দেশপাগল এক প্রকৃত মানুষ

লেখক:

পঙ্কজ ভট্টাচার্য

আমাদের সকলের প্রিয় মজুভাই, এদেশের স্থাপত্য শিল্পের পথিকৃৎ মাজহারুল ইসলাম, সম্প্রতি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। পরিণত বয়সেই তিনি বিদায় নিয়েছেন। তবু কেন জানি তাঁর তিরোধান মেনে নেওয়া কঠিন।

মজুভাইয়ের যোগ্য সহধর্মিণী আমাদের প্রিয় বেবী আপা আমার স্ত্রী রাখীকে একাধিকবার বলেছেন, ‘পঙ্কজ যেন তার মজুভাইকে একটিবার দেখতে আসে, তোমাদের মজুভাই হয়তো চিনতেও পারবে না, তবু দেখে যেতে বলো।’ প্রিয় বেবী আপার কথা রাখতে পারিনি ব্যস্ততার কারণে নয়, এরকম অবস্থায় মজুভাইকে কখনো দেখতে চাইনি বলে।

স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং তাঁর প্রিয় বাস্ত্তকলাবিদ বাংলাদেশের স্থাপত্য শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। নৈসর্গিক সুষমামন্ডিত তাঁর সৃষ্ট স্থাপত্যশিল্প আধুনিক এক নবধারা সৃষ্টি করেছে, যার স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশে তিনি পেয়েছেন নানা সম্মাননা ও পুরস্কার। তাঁর সৃষ্ট স্থাপত্যকীর্তিসমূহ স্বমহিমা ও বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে থাকবে যুগের পর যুগ। মজুভাইয়ের তিরোধানে তাঁর অনেক গুণগ্রাহী, ছাত্রছাত্রী ও শিল্পবোদ্ধা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করবেন এক বিরাট শূন্যতা, যা দীর্ঘকাল পূরণ হওয়ার নয়।

মজুভাইয়ের স্থাপত্যসাধনার কেন্দ্র ছিল স্বদেশ ও মানুষ। আর তাঁর বিশাল ও বহুমুখী কর্মকান্ডে নিয়োজিত জীবনটি কার্যত উৎসর্গিত ছিল দেশ ও মানুষের উদ্দেশে। মজুভাইয়ের স্মৃতিতর্পণে যেসব লেখালেখি হয়েছে এ-দিকটি প্রায়ই অনুল্লেখ্য থেকেছে, উপেক্ষিত হয়েছে। কেবল মতিউর রহমান ও খন্দকার মুনীরুজ্জামানের লেখা দুটি ছিল ব্যতিক্রমী। মজুভাইয়ের জীবনসাধনা ও স্বদেশভাবনা যা আমার চোখে ধরা পড়েছে তা-ই সাধ্যমতো তুলে ধরতে আমার এ-প্রয়াস।

মাজহারুল ইসলাম স্থপতি হিসেবে যশ ও মর্যাদার শিখরে পৌঁছেও অন্য কৃতবিদ্যদের মতো অর্থ, বিত্ত, বৈভব, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির পথে পা বাড়াননি। দীর্ঘকাল সামরিক স্বৈরশাসন দেশে অব্যাহত থাকায় বরেণ্য শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও দেশপ্রেমিক আমলারা ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক ক্ষমতার অংশীদার হয়েছেন – এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে মজুভাই কোনো সম্পর্ক রাখতেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-পরিজন যাঁরা সেনাশাসকদের তল্পিবাহক বা মন্ত্রী হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। দুর্নীতিবাজ, সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াপন্থী এবং ‘মুখে এক আর অন্তরে আরেক’ এমন ব্যক্তিদের ছায়াও অপবিত্র জ্ঞান করতেন তিনি।

অর্ধশতাব্দীর অধিক মজুভাইয়ের সান্নিধ্য পেয়েছি, কাছে থেকে তাঁকে দেখেছি, একসঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে সহকর্মী হিসেবে কর্মরত থেকেছি, আর প্রত্যক্ষ করেছি তাঁর অনন্য নীতিনিষ্ঠা ও জনগণের প্রতি তাঁর অবিচল দায়বদ্ধতা।

আমি যে-মজুভাইকে চিনি তাঁর জীবনের বড় অংশটি তিনি সার্বক্ষণিক কর্মীর মতো উৎসর্গ ও নিবেদন করেছেন জনকল্যাণে – জাতীয় কর্তব্য পালনে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এক বিপুল কর্মযজ্ঞে উৎসর্গ করেছেন নিজেকে।

এ-দেশকে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন, অন্যদের স্বপ্ন দেখাতেন। আইয়ুবী সামরিক শাসনের প্রথম পর্বে রবীন্দ্রনাথকে রেডিওতে নিষিদ্ধ করা – যা ছিল বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি নিশ্চিহ্ন করার শাসকগোষ্ঠীর সুপরিকল্পিত ধারাবাহিক চক্রান্ত, সে-চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদযাপনে – প্রধান বিচারপতি মোর্শেদকে আহবায়ক করে যে-বিশাল কমিটি গঠিত হয়, তার অন্যতম প্রাণশক্তি ছিলেন মজুভাই, সিধুভাই, ইত্তেফাকের ‘ভীমরুল’খ্যাত আহমেদুর রহমান, রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী জাহেদুর রহিম, সন্জীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক প্রমুখ। সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু ও অত্যাচার-হয়রানি মোকাবেলা করে এ-শতবার্ষিকীর সফলতা বাঙালির আত্মপরিচয়ের লড়াইকে উচ্চপর্যায়ে উন্নীত করে। এজাতীয় প্রতিরোধের পথ ধরে গড়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী ছায়ানট। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংস্কৃতি সংসদের’ উদ্যোগে পরপর তাসের দেশ, রক্তকরবী, চিত্রাঙ্গদা প্রভৃতি নৃত্যনাট্য অনুষ্ঠিত ও প্রশংসিত হয়। মজুভাই ছিলেন এসব কর্মকান্ডের অন্যতম প্রধান কর্মী। তাঁর পরীবাগের বাড়িটি ছিল এসব কর্মকান্ডের প্রাণকেন্দ্র। ’৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ নামে প্রকাশিত অভিন্ন সম্পাদকীয় প্রকাশ, দাঙ্গাবিরোধী জাতীয় প্রতিবাদ সংগঠিত করার কাজ, দাঙ্গা-উপদ্রুত নর-নারীর জন্য সাহায্য-সামগ্রী সংগ্রহ ও দাঙ্গাবিরোধী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের মতো কার্যক্রমে মজুভাই ছিলেন অন্যতম প্রধান (যদিও তিনি থাকতেন পাদপ্রদীপ থেকে অনেক দূরে)। মজুভাইয়ের ধানমন্ডির বাড়িতে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির মণি সিংহ, আবদুস সালাম, খোকা রায়, মো. ফরহাদসহ নেতাদের মে দিবসের গোপন অনুষ্ঠান এবং ন্যাপ নেতা ও কমিউনিস্ট নেতাদের মতবিনিময়ের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। সামরিক শাসনের কড়াকড়ির মধ্যে বিনা দ্বিধায় এ-ঝুঁকি তিনি নিতেন।

’৬২ সালে ন্যাপ পুনরুজ্জীবিত হলে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হন, গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখতেন সমাজ পরিবর্তনের স্বার্থে। তিনি আওয়ামী লীগের তাজউদ্দীনসহ সৎ, নির্ভীক নেতাদের সঙ্গেও সংযোগ রাখতেন, রাখতেন তৎকালীন মুজিবভাইয়ের সঙ্গেও। দলের নামে দলবাজি, কট্টরবাদী বা সংকীর্ণতাবাদীদের বিরুদ্ধে মজুভাই ছিলেন স্বোচ্চার। দলীয় সীমানার মধ্যে মজুভাই আটকে থাকতেন না। জাতীয় জাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে মজুভাই তাঁর জাতীয় কর্তব্যপালনে ছিলেন সদাব্যস্ত।

’৬৪ সালে চট্টগ্রামের ঘূর্ণিঝড়, ’৬৯ সালে ডেমরার ঘূর্ণিঝড়, ’৭০-এ বৃহত্তর বরিশালের ‘জলোচ্ছ্বাস’ এবং একাধিক বন্যার ক্ষেত্রে তিনি জাতীয় বিপর্যয়ে তাৎক্ষণিক ত্রাণকার্য ছাড়াও ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখার ক্ষেত্রে বাস্ত্তকলাবিদে বসে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রস্তাব-প্রস্তাবনা তৈরি করে সরকার-প্রশাসনকে দিতেন স্বউদ্যোগে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসন পড়েও দেখেনি।

মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার এই বড়মাপের মানুষটি ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ দ্বিধাহীনভাবে তুলে ধরতেন, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার/ অপব্যবহার প্রশ্নে দৃঢ় বিরোধিতা করতেন, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল, অন্ধভক্তি নয় – এ-তত্ত্বের সৃজনশীল অনুশীলনে ছিলেন অনুরক্ত।

মুজিবনগর সরকারের কর্মকান্ডে তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন, বিশেষত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিতেন। তখন কলকাতার নাসিরউদ্দিন রোডে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও সাপ্তাহিক নূতন বাংলা কার্যালয়ে স্বেচ্ছাসেবীর মতো তিনি কাজ করেছেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা, হাজার হাজার কম্বল জোগাড় করার ক্ষেত্রে মজুভাই আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে কর্মরত থাকতেন। সাহিত্যিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সহায়ক সমিতিতে তিনি বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিক-অর্থনীতিবিদ-দেশপ্রেমিক আমলাদের যুক্ত করার কাজও চালিয়ে গেছেন।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে স্বউদ্যোগে মজুভাই নানা পরিকল্পনা ও কাজে হাত দিয়েছেন – প্রশাসনকে সহায়তা দিতে সচেষ্ট ছিলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসনের উদ্যোগহীনতায় মজুভাই হতাশ ও ক্ষুব্ধ হতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের কর্মসূচি যখন প্রণয়ন করেন, সেক্ষেত্রে মজুভাই কৃষি সমবায় সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনা বঙ্গবন্ধুকে বিবেচনার জন্য দেন; একাধিক বৈঠকও করেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। মজুভাইয়ের পরিকল্পনা বাকশালের কৃষক সমবায় কর্মসূচিতে এভাবে যুক্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারের হত্যাকান্ডের পর মজুভাই সপরিবারে ’৭৫ থেকে ’৭৮ সাল পর্যন্ত অধিকাংশ সময় কলকাতায় এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে কাটান। জাতির জনকের হত্যাকারীদের রাজত্বে তিনি স্বদেশে ফিরবেন না, এ-কথা বলতেন। কলকাতার পার্ক সার্কাসের ঝাউতলার এক ছোট ফ্ল্যাটে কষ্টের জীবনকে বেছে নেন তিনি। এখানে অপর স্বেচ্ছানির্বাসিত সাহিত্যিক শওকত ওসমান প্রায়ই আসতেন, আসতেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী কল্পনা যোশী (দত্ত)। এ-বাসায় আমিও আশ্রয় পেয়েছি।

’৭৮ সালে মজুভাই আওয়ামী লীগে যোগ দেন; কিন্তু আওয়ামী লীগে বিভক্তি এলে মহীউদ্দীন আহমদ ও আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে নবগঠিত বাকশালে যোগ দেন, পরবর্তীকালে বাকশালকে আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত করতেও তিনি উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। আমৃত্যু আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে চেষ্টা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ধারা ও চেতনার দলটিকে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করাতে। বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান কর্মী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত গণআন্দোলন ও গণআদালতের তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ কর্মী।

বাংলাদেশের জন্মের পূর্বাপর উত্থান-পতনের সকল ঘটনা-দুর্ঘটনায় মজুভাই দেশ ও দেশবাসীকে বুক দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছেন সব সময়। এরকম দেশপাগল এবং জনগণ ও দেশের কল্যাণে দায়বদ্ধ অনন্যসাধারণ প্রকৃত মানুষ আমাদের দেশে কজন আছেন?

মজুভাইকে এহেন মজুভাই হতে যিনি বন্ধুর মতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন নিত্যদিন, হাসিমুখে সংগত-অসংগত কারণে রাগত মজুভাইকে সামাল দিতেন অসীম মমতায়, মজুভাইয়ের পথের পথিক বেবী আপাকে কী  সান্ত্বনা দেব? রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী, মুজিবনগরের সাংস্কৃতিক দলের সদস্য ডালিয়া (ডালি), কন্যাতুল্য নাজিয়া, পুত্রদ্বয় তান্না ও রফিকের পিতৃশোকের বেদনা – মাথার ওপর বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার মতো শূন্যতার পাশাপাশি আমি একজন সমাজ প্রগতির কর্মী হিসেবে গুরুস্থানীয় মজুভাইকে হারিয়ে অনেকটা অভিভাবকহীন হয়েছি। জাতি কি অভিভাবকহীন হয়নি?

গুরুর প্রতি শিষ্যের সামান্য এ-স্মৃতিতর্পণ শেষে প্রার্থনা করি, মজুভাইয়ের আত্মা শান্তি পাক।