অনুবাদ : আলম খোরশেদ
শেষ কিস্তি
আমি তাদেরগুলোর সঙ্গেই আমার স্ট্রলারটা রাখি, একটা বেঞ্চিমতো জায়গায় ভানইয়াকে আমার কোলে নিয়ে বসি, জ্যাকেট ও জুতো খুলে তাকে আলতোভাবে মেঝেতে নামিয়ে রাখি। ভাবি, সে হয়তো এদিক-সেদিক একটু হামাগুড়িও দিতে পারবে। কিস্তু সে তা চায়নি, তার মনে নেই সে এখানে এসেছে কি না, সে তাই আমার কাছে লেগে থাকতে চাইছিল, এবং তার হাতজোড়া বাড়িয়ে রেখেছিল। আমি তাকে আবার আমার কোলে তুলে নিই। সে বসে বসে আগ্রহ নিয়ে অন্য বাচ্চাদের দেখতে থাকে।
একটা অকর্ষণীয় তরুণী হাতে গিটার নিয়ে হেঁটে আসে। তার বয়স নিশ্চয়ই পঁচিশ হবে, তার লম্বা সোনালি চুল ছিল, হাঁটু অবধি ঝোলা একটা কোট পরা, উঁচু কালো জুতো এবং সে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়।
‘হাই’, সে বলে। ‘আপনাকে এখানে আগে দেখিনি। আপনি কি রিদম-টাইম ক্লাসের জন্য এসেছেন?’
‘হ্যাঁ’, আমি তার দিকে তাকিয়ে বলি। সে আসলেই সুন্দরী।
‘আপনি কি নাম লিখিয়েছেন?’
‘না’, আমি বলি। ‘আমাকে কি সেটা করতেই হবে?’
‘হ্যাঁ, তা করতে হয়। এবং আমি দুঃখিত যে আজ ক্লাস পুরো হয়ে গেছে।’
ভালো খবর।
‘কী লজ্জার কথা’, উঠতে উঠতে আমি বলি।
‘আপনি যেহেতু জানতেন না’, সে বলে। ‘আমার মনে হয় আমরা আপনাকে কোনোমতে ঢুকিয়ে দিতে পারি। শুধু এইবারের মতো। আপনি পরেরবারের জন্য নাম লিখিয়ে যেতে পারেন।’
‘ধন্যবাদ’, আমি বলি।
তার হাসিটা এত সুন্দর ছিল। তারপর সে দরজা খোলে ও ভেতরে ঢুকে যায়। আমি সামনে ঝুঁকে তার গিটারটা মাটিতে নামিয়ে রাখা, কোট, স্কার্ফ খুলে রুমের পেছনে চেয়ারে ঝুলিয়ে রাখা দেখি। তার উপস্থিতিটা ছিল হালকা, সজীব বসন্তের মতো।
আমি বুঝতে পারছিলাম এটা কোনদিকে গড়াচ্ছে এবং আমার মন বলছিল আমার উঠে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু আমি তো সেখানে আমার জন্য যাইনি, আমি সেখানে ছিলাম ভানইয়া ও লিন্দার জন্য। ফলে আমি বসেই থাকি। ভানইয়ার আট মাস বয়স এবং সে পরিবেশনার মতো কিছু দেখলেই একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায়। এবং এখন সে সেরকমই একটায় অংশ নিতে যাচ্ছে।
স্ট্রলার ঠেলে আরো নারীরা আসে, একটু একটু করে বিক্ষিপ্তভাবে এবং দ্রুতই ঘরটা ভরে ওঠে গল্প, কাশি, হাসি, কাপড়ের ঘষটানি, ব্যাগ টানাটানির শব্দে। অধিকাংশই আসে দুই কিংবা তিনের দলে। অনেকক্ষণ ধরে একা আমিই একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম সেখানে। কিন্তু ঠিক দুটার আগে আগে আরো দুজন একক পুরুষ আসেন। তাদের শারীরিক ভাষা থেকেই আমি বুঝতে পারি তারা একে অপরকে চিনতেন না। তাদের একজন ছোটখাটো চেহারার কিন্তু বড় মাথা, চশমা পরা, আমাকে সম্ভাষণ জানান। আমি তাকে লাথি মারতে পারতাম। সে কি ভেবেছে যে, আমরা দুজন একই ক্লাবের সদস্য? এরপর ওভারঅল, হ্যাট, জুতো ছেড়ে, দুধের বোতলের ঝনঝনানি ফেলে আমরা মেঝেতে নেমে পড়ি বাচ্চাসমেত।
মায়েরা অনেকক্ষণ হলো সেই ঘরে চলে গেছে যেখানে রিদম-টাইম শুরুর হওয়ার কথা। আমি শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করি; কিন্তু এক মিনিট আগে উঠে দাঁড়িয়ে ভানইয়াকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকি। মেঝেতে আমাদের বসার জন্য কুশন ছিটানো রয়েছে, আর যে তরুণী মেয়েটা ক্লাস পরিচালনা করছে সামনে একটা চেয়ারে বসে। তার কোলে গিটার, সে হাসিমুখে শ্রোতাদের পরখ করে। সে একটা হালকা হলদেটে কাশ্মিরী সোয়েটার পরা। তার স্তনজোড়া সুগঠিত, তার কোমর ক্ষীণ, তার দীর্ঘ পদযুগল, একটার ওপর আরেকটা আড়াআড়ি রাখা, এবং নৃত্যপর, তখনো কালো বুটে আবৃত।
আমি আমার কুশনে বসি। ভানইয়াকে আমার কোলে রাখি। সে বড় বড় চোখ করে গিটারঅলা নারীটিকে দেখে, যে তখন স্বাগত সম্ভাষণ আওড়াচ্ছিল।
‘আমরা কিছু নতুন মুখ দেখতে পাচ্ছি আজ’, সে বলে। ‘আপনারা নিজেদের পরিচয় দিতে চাইবেন নিশ্চয়?’
‘মনিকা’, একজন বলে।
‘ক্রিস্টিনা’, অন্যজন বলে।
‘লুল’, তৃতীয় আরেকজন বলে।
লুল? কী ধরনের ফালতু নাম এটা?
ঘরটা শান্ত হয়ে আসে। আকর্ষণীয় তরুণীটি আমার দিকে তাকায় এবং একটা উৎসাহব্যঞ্জক হাসি দেয়।
‘কার্ল ওভে’, আমি গম্ভীরভাবে বলি।
‘তাহলে আমাদের স্বাগত-সংগীতটা দিয়েই শুরু করা যাক’, সে বলে এবং গিটারে প্রথম আওয়াজ তোলে, যা ধ্বনিত হতে থাকে, যখন সে বাবা-মায়েদের ব্যাখ্যা করে বলে যে, তাদের দিকে সে মাথা নাড়লে তারা তাদের বাচ্চার নাম বলবে, এবং সবাই তখন সেই বাচ্চার নামটা সুর করে গাইবে।
সে একই আওয়াজ তোলে গিটারে আবার এবং সবাই গাইতে শুরু করে। গানের পেছনের পরিকল্পনাটা ছিল এরকম : প্রত্যেকে তার বন্ধুকে হ্যালো বলবে এবং তার উদ্দেশে হাত নাড়বে। এটা বোঝানোর জন্য খুব বেশি ছোট বাচ্চাদের
বাবা-মায়েরা তাদের কবজি ধরে টানে এবং হাত নাড়ে, যা আমিও করি; কিন্তু যখন দ্বিতীয় পঙ্ক্তি শুরু হয় তখন আমার আর কোনো অজুহাত থাকে না সেখানে নীরবে বসে থাকার; অতঃপর তাই গাইতে শুরু করতেই হয়। সরু গলার মেয়েদের ঐকতানের মাঝে আমার নিজের গম্ভীর গলাকে মনে হয় একধরনের অত্যাচারের মতো। মোট বারোবার আমরা এই হ্যালো-সংগীত গাই আমাদের বন্ধুদের উদ্দেশে, যতক্ষণ না প্রত্যেকটা বাচ্চার নাম উচ্চারিত হয় এবং তারপর আমরা সামনে এগোই। এরপরের গানটা ছিল শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিষয়ে, বাচ্চারা যখন গাইবে তখন তার সেই অঙ্গটি অবশ্যই স্পর্শ করতে হবে। কপাল, চোখ, কান, নাক, মুখ, পেট, হাঁটু, পা। তারপর আমাদের হাতে একটা ঝুনঝুনির মতো যন্ত্র তুলে দেওয়া হয় যা এর পরের গানটা গাইবার সময় আমাদের বাজাতে হবে। আমি বিব্রত হইনি, সেখানে বসে থাকাটা বিব্রতকর ছিল না, এটা ছিল অপমানজনক ও আত্মঅবনমনকারী। সবাই ছিল ভদ্র, বন্ধুসুলভ ও সুন্দর, প্রত্যেকটা নড়াচড়াই ছিল মিহি ও মধুর এবং আমি একটা কুশনে কুঁকড়ে বসে মা ও বাচ্চাদের সঙ্গে গুনগুন করে যাচ্ছিলাম, একটা গানের সুর, মোদ্দাকথায় বলতে গেলে, একজন নারীর কণ্ঠের তালে তালে, যাকে আমি আসলে বিছানায় নিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু সেখানে বসিয়ে আমাকে সম্পূর্ণ নিরীহ বানিয়ে দেওয়া হয়, কোনো মানমর্যাদা ছাড়া, নপুংসক, আমার ও তরুণীটির মধ্যে যেন কোনো পার্থক্য নেই, শুধু মেয়েটা খুব আকর্ষণীয়, এবং এই বাধ্যতামূলক সমতাবিধান, যেখানে আমি আমার সবকিছু বিসর্জন দিই, এমনকি আমার আকার, সেটাও ইচ্ছাকৃতভাবে, আমাকে ক্রোধে ভরিয়ে তোলে।
‘এখন বাচ্চাদের একটু নাচের সময়!’ সে বলে, মেঝেতে তার গিটার নামিয়ে রেখে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারে রাখা একটা সিডি প্লেয়ারের কাছে যায়।
‘সবাই গোল হয়ে দাঁড়াও, এবং শুরুতে আমরা একদিকে যাব, আমাদের পায়ে তাল দিতে দিতে, এভাবে’, সে বলে, তার আকর্ষণীয় পায়ে তাল দিয়ে, ‘এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে আরেকবার অন্যদিকে যাব।’
আমি উঠে দাঁড়াই, ভানইয়াকে তুলি, এবং ধীরে গড়ে ওঠা বৃত্তটার মাঝখানে দাঁড়াই। আমি অন্য দুজন পুরুষকে খুঁজি। দুজনেই তখন পুরোপুরি মনোযোগী তাদের বাচ্চাদের প্রতি।
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভানইয়া’, আমি ফিসফিসিয়ে বলি। ‘সবাই তার নিজের প্রতি – তোমার প্রপিতামহ যেরকম বলতেন।’
সে আমার দিকে মুখ তুলে তাকায়। এতক্ষণ পর্যন্ত সে বাচ্চাদের যেগুলো করার কথা তার কোনোটার প্রতিই কোনো উৎসাহ দেখায়নি। সে এমনকি মারাক্কাসটাও ঝাঁকাতে চায়নি।
‘চলো শুরু করা যাক’, আকর্ষণীয় নারীটি বলেন এবং একটা সিডি প্লেয়ারের বোতাম টিপে দেন। ঘরের মধ্যে একটা লোকগীতির সুর ঝরে পড়ে, এবং আমি অন্যদের অনুসরণ করতে থাকি, গানের তালের সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলি। আমি ভানইয়াকে এক হাত দিয়ে তার দু-বাহু ধরে রাখি, ফলে সে আমার বুকের নিচে ঝুলে থাকে। তারপর আমাকে আমার পা দিয়ে একটা আওয়াজ করতে হয় মেঝেতে, তারপর তাকে শূন্যে ঘোরাতে হয়, তারপর একই জিনিস করতে হয় অন্যদিকে ফিরে। অন্য অনেকেই এটা উপভোগ করছিল, সেখানে হাসির দমক এমনকি আনন্দের উল্লাসধ্বনি শোনা যায়, এটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমাদের বাচ্চা নিয়ে একা একা নাচতে হয়। আমি আমার ভানইয়াকে কোলে নিয়ে এদিক থেকে ওদিকে দুলি, একথা ভাবতে ভাবতে যে, নরকটা মনে হয় এরকমই, ইভ থেকে আগত শান্ত, সুন্দর অসংখ্য অচেনা মাতায় পরিপূর্ণ, তাদের বাচ্চাদেরসহ। এটা শেষ হওয়ার পর আরেকটা পর্ব শুরু হয় একটা বিশাল নীল পাল নিয়ে, যেটা ছিল সমুদ্রের প্রতীক, এবং আমরা ঢেউবিষয়ক একটা গান গাই, পালটাকে দোলাতে দোলাতে ঢেউ সৃষ্টি করি, এবং একসময় বাচ্চারা এটার নিচ দিয়ে হামাগুড়ি দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা হঠাৎ করে সেটাকে ওপরে তুলে ফেলি, আমাদের গাওয়া গানের তালে তালে।
যখন শেষ পর্যন্ত সে ধন্যবাদ জানিয়ে ক্লাসের সমাপ্তি ঘোষণা করে তখন আমি তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আসি, ভানইয়াকে কাপড় পরাই, তার চোখের দিকে না তাকিয়েই, বস্তুত মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে, যখন অনেকগুলো কণ্ঠস্বর, আগের চেয়ে সুখীতর, আমার চারপাশে গুঞ্জন করতে থাকে। আমি ভানইয়াকে স্ট্রলারে রাখি, তাকে ওটার সঙ্গে বেঁধে যত দ্রুত সম্ভব সেটা ঠেলা শুরু করি, আমার দিকে কারো মনোযোগ আকর্ষণ না করে। বাইরে রাস্তার ওপর আমার চিৎকার করতে ইচ্ছা করে, যতক্ষণ না আমার ফুসফুস বিস্ফোরিত হয়, এবং আমার ইচ্ছা করে কিছু একটাকে ফাটিয়ে চুরমার করে দিতে। অবশ্য এর পরিবর্তে আবারো আমাকে এই লজ্জাঘর ও আমার নিজের মধ্যে যতটা সম্ভব দূরত্ব বৃদ্ধি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয় আপাতত।
‘ভানইয়া, ও ভানইয়া’, সিভয়াভেগেন ধরে দ্রুত পা চালিয়ে আমি বলি। ‘তোমার কি সেখানে আনন্দ হয়েছে? দেখে তো সেরকম মনে হয়নি।’
‘দা দা দা’, ভানইয়া বলে।
সে হাসেনি, তবে তার চোখেমুখে খুশি।
সে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে।
‘আহ, একটা মোটরবাইক’, আমি বলি। ‘মোটরবাইক নিয়ে তোমার কী বিষয়?’
আমরা যখন তাইনেরগাতার কোনায় আসি তখন কনসুম শপে ঢুকি কিছু একটা কেনার জন্য। দমবন্ধ করা অনুভূতি তখনো বিরাজমান ছিল, তবে তার আগ্রাসনটা একটু কমে আসে, শেলফের মাঝের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি যা অনুভব করি, সেটা ঠিক রাগ নয়। দোকানটা স্মৃতি জাগিয়ে তোলে, আমি যখন তিন বছর আগে স্টকহোমে আসি তখন এই দোকানটাতেই বেশি আসতাম, রাস্তাটার একটু সামনের দিকে প্রকাশক নুরস্তেদ আমাকে থাকার জন্য যে ফ্ল্যাটটা দিয়েছিল, এটি তার খুব কাছেই। সেই সময় আমার ওজন ছিল ১০০ কেজির বেশি, এবং আমি আমার অতীত জীবন থেকে পালিয়ে থাকার জন্য, একধরনের আধা-স্থবির অন্ধকারের মধ্যে চলাফেরা করতাম। এতে খুব একটা মজা ছিল না। তবে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নিজেকে চাঙা করে তোলার, ফলে প্রতি সন্ধ্যায় আমি লিল-ইয়ান্সকুগেন অরণ্যে দৌড়াতে যেতাম। একশ মিটারেরও বেশি আমি যেতে পারতাম না, যখন আমার হৃৎপিণ্ড ধুকধুক করত আর ফুসফুস বাতাসের জন্য হাহুতাশ, তখন আমাকে থেমে যেতে হতো। আর একশ মিটার গেলেই আমার পা কাঁপতে শুরু করত। এরপর হাঁটার গতিতে হোটেলসদৃশ ফ্ল্যাটে ফিরে আসা এবং কড়কড়ে রুটি ও সুপ ভক্ষণ। এদিন দোকানে একজন নারীকে দেখি আমি, হঠাৎ করে সে আমার পাশেই এসে দাঁড়ায়, সকল জায়গার মধ্যে কি না এই মাংসের বিভাগে, এবং সেখানে তার উপস্থিতির মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল, এবং তার চেহারার স্রেফ শারীরিকতাটুকু, যা আমাকে প্রতিমুহূর্তের জন্য বিস্ফোরক বাসনায় পূর্ণ করে তুলছিল। সে তার ঝুড়িটা দুই হাতে সামনে ধরে রেখেছিল, তার চুল বাদামি, তার ফ্যাকাসে গায়ের চামড়া তিলভর্তি। আমি তার শরীরের একটা ঝলক পাই, একটা ঝাপসা ঘ্রাণ, সাবান ও ঘামের, এবং সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, ধুকপুকে বুক ও শুকিয়ে আসা গলায়, পনেরো সেকেন্ডের মতো, কেননা সেই সময়টাই সে নিয়েছিল আমার পাশাপাশি আসতে এবং কাউন্টার থেকে একটা সালামির প্যাকেট তুলে নিয়ে সামনের দিকে চলে যেতে। আমি তাকে আবার দেখি, যখন টাকা দিতে যাই, সে অন্য ক্যাশ কাউন্টারটিতে ছিল, এবং সেই কামনা, যা তখনো দূর হয়নি, আমার মধ্যে আবারো ফেনিয়ে ওঠে। সে তার সব জিনিস ব্যাগের মধ্যে গুছিয়ে রাখে, ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। তাকে আমি আর কোনোদিন দেখিনি।
স্ট্রলারের তলা থেকে ভানইয়া একটা কুকুর দেখতে পায়, যার দিকে সে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল। আমি কখনোই এটা ভাবা বন্ধ করিনি যে, ভানইয়া যখন তার চারপাশের পৃথিবীটাকে দেখে, সে আসলে কী দেখতে পায়। এই অন্তহীন মানুষের স্রোত, মুখ, গাড়ি, দোকান, সাইনবোর্ড তার কাছে কী অর্থ বহন করে? সে নিশ্চয়ই সেগুলো বৈষম্যহীন চোখে দেখেনি, সেটা একপ্রকার নিশ্চিত, কেননা সে নিয়মিতভাবে কেবল মোটরবাইক, বেড়াল, কুকুর ও অন্য বাচ্চাদের দিকেই লক্ষ করেনি, সে তার চারপাশের মানুষদের মধ্যেও একটা স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস গড়ে তুলেছিল : প্রথমে লিন্দা, তারপর আমি, তারপর দাদি এবং এর পরে অন্য সবাই, সেটা নির্ভর করত এর আগের কয়েকটি দিনে কে তার সঙ্গে বেশিক্ষণ সময় কাটিয়েছিল তার ওপর।
‘হ্যাঁ, একটা কুকুর, দেখো’, আমি বলি। আমি এক কার্টন দুধ নিই, যা আমি স্ট্রলারে রাখি, এবং লাগোয়া শেলফ থেকে এক প্যাকেট পাস্তাও নিই। তারপর আমি দুই প্যাকেট সেরানো হ্যাম, এক বয়ম জলপাই, মজারেলা পনির, এক শিশি বেসিল, এবং কিছু টমেটো নিই। আমার বিগত জীবনে এই খাবার কেনার কথা স্বপ্নেও ভাবতাম না, কেননা আমি তাদের অস্তিত্ব বিষয়ে জানতাম না। এখন আমি, স্টকহোমের সাংস্কৃতিক অভিজাতদের মাঝখানে, এবং যদিও সবধরনের স্প্যানিশ, ইটালিয়ান, ফ্রেঞ্চের ব্যাপারে প্রীতি ও সবকিছু সুইডিশের বিষয়ে বিরাগ আমার কাছে নির্বোধের মতো মনে হয়েছিল, এবং ধীরে যখন বড় ছবিটাও স্পষ্ট হয়, রীতিমতো বিকর্ষক, এর বিষয়ে শক্তিক্ষয়কে আমার অর্থবহ মনে হয়নি। যখন আমি পর্কচপ ও বাঁধাকপি, গরুর মাংসের স্টু, ভেজিটেবল সুপ, ডাম্পলিং, মিটবল, লাংম্যাশ, ফিশকেক, মাটন ও ভেজিটেবল, স্মোকড সসেজ রিং, তিমির স্টেক, সাগুর পুডিং, সেমোলিনা, রাইস পুডিং, নরওয়েজিয়ান পরিজের অভাব বোধ করতাম, সেটা আসলে স্বাদের চেয়েও সত্তরের নরওয়ের গোটা আবহটারই অনুপস্থিতি অনুভব করা। এবং খাদ্য যেহেতু আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, আমি বরং লিন্দার যা পছন্দের সেরকমই কিছুই না হয় করি।
আমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য সংবাদপত্রের স্টলের পাশে দাঁড়িয়ে দুটো সান্ধ্য দৈনিকপত্র, শহরের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা, কিনব কি না ভাবি। সেগুলো পড়া মানে হচ্ছে এক ব্যাগ বর্জ্য আপনার মাথার মধ্যে খালাস করে দেওয়া। মাঝেমধ্যে আমি সেগুলো কিনেছি বটে, যখন মনে হয়েছে ইতোমধ্যে অর্জিত বর্জ্যরে সঙ্গে আরো খানিকাটা মিশলে তেমন ফারাক হবে না। তবে আজ নয়।
আমি টাকা দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসি, তার কংক্রিটে শীতের আকাশের প্রতিফলিত আলোর মøান প্রতিচ্ছবি, এবং চৌরাস্তার সবদিকে গাড়ির লম্বা সারিকে মনে হচ্ছে নদীতে ভাসমান কাঠের স্তূপের মতো। ট্রাফিক এড়ানোর জন্য আমি তাইনেরগাতা ধরে হাঁটতে থাকি। পুরনো বইয়ের দোকানের জানালায়, যার ওপর আমি সাধারণত চোখ রেখে থাকি, আমি মালাপার্টের একটা বই দেখি, যেটার বিষয়ে বেশ উচ্ছ্বাসভরে কথা বলেছিল গাইয়ের, আরেকটা বই গ্যালিলিও গ্যালিলির লেখা, আটলান্টিস সিরিজের অন্তর্ভুক্ত। আমি স্ট্রলার ঘোরাই, আমার পায়ের জুতো দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলি এবং সেটাকে সামনে রেখে পেছন ফিরে দোকানে প্রবেশ করি।
‘আমি জানালার এ-দুখানি বই চাই’, আমি বলি। ‘গ্যালিলিও গ্যালিলি ও মালাপার্টের বই দুখানি।’
শার্ট-পরা মধ্যপঞ্চাশের মানুষটি, যিনি দোকান চালান, বলেন, ‘কী বললেন?’ তার নাগের ডগার ওপর রাখা চৌকো কাচের চশমার ভেতর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে।
‘জানালায় রাখা’, আমি সুইডিশে বলি। ‘দুটো বই। গ্যালিলেই, মালাপার্টে।’
‘আকাশ ও যুদ্ধ, হ্যাঁ?’ তিনি বলেন এবং বই দুখানি নিতে যান।
ভানইয়া ঘুমিয়ে পড়েছে।
রিদম-টাইমটা কি খুব ক্লান্তিকর ছিল?
মাথার নিচের হাতলটা আমার দিকে টেনে দিয়ে আমি তাকে স্ট্রলারের আরো ভেতরে নামিয়ে দিই আলতোভাবে। সে-ঘুমের মধ্যেই তার একটি হাত নাড়ে, এবং ঠিক জন্মের পরপর যেভাবে করেছিল, ঠিক সেভাবেই মুঠো করে ফেলে। এটা এমন একটা ভঙ্গি যা প্রকৃতি তাকে সরবরাহ করে; কিন্তু যেটিকে সে তার নিজের মতো করে পালটে নেয় ধীরে-ধীরে। কিন্তু সে যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন তা পুনরায় জেগে ওঠে।
আমি স্ট্রলারটাকে একপাশে সরিয়ে রাখি, যাতে করে লোকেরা চলাচল করতে পারে, এবং আর্টের বইয়ের শেলফের দিকে যাই, মালিক তখন সেই বই দুটোর দাম টেপেন তাঁর প্রাচীন ক্যাশমেশিনে। এখন যখন ভানইয়া ঘুমে, আমি আরো কয়েকটা মিনিট সময় পাই আমার জন্য, এবং প্রথম যে-বইটা আমার নজরে আসে সেটা পার মানিংয়ের একটি আলোকচিত্রের বই। কী ভাগ্য! আমি সবসময়ই তাঁর ছবি পছন্দ করতাম, বিশেষত এগুলো, এই প্রাণীর ছবিগুলো। গরু, শূকর, কুকুর, সিল মাছ। যেকোনোভাবেই হোক তিনি তাদের আত্মাকে ধারণ করতে পেরেছেন। সেখানে আর কোনো উপায় ছিল না, ছবির এই প্রাণীগুলোর চাহনির অর্থ বোঝার। সম্পূর্ণ উপস্থিতি, কখনো যন্ত্রণার্ত, কখনো শূন্যদৃষ্টি, অন্যসময়ে অন্তর্ভেদী। কিন্তু প্রায়শই রহস্যময়, সপ্তদশ শতাব্দীর শিল্পীদের আঁকা প্রতিকৃতিচিত্রের মতো।
আমি সেটা কাউন্টারে রাখি।
‘এই বইটা সদ্য এসেছে’, মালিক বলেন। ‘আপনি কি নরওয়েজিয়ান?’
‘হ্যাঁ।’ আমি বলি। ‘আমি বইটা আরেকটু নেড়েচেড়ে দেখতে চাই, যদি কোনো অসুবিধা না থাকে।’
সেখানে দেলাক্রোয়ার ডায়েরির একটা সংস্করণ ছিল, আমি সেটা নিই, তারপর টার্নার বিষয়ে একটা বই, যদিও টার্নারের চিত্রের মতো আর কোনো চিত্রকলাই ছবি তোলার পর এতটা হারিয়ে যায়নি, হামেরশই বিষয়ে পাউল ভাদের বই, আর শিল্পকলায় প্রাচ্যবাদ বিষয়ে একটা দুর্দান্ত গ্রন্থ।
তাদের কাউন্টারে নামিয়ে রাখার পর, আমার মোবাইল বেজে ওঠে। প্রায় কারোর কাছেই আমার নম্বর নেই, তাই আমার জ্যাকেটের পাশের পকেটের গভীর অভ্যন্তর থেকে একটা স্তিমিত স্বরে যখন রিংটোন বেজে ওঠে, তখন তা আমার মধ্যে কোনো অশান্তি তৈরি করে না। বরং তার উল্টো। নামতা-গানের ক্লাসের মেয়েটির সঙ্গে সামান্য কথোপকথন ছাড়া লিন্দা সাইকেলে করে স্কুলে যাওয়ার পরে আর কারো সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি।
‘হ্যালো?’ গাইয়ের বলে। ‘কী করছ তুমি?’
‘আমার আত্মমর্যাদার উন্নয়নে কাজ করছি’, দেয়ালের দিকে সরে গিয়ে আমি বলি। ‘তুমি?’
‘সেটা অন্তত নয়। আমি অফিসে স্রেফ বসে বসে সবাইকে দ্রুত পথ চলতে দেখছি। তা কী ব্যাপার?’
‘আমি এইমাত্র একটি আকর্ষণীয় মেয়েকে দেখেছি।’
‘তারপর?’
‘তার সঙ্গে গল্প করেছি।’
‘তো?’
‘সে আমাকে তার বাসায় নেমন্তন্ন করেছে।’
‘তুমি কি হ্যাঁ বলেছ?’
‘নিশ্চয়ই। সে এমনকি আমার নামও জিজ্ঞেস করেছে।’
‘তারপর?’
‘সে বাচ্চাদের নামতা ক্লাসের শিক্ষক। তাই তার সামনে বসে আমাকে হাততালি দিয়ে বাচ্চাদের গান গাইতে হয়েছে, ভানইয়াকে আমার কোলে রেখে। একটা ছোট্ট তাকিয়ার ওপর। অনেক মা ও বাচ্চাদের সঙ্গে।’
গাইয়ের হাসিতে ফেটে পড়ে।
‘আমাকে বাজানোর জন্য একটা ঝুনঝুনিও দেওয়া হয়েছিল।’
‘হা হা হা।’
‘আমি এত ক্রুদ্ধ ছিলাম যে, বেরিয়ে আসার পর আমি কী করব ভেবে পাইনি’, আমি বলি। ‘আমার কোমরের রেখা পরখ করে দেখারও একটা সুযোগ পাই আমি। এবং আমার পেটের গাদা-গাদা চর্বি নিয়েও কাউকে পীড়িত হতে দেখিনি আমি।’
‘না, তারা খুব নরোম ও সুন্দর, সত্যিই তারা’, গাইয়ের বলে, আবারও হাসতে হাসতে। ‘কার্ল ওভে, আজ রাতে কি আমরা বাইরে যাচ্ছি না?’
‘তুমি কি আমার সঙ্গে মশকরা করছ?’
‘না। আমি সত্যি বলছি। আমি এখানে সাতটা পর্যন্ত কাজ করার কথা ভাবছি, কমবেশি। তারপর আমরা শহরের কোথাও দেখা করতে পারি।’
‘অসম্ভব।’
‘তোমার স্টকহোমে আসার কী মানে হয় যদি আমাদের দেখাই না হয়?’
‘তুমি বুঝতে পারছ, তুমি এইমাত্র একটা সুইডিশ শব্দ ব্যবহার করেছো, ঠিক কি-না’, আমি বলি।
‘তোমার মনে আছে প্রথম স্টকহোমে আসার কথা?’ গাইয়ের বলে। ‘তুমি যখন ট্যাক্সিতে বসে আমাকে বক্তৃতা দিচ্ছিলে, ‘স্ত্রৈণ স্বামী’ বিষয়ে, আমি যখন নাইটক্লাবে যেতে চাচ্ছিলাম না?’
‘এই তো, আরেকটা ব্যবহার করলে। তোমার নরওয়েজিয়ানটা গোল্লায় গেছে’, আমি বলি।
‘যিশুর দোহাই, বন্ধু, আমি যেটার কথা বলছি সেটা তোমার ব্যবহৃত প্রবাদ। হেন-পেক্ড। তোমার মনে পড়ে?’
‘হ্যাঁ। আমার মনে আছে ঠিকই।’
‘আর?’
‘তুমি তা থেকে কী সিদ্ধান্তে আসো?’
‘অর্থাৎ সেখানে পার্থক্য রয়েছে’, আমি বলি। ‘আমি
হেন-পেক্ড নই। আমি হেনপেকার। আর তুমি হচ্ছো উডপেকার।’
‘হা হা হা। আগামীকাল তাহলে?’
‘আমরা আগামীকাল সন্ধ্যায় ফ্রেডরিক ও কারিনদের সঙ্গে বাইরে খাচ্ছি।’
‘ফ্রেডরিক? সেই সিনেমা প্রযোজক গাধাটা?’
‘আমি সেভাবে বলব না, তবে হ্যাঁ, সে-ই।’
‘হা ঈশ্বর! ঠিক আছে। রোববার? না সেদিনটা তোমার বিশ্রামের দিন। তাহলে সোমবার?’
‘ওকে।’
‘সেদিন শহরে অনেক মানুষ থাকবে।’
‘সোমবার পেলিকানে তাহলে’, আমি বলি। ‘ও হ্যাঁ, আমি মালাপার্টের একটা বই হাতে ধরে আছি।’
‘হ্যাঁ? তুমি কি তাহলে একটা পুরনো বইয়ের দোকানে? এটা ভালো, সেই বইটা।’
‘আর দেলাক্রোয়ার ডায়েরি।’
‘সেটাও ভালো হওয়ার কথা। থমাস সেটার কথা বলেছে, আমি জানি। আর কিছু?’
‘আফেন্তপোস্তেন পত্রিকাটি ফোন করেছিল গতকাল। তারা একটা ইন্টারভিউ করার কথা বলেছিল।’
‘তুমি নিশ্চয়ই হ্যাঁ বলোনি, হ্যাঁ?’
‘হ্যাঁ।’
‘বোকাটা। তুমি বলেছিলে তুমি এসব করা বন্ধ করে দেবে।’
‘আমি জানি। কিন্তু প্রকাশকেরা বলেছিল, সেই সাংবাদিকটা বিশেষ করে খুব ভালো। ফলে আমি ভাবলাম আমি শেষবারের মতো এইটা করব। এটা বেশ ভালো হয়ে যেতেও পারে, নয় কি?’
‘না, এটা হতে পারে না’, গাইয়ের বলে।
‘হ্যাঁ আমি জানি’, আমি বলি। ‘তবে কিছু মনে কোরো না। আমি এবার হ্যাঁ বলে দিয়েছি। তোমার আর কিছু নতুন খবর রয়েছে?’
‘কিছুই না। সামাজিক নৃতত্ত্ববিদদের সঙ্গে কিছু রুটির রোল খেয়েছি। তারপর ইনস্টিটিউটের পুরনো প্রধান, দাঁড়িতে রুটির গুঁড়ো লাগা আর জিপারের চেন খোলা অবস্থায় এসে হাজির হন কিছু বলবেন বলে। আমিই একমাত্র মানুষ যে তাঁকে বাতিল করে দিইনি। তাই তিনি আসেন।’
‘যিনি ভীষণ কড়া ছিলেন?’
‘হ্যাঁ। এবং এখন যিনি তাঁর দপ্তর হারাবার ভয়ে আতঙ্কিত থাকেন। এটাই তাঁর যা কিছু সম্বল বাকি রয়েছে। ফলে এখন তিনি একেবারে যাকে বলে ‘পাই’-এর মতো ভালোমানুষ। এটা খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যাপার। কঠিন যখন তিনি তা হতে পারেন, ভদ্র যখন তাঁকে তা হতেই হয়।’
‘আমি আগামীকালও হাজির হতে পারি’, আমি বলি। ‘তোমার কি সময় হবে?’
‘নিশ্চয়ই আছে। যতক্ষণ না তুমি ভানইয়াকেও সঙ্গে নিয়ে আসো।’
‘হা হা। ঠিক, তবে এখন আমাকে দাম দিতে হবে। কাল দেখা হবে।’
‘ঠিক আছে। লিন্দা ও ভানইয়ার জন্য শুভকামনা।’
‘ক্রিস্তিনার জন্যও।’
‘দেখা হবে।’
‘হ্যাঁ দেখা হবে বইকি।’
আমি লাইন কেটে দিই এবং মোবাইলটা জ্যাকেটের পকেটে ভরে ফেলি। ভানইয়া তখনো ঘুমে। বইঘরের মালিক একটা ক্যাটালগ পড়ছিলেন। আমি কাউন্টারের দিকে এগোলে তিনি মুখ তুলে তাকান।
‘১৫৩০ ক্রোনার’, তিনি বলেন। আমি তার দিকে আমার কার্ড এগিয়ে দিই। আমি রসিদটা আমার পেছনের পকেটে রাখি – আমি একমাত্র একটি উপায়ে এই কেনাকাটাকে বৈধতা দিতে পারি যে, এই খরচগুলো ট্যাক্সের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে – আমি স্ট্রলারের নিচের তাকে বইয়ের ব্যাগ দুটো রাখি, তারপর আমি সেটাকে টেনে দোকানের বাইরে নিয়ে আসি, আমার কানের মধ্যে দরজার ঘণ্টি বাজার শব্দ নিয়ে।
এরই মধ্যে সময় চারটা বাজার কুড়ি মিনিট মাত্র বাকি। আমি ভোর সাড়ে চারটা থেকেই জাগা, সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত দাম এর জন্য একটা সমস্যাকীর্ণ অনুবাদে ব্যস্ত থাকি, এবং এটা একটা ক্লান্তিকর কাজ হওয়া সত্ত্বেও, যেখানে আমি মূলের একেকটা বাক্যের সঙ্গে অনূদিত লাইনগুলো মিলিয়ে দেখি, সেটা তারপরও একশগুণ আকর্ষণীয় ও পুরস্কারতুল্য কাজ, সকালে আমি যে কাজগুলো করেছি, যেমন ন্যাপি পাল্টানো, এবং বাচ্চাদের ক্লাস ইত্যাদি, তার চেয়ে, যেগুলো আমার কাছে সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়। আমি জীবনযাপনে নিঃশেষিত হয়ে পড়তাম না, এর সঙ্গে শক্তিক্ষয়ের কোনো ব্যাপার ছিল না, কিন্তু যেহেতু তাতে প্রেরণার বিন্দুমাত্র স্ফুলিঙ্গও ছিল না, এটি আমাকে চুপসে দেয়, অনেকটা কোনো টায়ার পাঙ্কচারের মতোই।
দব্লেন্সগাতার চৌরাস্তায় আমি বাঁদিকে মোড় ফিরি, ইয়ুহান্নেস্ক্রিগের নিচের পাহাড় বেয়ে উঠি, যা তার লাল ইটের দেয়াল ও সবুজ টিনের ছাদের কারণে বার্গেনের ইয়ুহান্নেস্ক্রিগ ও আরেন্দালের ত্রেফলদিংসসিরকেনের মতোই ছিল, মাল্মসিলংনাদসগাতাকে অনুসরণ করি কিছুক্ষণের জন্য। তারপর দাভিদ বাগারেস গাতা দিয়ে নিচে নামি এবং আমার ব্যাকইয়ার্ডের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকি। উল্টোদিকের ক্যাফের পেভমেন্টে দুটো মশাল জ¦লছিল। সেখানে পেচ্ছাপের গন্ধ পাওয়া যায়, কেননা রাতের বেলায় স্তুরপ্লান সুপারমার্কেট থেকে ফেরার পথে লোকেরা সেখানে থেমে রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে পেচ্ছাপ করত, এবং দেয়ালের ধার ঘেঁষে সারিসারি ডাস্টবিন থেকে ময়লার গন্ধ আসে। কোনায় একটা কবুতর, যেটি আমরা দু-বছর আগে যখন এখানে আসি তখনই আবাসিকতা গ্রহণ করেছিল। তখন সে দেয়ালের একটা ফোকরে বাস করতো। যখন সেটিকে ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় এবং ধারালো লোহাগুলো ওপরের সমতলের সঙ্গে সিমেন্ট দিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হয় তখন সে নিচে নেমে আসে। এখানে ইঁদুরের উপদ্রবও ছিল। রাতে যখন আমি সিগারেট খেতে বাইরে বেরুতাম তখন মাঝেমাঝে তাদের দেখতাম, ঝোপের ভেতরে তাদের কালো পিঠ দেখা যেত, কখনোবা তারা আলোকিত চাতালের মধ্য দিয়ে অন্যপাশের পুষ্পশয্যার নিরাপত্তার দিকে ধাবিত হতো। এখন একজন নারী কেশসজ্জাকর সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সিগারেট খেতে খেতে মোবাইলে কথা বলছিল। তার বয়স নিশ্চয়ই চল্লিশ হবে, এবং আমি আন্দাজ করি সে কোনো ছোট শহরের সুন্দরী হিসেবে বেড়ে উঠেছিল, অন্তত সে আপনাকে মনে করিয়ে দেয় আরেন্দালের রেস্তোরাঁয় গ্রীষ্মকালে দেখতে পাওয়া মেয়েদের কথা, চল্লিশের নারীরা, তাদের চুল বেশি সোনালি কিংবা বেশি কালো রং করা, চামড়া অতিরিক্ত বাদামি, চোখগুলো খুব তোষামুদে এবং হাসি উচ্চকণ্ঠ। তার গলা বেশ জমকালো, পরিষ্কার স্কন্যা আঞ্চলিক টানে কথা বলছিল সে, এবং আজ সে পুরো সাদায় সজ্জিত। সে আমাকে দেখে মাথা নাড়ে, আমিও পালটা মাথা নাড়ি। অমি তাকে পছন্দই করতাম, যদিও তার সঙ্গে আমি খুব কমই কথা বলেছি, স্টকহোমে আমি যত লোকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, সে তার চেয়ে খুবই আলাদা, যারা কেবল ওপরে উঠছিল, অথবা ওপরে উঠে গিয়েছিল, কিংবা তেমনটি ভাবত নিজেরা। তার কোনো ট্রাক ছিল না, হালকাভাবে বলতে গেলে, তাদের সবার মতো একইরকম দেখতে, এবং সে-কথা প্রযোজ্য ছিল তাদের কাপড় ও বিষয়সামগ্রীর ব্যাপারেই শুধুু নয়, তাদের চিন্তা ও মানসিকতার ক্ষেত্রেও।
আমি দরজার সামনে একটু দাঁড়াই, তারপর আমার চাবি বের করি। বেসমেন্টের জানালা দিয়ে কাপড় ধোয়ার সাবান ও পরিষ্কার কাপড়ের সুঘ্রাণ আসছিল। আমি দরজার তালা খুলে যত নিঃশব্দে পারি হেঁটে হলঘরে ঢুকি। ভানইয়া এই শব্দগুলোকে এবং সেগুলো যে ক্রম অনুসারে ঘটে, তা এত ভালো করে জানে যে, সে প্রায় সবসময়ই আমরা এখানে ঢোকামাত্র জেগে ওঠে। সে এবারো তা করে। একটা চিৎকারসহকারে। আমি তাকে চিৎকার করতে দিই, লিফটের দরজা খুলি, বোতাম টিপি এবং আয়নায় নিজের চেহারা দেখি, দোতলার ওপরে উঠতে উঠতে। লিন্দা, যে নিশ্চয়ই চিৎকারগুলো শুনে থাকবে, দরজায় অপেক্ষা করছিল যতক্ষণ না আমরা সেখানে পৌঁছাই।
‘হাই’, সে বলে। ‘তোমাদের ভালো সময় কেটেছিল? তুমি কি এইমাত্র জেগে উঠেছো সোনামণি? এখানে এসো, আমি তারপর…’
সে বেল্ট খুলে ভানইয়াকে কোলে তুলে নেয়।
‘আমরা ভালোই ছিলাম’, আমি বলি, শূন্য স্ট্রলারটা ঠেলতে ঠেলতে, তখন লিন্দা তার কার্ডিগানের বোতাম খোলে, এবং বসার ঘরে চলে যায় তাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য।
‘কিন্তু আমি যতক্ষণ শ্বাস নিচ্ছি ততক্ষণ আর কোনোদিন নামতা-গানের ক্লাসে পা দেব না।’
‘এটা কি এতই খারাপ ছিল?’ সে জিজ্ঞাসা করে, আমার দিকে একটা চকিত হাসি দিয়ে, আবারো নিচে ঝুঁকে ভানইয়াকে তার নগ্ন স্তনজোড়ার মাঝখানে জাপটে ধরে।
‘খারাপ মানে? এর চেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা আমার কোনোদিন হয়নি। আমি যখন ফিরে আসি তখন রাগে গনগন করছিলাম।’
‘ও আচ্ছা’, সে বলে, তবে আর তেমন আগ্রহ দেখায় না বিষয়টায়।
ভানইয়ার প্রতি তার আদর এত আলাদা ছিল। এটা ছিল সর্বগ্রাসী। এবং পুরোপুরি অকৃত্রিম।
আমি বাজার নিয়ে রান্নাঘরে যাই, পচনশীল জিনিসগুলো রেফ্রিজারেটরে রাখি, জানালার সামনে একটা প্লেটের ওপর বেসিলের চারাটা রেখে তাতে পানি দিই, স্ট্রলারের তলা থেকে বইগুলো নিয়ে শেলফে রাখি, কম্পিউটারে বসে ইমেইল দেখি। সেটা সকাল থেকে দেখা হয়নি। একটা ইমেইল এসেছে
কার্ল-ইয়ুহান ভালগ্রেন থেকে, সে আমাকে এই মনোনয়নটা পাওয়ার জন্য অভিনন্দন জানায়, বলে, তার খারাপ লাগছে যে, সে আমার কোনো বই পড়েনি এখনো। সঙ্গে এও বলে, কোনোদিন বিয়ার খাওয়ার ইচ্ছা হলে আমার শুধুু তাকে একবার ফোন করলেই হবে। কার্ল-ইয়ুহান এমন একজন মানুষ, যাকে আমি সত্যি-সত্যি পছন্দ করি, আমি তার অতিরেককে মূল্য দিতাম – যা কারো কারো কাছে অপছন্দনীয় ছিল, লোকদেখানো কিংবা স্রেফ নির্বুদ্ধিতা ছিল – বিশেষ করে সুইডেনে আসার দুই বছরের মাথায়। কিন্তু তার সঙ্গে বিয়ার খাওয়া আমার জন্য অসম্ভব ছিল। আমি সেখানে স্রেফ চুপ করে বসে থাকতাম, আমি জানি আমি তা-ই করতাম, আমি এরই মধ্যে দুবার এটা করেছি। আরেকটা ইমেইল ছিল মার্তা নুরহাইম থেকে, এনআরকে ২-এর উপন্যাস-পুরস্কার সম্পর্কিত একটা সাক্ষাৎকার বিষয়ে, যে-পুরস্কারটা আমি জিতেছিলাম। এবং আরেকটা ছিল আমার চাচা গুন্নারের কাছ থেকে, যিনি আমার বইটার জন্য ধন্যবাদ দেন, এবং বলেন, তিনি সেটা পাঠ করার জন্য শক্তি সঞ্চয় করছেন, আমার শুভকামনা করেন সাহিত্যে নরডিক চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য এবং একটা পাদটীকা যোগ করেন, এটা খুবই লজ্জার যে, ইংভে ও কারি আন ডিভোর্স করছে। আমি কোনো জবাব না দিয়ে কম্পিউটার বন্ধ করে ফেলি।
‘ইন্টারেস্টিং কিছু আছে?’ লিন্দা জিজ্ঞেস করে।
‘হ্যাঁ। কার্ল-ইয়ুহান আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এনআরকে দুই সপ্তাহের মধ্যে একটা ইন্টারভিউ করবে আমার। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, হঠাৎ গুন্নার কাকাও লিখেছেন। তিনি আমাকে বইটার জন্য স্রেফ ধন্যবাদ দিয়েছেন। তবে সেটা খারাপ নয়, যদি ভাবি তিনি কী পরিমাণ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন আউট অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইটা লেখার জন্য।’
‘না, এটা ঠিক নয়’, লিন্দা বলে। ‘তুমি কি কার্ল-ইয়ুহানকে ফোন করে আসতে বলবে না?’
‘তুমি কি এতটাই ভালো মুডে আছো?’
সে আমার দিকে বিরক্তিসহকারে তাকায়।
‘আমি কেবল একটু ভদ্রতা দেখাতে চেয়েছিলাম।’
‘আমি সেটা জানি’, আমি বলি। ‘দুঃখিত। আমি অন্য অর্থ করিনি। ঠিক আছে?’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
আমি তার পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে ব্রাদার্স কারামাজভের দ্বিতীয় খণ্ডটাকে হাতে তুলে নিই, যেটা সোফায় পড়ে ছিল।
‘আমি গেলাম তাহলে’, আমি বলি। ‘দেখা হবে।’
‘উপভোগ করো’, সে বলে।
এখন আমার নিজের জন্য একটি ঘণ্টা সময় রয়েছে। দিনের বেলায় ভানইয়ার দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই একটি শর্তই আমি দিয়েছিলাম যে, বিকেলে আমি নিজের জন্য এক ঘণ্টা রাখব, যদিও লিন্দা এটিকে পক্ষপাতদুষ্ট মনে করত, কেননা সে কখনো নিজের জন্য একটি ঘণ্টা পায় না, তবু সে তাতে রাজি হয়। সে যে এক ঘণ্টা সময়ও পায় না তার নিজের জন্য, তার কারণ আমি ধরে নিই যে, সে এটা সম্পর্কে আসলে ভাবেইনি। এবং সে যে এটা নিয়ে ভাবেনি তার কারণ, আমি আবারো ধরে নিই, সে একা থাকার চাইতে আমাদের সঙ্গে থাকতেই পছন্দ করত। কিন্তু আমি সেভাবে অনুভব করিনি। ফলে প্রতি বিকেলে নিকটস্থ কোনো ক্যাফেতে বসে আমি বই পড়তাম, সিগারেট খেতাম। কোনো ক্যাফেতেই একটানা চার-পাঁচবারের বেশি যেতাম না, কেননা তাহলে তারা আমাকে নিয়মিত খদ্দের হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করত, মানে তারা আমি পৌঁছানোমাত্র আমাকে অভ্যর্থনা করত, এবং আমার পছন্দ ও পক্ষপাত বিষয়ে তাদের জ্ঞানগম্যি দিয়ে আমাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করত, প্রায়শই বন্ধুসুলভ কোনো মন্তব্যসমেত, সবার মুখে মুখে চালু কোনো বিষয় নিয়ে। কিন্তু বড় একটা শহরে বাস করার পেছনে আমার একমাত্র কারণ ছিল, আমার চারপাশে গিজগিজ করা মানুষের মাঝখানেও আমি সম্পূর্ণ একা থাকতে পারব। আমি আগে কখনো দেখিনি, এমনসব মুখের মাঝখানে! নতুন নতুন মুখের অব্যাহত স্রোত। আমার কাছে একটা বড় শহরের আকর্ষণই ছিল এরকম কিছুর মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করা। মেট্রোতে বিভিন্ন ধরনের ও চরিত্রের মানুষের ভিড়ভাট্টা। চত্বরগুলো। পথচারীদের অঞ্চল। ক্যাফেসমূহ। বড় বড় বিপণি। দূরত্ব, দূরত্ব, আমি কখনোই যথেষ্ট দূরত্বের সুযোগ পাব না। ফলে কোনো বারিস্তা যখন আমাকে হ্যালো বলে, এবং আমার দেখা পেয়েই হাসি দেয়, এবং আমি চাওয়ার আগেই আমার জন্য কফি নিয়ে আসে শুধু নয়, মাগনা ক্রয়সাঁও দেয় একখানা, আমি তখন প্রস্থানের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠি। এবং এর বিকল্প খুঁজে পাওয়াটাও তেমন কঠিন নয়, আমরা শহরের কেন্দ্রেই থাকতাম, এবং সেখানে দশ মিনিটের ব্যাসার্ধে শত শত ক্যাফের অস্তিত্ব ছিল।
এবারে আমি রিয়ারিংস গাতা ধরে শহরের কেন্দ্রের দিকে যেতে থাকি। পুরো রাস্তাটা লোকে লোকারণ্য। নামতা-গানের ক্লাসে দেখা আকর্ষণীয় তরুণীটির কথা ভাবি আমি। তার বিষয়টা কী? আমি তার সঙ্গে শুতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করিনি তেমন কোনো সুযোগ আমি পাব, এবং যদি সুযোগ পেতামও আমি তা গ্রহণ করতাম না। তাহলে আমি যদি তার সামনে মেয়েলি আচরণ করিও, সেটা এত গুরুত্বপূর্ণ হবে কেন?
আপনি আমার নিজের চোখে নিজের ছবি নিয়ে অনেক
কথাই বলতে পারেন, তবে এটা নিশ্চিতভাবেই যুক্তির আরামপ্রদ প্রকোষ্ঠের মধ্যে তৈরি হয়নি। আমার মেধা হয়তো সেটা বুঝতে সক্ষম, তবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো শক্তি ছিল না তার। একজনের আত্মচ্ছবি কেবল সে মানুষটারই ছবি নয়, বরং সে যা হতে চায়, হতে পারে কিংবা একদা হয়েও ছিল, তাকেও ধারণ করে, কেননা আত্মপ্রতিকৃতির ক্ষেত্রে বাস্তব ও কল্পিতের মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না। এটা সকল বয়স, সকল অনুভূতি ও সকল তাড়নাকেই ধারণ করে। যখন আমি শহরজুড়ে স্ট্রলার ঠেলি, দিনটা কাটাই আমার বাচ্চার দেখভাল করে, এটার অর্থ এই নয় যে, আমি আমার জীবনে নতুন কিছু যোগ করছি, যার ফলে তা আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে; বরং তার উল্টো, সেটি জীবন থেকে কিছু খসিয়ে দিচ্ছে, আমার কিয়দংশ, আমার পৌরুষের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশটুকু। এটা আমার বুদ্ধিবৃত্তি নয়, যা এই জিনিসটাকে আমার কাছে পরিষ্কার করে তুলেছে, কেননা আমার বুদ্ধি জানত আমি এটা করছি ভালো কোনো উদ্দেশ্যে, যেমন ধরুন, যাতে করে আমি ও লিন্দা বাচ্চাটার বিষয়ে একই সমতলে অবস্থান করি; বরং আমার আবেগ সেটা বলে, যা আমাকে একধরনের মরিয়া মনোভাবে পূর্ণ করে তোলে, যখনই আমি নিজেকে ছোট কোনো ছাঁচে ঢুুকয়ে ফেলি, যা এতই ছোট, এতই সংকীর্ণ যে, আমি আর নড়াচড়া করতে পারি না। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মানদণ্ডটি ক্রিয়াশীল হবে। যদি সমতা ও ন্যায়বিচারই হয় দুটো মানদণ্ড, তাহলে চতুর্দিকে কোমলতা ও অন্তরঙ্গতার জাদুতে ডুবন্ত পুরুষদের বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। এমনকি এটিকে যে অভিনন্দনের তালি দিয়ে সংবর্ধিত করা হয় সে-বিষয়েও নয়, কেননা সমতা ও ন্যায়বিচার যদি প্রধান মানদণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে একটি উন্নতি এবং প্রগতির পরিমাপক। কিন্তু এগুলোই তো একমাত্র মানদণ্ড নয়। সুখ একটি; বেঁচে থাকার সুতীব্র বোধ আর-একটি। এবং এমনও হতে পারে, যে-নারীরা তাদের চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত পেশাচর্চা করে শেষপর্যায়ে সন্তানের মাতা হয়েছে, জন্মের কয়েক মাস পর বাবাই যার দেখাশোনা করেছে নার্সারিতে একটা জায়গা পাওয়ার আগ পর্যন্ত, যাতে করে তারা দুজনেই তাদের পেশা অব্যাহত রাখতে পারে, তারা আগের প্রজন্মের নারীদের চেয়ে বেশি সুখী হতে পারে। এটাও সম্ভব, যে-পুরুষেরা ঘরে থাকে, তাদের শিশুদের দেখাশোনা করে মাসছয়েকের মতো, পরিণতিতে তারা তাদের বেঁচে থাকার অনুভূতিতে একটা অগ্রগমন লক্ষ করে। এবং নারীরা হয়তো এইসব শীর্ণবাহু, মেদবহুল কোমর, কামানো মাথা ও কালো ডিজাইনার চশমাপরা পুরুষদের কামনাও করে থাকতে পারে, যারা শিশু-ঠেলা গাড়ি ও বাচ্চাদের দোলনার ভালোমন্দ নিয়ে যতটা আলোচনা করতে পছন্দ করে, ঠিক ততটাই ভালোবাসে বাচ্চাদের খাওয়া ঘরে তৈরি করা ভালো নাকি বাজার থেকে পরিবেশবান্ধব শিশুখাদ্য কিনে আনা ভালো, তা নিয়ে বিতর্ক করতে। তারা হয়তো তাদেরও হৃদয়মন সঁপে দিয়ে কামনা করতে পারে। কিন্তু যদি তারা তা নাও করে, এতে কিছু আসে-যায় না, কেননা সমতা ও ন্যায়বিচার হচ্ছে মানদণ্ড, তারা এই সবকিছুরই গুণকীর্তন করত জীবন ও সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। এটা একটা পছন্দের বিষয় এবং সেই পছন্দবিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। আমার জন্যও তা সত্য। আমি যদি সেটার অন্যথা চাইতাম তাহলে আমাকে পিছিয়ে আসতে হতো এবং লিন্দাকে গর্ভবতী হওয়ার আগেই বলতে হতো : শোনো লিন্দা, আমি বাচ্চা চাই, তবে বাসায় বসে থেকে আমি তাদের দেখাশোনা করতে পারব না, এটা কি তোমার জন্য ঠিক আছে? তার মানে, অবশ্যই এগুলো তোমাকে একাই করতে হবে। তখন সে বলতে পারত, না, এটা ঠিক নেই, অথবা, হ্যাঁ ঠিক আছে, এবং সেই অনুযায়ী আমাদের জীবনকে পরিকল্পনা করতাম আমরা। কিন্তু আমি বলিনি, আমার যথেষ্ট দূরদৃষ্টি ছিল না, যার পরিণতিতে আমাকে খেলার নিয়ম মেনেই চলতে হচ্ছে। যে শ্রেণি ও
সংস্কৃতিতে আমরা বিরাজমান, তাতে সবার সমান ভূমিকা, আগে যাকে বলা হতো নারীর ভূমিকা কেবল। আমি এটার সঙ্গে বাঁধা ছিলাম, ওদিসিয়ুস যেরকম তাঁর মাস্তুলের সঙ্গে : আমি যদি নিজেকে মুক্ত করতে চাইতাম তাহলে পারতাম বইকি, তবে সবকিছু না হারিয়ে নয়। ফলে আমি স্টকহোমের রাস্তা ধরে হাঁটি, আধুনিক ও নারীসুলভ, ভেতরে এক ক্রুদ্ধ ঊনবিংশ শতাব্দীর পুরুষকে নিয়ে। যেভাবে আমাকে পালটে যেতে দেখা হয়েছে, যেনবা কোনো জাদুর কাঠির স্পর্শে, যে-মুহূর্তে আমি হাত রাখি স্ট্রলারের গায়ে। আমি সবসময় যে-নারীটির পাশ দিয়ে হেঁটে যাই তার দিকে তাকাই, যেভাবে সব পুরুষই করে, যা আদতে একটি রহস্যজনক কাজ, কেননা তা কোথাও নিয়ে যায় না, বড়জোর একটা ফিরতি নজর ছাড়া, এবং আমি যদি খুব সুন্দর একটা মেয়েকে দেখি তাহলে হয়তো ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে দেখি, লুকিয়ে অবশ্যই, কিন্তু দেখি তো বটেই; কিন্তু কেন, হায় কেন? এইসব চোখ, মুখ, স্তন, কোমর, পা ও নিতম্ব কী উদ্দেশ্য সাধন করে? তাদের দিকে তাকানোটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? যখন তা কেবল কয়েক সেকেন্ড, মাঝেসাঝে বড়জোর কয়েক মিনিটের জন্য, পরমুহূর্তেই যার সবটুকু ভুলে যাব আমি? কখনো আমার সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়, তখন সেটা যদি সামান্য একটুক্ষণ ধরে রাখা যায় তখন আমার ভেতর দিয়ে একটা স্রোত বয়ে যায়, কেননা তা এসেছে জনতার মাঝখানের একজন থেকে, আমি যার সম্পর্কে কিছুই জানি না; তার বাড়ি কোথায়, সে কোথায় থাকে, কিছুই না, তারপরও আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই, এটা আসলে ঠিক তা-ই, সে তারপর চলে যায়, এবং তা আমার স্মৃতি থেকে চিরতরে মুছে যায়। আমি যখন স্ট্রলার নিয়ে আসি, তখন কোনো নারীই তাকায় না আমার দিকে, যেন বা আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। কেউ হয়তো ভাবতে পারে, আমি এমন এক ইঙ্গিত দিই যে, আমাকে দখল করে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটা তো আমি যখন লিন্দার হাতে হাত রেখে হেঁটে যাই তখনো পরিষ্কার, কিন্তু তখন তো কোনো মেয়ের আটকায় না আমার দিকে তাকানো থেকে। হা ঈশ্বর, আমি কি আমার ন্যায্য শাস্তিটুকু পাচ্ছি না, আমাকে কি আমার প্রাপ্য জায়গাটাই দেওয়া হচ্ছে না হাঁটতে হাঁটতে মেয়েদের গিলে খাওয়ার জন্য, যখন আমার বাড়িতে একজন রয়েছে যে আমার সন্তানের জন্ম দিয়েছে?
হ্যাঁ, এটা ঠিক হচ্ছে না।
এটা কোনোভাবেই ভালো নয়।
তনিয়ে আমাকে বলেছিল যে, সে একবার এক রেস্তোরাঁয় একজন পুরুষের দেখা পেয়েছিল, তখন রাত হয়ে গেছে, সে তাদের টেবিলে আসে, মাতাল, তবে ক্ষতিকর নয়, অথবা তারা তেমনটি ভেবেছিল, সে বলেছিল সরাসরি মাতৃত্ব-ওয়ার্ড থেকে আসছে সে, সেদিন তার পার্টনার তাদের প্রথম বাচ্চার জন্ম দিয়েছে, এবং সে শহরে এসেছে উদ্যাপন করতে। তারপর সে অগ্রসর হতে শুরু করে, সে বেশ জোরাজুরি করতে থাকে, এবং শেষে তাকে তার হোটেলে যেতে প্রস্তাব দেয় …, তনিয়ের আত্মা অবধি কেঁপে ওঠে, পুরো ঘেন্নায় ভরা, যদিও কিছুটা বিস্ময় নিয়ে, আমি সন্দেহ করি, কেননা সেটা কীভাবে সম্ভব, সে আসলে কী ভাবছিল?
আমি এর চেয়ে বড় প্রতারণার কথা ভাবতে পারছিলাম না। কিন্তু সেটা কি ঠিক একই কাজ নয়, যখন আমি এইসব নারীর নজর প্রার্থনা করছিলাম?
আমার ভাবনাগুলো অবশ্যম্ভাবীরূপে বাড়িতে বসে থাকা লিন্দার কাছে যায়, ভানইয়াকে স্নান করানো, কাপড় পরানো, তাদের চোখ, ভানইয়ার কৌতূহলী, খুশি অথবা নিদ্রাকাতর চোখ, লিন্দার সুন্দর চোখ। আমি কাউকেই কখনো তার চেয়ে বেশি করে চাইনি, এবং আমি শুধু তাকেই পাইনি, তার দেওয়া বাচ্চাকেও। আমি কেন সেটা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারি না? আমি কেন এক বছরের জন্য লেখা বন্ধ করে দিয়ে ভানইয়ার বাবা হয়ে উঠতে পারি না, যতদিনে লিন্দা তার প্রশিক্ষণ শেষ করবে? আমি তাদের ভালোবাসি, তারাও আমাকে ভালোবাসে। তাহলে কেন বাকি আর সবকিছু আমাকে বিরক্ত ও বিভ্রান্ত করা থেকে বিরত থাকছে না?
আমার নিজের ওপর জোর করতে হয়। আমার চারপাশের সবকিছু ভুলে যেতে হবে, এবং দিনের বেলায় কেবল ভানইয়ার ওপর মনোনিবেশ করতে হবে। লিন্দার যা কিছু প্রয়োজন তাকে তা দিতে হবে। একজন ভালো মানুষ হতে হবে। যিশুর দিব্যি, একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা, সেটা কি আমার সাধ্যের অতীত?


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.