দিনকালের কাঠখড়

লেখক:

সেলিনা হোসেন

কোপেনহেগেনের বেলা সেন্টারে শরবানুর সঙ্গে দেখা হতেই তিনি প্রথমে হাসলেন, তারপর ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি?

মনে আছে আমাকে?

থাকবে না কেন? আপনি আমাকে অনেক যত্ন করেছিলেন। আপনিও এখানে জলবায়ুর  কথা বলবেন?

আমি তার দুহাত জড়িয়ে ধরে বললাম, আমি সাংবাদিক তো, এখানকার খবরাখবর দেশে পাঠাব।

আমার কথাও লিখবেন?

হ্যাঁ, অবশ্যই লিখব।

শরবানুর ভুরু সমান হয়ে গেল। মুখে হাসি ছড়িয়ে বললেন, আমি এখানে বাংলাদেশের হয়ে ক্ষতিপূরণ চাইতে এসেছি। এখানে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে।

আমি জানতাম আপনি আসবেন। দেখা হয়ে ভালো লাগল। মনে আছে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল

গাবুরায়। কোপেনহেগেনের এই বেলা সেন্টারে দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে আমার কথা বলতে ভালো লাগছে।

আমারও ভালো লাগছে। আমিও আপনাকে দেখে খুব খুশি হয়েছি।

আইলা ঝড়ে বিধ্বস্ত জনপদে আমি শরবানুকে দেখেছিলাম মৃতপ্রায় নারী হিসেবে। এখন তার চেহারায় ঝলমলে আভা। হাসতে হাসতে বলে, অনেক দুঃখের মধ্যে এইটুকু সুখ আপা গো! বিদেশে আসা হলো।

সুখ-দুঃখের হিসাব করে কুলোতে পারবেন না। এইসব হিসাব থাক।

ঠিকই বলছেন। সারাজীবন তো এইসব হিসাব করতে হবে। হিসাব করতে করতেই তো আমার অর্ধেক জীবন শেষ। আর কয়দিনের আয়ু।

চলেন আমার সঙ্গে। চা খাবেন।

যিনি আমার সঙ্গে আছেন। আমার ভাষা ইংরেজি করে দেন তিনি আমাকে এখানে দাঁড়াতে বলেছেন।

ও আচ্ছা, তাহলে আমিও আপনার সঙ্গে দাঁড়াই। আপনার সঙ্গে যিনি আছেন তার নাম কি?

শরীফ। খুব ভালো মানুষ। জানেন, এখন আর তেমন ভালো মানুষের দেখা পাই না। গ্রামেও নাই। আমাদের গাবুরার মানুষেরা একসময় খুব ভালো ছিল। এখন কেমন জানি হয়ে গেছে। গ্রামে কাজকাম নাই তো সেজন্য।

আইলা ঝড়ে বিধ্বস্ত গাবুরা গ্রাম আমি দেখে এসেছি। একটি গ্রাম কীভাবে বিধ্বস্ত লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। সে এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা ছিল আমার জন্য।

এখন এই বেলা সেন্টারে দাঁড়িয়ে শরবানু আকস্মিকভাবে নিজের স্মৃতিচারণ করে আগের মতো করে। আমি বুঝতে পারি এই ট্রমা থেকে ওর ফিরে আসা কঠিন। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি – সেই আইলা ঝড়ের পরে আমার বাজান ভেবেছিল আমি বুঝি মরে গিয়েছি। তাই আমাকে বাঁশের চাটাইয়ে মুড়ে নৌকায় করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকা আমার পাঁচ বছরের ছেলেটাকেও দিয়েছিল আমার সঙ্গে। নদীতে ভাসার সুখ আমি বুঝতে পারিনি।

আমি শরবানুর কথায় হকচকিয়ে যাই। বাবা যাকে মৃত বলে ভাসিয়ে দিয়েছিল তার বুকে সুখ খোঁজার তৃষ্ণা থাকে। গাবুরায় যখন আমি তাকে দেখি তখন তাকে একজন মৃতপ্রায় নারী মনে হয়েছিল – বিধ্বস্ত বিপন্ন বিপর্যস্ত। দৃষ্টিতে নদীর ঘোলাটে জলের ছায়া। সেই নারী এখন স্মৃতি হাতড়ে সুখ খুঁজতে চায়। আশ্চর্য! জীবন দেখার বৈচিত্র্য আমার সামনে থেকে কোনোদিনই ফুরোবে না। আমি অনবরত নতুন মুখ পাব এই স্বপ্ন আমাকে পেয়ে বসে। নিজেকেই বলি, এই মুহূর্তে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শরবানু অন্য এক নারী। নীল রঙের সিল্কের শাড়ি পরেছে, সঙ্গে একই রঙের ব্লাউজ। কপালে বড় টিপ। টিপের রংও নীল। বুঝতে পারছি কেউ ওকে সাজিয়ে দিয়েছে। কিংবা বলে দিয়েছে এভাবে শাড়ি-টিপ পরতে। দুহাতে চমৎকার কাঁচের চুড়ি। মাথাভর্তি চুলের বড় একটি খোঁপা চেহারাকে বাঙালিয়ানার সবুজ শোভায় মন্ডিত করে রেখেছে। ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমাকে বলল, সেই ঝড়ের পরে আপনি আর আসেন নাই।

আমি গিয়েছিলাম। দুবার গিয়েছি। আপনার খোঁজ করে শুনেছিলাম আপনি সুন্দরবনে কাঠ কাটতে গিয়েছেন।

হ্যাঁ, এখন তো কাঠ কেটে জীবন কাটাই।

আপনার ছোটভাই খলিলুরের সঙ্গে দেখা হলে ও আমাকে চিংড়ির ঘের দেখিয়েছিল।

ওহ, চিংড়ির ঘের। আমাদের সর্বনাশ।

এর মধ্যে শরবানুর ইন্টারপ্রেটার শরীফ এলো। বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে। স্মার্ট, তুখোড়। ইংরেজি বাংলা দুভাষাই চমৎকার বলে। আমাকে দেখেই বলল, আমি শুনেছিলাম আপনি আসবেন।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, শব্দটা কান থেকে চোখে এসেছে আপনার।

নিঃসন্দেহে আমি ভাগ্যবান।

শরীফ স্মার্টলি জবাব দেয়। আমার মনে হয় এও নতুন মানুষ দেখা। আমার দেখার বৈচিত্র্যে সব। বলি, শরবানুকে আমি প্রথম দেখি গাবুরায়। এখন কোপেনহেগেনে।

শরীফ হা-হা করে হাসতে হাসতে বলে, একদম দেশ ছাড়িয়ে, বিদেশের মাটিতে। একেই বলে কাকতালীয় যোগাযোগ। ভেবে দেখুন, শরবানু আজ একটি বিশ্ব সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের যে-ক্ষতি হয়েছে তাদের কৃতকর্মের ফলে, সে-ক্ষতিপূরণ চাইবে বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে।

আমি শরীফের দিকে তাকিয়ে বলি, সর্বস্ব-হারানো শরবানু এজন্য উপযুক্ত ব্যক্তি।

শরীফ ঘনঘন মাথা নেড়ে বলে, ইয়েস, ইউ আর রাইট।

আমি শরবানুর দিকে তাকাই। দেখি, ওর চোখে কৌতূহল। ও চারদিকে তাকাচ্ছে। নানাকিছু দেখছে। আমি জানি, তার কাছ থেকে শুনেই জেনেছি, সে যখনই একটুখানি উঠে দাঁড়াতে পেরেছে তখনই আর একটি প্রবল ধাক্কা তার সামনের সবটুকু অন্ধকার করে দিয়েছে। কিন্তু শরবানু সাহস হারায়নি। ভাবলাম, শহরের মানুষের চেয়ে লড়াইটা ওরা বেশি বোঝে।

আমি শরীফকে বলি, আমার একটু যেতে হবে। আসি।

শরবানু দ্রুত হাত জড়িয়ে ধরে বলে, আপনাকে তো আমার জীবনের সব কথা বলেছি আপা। আপনি আমাকে ভুলবেন না।

না, না ভুলবো না। আমি সুযোগ পেলেই গাবুরায় যাব। আপনার সঙ্গে কথা বলে আমি অনেক কিছু জানতে পারি।

দেশে তো দেখা হবেই, এখানেও আপনি আমার খোঁজ রাখবেন। যে কয়দিন থাকবেন আপনাকে দেখতে চাই।

দেখবেন নিশ্চয়ই। আমি প্রতিদিন আপনার সঙ্গে দেখা করব।

মৃদু হাসি লেগে থাকে শরবানুর মুখে। বুঝতে পারি আমার দেখা সেই হাসিটি যেটি আমি দেখেছিলাম। নৌকায় জ্ঞান ফিরে আসার পরে ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে শরবানু নেমে এসেছিল ডাঙায়। আমি সেদিন প্রথম তাকে নৌকায় আবিষ্কার করি। সেটিও একটি কাকতালীয় সাক্ষাৎ ছিল। শরীফের কথার পুনরাবৃত্তি করি নিজের সঙ্গে। সেদিন আইলা ঝড়ে বিধ্বস্ত জনপদে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব বিপন্ন বোধ করেছিলাম। মাথার মধ্যে সেই ছবি তীব্র আলোয় ফুটে উঠেছে। অথচ বেলা সেন্টারের চারদিকে নানা দেশের লোক নানা কাজে ছুটছে, কিংবা দাঁড়িয়ে কথা বলছে। নানা দেশের মানুষ জড়ো হয়েছে এখানে। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে কাজ করছে মৃতপ্রায় শরবানুর জেগে-ওঠার দৃশ্য। চারদিকে তাকিয়ে খোলপেটুয়া নদীর পাড় ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। সাংবাদিকতার কাজে এই এলাকায় আরো দুবার এসেছি। এলাকাটি আমাকে খুব টানে। সাতক্ষীরা জেলার দক্ষিণ সীমান্তে গাবুরা ইউনিয়ন। এরপরে সুন্দরবন। তারপরে বঙ্গোপসাগর। সুন্দরবন আর বঙ্গোপসাগর উচ্চারণ করলেও আমি অন্য মানুষ হয়ে যাই। ভেতরে তোলপাড় ওঠে। বেলা সেন্টারে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতর থেকে এসব সরাতে পারছি না। ভাবতে পারছি না এত নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরও কেন নিজেকে শরবানু থেকে সরাতে পারছি না? সেদিন খোলপেটুয়া নদীর ধারের জংলা জায়গায় তাকে আটকে থাকতে দেখেছিলাম। নৌকার উপরে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসেছিল। দূর থেকে দেখে আমি দৌড়াতে থাকি। কাছে গিয়ে লাফিয়ে নৌকায় উঠি। আমার পায়ে কেডস ছিল। কেডস ভরা কাদা ছিল। আমি কাদায় হাঁটার জন্য জিনসের প্যান্ট পায়ের পাতার কাছে গুটিয়ে রেখেছিলাম।

আমাকে দেখে শরবানু চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলেছিল, আপনি কোথায় থেকে আসলেন? ও আল্লাহ রে!

কিন্তু আপনি বা এখানে নৌকার উপর কেন?

জানি না। বলতে পারব না।

আপনার বাড়ি কোথায়?

জানি না। কিছু তো চিনতে পারি না।

আমি জুতা খুলে শরবানুর মুখোমুখি বসি।

চলেন আপনাকে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে নিয়ে যাই।

আমি হাঁটতে পারবো না। ছেলেটাও খিদায় কাঁদছে। আল্লাহ রে, কী উপায় হবে!

আমার ব্যাগে বিস্কুট আর পানি ছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে শরবানুর হাতে দিয়ে বলি, আপনারা দুজনে খান। আমি লোকজন ডেকে আনি।

আমার বাবার নাম শেরখান গয়াল। তাঁকে খোঁজ করবেন। আমার ভাই খলিলুর মফিজুরকে খোঁজ করবেন। আমার মা আমেনা বেওয়া।

আমি কেডসের ফিতা বাঁধতে বাঁধতে নামগুলো মুখস্থ করি। ছোটবেলায় লেখা নামতা পড়ার মতো বলতে থাকি। নদীর ধার দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ত্রাণ বিতরণের দলের সঙ্গে দেখা হয়। সকলের উৎসুক চোখ আমার মুখের ওপর পড়ে।

কী হয়েছে? কী হয়েছে শারমিন?

একজন অলৌকিক মানুষ পেয়েছি। আমার মনে হয় ঝড়ে উড়ে গিয়ে নৌকার উপর পড়েছে। কোলে একটি বাচ্চা আছে।

চলো দেখি।

সবাই যাওয়ার জন্য প্রস্ত্তত হয়।

ওর জন্য কিছু খাবার নাও। বাচ্চাটাও না খেয়ে আছে। কয়দিন খায়নি কে জানে!

ধরে নিতে পারি তিনদিন। কারণ ঝড়ের পরে দুদিন পার হয়ে গেছে।

অচেতন ছিল নিশ্চয়। সেজন্য খাবারের দরকার হয়নি।

বেঁচে গেল কী করে আল্লাহই জানে।

একটি ব্যাগে বিস্কুট, জুস, পানি নিয়ে ওরা রওনা করে। দ্রুতপায়ে হাঁটে সবাই। আমি সবার আগে, যেন আমি নিজেই নিজেকে দলের নেতা বানিয়েছি। কাছে গিয়ে দেখেছিলাম মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। বিস্কুট আর পানি খেয়ে বাচ্চাটি শুয়ে পড়েছে। আমি নৌকায় পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুলে ওঠে নৌকা। ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল শরবানু – আঁ-আঁ ধ্বনি কয়েক মুহূর্ত উড়তে থাকল সুন্দরবনের উপর দিয়ে। আমি তাড়াতাড়ি তার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, ভয় পাবেন না।

আমি ভেবেছি আবার বুঝি ঝড় –

দেখেন আকাশ কত পরিষ্কার। ঝড় আসেনি। মনে হয় না যে ঝড় আসবে।

আমি বাড়ি যাব। আমার বাজান কেমন আছে?

চলেন, আপনাকে বাড়ি নিয়ে যাব। হাঁটতে পারবেন?

আমার ছেলেটা বোধহয় পারবে না।

ওকে আমাদের ভাইয়েরা কোলে নেবে। দেখেন আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কতজন এসেছে।

শরবানু হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে বলেন, রিলিফ আনছেন আপনেরা?

হ্যাঁ, রিলিফ। আপনার জন্যও আছে।

রুহিনা বিস্কুট-জুসের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, এটা আপনার জন্য। আপনি জুস-বিস্কুট খান, তারপরে আমরা রওনা দেব।

আমি সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে বলি, এই আপা খেতে থাকুক। আমরা চারদিক খুঁজে দেখি কেউ কোথাও আটকে পড়ে আছে কিনা।

শরবানু চোখ বড় করে বলেছিল, বাঘের ভয় করবে না?

একটু তো করবেই। তবে সাবধানে থাকব।

আমরা চারদিকে তাকাতে তাকাতে এগোই। পথের ওপর গাছপালা ভেঙে পড়ে আছে। মাঝে মাঝে আমরা সেগুলো টেনে পথের একপাশে জড়ো করি। কাঁচা পাতা বিছিয়ে থাকলে তার ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যাই। অবশ্যই খেয়াল করি হরগোজাকাঁটা গাছ পথে পড়ে আছে কিনা। যদিও কেডস পরেছিলাম, তারপরও হরগোজাকাঁটা আমি ভয় পাই। কয়েকবার সুন্দরবনে আসার কারণে এই গাছগুলো আমি ভালো চিনেছি। একবার করমজল এলাকায় দেখেছিলাম হরগোজাকাঁটার বেগুনি ফুলের সৌন্দর্য। একসঙ্গে একগাদা ফুলে বেগুনি রঙের শোভা অপূর্ব লেগেছিল। কিন্তু ফুল আমাকে কাঁটার কথা ভোলাতে পারেনি। ভয়ের বাইরে আমি যেতে পারিনি। পথে হরগোজাকাঁটা না পেয়ে আমি মনের আনন্দে সবাইকে ছাড়িয়ে বেশ সামনে চলে গিয়েছিলাম। কেবলই মনে হয়েছিল সুন্দরবনের গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে-থাকা এই গাবুরা আমার কতকালের চেনা। আমি অনায়াসে এখান থেকে সেখানে ছুটে যেতে পারি। একদমে ঘুরে আসতে পারি পুরো এলাকা। যেতে যেতে দেখছিলাম নদীর ধারে নেতিয়ে পড়েছে গোলপাতা। বড় আকারের পাতাগুলোর সৌন্দর্যই আলাদা। অবশ্য মাথা-ভাঙা সুন্দরী গাছের কাতর দৃশ্য আমাকে মর্মাহত করেছিল। আমি তো জানি সুন্দরবন ছিল বলে আইলা ঝড়ের দাপট আমাদের বিস্তৃত এলাকায় ছোবল দিতে পারেনি। বাধা পেয়েছে সুন্দরবনের কাছ থেকে। আমি জানি না কবে আবার এই ন্যাড়া গাছগুলো পাতায় পাতায় পূর্ণ হবে। আকস্মিকভাবে গোলপাতার আড়ালে হলুদ শাড়ি পরা একজন নারীর শরীর দেখে আমি চমকে উঠি। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি।

পেছন থেকে তুহিন চেঁচিয়ে বলে, শারমিন দাঁড়ালে কেন? তুমি কি বাঘ দেখতে পেয়েছ?

আমি আতঙ্কিত দৃষ্টি নিয়ে বলি, হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছি। তোমরা আস।

আমি ততক্ষণে নদীর ঢালের নিচু জায়গায় নেমে যাই। দেখতে পাই হলুদ শাড়িপরা নারীর পা মাটির সঙ্গে লেগে আছে। পায়ের দুপাতাই কাদায় আটকে আছে। এজন্য হয়তো মাঝনদীতে ভেসে যায়নি। আমি বোকার মতো নিজেকে এমন একটি যুক্তি দেখাই। পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে ত্রাণের দলের কয়েকজন।

লুনা চিৎকার করে, ওহ, মা গো! বেঁচে আছে তো?

আমি কেডস খুলতে খুলতে বলি, চলো, সবাই আগে ওনাকে উঠিয়ে আনি।

সবাই মিলে ধরে উঠিয়ে আনার পরে আমরা টের পাই যে তার জ্ঞান নেই। নিশ্বাস পড়ছে। তাহলে বেঁচে আছেন। আমাদের কাছে রুমাল, টিস্যু পেপার যা ছিল তা বের করে তার পরিচর্যা করি। শাড়ি চিপে মেলে দিই। কাদা-ময়লা মুছে পরিষ্কার করি। মাথার চুল রুমাল দিয়ে মুছে ফেলি। এখন বেশ পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে তাকে। সবার দিকে তাকিয়ে আমি বলি, নেবো কি করে আমরা?

তুহিন সঙ্গে সঙ্গে বলে, সে-চিন্তা আমি করে ফেলেছি। ডাঙা ডালপালা জোগাড় করে এইসব লতা দিয়ে বেঁধে খাটিয়ার মতো করে ফেলব। তারপর ঘাড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব। কোনো সমস্যা হবে না। চিন্তারও কিছু নেই।

চলো তাহলে তাই করি। লুনা তুই ওনার কাছে বসে থাক। খেয়াল রাখিস।

আমাদের মধ্যে পাঁচজন ছেলে আর আমরা তিনজন মেয়ে। মিলেমিশে খুব দ্রুত একটা খাটিয়া বানাতে পারি। মানিক খাটিয়ার উপরে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে চেপে ভালো করে পরীক্ষা করে। ভেঙে গিয়ে কিংবা খুলে না যায়। আমরা লতা দিয়ে জোড়া দেওয়া জায়গাগুলো বারবার পরীক্ষা করি। শেষে নিশ্চিত হয়ে খাটিয়ায় উঠাই। তুহিন, মারুফ, মানিক আর অমিত খাটিয়া ঘাড়ে নেয়। শিহাব বলে, কিছুদূর গেলে আমি নেব। একজন রেস্ট পাবে। আমরা পালাক্রমে নেব।

তোকে পালা করার কথা ভাবতে হবে না। হালকা-পাতলা মানুষটিকে আমরা অনায়াসে নিতে পারব।

তারপরও -। পথ তো কম নয়। আমি বলি, তুমি নৌকার ছেলেটিকে কোলে নিও তাহলেই হবে।

আমরা আর দাঁড়াই না।

সূর্য তখনো মাথার ওপরে ওঠেনি। চারদিক নিস্তব্ধ। পাখির ডাক নেই। এমন কি পোকামাকড়ের ডাকও না। নদীর ধারে কুমির দেখা যায়। তারাও আজ নেই। গাছের পাতাও নড়ছে না। এতই স্তব্ধ চারদিক। যেন হাজার বছর ধরে নিঃসরিত হওয়া কার্বনের নিচে চাপা পড়ে জমাট হয়ে গেছে সুন্দরবন। আরো হাজার বছর পরে একদিন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাজের সুযোগে বেরিয়ে পড়বে এই জনপদ। লোকে বলবে, দেখো দেখো এখানে একদিন মানুষের বসতি ছিল। মৌয়ালরা বনে গিয়ে মধু সংগ্রহ করতো। বাওয়ালিরা গোলপাতা কাঠ কাটতে যেত। বনে দস্যুর উৎপাত ছিল। আর বাঘের পেটেও যেত মানুষ। ফুলের মধু খেয়ে অসংখ্য মৌচাক গড়ে তোলে মৌমাছি। শুনেছিলাম হরগোজাকাঁটার ফুলে অনেক বেশি মধু থাকে। ভাবলাম, কাঁটা আর মধুর এমন একসঙ্গে জড়াজড়ি পাওয়া কঠিন। সুন্দরবনই প্রকৃত জায়গা মানুষের বসবাসের জন্য। যদি কাঁটা আর মধু জীবনের কাজে একই সঙ্গে লাগানো যায়। আসলে আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। ভাবছিলাম, কেন ওসব ভাবছি? আবার ভাবি, ভাবতেই হবে। দিন বেশি দূরে নয়, গুনতে গুনতে শেষ হয়ে যাবে।

আমরা পৌঁছে যাই শরবানুর নৌকার কাছে। দেখলাম শরবানু একবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তারপর বসে পড়ে। চিৎকার করে বলে, কাকে আনলেন আপনারা? বেঁচে আছে, না মরে গেছে?

ছেলেরা খাটিয়া নামায় মাটিতে। চারজনই নিজেদের মাথা ঝাঁকিয়ে নেই। খাটিয়ায় শোয়া নারীর ভেজা শরীর থেকে পানি ঝরে ওদের মাথা ভিজেছে। ওদেরকে একগাদা টিস্যু পেপার দিয়ে আমি শরবানুর হাত ধরে বলি, আসতে পারবেন?

শরবানু শূন্যদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। ওঠার চেষ্টা করে। নিজেকে সামলায়। আমি বলি, যাকে এনেছি তাকে আপনি চেনেন কিনা দেখবেন? তারপর আমরা আপনাকে আপনার গ্রামে নিয়ে যাব।

শরবানু নৌকার উপর উঠে দাঁড়ায়। আমি হাত ধরি। মারুফ এসে তার অন্য হাত ধরলে তিনি পা বাড়িয়ে দিয়ে কাদা পার হন। খাটিয়ার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে, ও আল্লাহ, এ যে দেখি আমাদের মজিদা।

খাটিয়ার পাশে বসে শরবানু তার মাথায় হাত রাখে।

চোখ খোলরে মজিদা। আল্লাহ রহমানুর রহিম, চোখ খোল রে মজিদা।

আমি জিজ্ঞেস করি, মজিদা আপা কি আপনার গ্রামের?

আমার খালাতো বোন। পাশের গ্রামে থাকে। আমার বাড়িতে যাতায়াত আছে।

আপনি হাঁটতে পারলে, চলেন আমরা রওনা করি। বাড়ি যেতে যেতে মজিদা আপার জ্ঞান ফিরে আসবে মনে হয়।

চলেন। যাই। শরবানু ছেলের দিকে তাকায়। আমরা সবাই দেখি, ও জুস শেষ করে প্যাকেটটা নদীতে ফেলে দেয়। ওকে বেশ সজীব এবং উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। ও মায়ের দিকে দুহাত বাড়িয়ে মা মা করে ডাকতে শুরু করে। শিহাব গিয়ে ওকে তুলে নিজের ঘাড়ের উপর বসিয়ে বলে, এখন থেকে আমার ঘাড় তোর নৌকা। তুই এই ঘাড়ের উপর বসে বাড়ি যাবি।

ছেলেটি হি-হি করে হাসে। বেশ মজা পায়। নিজের দুই মুঠিতে শিহাবের চুল চেপে ধরে।

শিহাব জোরে জোরে বলে, ওউ, আমি ব্যথা পাচ্ছি।

ব্যথা পেলে আরো মজা, দিচ্ছি জোরে টান।

ও দুহাতে কষে চুল টেনে ধরে।

এমন করলে তোকে ঘাড় থেকে নামিয়ে দেবো।

না, নামিও না দাদাভাই। আর টানব না।

তোর নাম কী রে?

টিপু। নাম বলে ও আবার হি-হি করে হাসে।

এই তুই আমার গলা জড়িয়ে ধর।

দেখতে পাই টিপু শিহাবের গলা জড়িয়ে ধরেছে। শিহাব হালুম-হুলুম শব্দ করে ওর সঙ্গে মজা করছে। শরবানু ওর দিকে তাকিয়ে বলে, নৌকায় ওকে দেখে আমার মনে হয়েছিল ও বুঝি বাঁচবে না। বাঁচলেও ভালো হতে সময় লাগবে। এখন দেখছি আপনাদের পেয়ে ও ঠিক হয়ে গেছে। ও আমার ঝড়ের আগের টিপু।

আমি শরবানুর হাত টেনে ধরে বলি, চলেন। হাঁটতে ইচ্ছা না করলে আমাকে বলবেন। কষ্ট হলে আমার ঘাড়ে ভর করে হাঁটেন।

দেখি কতদূর যেতে পারি। না পারলে ঘাড়ে হাত রাখব।

ছেলেরা খাটিয়া ঘাড়ে তুলে নেয়। তখনো মজিদা বিবির জ্ঞান ফিরে আসেনি। নিঃসাড় পড়ে আছে খাটিয়ার উপর। তবে নিশ্বাস ঘনঘন পড়ছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি হয়তো জ্ঞান ফিরবে।

আমরা ফিরতে শুরু করি।

বেশ খানিকটা দূরে ত্রাণদলের একটি ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে। আমাদের চলার গতি নেই। শরবানু দ্রুত হাঁটতে পারছেন না। মাঝে মাঝে তিনি বসছেন।

ছেলেদেরও খাটিয়া নিয়ে ভাঙাচোরা পথে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। মাঝে মাঝে খাটিয়া নামিয়ে রেখে ওরা হাত-পা ঝেড়ে নিচ্ছে। আবার কখনো বসে আমরা নিজেরাও জুস-বিস্কুট খেয়ে নিচ্ছি। ক্ষণিকের জন্য বসলে শিহাবের ঘাড় থেকে টিপু নেমে পড়ে মাটিতে। দৌড়াতে ঠিক পারে না। টলে ওঠে। তবে মায়ের কোলে ঢুকে আবার বেরিয়ে আসার আনন্দ ওর কাছে খেলা হয়ে যায়। আমি ওইটুকু বাচ্চার আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। হাত বাড়িয়ে ওকে ডাকি। ও আমার কাছে আসে না। দৌড়ে শিহাবের কাছ যায়। হাসতে হাসতে বলি, তুমি তো বেশ ওর মামা হয়ে গেলে।

হিংসা হচ্ছে?

হ্যাঁ, একটু তো হচ্ছেই।

শরবানু আমার দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি ওর প্রাণের খালা।

সবাই হাসতে হাসতে তালি বাজায়। তালি বাজায় টিপুও।

আমি হাসতে হাসতে বলি, ওর বয়স যখন পঞ্চাশ হবে তখন আমাদের বঙ্গোপসাগরের উচ্চতা এক থেকে দেড় ফুট বাড়বে। বোঝ, তখন আরো ঘনঘন সাইক্লোন হবে।

আমারও সালাম স্যারের কথা মনে হচ্ছে। তিনি আমাদের ক্লাসে বলেছিলেন, এখন থেকে গত সাতচল্লিশ বছরে অর্থাৎ ’৬০ থেকে ’০৭ পর্যন্ত, বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে পনেরো-ষোলো বার। সঙ্গে অবশ্য জলোচ্ছ্বাসও ছিল। ’০৭-এর পরে ’১০ সালের মধ্যে সিডর, আইলা ইত্যাদি আঘাত হেনেছে পাঁচবার। এখন বঙ্গোপসাগর অল্পেই অশান্ত হয়ে যায়।

উৎপাত বেশি সহ্য করেছে, আর পারছে না। এখন রাগ বাড়ছে সাগরের। আর সেই রাগ গায়ে নিচ্ছে সাগর উপকূলের মানুষেরা।

বেশ বলেছিস। একেই বলে জলবায়ু পরিবর্তন। বিশ্বজুড়ে উষ্ণতা বাড়ছে। অঘটন ঘটাচ্ছে ধনী দেশগুলো। আর দায় সামলাচ্ছি আমরা। আচ্ছা ওরা কি কখনো কার্বন নিঃসরণ ঘটানো বন্ধ করবে।

আমি বলি, কচু করবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি না ওরা। ওদের কোনো দায় পড়েনি গরিব দেশকে সুস্থ রাখার। দরকার হলে দু-চার বস্তা গম দিয়ে বলবে, অনেক করেছি। এই নিয়ে চুপ করে থাকো। ছোট মুখে বড় কথা মানায় না। চলো উঠি।

আমি শরবানুকে হাত ধরে টেনে ওঠাই।

ছেলেরা খাটিয়া ওঠায়।

শিহাবের ঘাড়ের ওপর টিপু ওঠে।

আমরা হাঁটতে শুরু করি। আমাদের আর বেশি দূরে যেতে হবে না। সামনে একটি স্কুলে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আমরা সেখানে যাব। আমি বুঝতে পারি শরবানুর পায়ের গতি বেড়েছে। সে ভালোই হাঁটতে পারছে।

আমরা ক্যাম্পে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড় ঠেলে ছুটে আসে একজন বৃদ্ধ। শরবানুকে জড়িয়ে ধরে বলে, মা তুই বেঁচে আছিস।

বাজান, বাজান গো -। কাঁদতে থাকে দুজনে। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে দুজনে স্থির হলে শরবানুর বাবা আমাদের দিকে তাকিয়ে বলে, ও মরে গেছে মনে করে ওকে আমি বাঁশের চাটাইয়ে মুড়ে নৌকায় উঠিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম নদীতে। ছেলেটাকেও সঙ্গে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, মায়ের শেষবেলায় ও কাছে থাকুক। আল্লাহ মাবুদ – তোমার কাছে হাজার শোকর রহমানুর রাহিম।

আমি শরবানুকে এক জায়গায় বসতে দিই। পানি খেতে দিই। একটি কলা দিলে খুশি হয়ে কলা খায়। তারপর বলে, আমার বাজানরে একটু দেখেন। বাজানের নাম মোতালেব। আমার টিপু কই?

শিহাবের কাছে আছে। ওর জন্য আপনার ভাবতে হবে না। এখন তো আর হারাবার ভয় নেই।

সরল হাসি ফুটে ওঠে শরবানুর চেহারায়। তার হাসি আমাকে মুগ্ধ করে। এই বেলা সেন্টারে দাঁড়িয়েও সরল হাসি লেগে আছে শরবানুর চেহারায়। ও প্রতিবাদ জানাতে এসেছে। ক্ষতিপূরণ চাইতে এসেছে। কে দেবে? কার দায় আছে দেয়ার? আমি নিজেই ফুঃ বলে নিজের ভাবনা উড়িয়ে দিই। আমাকে এই সম্মেলন কভার করার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওদের কথা আমাদের শুনতে হবে। আমি বিপন্ন বোধ করি। ক্লাসে স্যার বলতেন, বিশ্বের বড় দেশগুলোর কাছে ছোট দেশের মানুষের কোনো অন্যায় নেই। কিন্তু তাদের অন্যায়ের দায় গরিব দেশের মানুষের ওপর বর্তায়। যারা কার্বন নিঃসরণে সম্পদের সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে তাদের কাছে সাধারণ মানুষের জীবন মূল্যহীন।

সেদিন আমি উঠে দাঁড়িয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার জীবন কী? মূল্যহীন কাকে বলে? বিশ্বে এই শব্দ দুটোর ব্যাখ্যা কত পার্সেন্ট লোক পায়?

স্যার আমার দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলেছিলেন, বসো। কঠিন প্রশ্ন করেছ। আমি চাই এই প্রশ্নের উত্তর তুমি জীবনভর খুঁজে বের করবে।

আমার তো কাজের জীবন শুরু হয়েছে। এখন আমার উত্তর খোঁজার পালা। আমি কঠিন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাব না। আমার উত্তর খোঁজা সাধ্যের অতীত। আমি যত ব্যাখ্যাই দাঁড় করাই না কেন সে-ব্যাখ্যার যুক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করবে না। আমি আমার সাংবাদিকতার জীবনে কেবলই জীবন ও মূল্যহীন শব্দের দায় টেনে যাব। এই মুহূর্তে কোপেনহেগেনের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আমি নিজের কাছে নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করি।

বেলা সেন্টারের কোনায় দাঁড়িয়ে মেশিন থেকে একটি পানির বোতল বের করার জন্য মেশিনের সামনে কিউতে দাঁড়াই। আমার সামনে তিনজন আছে। দুজন বিদেশি, একজন ইন্ডিয়ান। ওর নাম প্রান্তিকা। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। বাঙালি। কলকাতা থেকে এসেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে বলে, হ্যালো।

আমিও বলি, হ্যালো, ভালো আছ তো?

হ্যাঁ, দারুণ আছি। আজ আমাদের প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করবেন। তোমাদের শরবানু চমৎকার বলেছে। ওকে একটুও নার্ভাস দেখায়নি।

সাহসী না হলে এত দুর্বোগ মোকাবেলা করতে পারে। ওদের বেঁচে থাকার লড়াইটা আমাদের চেয়ে অন্যকরম। ওরা যা বোঝে, আমরা তা বুঝি না।

ইউ আর রাইট। জলের বোতল নিয়ে চলো বেরিয়ে পড়ি। আশপাশ থেকে ঘুরে আসি।

সমুদ্রের ধারে যাব ভেবেছি। লিটল মারমেইড ভাস্কর্য দেখব।

গুড। আমিও ভেবেছি ওটা দেখতে যাব। ফেরার পথে রেলস্টেশনে যাব। ওটা বেশ বড় জায়গা। ওখানে গিয়ে লাঞ্চ করব।

তুমি দেখছি অনেক কিছু ভেবে রেখেছ।

আগে ভাবিনি। তোমাকে দেখে মনে হলো।

তাহলে চলো বের হই।

দুজনে বাইরে আসি। ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকি। বেশ লাগছে হাঁটতে। ঠিক করি যতটুকু পারি হেঁটে তারপরে আমরা সাগরপাড়ে যাব। সাগরের কথা মনে হতেই প্রান্তিকাকে বলি, আমাদের বঙ্গোপসাগর আছে। পশ্চিমবঙ্গের পাশে তো সাগর নেই।

প্রান্তিকা হাত উল্টে স্রাগ করে বলে, নেই।

আমাদের সুন্দরবন আছে প্রান্তিকা।

ওহ, সুন্দরবন ওটা আমাদের দুঃখ।

দুঃখ, কেন?

সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ সুন্দরবনের খুব অল্প এলাকা পেয়েছে। বড় অংশ পেয়েছিল সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান।

লাফিয়ে উঠি আমি। বলি, কী আনন্দ, বলতেই পারি অনায়াসে সে-সুন্দরবন আমাদের।

হ্যাঁ, তোমাদেরই শারমিন। সুন্দরবনের জন্য এবার তোমরা আইলার হাত থেকে অনেক বেঁচে গেছ। নইলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতো।

আমি ট্রাউজারের পকেট থেকে চকোলেট বের করে প্রান্তিকাকে দিয়ে বলি, খাও।

ও মৃদু হেসে নেয়। চকোলেটের কাগজটা ছিঁড়ে মুখে পোরার আগে বলে, প্রেমে পড়েছ শারমিন।

পছন্দমতো এখনো কাউকে খুঁজে পাইনি। তুমি?

আমি পেয়েছিলাম। নানা কারণে সম্পর্ক ছুটে গেছে। নতুন করে আর ভাবিনি। ও সুইডেনে থাকে। মাঝে মাঝে মেইল করে। লেখে, আমার জন্য অপেক্ষা করো। একদিন না একদিন তোমার কাছেই ফিরব।

এটুকু বলে চকোলেটটা মুখে পোরে প্রান্তিকা। আবারো মৃদু হেসে বলে, আমি কোপেনহেগেনে এসেছি জেনে কাল মেইল দিয়েছে। লিখেছে, খুব কাছে আছ জানি। কিন্তু দেখতে যাব না। তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে মরিচঝাঁপিতে, যেখানে আমার জন্ম। আমি উদ্বাস্ত্ত মা-বাবার সন্তান।

মরিচঝাঁপি কোথায়? আমিও প্রান্তিকার সঙ্গে সঙ্গে বিষণ্ণ হয়ে যাই। প্রান্তিকা আমার প্রশ্নের উত্তর দেয় না। দাঁতের নিচে চকোলেট ভাঙে। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। আমি বুঝতে পারি ও নিজের সঙ্গে লড়াই করছে। বেদনা ও আনন্দের মিশ্রণে ও আমার সামনে এক বিমূর্ত মেয়ে। আমি আড়চোখে ওর দিকে তাকাই। অনেক আশা নিয়ে চুপ করে থাকি এই ভেবে যে, চকোলেট খেয়ে শেষ করে ও আমাকে ওর গল্পের আর একটু বলবে। বেশ কিছুক্ষণ পরে প্রান্তিকা আমার দিকে তাকায়। বুঝতেই পারি ওর চোখের বিষণ্ণতা গাঢ় হয়েছে। মৃদুস্বরে বলে, চলো ওই পার্কে বসি। আজ আর লিটল মারমেইড দেখতে যাব না। ওর ডান হাত দিয়ে আমার বাঁ হাত চেপে ধরে। পার্কের কাঠের বেঞ্চের ওপর আমরা পাশাপাশি বসি। ও বলে, তুমি জানতে চেয়েছিলে মরিচঝাঁপি কোথায়? মরিচঝাঁপি সুন্দরবন এলাকায়। দেশভাগের সময় ওটা পশ্চিমবঙ্গের অংশে পড়েছে।

আমি চুপ করে থাকি।

দেশভাগের সময় সুমিতের বাবা-মা ইছামতী নদী পার হয়ে এপারে এসেছিল। উদ্বাস্ত্ত হয়ে। নদীর ওপারে পড়েছিল ওদের বাড়িঘর। সুমিতের তখন জন্ম হয়নি। ওর জন্ম হয়েছে আরো কয়েক বছর পরে। বাবা-মায়ের মরিচঝাঁপিতে বেশিদিন থাকতে হয়নি। হাড়ভাঙা খাটুনি করে বেঁচে থাকার দিন ছিল ওর বাবা-মায়ের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নদীর ওপারে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর মা অসুস্থ হয়ে যায়। পাগলের মতো শুধু বলতো, এ কেমন স্বাধীনতা? ভিটে-পোতা ছাড়তে হলো। স্বদেশ ফেলে আসতে হলো। হাড়ভাঙা খাটুনিতেও খাবার ঠিকমতো জোটে না।

একটুক্ষণ থেমে প্রান্তিকা বলল, আর ইউ ফিলিং ব্যাড শারমিন? এসব কথা শুনতে খারাপ লাগছে?

আমি ওর হাত চেপে ধরে বলি, নট অ্যাট অল প্রান্তিকা। বরং মনে হচ্ছে আমার সুন্দরবন নিয়ে তোমার সঙ্গে আমার হৃদয়ের যোগ তৈরি হচ্ছে। আমার শুনতে খুব ভালো লাগছে। তুমি বাংলাদেশে এলে আমরা দুজনে সুন্দরবনে ঘুরতে যাব।

প্রান্তিকা কোনো কথা না বলে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। আমি ওর দৃষ্টির ভাষা বুঝতে পারি না। ও বিড়বিড় করে বলে, দেশভাগ থেকে তোমাদের স্বাধীনতা। ইতিহাসের বড় চেঞ্জ। তোমরা লাকি।

আমি নিজেকে চেপে রাখতে না পেরে বলি, সুমিতের সঙ্গে তোমার ছাড়াছাড়ি হলো কেন?

পুরো ছাড়াছাড়ি নয়। যোগাযোগ রাখে। ওর মধ্যে এক ধরনের ক্ষ্যাপামি আছে। ওর বাবা-মা রিফিউজি হয়েছিল সেজন্য নিজেকেও রিফিউজি ভাবে। মনে করে ওর কোনো দেশ নেই। সেজন্য ও কিছু টাকাপয়সা সঞ্চয় করে মরিচঝাঁপিতে এসে পরিবেশ বিষয়ে কাজ করবে। এখনো ফেরার জন্য রেডি না।

তুমি কী করবে?

আমি ওর জন্য অপেক্ষা করব শারমিন। আই লাভ হিম। তবে শেষ পর্যন্ত ও না ফিরলে আমি আর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেব না।

আমি ওর দুহাত চেপে ধরে চোখ উজ্জ্বল করে ওর দিকে তাকাই। ও মৃদু হাসে। বলে, মরিচঝাঁপি সুন্দরবনের উত্তর-পশ্চিম দিকের একটি ছোট্ট দ্বীপ। ওর কিছু অংশে চাষবাস হয়, কিছু অংশ নদী-নালার জলে ভরে থাকে। শুকনো জায়গার পরিমাণ ছিল খুব কম। খুপরি বানিয়ে মানুষেরা বাস করত।

তুমি গিয়েছ কখনো?

সাংবাদিকতার সূত্রে দুবার গিয়েছিলাম। সুমিতের সঙ্গে প্রেম হওয়ার পরও গিয়েছিলাম। কয়েকবার। মরিচঝাঁপি নিয়ে ও খুব অবসেসড। এর কোনো ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাই না। ওর পাগলামি আমি মেনে নিয়েছি।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে এসে তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো প্রান্তিকা। বন্ধুত্ব অটুট থাকবে আমি মনে করি।

সিওর। আমিও বন্ধুত্ব রাখব। তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে বন্ধুত্ব রাখা খুব কঠিন কাজ না। চলো ফিরি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুনব।

লাঞ্চ খাবে না?

একটা বার্গার হলেই চলবে আমার। তোমার?

নো প্রবলেম, আমারও তাই।

দুজনে আবার ফিরে আসি বেলা সেন্টারে। দেখতে পাই প্রথম সেশন ভেঙেছে। লবিতে লোকজনের ভিড়। প্রান্তিকা কোনদিকে যেন চলে যায়, টের পাই না। আমি একটা বার্গার কিনে খেতে খেতে ভানুয়াতু থেকে আসা মার্টিনের সঙ্গে কথা বলি। মার্টিন মধ্যবয়সী। মাথার চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে। মজা করে কথা বলে। যখনই দেখা হয় বলে, এসব সম্মেলন হলো মিসইউজ অব মানি। কিছুই হবে না। যে-টাকা খরচ হচ্ছে তা দরিদ্র দেশের ডেভেলপমেন্টের জন্য ব্যয় করা উচিত।

আজো আমার সামনে দাঁড়িয়ে স্রাগ করে বলে, বার্গার খাচ্ছ?

খাচ্ছি। তুমিও তো বার্গার খাচ্ছ, দেখছি।

খাবই তো। ইমপেরিয়ালিস্ট ফুড। খেতেই হয়।

বাট ইউ হেট ইমপেরিয়ালিজম।

ইয়েস, আই হেট। তারপরও কম্প্রোমাইজ করে বেঁচে থাকা। বলতে বলতে আর একজনের দিকে তাকিয়ে ও হাই করে এবং সেদিকে হেঁটে যায়।

আমি বার্গার শেষ করি। ওয়াশরুমে যাই। চারদিকে তাকিয়ে শরবানুকে দেখার চেষ্টা করি। না পেয়ে অডিটোরিয়ামের ভেতরে ঢুকি। একদম পেছনের সিটে বসে রিলাক্স মুডে থাকার চেষ্টা করি। অল্পক্ষণে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। একসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা শুরু করেন, এক্সেলেনসিস, ইচ ওয়ান অব আস গ্যাদারড হিয়ার টুডে একনলেজেস দ্যাট দোজ ওর্স্ট এফেকটেড বাই ক্লাইমেট চেঞ্জ আর দ্য লিস্ট রেসপনসিবল ফর ইট। হোয়াটএভার এমারজেস ফ্রম আওয়ার নিগোসিয়েশনস মাস্ট অ্যাড্রেস দিজ গ্লেয়ারিং ইনজাস্টিস, ইনজাস্টিস টু কান্ট্রিস অব আফ্রিকা, ইনজাস্টিস টু দ্য লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিস, অ্যান্ড ইনজাস্টিস টু দ্য স্মল ডেভেলপিং স্টেটস দোজ ভেরি সারভাইভাল অ্যাজ ভায়াবল নেশন স্টেটস ইজ ইন জিওপার্ডি। উই, ইন ইন্ডিয়া, টু, আর ভালনারেবল, বাট নেভারথলেস অ্যাজ রেসপনসিবল সিটিজেনস অব দ্য গ্লোব, উই হ্যাভ অ্যাগ্রিড টু টেক অন আ ভলান্টারি টার্গেট অব রিডিউসিং দ্য এমিসন ইনটেনসিটি অব আওয়ার জিডিপি গ্রোথ বাই অ্যারাউন্ড ২০% বাই ২০২০ ইন কমপ্যারিসন টু ২০০৫। উই উইল ডেলিভার অন দিজ গোল রিগার্ডলেস অব দ্য আউটকাম অব দিজ কনফারেন্স। উই ক্যান ডু ইভেন মোর ইফ আ সাপোর্টিভ গ্লোবাল ক্লাইমেট রেজিম ইজ পুট ইন প্লেস।

এক্সেলেনসিজস, উই হ্যাভ আ ডিফিকাল্ট টাস্ক অ্যাহেড অব আস, আই হোপ উই উইল অল প্লে আ পজিটিভ অ্যান্ড কনস্ট্রাকটিভ রোল সো দ্যাট উই ক্যান ব্রিজ ডিফারেনসেস অ্যান্ড কাম আপ উইথ আ ব্যালান্সড অ্যান্ড অলসো অ্যান ইকুইটেবল আউটকাম ডিউরিং দ্য কামিং ইয়ার। ইন্ডিয়া উইল নট বি ফাউন্ড ওয়ান্টিং ইন দিজ রিগার্ড।

এটুকু নোট করে আমি থামি। ভাবি, বিশ্বের সব দেশের নেতারা একই ভঙ্গিতে বক্তৃতা করছেন। বাক্য, শব্দ, থিম কাছাকাছি। বেলা সেন্টার থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরই সব মাথা থেকে নেমে যাবে। যার যার দেশে ফিরে গিয়ে তারা স্থিত হবেন। আর আমার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকবে কঠিন ওপিনিয়ন – ক্লাইমেট চেঞ্জের ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালনারেবল কান্ট্রি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার ফলে সাগরের মেজাজ বদলাচ্ছে, সাগরের তলদেশের উচ্চতা বাড়ছে, নোনা পানিতে ভরে যাচ্ছে শস্যক্ষেত্র, আইলায় নষ্ট হচ্ছে চিংড়ি ঘের… এমন আরো কত কী, কত কী।

সেশন শেষ হলে বাইরে আসি। দেশে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। সেই প্রস্ত্ততি নিয়ে হোটেলে ফিরে আসি। ল্যাপটপ নিয়ে বসি। মাথার ভেতর সুন্দরবন কাজ করে। শরবানুর কথা মনে হয়। ও এই হোটেলে আছে। ভাবলাম, পরে কথা বলব। আইলা ঘূর্ণিঝড় ওর ভিটে ধুয়ে সাফ করে ফেলেছে। এসব চিন্তা সুন্দরবনের পাশাপাশি আসে। কিন্তু গুগল সার্চ করে সুন্দরবন পেয়ে গেলে আমার মনোযোগ সুন্দরবনে স্থির হয়ে যায়। ভাটির দেশ সুন্দরবন আমার সামনে যাবতীয় শব্দরাজি নিয়ে উঠে আসে। আমি বিভিন্ন প্রসঙ্গ পড়তে থাকি। ভৌগোলিক পরিচয়, বন গড়ে ওঠার ইতিহাস, নদ-নদীর বিবরণ, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি নানাকিছু পড়তে পড়তে আমার ঘুম পায়। আমি ল্যাপটপ খোলা রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ি টের পাই না। স্বপ্নের মধ্যে নোনাজল আর মিঠেজলের সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরবনের মাথা আমার হাত ছুঁয়ে থাকে। প্রতিদিন জোয়ার ভাসিয়ে নেয় বন। জলের নিচে চলে যায় ঝোপঝাড়সহ নানা গুল্ম। ভাটার সময় নেমে যায় জলরাশি। তখন জেগে ওঠে বনের সবুজ সৌন্দর্য। পড়তে থাকি কীভাবে জলের তীব্র টানে বদলে যায় ছোট ছোট দ্বীপের আকার। আবার কখনো নতুন চর জেগে ওঠে। আবার নিশ্চিহ্ন হয় কোনো ছোট দ্বীপ। একসময় মনে হয়, কেন এসব ভাবছি। আসলে এসব ভাবনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে শরবানু। এখন পর্যন্ত শরবানুর পুরো জীবন। তার প্রস্ত্ততি দেখা, জলোচ্ছ্বাসে ভিটেহীন হয়ে যাওয়া, নোনা পানিতে দাঁড়িয়ে চিংড়ির পোনা ধরতে ধরতে ঊরু পর্যন্ত ক্ষত হওয়া – আরো কত কি, আরো কত কী!

স্বপ্নের ঘোরে শুনতে পাই শত শত মৌমাছির গুঞ্জন। ভেসে আসে খসরুভাইয়ের কণ্ঠস্বর। বলছেন, ভেবো না, এরা খুব সাধারণ মৌমাছি। বাংলাদেশে একটি শব্দ আমরা ব্যবহার করি। শব্দটি হলো চাড়াল। বেশি রাগী মানুষের রাগ দেখলে আমরা গালি দিয়ে বলি চন্ডাল একটা। এই মৌমাছিগুলো সেইরকম চন্ডাল। সুন্দরবনেও বসন্তকাল ফুল ফোটার সময়। হরেকরকমের ফুল ফোটে। এই ফুলের মধুর টানে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে উড়ে আসে কোটি কোটি মৌমাছি। এই এলাকায় এদের নাম হলো সূর্যমুখী। আগুনে মাছিও বলা হয়। এরা হলো আকারে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মৌমাছি। ইংরেজিতে এই মৌমাছির নাম হলো রক-বি।

আমরা একদল তরুণ তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে বলি, আপনি দারুণ লোক খসরুভাই। আপনি এতকিছু জানেন।

খসরুভাই হাসতে হাসতে বলতেন, সুন্দরবন আমার প্রেমিকা। বছরে দুচারবার এখানে না এলে আমার স্বস্তি নাই। তাছাড়া একটি বনভূমিকে চিনতে হলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হয়।

আমরা একদল ছেলেমেয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলাম, আপনার দেখার চোখ খুবই নিখুঁত।

মৌয়ালরা কীভাবে মধু সংগ্রহ করে এরপর তোমাদেরকে সে-গল্প বলব।

হুররে, জয়তু খসরুভাই।

স্বপ্নের ধাক্কায় ঘুম ছুটে যায়। ধড়মড় করে উঠে বসি। দেশে সম্মেলনের রিপোর্ট পাঠানো হয়নি। বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে পানি দিতে দিতে মনে হয় শরবানুর স্বামী মৌয়াল ছিল। মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের হাতে নিহত হয়। আমি শুধু এটুকুই জানি। পুরো ঘটনা শোনা হয়নি। তোয়ালেতে মুখ চেপে রেখে ভাবি, কত নিষ্ঠুর জীবনযাপন। কত কঠিন বেঁচে থাকা। কত প্রান্তিক এইসব নারী। কে এদের এই নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচাবে? জলবায়ু সম্মেলনে এসে এরা নিজের পক্ষে কিছুই করতে পারবে না বলেই আমার মনে হয়। যতই এখানে উচ্চারিত হোক না কেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালনারেবল। প্রান্তিকা বলে, সুন্দরবনের কাছাকাছি সদ্য জেগে ওঠা জমিতে যেসব গাছ জন্মায় সেসব গাছ ইকোলজিক্যাল ব্যালান্সে বেশি কাজে আসে না। এর জন্য সময়ের অপেক্ষা করতে হয়। বেশ দীর্ঘ সময়। জমি যখন আস্তে আস্তে দানা বাঁধে, শক্ত হয় তখন অন্য গাছগুলো গজাতে শুরু করে। প্রকৃতির কঠিন প্রক্রিয়া, বুঝলে। তবে আমার দুঃখ এই যে, মরিচঝাঁপি বাঘের জন্য সংরক্ষিত ভূমির মধ্যে পড়ে না। রয়েল বেঙ্গল টাইগার না থাকলে কি সুন্দরবনের সঙ্গে আদিখ্যেতা করা চলে। তারপর হা-হা করে হাসে প্রান্তিকা। আমি ওর প্রেমিকের কথা ভাবি। এই মুহূর্তে সুমিতের কথা ভেবে আমার মনে হয়, এও নিষ্ঠুর জীবনযাপন। শরবানুর জীবনের নিষ্ঠুরতার চেয়ে কম নয়। যতই সুইডেনে থাকুক, অনেক লেখাপড়া জানুক, পরিবেশ নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন থাকুক, উদ্বাস্ত্ত জীবনের তাচ্ছিল্যে মুচড়ে যায় অনেককিছু। এই বেঁচে থাকা তেমন নয় যে, জোয়ার-ভাটার টানে অল্পসময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছ। রাতারাতি একটি ঘন বন তৈরি করার সাধ্য রাখে – দ্বীপ হয়ে যায় জঙ্গল। মানুষ সেই জঙ্গলে বেঁচে থাকার সাধ্য মেটায়। আমি প্রান্তিকাকে বলি, হায় প্রান্তিকা, তুমি নিজেও এই উদ্বাস্ত্ত জীবনের দহনে পড়েছ। এখন ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছের মতো বেড়ে ওঠো আকাশের দিকে। দেখো, সেই গাছের মাথায় নিশ্চুপ বসে আছে সুমিতের মতো সোনালি ঈগল।

প্রান্তিকাকে আপাতত মাথা থেকে নামিয়ে অফিস রিপোর্ট পাঠানোর কাজ শেষ করি। সুন্দরবনও আমার মাথা থেকে নেমে যায়। সম্মেলনে এসেছেন আমার দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিও জোরালো ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলো তাঁর বক্তৃতার প্রশংসা করেছে। আমি তাঁর বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে রিপোর্ট করেছি। বেলা সেন্টারে আমার দেশ বেশ পজিটিভ অবস্থানে আছে। পাপুয়া নিউগিনির সাংবাদিক ফারজুন আমাকে বলেছিল, একদিন তোমাদের দেশ হয়তো বঙ্গোপসাগরের নিচে তলিয়ে যাবে।

আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম, ক্ষতি নেই। আবার আমাদের নতুন জীবন শুরু হবে। আকাশে চাঁদ থাকবে। পূর্ণিমা-অমাবস্যা হবে। জোয়ার-ভাটা হবে। আর ভাটার সময় গজাবে গাছ। গড়ে উঠবে জঙ্গল। জেগে উঠবে দ্বীপ। বসতি হবে মানুষের। আমরা তো পরাজিত হবার জন্য এই পৃথিবীতে আসিনি ফারজুন। ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি থামতেই ভুরু প্রসারিত করে হাসতে হাসতে বলে, তুমি তো ভীষণ ভাবুক মেয়ে দেখছি।

আমিও হাসতে হাসতে বলি, তখন কিন্তু তুমি আমার দেশে বেড়াতে আসবে।

শুধু বেড়াতে? তোমার সঙ্গে প্রেম করার জন্য নয়?

আমি কিছু বলার আগেই ও আমাকে বাই বলে, চলে যায়। আমার বুকের ভেতর জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন ভেসে ওঠে – ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়, হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে।’

ল্যাপটপ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে বিষণ্ণ হয়ে যাই। লাইট অফ করলে ঘর অন্ধকার হয়। রাস্তার বাতি আলো-অাঁধারি তৈরি করে আমার ঘরে। বিছানায় শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির কথা মনে হয়। মা-বাবা-ছোট দুই ভাই নিয়ে আমাদের সংসার। আমার বিয়ে নিয়ে মা খুব চিন্তিত। প্রসঙ্গ উঠলেই আক্ষেপ করে বলবেন, সাতাশ বছর হলো, এখনো বিয়ে দিতে পারলাম না মেয়েটার।

আমি সঙ্গে সঙ্গে বলি, মাগো তোমরা বিয়ে দিতে পারোনি, তা ঠিক নয়। আমিও করিনি। আমি এখনই বিয়ের মধ্যে ঢুকতে চাই না।

আমি জানি আমার কথা শুনে মা মন খারাপ করে। এই বয়সই বিয়ে এবং সন্তান ধারণের শেষ সময়। এখন না হলে আর কবে কী হবে ভেবে মা ব্যাকুল হয়ে যান।

মনে মনে বলি, মা ভালো থাক। খুব শিগগির পৌঁছে যাব তোমার কাছে। আর দুদিন থাকব কোপেনহেগেন। তারপর উড়াল দেবো ঢাকার পথে। আমার প্রিয় স্বদেশ।

সকালে দশটার মধ্যে পৌঁছে যাই বেলা সেন্টারে। দেখতে পাই নারী-পুরুষ জমতে শুরু করেছে। আজ এখানে বিক্ষোভ প্রদর্শন হবে। ভেতরে ঢুকতেই দেখা হয় সাউথ আফ্রিকার সাংবাদিক উইবির সঙ্গে। উইবি খুব চটপটে মেয়ে। ভীষণ শার্পও। ব্ল্যাক বলে একধরনের অহঙ্কার আছে ওর। আমাকে দেখে হাত নেড়ে বলে, হাই। আমিও হাই বলে কাছাকাছি দাঁড়াই। ও বলে, বিক্ষোভে যাবে?

যাব। আমি ওর হাত ঝাঁকিয়ে বলি, আমরা তো ওদের সঙ্গে দাঁড়াতে পারি?

অফকোর্স, হোয়াই নট। চলো এখনই যাই।

চলো। যেতে যেতে বলি, ওদের প্ল্যাকার্ডগুলো চমৎকার।

হ্যাঁ, আমারও খুব পছন্দ।

দুজনে সেন্টারের বাইরে এলে ইউবিকে বলি, চলো স্লোগান দেই।

ও চেঁচিয়ে বলে, আমাদের কোনো প্ল্যানেট বি নেই। পৃথিবী একটাই।

ইয়েস, পৃথিবী একটাই। আমি ওর সঙ্গে গলা মেলাই। তারপর আবার বলি, এই একটি পৃথিবীতে সবাইকে থাকতে হবে। হাসতে হাসতে বলি, জাতিসংঘের মহাসচিবকে এখানে এনে দাঁড় করালে কী হয়?

ইউবি আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলে, কিছুই নয়। শোনো তোমাকে একটি খেলার কথা বলি যার নাম গরিব-গরিব খেলা।

মানে? কী বলছ?

উইবি আমার হাতে চাপ দিয়ে বলে, এমনই হয়। এখানে যারা জড়ো হয়েছে তারা ধনী-গরিব খেলা খেলছে। এর দ্বারা তোমাদের শরবানুদের জীবনের কোনো কিছু এসে-যাবে না। একটি উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশের নারী হয়ে ইউরোপের একটি দেশে বেড়িয়ে যেতে পেরেছে এতেই ওর জীবন ধন্য। বুঝলে?

এই নির্মম সত্য আমিও জানি উইবি।

তোমাকে দক্ষিণ আফ্রিকার গরিব-গরিব খেলার গল্প বলি এখন। দারিদ্র্য উপভোগের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকজন ধনী দরিদ্র মানুষদের ঘরের মতো ঘর বানিয়েছে দেশটির ইমোইয়া রাজ্যের এক জায়গায়। বিলাসবহুল জায়গা সেটি। বিলাসী জীবনের উপকরণ সব রেখে বস্তির মতো বাড়ি বানানো হয়েছে। তাঁরা জানতে চান, এত ক্ষুদ্র পরিসরে মানুষ কীভাবে দিন কাটায়। গরিব হলে কী ধরনের অনুভব মনে আসে। তবে এর একটা অন্যদিকও আছে।

কী তা? রিসোর্ট হিসেবে ট্যুরিস্টদের টেনে আনা?

এক্সাক্টলি, তাই। অনেক ট্যুরিস্ট মনে করে টাকা খরচ করে দারিদ্রে্যর অভিজ্ঞতা নেওয়া খারাপ কী। এটাও জীবনের পজিটিভ দিক।

হা-হা করে হাসে উইবি। হাসতে হাসতে বলে, আমি ওদের সঙ্গে একমত নই। এগুলো মর্মান্তিক ফান। মানুষকে অপমান করা। তার মানবাধিকার লঙ্ঘন করা।

আমিও তোমার সঙ্গে একমত। যে-খেলায় মানুষ অপমানিত হয় সেটাকে খেলা বলা যায় না উইবি।

আমরা অন্য কোনো শব্দ খুঁজে পাইনি বলে এই শব্দ ব্যবহার করেছি। পরে অন্য একটি শব্দ খুঁজে বের করব। চলো সামনে এগোই। আমাদের হাতে প্ল্যাকার্ড থাকলে বেশ হতো।

আমি ওর হাত ঝাঁকিয়ে বলি, আমরা দুজনে দুজনের হাত উঁচু করে রাখব। তুমি আফ্রিকা, আমি এশিয়া। আমাদের একটাই পৃথিবী।

আমরা দুজনে হাত ধরে দৌড়াই। জাতিসংঘ-আয়োজিত এই জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে আমরা আসতে পেরেছি। জানতে পারছি অনেককিছু। সামান্য একটু জ্ঞান নিয়ে ফিরে যাব নিজ নিজ দেশে।

দুপুরে আমি বেলা সেন্টারে ফিরে আসি। উইবি ভিড়ের মধ্যে কোনদিকে ছিটকে পড়েছে খেয়াল করতে পারি না। ভেতরে ঢুকতেই দেখা হয় শরবানুর সঙ্গে। আমাকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসে। বলে, কেমন আছেন?

ভালো। আপনি?

আমিও ভালো আছি। দেশের জন্য পরান পুড়ছে। গতরাতে ছেলেটাকে স্বপ্ন দেখেছি।

ওর খালা ওকে মায়ের যত্নে রাখবে। আর মামা তো মামার বাড়ির যত্ন দিয়ে বলবে, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।

শরীফ হাসতে হাসতে বলে, দেখছি, আপনি শুধু একজন সাংবাদিক না, বড় একজন সাইক্রিয়াটিস্টও।

টিজ করছেন?

মোটেই না, প্রেইজ করছি।

ও আচ্ছা, ভালোই তো। আপনি যেভাবেই আমার কথা নেন না কেন, আমি মনে করি আমি যা বলেছি এই মুহূর্তে তাই বলা দরকার ছিল।

ঠিক। আপনার কথা শুনে আমার মন ভালো হয়ে গেছে। স্বস্তি পাচ্ছি। শরীফ ভাই আমার ছেলের জন্য চকোলেট, জামা-প্যান্ট কিনে দিয়েছে। ওগুলো পরলে আমার ছেলেকে রাজপুত্তুরের মতো দেখাবে।

দেশে ফিরলে আমি যাব রাজপুত্র টিপুকে দেখতে।

আপনি এখান থেকে কবে যাবেন?

আরো দুদিন পরে। এখানে আমার চাচাতো বোন থাকে। কাল ওর বাড়িতে যাব।

আমাদের গাবুরায় আসবেন কিন্তু। আমাদের গাবুরা সুন্দরবনের মেয়ে। আপনাকে মধুর চাক দেখাব। চিংড়ির পোনা ধরা দেখাব। আসবেন তো?

আসব, অবশ্যই আসব।

শরীফ ফোঁড়ন কাটে, ভালোই একটা কুটুমবাড়ি পেলেন। আদর-যত্নের অভাব হবে না। সঙ্গে দেখবেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

আপনি দেখছি আমার পেছনে লেগে আছেন।

মোটেই না। এটাকে বলতে পারেন নির্ভেজাল ডায়ালগ।

ঠিক আছে নির্ভেজাল না ভেজাল সেটা পরে বুঝবো। ঢাকা শহরে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে।

আমার অফিস কিন্তু শ্যামনগর উপজেলায়। ঢাকায় খুব কম আসি।

ঠিক আছে গাবুরায় গেলে আপনার অফিসে ঢুঁ মেরে আসব। চা খাওয়াবেন তো?

শরীফ মৃদু হেসে বলে, শুধু চা, সঙ্গে টাও থাকবে। তারপরে দুজনে একসঙ্গে সুন্দরবনে যাব।

রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখতে?

ধরেন তাই। যাবেন তো?

বেশি অ্যামবিশাস হওয়া ঠিক না। যাই।

শরবানু এতক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। আমি যাই বলতেই আমার হাত চেপে ধরে। ছলোছলো চোখে বলে, এখানে আসাটা তো আমার জীবনে হয়েছে। ভাগ্যে ছিল হয়েছে। আমার জীবন গাবুরার মাটি। গাবুরার বেশিরভাগ মানুষ মৌয়াল। ওখানে একটা গ্রামের নাম বিধবা পল্লী। স্বামীদের বাঘে খেয়েছে।

শরবানু চোখে অাঁচল চাপা দেয়। বেলা সেন্টারে দাঁড়িয়ে আমার কাছে পৃথিবী ছোট্ট হয়ে আসে। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম, ঠিক কোথায় তা মনে করতে পারছি না, এক বিদেশির লেখা – তিনি বলেছিলেন, মাত্র আধ সের মধুর জন্য ক্ষুদ্র মৌমাছির পরিশ্রমের শেষ নেই। হিসাব করে তা বলা যাবে না। ওইটুকু মধুর জন্য মৌমাছি যে-পথ পাড়ি দেয় তা পুরো পৃথিবীর চারদিকে দুবার ঘুরে আসার সমান। আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি, একজন শরবানু বেঁচে থাকার জন্য কয় হাজার বার পৃথিবীর চারদিক ঘোরার দূরত্ব অতিক্রম করে? শরবানু আবার আমাকে বলে, আপা আপনি কিন্তু আমাকে ভুলে যাবেন না।

আমি উত্তর দেওয়ার আগেই শরীফ বলে, আমার বস সুজানা বলেছেন, দেশে ফিরে যাবার পরে তিনি আপনাকে একটি মোবাইল কিনে দেবেন।  আপনি শারমিনকে ফোন করবেন। না, না, আপনি করবেন না। শারমিন আপনাকে ফোন করবেন। দিনে অন্তত পাঁচবার। কি রাজি?

শরীফ আমার দিকে তাকায়। আমি বুঝতে পারি ওর মাথা একটি ভীমরুলের বাসা। ভীমরুলের হুল খেয়ে মাথা কুটকুট করে।

কী চুপ করে আছেন যে? কিছু বলবেন না।

না কিছু বলব না। কারণ আপনার নির্ভেজাল ডায়ালগ ম্যানেজ করা আমার জন্য কঠিন।

বাহবা, ক্ষেপেছেন দেখছি।

অনেকক্ষণ আগে বলেছিলাম, যাই। এখন সত্যি সত্যি গেলাম। অনেক বন্ধু হয়েছে। সবাইকে গুডবাই বলতে হবে। শরবানুর দিকে তাকিয়ে বলি, বানু আপা গেলাম। গাবুরায় দেখা হবে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

আমি বেলা সেন্টারের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াই। বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলি। যেটুকু পরিচয় সেটুকুই বিদায় করার পালা। কিন্তু সবকিছুই কেমন এলোমেলো লাগে আমার কাছে। বুঝতে পারি, প্রত্যাশা যা ছিল তার সঙ্গে পাওয়ার কোনো যোগই হলো না। বড় দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণের দায় গ্রহণের প্রশ্নে ধনী ও উন্নয়নশীল দেশকে সমঝোতায় আনতে পারেনি জাতিসংঘের সমঝোতাকারীরা। অনেক পাড়ি এখনো বাকি বলে আমার মনে হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের একজন ক্ষুদে মানুষ আমি। প্রত্যাশা নিয়ে ঘুরেছি। ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত গ্রামের নারীর বক্তব্য শুনেছি। এখন তার মুখটি বিশাল হয়ে আটকে আছে আমার সামনে। যেদিকে তাকাই সেদিকেই যেন শরবানু আমার চোখের সামনে দেয়ালজুড়ে আটকে থাকে। একসময় আমি বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কারণ বিশ্ব রাজনীতির ঘোলাজলে ডুবতে থাকে আমার ভবিষ্যৎ।

 

দুই

 

শরবানু এখন গাবুরায়।

খুশির উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়ে বিদেশের গল্প করার কথা ছিল শরবানুর, কিন্তু দেশে ফিরে আসার পরে তেমন কোনো অনুভব তাকে আচ্ছন্ন করল না। উলটো চুপচাপ হয়ে গেল। আইলা ঘূর্ণিঝড়ে ভেসে যাওয়া শূন্য ভিটায় এখনো ঘর ওঠেনি। বাবার বাড়িতে আর কতদিনই বা থাকবে। যারা ওকে বিদেশে নিয়ে গিয়েছিল তারা বলেছিল, ঘর উঠিয়ে দেবে। কাজ এখনো শুরু হয়নি। কবে হবে তার কোনো খবর ওর কাছে নেই। ও শুধু আশায় আশায় দিন গুনছে। শূন্য ভিটার ওপর দাঁড়িয়ে অসীম শূন্যে তাকালে জীবনভর বঞ্চনা আর দুঃখ তোলপাড় করে। যেন একটা প্রবল আইলা ঝড় জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।

বিদেশ থেকে ঘুরে আসার পরও ওর মন ভালো নেই। উলটো চুপচাপ হয়ে গেল। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়, নইলে কথা বলে না। বিদেশের এত জাঁকজমক, এত ধনসম্পদ দেখে নিজের জন্য ভীষণ মায়া হয়েছিল। বেলা সেন্টারে বসে কতবারই তো কতজনকে প্রশ্ন করেছিল, আমাদের দেশের মানুষ এত গরিব কেন?

দেশটাই তো গরিব খালা। মানুষের দোষ কী?

দেশটা গরিব কেন?

হা-হা করে হেসেছিল ওর পাশে গোল হয়ে থাকা দেশের মানুষেরা। কেউ একজন বলেছিল, এই প্রশ্নের উত্তর অনেক কঠিন।

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য বড় বড় পন্ডিত লাগবে। খালা আপনাকে আমরা উত্তর দিতে পারব না। আপনিও বুঝবেন না।

থাকা বোঝার দরকার নাই। কপালে যা আছে তা হয়েছে। এই নিয়েই বাঁচতে হবে। কী আর করব আমরা। আল্লাহ আমাদের কপালে দেয়নি।

ঠিক বলেছেন, নসিব আপনা-আপনা।

আবার হাসি। শরবানু ভাবে, দেশে বসে মানুষগুলো কি এমন হাসি হাসতে পারে। কে জানে!

গভীর দীর্ঘশ্বাসে আইলা-বিধ্বস্ত শূন্য প্রান্তর হা-হা করে। শরবানু বাড়ি ফেরার তাগাদা অনুভব করে। ঘরে তিন মেয়ে এক ছেলে আছে। মেয়েদের নাম খুব শখ করে রেখেছিল ওদের বাবা। বড় মেয়ের নাম ফুলানি, মেজো মেয়ে মৌতুলি, ছোট মেয়ে হিমালি। ওর স্বামী বলতো, মেয়েদেরকে আমি মৌয়ালি বানাবো। ওরা বড় হলে বনে নিয়ে যাব। মধুর চাক ভাঙার কাজ করব। ওদের নিয়ে দল বানাব আমি। লোকে বলবে, হাসমত আলী এটা কী করেছ? আমি বলব, আমার বাহিনী বানিয়েছি। ঠিক কাজ করেছি। মেয়েদের দিয়ে মধুর চাক না ভাঙালে সুন্দরবন আমার সঙ্গে রাগ করবে। বলবে, তুই বাঘের পেটে যাবি।

শরবানু তার কথায় সায় দিয়ে বলত, ঠিক বলেছ। তোমার বাহিনীতে আমাকে নিলে একজন বাড়বে। আর টিপু বড় হলে বাড়বে দুইজন।

তুমি গেলে ঘরদুয়ার সামলাবে কে ফুলানির মা?

তাই বলে আমি যাব না? ঘরদুয়ার আমি বোনের হাতে দিয়ে যাব। যে-কয়দিন থাকব না, সে-কয়দিন আমার বোন দেখবে। মজিদাও দেখতে পারবে। ভয়ের কিছু নাই।

কিন্তু শরবানুর জীবনে সেইদিন আসেনি। বাঘের পেটে যেতে হয়েছে হাসমত আলীকে। শরবানু দুহাতে মুখ ঢাকে। তারপর ঝড়ের তান্ডবে উপড়ে যাওয়া বাড়িঘরের শেষ চিহ্ন ছিল একটি ভাঙা খুঁটি। সেটার গায়ে পিঠ ঠেকায় ও। এই খুঁটির গায়ে জড়িয়ে ছিল হিমালির চুলের লাল ফিতা। তিন মেয়ে তিন দিকে ভেসে গিয়েছিল। শরবানুকে মৃত ভেবে ভাসিয়ে দেয়ার পরে বিভিন্নজনের কাছ থেকে খুঁজে পেয়েছিল তিন মেয়েকে শরবানুর বাবা সাইদুল মিয়া। গাবুরা ইউনিয়নের তিন গ্রাম থেকে তিনজনকে উদ্ধার করে উদ্ধারকর্মীরা তার বাবার হাতে তুলে দিয়েছিল। ভাঙা খুঁটি আর লাল ফিতা এখনো টিকে আছে শূন্য ভিটার নির্মাণ নিয়ে। ফিতাটা শুকিয়ে গেছে। হিমালি বলেছে, ভিটেতে নতুন ঘর উঠলে ফিতাসহ খুঁটিটা মাচানে উঠিয়ে রাখবে। ফুলানি ও মৌতুলি ওর সঙ্গে সায় দিয়েছে।

ফুলানি বলেছে, প্রতি বছর ঝড়ের এই দিনে আমরা খুঁটির গায়ে একটা কালো ফিতা বেঁধে দেব।

মৌতুলি সবচেয়ে খুশি হয় এই কথা শুনে। দুটো তালি বাজিয়ে বলে, একদিন খুঁটিটা ফিতায় ভরে যাবে। তোমাদের বিয়ে হলে ফিতা আমি বাঁধব। শেষ মাথা পর্যন্ত বাঁধা হয়ে গেলে আমি আবার শুরু থেকে বাঁধতে আরম্ভ করব। বেশ লাগবে দেখবে। ওটা শেষে ফিতার খুঁটি হবে।

টিপু ফোঁড়ন কেটে বলে, আমি যদি একটি করে ফিতা খুলে ফেলি?

মার খাবি টিপু।

টিপু হি-হি করে হাসতে হাসতে বলে, একদিন দেখবে একটাও নাই।

তোর কি মনে হয় না যে, মা আর তোকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই দিনটা মনে রাখা দরকার?

আমরা তো মরে গিয়েছিলাম – ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয় ও। ফোঁস ফোঁস করে কান্নার ঢেউ তোলে। তিন বোন হাততালি দিয়ে বলে, কেমন মজা। আর বলবি এমন কথা?

ও দ্রুতবেগে মাথা নেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, না – না, এ্যাঁ – এ্যাঁ –

তখন শরবানু ওকে রান্নাঘরে নিয়ে বসিয়ে রেখেছিল। আমড়া কেটে লবণ মাখিয়ে দিয়ে বলেছিল, খা। আর কাঁদতে হবে না।

ও দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল, ওদেরকে দিবা না। রান্নাঘরে ঢুকতে দিবা না। ভাতও দিবা না।

তিন বোন ওর কথা শুনতে পায়নি। শরবানু জানে, ভাত দেবে না, এ-কথা ওদের বলা যাবে না। ওরা চিংড়ির পোনা ধরে। বিক্রি করে টাকা পায়। ফুলানির বয়স এগারো। মৌতুলির বয়স নয়। হিমালি আট বছরের মেয়ে। উপার্জন করতে শিখেছে। ওদেরকে ভাত দেবে না, এটা বলার সাধ্যি কি শরবানুর আছে। নিজেই নিজেকে বলে, নাই। মেয়েদের উপার্জনের উপর অধিকার খাটানো উচিত নয়। এমন অনেক কিছুই তো শেখা হয়েছে তার। সঙ্গে সঙ্গেই টিপু আমড়া নিয়ে দৌড়ে যায় বোনদের কাছে। গিয়ে বলে, একটা আমড়া আমরা সবাই খাব। বড় বুবু আগে খাও।

ফুলানি ওর হাত থেকে আমড়া নিয়ে এক কামড় খেয়ে টিপুকে দেয়। টিপু নিজে এক কামড় খেয়ে মৌতুলিকে দেয়। মৌতুলির কাছ থেকে ওটা আবার টিপুর কাছে যায়। টিপু হিমালিকে দিলে ও বলে, আর কেউ পাবে না। আমি খেয়ে শেষ করব।

টিপু হাসিমুখে বলে, খাও, খাও। তারপর আমরা খেলতে যাব। নদীর ধারে যাব। তোমরা যে চিংড়ি মাছ ধরা খেলো আমিও সেই খেলা শিখব।

হিমালি আমড়ার টুকরা চাবিয়ে বলে, চিংড়ি পোনা ধরতে শিখলে তুই আর ছোট থাকবি না, একলাফে বড় হয়ে যাবি।

টিপু চোখ বড় করে বলে, এক লাফে বড় হব? কত বড়? আমাদের বাবার সমান?

ঠিক বলেছিস। একদম বাবার সমান হয়ে যাবি।

বাবার সমান হলে আমাকে যদি বাঘে খায়?

খেতেও পারে। বাঘ তো আমাদের গাঁয়েও চলে আসে।

ওরে বাবা রে, আমি বাঘের পেটে যাব না।

ও একছুটে রান্নাঘরে মায়ের কাছে যায়। তিন বোনও রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়।

ফুলানি বলে, তোমার কি রান্না করা শেষ মা?

হ্যাঁ রে হয়েছে। শাকভাজি আর ডাল করেছি।

ভালোই হয়েছে। এর বেশি আর কি –

হিমালি বলে, গাঁয়ের ডাক্তার আপা বলেছে, শুধু এটুকু খেলে হয় না। পুষ্টিকর খাবার লাগে। ডিম – দুধ –

চুপ কর। মাকে কষ্ট দিস না। মা যে এইটুকু জোগাড় করে তাই কত না। আমাদের তো বাবা নাই।

মৌতুলি বলে, আমাদের ভাগ্যই খারাপ।

মা গো, আমাদেরকে বাবার বাঘের পেটে যাওয়ার গল্প বলেন। টিপুও শুনবে। টিপু শুনলে আর ভয় পাবে না। কাঁদবেও না।

তোরা পিঁড়ি নিয়ে বস মায়েরা। আমার কথার মাঝে তোরা কথা বলবি না। গল্পটা আমার বুকের ভেতর থেকে আসবে। কলিজা ফুটো করে বের হবে। শ্বাসনালী টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। আর মাথার মগজ খেয়ে চিবোবে।

এটুকু বলে শরবানু গুনগুন করে কাঁদে। একসময় দুহাতে চোখ মুছে বলে, বসন্তকাল ছিল মৌচাকের মধু ভাঙার সময়। এই সময় সুন্দরবনে লাখখানেক মৌচাক হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে শুধু চাক আর চাক। তোদের বাজান এই সময় মধু জোড়া করতে বনে ঢুকত। বাকি সময় অন্য কাজ করত। ভালোই আয়-উপার্জন করত। দিন আমাদের খারাপ কাটেনি।

কাঁকড়া ধরার কাজটা তোদের বাজানের খুব পছন্দের ছিল। বিয়ের পরপর আমিও তার সঙ্গে কাঁকড়া ধরার কাজে যেতাম। খলুই হাতে তার পেছনে পেছনে থাকতাম। কাঁকড়া উঠলে নিজে ধরে খলুইয়ে ভরতাম। আর গুনগুন করে বলতাম, নদীর মাসি বনের পিসি কাঁকড়া ভরে দাও – হাতের খলুই হাটে যাবে চাল ভরে দাও। আমার গুনগুন শুনে তোদের বাজান খুশি হয়ে যেত। বলত, তোমার সুর সুন্দরবনের বাতাসের মতো। প্রাণ শীতল করে দেয়।

হি-হি করে হাসে মেয়েরা। শরবানু ওদের দিকে তাকায় না। তখন তার বুকের আকাশজুড়ে পূর্ণ চন্দ্রের জোয়ার-ভাটা। আলোর জোয়ার-ভাটা দেখা যায় না, কিন্তু অনুভবকে গাঢ় করে রাখে। বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে তাদের মা গল্প বলছে। টিপু মায়ের হাত চেপে ধরে বলে, তুমি চোখ খুলে রাখ মা। আমার ভয় করছে।

শরবানু চোখ খোলে না। যেন ছেলের কথা শুনতে পায়নি। অথবা শুনতে পেয়েছে, কিন্তু চোখ খুলবে না। তাহলে চারটি কচিমুখ দেখতে হবে, যে-মুখের দিকে তাকিয়ে বাঘের গল্প বলবে না শরবানু। তখন শোনা যায় শরবানুর কণ্ঠস্বর, ফুলানির জন্মের পর থেকে আমি কাঁকড়া বেচে চাল কেনার আগে মেয়েটার জন্য দুধ কিনেছি। তারপরে চাল-ডাল কিনেছি। মাছ কেনা হয়নি। রোজ রোজ মাছ খাওয়া চলবে না। শরবানু ভেবে দেখল এক একটি বাচ্চা হয়েছে আর সংসারের অভাব বেড়েছে। অন্যদিকে খাল-বিলের অবস্থা খারাপ হয়েছে – ভরাট হয়েছে কিংবা পানি শুকিয়েছে। যত দিন গড়িয়েছে কাঁকড়া পাওয়া কমেছে। ভরসা ছিল সুন্দরবনের বসন্তকাল। মৌচাক আর মধু। এভাবেও দিন চলতো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলল না।

তিন মেয়ে একসঙ্গে বলে, মাগো গল্পটা বলেন। আমাদের বাবার বাঘের পেটে যাওয়ার গল্প।

টিপু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, আমিও গল্প শুনব।

শরবানুর চমক ভাঙে। আস্তে করে বলে, এটা তো গল্প না।

তাহলে এটা কী?

তোমাদের বাবা হারানোর ঘটনা।

আমাদের কাছে গল্পই। বাঘ আর মানুষের গল্প। আপনি বলেন।

টিপু লাফাতে লাফাতে বলে, হ্যাঁ, বলেন বলেন।

চার ছেলেমেয়ে আগ্রহে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শরবানু ফুলানিকে দেখে প্রথমে। শ্যামলা গায়ের রং। বড় বড় চোখের দৃষ্টি জ্বলজ্বল করে। মাথায় চুলের গোছা ঝাঁকড়া হয়ে থাকে। বেণি করলে মোটা বেণি হয়। স্কুলে যায়। পড়াশোনায় খারাপ না। টিচাররা প্রশংসা করে। ফকফকে দাঁতের হাসিতে ওকে বেশ সুন্দর লাগে। শরবানুর মনে হয়, মেয়েটি ভাগ্যবতী হবে। ওর দৃষ্টি মৌতুলির মুখে যায়। ওর সঙ্গে ওর দাদির চেহারার আদল আছে। মোটা ভুরু চোখের ওপর বিছিয়ে আছে। ছোট চোখ ছেলেমানুষি দুষ্টুমিতে ভরা। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। হাতের নখগুলো বেশ লম্বা। চেহারায় মায়াবী টান নেই। সাদামাটা ভাব ওকে দমিয়ে রাখে। শরবানু হিমালির দিকে তাকায়। তিন বোনের মধ্যে ও সবচেয়ে কালো। কিন্তু চেহারার মায়াবী টান রঙের বর্ণ ম্লান করে দেয়। শরবানু ভাবে, ও বনে ঢুকলে বাঘ ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে ফিরে যাবে। বলবে, ওকে আমার ভালোবাসা দিলাম। ওকে দিয়ে খিদে মেটাব না। তবে ওর জন্য প্রবল মায়া হয় শরবানুর। ক্লাসের সব পরীক্ষায় ও পাশ করতে পারে না। তাহলে ভবিষ্যতে কি ও মায়ের মতো কাঠ খুঁজে বিক্রি করা নারী হবে? নাকি লোকের বাড়িতে কাজ খুঁজতে যাবে? কী হবে তিন মেয়ের ভবিষ্যৎ? শরবানুর চোখে পানি আসে। শরবানু শাড়ির অাঁচল দিয়ে চোখ মোছে।

ফুলানি মায়ের হাত ধরে বলে, গল্পটা বলতে আপনার কষ্টে হবে মা?

মৌতুলি মায়ের হাত থেকে অাঁচল টেনে নিয়ে বলে, গল্পটা শুনতে শুনতে আমরা মাকে নতুন করে দেখতে পাব।

হিমালি লাফিয়ে ওঠে, ঠিক। আমাদের মা তখন অন্য মা হয়ে যাবে। আপনি কি আমাদের নতুন মা?

শরবানু মৃদু হেসে বলে, তোমাদের যদি মনে হয় নতুন মা, তাহলে তাই। নতুন হতে আমার ভালোই লাগবে। তোমরাও আমার নতুন মেয়ে হবে?

হ্যাঁ, হবো। তিনজনে চেঁচিয়ে বলে, আমরা নতুন মেয়ে হবো। আমাদের নতুন দিন হবে। সুন্দরবন নতুন হবে। সূর্যও।

টিপু বিরক্ত হয়ে বলে, ধুত্, এসব কী কথা হচ্ছে। গল্প শুনব, গল্প।

শরবানু বেড়ায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বোজে।

ফুলানি টিপুকে ধমক দিয়ে বলে, থাম তুই। এগুলোও গল্প।

গল্পটা শুরু করে শরবানু, সেদিন ছিল শুক্রবার। হাসমত আলী আর আসমত আলী কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিল। দুভাই প্রায়ই একসঙ্গে কাঁকড়া ধরতে যেত। তারা বলতো, তাদের শত্রু হলো তিন – বনদস্যু, বাঘ আর কুমির। তিনটার যে-কোনো একটাই খেয়ে ফেলে। বনদস্যু সরাসরি খায় না, কিন্তু তাদের নির্যাতন প্রতিদিনের। চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিয়ে ফতুর হয়ে যেতে হয়, নইলে মেরে ফেলে।

ওইদিন দুই ভাই দাতিনাখালী খালের মধ্যে কাঁকড়া শিকারের জন্য দোন ফেলে। সকাল আটটা হবে। সূর্য উঠেছে। কিন্তু বনের অাঁধার কাটেনি। হাসমত আলী খালের ধার ঘেঁষে নৌকায় দাঁড়িয়ে কাঁকড়ার দোন ওঠানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। আসমত আলী হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে জংলা পরিষ্কার করছিল। এমন সময় একটি বাঘ বন থেকে বের হয়েই হাসমত আলীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ডান পাঁজর আর কাঁধের পেছনের অংশ কামড়ে ধরে টানাহিঁচড়া করে বনের ভেতরে নিয়ে যেতে থাকে। হাসমত আলীর সাহসও কম ছিল না। বাঘ কামড়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে হাতে নৌকার বৈঠা তুলে নিয়ে মুখের ওপর পেটাতে থাকে। বেশিক্ষণ পারে না। বাঘের কামড়ে নেতিয়ে আসে শরীর। তারপরও দম হারায় না। অন্যদিকে আসমত আলী বাঁশ দিয়ে মারতে থাকে বাঘটিকে। শুরু হয়ে যায় বাঘে-মানুষে লড়াই। শক্তিশালী হিংস্র বাঘের থাবার নখর তখন হাসমত আলীকে কাহিল করে ফেলেছে। কিন্তু আসমত ছাড়ার পাত্র না। সমানে বাঁশ দিয়ে পেটাতে থাকে বাঘটিকে। পিটুনিতে বাঘ হাসমত আলীকে ছেড়ে পালিয়ে যায় বনের দিকে। আর ফিরে আসে না। ভাইকে নৌকায় তুলে বাড়িতে নিয়ে আসে ছোট ভাই। কিন্তু ভাইকে বাঁচাতে পারে না। ডাক্তার-ওষুধ করার পরও পচন ধরে হাসমত আলীর শরীরে।

একদিন গভীর রাতে শরবানুর হাত জড়িয়ে ধরে বলে, ছেলেমেয়েদের তুমি দেখো। বসন্তকালে মধু কাটার কাজ করো। সংসার একভাবে চলবেই।

শরবানুর খুবই ইচ্ছা ছিল স্বামীকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরার। কিন্তু শরীরের ঘায়ের কারণে কিছুই করতে পারেনি। সে-বছর খুব শীত পড়েছিল। শীতে জমে থাকত রাতদিন। কুয়াশার জন্য সূর্যের আলোও তেমনভাবে গায়ে লাগানো যেত না। এই প্রবল শীতের দিনে মাঘ মাসের এক দুপুরবেলা হাসমত আলী মরে যায়। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করার দশ দিন পরে।

বেড়ার গায়ে মাথা হেলিয়ে রাখা শরবানুর চোখ বন্ধ। বন্ধ চোখ থেকে পানি গড়ায়। তিন মেয়ে এক ছেলে অপলক তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। একজন জিজ্ঞেস করে, গল্পটা কি শেষ হয়েছে মা?

শরবানু কথা বলে না। টিপু মায়ের হাত ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে, আমি একদিন একটা বাঘ মারব। ঠিকই মারব। বাবার মৃত্যুর শোধ নেব।

তিন মেয়ে একসঙ্গে বলে, আমরাও শোধ নেব। বাঘকে ছাড়ব না।

তারপরও শরবানু চোখ খোলে না। বাঘের নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি মানুষের নিষ্ঠুরতা তাকে মর্মাহত করে রাখে। ছেলেমেয়েদের সে-গল্প বলা যায় না। শ্বশুরবাড়ি ছাড়তে হলো শরবানুকে। শাশুড়ি আঙুল তুলে চোখ গরম করে বলল, স্বামীখেকো ডাইনি একটা। তোমার চেহারা আমি দেখতে চাইনে। তোমার আর কী? আমি তো আমার ছেলে হারালাম। আমি তোমার বোঝা টানতে পারব না। তোমার বাপকে খবর দিব। চলে যাও বাপের বাড়ি।

ছেলেমেয়েদের বুকে জড়িয়ে কেঁদেছে। ভাসুরের বউ, ননদরা ভাত দিয়েছে, সেসব খেয়ে মাস তিনেক কাটিয়েছে শ্বশুরবাড়ি। তারপর একদিন বাবার হাত ধরে চকবারা গ্রাম থেকে ফিরে এসেছে গাবুরা গ্রামে। তারপর থেকে শুরু হয়েছে স্বামীহীন সংসারের লড়াই।

শরবানু নিজেকে বলে, বাঁচাই তো জীবন। তবে সবসময় বাঁচাটা নিজের জন্য হয় না। পরের সংসারে ঘানি টানলে সেটা নিজের বাঁচা হয় না। স্বামী-সংসার নিয়ে সুখে থাকলে নিজের বাঁচা হয়। এখন ওর বাঁচা আর নিজের জন্য নয়। ছেলেমেয়েদের জন্য বেঁচে আছে। তবে ওদের জন্য বেঁচে থাকতে ওর ভালোই লাগছে। সঙ্গে আছে হাসমত আলীর স্মৃতি। মানুষটা ভালোই ছিল। শাশুড়ি যখন ওর সঙ্গে রাগারাগি করেছে তখন রাতের অন্ধকারে গভীর সোহাগে ভরিয়ে দিয়ে বলেছে, তুই আমার মাকে মাফ করে দিস বউ। মনে দুঃখ রাখিস না।

হাসমত আলীর এমন আবেগের পরে শরবানু ভেবেছে, এই বেঁচে থাকা আমার নিজের, নিজেরই। ভালোবাসার মানুষ যদি খুদকুড়া দিয়ে শূন্য জায়গাটা পূরণ করে দেয় তখন দুঃখ রাখার জায়গা থাকে না। এখন তো কেউ নেই যে বলবে, বউ দুঃখ করিস না। মধু কাটতে গিয়ে বন থেকে ঠিকই ফিরে আসব। বাঘের পেটে যাব না তোর জন্য। তোর টানে আমার ঘরে ফেরাই হবে।

শরবানু ভেবে দেখল, বাঘের কামড় খেয়ে ঘরে ফেরা ঠিকই হয়েছিল হাসমত আলীর, কিন্তু বেঁচে থাকা হয়নি। শরীর যত খারাপ হচ্ছিল ততই বলছিল, তোর জন্য আমি মরতে চাই না। আমি মরে গেলে লোকে তোকে বিধবা বলবে বউ। তোকে আমি বিধবা হতে দিতে চাই না। আমি চাই তুই আমার আগে মরে যাবি বউ। যখন তোর আর আমার বয়স আশি বছর হবে তখন।

শরবানু হাসতে হাসতে বলেছিল, আমি অত দিন বাঁচতে চাই না। বুড়ি থুত্থুরি হয়ে যাব।

সেদিন হা-হা করে হেসেছিল হাসমত আলী। বলেছিল, আমি বুড়ো থুত্থুর হব না। তুইও হবি না।

হায়রে জীবন। জীবন বাঘের পিঠে যায়। কুমিরের পেটে যায়। নোনা পানির নিচে তলায়। বাঁধ ভেঙে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে সাগরের স্রোত। ঝড়ে উড়ে যায় ঘরবাড়ি। তারপরও লড়াই থামে না। সামনে ধু-ধু চর। ফসল নাই, ঝাউবন নাই, পানি নাই, ভাত নাই। হাসমত আলী চায়নি যে তার বউকে লোকে বিধবা বলুক। এখন শুধু বিধবা বলে না। বলে, বাঘবিধবা। মাঝে মাঝে বয়সী নারী-পুরুষের কেউ তাকে বলে, উ-হ-ই বাঘবিধবা শরবানু –

ডাকটা ওর কানে পৌঁছালে বুঝতে পারে না যে রসিকতা করল, নাকি মায়া দেখাল। প্রথম দিকে খারাপ লাগলেও এখন ও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ভাবে, এখন ওর বেঁচে থাকা তো ওর নিজের জন্য না। কে কীভাবে ডাকল তাতে কী আসে যায়।

ফুলানি হাত বাড়িয়ে মায়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে মায়ের গালে চুমু দেয়। বলে, মাগো আমরা আর আপনার কাছে গল্প শুনতে চাব না।

টিপু লাফিয়ে কোলে বসে বলে, আমরা বাঘ-হরিণের গল্প শুনব। আর না হলে প্যাঁচা আর কাকের গল্প শুনব।

মৌতুলি আর হিমালি বলে, আমরা মৌমাছির গল্প শুনব। মা মৌমাছির অনেক গল্প জানে।

শরবানুর বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস আসে। মুখে ওদেরকে বলে, তোমরা খেলতে যাও।

আর অন্তরে নিজেকে বলে বেঁচে থাকা তো ওদের জন্য। নিজের জন্য এখন আর ওর কোনো সঞ্চয় নাই। হাসমত আলীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয় শেষ। হাত একদম খালি হয়ে গেছে। নিজের জন্য এখন আর ওর কোনো সঞ্চয় করতে হবে না। এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে শরবানুর মনে হয় ও বেশ একটু স্বস্তি পাচ্ছে। নিজের জন্য ভাবতে না হলেও কষ্ট অনেক কমে যায়। শুধু ছেলেমেয়েদের ভাতের কষ্ট তার জন্য এক কঠিন যন্ত্রণা। রাতদিন পোড়ায় বুকের ভেতর।

সাতদিনের মাথায় শরীফ আসে ওর বাবার বাড়িতে। ওকে দেখে অাঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে যায় শরবানু। ভাবে, নিশ্চয় কোনো ভালো খবর আছে ওর জন্য, কিন্তু সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারে না। একমুখ হাসি নিয়ে তাকিয়ে বলে, শরীফভাই আপনি? ভালো আছেন তো?

আপনাকে দেখতে এসেছি শরবানু বুয়া।

গরিব মানুষের আর খোঁজখবর? আসেন, বসেন।

সাইদুল মিয়া শরীফের জন্য চেয়ার নিয়ে আসে। বলে, বসো বাবা। কতদিন পরে তোমাকে দেখলাম।

নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। নানা এলাকায় যেতে হয়। তাই সবসময় আপনাদের খোঁজ রাখতে পারি না। আপনি ভালো আছেন তো চাচা?

আর ভালো থাকা। মেয়েটা বাঘ-বিধবা হয়ে আমাদের জ্বালা বাড়িয়েছে। ওর কষ্টই তো এখন আমার কষ্ট।

বাজান, এসব কথা থাক।

তুমি ওর জন্য দুইটা পুলি পিঠা আন মা।

না, না আমি কিছু খাব না। শুধু একগ্লাস পানি দেন।

শরবানু চলে গেলে সাইদুল মিয়া জিজ্ঞেস করে, বাবা আপনেরা বলেছিলেন, ওর ঝুপড়িটা –

হ্যাঁ, চাচা ওই খবর নিয়েই তো এসেছি। এতদিনে আমাদের অফিসে শরবানু বুয়ার ঝুপড়ি তোলার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। সাতদিনের মধ্যে কাজটা শেষ হয়ে যাবে।

কামলা লাগবে না?

হ্যাঁ, লাগবে তো।

কামলার কাজটা আমাকে দিবেন বাবা। আর একজন বেশি লাগলে আমার ছেলে আসমত আছে। আমি তো ঘরের ছাউনি ভালো দিতে পারি। আপনি তো জানেন।

ঠিক আছে, চাচা। আপনারা দুজনেই ঝুপড়ি তোলার কাজটা করবেন।  নিজের কাজ নিজেরা করলে ভালোও হবে।

আমরা দরদ দিয়ে কাজ করব। ফাঁকি দেব না।

শরবানু এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। এক চুমুকে পানি খেয়ে গ্লাস ফেরত দেয় শরবানুর কাছে। সাইদুল মিয়া আবার জিজ্ঞেস করে, কবে থেকে কাজ শুরু করবেন?

পরশু দিন থেকে।

কিসের কাজ শুরু হবে? আমাকেও কাজে লাগাবেন।

আপনার ঝুপড়ি তোলার কাজ শুরু হবে শরবানু বুয়া।

ওহ, আল্লাহরে! এতবড় সুখবর নিয়ে আসছেন। আল্লাহ মাবুদ।

এখন মাত্র একটা ঘরে হবে।

ওই একটাতেই আমার চলবে। আমার বেশি চাওয়ার নাই। ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে কোনোমতে মাথা গোঁজা।

শারমিনের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ হয়?

গত মাসে একবার ফোন করেছিলেন। কেমন আছি জিজ্ঞাস করেছেন। বলেছেন, আগামী দুই-তিন মাসে সমুদ্রে ডলফিন দেখতে যাবেন। সুন্দরবনের এইদিকেও আসবেন। তবে আসার তারিখ ঠিক হয়নি।

ওহ, আচ্ছা।

আপনার সঙ্গে কথা হয় না?

মাঝে মাঝে হয়। তবে ডলফিন দেখার কথা বলেনি।

আমার ঘরের কথা ওনাকে জানাবেন। উনি খুব খুশি হবে।

হ্যাঁ, জানাবো। এদিকে আসতেও বলব। যাই বুয়া। ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।

শরবানু শরীফের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে পাকা সড়ক পর্যন্ত আসে। বলে, আপনারা আমার জন্য অনেক কিছু করলেন।

অফিস এটা নিজের জন্যও করেছে। বিশ্ববাসীকে দেখাতে হবে না যে, গরিব মানুষের পাশে আমরা দাঁড়াই।

দাঁড়ায় তো। এটা তো মিছা না। সত্যি কথা স্বীকার করুম না কেন?

নিশ্চয় করবেন। তবে যদি জানতেন ক্লাইমেট চেঞ্জ কেন হচ্ছে তাহলে –

আমি তো এতকিছু বুঝতে পারি না শরীফভাই। শারমিন আপা বোঝেন আপনি তাকে বলবেন।

শরীফ মৃদু হেসে বলে, আচ্ছা ঠিক আছে। যাই। আপনি আর আসবেন না।

শরীফ একটা রিকশা নেয়। যতক্ষণ রিকশাটা আড়াল হয় না ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে শরবানু। দাঁড়িয়েই থাকে শরবানু। কতক্ষণ থাকে নিজেই জানে না। নিজের বেঁচে থাকার খোঁজ রাখবে না বলে তো ও পণ করেছে। দাঁড়িয়ে দূরে তাকালে ভাবতে পারে যে, ওর সামনে বিপন্ন পৃথিবী। দেখা জায়গাগুলো বদলে যাচ্ছে। চেনা জায়গার রং ঝাপসা হচ্ছে। যেমন বদলে গেছে ওর জীবন। দেখতে পায় নুরুদ্দীন আসছে। মাথায় ঘাসের বোঝা। ওর অনেকগুলো গরু আছে। হাটে দুধ বিক্রি করে। মানুষটা সুবিধার না। সুযোগ পেলেই বাঁকা কথা বলে। ওকে দেখে সরে যেতে হবে এমন মনোভাব ওর ভেতরে কাজ করে না। ও রাস্তার ঢালুতে নেমে যায়।

নুরুদ্দীন কাছে এসে দাঁড়ায়। একগাল হেসে বলে, কী খোঁজ বাঘবিধবা?

শরবানু নির্বিকার উত্তর দেয়, থানকুনি পাতা।

থানকুনির ভর্তা বাটবা?

হ্যাঁ, পোলাপানকে এই দিয়ে ভাত দেব।

ও বেশ বেশ। এত বিদেশ-বিদেশ ঘুরে এলেন। ভাত দেওয়ার লোক নাই?

আপনি দেবেন?

তোমার তো সাধ বেশি বাঘবিধবা।

এই গাঁয়ে তো বাইশ জন বাঘবিধবা আছে। আপনি কয়জনকে এই নামে ডাকেন?

সবাইরে তো ডাকার দরকার নাই। শুধু তোমারে ডাকি।

আর একদিন ডাকলে আপনার থোতা মুখ ভোঁতা করে দেব।

কথা বলতে বলতে শরবানু একটা ইটের টুকরো হাতে নেয়। সেদিকে তাকিয়ে নুরুদ্দীন হাঁটতে শুরু করে। শরবানু ইটের টুকরো ছুড়তে ছাড়ে না। সেটা গিয়ে ঘাসের অাঁটিতে লাগে। ছোট টুকরোয় তেমন কিছু এসে-যায় না। নুরুদ্দীন সামলে নেয়। তারপর দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গালি দেয়। সে-গালি শরবানুর কাছ পর্যন্ত এসে পৌঁছায় না। ও দূর থেকে দেখতে পায় ওর চার ছেলেমেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। প্রত্যেকে মা-মা করে ডাকছে। সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে আসছে মৌতুলি। সবার পেছনে টিপু। ও দৌড়াচ্ছে এবং কাঁদছে। এমনই তো হবে। ও সবার ছোট, কিন্তু কেউ ওর দিকে তাকায় না। যার যার মতো দৌড়ে আসছে। শরবানু এই দৃশ্য ধরে ভাবল, বেঁচে থাকাটা এখন ওদের জন্য। নইলে নুরুদ্দীন অপমান করতে পারে? বাঘবিধবা ডাকতে পারে?

দৌড়ে এসে মৌতুলি জড়িয়ে ধরে ওকে। বলে, তোমারে না দেখলে খুব ভয় লাগে। মনে হয় যদি বাড়িতে বাঘ আসে? তাহলে তো এক লোকমা ভাতের মতো আমাকে খেয়ে ফেলবে। তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেও না মা।

ততক্ষণে ফুলানি আর হিমালি এসে দাঁড়ায়।

এখানে তুমি কী করছ মা?

থানকুনি পাতা খুঁজব।

থানকুনি পাতার ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে ভালো লাগে না। চল আমরা মাছ খুঁজি।

আজকে না মা। আজকে মাছ খোঁজার সময় নাই।

তখন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে টিপু আসে। বোনদের দিকে আঙুল তুলে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, ওরা আমাকে ফেলে আসছে সবাই। একদিন সবাই আমাকে মরা বলে ভাসিয়ে দিয়েছিল।

শরবানু ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ও কেঁদেকেটে হয়রান হয়ে যায়। মাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে সবাই। রাস্তার ঢালুতে কাঁকড়া খোঁজা যায় না। নামতে হবে খালে।

শরবানুর বুকের ভেতর দুপদাপ শব্দ। সামনে সুন্দরবন। ছেলেমেয়েদের এখানে রেখে কাঠ খুঁজতে যাবে কিনা একবার ভাবে, পরক্ষণে ভাবনা বদলায়। থাক। সুন্দরবনের গাছগুলোর মাথা ছুঁয়ে আকাশ দেখে ও। মজিদার স্বামীকে বাঘে খেয়েছে। কোনোরকমে বেঁচে গেছে। কিন্তু বাঁ পা-টা ঢুকেছে বাঘের পেটে। বেচারা এখন হাঁটতে পারে না। রাতদিন ঘরে বসে থাকে। মজিদাকে গালাগালি করে। অভাব ছাড়ে না সংসারের। মাঝে মাঝে মজিদা এসে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ওর বোঝা তো আর টানতে পারি না রে শরবানু। একদিন বিষ খাব। এই জীবন থাকা না থাকা সমান।

শরবানু ধমক দিয়ে বলে, খবরদার খারাপ কথা বলবি না। পরক্ষণে নিজেনে শাসন করে বলে, কী রে কী হলো তোর শরবানু। কী আর হবে, কেউ মরে যেতে চাইলে কি এসে যায় এই দুনিয়ার। একে তো কাঁধের বোঝা তার উপর গালাগালি – এত অনাচার কি সহ্য হয়। কতজনের সহ্যের কথা ভাবব আমি? আমি নিজে কি সহ্য করিনি?

ফুলানি মায়ের গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে, মাগো বাড়ি চলেন। খিদা লাগছে। আপনি তো থানকুনি পাতাও তুললেন না।

পাতা তো দেখি না রে মেয়েরা। তোরা কি দেখতে পেয়েছিস?

আমরা তো খুঁজিনি। আমরা ছাইপাতা খুঁজি না।

আমাদের পাগলি মা খোঁজে।

তিনজনে হি-হি করে হাসে। হাসতে হাসতে রাস্তার ঢালু গড়িয়ে দৌড়ে নামে। আবার উঠে আসে। টিপু বলে, আমি ছোট চাচার কাছে যাব।

তোর ছোট চাচা তো বাড়িতে নাই।

আমার ছোট চাচা কোথায়?

খুলনায় গেছে।

কাজ করতে? নাকি রিকশা চালাতে?

যেটা পাবে, সেটাই করবে।

আমার জন্য লাল গেঞ্জি আনবে?

হ্যাঁ, আনবে বলেছে।

আমার ছোট চাচা ঠিকই লাল গেঞ্জি আনবে। ছোট চাচা আমার বাবাকে বাঘের মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছিল – কত সাহসী, আমার ছোট চাচা বীর। বীরের মতো রিকশা চালায়।

কথা বলা শেষ করে টিপু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। শরবানুর মনে হয় কোনো কারণে ও ভয় পেয়েছে। ওর শরীর কাঁপছে থরথর করে। শরবানু ওকে গভীরভাবে জাপটে ধরে। দেখতে পায় তার তিন মেয়ে রাস্তার ঢালু থেকে নানারকম শাক কুড়িয়ে জামার কোচড়ে করে নিয়ে আসছে। তিন ক্ষুদে মেয়েকে বেশ দেখাচ্ছে। শরবানুর মন খুশিতে ভরে যায়।

তখন ফোন আসে শারমিনের।

কী করেন বানু আপা?

রাস্তার ধারে বসে আছি।

শরীফভাই আমাকে ফোন করে জানালো যে আপনার ঘর উঠিয়ে দেবে।

হ্যাঁ, আজকেই বলে গেলেন। তাকে বিদায় দেওয়ার জন্য যে পর্যন্ত এসেছিলাম, আমি সেখানেই বসে আছি।

বাড়িতে যান আপা।

বলেন বাবার বাড়িতে যান।

শারমিন হাসতে হাসতে বলে, ঠিক বলেছেন। ওটা তো বাবার বাড়ি। নিজের বাড়ি না।

নিজের বাড়ি সাগরে খেয়েছে। মানুষের চেয়ে সাগরের ক্ষুধা বেশি। আপনি কবে আসবেন আমাকে দেখতে?

গত কুড়ি বছরে কতজন মৌয়ালকে বাঘে খেয়েছে তার ওপর একটা রিপোর্ট করব। সেজন্য দু-তিনবার আসতে হবে আমাকে। আসার ডেট এখনো ঠিক করিনি। ডেট হলে আপনাকে জানাব।

আচ্ছা আসবেন। ততদিন আমার ঘর উঠবে আশা করি। আপনাকে শুকনো চিংড়ির ভর্তা খাওয়াব।

চিংড়ির শুঁটকির ভর্তা দিয়ে আমি তিন-চার প্লেট ভাত খাবো। মনে রাখবেন কিন্তু। আমি আপনার জন্য একটা লাল ডুরে শাড়ি কিনেছি বানু আপা। শিগগির দেখা হবে।

কেটে যায় ফোন।

ফোনটা কোমরে গুঁজে রাখে শরবানু। ফোনে লাল ডুরে শাড়ির কথা শুনে শরবানুর চোখ ভিজে যায়। হাসমত আলী বছরে দুটো শাড়ি দিত ওকে। কখনো শুধুই লাল রঙের শাড়ি কিনত। কখনো লালের সঙ্গে অন্য রং মেলানো শাড়ি কিনত। লাল রং তার খুব প্রিয় ছিল। বলত, বউ লাল রঙে তোমার চেহারা সকালের আকাশের মতো দেখায়। মানুষটা তাকে নানাভাবে সুখী রাখার চেষ্টা করেছিল। এখন ওর মনে হয় দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের কি এমন দেখার চোখ থাকে? নাকি এসব থাকা তার পোষায়? শরবানুর দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে যায়।

ঘোলাটে দৃষ্টি দিয়েই বাঘের কামড় খেয়ে ফিরে আসা মানুষটা সেদিন লাল হয়েছিল। ওর একবারও মনে হয়নি যে, মানুষটাকে সকালের আকাশের মতো দেখাচ্ছে। মনে হয়েছিল মানুষটা পুড়ে কাঠকয়লা হয়েছে। সে বাতাসের জন্য হাঁ করে আছে। বোজা চোখে সুন্দরবনের অন্ধকার। শরবানুর সামনে অন্ধকারই বেশি। তার দেখায় কালো রংই বিপন্ন সততা। ও এর বাইরে নিজেকে আনতে পারে না।

মা চলেন –

তিন মেয়ে তার হাত ধরে টানে।

মা অনেক শাক তুলেছি। দুপুরের হবে, রাতেও হবে।

টিপু হি-হি করে হেসে বলে, আমরা শুধু শাকভাজি খাব? তাহলে আমাদের মা শাকওয়ালি মা।

চার ভাইবোন একসঙ্গে হাসতে থাকে। হিমালি টিপুকে বলে, আমাদের বাবা তাহলে কি রে?

টিপু একমুহূর্ত চিন্তা করে ধুমধাম বলে ফেলে, আমাদের বাবা বাঘওয়ালা বাবা। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে। হা-হা-হা বাঘ-মানুষে যুদ্ধ। চার ভাইবোন একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলে, বাঘ-মানুষে যুদ্ধ – যুদ্ধ – যুদ্ধ –

ওরা মাকে পেছনে ফেলে দৌড়াতে থাকে। শরবানু ওদের পিছে পিছে হাঁটতে থাকে। কখনো দাঁড়ায়। চারদিকে তাকায়। ভাবে, আর কতকাল এভাবে বেঁচে থাকবে? সেই সুন্দরবন আছে, বাঘেরা আছে, মৌয়ালরা আছে – শুধু হাসমত আলী নাই। তার ছেলেমেয়েরা বলে, বাঘ-মানুষে যুদ্ধ – ওরা যুদ্ধ বলতে শিখেছে – এই যুদ্ধ এখন ওদের চারপাশে। শুধু বাঘের সঙ্গে নয় – চিংড়ি মাছের সঙ্গেও যুদ্ধ আছে, ধানক্ষেতের সঙ্গেও। শরবানু অবসন্ন বোধ করে। ভাবে, ওর চারপাশের গ্রামটা যদি বেলা সেন্টার হতো তাহলে ও চিৎকার করে বলত, বন্ধ করো যুদ্ধ। শান্তি দাও। কিন্তু এটা কোপেনহেগেন নয়, নিরন্ন গাবুরা গ্রাম মাত্র। এখানকার মানুষদের যুদ্ধ ছাড়া উপায় নাই।

দূর থেকে শুনতে পায় ছেলেমেয়েদের চিৎকার, মাগো তাড়াতাড়ি আসেন। এত আস্তে হাঁটেন কেন?

তাই তো এত ধীরে হাঁটবে কেন শরবানু? ওকে তো দ্রুত হাঁটতে হবে। চারপাশের যুদ্ধের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে ছেলেমেয়েগুলোকে বড় করবে কীভাবে? শরবানু দ্রুত হাঁটতে গিয়ে রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। ঘুরে ওঠে মাথা।

মা পড়ে গেছে, মা পড়ে গেছে –

ছুটে আসতে থাকে ছেলেমেয়েরা। ততক্ষণে মেঠো রাস্তায় উঠে বসে শরবানু। গায়ে-মাথায় ধুলো লেগেছে। বসে থেকে অাঁচল দিয়ে মুখ ঝাড়ে। হাত ঝাড়ে। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখতে পায় ইঁদুরের গর্ত। বুঝতে পারে ওই গর্তে পা আটকে পড়ে গেছে। ততক্ষণ ছেলেমেয়েরা কাছে এসে ঘিরে ধরেছে ওকে। হাত টেনে ধরে বলে, মাগো উঠেন। আপনি পড়লেন কেন? বাঘ তো নাই। কার সঙ্গে যুদ্ধ করলেন?

শরবানু কোনো দিকে না তাকিয়ে বলে, ইঁদুরের সঙ্গে।

ইঁদুর। ওরা প্রথমে বিস্মিত হয়, পরে হাসতে হাসতে হাততালি দেয়। ফুলানি ছড়া কেটে বলে, বাবার যুদ্ধ বাঘের সঙ্গে, মায়ের যুদ্ধ ইঁদুরের সঙ্গে।

মৌতুলি বলে, এখানে একটা মজা আছে। মা ইঁদুরকে ভয় পায় না। ইঁদুরের গর্তে পা পড়ে গেলে মা পড়ে যায়। ইঁদুর মাকে মেরে ফেলতে পারে না।

ফুলানি বলে, চল আমরা মায়ের হাত ধরে বাড়িতে ফিরব। মাকে ছেড়ে দেব না।

হিমালি কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলে, মাকে যদি ইঁদুরে খেয়ে ফেলে তো আমরা মা কোথায় পাব?

ধুর্, মাকে ইঁদুর খাবে কী করে?

একটা ইঁদুর খাবে না। হাজার হাজার ইঁদুর খাবে।

চুপ কর হিমালি। এসব কথা বলবি না। মাগো চলেন আমাদের সঙ্গে। ধরেন, আমাদের হাত ধরেন। শরবানু নিজের দুহাতের মুঠিতে চার ছেলেমেয়ের হাত ধরে।

ছেলেমেয়েরা গায় – ওরে … রে… রে… রে… মায়ের অাঁচল ধরে… বাড়ি যাই রে… রে –

শরবানু দুকান ভরে ওদের গান শোনে। ভালো লাগে শুনতে। বেঁচে থাকার ইচ্ছা বেড়ে যায়। ভাবে, শুধু ওদের জন্য নয়, আজকের এই দিনে নিজের জন্যও বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে। নিজেই নিজেকে মনে মনে বলে, শরবানু তুমি হাজার বছরের আয়ু নিয়ে বাঁচ। কারো সঙ্গে তোমার কোনো যুদ্ধ নাই।

থমকে দাঁড়ায় শরবানু। শারমিন তাকে বলেছিল, তার যুদ্ধ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে। বড় যুদ্ধ। এটা গাবুরা গ্রামের সীমানায় নেই। এই যুদ্ধ আসে বিত্তশালী দেশ থেকে। অনেক কিছু আপনাকে বুঝতে হবে বানু আপা। বেলা সেন্টারে দাঁড়িয়ে শুধু নিজের কথা বললেই হবে না। শরবানুর চলা থামে না। বড় করে শ্বাস ফেলে বলে, জলবায়ু পরিবর্তন।

 

তিন

আমি এখন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসে। আপাতত গত পাঁচ বছরে বাঘের কামড়ে কতজন মানুষ মারা গেছে তার ওপর প্রতিবেদন করতে এসেছি।

একজন অফিসার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নাম কী লিখব? কোন দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টার আপনি?

বললাম, আমার নাম শারমিন সুলতানা। এই যে আমার নেম কার্ড।

কয়দিন থাকবেন?

এখানে তিনদিন। গাবুরায় পাঁচদিন।

গাবুরায় কেউ আছে?

হ্যাঁ, শরবানু নাম। তাঁর স্বামীর বাঘের মুখে মৃত্যু হয়েছে।

ও আচ্ছা। আপনি আপাতত এই কাগজপত্র দেখুন। এতে যদি আপনার কাজ হয় তাহলে তো হলোই। না হলে আমাকে অন্য আরো ফাইল দেখতে হবে।

আমি মৃদু হেসে বলি, আপনি আমাকে অনেক কাগজ দিয়েছেন। আপাতত এগুলো দেখে যাই। পরে আবার আসব।

আমি ছোটঘরের ছোট পরিসরে বসে কাগজ ওলটাই। আমার কাছে যেসব তথ্য ছিল তার থেকে বুঝতে পারি যে, প্রতি বছরই বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা যায় না। আমি স্বস্তিতে কাগজ ওলটাই। দেখতে পাই বেশ কয়েকটি আবেদনপত্র। সাল-তারিখ উল্লেখ করে লেখা – মাননীয় রেঞ্জ অফিসার সাহেব, সাতক্ষীরা রেঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন – হুজুর বিনীত নিবেদন এই যে, আমরা নয়জন আপনার অফিস থেকে পাশ নিয়ে জঙ্গলে গিয়েছিলাম মধুর চাক কাটার জন্য। আমরা একদল মৌয়াল নিয়মিত জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করি। গত বৃহস্পতিবার, আমরা জঙ্গলে গেলে আমাদের দলের ময়দুল মিয়াকে বাঘে ধরে নিয়ে যায়। আমরা চিৎকার-হইচই করে বাঘের পেছনে তাড়া করি। কিন্তু তাকে জীবিত উদ্ধার করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত বাঘে খেয়ে ফেলে গেলে আমরা তার লাশ নিয়ে আসি। ময়জুল মিয়া খুবই দরিদ্র। ছেলেমেয়েরা ছোট। উপার্জনের কেউ নাই। অতএব হজুর, ময়জুল মিয়াকে আপনার অফিসে ডাইরিভুক্ত করার বিনীত নিবেদন জানাই। নিচে সবার স্বাক্ষর ও টিপসই দেওয়া আছে। আমি অাঁকাবাঁকা লেখার দিকে তাকিয়ে থাকি। বুঝতে পারি সরকারি অফিসকে জানানো হয়েছে। ফরেস্ট অফিসে এইসব রেকর্ড সংরক্ষণ করা হবে। তারপরে? কোনো সাহায্য যাবে কি ওই দরিদ্র মানুষটির বাড়িতে? নাকি শুধুই দুঃখ প্রকাশ করা হবে? পরে জানতে পারি এই আবেদনপত্রের একটি কপি থানার পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। এর বেশি তারা আর কিছুই করতে পারে না। মধু সংগ্রহের দায়িত্ব প্রত্যেকের নিজেদের। ফরেস্ট অফিস পারমিট দেয়, কিন্তু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে না।

বেলা সেন্টারে বসে প্রান্তিকা সুন্দরবন নিয়ে কথা বলার সময় বলেছিল, আমাদের যে-লোকেরা সুন্দরবনে নানা কাজে যায় তাদের জন্য কাঁটাওয়ালা লোহার টুপি বানিয়ে দেওয়া হয়। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড থেকে সহযোগিতা নিয়ে তাদের ফরেস্ট অফিস এই কাজটি করে। বাঘ আক্রমণ করলেও শরীর কামড়াতে পারে, কিন্তু মাথা বেঁচে যায়। আক্রান্ত লোকটির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

শরীফের সঙ্গে এই প্রসঙ্গটি আলোচনা করলে ও হেসে বলেছিল, শরীর ফিনিস হয়ে গেলে মাথা দিয়ে কী হবে? ওটা থাকা-না-থাকা সমান হয়ে যাবে।

আমি বলেছিলাম, কথাটা খুব ক্রূর শোনাল শরীফ।

শরীফের নির্বিকার উত্তর ছিল, সত্যি কথা সবসময় ক্রূর। আমি এভাবে নিজের ব্রেন ঠিক রাখার চেষ্টা করি।

তাহলে ব্রেনই সত্য, হার্ট কিছু নয়।

বিতর্ক করতে চাইলে বড়সড় একটা আয়োজন করেন শারমিন। দুজনে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেব। দেখা যাবে কে জেতে।

এসবে আমার কোনো ইচ্ছা নেই। বিতর্ক আপনি একা একাই করেন। আমার কাছে হার্ট এবং ব্রেন দুটোই সত্য। এবং সমান।

সেদিন শরীফ আর কথা বাড়ায়নি। আজ ওর কথা মনে হচ্ছে আরো বেশি করে। ঢাকা থেকে আসার আগে শরীফ ফোন করেছিল। বলেছিল, আপনি বুড়িগোয়ালিনী এলে আমি আসব। আপনার ডলফিন দেখার শখ, যদি সুযোগ করতে পারি তবে যারা ডলফিনের খোঁজে গভীর সমুদ্রে যায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। আমার বন্ধু রুবাই বিষয়টি ভালো জানে।

বুড়িগোয়ালিনী পৌঁছে দুবার ফোন দিয়েছি শরীফকে। ওর ফোন বন্ধ। হয়তো কোথাও ব্যস্ত আছে। মিসড কল দেখে ওকে নিশ্চয় কলব্যাক করবে। আমি শরীফের ফোনের জন্য অপেক্ষা করি।

আমি আবার কাগজের পৃষ্ঠায় মনোযোগী হই। ওলটাতে থাকি পৃষ্ঠা। একই ঘটনা ঘুরেফিরে আসছে। বাঘের সঙ্গে লড়াই করেছে মানুষ। এরপর মৃত্যু। তারপর সেই মৃত্যুবরণকারী মানুষের সংসারের বেহাল অবস্থা। খুবই বেদনাদায়ক এবং অবর্ণনীয় দুরবস্থার চিত্র। পড়তে পড়তে চোখ ভিজে যায়। বাঘের কামড় থেকে বেঁচে যাওয়া একজন মানুষের ফটো আছে ফাইলে। ছবি দেখে চোখ বুজি। জানতে পারি লোকটি বেঁচে আছে। ডুমুরিয়ায় থাকে। শরীফের কাছ থেকে হয়তো আরো তথ্য পেতে পারব।

অফিসের কাগজ দেখা শেষ করে বেরিয়ে আসি। রিকশা নিই আমার আস্তানায় ফেরার জন্য। একটি বেসরকারি সংস্থার গেস্ট হাউসে আছি। রিকশায় বেশিদূর যেতে ভালো লাগলো না। ভাবলাম হাঁটলে নানাজনের সঙ্গে দেখা হবে। কথা হবে। নানাকিছু জানতে পারব। আমি জানি আমার কৌতূহলের সীমা নেই। বাঘ থেকে ফুল-পাখি-গাছ-হরিণ এমনকি সুন্দরবনের শীত-বসন্ত জানতেও আমার ইচ্ছার শেষ নেই। মাঝে মাঝে এই কৌতূহলের জন্য আমি নিজেই নিজের কাছে বিব্রত হই। কিন্তু সেই বিব্রত অবস্থা কাটাতে সময়ও লাগে না। আবার নিজের ইচ্ছার বলয়ে ফিরে আসি। রিকশা থেকে নামতেই একজন বুড়িমা এগিয়ে এসে বললেন, মা গো কে তুমি?

আমি একজন সাংবাদিক। শারমিন সুলতানা নাম।

মাগো এতবড় নাম। আমি এতবড় নাম আর শুনিনি। আমার নাম হনুফা। আমার মাইয়ার নাম নূরী। বইনের নাম লিলি। বুড়িমা একগাল হেসে বলে, ছোট নাম ডাকতে সুবিধা।

আমি তার হাত জড়িয়ে ধরে বলি, আপনি আমাকে খুকি বলে ডাকেন।

খুকি! সুন্দর নাম।

আপনি কোথায় থাকেন?

ওই তো ওইদিকে। ছোট ঘর। একা একা থাকি। মাইয়া শ্বশুরবাড়িতে থাকে। মাইয়ার বাপে রে বাঘে নিছে। আমি অখন একজন বাঘবিধবা।

চমকে উঠি বুড়িমায়ের কথায়। শরবানুও বাঘবিধবা খেতাব পেয়েছে। মানুষের কি নিষ্ঠুর পরিহাস। যে-মৃত্যুর সঙ্গে একজন নারীর সরাসরি সংযোগ নেই, তাকে সেই মৃত্যুর দায় নিতে হয় অলক্ষ্মী, অপয়া শব্দের উচ্চারণে। নারীর পৃথিবী এই অত্যাচারের সাক্ষী। আমি বাঘবিধবা শব্দটিকে সুন্দরবনের সব নদী এবং খালের ভেতর চুবিয়ে দিতে চাই। কেমন করে পারব? যারা এই শব্দটি ব্যবহার করে তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে? বলব যে, এমন বাজে, নির্মম শব্দ ব্যবহার করে নারীকে তার অবমাননার কাদাজলে ডুবিয়ে রাখবেন না। এই মৃত্যুর দায় আপনাদেরও।

তুমি কী ভাব মাইয়া?

আপনার গ্রামের নাম কি বুড়িমা?

নীলডুমুর।

উহ, কী সুন্দর নাম।

কিন্তু আসলে সুন্দর না মাগো। মানুষের কষ্টের শেষ নাই। আমার ঘরে চল মাইয়া তোমারে চাল ভাজা খাইতে দেব।

চলেন বুড়িমা আমি চাল ভাজা খাব। আপনি নিজে ভেজেছেন?

হ মাগো। আমিই ভাজছি। চাল ভাজার লগে পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ মাখায়ে দেব।

ইস্ কি মজা। বুড়িমা আপনার হাত ধরি।

ধর মাগো। কোনোদিক থেকে যদি বাঘ আসে তাহলে বাঘকে বলব আমাকে খাও। মাইয়াটাকে না।

তারপর ফোকলা গালে হি-হি করে হাসে বুড়ি। আমি ভাবি, ভারি সুন্দর হাসির শব্দ। পরক্ষণে মনে হয় সুন্দরবনের ধারে বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝি এমন হাসি হাসা যায়। এই হাসির শব্দ ঢাকা শহরে নাই। আছে বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, নীলডুমুর, মুন্সীগঞ্জ, চকবারা, দাতনিখালী, ডুমুরিয়া, চুনার, ধানখালী, চুনা, পানখালী ইত্যাদি গ্রামের আনাচে-কানাচে। বাঘে-খাওয়া মানুষের পরিবারের কাছ থেকে এমন হাসি ধ্বনিত হয়। হাসির শব্দ উড়ে যায় সুন্দরবনের মাথা ছুঁয়ে। এমন একটি বন তো কোথাও নেই যে তার আশেপাশে বাস করা মানুষেরা এমন অনাবিল সৌন্দর্যের হাসি হাসবে, যেখানে আছে মৃত্যু, আছে দুঃখ – আছে অনন্ত সময়ের জীবনের জলছবি। বুড়িমার হাসি শুনে আমার চোখে পানি আসে। আমি দুহাতে পানি মুছি। বুড়িমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কাঁদো কেন মা? আমি তোমারে দুঃখু দিচ্ছি?

না, দুঃখ দেননি। আপনার গান শুনে আমার অনেক কথা মনে হয়েছে। সেজন্য আনন্দে চোখে পানি এসেছে।

ওহ, আল্লাহ রে, এটা কেমন কথা। আনন্দে চোখে পানি আসে। আমার চোখে কেবল দুঃখের পানি। আমার তো আনন্দ নাই। মাগো। সেজন্য আনন্দে চোখে পানি আসে না। এই যেমন তোমার সঙ্গে দেখা হলো। কত খুশি হলাম। কিন্তু চোখে তো পানি নাই।

আমি হেসে বলি, আজ আমি সারাদিন আপনার সঙ্গে থাকব। দুজনে অনেক মজা করব। আমি রান্না করব।

তুমি রান্না করবা? আমার ঘরে তো কিছু নাই।

যাবার সময় বাজার থেকে মাছ কিনব। আপনার যেই মাছ পছন্দ সেই মাছ। নাকি গরুর মাংস খাবেন?

বুড়ি চোখ উজ্জ্বল করে বলে, গরুর মাংস খাব। কতদিন মাংস খাইনি।

ঠিক আছে, চলেন দুই কেজি মাংস কিনি। রান্না করে আপনার জন্য রেখে যাব। অল্প অল্প করে খাবেন।

সত্যি মা? তুমি আমাকে মাংস রেঁধে দেবে?

আমি হেসে বুড়িমাকে নিয়ে বাজারে আসি। মাংস-চাল-সবজি-পেঁয়াজ-রসুন-আদা-লবণ কিনি। বুড়িমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি, আর কী কিনব?

ডাল কিন। সারাবছর তো ডাল-ভাত খাই। আর তো কিছু খাওয়া হয় না। কপালে থাকলে একটু যদি জুটে। মাংস তো সারাবছর চোখে দেখি না।

আমি তার গলা জড়িয়ে ধরে বলি, আমি ঢাকা থেকে নানা সময়ে আপনাকে নানাকিছু পাঠাব বুড়িমা। আপনি একটুও মন খারাপ করবেন না। আপনার চোখে আমি আনন্দের পানি দেবো।

সত্যি।

আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলব না।

বুড়িমা বাজারের পোঁটলাটা বুকের সঙ্গে অাঁকড়ে ধরে। যেন পরম মমতার ধন। একজীবনে এটুকু পেলেই বর্তে যায় কোনো কোনো মানুষ। আমি আমার জীবনের এমন নতুন অভিজ্ঞতায় অভিভূত হই। ভাবি, জীবনের সঞ্চয়ে যুক্ত হলো একটুখানি। আরো কত কিছু যে দেখার বাকি। আমি বুড়িমার হাত ধরতে পারি না। কারণ তার দুহাত বুকের কাছে জড়ো করা। আমি একটা রিকশা ডাকি। তার বাড়িতে এসে দেখি ছোট কুঁড়েঘরের মতো ঘরটি জনশূন্য। খুব একটা কাছেধারে কেউ থাকে না। ভীষণ একটা বিরান এলাকা। আমার মন খারাপ হয় এই ভেবে যে, এমন একটা ঘরে এই মানুষটি একা থাকে। এক ভুতুড়ে জীবনের ভুতুড়ে নারী যেন তিনি। আমার দিকে পিঁড়ি এগিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, মা গো এই পিঁড়িতে বসো। আমি রান্নাবান্না করি। এত কিছু কিনেছ এগুলো তো গুছিয়ে রাখতে হবে। নইলে চোর আসবে।

এই বাড়িতে চোর কেন আসবে? কিছুই তো নেই। মাদুর পেতে ঘুমান। দুটো শাড়ি। আর কিছু হাঁড়িকুড়ি। উঠানভর্তি শুকনো পাতা জমে আছে। ঘূর্ণিঝড়ে পাতাগুলো বনবন উড়বে। ওরা কী নিতে আসবে বুড়িমা?

মাঝে মাঝে বস্তায় ভরে শুকনো পাতা নিয়ে যায়।

আপনি কিছু বলেন না?

না। বরং নিয়ে গেলে খুশি হই। আমার এইটুকু সম্পদ আছে, তাও চুরি হয়। তখন আমার নিজেকে রানী মনে হয়।

হা-হা করে একগাল হাসিতে নিজেকে ভরিয়ে তোলে বুড়িমা। আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি। হাসি থামলে তাকে বলি, আপনার কি মনে হয় দেশটি চোর-বাটপারে ভরে আছে?

বলো কী মা, তাতো আছেই। মানুষজন হাঁ করে বসে আছে যে কখন আমি মারা যাব। তখন এই ভিটের জমিটা দখল করবে।

ওরা দখল করবে কেন? আপনার মেয়ে আছে না?

ও তো শ্বশুরবাড়িতে থাকে। গরিব মানুষের ঘর। এলাকার মাস্তান লোকজনের সঙ্গে বেয়াদবি করে কুলাতে পারবে না।

আপনার জমির দলিল নাই?

মাইয়ার বাপের নামে তো দলিল আছে।

সেটা কোথায়?

এই ঘরের চোঙের ওপর।

আপনি দলিলটা আপনার মেয়েকে দিয়ে দেবেন। ওর সঙ্গে আমিও গ্রামের মাতবরদের সঙ্গে বেয়াদবি করব। খালি হাতে জমি দখল চলবে না। টাকা দিয়ে কিনতে হবে।

বুড়িমা গালভরা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠে দপ করে নিভে যায়। বলে, ওদের সঙ্গে পারবা না মা। তুমি আমার ঘরের চারদিক ঘুরে বেড়াও। শুকনো পাতা দেখ, কলাগাছ দেখ। বনের ধারে গিয়ে হরিণ দেখার জন্য দাঁড়াও। খালের ধারে গেলে কাঁকড়া দেখতে পাবা।

না, না আমার এতকিছু দেখতে হবে না। আমি আপনার কাছে বসে থাকব। আপনি রান্না করেন।

বুড়িমা মাটির চুলোয় ভাত বসায়। মাংস কাটতে বসে। মাংস কাটা হলে মশলা বাটতে বসে। আমি আমার ল্যাপটপ খুলে বসি। হাঁটুর উপর ল্যাপটপ রেখে আইলা ঝড়-আক্রান্ত বুড়িমার জীবনের হদিস খুঁজতে থাকি। চিংড়ি ঘেরের কারণে ক্ষেত লবণাক্ত হয়ে গেছে। বুড়িমা একসময় ধানক্ষেতে কাজ করত, সে-কাজের সুযোগ নেই। বেশিরভাগ লোকজন কাজের খোঁজে শহরে চলে গেছে। আইলা ঝড়ে ভেড়িবাঁধ ভেঙেছে বলে নোনা পানিতে ভরে গেছে ফসলের ক্ষেত। বুড়িমা আগে ফসলের ক্ষেতে কাজ করতেন স্বামীর সঙ্গে। এখন কাজ নাই। তারপরও চেষ্টা করেন খালে মাছ ধরতে। অন্যকে সাহায্য করলে তারা কিছু সাহায্য দেয়। চাল-ডাল কিনতে পারেন। কেউ কেউ শুকনো পাতা নিতে আসে। বদলে তরিতরকারি দিয়ে যায়। বুড়িমার মনে হয় মন্দ না এভাবে বেঁচে থাকা। যতদিন আয়ু আছে ততদিন বাঁচতে তো হবে। আমি বুড়িমাকে মাথা থেকে নামিয়ে গুগল সার্চ করি। জলবায়ু বিষয়ে নানাকিছু খুঁজতে থাকি। দেখতে পাই জার্মানের একটি গবেষণা সংস্থার নাম ‘পস্টড্যাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চ’। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে প্রায় নববই জন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তারা বলছেন, পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ যে-হারে বাড়ছে এই পরিমাণ একইরকম থাকলে ২০৯০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে। এর ফলে মানুষের জীবনে ভয়াবহ রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসবে। আর এই দুর্যোগ সবচেয়ে বড় আকারে মোকাবিলা করতে হবে বাংলাদেশকে। বিশ্বজোড়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম সবার উপরে।

হাঃ, বলে আমি মাথা হেলাই।

বুড়িমা বলেন, কী হইল রে মাইয়া?

কী আর হবে, আপনার মাথা আর আমার মুন্ডু।

মন খারাপ করছিস কেন?

আপনাকে এতকিছু বোঝাতে পারব না। আমি নিজেই একটু বুঝি তো আরেকটু বুঝি না।

মেজাজ গরম করিস না। এই কুঁড়েঘরে না খেয়ে-দেয়েও আমি মেজাজ গরম করি না।

বেশ করেন। আমি আপনার মতো হতে পারব না। আমার মাথা অল্পে গরম হয়ে যায় গো বুড়িমা। আপনি আর আমার সঙ্গে কথা বলবেন না।

আচ্ছা। বুড়িমা মাথা নেড়ে চুলোয় কাঠ খুঁজে দেয়।

আমি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের ওপর নজর দিই। তাদের প্রতিবেদনের নাম ‘টার্ন ডাউন দ্য হিট : ক্লাইমেট এক্সট্রিম রিজিওনাল ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড কেস ফর রেজিলিয়ানস’। পড়তে শুরু করি প্রতিবেদনটি। সবকিছু বুঝতে পারি না। শুধু দেখতে পাই এই প্রতিবেদনেও বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আস্তে আস্তে সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হতে থাকবে। আস্তে আস্তে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকবে। একদিন বঙ্গোপসাগরের ব-দ্বীপ বঙ্গোপসাগরের নিচে তলিয়ে যাবে। কী হবে কোটি কোটি মানুষের? কী হবে -। আমি আর ভাবতে পারি না। আমার সামনে বিশাল সমুদ্র থইথই করে। আমি বুঝতে পারছি আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ল্যাপটপ বন্ধ করে ব্যাগে ঢোকাই। আমি বুড়িমার দিকে তাকিয়ে বলি, এখন যদি একটা বাঘ এসে বলে, আমি তোমার সঙ্গে গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাব। আমাকে ভাত দাও। তাহলে কী করবেন?

কী আর করব। ভাত দেব। জিজ্ঞেস করব, বাসনে খাইবে, না পাতিলে?

বুঝলাম এমন একটা নিঝুম প্রান্তরে বাস করেও বুড়িমা খুবই স্মার্ট। আমি তার দিকে তাকিয়ে বলি, যদি বলে, আপনার বাড়িতে যে-মেয়েটি বসে আছে আমি তাকে খাব।

তখন ঝাড়ু উঁচিয়ে বলব, তোর মুখে ঝাড়ু মারি হারামজাদা।

বুড়িমা এমন ভঙ্গিতে বলে যে আমি হাসতে হাসতে পেট ফাটাই। আমার মনে হয়, আমার হাসিতে শুকনো পাতা উড়ে যাচ্ছে। এমন উচ্চৈঃস্বরে, এমন প্রাণখোলা হাসি আমি জন্মের পর থেকে হাসিনি। কখনো কোনো মুহূর্ত সংগত কারণেই বিহবল করে দেয় মানুষকে। আমি এখন সেই অবস্থায় আছি। এমন নির্জন দুপুরে নিঃসঙ্গ একজন মানুষের কাছাকাছি হয়ে আমি বুঝতে পারি নিঃসঙ্গতার কোনো ব্যাখ্যা নেই। মানুষটির বুকের ভেতরে হাহাকার নেই, তবে কেন আমি তাকে নিঃসঙ্গ ভাবছি। নিজের প্রতি আমার নিজেরই করুণা হয়। আমি আবার প্রাণখোলা হাসিতে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে বলি, শারমিন সুলতানা, আসলে নিঃসঙ্গতার অর্থই তুমি বোঝ না।

এই মেয়ে তুই হাসছিস কেন? কার সঙ্গে হাসছিস?

হাসি এলো তাই হাসলাম। আর আমার কেউ নেই যার সঙ্গে হাসতে পারি।

তোকে কেউ ভালোবাসার কথা বলেনি?

বলেনি তো।

বলবে। অল্পদিনেই বলবে। তোর কপালে ভালোবাসার ফুল দেখতে পাচ্ছি।

আমার কপালে? ভালোবাসার ফুল?

তুই বুঝবি না। আমি বুঝি। আমার বয়স হয়েছে না। তাই আমি বুঝি। আমি আমার মাইয়া নূরীর কপালে ভালোবাসার ফুল দেখছিলাম। তারপর ওর বিয়ে হয়। মাইয়াটা সুখে আছে। ওর স্বামীটা খুব ভালো। মাইয়াটার সঙ্গে জোরজুলুম করে না।

তাহলে তো আপনি শান্তিতে আছেন।

খুব শান্তি। আল্লাহ মেহেরবান। ভাত খাবি রে?

হ্যাঁ। খিদে পেয়েছে।

এই যে বাসন। ধুয়ে রাখছি।

আমি রঙওঠা বাসন নিজে আবার ধুয়ে নিই। বুড়িমা আমার বাসনে ভাত দেয়। মাংস আর আলুর তরকারি দেয়। আমি দুটুকরো মাংসের এক টুকরো বুড়িমার বাসনে উঠিয়ে দিয়ে বলি, আমি এক টুকরোর বেশি মাংস খাই না।

আমাকে খাওয়াবি বলে, তুই খাবি না বুঝেছি।

আপনি আর কথা বলবেন না। এবার খেতে শুরু করুন। আপনার কপালে আমি খুশির ফুল দেখতে পাচ্ছি।

পাবিই তো। আমি তো মাংস-ভাত খেতে পেয়ে অনেক খুশি হয়েছি। এখন আমি গবগবিয়ে ভাত খাব। মাংস তো পাঁচ-ছয় টুকরো খাবই। দশ টুকরোও খেতে পারি।

নিশ্চয়ই খাবেন। আপনি যতক্ষণ খাবেন, আমি ততক্ষণ বসে থাকব। গল্প করব। আপনার গল্প শুনব। আপনি আস্তে আস্তে খাবেন। যতক্ষণ লাগে ততক্ষণ সময় নেবেন। যেন খাওয়াটা খুব মজার হয়।

বুড়িমা একগ্রাস ভাত মুখে পুরে আস্তে আস্তে খায়। ভাতের গ্রাস গিলে বলে, নূরীর বাবার একটা বাঘের গল্প বলি?

আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিই। বুড়িমা বলে, নূরীর বাবার তিন পুরুষ বাঘের কবলে পড়েছিল। আমার দাদাশ্বশুরকে বাঘে মুখে নিয়ে গহিন বনে চলে যায়। লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি তিনবার বাঘের মুখে পড়েছিলেন। একবার কচিখালী খালে মাছ ধরতে গিয়ে দাঁড় ঠিক করার সময় একটা বাঘ লাফিয়ে নৌকায় ওঠে। সঙ্গে ছিল তার ছোটভাই। দুজনে মিলে নৌকার বৈঠা দিয়ে বাঘকে মারতে থাকে। কিন্তু বাঘ নড়ে না। নৌকা থেকেও সরে না। তখন দুজনে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার দিয়ে কূলে ওঠে। ততক্ষণে বাঘটা চলে যায়। সে যাত্রা দুজনে বেঁচে যায়।

কথা শেষ করে বুড়িমা আমার দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করি, তখন আপনার বিয়ে হয়েছিল?

কেবল বিয়ে হয়েছিল, দুই কি তিন মাস হবে মাত্র। সেদিন ভেবেছিলাম আমার ভাগ্যটা ভালো। পরে তো দেখলাম ভালো না। বাঘেই নিল তারে। আরো একবার বাঘের কবলে পড়েছিল। সেবার সঙ্গীদের সঙ্গে মধুর চাক কাটতে গিয়েছিল। সে সবার পেছনে ছিল।  হঠাৎ কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঘ গাছের আড়াল থেকে লাফ দিয়ে তার ওপর পড়ে। তারপর পাঁজর ধরে মুখে নিয়ে বনের ভেতর ঢুকতে থাকে। সঙ্গীরা হইহই করে তাড়া করলে তাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। হায় আল্লাহ, সে কী কষ্ট! যমে-মানুষে টানাটানি।

সে-যাত্রায় বেঁচে যায় এ কারণে যে, গায়ে শীতের কাপড় বেশি ছিল। সোয়েটার জ্যাকেট গায়ে থাকায় পাঁজরে দাঁতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারেনি। কাঁধের ওপরও ক্ষত বেশি ছিল না। আল্লাহ সে যাত্রায় বাঁচিয়ে দিয়েছিল। পরের বার আর রক্ষা হয়নি। এমনই আমার ভাগ্য। ওই এক মেয়ে ছাড়া আর কোনো সন্তানও জন্ম নেয়নি। তার খুব শখ ছিল একটি ছেলের। যে-ছেলে বাঘের হাত থেকে বাবাকে বাঁচাবে – সে বলত, বনে-বাদাড়ে গেলে রক্ত কথা বলে – নিজের রক্ত যেমন জান-প্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমন কি আর অন্যরা করে। রক্তের কেউ থাকলেই বিপদ থেকে বিপদ পার করে দেয়।

আপনি ভাত শেষ করেন বুড়িমা।

তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে বুঝি। বেলা পড়ার আগেই তোমাকে আমি ঘাটে পৌঁছে দিয়ে আসব।

তার দরকার হবে না। আমি একাই যেতে পারব। আপনি খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়বেন। অনেক খাটা-খাটনি করে রান্না করেছেন।

মোটেই না। আমি রান্না করতে অনেক সুখ পেয়েছি। আমি যে কবে মাংস খেয়েছি তা কি আমার মনে আছে? আমার মা নূরী এসেছিল, তাকেও মাংস খেতে দিইনি। মুরগিও না।

এসব কথা থাক বুড়িমা।

আমার কথা তো কেউ শোনে না। আজ আমি তোকে পেয়েছি কথা বলার জন্য।

আমি আবার এদিকে এলে আপনাকে দেখে যাব বুড়িমা।

সত্যি আসবি তো? মনে হয় না। না আসলে ক্ষতি নাই। আজকের দিনটাই আমার সম্বল হবে। এই দিনই আমার একটা কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে।

দিন আপনার মেয়ে?

হা-হা করে হাসেন বুড়িমা। বলেন, ঠিকই বলেছি। দিনই আমার মেয়ে।  যেমন দিনই আমার স্বামী। আমার বাবা বা মা।

বুঝেছি। আপনি আপনার স্মৃতি ধরে রেখে সময়কে আপন করে রাখেন। আপনি একজন দারুণ মানুষ। আমি যদি আর কোনোদিন না আসি তাতে আপনার ক্ষতি নেই। আমি এমন একজন মানুষের দেখা পেয়েছি এটা আমার ভাগ্য। আমি আমার সৌভাগ্য নিয়ে ঢাকায় যাব। আপনাকেও আমি কোনোদিন ভুলব না বুড়িমা। যাই এখন?

যা। আমি আর উঠলাম না। হাঁড়িকুড়ির মধ্যে কিছুক্ষণ বসে থাকব।

আমি তাকে সালাম করে বেরিয়ে আসি। আমার মন ভরে থাকে। এই হা-হা নিঃশব্দ চারপাশের খড়কুটো উড়ে যাওয়া পরিবেশের মেঠোপথে হেঁটে যেতে আমার মনে হয় আমি একজন নিশ্চিত নারী যার চারপাশে মানুষের দীর্ঘশ্বাসের পাশাপাশি হাসিও প্রবল। আমার মন খারাপ নেই, ভয় নেই। যা কিছু লড়াই তাকে দুহাতে ধরতে পারাই আমার নিয়তি। এই নিয়তিকে এই বুড়িগোয়ালিনীর প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারি। এই চ্যালেঞ্জ আমি নিয়ে যেতে পারি কোপেনহেগেনের বেলা সেন্টার থেকে পৃথিবীর সর্বত্র। আমি আপনমনে হাসি। হাসি যে কত আনন্দের হতে পারে তাতো আমি বুড়িমার কাছ থেকে জেনেছি। এ আমার এক গভীর অভিজ্ঞতা। জীবনের আনন্দ ভাগ করব সর্বত্র – ছোট মাটির কণা থেকে বড় আকাশ – সবখানে।

পরদিন ফরেস্ট অফিসে গিয়ে আরো কয়েকটি বাঘ-আক্রান্ত আবেদনপত্র নোট করি। নাম-ঠিকানা, ঘটনার স্থান, সঙ্গীদের নামও লিখে নেই। প্রতিবেদনটি যাতে পূর্ণাঙ্গ হয় সে-বিষয়ে খেয়াল রাখি। আমার কাজ প্রায় শেষের দিকে তখন ফরেস্ট অফিসার এসে বলেন, আমাদের এলাকায় একজন লোক আছে যাকে বাঘে কামড়ে ছিল, তিনি বেঁচে গেছেন। আমি তাকে আসতে বলেছিলাম আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য, এসেছেন। তাকে এখানে নিয়ে আসি, কী বলেন?

অবশ্যই নিয়ে আসবেন। এখানে বসে কথা বলতেই আমার ভালো লাগবে।

ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলে আমি সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাগজপত্র গুছিয়ে ফেলি। তার কথা লিখব বলে, নতুন কাগজ বের করি। তিনি ঘরে ঢুকে বললেন, কালকে দেখলাম, আপনি হনুফা বিবির সঙ্গে বাজার করছেন।

হ্যাঁ, করেছি তো। এই চাল-ডাল আর কী। তারপর তার বাসায় গিয়েছিলাম।

ও আচ্ছা। ভালো করেছেন।

আপনি কেমন আছেন চাচা?

মাগো আমাদের আর ভালো থাকা। কোনোরকমে দিন কাটে। চেহারা দেখেই তো বুঝতে পারো যে শরীরের কী অবস্থা। এই শরীর নিয়ে কি মানুষের বাঁচার ইচ্ছা থাকে। এখন মরণেই সুখ। আল্লাহ কবে মেহেরবানি করবেন সেদিনের অপেক্ষায় আছি।

চাচা, আপনি ভালো থাকুন। আমরা এই আশা করি।

ভালো থাকা কত কষ্টের দেখো আমাকে।

আমি তাকে আগেই এক নজর দেখে শিউরে উঠেছিলাম। এখন পূর্ণ চোখে তার দিকে তাকাই। লম্বা-চওড়া মানুষটির ঘাড় কাত হয়ে গেছে। মাথা সোজা রাখতে পারে না। মাঝে মাঝে নড়তে থাকে মাথা। মাথার একাংশের চুল নেই। বাঘের কামড়ে মাথার একাংশ উঠে গিয়েছিল, সে-জায়গা লাল হয়ে আছে। যেন একটা ক্ষত। সেই কামড়ে কানটায় গভীর ক্ষত হয়ে যায়। অর্ধেক কান ঢুকে গেছে ভেতরের দিকে। সেই ফুটোতে যে-কোনো একটি লাঠি ঢোকানো যাবে কিংবা হাতের আঙুল কিংবা শোঁ-শোঁ বাতাসের প্রবল প্রবাহ বইবে সেখানে – সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জনও শোনা যেতে পারে। আমার মাথা কেমন এলোমেলো লাগে। তারপরও আমি দ্রুত হাতে লিখি। যেন আমি একটি ঘোরের ভেতর প্রবেশ করেছি। আমি বাঘের মুখে গহিন বনে যাচ্ছি। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষায় আছে এক বিচিত্র পৃথিবী। আমি আবার মতলুব গাজীর দিকে তাকাই। তার মুখের বাঁ দিক বাঁকা হয়ে আছে। কথা স্পষ্ট বোঝা যায় না। কথা বলতে কষ্ট হয় বুঝলাম। প্রশ্ন করলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। যেন প্রশ্নের জবাবটি আকাশ-পাতাল খুঁজছে। পাচ্ছে না। বেকুবের মতো তাকিয়ে আছে প্রশ্নকারীর মুখের দিকে। বুঝতে পারি তার ভেতরে প্রবল শূন্যতা হা-হা করে ফিরছে। আমার চোখে পানি আসে। আমি চশমা খুলে চোখ মুছি। মতলুব গাজী কিছু বলার চেষ্টা করে। তারপর থেমে থেমে বলে, আমরা মধু কাটতে গিয়েছিলাম তালপট্টি দ্বীপে। আমরা চারজন ছিলাম। একটু থেমে আবার বলে, চারজনের একজন ছিল আমার ছেলে। আমার সঙ্গে মতলুব গাজী। চোখ দিয়ে পানি গড়ায়। ঠোঁট কাঁপে। কিন্তু চোখের পানি মোছার চেষ্টা করে না। একটু পরে ভেঙে ভেঙে বলে, আমরা মধুর চাক কাটতে কাটতে যাচ্ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ করে বাঘ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মা গো বাঘে ধরলে মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে, কিন্তু আমি জোর খাটিয়ে চিৎ হয়ে পড়ি। বাঘ আমার বুকের ওপর উঠে আসে। মতলুব গাজী এটুকু বলে হু-হু করে কাঁদতে থাকে। কিছুক্ষণ কেঁদে বলে, আমার জোয়ান ছেলের গায়ে ছিল শক্তি। ও আমার দুই পা ধরে জোরে টান দিয়ে বাঘের নিচ থেকে সরিয়ে আনে। আমি বাঘের কামড় খেয়ে বেঁচে আছি। ওই আমিই তো তোমার সামনে বসে আছি মা গো। তারপর তিনি আবার কাঁদতে শুরু করেন। বেশ কিছুক্ষণ কাঁদেন। আমি তাকে এক গ্লাস পানি দিই। তিনি ঢকঢকিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে শেষ করেন। তার কাছ থেকে কিছু শুনতে পাব এই আশায় আমি চুপ করে থাকি। একসময় তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, এরপর বাঘ আমার ছেলের মাথা কামড়ে ধরে বনে চলে যায়। আর ফিরে পাইনি ওকে।

আমি কথা বলি না। মতলুব গাজী নিজেও চুপ করে থাকে। সময় আমার চোখের সামনে এক নিষ্ঠুর প্রাণী হয়ে ওঠে, যার ধারালো দাঁত এবং নখে মানুষের জীবন অাঁকড়ে থাকে। সময় আর কখনো পূর্ণ বসন্তকাল হয়ে ফুটে ওঠে না।

মতলুব আমার দিকে তাকালে আকস্মিকভাবেই জিজ্ঞেস করি, আপনার আর কয় ছেলেমেয়ে আছে?

ওই একটাই ছিল। অনেক মানত করে একটা ছেলেই পেয়েছিলাম। আমার বউয়ের দ্বিতীয়বার গর্ভ হয়নি।

তিনি কেমন আছেন? সুস্থ আছেন তো?

সুস্থ? হ্যাঁ সুস্থ আছে। কখনো কাঁদে, কখনো হাসে। ভাত রান্না রেখে দৌড়ে যায় বনের ধারে। বলে, ছেলেটা কী দিয়ে ভাত খাবে জিজ্ঞেস করে আসি। পাগল, পাগল। পাগলামির শেষ নাই।

অফিসার ঘরে ঢুকে তার বাহু ধরে বলে, চলেন যাই।

আমি চা খাব। বিস্কুট খাব।

আমি লজ্জা পেয়ে বলি, আমি চাচাকে চা-বিস্কুট খাওয়াব। চলেন দোকানে নিয়ে যাই।

না, না আপনার যেতে হবে না। আমি নিয়ে যাচ্ছি। চলেন মতলুব মিয়া।

আমি অফিসারের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলি, আমার হয়ে আপনি ওনাকে খাওয়াবেন।

আমাকে এক খিলি পান দিও মাগো।

উনি অনেক টাকা দিয়েছেন। ভাতও খেতে পারবেন। চলেন।

মতলুব গাজী আমার দিকে কেমন বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকান। আমি দেখতে পাই তার দৃষ্টিতে কোনো এক্সপ্রেশন নেই। অথচ নিজেকে প্রকাশের আশ্চর্য অনুভব তার মুখজুড়ে লেপ্টে থাকে। কিন্তু সে-প্রকাশ দৃশ্যমান হয় না। তার দিকে তাকিয়ে আমি বেঁচে থাকার ভিন্নমাত্রা অনুভব করি। আমার মন খারাপ হয়। আমি আমার কাগজে আর একটি বিবরণী লিখতে থাকি – ‘মধুর চাক ভাঙার পাশ নং ২০/২১৪৬-তে আট ব্যক্তির নামের উল্লেখ আছে। একজনের নাম আবদুল সাফুর, পিতা যাহুর মিয়া, সাং ডুমুরিয়া, থানা শ্যামনগর, জেলা খুলনা। ২ এপ্রিল তারিখে ধানখালির খালে মাছ ধরতে গেলে ডানদিক থেকে লাফ দিয়ে বাঘ তাকে ধরে নিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার হাড়গোড় খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথায় যে বাঘ তাকে নিয়ে গেল এতবড় জঙ্গলে কে আর কোথায় খুঁজবে।’ গত বছর আঠারো জনকে বাঘে নিয়ে গেছে। কাউকে জীবিত পাওয়া যায়নি। তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে। তাদেরকে কবর দেওয়া হয়েছে। বাকিদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। একটি বিষয় লক্ষ করলাম যে, সব মৃত ব্যক্তির জন্য ফরেস্ট অফিসে আবেদন করা হয়নি। তারা নিজেদের মতো করে লাশ দাফন করেছে। কারণ তারা জানে ফরেস্ট অফিসে আবেদন করে লাভ হয় না। তাদের কিছু করার নেই। তারা থানায় পাঠাবে আবেদনের কপি। এর বেশি তারা আর কিছুই করতে পারে না। থানাও কিছু করে না। তাই আমার মনে হয় বন অফিসে অনেক এমন রেকর্ড আছে। তথ্য হিসেবে এর একটা গুরুত্ব আছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সুন্দরবনের মৌয়ালদের যদি কাঁটাওয়ালা টুপি দেওয়া হয় তাহলে মৌয়ালদের নিরাপত্তার একটা দিক রক্ষা হবে বলে আমার মনে হয়। আমি এই ধারায় আমার প্রতিবেদনটি তৈরি করার চিন্তা করি। একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরে আমি স্বস্তিবোধ করি। আমার তথ্য সংগ্রহের কাজ দ্রুত চলতে থাকে।

তখন শরীফের ফোন আসে।

হ্যালো শারমিন, আমি শরীফ।

কণ্ঠস্বর চিনতে পেরেছি। কেমন আছ?

ব্যস্ত ছিলাম।

একদিন বুড়িগোয়ালিনীতে কাটিয়ে দিলাম। ফোন করার সময়ই পেলে না।

সরি শারমিন। তুমি ভালো আছ তো?

নিশ্চয়ই ভালো আছি। যে কাজ নিয়ে এসেছি সেটাও ভালোই এগিয়েছে।

সিরিয়াসলি করেছ?

সেন্ট পারসেন্ট সিরিয়াসলি। ভেবেছো তোমার মতো ফাঁকিবাজি করব।

আমি তোমার শরবানু আপার ঘরটি তুলে দিয়েছি। সারাক্ষণ রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে কাজটি করেছি। কোনো ফাঁকি দিইনি।

কংগ্র্যাচুলেশন্স শরীফ।

তুমি আমাকে দেখলে চিনতে পারবে না শারমিন। রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেছি।

তোমার কালো বা ফর্সা রঙে আমার কোনো আগ্রহ নেই। ঘরটি হয়েছে, সেজন্য থ্যাঙ্কু।

কবে আসবে গাবুরায়?

আগামীকাল।

আমি আসব নিতে?

একদম না। এখানে একজন বুড়িমা পেয়েছি। তাকে দেখে আমার শক্তি দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।

কোন বুড়িমা? হনুফা বিবি?

চেনো তাকে?

চিনব না কেন? বেশ কয়েকবার তার বাড়িতে গিয়েছি। তার সাহসকে বারবারই অভিবাদন জানাই। মানসিকভাবে বাঘের চেয়েও শক্তিশালী।

আমি হাসিতে ভেঙে পড়ি। শরীফ আমাকে উপদেশ দিয়ে বলে, হনুফা বিবির মতো হও। জীবনের মোকাবিলা করা সহজ হবে। সুখ এবং দুঃখ একই মুঠিতে দেখতে পাবে।

শরীফ! আমি ওর কথায় বিস্মিত হই। এবং হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। কথা বলতে পারি না।

শরীফ হ্যালো, হ্যালো করে। বলে, কথা বলছ না কেন শারমিন।

তুমি একটি গভীর কথা বলেছ। আমি অভিভূত।

শরীফ হাসতে হাসতে বলে, তাহলে তোমাকে আমি হনুফা ডাকি?

মোটেই না। খবরদার ওই নামে ডাকবে না।

তোমাকে দেওয়া আমার নাম শারমিন।

তোমার মতলব কি বল তো?

মতলব একটা তো আছেই। সামনা-সামনি বলব। কাল দেখা হবে শরবানুর বাড়িতে।

আমরা যে কবে আপনি থেকে তুমিতে এসেছি তা মনে রাখিনি।

 

আমি যখন গাবুরায় পৌঁছাই তখন দুপুর গড়ায়নি। রিকশার হুড ফেলে দিয়ে চারদিক দেখতে দেখতে এগোই। বেশ লাগে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা। তার সঙ্গে বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দ টুনটুন করে বাজে এবং খোলা প্রান্তরে ছড়িয়ে যায়। আমি যেন শুনতে পাচ্ছি শরীফ বলছে, তুমি আমার হনুফা হও শারমিন।

হনুফা? হনুফা তো বাঘের সঙ্গে লড়াই করে।

কুমিরের সঙ্গেও করে।

আমি হাসতে হাসতে বলি, বনদস্যুর সঙ্গেও করে। বনদস্যুকে টাকা না দিলে মৌয়ালদের রক্ষা নেই।

চিংড়ি ঘেরের নোনা জমিতে ফসল হয় না।

গেওয়া ছাড়া আর কোনো গাছ জন্মায় না।

নিরন্ন মানুষের পেট-পিঠ এক হয়ে থাকে।

তখন শরীফ হা-হা হাসিতে প্রান্তর ভাসিয়ে দিয়ে বলে, এইসব রিয়ালিটি আমাদের জন্য নয়। আমরা এক ভিনদেশি গাবুরার প্রান্তরে।

বুকের ভেতর স্তব্ধ হয়ে যায়। মনে মনে বলি, একটা প্রতিবেদন লিখব বলে এখানে এসে আমার বিশাল কিছু পাওয়া হলো। এই প্রান্তরের মানুষের আছে দুঃখ আছে মৃত্যুর সঙ্গে – আছে বেঁচে থাকা। কঠোরতর হিংস্রতায় দিনযাপনের আলোছায়া। শুধুই মুখ থুবড়ে পড়ে মরে থাকা নয়। সেজন্য হনুফা বিবির সাহস থেকে ভালোবাসার ফানুস উড়ে যায় শরীফের কাছে – উড়ে আসে অন্যত্র। আমি চমকিত, দিকভোলা মানুষের অবয়বে নিজের ছায়ার সঙ্গে ভালোবাসা জমাই। দেখতে পাই সূর্য মাথার উপরে। ঝকঝক করছে দিনের মধ্যবেলা। আশ্চর্য হয়ে দেখি সূর্যের তাপ-বিকিরণে উন্নতশীল দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ নাই। আমি কি ঠিক ভাবছি, নাকি ভুল? আমি চাই আমার দেশের প্রান্তর ছুঁয়ে থাকা সূর্যের তাপ কোনো কার্বন নিঃসরণে দূষিত হবে না। আমি জানি সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে আমেরিকা ও চীন। আমি হা-হা করে হাসি। কোথা থেকে কী ভাবনায় এসে গেলাম।

রিকশাওয়ালা মুখ ফিরিয়ে বলে, হাসেন কেন আপা?

দেশটা এত সুন্দর সেইজন্য হাসি।

সুন্দর কই? দেশ তো মরে যাচ্ছে। মানুষজন কাজের আশায় অন্য জেলায় চলে যায়। কেউ কেউ ইন্ডিয়ায়ও যায়। ছয় মাস নয় মাস থেকে আবার ফিরে আসে। কিছুদিন থেকে আবার যায়।

সীমান্তরক্ষীরা ধরে না?

লুকিয়ে-ছাপিয়ে যায়। ধরা পড়লে মার খায়।

আপনি কি শরবানু আপার বাড়ি চেনেন?

চিনব না কেন? সুন্দর বাড়ি বানিয়ে দিছে। শরবানুর ভাগ্য ভালো। বিদেশ গেল, ঘর পেল।

ও কেন বিদেশ গেল তা কি আপনি জানেন?

শুনেছি, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের যে-ক্ষতি হয়েছে, সেজন্য ক্ষতিপূরণ চাইতে গিয়েছিল। তো ক্ষতিপূরণ তো চাইল, তারপর কী হলো আপা?

কিছু হয়নি। কিছু হবেও না। এই যেমন ইন্ডিয়াতে আমাদের লোক কাজের খোঁজে যায়। সেই ইন্ডিয়াও কার্বন নিঃসরণ ঘটায়।

সত্যি?

হ্যাঁ, সত্যি তো।

তাহলে আমরা ওদেরকে কিছু বলি না কেন?

বলে লাভ নাই। ওরা আমাদের কথা শুনবে কেন?

তাই তো শুনবে কেন? ওরা আমাদের খায় না পরে।

রিকশাওয়ালার পরের বাক্যটি শুনে আমার ভীষণ হাসি পায়। আমি প্রাণখুলে হাসি। হাসতেই থাকি। রিকশাওয়ালাকে আমার বলা হয় না যে, ভারত ছাড়াও ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং আরো অনেক দেশই কার্বন নিঃসরণ ঘটায়। তারা নিজেদেরটা বোঝে, অন্যদেরটা না। আমার মতো একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিক, উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশের অধিবাসী এসব লিখে দৈনিক পত্রিকার পৃষ্ঠা ভরাতে পারব, বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পাব কিন্তু আর কিছুই করতে পারব না। চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখব আমার প্রকৃতি, মাটি, সাগর, নদী, বন – আর কী? আর হনুফা বিবি।

আমি আবার হাসি।

রিকশাওয়ালা আমার হাসি শুনে এবার আর আমার দিকে তাকায় না। মাঠের প্রান্তসীমায় রিকশা থামিয়ে বলে, নামেন আপা। ওই যে বাড়ি। এইটুকু আপনাকে হেঁটে যেতে হবে।

আমি রিকশার ভাড়া চুকিয়ে দেওয়ার সময় রিকশাওয়ালা বলে, আমি কি আপনার জন্য থাকব?

না ভাই, থাকতে হবে না। এখানে আমি দুই দিন থাকব।

আচ্ছা, যাই তাহলে।

আমি নিচের দিকে নেমে যাই। শরবানুর ঘরটি মাঠের মাঝখানে। চারদিকে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা। কোথাও কোথাও পানি জমে আছে। ঘরের পাশে খেলছে ছেলেমেয়েরা। বাড়ির ঠিকানা আমি আগেই নিয়েছিলাম। চিনতে কষ্ট হয়নি। দূর থেকে একটি নতুন ঝকঝকে কুঁড়েঘর অনায়াসে দৃশ্যমান হয়। আমাকে দেখে এগিয়ে আসে শরবানু। হাসতে হাসতে বলে, তাহলে আপনের আসা হলো?

ফুলানি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আপনার কথা আমি মায়ের কাছে শুনেছি। আপনি ভালো আছেন তো খালামণি?

তুমি তো ফুলানি না?

ও বিগলিত হেসে বলে, হ্যাঁ। আপনি আমার নাম জানেন?

জানব না কেন? আমি তোমাদের সবার নাম জানি। ও হলো মৌতুলি, ও হিমালি, আর ও টিপু।

ছেলেমেয়েগুলো আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। আমি ওদের জন্য আনা বিস্কুট আর আপেল ব্যাগ থেকে বের করে ওদের হাতে দিই। ওরা হুড়োহুড়ি করে ওগুলো হাতে নিয়ে ছুটে ঘরে যায়। শরবানুর দিকে তাকিয়ে বলি, নতুন ঘর পেয়ে খুশি তো বানু আপা?

খুব খুশি। শরীফভাই অনেক কষ্ট করেছেন। রোদে দাঁড়িয়ে তদারকি কাকে বলে।

শরবানু খুশির হাসিতে মেতে ওঠে। পরে বলে, এই ঘর আর কয়দিন। আবার আর একটা আইলা ঝড় আসতে কতক্ষণ। তাই না আপা?

হ্যাঁ, তা তো বটেই। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়াতে দুর্যোগের শিকার হবে আমাদের এই দেশ সবচেয়ে বেশি।

হায় আল্লাহ। কতবার ভাঙবে আমার ঘর। আর কেইবা বারবার তুলে দেবে।

আমি তার দুঃখ কমানোর জন্য বলি, চলেন ঘরে যাই। শরীফভাই ফোন করেছিল। আসবে বলেছে।

তাই নাকি? কখন আসবে?

এই তো এখুনি বোধহয়। আপনাকে একটা আপেল কেটে দিই আপা?

না, না ওগুলো বাচ্চারা খাবে।

আমি আপনাদের জন্য খিচুড়ি আর আলু-ভর্তা করেছি।

ব্যস ওতেই হবে। আর কিছু লাগবে না।

একগ্লাস পানি দেবো?

হ্যাঁ দেন।

চলেন, ঘরে চলেন। খালি ঘর। মাদুর বিছিয়ে ঘুমাই। শাড়ি-কাপড় দিয়ে বালিশ বানাই। আইলা ঝড় সব তো নিয়ে গেছে। আমাদের ঘরবাড়ি কি প্রতি বছরে আইলা ঝড়ে যাবে আপা?

যাবে না বললে তো মিথ্যা বলা হবে।

শরবানু মাথা চাপড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আমি ওর দিকে তাকাই না। ঘরের বাইরে বসে চারদিক দেখি। দেখি বিধ্বস্ত জনপদ। সেদিন ছিল পঁচিশ তারিখ। সোমবার। দেখা হয়েছিল হেমন্তীর সঙ্গে। নদী থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে ওর বাড়ি। আইলার কথা বলতে গিয়ে বলেছিল, তখনো দুপুর ঠিকমতো হয়নি। হবো হবো করছে। দক্ষিণ দিক থেকে ভয়ানক শব্দ আসছে – উ-উ-উ – শব্দ যেমন তেমন। বিলের দিকে তাকিয়ে দেখি জলের স্রোত চারদিক ভাসিয়ে নিয়ে আসছে। কত সময় জানি না। কোনো কিছু চিন্তা করার আগেই জলের স্রোত চলে আসে আমাদের উঠোনে। ছোট ছেলেটাকে ফেলে উঠানের সঙ্গে সঙ্গে আমি জলে ভেসে যাই। ভাসতে ভাসতে পাশের গ্রাস ভিটেডাঙ্গায় গিয়ে পৌঁছাই। ওখানে একটি দোতলা পাকা বাড়ি ছিল সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিই। ভগবান রক্ষা করে। দিনের আলো ছিল বলে রক্ষা পেয়েছি। রাতের আন্ধার হলে কিছুই তো হাতড়ে পেতাম না। মাগো, কী যে একটা দিন গেল। শেষ করে দিয়ে গেল মাঠঘাট, ভিটেপোতা। মা গো -।

হেমন্তীর কণ্ঠস্বর এখনো আমার কানে বাজে। আমার মনে হয়, মানুষের জীবনের কত গল্প আছে, তা এই এক জীবনে শুনে শেষ করা যাবে না। এইসব গল্প শুনতে হলে হাজার বছরের আয়ু লাগবে। আমার শরীর শিউরে ওঠে। বিলের ভেতরে বাস করা শরবানুই তো তার জীবনের গল্প বলতে কয় রাত লাগাবে কে জানে।

আইলার পরে গ্রামের মানুষ বলেছে, সারা বছরে তারা কোনো ফসল চাষ করতে পারবে না। পাকা ধান ঘরেও তুলতে পারবে না। তখন সরকারি কর্মকর্তারা বলেছিল, ভেঙেপড়া ভেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হবে বছরের শেষ দিকে। ধরা যাক নভেম্বর ডিসেম্বরের দিকে। এটা হলে পরের বছরের বর্ষা মৌসুমে রোপা আমন লাগানোর কাজ শুরু হবে। আর এই ফসল ঘরে তুলতে তুলতে পার হয়ে যাবে বছর। আবার ঘুরে আসবে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস। মাঝখানের আঠারো মাস গাঁয়ের লোকের বেঁচে থাকা নির্ভর করবে রিলিফের ওপর। রিলিফ কি ঠিকমতো আসবে? যদি আসে তারপরে কি পৌঁছাবে মানুষের ঘরে ঘরে? আমি জানি দুর্নীতি বলে একটি শব্দ আছে। সেটি বাঘের মতো কামড়ে ধরে মানুষের ঘাড়। শুষে খায় রক্ত। বাঁচার কোনো উপায় নেই। শরবানুর দিকে তাকিয়ে আমি হিসেব করি আঠারো মাস।

আঠারো মাস মানে দেড় বছর। এই দেড় বছর ধান উঠবে না ঘরে। রিলিফ, রিলিফ। শরবানুর ছেলেমেয়েরা রিলিফের ভূতে তাড়িত হবে! এখন ওরা হুটোপুটি করে বিস্কুট আর আপেল খাচ্ছে! মাত্র একদিন বা দুই দিন খাবে। তারপর ওদের সামনে বাজবে ঠুনঠুন শব্দ।

কথা বলেছিলাম আবু আলীর সঙ্গে। আবু আলীর চিংড়ির ঘের আছে। এখন মাথায় হাত দিয়ে বসেছে। আইলায় ভেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। বিশ-পঁচিশ বছর ধরে যারা চিংড়ি চাষ করেছে, তারা দেখছে এই ব্যবসায় বেশি লাভ নেই। চিংড়ি মাছে একরকম অসুখ হয়। এই অসুখও চিংড়ি ঘেরের অবস্থা খারাপ করে দিয়েছে। আমি আর আমার আববা ঠিক করেছি আমরা আবার ধান চাষে ফিরে যাব। যে-ক্ষতি করেছি এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব না। কিন্তু ধান চাষে পেটে-ভাতে টিকে থাকতে পারব।

বুঝতে পারি নানা ধরনের সমস্যা ঘিরে ধরেছে এলাকাকে। সমীর মন্ডল বলেছে, নদীভাঙনে চাষের জমি তলিয়ে গেলে ওর বড় ভাই ইন্ডিয়া চলে গেছে। সমীর মাটি-কামড়ে পড়ে আছে। কতদিন এভাবে থাকতে পারবে জানে না। কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। এ-দেশেও না, ওই দেশেও না। ওই দেশে গেলে তো রিফুজি বলে। কাজেরও ঠিক থাকে না। তাও যে কেন যাই, জানি না।

আমি শুনি আর অদৃশ্য শূন্যে তাকিয়ে থাকি। জীবনের মানে খোঁজার চেষ্টা করি। যারা এসব কথা বলে তাদের চেহারায় রেখা খুঁজি। অাঁকাবাঁকা রেখায় মানচিত্র খুঁজি। মানচিত্রের সীমানা দেখতে পাই না। মনে হয় ওই চেহারায় কোনো দেশের মানচিত্র নেই। পুরোটাই অদৃশ্য। যেন আমি এক অচিন পাখি। নিজের নীড়ের সন্ধানে ডেকে ডেকে ফিরি চারদিক। ঠিকানার হদিস মেলে না।

শরবানু আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ওই দেখেন শরীফভাই এসেছে। সঙ্গে আমার ভাই লুৎফরও আছে। ভালোই হয়েছে। লুৎফর তো আমার ঘরে আসতে চায় না। বলে, তোর ঘরে গেলে তুই কিছু না খাওয়াতে পারলে মন খারাপ করিস। সেজন্য আসতে চাই না।

দুজনকে আসতে দেখি আমি। বিলের মধ্যে বাড়ি সেজন্য এ-পর্যন্ত রিকশা আসে না। আমি যেভাবে এসেছি সেভাবে ওরাও এগিয়ে আসে। শরীফ কী যেন বলছে আর লুৎফর হাসছে। দৃশ্যটি দেখতে ভালোই লাগে। আমি আমার মোবাইলে ছবি তুলে রাখি।

ওদের দেখে দুপুরের ভাতের আয়োজন করে শরবানু। ছেলেমেয়েদের ডাকলে ওরা বলে, আমাদের পেট ভরা। ভাত খাব না। রাতে খাব মা। খেলতে গেলাম।

চার ভাইবোন একছুটে বাড়ি ছাড়ে। দুপুরের খিচুড়ি খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় লুৎফর। যাবার আগে বলে, চিংড়ি ঘেরে কাজ আছে। শরীফভাইকে দেখে এসেছি। নইলে আসতাম না। যেটুকু কাজ আছে ওইটুকু না করলে মালিক আবার টাকা দেবে না। শান্তি নাই শারমিন আপা।

ও আমার দিকে তাকিয়ে একগ্রাস খিচুড়ি মুখে পুরেছিল। বলেছিলাম, প্রায় বিশ বছর আগে মানুষ ভেবেছিল চিংড়ি ঘের করে রাজা-বাদশা হয়ে যাবে। এখন দেখছি মানুষ আবার চাষের জমিতে ফিরে যেতে চায়।

সেই রকমই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। আমার মালিক আড়াই একর জমিতে ঘের করেছিল। আবার উনিশ একর জমিতে সাদা মাছের ঘের করেছিল। এই আইলায় সব ভেসে গেছে। কিচ্ছু নাই। তবে মানুষটি শক্ত। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। রাতদিন খাটে। যাই রে বুবু। আবার আসব।

তোর শারমিন আপা তো একদিন থাকবে। পারলে কিছু মাছ দিয়ে যাস।

মাত্র একদিন কেন? দুইদিন থাকেন।

শরবানু হাসতে হাসতে বলে, তুই মাছ আনলে দুই দিন ধরে রাখব। পারবি তো?

লুৎফর মাথা চুলকে বলে, আচ্ছা দেখি।

ও চলে গেলে আমি বলি, শুধু শুধু ওকে লজ্জা দিলেন বানু আপা।

লজ্জার কিছু নাই। পারলে আনবে, না পারলে ও আসবে না। আপনাদের খাইয়ে-দাইয়ে আমি নিজে খালে মাছ ধরতে যাব।

আমি খলুই নিয়ে আপনার পিছে পিছে হাঁটব।

শরীফভাই আপনি কিন্তু রাতে খেয়ে যাবেন? শরবানু হাসতে হাসতে বলে, শারমিন আপার হাতে খলুই দেখলে মাছ নিজে নিজে ডাঙায় উঠে আসবে। আমি মনের সুখে মাছ রান্না করব।

আমাদের হাসির তোড়ে ডুবে থাকে এই কুঁড়েঘরের দারিদ্র্য। আমরা ক্ষণিকের জন্য সবকিছু থেকে নিজেদের আড়াল করতে পারি।

আমাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়। শরবানু বাসন-কোসন গোছাতে গোছাতে বলে, আপনারা বসেন আমি ঘুরে আসি।

আমি বলি, তাড়াতাড়ি আসবেন।

শরবানু মৃদু হেসে অপাঙ্গে তাকিয়ে বলে, ভয় কিসের একজন তো আছেন। এখানে বাঘের ভয় নাই।

আমি মনে মনে বলি, বাঘ কি শুধু বনে থাকে। বাঘ তো লোকালয়েও থাকে। শরীফের দিকে তাকাতেই দেখি ও একদৃষ্টে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

আমি হেসে বলি, বেশ তো।

ও বলে, শব্দটা উচ্চারণে ছোট। কিন্তু আকারে বেশ বড়। অর্থে আরো বেশি মন্ময়। প্রত্যাশায় সাগর। যে-কেউ অনায়াসে একবার ডুবে আবার ডুবতে পারে।

তুমি কতবার ডুবতে পার?

হাজার হাজার বার।

সে ইচ্ছাতে এখানে এসেছ?

বলতে পার, হ্যাঁ। ইচ্ছে – একটাই। নইলে এই খোলা প্রান্তরে কেনই বা আসব। অকারণে। কিংবা একদম কোনো কাজ ছাড়া।

তোমাকে আজ কথায় পেয়েছে শরীফ।

বলতে পার পেয়েছে। একটা কথা বলব বলে এসেছি। তো কথা তো একটি শব্দে ফুরোবে না। একটি শব্দের পেছনে শত শত শব্দ আসবে। সারি বেঁধে চলে যাওয়া হাজার হাজার পিপিলিকার মতো।

আমি মুগ্ধ হয়ে শরীফের দিকে তাকিয়ে থাকি। তন্ময় হয়ে যাই। বুঝতে পারি ওকে আমার ভালো লাগছে। কোনোদিন কাউকে আমি এমন করে দেখিনি।

তুমি আমাকে ভিন্ন চোখে দেখছ হনুফা।

হনুফা।

যে-দৃষ্টি তোমার প্রতিদিনের সেটা এই মুহূর্তে তোমার চোখে নেই হনুফা।

হনুফা? তুমি আমাকে হনুফা বলছ?

আমি তো তোমাকে হনুফা বলবই বলেছিলাম।

তাহলে পুরো নামটাই বল। হনুফা বিবি।

আহ্, তুমি আমার হনুফা বিবি।

শরীফ আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরে ঢোকে এবং ঝাঁপের দরজা আটক দেয়। আমি বিলের মাঝখানে গড়ে তোলা নতুন ঘরটায় হনুফা বিবি শব্দটাই শুনতে পাই।

চারদিকে অদৃশ্য আইলার প্রবল জলস্রোত বয়ে যায়। শরীফ আমাকে বলেছিল, আইলা মানে ডলফিন। আমি এখন শরীফের সমুদ্রে এক প্রাণবন্ত ডলফিন।