কাজী হাসান হাবিব

লেখক: আবুল হাসনাত

শিল্পী কাজী হাসান হাবিব (১৯৪৯-৮৮) তাঁর প্রজন্মের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল চিত্রকর ছিলেন। নবীন হলেও নানা কর্মপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জীবদ্দশায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন আলোচিত এক শিল্পীব্যক্তিত্ব। তাঁর বহুমুখীন কাজ শিল্পরুচি নির্মাণ করেছে, অন্যদিকে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন শিল্পাঙ্গনে দীপ্তিময় ও বিশিষ্ট। বগুড়ার মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের গণ্ডি পেরোবার পর সেই যে নিমগ্ন হয়েছিলেন চিত্রবিদ্যাচর্চায়, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সেই চিত্রবিদ্যাই তাঁর ধ্যান ছিল। মৃত্যু আসন্ন তা তিনি জানতেন, তবু হাসপাতালের-ক্লিনিকের শিয়র থেকে ইজেলকে তিনি সরাননি এবং ভয়ংকর সেই দিনগুলোতে অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠা যখন প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী তখন তাঁর বন্ধু, সুহৃদ ও পরিবার তাঁর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগাকুল হয়ে উঠেছিলেন। ধ্যান-নিমগ্ন কৃশতনু হাবিব তখনো ছবি এঁকেছেন। শিল্পের সব শাখায় তাঁর সহজ বিচরণ ছিল। নব উদ্ভাবনা ও নানা নিরীক্ষায় তাঁর বিভিন্ন মাধ্যমের সৃষ্টিকর্ম যখন মৌলিক ও স্বতন্ত্র হয়ে উঠছিল তখনই মৃত্যু তাঁকে ছিনিয়ে নিয়েছে। তখন ফর্ম, রং ও বিষয় নিয়ে তিনি প্রচুর ভাংচুর করেছেন এবং এই পরীক্ষা ও ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়েই তাঁর আলাদা চিত্রভাষা গড়ে তুলছেন। চিত্রকলার সব মাধ্যম সম্পর্কে তাঁর অনুসন্ধিৎসু হৃদয় ও সৃষ্টিশীল মন সর্বদা খুঁজে দেখেছে সৃষ্টির অপার রহস্য। সৃষ্টির এই পথচলায় ড্রইং ছিল প্রধান ভিত্তি। চিত্রবিদ্যায় যে-কোনো সৃষ্টির জন্য রেখাই হয়ে ওঠে প্রাণ। যে-শিল্পীর রেখা প্রাণময় ও বাঙ্ময় তিনি চিত্রসৃষ্টিতে ততো বেশি সাফল্য অর্জন করেন – এ তিনি বিশ্বাস করতেন। রেখার প্রাণশক্তিমত্তার অনুষঙ্গ অনুসন্ধানই তাঁকে নিরীক্ষাপ্রবণ করে তুলেছিল এবং নিত্যপরিবর্তন তাঁর শিল্পীসত্তার স্বভাবধর্মে পরিণত হয়েছিল। বিস্ময়কর সাহস ও অনমনীয় জেদে ধীশক্তি নিয়ে সমগ্র জীবন রং ও রেখায় জীবনের আলপনা এঁকে গেছেন এবং স্পর্শ, বোধ ও অনুভবের ভুবনকে সৃষ্টি দিয়ে ভরে তুলেছিলেন। প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীটি ছিল বিমূর্ত ও আধা-বিমূর্ত। কিন্তু জীবনকে অংকন করেছেন তিনি পরম মমতায়, গভীর দৃষ্টি দিয়ে। এই প্রদর্শনীতে নিসর্গ, দিগন্ত, চাঁদকে ধরতে চেয়েছেন সরল ও সত্যসন্ধানী চিত্রকরের মন দিয়ে। যেখানে তাঁর ভাষায় ছবিতে ‘মানুষ ধরার’ সুগভীর এক তন্ময়তা লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনীটি তিনি কবিতার পঙ্ক্তিমালাভিত্তিক করেছিলেন। বিষয়ের অভিনবত্বে চিত্রপ্রদর্শনীটি অনন্য হয়ে উঠেছিল।

সাহিত্যের ব্যাপক পঠন যে-কোনো সৃজনশীল মানুষের সত্তাসংকট উত্তরণে যে সহায়তা করে তাঁর ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় হয়নি। দীর্ঘদিন আমরা সংবাদে সহকর্মী ছিলাম। আড্ডাপ্রিয় ও নির্বাচিত বন্ধুবৃত্তে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে আলাপচারিতায় তিনি নানা বিষয় নিয়ে বিনম্র উচ্চারণে কথা বলতেন। তাঁর গ্রন্থপাঠে আগ্রহ ছিল। শিল্পের গ্রন্থ থেকে সমকালীন বিশ্বভুবন সম্পর্কে তিনি জ্ঞান আহরণ করতেন। তাঁর সৃষ্টিভুবন হয়ে উঠেছিল বৈচিত্র্য ও বহুগুণে উজ্জ্বল। নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে চিত্রসাধনায়ও তিনি বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিলেন।

প্রথিতযশা শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী একক প্রচেষ্টায় এদেশের গ্রাফিক শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলেছিলেন এ-ব্যাপারে আজ আর দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। শিল্পী কাজী হাসান হাবিব কাইয়ুম চৌধুরীকে সরাসরি অনুসরণ করেননি বটে, তবে শিল্পের এই মাধ্যম সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল এবং নিরীক্ষা বৈচিত্র্যসঞ্চারী হয়ে উঠেছিল। তাঁর অক্ষরশৈলী মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। এছাড়া তিনি বেশকিছু উলেস্নখযোগ্য বইয়ের প্রচ্ছদ অংকন করে খ্যাতিমান হয়েছিলেন। বইয়ের প্রচ্ছদ অংকন করে তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন।

 

দুই

তাঁর জন্ম যশোরের উমেদপুরে ১৯৪৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর, মৃত্যু ১৯৮৮ সালে ২৫ ডিসেম্বর। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে। বাল্যস্মৃতি এবং নিসর্গের নানা রূপ তাঁর সৃষ্টিতে ছাপ ফেলেছে। কবিতা ও বেশকিছু জলরঙের কাজে এই বাল্যস্মৃতি ঘুরেফিরে এসেছে। জন্ম যশোরে হলেও বগুড়ার মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থে হাবিবের কবিসত্তা যে কত সম্ভাবনাময় ছিল তা প্রতীয়মান হয়েছে। কবিতাগুলোতেও তাঁর নিসর্গপ্রীতি ও দেশপ্রেম উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়েছে। তাঁকে যে প্রকৃতি নানাভাবে আলোড়িত করেছিল এ-ব্যাপারে আজ আর সন্দেহের অবকাশ নেই।

 

তিন

ছাত্রাবস্থা থেকে তাঁর মধ্যে একটা পথ অন্বেষণের তাগিদ ছিল। জলরঙে ভালো কাজ করার জন্য তিনি ছুটে গেছেন কক্সবাজার ও হিমছড়ি। দুচোখভরে অবলোকন করেছেন নৈসর্গিক শোভা। তাঁর এই নিসর্গ-নিমগ্নতা থেকে সৃষ্ট অসংখ্য জলরঙের সৃষ্টি সেই সময়ে তাঁকে বিশিষ্ট করে তুলেছিল। হিমছড়ির দৃষ্টিনন্দন নিসর্গদৃশ্য ও সমুদ্রসৈকত, উদার দিগন্ত ও বিসত্মীর্ণ জলরাশি তাঁকে আবিষ্ট করেছিল। তিনি সর্বক্ষণ নিসর্গে ও সমুদ্রসৈকতে ছবি অংকনের বিষয় অন্বেষণ করেছেন। সেই যে অন্বেষণ শুরু হয়েছিল তা আর থেমে থাকেনি। সর্বক্ষণ নিজেকে অতিক্রম করার জন্য প্রয়াসী হয়েছেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও একজন বড়মাপের চিত্রীর মতো সেই অন্বেষণ তাঁর অব্যাহত ছিল। মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়ে নিজেকে বদলে নিয়ে শুধুমাত্র কয়েকটি মুখাবয়ব বিষয় করে যে অসাধারণ চিত্রটি তিনি নির্মাণ করলেন কোথাও রঙের অনুজ্জ্বল, কোথাও ধূসর বর্ণলেপনে এবং রেখাংকনে তা শুধু অসাধারণ নয়, একটি অনন্য কাজও বটে।

১৯৮২ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে পক্ষকালব্যাপী তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী হয়েছিল ঢাকা আর্ট কলেজ গ্যালারিতে। তেলরং ও অ্যাক্রিলিকে করা ঊনত্রিশটি কাজ ছিল এ-প্রদর্শনীতে। এ-প্রদর্শনী থেকেই উপলব্ধি করা গিয়েছিল কাজী হাসান হাবিবের শিল্পীসত্তা, সৃজনী আবেগ কীভাবে প্রথা ভেঙে এক নবীন লক্ষ্যে পথ নির্মাণ করছিল। বিষয়ে তিনি বৈচিত্র্য আনয়নের চেষ্টা করেছেন এই সময় থেকে এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যে তাঁর মুগ্ধতাবোধ যে কত তীব্র হয়ে উঠেছিল, তা চিত্রানুরাগীরা অনুভব করেছিলেন। তাঁর নির্মাণ-কৌশল সৃজন, সৃষ্টির ফল্গুধারা মুক্ত হয়েছিল। আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ শিল্পী ও তাঁর শিক্ষক মোহাম্মদ কিবরিয়া প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত একটি সুদৃশ্য পুস্তিকায় লিখলেন, ‘মেঘ বৃষ্টি রোদ এর মাঝে মানুষের চলাচল। এই নিয়েই প্রকৃতি। রিয়ালিস্টিক, ইম্প্রেশনিস্টিক আর বিমূর্ত সব ধরনের ছবিতেই এই প্রকৃতি শিল্পীকে সবসময়ে প্রভাবান্বিত করেছে।

আমাদের নবীন শিল্পী কাজী হাসান হাবিবের ছবিও এই প্রকৃতিকে ঘিরেই। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তাঁর দেখা প্রকৃতি তাঁকে নানানভাবে আলোড়িত করেছে, আবেগকে করেছে বিহবল, ভাবনা-চিন্তায় এনেছে পরিবর্তন, যার জন্যে এই প্রকৃতিই তার এখনকার কাজে হয়ে উঠেছে মুখ্য বিষয় এবং কাজেও এনেছে পরিবর্তন। এটাই তার প্রথম একক চিত্র-প্রদর্শনী। প্রদর্শনীতে যেসব ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে সেখানে প্রকৃতিকে হাবিব অন্তর্দৃষ্টিতে দেখেছে যার জন্যে তার এখনকার ছবি আগের চেয়ে অনেক সহজ এবং মৌলিক হয়ে উঠেছে। ছবি হয়েছে অনেক সবল আর সুন্দর। কাজের মাঝে সব সময়ে তাকে দেখার আশা রাখি।’

এ-প্রদর্শনী থেকেই তাঁর সৃজনশৈলী মৌলিকত্ব অর্জন করেছিল। তাঁর স্বতন্ত্র চিত্রভাষা, বিশেষত রেখার বিশিষ্টতা কাজী হাসান হাবিবকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেছিল।

হাবিব এই পুস্তিকায় লিখলেন – ‘আমার কৈশোরের স্মৃতি, সেই আকাশ, আলো-ছায়া, রং ক্যানভাসে ধরতে চেষ্টা করেছি। মাঠের শিয়রে চাঁদ। নির্জন সময় চমৎকার গান গায়। ঘনিষ্ঠ আকাশ জ্যোৎস্নার ভিতরে অপলক চেয়ে থাকে। এরাই দিনরাত্রি বারোমাসে ঘুরেফিরে আসে। আমার ইচ্ছা – এমন একটা ‘চিরকাল’ আমার ক্যানভাসের সীমিত আকাশে ধ’রে রাখার।’

দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীটি হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ১২ থেকে ১৮ এপ্রিল চারুকলা ইনস্টিটিউট গ্যালারিতে। একুশজন শিল্পীর একুশটি এনামেলে করা কাজ ছিল। বাংলাদেশের একুশজন কবির পঙ্ক্তিমালাভিত্তিক এ-প্রদর্শনী খুবই মনোগ্রাহী হয়েছিল। কবিতার পঙ্ক্তি নিয়ে সৃষ্ট এত চিত্রকর্ম দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ এবং চিত্রকলা ও কবিতা এই দুটি মাধ্যমের মধ্যে এক সেতু নির্মাণ করেছিল। অভিনবত্বে, বৈচিত্র্যে এই কবিতা ও চিত্রের যুগলবন্দি হয়েছিল বেশ কৌতূহলসঞ্চারী। কবিতার পঙ্ক্তি নিয়ে ইতোপূর্বে চিত্র-নির্মাণ হয়েছিল বিচ্ছিন্নভাবে, কিন্তু একটি একক প্রদর্শনীতে এত কাজ একসঙ্গে প্রত্যক্ষ করা – এ হয়ে উঠেছিল চিত্রানুরাগীদের জন্য সত্যিকার অর্থেই বিরল অভিজ্ঞতা।

শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ ও বেলাল চৌধুরীসহ একুশজন কবির পঙ্ক্তিকে ঘিরে তাঁর যে চিত্র-নির্মাণ তা ছিল গভীর হৃদয়স্পর্শী। বিশেষত শহীদ কাদরীর মননলগ্ন সংবেদনশীল কবিতা বৃষ্টিকে ঘিরে তাঁর অনুভূতি আনন্দের বিষাদগীতির মতো পৌঁছে গিয়েছিল নিভৃত হৃদয়ের গহনলোকে। তেলরঙের এ-কাজ পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞানে বিশিষ্ট এক চিত্রী হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করেছিল। এই প্রদর্শনীতে এই চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তখন থেকে বিষয় ও রং ব্যবহারে তাঁর পরিমিতিবোধ তাঁর চিত্রসাধনার দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কয়েকটি কবিতাকে ভিত্তি করে হাবিব চিত্রে সঞ্চার করেছিলেন যুদ্ধদিনের অনুভূতি।

তাঁর স্থিরচিত্র ও আত্মবিশ্বাসী নিরীক্ষা ছিল একসূত্রে গাঁথা। নিজেকে নিরন্তর ভেঙে গড়তে চেয়েছেন তিনি। সেজন্যে একজন চিত্রীর সাধনা এই ভাঙা ও গড়ার নিরন্তর কর্মে ধরা পড়ে। নিজেকে অতিক্রম করে একটি জায়গায় পৌঁছানোর জন্য তিনি ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করেছেন। আমরাও বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি মোড় নেওয়ার, বাঁক ফেলার ভেতরমুখী তাগিদ। কী অবিচলিত নিষ্ঠায়, পরম মমতায় তিনি ছবি অংকনকেই পরম জ্ঞান করেছেন। ছবিই হয়ে উঠেছিল তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান।

তাঁর চিত্রের আলাদা মেজাজ, উৎকর্ষ, রং ব্যবহারের অনায়াস দক্ষতা একক তিনটি চিত্রপ্রদর্শনীর মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কখনো প্রত্যক্ষ তাঁর অভিজ্ঞতাকে তিনি আধা বিমূর্তভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। কখনো বিষয় চলে এসেছে সরাসরি। বস্ত্তর অবয়বকে তিনি ভেঙেছেন বটে; কিন্তু তাঁর এ-ভাঙা ছিল বস্ত্তর অন্তর্নিহিত আদলকে খুঁজে নেওয়ার তাগিদ। তখন থেকে তাঁর চিত্র হয়ে উঠেছিল শুদ্ধ, পরিশীলিত ও আধুনিক জিজ্ঞাসায় সঞ্জীবিত। সেই সময়ের তেলরঙের চিত্রগুচ্ছে আলো-ছায়ার মায়াজাল সৃষ্টি ও বুনোটের মনোজ সুষমা তৈরিতে এক রূপকল্প সৃষ্টি হয়েছিল। স্মৃতির তাড়না তাঁর সৃষ্টিকে কাব্যগুণসমন্বিত ব্যঞ্জনা দিয়েছিল।

নববর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমির প্রযত্নে তাঁর যে সরাচিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল এক অর্থে তা ভিন্নমাত্রা সঞ্চার করেছিল তাঁর জীবন ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে। এই সরাচিত্রে কাজ করতে করতে তিনি বাংলা ও বাঙালির লৌকিক ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন দৃষ্টি অর্জন করেছিলেন। এ-ধারণা আমার জন্মেছিল তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। তিনি তখন সরাচিত্র নির্মাণে ব্যস্ত; বাংলার লৌকিক জীবন, ঐতিহ্য, বাঙালির লোকশিল্প পরম্পরা নিয়ে নতুন আবেগে তিনি আলোড়িত ও সঞ্জীবিত। নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দে কিছুটা উদ্বেলিত। সরাচিত্র গুচ্ছেও তাঁরই জাগর স্বাক্ষর ছিল। মোড় ফেরার যেন আরেক আভাস স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছিল এই সৃষ্টিগুচ্ছে! এই প্রদর্শনীর অন্তর্মুখী গঠনরীতি থেকে অনুভব করা গিয়েছিল বাঙালির পটচিত্রের ঐতিহ্যিক প্রবাহের পথ ধরেই তিনি বোধকরি নবীন যাত্রা শুরু করবেন। দেশজ আত্মার মর্মমূল সন্ধানের সক্রিয়তা ও সাধারণ এবং আটপৌরে এই অনুষঙ্গই তাঁকে নিয়ে এসেছিল প্রত্যক্ষ বাস্তবে। তাঁর শিল্পিত চৈতন্যে পালাবদল শুরু হয়েছিল এই সরাচিত্রে কাজ করতে গিয়ে। লোকছন্দের মিশ্রণে এবং লোককলার প্রবহমান ধারা তাঁর শিল্পচৈতন্যে নতুন আবেগ সঞ্চার করেছিল। বাঙালির লোককলা যে কত সমৃদ্ধ ও জীবন-অনুষঙ্গী এ-সময় থেকে তিনি তা অনুভব করেছেন। এতদিন এই লোককলা নিয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। সরাচিত্র প্রদর্শনীর জন্য কাজ করতে গিয়ে তিনি যেন সৃষ্টির জগৎকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে গেলেন।

 

চার

কাজী হাসান হাবিব মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে যে পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞানে দেশ, সমাজ ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছেন এবং একচিলতে আকাশকে প্রতীক হিসেবে এনে জীবনের মর্মকে উপস্থাপিত করেছেন তা থেকেই তাঁর জীবন ও সমাজের প্রতি অঙ্গীকার যে কত ব্যাপক ও গভীর ছিল তা পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। সেজন্যে তাঁর বহুকৌণিক কর্মে শিল্পিত প্রতিবাদী স্বাক্ষর রয়েছে। সমাজের নৈরাশ্য ও অসংগতিতে এই শিল্পীমানুষটি ছিলেন আশ্চর্য কাতর। সেজন্যে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও রাজনীতির অসংগতি ও মুক্তিযুদ্ধের অবমূল্যায়ন তাঁকে ব্যথিত করেছে। কতভাবেই না সময়ের সংকট ও মর্মযাতনাকে তিনি তুলে আনতে চেয়েছেন তাঁর ক্যানভাসে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর সমগ্র কাজের যে-প্রদর্শনী হয়েছিল শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে তাতে তাঁর সৃজনের আবেগ পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল। কাজী হাসান হাবিব তাঁর অবিরাম পথচলায় ছিলেন নিঃসঙ্গ। তাঁর অভাব পূরণ হয়নি বটে, তবে তাঁর সৃজনভুবন সর্বদা অনুপ্রেরণা সঞ্চার করবে এদেশের শিল্পাঙ্গনে – এ ব্যাপারে আজ আর সন্দেহ নেই।

Leave a Reply

%d bloggers like this: