কথা স্বর্ণলতার

লেখক: প্রদীপ আচার্য  

সকাল থেকেই নগেন পালের মনটা রসে টইটম্বুর হয়ে আছে। বাড়িতে আজ উৎসব। নাতি বিশুর বউভাত আজ। কাল সন্ধেবেলা নতুন বউ নিয়ে ফিরেছে বিশু। সাতসকালে সেই নাতিকে তাই হাতের নাগালে পেয়ে নগেনের খানিক ফিচলেমি করার সাধ হলো। বলল, ‘বিশে একবার আয় দিকি ইদিকি।’ বিশু ঠাকুরদার পায়ের কাছে এসে মাটিতে বসে পড়ে। বলে, ‘কী বলবা বলো।’ নগেনের বুকে থইথই করে ওঠে যত রাজ্যের অকথা-কুকথা। বলে, ‘বিশে, বে তো কল্লি, বউরি রাখবি কুথায়?’ বিশু আকাশ থেকে পড়ে। বলে, ‘ক্যান? আমার ঘরি। খাট সাজাচ্চে। সেকিন থাকবে!’

‘সেকিন তো থাকবে আম্মো জানি। তুই তারে কুথায় রাখবি?’ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে বিশু। ঠাকুরদা কী বলতে চায় গম্যি হয় না তার। নগেন এবার সিধে হয়ে বসে। বলে, ‘বউ হল গে বড় আদরির জিনিস। বুঝলি রে শালা। তারি বুকি কইরে রাকিস। বুকি চেইপ্পে ধইরে রাকিস। কিন্তুক ভুলিও তারি মাতায় তুলিসনে।’

‘আচসা, তুলবনি।’

‘কতাডা না বুঝিই বললি আচসা? ওরে শইরের বাচসা, বলতো ক্যান তুলবিনে?’

‘আমি তার কী জানি? তুমি বইলে দ্যাও।’ বিশুর গোল্লা গোল্লা চোখ গবাক্ষর মতো। নিরেট বলদের মতো সে চেয়ে থাকে ঠাকুরদার মুখের দিকে। নগেন গলায় গাম্ভীর্য আনে। ভ্রু-যুগল নাচাতে নাচাতে বলে, ‘শোন তালি। বেদমন্তর দিসছি। ভুলবিনে। বউরি মাতায় তুলতি নেই। কারণ, শালার কুকুর ওই সইদুল মিঞার দুকানির বাইরির নুনির বস্তা দেকলিই অমনি ঠ্যাং উঁচু কইরে দোমকল ছেইড়ে দ্যায়। হারামির বিড়াল খাট-আলমারির পায়া দেখলিই পিচকিরি ছাড়ে। আর মেইমানুষ হল গে পুরুষমানষির মাতায় উটলিই ছড় ছড় কইরে কম্মো সেরি দ্যায়।’

ঠাকুরদার কথা শুনে বিস্তর রাগ হয় বিশুর। বলে, ‘ছিঃ ছিঃ, মেইমানুষ মায়ির জাতি। তারে নে তুমার ই কতা বলতি মুকি বাদলো না? ছিঃ।’ নগেন ফিচেলের মতো হাসে। বলে, ‘আচসা। ঝা, আমার কথা আমি ফিরোয় নিসছি। কিন্তু, বলতিছি আজ তু তুমার ফুলশোয্যে। আজ রাত্তিরি দজ্জায় খিল দে বেশ্বরূপ দশশন করবা তুমি। তা সি বিশশোরূপ দেকি ঝ্যান তুমার মাতা ঘুইরে না যায় চান্দ আমার। মেইমানষির শরীল হলো গে খরস্যতা নদী। সিই নদীর ঘুন্নিপাকি পইরে খাবি খেলি চলবে না। মোদ্দাকথা হল গে এই।’ ময়নাকে এদিকে আসতে দেখে নগেন বলে, ‘ঝা, একোন ঝা। ঝা বললাম মনি রাকিস।’ বিশু মাথা নেড়ে সরে পড়ে।

ময়না বিশুর মাসি। বাপ-মা মরা ছেলে বিশুর বিয়ে উপলক্ষে আদহাটা থেকে আজ চারদিন হলো এসে রয়েছে। ময়নাই বিয়ের সম্বন্ধটা এনেছে। স্বর্ণও মা-বাপ মরা মেয়ে। বড় কষ্টে ছিল মামাবাড়িতে। সেই বৃত্তান্ত শুনে নগেন বলে, ‘আহা, অমন সুনার পিততিমা! তার এই নরকবাস? কিসসু দিতি হবে না। শাঁখা-সিন্দুরখান দিতি পারবে তো? বে-র দিন ফাইনাল কইরে দ্যাও।’ যেমনি কথা তেমনি কাজ। বিয়ে হয়ে গেল বিশুর।

নগেন পালের ঠাকুরদা-নাতির সংসারের মাথার গুনতি তিন হলো। জায়গা-বাসার অভাব নেই। পুকুরপাড়ে আড়াআড়ি দশ কাঠা জমি নগেনের বাপকে দান করেছিলেন বিপ্রদাস ব্যানার্জি। ব্যানার্জিপাড়ায় বিপ্রদাসবাবুদের জমিদারি ছিল এককালে। ওই জমিদারবাড়িতেই ঠাকুর গড়ত নগেনের বাপ অতুল পাল। নগেন তখন বাপের হাতে হাতে কাজ করে। জমিদারবাড়ির ফাইফরমাশ খাটে। বাপের কাছা ধরে সবে জগৎটাকে চিনতে শিখছে। কাঠামোয় খড় জড়ানোর পর তাতে মাটি লেপত বাবা। অবাক চোখে বাপের হাতের কাজ দেখত নগেন। আঙুলের কাজে কীভাবে প্রতিমার স্তনযুগলকে জাগিয়ে তুলতে হয়। সবই ঢাকা পড়ে যাবে কাপড়ে আর শোলার অলংকারে। বাপ বলত, ‘দু¹া ঝকোন নারী। তকোন তার শরীলে নারীর রূপদান কইরে নে সিই আব্রু ঢাকতি হবে কাপড় জড়ায়ে। কাপড়ির নিচির গড়ন নিকুত না হলি হাজার কাপড় জড়ালিও নারীর শরীলির ঝে অপরূপ শোবা, তা ফুইটে ওটে না।’

তা বাপের হাতের কাজ হুবহু আঙুলের কাজে ধরে রেখেছে নগেন। বাপের মতো মগজও খাটাতে শিখেছে। সে আজ কবেকার কথা। সেই নগেন আজ বিশুর ঠাকুরদা। একমাত্র বংশপ্রদীপ এই বিশু। নগেনের ছেলে রতনের একমাত্র চিহ্ন। বাপ অতুল পালের শিক্ষা পইপই করে হাতে ধরে শিখিয়েছিল ছেলে রতনকে। কাজ শিখেছিল বটে রতন। যাকে বলে গুরু মারা বিদ্যে। এই তামাম তল্লাটে রতনের নামডাক হয়েছিল খুব। রতনের কথা উঠলেই নগেন প্রলাপ বকে, ‘আমার রতনডা প্রতিমার চোখ আঁকত ঝ্যান বগমান সোয়ম মাটিতে নেমে এইসে তুলি ধরেছেন। তুলিতি এমনই খাসা রূপটান ছিল ব্যাটার আমার।’

রতনের কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। আজ সতেরো বছর হলো রতনের কোনো খোঁজ নেই। সাজানো সংসার কেমন একদিনের মধ্যে ছারেখারে চলে গেল। ব্যাটাচ্ছেলে বউকে সন্দেহ করেই ডুবল। এখনো পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আজ সতেরো বছর। ভগমান, আল্লাহ, খোদাতায়ালাকে অনেক ডেকেছে নগেন। মন্দিরে, পিরের দরগায় মানত করেছে। আপনমনে বিড়বিড় করে নগেন, ‘কে জানে সি হারামির ছল বেঁচি আছে কিনা।’

বিশের তখন চার বছর বয়স। দুর্গা প্রতিমার বায়না করতে এসে কোন ছেলে নাকি রতনের বউ শিবানীকে চোখ মেরেছে। শিবানীও নাকি খুব একচোট খিল্লি খেয়েছে। সেই নিয়ে রাতদুপুরে বেধে গেল কুরুক্ষেত্র। শিবানীর নাকমুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। খুনই হয়ে যেত সেদিন নগেন গিয়ে রতনকে না ঠেকালে। নগেনের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। বলদ পেটানোর মতো পিটিয়েছিল রতনকে। চুলের মুঠি ধরে দেয়ালে ঠেসে ধরে বলেছে, ‘শুয়ারির বাচসা, তুই ঘরির লক্কির গায়ি হাত ওটাও। তুরে আমি খুন কইরে ফ্যালবো।’ কাঁদতে কাঁদতে শিবানী বলেছিল, ‘শুইনে রাকো রতন পাল, তুমারি আমি উচিত শিক্কে দে যাবো।’

তা উচিত শিক্ষাই দিলো বটে শিবানী। পরদিন সকাল হতেই সারা পাড়ার লোক নগেন পালের বাড়ির উঠোনে। থানা-পুলিশ হলো। জামরুল গাছের ডালে ঝুলে থাকা শিবানীর নীল শরীরটাকে নামানো হলো। পুলিশের ভয়ে রতন সেই যে পালাল, আজ সতেরো বছর। তার কোনো খোঁজ নেই। খবর পেয়ে শিবানীর বোন ময়না ছুটে এসেছিল। ময়না কিন্তু সেদিন রতনের দোষ দেখেনি। বলেছে, তার দিদিরই একটু পুরুষ পুরুষ বাই ছিল। চার বছরের বিশুকে কোল পেতে দিয়েছিল ময়না। কিন্তু নগেনই চায়নি তার একমাত্র বংশপ্রদীপ তাকে ছেড়ে থাকুক। তাছাড়া কাল বাদে পরশু না হোক, একদিন তো ময়নার বিয়ে হবে। তখনো মায়া ছাড়ানো সহজ

হবে না।

সেই থেকে বিশু নগেন পালের কোলেপিঠে মানুষ হয়েছে। মানুষ হয়েছে, কথাটাকে খুব জোর দিয়ে বলতে চায় না নগেন পাল। বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত তো নগেনের বিয়ের বেলা গড়ায়নি। অতুল পাল বলত, ‘পুরুষির শরীলি তাড়না লাগার আগিই তার খোটা বেইন্ধে দাও। নালি ছাড়া বলদের মতুম রাজ্যির মেইমানষির দিকি নজর গেলিই মুশকিল।’ বাপের কথা শিরোধার্য করে গোঁফের রেখা দেখেই ছেলে রতনের বিয়ে দিয়েছিল নগেন। কিন্তু নাতির বেলা এই ভুল কী করে হলো? নগেন পাল নিজের মনকে নিজের মনেই গালাগাল করে ভূত ভাগিয়েছে। ‘নাতির কাঁধে যি মেইমানষির ভূত ভর করতি পারে, তা তুমার বুঝা ওচেত ছেলো না নগেন পাল?’ সত্যি সত্যিই বিশুর বয়স যে বিশ পেরিয়েছে, শরীরে তাড়না লেগেছে, তা আগেই বোঝা উচিত ছিল নগেনের। তাহলে আর নগেনকে অমন কুদৃশ্য নিজের চোখে দেখতে হতো না। নগেন পালের জমিটা আড়াআড়ি দশ কাঠা। নগেনের ঘরের পেছন দিকে নস্করদের শান-বাঁধানো পুকুর। সেই পুকুরে পদ্মফুল, শাপলাফুলের জটলা। নির্জন দুপুরে নস্করবাড়ির ছোটবউ নাইতে এসে আঁচল আলগা করে বুকের পদ্ম দুখান ভাসিয়ে রাখে জলে। ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে বিশু রোজ লুকিয়ে লুকিয়ে সেই সিনেমা দেখে। সেই মনস্তাপেই নগেন আদহাটায় ময়নার বাড়ি  ছুটেছে। ময়নার কাছে রাখঢাক নেই। সবই খুলে বলেছে। ময়নাই বলেছে, তার সন্ধানে মেয়ে আছে। বাপ-মা মরা মেয়ে। মামাবাড়ি লাথি-ঝাঁটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। নগেন বলেছে, ‘তুমি বিয়ে ফাইলাল কইরে ফ্যালো ময়না। সামনের লগ্নিই বে দোবো বিশের।’

সেই বিশের বউভাত আজ। সারা উঠোনে ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। মিনকে ঠাকুর রান্নার তোড়জোড় শুরু করেছে। মধু মিস্ত্রি বাঁশের খুঁটিতে খুঁটিতে টিউবলাইট লাগাচ্ছে। সন্ধে হতেই ঝলমলে হয়ে উঠবে গোটা বাড়িঘর-উঠোন। নয় নয় করে প্রায় দুশো লোক নেমতন্ন করেছে নগেন পাল। করুণা মিষ্টান্ন ভা-ারের মালিক পাঁচু বেরা ইস্তক বাদ যায়নি লিস্টে। পাঁচু বেরা অত বড়লোক হলে কী হবে? নগেনের সঙ্গে সম্পর্ক কি আজকের? চায়ের খুড়ি, দইয়ের ভাঁড়, রসগোল্লার হাঁড়ি সবই তো চালান যেত এই নগেন পালের উঠোন থেকে। ব্যবসার সেই লেনদেন আজ আর নেই ঠিকই, তবে সম্পর্ক যাকে বলে সেই দহরমমহরম একইরকম আছে। ব্যবসার লেনদেন যে নেই, তাতে কার কী করার আছে। সব প্লাস্টিকের কৌটোয় রসগোল্লা, দই বিক্রির যুগ পড়েছে। চায়ের ভাঁড়ও অচল এখন। সব প্লাস্টিকের কাপে চা চাচ্ছেন ভদ্রমানুষেরা। আরে বাবা, এত রোগভোগের জো লেগেছে কি এমনি এমনি? মাটির ভাঁড় ছাড়া দইয়ের সোহাগ জমে? ‘তা কুন শালা কুন শালার ব্যাটারে বুঝাবে বলোদিকি চান্দ।’ রাগে আপনমনে বিড়বিড় করে নগেন পাল। বলে, ‘তবু ভাল একোনো মাটির পিতিমাতেই পুজো অয় তাই। নালি পেটি গামছা বেইন্ধে দিন কাটাতি হতো।’

ময়নাকে এদিকে আসতে দেখে বিশুর সঙ্গে ফিচলেমিটা আর বাড়াল না নগেন। উঠোনের ওপর পাতা চারপেয়ের এককোনা দেখিয়ে নগেন বলল, ‘বসো মা। তুমার কাচে আমোর ঋণির শেষ নেই। বিশের মায়ের এ স্থান তুমি নেছো। সন্ধের ঝোঁকে বাড়ি ভত্তি লুকজন। আসবে-খাবে। তুমি আচো তাই না নিশিন্দি। নালি আমার আর কে আচে বলো ময়না? মাসিও এক পোকার মা। তুমার জন্নি সব হল। মেইমানুষ না থাকলি বে বাড়ি হয়? সত্যি ময়না, তুমার জন্নিই সব হলো। সন্ন ঝ্যান সত্তিকারেরই সুনার পোতিমা। আমি যি এতকাল ধইরে মা দু¹ার চোক আকিসি, মোনে মোনে গব্ব করিসি, আমার সব গরিমা মাটিতি মিশায় দ্যালো সন্ন। অমন রূপটান আমি জেবনভর দিতি পারিনি। কী জানি জেবনভর দু¹ার রূপটান দিসি, মা দু¹া তাই হয়তু আমারি এমন সুনার পোতিমাখান উফার দ্যালো।’ ময়না বলল, ‘সুনার পোতিমা কিনা বলতি পারবো না খুড়া। তবি কাজে কুব পটু। মুকবুজে ঘাড়গুজে কাজ কইরে ঝায়।’

ফুলশয্যে হয়ে গেল স্বর্ণলতার। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সব তালগোল পাকিয়ে গেল নগেনের। বিশু চুপ। স্বর্ণলতাও চুপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। ময়নাকে ডেকে নগেন জিজ্ঞেস করল, ‘কী গো ময়না, কী হলো? ব্যাপারখানা তু বুইতি পাচ্চিনে।’ ময়না বলল, ‘সি কতা তুমার জেনি কাজ নেই গো খুড়া। তুমার জেনি লাবও নেই।’ জেনি লাব নেই জেনি লাব নেই কইরে পাঁচদিন কেটে গেল। ময়না বলল, ‘এবার আমি বাড়ি পালাবো গো খুড়া। জটিল সুমোস্যা। কী উপায় ভেবি পাচ্চিনে।’ যাব তো যাব, চলেই গেল ময়না।

হাঁসের ডিমের ডালনা রাঁধল স্বর্ণলতা। খেয়ে নগেন তাজ্জব বনে গেল। অনেক দিন পরে যেন সবিতা রেঁধেছে। খেতে বসে নগেন বলল, ‘মা সন্ন, তুমার অমন চান্দের পারা মুখি হাসি নেই, মুখি কথা নেই ক্যান? কুন ব্যাদ অশুদ্দ হলো?’ স্বর্ণ শুকনো হাসি হাসল। কোনো উত্তর করল না। বিশুর জামার কলার চেপে ধরল নগেন। বলল, ‘চুম মেরি আচিস ক্যান সেদিনির তে?’ বিশু নগেনের হাত ছাড়িয়ে রাস্তার দিকে হাঁটা দিলো।

নগেন পাল অথই জলে পড়ল। যত রাগ গিয়ে পড়ল সবিতার ওপর। উঠোনের চারপেয়েতে বসে প্রলাপ বকে নগেন, ‘সুংসার সুংসারির মতুম পড়ি থাইকলো। তেনার অম্নি সাত তাড়াতাড়ি স¹ে যাওয়ার তাড়া লেগি গেলো। ময়নাও সাত্থোপরির মতুম সইরে পড়ল। হাজার হলিও সন্ন মেইমানুষ। তার হাগা আচে, মোতা আচে। হাজার এট্টা মেইলি সুমোস্যা আচে। সবিতা থাকলি বলতি পাত্তাম ‘ঝাও গে জিজ্ঞেস করো, কুন সমুদ্দুরি তার চাঁদ সদাগরের জাহাজখান ডুইবেসে?’

কদিনই দুপুরের ভাত খেতে আসে না বিশু। মধু মিস্তিরির সাগরেদ হয়েছে সে। ইলেকট্রিকের কাজেও ভালোই হাত পাকিয়েছে।

এ- চত্বরে আর ফাঁকা জমি বলে কিছু নেই। সব প্রমোটারের থাবায় শেষ। আকাশছোঁয়া সব ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে। সেসব ফ্ল্যাটে ইলেকট্রিকের ওয়ারিংয়ের কাজ ধরেছে মধু। দিনেরাতে বিরাম নেই। বিশু ব্যাটা মাটিতে হাত দিয়েই দেখল না। মাটির কাজ শিখল না। বংশছাড়া ছেলে হয়েছে। পরদিন বউকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গেল বিশু। নগেনের বুক থেকে যেন পাথর সরে গেল। সিনেমা থেকে ফিরে এসে তাড়িতাড়ি খেয়েই বউকে নিয়ে দরজায় খিল দিলো। দাওয়ায় বসে বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে নগেন মনের সুখে পা নাচাচ্ছিল। আকাশে তারার দিকে চেয়ে চেয়ে বিড়বিড় করল, ‘না গো সবিতা, সোব ঠিকই আচে। আমি বিথাই দুবভাবনা কইরে মরিছি।’

পরদিন সকালে কাজে বেরোল না বিশু। শুধু খায়দায় আর বউ নিয়ে দরজায় খিল আঁটে। নগেন মনে মনে বলে, ‘শালা মইরেছে। খরস্যোতা নদীর ঘুন্নিপাকে পইড়েছে। থাই ঠাকুদ্দা বুইলে আর লাজলজ্জার বালাই রাকল না। না রাকুক। সুকি থাক বাছা। তাতিই আমার সুক।’ কিন্তু টানা দশদিন কাজে বেরোল না বিশু। নগেন বলল, ‘বিশে বইসে খালি রাজার ধনও ফুরোয় ঝায়। ইবার কাজি মন দে। আয়-উপাজ্জন ছাড়া পুরুষ মানষির জাত থায়ে নারে শালা।’

পরদিন সকাল হতেই বিশুকে ব্যাগ গোছাতে দেখে অবাক হলো নগেন। বিশুর হাত চেপে ধরে বলল, ‘ব্যাগ গোছাতি লেগেইস যি? মতলবটা কী?’ বিশু গলা নামিয়ে জবাব দিলো, ‘দোমদোমা যাচ্চি। সেকিনি কনটাক ধইরেছে মধু মিস্তিরি।’

‘দোমদোমা? লোকালির কাজ কুন চুলোয় গেল?’

‘লোকালি আর কাজ করব না। দোমদোমায় হেবি কনটাক।’

‘থা নতুম বউরি কার জিম্মায় রেখি চল্লা তুমি?’

‘ক্যান? তুমি আচো না?’

‘আমি তু আচি তুর চামড়াখান খুইলে নিয়ার জন্নি। তুই একবার বাড়ির বাইরি পা রেখি দ্যাখ শোইরির বাচসা, তুর দশাখান আমি কী করি দ্যাখ।’ স্বর্ণ বলল, ‘ঠাকুরদা, ওরি ছেড়ি দ্যাও। যি চুলোয় যেতি চায় ঝাক।’ নগেন বলল, ‘তুই জানিস না সন্ন। মধু মাঘিখোর ব্যাটা। ওর পাল্লায় পড়লি বিশুডা বেশ্যাবাড়ির রাস্তা চেনবে।’

‘সি ভয় নেইগো ঠাকুরদা। সি ভয় নেই। সি খ্যামতা উর নেই। ওরি যেতি দ্যাও।’ স্বর্ণর এই ঠোঁট উলটে বিদ্রƒপের ভঙ্গিতে বলা কথায় যেন কী একটা রহস্যের গন্ধ পেল নগেন। তার এতকালের অভিজ্ঞ মন যেন কী একটা মহারহস্যের গন্ধ পেল। বিশুর হাতটা চেপে ধরেছিল নগেন। কখন যেন সেই বজ্রমুঠি শিথিল হয়ে গেল। বিশুও কখন ছাড়া পেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। স্বর্ণর খাটের ওপর স্থবিরের মতো অনেকক্ষণ বসে থাকল নগেন। সারা ঘরে বিদ্রƒপের বাতাস শুকনো গন্ধরাজের গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাহলে কি তাই?

হ্যাঁ, ঠিক তাই। বিশুটা নপুংসক। সেদিনই আদহাটায় ময়নার বাড়ি ছুটেছে নগেন। নগেন বলল, ‘মাগো ময়না, আমার মনি এট্টা সোন্দোহো জেগেইস।’ ময়না বলল, ‘হ্যাঁগো খুড়া, তুমি ঝা সোন্দোহ কইরেছো তা ট্যাকার ষোলোআনাই ঠিক।’

নগেন হা-হুতাশ করতে লাগল ময়নার মুখের কথা শুনে। বলল, ‘হায় হায় ইতু আমি মোহাপাপ করিসি তালি। ই পাপির তু কুনো ক্ষোমা নেই ময়না। একোন উপায় কী করি বলতি পারো মা?’ ময়না চুপ করে থাকে। আর কথা বাড়ায় না। হা-হুতাশ করতে করতে বাড়ি ফেরে নগেন। স্বর্ণটার কী হবে। মামাবাড়িতে লাথি-ঝাঁটা খেয়ে ভরা সংসারে এসেও সব উজাড় হলো।

নগেন বাড়ির উঠোনে পা দিতেই ছুটে এলো স্বর্ণ। বলল, ‘কুতায় গিইলে গো ঠাকুদ্দা। আমি তু ভেবি ভেবি সারা।’ নগেনের হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেল স্বর্ণ। বলল, ‘বোসো, তুমার জন্নি চা করিছিলাম। ঠান্ডা মেইরে গেচে। গরম কত্তিসি।’ নগেন স্বর্ণর মুখের দিকে চাইতে পারছিল না। এই একরত্তি বয়েস। সংসারের সব সুখ গেল মেয়েটার। শরীরের তাড়নাও তো আছে। মুখ বুজে কদিন সহ্য করবে? এসব ভাবতে ভাবতে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠল নগেন। স্বর্ণ শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিলো। মুখের সামনে চায়ের গেলাস ধরল। বলল, ‘ছিঃ, অমনপারা কাঁদতি নেই এই ভরসইন্ধেবেলা। উতি অমোঙ্গল হয় ঠাকুদ্দা। ঝি নাতির জন্নি কাঁদতিছো, সি তু বেইমানির মতুম তুমারি ছেড়ি গ্যালো।’ নগেন যেন সবিতার কথা শুনছে। ঠিক সবিতাও এই এমন করে কথা বলে মনের দুঃখ জুড়িয়ে দিত।

শীত এখন যাই যাই করছে। বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে বাতাসে। নিজের ঘরে ভেঙেচুরে বসেছিল নগেন। স্বর্ণ এসে নগেনের দুহাত ধরে টান দিলো। বলল, ‘গুম মেরি বইসে থাকলি সোরসতির পোতিমা কি হাওয়ায় হবে? কখান বায়না নেছো সি খেয়াল আচে?’ নগেন বলল, ‘মা গো, আর দুককু করব না। চল লেগি পড়ি।’ নগেন দেখল স্বর্ণ ঠিক সবিতার মতো করেই মাটি ছানতে ওস্তাদ। নগেন কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে চায়। কাঠামো গড়া। তাতে বিচুলি বাঁধার পালা শেষ। এবার মাটি লেপতে হবে। স্বর্ণ হাতে হাতে এগিয়ে দিচ্ছে সব। স্বর্ণর মধ্য দিয়ে যেন সবিতাই ফিরে এসেছে। সে-কথা ভেবে মন আনন্দে ভরে যায়। আবার যখন ভাবে, যৌবনবতী স্বর্ণর তো শরীরের তাড়না আছে, তখন আবার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়।

 

দুই

নগেন ভেবেছিল, সকাল সকাল বুঝি সরস্বতীর বায়না করতে এসেছে ছেলেটা। নগেনকে প্রণাম করে বলল, ‘এখানকার কাজিপাড়ায় প্লাম্বিঙির কনটাক নিছি। তা শুনলাম বিশের বউ নাকি মাদুরি দীক্ষিতির মতুম ঝাক্কাস হইতেছে? তাই ভাবলাম একবার ঝাঁক মেইরে দেখিই যাই।’ নগেন বলল, ‘তুমারি আমি ঠিক ঠাওর কত্তি পাচ্ছিনে।’ ছেলেটা বলল, ‘আমি তুমার ভাই কাত্তিক পালির নাতিগো ঠাকুদ্দা, বিকাশ। তখুন ছোটো ছেলাম। তুমার নতুন পামশু পুকুরি ছুইড়ে ফ্যাললাম, মুনে নেই তুমার।’ নগেন মনে করতে পারল কি না বোঝা গেল না। শুধু মুখে ‘অ’ উচ্চারণ করল। অচেনা গলা পেয়ে স্বর্ণ ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। বিকাশ স্বর্ণর কাছে গিয়ে বলল, ‘যা শুইনেলাম ইতু তারির চে দশগুণ সোন্দর গো। বউদি, আমি তুমার দেউর বিকাশ। বের সুমায় আসিনি। মিস করিসি।’ স্বর্ণ বলল, ‘ব্যাগির বোঝা কান্ধে। কদিন থাকবা তো?’

‘না বউদি থাকতি পারব না। কনটাকের কাজ। চান করব খাব, ধা হই যাব। আমারি এট্রুস তেল দাও।’ স্বর্ণ তেল এনে দিলো। বিকাশ উঠোনোর মাঝখানেই প্যান্ট খুলল। ছোট্ট একরত্তি একটা প্যান্ট পরে গামছা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পুকুরে। ভিজে গায়ে পুকুর থেকে যখন উঠল বিকাশ, নগেনের চোখ সিঁধিয়ে গেল বিকাশের শরীরের গড়নে। নগেনের অন্তরাত্মা ডেকে উঠল, ‘এই তু, এই তু আমারগের বংশির চেয়ারা।’ খড়ের ওপর মাটি লেপার সময় বিশ্বকর্মার এই গড়নই তো ফুটিয়ে তুলতে চায় নগেন। নগেন দেখল, বিকাশের প্রায় উদোম শরীর দেখে মুখ টিপে টিপে হাসছে স্বর্ণ। খেতে বসে কথার ফুলঝুরি ছড়াল বিকাশ। মজার মজার সব কথা। যাকে বলে কথার কারিগর এই বিকাশ। নগেনও না হেসে পারছিল না।

বিকাশ বিকেলে চলে গেল। কিন্তু ফের একদিন সকালে এসে হাজির। তারপর ঘন ঘন আসতে লাগল বিকাশ। নগেনের বুঝতে বাকি থাকল না, কীসের টানে বিকাশ বারবার আসছে। বিকাশ এলে স্বর্ণ একটু প্রাণখুলে হাসে। কথা বলে। নগেনের কাছে সেটার মূল্য অনেক। সে স্বর্ণর প্রতি অজান্তে যে অবিচার করেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। নগেনের অজান্তে কীসের যেন একটা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে মনের গহনে। ভালো মতো খেয়াল করায় কিছুটা যেন মনের নাগাল পেয়ে গেল নগেন পাল। ব্যাপারটা বুঝল নগেন। সে মনে মনে এই ফিকির করছে! বিকাশের সঙ্গে সে ভিড়িয়ে দিতে চায় স্বর্ণকে। নগেনের মন বলে, ‘মিত্তে সুমুস্কার আঁকড়ে ধইরে থাগলি মেইয়টার পোতি যি আরু অবেচার করা হবে।’ নগেন খুব ভালোমতো ঠাহর করেছে, বিকাশ এলে স্বর্ণ খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠে। বিকাশ স্বর্ণর ভালোবাসায় পড়েছে। পড়ে খাবি খাচ্ছে। নগেনের অভিজ্ঞ চোখে ছবির মতো সব ধরা পড়ে। এখন স্বর্ণর মন কী চায় তা জানার উপায় কী? দিনরাত এই ভাবনা অস্থির করে তোলে নগেনকে। খেতে বসে শুধু অকারণে বিকাশের কথা পেড়ে আনে নগেন। স্বর্ণর মুখে খুশি ঝিলিক মারে। নগেনের মন বলে, ‘মনি হচ্ছে দোয়ে দোয়ে চার হইয়ে বইসে আচে। খুব ভাল কতা। সন্নর জেবন বিকাশির মতুম পুরুষ মানুষই সাত্থক কত্তি পারে। বিশের বিষে ওই নিকুটি মেইরি পুইড়ে মত্তি দ্যাবো না। দিলি তা সোতীদাওর পারা অনাসার হবে। না থা আমি কিচুতিই হতি দ্যাবো না। নিকুচি মেরেইস সুমস্কারির।’ নগেন বুক সোজা করে বসে বিড়ির শেষ টান দিয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল।

 

তিন

কদিন পর একদিন গভীররাতে স্বর্ণ নগেনের ঘরে এলো। নগেনের চোখে তখন সবে তন্দ্রামতো এসেছে। স্বর্ণ বলল, ‘ঠাকুদ্দা, তুমার সঙ্গি কতা আচে।’ নগেন হকচকিয়ে উঠে বসে। বলে, ‘কী কতা মা?’

‘তুমি বিকাশরিই বাড়িতি আসতি মানা কইরে দোবা।’

‘ক্যান কী হল?’

‘কিচ্চু না। তুমারি ঝা বললাম, তা তুমি করবা।’

‘আহা কী হল, তা আমারি বলতি বাদা কীসির?’

‘আমি দেউরভাজের সোম্পক্ক নে চলতি চাই। ও আমারি ওর সাতি পলায় যেতি বলে কুন সাহুসে?’ শুনে খানিক চুপ করে স্থবিরের মতো বসে থাকে নগেন। তারপর সে যেন তার অভীষ্ট লক্ষ্যের প্রায় সীমার কাছে এসে পৌঁছে গেছে, ভেবে স্বস্তির শ্বাস নেয়। বিকাশ এমনই একটা প্রস্তাব দিক মনে মনে তাই চেয়েছে নগেন। সে ভাবে, স্বর্ণ হয়তো তার কাছে লজ্জায়, সংকোচে মনের ইচ্ছার কথা বলতে পারছে না। তাই নগেন বলল, ‘বিকাশরি তুর মনে ধইরেছে? ধরলি তুই উর সঙ্গি গে ঘর বাঁদনা। আমি না করব না।’

‘ছিঃ ঠাকুদ্দা, ছিঃ! আমি তুমার নাতবউ। অগ্নেসাক্কী করে তুমার নাতিরি সোয়ামি মেনিছি।’ নগেন ঝাঁঝিয়ে ওঠে। বলে, ‘কিসির সোয়ামি? সোয়ামি হওয়ার মুরোদ আচে তার? সি কি পুরুষ। আমি সোব জেনিসি। সি ব্যাটা নোপুংসক। তুই ক্যান তার জন্নি তুর জেবনডারে অনলি পুড়াবি পুড়ারমুখী?’ নগেনের কথা শুনে ফুঁসে ওঠে স্বর্ণলতা। বলে, ‘মুক সামলি কতা বলবা ঠাকুদ্দা। সি আমার সোয়ামি। সি পুরুষ কি নোপুংসক, থা আমারি বুইঝে নিতি দ্যাও। মনি রাখবা ঠাকুদ্দা, আমি তুমার সুংসারি ছেনাল হতি আসিনি। আমি তুমার কাচে বোঝা হলি আমারি হাত-পা বেইন্ধে পুকুরি ভাসায় দ্যাও। আমি মইরে সুখ পাব।’ বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে স্বর্ণ। নগেন স্বর্ণকে বুকে টেনে নেয়। বলে, ‘আমারি তুই ক্ষেমা কইরে দে মা সন্ন। তুই আমারি ক্ষেমা কইরে দে।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: