বার্ধক্যের ভালোবাসা
ভালোবাসার প্রচলিত ধারণা অনুসরণ করে ভাবনা-চিন্তা করলে স্বাভাবিক যে-সিদ্ধান্তে সহজেই উপনীত হওয়া যায় তা হলো, বার্ধক্য ভালোবাসায় চির ধরায়। তারুণ্যের উদ্দীপনায় যে তরুণ-তরুণী এক সময়ে মুহূর্তের জন্যেও একে অন্যের থেকে দূরে সরে থাকতে নারাজ, তাদেরকেই হয়তো বিবাহিত জীবনের প্রান্তে এসে পরিণত বয়সে দেখা যায় নিজেদের মধ্যে আগ বাড়িয়ে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে নিতে। জীবনসায়াহ্নে এসে ভালোবাসার টান এভাবে ফুরিয়ে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায় এবং মানবজীবনের স্বাভাবিক এই প্রবণতায় দেশকালের প্রভেদ মনে হয় তেমন একটা ছাপ কোথাও ফেলে না। ফলে দীর্ঘদিনের সংসারে তৈরি হওয়া বিচ্ছেদের দেয়াল বলা যায় সর্বত্রই দৃষ্টিযোগ্য।
দাম্পত্য জীবনের শেষপ্রান্তে এসে কারো কারো মনে আবার সংসারের বোঝা আরো কিছুদিন টেনে বেড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে হঠাৎ করেই দেখা দেয় উদ্ভট নানা প্রশ্ন, যার উত্তর হাতড়ে বেড়াতে গিয়ে কুলকিনারার খেই হারিয়ে অথৈ জলে তলিয়ে যাওয়াও তেমন নতুন কোনো কিছু নয়। জীবনসায়াহ্নে এসে ভালোবাসার অদ্ভুত এরকম পরিণতি নিয়ে জাপানের সংবাদ-মাধ্যম আজকাল হরহামেশাই বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছে। আর সেরকম বিতর্কের সূত্র ধরেই শেষ জীবনে ভালোবাসার টান আরো গভীরভাবে অনুভব করতে পারার প্রায় না-বলা ইতিবাচক দিকটি সম্পর্কে জানতে পারার ব্যতিক্রমি এক উদ্যোগ সম্প্রতি গ্রহণ করে জাপানের বাণিজ্য-জগতের নেতৃস্থানীয় কোম্পানি সুমিতোমো করপোরেশনের সাথে সংযুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো ট্রাস্ট এন্ড ব্যাংকিং।
২০০০ সালের নভেম্বর মাসে বার্ধক্যের ভালোবাসা সম্পর্কে জানতে পারার উপায় খুঁজে দেখার এক চিন্তা সুমিতোমো ট্রাস্ট এন্ড ব্যাংকিংয়ের কর্মকর্তাদের মাথায় দেখা দেয়। ব্যাংকিং খাতের ব্যবসায় যেহেতু ব্যক্তিগত মক্কেলদের দেখভাল করতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গণ্য, সুমিতোমো ব্যাংকিং বলা যায় অনেকটা সেরকম দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই তাদের সেই চিন্তার বাস্তব প্রয়োগে এগিয়ে আসে এবং ষাট বছর কিংবা বেশি বয়সের দম্পতিরা নিজেদের দীর্ঘ পারিবারিক জীবনে ভালোবাসার উপস্থিতি কতটা অনুভব করতে পারছেন, সে-সম্পর্কে চিঠি লেখার অনুরোধ জানিয়ে সংবাদ-মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। সুমিতোমো ট্রাস্টের সেই বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে প্রচুর যেসব চিঠি অল্পদিনের মধ্যেই সংস্থার দপ্তরের ঠিকানায় আসতে শুরু করে, চিঠির সেই সংখ্যা প্রকল্পের উদ্ভাবকদের শুরুতে করে নেওয়া সবরকম হিসাবকে সহজেই পালটে দেয়। সব মিলিয়ে তিন পর্যায়ে চিঠি লেখার অনুরোধ প্রচারিত হওয়ার পর সুমিতোমো ট্রাস্ট এন্ড ব্যাংকিংয়ের দপ্তরে সারা জাপান থেকে আসা চিঠির সংখ্যা হচ্ছে চৌত্রিশ হাজারেরও কিছু বেশি। সব চিঠিই হচ্ছে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা প্রদান আর উৎসাহ যোগানোর জন্য স্বামী কিংবা স্ত্রীর কাছে লেখা স্ত্রী অথবা স্বামীর পত্র। শুরুতে কেবল বাছাই করা কিছু পত্রের লেখক-লেখিকাকে পুরস্কৃত করার চিন্তা কোম্পানির থাকলেও চিঠির অভাবনীয় সংখ্যাধিক্য অন্যরকম চিন্তা-ভাবনা করতে তাদের প্ররোচিত করে, যার ফলশ্রুতি হচ্ছে সুমিতোমো ট্রাস্টের নিজস্ব প্রকাশনা ষাট বছরের প্রেমপত্র। সবগুলো চিঠি থেকে বাছাই করে নেওয়া সেরা চিঠির দুটি সংকলন ষাট বছরের প্রেমপত্র-এক এবং ষাট বছরের প্রেমপত্র-দুই নামে সুমিতোমো ট্রাস্ট যথাক্রমে ২০০১ ও ২০০২ সালে প্রকাশ করে।
দুটি বইই জাপানের বেস্ট-সেলার তালিকায় সহজেই জায়গা করে নেয় এবং এ পর্যন্ত এদের সম্মিলিতভাবে বিক্রি হওয়া কপির সংখ্যা হচ্ছে দুই লাখ চল্লিশ হাজার। বইয়ের কপিরাইট থেকে পাওয়া সবরকম অর্থ সুমিতোমো ট্রাস্ট এন্ড ব্যাংকিং আবার দান করে দেয় জাপানের নাগরিক সম্প্রচার কেন্দ্র এনএইচকে’র পরিচালিত ‘সহায়ক হাত’ নামের এক সাহায্য প্রকল্পে, সামাজিক অগ্রগতিতে সহায়তা করার লক্ষ্যে যে-প্রকল্প কয়েক বছর আগে এনএইচকে চালু করেছে।
ষাট বছরের প্রেমপত্রে-র মূল জাপানি সংস্করণের অভাবনীয় সেই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এর একটি বাছাই ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ পরবর্তীতে সুমিতোমো ট্রাস্ট এন্ড ব্যাংকিং হাতে নেয়। সেই প্রকল্পের ফসল হচ্ছে গত বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত পঞ্চাশ পৃষ্ঠার একটি বই। জাপানি ভাষার দুই খ- থেকে বাছাই করা তিরিশটি চিঠির ইংরেজি অনুবাদ বইয়ে সংযোজিত হয়েছে, যার প্রায় সবকটিই বার্ধক্যের ভালোবাসা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা সহজেই ভেঙে দিতে পারে। চিঠির ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে কাজ করার সময় এর অনুবাদক রিচার্ড গাইনিস-এর স্ত্রী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণত্যাগ করেন। বিচ্ছেদের সেই বেদনা শেষজীবনে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার প্রেমপত্রের সার্থক অনুবাদ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে নতুন করে তাঁকে যে অনুপ্রাণিত করে, ইংরেজি সংস্করণের মুখবন্ধে পাঠকদের সে-কথা জানাতেও ভোলেননি সুমিতোমো ট্রাস্ট এন্ড ব্যংকিংয়ের পরিচালকম-লী। ইংরেজি সংস্করণের তিরিশটি চিঠি থেকে বাছাই করে নেওয়া দুটি চিঠির অনুবাদ এখানে তুলে ধরা হলো, যে মূল গ্রন্থের পেছনের ধারণা আর এর বাস্তবায়নের ছবি কিছুটা হলেও এই রচনার পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে পারবে।
স্বামীকে লেখা স্ত্রীর পত্র
আকেমি নাকাগাওয়া (বয়স ৬১ বছর)
দয়া করে একথা কখনো বলবে না ‘তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি দুঃখিত।’
তোমার সেবা করে যাওয়ার সময় আটত্রিশ বছর ধরে আমার এই জীবন তোমার সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার আনন্দের স্মৃতি কখনো আমি ভুলে যাই
না, প্রিয় স্বামী আমার। এতটাই একে অন্যের ঘনিষ্ঠ আমরা ছিলাম যে এমনকি ঈশ্বরও হয়তো আমাদের হিংসা করে থাকবেন। আর সে-কারণেই বুঝি পারকিনসন রোগের ভারি এক বোঝা তোমার ওপর তিনি চাপিয়ে দিয়েছেন।
তবে চিন্তা কারো না! ভারি সেই বোঝা আমরা দুজনে ভাগাভাগি করে নিলে এর ভার তোমার কাছে নিশ্চয় সহনীয় হয়ে আসবে।
সামনে যে আরো আনন্দের পথ আমাদের জন্যে খোলা আছে!
স্ত্রীকে লেখা স্বামীর পত্র
হিরোশি মাৎসুমুরা (বয়স ৬৮ বছর)
নির্দ্বিধায় এখন আমি স্বীকার করতে পারি সেই দিনের আশংকার কথা, যেদিন সে-কথা আমি জানতে পারি যে, আমার এক সহকর্মী চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ঘরে ফিরে যাওয়ার পর তার স্ত্রী দাম্পত্য-জীবনে ছেদ টানার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাকে জানিয়েছিল। ফলে নিজের অবসর নেওয়ার দিনটিতেও হৃদয়ে প্রচ এক অশান্তি নিয়ে আমি বাড়ি ফিরে আসি। তবে দরজা খুলেই নাথা নত করে স্বাগত জানানোর ভঙ্গিতে তুমি বলেছিলে, ‘এতদিন ধরে কঠিন পরিশ্রম করে যাওয়ার জন্যে তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’ তোমার সেদিনের সেই মন্তব্যে এতটাই অভিভূত আমি হয়ে পড়ি যে, তৃপ্তির অনুভূতিতে আমার চোখ প্রায় ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
এবছর আমাদের দাম্পত্য জীবন চল্লিশ বছরে পদার্পণ করছে। একটি কবর তৈরির কথা আমরা ভেবেছিলাম। সেটা তৈরি হয়ে যাওয়ার পর ফাঁকা সেই কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রার্থনা আমরা করি, রোগমুক্ত সুস্থ জীবন নিয়ে আরো দীর্ঘদিন একসাথে আমরা যেন বেঁচে থাকি।
কঠোর পরিশ্রম করে যাওয়ার বাইরে এযাবৎ জীবনে তো আর কোনো কিছুই তোমাকে আমি দিতে পারিনি। তবে এখন থেকে তোমার জমা হওয়া সাংসারিক সমস্যার সেই ঋণ সুদে-আসলে পূরণ করে দেওয়ার চেষ্টা আমি করে যাব, এই প্রতিশ্রুতি তোমাকে আমি দিচ্ছি। এসো, আমাদের এই ‘দ্বিতীয় জীবন’ একসাথে আমরা উপভোগ করি। দয়া করে একথা কখনো বলবে না, ‘এমন কি মৃত্যুর পরের জীবনেও তোমার সাথে বসবাস আমার কাম্য নয়।’
দুই তরুণীর শীর্ষারোহণ
রিউনোসুকে আকুতাগাওয়া হচ্ছেন জাপানি-সাহিত্যের অত্যন্ত পরিচিত এক ব্যক্তিত্ব। ১৯২৭ সালে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে আÍহননের পথ বেছে নেন শারীরিক দিক থেকে চিরদুর্বল এই প্রতিভাবান সাহিত্যিক। তবে স্বল্প সময়ের সেই জীবনেও কীর্তির যে-সম্ভার তিনি রেখে গেছেন, জাপানি-সাহিত্যকে তা কেবল সমৃদ্ধই করেনি, একই সঙ্গে সাহিত্যকে নিয়ে গেছে আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে। মূলত ছোটগল্পের জন্যে বিখ্যাত আকুতাগাওয়া জাপানি লোকগাথা ও পুরাণ থেকে তাঁর গল্পের উৎস খুঁজে নিলেও রচনার বিন্যাসে তা তিনি সাজিয়ে তোলেন সম্পূর্ণ আধুনিক এক আঙ্গিকে, যার অনেকগুলোতেই আধুনিক সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারায় ব্যক্তির অপারগতা কাহিনীর মুখ্য-উপাদান হিসেবে আমাদের সামনে উঠে আসে। রচনাশৈলীর চমৎকার এই দক্ষতা রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার জন্য জাপানি-সাহিত্যে এনে দিয়েছে চিরস্থায়ী এক স্বীকৃতি। জাপানের বাইরে যে-পরিচয়ে সহজেই তাঁকে অনেকেই চিনে নিতে পারেন তা হচ্ছে, কুরোসাওয়ার বিখ্যাত ছবি ‘রাশোমনে’র কাহিনীর রচয়িতা তিনি; যদিও কিছুটা অস্পষ্টতা সেই পরিচয়ে থেকে যায়, কেননা ছবি তৈরি করতে গিয়ে মূল কাহিনীকে নিজের মতো করে কিছুটা রূপান্তরিত করে নিয়েছেন চলচ্চিত্রের সেই জাপানি দিকপাল।
আরেকটি যে-কারণে আকুতাগাওয়ার নাম জাপানের সাহিত্যের-জগতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়ে থাকে তা হলো, তার নামে প্রচলিত দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার। প্রকাশনা সংস্থা বুংকা শুনজু-শা ১৯৩৫ সালে ‘আকুতাগাওয়া পুরস্কার’ প্রবর্তন করে, সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ সাহিত্যিকদের বছরে দুবার সে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। মূলত ছোট গল্প বা ছোট আকারের উপন্যাসকেই পুরস্কারের জন্যে বাছাই করে নেওয়া হয় এবং ১৯৩৫ সালের পর থেকে এই আকুতাগাওয়া পুরস্কারে সম্মানীত লেখকদেরকেই দেখা গেছে পরবর্তীকালে সাহিত্য-জগতে স্থায়ী আসন পাকাপোক্ত করে নিতে। কেনযাবুরো ওয়ে, শিনতারো ইশিহারা, হারুকি মুরাকামি কিংবা রিউ মুরাকামি – এরা সবাই আকুতাগাওয়া পুরস্কারের পথ ধরেই এক সময়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন সাহিত্যের আসরে। তবে প্রতিবারের পুরস্কারেই সবচেয়ে বেশি যারা দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন, তারা হচ্ছেন বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ লেখক-লেখিকা।
টোকিওর গভর্নর ও জাপানের কট্টর-দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত শিনতারো ইশিহারা যে সাহিত্য-রচনার মধ্য দিয়ে শুরুতে নাম কেনেন তা কিন্তু অনেকেরই আজ স্মরণে নেই। শিনতারো ইশিহারা আকুতাগাওয়া পুরস্কার পেয়েছিলেন মাত্র তেইশ বছর বয়সে। ওই একই বয়সসীমার আরো তিনজন পুরস্কৃত লেখক হচ্ছেন, পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কেনযাবুরো ওয়ে, কেনজি মারুইয়ামা এবং কেইচিরো হিরানো। শেষের দুই ব্যক্তিত্ব অবশ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেমন পরিচিতি কখনোই পাননি।
এতদিন পর্যন্ত এই চারজন গণ্য হয়ে আসছিলেন আকুতাগাওয়া পুরস্কারের সর্বকনিষ্ঠ প্রাপক হিসেবে। তবে এবছরের শুরুতে ঘোষিত ১৩০তম আকুতাগাওয়া পুরস্কারের যৌথ দুই প্রাপক একই সঙ্গে ম্লান করে দিয়েছেন আগের সেই রেকর্ড। শুধু তা-ই নয়, তারুণ্যের মাপকাঠিতে তাদেরকে বালিকার পর্যায়ে ফেললেও খুব একটা ভুল যে করা হবে, তা কিন্তু নয়। সর্বশেষ আকুতাগাওয়া পুরস্কারের যৌথ দুই বিজয়িনী হচ্ছেন টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের উনিশ বছর বয়সী ছাত্রী রিসা ওয়াতাইয়া এবং মাত্র গত বছর লেখালেখির জগতে আÍপ্রকাশ করা বিশ বছর বয়সী হিতোমি কানেহারা। দুই বিজয়ীর বাইরে এবারের পুরস্কারের জন্যে সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আরেক প্রার্থীও হচ্ছেন বিশ বছর মহিলা রিও শিমামোতো। এদের তিনজনেরই জন্ম আশির দশকে এবং বেড়ে ওঠা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে জাপানের অস্তাচল ঘনিয়ে আসার দিনগুলোতে।
তিন লেখিকাই যে জাপানি-সাহিত্যের একেবারে নতুন পরিচিত ব্যক্তিত্ব, তা কিন্তু নয়। তিনজনই এর আগেও পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার। রিসা ওয়াতাইয়া বুঙ্গেই সাহিত্য পুরস্কার পান মাত্র সতেরো বছর বয়সে ইনস্টল নামের আÍজীবনীমূলক রচনার জন্য। প্রথম উপন্যাস জিব ফুটো সাপ-এর জন্যে হিতোমি কানেহারা এর আগে পেয়েছেন সুবারু সাহিত্য পুরস্কার। রিও শিমামুরাও মাত্র সতেরো বছর বয়সে লেখা উপন্যাস একটু একটু করে-র জন্যে পান সম্মানজনক নোমা পুরস্কার।
যে দুটি বইয়ের জন্য দুই তরুণী লেখিকাকে ১৩০তম আকুতাগাওয়া পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তা হচ্ছে রিসা ওয়াতাইয়ার কেরিতাই সেনাকা বা পিঠে কষে লাথি মারতে ইচ্ছে করে এবং হিতোমি কানেহারার উপন্যাস হেবি নি পিয়াসু বা জিব ফুটো সাপ। দুটি বইয়েরই কাটতি জাপানে এখন বেস্ট সেলার পর্যায়ে।
কেরিতাই সেনাকা-য় রিসা ওয়াতাইয়া অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন সহপাঠীদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না-পারা এক হাইস্কুলছাত্রীর সাথে পাগলাটে স্বভাবের এক স্কুলছাত্রের সম্পর্কের জটিল কিছু কিছু দিক, যে ছাত্র একই সঙ্গে আবার হচ্ছে জনপ্রিয় এক পপ গায়িকার অন্ধভক্ত। অন্যদিকে হেবি নি পিয়াসু-তে লেখিকা হিতোমি কানেহারা বর্ণনা করছেন উনিশ বছর বয়সী এক বালিকার কথা। দেহে উল্কির ছাপ এঁকে নেওয়া এবং কান, ঠোঁট আর জিব ফুটো করার বিচিত্র অভিজ্ঞতার খোলামেলা বর্ণনা পাঠকদের সামনে এতে তুলে ধরছেন। সন্দেহ নেই দুই লেখিকাই নিজেদের যাপিত জীবনের সাথে সম্পর্কিত বর্তমান সময়ের কথা বলছেন, যে-সময়ে রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা আদর্শগত অবস্থান তরুণদের মধ্যে সে-রকম কোনো আবেদন জাগাতে অক্ষম। ফলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের দেখা সেখানে সহজেই মিলে, যে-জগতের সাথে বয়স্ক লোকজন কিংবা ভিনদেশীদের রয়েছে বিস্তর এক ব্যবধান।
রিসা ওয়াতাইয়া আর হিতোমি কানেহারা – দুজনই সাম্প্রতিক বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে, অল্প বয়স থেকেই যা তাদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে তা হলো বইপড়া। মূলত জাপানি-সাহিত্যের বিভিন্ন বই তারা পড়লেও অনুবাদে বিদেশী-সাহিত্যের জগতে পদচারণাও ইতোমধ্যে তাদের হয়েছে। আর কীরকম বিক্রি হচ্ছে তাদের নিজেদের বই? সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যন থেকে এর পরিষ্কার ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। রিসা ওয়াতাইয়ার কিরেতাই সেনাকা প্রকাশিত হয় গত বছর আগস্ট মাসে। পুরস্কৃত হওয়ার আগে পর্যন্ত বইয়ের মোট বিক্রিসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ তিরিশ হাজার। তবে পুরস্কারের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বইয়ের কাটতি পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে জানুয়ারি মাসের শুরুতে প্রকাশিত হেবি নি পিয়াসুর বিক্রির সংখ্যা হচ্ছে এক মাসে তিন লাখ কপি। কে বলে ইন্টারনেটের প্রসার জাপানে বইয়ের বাজারকে করে তুলছে সংকুচিত?

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.