অ্যাবসার্ড সাহিত্য ও একজন কামু

লেখক:

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

আলবেয়ার কামু সাহিত্যের এমনই এক স্বর, যিনি তাঁর সময়কে মানে বিশ শতককে শৈল্পিকভাবে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। জীবনের কী অর্থ থাকতে পারে, তা তিনি তার মতো করে দিয়ে যেতে পেরেছেন। বরং এটা অন্যভাবে বলা যায়, তিনি আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখে যেতে পেরেছেন এমনই এক ভুবন যার কাছে আমাদের বারবার আসতেই হয়। তবে তাঁর সাজানোটা এমনই অর্থবহ আর অর্থনাশকারী যে, আমরা ক্ষণে ক্ষণে আমাদের চেনা চেহারাটা তার সংস্পর্শে হারাতেই থাকি। আমরা হারিয়ে হারিয়ে আবার ফিরে পাওয়া আমাদের মানসিক উজ্জ্বলতা বাড়াতে পারি। এ এক ভালোলাগার বিষয়ও হতে পারে।

আলবেয়ার কামু সম্পর্কে একটা কথা নির্বিঘ্নে বলা যায় যে, তিনি নিরর্থকতাকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। তার অ্যাবসার্ডিটি হচ্ছে, অস্তিত্বের গুণাবলি যা পূর্বনির্ধারিত, অযৌক্তিক ও আদিম। তার কাছে পৃথিবীর সবকিছুই যুক্তিপূর্ণ নয়। জগতের যাবতীয় কিছুর  ভেতর তিনি কোনো অর্থ খুঁজে পান না। জন্ম বা মৃত্যুর মধ্যে কোনো অর্থ খুঁজে পান না। আবার এসবকে ঠিক অস্বীকার করেও বসেন না। তাঁর স্বাধীনতা একান্ত তাঁর, তাঁর লড়াই বা দ্রোহও তারই। একটা সময়, সেই সময় হচ্ছে বিশ শতক, সেই সময়কে তিনি নিজের আয়নায় দেখেছেন। পৃথিবী যেন তাদের চেনার জায়গায় নেই, দেখার জায়গায়ও নেই। কেমন জানি যুক্তিবহির্ভূত মনে হচ্ছে অনেককিছু। একেবারে তুচ্ছ সব। এবং এসবের ভেতর দিয়ে একধরনের জান্তব অবস্থা কামু নির্ণয় করতে চান, তার নাম হতে পারে অ্যাবসার্ডিটি। সবই যেন ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। এমনই এক দার্শনিকের জন্য ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর, আলজেরিয়ার ছোট্ট শহরে, সেখানে তিনি ১৯৪২ সাল পর্যন্ত ছিলেন। এই সময় হচ্ছে আমাদের চোখের ইতিহাসে দেখার সময়; কিন্তু তিনি তো আজীবনই তাঁর বুকের মধ্যে একটা আলজেরিয়া লালন করতেন। একটু সময়ের জন্যও তা ছেড়ে থাকেননি। তার সবকটি উপন্যাসে কোনো-না-কোনোভাবে আলজেরিয়া আছে। এমনকি ফ্রান্স যখন জায়গাটি দখল করে কলোনি বানায়, তখন এখানকার মানুষ ক্ষিপ্ত হয়, উগ্রতা প্রকাশ করে, সংগঠনের মাধ্যমে এর সশস্ত্র প্রতিবাদ জানায়। তিনি হয়তো নিশ্চুপ ছিলেন, এমনই অনেকে মনে করতেন, কিন্তু কার্যত তা হয়নি। তিনি কলোনিয়াল প্রেষণকে তো সাপোর্ট করেনইনি, কোনো অযাচিত সন্ত্রাসবাদকেও আমলে নিতে চাননি। তিনি ছিলেন শান্তির পক্ষের মানুষ। এমনকি জীবনকে নিরর্থক দেখার জন্য তাঁর মেজাজ থেকেও তিনি খানিক সরে আসেন। আলজেরিয়ান ক্রনিকল গ্রন্থে তা তিনি স্পষ্টও করেছেন। তার এ-গ্রন্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সময়কে বিবেচনায় এনেছেন। তিনি তাঁর মতো করেই প্রতিবাদ করেছেন, দ্রোহের শিল্পত্ব নতুন চেহারা নিয়েছে তাতে। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রেবেল থেকে সতত না-বলার জায়গা থেকে খানিক দূরে এসেও প্রত্যাখ্যানের আত্মগরিমাকে ভোলেননি। তিনি নিজের স্বভাব নিজে অর্জন করতে চেয়েছেন, তা লালন করেছেন, তাতে শিল্পে অবগাহন বজায় রেখেছেন। তাঁর দ্রোহে চলমান প্রথাকে ভাঙার নেশা আছে, তিনি চেনাজানা শাস্ত্রবিরোধীও। তিনি বিদ্রোহের ভেতর দিয়ে যে-মূল্যবোধ নির্ণয় করতে চাইতেন, বা প্রচার করতে পেরেছেন, তাকেই আবার প্রশ্নণবিদ্ধও করতে পারতেন। তাঁর দ্রোহ একেবারে চিহ্নহীন থাকে না, কারণ তা অন্যের সংহতির সঙ্গেও প্রয়োজনে খাতির-প্রণয় করে।

তিনি আসলে খুন আর আত্মহত্যার বিষয়ে একধরনের ফয়সালা করতে চেয়েছেন। তাই দ্য রেবেল গ্রন্থে খুনের বিষয়টা বারবার এসেছে, আর মিথ অব সিসিফাসে আত্মহত্যা বিষয়ে একধরনের বোঝাপড়া করতে চেয়েছেন। তাঁর চাওয়ার ভেতর চমৎকারিত্ব আছে, শৈল্পিক বোঝাপড়া আছে, নিজেকে নিজের মতো করে উন্মোচনের সাধনা আছে; কিন্তু তার দ্রোহের চরিত্র বিষয় ফাইনাল কথা বলে দেওয়া মুশকিলই। যাবতীয় প্রতিষ্ঠানকে তিনি হিসাবের মধ্যে রেখেছেন, তা বলা যাবে না; কিন্তু খ্রিষ্টধর্মের সঙ্গে তার বোঝাপড়াটা ঠিক কী ছিল তা একেবারে চূড়ান্ত করে বলা মুশকিলই। কলোনিয়াল শাসনকে তিনি অগ্রাহ্য করেছেন, সর্বক্ষেত্রে না বলে দেওয়ার মতো দ্রোহমুখরতা তার থাকলেও রাজনৈতিক সন্ত্রাসকে তিনি পাত্তা দিতে চাননি। সেটা আমরা তার কার্যকলাপে, কথনে, জীবনযাপনে দেখতে পাই। তিনি সাংবাদিকতায় তা দেখাতে চেয়েছেন। সামাজিক নানান সংকট, রাজনৈতিক টানাপড়েন, খরা, অভাব, যন্ত্রণাকে তিনি উপলব্ধির ভেতর আনতে চান। তিনি দ্রোহকে লালন করতে পছন্দ করেন, এর ভেতর দিয়ে বাঁচা-মরাকে অর্থবহ করতে চেয়েছেন, মূল্যবোধকে দাঁড় করাতে চেয়েছেন।

তিনি সিসিফাসকে এনেছেন গ্রিক মিথোলজি থেকে। তার মাধ্যমে তিনি দেবত্বের ওপরে জীবনের জয় দেখাতে চেয়েছেন। এতে জীবনের অর্থহীনতার বিষয়টিকেও আমাদের চাক্ষুষ করেন। সিসিফাস দেবতাদের দেওয়া শাস্তিকে মোকাবেলা করেন। তিনি প্রতিদিন একটা পাথরকে ঠেলতে ঠেলতে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠান। তার সময় পার হয়, রাত সাবাড় হয়। সেই পাথর তার আপন গতিতে আবার নিচে পড়ে যায়। সিসিফাস আবার তা ওপরে তুলতে থাকেন। আবার তা পড়ে যায়। তিনি এসবের ভেতর একধরনের অ্যাবসার্ডিটি খোঁজেন। মানে, মানুষ তা বলতে পারে; কিন্তু কামু তা মানেন না। এর ভেতর একধরনের দ্রোহ আছে, আছে আনন্দ, মানুষের নিজের প্রতি পক্ষপাতের এক দারুণ লীলা হয়তো তাতে প্রকাশ পায়। এতে মানুষ নিজেকে দেখে, পরাজয় বরণ না করে দেখে, জয়ের একটা ধারা তাতে প্রকাশ পায়। ব্যক্তির বিকাশ হয়, তার দ্রোহের আলাদা মেজাজ পায়, চরিত্র দেখা যায়। সিসিফাস পরাজয় মানতে জানেন না। তিনি আত্মহত্যাও করেন না। একই কষ্টের ভেতর পড়েও আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন। নিজেকে বাঁচায়, মানুষের ভেতর লড়াইয়ের গল্প বহাল রাখে। স্বোপার্জিত অস্তিত্বের জন্য মানুষ কি-ই না করতে পারে! আমরা কখনো একে যাচ্ছেতাই মনে করতে পারি; কিন্তু মানুষ যে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে জানে না, তাও তো জানতে পারি?

এ-গ্রন্থে শুধু সিসিফাসের কাহিনি ধরে মানবজনম নিয়ে তিনি পাঠ দেন না, আত্মহত্যার সঙ্গে জীবনের নিরর্থকতার কী সম্পর্ক, মানুষ তাত্ত্বিক যুক্তিকে হিসাবে না নিয়ে কীভাবে আত্মহত্যার পথে যাওয়ার বিষয় হিসাবে আসে, নিজেকে কেন আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়, তাই আমরা তাঁর গ্রন্থে পাই। সবদিক থেকে জীবনের আলো নিভে গেলেই হয়তো আত্মহত্যার মতো একটা স্বোপার্জিত সিদ্ধান্ত নেয়, তা আমরা ভাবতে পারি। মায়া আর আলো তার কাছে অচেনা লাগে। বেঁচে থাকার কোনো যুক্তি বা অবলম্বন সে পায় না। যা পায় তার নাম নিজের ওপর নিজের অধিকার, নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ঈশ্বরত্ব! সে হয়তো পৃথিবীকে জানিয়ে দেয়, জীবনের অর্থ নেই। মরণেরও তো অর্থ নেই। এ হচ্ছে অনুভবের সঙ্গে একধরনের বোঝাপড়া করে নেওয়া। যুগের সঙ্গে এধরনের বোঝাপড়া এক কঠিন বিষয়ও বটে; কিন্তু জীবনকে নিরর্থক ধরে নিলে তো কিছুই মনে হয় না। অস্তিত্ববাদের মৌলতাড়নাকে দার্শনিক আত্মহত্যা বলতে চান তিনি। এমনকি অ্যাবসার্ড স্বাধীনতার কথা বলেন, এই করে করে মানুষের যাপিত জীবনের ভেতর দিয়ে অ্যাবসার্ড মানুষের চেহারা অাঁকেন! জীবনের এমনতর নিরর্থক দিক নিয়ে কথা বললেও মানুষের আবেগকে কখনো পরিত্যাগ করেননি। এ এক ঘটনা বটে। এমনকি মার্কস-লেনিন বিপ�বের কথা বললে, সমাজতন্ত্রের কথা বললে, একধরনের শ্রেণিহীন মিলিটারিজম কায়েমের কথা বললেও লড়াই-সংগ্রামে আবেগের একটা মূল্য থাকা উচিত, তা নাকি তারা কখনো ভাবেননি। অর্থাৎ মানুষের নিরর্থক ভাবনা হচ্ছে তার কাছে যাপিত জীবনের অবস্থা, তিনি প্রকৃতির প্রতিও ছিলেন আবেগবদ্ধ। নতুন কিছু নির্মাণের পেছনে থাকবে মতবাদ আর ভাবানুভূতি।

ক্যামু পাঁচটি উপন্যাস রচনা করেছেন। এগুলো হচ্ছে : দ্য ফল (১৯৫৬), দ্য আউটসাইডার বা, দ্য স্ট্রেঞ্জার (১৯৪২), দ্য প্পেগ (১৯৪৭), অ্যা হ্যাপি ডেথ (১৯৭১) এবং দ্য ফার্স্ট ম্যান (১৯৯৫)। আমরা একেকটি উপন্যাসে একেক ধরনের আবহ পাই। আমরা তাঁর উপন্যাসসাধনা থেকেই কিছু কথা জেনে নেব। কিছু আলোচনা, কিছু চালু কথা, কিছু ব্যাখ্যা দিয়েই আমরা আলোচনাকে চালিয়ে নিতে চাই। অনেক ক্ষেত্রেই যা হয়, আউটসাইডারের বেলায়ও তাই হয়েছে। আমরা যখন এর গায়ে যে-অ্যাবসার্ডিটির লেবেল লাগিয়ে দিই, তার দায়িত্ব কিছুটা নিতে পারে মার্সেল নামের কথক; কিন্তু সমস্ত চরিত্রকেই এর দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয়। আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখব, কথক ছাড়া আর কোনো চরিত্রই নিজের সম্পর্কেও উদাসীন নয়। তারা আবেগ-অনুভূতি, হা-হুতাশের যত আয়োজন আছে, সবই বহন করছে! আমরা বরং উপন্যাসটির শুরু থেকেই এর ঘটনাবিন্যাস, ন্যারেশন আর চরিত্রের আচরণ খেয়াল করি, তাতেই আমরা উপন্যাসটির টোটাল চৈতন্য বুঝতে পারব। উপন্যাসটির একেবারে শুরুতেই দেখা যাবে, কথক তার চাকরিস্থলে একটা তারবার্তা পায়, সেখানেই তার মায়ের মৃত্যুসংবাদটি দেওয়া থাকে। এবং আগামীকাল তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হবে জানানো হয়। তাতে বোঝা যায় না যে, মা গতকালই মারা গেলেন, বা তারও আগে। এখান থেকেই কথকের হতবিহবল অবস্থা শুরু হয়, মায়ের বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া, ছুটির দরখাস্ত দেওয়া, মৃতের মুখ দেখতে না-চাওয়ার মনোভাব ব্যক্ত করা, মায়ের শেষকৃত্যে তার অংশগ্রহণের ধরনে আমরা তার একধরনের নিস্পৃহ অবস্থা দেখি। সবই কেমন যেন খাপছাড়া লাগে; যেন কিছুর সঙ্গেই সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। বন্ধুর সঙ্গে সাগরতীরে যাওয়া, সেখানে তার অবস্থান, এক আরব লোককে হত্যার বিষয়টাও যেন অনেকটা বাড়াবাড়ি পর্যায়েই ঘটে যায়। এমনকি জেলখানায় যাওয়ার পর নিজের প্রতিও সে স্বাভাবিক আচরণ করে না। সবকিছুই তার কাছে তুচ্ছ লাগে। তার তো নিজের জন্য কোনো অনুশোচনায় নেইই, বরং খুশিমনে সে শিরশেছদের জন্য অপেক্ষা করে। পাদ্রির সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলে, তাতে তার কোনো মনোযাতনা থাকে না। সে মনে করে, প্রত্যেকেই তার কৃতকর্মের ভার নিজেই বহন করবে, অন্যে তার বিচার করতে পারে না। জগৎ, বিচার, ঈশ্বর ইত্যাদি সবই তো অর্থহীন! এখানে আমরা কথাগুলো স্মরণ করতে পারি – ‘আমার অন্ধ সেই রাগ যেন আমাকে ধুয়েমুছে দিল, প্রথমবারের মতো আশামুক্ত করে দিল আমায়; ওই তারা আর সংকেতে ভরা রাতের সময়টিতে, আমি আমাকে খুলে দিলাম এই জগতের নম্রতামাখা উদাসীনতার কাছে।’

আমরা এ-উপন্যাসটি শেষ থেকে যেন শুরু হতে দেখব, কারণ তার মৃত্যুদিনে সে তার মায়ের কথা মনে করবে। প্রথমবার যেন আবার সে নিজেকে আবিষ্কার করছে! মাটি আর সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া তার গালে এসে লাগছে। ঘুমন্ত গ্রীষ্মরাত্রির অপরূপ শব্দ যেন তার ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। আবার তার মনে পড়ছে স্টিমারের আওয়াজ। সে যেন জীবনকে রিপেয়ার করে নিচ্ছে। মৃত্যু নামক স্বাধীনতার কাছে এসে সে তার মায়ের কথা মনে করতে পারছে। বিকল্প স্বাধীনতার কথা সে বলছে, নিজের জীবনকে নিজের মতো করে লালনের কথা মনে হয়। আমরা এ-বিষয়টা হয়তো অতি আগ্রহের সঙ্গে, নবতর চেতনার উন্মেষ মনে করে স্মৃতিতে রাখতে পারি। সে জানায়, এই পৃথিবীতে কারো জন্য কারোরই কাঁদার অধিকার নেই। সে মনে করে পৃথিবীকে সে ভালোই ছিল, ছিল সুখীই। তা সত্যি কিনা তা আমরা পুরো গ্রন্থটি পাঠ করে নতুন করে ভাবতে পারি। কারণ এ তো শুধু মার্সালের জীবনকথার সারাৎসার নয়। এখানে আরো অনেক মানুষ, মানুষের নানান অনুভূতি আছে। তবে এটা মনে হতেই পারে, কথককে তার মনোভাব দেখানোর পার্শ্বচরিত্র হিসেবেই সবাই যেন ব্যবহৃত হয়েছে। এতে অন্য চরিত্রসমূহ তাদের বিকাশের কোনো পথ পায়নি। বা, পেলেও তা ছিল সীমিতই। আমরা একধরনের স্টেটমেন্টই এখানে খেয়াল করব, – যেন কোনো এক স্মৃতিকথা, বা মনোভাব প্রকাশের জায়গা যা কামু তাঁর প্রধান চরিত্রের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেছেন। যেন আমরা নানান স্মৃতি দেখি, – মানুষ তো শেষ পর্যন্ত স্মৃতিমুখর প্রাণীই। স্মৃতিই তাকে মনুষ্যত্ব দেয়! তবে মায়ের স্মৃতিময় জীবন, তার প্রেমিক, দারোয়ান, যাজক, বন্ধু, প্রেমিক, আশ্রমস্থলের যেটুকু জীবন আমরা দেখি, তাতে কামুর অদ্ভুত শিল্পীসত্তার পরিচয় পাই। সমস্ত গ্রন্থটি পাঠের মোহ আমাদের একেবারে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত জারি থাকে। বিশ শতকের এমনই এক গ্রন্থ এটি, যা অনেক ধারণাকে রীতিমতো টালমাটাল করে দেয়! জীবন আর তার ভেতরকার সময়কে একেবারে খোলাসা করে আমাদের সামনে হাজির করেন তিনি। রূপকের এমন জাদুকরি ব্যবহার আমরা আরো কোথাও খুব একটা পাই না।

দ্য ফল তার সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে পাঠবিমুখ এক উপন্যাস। ঘটনা হিসেবে এর ভেতর হয়তো সাদামাটা এক ব্যাপার আছে। আমরা এখানে এক আইনজীবীর কথা শুনব। জাঁ-বাপ্তিস্ত ক্লামাঁস একজন ফরাসি আইনজীবী, প্রচুর নাম-যশ তাঁর, সমাজের একেবারে উঁচুস্তরে তাঁর অবস্থান। তাঁর ভালোমানুষির শেষ নেই। মুখোশের অন্ত নেই তাঁর। মানুষকে ধোকা দেওয়ারও শেষ নেই। নানান ঘটনা তাঁর জীবনে ঘটতে থাকে। তিনি একসময় তার উঁচু অবস্থান থেকে যেন খসে পড়েন, সে-জায়গা থেকে মানুষকে কি আর স্বাভাবিক দেখা যায়? তা তো যায় না। কিন্তু ঘটনার এমনই অদ্ভুত রূপ যে, সেই আইনজীবীর পতন ঘটে। তিনি চলে গেলেন আমস্টারডামে। তিনি হয়ে গেলেন সাধারণ একজন, তার অনুতাপের শেষ নেই। তিনি বিচলিত, অনুতপ্ত হন। এক দেশোয়ালি ভাইকে তার অনুতাপের গল্প শোনান। এভাবেই কামু মানুষকে ভেতর থেকে আবিষ্কার করেন। মেকি-সভ্যতাকে আমাদের সামনে মেলে ধরতে থাকেন তিনি। তার পতনকাহিনির ভেতর দিয়ে মুখোশধারী সমাজকেই আমরা দেখি। মেকি সত্য দেখি! কামু মূলত তাঁর মতো করে সত্যের কাছে যেতে চেয়েছেন। সবচেয়ে টলটলায়মান এক জীবনকে তিনি নিজের মতো করে দেখাতে চেয়েছেন। এভাবে গ্রন্থটি হয়ে ওঠে এক আয়না, যেখানে মানুষ তার নিজেকে, সমাজকে, এমনকি সভ্যতাকে চিহ্নিত করতে পারছে। এটি হচ্ছে এমন এক কথনশিল্প, যেখানে মানুষ তার জীবনকে বা সভ্যতাকে চিহ্নিত করে নিজেকেই হয়তো যাচাই-বাছাই করতে পারবে।

তার উপন্যাসগুলোর ভেতর প্লেগ হচ্ছে দারুণ প্রতীকধর্মী। এখানকার কাহিনিতে কামুর শৈশব আছে, আছে আলজেরিয়ার ওরান বন্দরে। সেখানে নেমে আসে এক ভয়াল জীবন, কঠিন-জটিল রোগ প্লেগ, যা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ তো রোগ নয়, যেন ভয়ংকর জীবনের জীবন্ত প্রতীক। এ যেন এক পাপ, যেন এক ধ্বংসকারী রূপক। একটা নগরকে একেবারে বদলে ফেলে, জীবন বদলে যায়, মানুষের চলাচলে পরিবর্তন ঘটে, যেন এক স্বৈরাচারের উত্থান। হয়তো আমাদের মনে পড়বে নাৎসিবাহিনীর কথা, হিটলারের কথা, জান্তব মিলিটারিজমের কথাও। লেখক ধর্ম সম্পর্কে, জীবনের গভীরবোধ সম্পর্কে, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে নবতর চৈতন্যের ইশারা দেন। আমরা একজন মহান চিকিৎসকে পাই, ফাদার প্যানালুকে পাই। এই ফাদারের সঙ্গে সৃষ্টিকর্তাকে, ধর্মচৈতন্যকে যুক্ত করতে চায়। পাঠক তাঁর আচরণের ধরনে কামুর চৈতন্য সম্পর্কে হতচকিত হতে পারেন। তার প্রতি সন্দেহও জাগতে পারে। আমরা লক্ষ করি, একসময় ফাদার প্যানালুও প্লেগ আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখনই আমরা কামুর ধর্ম নিয়ে ভিনণ মতামতে নামি। তাঁর ধর্মীয় চেহারা পুরোপুরি উন্মুক্ত না হলেও ধরে নিই, কামুর ধর্মভাবনার ওপর সোজাসাপ্টা কোনো মন্তব্যই করা যায় না। তিনি বিপ্লবকে সহজ শ্রেণিকরণের ভেতর দিয়ে দেখতে চান না। মানবসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশের ব্যাপারে তার আগ্রহ আছে। কোনো ধরনের যান্ত্রিকতা তিনি পছন্দ করেন না। চরম বিপস্নবেও তিনি মানবিক আবেগকে স্মরণ করেন। তিনি হিংসার বিপক্ষের মানুষ। সহিষ্ণুতাকে তিনি তাঁর প্রেরণায় রাখতে চান।

এ-উপন্যাসের ভেতর দিয়েও আমরা আশাবাদের কথা শুনি, একসময় প্লেগও শেষ হতে থাকে। ডাক্তার রিও মুক্তি উৎসবের কথা জানান, জীবনকে স্পর্শ করার গল্প বলেন। তিনি অনেকদিন হয়তো বাঁচবেন। প্রতিমৃত্যু কিংবা জীবন স্পর্শ করে করে তিনি যেন জেনে ফেলেছেন কেমন করে বাঁচতে হয়। এখানে জীবন আর নিরর্থক থাকে না, আবেগাত্মকও হয়। সর্বত্র আনন্দধ্বনি ওঠে। পেস্নগে মারা যাওয়া মানুষের জন্য একটা স্মৃতিস্তম্ভ গড়ার কথা জানা যায়। একেবারে শেষদিকে ডাক্তার কিছু কথা জানান। যে- রোগী মৃত্যুগন্ধী তা নাকি কোনোদিন একেবারে নিশ্চিহ্ন হয় না। কোথাও-না-কোথাও কোনো-না-কোনোভাব নিজেদের জিইয়ে রাখে। এ হচ্ছে মৃত্যুবীজ, যা যুগ যুগ ধরে জীবিত থাকে। এই যে বীজের ইঙ্গিত দেওয়া হলো, তা তো প্রচলিত কোনো বীজ মনে হয় না, এ হচ্ছে রূপ, স্বৈরাচারের রূপক, ফ্যাসিজমের রূপক। তাই তো আমরা দেখি, হিটলারের বীজই যেন কখনো সামরিক অবস্থায়, কখনো সংসদীয় অবস্থায় রাষ্ট্রীয় জীবনে ঘুরেফিরে আসে। তা যেন এক চক্র। তা আসছে, তা যাবে, আবারও আসবে। প্লেগ যেন এক মৃত্যুদশা যা একসময় মৃত্যুকে চিনিয়ে নিতে বের হবে। আমরা তো প্লেগ পাঠ করি না, যেন দানবীয় স্মৃতি আমাদের মগজে জমা রাখি!

তিনি তো শুধু উপন্যাস বা প্রবন্ধ সৃজন করেননি, গল্প, নাটক এমনকি কবিতাও লিখেছেন। তবে তাঁর নাট্যসৃজনের বিষয়টা একেবারেই যেন ভিন্ন। যেন তিনি নিজেই এক গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়ক। ১৯৬০ সালে যখন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন, কিংবা তাকে সে-মৃত্যুর দিকে ধাবিত করা হলো, অথবা এক ষড়যন্ত্রের শিকারে পৃথিবী থেকে চলে গেলেন; তখনই যেন নাটকের আরেক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। যেন তাকে বিদায় না-জানানোর বাদ্য চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে। তিনি নাটক লিখেছেন উপন্যাসকে নাট্যরূপ দিয়েছেন, অভিনয় করেছেন, এমনকি নাট্যনির্দেশনার সঙ্গেও নিজেকে জড়িয়েছেন। কাজেই নাটকের লোকজন তাঁকে তাঁদের লোক তো মনে করতেই পারেন। ক্যালিগুলা নামের চমৎকার নাটক যেমন লিখেছেন, ফকনার আর দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের নাট্যরূপও তিনি দিয়েছেন। নাট্যরূপকেও তিনি রীতিমতো একটা শিল্পের পর্যায়ে দিতে পেরেছিলেন। নাটকের সঙ্গে তাঁর চেতনার রূপান্তরের একটা ইতিহাস হয়তো আছে। একসময় কমিউনিজমের প্রতি তাঁর আস্থা ছিল, তা থেকে ক্রমে সরে আসেন। মৃত্যু, অবিচার, ধ্বংস ইত্যাদি নিয়ে নতুন করে ভাবেন। তিনি লিখেন ভুল আর ক্যালিগুলা নামের নাটক। তিনি ছিলেন নাটকের নবদিগন্ত উন্মোচনকারী। থিয়েটারের পথকে তিনি উজ্জ্বলই করেছেন। তিনি যে-গল্প লিখেছেন সেখানেও জীবনের এক-একটা স্তর অতিক্রম করতে পেরেছেন। জীবন নতুন ধারায় যেন কথা বলেছে সেখানে।

তাঁর লেখার ঝাঁজ যে কত গভীর আর সুতীব্র ছিল তা আমরা জাঁ পল সার্ত্রের একটা কথা থেকেই অনুভব করতে পারি। কামু মারা যাওয়ার পর তিনি একটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু অতি তাৎপর্যমুখর এক কথন রচনা করেন। সেখানে কামুর রচনার ধরন, জীবনযাপন, তাদের বন্ধুত্ব নির্ণয়ের মাপকাঠি নিয়ে কিছু কথা বলেন। তাঁরা নীতির দিক থেকে একটা পর্যায়ে একেবারে ভিন্ন হয়ে যান। তাঁরা একসময় তুখোর বস্ত্তবাদী ছিলেন। জাঁ-পল সার্ত্র মার্কসবাদের প্রতি আজীবনই সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন; কিন্তু কামু স্বোপার্জিত সৃষ্টিশীলতা, পৃথিবীর নিরর্থকতা আর আবেগময় সৃষ্টিশীলতার প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছেন। মানুষের একাকিত্ব, দুঃখ আর জীবনের অর্থহীনতায় মগ্ন থেকেছেন। কিন্তু তারপরও কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারেননি যে এই হচ্ছে, এমনই হবে তার ক্রিয়েটিভিটি! বরং জাঁ পল সার্ত্র তাঁর সম্পর্কে বলছেন, ‘তিনি কী বলতে পারেন, তা নিয়ে আমাদের অনুমান করার সাহসও ছিল না।’ তিনি শিল্পের এমনই ছিলেন ধ্যানী মানুষ!

১৯৫৭ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পান। তিনি উৎফুলস্ন হন। তার বন্ধু জাঁ পল সার্ত্র তা প্রত্যাখ্যান করত সম্পূর্ণ বিপরীত মেজাজ দেখান। তাঁর সাহিত্যের সামগ্রিক কাজের জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়। তিনি যেন ফরাসি মননকে নতুন করে হাজির করতে পেরেছেন। তাঁর ছিল চিন্তার স্বচ্ছতা, গভীর মনোনিবেশ, জীবনের সূক্ষ্ণচেতনার বিন্যাস। ভাষার শিল্পনিপুণতা তো তাঁর দিক থেকে আছেই। তিনি চমৎকার একটা ভাষণ দেন সেখানে। পুরস্কার গ্রহণ করার কালে সবাইকে অফুরান ধন্যবাদও জানান। ব্যক্তিগত কৃতিত্বকে সম্মানিত করায় তিনিও সম্মানিত হন। শিল্পের প্রতি ক্ষুধা তিনি প্রকাশ করেন। তাঁর সৃষ্টিচেতনাই তাঁকে মানুষের সমস্তরে নামিয়ে আনে। এটা খুব গুরুত্বের সঙ্গে তিনি দেখেন। তিনি মনে করেন, শিল্প হলো সর্বাধিকসংখ্যক মানুষকে তাদের সাধারণ আনন্দ আর দুর্দশার চিত্রকল্পে জাগিয়ে তোলার এক অপরানন্দ! তিনি অন্যদের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার কোনো পদ্ধতিই জিইয়ে রাখেন না। এখানে নিজেকে আলাদা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। সৌন্দর্য আর সমন্বিত চৈতন্য সৃষ্টির মাধ্যমে একজন লেখক কার্যত অন্যদের দিকে আগুয়ান হন। প্রকৃত শিল্পী প্রতিক্ষণে ঘৃণা সৃষ্টির ভেতর থাকতে পারেন না, তাঁকে বিচারের দিকে যেতে হয়। তাঁকে যদি কিছুর পক্ষপাতই নিতে হয়, তবে অবশ্যই সৃষ্টিশীল সমাজের দিকেই তিনি যাবেন। এই হচ্ছেন কামু, নিজেকে চেনানোর এক মহান কারিগর! তিনি সমাজের বিচারক নন, সৃষ্টিশীল কাজের প্রতিভূ হবেন! তিনি ইতিহাসের নিয়ন্ত্রণকারীদের কখনো সেবাদাসে পরিণত হবেন না, কারণ তাঁর মূল কাজ ইতিহাস ভেঙে সৃষ্টিশীল জীবনকে জাগরূক করা। তিনি থাকবেন পীড়িতদের পক্ষের মানুষ হয়ে। নতুবা তিনি হবেন শিল্পশূন্য এক সত্তা, যা সৃষ্টিশীলতার কোনোই কাজে আসবে না। তিনি স্বোপার্জিত স্বাধীনতাকে পূজা করবেন, বিকল্প-সত্য খুঁজে নেবেন। তাঁর কাজ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা, তবে তাতে যান্ত্রিকতা এলে চলবে না। মানবিক আবেগ ছাড়া কিছুই স্থায়ী হয় না। প্রতিটি প্রজন্মই দুনিয়া সংস্কারের তাগিদ অনুভব করে। তার মূল কাজ পৃথিবীর আত্মধ্বংস রোধ করা। এমন এক বোধের কাজে নিজেদের নিয়োগ করা দরকার, যেখানে জীবন আর মৃত্যুকে মর্যাদা দেবে। কোনো শ্রমই দাসত্বের হতে পারে না, সেই শ্রমই উত্তম যেখানে তা সংস্কৃতির সঙ্গে একটা মানবিক বোঝাপড়া করে নিতে পারে। সত্য রহস্যময়, ছলনাময়ও বটে, তবে সবসময় তাকে যথার্থভাবে জয় করতে হয়। সমন্বিত আনন্দ আর স্বাধীনতার চেয়ে বড়ো কিছু নেই।

আমরা কামু আর হেমিংওয়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনকেই উদযাপনের এক আশ্চর্য ইশারা পাই যেন। যেন তাঁরা তাঁদের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তাঁদের শিল্পময়তার এক ছাপ রেখে গেলেন। তাঁরা ঈশ্বরের প্রতিযোগী হলেন কি? তাহলে তারা যে-জীবনকে দেখার সাধনায় ছিলেন তার কী হবে? একজন ইন্দ্রিয় উপভোগের ভেতর দিয়ে জীবনের সাধ নিতেন, অন্যজন ছিলেন আকাঙ্ক্ষী, লেখা-ভ্রমণ-ভোজনের প্রতি মনোযোগী মানুষ। তবু তারা স্বেচ্ছায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনকে নাড়া দিয়ে গেলেন। একজন সড়ক দুর্ঘটনায়, অন্যজন মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানালেন! কামু যেন ক্যালিগুলা নাটকের মতোই প্রকৃতি আর মৃত্যুকে একাকার করে ফেললেন। যেন তিনি রাজকীয় স্বাধীনতার কথা বলে মৃত্যু নয় জীবনকেই ভিন্নভাবে স্পর্শ করে গেলেন। এভাবেই একজন কামু নিজেকে ইতিহাসের কাছে উপস্থাপন করেন, নিজে যেন এক ইতিহাসও হয়ে যান। তেমনই এক কথাশিল্পে তাঁর জন্মশতবর্ষে আমর্ম ভালোবাসায় স্মরণ করি।