নজরুল-প্রসঙ্গে শওকত ওসমান একটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

লেখক:

আবুল আহসান চৌধুরী

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) মেজাজে-মননে ছিলেন উদার-আন্তরিক-মজলিশি চেতনার সক্রিয় সামাজিক মানুষ। তাঁর ব্যক্তিত্বের সম্মোহনে সাহিত্য-সংস্কৃতি-সংগীত-রাজনীতি ও অন্যান্য পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রচিত হয়। সহজেই মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক সহজাত প্রবৃত্তি ও অসামান্য ক্ষমতা ছিল নজরুলের। তাঁর ভক্ত-অনুরাগী-সুহৃদ-শুভার্থীর সংখ্যা ছিল অগণন। এই নজরুল-মন্ডলীর সঙ্গে যেমন নজরুলের জ্যেষ্ঠ ও সমবয়সীরা যুক্ত ছিলেন, পাশাপাশি তেমনি অনুজপ্রতিমরাও বাদ পড়েননি। এই শেষের প্রজন্মের মধ্যে সমমনা কয়েকজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় – তাঁরা হলেন : শওকত ওসমান (১৯১৭-৯৮), আবু রুশ্দ (১৯১৯-২০১০), গোলাম কুদ্দুস (১৯২০-২০০৬) ও আবুল হোসেন (জ. ১৯২২)। এই চারজন ছিলেন খুবই অন্তরঙ্গ – সাহিত্যই তাঁদের বন্ধুতার সুতোয় একসঙ্গে বেঁধেছিল। এঁদের পরিচয় ও সখ্য কলকাতায় উত্তরতিরিশের কালে – কারোরই তখন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাট চোকেনি। এঁরা কলকাতায় জুটেছিলেন হুগলি, কুষ্টিয়া ও খুলনা থেকে। আবু রুশ্দের জন্ম ও বেড়ে ওঠা অবশ্যি কলকাতাতেই। এই চারজনেরই লেখালেখির হাতমকশো তিরিশের মাঝামাঝি থেকে – চল্লিশের দশকে এঁদের নাম ফুটতে শুরু করে। এই চার বন্ধুর মধ্যে প্রথম বই বের হয় আবু রুশ্দের – রাজধানীতে ঝড় নামে একটি গল্প-সংকলন, ১৯৩৯-এ। তাঁর পরের বই উপন্যাস এলোমেলো, প্রকাশকাল ১৯৪৬। এঁদের মধ্যে প্রথম কবিতার বই প্রকাশ পায় আবুল হোসেনের – নববসন্ত ১৯৪০ সালে। তারপর ১৯৪৪-এ শওকত ওসমানের তিনটি বই বের হয় – তস্করলস্কর (নাটক) এবং দুটি শিশুতোষ উপন্যাস ওটেন সাহেবের বাংলো ও তারা দুইজন। দুবছর পর বেরোলো বনী আদম (১৯৪৬) উপন্যাসটি। গোলাম কুদ্দুসের প্রথম কবিতার বই বিদীর্ণ প্রকাশ পায় আরো পরে, পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় (১৩৫৭)। এই চারজনের মধ্যে অবশ্যি শেষের দুজনের সঙ্গেই নজরুলের যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বেশি ছিল। এই দুজনের মধ্যে আবার গোলাম কুদ্দুসের নাম আগে আসে। শওকত ওসমান এক চিঠিতে জানিয়েছেন : ‘মরহুম হবীবুল্লাহ্ বাহার-সম্পাদিত বুলবুল পত্রিকায় প্রকাশিত তিনটি কবিতা দিয়ে আমার সাহিত্যজীবন শুরু। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ। ১৯৪১-এ মাত্র তিন বছরের নবিশিকাল। কিন্তু তখনই সতীর্থ-বন্ধু কবি আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুস, গাল্পিক-ঔপন্যাসিক আবু রুশ্দ এবং এই অধম, কবির স্নেহাশ্রয় লাভ করেছিল। কবি গোলাম কুদ্দুসের প্রতি নজরুলের স্নেহ এবং পক্ষপাত ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পড়ত’ (শওকত ওসমান স্মারকগ্রন্থ : সেলিনা বাহার জামান সম্পাদিত; ঢাকা, মে ২০০৪; পৃ ৬৪)। নজরুলের অসুস্থতার আগে প্রকাশিত আবু রুশ্দের গল্পের বই নজরুলের হাতে পড়েছিল কিনা জানা যায় না। তবে আবুল হোসেনের কবিতার বই নববসন্ত নজরুল পড়েছিলেন এবং কবিতার বিষয় ও ভাবে যে খুশি হননি, সে-কথা সরাসরি জানাতে দ্বিধা করেননি। নজরুল পছন্দ করতেন গোলাম কুদ্দুসের কবিতা, তা সমাজ ও জীবনঘনিষ্ঠ বলে। এসব কথা আবুল হোসেনের সূত্রেই জানা যায়।

জননী (১৯৫৮), ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২), সমাগম (১৩৭৪), রাজা উপাখ্যান (১৩৭৭), জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), রাজসাক্ষী (১৯৮৩), পতঙ্গ-পিঞ্জর (১৯৮৩), রাজপুরুষ (১৯৯২) উপন্যাস এবং পিজরাপোল (১৯৫০), জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প (১৯৫২), সাবেক কাহিনী (১৯৫৩), প্রস্তর ফলক (১৯৬৪), নেত্রপথ (১৯৬৮), জন্ম যদি তব বঙ্গে (১৯৭৫), এবং তিন মীর্জা (১৯৮৬), মনিব ও তাহার কুকুর (১৯৮৬), হন্তারক (১৯৯১) প্রভৃতি গল্পের বইয়ের লেখক শওকত ওসমান মূলত কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হলেও প্রবন্ধ-নাটক-স্মৃতিকথা-অনুবাদ-শিশুসাহিত্য এসব শাখাতেও তাঁর আগ্রহের পরিচয় মিলবে। তবে তাঁর লেখালেখির শুরুটা কবিতা দিয়েই – প্রথমে বুলবুল, পরে মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায়। এরপর রীতিমতো গল্প-উপন্যাস লেখায় হাত দেওয়ায় কবিতাচর্চায় ছেদ পড়ে। জীবনের শেষপর্বে আবার কবিতায় ফিরে আসেন – সে এক নতুন ধরনের কাব্য-খেয়াল তাঁর – পরিচিত প্রিয় মানুষকে তিনি দু-চার-ছয়-আট পঙ্ক্তির অন্ত্যমিলের পদ্য লিখে উপহার দিতেন – কাউকে বই উপহার দিলেও এই কাব্য-কণিকা তাতে অনিবার্যভাবে যুক্ত হতো। রাজনীতি বা সাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে আশির দশক থেকে তিনি প্রায় নিয়মিত এই ধরনের পদ্য লিখে গেছেন এবং তা সংবাদপত্রের সাময়িকীর পাতায় ছাপাও হয়েছে। এই একেবারে নতুন ধরনের মূলত ব্যঙ্গধর্মী শ্লেষাত্মক পদ্য দুখন্ডে ১৯৯২ সালে বের হয়। শেখের সম্বরার দশ বছর আগে শওকত ওসমানের প্রথম কবিতার বই নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত (১৯৮২) প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি এখানে সংকলিত আলাপচারিতায় এই ধরনের পদ্য লেখার প্রেরণা যে নজরুলের কাছ থেকেই পেয়েছেন, সে-কথা কবুল করেছেন।

 

দুই

নজরুল সম্পর্কে শওকত ওসমানের যে আকর্ষণ-অনুরাগ গড়ে উঠেছিল তিরিশের দশকে, তা কখনো নিঃশেষিত হয়নি।    নজরুল-বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত মূল্যায়ন ও সশ্রদ্ধ মনোভাবের পরিচয় মেলে ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’ নামের এক প্রবন্ধে, পরে যা তাঁর সমুদ্র নদীসমর্পিত (১৯৭৩) প্রবন্ধ-সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। এখানে খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে সূত্রাকারে তিনি নজরুলের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট, মুসলিম সমাজে তাঁর স্থান-অবস্থান, তাঁর প্রগতিমুখী সামাজিক ভূমিকার যে বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন, তাঁর কিছু পরিচয় তুলে ধরা প্রয়োজন :

এম্নিতে জাতীয়তাবাদ সূত্রপাতে সার্বজনীনতার কণ্ঠস্বর হয়েই ফুটে উঠে। তদুপরি নানা দেশী-বিদেশী ভাবধারার সঙ্গম। এমন নির্মল ধারাস্নাত নজরুল স্বদেশের সকল ঐতিহ্যের সঙ্গে কোলাকুলি-মত্ত হন অতি সহজে। শ্যামা-সংগীত রচয়িতা কবি নজরুল ধর্মীয় অনুশাসনের মাপকাঠিতে খারিজ হয়ে যেতে পারেন, কিন্তু মানবিকতার মহৎ ধর্ম তিনি পালন করেছিলেন লা-পরোয়া।… একদা লেটোর দলভুক্ত কিশোরের মানস-পটভূমি যেন ভবিষ্যৎ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের জন্যেই তৈরী হয়েছিল। আপামর জনসাধারণের কাছাকাছি যেতে নজরুলের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন কোথায়?… অবহেলিত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সুর কি ঝুমুর, কি ভাটিয়ালী গানের প্রসারতা তখন সহজে দৃষ্ট হয়। সুরকার নজরুল সব টেনে আনেন সংগীতের আসরে।… পরবর্তীকালে আঞ্চলিক সংগীত সহজে তাঁর কাছে ধরা দেয়। পলাতক কিশোরের এক পর্যায় কাটে পূর্ববঙ্গে। জারী, ভাটিয়ালী প্রভৃতি গান প্রতিভার দোসর হওয়া স্বাভাবিক।… নজরুলের সামাজিক রাজনৈতিক ব্যঙ্গ কবিতা গানে লোকজ সংস্কৃতির ছাপ অতি স্পষ্ট। কীর্তন গান বঙ্গদেশের প্রত্যন্ত সীমায় ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। সেখানে নজরুলের কৃতিত্ব যেন সহজাত। কারণ, পটভূমি তৈরী ছিল।… মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সৈনিকরূপে নজরুলের পরিচয়। উক্ত অঞ্চলের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে একজন বাঙালী জাতীয়তাবাদীর একাত্মতা-অনুভব স্বাভাবিক।… জগলুল পাশা, রীফ নেতা আবদুল করিম, আনোয়ার পাশা, কামাল আতাতুর্ক নজরুলের কাব্যবিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হন স্বাভাবিক নিয়মে। বাংলার     জল-ভরণী বঁধুর দেহাবয়বের রণনে ফুটে উঠে মোতাকারিব ছন্দ, বৃক্ষঝরা শুষ্কপত্রের নূপুরে আর্বী লোক-সংগীতের সুর ধ্বনিত হয়। স্বতঃই এসে পড়ে বাংলার গানে গজলের প্রেমসিক্ত মূর্ছনা এবং গীত-ঢং। এই বহুমাত্রিকতার পেছনে ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, অবিশ্যি তার কাঠামো সর্বভারতীয়। [পৃ ১৪১-৪২]

জাতীয়তাবাদের স্রোতগতি এক খাতে চলে না। সামন্ততান্ত্রিক মোহভঙ্গ-ব্রত জাতীয়তাবাদীদের নিতেই হয়। স্বাধীনতার উদ্গাতারূপেই নজরুল বিদ্রোহী আখ্যা পান। সমাজের ক্ষেত্রেও তাঁর অকুতোভয় অগ্নিগিরিসদৃশ তেজোদীপ্ত মূর্তি তুলনা-বিরল।    [পৃ ১৪২]

নজরুল-কে পাকিস্তানে জাতীয় কবি-রূপে গ্রহণ, স্ববিরোধিতার আর এক চরম নজীর। আজীবন পাকিস্তান-বিরোধী এবং ভারতীয় নাগরিক – অদ্যাবধি – তথাকথিত মুসলিম জাতীয়তাবাদের কাছে পূজ্য ব্যক্তি হয়ে ওঠে। একদা-স্ববিরোধিতায় যে-দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রারম্ভ, স্ববিরোধেই তার পরিসমাপ্তি ঘটে। ইতিহাসের স্রাব পাকিস্তানেই এমন প্রহসন অভিনীত হতে পারে। নজরুল নিজের জোরে মুসলমান সমাজে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তাঁকে জায়গা দেওয়া হয়নি। [পৃ ১৪২-৪৩]

বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে

বিবি-তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি কোরাণ ও হাদিস চষে।

এমন বিদ্রূপ-হানা সমাজ-সংস্কারকের ভূমিকায় কবি মহৎ চারণের রূপে প্রমূর্ত। জনতার কণ্ঠস্বর তিনি। রবীন্দ্র-বলয় থেকে প্রক্ষিপ্ত আর এক গ্রহের মতো তার বিকাশ-দীপ্তি। সেখানে তিনি অতুলনীয়, আশ্চর্য পেশলতায় অনন্য। অথচ তাঁর শৈল্পিক উপাদান অতি সাধারণ। নিরাভরণ শব্দের সাহায্যে ধ্বন্যাত্মক মন্ত্রের অনুরণন গড়ে তোলার কারিগর তিনি। মানবপ্রেমিক কবি যেন মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্যে নিজস্ব শৈলী আবিষ্কার করেন। [পৃ ১৪৩]

নজরুলকে নিয়ে শওকত ওসমানের এই যে মূল্যায়ন – নজরুল-ব্যক্তিত্বের যে বৈশিষ্ট্য তিনি নির্দেশ করেছেন – তা তিনি আজীবন অন্তরে লালন করে তাঁর শৈল্পিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক ভূমিকা পালনে প্রেরণা পেয়েছেন। শওকত ওসমানের বিবেকী ভূমিকা, মানবিক চিন্তা, মুক্তমন ও স্বচ্ছদৃষ্টির যে শিক্ষা – তার জন্যে তিনি অনেকখানি ঋণী নজরুলের কাছে। নজরুলের সঙ্গে তাঁর কিছু স্বভাব ও চরিত্রগত মিলও ছিল – জীবনযাপনেও। দারিদ্র্য, অবিমৃশ্যকারিতা, খামখেয়ালিপনা, সংস্কার ও প্রথার দাসত্ব থেকে সর্বরকমে মুক্ত হওয়া, প্রগতির পথ থেকে সর্বরকমে কখনো সরে না আসা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা – এসব দিক দিয়ে এ-সাদৃশ্য স্পষ্ট।

তিন

 

নজরুলের প্রতি শওকত ওসমানের যে শ্রদ্ধা-মনোযোগ-আবেগ-দুর্বলতা ছিল তার পরিচয় নানা সূত্রে পাওয়া যায়, যেমন তাঁর কথোপকথন, স্মৃতিচারণা, চিঠিপত্র ও অন্যদের সাক্ষ্যে।

১৯৯৬-এর ১৭ নভেম্বর, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪০৩, রোববার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় শওকত ওসমানের ঢাকার ৭ মোমেনবাগের বাড়িতে বসে ৯০ মিনিটের একটি বড় সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। আমাদের কথোপকথন ছিল দুই পর্বে বিভক্ত : প্রথমে আলাপ হয় তাঁর জীবন, সাহিত্য ও নানা বিষয়ে তাঁর মত-মন্তব্য নিয়ে। আর দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা একান্তই ছিল নজরুল-বিষয়ে তাঁর স্মৃতি ও মূল্যায়নকেন্দ্রিক। আমাদের এই শেষপর্বের আলাপচারিতায় যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, সে-বিষয়ে অন্যত্র শওকত ওসমান যা বলেছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে যা বিশদ ও নির্ভুলভাবে পরিবেশিত, তা এখানে উদ্ধার করা প্রয়োজন :

ক. নজরুলের সঙ্গে শওকত ওসমানের প্রথম সাক্ষাৎ ও আলাপ।

খ.  শওকত ওসমানকে নজরুলের অটোগ্রাফ : হারানো ও প্রাপ্তি।

গ. বনগাঁর সাহিত্যসভায় নজরুলের বক্তৃতা ও শওকত ওসমানের প্রতিবাদ এবং তার প্রতিক্রিয়া।

ঘ.  কলকাতায় কালচারাল মজলিশের সভায় নজরুলের অনবদ্য বক্তৃতা।

ঙ.  শওকত ওসমানের উদ্যোগে নজরুল-স্মারক তথ্যদলিল উদ্ধার-সংগ্রহ এবং তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণের জন্যে প্রদান।

চ.  নজরুলের জন্মদিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার শুরু : শওকত ওসমানের সাক্ষ্য।

ছ.   শওকত ওসমানের নজরুল-মূল্যায়ন।

নজরুলের সঙ্গে শওকত ওসমানের প্রথম দেখা কোথায় এবং কোন সালে এ-প্রসঙ্গে তিনি দুরকম কথা বলেছেন আমাকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে। একবার বলেছেন হিজ মাস্টার্স ভয়েসের চিৎপুর রোডের বাড়িতে ১৯৪০ বা ১৯৪০-৪১-এ, সেখানে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন বুলবুল পত্রিকার সম্পাদক হবীবুল্লাহ্ বাহার। আবার পরক্ষণেই বলেছেন, বোধহয় কলকাতার ঝাউতলা রোডে নজরুলসুহৃদ ও অনুরাগী সুফী জুলফিকার হায়দারের বাসায়, ১৯৪১ সালে। আসলে জুলফিকার হায়দারের বাড়িতেই তিনি প্রথম নজরুলের মুখোমুখি হন – সালটা ১৯৪০ – নজরুল তাঁকে যে কাব্য-আশীর্বাণী লিখে দেন তা থেকে নিশ্চিত সাল-তারিখের হদিস পাওয়া যায়। তবে এইচএমভি-র আপিসেও তিনি নিশ্চয়ই গেছেন এরপরে – হয়তো প্রথমে হবীবুল্লাহ্ বাহার এবং পরে বন্ধু কবি আবুল হোসেনের সঙ্গে।

সুফি জুলফিকার হায়দারের বাসায় শওকত ওসমানের খাতায় নজরুল এই অটোগ্রাফ দেন :

শ্রীমান

শওকত ওসমান

কল্যাণীয়েষু

আছে সত্যের পূর্ণ স্বরূপ

চূর্ণিত পরমাণুতে

আছে দেহাতীত অজানা অরূপ

তোমারই বদ্ধ তনুতে।

নজরুল ইসলাম

১৭ই ভাদ্র

১৩৪৭।

নজরুলের এই আশীর্বাণী – এই স্নেহোপহার ছিল শওকত ওসমানের পরম প্রাপ্তি – অমূল্য সম্পদ। কিন্তু যে নোটবইয়ে নজরুল এই চতুষ্পদীটি লিখে দেন, তা একসময় অসাবধানে হারিয়ে যায়। নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কবি-প্রাবন্ধিক-সমালোচক-সাংবাদিক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহকে ১৯৮৮-এর ১৯ জুন লেখা এক চিঠিতে শওকত ওসমান খেদ মিশিয়ে এ-বিষয়ে লিখেছেন :

আমাদের কৈশোর-যৌবন কেটেছিল নজরুলের আচ্ছন্নতায়। তাঁর অন্তর্ধানের বারো বছর পরে আজ যখন পেছনে তাকাই, তখন অনেক অনুতাপ এসে জোটে। পরে সেইসব কথা জনসমক্ষে প্রকাশের বাসনা রইল। আজ একটি আফশোষের কাহিনী আপনাদের না জানিয়ে রাখলে স্বোয়াস্তি পাব না।

১৯৪১ খ্রীষ্টিয় সন। মাস মনে নেই। তবে গ্রীষ্মকাল। মরহুম সুফী জুলফিকার হায়দার সাহেব নজরুলকে তাঁর বাস-ভবন, কলকাতার পার্ক-সার্কাসস্থ এলাকা, ৮৪ নং ঝাউতলায় দাওয়াৎ করেছিলেন। আমার মত আরো কয়েকজন নিমন্ত্রিত সেখানে জড় হয়। কোন সাহিত্য-সভা নয়, উদ্দেশ্য ছিল, নিছক ঘরোয়া বৈঠক। এমন মজলিসে নজরুল আছেন।… সেই মজলিসে কোন এক ফাঁকে আমি একটি নোট-বই   কবি-সমীপে এগিয়ে দিয়েছিলাম কিছু লেখার অনুরোধসহ। ইংরেজদের ইন্সটেনটিয়াস কফির মত (তাৎক্ষণিক কফি) তিনি লিখে দিলেন :

শওকত ওসমান কল্যাণীয়েষু

বিশ্বব্রহ্মা-স্বরূপ

আছে চূর্ণ অণু-তে

আছে অজানা অরূপ

তোমার বদ্ধ তনু-তে।

কবির সর্বেশ্বরবাদী, মিষ্টিক ওই বাণী দেশ-বিভাগের পরও সন ১৯৬০-৬১ পর্যন্ত আমার কাছে ছিল। পরে ওই নোটবই আর খুঁজে পাইনি। সব চেষ্টা বিফলে গেছে। নজরুলের গান নয়, শুধু তাঁর ছোঁয়াচ-পাওয়া বহু চিজের জন্যে আমার লালসা কিরূপ, তা আপনাকে লিখে জানাতে পারব না। নজরুলীয় কিছু যোগাড় করতে পারলে, আমার উত্তেজনা-উৎসাহ সম্পর্কে আপনি কিছুটা ওয়াকিবহাল। সেইক্ষেত্রে আমার গচ্ছিত সম্পদ আমি কী করে খুইয়ে বসলাম, এমন প্রশ্নের জবাব দিতে আমি অক্ষম।…

১৯৩৮-১৯৮৮। সুদীর্ঘ পঞ্চাশ বছর কথা-রচনার পাগলামির ভিতর কাটিয়ে দিয়েছি।… অনেক অনুতাপ আছে বুকে। কিন্তু নজরুলের স্নেহস্পৃষ্ট পাথেয় সহসা খুইয়ে ফেলার বেদনা কিছুতেই মুছে ফেলতে পারিনে।… [শওকত ওসমান স্মারকগ্রন্থ : সেলিনা বাহার জামান সম্পাদিত; ঢাকা, মে ২০০৪; পৃ ৬৩-৬৫]

ওপরের চিঠির প্রায় আট মাস পরে ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহকে আরেকটি চিঠিতে শওকত ওসমান হারিয়ে যাওয়া নজরুলের কাব্য-আশীর্বাণীটি আকস্মিকভাবে হাতে পাওয়ার খবর জানিয়ে লেখেন :

আপনি জেনে খুশী হবেন নজরুল-সংক্রান্ত কয়েকটি মূল্যবান দলীল সংগ্রহে আমি সফল হয়েছি। বিবরণী পরে সাক্ষাৎ-মত তবে একটি লুপ্ত সংবাদ বর্তমানে আমার কাছে ফিরে এসেছে…। ১৩৪৭ সালের ১৭ই ভাদ্র মাসে মরহুম জুলফিকার হায়দারের কলিকাতাস্থ ৮৪ নং ঝাউতলা রোডের বাসায় অনুষ্ঠিত মজলিসে আমার খাতায় নজরুল একটি বাণী লিখে দিয়েছিলেন। বাণীর বিষয়বস্ত্ত ও কথা আমার আবছা মনে ছিল। আপনাদের বিগত সংখ্যা পত্রিকায় এক পত্রে কিছু স্মৃতিচারণের চেষ্টা পাই। কিন্তু এবার মূল দলীল এক অনুরাগীর কল্যাণে আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। আর অন্ধকারে হামাগুড়ি দেওয়া নিষ্প্রয়োজন।… [শওকত ওসমান স্মারকগ্রন্থ : পূর্বোক্ত; পৃ ৬৭]

এখানে প্রকাশিত আলাপচারিতায় শওকত ওসমান বনগাঁর সাহিত্যসভার যে স্মৃতিচর্চা করেছেন, তা যেমন মিলিয়ে নেওয়া যায় এবং সেইসঙ্গে অতিরিক্ত কিছু তথ্যও পাওয়া যায় ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি আবুল হোসেনের ভাষ্যে – এই সাক্ষাৎকারটিও আমি গ্রহণ করেছিলাম ১৯৯৮-এর ১৩-১৪ ফেব্রুয়ারি, যা পরে দুই পর্বে ঢাকার প্রতিপদ পত্রিকায় (এপ্রিল ২০০৫) ছাপা হয়। আবুল হোসেন জানিয়েছেন :

১৯৪১ সালের মাঝামাঝি হবে – বনগাঁয় একটা      সাহিত্য-সম্মেলনের আয়োজন করল ওখানে তখনকার এসডিও মীজানুর রহমান। মীজানুর রহমান নজরুল ইসলামের খুব অনুরাগী ভক্ত ছিলেন। সেখানে নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রধান অতিথি। দুটি বাসে করে আমরা কলকাতা থেকে লেখক-সাহিত্যিকরা ওখানে গেছিলাম। তাঁদের মধ্যে সবাই সেকালের পরিচিত লেখকবৃন্দ – বিশেষ করে মুসলমান লেখকরা প্রায় সবাই ছিলেন ওখানে। তরুণদের মধ্যে আমি ছিলাম, আবু রুশ্দ ছিল, শওকত ওসমান ছিল।… সভা শুরু হলে নজরুল ইসলাম বক্তৃতা করতে উঠলেন। আমরা ভেবেছিলাম যে, নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যজীবনের কথা বলবেন – তাঁর সাহিত্যিক  ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে কিছু বলবেন। বিশেষ করে সেই চল্লিশের সময়ে তখন মার্কস্ইজমের খুব একটা জোয়ার চলছে। কম্যুনিস্ট পার্টির উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। তো তখন মার্কসিস্ট লেখকরা সাহিত্যের সমালোচনার ধারাটা বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আমরা ভেবেছিলাম যে, শিল্পের সঙ্গে সমাজের কি সম্পর্ক এরকম কিছু একটা কথা নজরুল ইসলাম বলবেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম এসবের ধারেকাছেই গেলেন না। না গিয়ে তিনি শুধু মিস্টিসিজমের কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি অভেদমের কথা বলছিলেন। তিনি বললেন যে, ‘আমি মধুরমের সাক্ষাৎ পেয়েছি। সেই মাধুর্যের মধ্যে আমি ডুবে আছি।’ শওকত ওসমান তো সবসময় একটু চঞ্চলমতি, চিরকালই একটু হৈচৈ করেন বেশি। বিশেষ করে ধর্মের নাম শুনলে শওকত ওসমান লাফিয়ে ওঠেন। নজরুল যখন এইরকম এইসব কথা বলছেন, তখন শওকত ওসমান উঠে প্রতিবাদ করতে শুরু করল – চেঁচিয়ে। আর তখন একটা খুব সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটে গেল। কেননা সেকালে নজরুল ইসলামকে কেউ বাধা দেবে এটা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। নজরুল যখন কিছু বলছেন তাঁকে কেউ বলতে দেবে না – বাধা দেবে এটা ভাবা যায় না। তো হৈহৈ করে সমস্ত সভার লোক ক্ষেপে গিয়ে বলল – ‘ধর ধর’। তখন আমরা পালাতে আর পথ পাই না – কি করে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায় –  আমি, শওকত ওসমান, আবু রুশ্দ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঐ সভায় ছিলেন। ওঁর বাড়ি বনগাঁয়। উনি আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে এসে আমাদের নিয়ে গেলেন ওঁর বাড়িতে। ওঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চিড়ে-মুড়ি-গুড় খেতে দিলেন।… [পৃ ৪১১]

এরপর আবুল হোসেনকে প্রশ্ন করি : শওকত ওসমানের এই প্রতিবাদের কি কোনো প্রতিক্রিয়া হয়েছিল নজরুলের মধ্যে? – এর জবাবে আবুল হোসেন বলেন :

নজরুলের কোনো প্রতিক্রিয়াই হয়নি। নজরুল যে ওঁর কথা শুনেছেন এটাই মনে হচ্ছিল না। নজরুল নিজের মনে আপন মনে কথা বলে যাচ্ছেন ঐ সভার কোণ থেকে – এমনকি এই যে হৈ চৈ করে সব লোক ধাওয়া করেছে ক’জন তরুণকে এটাও নজরুলের যে চোখে পড়েছে মনে হলো না। তিনি নিজের মধ্যে নিজে ডুবে ছিলেন। তিনি নিজের কথাই বলে যাচ্ছিলেন। কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি তাঁর মধ্যে।              [পৃ ৪১১-১২]

আরেকটি সভায় নজরুলের বক্তৃতার কথা উল্লেখ করেছেন শওকত ওসমান তাঁর এই আলাপচারিতায়। ‘কালচারাল মজলিশে’র এই ঘরোয়া সভাটি হয়েছিল কলকাতায় আবু রুশ্দের বাসায়। এই সভায় কবি আবুল হোসেনও উপস্থিত ছিলেন, তাঁর সূত্রে এর যে বিবরণ পাওয়া যায় তা এইরকম :

আরেকটি সভায় নজরুলকে পেয়েছিলাম। আবু রুশ্দ তাঁদের বাড়িতে ‘কালচারাল মজলিশ’ বলে একটা সঙ্ঘ করেছিলেন। এই ‘কালচারাল মজলিশে’ নজরুল ইসলামকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল কিছু বলবার জন্য এবং তাঁকে বলা হলো, ‘আপনি রসলোক সম্পর্কে বলেন।’ আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করলাম যে, নজরুল ইসলাম সেদিন অ্যাস্থেটিক্স-এর আলোচনা করেছিলেন। তিনি এই যে অ্যাস্থেটিক্সের আলোচনা করছেন – রসলোক সম্পর্কে আলোচনা করছেন – এর মধ্যে একবারও কোনো মনীষীর নাম করলেন না – কে কি বলেছেন এ সম্পর্কে বললেন না, তাঁর নিজের মধ্যে থেকে নিজের জীবনে কি দেখেছেন সেটাই তিনি বললেন। আশ্চর্য, এমন সুন্দরভাবে বললেন যে, ওটা শুনে মনে হচ্ছিল যে এ লোকটা কতো বড় বিজ্ঞ লোক –  কতো বড় পন্ডিতলোক। যদিও তিনি মোটেই পন্ডিত ছিলেন না এবং সেই সভায় অমিয় চক্রবর্তী উপস্থিত ছিলেন – ড. নীহাররঞ্জন রায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা একেবারে অবাক হয়ে গেছিলেন নজরুল ইসলামের কথা শুনে। [পৃ. ৪১২]

নজরুলের এই অনবদ্য ভাষণটি কোথাও ছাপা হয়নি, যেহেতু এর শ্রুতিলিখনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে। এ-বিষয়ে আবুল হোসেনের বক্তব্য :

তখন এই শ্রুতিলিখন নেওয়ার কোনো ব্যবস্থাও ছিল না এবং সেটা কেউ ভাবেওনি এসব লিখে রাখা উচিত। রাখলে খুব ভালো হতো। অথবা যদি এই বক্তৃতা শুনে কেউ নিজেরা লিখে রেখে এটা ছাপতেন কোথাও তা হলে খুব ভালো হতো। কিন্তু এ কাজটা কেউ করেনি – শ্রুতিলিখনের।    [পৃ ৪১২]

আমার গৃহীত সাক্ষাৎকারে শওকত ওসমান সানন্দে-সগৌরবে জানিয়েছেন, তিনি অনেক শ্রমে সংগ্রহ করেন নজরুলের নিজের হাতে-লেখা কবিতা, বিয়ের চিঠি ও অসুস্থ নজরুলের বিদেশি চিকিৎসকের জর্মন ভাষায় লেখা ব্যবস্থাপত্র। নজরুলের জীবনীরচনার এইসব মূল্যবান দুর্লভ উপকরণ তিনি কলকাতা থেকে উদ্ধার করে এনে ঢাকার নজরুল ইনস্টিটিউট ও জাতীয় জাদুঘরে দান করেন।

কিছু অজ্ঞাত বা স্বল্প-জানা তথ্যের সঙ্গেও পরিচয়ের সুযোগ ঘটে তাঁর সৌজন্যে – যেমন : নজরুলের জন্মদিনেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক কর্মকান্ডের শুভসূচনা হয়।

এই সাক্ষাৎকারে সামান্য কথায় – সংকেতে-রেখায় নজরুলের যে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ তিনি করেছেন, তার গুরুত্ব অবশ্যই স্বীকার করতে হয়। নজরুলের মনন-মানস উন্মোচনে শওকত ওসমানের এই মন্তব্য-বক্তব্য দিক-নির্দেশী ভূমিকার সন্ধান দেয়।

 চার

 

নজরুলের সঙ্গে শওকত ওসমানের আলাপ-পরিচয় ঘটেছিল কবির মৌন-মূক হওয়ার মোটামুটি বছর দুয়েক আগে। আলাপের সময় দীর্ঘ না হলেও স্মৃতিমন্থনের কাল সংক্ষিপ্ত ছিল না। যে প্রাণবন্ত সহৃদয় নজরুলকে তিনি দেখেছিলেন একদিন, সেই স্মৃতির ছবি মুছে গিয়ে বহুকাল পরে অসুস্থ ভিন্ন এক নজরুলকে তিনি দেখেন। তাঁর এই নজরুল-দর্শন তাঁকে কী গভীরভাবে ব্যথিত ও বিচলিত করে তার পরিচয় মেলে তাঁর ১৯৭১-এর ২০ ডিসেম্বরের ডায়েরির পাতায় – লিখেছেন তিনি :

সন্ধ্যায় নজরুলকে দেখতে গিয়েছিলাম। ছোট ছোট কামরার ফ্লাট। তারি এক কোণে শুয়ে আছেন পুরুষসিংহ। সেই অপূর্ব চোখ কেমন যেন দিশাহারাভাবে নিষ্প্রভ। তিন মিনিটের বেশী দাঁড়াতে পারলাম না, চোখে পানি এসে গেল। তাড়াতাড়ি বসার ঘরে পালিয়ে বাঁচলাম। দরিদ্র মুসলমান সমাজ! এমন একটি মানুষ জন্মেছিল ব’লে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম কত সহায়তা না পেলে। বাংলার ঐতিহ্য মূর্ত হয়েছিল যাঁর মধ্যে, তাঁর ওই অবস্থা আমি চোখে দেখতে পারব না।

আর কোনদিন তোমাকে দেখতে আসব না, প্রিয়তম। গন্ধবিধূর ধূপের মত পুড়তে চেয়েছিলে একা-একা। নিজের বাণীকে সার্থকতা দিতে কি তোমার এই ছদ্ম-অভিমান?  তা-ই। তোমার কণ্ঠের ঝংকার এখন বাংলাদেশের গেরিলাদের কণ্ঠে ঝংকৃত। তুমি কখনও নিঃস্তব্ধ হতে পার না বাঙালীর আবাসভূমিতে। তোমাকে চোখে দেখার প্রয়োজন আছে কি? [শওকত ওসমান স্মারকগ্রন্থ : পূর্বোক্ত; পৃ ৬২]

না, আর কখনো নজরুলকে দেখতে যাননি শওকত ওসমান। স্বাধীন বাংলাদেশে যখন তিনি ঢাকায় – সেই হাতের কাছের নজরুলকেও দেখার সাধ জাগেনি তাঁর।

পাঁচ

 

নজরুল প্রসঙ্গে শওকত ওসমানের এই সাক্ষাৎকারটি প্রায় দেড় যুগ পরে ছাপা হলো। শওকত ওসমান এই আলাপচারিতার দুবছর পর প্রয়াত হন। টেপ-রেকর্ডারে ধারণকৃত সাক্ষাৎকারটি ছাপার উপযোগী করে তোলার জন্যে কিছু প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করতে হয়েছে। পুনরুক্তি ও অস্পষ্টতার জন্যে কিছু কিছু অংশ বা অর্থবোধক নয় এমন উচ্চারিত শব্দ বাদ দিতে হয়েছে। দু-এক জায়গায় শব্দ জুড়ে শূন্যপূরণ বা বক্তব্যকে স্পষ্ট করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রশ্নকে উপেক্ষা করে কখনো কখনো হয়তো তিনি কথা বলতে শুরু করেছেন, সেসব ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সংগতি রেখে ছাপার সময়ে প্রশ্ন সাজাতে হয়েছে। স্মৃতিবিভ্রমের জন্যে কখনো তথ্যভ্রান্তিও এই কথোপকথনে প্রবেশ করেছে। আর আবেগের তোড়ে মূল প্রসঙ্গ পথ হারিয়েছে – শাখা-প্রসঙ্গ প্রধান আলোচনার বিষয় হিসেবে দু-এক স্থান করে নিয়েছে।

এই সাক্ষাৎকার-গ্রহণে সহায়তা করেন অধ্যাপক শিরীনা হোসেন। রেকর্ডার থেকে সাক্ষাৎকারটি বাজিয়ে শুনে লিখে দেওয়ার শ্রমসাধ্য কাজের দায়িত্ব নেন আমার ছাত্র ড. মাসুদ রহমান। ভূমিকা লেখার জন্যে তথ্য ও বইপত্রের জোগান দিয়েছেন শওকত ওসমানের দুই কৃতী পুত্র লেখক-অধ্যাপক বুলবন ওসমান ও চলচ্চিত্র-নির্মাতা জাঁ-নেসার ওসমান। ড. তপন বাগচী ও ড. আবুল আজাদের সহায়তার কথাও উল্লেখ করতে হয়। সাক্ষাৎকারটি ছাপা হলো কালি ও কলম সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আবুল হাসনাতের আনুকূল্যে।

শওকত ওসমানের এই কথোপথনে নজরুল-বিষয়ে যেমন তাঁর স্মৃতিচারণ, পাশাপাশি এক ভিন্নতর নজরুল-মূল্যায়নের ভূমিকাও রচিত হয়েছে এতে। – আবুল আহসান চৌধুরী

আলাপ

 

আবুল আহসান চৌধুরী : আমরা আজ এই সন্ধ্যায় শ্রদ্ধেয় শওকত ওসমানের সঙ্গে নজরুল প্রসঙ্গে কিছু আলাপ করব। জানব তাঁর স্মৃতি ও মূল্যায়নের কথা। শুরু করছি আমাদের কথোপকথন : কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কোথায়, কবে এবং কীভাবে হয়েছিল?

শওকত ওসমান : প্রথম পরিচয় কখন হয়েছিল ঠিক এখন মনে করতে পারছি না। আমার মনে হয় উনি যখন হিজ মাস্টার্স ভয়েসের মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন সেই সময়। হবীবুল্লাহ্ বাহার আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন একদম চিৎপুর রোডে যেই অফিস ছিল সেই অফিসে, সকালবেলা, এখনো মনে আছে। দরোজাটা খুব বড়, তবে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে দোতলায় যেতে হয়। সেখানে ফরাস পাতা আছে, পানের ডিবা আছে। উনি আছেন আর চিত্ত রায় – চিত্ত রায় মানে উনার গানের স্বরলিপি লিখতেন। আমার মনে হয় ওইটা প্রথম অথবা সুফী জুলফিকার হায়দার বলে তখন আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের একজন উৎসাহী লোক ছিলেন, ওঁর বাড়িতে –  আমার মনে হয় ওঁর বাড়িতেই প্রথম দেখা।

আবুল আহসান : ওঁর বাড়ি মানে কলকাতায়?

শওকত ওসমান : কলকাতায় ঝাউতলা রোডে।

আবুল আহসান : কোন সালের দিকের কথা এটা?

শওকত ওসমান : এটা ১৯৪১।

আবুল আহসান : আর হবীবুল্লাহ্ বাহারের সঙ্গে হিজ মাস্টার্স ভয়েসের আপিসে গিয়েছিলেন, সেটা কোন সালে?

শওকত ওসমান : সেটা ওই ৪০ হবে, ৪০-৪১। আমরা বেশি দিন পাইনি আর কি। আর আমাকে – তুমি কি দেখেছ আমাকে উনি একটা শুভেচ্ছাবাণী লিখে দিয়েছিলেন?   

আবুল আহসান : হ্যাঁ, দেখেছি – অসাধারণ – খুব সুন্দর।

শওকত ওসমান : ওইটা জুলফিকার হায়দারের বাড়িতে বসেই লিখে দিয়েছিলেন, আর জিনিসটা আমি ওই জাদুঘরে দিয়ে দিয়েছি।

আবুল আহসান : নজরুল আপনাকে যে কাব্য-শুভেচ্ছা লিখে দিয়েছিলেন, এর পেছনের গল্পটা কী?

শওকত ওসমান : কিছুই না, উনি যথারীতি হারমোনিয়াম থাকলে গান করেন। সুফী জুলফিকার হায়দার ওখানে কিছু লোককে ডেকেছিলেন নজরুল ইসলাম আসবেন বলে। তাই আমরা গিয়েছিলাম আর কি। তারপর গানের ফাঁকে আমি – আমার কাছে খাতা ছিল – বলেছিলাম, ‘খাতায় কিছু লিখে দিন’। এই যে এখন আমি শুভেচ্ছা-পদ্য লিখে দিই – আমার মনে হয় ওটাও আরেকটা বই হতে পারে আর কি। অভ্যন্তরীণ কান্ড অবচেতনভাবে ছিল। কারণ আমি এখন যা করছি কত সহজে, বহু, মানে         পশ্চিমবঙ্গ-পূর্ববঙ্গ জুড়ে ওই শত শত। কারণ এই এখন যে পত্রিকায় বেরোয়, সপ্তাহে তো বেরোয় – দেখো চারটা করে হয়তো আটচল্লিশটা হয়। এগুলো তো গেলোই – তারপরে যে আবার অনেকের সঙ্গে দেখা হয় কোনো বিশেষ উপলক্ষে, কি বিয়ে উপলক্ষে কোনো বাড়িতে গেলাম, তো উপহার দিলাম কবিতা লিখে। সুরজিৎ ঘোষাল বলে এক জার্নালিস্ট, ইয়াং জার্নালিস্ট, মারা গেছিল জানো, আগস্টের দিকে, পশ্চিমবঙ্গে আর কি। ওকে লিখে দিয়েছিলাম : ‘এ যুগে খবর ঘটে না, হয় নির্মাণ/ প্রয়োজন শুধু ফোরম্যান আর ফরমান’ – বোঝো। এরকম বহু আছে আর কি, মানে ওই কফির মতো, মানে তাৎক্ষণিক কফি, মানে ইংরেজরা           যে-শব্দটা বের করেছে চট করে পাওয়া যায় কফি – ওই কান্ডটা আমার ভেতরে বোধ হয় কাজ করে। আর তার ফলে অনেকের কাছেই, আবার যাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, হয়তো আট-দশটা বই দিয়েছি, আট-দশটা বইয়েই লিখে দিয়েছি নানান রকমের কবিতা।  

আবুল আহসান : আপনি এই যে এখন কবিতার পঙ্ক্তি লিখে দেন নানাজনকে নানা প্রসঙ্গে, এটা কি নজরুলের কাছ থেকে আপনি যে কবিতা-শুভেচ্ছা পেয়েছিলেন, তার একটা অবচেতন প্রেরণা?

শওকত ওসমান : আমার মনে হয় তাই। কারণ উনি যে লিখে দিয়েছিলেন আমাকে, দেখেছ কী লেখা আছে? – ‘আছে দেহাতীত অজানা অরূপ/ তোমারই বদ্ধ তনুতে’। অনেকে বলে এত প্রফেটিক, কারণ নিজেরাই যদি হিসাব নাও, দেখবে এত কাজ তো আর কেউ করেনি। এত কাজ! পরিমাণ তো অনেক, আরো কত রকমের লেখা – আমার তখন মনে হয় – ‘আছে দেহাতীত অজানা অরূপ/ তোমারই বদ্ধ তনুতে’। তাঁর দোয়াটাই হয়তো ভিতরে কাজ করছে। 

আবুল আহসান : নজরুল আপনাকে যে-কবিতা লিখে দিয়েছিলেন তার পুরোটা কি আপনার মনে আছে?

শওকত ওসমান : মনে নেই। দাঁড়াও তোমাকে দিচ্ছি আমি।

আবুল আহসান : নজরুলের সেই কবিতার কপি তো আপনার কাছে আছে, কষ্ট করে যদি আমাদের একটু আবৃত্তি করে শোনান –

শওকত ওসমান : আবৃত্তি? পড়ে শোনাচ্ছি বুঝলে! আবৃত্তিকারের গলা তো আর নেই। শোনো – ‘শ্রীমান শওকত ওসমান কল্যাণীয়েষু/ আছে সত্যের পূর্ণ স্বরূপ/ চূর্ণিত পরমাণুতে/আছে দেহাতীত অজানা অরূপ/ তোমারই বদ্ধ তনুতে। নজরুল ইসলাম’ – তারিখ কত দেখেছ? –  ‘১৭ই ভাদ্র ১৩৪৭’ – কত বছর?

আবুল আহসান : তা প্রায় ছাপ্পান্ন বছর।

শওকত ওসমান : ছাপ্পান্ন বছর আগে লিখে দিয়েছিলেন। অবশ্য আমি এটাকে তাঁর আশীর্বাদ মনে করি। কারণ ৫৬ বছরে অন্তত কোথাও বিরতি হয়নি কাজের – চলছি, এখনো চলছি।

আবুল আহসান : সেটা ঠিক। তো নজরুলের সঙ্গে কি এরপরে আর কোথাও আপনার দেখা হয়েছিল?

শওকত ওসমান : এরপর দেখা হয়েছিল – একবার বনগাঁ গিয়েছিলাম, তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন। বনগাঁতে সভা হয়েছিল, সেই সভায়।

আবুল আহসান : এটা কোন সালে?

শওকত ওসমান : এটা ১৯৪১-এ – তার কয়েক মাস পরেই উনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

আবুল আহসান : সেই সভাতে তো বন্ধুদের সঙ্গে আপনিও উপস্থিত ছিলেন। কবি আবুল হোসেনের কাছে শুনেছি সভায় নাকি গোলমাল হয়েছিল এবং তাতে আপনার একটা ভূমিকা ছিল?

শওকত ওসমান : হ্যাঁ, আমিও উপস্থিত ছিলাম এবং উনি যে-বক্তৃতা করলেন তা শুনে আমি বললাম যে, ‘শহর থেকে এত দূরে এসেছি এই বক্তৃতা শোনার জন্য!’ স্থানীয় লোকজন যারা ছিল, তারা তো রেগে একেবারে ফায়ার – আগুন। আমি – মানে ইয়াং ছোকরা মানুষ তো, কাজেই একেবারে নজরুল ইসলামের মুখের সামনে ওরকম করে প্রতিবাদ করে ফেললাম। আমাদের বন্ধুরা ছিলেন – অনেক বন্ধু ওখানে ছিলেন। তো আবুল হোসেন – কবি, এখনো আছেন – কবি আবুল হোসেন সঙ্গে ছিলেন। কবি আবুল হোসেন কোথায় যেন এই ঘটনাটা লিখেছেন, আমি কোথাও লিখিনি। নজরুল তখন ওই রকম যে মানসিক বিভ্রান্তির ভেতরে ছিলেন, বক্তৃতাটাও ওই রকম হলো যে, ‘আমি স্বপ্ন দেখছি’ – অর্থাৎ তাঁর কথা যুক্তিযুক্ত ছিল না আর কি।

আবুল আহসান : অসংলগ্ন!

শওকত ওসমান : অসংলগ্ন কথা।

আবুল আহসান : আপনি কি নজরুলের ভাষণের পর আপনার বক্তৃতায় একথা বলেছিলেন – নাকি শ্রোতার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন?

শওকত ওসমান : না, ওই উনি বক্তৃতা করছেন তার মাঝখানে মিটিং-এ দাঁড়িয়ে বলেছিলাম আর কি – এরকম। বোঝো না, এখন কত বয়স – আর তখন বয়স কত? তেইশ বছর –     কুড়ি-বাইশ-তেইশ বছর বয়স, টগবগে রক্ত। কাজেই যেটা বলেছিলাম, খুব কুইক।

আবুল আহসান : তো নজরুলের কি কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছিলেন এতে?

শওকত ওসমান : না, অত আর লক্ষ করিনি। স্নেহভাজন, মানে আমাদের তো একটা অত্যন্ত স্নেহের চোখেই দেখতেন। তারপর উনি যখন নবযুগের এডিটর হলেন, তখন রাজনীতিক ফজলুল হক চিফ মিনিস্টার – এ. কে. ফজলুল হক। উনি নবযুগ বের করলেন। এই ন্যাশনাল স্পিরিটে আর কি। ওই বোঝো, পবিত্র ইসলামের নামে অ্যান্টিন্যাশনালিজম এবং ন্যাশনালিজম ওই লড়াই চলছে আর কি – ওই দারা-আওরঙ্গজেব। আমি বলব যে,  বোধহয় ইতিহাসের এইটা একটা অচ্ছেদ্য বন্ধন। কেননা ওই দারা আর আওরঙ্গজেব থাকবে। এখানে দেখছ না! এখানেও তো দেখতে পাচ্ছ। আমাদের যাঁরা এখন মওলানাদের ভিতরে আছেন ভালো – তাঁদের ভিতরে মওলানা আউয়াল কিন্তু খুব যুক্তিবাদী এবং র‌্যাশনালিস্ট পুরোপুরি। আবার আমাদের দেশে গোলাম আযমও আছে। ওই মানে দারা-আওরঙ্গজেব যেন আছেই পৃথিবীর ইতিহাসে। জরথুস্ত্র যেমন বলতেন, ওই আলো-অন্ধকার, শুভ-অশুভ – এটা বোধ হয় একটা সমাজের মানুষের অস্তিত্বের খেসারতও বলতে পার। মানে এই শুভ-অশুভ নিয়ে তো অনেকেই মাথা ঘামিয়েছেন, ডস্টয়ভস্কি মাথা ঘামিয়েছেন – কোত্থেকে অশুভ আসে। যাই হোক, তখন মানে সন্ধ্যায় কয়েকবার নজরুলের সঙ্গে দেখা হয়েছে।

আবুল আহসান : নবযুগ অফিসে?

শওকত ওসমান : হ্যাঁ, নবযুগ অফিসে।

আবুল আহসান : সেই সময়ের বিবরণ যদি একটু আমাদের জানান।

শওকত ওসমান : সেই সময়ের বিবরণ! সম্পাদক মানুষ, আমরা গিয়ে ভিতরে বসলাম কিছুক্ষণ, তারপর চলে আসতাম। নানান রকমের কথা হতো – যে ম্যানেজার ছিল, নামটা ভুলে গেছি, সেই ভদ্রলোক আর ওঁরা থাকতেন। তারপর ওখানে অবশ্য অন্য লোকও অনেকে দেখা করতে আসতেন। একদিন দেখি এক সন্ন্যাসী এসেছেন – গেরুয়া-পরা সন্ন্যাসী একদম ইত্যাদি।

আবুল আহসান : কার সঙ্গে দেখা করতে – নজরুলের সঙ্গে?

শওকত ওসমান : নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, মানকৃষ্ণ নাকি কৃষ্ণ ভট্টাচার্য – যাই হোক, তিনি ওই যে ‘মূর্তির আড়ালে মা চাঁড়াল’ বলে কি কবিতাটা –

আবুল আহসান : ‘আনন্দময়ীর আগমনে’।

শওকত ওসমান : ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নিয়ে সে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হতে বলল, ‘আমি দেখা করব – আমি দেখা করতে এসেছি।’ তারপরে ওই কবিতাটা তিনি সব বললেন। কবিতাটা পড়ার পরে বাড়ি চলে এলাম। মানে স্বদেশি – আগে সন্ত্রাসবাদী ছিল। স্বদেশিরা যারা আবার পরে টেরোরিস্ট হয়, তারা ওরকম হয়ে যায়। তারা অনেকেই সন্ন্যাসী হয়ে গেছে। মানে সন্ত্রাসবাদী থেকে সন্ন্যাসী – এটা চোখের সামনে দেখা আর কি।

আবুল আহসান : সুফী জুলফিকার হায়দারের বাড়িতে          যে নজরুলের সঙ্গে আপনার ঘরোয়া পরিবেশে আলাপ হয়েছিল, সেই কথা কিছু মনে পড়ে?

শওকত ওসমান : না, ওখানে তো আলাপের তেমন সুযোগ ছিল না। ওখানে আমরা তো ছেলেমানুষ, গুরুজন অনেক। তারপর ওখানে উনি গান করছেন – অন্যদের সঙ্গে কথা বলছেন –  তারপর পান খাওয়ার যে অভ্যাস আছে, পান খাচ্ছেন। ওখানে তো এমন খুব ঘরোয়া কথা হয়নি। দু-একটা কথা বলেছি, কিছু মনে নেই। তারপরে আমাদের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ হলেন অন্য সূত্রে। প্রবীণ সাহিত্যিক এখন আমরা যে কয়জন আছি, ওরা আমার চেয়ে ছোট বছর চারেকের – যেমন আমি আট চলে গেলে ওরা সাতে আছে। সবাই প্রবীণ আর কি। তখন আমরা ওখানে একটা সেন্টার করেছিলাম, কালচারাল সেন্টার, এই কালচারাল সেন্টার হচ্ছে, ওই যে –

আবুল আহসান : কলকাতায়?

শওকত ওসমান : হ্যাঁ, কলকাতায়, রেনেসাঁস সোসাইটি। ইসলামিক রেনেসাঁস সোসাইটির পাল্লা বলা যেতে পারে। সেটার মুখ্য অরগানাইজার ছিলেন আবু রুশ্দ, আমাদের কবি গোলাম কুদ্দুস – উনি পশ্চিমবঙ্গেই থেকে গেছেন – এঁরা। এই আবু রুশ্দের বাড়িতে উনি মানে নজরুল এসেছিলেন একটা বক্তৃতা করতে।

আবুল আহসান : এটা কি সেই কালচারাল সেন্টারের অনুষ্ঠানে?

শওকত ওসমান : মজলিশ, কালচারাল মজলিশ। কালচারাল মজলিশে তিনি বক্তৃতা করতে এসেছিলেন।

আবুল আহসান : এটা কোন সালের দিকে?

শওকত ওসমান : এটা হচ্ছে ফরটি।

আবুল আহসান : এটা কি ঘরোয়া অনুষ্ঠান ছিল?

শওকত ওসমান : হ্যাঁ, ঘরোয়া অনুষ্ঠান, আবু রুশ্দের বাড়িতে।

আবুল আহসান : সেখানে নজরুল কী বিষয়ে বলেছিলেন?

শওকত ওসমান : সেখানে শ্রোতা কে জানো? শ্রোতা আবু সয়ীদ আইয়ুব, ড. নীহাররঞ্জন রায়, কবি অমিয় চক্রবর্তী – এই সমস্ত লোক হচ্ছেন ওইখানে শ্রোতা। আর আমরা খালি ভাবছি এইসব পন্ডিতের মাঝখানে নজরুল কী বক্তৃতা করবেন! কেননা আমাদের ভয় আছে তো! কিন্তু নজরুল যে-বক্তৃতা করলেন তাতে তুমি একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাবে। তখন তো আর টেপ-রেকর্ডার ছিল না। আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে শুনলাম। আমি এখন ভাবি যে, কেউ অনুলিখন কেন নিল না –  অনুলিখনটা নেওয়া উচিত ছিল। খালি একটি উপমা কিন্তু আমার মনে আছে। সেই উপমাটা আমি এখনও ভুলি নাই। তিনি বললেন যে, ‘শিল্পীর জন্য জীবনের যে দৈনন্দিনতা আছে তার ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া উচিত, উঠতেই হয় তাকে। এই উঠে যাওয়া উচিত, এ ছাড়া হয় না।’ তারপরে যে-উপমাটা দিলেন এখনো আমার মনে আছে – ‘পানি সমুদ্রে-বিল-ডোবাতে যেখানেই থাকুক, পানি সূর্যের তাপে উপরে উঠে যায়, উপরে উঠে গিয়ে আবার পরে বরিষণ হয়ে আসে এবং পৃথিবী শস্য-শ্যামলা হয়।’ তাঁর এই উপমাটি আমার ভয়ানকভাবে মনে আছে এবং ওই তোমার সমস্ত মানসিক চৈতন্যকে এমন একটা স্তরে ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে হয় যে ওখান থেকে বরিষণ মানে বর্ষণ হয়ে পৃথিবীতেই আবার ফিরে আসে। যেখান থেকে উৎপত্তি – সমাজ থেকেই তার উৎপত্তি হবে, আবার সমাজকেই শস্য-শ্যামলা-উর্বর করবে – সমাজেই আবার ফিরে আসবে। খুউব মনে পড়ে। আর ওই কণ্ঠ তো অসাধারণ। আর ওই হাতের লেখা দেখো? চাটগাঁর এক ভদ্রলোক, জাহিদ হোসেন বলে, ওঁর কাছে দেখলাম যে একটা শ্যামাসংগীত আছে। হাতের লেখা দেখলেই তো বোঝা যায়, কিন্তু সই নেই। আমি বললাম যে, ‘ওর আর সইয়ের দরকারও নেই।’ উনি ওটা দান করে দিয়েছেন ওই নজরুল ইনস্টিটিউটে – এনে দিয়েছেন আর কি। কী করে কী করে এসে গিয়েছিল ওই হাতের লেখাটা আর কি। আমি তাঁর ২৬টা গান যা পেয়েছিলাম, সেটা জাদুঘরে আছে। আর তারপর নজরুল ইনস্টিটিউটে আমি কী দিয়েছি জানো? বিয়ের চিঠিটাসুদ্ধ – ৮৫-৮৬টা, ডাক্তারদের সব রিপোর্ট মানে ভিয়েনার সেইসব রিপোর্ট – সব জার্মান ভাষাতেই। আমি তো ওখানে এক বাড়িতে –

আবুল আহসান : এইগুলো আপনি কীভাবে পেয়েছিলেন?

শওকত ওসমান : ওই পশ্চিমবঙ্গে। তাঁরা এমনি দুস্থ পরিবার, কেরানির পরিবার, কিন্তু কালচারাল-মনা। সেইজন্য সেই বাড়িতে ছিল। মোহাম্মদ রবীউদ্দীন বলে এক বন্ধু ছিল, তাঁর ভাই রফিকউদ্দীন এবং তাঁর স্ত্রী – নামটা ভুলে যাচ্ছি – ডাকনাম লুসি আর ভালো নাম হচ্ছে মনসুরা, মনসুরা লুসি। এই এঁরাই সব আগলে আগলে রেখেছিল আর কি। কল্পনা করো যে বিয়ের চিঠি, বিয়ের চিঠিও –

আবুল আহসান : মানে নজরুলের বিয়ের চিঠি?

শওকত ওসমান : নজরুলের বিয়ের চিঠি, বোঝো, সেটাও আমি দিয়েছি।

আবুল আহসান : আপনি যে ২৬টি গান জাদুঘরে দিয়েছেন, সেগুলো কোত্থেকে পেয়েছিলেন?

শওকত ওসমান : সেগুলো ওঁদের বাড়িতেই ছিল। ওই বাড়িতেই ছিল।

আবুল আহসান : এটা কোন সালে সংগ্রহ করেছিলেন আপনি?

শওকত ওসমান : এটা আমি সংগ্রহ করেছি – তারিখটা হবে যথারীতি – কেননা আমি তো আবার চলে গেলাম – ওই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে আমি যে নির্বাসনে গেলাম –  আত্মনির্বাসনে, সেই সময়ে সংগ্রহ করলাম। ’৮১ সনে ফিরে এলাম। তা হলে ওরকম সময়েই। তারপর ’৮২-৮৩-র দিকে দিয়ে দিয়েছি আর কি।

আবুল আহসান : ’৮২-৮৩ সালে?

শওকত ওসমান : ’৮২-৮৩ সালে। এগুলো ওঁদের কাছ থেকে নিয়ে এসে এঁদেরকে দিয়েছি আর কি। আর ওই নির্বাসনে আরো একটা কাজ করেছি জানো? আমাদের এক বন্ধু, ও এক বছর আগে পড়ত, সিনিয়র ছিল এক বছরের – ফজলুল হক বলে। গাল্পিক, আত্মহত্যা করেছিল ১৯৪৯ সনে। তখনকার যুগের পরিচয় এবং চতুরঙ্গ-এ তাঁর গল্প বেরিয়েছিল। তাঁর জন্য দুঃখ করি যে, একজন বড় গাল্পিককে হারিয়ে ফেললাম। এই গোটাপাঁচেক গল্প। সেই পাঁচটা গল্পই পরে ওখান থেকে উদ্ধার করেছিলাম – চতুরঙ্গ, পরিচয় – এইসব থেকে। পরে এসে বই বের করেছিলাম। তার একটা সংকলন আছে জানো? ওই সংকলনটা হচ্ছে ফজলুল হকের গল্প। এটা বের করেছিলাম আর কি। আর নজরুলের ওইগুলোকে আবিষ্কার করেছিলাম। আর কী আবিষ্কার করেছিলাম জানো? আমি তো ভাবি যে এটার জন্য ওই পরিবারকে টাকা দেওয়া উচিত। এরা এখন এত লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করবে, আমি তো জানি না। জানলে ওঁদেরও – না, আমিই লিখে দিয়েছিলাম যে ১০-১৫ হাজার যা পার দাও। ওরা তা করেছিল আর কি। তো নজরুলের টিচার – স্কুলের টিচার চলে যাবে, তখন তার জন্য যে কবিতা লিখেছিল, সেই কবিতার আবার গোড়ার দিকে লেখা আছে নজরুল ইসলাম। সুতরাং কী এনে দিয়েছি বুঝতে পারছ? আর ওই পরিবারকেও ধন্যবাদ যে ওরা এইগুলোকে যত্ন করে রেখেছিল। কত বছরের ব্যাপার!

আবুল আহসান : বনগাঁতে যে সাহিত্য সম্মেলনে নজরুলের সঙ্গে আপনি গিয়েছিলেন, সেখানে কি ঘরোয়া পরিবেশে নজরুলকে পেয়েছিলেন?

শওকত ওসমান : খুব ঘরোয়া না, অনেক লোক তো – হবীবুল্লাহ্ বাহার ইত্যাদি অনেক লোকের ভিতরে। ঘরোয়া না, ওই এক-আধটা কথা আর কি।

আবুল আহসান : সেখানকার স্মৃতি কি আর কিছু মনে পড়ে?

শওকত ওসমান : না, আর কিছু মনে পড়ে না। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছিলেন, তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বিভূতিভূষণ – পথের পাঁচালীর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এইটুকু মনে আছে। কিছু মনেও নেই কী খাইয়েছিলেন ওঁর বাড়িতে।

আবুল আহসান : নজরুল সম্পর্কে কিছু কি লিখেছেন?

শওকত ওসমান : ওমা! লিখেছি মানে! প্রবন্ধ আছে – আমার একটা প্রবন্ধের বই আছে, তাতে একটা ছোট প্রবন্ধ আছে ছয়-সাত পৃষ্ঠার। পিএইচডি করতে পারবে ভবিষ্যতে। সবই আছে।

আবুল আহসান : এটা কোন বইয়ে?

শওকত ওসমান : সমুদ্র নদীসমর্পিত – ওতে ওই নজরুল সম্পর্কে লেখাটা আছে। তারপরে নজরুল ইনস্টিটিউটের পত্রিকাতেও লিখেছি। আর সবচেয়ে যেটা আমার কাছে এখন আনন্দের ব্যাপার – কিন্তু দুঃখের ব্যাপারও ছিল, সেই দুঃখের ব্যাপারটা হচ্ছে যে আমি লেখার আগে আর কেউ এটা খেয়ালও করেনি। আমি লেখার আগে – কী লেখার আগে জানো? মুজিবনগরে আমরা পাঁচদিন না ছয়দিন – এখন পাঁচ না ছয় এটা আরো সার্টেন করতে হবে। তখনকার মুজিবনগর স্বাধীন বাংলা বেতারের যে ডিরেক্টর ছিল – হয়তো ঠিক দিন, হয়তো এক্সাক্ট দিন – চার দিন না পাঁচ দিন অপেক্ষা করলাম আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যে চালু করব, আমরা যে শুরু করব – আমরা ওই জন্য দেরি করলাম যে ওইটা নজরুলের জন্মদিনে শুরু করতে হবে। সেজন্য আমরা পাঁচ-ছয়দিন অপেক্ষা করেছিলাম। পৃথিবীর কোনো কবির ভাগ্যে এই জাতীয় সম্মান তুমি কল্পনা করো!

আবুল আহসান : দুর্লভ।

শওকত ওসমান : দুর্লভ, কল্পনা করো! কিন্তু এই খবরটা কতদিন ধরে চাপা পড়ে ছিল! কেউ কিছু বলেনি। মানে অভিযোগ করলাম যে, এখন এ যদি আমি না বলতাম, তুমিও চুপচাপ হয়তো থাকতে – এভাবে একটা খবর চাপা পড়ে যেত। এটা আমাদের জাতির একটা ঐতিহ্য না?

আবুল আহসান : তা হলে আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যে সূচনা তা নজরুলের জন্মদিনে?

শওকত ওসমান : হ্যাঁ, নজরুলের জন্মদিনে।

আবুল আহসান : এটি সত্যিই একটা অসামান্য ঘটনা। এই প্রসঙ্গে, নজরুল প্রসঙ্গে আরেকটু জিজ্ঞেস করতে চাই যে, নজরুলের কোনো প্রভাব বা প্রেরণা আপনার ব্যক্তিগত জীবন বা লেখকজীবনে কি পড়েছে?

শওকত ওসমান : অসাম্প্রদায়িকতা ছাড়া এই দেশের মুক্তি নাই। নজরুলের সমস্ত শিল্প-সাহিত্য-সাধনার মূলে এই চিন্তা ছিল বললে ভুল হবে না। কাজেই আমরা তো ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি আরো এ জন্য যে, কোনো বাঙালি মুসলমান ভবিষ্যতে তাঁর ওই জায়গা নিতে পারবে কিনা আমি জানি না। আজকের এই ১৯৯৬ সনেও – আজকেও  চন্ডীমন্ডপ থেকে – পূজার মন্ডপ থেকে যে গান হয় – মা কালীই হোক আর মা দুর্গাই হোক আর শ্যামাই হোক, সেই গানের রচয়িতা একজন মুসলমান – তাঁর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। কল্পনা করো, এইরকম হানাহানি – সাম্প্রদায়িকতার হানাহানি – আরেকটা রাষ্ট্র হলো, আমি আর কী বলব, দুখানা হলো, তিনখানা হলো ভারতবর্ষ এইরকম। আর এটাও তোমার মনে আছে, এই ঐতিহ্যের গর্ব নিয়ে আমি এখনও জোর করেই বলি যে, মৌলবাদ এই দেশ থেকে মুছে যাবে। আমাদের শ্রেষ্ঠ যে সন্তান, ইতিহাসের জাতীয় কবি হয়েছেন, তা তো এমনিই হয়ে যাননি, বহু বছর লেগে গেল আর কি এই মূর্খদের জন্য। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ছিলেন, তাই বোধহয় এই দিকে নজর দেননি। আমি মনে করি, এই একজন লোক তিনি ইসলামি গানও লিখেছেন, তেমনি আবার অন্য গানও লিখেছিলেন। এবং এই যে ঐতিহ্য – এই ঐতিহ্য তো গর্ব করার মতো। আমি জানি না তাঁর স্থানে আর কেউ আসবেন কিনা ভবিষ্যতে। আমি তো ভাবতেই পারি না যে, সহজে আর কেউ আসবে! আর দেখো না কী রকম লোক – নিজের ছেলেদের নামগুলো তো আর আরবিতে রাখেননি – কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ। বাঙালি মুসলমানেরা তো আরবি নামই রাখে – আরবি নাম। সুতরাং বুঝতে পারো যে, নজরুলের প্রভাব কী রকম! শুধু প্রভাব বললে কিছুই বলা হয় না আর কি। সুতরাং চেতনা যে দরকার একটা মানুষের – বিশেষ করে এই দেশের এই নাগরিকের – সেটার আদর্শ তো আমরা পেয়েছি। যে মুসলমান মা কালীর গান লেখে- সে তো আর মুসলমান থাকে না – মানে এই মূর্খ-সংকীর্ণ যে জাত – গোঁড়া মুসলমানদের জন্য আর কি। ওই আদর্শে গত আটশো বছরে ওই একজন মডেল বাঙালি জন্মেছেন। বারশো চার না কবে বখতিয়ার খিলজি থেকে এই সময় পর্যন্ত আর কি। এই সাতশো কত বছর হবে! তাঁর চেয়ে তো আর কোনো বড় মডেল নেই। মডেল অন্য অনেক দিক থেকে। কবিতা লিখে এতদিন টিকে আছেন কী করে? ছিয়াত্তর সনে তো চলে গেছেন। আছেন – মানে রবীন্দ্রনাথও আছেন, নজরুলও আছেন। আবার শুধু এই দেশে নয় – অনেকে মনে করে খালি বাঙালিদের কাছে আছেন – কিন্তু বোম্বাইতে গিয়েও রফি গান করে, বাংলা গান করে, সুরটা তো আছে। সুরটা তো ওই সমস্ত উপমহাদেশেতেই রয়েছে – মানে সেই ইমন রাগ হোক আর কল্যাণ রাগই হোক – সে বাংলাদেশেও যা, বোম্বাইতেও তা এবং সেই মাদ্রাজেও তাই। বুঝলে না! শুধু তাই না, জিয়োলজিক্যাল বিষয়টা দেখো না, পানি নিয়ে কী হচ্ছে! তা মূর্খরা কি এটা বুঝত আর ওটা তো – আমি তখনো বলতাম ম্যাট্রিকুলেট ব্যারিস্টার – বুঝেছ লোকটা কে? –  এম. এ. জিন্নাহ। ওদের কোনো দূরদৃষ্টি ছিল? আজকে পানি নিয়ে দেখো না কী হচ্ছে! মানে কেউ তো ইতিহাসকে এরকম করে দেখে না ভাই। আর ইতিহাস তো কড়া শাস্তি দিয়ে যায়। দেখো, শাস্তিটা হচ্ছে কী রকম! এখন যে-অবস্থা – সন্ত্রাস। শিক্ষাঙ্গনগুলো – তুমি তো শিক্ষক, কী অবস্থা হয়ে গেছে – হত্যাঙ্গন। অবক্ষয়ের যত রকমের কুষ্ঠব্যাধি আছে সব তো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শাসক যারা আসে তারা স্বৈরাচারী হয়ে আসে। দেখা যাক, নতুন সরকার কী করে! কিন্তু এ পর্যন্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দেখলে তো দূরদৃষ্টি! পলিটিক্যাল প্যাট্রিওটিজম আছে কোনো? দেশপ্রেম আছে তোমরা মনে করো? কোনো দেশপ্রেম পর্যন্ত এদের নেই। থাকতে পারে না। আজকের যুগে বর্ণবাদ এবং সেই সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেখছ তো করাচির, মানে পাকিস্তানের অবস্থাটা কী দাঁড়িয়েছে? কেন, ওটা জিন্নাহ সাহেব জানতেন না? মুসলিম হোমল্যান্ড – এখন জিজ্ঞেস করো! এখন কী হয়েছে জান? ওখানে গিয়ে অনেকে পয়সাকড়ি বানিয়েছে, যারা পয়সা বানিয়েছে তারা আবার ইন্ডিয়াতে কোনো শহর, যেমন বিশেষ করে কলকাতা – ওইসব জায়গায় ঘর ভাড়া করে ফ্যামিলি টিকিয়ে রাখে। মানে মানুষ তো, একটা জায়গা চায় –  সেই তার নিরাপত্তার জন্য। নিরাপত্তার জন্য মানে আবার ওই ফিরে যাচ্ছে আর কি। আমার দুঃখ কী জানো, উপমহাদেশের ওপর দিয়ে এরকম একটা ট্র্যাজেডি হয়ে গেল – মূর্খের ট্র্যাজেডি –  মানুষের ট্র্যাজেডি। একটা উপন্যাস বেরোলো না যাতে ওইটা থাকে। কোনো বই বেরোয়নি। এন্টারটেইন আর এন্টারটেইন করে, বেশির ভাগ এন্টারটেইন করে আর কি। নতুন জেনারেশনের লেখক অনেক বেরোয়। মানে সোজা বিনোদন কাজের কাজটাই করে। সেটাও কাজ, কিন্তু বিনোদনের কাজ। কিন্তু এই ট্র্যাজেডি – এটা বুকে ধারণ করে না। আজকে দেখো না কী হচ্ছে! এবং এখনও ওই রেশটা যায়নি। এখনও ওই রেশটা গেছে? প্রত্যেক দেশেই তো জামায়াতে ইসলাম আছে। এদের কাজটা কী? কাজটা তো সবসময় শোষক-শাসকদের সাহায্য করা। আমার পথপ্রদর্শক মোহাম্মদ (সা.) – তাঁর সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক আছে নাকি? তিনি তো দীন-দরিদ্রের, বঞ্চিতের – আর এরা?

আবুল আহসান : নজরুল তো এই কথাটাই বলেছেন। ধর্ম প্রসঙ্গে তাঁর যে কবিতা-গান বা অন্য ধরনের রচনা আছে, তাতে তিনি খুব উদার, মুক্ত দৃষ্টি নিয়েই এই কথাগুলো বলেছেন।

শওকত ওসমান : এই জন্যই তো সত্তর বছর লেগে গেল।

আবুল আহসান : এবারে নজরুলের গান নিয়ে কিছু কথা শুনি। আপনি তো নজরুলের গান শোনেন। তো আপনার খুব প্রিয় নজরুলগীতির কথা বলবেন?

শওকত ওসমান : অনেক, মানে এত গান লিখেছেন – আর আমাদের সময়ে তো একটা প্রবাদ ছিল যে দৈনিক ২৫-৩০টা গান লেখেন। তাই-ই আমি এখন দেখছি হিসাব করে। আমাদের এক বন্ধু হিসাব করেছে যে, ’৪১ সন থেকে তো অফ্ হয়ে গেলেন, তার আগে ১৯২২-২৩-২৪-এ যখন প্রলয়শিখা ওইসব বইটই বেরিয়ে গেল, ১৬ বছর। ১৬ বছর তো খাওয়া-দাওয়া-ঘুমানো আছে। তো তারপরে দেনার দায়ে ব্যতিব্যস্ত – এসব আছে। ১০ কি ১১ বছর কাজ করেছেন। দেখো মানুষটার ছেলে মারা গেছে। এসব করে তাই মনে হয় দিনে ২৫/৩০টা করে না হলে এত গান কী করে হবে? তার ভিতর তো অনেক রকমের গান আছে – চলছে এখনো। ‘নীলাম্বরী শাড়ি পরে নীল যমুনায় কে যায়’ – এসব গান। তারপরে প্রেমের গান – সেসব অনেক আছে। তাঁর প্রেমের গান এখনো ইয়াং জেনারেশনের প্রিয়। কয় জেনারেশন! দেখো, তিন জেনারেশন চলছে।  আবুল আহসান : নজরুলের প্রেমের গানের প্রসঙ্গে একটু জানতে ইচ্ছে হয় নজরুলের প্রেম সম্পর্কে।        

শওকত ওসমান : এগুলো মানে অনেক কাহিনি – অনেক গুজব ইত্যাদি আছে। এগুলো সম্পর্কে আর ব্যক্তিগত আলোচনা করি না আমি। তো গুজব নানারকম হতো – ওই রমণীমোহন, রমণীমোহন আর কি। তাঁর ব্যক্তিত্ব – ওই অনেকেই তো লিখেছে – এই যে প্রতিভা বসু, বুদ্ধদেব বসুর বউ। আমি নজরুলকে যখন দেখেছি তখন একটু ভারিক্কির দিকে চলে গেছেন – ভারিক্কি একটু হয়ে গেছেন। উনি যখন ইয়াং একেবারে, যেমন ওই কামানের গায়ে যে-ছবি ওইটা দেখো! মানে এত সুন্দর দেখতে যে তোমাকে বোঝাতে পারব না। তা আমরা তো যখন দেখেছি তখন আরো মোটা হয়ে গেছেন। রাজকীয় ব্যাপার – মানে কণ্ঠ তো অসাধারণ –  কণ্ঠ সত্যি তুলনাহীন। আমি অনেক সময় বলি কণ্ঠস্বরও এমন, যা ওই হাজার জনের ভিতরে একজনের। আর আমাদের বঙ্গবন্ধুরও – শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ দেখো না! কণ্ঠ – ওই রকম কণ্ঠটাও অনন্য। বুঝলে? হ্যাঁ, বক্তৃতাও দেখো – ‘আর আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’ – মানে এই যে ফোক-ডায়ালেক্টে বলা। কাজেই এঁরা ক্ষণজন্মা পুরুষ। মানে এই যে কম্যুনিকেশন দিতে পারে। নজরুলের কথাও তাই – কম্যুনিকেশন তো আর সবাই দিতে পারে না।

আবুল আহসান : আমাদের দেশে এবং পশ্চিমবঙ্গেও প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নজরুলচর্চা হচ্ছে। এই চর্চা সম্পর্কে আপনার কাছে কিছু জানতে চাই। এর বৈশিষ্ট্য, সীমাবদ্ধতা কিংবা এর বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রবণতা সম্পর্কে আপনি যদি কিছু বলেন।

শওকত ওসমান : শোনো, এই সমস্ত মানে যত মহাপুরুষ – সমাজের বড় ফিগারদের নিয়ে এই কান্ডটা হয়। যেমন ধরো আমাদের কবির – এঁরা তো সব ওই তন্তুবায় ছিলেন, পেশায় তো তাঁতি ছিলেন।

আবুল আহসান : সন্ত-সাধক কবির তো!

শওকত ওসমান : সাধক কবির আর কি। সাধক তো, কিন্তু এমনি তো ছিলেন পেশায় তাঁতি। তো এক শিষ্য বলল, ‘উনি বলে গেছেন – ‘জ্বালো মাত গাড়ো’ – মানে পোড়াও। আরেকজন বললেন, ‘না, গাড়ো মাত জ্বালো’ – অর্থাৎ গোর দাও। এই টানাটানি হয় মহাপুরুষদের নিয়ে। ঠিক অবিকল ওই কান্ডটা মুসলমানদের মধ্যে হচ্ছে। এই নজরুল একাডেমিটা আইয়ুব খান করেছিল, কী মহৎ উদ্দেশ্যে করেছিল বুঝতে পারো? আমি জানি, একসময় এইসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা।

আবুল আহসান        : নজরুল একাডেমি প্রতিষ্ঠায় কি সরকারি কোনো সহায়তা ছিল সে-সময়?

শওকত ওসমান       : আরে আইয়ুব খানের সময়ই তো হলো – বুঝতে পারছ? তারপর একসময় দেখা গেল যে, কয়েক বছরে দু’কোটি টাকা ওখানে খরচ হয়েছে। আমি বলতাম, দুকোটি টাকা খরচ হয়েছে খালি একটা বাক্য প্রমাণ করার জন্য যে নজরুল মুসলমান ছিলেন। এই একটা বাক্যই। আবার রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে এখন নজরুলচর্চা হচ্ছে, নজরুল ইনস্টিটিউট হয়েছে। এইগুলোও আবার দেখবে কী জাতের লোকেরা ওখানে গিয়ে বসেছে। মানে আর কী বলব! একদল তো আছেই আর কি। মুসলমান সম্প্রদায় থাকবে – ঠিক আছে, এতে কোনো আপত্তি নেই – কিন্তু সে আবার রিভাইভালিজম – সেই ফিরে যাবে অতীতে, ফিরে গিয়ে মৌলবাদের চর্চা করবে। মৌলবাদটা ওখান থেকেই এসেছে। শব্দটা হচ্ছে মূলে যা ছিল –  তা তো থাকা যায় না। আর এই যে চলমানতা এবং এটার মানে তারা কী করে বুঝবে! সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় মরুভূমি হচ্ছে – নামটা ঠিক মনে করতে পারলাম না। ‘খালি’ আর কি, ‘খালি’টা আরবি শব্দ, জানো তো? বাংলা পড়াও তো। অনেকেই তো আমাকে বলেছে শব্দের তো মানে এরকম হয়ে যায় ‘খালি’ – মানে জানো তো? সবচেয়ে বড় মরুভূমির নাম ‘খালি’ আর কি। এখন সেই দেশে তোমরা ‘খালি’ এইটুকু কল্পনা কর। ইতিহাসের চলমানতাটাকে যদি স্বীকার না কর, একটা মরুভূমি থেকে একটা আদর্শ – একটা চিন্তা, বাড়তে বাড়তে তারপরে কোথায় গেল? ইন্দোনেশিয়া, সমস্ত আফ্রিকা, এদিকে তো কাস্পিয়ান সাগরের পাড়, ফ্রান্সের বর্ডার। তারা লাথি খেতে খেতে এখন একেবারে গর্তে ঢুকেছে। তাই শুধু নয়, যখন ওই সাদ্দাম সৌদি আরবের ওপর হামলা চালাল, তখন ইহুদি নাসারার কাছে গিয়ে বলে, ‘হুজুর বাঁচাও!’ লজ্জাও নাই। মানে এই সমস্ত সংকীর্ণচেতা ধর্মান্ধ মোল্লাদের জন্যই মুসলমানদের আজ এই অবস্থা। কোথাও দাবি করার কিছু নেই। সেই যে অসুখ করলে দৌড়ায় আমেরিকা, সিঙ্গাপুর আর লন্ডন। কারণ সে বাঁচতে চায়। ওষুধ বের করেছে? এ তো খালি মরতে চায় – আর মনে করে মোনাজাত করেই সব পাওয়া যাবে। আর যে মাথা দিয়েছেন আল্লাহ ওটা ভুলে গেছে। মানে সোজা, লজ্জাও তো থাকা উচিত! ইসলামি রাষ্ট্র তোরা চালাবি কী করে? কোথা থেকে অস্ত্র পাবি? এই অস্ত্র তোদের মগজ থেকে কি আর বেরোয়? পেট্রোল তো ঘুমোচ্ছিল আরবদেশের মরুভূমির তলায় বাবা আদমের সময় থেকে। তোদের মগজ দিয়ে তো উঠল না! কেন? কিসের জন্য? ওই যে মাঝে মাঝে আমি ঠাট্টা করেই বলি, টুপি দিতে বলেছিলেন হজরত – বলেছিলেন, ‘টুপি দিও।’ তারা সবাই বলল যে, ‘হে রসুলুল্লাহ, আমরা আপনার সব কথাই পালন করব, কিন্তু আমরা আরো গভীরে যেতে চাই, শুধু উপরে রাখলে হবে না।’ ভেতরে একেবারে মগজে দিয়ে বসে রইল। আচ্ছা, একটা মুসলমান সায়েনটিস্ট প্রথম ওয়ার্ল্ডে স্বীকৃতি পেল, তাঁর নাম হচ্ছে প্রফেসর সালাম – আহমদিয়া। পাকিস্তানে ভুট্টো, মানে এই বেনজির ভুট্টোর বাবা – বাঙালিদের তার নামে থুথু ফেলা উচিত। তার নামে, জুলফিকার আলি ভুট্টোর নাম শুনলে আমি তিনবার করে থুথু ফেলি। সমস্ত রাজনীতি নিয়ে কী খেলা খেলল দেখেছ? সে পাস করেছে যে, আহমদিয়ারা মুসলমান নয় পাকিস্তানে – ইসলামিক রাষ্ট্রের পার্লামেন্টে। তারপরে জিয়াউল হক, জিয়াউল হকও ওই সেই করলেন। কী কাজ করলেন? ও তো মুসলমান নয়, সেই-ই একটা নোবেল প্রাইজ পেয়েছে, মুসলমানরা নয়, মনে রেখো পাকিস্তান থেকে, ইসলামি রাষ্ট্র থেকে। সুতরাং আমাদের এ-ই দুর্ভাগ্য। নজরুল তো আমাদের মডেল – এতে কোনো ভুল নেই। আর কবিদের সম্পর্কে একটু দুঃসংবাদ দেবো।

আবুল আহসান        : হ্যাঁ, বলুন।

শওকত ওসমান       : তুমি তো অধ্যাপক, কাজেই বোঝো। ফর্মের দিকে তো কেউ যায় না। কবিদের জন্য যা বলছিলাম – কবিদের জন্যে দুঃসংবাদ কি জানো আবুল আহসান! তুমি অধ্যাপনা করো, কাজেই তোমার কাছে আর এসব কথার পুনরুক্তি করার প্রয়োজনও আছে বলে মনে করি না। ফর্মের দিক থেকে – গঠনভঙ্গির দিক থেকে এপিক আর লিরিক, এই তো আমরা দেখি এবং নানান রকমের মতভেদ থাকলেও এই দুটোই হচ্ছে মৌলিক, মূল গঠনভঙ্গির দিক থেকে। এখন যাঁরা আছেন, যাঁরা কবিতা লেখেন, তাঁরা কিন্তু ওই এপিক ফর্মের কথা কেউ ভাবেন না। কিন্তু নজরুলের কাব্যে কত যে এপিক আছে, সেগুলো টিকে আছে এখনো, কিন্তু কতদিন টিকে থাকবে সে কথা আর চিন্তা করি না। এজন্য জান, এখন বলে ছয়ের দশকের কবি, পাঁচের দশকের কবি – তা আমি বলি, কবিরা কেবল বাঁচেন দশ বছর। দশ বছরের বেশি বাঁচতে গেলে খুব অসুবিধাও আছে আমার মনে হয়। নজরুল ইসলাম তো কুড়ি বছর চলে গেছেন, আমাদের ছেড়ে আছেন এবং এখনও যে খুব দাপট কমেছে বলে আমার তো মনে হয় না। কারণ দাপট কমেনি এইজন্য যে দেখি বোম্বাইয়ের গাইয়েরা, গুজরাটের গাইয়েরা তাঁরাও নজরুলের গান করে এবং বাংলায় করে এবং সুরকেও আবার নানান কাজে লাগায় – রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারেও তাই হয়েছে – আমি তো গুজরাটি ভাষায় শুনেছি রবীন্দ্রনাথের সুরের গান। কাজেই দুজনেই ছিলেন কিন্তু মিউজিশিয়ান, এটা যেন কেউ ভুলে না যাই। তাঁদের প্রতিভার একটা বড় সুবিধার দিক ছিল যে তাঁরা মিউজিশিয়ান। কবিতাতে না টিকি না টিকলাম, কিন্তু গানে তো টিকে যাব। তাই-ই হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ খুব বেশি লোক পড়ে বলে এখন আমার মনে হয় না। সুতরাং এইখানে সময়ের কথাও ভাবা উচিত যে কতদিন টিকব। টেকার কথা নিয়েও তো প্রশ্ন আছে। যখন আমরা হোমার কিংবা অতীতের কবিতা কি আমাদের দেশের জয়দেবকে পড়ি – তখন তাঁদের কবিতার আয়ুর কথাটা ভাবি। আয়ুর কথাটা আশা করি আধুনিক কবিরাও চিন্তা করেন যে আয়ুটা কত দিন! সুতরাং নজরুলের মতো রবীন্দ্রনাথও সেদিক থেকে একটা ভয়ানক শিক্ষাগুরুও হয়ে আছেন এবং মডেলও হয়ে আছেন। সেটা যেন কেউ ভুলে না যাই।

আবুল আহসান : আপনি কি মনে করেন যে নজরুল সংগীতকার হিসেবেই বেঁচে থাকবেন? তাঁর কবিতা বা অন্য রচনা ক্রমশ আবেদন হারাবে?

শওকত ওসমান : না, ওরকম জোর করে কিচ্ছু বলা যায় না। কারণ জাতির জীবনের কাছে আমি বলি এঁরা ফিনোমেনা – আলো-বাতাসের মতো, তেমনই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। কাজেই এঁদের সম্পর্কে চট করে কিছু বলা যায় না – কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না বলতে পারব না। আর নজরুল তো খুব নিরিবিলি নন – সাম্যবাদের কবি। আমি ওইজন্য অনেককে বলি কি জানো, মননশাস্ত্রের দিক থেকে খুব মার্জিত নয় –

আবুল আহসান : পরিশীলিত নয় –

শওকত ওসমান : পরিশীলিত নয়। এজন্য আমি সোজাই বুঝি, ইংরেজিটাই খুব ভালো, বললে বোঝা যায় – ম্যাগনিফিসিয়েন্ট, বারবারিয়ান নয়। সেইটা ভুলে যেও না।

আবুল আহসান :      রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে নজরুলের গানের তুলনা করলে আপনার কী মনে হয়?

শওকত ওসমান : এখানে তুলনা না – মুডের ব্যাপার, রুচির ব্যাপার। মুড – কার মুডে কোনটা খাপ খায়। তুলনা করে বিচার করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের তো ভ্যারাইটিজ – অনেক গান – নানান রকমের গান লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথের জীবন স্বাভাবিকতার জীবন। ‘আগে মন করলে চুরি মর্মে শেষে হানলে ছুরি’ – রবীন্দ্রনাথ তো সারা জন্মেও লিখতে পারতেন না এই লাইন। কিন্তু এক শ্রেণীর লোককে তো খুব উদ্যমতা দেয়। কাজেই এখানে ঠিক তুলনা চলে না।

আবুল আহসান : নজরুল সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

শওকত ওসমান : রবীন্দ্রনাথ অবশ্য আমাদের খুব ঠাট্টা করে বলে গেছেন মূল্যায়নটা –  এটা ক্লাসিক, ক্লাসিক হয়ে গেছে, ধ্রুপদীর পর্যায়ে চলে গেছে আর কি। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু চমৎকার করে বলে দিয়ে গেছেন, ‘পুরোনো নৌকা-বজরা – ওটা ঘাটে বাঁধা থাকবে, ওটা এককালে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু পারাপারের জন্য নয়।’

আচ্ছা ভাই, অনেক রকমের কথা বললাম, কিছু আবোল  কিছু তাবোল। তোমার সাথে আজ অনেকক্ষণ ধরেই কিছু বাক্যালাপ করা গেল। এখন বয়স হয়ে গেছে আমার, উদ্যম অনেক কমে গেছে। তবু যাই হোক, অনেকক্ষণ তোমার সঙ্গে সময়টা ভালোই কাটল।