চার তরুণ পেলেন কালি ও কলম পুরস্কার ২০২৫ – ‘ভাষাই মূলত সাহিত্যের মূল বাহন’

‘সাহিত্যের গভীরে পৌঁছাতে হলে ভাষার প্রতিটি অলিগলি ও সূক্ষ্মতা জানা জরুরি’ বলে মন্তব্য করেছেন কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই। তিনি বলেছেন, ‘ভাষাই সাহিত্যের মূল বাহন। তাই ভাষার সঠিক ও প্রমিত ব্যবহারের পাশাপাশি এর গভীরতা ও সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করা সাহিত্যচর্চার জন্য অপরিহার্য।’

গত ৫ই সেপ্টেম্বর, শনিবার, সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে সিটি ব্যাংক-নিবেদিত ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০২৫’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বনামখ্যাত এই কথাসাহিত্যিক।

এবার কবিতা, প্রবন্ধ ও গবেষণা, কথাসাহিত্য এবং শিশু-কিশোর সাহিত্য- এই চার বিভাগে চার তরুণ কবি ও লেখককে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কৃতরা হলেন- কবি রনক জামান, প্রাবন্ধিক ও গবেষক রাফাত আলম, কথাসাহিত্যিক হামিম কামাল এবং শিশুসাহিত্যিক রবিউল কমল।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাসনাত আবদুল হাই পুরস্কারের নির্ধারিত বিভাগগুলোর সৃজনশীল ও মননশীল নানা দিক তুলে ধরেন। সাহিত্যচর্চায় ভাষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভাষাই মূলত সাহিত্যের মূল বাহন, তাই সাহিত্যের গভীরতা স্পর্শ করতে হলে ভাষার প্রতিটি অলিগলি ও সূক্ষ্মতা জানা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।’ ভবিষ্যতে ‘ভ্রমণ সাহিত্য’কেও এই পুরস্কারের একটি নতুন বিভাগ হিসেবে যুক্ত করারও অনুরোধ জানান তিনি।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে রনক জামান ‘এই গ্রাম কুড়িয়ে পেয়েছি’ গ্রন্থের জন্য কবিতা বিভাগে, রাফাত আলম ‘বাংলাদেশ পাঠ : সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতার অনুষঙ্গে’ গ্রন্থের জন্য প্রবন্ধ ও গবেষণা বিভাগে, হামিম কামাল ‘ত্রিস্তান’ গ্রন্থের জন্য কথাসাহিত্য বিভাগে এবং রবিউল কমল ‘দস্যু ও দুই দুরন্ত’ গ্রন্থের জন্য শিশু-কিশোর সাহিত্য বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন। প্রত্যেককে দেওয়া হয় দুই লাখ টাকা অর্থমূল্যের চেক, ক্রেস্ট এবং সনদ। পুরস্কৃতদের নাম ঘোষণা করেন বিচারকমণ্ডলীর সদস্য কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। তিনি জানান, এবার মানসম্মত গ্রন্থ না পাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লব বিভাগে কোনো পুরস্কার প্রদান করা সম্ভব হয়নি। অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’-এর ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়ার বড় দায়িত্ব এখন তরুণ লেখকদের ওপর।’ তিনি আরো বলেন, ‘বয়স ৪০ বছর হওয়ার আগেই এমন একটি স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ তাঁদের ভবিষ্যতে আরো ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন এবং কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ফারুক মাহমুদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য লুভা নাহিদ চৌধুরী।

এ বছর ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের শেষ অংশে সংগঠনটির বিভিন্ন সভায় পরিবেশিত ঐতিহাসিক কয়েকটি গান পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী প্রিয়াংকা গোপ। তাঁর কণ্ঠে বেজে ওঠে ‘মোর বীণা ওঠে’, ‘আসিলে কে গো অতিথি’, ‘বসিয়া বিজনে’ ও ‘দুর্গম গিরি’সহ বেশ কয়েকটি গান।

সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক মাসিক পত্রিকা কালি ও কলম বাংলাদেশের নবীন কবি ও লেখকদের সৃজনধারায় গতি সঞ্চার ও উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে এ পুরস্কার প্রদান করে আসছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৭১ জন তরুণ কবি ও লেখক এ স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। প্রথম দিকে এই পুরস্কারের অর্থমূল্য এক লক্ষ টাকা থাকলেও পরবর্তীকালে তা বাড়িয়ে দুই লক্ষ টাকা করা হয়।

সাহিত্যে কালি ও কলমের টান

কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কারের অংশ হিসেবে গত ১৬ই মে আয়োজিত হয় ‘সাহিত্যে কালি ও কলমের টান : সাহিত্যের সঙ্গে চিত্রকলার সংযোগ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের। এ আয়োজনে সাহিত্য ও চিত্রকলার সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করেন বিশিষ্টজনেরা।

অনুষ্ঠানে এমেরিটাস অধ্যাপক ও চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী তার শিল্পজীবনে কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘তারুণ্যে কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আড্ডা ও মেলামেশা তাঁর শিল্পচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। একসময় ‘সচিত্র সন্ধানী’র আড্ডায় শামসুর রাহমান, শওকত ওসমানসহ কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে শিল্প, সাহিত্য, দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো।’ তাঁর মতে, ‘সেই ঘনিষ্ঠতা ও আদান-প্রদান শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর সময়ের অনেক শিল্পীকেই নিজেদের গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি চিত্র নিয়েও কথা বলেন রফিকুন নবী। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি অনেক চিত্রের ধরনে মিল দেখা যায়। শিল্পীর নিজের হাতে তৈরি কাজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি কাজের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের এই নতুন ধারাটিও তৈরি হচ্ছে- এটিকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে উল্লেখ করেন।

আলোচনায় প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনেক ভালো দিক রয়েছে। তবে সৃজনশীলতার জায়গায় প্রযুক্তিটি এখনো পুরোপুরি পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে আরো সময় প্রয়োজন।’ শিল্পী সব্যসাচী হাজরা বলেন, ‘একসময় শিল্পী ও কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে যে নিবিড় যোগাযোগ ছিল, তা এখন অনেকটাই বিচ্ছিন্ন; এর প্রভাব শিল্পচর্চাতেও পড়ছে।’আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে শিল্পী রফি হক এবং লেখক ও সাংবাদিক সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমামও বক্তব্য প্রদান করেন।