নীল পাহাড়ের গান

লেখক:

Basanta Roy

বসন্ত রায় চৌধুরী

জীবন যেখানে যেমন; অনুভূতির এই দ্বন্দ্বে আমরা শেষ অবধি একটি উপসংহারে পৌঁছি, জীবন যাপনের প্রথাগত ধারণাকে মেনে পথ চলি। বাংলাদেশের আদিবাসীদের জীবন যাপনের ধরন সমতলে বাস করা সমাজব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন। দৈনন্দিন জীবন যাপনে তারা লালন করেন নিজস্ব সংস্কৃতি। এর প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে নন্দননির্ভর ঐতিহ্য। কনক চাঁপা চাকমা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সৌন্দর্যের কথা ছবিতে উপস্থাপন করেন। তাঁর শিল্পকর্মে গত তিন দশক ধরে নানাভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের দিনপঞ্জি নির্মাণ দেখা যায়। শিল্পী নিজে পার্বত্য চট্টগ্রামে শৈশব, কৈশোর কাটিয়েছেন। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন। চিত্রকলার পাঠ নিতে গিয়ে তিনি ছবির বিষয়ে হাজির করেন পাহাড়ি জনজীবনের আচার, রীতি-নীতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যবহার্য সামগ্রী। এ প্রদর্শনীর মোট শিল্পকর্মের সংখ্যা ৫০। মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক, তেলরং ও কাগজে চারকোল। কনক চাঁপা চিত্রকলার মৌলিক দিক কম্পোজিশনকে সব ছবিতে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ফলে তাঁর ক্যানভাস পূর্ণতা পায়, জ্যামিতিক আকৃতির অদৃশ্য বন্ধনে তৈরি হয় শক্তি। তাঁর বিষয়ের প্রতি মনোযোগের সঙ্গে ক্যানভাসে এক কেন্দ্রে গল্পের চরিত্রগুলো হাজির করেন। কেন্দ্রবিন্দুতে রঙের প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি দর্শকদের স্বস্তি দেয়। আদিবাসী জীবনযাত্রার ছন্দ ছবির মাঝে কল্পনার পাহাড়ি প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যায়। আদিবাসী সমাজের মানুষ ও জীবনাচরণে সমভূমিতে বাস করা মানুষের আচরণ কিছুটা প্রভাবিত হলেও তাঁদের মৌলিক আচরণে কোনো ব্যত্যয় দেখা যায় না। কনক চাঁপার কাজে জাতি-গোষ্ঠীভেদে যে-পার্থক্য পাওয়া যায় তা স্পষ্ট। রং প্রয়োগের কৌশলে বুনট ও উজ্জ্বলতাকে প্রধান করে নিয়ে বিষয় গড়েন। ইম্প্রেশনিস্ট রীতির চড়া ভারি রঙের প্রলেপের ঢং কনক চাঁপাকে আকৃষ্ট করে আছে গত তিন দশক ধরে। তবে বিষয় বর্ণনে একটি পরম্পরা অনুসরণে তিনি তৎপর থাকেন। কনকের ছবি দেখে এ-প্রশ্নটি বারবার সামনে এসে দাঁড়ায় – একই রকম চিত্রনির্মাণে শিল্পীর নিজস্বতার সঙ্গে দর্শকের দৃষ্টির ক্লান্তি আসেনি তো? এমন ধারণাকে পাল্টে দিয়ে আমরা বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলার ইতিহাস খুঁজলে স্পষ্ট ধারণা খুঁজে পাব। তাতে শিল্পীর স্বকীয়তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। পাঠক, আমরা সে-আলোচনায় না থেকে বরং কনক চাঁপা চাকমার এবারের ৫০টি কাজকে ভাগ করে নিয়ে বিশ্লেষণে যাই। একেবারে ছোট আকৃতি অর্থাৎ ২৪র্র্ x২৪র্ র্ ক্যানভাস থেকে শুরু করে ১৫র্ x ১০র্ মাপের বড় কাজের মধ্যে ক্যানভাসের জমিন তৈরি করেছেন রঙের প্রলেপে সৃষ্ট বুনটের সাহায্যে। কোনো ক্যানভাস গাঢ় রঙের জমিন, কোনোটি হালকা রঙের জমিন। পাতলা রঙের রেখা ও স্ট্রোকে পরবর্তীকালে বিষয়ের আবহ তৈরি হয়। রেখার চেয়ে তাঁর ক্যানভাসে বুনটের উপস্থিতি রঙের ভারি অবস্থানকে জানান দেয়। এ-প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘লাইফ ইজ হিয়ার’ অর্থাৎ এখানেই জীবন। মানুষের জীবনে প্রকৃত রূপের কথা তিনি এখানে খুঁজে পান। পাহাড়ি জনপদের জীবনযাত্রায় মানুষই একমাত্র ভরসা। প্রকৃতি সেই মানুষের সহযাত্রী, পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রায় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় লড়াই। উৎসব, পার্বণ ঘুরেফিরে তাদের কাছে আসে। কনকের কাজে উৎসবের রং হাজির হয়। ‘লেডি লাইক’, ‘হান্টসম্যান’, ‘অ্যাকুয়া মিসটিক’ অথবা, ‘হোল্ডিং হারমনি’ ক্যানভাসের ফিগার ড্রইংয়ে শক্তির উপস্থিতি দর্শকমনে নিশ্চয়তা দেয়। উজ্জ্বল রং আর ধূসর রঙের চিত্রতলে বিষয় নির্মাণে স্বকীয়তা দেয়। স্থির, ছন্দ আর গতিময় আবহে ক্যানভাসের সীমারেখার বাইরে রঙের দ্যুতি ছড়িয়ে যায়। অধিকাংশ কাজে তেলরঙের ব্যবহারে চিত্রতলের সঙ্গে বিষয় একীভূত হয়ে যায়। কৌণিক রেখা সৃষ্টির কাজে ব্যবহৃত তীরের আকৃতি একরকম জ্যামিতির অবয়ব গড়ে তোলে। এটি শিল্পীর অভ্যাসগত প্রয়োগ হলেও চিত্রনির্মাণের ক্ষেত্রে একটি শক্তি দেয় এ-আকৃতি। ক্যানভাসে গাঢ় লাল, ধূসর, উজ্জ্বল হলুদ, সেপিয়া গ্রিন, কোবাল্ট ব্লু ব্যবহারে বিষয়ে দর্শকদৃষ্টি সহজে টেনে নেয়। দৃষ্টি ও সৃষ্টির এই অপূর্ব যোগাযোগে শিল্পকর্ম প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। ১৮০ x ৩৬০ সেমি আয়তনের ‘ফেস্টিভ্যাল’ ছবিটি আড়াআড়ি দাঁড়ানো ফিগারের সারির সঙ্গে শিঙায় ফুঁ-দেওয়া মানুষের অবস্থান গতানুগতিক রীতি ভেঙে দিয়ে একটি নতুন আচরণ স্পষ্ট করে দেয়। তাঁর ছবির রঙের উজ্জ্বলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন এমন করে  – ‘আদিবাসীদের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতি ও রোদ্দুরের সরাসরি সখ্য রয়েছে। সেই রোদের খেলা একেক সময় একেক রকমভাবে দেখা দেয়। আলো ও ছায়ার বৈচিত্র্যময়তা নানারূপে আমার ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।’ আলোছায়ার প্রতি এক বিশেষ পক্ষপাত কনকের কাজকে বিশেষত্ব দিয়েছে। তাঁর ঐতিহ্যলগ্ন প্রকৃতিপ্রেমের মতোই আলোছায়ার প্রেমও এতে স্পষ্ট হয়ে উঠে। ফিগারের উপস্থিতি ছাড়াও এ-প্রদর্শনীতে বেশকিছু মুখাবয়ব রেখেছেন। মুখাবয়বে মানুষের আনন্দ-বেদনা দেখা দেওয়ার সঙ্গে পাহাড়ি মানবীর মাথায়-গলায় শোভা পাওয়া বিচিত্র অলংকারের গড়ন দেখা যায়। এক্ষেত্রে ‘ফেস-১’ ছবিতে মাথায় বাঁধা ফিতের নকশার সঙ্গে গলার নেকলেস ও পরনের পোশাকে মিল পাওয়া যায়। কনকের ছবির মানুষের পোশাক আর অলংকারে ঐতিহ্যগত আচরণ প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে শিল্পী কল্পনাকে প্রধান করেছেন। চিত্রতলের রঙের ক্ষেত্রে বাস্তবানুগ নির্মাণরীতিকে দৃশ্যমান না করে কল্পনানির্ভরতা শিল্পীর আরাধ্য। বিজু উৎসবের রঙের মেলায় পাহাড়ি মেয়েগুলির অবয়বে গাঢ় রং ব্যবহারের কারণকে আমরা সময়ের প্রতিচ্ছবি বলতে পারি। উৎসবের রঙের বিচ্ছুরণ তাদের মুখ আলোকিত করে না, কেবলই একটি উৎসব হয়ে ধরা দেয়। আলো-অাঁধারের দোলাচলে পাহাড়ি জনপদ হয়তো অনেকটা ক্লান্ত। সেই ক্লান্তির সুর কনকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এমন করে –  ‘পাহাড় ও বনভূমি ডুবিয়ে যখন কর্ণফুলী লেক, যৌবনের প্রাচুর্যে মগ্ন তখন অনেক মানুষের জল, মনোবেদনা সে কি শুনেছিল? কর্ণফুলী, তুমি এক হাতে অনেক আলোর জন্ম দিলে, আরেক হাতে অনেক জীবনের আশার আলো কেড়ে নিলে, সেটা কি তুমি জানো? আমি সেই ছবি অাঁকি যে-জীবন আমি হারিয়েছি। আমি সেই ছবি অাঁকি যে-জীবন আমি ফিরে পেতে চাই।’ আশা আর নিরাশার দোলাচলে কনক চাঁপার রঙের বাহন ছুটে চলে স্বপ্নের ভুবনে। যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় মানুষের জীবন। বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে গত ১৫ নভেম্বর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে ৬ ডিসেম্বর ২০১৪।