উনিশ

কমলরানি গায়ে আগুন দেবে মাঘ মাসের শেষদিককার এক সন্ধ্যায়। শীত যাই যাই করেও যাচ্ছিল না। কোনো কোনো রাতে শিশির এত নিবিড় হয়ে ঝরে, গাছের পাতায় পাতায় এমন করে জমে থাকে, সকালবেলার আলো ফুটে ওঠার অনেকক্ষণ পর পর্যন্ত টুপটাপ টুপটাপ করে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মতো অনেকক্ষণ ধরে ঝরতে থাকে। গৃহস্থের উঠোনপালান স্যাঁতসেঁতে। হঠাৎ করে তাকালে মনে হয়, ভোররাতের দিকে বুঝি মিহিন একখানা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বঁটির ধারের মতো চকচকে রোদ ওঠার পরই আস্তে আস্তে বদলাতে থাকে দিনের চেহারা। রোদের তাপে দশদিকে ছড়িয়ে যায় উষ্ণতা। গৃহস্থলোক শীতের আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে গৃহস্থালি কাজে মন দেয়। তবে বিকেল শেষ হতে না হতেই ঘনায় সন্ধ্যাকাল। চকমাঠের দিক থেকে উড়ে আসে সাদা বকের মতো কুয়াশা। ধীরে ধীরে ঢাকা পড়তে থাকে গ্রামপ্রান্তর।

সেদিনও এমনি করেই ফুরিয়ে গিয়েছিল দিনটি। অভয় তালুকদার মহাশয়ের বাড়িতে ‘নিমাই সন্ন্যাসী’ যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি সীতারামপুরের জমিদার। জমিদার হিসেবে তেমন বড় নন, ছোটই। ছোট হলেও জমিদার তো। ঠাটবাট অন্যরকম। দুর্গাপূজার বিশাল আয়োজন হয় বাড়িতে। বছরভর লেগে থাকে আনন্দ-উৎসব। ছেলেমেয়েরা থাকে কলিকাতায়। পূজাপার্বণে বাড়িতে আসে। হিন্দু-মুসলমান বলে কথা নেই। তালুকদারবাড়ির উৎসবে সবারই নিমন্ত্রণ। সে এক দিন গেছে। দেশভাগের কয়েক বছর আগ থেকে তালুকদারবাড়ির উৎসব-আনন্দে কিঞ্চিত ভাটা পড়েছিল। দেশের

এদিক-ওদিক প্রায়ই হচ্ছিল রায়ট। হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। এ-ওর গলা কাটে। এই অবস্থায় জমিদারি গোটাতে শুরু করেছিলেন তালুকদার মহাশয়। চকমাঠের জমিজমা প্রায় সবই বেচাবিক্রি শেষ। বাড়িটা আছে। বাড়ির এদিক-ওদিক কিছু জমি, বিশাল একখানা পুকুর – এসব রয়ে গেছে। দেশবিভাগ হয়ে গেল। সেই ডামাডোলে তিনি আটকা পড়লেন গ্রামে। নাকি ইচ্ছে করেই রয়ে গেলেন, তা পরে জানা যাবে। স্ত্রী স্বর্গে গেছেন কয়েক বছর আগে। বুড়ো জমিদার কয়েকজন চাকর-নফর নিয়ে থাকতেন বাড়িতে। দেশভাগের কালে আতঙ্কিত হয়ে বিক্রমপুরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে দরিদ্র আত্মীয়রা ঘরবাড়ি ছেড়ে তালুকদারবাড়িতে এসে উঠেছে। বিশ-বাইশটি পরিবার হবে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে শ’দেড়েক মানুষ। দিনে দিনে তারা এই বাড়ির পাকাপোক্ত বাসিন্দা হয়ে গেল। অভয় তালুকদারের জমিজমা, বিশাল বাড়িটি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে সেই ভাগের মালিক হয়ে বসবাস করতে লাগলো। চকের জমিতে চাষাবাদ শুরু করেছে। বাজারে কেউ কেউ দোকান করেছে। সীতারামপুরের খালের ধারে ছোট মুদিদোকান দিয়েছে একজন। খালেবিলে মাছ ধরে কেউ কেউ। এই মানুষগুলোর মধ্যে মিলেমিশে রয়ে গেলেন তালুকদার মহাশয়। লোকগুলো তাঁকে শ্রদ্ধা-সম্মান করে। সেবাযত্নেরও অভাব নেই। মানুষগুলোর মায়ায় আটকা পড়ে গেলেন তিনি। ছেলেমেয়েরা চাইছিল কলিকাতায় নিয়ে যেতে। তিনি যাবেন না। বুড়ো থুত্থুড়ে হয়ে গেছেন। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটাচলা করেন। খাস চাকর আছে দুলাল আর সেন্টু। ওদের পরিবারও এই বাড়িতেই থাকে। জমাজমি বিক্রির সময় এই দুজনকে কয়েক কানি করে জমি দান করেছেন। সেই জমির আয়ে দুলাল-সেন্টুর সংসারে অভাব বলতে কিছু নেই। তালুকদার মহাশয়কে তারা এতই ভালোবাসে, পরিবার এই বাড়িতে থাকা অবস্থাতেও নিজের ঘরে বলতে গেলে ওই দুজন যায়ই না। তালুকদার মহাশয়ের পাশের কামরাতেই থাকে দুজনে। কী জানি রাত-বিরাতে কর্তার কোনো অসুবিধা হয় কি না। তার সামান্য কাতরানি শুনলেও যেন দুলাল আর সেন্টু ছুটে যেতে পারে, এরকম সচেতন থাকে তারা। অতন্দ্র প্রহরী বলতে যা বোঝায়, তালুকদার মহাশয়ের চাকর দুজন আসলে সেই রকম। দেশভাগের ফলে বিক্রমপুর উজাড় করে হিন্দুরা চলে গেছে। গেছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বা উদ্বাস্তু শিবিরে। আবার অনেকে যায়ওনি। দাঙ্গা বিক্রমপুর অঞ্চলে হয়নি। মাটির মায়া বলেও একটা কথা আছে। সেই মায়াও কাটাতে পারেনি অনেকে। যেমন দেবুঠাকুর।

তালুকদারবাড়ি সেই সময়েই প্রায় ধসে পড়া। দালানকোঠাগুলোর ছিরিছাদ নেই। এদিক-ওদিক পড়ে আছে শ্যাওলা ধরা ইটের স্তূপ। পুকুরঘাট ধসে পড়া। বারবাড়ির দিককার দোতলা বিশাল দালানটির খাঁচা দাঁড়িয়ে আছে। তার পশ্চিম পাশে একতলা একটা দালান। সেই দালানেও একটি উদ্বাস্তু পরিবার থাকে। দুই দালানের মাঝখানে বিঘা দেড়েক ফাঁকা প্রাঙ্গণ। শীতের শেষদিকে এই জায়গাটায় যাত্রার দল ভাড়া করিয়ে আনান তালুকদার মহাশয়। এই একটা শখ এখনো তাঁর রয়ে গেছে। যাত্রা দেখা। বহু বহু বছর ধরে আয়োজনটা হতো দুর্গাপূজার সময়। এখন আর পূজাটা জাঁকজমকপূর্ণ হয় না। হয় অনেকটা দায়সারাগোছের। জমিজমা বিক্রির টাকা কলিকাতায় পাচার হয়ে গেছে। কিছু হয়তো এখনো রয়ে গেছে তালুকদার মহাশয়ের লোহার সিন্দুকে। সেই টাকা থেকে খাওয়ার খরচ চালিয়ে যাত্রার শখটুকু মেটান কর্তা। একজন মানুষের খাওয়ার খরচ বিশেষ আর কী! তাছাড়া মাসের বেশিরভাগ দিন তাঁর হেঁসেলে রান্নাই হয় না। তাঁর রান্নার কাজ পালা করে সারে দুলালের বউ মুক্তা আর সেন্টুর বউ আরতি। এখন কর্তার হেঁসেলে তারা বলতে গেলে ঢোকেই না। নিজেদের ঘরের রান্নায়ই কর্তার খাওয়ায় পরিবেশন করে। সেসব খাবার স্বাদ করেই খান কর্তা। তাঁর খাওয়াও বিশেষ কিছু না। সকালবেলা চাউলের রুটি আর সবজি, রাতের বেলায় বড় এক গেলাস দুধ। দুপুরের মুখে বাড়ির গাছের যখন যে ফল পাওয়া যায়, ওই। দুপুরে সামান্য ভাত, মাছ বা মুরগি। বিকেলে চা আর একমুঠ মুড়ি। এ এমন কী! ফলে খাওয়া খরচের জন্য সিন্দুকে হাত তাঁর দিতেই হয় না। হাত দিতে হয় যাত্রার শখ মেটানোর সময়।

এবারো সেই আয়োজনটি করা হয়েছে।

তালুকদারবাড়ির যাত্রার আসরে আশপাশের গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দেবুঠাকুর আমন্ত্রণ পান সবার আগে। তালুকদার মহাশয়ের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা। তাঁর চিকিৎসাও করেন তিনি। গেল বর্ষায় এক রাতে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলেন কর্তা। পাঁচ-সাতবার পায়খানায়

আসা-যাওয়ার পর একেবারেই নেতিয়ে পড়লেন। দুলাল-সেন্টু তাঁর দেখভাল করতে করতে ভয়ে অস্থির হলো। সুশীলরা চারজন নৌকা নিয়ে এলো দেবুঠাকুরকে নিয়ে যেতে। ঘটনা শুনে কী করতে হবে বুঝে গেলেন দেবুঠাকুর। সেইমতো প্রস্তুতি নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখেন বিছানা নষ্ট করে ফেলেছেন তালুকদার মহাশয়। দুর্গন্ধে টেকা দায়। দুলাল আর সেন্টু নাকে গামছা বেঁধে কর্তার শরীর ধুইয়ে দিচ্ছে। মানুষটি তখন প্রায় অচেতন।

ডাক্তারি জীবনে এই ধরনের রোগী দেখা বিচিত্র কিছু নয়। ‘ঘিন্নাপিত্তি’ থাকলে ডাক্তারি করা যায় না। দেবুঠাকুর তারপরও নাকে রুমাল বেঁধেছিলেন। পরপর দুটো ইনজেকশন দিলেন তালুকদার মহাশয়কে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাঁর দাস্ত একেবারেই উধাও। তাঁকে আখিগুড় আর লেবুর শরবত খাওয়ানো হলো। মানুষটি ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। দেবুঠাকুরের একটা হাত জড়িয়ে ধরে রাখলেন অনেকক্ষণ। মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘তুই আমারে বাঁচাইলি দেবু, ভগবান তোর মঙ্গল করবো।’

দেবুঠাকুর বাড়ি ফিরেছিলেন ভোররাতে। খরালিকালের দুই মাস বাপের বাড়িতে কাটিয়ে বর্ষার মুখে মুখে স্বামীর সংসারে ফিরেছিল কমলরানি। ভরা বর্ষায় কথামতো ঠাকুর তাকে আবার দিয়ে এসেছিল বাপের বাড়িতে। ভোররাতে মতি বেলদারের কেরায়া নৌকা নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। দুপুরের মুখে মুখে মালখানগরে কমলরানিদের বাড়িতে গিয়ে হাজির। দুপুরের ভাত সেই বাড়িতে খেয়ে আবার যাত্রা করেছিলেন রতনপুরের দিকে। শ্বশুর-শাশুড়ি আর শ্যালক-শালিকারা জোরাজুরি করেছিল একটা রাত অন্তত থেকে যাওয়ার জন্য। কমলরানিও অনুরোধ করেছিল। দোলন একা বাড়িতে, এই দোহাই দিয়ে ফিরে এসেছিলেন ঠাকুর। ফিরতে ফিরতে রাত এক প্রহর। তাঁর জন্য জেগে অপেক্ষা করছিল দোলন। তবে তার কোনো ভয়ডর ছিল না। বনভূমির মতো বিশাল বাড়িটিতে একাকিত্ব সে টেরই পায়নি। তার মনে হয়েছিল, উঠোনের এদিক-ওদিক কারা যেন অবিরাম হাঁটাচলা করছে। যেন বা তাকে পাহারা দিচ্ছে। দোলন বুঝে গিয়েছিল, আসল ঠাকুর মালখানগরে গেছেন, অন্য সাতজন রেখে গেছেন দোলনের পাহারায়।

সেই রাতেও দোলন একা। রতনপুর থেকে সীতারামপুর মাইলখানেকের পথ। যেতে-আসতে সময় ভালোই লাগবে। তার ওপর কতক্ষণ থাকতে হবে রোগীর কাছে তাই বা কে জানে! কমলরানি বাপের বাড়িতে। এখন দোলন ঘুমায় দেবুঠাকুরের গলা জড়িয়ে। একটা রাতের বিরহও তার সহ্য হয় না। রাতটা দোলন অতিকষ্টে কাটিয়েছিল। দাস্ত করা রোগী ঘাঁটাঘাঁটি করে এসেছেন দেবুঠাকুর। ঘরে না ঢুকেই চলে গিয়েছিলেন ঘাটে। বর্ষার টইটম্বুর জলে চান করে এসেছিলেন। দেবুঠাকুর পরিচ্ছন্ন থাকা মানুষ।

বর্ষাকালের সেই রাতের পর থেকে তালুকদার মহাশয় যেন দেবুঠাকুর ছাড়া কিছু বোঝেনই না। বাড়িতে যাত্রার আয়োজন করেই দেবুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বলেছেন, যাত্রা শুরুর আগে দেবু যেন তাঁর কামরায় আসেন। কথা আছে। সেই প্রস্তুতি নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন ঠাকুর। এই ধরনের অনুষ্ঠানে বিশেষ সাজগোজ করে যান ঠাকুর। সাদা ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি পরেন। পায়ে পাম্প শু। পাঞ্জাবির ওপর দামি আলোয়ান। চোখে চশমা। গায়ে সুগন্ধি ছড়িয়েছেন। অপূর্ব এক ফুলের সুবাস আসছিল তাঁর গা থেকে। শীতের শেষ বিকেল ভেঙে প্রিয়নাথকে সঙ্গে নিয়ে তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন তালুকদারবাড়ির দিকে। প্রিয়নাথের হাতে ছিল ঠাকুরের ডাক্তারি ব্যাগ। এই ব্যাগ ছাড়া বাড়ি থেকে তিনি বেরোন না। বলা তো যায় না, যেখানে যাচ্ছেন সেখানে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে যায় কি না কোনো মানুষ। হাতের কাছে ডাক্তার থাকলে রোগীর লোকজন তাঁকে ধরবে। ওরকম পরিস্থিতি তো আর এড়ানো যায় না। এজন্য ব্যাগটা তিনি সঙ্গে নেন।

যাত্রা শুরু হয় সাধারণত একটু বেশি রাতে। দেশগ্রামের মানুষ রাতের খাওয়া শেষ করে যাত্রা দেখতে যায়। গ্রাম এলাকায় সন্ধ্যারাতই যেন গভীর রাত। সন্ধ্যা হতে না হতেই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে গৃহস্থলোক। দেবুঠাকুরও তাঁর রাতের দুধটুকু খেয়ে বেরিয়েছেন। সীতারামপুর পৌঁছাতে আধাঘণ্টাখানেক সময় লেগেছে। চকেমাঠে তখনো রয়ে গেছে বর্ষার ছাপ। আমন ধান কাটা শেষ হয়েছে অগ্রহায়ণে। শীত আসতে না আসতেই ক্ষেতখোলার কাজে লেগে গেছে গৃহস্থরা। ধান কাটার পর ‘ডাঁটি’ও কেটে নেওয়া হয়েছে। ডাঁটি জিনিসটি ধানের ছড়া আর গোড়ার মাঝখানকার অংশ। ওই দিয়েই বাড়ির আঙিনায় ‘পালা’ দেয় লোকে। পালা দেওয়ার জায়গাটিকে বলে ‘পালান’ আর পালাটিকে বলে ‘খ্যাড়ের পালা’। গোড়ার যে-অংশটা তখনো লেপটে থাকে ধানিজমিতে, সেটা হচ্ছে ‘নাড়া’। কাদাজলে মাখামাখি হয়ে থাকা নাড়া বেশিরভাগ গৃহস্থ বাড়িতে আনে না। ক্ষেতের খানে খানে সেগুলো জড়ো করে বিকেলের মুখে মুখে আগুন লাগিয়ে দেয়। নাড়ার ধোঁয়ায় তখন আচ্ছন্ন হয় চারদিক। আর নাড়াপোড়ার ছাইয়ে জমির উপকার হয়। সারের কাজ দেয় কিছুটা।

সেই সন্ধ্যায়ও নাড়া পুড়ছিল বিভিন্ন ক্ষেতে। নাড়ার ধোঁয়া আর পোড়াগন্ধ ভাসছিল হাওয়ায়। গ্রামের এদিক-ওদিক যাওয়ার বড় হালট তেমন নেই। ক্ষেতখোলার মাঝখানকার ‘আইল’ ধরেই হাঁটতে হয়। ঠাকুর সে-পথেই হেঁটে গিয়েছিলেন তালুকদারবাড়িতে। অভয় তালুকদার মহাশয় থাকেন বড় পুকুরটির ধারের দক্ষিণমুখী একতলা দালানটিতে। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে সেই দালানে উঠতে হয়। পাশাপাশি বিশাল বিশাল তিন-চারটি কামরা। চওড়া বারান্দার শেষ দিককার কামরাটিতে থাকেন তিনি। এই দালানটি এখনো ধসে পড়েনি। হয়তো আরো দশ-পনেরো বছর পুরনো মহিমা নিয়ে টিকে থাকবে। ততদিনে স্বর্গে যাবেন কর্তা।

দেবুঠাকুর এসেছেন শুনে তালুকদার মহাশয় তাঁকে নিজের কামরায় ডেকে নিয়েছিলেন। কথা ছিল ঠাকুরের সঙ্গে।

যাত্রার আঙিনা তখনই ভরভরাট। আঙিনা জুড়ে শুকনো নাড়া বিছানো। তার ওপর চাদরমুড়ি দিয়ে লোকজন বসে গেছে। মহিলারা বসেছে একপাশে। নারী-পুরুষ তখনো সমানে আসছে। শো-শো করে চারখানা হ্যাজাগ বাতি জ্বলছে। সেই আলোর ভেতর দিয়ে কর্তার ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন দেবুঠাকুর। তাঁর সঙ্গে প্রিয়নাথ তো ছিলই। কর্তার ঘরের দিকে যেতে যেতে যাত্রার মঞ্চটির দিকে একবার তাকিয়েছিলেন ঠাকুর। বেশ লম্বা আর চওড়া মঞ্চ তৈরি হয়েছে এবার। তিনদিক খোলা মঞ্চটি যাত্রা শুরুর জন্য গভীর আগ্রহে যেন অপেক্ষা করছিল। বিশিষ্টজনের জন্য হাতলঅলা পনেরো-ষোলোটি চেয়ার রাখা একপাশে। কর্তার কামরার দিকে যেতে যেতে মুহূর্তেই যেন সব কিছু দেখে ফেলেছিলেন দেবুঠাকুর।

কর্তা বসেছিলেন আরাম কেদারায়। দেবুঠাকুরের মতো তিনিও কিছুটা সাজগোজ করেছেন। সাদা ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি পরেছেন। গেরুয়া রঙের শাল জড়িয়েছেন পাঞ্জাবির ওপর। বয়সের ভারে গলা আর মুখের চামড়া ঝুলে গেছে। নাকের তলার পুরুষ্ট গোঁফ ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে অনেকখানি নেমেছে। চোখে পুরো লেন্সের চশমা। গোঁফের মতো চোখের পাপড়ি আর ভুরু দুটোও সাদা। মাথার চুল পাটের আঁশের মতো। তবে টাক তেমনভাবে পড়েনি। চুলগুলো আজ তেল দিয়ে আঁচড়িয়েছেন। বিশালদেহী মানুষটি আরামকেদারায় বসে গড়গড়া টানছিলেন। তাঁকে দেখাচ্ছিল অনেকটাই যেন বাংলা সিনেমার ছবি বিশ্বাসের মতো। দেবুঠাকুরকে দেখেই বলেছিলেন, ‘আইছস দেবু, আয় দাদা, আয়। বয়।’

দেবুঠাকুর তাঁকে প্রণাম করে মুখোমুখি চেয়ারে বসেছিলেন।

তালুকদার মহাশয় গড়গড়ার নলে দু-তিনটি টান দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া ছাড়লেন। সেই ধোঁয়ার সঙ্গে হাওয়ায় ভাসতে লাগলো খুশবুদার তামাকের নেশা নেশা গন্ধ। ঠাকুরের গায়ের সুগন্ধ যেন সেই গন্ধের কাছে মার খেয়ে গেল।

তালুকদার মহাশয় বললেন, ‘দ্যাশে তো আর মানুষ নাই, কেঐর কাছে মনের কথা কইতে পারি না। অনেক কথা জইমা রইছে মনের ভিতরে। কথাগুলি কেঐরে কওন দরকার। আইজ থিকা বায়ান্ন বচ্ছর আগে পাশের গেরাম কাজিরপাগলায় আমি হাই ইস্কুল কইরা দিছিলাম। আশপাশের দশ গেরামে আছিলো আমার জমিদারি। ১৯০৫ সালের কথা। আমার বয়েস তখন তিরিশের মতন হইবো। অখণ্ড ভারতে চলছে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। আমি সেই আন্দোলনের কথা মনে রাখি নাই। যদিও আন্দোলনটা পড়ে থাইমা যায়। বঙ্গভঙ্গ আর হইলো না। তয় আমি ওইসবের তোয়াক্কাও করি নাই। বাংলা ভাগ হইলো কি হইলো না, সেইটা আমি মনেও রাখি নাই। আমি দেখলাম, দশ গেরামের মইদ্যে কোনো হাই ইস্কুল নাই। প্রাইমারি ইস্কুল আছে দুইটা। চিন্তা করলাম একটা হাই ইস্কুল প্রতিষ্ঠা করুম। যেই চিন্তা সেই কাজ। কাজিরপাগলা বাজারের লগে হাই ইস্কুল করলাম। নিজের নামে ইস্কুলের নাম করলাম ‘কাজিরপাগলা এ. টি. ইনস্টিটিউশন’। অর্থাৎ ‘কাজিরপাগলা অভয় তালুকদার ইনস্টিটিউশন’। বাজারের জমিন, ইস্কুলের জমিন আর বিরাট মাঠটা সবই আমার। টিনের লম্বা দুইখানা ঘর কইরা দিলাম। মাস্টারগো বহনের লেইগা তিন কামরার চৌচালা টিনের ঘর কইরা দিলাম। ইস্কুল চালু হইয়া গেল। হ, এই কথা মাইনষে মনে রাখছে। দেশ ভাগ হইয়া গেছে। পূর্ব বাংলা এখন পূর্ব পাকিস্তান। তারপরও ইস্কুলটা আমার নামেই রইয়া গেছে। নামটা কেউ বদলায় নাই। চাইলেই বদলাইতে পারতো। আমার তো কিছু করনের আছিলো না। তয় দ্যাশের মাইনষে আমারে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার টানেই আমি রইয়া গেছি। নাইলে কবেই তো কলিকাতায় চইলা যাইতে পারতাম। অহনও পারি। যাই না দেইখা ছেলেমেয়েরা রাগারাগি করে। রাগ কইরা আমার লগে কথা কয় না। চিঠিপত্র লেখে। আমিও লেখি। কলিকাতা থিকা ছেলেমেয়েরা ওষুদবিষুদ পাঠায়। কাপড়চোপড় পাঠায়। টাকাও পাঠায়। দুই-চাইর বচ্ছরে কেউ কেউ আমারে দেখতেও আসে। বাড়িঘরের অবস্থা আর আমারে দেইখা মনে কষ্ট পায়। তালুকদারবাড়ি তো আর আগের সেই বাড়ি নাই। ছোটকালে আমার পোলাপানে যেই বাড়ি দেখছে, অহন তো আছে সেই বাড়ির কঙ্কাল। অহন তো বাড়ি হইয়া গেছে উদ্বাস্তু শিবির। তারা নাক ছিটকায়। তাগো এইসব মানুষজন

ভালো ল্লাগে না। তাগো শরীলে জমিদারি রক্ত। সব মানুষেরই তারা নিজেগো প্রজা মনে করে। এইসব দেইখা আমি তাগো কইছি, তগো আর এই বাড়িতে আহনের কাম নাই। তরা কলিকাতায় থাক তগো জমিদারি রক্ত লইয়া। আমি এই মানুষগুলির লগেই থাকুম। ধইরা নে, আমিও অহন অগো মতনই উদ্বাস্তু। এইসব মানুষ ছাইড়া আমি যামু না। যতদিন বাঁইচা আছি, অগো লগেই থাকুম। এই বাড়িতে কত ছোট ছোট পোলাপান। রাইত দিন হৈচৈ। পোলাপানের হাসন-কান্দন, দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি, চিল্লাচিল্লি আর হৈচৈ। বুঝলি দেবু, এইসব আমার ভাল্ল­াগে। বাড়ির বউঝিগো মইদ্যে কাইজ্জাফ্যাসাদ লাইগ্যাই আছে। একজন আরেকজনরে অসইভ্য ভাষায় বকাবাদ্যি করে। বউঝিগো পক্ষ লইয়া এক বাসি যায় আরেক বাসিরে কোবাইতে। আমি একটা ধমক দিলেই বেবাক ঠান্ডা। আবার দেহি বাড়ির বউঝিগো মইদ্যে বিরাট খাতির। দল বাইন্দা গল্পগুজব করে। হাসি-মশকরা করে। দেইখা আমার চোখ দুইডা জুড়াইয়া যায়। পুরুষ পোলাগো মইদ্যেও দেহি কাইজ্জাকিত্তনের পর আবার অনেক মিলমিশ। এক লগে তামুক-বিড়ি খায়, হাসে, গল্প করে। দেইখা আমার ভালো লাগে। একজন বিপদে পড়লে, দশজন গিয়া খাড়ায় তার পাশে। পবনের বউটার পোলাপান হইবো। বাড়ির বউরা বেবাকতে অরে দেইখা-শুইনা রাখলো। ‘আহুজ’ যেদিন পড়লো, পবনের পোলাটা যেদিন হইলো, বাড়ির বেবাকটি ঘরে সাড়া পইড়া গেল। কি আনন্দ! কি আনন্দ! যেন বাড়িতে দুর্গাপূজার ঢেউ লাইগা গেছে। আবার যেদিন নন্দ মইরা গেল, হেদিন দেহি পুরা বাড়ির মানুষ কানতাছে। পোলাপানরাও চুপচাপ হইয়া গেছে। পুকুইরের জলের লাহান ‘নিটাল’ চাইরমিহি। পাখির ডাক ছাড়া কিচ্ছু হুনা যায় না। রতনের মাইয়াটা কাজিরপাগলা ইস্কুলে কেলাশ এইটে পড়ে। জোছনা রাইতে উঠানের তুলসীমঞ্চটার সামনে খাড়াইয়া জোছনা দেহে আর গান গায়। ‘ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে, আমি বনফুল গো’। আমি হয়তো তহন ঘুমাইয়া পড়ছি। মাইয়াটার নাম মাধুরী। অর গান হুইনা ঘুম ভাইঙ্গা যায়। মনে হয়, গান তো না, যেন চান্দের আলো দেইখা সেই আলোর ছন্দে বনের ফোটা ফুল নাচতাছে। আমার আর ঘুম আহে না। যতক্ষণ মাইয়াটা গান গায় আমি জাইগা থাকি। আমার খালি মনে হয়, এই বাড়ি ভরা আনন্দ। এই আনন্দ হালাইয়া আমি কই চইলা যামু? কীর লেইগা যামু? এইডাই তো আমার জমিদারি! এই বাড়ি ভরা আমার প্রজা। তারা আমারে ভালোবাসে আর আমি ভালোবাসি তাগো। ভগবান পৃথিবী তৈরি করছেন মাইনষের ভালোবাসার লেইগা। মরণ ছাড়া এই ভালোবাসা ছাইড়া আমি যাইতে চাই না। কলিকাতায় গেলে কী হইবো? পোলামাইয়ারা আমারে তিনমহলা বাড়িতে রাখবো। ভালো খাওন-পরন,

চাকর-নফর, ডাক্তার-কবিরাজ পামু। ওইসব আমার লাগে না। আমার চাইরমিহি এত মানুষ, খাওনদাওনের আকাল নাই, চিকিৎসার লেইগা আছস তুই। দাস্ত কইরা মইরা যাই, ঘিন্নাপিত্তি ত্যাগ কইরা তুই আমারে বাঁচাইলি। আমার আর কিয়ের ডাক্তার-কবিরাজ লাগে? পোলাপানরে এইসব আমি বুঝাইতে পারি না। তারা রাগারাগি করে। রাগ কইরা চিঠিপত্র লেখা বন্ধ করে। তয় আমি তো বাপ। আমি তো পোলাপানের ওপরে রাগ কইরা থাকতে পারি না। আমি আমার মতন চিঠিপত্র লেখি। ভালোমন্দ খবরবার্তা জানাই। দিনে দিনে এমুন হইছে রে দেবু, অহন আর পোলাপানের কথা বেশি আমার মনেই হয় না। মনে হয়, এই বাড়ি ভর্তি আমার পোলাপান। তারা আমারে দেইখাশুইনা রাখে। আমারে খাওয়াইয়া-পরাইয়া বাঁচাইয়া রাখে। সবাইরে লইয়া এই বাড়িতে আমি নিজের মতন কইরা বাঁইচা আছি। আনন্দ লইয়া বাঁইচা আছি। কলিকাতায় গেলে এই আনন্দ আমার থাকতো না। বহুত আগেই আমি চিতায় উঠতাম। আনন্দ ছাড়া মানুষ বাঁচে না রে, দাদা। অনেক দিন ধইরা মনে হইতাছে এই কথাগুলি কেঐরে কই। ভাইবা পাইতাম না, কারে কমু। শেষমেশ মনে হইলো তরে কই। তুই বুজদার মানুষ। আমার কথা বুজবি।’

যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে তালুকদার মহাশয় বললেন, ‘এই দ্যাহো করছি কী! তরে তো এককাপ চা-ও দিতে কই নাই! ওই দুলাল, ওই সেন্টু, দেবুরে এককাপ চা দে।’

দেবুঠাকুর হেসে বললেন, ‘চা অরা আমারে দিছিল কর্তা। চা আমি খাইছি। আপনে কথার তালে আছিলেন। ‘উদিস’ পান নাই।’

শুনে কর্তার মুখটা উজ্জ্বল হলো। ‘ও, তয় তুই চা খাইছস, দাদা? ভালো করছস।’

ঘরের ভেতর অনেক আগেই হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে দুলাল। সেই আলোয় তালুকদার মহাশয়কে কেমন যেন অচেনা লাগছে দেবু ঠাকুরের। যেন এই মানুষটিকে আগে কখনো দেখেননি তিনি। যেন এ এক অন্য মানুষ। এই মানুষটির ভেতর যে মানুষের জন্য এত মমত্ববোধ আর এত ভালোবাসা, তা জানা ছিল না দেবুঠাকুরের। আজ যেন অন্য এক অভয় তালুকদারকে দেখতে পেলেন তিনি। এ যেন এক সত্যিকারের জমিদার।

অথবা তিনি যেন এক প্রজাপ্রেমী অসামান্য মহারাজ। প্রজাদের জন্য জীবনের যাবতীয় মোহ ত্যাগ করে নিঃস্ব হয়ে বসে আছেন। ভালোবাসা ছাড়া তাঁর আর কিছুই নেই।

সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। যাত্রা শুরুর সময় ঘনিয়ে আসছে। দুজন মানুষের একজনেরও যেন তা মনে নেই। কর্তার তামাক পুড়ে শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। সেন্টু নতুন কলকেতে তামাকের ওপর জ্বলন্ত টিকা বসিয়ে ফুঁ দিতে দিতে ঘরে ঢুকলো। পুরনো কলকে সরিয়ে হাতেধরা কলকেটি বসিয়ে দিলো গড়গড়ার মাথায়। কর্তা আবার গুড়গুড় করে তামাক টানতে লাগলেন। ফাঁকে ফাঁকে আগের মতোই কথা বলতে লাগলেন, ‘বুজলি দেবু, দ্যাশ গেরামের মাইনষে আমারে লইয়া নানান পদের কথা কয়। কয়, কী জানি কী লোভে পইড়া আমি এই দ্যাশে রইয়া গেছি। এই দ্যাশ বলে অহন আর আমার দ্যাশ না। পরের কথাটা মিথ্যা। এই দ্যাশই আমার দ্যাশ। এই মাটিই আমার মাটি। মানুষ যেই মাটিতে জন্ম লয়, সেই মাটিই তার দ্যাশ। তয় পয়লা কথাটা সত্য। আমি লোভে পইড়াই আমার দ্যাশে রইয়া গেছি। দ্যাশছাড়া মানুষ হই নাই। উদ্বাস্তু হই নাই। নিজের দ্যাশ ছাইড়া অন্য দ্যাশে গিয়া যারা ঘর বান্দে, তারা বেবাকতেই উদ্বাস্তু। আমি উদ্বাস্তু হইতে চাই নাই। এক রকমের লোভে পইড়াই আমি আমার মাটিতে রইয়া গেছি। সেই লোভটা কী? লোভটা হইলো এই বাড়িভরা মাইনষের ভালোবাসা। দ্যাশ-গেরামের বহুত মাইনষের ভালোবাসা। তাগো ভালোবাসার কারণেই আমি দ্যাশ ছাড়ি নাই। গেরাম আর বাড়ি ছাড়ি নাই। ছেলেমেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করছি। হ, ভালোবাসা পাওয়ার লোভেই আমি সব করছি। বাঁইচা আছি মাইনষের ভালোবাসায়। মইরাও যামু মাইনষের ভালোবাসা লইয়া। তয় তর কাছে আমার একটা অনুরোধ দাদা, আমার মরণের খবর পাইলে তুই একটু আহিচ। শেষবারের লাহান আমার মুখটা একটু দেহিচ। চিতাখোলায় আমারে নেওনের সময় শবযাত্রায় তুই একটু থাকিস দাদা।’শেষ কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে এসেছিল অভয় তালুকদার মহাশয়ের। চশমার মোটা কাচের ভেতর দিয়ে তাঁর বৃদ্ধ চোখ দুটো অশ্রুভারাক্রান্ত হতে দেখছিলেন দেবুঠাকুর। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রতনপুর থেকে ছুটতে ছুটতে এসেছিল হাজামবাড়ির কিশোর ছেলে বদরু। এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল, ‘ঠাকুরনে শইল্লে আগুন দিছে।’  [চলবে]