আবুল হাসানের কবিতা ও তাঁর বিষয়ভাবনা

লেখক:

সোহেল মাজহার

মধ্যষাটের দিকে আধুনিক বাংলা কবিতার যুবরাজ কবি আবুল হাসানের আগমন ঘটে। সময়টি ছিল বাঙালির জাতীয় জীবনের ক্রান্তিকাল, দুঃসহ সময়। অন্যদিকে তখন থেকেই শুরু হয় বাঙালি রেনেসাঁসের পুনরুজ্জীবন বা নতুন করে পথচলা। কারণ ’৫২-এর মহান ভাষা-আন্দোলন বাঙালিকে দিয়েছিল একটি একক জাতিসত্তাবোধ, পূর্ণাঙ্গ ও পরিশুদ্ধ ভাবনা। আর সেই ভাবনা থেকে ব্যক্তি ও কবি আবুল হাসান কখনো পৃথক ছিলেন না। আর এই ভাবনাকে ধারণ করে ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে শামসুর রাহমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক ও মোহাম্মদ রফিকরা তৎকালীন সময়ের চলমান ঘটনা ধারণ করে কবিতার নির্মাণশৈলীতে ভিন্ন-ভিন্ন উচ্চারণ করেন। তাঁদের কারো কারো কবিতা ছিল অনেক বেশি স্লোগানধর্মী ও আবেগতাড়িত। পরবর্তীকালে তাঁদের অনেকের কবিতার বিষয় ও শৈলী পরিবর্তিত হয়েছে। পক্ষান্তরে কবি আবুল হাসান কবিতার শব্দচয়নে স্লোগানধর্মিতা এড়িয়ে নান্দনিকতার ছোঁয়ায় প্রতিবাদের ভাষাকে আরো বেশি উজ্জীবিত করতেন। কবি আবুল হাসান সমকালীন সময়ের চিত্র অাঁকতে গিয়ে ইজমপ্রধান হয়ে ওঠেননি। অর্থাৎ কবি আবুল হাসান আবেগকে প্রশমন করতে না পারলেও লেখনীকে প্রশমিত করতেন উপমা ও রূপকের সূক্ষ্ম কারুকার্যে। আর এ-কারণেই দেখি তাঁর নান্দনিক প্রতিবাদ –
যদি দেখি না
পৃথিবীর কোথাও এখন আর যুদ্ধ নেই, ঘৃণা নেই, ক্ষয়ক্ষতি নেই তাহলেই হাসতে হাসতে যে যার আপন ঘরে
আমরাও ফিরে যেতে পারি।
(‘ফেরার আগে’, গোলাম সাবদার সিদ্দিকীকে)
অথবা অন্যত্র যদি আমরা লক্ষ করি তাহলে নান্দনিক প্রতিবাদের ভেতরও তিনি বিভিন্ন স্তর-অভিমুখী হয়েছেন। কখনো নির্লিপ্ততা বা নীরবতা কবির ভাষাকে আরো সুষমামন্ডিত করেছে। শিল্পিত প্রতিবাদের ভাষা আরো বেশি হয়েছে প্রকৃষ্ট।
তোমাদের অনশন! তোমাদের অনশন! তোমাদের অনশন!
আর আমার ভাল্লাগেনা! আর আমার ভাল্লাগেনা! ভাল্লাগেনা!
এর ভেতরে আমি কে? আমি একজন নিঃসঙ্গ কবি, নিঃসঙ্গ
নিঃসঙ্গ, নিঃসঙ্গ
একজন কিশোরী হায়রে ভাতের অভাবে আর ক্ষিধের জ্বালায়
হায়রে
যুবতী হতে হতে আর যুবতী হচ্ছে না আর যুবতী হচ্ছে না।
(‘এক ধরনের প্রতিবাদ’)
কবিতার আঙ্গিক ও গঠনশৈলী নিয়ে ষাটের দশকের প্রথমার্ধে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। এ-সময়েই বাংলাদেশের কবিতায় গদ্য একটি মাধ্যম হিসেবে প্রবেশাধিকার পায়। আবুল হাসান মধ্যষাটে আত্মপ্রকাশ করে নিজেও কবিতার উপস্থাপন মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। এ-সময় কেউ কেউ কবিতাকে গদ্যরেখার মতো, সরল রেখার মতো উপস্থাপনা করেছেন। যেহেতু বক্তব্য উপস্থাপনে সুস্পষ্ট বক্তব্যাশ্রয়ী হয়নি ফলে এর গদ্যভাষা একধরনের অস্পষ্টতার ভেতর আচ্ছন্ন ও আরোপিত ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে। বক্তব্য বৃহত্তর কাব্যপাঠকের কাছে সহজবোধ্য ছিল না। কবি আবুল হাসান কবিতায় গদ্যভঙ্গিকে উপস্থাপন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি যথাযথভাবে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গিকে গুরুত্ব দিয়েছেন সমমাত্রায়। তাই তাঁর কবিতার গদ্যভাষাতে যাবতীয় অস্পষ্টতা ও ধোঁয়াশার ভেতরও বক্তব্য প্রকাশের প্রচ্ছন্ন সূত্র সবসময় বিদ্যমান। তাঁর কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, কবিতার প্রকাশভঙ্গি জৈবিকতার চেয়েও বেশি আত্মজৈবনিক বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী। তাঁর এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ স্পষ্ট। কবি এ-সময়ে মিথাশ্রয়ী বা প্রতীকাশ্রয়ী হয়ে পড়েন। বিষয় হিসেবে বেছে নেন প্রেম-প্রকৃতির মাধুর্য ও সৌন্দর্য, লোকজ উপাদান ও শব্দ, রাত্রির নির্জনতা, গাছের পাতা, দিনের শব্দমুখরতা, পাখির কাকলি। বস্ত্তত জলে, স্থলে, বাতাসে, অন্তরীক্ষে তিনি কবিতা হাতড়ে বেড়িয়েছেন। অর্থাৎ এভাবেই তিনি ছায়াঘেরা গ্রামবাংলার চিরচেনা প্রকৃতির সঙ্গে নগরসভ্যতার একটি যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে সফল বলা যায় অনেকাংশে। আর এজন্যেই হয়তো বিভিন্ন সমালোচক তাঁকে ‘নগর সভ্যতার বিশুদ্ধ উচ্চারণ’ বলতে দ্বিধাবোধ করেননি। কিন্তু আমরা দেখতে পাই কাব্যে নগর-চেতনার পাশাপাশি অত্যন্ত নিপুণ হাতে গ্রামবাংলার আবহমান পটভূমিকে ভাষার বিমূর্ত চিত্রে অঙ্কন করেছেন। এই প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্যেও তিনি তাঁর সমকালীন সমাজ, রাজনীতি, পারস্পরিক সমাজবাস্তবতা থেকে বিমুখ হননি। বস্ত্তত গ্রামীণ আলোছায়ার ভেতরেই তিনি অত্যন্ত সফলভাবে ভাষা দিয়েছেন নগরের শাশ্বত যাতনাকে। যেখানে কালবোধ, সমাজবোধ, দর্শন ও চলমান চালচিত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই তাঁকে দৃঢ়, ঋজু ও বেদনার্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করতে শুনি –
পাতা কুড়োনির মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছো? ছায়া, আমি ছায়া কুড়োই! পাখির ডানাসিক্ত সবুজ গাছের ছায়া, গভীর ছায়া একলা মেঘে কুড়োই, হাঁটি মেঘের পাশে মেঘের ছায়া ‘ছায়া কুড়োই!’-

পাতা কুড়োনির মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছো? মানুষ, আমি মানুষ কুড়োই। আহত সব নিহত সব মানুষ কারা বাকস খুলে ঝরায় তাদের রাস্তাঘাটে, পুষ্প – তবু পুষ্পেভরা পুষ্প : তাদের কুড়োই আমি – দুঃখ কুড়োই! (‘ধরিত্রী’)
তাই পটভূমিতে কবি আবুল হাসানকে দুঃখবোধের কবি বলা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। আর এ-কারণেই হয়তো কবি-সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘চূড়ান্ত ব্যবচ্ছেদ করলে তার ভেতর মায়ামমতা, মানুষের জন্য দুঃখবোধ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না।’ বস্ত্তত একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কবি শরবিদ্ধ পাখির মতো সাধারণের দুঃখ নিজের ভেতর অনুভব করেন। এই অনুভবের শক্তির ভেতর যদি কৃত্রিমতা ভিড় করে তাহলে স্বভাবত স্বভাবধর্ম, প্রাকৃতিক গতি ও ছন্দ ব্যাহত হবে। কবি আবুল হাসানকে অন্তত এ-দোষে দুষ্ট বলা যায় না। কারণ তিনি ছিলেন শামসুর রাহমানের ভাষায় – ‘মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কবি।’ অন্য কথায় বলা যায়, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সার্বক্ষণিক কবি। আত্মতাপসের মতো অহর্নিশ কবিতার ধ্যান করতেন। ফলে দুঃখবোধ হোক আর রোমান্টিসিজমের কণ্ঠস্বর হোক, সকল উচ্চারণ তাঁর কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে নিজের ভেতর থেকে সৃষ্ট হওয়া মাতৃভাষা হিসেবে। তাকে আমরা বলতে শুনি –
আমি জানি না দুঃখের কী মাতৃভাষা
ভালোবাসার কী মাতৃভাষা
বেদনার কী মাতৃভাষা
যুদ্ধের কী মাতৃভাষা

শুধু আমি জানি আমি একটি মানুষ
আর পৃথিবীতে এখনও আমার মাতৃভাষা, ক্ষুধা
(‘মাতৃভাষা’)
আপাতদৃষ্টিতে তাঁর কবিতায় দুঃখবোধকে একমাত্র প্রধান সিম্বলিক মনে হলেও একটু গভীর দৃষ্টি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে আর একটি সত্য দৃশ্যমান হয়। অর্থাৎ গণমানুষের প্রাপ্তি ও ব্যর্থতা একান্ত নিজের করে দেখার ভেতর দিয়ে একসময় নিজের আত্মকেন্দ্রিক কষ্টটুকু গৌণ হয়ে ওঠে। মানবজীবনের এই গভীর একান্ত সামষ্টিক দুঃখবোধ অনুভূতি কবির কবিতার দার্শনিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। অর্থাৎ কবির এই দুঃখ আগামী বৃহৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে। কবির কণ্ঠে –
দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদি রাখবো না আর
আমার ভেতর

আমার বুকের কাছে তাদেরও দুঃখ আছে, পূর্বজন্ম পরাজয় আছে
কিন্তু কবি তোমার কিসের দুঃখ? কিসের এ হিরন্ময় কৃষকতা
আছে?
(‘কালো কৃষকের গান’)
আবুল হাসান যতটা নাগরিক চেতনায় দুঃখবোধ উচ্চারণ করেন। তার চেয়ে বেশি মগ্ন ছিলেন লোকায়ত দর্শনের প্রতি। তাঁর কবিতায় লোকায়ত দর্শনের পাশাপাশি ভারতীয় পুরাণ কাহিনি, গ্রিক ও পাশ্চাত্য মিথ একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে। বাংলার ভাববাদী দর্শন লোকায়তচর্চা তিনি তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে মূর্ত করেছেন। বস্ত্তত একজন কবি হিসেবে তাঁর এই প্রচেষ্টা নিজস্ব আত্মোপলব্ধির বিশ্লেষণের নামান্তর। বাংলার লোকায়ত দর্শনের ক্ষেত্রে লালন ফকির মহীরুহ। জীবনজিজ্ঞাসার অনেক বিষয়ভাবের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। জীবনযাপন ও মননের অনেক প্রশ্নের মীমাংসা ফকির লালন শাহ তাঁর জীবন ও পরিপার্শ্ব থেকে খুঁজেছেন। কবিও এক অর্থে আধ্যাত্মিক পরিব্রাজক। কারণ তিনিও কবিতার চিত্রকল্প, উপমা ও শব্দপ্রতীকের মাধ্যমে জীবনকে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাই তাঁর কবিতায় ফকির সাধক লালন শাহ ‘সশরীরে মূর্ত হয়ে ওঠেন -’
ওহে দূর লালন ফকির। তুমি শোনো
আমার আরশীনগরে আজ আর নেই পড়শী কোনো – একা
বড় একা,
আমার বয়স স্বপ্ন, স্মৃতি দিয়ে লেখা এ্যালবাম সেও বড়
বদন প্রয়াসী।
(‘লোকটা যখোন নিঃসঙ্গ’)
কবিতা কি শুধু দৃশ্যকল্প, উপমা, চিত্রকল্প ও শব্দপ্রতীকের ব্যবহার? না, শব্দ ও বাক্যের ঝংকার তুলে শব্দ ঢেউ ও অনুরণন তৈরি করা। কবিতা তার চেয়েও বেশি কিছু। যে-অনুভূতি ভাষা ও বাক্যে লেখা যায় না – কবি তাতেই প্রাণের সঞ্চার করেন। মানবমনের প্রতি মুহূর্তের চিন্তা, আবেগ, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন, তার অন্তর্গত অভিব্যক্তিকেও কবি বারবার স্পর্শ করতে চেয়েছেন। দৃশ্যের বহিরঙ্গ ও তার অন্তর্গত প্রকৃতি, রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতির অন্তর্গত মূল্যবোধ, দর্শন, সংকট, সেখানে ব্যক্তির অবস্থানের বিশ্লেষণ কবিতায় যথাযথভাবে করতে পেরেছে। কবি আবুল হাসান এমন একজন কবি, যিনি ভাষা দিয়ে অন্তর্গত অনুভূতি পর্যবেক্ষণ ও গূঢ় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজের মতো খেলা করেছেন। কবি নিজে তাঁর অন্তর্গত অসহায়ত্ব নিয়ে এভাবে উচ্চারণ করেন –

এক
অবশেষে জেনেছি মানুষ একা
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা
দৃশ্যের বিপরীতে সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনদিন

দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতা দুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক
যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শত জীবনের শত কুহেলী ও কুয়াশার গান!
(‘পাখি হয়ে যায় প্রাণ’)

দুই
এতদিন ছিলাম তবুও প্রণয়-প্রণতি কাজশূন্যতা সঙ্গম
কিছু দিন এ-ওকে ধারণ করে!
অবশেষে এখন আবার সেই
প্রথমের আভাস, বিন্যাস :
সত্তা : আবার যা তাই!
একা হয়ে গেছি, একা! সর্বদাই শূন্য, একা-ভালোলাগে
তবু ভাবি আমার একায় যদি শুদ্ধ হয় সন্তানেরা
আর ঐ সহস্র অপর!!
(‘অন্তর্পুরুষ’)
বস্ত্তত ব্যক্তির একাকিত্বের সাথে যখন তার অনুভূতি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার সমন্বয় ঘটে, তখনই কবিতা আপন তন্ত্রীতে বেজে ওঠে। বিষাদ ও স্পর্শকাতরতা ধীরে-ধীরে মানুষের রক্তকণিকার ভেতর প্রবেশ করে মানুষকে উন্মাতাল করে। কবির একাকিত্ব স্পর্শ করে মানুষকে। কবির এই একাকিত্ব যত না অবয়বগত তার চেয়ে বেশি মনোগত।
বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন, ঊনসত্তরের দুর্বার গণজোয়ার, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রতিক্রিয়াশীল, উগ্র কালো হাত, প্রগতির সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীলদের ক্রমাগত দ্বন্দ্ব, রাজনীতি ও সমাজনীতিতে শূন্যতা ও বন্ধ্যত্ব সামাজিক উত্থান-পতনের ঘণ্টাধ্বনি একটি সামাজিক আবহ তৈরি করে। এরকম ক্রান্তিকালে আবির্ভাব ঘটে কবি আবুল হাসানের। প্রাথমিক অবস্থায় তাঁর কাব্য ভাষা ও রীতিনীতিতে পূর্বসূরিদের বৈশিষ্ট্য বিশেষমাত্রায় পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় তাঁর কবিতায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। ফলে অনেকে তাঁকে দুঃখবোধের কবি, রোমান্টিসিজম নগর-চেতনার বিশুদ্ধ উচ্চারণ ইত্যাদি সীমিত অভিধায় ভূষিত করে। সেই মুহূর্তে আমার কাছে তাঁর কবিসত্তার বিষয়টি বড় হয়ে ওঠে। কবিতা, শব্দ ও ভাষা এমন একটি শিল্পমাধ্যম যেখানে নদীর গতির মতো স্রোতকে কখনো থামিয়ে রাখা যায় না। প্রকৃতি যেখানে প্রতিনিয়ত চেতনে-অবচেতনে, গোচরে-অগোচরে তার রূপ পরিবর্তন করতে থাকে সেখানে প্রকৃতির মতো গতিশীল একটি মাধ্যম কবিতা কখনো একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে আবদ্ধ থাকতে পারে না। এতে কবিতার চমৎকারিত্ব ও আবেদন নষ্ট হয় বলে আধুনিক বোদ্ধাদের অভিমত। কিন্তু চমৎকারিত্ব ও উপস্থাপনে যতটুকু শৈল্পিক ভাবনা প্রকাশিত হয় কবিতার শিল্পগুণ ততটুকুই সার্থক। বস্ত্তত শিল্প এমন একটি দর্পণ যেখানে একই আরশিতে প্রতিফলিত হয় রূঢ় বাস্তব ও তার অনুভূতিবোধ। ফলে একে বাস্তবতার তির্যক ফটোগ্রাফি বলা যায় না। উপরন্তু বলতে হয়, শিল্প একটি ধারাবাহিক ও সূক্ষ্ম অনুশীলন প্রক্রিয়া। তাই কালে-কালে কবিতা শিল্প ও সংজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে তার স্বাভাবিক চলার পথ সৃষ্টি করে নিয়েছে। যুক্ত করেছে সংজ্ঞার নতুন-নতুন সংযোজন। আর এ-দৃষ্টিকোণ থেকে আবুল হাসানের কবিতায় শিল্পরূপ প্রয়োগ সফল। কবির শিল্পভাবনা –
শিল্প হলো স্বাতীর হাতের ঐ কমলালেবু
লজ্জায় আনতমুখ রোদের ফড়িং
শিল্প হলো স্বাতীর কানের রিং –
(‘স্বাতীর সঙ্গে এক সকাল’)
ওপরের লাইনগুলো কবির ভাবনা নিজের মনোজগতে একান্ত স্বপ্নের পসরামাত্র। সেখানে কেবল ব্যক্তি আবুল হাসান প্রবেশ করেন। কিন্তু পরের লাইনগুলোতে যে-উচ্চারণ তা আর কোনো ব্যক্তির থাকে না। হয়ে যায় কবির আর কবিমাত্র সর্বজনীন। কবির সরব উচ্চারণ –
শিল্প তো নিরাশ্রয় করে না, কাউকে দুঃখ দেয় না –
শিল্প তো স্বাতীর বুকে মানবিক হৃৎপিন্ড, তাই
আমি তার হৃৎপিন্ডে বয়ে যাই চিরকাল রক্তে আমি
শান্তি আর শিল্পের মানুষ!
(‘স্বাতীর সঙ্গে এক সকাল’)
আবার প্রচ্ছন্ন এবং শিল্পিত দৃষ্টিতে তাঁর কবিতাগুলো কৌশলী উপস্থাপনা। অর্থাৎ স্পষ্ট করে বলতে হয় রাজনৈতিক চেতনাবোধকে তিনি কবিতার বিষয়বস্ত্ত করেছেন, কিন্তু রাজনীতির ভাষা ও তার উচ্চকণ্ঠকে তিনি কবিতার প্রকাশভঙ্গি হিসেবে গ্রহণ করেননি। আর একেই কবিতার যথার্থ শিল্প-প্রয়োগ বলা যায়। কারণ কবি সমস্ত উচ্চারণই করেছেন কিন্তু স্লোগান ও আওয়াজ তোলেননি, যা তাঁকে তাঁর সময়কার কবি থেকে পৃথক করেছে। এ জন্য তাঁকে কাব্য-চেতনার অমর শিল্পী হিসেবে অভিহিত করা যায়।
কবি রাজনীতিকে নিয়ে শব্দের খেলায় মেতে ওঠেন। শব্দের পর শব্দ দিয়ে তিনি এমনভাবে তির্যক ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন যাকে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ কথামালা মনে হলেও শব্দের অনুরণন অন্তর্গত রক্তের ভেতর ঢেউ তোলে। শব্দ ও ধ্বনির সঞ্চার দীর্ঘসময় ধরে অনুভূতিপ্রবণ মানুষের ভেতর রেশ জাগিয়ে রাখে। রাজনীতির সঙ্গে মানুষের ব্যক্তি-অনুভব যখন এক ও একাত্ম হয়ে ওঠে তখন তা তীব্রভাবে মানুষকে গ্রাস করে। কবির ভাবনায় –
এক
আমি পকেটে দুর্ভিক্ষ নিয়ে একা একা অভাবের রক্তের রাস্তায় ঘুরছি
জীবনের অস্তিত্বে মরছি রাজনীতি, তাও রাজনীতি আর
বেদনার বিষবাষ্পে জর্জরিত এখন সবার চতুর্দিকে খাঁ খাঁ খল
তীব্র এক বেদেনীর রূপে খেলা দেখছি আমি, রাজনীতি তাও কি রাজনীতি?
(‘অসভ্য দর্শন’)

দুই
এমনও সময় আসে
বিপ্লবীর মন শুধু নয়, বনভূমি সেও বড় বেদনায়
বিদ্রোহ জমিয়ে রাখে গাছে গাছে সবুজ পাতায়।
(‘বন্দুকের নল শুধু নয়’)

তিন
চে গুয়েভারার মতো দাড়িপূর্ণ ছবি
ঠোঁট তাম্রবর্ণ আদিবাসীদের মোটা সিগারেট!

অম্পূর্ণ যুবক এক অনস্থির
তার বন্দুকের নলে ধ্রুব আত্মশক্তি
এত তীব্র ছিল!
বাহুতে ছিল পেশীকণা ছন্দে
বেজে ওঠে রাজদ্রোহী গর্জনের কাঠ! –
(‘আলেখ্য)’

মধ্যষাট থেকে যাত্রা শুরু করলেও স্বাধীনতা-উত্তর অস্থিরতায় ১৯৭২-এর ডিসেম্বরে ৪৫টি কবিতাসমৃদ্ধ কবি আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় রাজা যায় রাজা আসে। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ ও খরাপীড়িত দেশে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যে তুমি হরণ করো প্রকাশিত হয়। তার আরো পরে ৪৪টি কবিতা গ্রন্থিত আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে পৃথক পালঙ্ক নামে। বস্ত্তত এই কাল-পরিক্রমায় কবি আবুল হাসান প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই আস্তে-আস্তে উত্তরণের পথে যেতে থাকেন, যার বাস্তব রূপায়ণ চোখে পড়ে পৃথক পালঙ্কে। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা, ফখরুল ইসলাম রবি ও জাফর ওয়াজেদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা, যা তাঁর শিল্পচিত্তের প্রামাণ্য দলিল। কবিতার শিল্পস্বরূপ প্রয়োগে এই কবি কতটা সার্থক, শৈল্পিক ভাষা ও চিত্রকল্প প্রয়োগে কতটা পারঙ্গম, তার সবচেয়ে বড়ো স্মারক চিহ্ন –
ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!
একজন কবিকে শেষ পর্যন্ত কী বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করা যায় তা সত্যিই দুরূহ বিষয়। কারণ প্রত্যেক পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পের রস-আস্বাদনের তাৎপর্য ও কবিতাকে বিশ্লেষণ করা যার-যার নিজস্ব দৃষ্টিকোণের বিষয়। ফলে একই কবির কবিতা ভিন্ন-ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন-ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত কবিকে পাঠক পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না। এই বিষয়ে আমরা আবুল হাসানের কবিতাকে উদ্ধৃত করতে পারি –
দৃশ্যমধ্যে অহরহ পরস্পরকে খুঁজে আবার কোথায় হই প্রতিধ্বনিত
আমার নিজ কণ্ঠস্বরে অন্য কাউকে ডেকে ফিরছি। ছেঁড়া চক্ষু ভাঙা গলা
দেখে যাচ্ছি। শুনে যাচ্ছি। একই বৃত্তে পরস্পরকে একই সঙ্গে এক আসরে
অথচ দ্যাখো আমরা কেউ চিনি না কাউকে ব্যক্তিগত পোশাক পরলে।
(‘ব্যক্তিগত পোশাক পরলে’)
আবুল হাসানের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো, মানবমনের বিচিত্র গতিপ্রকৃতির রহস্য ভেদ করা। বস্ত্তত বিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিচিত্র নকশা ও মানুষের আত্মোপলব্ধি, সংশয়, দ্বিধা, আত্মপরিচয় ও ব্যক্তির সংকট ঘিরে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাকেই তিনি কবিতায় রূপান্তর করতে চেয়েছেন। 