নিরবচ্ছিন্ন গল্প

লেখক: উম্মে তানিয়া

অবিরাম পথ চলার একধরনের শক্তি আছে, আজ এই চলার পেছনে রয়েছে প্রচেষ্টা এবং ঐক্য। এ দুটো বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে চলছে দি স্প্রাখে প্রতিষ্ঠানটি। দি স্প্রাখের ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১২ জুলাই ১২ জন শিল্পীকে নিয়ে হয়ে গেল একটি যৌথ প্রদর্শনী। যেখানে চট্টগ্রামের নবীন ও প্রবীণ, যাঁরা শিল্পচর্চার সঙ্গে রয়েছেন এবং শিল্প-সম্পর্কিত নানামুখী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাঁদের নিয়েই ছিল এই আয়োজন। দি স্প্রাখে, যাঁরা জার্মান ভাষাশিক্ষা নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের এই আয়োজনে তাঁরা যে-শিল্পপ্রদর্শনীর কথা ভেবেছেন এটি বেশ আশাব্যঞ্জক শিল্পের জন্য। দারুণ বিষয় হলো, কলার অন্তর্গত হলো ভাষা। তাই ভাষার বেশ একটা ভূমিকা রয়েছে শিল্পকলায়। দুটোর প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে কিন্তু দুটোই প্রকাশভঙ্গির অন্তর্গত এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশবাহন। দি স্প্রাখের পরিচালক জয়ন্ত চৌধুরী। শিল্পের প্রতি তাঁর যে এক নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, সেটি তাঁর শিল্পচিমত্মায় প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, শিল্পকলার মাধ্যমে সবধরনের বিষয়কেই অনেক জোরালোভাবে শিল্পী তাঁর সৃষ্টিশীল ভাষায় চিত্রপটে তুলে ধরতে পারেন, যা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব হয় না। স্প্রাখের উদ্দেশ্য হলো যাঁদের নিয়ে তাঁদের কাজ এবং নতুন যাঁরা উদীয়মান শিল্পী তাঁদের বিভিন্ন রকম সুযোগদানে প্রণোদিত করা। এরই অংশ ছিল এই শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন। এই আয়োজনের পেছনে যাঁদের অবদান তাঁরা হলেন কিংশুক দাশ চৌধুরী ও শারদ দাশ – দুজনেই শিল্পী।
এই প্রদর্শনীর যে-বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো, ফিগারের উপস্থাপন। প্রায় সব শিল্পকর্মে ফিগার ও অবয়বের ভিন্ন ভিন্ন রূপ-প্রতিরূপ রয়েছে। সেগুলো মনে করিয়ে দেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রিয়ালিস্ট শিল্পীদের কথা, যাঁদের ছবিতে রয়েছে হিউম্যান ফিগারের এক নতুন আইডেন্টিটি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফিলিপ পারলস্টেইন, আর. বি. কিতাজ, লুসিয়ান ফ্রয়েড, ফ্রান্সিস বেকন, ফ্রিদা কাহ্লো এবং আরো অনেকে। সকলেই রসদ সংগ্রহ করেছেন বিভিন্ন প্রিমিটিভ, মেক্সিকান, ইজিপ্শিয়ান ও আফ্রিকান আর্ট থেকে। এ তো হলো সত্তর-আশির দশকের ইউরোপিয়ান-আমেরিকান শিল্পের কথা। বর্তমান গেস্নাবালাইজেশনের সময়ে সব নতুন সৃষ্টিই সময়ের ব্যবধানে সকলের কাছে পৌঁছে যায়। এর ফলে জানা-অজানা অনেক শিল্পীর কাজের সঙ্গে অনেকের কাজের
কোথাও একটা-না-একটা মিল খুঁজে পাওয়াই যায়। এ-প্রদর্শনীর শিল্পীদের কাজেও রয়েছে রিয়ালিস্টিক আবহের সঙ্গে অ্যাবস্ট্রাক্ট ও সেমি-অবস্ট্রাকশনের সংমিশ্রণ, যার বিষয়বস্ত্ততে আত্মচেতনা থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক সবকিছুই উঠে এসেছে। মানবদেহ বা অবয়ব এমন একটি ফর্ম যার মাধ্যমে কোনো ছবির শিল্পভাবনা বুঝতে পারাটা অনেকটা সহজবোধ্য হয়।
‘রোহিঙ্গা’ শব্দটির সঙ্গে মিশে আছে একটি মানবজাতির ইতিহাস, যার সঙ্গে রয়েছে পুরো বিশ্বের একটা সম্পর্ক। রয়েছে বিভিন্ন রকমের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঘাত-প্রতিঘাতের যোগসাজশ। এই শিরোনামে রয়েছে নিত্যানন্দ গাইনের ছাপচিত্র মাধ্যমে করা শিল্পকর্ম। জয়দেব রওজা পারফরম্যান্স শিল্পে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। তাঁর চিত্রকর্মে তিনি বলেছেন উপজাতিদের গল্প। নাসিমা মাসুদ রুবির ‘পোর্ট্রেট’ ও সুফিয়া বেগমের ‘মিরর’ শিরোনামের শিল্পকর্মগুলোতে খুব সরাসরি কোনো মানবদেহ বা অবয়ব না থাকলেও রং ও ফর্মের বিমূর্ততার ভেতর দিয়ে ঘুরে আসা যায় তাঁদের মনোজগতে। প্রায় একই ধরনের উপস্থাপন রয়েছে কাজী সোহানার শিল্পকর্মেও। তাসলিমা আক্তার বাঁধনের শিল্পকর্ম ‘পেস্ন উইথ উইমেন পাওয়ার ৮’-এর ফিগারগুলোতে আছে মিনিয়েচার চিত্রের বৈশিষ্ট্য। শারদ দাশের চারটি ক্যানভাসে অনেকগুলো চার দেয়ালের রহস্য ঘোরাঘুরি করছে। অন্যদিকে রিপন সাহার চিত্রপটে রয়েছে ভালোমন্দের বসবাসের গল্প। কিংশুক দাশের জলরঙের ফিগারগুলো যেন একসঙ্গে জড়ো হয়ে আবার কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে, জীবনের নানা খেলায় মেতে আছে ‘রেভল্যুশন’ শিরোনামের শিল্পকর্মে। সঞ্জয় চক্রবর্তীর ‘স্ক্যারি সিটি’ নামের মধ্যেই আছে তাঁর চিত্রকর্মের বিষয়বস্ত্ত, যা বর্তমান সময়ের শহুরে অস্থিরতাকে উপস্থাপন করে। তাঁর ক্যানভাসে ফিগারের যে রিলিফ আদল তা বেশ অন্যরকম একটা অনুভূতির সৃষ্টি করে। জিহান করিমের ‘করপোরেট ফ্যান্টাসি’ শিল্পকর্মের ভেতর ফিগারের যে স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকা–র মুভমেন্ট ও তাদের যে-মেটামরফসিস, সেটি বেশ চাঞ্চল্যকর পরিবেশ তৈরি করে। প্রকৃতি সকল সৃষ্টিশীলতার মূল উৎস। সেই প্রকৃতিই অনেক কিছু বলে আমাদের। অসংখ্য ভাবনার অস্থির দোলাচল জড়িয়ে আছে তার ডালপালায়। ঠিক এমনটাই মনে হয় শায়লা শারমিনের শিল্পকর্ম দেখে।
দি স্প্রাখের এই প্রদর্শনীতে, ছোট্ট পরিসরে, এত ভাবনার জায়গা যে তারা করে দিয়েছে, তা সত্যি শিল্পীদের জন্য আশাব্যঞ্জক। চট্টগ্রাম খুব ছোট্ট পরিসর শিল্পচর্চার জন্য। কিন্তু এখানে শিল্পীদের খুব আলাদাভাবেই চেনা যায় তাঁদের শিল্পভাষার কারণে। দি স্প্রাখের এই আয়োজন যদি নতুনদের খুব সহজভাবে তাঁদের প্রদর্শনীর বা আরো বিভিন্ন কর্মকা–র সুযোগ করে দেয়, তবে শিল্পী ও শিল্পকর্মের পরিধি বাড়ার একটা নতুন স্থান তৈরি হবে।

Leave a Reply