অ্যামেলিয়া

লেখক: তিলোত্তমা মজুমদার

\ ১৮ \

শবনম : তো কী বলতে চাও? আমি কি ওকে কোলে তুলে চুমু খাব? পরিষ্কার একটা কথা বলে দিচ্ছি। কোনো ইসরায়েলি আমার বন্ধু হতে পারে না। চল্লিশ লাখ বুঝলে, চল্লিশ লাখ প্যালেস্টিনিয়ান উদ্বাস্তু। আমি বলছি না। ইতস্ নত মাই ইনফরমেশন। দিস ইজ ইউএন রিলিফ ওয়ার্কস এজেন্সি রিপোর্ট। কেন? আমরা কী করেছি? বিশ্বের বৃহত্তম উদ্বাস্তু এই আমরা! জিওনিজম-জিওনিজম করে ওরা আমাদের গোটা দেশ দখল নিয়েছে। এটা নয়া-উপনিবেশবাদ নয়? ধর্মের নামে দেশ দখল নয়? প্যালেস্টাইনে বসে ওরা প্যালেস্টিনিয়ানদের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। আ ল্যান্দ উইদাউত পিপল ফর পিপল উইদাউত আ ল্যান্দ। ওয়াজ ইত রিয়েলি আ ল্যান্দ উইদাউত পিপল? হোয়াত? উই আর ইনভিজিবল? প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে এই নিয়ে নখরা চলছে। আল নকাব, বুঝলে ১৯৪৮-এ স্বাধীন ইসরায়েল হওয়া মানে প্যালেস্টাইনের দুঃখের দিন। ক্যাতাসত্রপি। কী করেছে আমাদের জন্য ইউরোপ আমেরিকা? কিছু না। ওসলো চুক্তি একটা ভান। একটা মিথ্যা। দেশটাকে তিন টুকরো করেও ওদের শান্তি হয়নি। জেরুজালেম, বেথেলহেম নিয়ে জঘন্য রাজনীতি করছে। বলছে, ওই তো গাজা ছেড়ে দিয়েছি আরবদের জন্য। থাকুক ওরা। ওদিকে আমাদের দেশছাড়া করছে, খুন করছে, গুলি করে মারছে। গাজায় সারাক্ষণ গুলিগোলা, বোমাবাজি। রক্তের গন্ধে আর আমাদের গা গুলিয়ে ওঠে না। মরা মানুষ দেখলে আর কান্না পায় না। লোকে বলে, ইসরায়েল ইজ আ বিউতিফুল কানত্রি! আমাদের হাড়-মাংস-রক্ত দিয়ে তা সাজানো। আমাদের রক্ত খেয়ে ওরা বাঁচে। বিদ্রোহী, ইনতিফাদাই বলে তরুণ ছেলেগুলোকে জেলে পুরে পাথর মেরে মেরে ওদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। ভাবতে পারো? ওরা আমাদের মুছে ফেলতে চায়। আমি কত প্রিয়জন হারিয়েছি জানো তোমরা? আজ কেন আমি দেশছাড়া? উদ্বাস্তু হও, আল্লাল্লাহ্, তোমরা সবাই একবারের জন্য উদ্বাস্তু হও, তাহলে বুঝবে আমার বুকের মধ্যে কী আগুন জ্বলে।
‘চুপ করো, চুপ করো। শান্ত হও। শান্ত, শান্ত।’
অমলিনী শবনমকে জড়িয়ে ধরল। তার কাঁধে মাথা রেখে থরথর করে কাঁপতে লাগল শবনম। ইয়াকভ বলল, ‘ভোর হতে বেশি দেরি নেই। একটু তো ঘুমোতে হবে! চলো, ফিরি এবার।’
মোলি : কাল সকাল সাড়ে আটটায় লবিতে দেখা হবে?
ফেরার পথে শবনম সারাক্ষণ মোলির হাতখানা শক্ত করে ধরে রইল। মোলির ঘরের কাছে এসে বলল, ‘একটু জল খাওয়াবে?’
মোলি : নিশ্চয়ই। এসো। এই বোতলগুলোর যে-কোনোটাই খেতে পারো। আমি মুখ লাগিয়ে খাই না।
শবনম : আমি খাই। [একটি আধ লিটার এক চুমুকে শেষ করে] এই বোতলটা কি আমি ঘরে নিয়ে যেতে পারি? আমার একটাও নেই।
মোলি : নিশ্চয়ই। কিন্তু তুমি জল স্টোর করছ কিসে?
শবনম : স্টোর? স্টোর করব কেন? কলের জল খাচ্ছি।
মোলি : সেটা কি স্বাস্থ্যকর? বলরুমের পাশে একটা পানীয় জলের ঝরনা আছে তো।
শবনম : পানীয়জল? গাজায় মানুষ হয়েছি মোলি আমি! গাজা, গাজা! যেখানে জল সরবরাহের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। পাশের বাড়িটা হয়তো জ্বলছে, আমরা ভোজন করছি। রাস্তায় মরা মানুষ পড়ে আছে, আমরা বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাচ্ছি। আমার সব সয়। আমি রিফিউজি ক্যাম্পে থাকা মেয়ে।
মোলি : বোসো শবনম।
শবনম : হ্যাঁ, বসি একটু। তোমার ঘরটায় খুব শান্তি মোলি। আইওয়া হাউজ হোটেলে এক টুকরো স্বর্গ। কী করে এমন সাজিয়ে রেখেছ? আমার নিজের ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। আজ তো আর ঘুমই হবে না।
মোলি : থাকো এখানে, যদি ইচ্ছে হয়।
শবনম : তোমার তো ঘুমের দফারফা হয়ে যাবে। আমি ভীষণ কথা বলি। মরে গেলে তো দাফন করে দেবে। কিংবা ইসরায়েলি বোমায় দলা পাকিয়ে পোড়া রক্ত-মাংসের পিণ্ড হয়ে থাকব। আমাকে আর আমি বলে চেনাই যাবে না। চিরকালের মতো কথা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সারাক্ষণ কথা বলতাম। যেন বুকে যত কথা, সব বলে ফেলতে হবে। যেন আমার গলার আওয়াজ বাতাস থেকে মুছে না যায়। অনিশ্চয়তা, ভীষণ অনিশ্চয়তা, তাই হাতে টাকা এলে সব খরচ করে ফেলি! খুব দামি রঙিন পোশাক কিনি। ভালো খাবার খাই। আর সারাক্ষণ সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান পুরুষের সঙ্গে সেক্স করার জন্য ছুঁকছুঁক করি। যতটুকুই বাঁচি না কেন, সেই জীবন যেন দারুণ উপভোগ্য হয়! এই করতে গিয়ে পেনিলেসও হয়ে পড়ি আমি মোলি। তখন, আমার ঘরে তাকে সাজিয়ে রাখা ত্রিশ জোড়া চকচকে রঙিন জুতোর দিকে তাকিয়ে ভাবি, আমি সম্রাজ্ঞী, না ভিখারিনি! হা হা হা! মনে শান্তি নেই কিন্তু সুখভোগের প্রবল ইচ্ছা! মোলি, তুমি সুখ-শান্তি আলাদা করতে পারো? তোমরা বিছানায় ওটা কী পেতে রেখেছ? ভারী সুন্দর!
মোলি : ওটা কাশ্মিরি শাল। পুরো হাতে নকশা করা! তুমি চা বা কফি খাবে?
শবনম : কফি, কফি! উপ্স! আই মিস বেলজিয়াম কফি।
মোলি : তার বদলে ইন্ডিয়ান কফি খাও।
শবনম : র, র, র কফি। আমি সব র ভালোবাসি। দেখি ঘরে যাওয়ার সময় রোজানার থেকে একটা ঘুমের ওষুধ নেব। এক-এক সময় তিনদিন-চারদিন আমার ঘুম হয় না। তারপর টানা হয়তো দুদিন ঘুমিয়েই রইলাম। জীবনটাই ছন্দহীন হয়ে রয়েছে।
মোলি : তুমি যখন ইজিপ্টে থাকতে, তখনই কি রোজানার সঙ্গে পরিচয়?
শবনম : আল্লাল্লাহ্! সে এক ইত্তেফাক! তোমার কথা বলো মোলি। বিয়ে করেছ? বাচ্চা আছে?
মোলি : বাচ্চা হয়নি। বিয়ে করেছিলাম। পাঁচ বছর ধরে আলাদা থাকি।
শবনম : ডিভোর্স?
মোলি : হয়নি এখনো।
শবনম : কেন? পতিপ্রেম রয়েছে এখনো? আশা – আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে! মেয়েমানুষ মানেই কি হদ্দবোকা, সব্বার এক গল্প!
মোলি : দেখো, প্রেম আছে কি না জানি না। আশা একটা আছে। গত ছ-মাস যদিও আমাদের একটিও বাক্যবিনিময় হয়নি। এখানে এসে হোয়াটসঅ্যাপ করলাম। উত্তর নেই।
শবনম : মারো গোলি। এবার গিয়ে ডিভোর্স করো। প্রেমই যার প্রতি নেই তার জন্য অপেক্ষা করে আছ? যে-জামাটা তোমার গায়েই আঁটবে না, তার জন্য গুচ্ছের পয়সা খরচ করবে? নাকি বিয়ে টিকিয়ে রাখার মধ্যে কোনো ভারতীয় সংস্কার কাজ করে? যেমন দেখায় বলিউড ফিল্মে বর মারছে-ধরছে, অন্য মেয়ের সঙ্গ করছে কিন্তু স্ত্রী শুধু চোখের জলে ভেসে ভগবানের পুজো করছে। কী অবাস্তব! যৌনতা বলে একটা বিশাল ব্যাপার আছে তো! একটা জোয়ান মদ্দ নিয়ে থাকো। যৌনসঙ্গী কেউ তো আছে।
মোলি : নেই শবনম।
শবনম : বলো কী! আছ কী করে! একটা জোটাতে পারোনি?
মোলি : জোটেনি।
শবনম : মেয়েমানুষ চাইলে পুরুষ জোটে না, তা কখনো হয়?
মোলি : আসলে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে না উঠলে শরীর পর্যন্ত যাওয়া যায় না। তেমন হৃদয়বান কাউকে পেলাম না এখনো।
শবনম : আরে হৃদয় দিয়ে হবেটা কী! সে তুমি পেলে ভালো। না পেলে সেক্স করবে না। সেক্স করার জন্য একটা সুপুরুষ পেলে আর কিছু লাগে নাকি? তোমার অরগাজম কি হার্ট দিয়ে হবে?
মোলি : সুপুরুষ লাগবে? স্বাস্থ্যবান পুরুষ হলে হবে না?
শবনম : নাঃ! আমার অন্তত একটু রূপ লাগে। উফ্! ভাবো তো, তোমার অরগাজম হচ্ছে, আর একটা কিম্ভূত মুখ তোমার নাকের ডগায়!
মোলি : হা হা হা!
শবনম : হেসো না। এখানে একজনকে পটাও। দু-তিনজনও পটাতে পারো। তিন মাস মজা মারো। কাকে পছন্দ হয় বলো তো! জেরেমিস! নিশ্চয়ই জেরেমিস!
মোলি : কেন? জেরেমিস কেন? ইয়াকভ নয় কেন?
শবনম : আরে জেরেমিসকে সব্বার ভালো লাগে। ও ছাড়া রাইটারদের মধ্যে আছে-টা কে? ইয়াকভ? সুন্দর। কিন্তু নিরিমিষ্যি। কোনো আকর্ষণ নেই। তু গুদ। হোয়াত উদ ইউ দু উইথ আ জেনতলম্যান? উইমেন লাইক নতি ম্যান। তার সঙ্গেই তো খেলে মজা যে খেলতে জানে। জেরেমিস নারী পছন্দ করে। ওর চোখ দেখবে। যে-কোনো পুরুষের চোখ দেখবে। চোখই সব কামনার আয়না। কী দুর্ভাগ্য বলো, রাইটারদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হলো ফিলিপ, তারপর সমীর। দুটোই শালার হোমো! সব গুদ লুকিং ছেলেই যদি গে হয়ে যায়, আমরা কী করি! শাম্বাগ হাউজে ইয়াপের একজন ইন্ডিয়ান ছেলে আছে, দেখেছ? কৃষ্ণাণ! উফ! কী দেখতে! টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম! ওরও আমার প্রতি আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে! ইন্ডিয়ান পুরুষ আমার দারুণ লাগে! শুধু আমার কেন, আমি, হারিক, রোজানা – আমরা ভারতীয় পুরুষ বলতে পাগল।
মোলি : আমার বন্ধুরা শুনলে খুশি হবে শবনম। কিন্তু ভারতীয় পুরুষদের এত ভালো লাগার কারণ কী?
শবনম : দাও না আমায় একটা ইন্ডিয়ান গাই জুটিয়ে! ওদের শ্যামলা রং, নরম অথচ পুরুষালি চেহারা, সুন্দর চোখ, লাজুক চাহনি, দেখলে মনে হয় জাপটে জড়িয়ে ঠোঁট দুটো চুষে চুষে শেষ করে ফেলি। ওরা ভীষণ একনিষ্ঠ হয়। একবার প্রেমের আঁচলে বেঁধে ফেললে আর অন্যদিকে তাকায় না! তুমি ভাবছ, আমি এত কী করে জানলাম! ওখানে বেলজিয়ামে কয়েকটি ইন্ডিয়ান ফ্যামিলিকে আমি জানি।
মোলি : তোমার ফ্যামিলি?
শবনম : ফ্যামিলি? সেই কপাল আমার। তিন দাদার পর আমি জন্মেছি, একমাত্র মেয়ে, সবার ছোট, খুব আদরের আমি। উনিশ বছর বয়সে বিয়ে হলো। সংসারে আমার সেই স্বামীর মা ও দুই দিদি। কেউ বিয়ে করেনি। মানে দিদিরা। জান্নাত থেকে জাহান্নামে গিয়ে পড়েছিলাম। দাসীর মতো খাটাত। আমার স্বামীকে আমার কাছে ঘেঁষতে দিত না। কোনোদিন ছেলেকে ছাড়া মায়ের ঘুম আসে না, কোনো দিন ভাইকে ছাড়া দিদিদের ঘুম আসে না। নোংরা, মোলি! ভীষণ নোংরা একটা সম্পর্ক ছিল ওদের। দে ওয়ার ইনসেস্ত।
মোলি : তাহলে ছেলের বিয়ে দিলো কেন?
শবনম : সমাজে নিজেদের মান বাঁচাতে! কলেজে যেতে চাইতাম বলে মারত। ছোট ছিলাম তো, বরটার প্রেমে পড়েছিলাম। ভাবতাম, ও ঠিক একদিন আমার প্রেমের মর্ম বুঝবে। একদিন আমার জীবনও সুখের হবে! সাত বছর মোলি! সাত বছর নরকবাসের পর আমার মুক্তি হলো। অনেক টালবাহানা করে তালাক পেলাম। বসে বসে কপাল না চাপড়ে কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। আই হেত দিফিত! আই ওয়ানত তু ফাইত তিল দেথ! কলেজের ওই পাঁচটা বছর ভীষণ ভালো কেটেছিল জানো। আমার বেহেস্ত। বেস্ত তাইম ইন মাই লাইফ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের সঙ্গে প্রেম হলো। গভীর প্রেম। কোথাও কোনো ফাঁকি ছিল না। সে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল; কিন্তু তার আরো একটা বউ ছিল। ছেলেমেয়ে। আমার জন্য বউকে তালাক দিতেও রাজি ছিল সে। কিন্তু আমিই রাজি হতে পারলাম না। বউ-বাচ্চা তো কোনো দোষ করেনি। নিজে মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে কী করে কষ্ট দিই! আমিই সরে গেলাম। ইজিপ্টে থাকাকালে আমারই স্বজাতি একজন আমার প্রেমে পড়ল। প্রেম মানে সে তুমি ভাবতে পারবে না! আমাকে না পেলে বিষ খায় আর কী! আমি তখন ছিন্নমূল। একটা অবলম্বন চাইছি। সে আমার মতো আশ্রিত ছিল না। ভালো চাকরি করে, গুদ লুকিং। তাকে বিয়ে করলাম। দারুণ সেক্সি ছিল সে। একদম আমার মনের মতো। যেমন সেক্সি, তেমন রোমান্টিক! আমরা বাথটাবে সেক্স করেছি, কিচেনে করেছি, মাঝরাতের অন্ধকারে খোলা বারান্দায় করেছি। কিন্তু বিবাহিত জীবন মানে তো শুধু সেক্স নয়। একটা নিরাপত্তা, সংসার, মাতৃত্ব। আমার যখন তেত্রিশ বছর বয়স। চুপচাপ পিল খাওয়া ছেড়ে দিলাম। কারণ ও বাচ্চা চাইছিল না। ভাবলাম, পেটে এসে গেলে আর কী করবে। এলো! সে যেদিন টের পেল সেদিন থেকে সম্পূর্ণ অন্য লোক! রোমান্টিক, প্রেমিক মানুষটা যেন মুখোশ পরে ছিল। তার মধ্যে যে এমন একজন হিংস্র মানুষ থাকতে পারে, আমি কল্পনাও করিনি। প্রচণ্ড মারল। বলল, বাচ্চা নষ্ট করো। আমিও করব না। সে আমার দিকে গরম ইস্ত্রি ছুড়ে মারে, আমি তার দিকে ফুটন্ত জল ছুড়ে মারি। সে আমার গলা টিপতে চায়। আমি তার বুকে লাথি কষাই। রাগে আমার ঘুমের মধ্যে চুল কেটে দিলো! সে কী জঘন্য ব্যাপার! আমিও ওর দামি দামি জামাকাপড়ে আগুন লাগিয়ে দিলাম। মোলি, শুধুমাত্র মা হতে চেয়েছি বলে আমার সুখের সংসার হঠাৎ নরক হয়ে গেল! সে নাকি বন্ধনে জড়াতে চায় না। আরে! বিয়ে মানেই তো তুমি বন্ধন স্বীকার করলে! একদিন সে আমাকে ছেড়ে গেল। বাচ্চা নষ্ট না করলে ফিরবে না। মোলি, আমি রিফিউজি ছিলাম। সরকারি সাহায্য পেতাম। বিয়ে করে আমার পরিচয় বদলাল। আমি নির্ভরশীল হয়ে গেলাম। এখন খাব কী? বাচ্চা বাঁচাব কী করে? বাচ্চাটা বোধহয় তার মায়ের অসহায় দশা বুঝেছিল জানো! তখন আমার চার মাস চলছে। পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো। অল্প অল্প রক্ত! বাড়ির কেউ কাছে নেই। গাজায় ফেরার উপায় নেই। কোথাও কোনো সাহায্য নেই! আমি একাই একটা ট্যাক্সি ডেকে হাসপাতালে গেলাম। প্রথম রোজানার সঙ্গে দেখা হলো। শি ওয়াজ মাই দকতর। শি ইজ এ গাইনি। সে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলল, আমি দুঃখিত। বাচ্চার হার্টবিট নেই। তোমাকে অপারেশন করতে হবে।
হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল শবনম : মাই বেবি! মাই বেবি! শি লেফত মি। আই ওয়ান্তেদ আ বেবি গার্ল, ইউ নো! শি রিয়ালাইজদ, আই অ্যাম আ ব্যাদ মাদার, আই কুদন্ত প্রোতেক্ত হার। শি লেফত মি! একটা রক্ত-মাংসের দলা মোলি! ও মোলি! আমি আর মা হতে পারব না। কোনোদিন মা হতে পারব না। আই হ্যাভ লস্ত মাই সিস্তেম তু।
শবনমকে বুকে জুড়িয়ে ধরল মোলি। দুই নারী, ভিন্ন দেশের, ভিন্ন ভাষার, পরস্পরকে জড়িয়ে রাত্রির শেষ প্রহরে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল মাতৃত্বহীনতার যন্ত্রণায়, দাম্পত্য জীবনের ব্যর্থতায়, প্রেমহীন জীবনের নিঃসীম শূন্যতায়।
একসময়, প্রবল বর্ষণশেষে সিক্ত পৃথিবীর মতো শান্ত হলো তারা।
শবনম : খুব হালকা লাগছে! খুব, খুব হালকা লাগছে। রোজানাও এত কথা জানে না, যা তোমাকে বললাম। হয়তো তোমার আমার সম্পর্ক আগেই কোথাও তৈরি হয়ে ছিল! আমি ধর্মানুরাগী, ঈশ্বরবিশ্বাসী। কিন্তু আমার কোনো সংস্কার নেই। আমি বাইবেল পড়েছি, গীতা পড়েছি। দর্শনের ছাত্র হিসেবে আমার সব ধর্ম ও দর্শনের প্রতি অনুরাগ আছে। ধর্ম তো আসলে দর্শন। তোমাদের ধর্মে জন্মান্তর মানে। হয়তো আগে আমাদের দেখা হয়েছিল। হয়তো আমি, হারিক, রোজানা, ইয়াসমিন চার বোন ছিলাম। জানো, আমরা চারজনই বাবা-মায়ের এক মেয়ে। চারজনই কবি। আমাদের সবারই জীবন প্রায় এক। রোজানা তিনবার বিয়ে করেছে, তিনবার ভেঙে গেছে। ইয়াসমিন দুবার। হারিক এখনো একবার। কারো দাম্পত্য টেকেনি। বাচ্চা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখো, সবার এক গল্প। ওকিওকির খুব অশান্তি চলছে। কয়েক মাস আগে ভেরোনিকার ডিভোর্স হয়েছে। মেইমি দু-বছর হলো সিঙ্গল। একাই ছেলেকে মানুষ করছে। আদনাশে বিয়েতে বিশ্বাস করে না। ও সবচেয়ে স্বাধীন। সবচেয়ে সুখী। ও এমনকি সন্তানের জন্মও দেবে না। দত্তক নেবে। বলে, আফ্রিকায় হাজার হাজার শিশু অপুষ্টিতে মারা যায়। আমি না হয় একজনকে খাইয়ে-দাইয়ে মানুষ করব।
ভারতীয় কফির তারিফ করে, কাশ্মিরি শালটিতে হাত বুলিয়ে, জলের বোতল নিয়ে শবনম যখন চলে যাচ্ছে, ভোর পাঁচটা। মোলি তার প্রিয় কালো শাল শবনমের গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার চিহ্ন, রইল তোমার কাছে। একবার কেচে নিও।’ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল তারা। চুমু খেল। মোলি বলল, ‘তোমার সেই দ্বিতীয় স্বামীর কী হলো?’
শবনম : অমানুষ! অমানুষ! আমার বাচ্চা নষ্ট হয়ে গিয়েছে শুনে আবার এসেছিল একসঙ্গে থাকবে বলে। আমি মাংস কাটার ছুরি নিয়ে তাড়া করলাম। চুকে গেল। আবার শরণার্থী শিবিরে নাম লেখালাম। সম্পর্ক একটা অদ্ভুত জিনিস। ভেঙে যায়, থেমে যায়, শীতল হয়ে যায়। সেগুলো একরকমের বোঝা। তোমার মতো মেয়ে সেই বোঝা টেনে চলেছে, এটাই আশ্চর্য। এই দুনিয়ায় সম্পূর্ণ একলা বাঁচা যায় মোলি, বাঁচতে হয়।

Leave a Reply