নোরার ক্যাসল অব ক্যাসাব্লাঙ্কা

লেখক: কাজী রাফি

কাতার থেকে ইতিহাদ এয়ারলাইন্সের বিমানটা জাহিনকে ক্যাসাব্লাঙ্কা এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিলো। এখানে এগারো ঘণ্টার জন্য ওর যাত্রাবিরতি। ক্যাসাব্লাঙ্কার বিমানবন্দরে জটলা কম হয়। ভালো লাগে তার বিমানবন্দরের ভূমির সমান্তরালের ওয়েটিং লাউঞ্জটা। জাহিনের ইচ্ছা ছিল কোনো একটা বেঞ্চ একাই দখল করে লম্বা একটা ঘুম দেওয়ার। কিন্তু আজ ওয়েটিং লাউঞ্জে যাত্রী গিজগিজ করছে। কোথাও বসার জায়গাটুকুও নেই। ঘড়ি দেখল সে। এখন বিকেল চারটা বেজে পাঁচ মিনিট। কী করবে, সে বুঝতে পারল না। আটলান্টিকের তীরের ক্যাসাব্লাঙ্কা শহর তাকে খুব টানছে। কিন্তু লম্বা যাত্রার কারণে তার শরীরজুড়ে এখন দারুণ ক্লান্তি।

মনের চাওয়া আর শরীরের ক্লান্তি দুইয়ের পাল্লাটাই সমান হওয়ায় মাথা আপাতত নিরপেক্ষ ভূমিকায় বলে কোনো সিদ্ধান্তই সে নিতে পারছে না। সুতরাং কফিশপে বসে এক কাপ কফি খাওয়া ছাড়া তার সামনে আপাতত কোনো পথ খোলা নেই। কফি-কাপে প্রথম চুমুক দিতেই সে দেখল, এক তরম্নণী তার হাতের ঝোলাটি কাঁধে ঝুলিয়ে এক হাতে কফি-মগ নিয়ে কফিশপের চারদিকে চোখ বুলিয়ে কী যেন খুঁজছে। জাহিনের মনে হলো, সে তার সঙ্গীকে খুঁজছে। কিন্তু না, মেয়েটি বেশ কয়েকবার তাকেই নিরীক্ষণ করল। একসময় কী মনে করে চোখ-ধাঁধানো সৌন্দর্যের সেই তরুণী তার সামনের ফাঁকা চেয়ারটিতে এসে বসলে জাহিনের মনে হলো মেয়েটি আসলে নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজছিল। এটা তার জীবনে অনেকবার ঘটেছে, কিন্তু তরুণীদের চোখ জাহিনের অভিব্যক্তির ভেতর নিরিবিলি ব্যাপারটা খুঁজে পায় কি এজন্য যে, তার নিরীহ দুই চোখে তাদের জন্য নিরাপদ এক বার্তা লুকানো থাকে? মেয়েটিকে নিয়ে তার কল্পনা শেষ হলো না। বিশেষত তরুণীটির মনন তার ব্যাপারে কী বার্তা পেল – তা এখনো তার কাছে রহস্যময়। আশপাশে আরো ফাঁকা টেবিল তো ছিলই। অথচ মেয়েটি কিনা তারই কাছে এসে প্রশ্ন করল :

মে আই…

জাহিন তার চিরচেনা স্মিত হাসিতে প্লিজ বলে তাকে স্বাগত জানাতেই সে সামনে বসে তার চোখে চোখ রেখে মিষ্টি করে
কৃতজ্ঞতার হাসি হাসল। ইউরোপীয় বেশভূষায় হাঁটুর কাছে কাটা জিন্স, চেইন খোলা বাদামি জ্যাকেটের নিচে সাদা টি-শার্ট আর বুটসদৃশ উঁচু জুতায় পরিপাটি হলেও তার মুক্তা-ঝরানো হাসির সঙ্গে মায়াবী চোখের ভাষায় জাহিন তাকে পড়ে নিল কিছুটা। তার মনে হলো মেয়েটি এশীয়। ইউরোপ এবং আমেরিকার নারীদের হাসির আড়ালে অমন লাজুক অভিব্যক্তির সঙ্গে চোখের ভাষা দ্বিধান্বিত হয়ে আকুলতা ছড়ায় না। তরুণী বলল :

আমি নোরা।

ধন্যবাদ নোরা। আমি জাহিন।

তোমার দেশ? তুমি কি এর আগে ক্যাসাব্লাঙ্কা শহরে গিয়েছ?

গিয়েছি। বাংলাদেশ আমার দেশ। তোমার?

আমার জন্ম আলেকজান্দ্রিয়ায়। দেশ? কোনটা বলব!

মানে?

মা থাকেন কাতারে, মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে কথা হয়। মায়ের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের স্বীকৃতি নেই বলে আমার বাবাকে আমি কোনোদিন দেখিনি। তবে তার পক্ষ থেকে যা অর্থ আসে আমার কাছে, তা আমার জীবন ধারণের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। তিনি ইউএসএতে আছেন। আর আমি আপাতত বাস করি মাদ্রিদে। ধরো এ-পৃথিবীটাই আমার দেশ।

সেই হিসেবে তুমি-আমি একই দেশের বাসিন্দা। পৃথিবী নামক গ্রহটাই আমাদের…

কফিতে চুমুক দিতে গিয়েও থেমে গেল নোরা। তার এই দৃষ্টিনন্দন থেমে-যাওয়া কেড়ে নিল জাহিনের শেষ না-করা বাক্যটার বাকি কথা। সামান্য এই বাক্যটা সে যেন আবার মনে মনে পড়ে নিল। কিন্তু জাহিনকে তার কথার প্রত্যুত্তরে সে মুখে কিছুই বলল না। ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে বলল :

কোথায় যাবে তুমি? মাদ্রিদ?

না, কিন্তু তোমার কেন মনে হলো আমি মাদ্রিদ যাচ্ছি?

কারণ লম্বা যাত্রাবিরতিতে কী করা যায় ভেবে আমিও এখানে কফি খেতে ঢুকেছি। ফ্লাইটেই যখন একগাদা খাবার গিলতে হয় তখন এসব বিমানবন্দরের ওয়েটিং লাউঞ্জে মানুষ কখন কফি খেয়ে জলে পয়সা ঢালে? অথবা জেমস জয়েসের ইউলিসিস খুলে বসে?

কখন?

যখন সে সামনের লম্বা বিরতি নিয়ে বিভ্রান্ত।

সুতরাং অবধারণের সূত্র অনুসারে তোমার মনে হলো, আমিও মাদ্রিদ যাচ্ছি। মিনস ইউ হ্যাভ অ্যা লটস অব টাইম?

নাইন আওয়ারস…

ওহ! আমার হাতে তার চেয়ে দুঘণ্টা সময় বেশি আছে।

মিনস, ইউ আর নট দেন গোয়িং টু মাদ্রিদ দেন? নোরার কথায় আনমনা ভঙ্গিতে জাহিন তাকে জানায় :

নোরা, আমার যাত্রা মাদ্রিদের বিপরীত শব্দের কাছে। যাদের আলো কেড়ে নিয়ে ইউরোপ আলোময় সেই ঝলমলতা ছেড়ে আলোহীনতার সেইদিকে যার আলোয় আমার হৃদয় ভরতে চাই।

আফ্রিকা?

ইয়েস।

ওহ, গড! হাউ সুইট…

হোয়াট?

আমার থিসিসের জন্য তোমাকে আমার কাজে লাগবে।

থিসিস? আমি কি গিনিপিগ?

সরি, তোমাকে মানে আমি আসলে তোমার অভিজ্ঞতাকে বোঝাতে চেয়েছি। আমার টপিক হলো, ইউরোপীয়দের আগমন পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকার মানুষদের সামাজিক জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল?

বাহ্, ইউরোপে বসে আফ্রিকার মানুষের জীবনকে কাছ থেকে না দেখে অথবা না জেনেই যেসব তত্ত্ব খোঁজার কাজে তুমি নিজেকে নিয়োজিত করেছ, তা একজন বিশ্বনাগরিক হিসেবে জুতসই বটে!

মানে?

আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ষোলোগুণ বড় হলেও ইউরোপীয়রা সারা পৃথিবীর চেয়ে নিজেকে বড় দেখে বলে মানচিত্রকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিল। মহান সময় এবং সূর্যমামাকে নিজেদের ঘড়ির সঙ্গে…

না, তা ঠিক নয়। দেখো, আমি আমেরিকান অথবা ইউরোপীয় কেউ নই। মধ্যপ্রাচ্যেই আমার জন্ম। মা আরব। বাবা…

এবং এখন তুমি মরক্কোয় … আফ্রিকা এবং ইউরোপের নাভিস্থলে।

ইয়েস। এবং তোমার মতো কারো প্রত্যাশায় আমি এতদিন অপেক্ষায় ছিলাম – আমি নিশ্চিত; যার সঙ্গে আফ্রিকায় গিয়ে আমি আমার পেপারসকে সমৃদ্ধ করতে পারি। যা-হোক, আমরা এই লম্বা যাত্রাবিরতির মাঝে সাত ঘণ্টা অন্তত ক্যাসাব্লঙ্কায় কাটিয়ে আসতে পারি। ক্যাসাব্লাঙ্কাকে আমার বড় রহস্যময় লাগে। ক্যান উই গো টুগেদার?

রহস্যময়! কী আশ্চর্য, ক্যাসাব্লাঙ্কাকে নিয়ে জাহিনেরও একই অনুভূতি হয়। কিন্তু ক্যাসাব্লাঙ্কা কেন নোরার কাছে রহস্যময় – তা খুব জানতে ইচ্ছা করলেও সে এ-মুহূর্তে তার ইচ্ছাটুকু দমিয়ে রাখল এই ভেবে যে, শহরে ঘুরতে ঘুরতে তা জানা হয়ে যাবে।

ইয়েস, উই ক্যান। মৃদু হাসিতে জাহিন সম্মতি জানালেও তার চোখের উচ্ছ্বাস সে এড়াতে পারল না। রহস্য ভাঙার নেশায় শরীরের ক্লান্তি তার কোথায় উবে গেল।

কথাগুলো বলে সে বাইরে তাকাল। ওয়েটিং লাউঞ্জ এখন অনেকটাই ফাঁকা। নোরা অমন প্রস্তাব না দিলে সে হয়তো ফাঁকা কোনো বেঞ্চিতে লম্বা একটা ঘুম দিত।

ওয়াও! অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। নোরার কথায় এবার ঘুমের ভাবনা উবে যেতেই নোরা আবার বলল :

ক্যাসাব্লাঙ্কা শহরে একটা টিলার ওপর একটা প্রাসাদ আছে না? আমরা ওখানে যাব।

প্রাসাদ? না তো। ক্যাসাব্লাঙ্কায় পৃথিবীখ্যাত মসজিদ আছে, সুন্দর সাগরসৈকত আর নীল নীল জলের সঙ্গে আকাশের খেলা আছে, আছে বৈচিত্র্যময় খাবার। আমি এর আগে দুবার থেকেছি শহরটায় কিন্তু…

প্রাসাদটার কথা শোনোনি তাই তো…

ঠিক তাই।

তা শুনবে কেন। তখন তো আমি ছিলাম না, তোমার আগ্রহ আর নজর ছিল শুধু খাবার আর সুন্দরী নারীর দিকে … ঠিক?

নো, বাজে কথা।

বাজে কেন? একা পুরুষের স্বাভাবিক ভাবনা।

আর একা নারীর?

ঘোড়ার ডিম। শোনো মিস্টার, বিপরীত লিঙ্গের একজন সঙ্গী পাশে থাকলে ভাবনাগুলো সঠিক পথে শাসিত হয়, বুঝেছেন?

বুঝলাম। চলো, চলো। একটু বেলা থাকতেই শহরে ঢুকে পড়ব।

চার-পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা ফিরব। শহর থেকে ডিনার করে এই ওয়েটিং লাউঞ্জে এসে আমি ছোট্ট একটা ঘুম দেবো। ইউ নো, আই’ম হেল টায়ার্ড।

 

দুই

টিকিট কেটে তারা বিমানবন্দরের গুহার মতো স্টেশনটায় ঢুকল। এখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিক, তবু গরম লাগায় নোরা তার পাতলা জ্যাকেটটা খুলে ফেলল। মোলায়েম হাতদুটো তার লম্বা আঙুলগুলোর মতোই রহস্যময় সৌন্দর্য দিয়ে এই স্টেশনের নিঃসঙ্গতাকে যেন ভেংচি কাটল। ট্রেনের জন্য আরো পাঁচ মিনিট তাদের অপেক্ষা করতে হবে। একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে তারা পাশাপাশি বসল। তারপর একেবারেই অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে চেনা মানুষ অথবা আপনজনের মতো এই অভিযাত্রার মনস্তত্ত্ব হয়তো তাদের দুজনেরই ভাষা কেড়ে নিল।

লালচে নিয়ন আলোয় পাশে বসা নোরার দিকে একবার আড়চোখে তাকাতে ইচ্ছা করতেই জাহিন ক্যাসাবস্নাঙ্কার দুর্গ সম্পর্কে জানার ভান করে নোরার দিকে পূর্ণচোখে তাকাতেই চমকে গেল। মনে হলো, এ এতক্ষণ দেখা নোরা নামের মেয়েটি নয়। লালচে নিয়ন আলো তার মুখ-কাঁধ-গলা আর খোলা বাহু হয়ে আঙুল পর্যন্ত হলুদ আগুন হয়ে যেন খেলা করছে। হঠাৎই জাহিনের মনে হলো, নোরা তার অপরিচিত কেউ নয়, বরং চিরপরিচিত এক নারী, যাকে কোনোদিন দেখা হয়নি। তার ছায়াস্বপ্নের মতো এই নারী তার স্বপ্নঘোর হয়ে তারই সঙ্গে বাস করছে তার যৌবন শুরুর প্রারম্ভকাল থেকে। নোরাকে অমন অবাক আর বিস্মিত অথচ নিষ্পাপ ভঙ্গিতে দেখতে গিয়ে জাহিন স্থান-কাল এবং সময়ের ধারণা থেকে বিচ্যুত হয়ে গেল।

তার আর মনে পড়ছে না, সে এখন ঠিক কোথায় এবং অদ্ভুতভাবে তার পাশের এই তরুণীটির নামও তার মনে আসছে না। জাহিনকে ওভাবে বিমূঢ় অথচ মায়াভরে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নোরা বিব্রতবোধ করল না। এই বিব্রতবোধটুকু নিজের মধ্যে কাজ করছে না উপলব্ধি করে নোরাও তার চোখে চোখ রেখে চুপ করে তাকিয়ে থাকল কতক্ষণ। সময়ের উপলব্ধিহীনতা গড়াল তারও মাঝে। আশ্চর্য, এত অল্প সময়ে কাউকে এতটুকু প্রশ্রয় সে দিয়েছে কখনো তা তার মনে পড়ছে না মোটেও। ঠিক এ-ও মনে পড়ছে না যে, এখনো রাত হয়নি অথবা তারা একটা ট্রেনের জন্য প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছে।

ট্রেনের আগমনে তাদের এই সময়হীনতার ঘোর কেটে গেল। কিন্তু তা কাটল চমকে ওঠার মতো। মাত্র কিছুক্ষণ আগে পরিচিত হওয়া নোরা নামের মেয়েটাই তো তার সামনে! স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার মুহূর্তটুকু সেই সময়হীনতায় এমনভাবে মিশে গেল যে, জেগে থাকার ওই ক্ষণটুকুকেই তার স্বপ্ন বলে ভুল হতে থাকল। মনে হলো, বড় বড় চোখদুটির ভেতরের মায়াকে তার পাপড়িতে ছড়িয়ে রাখা কফি পানরত সেই নোরা এই মেয়েটি ঠিক নয়। যাকে সে সারাজীবন চেনে অথচ দেখা হয়নি কোনোদিন; যাকে মনে মনে কামনা করে শুধু কল্পনার নারী ভেবে, তবু তার কাছে সে জমা রেখেছে তার স্বপ্নভূমি – এই এতদিন পর তাকে সামনে থেকে দেখে ভাষা হারানোর অনুভূতিতে নিজেকেও হারিয়েছিল জাহিন। আর নিজেকে ফিরে পাওয়ার মুহূর্তে তার মনে হলো, কোনোদিন কোনো কথা না হলেও এই কন্যাটির চেয়ে বেশি কথা সে আর কারো সঙ্গে বলেনি।

চলো, ওই যে ওই বগিটাই মনে হয় সেকেন্ড ক্লাস যাত্রীদের…

নোরা যাত্রাপথে অযাচিত অর্থ-খরচ এড়াতে দ্বিতীয় শ্রেণির টিকিট কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। জাহিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো নোরার পিছু পিছু যে কামরায় উঠল সে কামরার শেষপ্রান্তে একজন মাত্র যাত্রী। মুখোমুখি আসনে বসে নোরা প্রশ্ন করল :

তুমি কিছু ভাবছিলে? অদ্ভুত কোনো ভাবনা?

না, তা ঠিক নয়। কিছুক্ষণের জন্য আমার ব্রেন ব্ল্যাকআউটে ছিল। চেনা-অচেনার একটা ঘোর তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু তোমাকে দেখেও তো…

পৃথিবীর সকল প্রান্তের নারী স্থান-কালের ঊর্ধ্বে একটা অনুভূতিকে তাদের সত্তায় লালন করে। আর তা হলো, তার হৃদয়ের চমকে ওঠা প্রথম একান্ত অনুভূতি সে নিজ থেকে প্রকাশ না করে নিজের কাছে আগলে রাখতে চায়। সবার কাছ থেকে তা আড়াল করতে চাইলেও সে চায় তার সত্তার কোরকে উঁকি দেওয়া ভাষাটা তাকে দিয়েই আবিষ্কৃত হোক, যার জন্য সেই হৃদয়-কোরকে ডানা মেলা তার একান্ত অনুভূতির এমন অনুরণন। পরিচিত এত এত হাইপ্রোফাইলড হ্যান্ডসাম তরম্নণের হাতছানিকে মুচকি হাসিতে পায়ের তলায় মাড়িয়ে নিজেকে অনন্য ভাবার অভ্যাসে অভিযোজিত নোরা অচেনা এক যুবকের জন্য কেন অমন অনুভব করল – তা নিয়ে তার দুঃখের শেষ নেই। মন আর শরীর নিয়ে কোনো সংস্কার তার বোধে না থাকলেও পুরুষের আগ্রহকে পাত্তা না দেওয়ার অহংকার ছিল। সেই অহংকার তার ভেতরে বাস করলেও আজ কেন যেন তা তার চোখে এসে আশ্রয় নিয়েছে। সেজন্যই চোখের ভাষায় তার মায়াবী আড়াল। নোরা জাহিনকে তার কথা বাড়াতেই দিলো না।

আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি…

এমন সম্রাজ্ঞীর মতো কণ্ঠ জাহিন আগে আর কোনোদিন শোনেনি। এই অধিকার মেয়েটা কখন পেল যে, সে এমন নির্দেশ দেওয়ার স্বরে তাকে তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার তাড়না দেয়? যে ফরাসি কোম্পানিতে সে চাকরি করে সেই অফিসেও ঝলমলে নারীর অভাব নেই। মিস শাকিরা সার্বেমিত্মস তো তার বস। সে-ও কি এমন কণ্ঠে তাকে কোনোদিন আদেশ শুনিয়েছে? কিন্তু এই আদেশ তাকে উলটো আবিষ্ট করল। সে আবেগাপ্লুত স্বরে বলে বসল :

নোরা স্টেশনের নিয়ন আলোয় ঝলসে ওঠা তোমাকে দেখে আমার মনে হলো, তুমি আমার অনেকদিনের চেনা। তুমি সেই পরি, যার শরীরে বিদ্যুতের আলো আগুন হয়ে যায়। যার চোখের ভাষায় এত রহস্যময়তা যে, আমি তোমাকে এত করে কাছে পাওয়ার ইচ্ছাটার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিলাম। সামান্য এক মানুষ হয়ে তোমাকে চাওয়া নিশ্চয়ই অপরাধ! মনে হলো, এত অচেনা অথচ এত চেনা অথবা, এত চেনা অথচ এত অচেনা কারো সঙ্গে আগে কোনোদিনই আমার আর দেখা হয়নি। আমার ভেতরটা হঠাৎ অবশ হয়ে এলো। স্বপ্নও যে দুঃস্বপ্নের মতো হয়, জীবনে প্রথম তেমন কোনো অনুভূতিতে হারিয়ে যাওয়ার জন্য আমার ব্রেনের কোনো অংশ ব্ল্যাকআউট নামের বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল নিঃসন্দেহে…

নোরা জাহিনের দু-হাত ধরল। সেই হাতে মায়া নাকি শাসন ঠিক বোঝা গেল না। কথাগুলো বলার পর জাহিনের হুঁশ হলো যেন। সে লাজুক ভঙ্গিতে তবু নোরার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল তার প্রতিক্রিয়াটুকু জানার জন্য। নোরা তার আবেগকে মোটেও পাত্তা না দিয়ে বলল :

মেয়ে পটানোর মাস্টার তুমি। এশিয়া মহাদেশটা একটা সমস্যা-আক্রান্ত মনস্তত্ত্বের ভূমি। শোনো জাহিন, মিশর বলো আর আরবই বলো, মধ্যপ্রাচ্যের নিষ্ঠুর রক্ত আমার ধমনিতে। আমি রানি ক্লিওপেট্রার বংশধর। জানো তো, এই জাতিকা পদ্মিনী হলেও পুরুষের রক্তে স্নান করতে দ্বিধা করে না মোটেও।

নোরার কথায় দ্বিধান্বিত হওয়ার পরিবর্তে জাহিনের দ্বিধা যেন আরো কেটে গেল। নোরার কথাতেই কি সেই দ্বিধা কাটানোর ইঙ্গিত নেই? জাহিনের মনে হলো, নোরা তার কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য অমন নিষ্ঠুর কথাগুলো বলল। সে শান্ত আর নিরীহ ভঙ্গিতে শ্রদ্ধাপূর্ণ হাসি উপহার দিয়ে বলল :

এখনো রানি ক্লিওপেট্রার স্নানের রক্ত দেওয়ার জন্য পাগল পুরুষকে তুমি এশিয়াতেই পাবে। না, নোরা। কথাগুলো আমি তোমাকে বলতে চাইনি অথচ দেখো আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারিনি। এই নিয়ন্ত্রণহীনতার জন্য আমি লজ্জিত নই। ইয়েস, মহান রানির জাতিকা, আপনি আমার রক্তে স্নান করলেও, আমি তাই আর ভীত নই। আমরা এখন সহযাত্রী। সহযাত্রী মানে জানো তুমি?

দ্রুত হাত ছেড়ে দিয়ে সিটে শরীরকে এলিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে নোরা বলল :

জানতে চাই না। শোনো মিস্টার, কথা দিয়ে আমাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করবে না। তুমি বুদ্ধিমান – আমি নিশ্চিত। সুতরাং তোমার বোঝা উচিত মিষ্টি-কথা-বলা পুরুষদের ব্যাপারে আমার যথেষ্ট বিরক্তি কাজ করতে পারে।

নোরার কথায় এবার জাহিন স্পষ্টত অপমানিত বোধ করল। কিন্তু মন খারাপ হলো না তার। এই অনুভবেও সে আশ্চর্যান্বিত হলো। তার আত্মসম্মানবোধ প্রবল। অথচ ভয়াবহ সুন্দরী নোরার কথায় তাকে সরাসরি উপেক্ষা করার ইঙ্গিত থাকলেও আজ কেন তার মন খারাপ হচ্ছে না? তা কি এজন্য যে, নোরার এই প্রতিবাদের মধ্যে সে এক অসহায় নারীকে আবিষ্কার করল, যে-তরুণী পুরুষদের হাতছানিকে এড়ানোর সংগ্রাম করতে করতে ক্লান্ত। মায়ার চেয়ে তার শ্রদ্ধা জাগল নোরার জন্য। জাহিনের নির্মোহ তবু মায়া-ছড়ানো দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে সে বলল :

আমি তোমাকে আঘাত করতে চাইনি। আমি সহযাত্রী হওয়ার গুরম্নত্ব বুঝি। সহযাত্রী তারাই হতে পারে মৃত্যুও যাদের যাত্রাকে
থামিয়ে দিতে পারে না … তোমার চোখ আমাকে বলেছিল, এই চোখ দুটো মিথ্যা ভাষাকে ধারণ করে না। আই’ম সরি…

ইয়েস নোরা, ইউ শুড বি সরি ফর নট আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্যাট…

হোয়াট?

যে-কারণে তোমার যুদ্ধক্ষেত্রটা বড় হয়ে যাচ্ছে।

কোন কারণে?

এটা বুঝতে না পারা যে, যে-পুরম্নষের চোখ তোমার কাছে সত্যকে ধারণ করার অভিনয় করতে জানে, সেই চোখই পুরাতন মিথ্যা নামের এক চিরন্তন সত্যিকে লুকানোর কৌশল রপ্ত করতে শিখেছে মাত্র।

মানে? কী বোঝাতে চাইছ তুমি?

প্রতারণা। আমার চোখে যে-সততা আবিষ্কার করেছ বলে ভাবছ, তার অন্তরালে লুকানো আছে হয়তো এক ধরনের প্রতারণা … সুযোগ পেলেই সে তোমাকে…

বিছানায় নেবে?

না, ওটা সামান্য ব্যাপার। সে সুযোগ বুঝে তোমার অন্তর্লোকের সব ভাষাকে নিজের করবে আর দখল নেবে তোমার হৃৎপিণ্ডর সব নিলয় আর অলিন্দে…

যদি সে পারে! সত্যিই পারে যদি কেউ, বেশ হয় … আমি চাই আমার সবটা তার হোক যে, এমনকি প্রতারণা করেও আমার হৃদয়ের একান্ত আবাসটা দখল করতে সমর্থ। এমন কেউ কি জন্মেছে আসলে? নারীলিপ্সু আরবদের দেখে শরীরী ব্যাপারটার প্রতি আমার ঘৃণা জন্মেছে। বিশ্বাস করো জাহিন…

বলে নোরা চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। জাহিন তার দিকে বোবা-দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকল। নোরা ঢোক গিলে বলল…

আমি খুব খুঁজি তেমন একজনকে … যার সঙ্গে আমি বৃদ্ধ হয়ে কবরে যেতে চাই। আমার যৌবনের প্রতিটি ভাঁজ, রক্তকণার প্রতিটা সিম্ফনি যার ছোঁয়ায় ছোঁয়ায় একদিন ভাঁজহীন এবং শীতল হয়ে আসবে। এ-পৃথিবীকে তারপর একদিন বিদায় জানাতে আমার হৃদয় অবারিত এবং চিত্ত আনন্দিত হবে। আই মিন ইট; বিলিভ মি…

চমকে উঠে ভাষা এবং কালের ধারণা হারালেও জাহিন জানে সে এখন নোরা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে দ্রুতগামী এক ট্রেনে ক্যাসাব্লাঙ্কার পথে। নোরার ভাষায় যে-শহরটা রহস্যময় এবং যেখানে একটা গোপন দুর্গ আছে। সে আলতো ভঙ্গিতে ভাষা হারানো দৃষ্টিকে ট্রেনের জানালার বাইরে নিল। দিগন্তছোঁয়া মাঠের সবুজ শস্যক্ষেতে হলুদ আভামিশ্রিত শেষ বিকেলের মৃদু আলোরা খেলা করছে। জাহিনের মনে এলোমেলো ভাবনাগুলো উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। নারীর চিরন্তন অনুভব এমন শাশ্বত যে, তা এশিয়া থেকে ক্লিওপেট্রার বংশধর হয়ে আফ্রিকার কালো প্রজাতি পেরিয়ে রেড ইন্ডিয়ানদের প্রাচীন নিবাস পর্যন্ত একই রকম!

 

তিন

তেত্রিশ মিনিটেই তারা শহরে এসে পৌঁছাল। শহরে তিন ঘণ্টা ঘোরার চুক্তিতে তারা একটা ট্যাক্সি ভাড়া করল। তাদের দুজনের ভেতরের যে-রসায়ন তার দূরত্ব অথবা ঘনত্ব মাপতে চল্লিশোর্ধ্ব ট্যাক্সিচালকের সময় লাগল না। সে তাদের সেই দূরত্বকে রসায়নের ঘনত্বের সংজ্ঞায় আরো ঘনীভূত করার মানসে সাগরঘেঁষা সব তারকা রেস্টহাউসের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিলো। ক্যাসাব্লাঙ্কায় এসে এমন জুতসই যুগলকে ভ্যাগাবন্ডের মতো ঘুরতে দেখতে তার ভালো লাগছে না। মিষ্টি করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে বলল :

দূরের দেশ থেকে এসেছ, মরুর তপ্ততার সঙ্গে আটলান্টিকের জলীয় বাষ্প-মেশা বাতাস, যা ক্যাসাব্লাঙ্কার সঞ্জীবনী সুধা নামে পরিচিত তাতে শরীর মেলে দুজন দুজনের ভেতর আগে হারিয়ে যাও …  তারপর না ক্যাসাব্লাঙ্কার বাকি সৌন্দর্য তোমাদের চোখে পড়বে। নোরা একটুও লজ্জা না পেয়ে রসিকতা করে বলল :

দারম্নণ! কিন্তু তোমার সঙ্গে তিন ঘণ্টার জন্য করা একশ ডলারের চুক্তিটা?

আহা, ম্যাম! কতশত ডলার আসবে-যাবে, কিন্তু ক্যাসাব্লাঙ্কায় মিলনের স্মৃতি জীবনে ভুলবে না কোনোদিন, খোদার কসম! তোমার সময়কে স্মৃতিময় করতে পারে এমন ভালো একটা রিসোর্ট দেখিয়ে দিলেই আমি ওই ডলারটুকু অর্জনের যোগ্য হতে পারি।

ব্যাপারটা তাহলে এই! নোরার ভাবনাকে আর এগোতে দিলো না ড্রাইভার। বলল :

আমার অভিজ্ঞতার মূল্যটুকুই না হয় দিলে। তোমাদের ক্লান্তিকে মোহনীয় করতে মধ্যরাতের পর যদি বের হও তাহলে তোমাদের শহরের প্রশস্ত রাস্তাগুলো বাদ দিয়ে নিয়ে যাব সেসব গলিতে, যেখানে খাঁটি মধু আর জাফরানমিশ্রিত পায়েস, পাউরুটির সঙ্গে গরু অথবা হরিণের মাথার মগজ ভুনার উৎসব চলে। আর এসবই তোমাদের মতো তরুণ-তরুণীর জন্য। জীবন যাদের আটলান্টিক ঢেউয়ের মতো উছলে পড়ছে যৌবনের কিনারে। নোরা তার প্রস্তাবে সায় না দিয়ে বলল :

না, আমরা এই তিন ঘণ্টায় ওই সরু গলিগুলোর ভেতর ঢুঁ মারতে চাই। বোঝো তো, পেটে খেলে না পিঠে সয়। এ-কথায় ট্যাক্সিচালক জাহিনের দিকে এমন ভেংচিপূর্ণ আর ইঙ্গিতময় দৃষ্টিতে তাকাল যে, জাহিনের খুব ইচ্ছা করল নোরার কানটা মলে লাল করে দিতে। নোরার বাক্যটা শুনে জাহিনের চোখের কোণে অস্বস্তি জেগেছিল, যতটুকু ড্রাইভারের অর্থপূর্ণ দৃষ্টিবিনিময়ে সে লজ্জা পেল তার চেয়ে অনেক বেশি। ড্রাইভার তাকে যেন ইশারায় বলছে :

ভয় পাওয়ার কারণ নেই। এ-শহরের খাবার এবং পরিবেশই তোমাকে পুরুষ করে তুলবে।

এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে নোরা তাকে আড়চোখে দেখে দারম্নণ মজা পেল। বেচারার এমন করুণাবস্থায় সে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে তাকে আরো লজ্জায় ফেলতেই যেন বলল :

আহা, বেবি! বিব্রত বোধ করো না। চলো এখন, ক্যাসাব্লাঙ্কার গরুর শিং আর হরিণ খেয়ে পিঠ শক্ত করো। আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমিয়ে গেলে তুমি আমার ঘুমন্ত লাশটা নিয়ে যাবে বিমানবন্দরে। ওকে?

ক্লান্ত লাশ? লাশের ক্লান্তি? শব্দগুলো ভাবতেই, মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে অচেনা এক নারীর সঙ্গে শহরে এসে জাহিন বাক্য গঠনের সব সূত্র ভুলে গেলেও ট্যাক্সি ড্রাইভার নোরার কথায় যারপরনাই আনন্দিত হয়ে উঠল :

আমি আনন্দিত যে, আজ কাজ শেষ করব নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে। কাল তোমাদের দেওয়া সময়ে আবার আসব তোমাদের হোটেলে …ভালো কথা, রাবাত যাবে তো?

পাশের গোছানো আর পরিপাটি গাছগুলোতে, সরু গলি পেরিয়ে রেস্তোরাঁর উৎসবে, সাগরসৈকতে সবখানে আকাশের নীল যেন এখনো উঁকি দিচ্ছে। গাড়ির সিটে গা এলিয়ে নোরা বলল :

কিছু বলছ না?

ক্যাসাব্লাঙ্কার রহস্যময়তা দেখছি।

সেটা কেমন?

এই যে আটলান্টিকের জল এবং আকাশের নীল পামগাছগুলোর মাথায় সন্ধ্যাকে নিয়ে কেমন মায়ার এক বাঁধনে জড়িয়ে আছে। এটাই ক্যাসাব্লাঙ্কার রহস্য! প্রকৃতি এখানে ইট-পাথরের শহরের ইতিহাসের ভেতর সাগরের ঢেউ-ছন্দ বুকে নিয়ে ঘর বাঁধে। তারপর চাঁদের আলোর সঙ্গে চলে তাদের কথোপকথন…

কথাগুলো শুনে নোরা একদৃষ্টিতে জাহিনের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল। জাহিন কোনো একটা প্রশ্ন তার কাছ থেকে এ-মুহূর্তে প্রত্যাশা করছিল। কিন্তু দুজনের অনিমেষ চাহনির মাঝে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন উঁকি দিলেও মুখে তা আর উত্থাপিত হলো না। সামনে একটু ঝুঁকে, বাঁ কনুইকে বাঁ থাইয়ের ওপর রেখে বাঁ হাতের ওপর নোরা তার বাঁ গাল ছোঁয়াল। বাদামি বর্ণের নেইল পলিশ করা নখগুলো তার গোলাপি আভামিশ্রিত ত্বকে জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন কোনো ছোট ছোট ফলকের মতো দেখাচ্ছে। জাহিনের দৃষ্টির অপেক্ষাকৃত নিচু থেকে দুই চোখের পাপড়ি মেলে ধরে নোরা তাকিয়েই আছে। বাঁ পাশ থেকে তাকানোয় তার দুই অক্ষিগোলক চোখের একেবারে ডান কিনারে। চোখ নয়; জাহিনের মনে হলো সে যেন এমন এক চন্দ্রালোকিত আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে রহস্যাবৃত সব নিদর্শন। এই দৃষ্টির মধ্যে সৌন্দর্যের চেয়ে ভাষা এত ঘনীভূত যে, জাহিনের মেরুদ– তা কেমন শিরশির করে প্রশ্নবাণ অথবা উত্তরের স্রোত হয়ে বয়ে যাচ্ছে। এই দৃষ্টির মাঝের রহস্যময়তার চেয়ে দৃশ্যকল্পটুকুই জাহিনের মনে গেঁথে গেল। ভোররাতে নোরা মাদ্রিদ চলে যাবে; কিন্তু জাহিনের মানসপটে চিরদিনের জন্য রেখে যাবে এই চাহনির দৃশ্যকল্প। সে-কথা ভেবেই সে এই ঘোর থেকে বের হতে চাইল :

কিন্তু নোরা, সেই প্রাসাদের কথাটা যে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে কিছু বললে না? এ-কথায় নোরা ফিক করে হেসে দিলো। কিন্তু উত্তর দেওয়ার তাড়া বোধ করল না। জাহিনই তাকে উত্তর দেওয়ার জন্য উসকে দিলো :

আমরা সেখানে যাব না?

গাল থেকে হাত সরিয়ে এবার সরাসরি জাহিনের চোখের সমান্তরালে মুখ এনে নোরা বলল :

ইয়েস। তবে এয়ারপোর্টে গিয়ে। জাহিনের হাসি পেল। সে ঠোঁট দুটো চেপে গালে নিষ্পাপ টোল ফেলে বলল :

তোমার কল্পনা দারুণ! নোরা এ-কথায় জাহিনের বাঁ গালের টোলের অংশটুকু টেনে বলল :

উফ! গালে টোলপড়া ছেলেদের আমি একদম সহ্য করতে পারি না। সেটা আমার না হয়ে তার হবে কেন?

কারণ তুমি রানি ক্লিওপেট্রার জাতিকা। ধমনিতে নিষ্ঠুর রক্ত যাদের, তাদের গালে ওসব টোল-মোল থাকা কি মানায়?

শোনো, কথা দিয়ে আমাকে খেপানোর চেষ্টাও করবে না…

কিন্তু নোরার হুমকি শেষ হওয়ার আগে ট্যাক্সি ড্রাইভার প্রায় চিৎকারের স্বরে প্রেম শব্দটায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলল :

এই সেই গলির সেসব রেস্তোরাঁ, যার খাবার খেলে তোমাদের প্রেম উদ্দাম হবে।

রেস্তোরাঁর সামনে বড় বড় প্লেটে থরে থরে খাবার সাজানো। এই পুরো এলাকা খাবারের ঘ্রাণে ম-ম করছে। কিন্তু এই ম-ম ঘ্রাণের মধ্যেও তেলেভাজা তাদের অজানা কোনো খাবারের ধোঁয়ার উৎকট ঘ্রাণও লুকিয়ে আছে। খাবারের ঘ্রাণে জাহিন চাঙ্গা হয়ে উঠলেও নিষ্ঠুর রক্ত বহনকারী নোরার নাসারন্ধ্রে সেই উৎকট ঘ্রাণটুকুই এত প্রকট হয়ে উঠছে যে, তার শরীর বিদ্রোহ করতে চাইছে। কিন্তু এখান থেকে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলার পরিবর্তে সে বরং বীরত্বের সঙ্গে খাবারের ওপর হরিণ-গরু-মহিষের শিং সাজানো প্লেটগুলো আগ্রহভরে দেখতে থাকল। জাহিন তাকে ওসব হাই ভলিউম খাবার বাদ দিতে অনুরোধ করলেও সে জাহিনকে শায়েস্তা করার মানসে হরিণের শিং সংবলিত বড় দুটো প্লেট সরবরাহের আদেশ করল। জাহিনকে তার কেন শাস্তি দিতে ইচ্ছা করছে তা সে জানে না। তবে প্রকৃতি এখানে ইট-পাথরের শহরের ইতিহাসের ভেতর সাগরের ঢেউ-ছন্দ বুকে নিয়ে ঘর বাঁধে – জাহিনের এই বাক্যটা তাকে অবশ করে ফেলেছিল। সারা পৃথিবীর কোথাও তার ঘর নেই – এ-কথাটা শোনার পর থেকে এই অনুভূতি তার বুকে ডামাডোল তুলছে। এজন্যই তাকে কি শাস্তি দিতে ইচ্ছা করছে?

খাবার তো নয় যেন অমৃত।

বলে কি এই পাগল! নোরা ভেবে পায় না, প্রায় অর্ধপোড়া কোনো ষাঁড়ের মগজে কামড় বসানোর পর জাহিন কীভাবে আরো এক প্লেট জোগানোর আদেশ দেয়? নোরা এখান থেকে দ্রুত চলে যাওয়ার তাড়া দিলো। কারণ হিসেবে সে তার ক্লান্তির কথা বলল। একটু ঘুমানো প্রয়োজন, তাও জানাল। এয়ারপোর্টের কোনো বেঞ্চিতে শুয়ে সে ঘুমাতে চায়। সুতরাং বিল পরিশোধ করে তারা দ্রুতই সাগরসৈকতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

 

চার

আকাশে চাঁদের সাম্রাজ্য আর সেই সাম্রাজ্যে জোছনার মোহনীয় বিস্তার। ক্যাসাব্লাঙ্কাকে হাতের মুঠোয় পুরিয়ে রাখা ট্যাক্সি ড্রাইভার টিলামতো এক চত্বরে দেখিয়ে বলল :

ফেনিল আটলান্টিকের দিকে মুখ করা ওই ঘাসের ছোট্ট পাহাড় অনেক দম্পতির লাজ-শরমের মাথা খেয়ে ফেলে। আর এমন নির্জন জোছনা রাতেও যদি তোমরা এখানেও…

সে তার কথা শেষ না করে রহস্যময় হাসি উপহার দিয়ে কারের দরজা বন্ধ করে ঘাসের চত্বরের দিকে পা বাড়ানো জাহিনকে বলল : প্রেম পাকানোর জন্য এমন উন্মুক্ত দরজা ক্যাসাব্লাঙ্কায় আর একটাও নেই। খোদার কসম! আশা করি এমন উপযুক্ত স্থানে আনার জন্য তোমরা আমাকে পুরস্কৃত করবে।

সাগরের দিকে আনুভূমিক চত্বরের দিকে মুখ করে বসতেই নোরার মনে হলো নির্জন এই সাগর-জোছনার মোহনীয় প্রান্তর আসলেই অনবদ্য। আগেও সে ক্যাসাব্লাঙ্কায় ট্রানজিট ভিসায় ঢুকেছে; কিন্তু এখানকার কথা কারো কাছ থেকে সে শোনেনি। নাকি একা পুরুষ আর নারীকে এমন মোহনীয় স্থানে আনতে ভাড়াটে গাড়ির ড্রাইভারগুলো ইচ্ছুক নয়? সে তার উচ্ছ্বাসকে লুকাতে পারল না :

উফ, জাহিন! আমরা মনে হয় আরো তিন ঘণ্টা এখানেই কাটিয়ে দিতে পারি … দেখো, এই সেই প্রাকৃতিক রহস্যময় ক্যাসল। ক্যাসল অব ক্যাসাব্লাঙ্কা। আমার মন বলছিল দুর্গ ছাড়াই প্রাকৃতিক কোনো প্রাসাদ আছে এই শহরে।

জাহিন কোনো কথা বলল না। রেস্তোরাঁর খাবার তারা কী দিয়ে বানিয়েছে স্রষ্টা জানেন। কিন্তু সেই খাবার তার হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সে নোরার দিকে কম মনোযোগ দিয়ে সাগরের তরঙ্গময় ঢেউ আর আস্তরিত ফেনার দিকে তাকিয়ে আছে। নোরার শরীরী সৌন্দর্য তার চোখে পড়ুক সে চায় না। এই খাবারের পর থেকে নোরার ত্বকের ঘ্রাণ অথবা চুলের সামান্য স্পর্শও তাকে উদ্বেলিত করছে। মাত্র পনেরো ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও তার কপাল এবং মেরুদণ্ডর পেছনে চিকন ঘামের ফোঁটাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নোরার কণ্ঠের এমন মধুমাখা শব্দগুলোও সে এখন এড়াতে চায়। কিন্তু মেয়েটা কীভাবে নিজেকে সামলাচ্ছে সে বুঝল না। সে কি তার মতো ঘামছে না? তার দিকে না তাকিয়েই সে বলল :

হ্যালো!

হোয়াট?

ওই রেস্তোরাঁগুলো…

রেস্তোরাঁর খাবারের পর থেকে নোরার শরীর গুলিয়ে উঠছিল। বিশেষত সেই উৎকট ঘ্রাণ তার মাথার কোনো রন্ধ্রে ঢুকে তার বিবমিষাকে চাউর করে রেখেছে। আবার শিং-সাজানো প্লেটটার দৃশ্য মনে হতেই তার নাড়িভুঁড়ি যেন উলটপালট হয়ে গেল। সে জাহিনের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাতেই চমকে উঠল। কেমন বদলে গেছে তার অভিব্যক্তির অবয়ব। যেন কোনো কিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে তার মতো সেও ঘেমে গেছে। নোরা রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে দিতে গিয়ে থমকে গেল। পেছনে দুহাত এলিয়ে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখা জাহিন অদ্ভুত দৃষ্টিতে নোরাকে দেখছে। পুরুষের অসহায় দৃষ্টি অথবা কামনার দৃষ্টিকে সে ঘৃণা করে। জাহিনের চোখে যুগপৎ এই দুই দৃষ্টি তাকে বিষণ্ণ না করে বরং ভাবনায় ফেলে দিলো। ভেতরের তোলপাড় নাড়িভুঁড়ি এবার তার মুখে উঠে এলো। সে ভকভক করে বমি করে দিলো। প্রবল আর তীব্র সেই বমির বেগ সে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তার বমি দিয়ে ভেসে গেল জাহিনের শার্ট-বুক এবং চিবুক। কোনোরকমে মুখ ঘুরিয়ে সে বাকি বিবমিষা উগরে দিলো। সরি বলার জন্য একবার ফুরসত করতে পারলেও সে তাও বলতে পারল না। মনে হলো তার নাভির নিচে কে যেন কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলছে। নাভি টেনে টেনে কোনো অতল গহবরে নেওয়ার জন্য কোনো মৃত্যুদূত যেন তা আপ্রাণ টানছে। মনে পড়ল, খাবারটুকু দেওয়ার আগে রেস্তোরাঁর পরিচারিকা মেয়েটি তার কানে ফিসফিস করে বলেছিল :

ডোন্ট গেট দিজ ডিশ ইফ ইউ আর ড্রাঙ্ক অ্যান্ড উন্ট গো ফর… উইথ ইয়োর মেট। নিজের প্রতি চরম আত্মবিশ্বাসের কারণে নোরা তার কথাকে পাত্তা তো দেয়ইনি; বরং তার কথার জন্য এই খাবারের স্বাদটাই নেওয়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এভাবে তার মাশুল দিতে হবে তা সে কল্পনাও করেনি!  বিমানে সে হট ড্রিঙ্কস নিয়েছিল এবং জাহিনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। তবে নিজের শরীরের বিদ্রোহকে একবার তাড়িয়ে উপভোগ করার চিন্তায় সে আনন্দিতও হয়েছিল। সেই আনন্দে ডুব দেওয়ার কল্পনা এখন এক ভয়াবহ বিষাদ! তার নাভির অংশের সামান্য মেদটুকুতে থরথর কাঁপন। কাঁপতে কাঁপতে নাভিটা পেটের কোনো গহবরে তলিয়ে গিয়ে যেন আর স্বাভাবিক স্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতেই তা ছিঁড়ে আসছে। সে জাহিনকে দুঃখিত বলতে গিয়েও তা না বলে চিৎকার করে বলল :

আমার নাভি ছিঁড়ে যাচ্ছে জাহিন। হোল্ড ইট … শক্ত করে ধরো, প্লিজ। আমি মরে যাচ্ছি। ব্যথার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কেঁদে দিলো নোরা। গা থেকে ততক্ষণে খোলা শার্টটা জাহিন ফেলে দিয়ে অস্থির হয়ে উঠল। ঢালুর দিকে বমি আটকানোর কসরত করতে থাকা নোরার পেছন থেকে সে তার নাভি শক্ত করে খামচে ধরল। থরথর কম্পনরত নোরার ঘাম আর বমিতে ভেজা শরীর শান্ত হয়ে এলো। জাহিন তাকে চিৎ করে শুয়ে দিতেই কয়েক মিনিটের মধ্যে তার শরীর বেয়ে শীতল শামিত্মর এক অনুভূতি বয়ে গেল। ব্যাগের পকেট থেকে পানির বোতল বের করে মুখ-হাত আর টি-শার্টের বুকের কাছে লেগে থাকা বমির দাগ ধুয়ে নিল নোরা। তারপর সে  জাহিনের দিকে মুখ করে তার পাপড়িকে ছড়িয়ে বড় দুই চোখকে তার চোখে স্থির করে বলল :

আই’ম সরি। তোমার শার্টটা দাও, আমি সাগরের জলে ওটা ধুয়ে দিই।

নোরাকে সুস্থ দেখে লম্বা শ্বাস নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করল সে। তার মনে হচ্ছিল নোরা মারা যাচ্ছে। তাকে ফিরে পেয়ে সে সটান ঘাসের ওপর শুয়ে তারাভরা আকাশে সম্রাটের মতো চাঁদটার প্রতি আর স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল। জাহিনের চোখ জলে ভরে এলো। তার শরীরের সব উত্তেজনা ঘাম আর অশ্রু হয়ে গলে গলে ঝরে যাচ্ছে। তার শার্ট ধুতে যাওয়া নোরাকে হাত ধরে সে থামাল। তার হাত থেকে দ্রুত নোংরা শার্টটা নিয়ে বলল :

তুমি চুপ করে শুয়ে থাকো। আমি আসছি।

বলে সে এক দৌড়ে সাগরজলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জলে শরীর ভাসিয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে। নোরা ভয়ে চিৎকার করে বলল :

ডোন্ট ডু সো। প্লিজ জাহিন, গেটআপ। আটলান্টিক ইজ নেভার ফেভারেবল ফর সুইমিং।

শার্ট ধুয়ে খালি শরীরকে ঢাকার জন্যই ভেজা শার্টটা গায়ে দিয়ে জাহিন উঠে আসতেই নোরা তার শার্টের কলার ধরে পাশে বসাল। শাসনের ভঙ্গিতে বলল :

এত ভালো মানুষ সাজার অভিনয় করবে না আমার সঙ্গে! ডোন্ট পুট ইয়োর সেলফ ইন রিস্ক। অভিনয় করা মানুষগুলোকে আমি একদম সহ্য করতে পারি না।

জাহিন তার কথায় মূক হয়ে তার মুখের দিকে আবার ফ্যালফ্যাল করে মেয়েটার মনস্তাত্ত্বিক রোগটা বোঝার চেষ্টা করতেই নোরা তার বুকে আলতো মাথা রাখল। তার শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে কান্নার আবেগ। তার বুকের মাঝে কোনো তরুণী নিঃশব্দে কেঁদেই চলছে ভাবতেই নিজেকে জাহিন সামলাতে পারল না। সে আলতো করে তার পিঠে হাত রেখে বলল :

নোরা প্লিজ। প্লিজ নোরা, কারো কান্না আমি সহ্য করতে পারি না। আমার হৃদয় ভেঙে যায়।

নোরা এবার শক্ত করে জাহিনকে ধরে বলল :

কেন তুমি এত সম্মান করলে? কেন? পুরুষ জাতটা যে ভালো, আমি তো এ-ধারণা পোষণ করতে চাই না।

একসময় শান্ত হয়ে আসা নোরা জাহিনকে ছেড়ে বলল :

পৃথিবীর সকল প্রান্তে নারীরা হয় শারীরিক, মানসিক অথবা পুরুষের চেতনা দ্বারা নিগৃহীত। নারীর সুন্দর ত্বক আর মুখশ্রী তার নিতম্ব আর বুকের ভাঁজকে উপভোগের চেতনায় সামান্য ফেসভ্যালু ছাড়া আর কিছু নয়। মা-বাবা আমাকে একগাদা অর্থের উৎস দিয়ে চলে গেল। তারপর এমন পরিস্থিতিতে পুরুষকে বুঝতে বুঝতে আশ্রয়দাতা আত্মীয়, গৃহপরিচারক, এমনকি শিক্ষককে দিয়েও নোরারা লাঞ্ছিত হয়। বাইরের লাঞ্ছনা যে-সমাজ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারঙ্গম, সে-সমাজ ঘরে নারীদের আস্থা আর বিশ্বাসকে ছলে-কৌশলে ব্যাপকভাবে ধর্ষণ করে। নোরা তেমনই এক নষ্ট আস্থার প্রতীক মাত্র… জাহিন নোরার ঠোঁটে হাত রেখে তাকে থামাল,

আমাদের চলে যাওয়ার সময় হয়েছে…

নোরা এবার অনিমেষ দৃষ্টিতে জাহিনের দিকে তাকিয়েই থাকল। সময় যেন এই আটলান্টিকের ওপর আকাশে জেগে থাকা চাঁদ আর রহস্যময় মায়ালোক বিস্তার করা জোছনায় থমকে থেমে আছে। জাহিন নোরার মুখের দিকে ঝুঁকে বলল :

আজকের এই প্রকৃতি আর তোমাকে সারাজীবন আমি মনে রাখব এবং…

জাহিনের অপূর্ণ বাক্যটা শোনার জন্য নোরা অস্থির হয়ে উঠল। বাকি কথা জানার আগ্রহ তার অক্ষিগোলকে ওঠানামা করছে,

এবং…?

এবং শ্রদ্ধা আর মায়াভরে ভালোবাসব। জীবনের সময় কত অল্প, নোরা। সেই স্বল্প এক জীবনে আমার কিছু সময় তোমার জন্য বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছিল। তোমার ভেঙে পড়া বিশ্বাস দিয়েও তুমি আমাকে যে আস্থায় নিয়েছিলে, তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার জীবনে আর কিছু নেই!

 

পাঁচ

বিমানবন্দরে ফিরে নোরাকে নিরিবিলি কোনো জায়গা খুঁজতে হলো না। পুরো ওয়েটিং লাউঞ্জ প্রায় ফাঁকা। লম্বা একটা বেঞ্চিতে গিয়ে সে কাঁধের ব্যাগ পাশে রেখে জুতা খুলে ফেলল। নোরা হয়তো ঘুমাবে ভেবে অন্য বেঞ্চির দিকে পা বাড়াতেই নোরা তার হাত ধরে ঠিক সেভাবে তাকে থামাল, যেভাবে জাহিন শার্ট ধোয়ার জন্য সাগর কিনারের দিকে যেতে উদ্যত নোরাকে থামিয়েছিল। তার শার্টটা ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে। হেঁচকা টান দিয়ে সে জাহিনকে বলল :

অভিযাত্রী তারাই যারা সময়ের সহযাত্রী! ঘর কী – তা তো তোমার মতো করে কোনোদিন উপলব্ধি করিনি। আগামী তিন ঘণ্টা এই বেঞ্চিটাই হবে আমার প্রাসাদ। তোমার কোলে মাথা রেখে আমি ঘুমাব আর তুমি আমাকে জেগে জেগে পাহারা দেবে।

জাহিন কোনো কথা ছাড়াই মন্ত্রমুগ্ধের মতো বেঞ্চির একপাশে বসে পড়ল। পায়ের জুতা-মোজা খুলে ফেলল। আর কোনো দ্বিধা ছাড়াই নোরা জাহিনের পেটের দিকে মুখ করে ওর কোলে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ল। জাহিন দুদিকে হাত ছড়িয়ে শরীর এলিয়ে বসলে ঘুম ঘুম কণ্ঠে নোরা তাকে ধমক দিলো :

তুমি আমাকে অবহেলা করতে পারো না…। পুরুষের অতি আগ্রহ নামের অতি অবহেলায় কেটেছে আমার সারাজীবন! কিন্তু তোমার আগ্রহহীনতা আমি মনে হয় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নই।

আমি মোটেও তোমাকে অবহেলা করছি না, নোরা।

তাহলে আমাকে ধরো। আমার চুলে বিলি কেটে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও, প্লিজ। আমি বুঝতে চাই, এ-পৃথিবীতে এখনো কোনো পুরুষ আছে, যার কাছে নারীর শরীরের চেয়ে তার অসহায়ত্ব, তার শরীরের ভাঁজে উপচেপড়া যৌবনের চেয়ে তার চুলে খেলা করা চিকচিকে লাবণ্য সেই পুরুষের মায়া কাড়ে। মায়া না জন্মালে কোনো নারীর গভীরে প্রবেশের অধিকার কোনো পুরুষই পায় না। শরীর পেলেই কি নারীত্বকে উপলব্ধি করা যায়?

কথাগুলো বলতে বলতেই চুপ হয়ে গেল নোরা। জাহিন বুঝল সে ঘুমিয়ে গেছে। মানুষের প্রতি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের টালমাটাল অস্থিরতার জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রায় অসুস্থ আর দুঃখী এই মেয়েটাকে একটু পর বিদায় জানাতে হবে এবং আর কোনোদিন তার সঙ্গে দেখা হবে না – মনে হতেই খুব বৃষ্টিমুখর এবং পৃথিবীকে নিঃসঙ্গ করে দেওয়া একটা দিনের কথা তার মনে পড়ল। আফ্রিকায় কোনো এক অজানা প্রান্তরে বসে মায়ের মুখটা প্রবল বৃষ্টির অযুত ফোঁটার মধ্যে ঝাপসা হয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। সে আনমনে অথচ মায়াভরে নোরার ঝলমলে চুলগুলোতে বিলি কাটতে লাগল। এই প্রথম এক নারীকে সে এত কাছে পেল, যে এত অচেনা হয়েও চিরচেনার বেদনা দিয়ে চলে যাচ্ছে তার নিজস্ব গন্তব্যে। কেমন বিবশ আর অসহায় লাগছিল তার। নোরার অনেক কথা জানা হলো না। কেন তার মা-বাবা তাকে একা করে দিলো? মনের মধ্যে এসব প্রশ্নের এত তোলপাড় আনাগোনা যে তার ক্লান্তি কোথায় উবে গেল। বিষণ্ণ আর উদাস দৃষ্টিতে সে এবার নোরার দিকে তাকাল। পাণ্ডকে বালিশ বানিয়ে অপরিচিত এক পুরুষের কোমর জড়িয়ে কেমন পরম নির্ভরতায় মেয়েটি ঘুমাচ্ছে! নোরা এবার তার মনের কথা বুঝি টের পেল। মুখটা জাহিনের নাভির কাছে রেখেই ঘুমকণ্ঠে বলল :

আমার মা-বাবার কথা জিজ্ঞেস করে আমাকে কেউ বিব্রত করুক, আমি তা চাই না। যারা সন্তানের যত্ন বলতে একগাদা অর্থের সংকুলান করাকে বোঝায়, তাদের নিয়ে কিছু বলার মতো প্রেরণা কোনো সন্তানেরই থাকে না। থাকা উচিত নয়। জাহিন সচকিত এবং অবাক হয়ে প্রশ্ন করল :

তুমি ঘুমাওনি?

ঘুমাতে ঘুমাতেই জেগে আছি, জাহিন। বলে নোরা মাথা তুলে জাহিনের চোখে কী যেন খুঁজল। তারপর তার গলায় ঝোলানো লকেট দেখে ফিক করে হেসে দিলো :

ছেলেরা গলায় লকেট পরে! বলে সে দ্রুত জাহিনের গলা থেকে লকেটটা হাতে নিয়ে বলল :

খুলে ফেলি? এর ভেতর নিশ্চয় তোমার প্রেমিকার ছবি?

কিন্তু জাহিনের অনুমতির তোয়াক্কা না করে দ্বিখন্ডিত করার মতো করে সে লকেটটার মধ্যখান বরাবর খুলে ফেলল। লকেটের এক অংশে মধ্যবয়সী এক সুন্দরী নারীর মুখ আর অন্য পাশে হাস্যরত জাহিনের কোলে-পিঠে পাঁচজন আফ্রিকান শিশু। প্রশ্নসূচক চোখে নোরা ওর চোখে তাকাতেই জাহিন বলল :

আমার মা! মা-কে হারানোর পর আমারও আর ঘর বলে কিছু নেই। তোমার জন্য তবু অর্থের এক বড় উৎস তারা রেখেছেন। আর মা-বাবার যৎসামান্য যা ছিল আমার লুটেরাদের কাছ থেকে তা উদ্ধারের পথটুকুও রাখেনি কেউ। শুধু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমাকে দেশ থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয়। যুদ্ধ করতে হয়, প্রতিনিয়ত।

নোরা লকেটের খণ্ডিত দুই অংশ একত্রিত করল এবং তা নিজের গলায় পরে নিয়ে বলল :

আজ থেকে আমি তোমার ঘর হয়ে অপেক্ষা করব। আমাকে গ্রহণ করবে?

নোরা!

সত্যি বলছি … ডিগ্রিটা হয়ে গেলেই আমি তোমার কাছে আসব। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তর খুঁজে খুঁজে বের করব আমাদের বাসের জন্য শ্রেষ্ঠ ঘর। ঘাসের চত্বরের নির্জন প্রান্তরে কোনো উঁচু টিলায় যে-ঘরে একই সঙ্গে খেলা করবে সাগরের তরঙ্গছন্দ নিয়ে চাঁদের আলো। আমাদের প্রাসাদ! সত্যি বলছি সেদিন বিবমিষা নয়, আমাকে আগলে রাখবে আনন্দমিষা আর পাগল পাগল সেই নেশা…

জাহিন কোনো কথাই খুঁজে পাচ্ছিল না। ভেবেও পাচ্ছিল না, এটা নোরার মানসিক কোন সত্মরের অভিব্যক্তি। সে মূক হয়ে নোরার নিশ্বাসের খুব কাছাকাছি নিজের শ্বাসকে অনুধাবন করতে করতে তবু বলল :

তোমাকে পাওয়ার মতো এত যোগ্যতা কি আমার আছে? তোমাকে পেলে এক জন্মে এক পৃথিবীর সব পাওয়া পূরণ হয়ে যায়, নোরা। তুমি কি সত্যিই ফিরবে এই সামান্য মানুষটার কাছে?

আমি কোনো এক যুবককে খুঁজে ফিরছি যার অসামান্যতা তার বিনয়ের কাছে সামান্য হয়ে যায়। তার অনন্যতা, তার ভদ্রতা আর উদারতার কাছে হয়ে যায় খুব সাধারণ। আমি মানসিক প্রতিবন্ধী কেউ নই, জাহিন। কোনোদিন ভালোবাসা না পাওয়া এই নোরা হয়তো বিশুদ্ধ ভালোবাসার কাঙাল। কিন্তু মনে রেখো, এই কথা। আমাকে পেলে যদি অবহেলা করো, তোমাকে মেরে ফেলব। এই ক্যাসাবস্নাঙ্কায় আমরা হয়তো আবার ফিরব … তোমার বুকের মাঝে যে অনন্য ঘর আছে তাই পেতে নেব আজকের ফেলে আসা এমনি চাঁদনী সাগর প্রান্তরে। আওয়ার ক্যাসল ইন ক্যাসাব্লাঙ্কা।

 

ছয়

প্যাসেঞ্জারস অব ক্যাসাব্লাঙ্কা টু মাদ্রিদ, ফ্লাইট ইকে-ওয়ানফোরওয়ান, ইউ আর কাইন্ডলি রিকোস্টেড টু রিপোর্ট অ্যাট গেট নাম্বার থার্টি সিক্স। ছত্রিশ নম্বর দ্বার মাদ্রিদের ফ্লাইটের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। নোরার ফ্লাইটের লম্বা লাইনটুকুও এক সময় ফাঁকা হয়ে এলো। জাহিন উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডব্যাগ হাতে নিয়ে বসে থাকা নোরার হাত ধরল। নোরা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের মধ্যমার পার্লের আংটিটি খুলে জাহিনের কনিষ্ঠায় পরিয়ে দিয়ে বলল :

তোমাকে আমার এই আংটি পাহারা দেবে অন্য সবার দৃষ্টি থেকে … বলে উঠে দাঁড়াল নোরা। শক্ত করে জাহিনকে জড়িয়ে ধরতেই জাহিনের দুচোখ ছলছল করে উঠল। এই সামান্য সময়েই মেয়েটার জন্য কখন এত মায়া জন্মাল ভেবে সে অবাক হলো। নিজের অশ্রুটুকু জাহিনের বুকের কাছে লুকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে নোরা জাহিনের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল :

অ্যা টরু উওম্যান ডাজন’ট মিসটেক রিকগনাইজিং অ্যা পিওর সোল। আই লাভ ইউ, ইয়োর পিওর সোল, বেবি!

নোরা ছত্রিশ নম্বর দ্বারের শেষ প্যাসেঞ্জার হিসেবে তার বোর্ডিং পাস এগিয়ে দিলো এবং তার দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা জাহিনকে দেখে তার কী হলো কারো কোনো তোয়াক্কা না করে এক দৌড়ে কাছে এসে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাকরুদ্ধ কণ্ঠটা সাবলীল করার চেষ্টা করে বলল :

নট অনলি ইয়োর সোল বাট আই লাভ ইউ ঠু…

 

তার এক ঘণ্টা পর।

ভোর হয়ে আসছে প্রায়। নিজের শরীরের ঘ্রাণ জাহিনের কাছে অচেনা লাগছে। কয়েক ঘণ্টাতেই তা বদলে গেছে। তার শরীরে এখন নোরার ব্যবহার করা প্রসাধনীর সুবাস। সে কি স্বপ্ন দেখছে? নাকি নোরার ত্বকের ঘ্রাণ এমন? সে মায়াভরে নোরার পরিয়ে দেওয়া আংটিটায় চোখ রাখল। হাতের মায়াস্পর্শ দিয়ে নোরার উপস্থিতি উপলব্ধি করার চেষ্টা করল। এত অল্প সময়ে হৃদয়টা তার কী অদ্ভুতভাবে বেদখল হয়ে গেছে! সেখানে টিকটিক শব্দে রক্ত সঞ্চালনের চেয়ে নোরা শব্দের স্পন্দন এখন অনেক বেশি। প্রাণ ধারণের চেয়ে স্বপ্নের জাগরণে স্পন্দিত তার ভড়ংশূন্য আর কাঁচা হৃদয়ের ভাষাটাও কেমন বদলে গেছে।

আবিদজানের ফ্লাইট দুঘণ্টা পিছিয়ে গেছে। এই ঘোষণার সঙ্গে কিসের প্রবল শব্দে জাহিন চমকে উঠল। কাচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে রানওয়ের শেষ মাথায় আগুনের দাউদাউ লেলিহান শিখা দেখে সে অস্থির হয়ে উঠল। ঠিক তখন বিমানবন্দরে রেড অ্যালার্টের সাইরেন বেজে উঠল। দ্রুত টিভি স্ক্রিনে সে চোখ রাখল। কিন্তু সেখানে কোনো তথ্যই নেই। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ মুখে আঠা লাগিয়েছে। তাদের কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করা এখন ধৃষ্টতা। অবশেষে হাওয়ার কানে ভর করে ভেসে এলো :

ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিএ-ফোরফাইভসিক্স বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ক্যাসাব্লাঙ্কায় জরুরি অবতরণ করতে গিয়ে ক্র্যাশ করেছে।

কষ্ট না কমলেও নোরার চিন্তায় বুক থেকে পাথরের মতো চাপা উদ্বেগটুকু কেটে গেল। যাক, ফ্লাইট ইকে-ওয়ানফোরওয়ান তাহলে ঠিকমতো উড্ডয়ন করেছে। প্রকৃতি ছাড়া কাউকে ঈশ্বর না মানা জাহিন এ-খবরে প্রার্থনার ভঙ্গিতে স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানাল। ঠিক তখনই আরো কিছু ভীতিকর তথ্য সে পেল :

বিএ-ফোরফাইভসিক্স বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য উলটোপথে অবতরণ করতে গিয়ে মাত্র উড্ডয়নরত আরো একটি বিমানকে মাটিতে ভূপাতিত করেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমানটির কিছুই করার ছিল না। তাদের দুই ইঞ্জিনেই আগুন ধরে গিয়েছিল।

বুকের ভেতর ধক করে উঠল। ব্রিটিশ বিমানটি কোনো বিমানকে আঘাত করেছে? জাহিনের বুকের ধকধক হাতুড়িপেটার শব্দ একসময় তার কাছে ভয়ংকর নিনাদ হয়ে উঠল। তার কপাল আর মেরুদণ্ড বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম স্রোত হয়ে গেল যখন সে জানল :

বিএ-ফোরফাইভসিক্স বিমানটি মাত্র উড্ডয়নরত মাদ্রিদগামী ফ্লাইট ইকে-ওয়ানফোরওয়ান বিমানকে আঘাত করায় বিমানটি দুভাগ হয়ে গেছে…

বাকি কথাগুলো দূর কোনো রেডিও স্টেশনকে ঠিকমতো ধরতে না পারায় ঝিঁঝি পোকার নিনাদ হয়ে গেল। একটা বাক্য সে বুঝল, ফ্লাইট ইকে-ওয়ানফোরওয়ানের মধ্যখান থেকে লেজটা আলাদা হয়ে মাঠে পড়ে আছে এবং তাতে এখনো আগুন লাগেনি।

জাহিনের আর কিছু ভাবার সময় নেই। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে এক দৌড়ে সে সিকিউরিটি গার্ডকে ধাক্কা দিয়ে বিমানবন্দরের ভেতর ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন এসে তাকে ধরে ফেলল। সে চিৎকার করে তাদের বলল :

মাই ফিয়ান্সে ইজ স্টিল অ্যালাইভ; প্লিজ…

হোয়াট?

ইয়েস, সি ওয়াজ অ্যাট দ্য রিয়ার এন্ড অব ফ্লাইট ইকে-ওয়ানফোরওয়ান…

কিন্তু তাতে কাজ হলো না। তাকে পাঁজাকোলা করে তারা ভেতরের এক রুমে বন্ধ করে ফেলল। বিমানবন্দর পাঁচ মিনিটেই পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক বিপর্যয়ের এক পটভূমি হয়ে উঠলে জাহিন ঘরটার সামনে দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়া এক নিরাপত্তাকর্মীকে কাছে ডাকল। জানালা দিয়ে তার মানিব্যাগের অবশিষ্ট পাঁচশো চার ডলারের সবটুকু ধরিয়ে দিতেই হতভম্ব নিরাপত্তাকর্মী কিছু না বুঝেই বাইরে থেকে আটকানো দরজাটা খুলে দিলো। জাহিন লাফ দিয়ে বাইরে এসে দু-পা শূন্যে তুলে তার বুকে লাথি মারল। মাটিতে পড়ে যেতেই নিরাপত্তাকর্মীকে টেনে সে দরজার এ-পাশে এনে তার পোশাক গায়ে পরে নিল এবং দ্বিধাহীনভাবে দৌড়ে এগিয়ে যেতে থাকল মাঠের মধ্যে পড়ে থাকা ফ্লাইট ইকে-ওয়ানফোরওয়ানের লেজের অংশের দিকে।

সে জানে ঘাসের মধ্যে একটা লকেট গলায় তার নোরা মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। নোরা এমন কোনো কাপুরুষকে তার জীবনে চায়নি যে, সে মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতরাবে আর তার প্রিয় পুরুষ জীবনের ঝুঁকি নিতে ভয় পাবে!

রানওয়ে হয়ে মাঠের মধ্যে পড়ে থাকা বিমানের খণ্ডিত অংশে আগুনের লেলিহান শিখা। সেদিকে পৃথিবীর সব ক্যামেরা তার লেন্সগুলো তাক করে বাড়িয়ে তুলছে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের মানুষের হাহাকার। স্যাটেলাইট হয়ে ক্যামেরা অথবা ক্যামেরা হয়ে স্যাটেলাইটগুলোতে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে কোনো প্রাণের স্পন্দন খুঁজে ফেরা হলেও আগুনের লেলিহান শিখা আর তার তাপ অতিক্রম করে মানবের চোখ সেখানে পৌঁছানোর জন্য এখনো সমর্থ নয়।

কিন্তু পুরো বিশ্বকে অবাক করে সব টিভির ক্যামেরায় ভেসে উঠল এক অকুতোভয় নিরাপত্তাকর্মীর ফ্লাইট ইকে-ওয়ানফোরওয়ানের দিকে ছুটে চলা…

ছুটে চলতে চলতে তার শরীরী অবয়ব আগুনের ধিকিধিকি শিখার মধ্যে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে গেলেও অগ্নিস্ফুলিঙ্গে প্রতিধ্বনি হয়ে আছড়ে পড়া এবং প্রাণ আকুল-করা একটা শব্দ মানুষের মহান আবিষ্কার ক্যামেরাগুলোতে ধরা পড়ল –

নো…রা…, নো…রা…

শেয়ার করুন

Leave a Reply