আগামী মাসে হল ছেড়ে দিয়ে কোনো একটা মেসে উঠতে হবে। আমার মাথাটা গুবলেট হয়ে যাচ্ছে।
পাগলের পাল্লায় পড়েছি। বলে মুখর আমার পাশে বসে পড়ে।
মুখর তুমি চলে যাও শেডের নিচে। মেয়েদের ভেজা শরীরে ভালো দেখায় না।
তুমি না গেলে আমিও যাবো না। বলে মুখর বসে থাকে। বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। এতো ভাবছ কেন চলো আমরা বিয়েটা করে ফেলি। আপাতত গোপন রাখি তারপর প্রকাশ করব।
তারপর দুদিন আর মুখরের সঙ্গে আমার দেখা হয় না। একটা চাকরির চেষ্টায় বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াতে থাকি। লিপি নামে একটি মেয়েকে পড়াই। লিপির মা ভালো মহিলা। আমাকে ভালো জানেন। তার কাছে আরেকটা টিউশনি চাই। আর চাই পাঁচ হাজার টাকা ধার। পাঁচ হাজার টাকা হলো আমার দুই মাসের বেতন। পাঁচ হাজার টাকা যদি লিপির মা দেনও তাহলে আমি দুই মাস কী করে চলব জানি না। অনেক রাত হয় হলে ফিরতে। দরজা খুলতেই একটা ভাঁজ করা কাগজ ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখি। সেটা উঠিয়ে নিই। ভাঁজ খুলি। মুখরের চিঠি।
বেশ কয়েকদিন ধরে তোমার সঙ্গে দেখা হয় না। তমাল আজ বিকেলে অবশ্যই হাকিম চত্বরে এসো। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে। ছোট চিরকুটটা পড়ে ফেলে দিই একপাশে। একটা নতুন টিউশনির সন্ধানে আজ বিকালে আমাকে যেতে হবে অনেকদূর, মিরপুরে। লিপির মা বলে দিয়েছেন। টিউশনিটা হলে ভালো অ্যামাউন্ট পাবো। লিপির মায়ের বোনের মেয়েকে পড়াতে হবে। বিকালে হাকিম চত্বরে যাওয়া হয় না। বিকালের সময়টাতে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আমি ছুটতে থাকি মিরপুরে। আমি জানি এখন হাকিম চত্বরে অপেক্ষা করছে মুখর। কথাটা ভাবতেই আমার শরীর শিহরিত হয়। আমার চোখে জল আসে। শাহবাগে এসে একটা বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে থাকি। আমার ইচ্ছা হয় চলন্ত বাসের হ্যান্ডেলটা ছেড়ে নিচে পড়ে যাই। বাসটা আমায় চাপা দিক। আমার চোখে ভাসছে মুখরের ছবি।
মিরপুর দশ নম্বর গোলচক্করে বারকয়েক চক্কর খাই। পকেট হাতড়ে ঠিকানা খুঁজি। লিপির মায়ের দেওয়া ঠিকানাটা কোথায় রাখলাম? না, পাই না। ঠিকানাটা তাহলে কি আমি রেখে এসেছি আমার রুমে। আমার মাথা কাজ করছে না। নিশ্চয়ই এখন মুখর তার হলে ফিরে গেছে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এই সময়টায় ডাস আর টিএসসি চত্বর থাকে মুখরিত। কেউ সময়ের হিসাব করে না। সময়ের বেহিসেবি খরচের সময় এটা।
আমি ফুটপাতের একটা দোকানে বসে থাকি। চা খাই। সিগারেট খাই। মানুষের চলাচল দেখি। দেখি আকাশ। আকাশটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে রাতের গহবরে। একটা টেলিফোনের দোকান আমার চোখে পড়ে। আমি কি লিপির মায়ের কাছে একটা ফোন করব? লিপিদের বাসার নম্বরটা তো আমার মুখস্থ। ফোন করি। মনে হয় লিপিদের কাজের মেয়েটা ধরে।
হ্যালো কে?
আমি লিপির মাস্টার বলছি। আন্টি কি বাসায় আছে?
লিপি কেডা? লিপি নামে এই বাসায় কেউ নাই। রং নাম্বার।
ফোনটা রেখে দিই। বিল পরিশোধ করি। হাঁটতে থাকি অজানা উদ্দেশে। একসময় চলে আসি হলের গেটে। রুমে ঢুকেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়ি। সকালে উঠে মুখরের হলে যাই। মুখর নেই। চলে গেছে গ্রামের বাড়িতে। কবে আসবে তার রুমমেট জানে না। আর না জানারই কথা, এখন তো পরীক্ষা শেষ। অপেক্ষা শুধু রেজাল্টের।
মুখর হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে। সেই যে হারালো আর পেলাম না। অনেক চিঠি দিয়েছি মুখরের গ্রামের ঠিকানায়। কোনো উত্তর আসেনি। মুখরের কাছ থেকেও কোনো চিঠিপত্র পাইনি। ছিটকে পড়লাম দুজন। হাকিম চত্বরে সারাদিন বসে থাকলাম। রাত হলো। তাও উঠি না। কোথায় যাবো ভাবতে পারছি না। আমার যেন যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।
তমাল ভাই আপনি সেই সকাল থেকে এখানে বসে আছেন। এখন তো অনেক রাত। এবার হলে যান। গতকাল মুখর আপা এখানে অনেকক্ষণ বসেছিল। বারবার আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিল। মনে হয় আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আপনি আপার জন্য অপেক্ষা করছেন? হাকিম চত্বরের একটা দোকানের কাজের ছেলে আমার সামনে এসে বলে। ও তখন দোকান বন্ধ করতে ব্যস্ত।
তারপর থেকেই ঢাকা শহরে চক্কর খেতে থাকি। চরকির মতো ঘুরে বেড়াই। মিরপুর দশ নম্বরের টিউশনিটা হয়েছে। ছয় মাসের মাথায় একটা চাকরি পেয়ে যাই। বেতন ভালো। একটা বিদেশি কোম্পানি। কিন্তু আমার মনে স্বস্তি আসে না। আমি মুখরকে খুঁজে বেড়াই। রেজাল্টের পর বেশ কয়েকদিন ওর হলে যাই। না, ও আসেনি। ওর রুমমেট জানায়, মুখরের নাকি বিয়ে হয়ে গেছে। পাগল পাগল ভাব নিয়ে থাকি। মুখর না থাকলে আমার চাকরি দিয়ে কী হবে?
জিগাতলায় এক বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করে থাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসমেট আরমান তার স্ত্রী শারমিনকে নিয়ে থাকে। শারমিনও আমার পরিচিত। সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। তবে আমাদের এক ব্যাচ জুনিয়র ছিল। ওরা দুজনই চাকরি করে। সকালে বের হয়ে যায়। সন্ধ্যায় ফিরে আসে। আমিও সকালে বের হই। তবে আমার ফেরার কোনো সঠিক সময় নেই। অফিসের পর উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াই।
মুখরের হাসিটা এখনো আমার কাঁধের ওপর ঝুলছে। মুখর নিশ্চয়ই আছে রানি হাউসে। যাবো নাকি একবার রানি হাউসে? যেতে হবে। আমাকে অবশ্যই যেতে হবে। মুখরের সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে। রানি হাউসটা খুব কাছে। হাঁটতে হাঁটতে রানি হাউসে যাই। রানি হাউসের তিনতলায় উঠে দাঁড়াই। দুপাশে দুটো ফ্ল্যাট। প্রথম বাম পাশের ফ্ল্যাটের বেল দিই। কে? কে? বলতে বলতে একজন মহিলা এসে দরজা খোলে। কালো মোটা অনেকটা নিগ্রোদের মতো চেহারার এক মহিলা দরজার ভেতরে দাঁড়ানো। মহিলাটিকে দেখে আমি থমকে যাই। সালাম দিই। আচ্ছা আপা এই ফ্ল্যাটে মুখর নামে কোনো মহিলা থাকেন?
না তো। এই ফ্ল্যাটে আমি আর আমার স্বামী থাকি। পাশের ফ্ল্যাটে জিজ্ঞেস করতে পারেন। উনারা নতুন এসেছেন। আমি নাম জানি না। বলে মহিলা দরজা বন্ধ করে দেন।
আমি পাশের ফ্ল্যাটে বেল দিই। দরজা খুলে যায়। একটা অল্পবয়সী মেয়ে দরজা খোলে। দেখেই বোঝা যায় কাজের মেয়ে। কাকে চান? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
আচ্ছা এই বাসায় মুখর নামে কোনো মহিলা আছেন? আমার প্রশ্নের মাঝখানে কাজের মেয়েটির পেছন দিয়ে একটি মুখ উঁকি মারে। ফর্সা মুখটি আমি ভালো করে দেখি। ভ্রু কুঁচকে মহিলাটি আমার দিকে তাকান, জিজ্ঞেস করেন, কাকে চান? আমি আবার মুখরের নাম বলি।
এ-বাসায় এ-নামে কেউ নেই। বলে মহিলা দরজা বন্ধ করে দেন।
তাহলে আমি কাকে দেখলাম দোকানে? না, আমার ভুল হতে পারে না। নিশ্চয়ই মুখর এই বিল্ডিংয়ের অন্য কোনো ফ্ল্যাটে আছে। আমি একবারে নিচতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্ল্যাটে খোঁজ নিই। না, নেই মুখর নামের কেউ এ-বিল্ডিংয়ে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস মুখর আশপাশের কোনো বাসায় থাকে। তাকে আমার পেতেই হবে। তাকে বলার অনেক কথা আছে। একবার দেখতে ভীষণ ইচ্ছা করছে।
হতাশ হয়ে রানি হাউস থেকে বের হই। সেই মুদির দোকানটায় যাই। এখন রাত ৮টা-৯টা বাজে। দু-তিনজন মহিলা দোকানে ঢুকেছে কেনাকাটা করার জন্য। এখন থেকে আমি দোকানেই খুঁজব মুখরকে। কোনো না কোনো সময় তো মুখর আসবে। দোকানের সামনের ফুটপাতের উলটো পাশের একটা চায়ের স্টলে বসে চা খাই। সিগারেট খাই। অফিস থেকে বের হয়ে সোজা চলে আসি ফুটপাতের ওই চায়ের দোকানটায়। বসে বসে কাপের পর কাপ চা আর সিগারেট খাই। আর তাকিয়ে থাকি সেই হাসিমাখা মুখটির সন্ধানে।
একদিন চায়ের স্টলের মালিক জিজ্ঞেস করে, স্যার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে বসে থাকেন। কাউকে খোঁজেন নাকি?
সত্যটা এড়িয়ে অন্য একটা কথা বলে দিই। তাহলে কি মুখর আমাকে চিনতে পেরেছে এবং আমাকে দেখছে? আমাকে এড়িয়ে চলার জন্য সে আর দোকানে আসছে না। আমি নাছোড়বান্দা। মুখরকে বের করবোই। অফিস যাওয়া বাদ দিই। মায়ের অসুখ বলে অফিসে একটা ছুটির আবেদন পাঠিয়ে দিই। তারপর সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকি। আশপাশের লোকজন আমাকে পাগল বলতে থাকে। কিন্তু আমার তাতে কিছু আসে-যায় না।
একদিন সকালে চায়ের স্টলের মালিক আমার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ দেয়। বলে, ভোরে একটা ছেলে এটা দিয়ে গেছে আপনাকে দেওয়ার জন্য। আমি দোকানদারের কাছ থেকে ভাঁজ করা কাগজটা নিই। একটা চিঠি। খুলেই আমার মাথা চরকির মতো ঘুরতে থাকে। এটা তো মুখরের হাতের লেখা।

তমাল,
তুমি এ কি পাগলামি করছো? প্রথম দিন মুদির দোকানে দেখে আমার চিনতে একটুও কষ্ট হয়নি। কেমন শুকিয়ে গেছো। আগের সেই উচ্ছল তারুণ্য তোমার চোখে-মুখে নেই। তোমাকে তো ভুলেই গিয়েছিলাম। কেন আবার দেখা দিলে? তোমায় দেখার পর থেকে রাতে আমার ঘুম হয় না। ভাবছিলাম তুমি আমাকে ভুলে গেছো। কিন্তু এখন আমি দেখছি আমার ধারণা ভুল। আমার খোঁজে তুমি দিন-রাত বসে থাকো রাস্তার পাশের দোকানে। এসবের কি কোনো মানে আছে? আমার স্বামী আছে। সন্তান আছে। আমার অনুরোধ বিয়ে করো। সংসারী হও। তুমি যে আমার চিঠিটা পড়ছো তা আমি জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি। আর এভাবে চাকরি-বাকরি ছেড়ে বসে থেকো না। তোমাকে দেখি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা। আমিও তোমার জন্য বারান্দায় বসে থাকি। এখনো আমার স্বামী জানতে পারেনি ব্যাপারটা। জানতে পারলে আমার সংসারে নেমে আসবে অন্ধকার। তাই তো বাসা ছেড়ে, এই এলাকা ছেড়ে ঢাকা শহরের অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছি।
ভালো থাকো।
তোমার মুখর।
চিঠিটা হাতে নিয়ে আমি থ হয়ে বসে থাকি। বাতাসে কাগজটা উড়ে যায়। আমি আশপাশের বিল্ডিংগুলোর দিকে তাকাই। অসংখ্য বিল্ডিং। আমি কোনটাতে খুঁজবো মুখরকে। দু-হাতে চোখ চেপে ধরে বসে থাকি। 

৪ thoughts on “অপরাহ্ণের নীল কষ্ট