এডওয়ার্ড সাঈদ ও এলিজি মাহমুদ দারবিশের একটি কবিতার অন্তরঙ্গ পাঠ মাসুদুজ্জামান এডওয়ার্ড সাঈদ : পরম্পরিত সাংঘর্ষিক পাঠ

লেখক: মাহমুদ দারবিশ

 

তিরিশ বছর আগে,

সময় তখন এতটা বন্য ছিল না …

আমরা দুজনেই বলছিলাম :

অতীত শুধুই যদি হয় এক অভিজ্ঞতা,

ভবিষ্যতের নির্মাণ তাহলে অর্থপূর্ণ হবে, হবে বীক্ষণ।

সবাই চলো,

সবাই চলো ঘাসের অলৌকিকতা আর কল্পনার সারল্যকে

বিশ্বাস করে আগামীর দিকে এগিয়ে যাই/

 

মনে করতে পারছি না দুজনে সিনেমা দেখতে গেছিলাম কিনা

সন্ধ্যায়। এখনো আমার কানে বাজে

বুড়ো প্রাচীন ইন্ডিয়ানরা হেঁকে চলেছেন : বিশ্বাস

করো না ঘোড়া অথবা আধুনিকতাকে

 

না। ফাঁসি হতে চলেছে যে-মানুষটির

সে কখনো যে ফাঁসি দিচ্ছে, তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারে না :

আমিই কি তুমি? আমার তরবারি কি আমার নাকের চাইতে বড় ছিল,

তুমি কী জিজ্ঞেস করবে

আমি তোমার মতো আচরণ করেছিলাম কিনা?

এরকম একটা প্রশ্ন এক ঔপন্যাসিকের কৌতূহলকে

প্ররোচিত করেছিল,

কাচের অফিসে তিনি বসে আছেন, বাগানের লিলি তার

নজরেই আসছে না, যেখানে

কল্পনার বাহু বিবেকবোধের চাইতেও

স্পষ্ট

ঔপন্যাসিক এরকম একটা কিছু লিখতে চাইছিলেন

মানবিক প্রবৃত্তি নিয়ে … গতকালের মধ্যে

কোনো আগামীকাল নেই, তাহলে সবাই এসো

সামনের দিকে অগ্রসর হই/

 

সামনের দিকে এভাবে এগিয়ে চলা

বর্বরতার দিকে যাওয়ার

সেতু হয়ে উঠতে পারে …/

 

নিউইয়র্ক। অলস এক ভোরে এডওয়ার্ড

ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙে উঠলেন। তিনি বাজালেন

মোৎসার্ট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের টেনিস কোর্টে কিছুক্ষণ

দৌড়ালেন।

সীমানা ছাড়ানো

 

ভাব ও চিন্তার মধ্যে পরিভ্রমণ করতে করতে ছাড়িয়ে গেলেন

একের পর এক সীমান্ত,

অতিক্রম করে গেলেন সব বাধা। তিনি পড়তেন নিউইয়র্ক  

                                                      টাইমস

লিখতেন মন্তব্যধর্মী জ্বালাময়ী নানান লেখা। প্রাচ্যবাদীদের কষে সমালোচনা করতেন জেনারেলদের দুর্বলতা ধরিয়ে দিয়ে তাদের

দিকনির্দেশনা দিতেন,

প্রাচ্যের নারীর হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হতে শিখিয়েছেন। তিনি গোসল

সারলেন।

 

পছন্দমাফিক বেছে নিলেন অভিজাত স্যুট। চুমুক দিলেন তার সফেদ কফিতে। ভোরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন :

ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িও না।

 

বাতাসের মাঝে তিনি হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আর বাতাসের

মধ্যেই নিজেকে চিনেছেন তিনি। বাতাসের কোনো ছাদ নেই,

কোনো ঘরবাড়ি নেই বাতাসের। বাতাস হচ্ছে কম্পাস

উত্তর দিক থেকে আসা অপরিচিত মানুষের।

তিনি বললেন : সেখান থেকেই আমি এসেছি, এখান থেকেও,

কিন্তু আমি সেখানকার নই, নই এখানকারও।

আমার আছে দুটি নাম যারা একবার মিলেমিশে যায় আরেকবার

বিচ্ছিন্ন …

আমার আছে দুই ভাষা, কিন্তু সেই কবে ভুলে গেছি

আমার স্বপ্নের ভাষা সত্যি সত্যি কোনটি।

আমার আছে এক ইংরেজি ভাষা, লেখার জন্য,

তাই দিয়ে সৃষ্টি করে চলেছি কথামালা,

আর আছে সেই ভাষা যা দিয়ে স্বর্গ আর জেরুজালেমের মধ্যে

আলাপন চলে, রুপোলি ছান্দোলয়ে,

কিন্তু সেই ভাষা আমার নিজের ভাবনাকে জাগিয়ে তোলে না।

 

আত্মপরিচয় সম্পর্কে কী বলবেন? আমি জিজ্ঞেস করি।

তিনি বলছিলেন : এ একধরনের আত্মরক্ষা …

আত্মপরিচয় হচ্ছে জন্মের শিশু, কিন্তু

পরিশেষে, এটা আত্ম-আবিষ্কার, তবে অতীতের

উত্তরাধিকার টেনে টেনে চলা নয়। আমি বহু, অসংখ্য …

আমার ভেতরে সবসময় তৈরি হয় নতুন আরেক বহির্দেশ। এবং

যারা দুর্ভোগের শিকার আমি তাদের সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলি। আমিও কী সেখান থেকেই আসিনি,

সেখানকার উপমার হরিণকে লালন-পালন করবার জন্যে আমার হৃদয়কে আমি প্রশিক্ষিত করে নিয়েছি …

উলে যেখানেই তুমি যাও, নিজের স্বদেশকে সঙ্গে নিয়ে যাও, আর যদি প্রয়োজন পড়ে আত্মমুগ্ধ হতে পার/

 

বাইরের বিশ্ব এক নির্বাসন,

নিজের ভেতরেও আছে নির্বাসিত বিশ্ব।

আর এই দুইয়ের কোনখানে তোমার অধিষ্ঠান?

আমার কথা যদি বলো, বলব – জানি না

ফলে একে হারাবার কোনো ভয় আমার নেই। আমি তা-ই যা আমি।

আমিই আমার অন্য, এক দ্বিত্ব

কথা আর অঙ্গভঙ্গির মধ্যে অনুরণন সৃষ্টি করে চলেছি।

যদি আমি কবিতা লিখতে পারতাম তাহলে বলতাম :

একের মধ্যে দুই আমি,

দুই পুচ্ছবিশিষ্ট পাখির ডানার মতো,

বসন্ত যখন বিলম্বে আসে

আমি তখন বয়ে আনি শুভসংকেত।

 

একটি দেশকে তিনি ভালোবাসতেন আর সেই দেশটিকে ছেড়েও এসেছিলেন।

[অসম্ভব কি সত্যিই সুদূর?]

অজানা সবকিছুকে ছেড়ে আসতেই ভালোবাসতেন তিনি।

সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিতে স্বাধীনভাবে পরিভ্রমণের জন্যে

যারা মানবতার মর্মোদ্ধার করে চলেছেন

একটা জায়গাতেই যাতে সবাই বসতে পারেন সেরকম পরিসর

খোঁজেন …

এখান থেকেই প্রান্ত এগিয়ে চলে। অথবা বলা যায় কেন্দ্র

যায় পিছিয়ে। পুব এখানে কেবল আঁটসাঁট গণ্ডিতে বাঁধা পুব নয়,

অথবা পশ্চিম নয় সুকঠিন আঁটসাঁট পশ্চিম,

এখানে আত্মপরিচয় বহুত্বের মধ্য দিয়ে মুক্ত, প্রসারিত,

এ নয় কোনো দুর্গ অথবা পরিখা/

 

উপমারূপক তখন নদীতীরে ঘুমাচ্ছিল;

পরিবেশ দূষণের জন্যে নয়

এক তীর অন্য তীরকে আলিঙ্গনে বাঁধবার জন্য।

 

– আপনি কি কোনো উপন্যাস লিখেছেন?

চেষ্টা করেছি … চেষ্টা করেছি কীভাবে ফিরে পাওয়া যায়

দূররমণীকুলের আয়না থেকে নিজের প্রতিকৃতি।

কিন্তু তারা সুরক্ষিত রাত্রির মধ্যে ভোঁ-দৌড় দিয়ে ঢুকে পড়েছে।

যেতে যেতে বলে গেছে :  যে-কোনো লেখাতেই হোক আমাদের পৃথিবী স্বাধীন।

এক পুরুষ আরেক নারীকে লিখতে পারে না যে-কিনা একই সঙ্গে প্রচ্ছন্ন আর স্বপ্ন।

এক নারী আরেক পুরুষকে লিখতে পারে না যে-কিনা একই সঙ্গে প্রতীক আর নক্ষত্র।

এমন দুটো ভালোবাসা পাওয়া যাবে না যা একরকম। একরকম নয়

কোনো দুই রাত। তাহলে এসো মানুষের ভালো গুণাবলির একটা তালিকা করি

আর হাসি।

 

– তাহলে আপনি আর কী করতেন?

 

আমি আমার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে হাসাহাসি করতাম

আর ময়লা ঝুড়ির মধ্যে উপন্যাসটিকে

ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম/

 

বৌদ্ধিক নিয়ন্ত্রণের কথা ঔপন্যাসিক বলতে পারতেন

আর দার্শনিক ব্যাখ্যা করে দেখাতে পারতেন চারণকবির গোলাপগুলোর/

 

একটি দেশকে তিনি ভালোবাসতেন আর সে-দেশটিকে ছেড়েও এসেছিলেন তিনি :

আমি যা আমি তাই-ই আর এরকমই থাকব।

আমি কোথায় থাকব নিজেই তা ঠিক করব।

বেছে নেব নির্বাসনের স্থান। আমার নির্বাসন, মহাকাব্যিক

দৃশ্যের মতো। পক্ষ নিই

কবির প্রয়োজনে লাগা স্মৃতি আর আগামীকালের,

আমি বৃক্ষপ্রিয় পাখির জন্যে দেশ ও নির্বাসনকে

সমর্থন করি,

আর একটি চাঁদ, প্রেমের কবিতা লেখার রসদ জোগানোর জন্য

যথেষ্ট ঝলোমলো;

আমি সেই ধারণার পক্ষ অবলম্বন করি যা পার্টিবাজির কারণে

তছনছ হয়ে গেছে

পক্ষ অবলম্বন করি একটি দেশের যা পুরাণের দ্বারা ছিনতাই হয়ে

গেছে।

 

– তুমি কি আসলে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারবে?

পেছনে যা ফেলে এসেছি আমার আগামী তাই টেনে তুলছে আর বেশ

দ্রম্নতই …

বালির ওপর হিজিবিজি লেখার জন্য আমার ঘড়িতে

কোনো সময় অবশিষ্ট নেই। আগন্তুকের মতো যদিও আমি গতকাল

ঘুরে আসতে পারি যখন তারা

কোনো এক বিষাদিত সন্ধ্যায় গ্রাম্যগাথা শুনছে :

‘মেঘের কান্না দিয়ে,

‘বসন্তে বালিকা তার কলসি ভরে নিচ্ছে,
‘কাঁদছে আর মৌমাছির মতো হাসছে

‘হৃদয় তার ছিঁড়ে যাচ্ছে …

‘এ কী প্রেম যার জন্যে পানিও ব্যথাতুর

‘অথবা অশ্রম্নবাষ্পে কিছুটা অসুখ …’

[গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত]

 

– তাহলে, নস্টালজিয়া আপনাকে স্পর্শ করতে পারে?

নস্টালজিয়া আরো উঁচু, আরো দূর আগামীকাল,

আরো অনেক দূরত্ব। আমার স্বপ্ন আমার পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ করে।

আর আমার দৃষ্টি আমার স্বপ্নকে স্থান করে দেয়

আমার হাঁটুর কাছে

পোষা বেড়ালের মতো। এটাই কল্পিত বাস্তব,

ইচ্ছার শিশু : আমরা গোলকধাঁধার সম্ভাব্যতাকে বদলে ফেলতে

পারি।

 

– আর গতকালের জন্যে কোনো নস্টালজিয়া?

বুদ্ধিজীবীর কোনো জোলো আবেগ থাকা মানায় না, যদি কিনা

তা অচেনা মানুষকে বিমূঢ় করে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত না হয়

আর তাকে অগ্রাহ্য করে।

আমার নস্টালজিয়া একধরনের সংগ্রাম

বর্তমানকে ছাড়িয়ে

ভবিষ্যপ্রসারী।

 

– তুমি কী নিঃশব্দে গতকালের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলে যখন

সেই বাড়িতে গিয়েছিলে, তোমার বাড়িতে

তালবিয়ায়, জেরুজালেমে?

বাবাকে ভয় পাওয়া একটি শিশুর মতো

আমি আমার মায়ের বিছানায় ঘুমোবার

আয়োজন করছিলাম। আমি

মনে করতে চেষ্টা করেছিলাম আমার জন্মের কথা, আর

আমাদের পুরনো বাড়ির ছাদের ওপর থেকে দেখতে চেষ্টা

করেছিলাম

সেই ছায়াপথ।

চাইছিলাম অনুপস্থিতির গায়ে চিমটি কেটে

গ্রীষ্মের বাগানের জেসমিন ফুলের

গন্ধ নিতে। কিন্তু হায় না, এটা সত্যি,

চোরের মতো আমাকে তাড়া করে নস্টালজিয়ার কাছ থেকে সরিয়ে

দিলো।

– তুমি কি ভয় পেয়েছিলে? কিসে তুমি ভয় পেয়েছিলে?

হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর আমি মুখোমুখি হতে

পারছিলাম না। দরোজার কাছে একটা ভিক্ষুকের মতো দাঁড়িয়েছিলাম।

আমার বিছানায় যেসব অচেনা মানুষ শুয়ে আছে কী করে তাদের

কাছে আমি

ভেতরে ঢোকার অনুমতি চাই … কী করে বলি পাঁচ মিনিটের জন্যে

আমি কি ঢুকতে পারি? ছেলেবেলার স্বপ্নে দেখা প্রতিবেশীদের কাছে কি আমার শ্রদ্ধায় আনত হওয়া উচিত? তারা কি আমাকে জিজ্ঞেস করে বসবে :

কে হে তুমি কৌতূহলী বিদেশি ভ্রমণকারী? আর কী করেইবা আমি

যারা যুদ্ধে আক্রমণের শিকার হয়েছে, আক্রান্তদের দ্বারা আক্রান্ত

হয়েছে,

তাদের কাছে যুদ্ধ ও শান্তির কথা বলি,

কোনো কিছু যোগ করা ছাড়াই, মন্তব্য ছাড়াই?

তারা কী তাহলে আমাকে বলবে : এক শোবার ঘরে

দুই স্বপ্নের কোনো ঠাঁই নেই?

 

এভাবেই আমি নই কিংবা তিনি

কে জিজ্ঞেস করেছিল; হয়তো পাঠক প্রশ্ন করেছিল :

চরম দুঃসময়ে কবিতা কী বলতে পারে?

 

রক্ত

আর রক্ত,

রক্ত

তোমার দেশে,

আমার নামে এবং তোমার নামে,

কাঠবাদামের ফুলে, কলার গায়ে

শিশুর দুধে, আলো আর ছায়ায়,

গমের দানায়, নুনে/

 

দক্ষ খুনি, সর্বোচ্চ কুশলতার সঙ্গে

লক্ষ্যবস্তু  ভেদ করে চলেছে।

রক্ত

এবং রক্ত

এবং রক্ত।

এই ভূমি এর শিশুদের রক্তের তুলনায় খুবই ছোট

বলি হওয়ার জন্যে সর্বনাশের সীমায় দাঁড়িয়ে আছে। এই ভূমি

সত্যিকার অর্থেই সৌভাগ্যে পরিস্নাত,

অথবা বলা যায় দীক্ষিত

রক্তে,

এবং রক্তে

এবং রক্তে

যা প্রার্থনায় নয় অথবা বালি কখনো শুকাতে পারে।

পবিত্র গ্রন্থে সেভাবে বিচারের কথা লেখা নেই, যেভাবে লেখা থাকলে

শহিদ হওয়া মানুষেরা স্বাধীনতার জন্য উল্লাস করতে পারত

হেঁটে যেতে পারত মেঘের দিকে। দিনের আলোয় রক্ত,

অন্ধকারে রক্ত। কথায় রক্ত।

 

তিনি বললেন : যা হারিয়ে গেছে কবিতা তাকে

আতিথ্য দিতে পারে, সুতোর মতো আলোর রেখা জ্বলজ্বল করছে

একটা গিটারের হৃৎপিণ্ড; অথবা যিশুখ্রিষ্ট

একটা ঘোড়ার পিঠে চড়ে রূপকালঙ্কার ভেদ করে ছুটে চলেছেন। লক্ষ্য

নন্দনতত্ত্ব কিন্তু তার উপস্থিতি বাস্তবের

আঙ্গিকে/

আকাশহীন এক পৃথিবীতে, পৃথিবী

পরিণত হয়েছে এক গোলকধাঁধায়। কবিতা

একধরনের সান্তবনা, বাতাসের

 

এক ঝাপট, উত্তরের অথবা দক্ষিণের।

বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই ক্যামেরা তোমার ক্ষত

কীভাবে দেখে। এমনভাবে আর্তনাদ করো যেন তুমি নিজেই

শুনছো,

আর্তনাদ করো যাতে জানতে পারো তুমি এখনো বেঁচে আছো,

এবং বেঁচে আছো, জীবন

পৃথিবীতেই সম্ভব। বলার জন্য আশাকে আবিষ্কার করো,

আবিষ্কার করো চলার নিশানা, মরীচিকাকে প্রসারিত করো অপার

আশায়।

এবং গান গাও, নান্দনিকতার জন্যই আমাদের স্বাধীনতা/

 

আমি বললাম; জীবনকে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না

মৃত্যু যদি জীবন না হয়ে ওঠে।

 

তিনি বললেন : আমরা বাঁচব।

এসো আমরা তাহলে শব্দের ওপর প্রভুত্ব করি, যে-শব্দ

তার পাঠককে মৃত্যুঞ্জয়ী করে রাখে – তোমার বন্ধু

রিতসস এরকমই বলেছিলেন।

 

তিনি আরো বললেন : আমি যদি তোমার আগে মরি,

আমার এই ইচ্ছা পূর্ণ হওয়া অসম্ভব।

আমি জিজ্ঞেস করলাম : অসম্ভব কি খুব দূরে সরে গেছে?

তিনি বললেন : এক প্রজন্ম দূরে।

আমি বলি : আর আমি যদি আপনার আগে মরি?

তিনি বললেন : গালিলি পাহাড়ে গিয়ে আমার শোকপ্রকাশ করে

আসব,

আর লিখে রাখব, ‘নন্দনতত্ত্বের কাছে পৌঁছানোই স্থিরতা অর্জন।’ আর এখন

ভুলে যেও না; আমি যদি আপনার আগে মরি, এ আমার এক অসম্ভব ইচ্ছে।

 

শেষবার আমি যখন নতুন সদোমে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি,

দুই হাজার দুই সালে, তিনি তখন ব্যাবেলের মানুষের পক্ষে যুদ্ধ করা থেকে বিরত ছিলেন …

আর ক্যানসার। তিনি শেষ মহাকাব্যের মহানায়কের মতো

ট্রয়ের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করে চলেছেন

অন্যদের নিজের ন্যারেটিভের ভাগ দেওয়ার জন্যে।

 

একটি ঈগল উঁচু থেকে আরো উঁচুতে চক্রাকারে উঠে যাচ্ছে

তার উচ্চতাকে জানাচ্ছে অভিবাদন,

অলিম্পাসে বসতিগড়া

কিংবা আরো উঁচুতে

সত্যিই ক্লান্তিকর।

 

বিদায় অভিবাদন,

বিদায় অভিবাদন, কবিতার বেদনাকে।

[অনুবাদ : মাসুদুজ্জামান]

 

ওপরে, এই লেখার শুরুতেই প্যালেস্টাইনি কবি মাহমুদ দারবিশের লেখা ‘এডওয়ার্ড সাঈদ : পরম্পরিত সাংঘর্ষিক পাঠ’ শীর্ষক যে অনূদিত কবিতাটি দেওয়া হলো, সেই কবিতাটি নিয়ে এই লেখা।

 

১. কবি ও সমালোচকের পরম্পরিত সাংঘর্ষিক বন্ধুতা

সাঈদ ও দারবিশ, রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত এক ভূখ- প্যালেস্টাইনের দুই বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব। দুজনেই আজ মৃত। প্রথমজন ‘প্রাচ্যবাদ’ খ্যাত বিশ শতকের প্রধান ভাবুক, অন্যজন ওই শতকেরই আরবি ভাষার আরেক বিশ্বখ্যাত কবি। এঁদের পরিচিতি দিতে গিয়ে ‘ব্যক্তিত্ব’ কথাটা লেখার আগে, অন্যদের পরিচিতি দিতে গিয়ে যেমন হয়, আরেকটি শব্দ মাথায় এসেছিল আমার – ‘নাগরিক’। বাক্যটি লিখতে চেয়েছিলাম এভাবে : ‘সাঈদ ও দারবিশ, রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত এক ভূখ- প্যালেস্টাইনের দুই বিশ্বখ্যাত নাগরিক। কিন্তু নাগরিক বলতে গেলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকতে হয়, যার আছে স্বশাসনের অধিকার, সার্বভৌমত্ব, অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। কিন্তু প্যালেস্টাইন বলে এরকম কোনো রাষ্ট্র আজো প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি – পশ্চিমি আধিপত্য ও গভীর ষড়যন্ত্রের কারণে। আদি প্যালেস্টাইন ভূখ-কে সাম্রাজ্যবাদীরা ইসরায়েল নাম দিয়ে রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র আজো প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়নি। ইসরায়েলের মানচিত্রের বাইরে যে-জায়গাটুকু আছে, তাও ইসরায়েল নানাভাবে পদানত করে রেখেছে, প্যালেস্টাইনিদের ওপর চালাচ্ছে নির্মম হামলা। নাগরিক কথাটা কী তাই এই দুজনের পরিচিতির বেলায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না?

সাঈদ ও দারবিশ দুজনেই তাই নির্বাসিত জীবন বেছে নিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী ইয়োরো-মার্কিন-জায়নবাদী শক্তি এভাবেই পা্যলেস্টাইনিদের অধিকার খর্ব করে চলেছে, তাদের জীবনকে বিপন্ন করে রেখেছে। শুধু প্যালেস্টাইনিদের ওপর হামলা নয়, প্রতিবেশী লেবানন, যেখানে স্তিনের হাজার হাজার মানুষ দিনের পর দিন রাষ্ট্রপরিচয়হীন, আত্মপরিচয়হীন উদ্বাস্ত্ত জীবনযাপন করছে, সেখানেও তারা হামলা করে চলেছে বারবার।

এরকমই একবার, ২০০১ সালে ইসরায়েল লেবাননের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালালে সাঈদ দারবিশের একটি কবিতা উদ্ধৃত করে ‘ইসরায়েলের কানাগলি’ শিরোনামে একটা রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখেছিলেন। দারবিশের কবিতাটা ছিল এরকম : ‘পৃথিবীর মাটি আমাদের কাছাকাছি চলে আসছে,/ আমাদের ঠেলে দিচ্ছে সর্বশেষ সুড়ঙ্গ দিয়ে পার হতে গিয়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে আমাদের শরীর,/ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। সর্বশেষ যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে কোথায় যাব আমরা?/ সর্বশেষ আকাশের পরে পাখিরা কোথায় কেমন করে উড়বে?’ লিখেছিলেন ১৯৮২ সালে ইসরায়েলি আক্রমণে প্যালেস্টাইনি মুক্তিবাহিনী (পিএলও) লেবানন থেকে সরে এলে। সাঈদ যদি বেঁচে থাকতেন, বলা নিষ্প্রয়োজন, ২০০৬ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান আবার যখন লেবাননের ওপর নির্বিচারে বোমা হামলা চালিয়েছিল, কিংবা সাম্প্রতিককালে গাজা ও পশ্চিম তীরের প্যালেস্টাইনিদের ওপর যে জঘন্য হামলা চালানো হয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অসংখ্য পাঠকের উদ্দেশে বিশেস্নষণধর্মী রাজনৈতিক লেখা লিখতেন।

সাঈদ জীবিত নেই, ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বপাঠকের উদ্দেশে রাজনৈতিক ভাষ্য লেখারও তেমন কেউ নেই আজ। নেই সাঈদের বন্ধু দারবিশও। কিন্তু যতদিন সক্রিয় ছিলেন, প্যালেস্টাইনিদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে লিখেছেন কবিতা। লেবাননের ওপর ২০০৬ সালে ইসরায়েল হামলা চালালে ‘দিনলিপি’ শিরোনামে তাঁর নিজের সম্পাদিত আরবি ভাষায় প্রকাশিত আল-কারমেল সাহিত্য পত্রিকায় একটি ধারাবাহিক গদ্যকবিতা লিখেছিলেন তিনি। এই কবিতায়, সাহিত্য-সমালোচকদের মতে, দারবিশ ঐতিহ্যবাহী আরবি শোককবিতা নিয়ে একধরনের চমৎকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা আরবি শোককবিতার প্রকরণকে তো বটেই, আধুনিক কবিতার ধারাকেও ভিন্নমাত্রায় উন্নীত করেছে।

আরবি শোককবিতা সাধারণত ‘মর্সিয়া’ নামে খ্যাত। বাংলা ভাষায়ও মর্সিয়া সাহিত্য নামে একধরনের কবিতার অস্তিত্ব রয়েছে, এই শোককবিতা যে আরবি কবিতার ধারাতেই বাংলা কবিতায় স্থান করে নিয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা ভাষায় এই মর্সিয়া কবিতা রচনার জন্য খ্যাতিমান হয়ে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম। দারবিশও মর্সিয়া নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ‘দিনলিপির পঞ্চম গদ্যকবিতায় বৈরুতে আক্রান্ত মানুষের মাঝে তাঁর নিজের ছিন্নভিন্ন শরীর পড়ে আছে বলে কল্পনা করে লিখেছেন :

আমার শরীর থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, ক্ষতবিক্ষত হাত দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া নাড়িভুঁড়ি বের হওয়া পেটটাকে চেপে ধরার চেষ্টা করছি, কত যে শরীর … মাটি, আকাশ, সমুদ্র আর ভাষার দ্বারা আমি অবরুদ্ধ। বৈরুত বিমানবন্দর থেকে বিমান উড়ছে আর আমাকে টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে দিয়েছে, কীভাবে আমার মৃত্যু হয় তার শেষ দৃশ্য দেখার জন্যে, লক্ষ লক্ষ দর্শক … আমি জানি না এখন আমি কোথায় : টেলিভিশনের সামনে, অথবা টেলিভিশনের ভেতরে। হৃদয়ের কথা যদি বলি, দেখতে পাচ্ছি তা গড়িয়ে চলেছে, পাইনের গুঁড়িয়ে মতো লেবাননের পর্বত থেকে গাজায়।

[হুদা ফাখরেদ্দিনের ইংরেজি থেকে লেখকের করা বাংলা অনুবাদ]

কবিতাটি, লক্ষণীয়, অর্থের দিক থেকে বহুমাত্রিক। এটি একটি এলিজি, তবে আত্মজৈবনিকতাকে ছাড়িয়ে কবিতাটি সমগ্র প্যালেস্টাইনি ও লেবাননি জনগোষ্ঠীর অবরুদ্ধ অবস্থাকে ব্যক্ত করছে। সবদিক থেকে ওই ভূখ–র মানুষ আজ অবরুদ্ধ, নির্বিচারে তাদের যেমন হত্যা করা হচ্ছে, তেমনি মাটি মানে স্বদেশভূমি, আকাশ মানে স্বাধীনতা, সমুদ্র মানে বিসত্মার, আর ভাষার দ্বারা অবরুদ্ধ মানে প্যালেস্টাইনিরা দিনের পর দিন নিজেদের স্বাধীনতার কথা বলে গেলেও কেউ তাতে কান দিচ্ছে না। সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা গণমাধ্যম, বিশেষ করে টেলিভিশন আজ নিয়ন্ত্রিত। এদিকে হৃদয় গড়িয়ে চলেছে লেবানন থেকে গাজায়, কোনো স্থিতি নেই, আশা নেই।

লেবাননের মানুষ যারা ইসরায়েলের বোমা হামলায় জীবন দিয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, আত্ম-এলিজির ভঙ্গিতে লেখা এই কবিতায় দারবিশ তাদের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আত্মমুদ্রা খচিত করে দিয়েছেন। বিস্ময়কর হলো, এভাবে আত্মমুদ্রা খচিত করে এলিজি রচনার রীতি দারবিশ সূচনা করেছিলেন বিশ শতকের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক-ভাবুক এডওয়ার্ড সাঈদকে অবলম্বন করে। সাঈদের উদ্দেশে রচিত এই কবিতাটির শিরোনাম হচ্ছে, ‘এডওয়ার্ড সাঈদ : পরম্পরিত সাংঘর্ষিক পাঠ’। কবিতাটি প্রকরণের দিক থেকে শোককবিতা বা এলিজি। লিউকিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২০০৩ সালে সাঈদ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই কবিতার মধ্য দিয়েই দারবিশ তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু, বিশ্বজননন্দিত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। কবিতাটি তাই রাজনৈতিক ও শৈল্পিক উভয় দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বকবিতায় এতদিন ধরে যে-ধরনের শোককবিতার ধারা প্রচলিত ছিল, দারবিশ তাতে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা। সম্পূর্ণ নতুন অভিনব এক প্রকরণরীতি অবলম্বন করে এই কবিতাটি তিনি রচনা করেছেন। কবিতাটির প্রকরণশৈলীতে একই সঙ্গে এসে মিশে গেছে প্রতিবাদী কবিতা, রাজনৈতিক ইশতেহার, প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি, সাক্ষাৎকারের ভঙ্গি, স্মৃতি, শ্রদ্ধাবোধ, রাজনৈতিক মতাদর্শ, পরাবাস্তববাদ ইত্যাদি। কবিতাটির অনন্যতা মূলত এখানে যে, দারবিশ এতে সাঈদের রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে যেমন মন্তব্য করেছেন, তেমনি এর শৈলীতে তার বিশ্বখ্যাত প্রাচ্যবাদ ও সমালোচনা পদ্ধতিও চমৎকার ব্যবহার করেছেন। সাঈদের সমালোচনা পদ্ধতির একটি রীতি ছিল ‘বিমিশ্রণ’ রীতি, নির্বাসিত জীবনের অভিজ্ঞতা – যে-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দুজনেই জীবনযাপন করেছেন; সাঈদ প্রতীচ্যের মধ্যে মিশে গিয়েও প্রাচ্যবাদের বৌদ্ধিক রাজনৈতিক অবস্থানকে তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন; দারবিশ লিখে গেছেন শিল্পসম্মত প্রতিবাদী চমৎকার কবিতা।

প্রাথমিকভাবে সাঈদের স্মৃতির উদ্দেশে রচিত কবিতাটি মর্সিয়া বা শোককবিতা, আরবি কবিতার ঐতিহ্যের অংশ। ইসলামপূর্ব কাল থেকে আরবি ভাষায় মর্সিয়া রচিত হয়ে আসছে। দারবিশ এই ঐতিহ্যকে স্বীকরণ করে কবিতাটি রচনা করেছেন, কিন্তু তাঁর সৃজনীপ্রতিভার গুণে এটি হয়ে উঠেছে নতুন এক উদ্ভাবন। টিএস এলিয়ট যেমন বলেছিলেন, দারবিশও সেভাবে ঐতিহ্যকে নবায়িত করে নিয়ে আত্মবৈশিষ্ট্যে কবিতাটিকে অনন্য করে তুলেছেন। এই কবিতার মধ্য দিয়ে দারবিশ এভাবেই জন্ম দিলেন নতুন একধরনের এলিজির। মূল আরবিতে লেখা কবিতাটি দারবিশ প্রথম পাঠ করেন ২০০৪ সালের জুলাই মাসে জর্ডানের ‘জেরাশ কবিতা সম্মেলনে’। পরে প্রথম মুদ্রিত হয় ২০০৪ সালের ১০ আগস্ট লন্ডনভিত্তিক লেবাননি পত্রিকা আল-হায়াতে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে এটি পুনর্মুদ্রিত হয় কায়রোর আল-আরাবি এবং অন্যান্য আরবি পত্রিকায়। এটি ইংরেজিতে চমৎকার অনুবাদ করেছেন মোনা আনিস। এই অনুবাদ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মিশরের ইংরেজি পত্রিকা আল-আহরাম সাপ্তাহিকীতে। এর পরপরই কবিতাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাঠকদের দৃষ্টিতে আসে। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে এর ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয় লা মদে দিপেস্নামেতিকে। অনুবাদ করেছেন দারবিশের কবিতার প্রখ্যাত ফরাসি অনুবাদক ইলিয়াস স্যঁবর।

কবিতাটি এভাবে শুধু বিশ্বজনীন হয়ে ওঠেনি, এর প্রকরণরীতিটিও মিশ্র ধাঁচের। দারবিশ এমন একজনকে নিয়ে কবিতাটি লিখেছেন, যিনি নিজেও ছিলেন বিশ্বভাবুক। সাঈদ মার্কিন শিক্ষাদীক্ষায় যেমন বেড়ে উঠেছেন, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে বৌদ্ধিক আলোচনা করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছেন। সাঈদ অসংখ্যবার উলেস্নখ করেছেন, তাঁর ভাবনার প্রাথমিক উদ্বোধন ঘটেছিল পশ্চিমি সাহিত্য-সমালোচনার হাত ধরে, পরে মধ্যজীবনে ‘পুনরায় শিক্ষিত’ হয়ে ওঠেন কিছুকাল বৈরুতে থাকাকালে আরবি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনার মধ্য দিয়ে [দ্রষ্টব্য সাঈদের লেখার গ্রন্থ : শেষ আকাশের পর : প্যালেস্টাইনি জীবন]। প্রায় চলিস্নশ বছরের ভাবুক জীবনে সাঈদ তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ডিসকোর্সের পাশাপাশি নানা ধরনের গদ্য লেখালেখি এবং প্রকরণ – যেমন স্মৃতিকথা,
সাহিত্য-সমালোচনা, আলোকচিত্রের বিশেস্নষণ, সংগীত, চলচ্চিত্র ও নৃত্যের বিষয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। দারবিশও সাঈদের বহুমাত্রিক জ্যঁর বা প্রকরণের ঢংয়ে যুক্তি-প্রযুক্তির মিশ্রণ (counterpoint) রীতিতে লিখেছেন ওই কবিতাটি – ‘এডওয়ার্ড সাঈদ : পরম্পরিত সাংঘর্ষিক পাঠ’।

সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদ (১৯৯৩) গ্রন্থে সাঈদ লিখেছেন, এই সাংঘর্ষিক বিমিশ্রিত রীতির (contrapuntal method) মাধ্যমেই পাশ্চাত্যের আধিপত্যবাদী ডিসকোর্স কীভাবে প্রাচ্যের ইতিহাস নির্মাণ করেছে, তার স্বরূপ উন্মোচন করা যাবে। সাহিত্যের সঙ্গে সংগীতের বহুস্বরের (polyphony) তুলনা করে সাঈদ বলেছেন, কোনো ধরনের উঁচুনিচু অবস্থানে স্থাপিত না করে পশ্চিমের ধ্রম্নপদি সংগীত বিভিন্ন বিষয়কে (theme) পাশাপাশি স্থান দেয়। বিমিশ্রিত সাংঘর্ষিক রীতিটিও হচ্ছে ঠিক সেই ধরনের রীতি, যেখানে চলে বিভিন্ন বিষয়ের সুসংগঠিত আন্তর্খেলা (organized interplay)। সংগীতের এই পদ্ধতি সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হলে কীভাবে কোনো লেখা ‘আকার পায় এবং সম্ভবত উপনিবেশবাদের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে, প্রতিরোধে এগিয়ে আসে, সর্বোপরি দেশীয় জাতীয়তাবাদের জন্মে দেয়’, তার হদিস পাওয়া যেতে পারে। এ-ধরনের সাংঘর্ষিক রীতি সাঈদ যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, ‘জন্ম দেয় বিকল্প অথবা নতুন ন্যারেটিভের’।

[সাঈদ ১৯৯৩ : ৫১]

এই ধারণাকে (concept) আমির মুফতি উলেস্নখ করেছেন ‘স্মৃতিজাগানিয়া, নিবিড় ও বিস্মৃতিপ্রবণ’ বলে। কিন্তু এই পদ্ধতিটি সাঈদের ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ [মুফতি ২০০৫ : ১১৪]। বারবার এর কথা নিজের লেখায় এবং নানা সাক্ষাৎকারে তিনি উলেস্নখ করেছেন, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আলোচনা করেছেন, ব্যবহার করেছেন। সাঈদের স্মৃতিকথা স্থানচ্যুতি : স্মৃতিচারণা (১৯৯৯) গ্রন্থে এর উলেস্নখ যেমন আছে, তেমনি আছে তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত বিলম্বিত শৈলী প্রসঙ্গে (২০০৬) শীর্ষক সর্বশেষ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে সাঈদ বিশেস্নষণ করে দেখিয়েছেন, সংগীতের ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত সংগীতজ্ঞরা (composer) কীভাবে কোন উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষক্ষ্য সাংঘর্ষিক বিমিশ্রণ রীতি (counterpoint) ব্যবহার করেছেন। শুধু সংগীত নয়, সাঈদের মতে এই রীতিটি অন্যান্য শিল্প-সমালোচনা, বিশেষ করে সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়। মোৎসার্ট ও বাখের সংগীতচর্চার পটভূমিতে সাঈদ বলেছেন, ভাষা ও সমালোচনা সম্পর্কিত তর্কবিতর্ক ও তত্ত্ব-আলোচনা এবং যুক্তি প্রদানের সময় এই রীতিটি ব্যবহৃত হতে পারে। সংগীতের ক্ষেত্রে যেমন করা হয়, তেমনি একটি থিমের আবিষ্কার এবং সেই থিমটিকে এই সাংঘর্ষিক বিমিশ্রণ রীতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিকশিত করা যায় আর এর মাধ্যমে ওই থিমের সমস্ত সম্ভাবনাকে টেনে বের করে পাঠকের গোচরে নিয়ে আসা যায়। এর অর্থ হলো, সাঈদের ভাষায় এই পদ্ধতির মাধ্যমে যে-কোনো শিল্পের সমালোচনা ভাষাগত দিক থেকে বর্ণনা করা সহজ এবং বিসত্মৃত করা যেতে পারে।

[সাঈদ ২০০৬ : ১২৮]

সাঈদের লেখকবন্ধু দারবিশ, একইভাবে যিনি মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছিলেন, বেছে নিয়েছিলেন নির্বাসিত জীবন, কবিতা রচনার মাধ্যমে যুক্ত থেকেছেন রাজনৈতিক বৌদ্ধিক সংগ্রামে : সাঈদের ওপর কবিতা লিখতে গিয়ে অবলম্বন করেছেন এই একই রীতি। কথোপকথনের ভঙ্গিতে কবিতাটি লেখা : কবির কথা, সাঈদের কথা এবং নানা স্বর এসে এখানে মিশেছে, পাওয়া যায় নানাজনের নানা মন্তব্য, কিন্তু কারো কথাই এতে প্রধান হয়ে ওঠেনি, কোনো মন্তব্যও প্রাধান্য বিসত্মার করেনি। অর্থাৎ কবিতাটিতে কবিকথকের স্বর যেমন প্রধান নয়, তেমনি প্রধান নয় সাঈদের স্বরও; সেইসঙ্গে এতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান সাধারণ প্যালেস্টাইনিদের স্বরও এসে মিশেছে। কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে, এদের কোনো একজনের কথা বা মন্তব্য এতে প্রধান হয়ে ওঠেনি। কবিতাটি সেদিক থেকে বলতে গেলে আধিপত্যবিরোধী (antihegemonic) ভঙ্গিতে লেখা। ফলে কবির পর্যবেক্ষণ, নানাজনের নানা কথা এবং স্বরের সহাবস্থান ও বুনটে, সাঈদ যেমন বলেছেন, বিমিশ্রণরীতিতে ধ্রম্নপদি সংগীতের মতো গড়ে উঠেছে। সাঈদীয় বিমিশ্রণরীতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশেস্নষণ বা মন্তব্য করা, সাঈদ পশ্চিমের প্যালেস্টাইন-নীতি বা ইসরায়েলি আগ্রাসন সম্পর্কে তাঁর ভাবনা যুক্তিসহকারে আজীবন নানা লেখায় প্রকাশ করে গেছেন। নিজের এই মন্তব্য প্রকাশের রীতিকে তিনি ‘ভাবনার’ (ideas) ‘একটি সুসংগঠিত আন্তর্খেলা’ (an organized interplay) বলে আখ্যায়িত করেছেন। [সাঈদ, ১৯৯৩ : ৫১]। এরই সঙ্গে তিনি মনে করেছেন, যে-রক্তপাত তাঁর স্বদেশকে ঘিরে ওই অঞ্চলে ঘটে চলেছে, সম্মিলিত বহুস্বর সেই বিরাজমান রাজনৈতিক উচ্চাবচ অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আর আশাজাগানিয়ার কাজ করতে পারে।

আরবি ভাষায় সাঈদি ঘরানার সমালোচকরা যুক্তি-প্রযুক্তিময় বিমিশ্রণরীতির পারিভাষিক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘তিবাক’ (Tibaq) শব্দটি। সাঈদ তাঁর কবিতাটিও লিখেছেন ওই নামে ও পদ্ধতিতে। কবিতার আভ্যন্তর রচনাশৈলীর দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যাবে কী চমৎকারভাবে সাঈদের উদ্দেশে রচিত কবিতাটিতে দারবিশ উক্তি-প্রত্যুক্তিধর্মী বিমিশ্রণরীতিটি ব্যবহার করেছেন। রাজনৈতিক-মতাদর্শিক বন্ধুর সমালোচনারীতির প্রতি দারবিশের শ্রদ্ধা কত গভীর ছিল, সাঈদের সমালোচনা পদ্ধতি গ্রহণ করে তার প্রমাণ দিয়েছেন দারবিশ।

‘এডওয়ার্ড সাঈদ : পরম্পরিত সাংঘর্ষিক পাঠ’ শীর্ষক কবিতাটি দারবিশ রচনা করেছেন কথোপকথনের ভঙ্গিতে সংলাপের ওপর ভর করে। এই সংলাপ চালাচালি করেন কবিকথক দারবিশ ও তাঁর মৃত বন্ধু সাহিত্য-সমালোচক ও প্রাচ্যবাদখ্যাত তাত্ত্বিক সাঈদ। কবিতাটির ভাষাভঙ্গি ও গঠনশৈলীতে সাঈদের উদ্ভাবিত বিমিশ্রণ পদ্ধতি খুবই স্পষ্ট নানা প্রসঙ্গের উপস্থাপন এবং এসবের আন্তর্খেলা বা আন্তর্বুলির মধ্যে। মাঝেমধ্যে এতে আরেক কথকের স্বর শোনা যায়, যে-কবিকথক ও তার বন্ধুর সমান্তরালে দাঁড়িয়ে বর্ণনা করেন নানা প্রসঙ্গ। এসবের মাধ্যমেই উন্মোচিত হয় এই কবিতার উপজীব্য রাজনীতি। তবে নির্দ্বান্দ্বিকভাবে নয়, দারবিশ একই সঙ্গে প্যালেস্টাইনি-ইসরায়েলি দ্বন্দ্ব, আশা ও নির্মমতাকে সাংঘর্ষিক রীতিতে তুলে ধরেন, তাত্ত্বিকভাবে সাঈদেরই উদ্ভাবিত বিমিশ্রণরীতিতে।

সাঈদ তাঁর প্রাচ্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নানা লেখা, সমালোচনামূলক প্রবন্ধ-সাক্ষাৎকারে ‘অন্য’ (other) বা ‘অপর’-এর একটি তাত্ত্বিক রূপ উপস্থাপন করেছেন। এই কবিতাতেও দারবিশ নিজেকে এই অপরের পঙ্ক্তিভুক্ত বলে মনে করেছেন : ‘আমিই আমার অন্য, এক দ্বিত্ব।’ এই পৃথিবীতে ‘যারা মানবতার মর্মোদ্ধার করে চলেছেন’ আর যারা ‘একটা জায়গাতেই যাতে সবাই বসতে পারেন সেরকম পরিসর খোঁজেন’ তাদের লক্ষ করে দারবিশ এরপর লিখেছেন :

এখান থেকেই প্রান্ত এগিয়ে চলে। অথবা বলা যায় কেন্দ্র যার পিছিয়ে। পুব এখানে কেবল আঁটোসাঁটো গণ্ডিতে বাঁধা পুব নয়,

অথবা পশ্চিম নয় সুকঠিন আঁটোসাঁটো পশ্চিম,

এখানে আত্মপরিচয় বহুত্বের মধ্য দিয়ে মুক্ত, প্রসারিত,

এ নয় কোনো দুর্গ অথবা পরিখা …

এই কবিতার যে-কথক সে সাঈদের ভাষাতেই কথা বলে, কিন্তু তা অনেক বেশি তীব্র। সাঈদের ভাবনার একটি মূল সূত্র হচ্ছে প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক। তাঁর লক্ষ্য ছিল বহুত্বের সমন্বয়। এখানেও আছে সেই পরম্পরা, সাঈদ ও দারবিশ দুজনেই চেয়েছেন প্যালেস্টাইনিদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্যালেস্টাইন ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক সহাবস্থান। জাতীয়তাবাদী ও নৃকেন্দ্রিক ডিসকোর্স হিসেবে সাঈদের ভাবনাকেই দারবিশ তাঁর কবিতায় উপজীব্য করে তুলেছেন। আরো গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সাঈদ ও দারবিশ দুজনেই চেয়েছেন সাংঘর্ষিক পরম্পরিত (contrapuntal) রাজনৈতিক সমাধান। মানবিক-রাজনৈতিক এই ভাবনা, বলা বাহুল্য, সাঈদেরই; দারবিশ শুধু তাঁকে অনুসরণ করেছেন। কবিতাটিও এভাবেই রচিত। এখানে কবি ও সমালোচক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে সহমত ও ভিন্নমত প্রকাশ করতে করতে এগিয়ে চলেছেন। সাঈদের রাজনৈতিক ভাবনার মূলকথা ছিল সমন্বয়ধর্মী বহুত্বের (harmonious plurality) মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইনিদের পারস্পরিক সহাবস্থান। তিনি ছিলেন অনপেক্ষ (secular) বুদ্ধিজীবী, ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে চলিষ্ণু। দারবিশ এ-প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘তিনি বললেন : সেখান থেকেই আমি এসেছি, এখান থেকেও/ কিন্তু আমি সেখানকারও নই, নই এখানকারও।’ নিজের সঙ্গেই দারবিশের দ্বন্দ্ব, জাতীয়তাবাদী তিনি, কিন্তু তা নিয়েও দ্বিধা তাঁর। আত্মপরিচয়ের সন্ধান করছেন, সাঈদের মতো নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়েও আবার তা অগ্রাহ্য করছেন এই বলে, ‘বুদ্ধিজীবীর কোনো জোলো আবেগ থাকা মানায় না।’ কিন্তু এই কবিতায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে সংগতির ওপর। সাঈদ ও দারবিশ উভয়েই লেখক-কবি-সমালোচকরা রাজনৈতিক আন্দোলনে কীভাবে অবদান রাখতে পারেন, তার উলেস্নখ আছে। কবিতাটির প্রথমভাগ সাঈদ ও দারবিশের বৌদ্ধিক তর্ক-বিতর্কের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে। এক মহান কবি আরেক মহান ভাবুকের প্রতি যে-শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, তার তুলনা বিশ্বকবিতার ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে সাঈদ ও দারবিশের পরস্পরের প্রতি অনুরাগ ও শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টি একপক্ষীয় ছিল না, ছিল পারস্পরিক। সাঈদ ১৯৯৪ সালেই ‘মাহমুদ দারবিশ সম্বন্ধে’ শীর্ষক প্রবন্ধে অকপটে দারবিশের প্রতি এই শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটিয়ে লিখেছিলেন :

(দারবিশ) কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কৌতুকবোধ, তীব্র রাজনৈতিক স্বাধীন মতাদর্শ, বিশেষ করে পরিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক সংবেদনা স্তিনি ও আরবীয় রাজনীতির সাংঘর্ষিক অবস্থান থেকে তাকে মুক্ত রেখেছে।

[সাঈদ ১৯৯৪ : ১১২]

দুজনেই যৌথভাবে সংগ্রাম ও অবস্থান নিয়েছেন স্তিনি অবদমনের বিরুদ্ধে। সাঈদ হয়ে উঠেছিলেন ওই সংগ্রামের বৌদ্ধিক কণ্ঠস্বর, দারবিশ সৃজনশীল মুখপাত্র। রাজনৈতিকভাবে সাঈদ ও দারবিশের অবস্থানও ছিল সমধর্মী; প্যালেস্টাইনিদের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানালেও একধরনের বৌদ্ধিক সমালোচনামূলক দূরত্ব বজায় রেখে ওই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরা।

 

২. ঐতিহ্যের নবায়ন, ঐতিহ্যের রূপান্তর

অন্য অনেক আরবি কবির মতো বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আরবি কবিতার ঐতিহ্যকে প্রাথমিকভাবে স্বীকরণ এবং পরবর্তীকালে অতিক্রম করে কবিতা লিখেছেন দারবিশ, বিশেষ করে প্রথাবদ্ধ পঙ্ক্তিবিন্যাস ও ছন্দোরীতিকে অগ্রাহ্য করে স্বাধীনভাবে কবিতা লিখেছেন তিনি। আরবি প্রথাবদ্ধ কবিতা হলো ‘ক্বাসিদা’, সমসংখ্যক পর্বে বিন্যস্ত করে এই কবিতা রচনা করা হয়। এ-ধরনের কবিতা পুরোপুরি সমপার্বিক ও সমছন্দে ঘনসংবদ্ধ। আরববিশ্বে কবিতাকে উঁচুস্বরে আবৃত্তি করা হয় বলে আরবি কবিতার মূলধারাটি এরকম গঠনরূপ পেয়ে গেছে। দারবিশকে নিয়ে ১৯৯৭ সালে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন সিমোঁ বিতোঁ এবং এলিয়াস স্যঁবার। ওই তথ্যচিত্রে প্রথাবদ্ধ আরবি কবিতা থেকে দারবিশ কীভাবে সরে এসেছিলেন তার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে একটি কবিতার মাধ্যমে :

মরুভূমি কি আমি জানি না

কিন্তু আমি তার সানুদেশে শব্দের মতো অংকুরিত হয়েছি

শব্দেরা যখন কথা বলা শুরু করেছে বিদায় নিয়ে চলে এসেছি

শুধু সেই ছন্দকে ধরে রেখেছি যাকে আমি শুনি আর মান্য করি।

উলিস্নখিত কবিতায় লক্ষণীয়, দারবিশের নির্বাসিত জীবন আর কীভাবে আরবি প্রথাবদ্ধ কবিতার রীতিকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন তার ইঙ্গিত আছে। কবিতার কথক আমাদের জানাচ্ছেন মরুভূমি কী তিনি জানেন না; এখানেই বলা হলো কবির ভৌগোলিক স্থানচ্যুতির কথা। দারবিশের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর তখন তিনি ছেড়ে আসেন তাঁর নিজের শহর প্যালেস্টাইনের বিরবা নামের জায়গাটি। একই সঙ্গে এই কবিতায় তাঁর কবিসত্তা কোথায় শিকড়িত হয়ে আছে, তারও উলেস্নখ আছে; মরুভূমিতে অংকুরিত হয়েছে তাঁর কবিতার শব্দরাজি। ক্বাসিদাই তাঁর ঐতিহ্য, মরুভূমিতে বেদুইনদের মধ্যে যে-কবিতা বিকাশ লাভ করেছিল। কিন্তু ওই কবিতা ও ভূমিকে ছেড়ে চলে এসেছেন তিনি, বাধ্য হয়েছেন নির্বাসিত জীবন বেছে নিতে; তবে অনুসৃতি চলছে সেই কবিতাছন্দের।

পাশ্চাত্যের শোককবিতায় কবি পিটার স্যাক্সের ভাষায়, নিরন্তর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজের শোককে ব্যক্ত করে চলেন। [স্যাক্স ১৯৮৫]। দারবিশও এই রীতিটি অবলম্বন করে সাঈদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই কবিতাটি লিখেছেন। তবে তিনি শুধু নিজের ঐতিহ্যের প্রতি সমর্পিত না থেকে বিভিন্ন ভাষায় লেখা শোককবিতার বিভিন্ন পদ্ধতিকে আত্মীকৃত করে এলিজির নতুন ঘরানা সৃষ্টি করেছেন।
কবিতা-সমালোচক মুনির আকাশ এ-প্রসঙ্গে বলেছেন, আল কারমেল পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দারবিশ হিব্রম্ন, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় রচিত অনেক কবিতা পড়েছেন। সবসময় তাঁর লক্ষ্য ছিল ‘কী ধরনের নতুন সাহিত্য আন্দোলন হচ্ছে এবং বিশ্বসাহিত্যের গতিপ্রকৃতি কী দাঁড়াচ্ছে তার সঙ্গে যুক্ত থাকা।’ [আকাশ ২০০০ : ৩৯]। আরবি কবিতায় তাঁর অবদান, ঐতিহ্যের এই আত্মীকরণ ও অনন্যতার জন্যই উলেস্নখযোগ্য। এ-প্রসঙ্গে বিতোঁ ও স্যঁবারের তথ্যচিত্রে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দারবিশ নিজেই বলেছেন, ‘আরবি গদ্যকবিতার ঘরানা, বিশেষ করে এর পর্ববিন্যাস ও ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করতে গিয়ে আমি হিমশিম খেয়েছি আর আনন্দ অনুভব করেছি। কারণ এই রীতির ওপর দখল আনতে গিয়ে কাব্যশক্তির ওপর আমার ক্ষমতায়ন ঘটেছে, প্রথা ভেঙে কবিতা রচনার বিষয়ে আমি বিদ্রোহী হতে পেরেছি। শূন্যস্থান পূরণ করছি বলে নয়, জ্ঞান ও কাব্যশক্তির কারণে আমি নিজেকে দ্রোহী ও আবিষ্কারক বলে মনে করি।’ দারবিশ মনে করেন, সমকালের উদ্ভাবনমূলক কবিতায়ও ঐতিহ্যের ব্যবহার অনিবার্য। আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে ঐতিহ্যের ব্যবহার শুধু তাঁর ‘কাব্যশক্তির ক্ষমতায়ন ঘটায়নি, সেইসঙ্গে তাঁকে নতুন নতুন উদ্ভাবনা, আবিষ্কার এবং প্রথা ভাঙতেও সহায়তা করেছে। কবিতার সঙ্গে ঘটেছে পাঠকের নিবিড় সংযোগ। এ-ধরনের কবিতা পড়তে গিয়ে পাঠক কখনোই কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে বলে মনে করেন না; বরং কবির অভূতপূর্ব সৃজনশীলতার মধ্যে প্রবেশাধিকার ঘটেছে বলে ভাবতে পারেন। অজানা কোনো দেশ থেকে হঠাৎ করে কবির আবির্ভাব ঘটেছে, এমন অনুভূতি পাঠকের হয় না।’ আরবি প্রথাবদ্ধ কবিতার ছন্দোস্পন্দনকে নিজের কবিতায় নিরন্তর ব্যবহার করে এবং ইমরুল আল কায়েস ও আল-মুতানাবিবর মতো কবির সৃজনশৈলীকে আত্তীকৃত করে দারবিশ আরবি পাঠকের সঙ্গে নিজের সংযোগ রক্ষা করেছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই সাঈদের ওপর এলিজি লিখতে গিয়ে যে ন্যারেটিভের আশ্রয় নিয়েছেন, তার পরিপূর্ণ পূর্বপ্রস্ত্ততি তাঁর ছিল।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কাব্য-আলোচকরা আরবি মর্সিয়া কাব্য নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। এটি ক্বাসিদারই একটি ধারা [বাদায়ী ১৯৭৫; অ্যালেন ২০০০; ব্র্যাগিনিস্কি ২০০১]। আরবি কবিতায় মর্সিয়া শোককাব্যের অনেকগুলো উপধারা রয়েছে। এর একটি উপধারা গড়ে উঠেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শোকোচ্ছ্বাসকে কেন্দ্র করে; বিখ্যাত কোনো মানুষের মৃত্যু হলে তাকে উদ্দেশ করে এই শোককবিতা রচনা করা হয়। আরেকটি ধারা আত্মকেন্দ্রিক; অর্থাৎ নিজের মৃত্যুকে নিয়ে জীবিত কবি শোকপ্রকাশ করে কবিতা রচনা করেন। আরবি কবিরা আরো যেসব বিষয় নিয়ে শোককবিতা লিখে থাকেন সেসব বিষয় হচ্ছে : পরিবারের মৃত সদস্য, বিধ্বস্ত নগর, মৃত পশুপাখি, বিলুপ্ত প্রকৃতি ইত্যাদি। কখনো কখনো এর কোনো একটি বিষয় নয়, বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয় ঘটে আরবি কবিদের একক শোককবিতায়।

গবেষকদের মতে, মর্সিয়া কাব্যের সূত্রপাত ঘটে পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যুর পর ওই পরিবারের নারীরা যে মাতম করতেন, তার ওপর ভিত্তি করে। আরবীয় সমাজের নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও ইসলামপূর্ব কাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই শোককবিতার ধারা আরবি কবিতায় বহমান। তবে আধুনিককালে সামাজিক উপপস্নবের ঢেউ এই কবিতার বৈশিষ্ট্য অনেকটাই বদলে দিয়েছে। এই কবিতা অনেক আরবি কবির কাছে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক-ধর্মীয় বিষয়-আশয় প্রকাশের মাধ্যম, তবে এর যে মূল বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিগত শোকের প্রকাশ হিসেবে তা অনন্য হয়ে আছে।

আরবি কবিতার ধারায় প্রথম দিকে মর্সিয়া কবিতা রচনা করে যেসব কবি খ্যাতিমান হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছেন তুমাদির বিনতে আমর, আল খানসা, আহমেদ সাকি, আল মুতানাবিব প্রমুখ। তুলনা করলে দেখা যাবে, তাঁদের কবিতা ছিল ব্যক্তিগত শোকানুভূতিতে আচ্ছন্ন। কিন্তু দারবিশের এলিজিগুলো রাজনৈতিক হত্যাকা- ও শোককে প্রাধান্য দিয়েছে। দারবিশ সাঈদের উদ্দেশে রচিত কবিতায় সাঈদের মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে নির্বাসিত, বাস্ত্তচ্যুত, দেশহীন দুই স্তিনি বন্ধুর বেদনা, আত্মসংকট, সমষ্টিগত সংকট ও সংগ্রামকে একীভূত করে প্রকাশ করেছেন। তবে এর কেন্দ্রীয় বিষয় রাজনীতি, রাজনীতির উপস্থিতিই এখানে প্রবল। ব্যক্তিকেন্দ্রিক শোকানুভূতি ছাড়িয়ে জনমুক্তির আকাঙক্ষা এখানে ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করেছে। ফলে কবিতাটি অন্তিমে হয়ে উঠেছে অনন্য এক রাজনৈতিক বয়ান বা ডিসকোর্স। নিজের সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সংগ্রাম, অস্তিত্ব ও রাষ্ট্রগঠনের আকাঙক্ষা হয়ে উঠেছে এর মূল বিষয়।

সমালোচক ইয়াসিন নূরানি বলেছেন, উত্তর-আধুনিক রাষ্ট্রগঠনে আরবি শোককবিতা বিশেষ একধরনের ভূমিকা পালন করেছিল। প্রাচীন রীতিটি অতিক্রম করে এই কবিতা যখন বিশ শতকে প্রবেশ করে, তখন মিশরীয় রাষ্ট্রগঠনে এর অবদান ছিল উলেস্নখযোগ্য। [নূরানি ১৯৯৭ : ৬৪]। নূরানি ওই সময়ের মর্সিয়া কাব্যকে নব্যধ্রম্নপদি বলে উলেস্নখ করে জানাচ্ছেন, কবিতাটি তখন শুরু হতো মৃত প্রখ্যাত ব্যক্তির শোকপালনের মধ্য দিয়ে, সবশেষে থাকত ‘ব্যক্তি হিসেবে তিনি নিজের সম্প্রদায় ও জাতির জন্যে কী অবদান রেখে গেছেন তার উলেস্নখ।’ [নূরানি ১৯৯৭ : ৫৪]। শোককে শক্তিতে পরিণত করে কবিরা রাজনৈতিক বিষয়কে এভাবে যেমন উপজীব্য করেছেন, তেমনি মর্সিয়া কবিতাকে করে তুলেছেন জাতিসত্তা নির্মাণের হাতিয়ার। আগে ধর্মীয় মতাদর্শ ও পারলৌকিক পরমার্থ লাভের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে মর্সিয়া লেখা হতো, কিন্তু এ-সময় থেকে এই ন্যারেটিভটি ক্রমশ মৃত্তিকাসংলগ্ন হতে থাকে আর তা ভরে ওঠে ইহজাগতিক বিষয়-আশয়ে। নূরানি লিখেছেন, নব্যধ্রম্নপদি মর্সিয়াকাব্যের লক্ষ্য ছিল জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়। ব্যক্তিপরিসর থেকে এই কবিতা সরে আসে জনপরিসরে : ‘মৃত যে, সে সংখ্যামাত্র … বেঁচে থাকবেন জীবিতের প্রতিমূর্তি নিয়ে, সমস্ত সম্প্রদায় এটাই কামনা করে, তাকে মূল্য দেয়।’

[নূরানি ১৯৯৭ : ৪৯]

দারবিশের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়, তিনি শুধু আরবি শোককবিতা ধারাটির দ্বারা প্রভাবিত হননি, এই শোককবিতার সম্ভাবনাকে আরো প্রসারিত করে কবিতা রচনা করেছেন। সাঈদের উদ্দেশে এলিজি রচনার আগেই আরবি শোককবিতা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। নিজের বন্ধু, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিলুপ্ত জনপদ, অনামা রাজনৈতিক সশস্ত্র সংগ্রামী যোদ্ধা ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি এলিজি রচনা করেন; আর এসব কবিতা তিনি রচনা করেছিলেন সাঈদের উদ্দেশে এলিজি রচনার আগেই। এরকম একটি চমৎকার কবিতা হচ্ছে ‘রুটি’। এই কবিতায় বৈরুত নগরীর জন্যে শোকপ্রকাশ করেছেন দারবিশ। বৈরুতে ১৯৭৫ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত যে-গৃহযুদ্ধ চলছিল, কবিতাটি সেই পটভূমিতে রচিত। এই হানাহানির এক পর্যায়ে একদিন দোকানে গিয়ে রুটি কেনার সময় খুন হন লেবাননের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ইব্রাহিম মারজুক। মারজুকের এই মৃত্যুর সঙ্গে দারবিশ এরপর যুক্ত করে দিয়েছেন ওই গৃহযুদ্ধের কারণে ক্ষুধার্ত শিশু আর পারস্পরিক হানাহানিতে মৃত অন্য মানুষদের। কবিতাটিকে তিনি এভাবেই একজন শিল্পীর মৃত্যু থেকে প্রসারিত করে দিয়েছেন আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে, যে-বিপর্যয় লেবাননের প্রতিটি মানুষের জীবনকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। ওইসব বিপর্যস্ত বেশিরভাগ মানুষই ছিল আবার প্যালেস্টাইনি উদ্বাস্ত্ত : ‘বেতারকেন্দ্র থেকে গণিকার পুরুষ দালালের জীবন পর্যন্ত মৃত্যু ছড়িয়ে পড়ছে/ ছড়িয়ে পড়ছে সবজির বাজার অবধি।’ ‘অবিস্মরণীয় স্মৃতি : আগস্ট, বৈরুত, ১৯৮২’ শীর্ষক অন্য আরেকটি কবিতায় দারবিশ বর্ণনা দিয়েছেন বিধ্বস্ত বৈরুত নগরীর, যে-নগরীতে অনুপ্রবেশকারী ইসরায়েলিদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে আছে লেবানন ও প্যালেস্টাইনের মানুষ। স্মৃতিচারণামূলক এই কবিতায় দারবিশ যে-বর্ণনারীতি বা ন্যারেটিভের আশ্রয় নিয়েছেন তা এলিজিধর্মী।

সাঈদের উদ্দেশে শোককবিতা লেখার আগেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক মর্সিয়াকাব্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন দারবিশ। সেই কবিতাটির নাম ছিল ‘সবুজ ছায়াপুরুষ’। কবিতাটি লেখা হয়েছিল মিশরীয় প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। ওই কবিতাতেই প্রথম দারবিশ ‘আমি’ থেকে ‘তুমি’ এবং তুমি থেকে সমষ্টিচেতনায় কবিতাকে উত্তীর্ণ করে দিয়েছেন। ব্যক্তিস্তর থেকে গণস্তরে কবিতার ভাবনাকে তুলে এনেছেন; ব্যক্তিএলিজি হয়ে উঠেছে গণএলিজি। কবিকথক এই কবিতার এক জায়গায় নাসেরকে উপলক্ষ করে লিখেছেন : ‘তুমি কী মনে করতে পার/ কীভাবে তুমি আমার মুখের আদল গড়ে দিয়েছিলে/ কীভাবে গড়ে দিয়েছিলে আমার চোখের ভ্রম্ন/ কীভাবে তুমি তৈরি করে দিয়েছিলে আমার নির্বাসন ও মৃত্যু।’ কিন্তু এই ব্যক্তিগত শোক ও আর্তি অচিরেই রূপান্তরিত হয়ে যায় সমষ্টিগত শোকে : ‘তোমার সঙ্গেই আমরা বসবাস করি/ তোমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চলা।’

দারবিশের কাব্যচর্চার ধারাক্রম লক্ষ করলে দেখা যাবে, সাঈদের উদ্দেশে শোককবিতা রচনার অনেক আগে থেকেই এ-ধরনের কবিতা রচনা করে অনেকটাই সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছিলেন দারবিশ। কিন্তু সাঈদকে নিয়ে লেখা তাঁর এই এলিজিটি নানাদিক থেকে হয়ে উঠেছে অনন্য। পারস্পরিক ব্যক্তিগত অনুভূতি, ভাবনা; যাকে উদ্দীষ্ট করে লিখেছেন (এখানে সাঈদ) তাঁর জীবনযাপন, তাঁর তত্ত্বচেতনা; নিজের (দারবিশের) তত্ত্বচেতনা, রাজনৈতিক সম্পর্ক, পারস্পরিক বন্ধুতা, নির্বাসিত জীবনযাপন, নিজেদের ভবিষ্যৎ, প্যালেস্টাইনিদের সংগ্রাম, রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্ন, বৈশ্বিক অবস্থা, সবকিছু পরম্পরিত হয়ে গেছে। ব্যক্তিশোক সমষ্টিশোকে তো বটেই, সেইসঙ্গে গণশোকে পরিণত হয়েছে। সমকালীন রাজনীতি, যাকে উত্তর-আধুনিক ও বিশ্বায়ন বলে অভিহিত করা হয়, যে-রাজনীতির আরেকটি মাত্রা হচ্ছে উত্তর-সমাজতান্ত্রিক এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা – তার সবকিছুই এই কবিতায় একাকার হয়ে গেছে। প্রধানত গদ্যছন্দে কবিতাটি লেখা হলেও কখনো কখনো তাতে তিনি এনেছেন ঈষৎ ছন্দের দোলা। কোথাও কোথাও এর ভাষা কর্কশ, কোথাও কোথাও অপেক্ষাকৃত মসৃণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ন্যারেটিভের যে-রীতিটি এই কবিতায় দারবিশ গ্রহণ করেছেন সেটা একধরনের সাংঘর্ষিক অথচ পরম্পরিত রীতি। এই রীতি একটি তত্ত্ব। দারবিশ এটি গ্রহণ করেছেন যাঁকে নিয়ে তিনি কবিতাটি লিখছেন সেই সাঈদের তত্ত্বভাবনা থেকে। সাঈদ তাঁর বিভিন্ন লেখায়, বিশেষ করে বিলম্বিত শৈলী (২০০৬) শীর্ষক গ্রন্থে এবং এর আগে লেখা ‘তত্ত্বের পরিভ্রমণ পুনর্বিবেচনা’ (১৯৯৪) শীর্ষক প্রবন্ধে এই তত্ত্বের কথা উলেস্নখ করেছেন। এ-প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘যে-কোনো তত্ত্বীয় ধারণার সূত্রপাত ঘটে প্রচণ্ড স্ববিরোধিতার মধ্য দিয়ে, কিন্তু শেষ হয় পরিত্রাণধর্মী প্রকরণের মধ্য দিয়ে।’ [সাঈদ ১৯৯৪]। ওই প্রবন্ধেই সাঈদ বলেছেন, তত্ত্ব যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায় এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের বাইরে চর্চিত হয়, তখন এর সূচনাকালের শক্তি ক্ষয়ে যায়। সাঈদের তাত্ত্বিকভাবনা অনুসারে তত্ত্ব তাই একই সঙ্গে মুক্ত, প্রসারিত ও পরিত্রাণধর্মী। দারবিশও সাঈদের সম্মানে যে-কবিতাটি লিখেছেন, সেখানে নানা বিষয়ের মুক্তরূপের উক্তি-প্রত্যুক্তিময় প্রকাশ লক্ষ করা যায়। সে সঙ্গে কীভাবে রাজনৈতিক মানবিক মুক্তির পথে মানুষ অগ্রসর হতে পারে তার ইঙ্গিত রয়েছে।

 

৩. সাঈদের প্রতি দারবিশের শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাঈদের উদ্দেশে রচিত কবিতাটি আরবি প্রথাসিদ্ধ আঙ্গিক মর্সিয়া রীতিতে লেখা, কিন্তু তিনি এই আঙ্গিকটিকে ভেঙেচুরে অন্যভাবে দাঁড় করিয়েছেন। সাঈদের যে-ভাবমূর্তি তিনি এখানে তুলে ধরেছেন, সে-ভাবমূর্তিও শুধু সমালোচকদের ভাষায় (অ্যালেন ২০০০) ‘মৃত ব্যক্তির গুণপনায় ভরা’ বা প্রশস্তিসূচক নয়। কবিতাটি শোকপ্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি, সনাতন মর্সিয়ারীতিকে এভাবেই কবিতাটি অতিক্রম করে গেছে। দারবিশের কথক, যিনি বর্ণনা দিয়ে চলেন, কবিতাটির শেষাংশে ভাবের চূড়ায় ওঠার পূর্ব পর্যন্ত (যখন প্যালেস্টাইনি ভূখ– রক্তের উলেস্নখ করা হয়) অনেকটা বিচ্ছিন্ন থেকে হতাশাগ্রস্ত স্বরে বিবরণ দিয়ে গেছেন। কবিতাটি পূর্বাপর সাঈদের জীবননির্ভর, সেইসঙ্গে দারবিশের নিজের কথা ও সাঈদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের পটভূমিতে লেখা বলে আত্মজৈবনিক। তবে সাঈদ ও দারবিশের বন্ধুতার একরৈখিক, সরল বর্ণনা এতে স্থান পায়নি; কবিতাটি বাহাসের ভঙ্গিতে লেখা। সাঈদের সমীক্ষামূলক ভাবনা এবং দারবিশের সঙ্গে রাজনীতি, সাহিত্যচর্চা, তত্ত্বচিন্তা, নির্বাসিত জীবন ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে যে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, সেসব প্রসঙ্গ এখানে উপজীব্য হয়েছে। দারবিশ মর্সিয়ার সনাতন প্রকরণ থেকে আরো একটা দিক থেকে সরে এসেছেন। আগে যে-ব্যক্তিকে নিয়ে মর্সিয়া রচনা করা হতো তাকে ‘গোত্রের প্রতিষ্ঠাতা, সমন্বয়কারী অথবা পূণর্জাগরণবাদী’ হিসেবে তুলে ধরে এক অতিমানবে পরিণত করা হতো (নূরানি ১৯৯৭ : ৫৪)। কিন্তু দারবিশ এ-কবিতায় সাঈদকে কোনো মহামানবে পরিণত করেননি। তাঁরা বরং সাধারণ মানুষের মতো তর্ক-বিতর্ক করেন, বৌদ্ধিক কথাবার্তাও বলেন সাধারণ মানুষের মতো। তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে কবিতাটি যখন শীর্ষ ছুঁয়ে বিমোক্ষণের (catharsis) দিকে গড়িয়ে যায়, তখন কবিকথক ও সাঈদ রাজনৈতিক সংকট ও সংকটমুক্তির সমন্বিত ভাবনায় স্থিত হয়েছেন বলে মনে হয়। এরপর কবিতাটি শেষ হয় সাঈদের মৃত্যু ও দারবিশের বিদায় অভিবাদনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু প্রথাসিদ্ধ মর্সিয়াকাব্যে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ধর্মীয় বাতাবরণ সৃষ্টি করা হয়, এই কবিতায় তার কোনো নিদর্শন নেই, নেই মৃত্যুজনিত হাহাকার বা শোকোচ্ছ্বাস। আরো একটি দিক থেকে মর্সিয়া বা এলিজির সনাতন রীতিকে অতিক্রম করে গেছেন দারবিশ।  সেটি হলো, একবার সাঈদকে পুরাণধর্মী চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করে পরমুহূর্তেই তাঁকে তিনি সাধারণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। দারবিশ সাঈদকে দেখেছেন ঈগলের রূপে উড়ছেন, অধিষ্ঠিত হয়েছেন অলিম্পাসে, কিন্তু পরক্ষণেই ধ্বস্ত তিনি।

কবিতাটি শুরু হয়েছে সাঈদের জীবনকে কেন্দ্র করে, কবিকথকের সঙ্গে তাঁর তিরিশ বছরের সস্পর্কের উলেস্নখের মধ্য দিয়ে। এই বর্ণনায় সাঈদের প্রতি দারবিশের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু নিউইয়র্ক পত্রিকায় সাঈদের লেখালেখি এবং পশ্চিমি আধুনিকতার প্রতি তাঁর ঝোঁক থেকে তিনি সন্দিহান। সন্দিহান এ-কারণে যে, এই আধুনিকতার কারণেই প্রাচীন ইন্ডিয়ানদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছিল। দুজনই প্রাথমিকভাবে কীভাবে নির্বাসিত জীবনের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সমন্বিত স্বরে তার কথাও বলেছেন :

এডওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা হয়েছিল,

তিরিশ বছর আগে,

সময় তখন এতটা বন্য ছিল না …

আমরা দুজনেই বলছিলাম।

অতীত শুধুই যদি হয় এক অভিজ্ঞতা,

ভবিষ্যতের নির্মাণ তাহলে অর্থপূর্ণ হবে, হবে বীক্ষণ।

সবাই চলো

সবাই চলো ঘাসের অলৌকিকতা আর কল্পনার সারল্যকে

বিশ্বাস করে আগামীর দিকে এগিয়ে যাই

কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকের এই অংশে প্রকাশ পেয়েছে দুজনের নিরঙ্কুশ আশাবাদ। তখন তাঁরা তরুণ, কিন্তু একটু পরেই কবিতার কথক হতাশার স্বরে বলছেন, ‘গতকালের মধ্যে/ কোনো আগামীকাল নেই, তাহলে সবাই এসো/ সামনের দিকে অগ্রসর হই।’ দারবিশের কথক এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন, প্রশ্ন তুলছেন প্রগতি সম্বন্ধে, যে-প্রগতির পথে একদা অগ্রসর হবেন বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু উচ্চারিত হলো এই সতর্কবাণী : ‘সামনের দিকে এভাবে এগিয়ে চলা/ বর্বরতার দিকে যাওয়ার/ সেতু হয়ে উঠতে পারে।’

কবিকথক ও সাঈদের মধ্যে শুরু হলো রাজনৈতিক মতানৈক্য; এ-কারণেই ‘আমরা দুজনেই বললাম’, ‘তিনি বললেন’ ও ‘আমি বললাম’ সর্বনামধৃত তর্ক-বিতর্কমূলক সংলাপধর্মী বাক্যের ব্যবহার পাই এই কবিতায়। সাঈদই একবার বলেছিলেন, এলিজির জন্যে স্বরায়ণ ও কাঠামোতে কথোপকথনের ভঙ্গি থাকা জরুরি, এই রীতিটি এলিজির জন্যে যথোপযুক্ত (সাঈদ ১৯৯৪)। নব্যধ্রম্নপদি মর্সিয়া কবিতায় উদ্দীষ্ট ব্যক্তিকে সন্তু বা মহামানব রূপে উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু দারবিশ সাঈদকে টেনিস খেলোয়াড়, নিউইয়র্ক পত্রিকার পাঠক, অ্যাকাডেমিক কর্মকা–র সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যিনি অলস কিন্তু লিখতেন মন্তব্যধর্মী জ্বালাময়ী নানা লেখা। প্রাচ্যবাদীদের কষে সমালোচনা করতেন, জেনারেলদের দুর্বলতা ধরিয়ে দিয়ে তাদের দিকনির্দেশনা দিতেন, প্রাচ্যের নারীর হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হতে শিখিয়েছেন। তিনি গোসল সারলেন। পছন্দমাফিক বেছে নিলেন অভিজাত স্যুট। চুমুক দিলেন তাঁর সফেদ কফিতে। ভোরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন, ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়িও না।

সাঈদ ছিলেন দারবিশের দীর্ঘকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু এই বন্ধুত্ব সত্ত্বেও দারবিশ সাঈদকে সহজ সাদামাটা অথচ বুদ্ধিদীপ্ত সংবেদনশীল একজন ভাবুক মানুষ হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন, দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা খ-চিত্রের মাধ্যমে। সেইসঙ্গে যে-কারণে সাঈদ বিশ্বখ্যাত সেই প্রাচ্যবাদের কথা বলতেও ভুল করেননি। প্রাচ্যবাদকে সাঈদ যে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখতেন তাও উলেস্নখ করেছেন তিনি এভাবে, ‘প্রাচ্যবাদীদের কষে সমালোচনা করতেন।’ বীরোচিতভাবে সাঈদকে উপস্থাপন না করে তাঁকে উপস্থাপন করা হয়েছে নিজের কাজে ব্যস্ত একজন বন্ধু হিসেবে।

লক্ষণীয়, কবিতাটি লেখা হয়েছে প্রশ্ন ও উত্তরের আঙ্গিকে। কবিকথক এখানে সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন আর উত্তর দিচ্ছেন সাঈদ। সাক্ষাৎকারটি কাল্পনিক, কিন্তু সাঈদের  জীবনে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, দারবিশ সেসব বিষয়েই প্রশ্ন রেখেছেন আর তিনিই আবার সাঈদের জবানিতে উত্তর দিয়ে গেছেন। প্রশ্নোত্তরের প্রসঙ্গগুলো তাই শেষ পর্যন্ত আর কাল্পনিক থাকেনি। সাঈদের জীবনই হয়ে উঠেছে দারবিশের কবিতার বিষয়বস্ত্ত। সাঈদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ  ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯২ সালে। ওই বছর তিনি পশ্চিম জেরুজালেমের তালবিয়ায় অবস্থিত তাঁর ফেলে আসা বাড়ি দেখতে এসেছিলেন। সাঈদের স্থানচ্যুতি : স্মৃতিচারণা (১৯৯৯) শীর্ষক আত্মজীবনীতে এই ঘটনার উলেস্নখ আছে। দারবিশ ঘটনার সূত্রটি ধরে লিখেছেন :

দরোজার কাছে একটা ভিক্ষুকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমার বিছানায় যেসব অচেনা মানুষ শুয়ে আছে কী করে তাদের কাছে আমি

ভেতরে ঢোকার অনুমতি চাই … কী করে বলি পাঁচ মিনিটের জন্যে

আমি কি ঢুকতে পারি?

এই বাস্ত্তচ্যুতি কি শুধু সাঈদের? দারবিশের নয়? নিজের বাড়িতে ফিরতে গেলে তাকেও আগন্তুক হিসেবেই বিবেচনা করবে সবাই। এই অনিকেতবোধ আবার দারবিশেরও নয়, নিজেদের ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্ত্ত সব প্যালেস্টাইনির। সাঈদ শুধু তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন এই কবিতায়। ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইনিদের সংঘাতের কথা সরাসরি না বলে এভাবেই ব্যক্ত করেছেন দারবিশ – কাল্পনিক কথোপকথনের ভঙ্গিতে। শুধু সমকালের সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নয়, দুজনেই এই কবিতায় প্যালেস্টাইনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা কথা বলেছেন, নিজেরা এ নিয়ে কী ভাবতেন তার উলেস্নখ আছে। এই শোক-কবিতাটি এ-কারণেই অনন্য হয়ে উঠেছে যে, প্রায় এক দশক ধরে নানা সময়ে নানা প্রসঙ্গে দারবিশ ও সাঈদ রাজনীতি ও সাহিত্য নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তার চমৎকার উপস্থাপনা ঘটেছে।

অনিশ্চিত জীবন (২০০৪) শীর্ষক গ্রন্থে জুডিথ বাটলার শোক ও দুঃখকাতরতা সম্বন্ধে লিখেছেন, এই অনুভূতিটি অরাজনৈতিক যেমন নয়, তেমনি নয় শুধুই ব্যক্তিগত। যেসব মানুষের জীবনে এটা ঘটে, সেসব মানুষ রাজনৈতিক সম্প্রদায়েরই অংশ। দারবিশ ও সাঈদের জীবনে যে শোক ও বেদনার আবির্ভাব হয়েছে তা প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিক, কিন্তু তাঁরা বিশেষ রাজনৈতিক সম্প্রদায়েরই অন্তর্গত মানুষ। এই কবিতায় যে ‘আমরা’ সর্বনামের ব্যবহার আছে, সেই আমরা শুধু দারবিশ ও সাঈদকে নির্দেশ করে না, সাধারণভাবে সমস্ত প্যালেস্টাইনিকে নির্দেশ করে। প্যালেস্টাইনিদের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন করা হচ্ছে, আধিপত্যবাদী আগ্রাসন চালানো হচ্ছে, সেই আগ্রাসন পেয়ে যায় বৈশ্বিক চারিত্র্য।

আরেকটি কারণে কবিতাটি অনন্য। রাষ্ট্রীয় সংকটের মুহূর্তে, মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে কবিদের কী ভূমিকা তা এখানে মূর্ত হয়েছে। রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি শুধু ইতিহাসের উপাদান হয়ে থাকবে এমন নয়, দারবিশ দেখিয়েছেন কবিতাতেও এর উলেস্নখ থাকতে পারে। কবিতাও এভাবে হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সহায়ক শক্তি। রাষ্ট্রগঠনে সাহিত্যশিল্প কী ধরনের ভূমিকা পালন করে, সমকালীন সাহিত্যতত্ত্বের এটি হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। অর্থাৎ সাহিত্যে রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিফলিত হয় তা নয়, সাহিত্য কীভাবে রাষ্ট্রগঠনে সহায়তা করে, তাও সাহিত্য ও সমাজবিজ্ঞানীদের আলোচনার বিষয়বস্ত্ত হয়ে উঠেছে (জিমান ২০০৩)। দারবিশও এরকমই একটা ভূমিকায় কথা বলেছেন এই কবিতায় – কবিতা কীভাবে রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে :

এভাবেই আমি নই কিংবা তিনি

কে জিজ্ঞেস করেছিল; হয়তো পাঠক প্রশ্ন করেছিল।

চরম দুঃসময়ে কবিতা কী বলতে পারে?

এই পঙ্ক্তিগুলোর পরই রাজনৈতিকভাবে কী বিপর্যয় নেমে এসেছিল প্যালেস্টাইন ও লেবাননের মানুষদের ওপর, তার পরিমিত ঘনসংবদ্ধ শব্দরূপ :

রক্ত

আর রক্ত,

রক্ত

তোমার দেশে,

আমার নামে এবং তোমার নামে,

কাঠবাদামের ফুলে, কলার গায়ে

শিশুর দুধে, আলো আর ছায়ায়,

গমের দানায়, নুনে

এক শব্দের এক পঙ্ক্তি, এরপরই দুই শব্দের আরেক পঙ্ক্তি এরপর এক শব্দের এক পঙ্ক্তির পর কয়েক শব্দের দীর্ঘ পঙ্ক্তি – এভাবেই কবিতাটি রচনা করেছেন দারবিশ। রক্ত – এই শব্দের নিজস্বতা, অনন্যতা, নির্মমতা এতটাই যে এর পাশে অন্য শব্দ বসে না। ফলে রক্ত শব্দটি বসানোর পর শূন্য সাদা স্থান। এই চিত্রকল্পের নিজস্ব শক্তি এতটাই বেশি যে, দারবিশ এই চিত্রকল্পটিকে কোনো রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত করেননি, সম্পর্কিত করার প্রয়োজনীয়তাও ছিল না।

কবিতাটির পরের স্তবকেও রক্তের প্রসঙ্গ আবার ফিরে আসে। তিনবার এই শব্দটি ব্যবহারের পর তিনি একে কথা বা বচনের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন, রক্তই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা – ‘দিনের আলোয় রক্ত, অন্ধকারে রক্ত। কথায় রক্ত।’ দারবিশের উপজীব্য এটাই, ‘রক্তপাতের মুহূর্তে কবিতা কী বলতে পারে?’ দারবিশ একটি সাক্ষাৎকারে ২০০২ সালে বলেছিলেন : ‘এক সময়ে মনে হয়েছে কবিতা সবকিছু বদলে দিতে পারে, বদলে দিতে পারে ইতিহাস এবং সবকিছুকে করে তুলতে পারে মানবিক।’ সাঈদের উদ্দেশে লেখা এই কবিতাতে দারবিশের এই পূর্ব ধারণারই প্রতিফলন লক্ষ করা যায়, কবিতা রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। শেষের দিকের একটা স্তবকে পাঠকের প্রশ্নের উত্তরে সাঈদ যে-কথা বলেছেন, সেখানেই কবিতার ভূমিকা স্বীকৃত হয়েছে :

… যা হারিয়ে গেছে কবিতা তাকে

আতিথ্য দিতে পারে, সুতোর মতো আলোর রেখা জ্বলজ্বল করছে

…      …     …

লক্ষ্য নন্দনতত্ত্ব কিন্তু তার উপস্থিতি বাস্তবের

আঙ্গিকে/

আকাশহীন এক পৃথিবীতে, পৃথিবী

পরিণত হয়েছে এক গোলকধাঁধায়। কবিতা

 

এক ধরনের সান্তবনা, বাতাসের

এক ঝাপট, উত্তরের অথবা দক্ষিণের।

…      …        …

বলার জন্যে আশাকে আবিষ্কার করো,

আবিষ্কার করো চলার নিশানা, মরীচিকাকে প্রসারিত করো অপার আশায়।

এবং গান গাও, নান্দনিকতার জন্যেই আমাদের স্বাধীনতা

রাজনীতি অর্থই সংঘাত, কখনও যা সন্ত্রাসে রূপ নেয়।

প্রশ্ন আসে, অনেক ভাবুকই কথাটা তুলেছেন, সন্ত্রাস ও অবদমনের সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা কী কোনো বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে? এ-প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পেতে চেয়েছেন দারবিশ এই কবিতায়। লক্ষ করার বিষয়, দারবিশ কোনো কিছুতেই ভেঙে পড়েন না, হতাশ হন না। কিন্তু যে-কোনো সংবেদনশীল লেখকের মতোই এই দ্বন্দ্ব তাঁকে পেয়ে বসে – নন্দনতত্ত্বের ও শিল্পের মাধ্যমে যে-স্বাধীনতার কথা বলা হয়, তা কি যথেষ্ট? সাঈদের উদ্দেশে রচিত কবিতাটি সাক্ষ্য দেয়, শিল্পই সবকিছু নয়, জীবনের ব্যাখ্যাদানও সহজ নয়, ‘আমি বলি : জীবনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে শুধু মৃত্যুই জীবন নয়।’ মানুষ নশ্বর, কিন্তু জীবনকে এভাবেই অমরত্বের দ্বারা অভিষিক্ত করতে চেয়েছেন দারবিশ। চেয়েছেন শিল্পকে শানিত করতে। কবি ও লেখক যেহেতু নির্ভর করেন ভাষার ওপর, ফলে শব্দকে নিয়ন্ত্রণে এনে নিজেদের উপজীব্য বিষয় – তা সে কবিতাই হোক কিংবা তত্ত্ব – মানবমুক্তির কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছেন : ‘এসো আমরা তাহলে শব্দের ওপর প্রভুত্ব করি,/ যে-শব্দ তার পাঠককে মৃত্যুঞ্জয়ী করে রাখে।’ এ-কথাগুলো এই কবিতায় বলছেন সাঈদ, অ্যাকাডেমিক চর্চা ছেড়ে সমকালীন সংকটের পটভূমিতে সাহিত্য ও রাজনীতির ইশতেহার তৈরির ইঙ্গিত আছে এখানে; নন্দনতত্ত্ব থেকেও চাইছেন সরে আসতে। ফলে সাঈদ বা দারবিশ নয়, প্যালেস্টাইনি জনগণই যেন শব্দের ওপর প্রভুত্ব করতে চাইছে।

শোক-কবিতাকে এভাবেই রাজনৈতিক চেতনানির্ভর কবিতা করে তুলেছেন দারবিশ। প্যালেস্টাইনিদের স্বাধীনতাসংগ্রাম মানেই সংঘাত। কবিতায় এই প্রেক্ষাপট নির্মাণ করা হয়েছে প্রধানত চারটি সর্বনাম ব্যবহার করে; সর্বনামগুলো হলো ‘আমরা’, ‘আমি’, ‘তিনি’ ও ‘তারা’। ‘আমরা’ বলতে বোঝানো হয়েছে দারবিশ ও সাঈদকে, কখনো কখনো যা ‘আমি’ ও ‘তিনি’তে বিভক্ত হয়ে পড়েছে; কর্তৃত্বপরায়ণ ডিসকোর্সকে তাঁরা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছেন। এখানে বলা প্রয়োজন, দারবিশ সাঈদের ইশতেহারকে অনুসরণ করেননি; যে-ইশতেহারে বলা হয়েছে বহুত্বের কাছে ফিরে যাওয়ার কথা। দারবিশ সাঈদের জীবনের লক্ষ্য ও ভাবনাকে নানাভাবে বিপ্রতীপ অবস্থানে থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তবে পরম্পরিত সাংঘর্ষিক ভাবনার পর এক জায়গায় এসে তাঁদের ভাবনাবিন্দু মিলে গেছে; তাঁরা রাজনীতি, জীবন ও শিল্প সম্পর্কে সহমতে পৌঁছেছেন, সাঈদ একেই ‘নতুন ন্যারেটিভ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন (সাঈদ ১৯৯৩ : ৫১)। কবিতাটির সর্বশেষ স্তবকে অসম্ভবের জন্যে উচ্চারিত হলো মৃত্যু আর আশাবাদের কথা; প্যালেস্টাইনিরা ফিরে পাক শান্তি ও স্বাধীনতা।

কবিতাটি প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক। আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান থেকে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া পর্যন্ত তা প্রসারিত হয়ে আছে। মুসত্মাফা মারুচি বলেছেন, জীবদ্দশায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষর সঙ্গে সংগ্রাম করার জন্য বেঁচে থাকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন সাঈদ (মারুচি ২০০৪)। মারুচিকে ব্যক্তিগতভাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মরতে চাই না, কেননা অনেকেই আমার মৃত্যু চায়।’ দারবিশ সাঈদের এই আর্তিকেই ঐশ্বর্যময় ও মহিমাময় করে তুলেছেন এই কবিতায় আত্মপরিচয়-সংক্রান্ত সাঈদের নানা মন্তব্য, নস্টালজিয়া, শিল্প ও রাজনৈতিক ভাবনার মাধ্যমে। সাঈদ যেন এখানে কথোপকথনের ভেতর দিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠলেন, বৃত হলেন তর্কে-বিতর্কে, নতুন ভাবনার উদ্ভাবক হিসেবে আবির্ভাব ঘটল তাঁর। ‘অসম্ভব’ কথনকে সম্ভব করে তুললেন; তাঁর জীবদ্দশায় যা অনর্জিত থেকে গেল, তাকে অর্জনযোগ্য করে তুলবে পরবর্তী প্রবংশ এরকমটাই ভেবেছেন তিনি।

উপর্যুক্ত পটভূমিতে এই কবিতাটিকে কি তাই ‘প্রতিরোধের সাহিত্য’ বলে আখ্যায়িত করা যাবে? দারবিশ নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ‘প্রতিরোধের সাহিত্য’ কথাটি ব্যবহারের পক্ষপাতী নন তিনি। কেননা তাঁর মতে, ‘সব কবিতাই রাজনৈতিক যেখানে প্রধানত ভবিষ্যৎকে পুনর্নির্মাণ করার কথা থাকে।’ সম্প্রতি কেন তুমি একা নিজের বাড়ি ছেড়ে গেলে (২০০৬) শীর্ষক দারবিশের আত্মজৈবনিক কবিতার যে-সংকলনটি বেরিয়েছে, সেই সংকলনের কবিতাগুলোতেও রাজনীতি ও ভবিষ্যতের এই পুনর্লিখন ঘটেছে বলা যায়। দারবিশের নিজের সংকট – যেমন বিপন্ন শৈশব, হারানো ভূমি, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, নির্বাসিত জীবনযাপন আসলে অন্য কারো কথা নয়, হয়ে উঠেছে তাঁর দেশের মানুষেরই কথামালা। সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে কবিতার বিষয়-আশয় করে তোলার মধ্য দিয়ে সনাতন আরবি এলিজি বা মর্সিয়া কবিতাকে বিষয়বস্ত্ত ও আঙ্গিকের দিক থেকে অভিনব ও অনন্য করে তুলেছেন। তবে প্রথমে চিন্তা ও ভাবনার সংঘাত-সংঘর্ষ, পরে নানা তর্ক-বিতর্ক এবং সবশেষে জীবনবোধের স্থিরবিন্দুতে পৌঁছানোর ফলে দারবিশ সাঈদের পরম্পরিত সাংঘর্ষিক পাঠ বা কন্ট্রাপুন্টাল তত্ত্বটিকেই নিজের কবিতায় চমৎকারভাবে ব্যবহার করে শিল্পকুশলতার যে-স্বাক্ষর রেখেছেন, নিঃসন্দেহে তা অনন্য অভিধায় আখ্যায়িত হতে পারে। দারবিশের এই কবিতা শুধু আরবি কবিতার ক্ষেত্রে নয়, তুলনামূলক বিশ্বসাহিত্যের এমন একটা দিক উন্মোচন করে দিয়েছে, যেখানে মর্সিয়া, এলিজি ও শোক-কবিতার তুলনা চলতে পারে; বিশ্ব শোক-কবিতার ক্ষেত্রে দারবিশের অনন্যতা তখনই আরো গভীরভাবে বোঝা যাবে নিঃসন্দেহে।

 

তথ্যনির্দেশ

Akash, Munir (2000) ‘Introduction’, The Adam of the Two Edens : Poems, Mahmoud Darwish, Syracuse : Syracuse University Press.

Allen, Roger (2000), An Introduction to Arabic Literature, Cambridge : Cambridge University Press.

Butler, Judith (2004), Precarious Life : The Powers of Mourning and Violence, London : Verso.

Marrouchi, Mustapha (2004), ‘Stirrings Still; or, The impossibility of Mourning the Deaths of Edward Said’, College Literature, 31.1.

Mufti, Amir R. (2005), ‘Global Comparativism’, in Homi Bhaba and W.J.T. Michell (eds.) Edward Said : Continuing the Conversation, Chicago : University of Chicago Press.

Noorani, Yaseen (1997), ‘A Nation Born in Mourning : The Neoclassical Funeral Elegy in Egypt’, Journal of Arabic Literature 28.

Sacks, Peter M. (1985), The English Elegy : Studies in the Genre from Spenser to Yeats, Baltimore : John Hopkings Univeristy Press.

Said, Edward (1993), Culture and Imperialism, New York : Knopf.

– (1994) Representations of the Intellectual, New York : Vintage.

– (1994) ‘Traveling Theory Reconsidered’, Reflections of Exile and Other Essays, Cambridge : Harvard University Press.

– (2006) On Late Style : Music and Literature Against the Grain, New York : Pantheon.

Szeman Imre (2003), Zones of Instability, Baltimore and London : Johns Hopkins University Press.

Leave a Reply

%d bloggers like this: