কবিতা ও ছবির আন্তরসম্পর্ক

মৃণাল ঘোষ

কবিতা ও ছবি দুটি আলাদা শিল্পমাধ্যম। কবিতা রচিত হয় শব্দ দিয়ে। শব্দকে বাক্-প্রতিমায় রূপান্তরিত করে। ছবি গড়ে ওঠে রেখা ও বর্ণকে দৃশ্যপ্রতিমায় উদ্ভাসিত করে। রেখা ও বর্ণ ছাড়া প্রথাবিরোধী অন্য কোনো দৃশ্যবস্ত্তও অনেক সময় ব্যবহার করেন কোনো শিল্পী। প্রকরণের এই ভিন্নতাই দুটি মাধ্যমের বিভেদের আদি উৎস। তবু কবিতা ও ছবি পরস্পর পরস্পরের প্রতি অমোঘ টান অনুভব করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। আধুনিক ও আধুনিকোত্তর যুগে সেই আকর্ষণ এমন অপরিহার্য হয়েছে যে, দুটি মাধ্যমই একে অন্যের ঐশ্বর্যটুকু আত্মস্থ করে সমৃদ্ধ হতে চায়। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তখন প্যারিসে থাকতেন। সকালবেলা লেখালেখির কাজ খানিকটা এগোলে তিনি হাঁটতে-হাঁটতে যেতেন কাছের একটি আর্ট গ্যালারিতে। নিবিষ্টভাবে দেখতেন সেখানে সেজানের ছবি, অন্যান্য ইম্প্রেশনিস্টের কাজ। সেজানের ছবি থেকে তিনি শিখতেন, গারট্রুড স্টেনের (Gertrude Stein) ভাষায়, কেমন করে দেখতে হয়, কেমন করে লিখতে হয় চোখ দিয়ে। যেমন আমরা দেখেছি রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। ছবি আঁকা শুরু করার পর জগৎটা তাঁর কাছে হয়ে ওঠে ‘আকারের মহাযাত্রা’। নির্মলকুমারী মহলানবীশকে লেখেন – ‘গাছপালার দিকে তাকাই, তাদের অত্যন্ত দেখতে পাই – স্পষ্ট বুঝি জগৎটা আকারের মহাযাত্রা। আমার কলমেও আসতে চায় সেই আকারের লীলা। আবেগ নয়, ভাব নয়, চিন্তা নয়, রূপের সমাবেশ।’ ছবি যেমন কবিতাকে দেয় আয়তনের বোধ, তেমনি দৃশ্যকলার স্তব্ধতার ভেতর জঙ্গমতা সঞ্চার করতে তাকে আত্মস্থ করতে হয় কবিতার অন্তর্নিহিত গতিধারা। রূপক বা মেটাফোরের মধ্য দিয়ে বাস্তবকে বাস্তবাতীতে নিয়ে গিয়ে স্বতন্ত্র একটি বাস্তব তৈরি করা, যে বাস্তব অলৌকিকের স্পন্দনে স্পন্দিত হয়, এটাই ছবি বা কবিতা – উভয়েরই পরম লক্ষ্য। এখানেই তাদের পরোক্ষ একটি ঐক্যের সূত্র।

একজন ছবির দর্শক বা কবিতার পাঠক যতই তাঁর দেখা ও পাঠ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে থাকেন, ততই এই দুটি শিল্পরূপের ঐক্য ও ব্যবধান, তাঁর কাছে নানা অজানা রহস্যের দরজা খুলতে থাকে। তাঁর সেই আবিষ্কার বা অনুভবের আনন্দ তিনি অন্যের মধ্যেও সঞ্চারিত করতে পারেন। অমিতাভ মৈত্র তাঁর সাপলুডো শীর্ষক বইতে (প্রকাশক : প্রতিভাস) এই কাজটিই করেছেন খুব প্রজ্ঞাদীপ্তভাবে। কবিতা ও দৃশ্যকলা উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অভিনিবেশ অত্যন্ত গভীর। তাঁর সেই দেখা ও পড়ার আনন্দকে তিনি উন্মীলিত করতে পেরেছেন ১৬৮ পৃষ্ঠার এই বইয়ের ৩৮টি আলাদা নিবন্ধে। দুটি মাধ্যমেই সমান স্বচ্ছন্দ বা তন্ময় আনন্দ পান এবং সেই অনুভবকে সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে পারেন, এরকম পাঠক তথা দর্শকের সংখ্যা কম। বাংলা ভাষায় এরকম বইয়ের সংখ্যাও সীমিত। সেদিক থেকে এ-বই প্রয়োজনীয় প্রকাশনা।

পাঠের অংশের সঙ্গে এ-বইতে রয়েছে দৃশ্যের সম্ভারও। লেখার মাঝে-মাঝে ছড়ানো রয়েছে ১৬টি পূর্ণপৃষ্ঠার রঙিন ছবি। সেই ছবির শিল্পী চন্দনা হোড়। কাজেই এ-বই একজন লেখক ও একজন শিল্পীর যৌথ প্রয়াস বা যুগলবন্দি। প্রচ্ছদে ও নামপত্রে রয়েছে দুজনেরই নাম। কবিতা ও ছবির আমত্মঃসম্পর্ক নিয়ে লেখা একটি বইয়ের নাম কেন হলো সাপলুডো, এর মধ্যেও থাকে একটি রহস্যের আবরণ। আসলে সাপলুডো তো উত্থান ও পতনের খেলা। মই বেয়ে-বেয়ে উঠে যাওয়া, তারপর সাপের মুখে পড়লে একেবারে পরিত্রাণহীন পতন। জীবনও তো এরকমই। কবিতা বা ছবি তো সেই জীবনের রহস্যকেই বুঝতে চায়। লেখক অবশ্য তাঁর মুখবন্ধে নামের তাৎপর্যকে বোঝাতে চেয়েছেন এভাবে – ‘তবু এই ঘুরে বেড়ানোর ভেতর দিয়েই কোথাও অনুভূতির এক গূঢ় পৃথিবী আসেত্ম-আসেত্ম খুলে যেতে থাকে।’ তবে বইটির আলোচ্য বিষয়ের আভাস দিয়ে একটি উপশিরোনাম থাকলে ভাল হতো।

উপস্থাপিত ৩৮টি নিবন্ধ দুটি পর্বে বিন্যস্ত। প্রথম পর্ব : ‘প্রতিচ্ছবি ও প্রতিধ্বনির গল্প’। সেখানে রয়েছে ২৩টি লেখা, যার মূল উপজীব্য প্রধানত পাশ্চাত্যের বিভিন্ন কালজয়ী সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠ এবং সেই সাহিত্যের সঙ্গে দৃশ্যকলার সম্পর্কের নিবিড় বিশ্লেষণ। দ্বিতীয় পর্বের শিরোনাম বইয়ের শিরোনামের সঙ্গে এক – ‘সাপলুডো’। সেখানে অন্তর্ভুক্ত ১৫টি লেখার বিষয় বাংলা সাম্প্রতিক কবিতা। পনেরোজন কবির প্রত্যেকের একটি বা একাধিক কবিতা নিয়ে নিবিড় বিশ্লেষণ। কবিতার গ্রহণ অন্তর্লোককে উন্মোচিত করেছেন লেখক গভীর প্রজ্ঞায়। কবিতা শব্দ দিয়ে লেখা হয়। শব্দের সঙ্গে শব্দের সংযোগে শব্দের পরিচিত ও প্রচলিত অর্থকে বিশিস্নষ্ট করে তার ভেতর নতুন আলোর দ্যোতনা আনেন একজন কবি। সেই দ্যোতনা যত স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ হয়, যত অপার্থিবতায় ঝংকৃত হয়, ততই উন্মোচিত হয় কবিতার গভীর ভুবন। প্রথম পর্বে লেখক নির্মাণ করেন তাঁর তাত্ত্বিক আদর্শ। দ্বিতীয় পর্বে থাকে সেই আদর্শেরই প্রয়োগ।

কেমন সেই আদর্শ? প্রথম পর্বের ‘শব্দ’ নামের নিবন্ধটিতে লেখক বলেছেন – ‘…শব্দের সব আছে, শুধু নিজস্ব প্রাণস্পন্দন নেই।’ আবার এও বলেছেন যে, শব্দের মধ্যে থাকে ‘আলোর গুণ’। কিন্তু সেই আলো কি শব্দের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই থাকে? নাকি একজন কবিকে সেই আলো সৃজন করে নিতে হয়। কেমন করে কবি সৃজন করবেন সেই আলো? লেখক বলছেন, ‘শব্দের এই বিপুল ছায়াময়তা ধারণ করতে পারে metaphor, এবং একমাত্র metaphor, যা কবিতার প্রধানতম মুক্ত জানালা।’ এবং ছবির ক্ষেত্রেও তাই। লেখক উলেস্নখ করেছেন রেমব্রান্টের ‘Slaughtered ox’ ছবিটির কথা। সেখানে রক্তাক্ত ঝুলন্ত মাংসপুঞ্জে যে হিংসা ও মৃত্যুর তমসা তাও তো উন্মোচিত হচ্ছে রূপক বা ‘metaphor’-এর অমোঘ প্রয়োগেই। এখানে একটি সংশয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে লেখক যখন বলেন ‘রঙের সুবিধে এই যে ভাষার মতো চিহ্ন নয়।’ (পৃ ৭৩) কেন নয়? শব্দের মতো রঙেরও তো নিজস্ব কোনো প্রাণ থাকে না। শিল্পীকে সেই প্রাণ সঞ্চার করতে হয়। তা তিনি করেন ‘metaphor’ নির্মাণের মাধ্যমেই। এখানেই দুটি মাধ্যমের সঙ্গোপন ঐক্যের পরিসর রচিত হয়। কালের ব্যবধান সত্ত্বেও একই আবেগ, সেটা হতে পারে ধ্বংসের বা সর্বগ্রাসী বিপর্যয়ের আবেগ, কেমন করে একজন কবি ও শিল্পীর রচনায় সমধর্মী আলোড়ন জাগিয়ে তোলে, তা বোঝাতে লেখক দান্দের ইনফার্নো বর্ণনার সঙ্গে হেনরি মুরের ‘শেল্টার ড্রয়িং’ বা ‘টানেল ড্রয়িং’য়ের তুলনা করেছেন।

এই তাত্ত্বিক-প্রস্থান থেকে লেখক এসেছেন সমকালীন বাংলা কবিতায়। কবিতা কি অমোঘ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বস্ত্তর ও শরীরের স্থূল পর্দাগুলোকে ভাঙতে-ভাঙতে সত্যের নিশ্চয়তায় পৌঁছতে চায় অথচ কাছে গিয়েই দেখে সত্য আরো দূরে চলে গেছে, এই টানাপড়েনের খেলাকে লেখক নানাভাবে উন্মীলিত করেছেন। আমরা দৃষ্টান্ত হিসেবে একটিমাত্র কবিতার উলেস্নখ করব – উৎপলকুমার বসুর ‘রাক্ষস’ নামে কবিতাটি, মাত্র পাঁচ লাইনের আপাতসরল কবিতাটির মধ্যে কি ভয়ংকর এক ট্র্যাজেডি-দীর্ণ জীবন-সত্য লুকিয়ে আছে, লেখক তার অসামান্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। সুরেন ব্যানার্জি রোডে যে-নির্জনতার সঙ্গে দেখা হয় কবির, সে কেমন করে হয়ে ওঠে ‘ফুটপাথে কেনা শান্ত, নতুন চিরুনি’। আর সেই চিরুনির দাঁতে লেগে থাকে যে ‘এক স্ত্রীলোকের দীর্ঘ কালো চুল’, তা কেমন করে ‘রাক্ষসে’র হিংসার প্রতীক হয়ে ওঠে, তার নিবিড় বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। বলেছেন, ‘এই হল রাক্ষস, কবির এই ‘আমি’।’ তারপর দেখিয়েছেন কেমন করে এই কবিতা দূরতর এক সংযোগ রচনা করে সালভাদর দালির ১৯৩৩-এ আঁকা ‘The Phantom Cort’ ছবিটির সঙ্গে। এভাবেই কবিতা ও ছবি বিশ্বব্যাপ্ত এক সৃজনের জালে বা ‘ক্রিয়েটিভ সার্কিটে’ পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে যায়।

দু-একটি সংশয়ের কথা বলা যায়। শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক এক জায়গায় বলেছেন, ‘জীবনানন্দ শহুরে, আর্বান। তাঁর নিসর্গে মেধা আছে, বিস্ময় নেই’ (পৃ ১৫৬)। এরকম কি নির্দ্বিধায় বলা যায়, ‘রূপসী বাংলা’ সত্ত্বেও? ‘আইকন থেকে আয়রনি’ নামের প্রবন্ধে ভ্যান গঘের ‘হাতের তালুতে মুখ গুঁজে চেয়ারে বসের থাকা এক ভেঙেপড়া বৃদ্ধের’ ছবির সঙ্গে তুলনা করেছেন পিকাসোর ‘গের্নিকা’র। বলেছেন, ‘গোয়ের্নিকার রূপারোপিত প্রতীকের থেকে অনেক বেশি গাঢ় এই যে অনুভূতি’ (পৃ ৭৯) অর্থাৎ ভ্যান গঘের সেই ছবির। এতটা সহজে এরকম বলা কি সংগত, ছবিটি যেখানে ‘গের্নিকা’? এর পরেই মন্তব্য করেছেন ‘দৃশ্যশিল্পে এই শ্বাসরোধকারী নান্দনিকতা আসে Golden Section-এর হাত ধরে’ (পৃ ৭৯-৮০)। ৫ ও ৮-এর অনুপাতে বিন্যস্ত প্রকৃতির যে স্বতঃস্ফূর্ত বিভাজন, যাকে ‘গোন্ডেন সেকশন’ বলে অভিহিত করেছিলেন গ্রিক গাণিতিক ইউক্লিড (Euclid), রেনেসাঁসের সময় পর্যন্ত বা তার পরেও স্বাভাবিকতাবাদী শিল্পে এই অনুপাত ধ্রম্নব সত্য বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী যুগে ‘গোন্ডেন সেকশনে’র তাৎপর্য আর কি তত বিতর্কহীন রইল? এরকম কয়েকটি গৌণ প্রশ্ন সত্ত্বেও এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সাপলুডো পড়ে কবিতা ও ছবিতে আগ্রহী একজন পাঠক যথেষ্ট সমৃদ্ধ হবেন।

তাঁকে আরো তৃপ্ত করবে চন্দনা হোড়ের আঁকা ছবিগুলো। বইটি জুড়ে রয়েছে এক বিপন্নতার আখ্যান। এই বিশ্বলোক নিয়ে মানুষের যে-গভীর অতৃপ্তি, যে-দুঃখ পরিত্রাণহীনভাবে জড়িয়ে থাকে, তার পায়ে-পায়ে, তাই তো একজন কবি বা শিল্পীকে সৃজনে উদ্বোধিত করে। সেই ছায়ার আবরণ রয়েছে বইটির পাঠ্য অংশে। চন্দনার ছবি সেই সংশয়দীর্ণ ছায়াচ্ছন্নতা থেকেই উৎসারিত। তাঁর ছবির যে মানব-মানবী এক নেতির বা শূন্যতার চেতনার ভেতর থেকে তারা যেন জীবনের তাৎপর্য খুঁজতে চাইছে। স্প্যাচুলার ঘন-সংবদ্ধ মোটা বুনোটে শিল্পী ছবির প্রেক্ষাপট এঁকেছেন। অধিকাংশ প্রেক্ষাপটেই রয়েছে অগ্নিভ এক ক্ষরণের অনুভূতি। সেই প্রেক্ষাপটে হলুদাভ মানব-মানবীরা সংশয়দীর্ণ দৃষ্টিতে জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকে। যে-জীবনকে কখনো সম্পূর্ণভাবে আত্মগত করা যায় না। অথচ আত্মস্থ করার সংগ্রাম চলতেই থাকে। সত্যকে পাওয়ার জন্য এই সাধনা বা সংগ্রামই জীবন। এই বইয়ের পাঠ্য অংশে যেমন, দৃশ্য অংশেও সেই অধরা মাধুরীকে ধরার জন্য এক বিষাদের আবহ রয়েছে। এজন্যই বইটি তাৎপর্যপূর্ণ।

বইয়ের প্রচ্ছদ চন্দনার আঁকা। শুভ্র প্রেক্ষাপটে একটি সাপের দ্রম্নত চলন। এই জঙ্গমতা একটু বিপন্নতারও সঞ্চার করে, যে-বিপন্নতা সব সময়ই জীবনে জড়িয়ে থাকে। এই জীবনেরই ধ্যানকে রূপ দিয়েছেন অমিতাভ ও চন্দনা। সামান্য দু-একটি ছাপার ভুল আছে। বাংলা মুদ্রণে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুব সহজ নয়। r

Leave a Reply

%d bloggers like this: