ছবি

লেখক: সৌরভ হোসেন

দু-গদ্দনের ফাংড়ি গাছটার মগডালটা সরু গলা বাড়িয়ে নীল-সাদা রং চাপা দেয়ালটার যে-জায়গাটা ছুঁয়ে সটান উঠে গেছে, সেখানে আগে থেকেই খাড়া করা আছে ঘাড় টান করা একটা ঝলমলে ছবি। নীল পাড় ধবধবে সাদা রঙের শাড়ির ছবিটার চোখ নাক ঠোঁট চুঁইয়ে নামছে গালভরা হাসি। ছবিটি আড়েবহরে এত্ত বড় যে, সরকারি বিল্ডিংটার আধখানা দেয়াল ঢেকে আছে! ঠিক তার পাশেই কান ঘেঁষে নতুন ছবিটা উঠছে। ‘নমস্কার’ ভঙ্গিতে তোলা ছবিটার পরনে খদ্দরের কুর্তি। মসুরের ডালের মতো রঙের কুর্তিটা একটা ফিনফিনে নীল রঙের পাঞ্জাবির ওপর চড়ানো। হালফিলের নেতা। রিমলেস চশমার ভেতরে নিরীহ অবলা চোখ। আবার মাপে-ধাপে ছবিটা আগের ছবিটার অর্ধেক। এবং হাসির ফ্যাচাংও পাশের ছবিটার একহাঁটু নিচে। রঙের চাকচিক্যও পাশের দেয়াল মুড়ে দেওয়া ছবিটা থেকে কিছুটা ফিকে। এমনভাবে রং চাপানো হয়েছে, যাতে করে কোনোভাবেই যেন পাশের ছবিটা টপকে না যায়। বোঝাই যাচ্ছে অনেক অঙ্ক কষে আটঘাট ভেবে জাত করে ছবিটি তোলা হয়েছে। একটা আসমানছোঁয়া স্টিলের মই লাগানো হলো। রুপোরঙের কলাপসিবল মইটাকে তিনতলা বিল্ডিংটার ছাদের কার্নিশ কামড়ে হেলান দেওয়া হলো। ওপর-নিচ মিলে গোটা পাঁচেক লেবার-মুনিষ আছে। আগের ছবিটা টাঙাতে অবশ্য ক্রেন লাগাতে হয়েছিল। উচ্চতার বহর আর ওজনের ভারিক্কি যা ছিল তাতে অবশ্য দুপেয়ে মানুষের গায়ের বলে সম্ভব হতো না। একডজন লোক হাত লাগালেও দম বেরিয়ে যেত। তার ওপর ছিল ভয়, ছবিটার কোথাও যেন বিন্দুমাত্র আঁচড় না পড়ে। না পড়ে এতটুকু ভাঁজ, না কোনো জায়গা ভুল করেও চুল পরিমাণ ছিঁড়ে যায়। সেসবের কোনো একটা ঘটলে নাকি ওপরমহলে খবর হয়ে যেত। এসব ওপরমহলের কানে তোলা লোকের অভাব তো নেই! এক লাগান পারানেই সব ভ-ুল হয়ে যেতে পারে। তখন ছবি তো দূরের কথা, দলে নিজের অস্তিত্ব থাকবে কি না সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। এসব সাতপাঁচ ভেবে হালফিলের দল বদলি নেতাটা আর রিস্ক নেননি। নিজেই সদলবলে উপস্থিত হয়েছেন। দাঁড়িয়ে থেকে তদ্বির করছেন।
‘দাদা, কার্নিশছুঁয়া ডালটা কেটি ফেলতে হবে, তা না হলে ছবিডা টাঙানো যাচ্ছে না খ।’ মইয়ের মগধাপি থেকে কথাটা ব্যাড় পাকিয়ে নিচে নেমে এলো টগবগে নেতার কানে।
‘তো কেটে ফেল।’ হেয় করে কথাটা বললেন চাবুক ফিগারের নেতাদাদা।
‘কেটি ফেলব! সরকারি গাছ! কেসে ফেসি যাব না তো!’ মইয়ে পা দুমড়ে দাঁড়িয়ে-থাকা খুঁটলচোখা লেবার ছোড়াটার মুখ থেকে ফট করে কাঁচুমাঁচু করা কথাটা যেই বেরিয়ে এসেছে, অমনি চোখমুখ ধমকে গেংড়িয়ে উঠলেন দুঁদে নেতাদাদা, যেন তার হাড়মজ্জায় কেউ অপমানের ঘা মারল, ‘সরকার! সরকার আবার কে রে? কুন বাপ?’ বাইশ-তেইশ বছরের মুনিষ ছোড়াটা ধমকের ঝাঁজে আঁতকে থড়বড় করে মুখ জড়সড়ো করে নিল। ধমকানি খেয়ে তার মতি ফিরল, নেতাদাদার কথার সার বুঝতে পারল, তাই তো সরকার তো দাদারাই। দাদাদের হুকুমেই তো সব হয়। আমরা সাধারণ মানুষ পান থেকে চুন খসলেই বিপদ-আপদ খামচে ধরে। হ্যান কেসে ত্যান কেসে জড়িয়ে যাই। কিন্তু দাদারা তো ক্ষমতাসীন দলের নেতা। মানুষ কেটে ফেলে নিচ্ছেন তাই-ই পুলিশ লোম পর্যন্ত ছুঁতে পারছে না তো গাছের একটা এলেবেলে মেহি ডাল।
‘এই লাও, কেটি ঝুরি দাও।’ নিচ থেকে একজন প্যান্দা দেহের লেবার একটা দা মইয়ের নিচের পৈঠেয় দাঁড়িয়ে-থাকা ডাহুকচোখা লেভারটার হাতে তুলে দিলো। সে আবার দাটাকে কৃষ্ণচূড়া গাছটায় উঠে থাকা বেঁটে শরীরের লেবারটার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘কুপিয়ে নামি দে।’ দাটা হাতে নিম্নে বেঁটে লেবারটা ‘ঘ্যাঁচঘ্যাঁচি’ করে দু-চার কোপ দিয়ে ফ্যাকড়া বেঁধে থাকা ডালটা আগরাবাগরা করে কেটে দিলো। ফুলপাতা নিয়ে কাটা ডালটা ঝুড়মুড় করে নিচে মুখ থুবড়ে পড়ল। তারপর ‘খটাং’ করে দাটা নিচের টাইলস বসানো অফিস উঠোনে ছুড়ে ফেলল।
পিন্ধনের প্যান্ট নেংটি করে বাঁধা খুঁটলচোখা লেবারটা তার হাড়গিলে শরীরটা কুঁত পেরে হাতের কব্জি হুকের মতো বেঁকে ছবিটাকে বগলদাবা করে ধরে ওপরের দিকে তুলতে লাগল। নিচে আরো দুজন লেবার গায়ে মোষের দোম দিয়ে হোর্ডিংটাকে ওপরের দিকে দাঁত চিবিয়ে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু নাহ্, কোনোভাবেই হচ্ছে না। উঠতে গিয়েও উঠছে না। কোথাও একটা বেধে যাচ্ছে। ওপরের মাথার দিকটা সেট হলেও নিচের ডান দিকের কোনাটা মাথা ফুঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে। লেবার লোকগুলো অনেক করে ঠেলাঠুলি দিয়ে
এদিক-ওদিক কাত করেও ফিটিং করতে পারল না। ঘষাঘষি, ঠেলাঠেলি, ওঠানামা করতে গিয়ে দেয়ালটার হালফিলের টাটকা রং কয়েক জায়গায় চাঙর ওঠার মতো খড়মড় করে উঠে এলো। এত আলতো ঘষাতেই এভাবে পড়পড় করে রং উঠে যাওয়ায় লেবার লোকগুলো ঠাহর করল, ঠিকাদার ভালোই ঘাবলা মেরেছেন। রঙের পরতে পরতে লুটেপুটে খাওয়ার ছাপ। রঙে আঁঠাই দেননি। তা না হলে এভাবে মজাক করে এক ঘষাতেই ঘষ্টেমষ্টে উঠে আসে!
‘দাদা, কুনুভাবেই হচ্ছে না। এই ছবিডাকে খুলি পাশে লাগাতে হবে। খুইব ব্যাড় বাধাচ্ছে।’ আধখানা দেয়ালজুড়ে টাঙানো ছবিটার ডানদিকে আরো একটা ছবির হোরডিং আগে থেকেই টাঙানো আছে। ছবিটা সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে আবদুল কালামের। তাঁর হাস্যমুখের ছবির নিচে জ্বলজ্বল করা বর্ণে লেখা আছে তাঁর বাণী। খুঁটলচোখা লেবার লোকটা এই ছবিটা সরানোর কথাই বলছে। নেতাদাদার একজন সাগরেদ ঘাড় কাত করে তার আয়তচোখ ফেড়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে দাঁত কেলিয়ে বলল, ‘অ পাশে সরানোর দরকার নাই, খুলে একেবারে নিচে নামিয়ে দে।’ লেবার লোকটা প্রথমে তার ডুবুডুবু চোখ রসগোল্লা পাকিয়ে সাগরেদটাকে দেখল। তারপর মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘ধুর, আমার কী, আমি হলেম টাকার বিনিময়ে মুনিষখাটা লোক। কে থাকল কে নামল, আমার বয়েই গেল।’ যেই বলা সেই কাজ। ফড়ফড় করে বাঁধনগুলো ছিঁড়ে-হেঁচড়ে ছবির হোরডিংটা নিচে নামিয়ে দিলো সে। একটা হড়াম করে শব্দ হলো। সাবেক রাষ্ট্রপতির ছবির হোর্ডিংটা কৃষ্ণচূড়া গাছটার ডালে বাড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল। হোরডিংটা নামাতেই স্যাঁতসেঁতে দেয়ালটার লুকোনো পিঠটা নজরে চলে এলো। আলো-বাতাস না পেয়ে দেয়ালটা রসকস জমে কালচে হলদেটে হয়ে গেছে। কালামের ছবিটা নামাতেই ডানদিকটা পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। উদোম হয়ে খাঁখাঁ করছে। ‘স্টিক নো বিল’ কথাটা আধমরে আবছা হয়ে ভাসছে। নতুন ছবির হোর্ডিংটা গায়ে বলদের দোম দিয়ে বাদুড়ের মতো ঝুলে ‘হেই সামালো …’ বলে ওপরে হেঁচকে টানল মইয়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা খুঁটলচোখা লেবারটা। ওপরটা ঠিক সেঁটে গেল। কিন্তু ক্যাচাল বাধাল নিচের অংশটা। আধহাত-মতো হোরডিংটা নিচে বাধা ছবির হোর্ডিংটার ওপরে পা তুলে উঠে পড়ছে। মইটার নিচের পৈঠেয় দাঁড়িয়ে থাকা ডেকোরেটরের লেবারটা তার ডাহুক চোখ ঘুলঘুল করে থ মেরে গেল। নতুন ছবির হোর্ডিংটা এমনভাবে পোক্ত করে কোলে তুলে ধরল যাতে নিচের ছবিটায় বিন্দুমাত্র আঁচ না লাগে। সে জানে, নিচের ছবিটা কাদের মোল্লার। শাসকদলের দাপুটে নেতা। যার নতুন ছবি টাঙানো হচ্ছে তিনি যদি হন দলের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, তবে যিনি নিচে হাস্যবদন করে আছেন সেই কাদের মোল্লা হলেন আফ্রিকান টাইগার। তিনি সদ্য পদ হারালেও তার তর্জন-গর্জন কিন্তু বিন্দুমাত্র কমেনি। তুষের আগুনের মতো ধিকধিক করে আছেন। সুযোগ পেলেই দপ করে উঠবেন। তার পোষা গুন্ডাবাহিনী দেখলে চোখ কপালে উঠে যাবে। তিনি মাছি মারার মতো মানুষ মারেন। সেয়ানে সেয়ানে টক্কর, সুতরাং খু-উ-ব সাবধান। একটু
এদিক-ওদিক হলেই গদ্দান কাটা পড়ে যাবে। বেটা নচ্ছার চিজ আছেন। ভয়ে আরো গুটিয়ে গেল ডাহুকচোখের লেবারটা।
‘কী হলো, হাঁ-মুখ করে কী মাহাল দেখছিস। তাড়াতাড়ি ফিটিং কর।’ ফ্রেঞ্চকাটের চ্যালাটা হেঁড়ে গলায় ধমকে উঠল। ডাহুকচোখা লেবারটা দুকদুক কণ্ঠে বলল, ‘দাদা, নিচের ছবিটায় বেধি যাচ্ছে। ফিটিং হচ্ছে না।’
‘তো কী ল্যাওড়া দেখছিস, আরো একটু ওপরে তুলে দে।’ চ্যালাটা দাঁত খিঁচিয়ে উঠল।
‘ওপরে আর উঠবে না সাহেব, কার্নিশ ঠেকি গেছে।’ ওপর থেকে খুঁটলচোখা লেবার লোকটা ধমকের ভয় পেয়ে আঁকুপাঁকু করল।
‘কী অত ঘ্যানর ঘ্যানর করছিস, নিচেরটা খুলে ফেলে দে।’ লম্বা ঠ্যাংঠেঙে হিপ্পিকাটের কয়রাচোখে একজন চ্যালা গলা বাজিয়ে উঠল। তার হাতে গুচ্ছের তামা লোহার বালা। জড়িয়ে পেঁচিয়ে লাল সুতোর বাঁধন। থুঁতনির নিচে বলস্নমের মতো সুচালো কালো কুচকুচে আধমুঠো দাড়ি।
‘ফেলে দেওয়ার দরকার নেই, একদিক খুলে কিছুটা নিচে নামিয়ে দে না।’ নেতাদাদা ঠোঁটে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের হাসি মাখিয়ে আলগোছে বললেন। তারপর গায়ের খদ্দরটায় আলতো দুবার টোকা দিয়ে ধুলো ঝারলেন। যেন বোঝাতে চাইলেন, ও নেতা আমার গায়ের ধুলোমাত্র। সঙ্গে সঙ্গে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরা দুজন চ্যালা-চামচা নিজেরা মইয়ের কাছে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে বাঁধন খোলার কাজে হাত লাগাল। ফটাফট দড়ির আঁটসাঁট বাঁধনগুলো খুলে হোর্ডিংটাকে ডানদিকে কাত করে ঝুলিয়ে রাখল। তেরছা হয়ে ‘ভি’ আঙুল দেখানো ছবির টগবগে মুখটা কিছুক্ষণ হেলেদুলে দেয়ালে সেঁটে গেল। সদ্য পুরনো হয়ে হাওয়া কাদের মোল্লা ইচ্ছে করেই দলের সর্বময়ী নেত্রীর বড় ছবিটার পায়ের নিচে ছবি ঝুলিয়েছিলেন, যাতে কখনো কোনোদিন নেত্রীর নজর পড়ে গেলে তাকে যেন পিঠ চাপড়ে তার অতিভক্তির জন্যে বাহবা দেন। তিনি যেন তার নেত্রীকে আকারেইঙ্গিতে বোঝাতে পারেন, তিনি দলের একনিষ্ঠ সেবক। তিনি নেত্রীর চরণতলেই রয়েছেন।
জায়গার আর কোনো ঘোট নেই। দেয়ালটা একেবারে হাঁ হয়ে গেল। জাব্দা করে ছবির হোরডিংটা টাঙানো যাবে। এই দক্ষক্ষণমুখী দেয়ালটা প্রশাসনিক বিল্ডিংটার একেবারে ফ্রন্ট-এরিয়া। ফোকাসের মুখ। মূল ফটকের দিকে হাঁড়া মুখ হাঁ করে থাকে। সারাদিনের রোদ দেয়ালের এই পিঠে পড়েই গা শুকোয়। দেয়ালটার গা-ঘেঁষে ঝলমল করছে অপরূপ শোভায় শোভিত নীলদিঘি। দিঘিটায় আমোদ-প্রমোদ আর ফুর্তি করার টিকিট কাউন্টার এবং প্রবেশদ্বারও এই দেয়ালটার ঠোঁট ছুঁইয়ে। ফলে কোনো লোকেরই নজর এড়ানোর কথা নয়। যিনিই মূল ফটকের চৌকাঠে পা দেন, তারই দেয়ালটায় চোখ পড়ে। সুতরাং সব নেতারই লক্ষ্য থাকে এই দেয়ালটাকে কব্জা করা। এমনিতেই মুখের ছবিতে শহরটা ছেয়ে গেছে। হেন কোনো গলি নেই যেখানে শাসকদলের কোনো নেতার ছবি টাঙানো নেই। মোড়গুলো তো মুখচ্ছবির মোড় হয়ে উঠেছে। নেতাদের ছবির ঠাপে শহরের আকাশ কবেই ঢাকা পড়ে গেছে। এখন তো শহরটার দোমবন্ধ অবস্থা! তা আবার এক একটা ছবির এক এক রকম ছিরি! ঢং আর ভড়ংয়ের বাহার কত। এক একজন নেতার কায়দা দেখে গায়ে জ্বর চলে আসবে। শুধু শাসকদল একা নয়, অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই হিড়িক। ইদানীং আবার বামদলগুলোর নেতানেত্রীরাও মুখ দেখানোর হুজুগে পড়ে গেছেন। যে-কোনো বাহানায় তারাও হাস্যমুখে ইলেকট্রিকের পোলে, ল্যাম্পপোস্টে, গাছে-ডালে, দেয়াল-পাঁচিলে বড় মুখ করে হাজির। ছবি নেতার ভিড়ে শহরের আকাশের মুখ ভার। কাজেকর্মে নয়, মুখচ্ছবিতে একজন আরেকজনকে টেক্কা দিচ্ছেন। যেন পাবলিককে চোখে আঙুল দিয়ে চিনিয়ে দেওয়া, এই দেখুন, আমিই অমুক, আমিই সবচেয়ে বড় নেতা। দলের সবচেয়ে কাছের লোক।
‘হেই সামালো …।’ বলে সাড়ে দশ বাই সাড়ে বারো ফুট মাপের ছবিটা টেনে ঠেলে যেই ওপরে তুলেছে, অমনি কথাটা ফট করে ফোনের মধ্য দিয়ে উড়ে এলো। এতক্ষণ ঠিকই চলছিল। বাধা যা আসছিল তা দেয়ালে টাঙানো ছবির কাছ থেকে। কিন্তু এবার বাধাটা এলো মানুষের মুখ থেকে! যে-কথাটা এলো সেটা কিন্তু জুতসই কথা। এ ভুল হয়ে গেলে কিন্তু মারাত্মক অপরাধ হয়ে যাবে। এর মাশুল গুনতে শেষমেশ না পদ খোয়াতে হয়। এত বড় আস্পদ্দা হয় কী করে, আসলামের? এ তো ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া! ব্যাপারটা একবারও কি আসলামের মাথায় আসেনি? না, এলেও সেভাবে অত তলিয়ে দেখেননি? কিন্তু তিনি যে কাজ করতে চলেছিলেন তাতে তো তিনি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারতে চলেছিলেন! এই ডামাডোলের বাজারে এমন ভুল জেনেশুনে কেউ করেন? এ তো মহামূর্খামি ছাড়া কিছুই নয়। কথাটা কানে টং করে বাজতেই আসলামের মাথা ঠক করে উঠল, আরে তাই তো! এ আমি কী করতে চলেছিলাম! জেনেবুঝে বিরোধী লবির হাতে মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিচ্ছিলাম। ব্যাপারটা তো কাদের মোল্লাকে ডেকে নিজের তূণ থেকে তীর তার তূণে পুরে দেওয়া। আমার মগজটা কি ভুসি হয়ে গেল নাকি। না-হলে এমন আত্মঘাতী কাজ কী করে করতে পারি। এ তো এক মিনিটেই সব খাটুনি মাঠে মারা পড়ে যেত। মুহূর্তে ফানুস হাওয়া হয়ে যেতাম। শালা মাথাটা মাঝেমধ্যে এভাবে কেন যে ফিউজ কাটা তার হয়ে যায়। ব্যাটা লেল্টেও তো আগে বলতে পারত? ওকেই তো ছবি হোর্ডিং ফ্লেক্স ব্যানার বানানোর দায়িত্ব দেওয়া আছে। ভুলটা ওর মাথাতেও তো ধরা পড়তে পারত? ওর মাথাতেও তো কিছু না কিছু ঘিলু আছে? ব্যাটা এখন কোত্থেকে ফট করে ফোনে জানাচ্ছে। ছবিটা এখনো সম্পূর্ণ টাঙানো না হলেও এই আধ-টাঙানো অবস্থাতেও তো অনেক লোকের চোখে পড়ল। অফিসে লোকের তো অভাব নেই। ছুটির সময় হয়ে এলেও লোকজন বলার মতো এখনও পাতলা হয়নি। কে না বলতে পারে, এদের মধ্যেই কাদের মোল্লার লোক ঠেসে আছে। কথাটা এতক্ষণ না ফোনে চেপে ওপরমহলে চালান হয়ে গেল। সর্বনাশ! পদ তো দূরের কথা দল থেকেই না সাসপেন্ড হয়ে যান। লাড্ডুর মতো ঘুরপাক মারতে লাগল আসলাম খানের মাথা। ইস্পাতের মতো পোক্ত ধাতের নেতা এক কথাতেই মোমের মতো গলে পড়ছেন! তার কঞ্চির মতো দৃঢ় শরীর চাঁছির মতো বেঁকে যাচ্ছে। আরাম কেদারাটা থেকে তড়বড় করে উঠে চোখের মণি-ভ্রম্নর সঙ্গে গেঁথে কণ্ঠ থড়বড় করে বললেন, ‘আরে থাম থাম, মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে!’
সবাই থ! নেতাদাদার বিড়বিড়ানি দেখে চ্যালো-চামচাগুলোর চোখ তো ছানাবড়া! কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। সবাই মুখ হাঁ করে নেতাদাদার অস্থির মুখের দিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। বালির চাড়ে চিড়বিড় করে খই ফোটার মতো করে আসলাম খান তিড়বিড় করে খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘তোদের চোখও কি অন্ধ হয়ে গেছে? কারো চোখে সুঁজলো না!’
‘কী দাদা! আপনি কী বলছেন কিছুই তো বুঝতে পারছি না! কী সুঁজলো না?’ কয়রা চোখে ক্যাডারটা সাহস করে ম্যাঁও-ম্যাঁও করে কথাটা বলল। যদিও তার চওড়া বুকের ভেতরটা ভয়ে ধুকপুক ধুকপুক করছে। দাদা এক ধমক না দিয়ে বসেন!
‘আগে ছবিটা নিচে নামা তারপরে বলছি।’ গলার স্বর আরো খ্যাঁক করে উঠলেন নেতাদাদা। তিনি এমন হম্বিতম্বি করতে লাগলেন যে পারলে একার গায়ের জোরে তার নিজের হাতির মাপের ছবিটা টেনে হেঁচড়ে পড়পড় করে নামান। ‘তোদেরকে পইপই করে বলে দিলাম, কোনো খুঁত না থাকে যেন। তোরা কথা শুনলে তো!’ খচে বিড়বিড় করতে লাগলেন এই তল্লাটের বাঘা নেতা।
নেতাদাদা যেই বলেছেন খুঁতের কথা অমনি উপস্থিত
চ্যালা-চামরারা চোখ ফেঁড়ে মন গেঁথে দেয়ালে আধশোয়া করে ঝুলতে থাকা তাদের প্রিয় নেতার ছবি-হোর্ডিংটার পরতে পরতে চোখের জরিপ করতে লাগল। চোখ বুলিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল, কোত্থাও কোনো ঘামতি আছে কি না। মুখের হাসি, হাসির ঢং, ভঙ্গিমা,
চোখ-মুখের চিকনাই, রঙের চাকচিক্য, চুলের ছাঁট, পোশাকের বাহার, দাঁড়ানোর আদবকায়দা, ব্যাকগ্রাউন্ড, দলের প্রতীক, পায়ের জুতো, জুতোর তলার শুকতলা – নাহ্ সবই তো একেবারে নিখুঁত। দাদার বলে দেওয়া কথারই দৃশ্যায়ন। তাহলে খুঁত কোথায়! ফ্রেঞ্চকাটের চ্যালাটা গলায় একটা শুকনো ঢোঁক গিলে ক্যাউম্যাউ করে বলল, ‘দাদা, খুঁতের তো কিছু দেখছি ন্যা।’
‘চোখ থাকলেই তো দেখতে পাবি? এসব গাধা নিয়ে কি রাজনীতি করা যায়!’ দাঁত খিঁচিয়ে উঠলেন আসলাম খান। এমনভাবে চোখ গরম করে উঠলেন যেন চোখ দিয়ে সপাটে থাপ্পড় মারলেন।
চ্যালা-চামচারা এমনভাবে থত্থর করে কেঁপে উঠল যেন মাটি ফুঁড়ে ঢুকে পড়ে। আসলাম খান মইটার গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ওপর সোজা চোখ করে লেবারদের উদ্দেশে গেংড়িয়ে উঠলেন, ‘কী মাহাল দেখছিস, তাড়াতাড়ি ছবিটি নিচে নামা।’
‘এই সেরেছে রে।’ কথাটা খুঁটলচোখা লেবারটার মুখ থেকে ফট করে বেরিয়ে পড়লে সে ঠোঁট কামড়ে ওঠে। এমন করে যাতে তার মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কথাটা সে পারলে গিলে নেয়; কিন্তু তার আর উপায় নেই। ভাগ্যিস কথাটা নেতাদাদার কানে পৌঁছায়নি। নিচের ডাহুকচোখা লেবারটার কান পর্যন্ত এসে থেমে যায়। ডাহুকচোখা লেবারটা চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকায়। ক্ষ্যাপা হনুমানের মতো দাঁত কটমট করে। খুঁটলচোখা লেবারটা বুঝতে পারে, সে মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে। আসলাম খানের মতো বাঘা নেতাকে ঠাট্টা-তামাশা করার জন্যে কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালটার মতো এক্ষুনি তার গদ্দান চলে যেত পারত। সেসবের কিচ্ছু হলো না। আসলাম খানের মন অন্যদিকে থাকায় তিনি আর এদিকে অত নজর দিলেন না। খুঁটলচোখা লেবারটার মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠতে লাগল, শহর মুড়ে টাঙানো ঝোলানো নানান নেতার ছবির ছিরি। তার সব থেকে হাসি পাচ্ছে, ডাহুস ডাহুস সব ছবির নিচে জ্বলজ্বলে রঙে লেখা ‘সৌজন্যে’র অনুচর তাঁবেদারদের নাম। তার আবার ফিরিস্তি কত রে বাপ! কে কাকে কত তেল মারতে পারে তার প্রতিযোগিতা! এক একটা ইলেকট্রিক পোলে খরগোশের চ্যাপ্টা কানের মতো ছবিগুলো বাহার দিয়ে ঝুলানো আছে যে, সামান্য সেক্সের বিজ্ঞাপন সাঁটানোর জায়গা পর্যন্ত ফাঁকা নেই। পুজোর সময় তো এমন হয় যেন জীবন্ত মানুষ নয় ছবিমানুষ নেতাদের ঠাপে রাস্তায় হাঁটার জো থাকে না! এক নেতার ঘাড়ে চেপে আছে আরেক নেতা। এক নেতার পায়ের নিচে আরেক নেতার করজোড় ছবি! এক নেতার বগলে আরেক নেতার মুখ উঁকি দিচ্ছে। ধাপে ধাপে ওভারগেট! একজনের ঘাড় টপকে আরেকজনের উঠে পড়া। ইদানীং তো আবার অদ্ভুত উলোটপুরাণ দেখা যাচ্ছে, এতদিন আমলারা নেতাদের তেল মারতেন। আর এখন দেখা যাচ্ছে, নেতাদের আমলাদেরকে তেল মারার হিড়িক। বোঝাই যাচ্ছে গণতন্ত্র রাস্তা থেকে চেয়ারে ঠেসে বসছে। আর ফাইলের বাঁধনে ঢুকে ফোঁস ফোঁস করছে! ধুর! শূন্যে বাঁশের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে শুকনো মুড়ি চিবিয়েই দিন কাটিয়ে দিতে হচ্ছে। বিড়ি ফুকার ফুরসতটুকুও পাচ্ছি না! একটু আগেই পোক্ত করে বাঁধা গিঁটটা থ্যাচ থ্যাচ করে খুলতে খুলতে মাথা ঠকঠক করে খুঁটল চোখগুলো আরো খুঁটলে ঢুকে গেল লেবারটার।
একমুহূর্ত দেরি করল না। হুটপাট করে ঢাউস মাপের ছবির হোরডিংটা সড়সড় খড়খড় করে নিচে নামাল লেবাররা। তবে খুব সতর্কতার সঙ্গে। যাতে করে হড়াম করে ছিঁড়ে-ছেঁচড়ে মুখ থুবড়ে না পড়ে। নেতার সামনে সে নেতার নিজের ছবির যদি বারোখিটকেলে ছিরি করে নামায় তাহলে তো এ তল্লাটে তাদের কাজ করে খাওয়াটা জীবনকার মতো হারাম করে দেবেন। চ্যালা-চামচারা তো জিয়ল মাছের মতো কাঁটা মারার জন্যে ছোঁ মেরে আছে। সুতরাং আলতো করে হোর্ডিংটা নিচে নামাল লেবার-কটা। আসলাম খান তখন ক্ষ্যাপা বাঘের কণ্ঠে ফোনে প্রেসওয়ালাকে কী সব টিপস দিচ্ছেন। মিনিট দেড়েকের কথার খ্যাঁকানি-টিপসের পর শেষে বাজখাই গলায় বললেন, ‘কোনো কথা শুনতে চাই না, আধঘণ্টার মধ্যে পাঠিয়ে দাও। কান খাড়া করে শুনে রাখো, যা বলেছি তার এতটুকু যেন হেরফের না হয়।’ ফোনটা রেখে চ্যালা-চামচাদের উদ্দেশে চোখ তামাটে করে বললেন, ‘আধঘণ্টার মধ্যে নতুন হোর্ডিং চলে আসছে। তোরা এক পাও কেউ এখান থেকে নড়বি না।’ চ্যালা-চামচারা বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল। ব্যাকপাশ চুলের সামনে ক্লিপ-আটা আর পেছনে ঝুট করে বাঁধা চুলের এক চ্যালা থড়বড় করে বলল, ‘আমি কি নিয়ে আসতে যাব, দাদা?’
‘না, ওরা পাঠিয়ে দেবে।’ কণ্ঠ গম্ভীর করে বললেন দলের যুব সভাপতি আসলাম খান। মইয়ের ওপরের পৈঠেয় দাঁড়িয়ে-থাকা খুঁটল-চোখের লেবারটা মিনমিন করে বলল, ‘যাক, একটা বিড়ি খাওয়ার বাহানা পাওয়া গেছে।’
‘ধরা।’ ফিস করে বলল ডাহুক-চোখের লেবারটা। ওপরের খিটখিটে লেবারটা গোটানো কালচিটে প্যান্টের ঢলঢলে পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বের করল। হলুদ রঙের স্টিকার-সাঁটা চিলমিলির প্যাকেট থেকে খড়মড় করে বিড়ি বের করতে করতে নিচের দুটো লেবার আর গাছে থাকা আরো একটা লেবারকে উদ্দেশ করে জিজ্ঞেস করল, ‘তুরা খাবি নাকি?’ নিচের দুজন ঘাড় নাড়ল, ‘হা।’ গাছে বাদুড়ের মতো পা ঝুলিয়ে থাকা ঘুটু লেবারটা খেঁকলিয়ে বলল, ‘মাগনাই যখন পেছি, নাহ্ বুলব ক্যানে।’ বলেই ক্যালা দাঁত বের করে হাত বাড়াল। তারপর নিচে একবার চোরের মতো চোখ বুলিয়ে খ্যাকড়ানো দাঁতে মশকরা করল, ‘বিড়ির বাঁধন নীল তো?’
‘নাহ্ লাল! ফুটেনি মারার আর জায়গা পাস না, না? লাল বাঁধনের বিড়ি কি আর বাজারে আছে?’ চোখ টেরিয়ে উঠল খুঁটলচোখা লেবারটা। সে মনেমনে দাঁত খুঁটল, সে কি কম হ্যাপা ছিল। ডেকোরেটরের লাইনে কাজ করতে এসে সে ঠেলা কাকে বলে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি বাপ রে বাপ, কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে লাল কার্পেট, লাল চেয়ার, লাল টেবিল চলবে না। একেবারেই ভেত্তু। হারাম। উপায়! এতদিনের এত্তসব লালরঙা মাল কী করে ফেলে দিয়ে গাঢ়ি গাঢ়ি টাকা গাঁট থেকে ঝরিয়ে নীলরঙা কেনা সম্ভব। অগত্যা রংই রঙের সমস্যার সমাধান আনল। সব লাল রঙের ওপর নীল রং চড়ানো হলো। কারবার খাদের কিনারা থেকে বেঁচে স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
খুঁটলচোখা লেবারটা গাছের বেঁটে লেবারটাকে আগে একটা বিড়ি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘লে, তুই আগে ফুক। আর চোখ ফেঁড়ে দেখে নে, লাল বাঁধন না নীল বাঁধন।’ তারপর নিচের পৈঠেয় দাঁড়িয়ে থাকা লেবারটার হাতে একটা বিড়ি ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘আগুন ধরা।’ ডাহুক-চোখে লেবারটা বিড়ির পুটকিটা মুখে পুড়ে পাছার পকেট থেকে গ্যাসলাইটারটা বের করে দপ করে জ্বেলে বিড়ির মুখে আগুন ঠেকিয়ে দু-একবার ফুক ফুক করে ফুঁকে আগুন ধরাল। বিড়ির মুখটা গনগনে আগুনে হাওয়া টানা তুষের আগুনের মতো লাল হয়ে উঠল। মুখ থেকে গব করে একগাল ধোঁয়া বেরিয়ে গেল। তারপর জ্বলন্ত বিড়িটা হাতে করে ওপরে তুলে দিয়ে বলল, ‘লে।’ ওপরের খুঁটলচোখা লেবারটা সেটা আঙুলের ফাঁকে ধরে তার ঠোঁটে ধরা বিড়িটার মুখে ধরে ফুঁক ফুঁক করে টানল। তামাকের শুকনো পাতা আগুনের স্পর্শ পেয়ে পড়পড় করে জ্বলে উঠল। বিড়ি ধরানো হয়ে গেলে ডাহুকচোখের লেবারটাকে তার বিড়িটা ফিরিয়ে দিয়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে লম্বাটান দিলো খুঁটলচোখা লেবারটা। তিনজনের সুখটানের ধোঁয়ায় হাঁ করে থাকা দেয়ালটা ফিনফিনে সাদা হয়ে উঠল। তার ওপরে শেষ বিকেলের রোদ পড়ে ধোঁয়াটা যেন চিকনাই মেরে উঠেছে। দেয়ালের গা ছুঁয়ে উঠছে কু-ুলি পাকানো ধোঁয়া। যেন বিড়ির সুখটানের ধোঁয়ায় আলপনা এঁকে উঠছে দেয়াল।
ডাহুকচোখা লেবারটা নিচের পৈঠে থেকে থপথপ করে ওপরে খুঁটলচোখা লেবারটার পায়ের কাছে উঠে এলো। পড়ন্ত বিকেলের হলুদ শর্ষেরঙা রোদ তার পিঠ চুঁইয়ে মই বেয়ে নিচে নেমে আসছে। মইয়ের দাঁত বের করা ছায়াটা দেয়ালের গায়ে নখ কামড়ে লেগে আছে। কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে এক গাছ রোদ-ছায়া একঠ্যাঙা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে হ্যাঁ করে থাকা দেয়ালটায়। বেঁটে লোকটা যে-ডালটায় ঝুলে আছে সে-ডালটি মইয়ের মগ পৈঠের কান লাগা। তিন লেবারের মাথা এক জায়গায় হতেই ডাহুকচোখা লেবারটা মিনমিন করে বলল, ‘ছবিটায় কী ভুল ছিল যে পালটাতে হচ্ছে।’ খুঁটলচোখা লেবারটা ফিসফিস করে বলল, ‘আমার মাথাতেও ব্যাপারটা খেলছে না!’
‘আমি ঠিক ধরি ফেলিছি।’ ফদ করে বলল বেঁটে লেবারটা। ‘তুই তো বুদ্ধির ঢেঁকি, তুই ছাড়া আবার কে বুঝবে।’ ঠেস মারল খুঁটলচোখা লেবারটা। বেঁটে লেবারটা ডাল ছেঁচড়ে আরো কিছুটা ছমুতে এগিয়ে এসে ফুসুরফুসুর করে ‘আমার মুনে হয় …’ বলে
কথাটা বলতে যাবে এমন সময় রকেটের গতিতে একটা ছোট হাতি গাড়ি ভু-উ-উ করে গেট দিয়ে ঢুকে সোজা কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে ঘ্যাঁচ করে এসে থামল। ‘এত্ত তাড়াতাড়ি! কী করে সম্ভব।’ ডাহুক চোখা লেবারটা চোখ গোল্লা পাকিয়ে বলল। ‘এসব আগে থেকিই বানানে থাকে। এই নেতার ক্ষমতা তো কম নয়! দুকানদাররাও জানে, কখুন কাকে ধরি কারবার চাগান দিতে হয়।’ খুঁটলচোখা লেবারটা সুচের মতো দৃষ্টি ফেলে বলল। ‘শালা, বিড়িটা খাওয়ার সুমাটাও পালাম না!’ বিড়বিড় করে উঠল বেঁটে লেবারটা।
সবাই মিলে হাত লাগিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছবির হোর্ডিংটা গাড়ি থেকে নিচে নামানো হলো। রোদ তখন একটু একটু করে মরে ছায়া হয়ে উঠছে। দেয়ালে হাত বোলাচ্ছে পড়ন্ত বিকেল। কিছুক্ষণ পরেই হাঁটু মুড়ে বসবে সন্ধ্যার গোধূলি। ছবিটা নিচে নামিয়ে খাড়া করতেই বেঁটে লেবারটা ফট করে বলল, ‘হ্যাঁ, অ্যাকিবারে মিলি গেছে, যা ভুল ভেবিছুনু তাই!’

দুই
রক্তের একটা লাল শুকনো দাগ ঢের খানিকটা বয়ে গিয়ে পাশের শপিংমলের দেয়ালটার গায়ে মিশেছে। দাগটা শুকিয়ে কালশিটে হয়ে চেপ্টে গেছে। মনেই হচ্ছে আক্সানটা প্রথম রাতের। রক্তের দাগটা যে-দেয়ালে গিয়ে ঠেকেছে সে-দেয়ালেও হুড়মুড়িয়ে সাঁটানো আছে ছবির পরে ছবি। এক একজন নেতার এক একরকম পোজ। সবচেয়ে বড়মাপের ছবিটা হলো বাঘা নেতা আসলাম খানের। হালফিলে টাঙানো। পাশে গুঁতাগুঁতি করে নমস্কার করছেন গুচ্ছের ছোট মাঝারি বড় নানান মাপের নানান ভাবের নেতানেত্রী। ছবিতে এরা ময়ামাছ হলেও বাস্তবে কেউ শোল, কেউ পুঁটি। হম্বিতম্বিতে টেকা দায়। আবার এদের মধ্যে অনেকে আছেন যারা না ভারে না ধারে কাটেন। তবু কলার তোলা নেতা। আসলাম খানের ছবির যে হোর্ডিংটা এখানে টাঙানো আছে, একই ছবি দিনসাতেক আগে টাঙানো হয়েছে প্রশাসনিক বিল্ডিংয়ের দক্ষক্ষণ দেয়ালে। আসলাম খানের হাস্যমুখের দীর্ঘদেহী পূর্ণাবয়ব ছবির ওপরে দলের সর্বময়ী নেত্রীর হাস্যবদন নিটোল ছবি। একটু দূরে জেলা অবজারভারের তুলনামূলক আকারে ছোট দীপ্তচোখের মুখচ্ছবি। তারপাশে আরো কিছুটা ম্যাপে ছোট দলের জেলা সভাপতির ছবি। অন্য পাশে দলের প্রতীক জ্বলজ্বল করছে। প্রশাসনিক বিল্ডিংয়ের দেয়ালে প্রথমে যে-ছবিটা টাঙানো হচ্ছিল সে-ছবিটায় শুধুমাত্র আসলাম খানের একার ছবি ছিল। অন্য কারো মুখ ছিল না। আর সেটা নিয়েই ফেরে পড়ে গেছিলেন আসলাম খান। দলের ওপরমহলের নেতানেত্রীদের সমীহ না করে শুধু একার ছবি ঝোলাচ্ছেন। ওঁর এত বুকের পাটা হয় কী করে! আস্পদ্দা তো কম নয়! ব্যাপারটা কানে আসতেই তড়িঘড়ি ছবি বদলান আসলাম।
একটা দোকানও খোলা নেই। পুরো বাসস্ট্যান্ড চত্বর খাঁখাঁ করছে! যেন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। দূরপাল্লার কিছু বাস এসে থেমেই পরমুহূর্তে ঘটনার আঁচ পেয়ে পিকআপ তুলে ভু-উ-উ করে চলে যাচ্ছে। ব্রহ্মপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে একটা বাসও ছাড়েনি। চত্বরটা এখন পুলিশের দখলে। লাশটা যেখানে চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে, তার চারপাশ তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশ দাগ টেনে ঘিরে দিয়েছে। দিনের আলো ফুটতেই লোক ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে। নানান কিসিমের নেতানেত্রী আসছেন। এত বড়মাপের নেতার মার্ডার হালফিলে হয়নি। সবাই ফুসুরফুসুর করছে, অ্যা কাদের মোল্লার কাজ। ইদানীং তার সঙ্গে আসলাম খানের বিরোধ চরমে উঠেছিল। আর দুই গোষ্ঠীর বিরোধে আরো ইন্ধন জুগিয়েছিল হালফিলে শহর জুড়ে আসলাম খানের ছবি টাঙানোর জবরদখল নিয়ে। প্রশাসনিক বিল্ডিংয়ের দেয়ালে কাদের মোল্লার ছবি খুলে নিচে নামিয়ে দিয়ে আসলাম খানের ছবি ওপরে টাঙানোয় নাকি কাদের মোল্লা ক্ষক্ষপে লাল হয়ে উঠেছিলেন। দাঁত চিবিয়ে নাকি বলেছিলেন, এর বদলা নাকি তিনি ঠিকই নেবেন। হুমকি দিয়েছিলেন, বেটা আসলাম খানকে চিরদিনের মতো ছবি বানিয়ে দেবো।
সকালের মিষ্টি হলুদ রোদ গান্ধী শপিংমলের দেয়ালে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে-থাকা আসলাম খানের ছবির মুখ ঠিকরে নেমে আসছে নিচের ঢালায় মেঝের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে থাকা আসলাম খানের উপুড় পিঠের ওপর। আর দেয়ালে তার ছবির নিচে তেরছা করে ঝুলতে থাকা কাদের মোল্লা যেন চিরিক করে হেসে বলছেন, ‘দেখলি, ব্যাটা, তোকে চিরদিনের মতো কেমন ছবি বানিয়ে দিলাম!’

Leave a Reply

%d bloggers like this: