একটি জানালা

লেখক: হারুকি মুরাকামি

অনুবাদ : সম্পদ বড়ূয়া
আপনাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

প্রতিটি দিন অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের ঠান্ডা আমেজও কমে আসছে। এখন সূর্যালোকে বসমেত্মর হালকা ঘ্রাণ ভেসে আসছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি ভালো আছেন।

আপনার সম্প্রতি লেখা চিঠিটি পড়ে খুব আনন্দ পেয়েছি। বিশেষ করে মাংসের হ্যামবার্গার আর জায়ফলের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে লেখা অনুচ্ছেদটি সত্যিই সুলিখিত। আমি বুঝেছি, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে অকৃত্রিম সম্পর্কযুক্ত বিধায় বিষয়টি বেশ সমৃদ্ধ। রান্নাঘরের উষ্ণ সৌরভকে কি চমৎকারভাবেই না তুলে ধরা হয়েছে। কাঠের তক্তার ওপর ছুরি দিয়ে মৃদু আঘাতের মাধ্যমে রসুনকে ফালি ফালি করে কাটার বর্ণনা সত্যিই অনবদ্য।

আমি যখন পড়ছিলাম, আপনার চিঠি আমার ভেতর হ্যামবার্গারের জন্য এমন এক অদম্য আকাঙক্ষা জাগিয়েছিল যে, আমাকে সে-রাতেই কাছের এক রেস্টুরেন্টে গিয়ে তার আস্বাদন গ্রহণ করতে হয়েছিল। সত্যি বলতে কি, আশপাশের এলাকায় খাবারের দোকানে আট ধরনের হ্যামবার্গার রয়েছে – টেক্সাস, হাওয়াইন, জাপানিজ এবং আরো অনেক রকম। টেক্সাস হ্যামবার্গার আকারে বেশ বড় হয়। টোকিওর এ-প্রামেত্ম  কোনো টেক্সান এসে পড়লে, সন্দেহ নেই, সে একটা ভালো ধাক্কা খাবে। হাওয়াইন রীতিতে হ্যামবার্গারের পাশে আনারসের ফালি দিয়ে সাজানো থাকে। ক্যালিফোর্নিয়া হ্যামবার্গার কেমন আমার মনে পড়ছে না। জাপানি হ্যামবার্গার তৈরি করার সময় মুলার কুচিকে জ্বলন্ত আগুনে চেপে রাখা হয়। রেস্টুরেন্টের পুরো জায়গাটা চৌকসভাবে সাজানো হয়েছিল, পরিচারিকারা সকলেই সুশ্রী, সবার পরনে খাটো ঘাগরা। ওই রেস্টুরেন্টে আমার যাওয়ার বিশেষ উদ্দেশ্য কিন্তু এর ভেতরের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা দেখা কিংবা পরিচারিকাদের পা নিয়ে ভাবনাচিমত্মা করা নয়। আমি সেখানে হাজির হয়েছিলাম শুধু একটা কারণে আর সেটা হচ্ছে সাধারণ হ্যামবার্গার খাওয়া – টেক্সাস বা ক্যালিফোর্নিয়া বা অন্য কোনো হ্যামবার্গার নয়। নিরেট সাধারণ হ্যামবার্গার।

কোন হ্যামবার্গার কেমন, আমি কি চাই এসব বললাম পরিচারিকাকে।

‘আমি দুঃখিত’, সে উত্তর দিলো, ‘তবে এ … এ-ধরনের … এ প্রকারের হ্যামবার্গারই কেবল আমাদের এখানে পাওয়া যায়।’

আমি পরিচারিকাকে দোষ দিতে পারিনে। নিশ্চয়ই নয়। সে তো আর খাবার তালিকা ঠিক করে দেয়নি। তার পরিধেয় পোশাকটাও সে নির্ধারণ করেনি, যা টেবিল থেকে কোনো খাবার পরিষ্কার করার সময় প্রতিবারই ঊরুর অনেকটা অনাবৃত হয়ে যায়। আমি হেসে তার দিকে তাকালাম আর একটা হাওয়াইন হ্যামবার্গার দেওয়ার জন্য বললাম। ওটা খাবার সময় কেবল আনারসের টুকরোগুলো একপাশে সরিয়ে রাখতে হলো।

কি এক আশ্চর্য পৃথিবীতে আমরা বাস করছি। আমি শুধু চাচ্ছি একটা নিখুঁতভাবে তৈরি সাধারণ হ্যামবার্গার। আর এই বিশেষ সময়ে সেটা আমি খেতে পারি, সেই আনারসবর্জিত হাওয়াইন স্টাইলের হ্যামবার্গার। আপনার নিজের হ্যামবার্গারও, আমি জেনেছি, সাধারণ প্রকৃতির। আপনার পত্রের জন্য ধন্যবাদ। আমি সর্বামত্মঃকরণে যা চাই সেটা হচ্ছে আপনার বানানো একেবারে সাধারণ হ্যামবার্গার। অন্যদিকে জাতীয় রেলওয়ের স্বয়ংক্রিয় টিকিট মেশিনের ওপর আপনার লেখা অনুচ্ছেদটি আমার কাছে অনেকটা ভাসা ভাসা মনে হয়েছে। নিশ্চিত করে বলা যায়, সমস্যাটির ওপর আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ ভালো। তবে পাঠক সে-বিষয়টি প্রাণরসে পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারবে না। গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন পরিদর্শক হওয়ার জন্য এত কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। লেখালেখি হচ্ছে মূলত একটা সাময়িক রূপান্তরের খেলা।

সর্বশেষ এ নতুন চিঠির জন্য আপনার সার্বিক প্রাপ্ত নম্বর হচ্ছে সত্তর। ধীরে ধীরে অথচ নিশ্চিতভাবে আপনার রচনাশৈলী উন্নততর হচ্ছে। অস্থির হবেন না। আপনি এতদিন যেমন কঠোর পরিশ্রম করেছেন সেটা চালিয়ে যান। আপনার পরের চিঠির অপেক্ষায় আছি। এটা কি যথেষ্ট আনন্দদায়ক নয় যখন সত্যিই বসন্ত এসে পড়ে?

বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট মিষ্টি কেকের বাক্সের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেগুলো সত্যিই সুস্বাদু। সমিতির নিয়মে অবশ্য বলা আছে চিঠি লেখালেখির ক্ষেত্রে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে। ভবিষ্যতে এ-ধরনের পত্রালাপ থেকে বিরত থাকার জন্য আপনার সদয় অনুগ্রহ কামনা করছি।

যাই হোক, আপনাকে আবারো ধন্যবাদ।’

 

প্রায় এক বছর হলো আমি এ খ-কালীন চাকরিটা করেছি। আমার বয়স তখন বাইশ। প্রতি মাসে তিরিশটা বা তারো বেশি এ-ধরনের চিঠি আমি কষ্ট করে পাঠ করি। এজন্য ইদাবাসি জেলায় অবস্থিত পেন সোসাইটি নামে ছোট একটা কোম্পানি প্রতি চিঠির জন্য আমাকে দু-হাজার ইয়েন দিয়ে থাকে।

কোম্পানির বিজ্ঞাপনে গর্বিত ঘোষণা ছিল – ‘আপনিও শিখতে পারেন আকর্ষণীয় চিঠি কীভাবে লিখতে হয়।’ নতুন সদস্যরা একটা প্রারম্ভিক ফি আর মাসিক চাঁদা পরিশোধ করে। এর বিনিময়ে তারা মাসে চারটি চিঠি পেন সোসাইটি বরাবরে লিখে পাঠায়। আমরা যারা পেন মাস্টার, নিজের ভাষায় এসব চিঠির উত্তর দিয়ে থাকি। ওপরের চিঠিটা এ-ধরনের একটা চিঠির উত্তর যাতে ভুল সংশোধন, মন্তব্য আর ভবিষ্যতে আরো উন্নতির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সাহিত্য বিভাগে ছাত্র দফতরে একটা সাক্ষাৎকারে হাজির হয়েছিলাম। সে-সময় বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার গ্র্যাজুয়েশন এক বছরের জন্য পিছিয়ে গিয়েছিল। আমার মা-বাবাও তখন জানালো যে, আমার মাসিক সহায়তাও তারা আগের মতো দিতে পারবে না অর্থাৎ তা কমতে থাকবে। এই প্রথম আমি জীবন ধারণের সমস্যায় পড়লাম। চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার ছাড়াও আমাকে কিছু শব্দ বা বাক্যগঠন করার পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। এক সপ্তাহ পর আমাকে এরা চাকরি দিলো। তারপর শুরু হলো কীভাবে চিঠির ভাষণ সংশোধন, পরিবর্ধন করা হয়, নির্দেশনা বা উপদেশ দেওয়া যায়। এ-ব্যবসার কিছু কৌশল সম্পর্কে ধারণাও দেওয়া হলো। এগুলো তেমন কঠিন বিষয় ছিল না।

সোসাইটির সদস্যদের বিপরীত লিঙ্গের পেন মাস্টারের সঙ্গে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। আমার ভাগে চবিবশজন মহিলা সদস্য ছিল, যাদের বয়স চৌদ্দো থেকে তেপ্পান্ন। তবে বেশিরভাগ সদস্যের বয়স পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। আর একটা কথা বলে রাখি, তাদের অধিকাংশই আমার চেয়ে বয়সে বড়। প্রথম মাসেই আমি ভড়কে গেলাম। মহিলারা আমার চেয়ে অনেক ভালো লেখে। লেখালেখিতে তাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। জীবনে আমি কখনো গুরুত্বপূর্ণ একটি পত্র লিখেছি কি না ঠিক মনে পড়ে না। প্রথম মাসে কীভাবে কাজ করেছি সে-সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই। আমার সারাক্ষণ শীতল ঘাম ঝরত। নিজেকে আশ্বস্ত করতাম এই ভেবে যে, সদস্যদের অধিকাংশই একসময় একজন নতুন পেন মাস্টারের জন্য দাবি তুলবে, যা সোসাইটির নিয়মে এ-ধরনের সুযোগ রয়েছে।

এক মাস অতিক্রান্ত হলো। একজন সদস্যও আমার লেখার বিরুদ্ধে এতটুকু অভিযোগ করেনি। তারা এ থেকে অনেক দূরে। বরং প্রতিষ্ঠানের মালিক জানালো, আমি ওদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। আরো দু-মাস পার হলো। আমার পরিচালনার প্রতি সমর্থন জুগিয়ে পারিশ্রমিকও বাড়ছে। এটাকে ভাগ্য বলতে হয়। এসব মহিলা সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে আমাকে তাদের একজন শিক্ষক হিসেবে মান্য করে। যখন এ-বিষয়টি বুঝতে পারলাম, বড় ধরনের কোনো চেষ্টা বা দুশ্চিমত্মা ছাড়াই সমালোচকদের কথা ছুড়ে ফেলে দিতে তেমন বেগ পেতে হয়নি।

প্রথমে বিষয়টি ঠিক বুঝতে পারিনি। এই মহিলারা বড় একা (সমিতির পুরুষ সদস্যরাও তাই)। তারা তাদের কথা লিখে জানাতে চায়, কিন্তু এমন কেউ নেই যাকে লিখতে পারে। নৈশক্লাবে নাচের অনুষ্ঠানের অত্যুৎসাহী সমর্থক হিসেবে চিঠি লেখার অবস্থাও তাদের নেই। তারা আরো বেশি ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক চায়, সেটা যদি সংশোধন বা সমালোচনার মোড়কে হয় তা হলেও কোনো আপত্তি নেই।

আর তাই এমন হলো যে, আমার জীবনের প্রথম বিশ বছরের একটি অংশ আমি চিঠির এক গোপনীয় প্রকোষ্ঠে খোঁড়া সিন্ধুঘোটকের মতো কাটিয়েছি।

বিস্ময়ে ভরা কত বিচিত্র ধরনের চিঠি ছিল সেখানে! বিরক্তিকর চিঠি, কৌতুকপূর্ণ চিঠি, বেদনা ভরা চিঠি। দুঃখের বিষয়, আমি সেসবের একটি চিঠিও নিজের কাছে রাখতে পারিনি (সব চিঠি কোম্পানিকে ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে)। আর এটি ঘটেছে অনেক দিন আগে, চিঠির বিস্তারিত বিষয়ও আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে এটুকু মনে আছে, সেসব চিঠিতে জীবনের সব অনুষঙ্গ পূর্ণ হয়ে উপচে পড়ছে। এতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে শুরু করে অপ্রয়োজনীয় ক্ষুদ্র বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। চিঠিগুলো থেকে যে-বার্তা আমাকে মানে বাইশ বছরের একজন কলেজছাত্রকে পাঠাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে সেগুলো বাস্তবতাবিবর্জিত, মাঝেমধ্যে মনে হয় একেবারে অর্থহীন। শুধু জীবন সম্পর্কে আমার নিজের অভিজ্ঞতা নেই বলে এসব হচ্ছে – তা কিন্তু নয়। এখন আমি অনুধাবন করতে পেরেছি জীবনের বাস্তবতা এমন এক জিনিস, যা মানুষকে বলা যায় না, উপলব্ধি করতে হয়। এটা এমন এক বিষয় যা অর্থপূর্ণ কোনো কিছুর জন্ম দিয়ে থাকে। অবশ্য এখনো আমি তা জানতে পারিনি, মহিলারাও পারেনি। এটাই নিশ্চিতভাবে অনেকগুলো কারণের অন্যতম যে, তাদের চিঠির ভেতর যা ছিল তা অস্বাভাবিকভাবে দ্বৈত মাত্রা হিসেবে আমাকে বিদ্ধ করেছে।

চাকরিটা ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলে আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব সদস্য দুঃখ প্রকাশ করল। অকপটে স্বীকার করছি চিঠি লেখার এই অন্তহীন কাজে অনেক কষ্ট করেছি, এই ভেবে দুঃখও হচ্ছে। তবে আমি জানি, এই মহিলারা নিরেট সততার সঙ্গে তাদের মনের সমস্ত কথা আমার কাছে যে অকপটে তুলে ধরছে, এ-সুযোগ আর কখনো আসবে না।

মাংসের হ্যামবার্গার।

এ-গল্পের শুরুতে যে-মহিলা বরাবর পত্র লেখা হয়েছিল তার তৈরি হ্যামবার্গার খাবার সুযোগ সত্যিই আমার হয়েছিল। মহিলার বয়স বত্রিশ, কোনো বাচ্চাকাচ্চা নেই, স্বামী একটা কোম্পানিতে কাজ করে, যা দেশে সবচেয়ে ভালো নামকরা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। আমার সর্বশেষ চিঠিতে যখন তাকে জানিয়ে ছিলাম মাসের শেষে চাকরিটা আমি ছেড়ে দিচ্ছি, তখন সে আমাকে দুপুরের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সে লিখেছে, ‘আমি আপনার জন্য একটা সাধারণ হ্যামবার্গার তৈরি রাখব।’ সমিতির নীতির বিরুদ্ধে হলেও আমি সিদ্ধান্ত নিই তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করব। বাইশ বছরের এক তরুণের কৌতূহলকে তো আর অস্বীকার করা যায় না।

ওদাকু লেনের রেললাইনকে মুখ করে মহিলার অ্যাপার্টমেন্ট দাঁড়িয়ে আছে; সমত্মানহীন দম্পতির জন্য অনুকূল এর রুমগুলো। ঘরে আসবাবপত্র কিংবা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বা মহিলার পশমি কাপড় কোনোটাই খুব বিশেষ দামি জিনিস নয়, তবে সেগুলো যথেষ্ট পরিপাটি অবস্থায় আছে। আমাদের পরিচয় শুরু হয় পারস্পরিক বিস্ময়ের মাধ্যমে – তার যৌবনদীপ্ত চেহারার প্রতি আমার আর আমার সত্যিকারের বয়স দেখে তার বিস্ময়ভরা প্রতিক্রিয়া। সে ভেবেছিল আমি তার চেয়ে বয়সে বড় হবো। সমিতি পেন মাস্টারদের বয়স প্রকাশ করে না।

একে অন্যের প্রতি অবাক হওয়ার ঘোর কাটার পরপরই প্রথম সাক্ষাতে যে স্বাভাবিক দুশ্চিমত্মা থাকে তা সরে গেল। আমরা হ্যামবার্গার খেলাম, কফি পান করলাম। দুজন সহযাত্রীর একই ট্রেন ধরতে না পারার অনুভূতি আমাদের গ্রাস করল। ট্রেনের কথা যখন উঠল – তার তৃতীয় ফ্লোরের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে জানালা দিয়ে নিচে বৈদ্যুতিক ট্রেনলাইন চোখে পড়ে। সেদিন আবহাওয়া ছিল চমৎকার। ইমারতের বারান্দার গরাদে রঙিন চাদর আর পাতলা তোশক ঝুলছে, যা রৌদ্রে শুকাবে। প্রায়শই বাঁশের ঝাড়ু দিয়ে চাটি মেরে এসব তোশক ঠিক করা হয়। এ-শব্দ আমি এখনো শুনতে পাই। এটা অদ্ভুতভাবে দূরত্ব চেতনাহীন একটা বিষয়।

আমার জন্য পরিবেশিত হ্যামবার্গারটি একেবারে নিখুঁত ছিল, স্বাদ যথাযথভাবে খাঁটি বিশুদ্ধ; বাইরের ওপরের অংশটি গ্রিল করা ঢেউ-খেলানো কৃষ্ণাভ ও বাদামি, ভেতরে রসে টইটম্বুর; চাটনিটা একেবারে মানানসই। সত্যি কথা বলতে কি, আমি দাবি করতে পারি না যে কখনো এ-ধরনের সুস্বাদু হ্যামবার্গার আমার জীবনে খাইনি, তবে হলফ করে বলতে পারি, অনেক দিন পর্যন্ত এটাই ছিল সেরা খাবার। এ-কথা আমি মেয়েটাকে বলেছি, সে শুনে খুশিও হয়েছে।

কফি পান করার পর আমরা একে অন্যকে আমাদের জীবনের গল্প শোনাই। বার্ট বার্করেকের গান রেকর্ডে বাজছিল। যেহেতু তখনো আমার সত্যিকার অর্থে জীবনের গল্প শুরু হয়নি, বেশিরভাগ কথা মহিলারাই বলেছে। সে বলল, কলেজে থাকতে সে একজন লেখক হতে চেয়েছিল। তার প্রিয় কবিদের একজন ফ্রান্সিসকো মার্গানের কথা সে তুলল। সে কি আইমেজ-ভস-ব্রামসকে বিশেষভাবে পছন্দ করত? আমি নিজে মার্গানকে অপছন্দ করি না। অন্তত এটুকু বলতে পারি আমি তাকে অত সস্তা ভাবি না, যেভাবে অন্যরা মনে করে। হেনরি মিলার বা জেন জেনেটের মতো সবাইকে উপন্যাস লিখে ফেলতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

‘যাই হোক আমি লিখতে পারি না’, সে বলে ওঠে।

‘দেরি হয়েছে বলে লেখালেখি শুরু করা যাবে না এরকম কখনো হতে পারে না।’ আমি বলি।

‘না না, আমি জানি আমি লিখতে পারি না। আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আমাকে এ বিষয়টি ভাবিয়েছেন।’ সে হেসে ওঠে। ‘আপনাকে চিঠি লিখতে লিখতে আমি শেষে বুঝতে পেরেছি আমার সেই মেধা নেই।’

আমার মুখে উজ্জ্বল রক্তিম আভা ফুটে উঠল। এটা এমন একটা ব্যাপার, যা এখন আমি করতে পারব না। কিন্তু যখন আমার বয়স বাইশ বছর তখন আমার চেহারায় সবসময় একটা আরক্তিম ভাব চলে আসত।

‘তবে আপনার লেখার মধ্যে একটা সততার ছাপ আছে।’

কোনো উত্তর না দিয়ে মহিলা হেসে ওঠে। ছোট্ট সে হাসি।

‘অন্তত একটা চিঠির কারণে হ্যামবার্গার খাবারের জন্য আমি বাইরে আসতে পেরেছি।’

‘সে-সময় আপনি ক্ষুধার্ত ছিলেন।’

সত্যি! হয়তো তাই ছিলাম। শুকনো ঠনঠন শব্দ তুলে একটা ট্রেন জানালার নিচ দিয়ে অতিক্রম করল।

ঘড়িতে পাঁচটা বাজলে আমি বলি, ‘এবার বিদায় নিতে হবে। আমি নিশ্চিত, আপনার স্বামীর জন্য রাতের খাবারের আয়োজন করতে হবে।’

‘ও অনেক দেরিতে বাসায় ফেরে’, চিবুকে হাত রেখে সে বলে, ‘মধ্যরাতের আগে ফিরবে না।’

‘তিনি সত্যিই একজন ভয়ানক ব্যস্ত লোক।’

‘তাই মনে হয়’, একটুক্ষণের জন্য থামল সে, ‘মনে হয় একবার আমি আমার সমস্যার কথা আপনাকে লিখেছি। কিছু কিছু বিষয় আছে যা আমি ওর সঙ্গে আলাপ করতে পারি না। আমার অনুভূতিগুলো তার কাছে পৌঁছাতেই পারে না। অনেক সময় দেখি, আমরা দুজন দুটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলছি।’

আমি জানি না ওকে কী বলব। বুঝতে পারি না একজন লোক তার একবারে কাছের লোকের সঙ্গে কীভাবে দিনযাপন করতে পারে, যাকে সে তার মনের কথাই বলতে পারে না।

‘যাই হোক, ঠিক আছে’ নরম সুরে সে বলে ওঠে। কথাগুলো এমনভাবে উচ্চারণ করল যেন সত্যিই সব ঠিক আছে। ‘বিগত মাসগুলোতে আমাকে চিঠি লেখার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কাজটা সত্যিই আমি উপভোগ করেছি। আপনার এসব চিঠির উত্তরদান আমার জন্য মুক্তি, অনন্ত সুখের আস্বাদন।’

‘আপনার চিঠি পড়ে আমিও আনন্দ পেয়েছি’, আমি বললাম যদিওবা চিঠিতে সে কী লিখেছে তা আমার খুব একটা মনে পড়ছে না।

কিছুক্ষণের জন্য কোনো কথা না বলে সে দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হচ্ছে সময়ের যে-গতিধারা সেটি সে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

‘গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি পাশ করে আপনি কী করবেন?’ সে প্রশ্ন করে। আমি বলি, এখনো তা ঠিক করিনি। কী করতে হবে সে সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণা নেই। এসব যখন বলছি সে আবার হেসে ওঠে। ‘লেখালেখি করতে হবে এমন কোনো কাজের সঙ্গে হয়তো আপনি জড়িয়ে পড়বেন’, সে উত্তর দেয়, ‘সমালোচনামূলক লেখায় আপনার জুড়ি মেলা ভার। আমি সেসব লেখার দিকে চেয়ে আছি। সত্যিই আমি করব। কোনো ভনিতা করছি না। আমি জানি আমি যেসব লিখেছিলাম তা একটা কোটা পূরণের জন্য, তবে সেসবের মধ্যে ছিল সত্যিকারের অনুভূতি। আমি সবই রেখে দিয়েছি। মাঝেমধ্যে সেগুলো বের করি আর পুনঃ পুনঃ পাঠ করি।’

‘আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ’, আমি বলি, ‘আর ধন্যবাদ জানাচ্ছি হ্যামবার্গারের জন্য।’

 

দশ বছর কেটে গেছে। কিন্তু যখনই ওদাকু লেন ধরে তার বাসার পাশ দিয়ে যাই তার কথা আমি ভাবি আর তার সেই মচমচে গ্রিলড হ্যামবার্গারের কথা মনে পড়ে যায়। আমি রেললাইনের পাশের ইমারতগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। নিজেকে প্রশ্ন করি এসবের মধ্যে কোন জানালাটা সেই মহিলার। সেদিন জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখার ঘটনাটা মনে মনে ভাবি, সেই জানালাটা কোথায় হতে পারে তা বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি একবারও তা মনে করতে পারি না। মনে হলো, মহিলা এখন আর সেখানে থাকে না। যদি থাকে তাহলে সম্ভবত এখনো সে-জানালার অপর পাশে রেকর্ডে বার্ট বার্করেকের গান শুনছে।

তার সঙ্গে কি সেদিন বিছানায় যাওয়া উচিত ছিল?

এ-গল্পের এটাই হচ্ছে মূল প্রশ্ন।

এর উত্তর আমার বোধের অতীত। এখনো এ-সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। এমন অনেক বিষয় আছে যা আমরা কখনো বুঝতে পারি না। কত বছর আমরা সক্রিয়ভাবে পার করেছি সেটা বিচার্য নয়; কত অভিজ্ঞতা আমরা সঞ্চয় করেছি সেটাও ধর্তব্য নয়। আমি শুধু যা করতে পারি তা হলো, ট্রেন থেকে ইমারতগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা যেখানে তার ঘরের জানালাটা শোভা পাচ্ছে। মাঝেমধ্যে আমার মনে হয় ইমারতগুলোর প্রত্যেকটা জানালা তার। আর অন্য সময় ভাবি এর কোনোটাই তার ঘরের জানালা নয়। সেখানে শুধু সাধারণভাবে অনেক জানালা ঝুলে আছে।

[হারুকি মুরাকামি : জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামির জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে। তাঁর গল্প, উপন্যাস প্রায় পঞ্চাশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। উত্তর আধুনিক সাহিত্যে তাঁকে অন্যতম লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি World Fantasy Award (২০০৬), Franz Kafka Prize (২০০৬), Jerusalem Prize (২০০৯)-এ ভূষিত হয়েছেন। বলা হয় যে, তাঁর রচনায় সহজে প্রবেশ করা যায়, তবে পরে মনে হবে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে জটিল। তাঁর অধিকাংশ রচনা উত্তমপুরুষে লেখা। তিনি মনে করেন, তৃতীয় পুরুষে লেখা রচনা অনেকটা ওপর থেকে নিচে দেখার মতো। একই লেভেলে না থাকলে ঠিক অনুভব করা যায় না। উলেস্নখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে, Norwegian Wood (1987), Kafka on the Shore (2002), IQ84 (2009), The Wind-up Bird Chronicle (1994)। গল্পগ্রন্থ After the Quake। জাপানি পরিচালক Kazuki Omori ১৯৮১ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস Hear the Wind Sing (1979)-এর কাহিনি অবলম্বনে ছবি নির্মাণ করেন। তাঁর বেশকিছু গল্পের স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মিত হয়েছে। ‘একটি জানালা’ গল্পটি মুরাকামির গল্পগ্রন্থ The Elephant Vanishes-এ অন্তর্ভুক্ত Jay Rubin কর্তৃক মূল জাপানি ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত গল্প ‘A Window’-র বাংলা
অনুবাদ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: