কল্পনা করুন আপনি একজন শিল্পী, আপনার শিল্পকর্মটি পৃথিবীর বাইরে কোনো উন্মুক্ত গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে। শুধু একটি শিল্পকর্মই সেখানে আছে, অবশ্য আক্ষেপও আছে। কারণ গ্যালারিটি দর্শকশূন্য (নাকি দর্শক আছে!)। মধ্যযুগীয় নাইটদের সাহসী অভিযান আর রুশ-মার্কিন শীতলযুদ্ধ চলাকালীন মহাশূন্য জয়ের প্রতিযোগিতায় নভোচারীদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির সমন্বয় সৃষ্টির ভাবনার বেলজিয়ান শিল্পী পল ভ্যান হয়ডঙ্ক হচ্ছেন আপাতত পৃথিবীতে এমনই একমাত্র শিল্পী, এবং তাঁর আক্ষেপের কারণ বেশ বিস্তারিত। চাঁদের ধুলায় শুয়ে আছে তাঁর নিঃসঙ্গ নভোচারী – ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’। প্রায় সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা অ্যালুমিনিয়ামের ছোট এই ভাস্কর্যটি সৃষ্টি করেছিলেন শিল্পী পল ভ্যান হয়ডঙ্ক।

১৯৬৯ সালের মার্চের এক সকালে শিল্পী হয়ডঙ্ক ম্যানহাটানে তাঁর গ্যালারিতে গিয়েছিলেন, গ্যালারি ডিরেক্টর লুইস ডয়েসম্যান আর মালিক ডিক ওয়াডেলের মধ্যে চলমান বিস্ময়কর একটি কথোপকথনের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। ‘কেন আমরা পলের একটি ভাস্কর্য চাঁদে প্রতিস্থাপন করছি না?’ লুইসের আজব এ-প্রশ্নের উত্তর ওয়াডেল দেওয়ার আগেই হয়ডঙ্ক এই কথোপকথনে প্রবেশ করে মন্তব্য করেছিলেন, ‘তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে? কীভাবে আমরা সেই কাজটি করবো?’ ডয়েসম্যান তাঁর অবস্থানে অটল থেকেই বলেন, ‘আমি জানি না, তবে একটা উপায় আমি বের করবো।’ এবং তিনি আসলেই সেটি করেছিলেন। ১৯৭১ সালে আগস্টের ২ তারিখ, গ্রিনিচ স্ট্যান্ডার্ড সময় ১২:১৮, অ্যাপোলো-১৫ কমান্ডার স্কট সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা অ্যালুমিনিয়ামের একটি ভাস্কর্য তাঁর পার্ক করা লুনার রোভারের কাছে ধুলার ওপর শুইয়ে দিয়েছিলেন।

সেই মুহূর্তে চাঁদ বাতাসহীন একটি পাথর খণ্ড থেকে রূপান্তরিত হয়েছিল আমাদের জানা মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্পকলার গ্যালারিতে। স্কট সেই মুহূর্তটিকে মহাশূন্য-অভিযানের প্রতিযোগিতায় জীবন বিসর্জন দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ বীর নভোচারীদের প্রতি একটি নিবেদন হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। ভাস্কর্যটির সঙ্গে ছিল একটি ফলক, যেখানে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি মোট চৌদ্দজন (আটজন যুক্তরাষ্ট্রের আর ছয়জন রুশ) নিহত নভোচারীর নাম লেখা ছিল।

ভ্যান হয়ডঙ্ক শিহরিত হয়েছিলেন – তাঁর শিল্পকলা পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মানব-নিয়তির নতুন সূচনার দিকনির্দেশ করছে, এবং আশা করেছিলেন, তিনি খুব শিগগির ‘পিকাসোর চেয়ে আরো বড়’ কিছুতে পরিণত হবেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁর চাঁদের ভাস্কর্যটি, ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, উচ্ছ্বাস নয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে ওয়াডেল গ্যালারি বন্ধ হয়ে যায়। নাসা ছাড়তে হয় নভোচারী স্কটকে। জনগণের প্রকল্প থেকে ব্যবসা করে লাভবান হওয়ার জন্য হয়ডঙ্ককে অভিযুক্ত করা হয়, যিনি অতঃপর তাঁর জন্মস্থান বেলজিয়ামে স্বল্পপরিচিত একটি শিল্পীজীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

প্রায় বিস্মরিত একটি ভাস্কর্য আর তিরস্কৃত আশির দশকের এই শিল্পী এখনো ভাবেন, তাঁর সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আমাদের মাথার ওপর ২ লাখ ৩৮ হাজার মাইল উঁচুতে এখনো ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’ আমাদের নক্ষত্র ছোঁয়ার স্বপ্নকে ধারণ করে শুয়ে আছে। হয়ডঙ্ক অবশ্য অতীতে বেঁচে থাকেননি। অ্যান্টওয়ার্পের কাছে একটি শহরতলিতে তিনি তাঁর কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন এবং শিল্পকর্মে মহাশূন্য, গ্রহ, নক্ষত্র আর নভোচারীদের চিরন্তন মূলভাবটি তিনি অপরিবর্তিত রেখেছিলেন।

ষাটের দশকের শুরুতে নিউইয়র্কে একবার বেড়াতে এসে তিনি ওয়াডেল গ্যালারির সঙ্গে যুক্ত হন, এরপর বেলজিয়ামে হয়ডঙ্ক তাঁর প্রথম ‘মহাশূন্য’ ভাবনা নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। জুলভার্নের প্রতি মুগ্ধতা, আর্ট অ্যাকাডেমির স্থবিরতার প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করেই তিনি মহাশূন্য-অভিযানের থিমে ভাস্কর্য নির্মাণ করতে শুরু করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে নিউইয়র্কের ওয়াডেল গ্যালারিতে প্রথম প্রদর্শনীতে তাঁর ‘শিল্পীর বক্তব্য’টি ঘোষণা করেছিল, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক জায়গা হচ্ছে কেপ কেনেডি।’ আর মহাশূন্য নিয়ে তাঁর এই উন্মাদনাই ডয়েসম্যানকে উচ্চাভিলাষী সেই মন্তব্য করার জন্য উদ্দীপ্ত করেছিল। তাঁর প্রাথমিক অবিশ্বাসের পর, খুব সহজে তাকে রাজি করানো সম্ভব হয়েছিল এবং এক মাসের মধ্যে তিনি সম্ভাব্য চাঁদের ভাস্কর্যটির কনসেপ্ট ড্রইং করতে শুরু করেন।

ধারণাটি মূলত ছিল প্রাক্তন বিজ্ঞাপন-বিপণন কর্মী ও গ্যালারি পরিচালক লুইস ডয়েসম্যানের। তিনি বিশ্বাস করতেন, চাঁদে শুধু ভাস্কর্যই স্থাপন করা যাবে না, এটি আবশ্যিকও। তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘তখন মহাশূন্য-যুগ, নক্ষত্রে যাবার প্রতিযোগিতা চলছে, আমি বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করি, কিন্তু একটি উপায় খুঁজে না পাওয়া অবধি আমি থামিনি।’ এরপর ধারাবাহিকভাবে বেশকিছু ঘটনা এবং একজন মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায় হয়ডঙ্ক ১৯৭১-এর জুলাই মাসে নিজেকে নভোচারী ডেভিড স্কট ও তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে নৈশভোজ করতে আবিষ্কার করেছিলেন। তখনো অ্যাপোলো-১৫ অভিযান শুরু হতে আট সপ্তাহ বাকি। স্পষ্টতই স্কট আর হয়ডঙ্কের পছন্দের কিছু বিষয় মিলেছিল, যেমন, প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা আর মধ্য আমেরিকার মায়াদের পুরাণ, এবং একটি পর্যায়ে স্কট তাঁর সহকর্মীদের জানান, ‘দেখো, এই ভদ্রলোক কী বলছেন, এসো, আমরা ওর একটা ভাস্কর্য চাঁদে নিয়ে যাই।’

হয়ডঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরেই কাজে লেগে যান, তাঁর ছেলে শিল্পী প্যাট্রিককে নিয়ে একটি প্লাস্টার আর প্লেক্সিগ্লাসের মডেল তৈরি করে ফেলেন, মানব-ভবিষ্যৎ যার বিষয়। কিন্তু হয়ডঙ্কের ভবিষ্যৎবাদী নান্দনিকতা আর স্কটের গম্ভীর দার্শনিক উদ্দেশ্য সমন্বয় করে শিল্পকর্ম সৃষ্টি বেশ কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। শিল্পী হিসেবে তিনি একা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, তিনি তাঁর শিল্পকর্মের মূল ভাবনায় রেখেছিলেন মহাশূন্য-অভিযাত্রীদের ঐতিহাসিক সেই যাত্রার উত্তেজনা আর বীরোচিত সাহস, ‘আমাদের সন্তানদের কাছে তারা হয়তো স্বাভাবিক, তবে আমাদের পৌত্রদের কাছে তারা পুরাণের চরিত্র।’ কিন্তু স্কট ও তাঁর সহযাত্রীরা ভেবেছিলেন আরো ব্যক্তিগত স্মারকসূচক কোনো কিছু হবে সেই শিল্পকর্মটি, ‘আমাদের সেইসব সহকর্মীকে শ্রদ্ধা জানাতে আমরা একমত হয়েছিলাম, যাঁরা মহাশূন্য-অভিযানের প্রচেষ্টায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। এই তালিকায় আমাদের সোভিয়েত সহকর্মীদেরও আমরা স্মরণ করতে চেয়েছিলাম।’ তখন শীতল-যুদ্ধের সময়, এটি অবশ্যই লক্ষণীয় একটি সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে রুশ-মার্কিন মহাশূন্য জয়ের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়।

লুনার মডিউলে নভোচারীরা কী সঙ্গে নিতে পারবেন সে-ব্যাপারে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। এছাড়া এমন উপাদানে সেই ভাস্কর্যটি বানাতে হবে, যেন সেটি চাঁদে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হবে, যেখানে দিনের তাপমাত্রা প্রায় ২৫০ ডিগ্রি স্পর্শ করে আর রাতে যা নেমে যায় শূন্যের ২৫০ ডিগ্রি নিচে। হয়ডঙ্ক এই নন্দনতাত্ত্বিক এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জটি মোকাবিলা করতে ব্রুকলিনের একটি ঢালাই প্রতিষ্ঠান, মিলগো/ বাফকিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভাস্কর্যটিকে অবশ্যই আকারে ছোট হতে হবে এবং স্কটের নির্দেশ অনুযায়ী এটি যেন বিশেষ কোনো জাতি বা বর্ণ এবং লিঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব না করে, যা তাপমাত্রার চরম তারতম্য সহ্য করতে পারবে। সুতরাং হয়ডঙ্ককে এমন কিছু ডিজাইন করতে হবে যেখানে তাঁর অতীতমুখী ভবিষ্যৎবাদ আর আধ্যাত্মিক প্রকটতা, যা তাঁর অন্য ভাস্কর্যে বৈশিষ্ট্যসূচক, মূলত এই প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়ে যাবে। ‘আমি এর চেয়ে ভালো কাজ করেছি, এটি সেরা ভ্যান হয়ডঙ্ক নয়।’ ব্রুস গিটিনের বানানো ছাঁচে অবশেষে তৈরি হয় মানবসদৃশ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’, যার নির্মাণ-উপাদান ছিল অ্যালুমিনিয়াম, কারণ এটিকে শক্তিশালী আর হালকা হতে হবে। শিল্পী চেয়েছিলেন তাঁর এই অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষুদ্র মূর্তিটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

অ্যাপোলো-১৫ যাত্রা শুরু করার কথা ছিল জুলাইয়ের ২৬ তারিখে (১৯৭১)। ৮১ বছর বয়সে যখন স্কটকে স্মরণ করতে বলা হয়, কীভাবে বিশাল একটি নিবেদিত টিমের কড়া নজরদারির মধ্যে তিনি মূর্তিটিকে গোপনে চাঁদ অবধি নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি স্বীকার করেছিলেন, বিষয়টি তাঁর নিজেরই মনে নেই। কিন্তু চাঁদে যেদিন তিনি পা দিয়েছিলেন তিনি জানতেন তাঁর পকেটে মূর্তিটি আছে। জুলাইয়ের ৩০ তারিখে তাঁদের লুনার মডিউলটি চাঁদে নেমেছিল, স্কট এবং আরইউন সেখানে তিন দিন কাটান। টানটান নিয়মবদ্ধ সময়ের হিসাবে তাঁরা তাঁদের কাজগুলো সম্পাদন করেন।

একেবারে শেষ মূহূর্তে তিনি ফলেন অ্যাস্ট্রোনটের জন্য সময় বের করেছিলেন এবং সেটির একটি ছবি তুলেছিলেন। আর তখনো পর্যন্ত কারোরই সেটির অস্তিত্ব জানা ছিল না। নিয়মমাফিক পুরো চাঁদ-অভিযানে তাঁরা ১১০০ ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে হিউস্টনের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে মনোযোগ ঘুরিয়ে রেখেছিলেন যখন আরউইন আর স্কট ফলেন অ্যাস্ট্রোনটকে চাঁদের প্রথম নাগরিক হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি তাঁর পকেট থেকে মূর্তিটি বের করেন, চাঁদের ধুলোর ওপর সরাসরি সেটি স্থাপন করেন, এর পাশে সেই স্মারকফলকটি রাখেন, যেখানে মৃত নভোচারীদের নামের একটি তালিকা ছিল। নিজের ধর্মবিশ্বাসকে তিনি প্রকাশ করেননি, তবে স্কট আধ্যাত্মিকভাবে তাঁর এই নিবেদনটিকে একটি নীরব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। সামান্য এক মিনিট, তারপর আবার দ্রুত তাঁরা তাঁদের রুটিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর পাঁচ ঘণ্টা পর লুনার মডিউল চাঁদকে পেছনে ফেলে চলে যায় অরবিটিং মডিউলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্যে। তাঁকে যখন শিল্পকলাটিকে চাঁদের মাটিতে রাখার কথা স্মরণ করতে বলা হয়েছিল, তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, আমরা যেন ভুলে না যাই কেন আমরা সেটি সেখানে রেখেছিলাম।

এটি ভুলে যাবার পর্বটি শুরু হয় পৃথিবীতে ফিরে আসার পর থেকে। ডেভিড স্কট সংবাদ সম্মেলনে এটি প্রকাশ করেছিলেন; কিন্তু বিষয়টি আসলেই সেভাবে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। আর নভোচারীদের মনে হয়েছিল, এই কাজটি মৃত নভোচারীদের স্মরণেই তাঁরা করেছিলেন। তিনি তাঁর বার্তায় যোগ করেছিলেন, ‘দুঃখজনকভাবে দুটি নাম এখানে বাদ পড়েছে প্লেক থেকে (ভ্যালেন্টাইন বন্ডারেঙ্কো, গ্রিগরি নেলইয়ুবভ)।’ তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন পশ্চিমা বিশ্ব তাঁদের মৃত্যু সম্বন্ধে পরে জানতে পেরেছে, কারণ সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচিকে ঘিরে থাকা গোপনীয়তা। আরো একজন মৃত্যুবরণ করা নভোচারীর নাম বাদ পড়েছিল, রবার্ট হেনরি লরেন্স জুনিয়র, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী, বিমানবাহিনীর অফিসার, যিনি ১৯৬৭ সালে তাঁর মহাশূন্যযাত্রার প্রশিক্ষণের সময় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। নভোচারীরা এরপর তাঁদের তারকাখ্যাতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর শিল্পী ভ্যান হয়ডঙ্ক অদ্ভুত নীরবতায় তাঁর কাজে ফিরে যান। মানবজাতিকে নক্ষত্রের জগতের দিকে নির্দেশিত করার সেই বিষয়টি ক্রমশ তাঁর কাছে আরো বেশি স্বপ্নের মতো অনুভূত হতে শুরু করেছিল।

নাসার মিশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্কট শিল্পী ভাস্করের নাম উচ্চারণ করেননি, অনেকটাই অজ্ঞাতপরিচয় একটি স্মারক হিসেবে তিনি সেটি চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন, আর স্কট (খুব অদ্ভুতভাবেই) ধারণা করেছিলেন, শিল্পী নিজেও সেটাই চেয়েছেন। শুরুর দিকে এটি মেনে নেওয়া ছাড়া হয়ডঙ্কের আর কিছু করার ছিল না, যদিও তাঁর বোঝাপড়া সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন ছিল। তিনি অ্যাপোলো-১৫ নভোচারীদের লিখেছিলেন, ‘এই শতাব্দীতে মানুষের মহাকাশ অভিযানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন।’ স্কটকে লেখা আলাদা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘দুঃখিত, তুমি চাঁদে পুরনো মন্দির পাওনি, তবে নিশ্চয়ই চাঁদের ওপর হাঁটবার অভিজ্ঞতা তোমাকে ভিন্নমাত্রার একটি বাস্তবতায় নিয়ে গিয়েছিল।’ কিন্তু ক্রমশ ভ্যান হয়ডঙ্ক অস্থির হতে শুরু করেছিলেন এই কৃতিত্বটি না দাবি করতে পেরে, যা তিনি আসলেই মনে করেছিলেন তাঁর ঐতিহাসিক একটি সৃষ্টি। এই মতবিরোধটি স্পষ্ট প্রকাশ পায় সেপ্টেম্বর মাসে, বেলজিয়ামে একটি কনফারেন্সে যখন নভোচারী স্কটের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর, সেখানে তাঁকে বলা হয়, আরো এক বছর এই ভাস্কর্য বিষয়ে কারো কাছে কিছু না বলতে।

এছাড়াও তিনি ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’ নামটি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর মনে হয়েছে, এটি মহাকাশ-অভিযানের উদ্দেশ্য বীরযাত্রা – এমন কিছু নির্দেশ করে না। নভোচারী, বিশেষ করে স্কট তাঁর অনুমতি ছাড়াই এই নামটি ব্যবহার করেছিলেন। নভোচারী স্কট অবশ্য পরে মনে করতে পারেননি কীভাবে নামটি এসেছিল, তবে সম্ভবত সেই সময়ে সয়ুজে অভিযানে মারা যাওয়া তিনজন কসমোনটের কথা মনে করেই এই নামটি তাঁর মনে এসেছিল। নভোচারীদের কাছে হয়ডঙ্কের শিল্পকর্মটি ছিল মূলত একটি নামফলকসহ স্মারক।

কিন্তু পরে যখন এই অভিযান সংক্রান্ত নাসার প্রকাশিত বুকলেটে ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনটে’র ভাস্কর হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, তখন হয়ডঙ্ক আর সহ্য করতে পারেননি। তাঁকে নীরব রাখার একটাই কারণ তিনি ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলেন, আর সেটি হচ্ছে, ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যাবার একক কৃতিত্ব দাবি করার লক্ষ্যে নভোচারীদের একটি চাল। এই ফাটলটি আরো প্রশস্ত হয়েছিল যখন নভেম্বরে তিনি নভোচারীদের কাছ থেকে একটি চিঠি পান যে, স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট চাঁদে রাখা ভাস্কর্যটির একটি অনুলিপি রাখার অনুমতি চাইছে, এবং তারা মনে করে যে, এই প্রস্তাবে তাঁর রাজি হওয়া উচিত, এবং অবশ্যই তাদের একটি হুবহু অনুলিপি দরকার, একই উপাদান, একই রকম দেখতে এবং একটি শিল্পীর সৃষ্টি অনুলিপি। ‘তারা এটি কিনতেও রাজি আছে যদি তুমি আরো দুটো বানাও।’ তবে ভান হয়ডঙ্ক দ্বিগুণভাবে অপমানিত বোধ করেছিলেন, প্রথমত, স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম শিল্পী হিসেবে তাঁর সঙ্গে নয়, বরং নভোচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কারণ শিল্পীর নাম তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কাছে গোপন রেখেছিলেন, এবং সেই আমন্ত্রণপত্রে তাঁকে ভাস্কর হিসেবে উল্লে­খ না করে বলা হয়েছে ‘কারিগর’। আর তিনি কখনোই এই অপমান ভুলতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কারিগর নই, আমি শিল্পী, তোমরা যদি চাঁদে গিয়ে গর্ব করতে পারো, আমিও গর্ব করতে পারি সেখানে আমার একটি ভাস্কর্য আছে।’

পরিশেষে অবশ্য তাঁর অহংকার হার মানে ভবিষ্যতের অমরত্বের আশায়। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামের জন্যে তিনি দুটি রেপ্লিকা নির্মাণ করেন। যাদের একটি তাদের স্থায়ী জায়গা পায় National Air and Space Museum-এ, অন্যটি শিল্পী উপহার দেন বেলজিয়ামের রাজাকে। আর হিউস্টনের একই নির্মাতার কাছ থেকে সেই স্মৃতিফলকটির একটি অনুলিপি তৈরি করার ব্যবস্থা করেছিলেন স্কট।

স্মিথসোনিয়ান থেকে আসা অনুরোধ হয়ডঙ্ককে তাঁর নীরবতা ভাঙতে প্ররোচিত করেছিল। নিউইয়র্কে তাঁর প্রতিনিধি ওয়াডেল গ্যালারির মাধ্যমে ঠিক করা হয়েছিল যে, এটি প্রথম প্রচার হবে সিবিএস নিউজের অ্যাঙ্কর ওয়াল্টার ক্রংকাইটের মাধ্যমে, যিনি অ্যাপোলো-১৬ মিশনের আগে ঘোষণা করবেন চাঁদের ভাস্কর্যটির মূল শিল্পী কে।

১৯৭২ সালের মার্চে হয়ডঙ্ক স্কটকে সতর্ক করে দেন, তিনি টিভি সাক্ষাৎকার দেবেন, চাঁদে প্রথম শিল্পকর্ম নিয়ে। এর উত্তরে স্কট জানান, ‘হয়তো তোমাকে এর উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করা হবে, যে-প্রশ্নটির অর্থপূর্ণ উত্তর শুধু আমরা নভোচারীরা দিতে পারি।’ কিন্তু হয়ডঙ্ক তাঁর চূড়ান্ত মন্তব্য করেন হাতে লেখা একটি নোটে, ‘সিবিএসে যাওয়ার একমাত্র কারণ সেটি ঘোষণা দেওয়া যে, এই শিল্পকর্মটি আমার ডিজাইন করা, যা তোমার স্বাভাবিক বলে মনে করাই উচিত। একজন শিল্পীর কোনো শিল্পকর্মের স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত হওয়ার অধিকার আছে। আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু যেহেতু আমি একমাত্র শিল্পী যাঁর কাজ পুরোপুরিভাবে মহাশূন্যের প্রতি নিবেদিত হিসেবে পরিচিত এবং শিল্পকলার জগতে এই বিষয়ে ক্রমশ কথাবার্তা হচ্ছে। আমি তোমার বার্তা পুরোপুরি বুঝতে পারছি, কিন্তু কোনোভাবে এই স্মারকটিকে আমি খাটো করছি না।’

কিন্তু স্কট এটি পছন্দ করেননি, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, এই অজ্ঞাত থাকার ব্যাপারটি তাঁদের সহকর্মীদের আত্মত্যাগের প্রতি নিবেদিত স্মারকটিকে আরো মহৎ করে তুলেছে। কোনো ধরনের বাণিজ্যিক ভাবনা বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেবে। ১৯৭২ সালে এপ্রিলের ১৬ তারিখ হয়ডঙ্ক টিভিতে ঘোষণা করেন, হাতে একটি রেপ্লিকা নিয়ে, ‘আমি মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিলাম, নক্ষত্রের জগৎই মানুষের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।’ তিনি বলেন, ‘এটি পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম স্মারক ভাস্কর্য।’ কিন্তু কংক্রাইট স্মরণ করিয়ে দেন, ‘না, পৃথিবী নয়, এই মহাবিশ্বে আর চাঁদে এটি রাখা হয়েছে।’

শিল্পী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর তাঁর আশাবাদ ফিরে এসেছিল। এবার নিশ্চয়ই তিনি তাঁর ভাস্কর্যগুলোর জন্যে পরিচিতি পাবেন। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন বেশিদিন টেকেনি। অবাক হয়ে তিনি লক্ষ করেছিলেন সেই সময় মানুষ ‘ফলেন অ্যাস্ট্রোনট’ পছন্দ করেনি, তারা ভাবতে পারেনি চাঁদে এই ভাস্কর্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি কারণ ছিল, হয়ডঙ্ক যে বিদেশি সেটা নিউইয়র্কের শিল্পীরা পছন্দ করেননি। একজন বিদেশি, বিত্তশালী, তবে দ্বিতীয় শ্রেণির গ্যালারি যাঁকে প্রতিনিধিত্ব করে, চাঁদে ভাস্কর্য স্থাপন করার কোনো যোগ্যতা তাঁর নেই।

নিউইয়র্ক টাইমস সমালোচনা করে বলে, এটি স্ফীত টিউনিং ফর্ক ছাড়া আর কিছু নয়। ততদিনে চাঁদে অভিযানের আগ্রহ কমে গেছে সরকারি পর্যায়ে, বেশ কিছু মিশন বাতিল ঘোষণা করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন।

ডিক ওয়াডেল শিল্পীর সম্মতিতে একটি নিয়তিনির্ধারক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ৯৫০টি শিল্পীর স্বাক্ষরিত রেপ্লি­কা ৭৫০ ডলার করে বিশেষ আগ্রহী সংগ্রাহকদের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। এবারে তাঁরা বিজ্ঞাপনও দেন। শিল্পী জানতেন, নভোচারীরা বিষয়টি পছন্দ করবেন না, কিন্তু এই কাজটি থামানোর কোনো ইচ্ছাও তাঁর ছিল না। স্কট আর হয়ডঙ্কের মধ্যে চিঠি আদান-প্রদান হয়, কিন্তু হয়ডঙ্কের হাতে আসলেই আর কোনো উপায় ছিল না। তাঁদের এই ভিন্নমতটি হয়তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকতো। কিন্তু এখানে আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল, অ্যাপোলো-১৫’র নভোচারীরা কিছু কভার স্ট্যাম্প নিয়ে গিয়েছিলেন, যেগুলো চাঁদের পোস্টমার্কসহ ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কথা ছিল, এর ১০০টি এমন কভার স্ট্যাম্প ২১০০০ ডলার দিয়ে জার্মান সংগ্রাহক হেরমান কিনে নেবেন; যে-অর্থ ব্যবহার করা হবে নভোচারীদের সন্তানদের কল্যাণে একটি ট্রাস্ট সৃষ্টি করতে। কথা ছিল, এগুলো বিক্রি করা হবে পরে, যখন নভোচারীরা নাসার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। কিন্তু হেরমান প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। এর জন্যে বিপদে পড়েছিলেন নভোচারীরা, তাঁদের কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তদন্ত কমিটির কাছে এই রেপ্লিকা বিক্রিও গ্রহণযোগ্য ছিল না। এর পরের বছরগুলোয় বেশকিছু তদন্ত হয়; এছাড়া চাঁদের মিশন নিয়ে আগ্রহ কমে যেতে শুরু করে।

জেরার মুখে স্কট স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন, এই প্রকল্পে নভোচারীদের কোনো সংযোগ নেই। এদিকে মাত্র ৫০টি কপি তৈরি করার পর ওয়াডেল গ্যালারি প্রকল্পটি বাতিল করে দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই ঘটনাগুলো শিল্পী এবং গ্যালারির জন্যে নেতিবাচক প্রচারণা ছিল; কংক্রাইটের সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচারের পর ‘স্পেস চাইল্ড’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছিল; কিন্তু সেটি কখনোই প্রদর্শন করা হয়নি। আর ওয়াডেল গ্যালারির ব্যবসাও মুখ থুবড়ে পড়েছিল, ডিক ওয়াডেল হতাশাগ্রস্ত হয়ে মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা যান। হয়ডঙ্ক বেলজিয়ামে ফিরে যান এবং তাঁর কাজ অব্যাহত রাখেন মূলত সবার অগোচরে। নভোচারী তিনজনও এক পর্যায়ে নাসা থেকে চাকরি ছেড়ে দেন। অনেক পরে নাসার পুনর্তদন্ত কভার স্ট্যাম্প সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে নভোচারীদের দায়মুক্ত করেছিল। ইতিহাদবিদরা ফলেন অ্যাস্ট্রোনটের দিকে নজর না দিলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু তাঁরা ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে ঘটনাটির চল্লিশ বছর পর শিল্পীকে মিউজিয়ামে বক্তৃতা দেওয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। স্কটের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেন, তিনিও সেই অনুষ্ঠানে যাবেন কি না জানতে, কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে পারেন স্কটদের সেই অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণই করা হয়নি। এর কারণ হিসেবে পরে অবশ্য বলা হয়েছিল, বাজেটের অভাব। তবে, যাই হোক, স্কটের ক্ষোভ একটুও কমেনি, তিনি বলেন, ‘আমি একমাত্র মানুষ যে কি না ভাস্কর্যটি চাঁদে নিয়ে যেতে পারতো, আর সেটি কেউ আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।’ সেদিন উপস্থিত প্রায় ৪০ জন, এছাড়া অ্যান্ডি ওয়ারহোল, অ্যানি লেইবোভিৎস, নরমান রকওয়েলের কাজের পাশে সাজানো তাঁর ফলেন অ্যাস্ট্রোনট, কিন্তু একমাত্র তারই একটি শিল্পকর্ম পৃথিবীর বাইরে আছে। তিনি পুরো কাহিনিটি বলেন এবং নভোচারীদের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘আমার মতো ভীতু মানুষ কখনোই মহাশূন্যে যেতে পারতো না।’

Leave a Reply