কুয়াশা পাহাড়ের উপাখ্যান

লেখক: অমর মিত্র

অতীন সরকার বললেন, আপনি দেখতে পাবেন মানুষ কুয়াশা থেকে এসে কুয়াশায় ঢুকে যায় এদেশে, কুয়াশা যখন নামে, সূর্যাসত্ম অবধি থেকে যায়, এমনও হয়।

বিপুল এসেছে পিতৃভূমিতে। কলকাতা থেকে নেত্রকোনা, নেত্রকোনা থেকে কংস নদ পেরিয়ে সোমেশ্বরী নদীর ধারে সুসং দুর্গাপুর। সঙ্গে নেত্রকোনার অতীন। তিনি এক ইতিহাস রচনা করছেন অথবা এক পা-ুলিপির ভেতরে আরো কাহিনি যোগ করছেন, যেমনভাবে কি না দশ হাজার শেস্নাকের জয়কাব্য এক লাখ শেস্নাকের মহাভারত হয়েছিল। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার ইতিহাসের শেষ নেই। কাহিনিকাব্য নিয়ে বসে আছে মানুষ। অতীন বলছেন, সুসং দুর্গাপুরে, সোমেশ্বরী বা সিমসাং নদীর ধারে এমনিই অনেক কাহিনি জন্ম নেয়, হারিয়ে যায়, জন্ম নেয়, খুঁজলে একশ-দেড়শো-দুশো বছরের মানুষ পাবেন এদেশে।

একশ-দুশো-তিনশো বছরের মানুষ! মানে একশ-দুশো-তিনশো বছরের স্মৃতি। ইতিহাস কিংবা ইতিহাসের কল্পনা। মানুষ তো নিজেই  স্মৃতিপুঞ্জ। স্মৃতিই মানুষের জীবন গড়ে তোলে। যে-কাহিনি রচনা করছেন অতীন তা আসলে স্মৃতিপুঞ্জই, যা অতীন আহরণ করেছেন এতটা জীবন এই কবির ভূমিতে বসবাসসূত্রে। কিন্তু এত বিপুলের যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা। আসলে এই কবির ভূমিতে এমনই ঘটে থাকে। যে-মানুষটি মহুয়া, মলুয়া কিংবা কমলা সায়রের কথা বলছে পথেঘাটে, যে-মানুষটি কংস নদের ধারে চায়ের দোকান করে বসে আছে বেল চা নিয়ে, যে-মাঝি নৌকো নিয়ে পারাপারের জন্য বসে আছে, যে-লোকটি গাছতলায় বসে আছে নিঝুম হয়ে, তারা সবাই দেড়শো-দুশো বছরের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের বয়স রামায়ণ, মহাভারতের যুগের মানুষের মতো, কবির দেশে এমনই হয়। তাদের বয়স গারো পাহাড়ের বৃক্ষের মতো। গারো পাহাড়ের পাদদেশে এমনই হয়। মহুয়া, মলুয়া, কমলা সায়রের কাহিনি যদি সুর করে বলে যেতে পারে মানুষ, তবে কেন টঙ্কের কথা ভুলে যাবে। নিষ্কর খাজনার জমি বটে কিন্তু ফসলের ভাগ দিতে চাষার পেটে ভাত থাকত না সম্বৎসর। রাজার বাড়ি ভাগিনেয় মণি সিং রব তুলেছিল –

ধান দিব না, না না,

কবির ভূমি নেতেরক’না।

তখন পেয়াদা ঘুরতে লাগল গাঁয়ে গাঁয়ে। পেয়াদা ছিল হরিশচন্দ্র কিংবা মাধবচন্দ্র। তাদের ছিল পেয়াদার মতো রক্তচক্ষু, হিংসায় ভরা। সরকার বাহাদুর বলেছে টঙ্ক দিতে, দেবে না কেন, যতটা পারো দাও, বকেয়া দেবে পরের সনে, সরকার বাহাদুরের প্রজা সব, রাজা, জমিদার, তালুকদার সরকার বাহাদুরের এজেন্ট। সরকারের কথায় তাঁদের অমত্মঃকরণ ভালো হয়, মন্দ হয়। যাও, টঙ্ক দাও, না হয় ধান দাও, দিয়া আসো, যা পারবে দাও, পরের সনে বকেয়ার সঙ্গে আসল।

পরের সনের টঙ্কের সঙ্গে বকেয়া? সাবেক আর হাল মিলে পাহাড় হয়ে যাবে টঙ্কের দেয়। বকেয়া বেড়ে যাবে ক্রমশ। বাড়ুক কিন্তু টঙ্ক দিতে হবে। ধান উঠলে টঙ্ক আদায়ের ধুম ওঠে। খবরিয়া ইমতিয়াজ আলী বানেশ্বর খবর করে বেড়ায়। টঙ্কের ধান না দিলে, রাজা কহিসে সাক্ষাৎ মিত্যু হসত্মীর পদতলে। তা শুনে লোকের ঘুম যায়। জেগে গ্রাম পাহারা দেয়। রাজার হাতি মত্ত হয়ে না আসে হাজংপলিস্ন, চাষাপলিস্নতে। দিনমানে সেপাই পেয়াদা গেরসত্মর ঘরে ঘরে যায়। টঙ্ক দাও, নইলে বিপদ হবে। চাষাদের কেউ কেউ সন্ধের অন্ধকারে টঙ্কের ধান নিয়ে রওনা হয়ে ধরা পড়ে।

কুথায় যাও? হাজং প্রহরী জিজ্ঞেস করে। তারা আটকায় ধান। টঙ্কের ধান কেন দিবা?

সম্বৎসর উপাস দিবা \

না দিলা পহরী ধরে লিয়ে যাবে। কাতর গলায় বলল দুখু হাজংয়ের বেটা।

মনি সিং কইসে,

বিবাদ জারি রিইসে।

সিকিভাগ দিয়া হবে,

এক সিকিতে শোধ হবে। বলল টঙ্ক পাহারাদার।

টঙ্কের ধান দিয়া হবে না। দিবে তো দাও সিকিভাগ। সিকিভাগ সিকিভাগ। এক সিকিভাগ রাজায় পাবে, তিন সিকি ভাগ চাষায় খাবে। রব উঠল,

এক সিকির বেশি হবে না ধান,

যায় যাবে যাক, রাজার মান।

সিকিভাগ রাজা-জমিদারের ভাগ। তা নিয়ে খুব গোলমাল হলো।

চাষাদের ভয় দেখাতে সিপাই ঢুকল গাঁয়ে গাঁয়ে। কিন্তু ধান সেই উৎপাদিত ফসলের এক সিকি। সিপাইরা এসে বলতে লাগল, নতুন ফরমান, সরকার বাহাদুর এখনো গোরা সিপাই পুলিশ পাঠায় নাই, তারা এলে অনত্থ হবে। শুনহ নতুন ফরমান, মণি সিংয়ের জাত গিইসে, হাজংঘরে ভাত খাইসে। টঙ্ক রহিব, টঙ্কেই হবে রফা।

সেপাই যতই চোখ রাঙাক, চাষিদের মরণপণ। টঙ্ক দিব না। সিকিভাগ কেউ দেয়, কেউ দেয় না। বানায় ফসল মরে, পেটের ভাত আগে তারপর তো রাজা, জমিদারের ভাগ। মণি সিং, ললিত হাজংবাবু তখন কমিউনিস্ট পার্টির লোক। বিপ্লব হয়ে গেল প্রায়। বিপ্লবের স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষ দুজনে। ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের তখন টনক নড়ল।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কড়া নাড়ছে দুয়ারে। কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে চাষারা জোট বেঁধেছে। এরপর ধানই বন্ধ করে দেবে। ঠিক আছে, টঙ্কর জমি জরিপ করে দেখা হবে, কার আছে কত জমি, কার ভাগে কত ধান। জমির পরিমাণেই তো ধান। জরিপে চাষাদের লাভ হয়, আড়াই বিঘাকে তিন বিঘা দেখানো হয়েছিল কোথাও, কোথাও দেড় বিঘাকে তিন বিঘা। রাজার আমিন এমন করেছিল। আমিনের কাজই এই। না হলে আমিনকে ভয় করবে কেন জমির চাষা?  হ্যাঁ, আমিনকে কে না ভয় করত? আমিন ধরাকে সরা জ্ঞানে মেপে দিতে পারে জমি। তাই দিয়েছিল। এখন মণি সিং জোট করেছে। জোতের মানুষ আমিনের চেন ধরেছে। এক চেন মানে ৬৬ ফুট। তা জানত কে? আমিন বলত, এক চেন মানে ১০০ ফুট। তাতে ছোট জমির মাপ বড় হয়ে যেত। ফলে টঙ্কের পরিমাণ বেড়ে যেত। ললিতবাবু মাপ জানেন। তিনি তদারকি করায় রাজার আমিন আর ঠকাতে পারল না। আমিনের কেরামতি শেষ। চেন ঝাড়া দিয়ে জমিতে ফেলেছে। কম হবে না, বেশিও হবে না। জরিপের পর ফরমান এলো সরকার বাহাদুরের, টঙ্ক দেবে আট কিসিত্মতে। আট কিসিত্মতে শোধ হলে জমিন চাষার হয়ে যাবে। রায়তি স্বত্ব। পাঁচ দফার দ্বিতীয় দফা মানা হতে পারে এভাবে। একে মহাযুদ্ধ, তারপর কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলো, চাষারা সব চুপ করে থাকল। টঙ্কের চাপ কমল তো। কিন্তু টঙ্ক উঠে গেল না। চাষির মনে ক্ষোভ থেকেই গেল। মণি সিং জেলে গিয়েছে, তাই টঙ্ক প্রথা চালু রয়েছে। ১৯৪২ সালে মণি সিং জেল থেকে মুক্তি পেলেন। কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হলো। তখন কী হলো?

মহামন্বন্তর এলো দেশে। মিলিটারির জন্য ধান ক্রোক করতে লাগল সরকার। চাষার পেটে অন্ন নাই। ধান নিয়ে নিল মিলিটারি। চালের দাম মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেল। সুসং, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ নিরন্ন মানুষের কান্নায় পস্নাবিত হয়ে গেল। নিরন্ন হলো মানুষ, বিবস্ত্র হলো মানুষ, ধানের সঙ্গে কাপড়ের অভাব ঘটল। কত মানুষ মরে গেল না খেয়ে। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জের কবিয়াল নিবারণ প–ত গান বেঁধেছিলেন,

সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে না রে আর

সোনার পলস্নী হলো যে আঁধার

নিশ্চিহ্ন হইল কত পরিবার

গ্রামবাসী আজ অসহায় \

গৃহস্থের উঠানে উঠানে শ্মশান কবর, শৃগাল ঘোরে নির্ভয়ে। কিন্তু যত মানুষ মরল, তার চেয়ে বেশি মানুষ বেঁচেও থাকল। সেই মানুষ বেঁচে ছিল গারো পাহাড়ের দেশে, কংস নদী, সোমেশ্বরী নদী আর নাগরাই নদী, সোনাই নদীর কূলে, হাওরের ধারে। তারা সব মিছিল করে চলল নেত্রকোনা, ১৯৪৫-এর চৈত্রের ১৯-২০ তারিখ, ৪-৫ এপ্রিল। দুর্ভিক্ষ শেষ হয়ে গেলে আবার জোট বাঁধল মানুষ।

ঐ দ্যাখো মায়ের পিঠা কচিডা বান্ধা থাকে।

তারে নিয়া মা বাপে শত মাইল হাঁটে \

জনসমুদ্র লাগিসে জুয়ার, নেতেরক’না চলো।

টঙ্ক দিব না, ধান দিব না, সক্কল মিলা বলো \

টঙ্ক প্রথা, না না না।

জমিন্দারি, না না না \

ধান দিব না ধান দিব না।

কবির ভূমি নেতেরক’না \

বিপুল শুনতে শুনতে বলে, এই কথা গীতিকায় নেই।

অতীন বললেন, বিপ্লব কবিতার মতোন, কবিয়াল নিবারণ প–তের কবিতা।

বিপুল বলল, আপনি সেই বৃত্তান্ত  লিখছেন।

অতীন বলল, আমি নই, আর কেউ, যে এসে রেখে গিয়েছিল পা-ুলিপি, তিনি এ যুগের ব্যাস দেব।

তিনি কে?

আমাকে এই পা-ুলিপি দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন, আমি শেস্নাক যোগ করছি মাত্র।

আপনি আমাকে শোনান, আমি নিয়ে যাই আমার দেশে।

চুপ করে বসে থাকলেন অতীন। রাত এখন অনেক। তাঁদের নৈশাহার হয়ে গেছে। বাইরে খুব শীত। এই বাড়িটি কাঠের। তাই ভেতরে ঠান্ডা কম। অতীন বললেন, চলুন ব্যালকনিতে যাই।

শাল মুড়ি দিয়ে তাঁরা ব্যালকনির দরজা খুলতেই ধূসর এক অন্ধকারের মতো কুয়াশা আবৃত করে ফেলল তাদের। ব্যালকনি থেকে বাইরের রাস্তা, মাঠ, ঘরবাড়ি, মসজিদ, প্যাগোডা, মন্দির সব কুয়াশার ভেতরে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। রাস্তার আলোও মুছে গেছে। সুসং দুর্গাপুর দেখা যাচ্ছে না। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অনন্ত কুয়াশা নেমেছে এই রাত্রে। এরই ভেতর মিলিয়ে গেছে কত-না-শোনা কাহিনি। কুয়াশায় ব্যালকনি ঢেকে যেতে, বিপুল বলল, ঘরে চলুন।

অদৃশ্যপ্রায় অতীনের কণ্ঠস্বর শুনল বিপুল, এই কুয়াশা কাটতে দুদিন লাগবে।

কেন? বিপুল জিজ্ঞেস করল।

এই পাহাড়ি দেশে কুয়াশা এলে এমনই আসে, সারাদিন রোদ ওঠে না, দুহাত দূরের কিছুই দেখা যায় না, অন্ধের মতো হয়ে যায় মানুষ, সাড়া দিয়ে দিয়ে পথ চলে।

হয়তো আগামীকাল  দুপুরের দিকে রোদ উঠবে। বলল বিপুল।

না, আমি টের পাই মশায়, কাল আমরা ফিরতে পারব না। বললেন অতীন, এই কুয়াশা প্রাচীন কুয়াশা, এর কোনো শেষ নেই মনে হয়, অবরুদ্ধ ছিল কোথাও, কোনো গুহায় হতে পারে, বনের ভেতর হতে পারে, কোনো জলাভূমির ভেতরে হতে পারে, এখন  ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসছে, সমসত্ম রাত ধরে আসবে।

অতীনকে আবছা দেখতে পাচ্ছিল বিপুল। ব্যালকনির আলো কুয়াশায় ঢেকে গেছে। সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কুয়াশা চেনেন?

চিনি, আমি একবার সে অনেক বছর আগে, তখন আমার বয়স বছর-পঁচিশ, স্বাধীন দেশে মিলিটারি শাসন, বঙ্গবন্ধুর ইমেত্মকাল হই গেসে। দেশে খুব অরাজক। হঠাৎ শুনলাম মিলিটারি আসতেছে নেত্রকোনা, ধরপাকড় হবে,  আমরা সবাই এই সুসং চলি এইসিলাম মিলিটারির ভয়ে, তখন খুব অত্যাচার চলসিল, ধরপাকড়, জেল, ফাঁসি, গুলি, বিচার ছিল না। সেসময়  একদিন সকালে কী মনে হলো, আমি বেরলাম গারো পাহাড়ের দিকে ঘুরতে। ওদিকি একটা গ্রাম আছে, সেখেনে নাকি গারো রাজার একটা গড় আছে। দুর্গ। ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে রাজা সোমেশ্বর পাঠক এই পাহাড়তলি জয় করার আগে তো গারোদের রাজত্ব ছিল এই অঞ্চল। আমি শুনেসিলাম, সেই দুর্গে গারো রাজা থাকেন নাকি একা। সাতশো বছর বেঁচে আছে গারো রাজা। কথাটা যে সত্যি না, তা বুঝতে পারা যায়। কিন্তু মানুষে বলে তা। বলে সুখ পায়। সেই দুর্গ নাকি পাহাড়ি বনের ভেতরে হসত্মীর দেশে রয়ে গেছে। সেই দুর্গে রাজা বা রাজার বংশধর থাকেন। কথাটা শোনা যায়, কিন্তু কেউ স্পষ্ট বলতে পারল না। আমি অধিকন্তু শুনলাম, হসত্মী প্রহরায় একা থাকেন দুর্গাধিপতি। সেই গারো রাজার মরণ হয় নাই। তিনি আবার হসত্মী সৈন্য নিয়া নেমে আসবেন নিজ ভূমি পুনরুদ্ধারে। সেই ভূমি সিমসাং নদীর ধারের সুসং দুর্গাপুর।

বিপুল বলল, এমন রাজার কথা বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসে আছে।

জানি, কিন্তু পরাজিত গারো জাতি এই বিশ্বাস করে, শুধু রাজা আছেন আর কেউ না, রানিও না, রাজকন্যাও না, এখেনে সেই রাজার কথা আছে যিনি তাঁর হারানো দেশ ফিরে পেতে শত শত বছর বেঁচে আছেন, বন-পাহাড়ে দুর্গের ভেতরে থাকেন, আসবেন আসবেন, দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসবেন।

মানুষ কত কল্পনা করতে পারে! বিপুল মন্তব্য করে।

কল্পনা নয়, পরাজিত মানুষের সুপ্ত আকাঙক্ষা। অতীন বললেন,  পাহাড়টা কত কাছে, অথচ যাইনি, পাহাড় আমারে কদিন ধরে টানতেসিল, গারো রাজা টানতেসিল, পাহাড়ের পথ জানেন তো, পাকদ-ী, ঘুরে ঘুরে উঠে গিয়ে জঙ্গলের ভেতরে হারাই যায়, এক পথ থেকে আর এক পথ বের হয়। আবার কোনো পথ নিচেও নেমে যায় কোনো একটা জায়গা থেকে, আমারে যেন ভুলোয় পেইসিল, পাহাড় আমারে ডাকতিসিল। আমি চলসিলাম। গোধূলি আলোর মতো কুয়াশার ভেতরে  আমি দেখতে পেলাম সমুখে অনেক দূরে ছায়ার মতো একটা মানুষ যায় যেন। ওই যে বলেছিল কে, রাজার লোক থাকে পাহাড়ে, সে হতে পারে। আমি ভাবলাম ডাকি, গারো রাজার বাড়ি কোথায় তা জিজ্ঞেস করি, কিন্তু চতুর্দিক এত নিসত্মব্ধ, পত্র মর্মর ব্যতীত আর কোনো শব্দ নেই, আমি তারে ডাকতে পারলাম না। কিন্তু মনে হলো সেও রাজার বাড়ি যাচ্ছে। দীর্ঘদেহী, গৌর বর্ণ। মাথার চুল ঘাড়ের কাছে লুটোচ্ছে। আমি দূর থেকে তার পিছু ধরলাম।

 

দুই

বিপুল মানুষটাকে আবছা দেখতে পাচ্ছিল এত সময়, এবার কথা বলতে বলতে মুছে যেতে লাগলেন অতীন সরকার। বিপুলের ভয় করল। কুয়াশার এমন নিশ্ছিদ্র আবরণ সে দ্যাখেনি। মনে হলো, কথা বলতে বলতে হারিয়ে যাবেন অতীন। তাই বলছেন অতীন, পাহাড়ে গিয়ে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন হঠাৎ আসা কুয়াশার ভেতর। তারপর সেই কুয়াশার ভেতরে কুয়াশাচ্ছন্ন এক মানুষ … – বলতে বলতে থামলেন অতীন। চুপ করে থাকলেন। বিপুল টের পেল আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। ভিজে যাচ্ছে গায়ের আলোয়ান। সে বলল, ভেতরে চলুন, শুনব, বাইরে থাকা যাচ্ছে না।

হুঁ, আমার হাত ধরেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন অতীন। বিপুল আন্দাজে হাত বাড়ায়। কিন্তু স্পর্শ করতে পারল না অতীনকে।  অতীন বললেন, আফনে ভুল দিকে হাত বাড়াইসেন মশায়।

তবে? কথার মুখে হাত বাড়ায় আবার সে। কিন্তু খুঁজে পায় না অতীনকে। অতটুকু ব্যালকনি, লোকটা গেল কোথায়? দু-ফুট দূরের মানুষও দেখা যাচ্ছে না। অতীন বললেন, ঘরে যান, আমিও ঘরে যাব, আমার ভয় করতেসে মশায়।

বিপুল আন্দাজ করে ঘরের বন্ধ দরজার দিকে ফিরল। দরজা স্পর্শ করে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল বিছানায় বসে আছেন অতীন। গায়ে টেনে নিয়েছেন কম্বল। বললেন, চোখ জড়িয়ে আসছিল, বাইরে খুব কুয়াশা পড়ল নাকি?

সেই কুয়াশা আরো ঘন, কিন্তু আপনি তো -?

বিপুল চুপ করে গেল। সমসত্মটা কেমন বাসত্মব-অবাসত্মবের সীমারেখা ভেদ করে যাচ্ছে। অতীন বললেন, এই প্রাচীন কুয়াশা বহু বছর বাদে আমি দেখতে পেলাম।

হ্যাঁ, আপনি বলেছেন। বলল বিপুল।

আমি কি একই কথা বলে যাচ্ছি? বিহবল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন অতীন।

আপনি কি কিছু ভুলে যাচ্ছেন?

কেন বলুন দেখি, মনে হচ্ছে তাই?  কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে সব। বিনবিন করে বললেন অতীন, কুয়াশা যেন স্মৃতির ভেতরে প্রবেশ করেছে।

বিপুল বলল, উত্তরাঞ্চলে এমন কুয়াশা স্বাভাবিক, আমি কিছুদিন আমাদের দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে ছিলাম, সেখানে রোদই ওঠে না শীতের সময় দিনের পর দিন।

মাথা নাড়েন অতীন, বলেন, সে তো হয়, নেত্রকোনাতেও হয়,  কিন্তু কুয়াশার কথা ভাবুন, সে-বছর নাকি কুয়াশা দুদিনের জন্য পাহাড় থেকে নেমে এসেছিল সুসংয়ে, ভেসে গিয়েছিল নেত্রকোনার দিকে, ফলে আর্মি ঢুকতেই পারেনি, শহরের কাছে এসে ফিরে গিয়েসিল ভয় পেয়ে, অমনি কুয়াশা কেউ কখনো দেখেনি।

বিপুল জিজ্ঞেস করে, তখন আপনি পাহাড়ে?

অতীন বললেন, আমি সেই কুয়াশার জন্ম দেখেসি মশায়, সেদিন রোদ ছিল না বটে, কিন্তু আলো ছিল, সবদিক দেখা যাচ্ছিল, আমি একা একা রওনা হইসি, পাহাড়ি পথে ভেতরে চলেসি, আমার ইচ্ছে গারো রাজার দুর্গ দেখব, পাহাড়ে পৌঁছবার আগে পথে এক বুড়ার সঙ্গে দেখা, সে বলল, আমার যদি ইচ্ছে হয়, আমি নিজেই পথ খুঁজে পাব, পাহাড়ে রাজার লোক থাকেই, দেখা হবে তাদের সঙ্গে। আমি পাহাড়ি পথ ধরে পাহাড়ের ভেতরে প্রবেশ করেসি, কিন্তু কেউ ছিল না কোথাও, বনের ভেতর অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল।

কেমন ছিল সেই পথ? পাথর আর মাটির সেই পথ ঘুরে ঘুরে অনেক ওপরে উঠে গেছে। গাছের পরে গাছ। নিষ্পত্র হওয়া আরম্ভ তখন। অনেক পাতা আছে, অনেক পাতা নেই। পাতা ঝরছে, ঝরেই যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে অনেক দূর। পাহাড়ে পাখির ডাক ছিল। পাতা ঝরার শব্দ ছিল। শীতকাল। অতীন নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন বনে হারিয়ে যাওয়ার আশংকা কম, তাই। কিন্তু কেমন যেন মনে হচ্ছিল, কোন পথে যাবেন বুঝতে পারছিলেন না। যেতে যেতে যদি হাতির দেশে চলে যান? হাতির দেশও আছে গারো পাহাড়ের গহিনে। এ-মুলুক-সে-মুলুক ছেড়ে গেলে আছে গহিন বন। মসত্ম মসত্ম গাছ সেই বনে, বেত, বাঁশ, ছন। অঘোর জঙ্গল সে, দিনেই থাকে রাত আর ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে-জঙ্গল কত বড়! একদিকে এক মুখে হেঁটে গেলে ছ-মাস লাগবে বন পেরিয়ে লোকালয়ে ঢুকতে। অঘ্রাণ থেকে বৈশাখ পার হয়ে যায় সে-বনের ভেতর। লাখে লাখে হাতি থাকে সেই বনের দেশে। একসঙ্গে থাকে তারা, একই মুলুক। সেই বনে হাতি ছাড়া আর কোনো জীবজন্তু থাকে না। তারা হাতির ভয়ে পালিয়েছে, না হয় হাতির পায়ের তলায় মরেছে। শূন্য শূন্য, শূন্য সে-হসত্মীর মুলুক, আসমানে  নাই পঙ্খি, পানিতে নাই মৎস্য। হাতির দল উপড়ে ফেলে বড় বড় গাছ। বৃক্ষ কাঁপে থরথর, হাতির রোষ পড়লে হলো। হাজার হাজার মাইল যাও সেই বনে, কিনারা নাই কোনো। এমন বনে যাদের বাস, তারা যেন নব জলধর মেঘপুঞ্জের মতো বনের মাটিতে ভেসে ভেসে বেড়ায়। দলবদ্ধ হয়ে থাকে যারা, সেই মহাশক্তিধর হাতির দল থেকে কজনকে বের করে আনা বড়ই কঠিন। সে-কাজ করতে মরে পাঞ্জালি আর হাতিখেদার দল। কিন্তু তারা অসম সাহসী তাই ডরে না হাতিরে। পাঞ্জালি না গালি দিলে তার বুকে বল হবে কী করে, ওরে ও হাতি, হাতি কান পেতি হুন, ইধার-উধার করলে তুর কপালে আগুন, হুন হাতি, কান পেতি হুন, কুনা কুনা যাওরে হাতি, উতরদিকা যাও – …। উত্তরে গিয়ে হাতি ফান্দেতে পড়িল। মাইনসের কেরামতি হাতি না বুঝিল হায়, দল ছাড়ি খেদার দিকে হেলিয়া-দুলিয়া যায়। হাতি না চিনে খেদা, যেমন জাল না চিনে মৎস্য, খেদার ভেতরে কলাবন আর তারাবন। তারা গাছ ছোট ছোট গুল্ম, হাতির খাদ্য। খাদ্যের লোভেতে হাতি ফান্দেতে পড়িল, অঘোর জঙ্গল ইহা মনে মনে ভাবিল। বনের পশু বন চিনল না, চিনল তার গুষ্টিমারা কল। এমন করে পাঞ্জালি হাতি ধরা করত, আর সেই হাতি বেচে রাজার ঘরে মণিমাণিক্য আসত। এক হাতির দাম ওজনে সোনার দাম। কিন্তু হাতির দেশে একা গেলে মরণ নিশ্চিত। শোনা যায় গারো রাজার প্রাসাদ হাতির দেশে আছে কোথাও।

ভয় করতে লাগল। কোনো লোক নেই, কাঠুরেরা নেই যে পথ জিজ্ঞেস করে নেবেন। ধীরে ধীরে নিসত্মব্ধতা বেড়ে যাচ্ছিল। অত ওপরে পাখিরা ছিল না। পাখির ডাক থেমে গিয়েছিল। তখন তিনি টের পেলেন, অনেক ওপরে উঠে এসেছেন। সে-সময় অবাক হয়ে দেখতে পান, সামনে কুয়াশা জমে আছে। বনের ভেতর থেকে কুয়াশা যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। কুয়াশার রং মেঘের মতো। মেঘের রং হাতির মতো। কুয়াশা ছেয়ে ফেলতে লাগল বন। এতটা সময় সবদিক ছিল স্পষ্ট। এবার সব অস্পষ্ট হয়ে যেতে লাগল। তাঁকে ঢেকে ফেলল কুয়াশা। কুয়াশায় না প্রবেশ করে তাঁর উপায় ছিল না। কুয়াশার ভেতর হাঁটতে লাগলেন তিনি অন্ধের মতো প্রায়। কত সময় হেঁটেছেন হিসাব নেই। তারপর আচমকা কুয়াশা নেই। সিত্মমিত আলোয় দেখা গেল এক দুর্গ। সেই গারো রাজার দুর্গ। অতি বৃহৎ কাঠের বাড়ি। লম্বায় অনেক। মনে হলো একটি মানুষ দুদিকে দীর্ঘ দু-হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের মুখ দুর্গের মুখ। সেই মুখে প্রাচীন সত্মব্ধতা। সেই আলো ছিল গোধূলিবেলার মতো। ছায়া ছায়া আলো বনের বাইরে বিস্মৃত। বন আছে দুর্গের পেছনে। বন আছে অনেকটা দূরে। বন যেন দুর্গটিকে ঘিরে ছিল।

দুর্গ, হ্যাঁ দুর্গ। আমি এক দুর্গের সমুখে দাঁড়িয়েছিলাম। পাথর আর কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা সেই দুর্গের গড়ন ছিল পুব দেশের প্যাগোডার মতো। কাঠের লম্বা বারান্দা। কাঠের কারুকাজ তাকিয়ে দেখার মতো। রাজার বাড়ির জানালা-দরজা খোলা ছিল। আমি সম্মোহিতের মতো প্রবেশ করলাম ধূসর দরজা দিয়ে। এখন মনে হয়, কুয়াশার ভেতর লুকিয়ে থাকে যে-বাড়ি, তার দরজাও ছিল কুয়াশার পর্দা। তখন সেই পর্দা সরে গেছে। বুঝতে পারলাম, কুয়াশার ধূসরতা ছিল দুর্গের প্রাচীর। লম্বা এক পথ ছিল আমার সমুখে। সে-পথ আমাকে নিয়ে গেল রাজদরবারে। দরবার খুব সাধারণ। অতিবৃদ্ধ  এক গারো পুরুষ বসেছিলেন লম্বা কুশনে ঠেস দিয়ে। ঘরে আর কেউ ছিল না। তিনি হাত তুলে ইঙ্গিতে আমাকে আসন নিতে বললেন। আমি একটি নিচু আসনে বসেছি। তিনি ব্যগ্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, সোমেশ্বর রাজা সন্ধি করতে পাঠাল, আমি জানতাম একদিন কেউ আসব পস্তাব নিয়া।

আঁজ্ঞে! আমি বুঝতে পারলাম না।

মুর হসত্মীবাহিনী তখন প্রস্ত্তত ছিল না। বললেন গারো রাজা, হসত্মীযূথ প্রস্ত্তত থাকলে সোমেশ্বর পাঠক পরাসত্ম হয়ে ফিরে যেত কান্বকুব্জের পথে।

আঁজ্ঞে, তিনি তো বেঁচে নেই। আমি বললাম।

নেই! প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন বৃদ্ধ, বিড়বিড় করতে লাগলেন, আমি আছি সে নেই, আহা, আমি পরাজিত রাজা, মুই তাতারা রাবুগার আশীববাদ পাইসি, তিনি মুদের বড় ঠাকুর, তাতারা রাবুগা কইসেন তাই মু রাজা গোয়েরা মুর শোক নিবেদন করলাম, তাই-ই কইসি মু। বলতে বলতে বৃদ্ধ রাজা তাঁর চীবরের মতো গাত্র বস্ত্র দিয়ে চোখ মুছলেন, আমি তো  হিংসা করি নাই, তার ভেতর, আমি নিজেও মেনে নিয়েছিলাম পরাজয়, সে দুর্গ অবধি না এসে নিচে নেমে গেল, হায় তার সঙ্গে আর দেখা হবে না?

আমি বললাম, সাতশো বছর আগে তিনি এদেশে এসেছিলেন।

সাতশো বছর! সেদিনের ব্যাপার, সে কার হাতে মরিসে? গারো রাজা গোয়েরা জিজ্ঞেস করলেন, পাকিস্তানি খানসেনা?

না, তিনি বহুদিন আগে ছিলেন, বহুদিন আগে চলে গেছেন। আমি বললাম।

তুমি তারে মরতি দেখিস? গারো রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

না, আমি দেখব কী করে, আমার বয়ঃক্রম একবিংশতি মাত্তর।

তবে যে বললে সে মরি গিইসে, মরিতে তুমু দেখ নাই?

আমি বললাম, এতদিন কেউ বাঁচে না।

মুই কি বাঁচি নাই, মুই কি মরি গিইসি? জিজ্ঞেস করলেন বৃদ্ধ রাজা।

অতীন চুপ করে থাকলেন।

সোমেশ্বর পাঠক কি বানপ্রস্থে গিইসেন, এই পাহাড়ের দিকে চলা আইসেন? বৃদ্ধ রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

অতীন বললেন, তাঁর জানা নেই। বলতে বলতে মাথানত করলেন। কেননা তিনি দেখছিলেন পরাসত্ম রাজা বিজয়ী রাজার মৃত্যু সংবাদে শোকার্ত হয়েছেন। তাঁর ছিল মু–ত মসত্মক। গাত্রবস্ত্র গভীর কালচে লাল, মুখম-লে অজস্র বলিরেখা, চক্ষুমণি জ্বলজ্বল করছে জলের ভেতর ঝাঁকের মাছের এক একটির মতো।

রাজা বললেন, হে সিমসাং নদী, আমার শোক নিইয়া যাও।

অতীন মোহমুগ্ধের মতো বললেন, শোক গ্রহণ করতে আমার আসা।

রাজা বললেন, মু একা মান্দি, আমি কারে দিয়ে পাঠাব শোকবার্তা, হসত্মীযূথে ডর লাগব মান্দিগণের।

তিনি নেই। সোমেশ্বর সিংহের কথা স্মরণ করালেন অতীন আবার।

বিশ্বাস করি না, সেই এক বসন্তকালে খানসেনা এলো, আমি হাতি পাঠায়ে সব শেষ করে দিলাম, তখনো তো শুনি নাই সোমেশ্বর পাঠক নাই, সে আমার ভাই।

বিপুল জিজ্ঞেস করল, মুক্তিযুদ্ধ আর হসত্মীর কাহিনি কি সত্য?

হুঁ, কাহিনিটা তখন আমি শুনেছিলাম, হাতিরা খেদিয়ে দিয়েছিল খানসেনা। বললেন অতীন, কিন্তু গারো রাজা বললেন যা তা হলো, খানসেনার খবর পেয়ে তিনিই হসত্মীবাহিনী পাঠালেন সুসং দুর্গাপুরে। রাজা বিশ্বাস করেন, সোমেশ্বর পাঠক জয় করলেও রাজ্য আসলে তাঁর। সোমেশ্বর পাঠক তাঁর অধীনেই রাজা হয়ে আছেন। তাঁর অধিকার সাময়িক। প্রজা পালনে তাঁর নিজের অধিকার। প্রজার ভালোমন্দে তিনিই তাদের দেখবেন। বিপদে রক্ষা করবেন। তিনি বললেন, খানসেনা আসার খবর তিনি পেয়েছিলেন বনের পঙ্খির কাছে। বনের পঙ্খিরা পাহাড় থেকে উড়ে যায়, খবর নিয়ে আসে। সেই পঙ্খি নাকি হলুদ পঙ্খি। খবরিয়া হলুদ পঙ্খি। হলুদ পঙ্খি খবর দিলে তিনি কুয়াশা নামিয়ে হসত্মীসেনা পাঠিয়ে খানসেনাদের পরাসত্ম করেছিলেন।

আপনি কোনো নারীকে দেখেননি সেখানে?

অতীন বললেন, না তিনিই একা, আর কেউ ছিল না, এক আশ্চর্য গোধূলিবেলায় তিনি বসেছিলেন। জানালা ছিল সেই ঘরে। বড় বড় দুটি। জানালার বাইরে ঘন কুয়াশা। কুয়াশার পারে কী ছিল তা দেখা যাচ্ছিল না। গারো রাজা বলছিলেন, আবার কুয়াশা নামিয়ে দিয়েছেন সুসং থেকে পূর্বধলা, নেত্রকোনা পর্যন্ত, সমসত্ম জায়গা ছেয়ে আছে নীরন্ধ্র কুয়াশায়, সেনাবাহিনীর সাধ্য কি সেই কুয়াশা ভেদ করে এগোয়, সেনাবাহিনী  ফিরে যাবে, ভয় নেই। হাত তুলে অভয় দিলেন তিনি।

আজ কুয়াশা নামল কেন? বিপুল জিজ্ঞেস করে।

হয়তো এমন কিছু ঘটত, ঘটতে যাচ্ছিল, ঘটতে পারল না। অতীন বিড়বিড় করলেন, বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে সুসং দুর্গাপুর কিংবা কেউ কেউ?

সেই যা ঘটতে পারত তা কি পা-ুলিপিতে নেই? বিপুল জিজ্ঞেস করে।

অতীন চুপ করে থাকলেন। বিপুল ভাবছিল পা-ুলিপিই সত্য। পা-ুলিপিতে আছে কিন্তু জানা যাচ্ছে না। পা-ুলিপি ক্রমাগত দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। দশ হাজার হয়ে যাচ্ছে এক লাখ। বিপুলের মনে হয়, সে যা দেখতে এসেছিল পিতৃভূমিতে, তার অনেক বেশি পেয়ে গেছে যেন। আরো আছে। মানুষের অদম্যতার কাহিনি শেষ হয় না। কুয়াশার ভেতর থেকে তা ক্রমাগত বেরিয়ে আসতে থাকে। এই যে কুয়াশা, এর ফলে যে-লোকটি ছুরি হাতে বেরিয়েছিল কারোর রক্ত দেখার নেশায়, যে-ঘাতক ভেবেছিল শেষ করে দেবে নিরীহ পরিবারটিকে, যে-শয়তান ভেবেছিল লুট করে আনবে যুবতীকে, সে কুয়াশায় ঘুরছে, পৌঁছতে পারছে না। ঘাতকেরা পথ হারিয়েছে। কত মৃত্যুদুয়ার থেকে ফিরে গেল।

পরদিন কুয়াশা কাটল না। সূর্য ওঠেইনি যেন। কুয়াশায় নেত্রকোনা ফেরা যাবে না। বরং অতীনের কাছে বাকিটা শুনে নেওয়া যাক। বাকিটা মানে ১৯৪৫-এ নেত্রকোনায় কৃষক সম্মেলন। মণি সিংয়ের ডাকে হাজং, গারো চাষারা, মুসলমান চাষারা, নমঃশূদ্র চাষারা চলল নেতেরক’না। কিশোরগঞ্জের কবিয়াল নিবারণ প–ত গান বাঁধল মণি সিংকে নিয়ে,

শুনেন যত দেশবাসী, শুনেন ভাই গরিব চাষী, শুনেন সর্বজন,

কৃষক দরদি মণি সিংহের বিবরণ

সংক্ষেপেতে দু এক কথা হে করিব বর্ণন।

কী কথা, না রাজবাড়িতে মণি সিং, রাজার ভাগিনেয় দেখে টঙ্ক ধান দিতে এসে হাজং চাষাদিগের কি না হয়রানি। নববই তোলায় সের ওজন ধান নিয়ে এসে শোনে রাজার পেয়াদা একশ তোলায় সের চায়। না দেবে তো ধান নেবে না। বসে থাক। রাজা বলেছেন বৈকালে বাহির আঙিনায় আসবেন। তখন বিচার হবে, একশ তোলায় সের নেব না নববই তোলায় সের। থেমে থাকা আন্দোলন আবার শুরু হলো। রব উঠল,

নববই তোলায় সের সের।

কত ঠকাইসো, ঢের ঢের \

মণি সিং ডাক দিয়েসে।

টঙ্ক দিতা না কহিসে।

টঙ্ক দিবা না, টঙ্ক না।

মিছিল যায় নেতেরক’না।

মিছিল চলল নেত্রকোনা। ময়মনসিংহ তখন বাংলার সবচেয়ে বড় জেলা। সারাভারত কৃষক সম্মেলন সেখানে। নেত্রকোনায় কত মানুষ এসেছিল? লক্ষাধিক মানুষ। শুনেছেন অতীন, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। তাঁরা এসেছিলেন। শুনেছেন অতীন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টির জনযুদ্ধ পত্রিকায় প্রতিবেদন লিখেছিলেন। শুনেছিলেন অতীন, গারো পাহাড় থেকে হসত্মীযূথ এগিয়ে এসেছিল। তারা নাকি সব পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছিল যাতে পুলিশ, মিলিটারি, জমিদারের লেঠেল নেত্রকোনায় প্রবেশ না করতে পারে। এসব শোনা কথা। মিছিল পার করে হাতিরা দাঁড়িয়েছিল কংস নদের পাড়ে। নদী ঘাটে। আবার হাতিরা এসে দাঁড়িয়েছিল নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ রাস্তার ওপর। মিলিটারি-পুলিশ না ঢুকতে পারে শহরে। সব শোনা কথা। কার কাছে শোনা, কে বলেছিল কেউ বলতে পারবে না। অতীন বলছেন, গারোরাজার কাছে শোনা হয়তো। গারো রাজা সেই কুয়াশাঘেরা প্রাসাদে বসে কত কথা শুনিয়েছিলেন তাঁকে। মনে হয় ময়মনসিংহর এই নতুন উপাখ্যান গারোরাজার লেখা। তাঁর কাছে পা-ুলিপি হস্তান্তর করেছিলেন তিনি।

বিপুল জিজ্ঞেস করে, নেত্রকোনার কৃষক সম্মেলনের কথা শুনেছিলেন রাজার কাছে?

মনে হয়, হসত্মীসেনা পাঠিয়েছিলেন গারো রাজা।

আপনি কল্পনা করেছেন? বিপুল জিজ্ঞেস করল।

জানি না, কল্পনা না বাসত্মব। অস্ফুট গলায় বললেন অতীন, কিন্তু গারোরাজা যে রক্ষা করেন তাঁর প্রজাদের তা বিশ্বাস করে গারো সম্প্রদায়। বিশ্বাস করে, গারো রাজা আছেন। গহিন অরণ্য পাহাড়ে আছেন তিনি। শুনুন আমি শুনেছি না দেখেছি তা বলতে পারব না, কিন্তু গারোরাজা বিলীন হয়ে গেছেন যে অরণ্য পাহাড়ে, তাও সত্য। আসলে আমি কী লিখব আর লিখব না, তা নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়েছি। আমার সেই কাহিনি এই কাহিনিতে জুড়তে পারে কিনা, তাও বলা সম্ভব নয়, আমি শুধু বলি কি দেখেছিলাম, কি না দেখেও ভেবেছিলাম দেখেছি  তা এই পা-ুলিপির ভেতরে রেখেছি নিজের মতো করে।

কী হয়েছিল শেষ অবধি? বিপুল জিজ্ঞেস করে।

বলছি। গারো রাজা আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, আমি উত্তর দিচ্ছিলাম। গারোরাজা বললেন তখন, সোমেশ্বর পাঠক আসছে, তুমি কি পথে তাকে দেখোনি?

তিনি আকাশের তারা হয়ে গেছেন। অতীন বলেছিলেন।

তবে কি আসমানের তারা নেমে আসছে, হলুদ পঙ্খি কি জানে না? বিড়বিড় করতে লাগলেন গারো পাহাড়ের রাজা।

 

তিন

পাখিটা উড়তে উড়তে এলো রাজার বাড়ি। হলুদ রঙের লেজ, হলুদ রঙের পিঠ, আবছা লাল রঙের পেট আর আর মাথাটি হলুদ পালকে ভর্তি। সেই পাখি আসলে হলদে পাখি। হলুদ পঙ্খি। এমন এক নাম টঙ্ক আন্দোলনের সময় খবরিয়া ইমতিয়াজ আলী বানেশ্বর দিয়েছিল তার বিবিকে। ইমতিয়াজ আলী বানেশ্বর নিখোঁজ হয়েছিল। রাজার বাড়ি তাকে নিখোঁজ করে দিয়েছিল, খবরিয়া রাজাবাড়ির কথামতো খবর দিয়ে ঘুরছে না। খবরিয়ার কাজ তো রাজার গুণগান করা। সে কি না টঙ্ক বিদ্রোহের খবর নিয়ে ঘুরত। খবরিয়া নিখোঁজ হলে গারো রাজা হলুদ পঙ্খিরে ডাক দিলেন। আয় মা, কংস নদীর মা, খবর নিয়ে আয়। খবরিয়ার কাজটি তুই কর। তখন থেকে এই হলুদ পঙ্খি গারো রাজার খবরিয়া। রাজা তারে ডাকে হলুদ পঙ্খি নামে। শুনুন সে হলো খবরিয়া পঙ্খি। এক জন্মে মানুষ ছিল, খবরিয়া বানেশ্বরের বিবি ছিল, সুকৃতির জন্য পরজন্মে পাখি হয়েছে। সে খবর নিয়ে আসে রাজার বাড়ি। সে উড়তে পারে অনেক উঁচু দিয়ে। ফলে পাহাড়তলির মানুষ তাকে তীর দিয়ে ভেদ করতে পারে না। বন্দুকের গুলিতে বিদ্ধ করতে পারে না। তার চোখের খুব জোর। কত উঁচু থেকে সে সব দেখতে পায়। কী দেখতে পায়, না গারো রাজার দেশে হচ্ছে কী। অত্যাচারী সেনাবাহিনী আসছে কি আসছে না, খারাপ মানুষ ভালো মানুষের ওপর অত্যাচার করছে কি করছে না, সিমসাং নদীতে বান এলো কি এলো না, নদীর ভেতরে নৌকোডুবি হলো কি হলো না, এসব খবর নিয়ে খবরিয়া হলুদ পঙ্খি উড়ে আসে পাহাড়ে। এই সিমসাং নদীর রাজার রাজধানীতে, রাজার কুয়াশাঘেরা বাড়িতে। রাজায় রাজায় যে-যুদ্ধ হবে তা রাজার বাড়ির কেউ জানত না। রাজা না, সেনাপতি না। যুদ্ধ হয়নি কোনোকালেই। কে আসবে যুদ্ধ করতে? যুদ্ধ মানে হিংসা। হিংসা মানে রক্তপাত, মৃত্যু। তার বিরোধী ছিলেন গারোরাজা। যুদ্ধে খুব বিতৃষ্ণা ছিল গারোরাজার, তাই যুদ্ধ হয়নি। কী হয়েছিল সে-সময়? সিমসাং নদীর দেশের রাজা বলেন, কিছুই হয়নি, সোমেশ্বর পাঠক আসতেই পারেনি রাজার বাড়ি দখল করতে। এলে ভয়ানক কিছু হতো। রাজার বাড়িতে আগুন লাগত। রক্তপাত হতো। তখনো এক হলুদ পঙ্খি এসে খবর দিয়েছিল। খবরিয়া পাখি খবর দিয়েছিল। আসছে। রাজামশায় তারা আসছে দামামা বাজিয়ে। যুদ্ধ করবে। যুদ্ধ! ১৮ ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকা সেনাপতি পালিয়ে বনে চলে গেল। মন্ত্রী আর দেওয়ান মনে মনে ভেবে নিল ভিনদেশিরা এলেই তাদের দলে চলে যাবে। কিন্তু কিছুই হলো না। রাজা এসে দাঁড়ালেন বনের ধারে খোলা আকাশের নিচে। যুদ্ধের ভেরি বাজাতে বাজাতে আসছে ভিনদেশিরা। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন আয়। এলো। কে এলো? যোদ্ধারা, না হসত্মীসেনা? হসত্মীসেনা দিয়ে প্রতিরোধ করলে ভিনদেশিরা মরত সব। কিন্তু হসত্মীসেনা প্রস্ত্তত নেই বলেছিল সেনাপতি। বলে বনপথ দিয়ে সোমেশ্বর পাঠকের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। রাজা কিছুই না করে কুয়াশা ডাকলেন। কুয়াশা নেমে এলো আচমকা। আকাশ থেকে ঝরে পড়তে লাগল যেন। কুয়াশায় ছেয়ে গেল বন-পাহাড়। কুয়াশার দেয়াল উঠে গেল রাজবাড়ির সবদিকে। সোমেশ্বর পাঠকের সৈন্য আর ভেরিবাদকরা কুয়াশায় পথ হারিয়ে সাতদিন ঘুরেছিল পাহাড়ে আর বনে। তারপর নামতে পেরেছিল নিচে।

হলুদ পঙ্খি হলুদ পঙ্খি, কী খবর?

হলুদ পঙ্খি খবর দেয়, সেই কতদূর থেকে মিলিটারি আসছে ট্যাংক, কামান, বন্দুক, রাইফেল নিয়ে পাহাড়তলির রাজার দেশে।

পাহাড়তলির রাজা সোমেশ্বরের কোনো রাজ্য নেই, আমার রাজ্য সে নিয়েছে, আমি দিয়েছি তাই নিয়েছে, প্রজারা সব আমার। সিমসাং নদীর রাজা বলল।

কেউ বাঁচবে না কামানের হাত থেকে, পাকিস্তানি সেনা নেমেছে যুদ্ধ করতে, যুদ্ধে কোনো বিপক্ষ নেই, আছে প্রজারা, তাদের কোনো বন্দুক নেই, তারা চাষবাস করে খায়। হলুদ পঙ্খি বলল।

যা বলেছিল খবরিয়া পাখি সব সত্যি। সেই যে অনেক বছর আগে সে দেশে মুক্তিযুদ্ধ লাগে। পাকিস্তানি মিলিটারির কামান-বন্দুকের বিরুদ্ধে দা-কুড়ুল নিয়ে যুদ্ধে নামে সে দেশের মানুষ। সেই তখনকার কথা হচ্ছিল রাজা আর খবরিয়ার। রাজা বলল, আমার প্রজা, রক্ষা করব আমি।

পাহাড়তলিতে পাকিস্তানি সেনা আসতে না আসতে কুয়াশা নামল দশদিক জুড়ে। আর সেই কুয়াশার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল হাতির পাল। পাকিস্তানিরা পালিয়েছিল। পালাতে গিয়ে নদীর জলে ডুবে মরেছিল। হাতির পায়ের তলায় পিষে মরেছিল।

এ-খবর তো জানা খবর, আগেই শোনা। বিপুল বলল।

হ্যাঁ, আগেই শোনা আগেই বলা আগেই লেখা – মানুষ কত না কল্পনা করতে পারে, কিন্তু বৃদ্ধ রাজা যে হলুদ পঙ্খির খবর শুনে প্রতিরোধ করেন, তা যে সদ্য জানা হলো।

রাজার মুখের কথা এসব। সাতশো বছর ধরে খবরিয়া হলুদ পঙ্খি কত খবর নিয়ে উড়ে এসেছে। রাজা শুনেছে আর চুপ করে থেকেছে। বন্যায় ফসল নষ্ট, চাষিদের খুব কষ্ট। রাজা বললেন, পরের সনে বানা হবে না, চাষ হবে ভালো, আমার প্রজাদের কষ্ট হবে না।

কত খবর আসে। একটা শয়তান লোক দলবল নিয়ে খুব ঝামেলা করছে। চাষিদের ঘরে আগুন দিচ্ছে, চাষিদের ফসল লুট করছে। রাজা হাতি পাঠালেন। অন্ধকার রাতে হাতি নেমে গিয়ে লোকটাকে শুঁড়ে করে তুলে এনে বনের ভেতরে ছেড়ে দিলো, কুয়াশায় ঘিরে দিলো তার চারদিক। সেই কুয়াশা থেকে লোকটা বেরোতে পারেনি। খারাপ লোককে কুয়াশার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে শাসিত্ম। রাজার বাড়ি অভিযান করতে এসে ফিরে গেছে ব্রহ্মদেশের রাজা। কুয়াশায় দিক্ভ্রান্ত হয়েছিল তারা। তো আমার সমুখে সেই খবরিয়া এক হলুদ পঙ্খি বসল রাজার সমুখে। খবরিয়া খবর আনল একটা লোক আসছে। সে দেখেছে একটা লোক আসছে। রাজার বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে একটা লোক আসছে। কেমন মানুষ সে?

খবরিয়া হলুদ পঙ্খি বলল, এমনি মানুষ।

এমনি মানুষ! রাজার বাড়ি আসছে কেন?

হলুদ পঙ্খি খবরিয়া বলল, এমনি আসছে।

এমনি মানে কী? সিমসাং নদীর বুড়ো রাজা জিজ্ঞেস করল।

এমনি মানে এমনি, লোকটা আসছে রাজার বাড়ি দেখতে।

রাজা বললেন, গারো পাহাড়ে রাজার বাড়ি আছে তা কে বলল?

শুনেছে সে। পঙ্খি বলল, সবাই জানে গারো পাহাড়ে গারো রাজার বাড়ি আছে, কিন্তু কেউ খুঁজে পায় না, লোকটা শুনেছে তাই।

কে শুনাল? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

কেউ না রাজামশায়, এমনি শুনেছে।

এমনি শোনা যায়? রাজা জিজ্ঞেস করল।

যায় মশায় যায়, বাতাসে রাজার বাড়ির কথা ভেসে বেড়ায়।

তার হাতে অস্ত্র আছে? রাজা জিজ্ঞেস করেন।

না মশায়, সে শান্ত মানুষ।

শান্ত মানুষ এতদূর আসে কেন?

খবরিয়া পঙ্খি বলল, এমনি আসে মহারাজ, কুয়াশা হয় না যেন মশায়।

মশায় গারো মহারাজ বলল, রাজার বাড়ির পথ কেউ জানবে না, কুয়াশা হবে তবু সে আসবে এখানে, আসুক সে, কিন্তু এসে করবে কী?

রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। খবরিয়া হলুদ পঙ্খি বলল।

কেন সাক্ষাৎ করবে? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

এমনি মশায়, এমনি। খবরিয়া পঙ্খি বলল।

এমনি এমনি আর এমনি, এমনির বাইরে হয় না কিছু? রাজা অধৈর্য হয়ে বললেন।

সে জানে মশায়, সে এক ভালোমানুষ। খবরিয়া হলুদ পঙ্খি বলল।

ভালোমানুষ তো আসা কেন?

পাখি শিস দিয়ে উঠল, পাখি গান গেয়ে উঠল,

সিমসাং নদী, তুমার রাজায় কত না কথা কয়।

সিমসাং নদী আজো দেখি এমনি এমনি বয়।।

এমনি আলো এমনি কুয়া, এমনি মানুষ ভালো।

এমনি জগৎ এমনি পাহাড় এমনি এত আলো \

রাজা বললেন, আমার প্রাসাদে ভালোমানুষ আসবে, তাকে কী দিয়ে আপ্যায়ন করব?

পঙ্খি বলল, আমাদের খেজুর রস আর পিঠাপুলি, আর হরিণের দুধ।

তারে আমরা কী দেব, কোনো মণি-রত্ন? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

হলুদ পঙ্খি বলল, বাঁশের ঝুড় আর বেতের ধামাভরা আপেল আর কমলালেবু সবুজ লেবু জাম্বুরা দেব।

রাজা তখন বললেন, তাহলে যাও দেখে এসো, কেমনে সে আসে, ঠিকপথে আসে না ভুল পথে যায়?

যাওরে হলুদ পঙ্খী যাও খবরিয়া,

আসো তারে নিয়া।

কুয়াশায় কুয়াশা নামে

আসে কোন পথ দিয়া \

লোকটা পাহাড়ের পথে কিছুটা চলে আচমকা দেখল কুয়াশা নেমে এলো। দুর্ভেদ্য কুয়াশা। এক হাত দূরের কিছু দেখা যায় না। কিন্তু সে জানত এমনি হবে। কুয়াশার ভেতরেই আত্মরক্ষা করে সিমসাং রাজা। কুয়াশার প্রাচীরের ভেতরই রয়েছে রাজার বাড়ি। গারো পাহাড় আর সিমসাং নদীর রাজার বাড়ি যাচ্ছে সে। সে অন্ধের মতো চলতে লাগল। গারো পাহাড়ে এক রাজার প্রাসাদ আছে, সে তাদের দেখতে এসেছে। দেখে ফিরে যাবে, আর কিছু নয়। মানুষ এমনি কত কিছু দেখে ফিরে যায়, সমুদ্র, হ্রদ, নদী, পাহাড়, জঙ্গল, সূর্যাসত্ম, সূর্যোদয়, কত কিছু। এমনিই দেখে ফিরে যায়। সেও এমনি দেখে ফিরে যাবে কি যাবে না, তা পরের সিদ্ধান্ত। আর কিছু নয়। এই যে এত কুয়াশা, এমনি কুয়াশা এলো কোথা থেকে, সে শুনেছিল, কুয়াশা পেরিয়ে যেতে হবে রাজার বাড়ি। কত পথ যেতে হবে, কত দূর তা জানে না লোকটি। সে নিজের মতোই চলছিল। ভুল না ঠিক পথ জানে না। কিন্তু যেতে যেতে তার মনে হলো কুয়াশার ভেতরে কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে। সে ডাক দিলো, কেউ আছ, আমি রাজার বাড়ি যাব, কোন পথে যাব?

হলুদ পাখি খবরিয়া ছিল একশাল গাছের ডালে, বলল, যে-পথে যাও, রাজার বাড়ি পৌঁছবে।

কোন পথে তাড়াতাড়ি পৌঁছব?

খবরিয়া পাখি  বলল, যে পথে যাও, একই দূর।

রাজার বাড়ি উত্তরে না দক্ষিণে, পুবে না পশ্চিমে?

উত্তরদিক দিয়ে যাওয়া যায়, পুবদিক দিয়েও যেতে পার, পশ্চিমে রাজার বাড়ি আবার দক্ষিণেও সেই একই বাড়ি, গারো পাহাড় আর  সিমসাং নদীর রাজা তোমার জন্য বসে আছে ধামাভরা ফল-পাকুড় আর গজা কদমা নিয়ে। হলুদ পঙ্খি বলল।

লোকটা নিশ্চিন্ত হয়। এমনিই শুনেছিল বটে। সে জিজ্ঞেস করল, আর কত সময় লাগবে?

হলুদ পঙ্খি বলল, সময় কী তা তো জানি না, তুমি ঠিক পৌঁছে যাবে।

লোকটি অনেক লম্বা, স্বাস্থ্যবান, গৌরবর্ণ, সে চলল কুয়াশার ভেতরে। চলতে চলতে চলতে, আচমকা দেখল কুয়াশা নেই। বিকেলের আলো যেন মুছে যেতে যেতেও রয়ে গেছে। রোদ নেই। আলোর ভেতরে সূর্যাসেত্মর লালচে ভাব।

তখন গারো রাজার সমুখে বসে অতীনের মনে হচ্ছিল রাজার বাড়ি নয়, এক বিভ্রমবাড়ি এসে পড়েছেন তিনি। তিনি স্পষ্টই দেখলেন, কুয়াশার প্রাচীর ভেদ করে এক রাজপুরুষ প্রবেশ করল রাজার বাড়ি। এঁকে তিনি বনের ভেতরে দেখেছিলেন। তাঁর সমুখে অনেক দূরে হেঁটে চলেছিলেন তিনি। তিনিই রাজা সোমেশ্বর পাঠক। সোমেশ্বর সিংহ। আকাশের এক তারা।

কুয়াশার দরজা ভেদ করে লোকটা পৌঁছে গেল। রাজার সমুখে অতিথির জন্য একটি আসন। আসনের সামনে পানীয়জল, মিষ্টান্ন। রাজা তাকিয়ে আছেন অতিথির মুখের দিকে। অতিথিও রাজার দিকে চেয়ে আছেন।

রাজা বিস্মিত গলায় বললেন, তুমি?

হ্যাঁ আমি। লোকটি বলল।

তুমি কি এই প্রাসাদ অধিকার করবে? রাজা অকম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

লোকটা মাথা নিচু করল, বলল, আমি সব ফেরত দিতে এসেছি রাজা।

তুমি সোমেশ্বর পাঠক!

হ্যাঁ মশায়, রাজা।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, কী ফেরত দেবে?

যে-রাজ্য জয় করেছিলাম, সেই রাজ্য। বলে দীর্ঘদেহী সেই রাজপুরুষ দু-হাত বাড়িয়ে দিলেন।

রাজা বললেন, আমাকে কোন রাজ্য ফেরত দেবে, রাজ্য তো আমার আছে।

আছে! বিস্মিত হলেন রাজা সোমেশ্বর পাঠক।

আছে, আমার রাজ্য তো আমারই আছে, কিছুই তুমি নিতে পারোনি।

সোমেশ্বর পাঠকের চোখে জল এসে গেল, বললেন, তাই বলছ রাজা?

হ্যাঁ, আমার কিছুই যায়নি রাজা, তুমি কী দেবে?

সোমেশ্বর উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন গারো রাজার দিকে। গারো রাজা, সিমসাং নদীর রাজা উঠে এগিয়ে এলেন। আলিঙ্গন করলেন তাঁরা পরস্পরে। আর তখনই অন্ধকার নেমে এলো। সূর্যাসত্ম হলো। প্রাসাদ আর রাজা সব মুছে গেল জগৎ থেকে। দেখল সব সেই হলুদ পঙ্খি খবরিয়া। সে উড়ে গেল এই কাহিনি নিয়ে। রাজার বাড়ি নেই। দুই রাজা আর নেই। কুয়াশা আর নেই। আমি পাহাড় থেকে ফিরে এলাম। হ্যাঁ, সেই হলুদ পঙ্খি আর আমার সামনেই যেন সব ঘটেছিল। অথবা সমসত্মটাই এই পা-ুলিপিতে লেখা ছিল। পা-ুলিপি আমি গারো রাজার প্রাসাদ থেকে নিয়ে এসেছিলাম। পা-ুলিপি থেকেই তো আমি শোনাচ্ছি এই কাহিনি। মৈমনশাহী এই উপাখ্যান।

Leave a Reply

%d bloggers like this: