ভূমিকা
‘কোয়ান্টাম’ শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয় পদার্থ শক্তি শোষণ বা নির্গমন করে বিচ্ছিন্ন প্যাকেট বা ‘কোয়ান্টা’ (quanta) হিসেবে। পদার্থবিজ্ঞানে এর ব্যবহার এসেছে জার্মান শব্দ ‘quant’ থেকে, যা আবার একটি ল্যাটিন শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘কতটা’ বা ‘পরিমাণ’। ১৯০০ সালের দিকে ম্যাক্স প্লাঙ্ক এবং পরবর্তীকালে আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো পদার্থবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন কেন পারমাণবিক জগতের কিছু ঘটনা চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের (classical physics) সাহায্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তবে ১৯২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে, যাকে অনেকে ‘ডারউইনীয় মুহূর্ত’ (Darwinian moment) বলে আখ্যায়িত করেন, কারণ এ-বছর দৃষ্টিভঙ্গির এমন এক পরিবর্তন হয়, যা ভৌত বিজ্ঞানের জন্য ঠিক ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, যতটা জীববিজ্ঞানের জন্য ছিল ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনবাদ। ১৯২৫ সালের জুন মাসে হাইজেনবার্গ যখন খড় জ্বর (hay fever) থেকে সেরে ওঠার জন্য হেলগোল্যান্ড দ্বীপে অবস্থান করছিলেন, তখন তাঁর মাথায় কোয়ান্টাম গুণন বিধির (quantum multiplication rule) ধারণাটি আসে। হাইজেনবার্গ এর ধারণার ভিত্তিতে সে-সময় খুব একটা পরিচিত নয় এমন ‘ম্যাট্রিক্স বীজগণিত’ (matrix algebra) ব্যবহার করে বর্ন, হাইজেনবার্গ এবং জর্ডান কোয়ান্টাম বলবিদ্যার যে-ধারণা প্রদান করেন, তা ‘ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স’ বা ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা নামে পরিচিত। তাঁদের এই কাজ আরভিন শ্রোডিঙ্গারের প্রস্তাবিত বিকল্প তরঙ্গ বলবিদ্যা (Wave mechanics) থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এগিয়েছিল। ১৯২৬ সালে শ্রোডিঙ্গার এবং পাউলি প্রমাণ করেন যে, কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এই দুটি সংস্করণ – ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা ও তরঙ্গ বলবিদ্যা – আসলে গাণিতিকভাবে সমতুল্য।
১৯২৭ সালে কোপেনহেগেনে বোরের সঙ্গে কাজ করার সময়, যখন বোর স্কিইং-এর ছুটিতে নরওয়ে গিয়েছিলেন, হাইজেনবার্গ তখন একটি প্রশ্নের ওপর তাঁর সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। প্রশ্নটি হলো – ‘একটি কণা শনাক্তকারী যন্ত্র বা মেঘ চেম্বারে ইলেকট্রনের গতিপথকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার গাণিতিক কাঠামোতে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়?’ হাইজেনবার্গ চিন্তা করেন যে, আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর একটি আলোচনা হয়েছিল, যেখানে আইনস্টাইন মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘তত্ত্বই নির্ধারণ করে কী পর্যবেক্ষণ করা যাবে।’ অতএব, হাইজেনবার্গ প্রশ্নটিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং উল্লেখ করেন যে, ‘এটা কি সম্ভবত সত্য যে, প্রকৃতিতে বা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কেবল এমন পরিস্থিতিই ঘটে যা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার গাণিতিক কাঠামোতে উপস্থাপন করা যেতে পারে?’ এর অর্থ ছিল : মেঘ চেম্বারে ইলেকট্রনের কোনো বাস্তব পথ ছিল না। সেখানে ছিল জলের ফোঁটার একটি ক্রম। প্রতিটি ফোঁটা ইলেকট্রনের অবস্থান ভুলভাবে নির্ধারণ করত, এবং ফোঁটার ক্রম থেকে বেগ ভুলভাবে নির্ণয় করা যেত। এই ধরনের পরিস্থিতি আসলে গাণিতিক কাঠামোতে উপস্থাপন করা যেতে পারে; গণনাটি অবস্থান এবং ভরবেগের ভুলের গুণফলের জন্য একটি নিম্ন সীমা প্রদান করে’১। এই চিন্তাধারা থেকে হাইজেনবার্গ তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তা বা অনির্দিষ্টতার সম্পর্ক উদ্ভাবন করেন। অনিশ্চয়তার সম্পর্কগুলোকে ইংরেজিতে ‘Uncertainty Principle’ বা ‘অনিশ্চয়তা নীতি’ বলা হয়। এই নীতির সঙ্গে বোরের পরিপূরকতার নীতি, শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশন এবং বর্নের সম্ভাব্যতা ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা প্রদান করে। পদার্থবিজ্ঞানের অনেক দার্শনিক তাৎপর্য কোপেনহেগেন ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত২। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological) সমস্যা, না তত্ত্ববিদ্যাগত (ontological) সমস্যা? এর উত্তর খুঁজতে আমরা অনিশ্চয়তা নীতিকে আরেকটু বিশ্লেষণ করে দেখি।
অনিশ্চয়তা নীতি
হাইজেনবার্গ অনিশ্চয়তা সম্পর্ক প্রস্তাব করেছিলেন, একটি কণার অবস্থান এবং গতি একই সঙ্গে কতটা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে তার ওপর সীমা নির্ধারণ করে। তাঁর ১৯২৭ সালের গবেষণাপত্রে, হাইজেনবার্গ উল্লেখ করেন যে, ‘প্রসম অনুবন্ধী রাশিগুলি (canonically conjugate variables) কেবল একটি বৈশিষ্ট্যগত অনিশ্চয়তার সঙ্গে একই সঙ্গে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় পরিসংখ্যানগত সম্পর্কের ঘটনার আসল ভিত্তি’৩। হাইজেনবার্গ দেখিয়েছিলেন যে, যদি কোনো কিছুর অবস্থান সম্পর্কে আমাদের তথ্যের নির্ভুলতা ΔX হয়, এবং তার গতি (তার ভর দ্বারা গুণিত) সম্পর্কে আমাদের তথ্যের নির্ভুলতা ΔP হয়, তবে দুটি নির্ভুলতাই সঠিক হতে পারে না। তারা উভয়ই শূন্যের খুব কাছাকাছি হতে পারে না। তাদের গুণফল একটি ন্যূনতম পরিমাণের চেয়ে ছোট হতে পারে না, যা প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবকের অর্ধেক। সূত্র হিসেবে এটি হলো : ΔX ΔP ≥ ℏ/2। এর মানে হলো, যে-কোনো কণার অবস্থান যত নির্ভুলভাবে নির্দিষ্ট করা যায়, তার ভরবেগ তত কম নির্ভুলভাবে নির্দিষ্ট করা যায়, এবং এর বিপরীতটিও সত্য। ‘নির্দিষ্ট করা’ বলতে বোঝায় ‘সম্ভাব্য মানগুলোর পরিসর নির্দিষ্ট করা’। সম্ভাব্য মানগুলোর এই পরিসরকেই ‘অনিশ্চয়তা’ বলা হয়। এই শব্দটি আমাদের জানার বা না জানার ক্ষমতা সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দেয় – অর্থাৎ, পরবর্তী কোনো পরিমাপের ফলাফল সম্পর্কে আমরা কতটা অনিশ্চিত। এই ধরনের ভাষা থেকে মনে হতে পারে যে, আমরা নীতিগতভাবে যা জানি তার চেয়ে বেশি জানতে পারি, এবং আমরা এখানে যে সীমাবদ্ধতার কথা বলছি তা কেবল আমাদের অজ্ঞতা বা তথ্যের অভাবের ফল। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। অনিশ্চয়তা নীতিতে নিহিত সীমাবদ্ধতাটি কোয়ান্টাম কণা সম্পর্কিত একটি মৌলিক ভৌত সত্য, এটি কোনো ব্যক্তির নির্ভুল পরিমাপ করার অক্ষমতার প্রতিফলন নয়। পদার্থবিদ রোভেল্লির মতে, ‘অনিশ্চয়তা নীতির অর্থ এই নয় যে, আমরা কোনো কণার অবস্থান অত্যন্ত নির্ভুলভাবে এবং তারপর তার গতিও খুব নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে পারি না। আমরা পারি। কিন্তু দ্বিতীয় পরিমাপের পর, অবস্থান আর একই থাকবে না : গতি পরিমাপ করলে অবস্থানের তথ্য হারিয়ে যায়, ফলে আমরা যদি এটি আবার পরিমাপ করি, তবে দেখব যে, তা পরিবর্তিত হয়েছে’৪। প্রকৃতপক্ষে, হাইজেনবার্গ তাঁর নীতিটি বর্ণনা করার জন্য ‘Uncertainty’র পরিবর্তে জার্মান শব্দ ‘ungenauigkeit’ ব্যবহার করেছিলেন, যার অর্থ অনির্দিষ্টতা বা অস্পষ্টতা। ‘অনিশ্চয়তা’ শব্দটির চেয়ে এই শব্দটিই হাইজেনবার্গের নীতির প্রকৃত অর্থের কাছাকাছি।
এখানে উল্লেখ্য, এই নীতিটি কেবল অবস্থান এবং ভরবেগের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সময় এবং শক্তির মতো অন্যান্য জোড়া রাশির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফাইনম্যান দ্বি-ছিদ্র পরীক্ষা প্রসঙ্গে অনিশ্চয়তা নীতির একটি সমতুল্য সম্প্রসারণ ঘোষণা করে বলেন যে, ‘ইলেকট্রনটি কোন ছিদ্র দিয়ে যাচ্ছে তা নির্ধারণ করার জন্য এমন কোনো যন্ত্র ডিজাইন করা অসম্ভব, যা একই সঙ্গে ইলেকট্রনটিকে এতটাই নাড়া দেবে যে, তার ব্যতিচারের ধরন নষ্ট হয়ে যায়।’ ফাইনম্যান আরো উল্লেখ করেন যে, ‘এটি প্রকৃতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য এবং এটি আমাদের সবকিছু সম্পর্কে কিছু না কিছু বলে।’ ফাইনম্যানের মতে, ‘অতএব, অনিশ্চয়তা নীতিকে অজানা বস্তুর অনেক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আগে থেকে অনুমান করার জন্য একটি সাধারণ নীতি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে’৫। স্টিফেন হকিং তাঁর এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ‘হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বিশ্বের একটি মৌলিক, অনিবার্য বৈশিষ্ট্য।’ হকিং আরো উল্লেখ করেন যে, ‘আমরা যেভাবে বিশ্বকে দেখি, তার উপর অনিশ্চয়তা নীতির গভীর প্রভাব রয়েছে’৬।
উল্লেখ্য, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দুটি ধ্রুবকের ওপর নির্ভরশীল – আইনস্টাইনের আলোর গতি ‘c’ এবং প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক ‘h’। এ-দুটি আসলে আমাদের পর্যবেক্ষণকৃত বাস্তবতার মৌলিক সীমা। একদিকে প একটি গতিসীমা, যেখানে সময় থমকে যায়; অন্যদিকে য স্থান-কালের বাস্তবতায় আকারের সীমা। এ-দুটি সীমার ওপর বাস্তবতা নির্ভরশীল। হাইজেনবার্গ এই দ্বিতীয় সীমাটিই আবিষ্কার করেন, এবং ১৯২৭ সালে তাঁর গবেষণাপত্রটি অনিশ্চয়তার ধারণার সঙ্গে তাঁর নামকে চিরতরে যুক্ত করে, যা বাস্তবতাকে জানার সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
অনিশ্চয়তা : জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং তত্ত্ববিদ্যাগত
কনরাড ক্লাইনকনেখট, আইনস্টাইন ও হাইজেনবার্গ সম্পর্কিত তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন যে, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির আবিষ্কার প্রকৃতি দর্শন এবং জ্ঞানতত্ত্বের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে৭। এখানে উল্লেখ্য, বর্নের পরিসংখ্যানগত ব্যাখ্যা কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় একধরনের অনির্দিষ্টতা নিয়ে আসে, কারণ কণাটি সম্পর্কে তত্ত্বটি যা বলে তার সবকিছু আমরা জানলেও, এর অবস্থান পরিমাপের একটি সাধারণ পরীক্ষার ফলাফল আমরা নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি না। এই অনির্দিষ্টতা পদার্থবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক – উভয়কেই সমস্যায় ফেলেছে। অনিশ্চয়তা নীতির সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনেক পদার্থবিজ্ঞানী উপলব্ধি করেছেন। তাহলে, কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তা কি জ্ঞানতাত্ত্বিক, নাকি তত্ত্ববিদ্যাগত?
একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্ভাবনা হলো এমন কিছু যা প্রাসঙ্গিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে সত্য হতে পারে। কিন্তু একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক আবশ্যকতা হলো এমন কিছু যা প্রাসঙ্গিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে অবশ্যই সত্য হবে। অপরদিকে, তত্ত্ববিদ্যাগত হলো, যা কিছু আছে তার অধ্যয়ন, যাকে ইংরেজিতে বলা যায় ‘a studz of what there is’। অনিশ্চয়তা নীতি, কেবল আমরা যা জানতে পারি তার একটি সীমা নয়, বরং এটি বর্ণনা করে যা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা আসলে কেমন। এই ধারণার অর্থ কী? এর অর্থ এই যে, একটি ইলেকট্রনের একই সময়ে কখনোই একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং একটি সুনির্দিষ্ট ভরবেগ থাকে না। ইলেকট্রনটি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না, বা এটি একটি নির্দিষ্ট গতিতেও চলে না। এক অর্থে, ইলেকট্রনটি একই সময়ে অনেক বেগের সম্ভাবনা এবং একই সময়ে অনেক জায়গায় থাকার সম্ভাবনা বহন করে। আমরা যদি দ্য ব্রয় (de Broglie)-এর ধারণাকে গুরুত্বসহকারে নিই যে, প্রতিটি কণার সঙ্গে একটি গাণিতিক কোয়ান্টাম সম্ভাবনা তরঙ্গ যুক্ত আছে, তাহলে এটি তরঙ্গের প্রকৃতির একটি প্রত্যক্ষ পরিণতি।
হাইজেনবার্গ তাঁর পদার্থবিজ্ঞান ও দর্শন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা যা পর্যবেক্ষণ করি তা আসলে প্রকৃতি নয়, বরং আমাদের প্রশ্ন করার পদ্ধতির কাছে উন্মোচিত প্রকৃতি’৮। ১৯২৯ সালে শিকাগোতে দেওয়া এক বক্তৃতায় হাইজেনবার্গ বলেন যে, ‘পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং তার ফলাফল দৈনন্দিন জীবনের ভাষায় বর্ণনা করা যেতে পারে। সুতরাং, যদি পদার্থবিজ্ঞানী তাঁর ফলাফল ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো তত্ত্বের দাবি না করতেন এবং ধরা যাক, ফটোগ্রাফিক প্লেটে প্রদর্শিত রেখাগুলোর বর্ণনা দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারতেন, তাহলে সবকিছুই সহজ হয়ে যেত এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার কোনো প্রয়োজনই থাকত না। সমস্যা হচ্ছে, যখন ফলাফলগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ ও সংশ্লেষণ করার এবং তাদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক স্থাপন করার প্রয়োজন হয় – অর্থাৎ একটি তত্ত্ব নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়’৯। আমি যুক্তি দেব যে, এই উপলব্ধিই হাইজেনবার্গকে একটি সাধারণীকরণযোগ্য গাণিতিক সম্পর্ককে পরিমাণগতভাবে প্রণয়ন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যা এখন ‘অনিশ্চয়তা নীতি’ নামে পরিচিত।
১৯৫৪ সালের শরৎকালে আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় আমরা হাইজেনবার্গের আরো কিছু দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারি। সাক্ষাতের সময় আইনস্টাইনের সম্পূর্ণ আগ্রহ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ব্যাখ্যার ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। এই সাক্ষাতে হাইজেনবার্গ বলেছিলেন যে, ‘কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তার অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর প্যারাডক্সগুলোসহ, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রকৃত ভিত্তি রচনা করেছে। আইনস্টাইন উল্লেখ করেন যে, ‘কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন না যে, ঈশ্বর পাশা খেলেন।’ হাইজেনবার্গ উত্তর দেন : ‘কোয়ান্টাম তত্ত্বে, প্রাকৃতিক নিয়মগুলো সম্ভাব্য এবং সম্ভাব্যতার সাময়িক পরিবর্তন নিয়ে কাজ করে। তবে, যে পছন্দগুলো সম্ভাব্য থেকে সম্ভাব্যতার দিকে নিয়ে যায়, সেগুলো কেবল পরিসংখ্যানগতভাবে নথিভুক্ত করা যেতে পারে, কিন্তু সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না১০। হাইজেনবার্গ উল্লেখ করেন যে, ‘বলা যেতে পারে যে, নিউটনীয় বলবিদ্যায় তাদের অবস্থানের ক্ষেত্রে তারা সুসংজ্ঞায়িত ছিল, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা ছিল না। অর্থাৎ আমরা আগে থেকে কখনোই জানতে পারি না যে, প্রকৃতির দূরবর্তী অংশে আমাদের জ্ঞানের প্রসারের ফলে কোন ধারণার প্রয়োগযোগ্যতার ওপর কী কী সীমাবদ্ধতা আরোপিত হবে, যেখানে আমরা কেবল সবচেয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়েই প্রবেশ করতে পারি।’ অধিকন্তু, হাইজেনবার্গ আমাদের একটি পুরনো প্রজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দেন যে, ‘যে ব্যক্তি কখনো ভুল উচ্চারণ না করার ওপর জোর দেয়, তাকে অবশ্যই নীরব থাকতে হবে’১১।
হাইজেনবার্গ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে ভাষা এবং বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করেছেন। তিনি চিরায়ত যুক্তিবিদ্যা এবং কোয়ান্টাম যুক্তিবিদ্যার ভাষার সমস্যা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায় – ‘চিরায়ত যুক্তিবিদ্যায় ধরে নেওয়া হয় যে, যদি কোনো উক্তির কোনো অর্থ থাকে, তবে হয় উক্তিটি অথবা উক্তিটির অস্বীকৃতি অবশ্যই সঠিক হবে … তৃতীয় কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্বে এই ‘তৃতীয় কোনো সম্ভাবনা নেই’ নিয়মটি সংশোধন করতে হবে’১২। হাইজেনবার্গ এটিকে ‘মধ্যবর্তী স্থান’ হিসেবে ভাবতেন। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে সত্য কোনো একটি উপাদানের মধ্যে না থেকে, বরং উপাদানগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত হয়।
উপসংহার
সর্বোপরি, হাইজেনবার্গ গ্রিক প্রাকৃতিক দর্শনের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। হাইজেনবার্গ বিশ্বাস করতেন, প্রাকৃতিক দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান ছাড়া আধুনিক পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানে অগ্রগতি করা প্রায় অসম্ভব। তিনি ‘সম্ভাবনা’ বা সুপ্ত শক্তির (potentialities) ধারণাটি ব্যবহার করেছেন, যেখানে সুপ্ত শক্তি বা ক্ষমতার (potential) ধারণাটি অ্যারিস্টটলের দর্শন থেকে আহরিত হয়েছিল। হাইজেনবার্গ আরো মনে করতেন যে, সম্ভাব্যতা ফাংশনগুলিতে প্রবণতার বস্তুনিষ্ঠ উপাদান এবং অসম্পূর্ণ জ্ঞানের আত্মনিষ্ঠ উপাদান বিদ্যমান থাকে১৩। সুতরাং, আমি যুক্তি দেখাই যে, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতিটি কেবল জগৎ সম্পর্কে আমরা কী জানতে পারি তা নিয়েই নয়, বরং এটি বস্তুসমূহের প্রকৃতি সম্পর্কিত একটি সূত্র।
তথ্যসূত্র
1. Heisenberg, W (1976), ÔRemarks on the Origin of the Relations of UncertaintyÕ, William Price & Seymour Chissick (edited) The Uncertainty Principle and Foundation of Quantum Mechanics (1977), John Willy & Sons, London, pp 3-6.
2. Mehra, J and Rechenberg (2002), The Historical Development of Quantum Theory, V2, Springer , Germaû, p 10.
3. Heisenberg, W (1927), ÔOn the Perceptible Content of the Quantum Theoretical Kinematics and MechanicsÕ (originally published in German language), Zeitschrift for Physik, 43, 172-98 (Translated in English by Wheeler and Zurek, 1981).
4. Rovelli, C (2022), Helgoland, Penguin, London, p 93.
5. Feynman, R(1992), The Character of Physical Law, Penguin, pp 143-144.
6. Hawking, S (2016), A Brief History of Time (updated edition), Bantam Books, p 63.
7. Kleinknecht, K (2019), Einstein and Heisenberg: The Controversy Over Quantum Physics, Springer, Germaû, p 84.
8. Heisenberg, W (1989), Physics and Philosophy, Penguin, London, p 32.
9. Heisenberg, W( 1949), The Physical Principles of the Quantum Theory, trans. C. Eckart and F.C.Ho–t, Dover Publications, p 1.
10. Kleinknecht (2019) Op.sit, p 163.
11. Heisenberg (1989) Op.sit., p 46.
12. Heisenberg (1989), Ibid, pp123-124.
13. Heisenberg (1989), Ibid, p 21.


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.