পিঁপড়া-কাসেম

লেখক: সালাহ উদ্দিন পাঠান

ডান বাহুর কনুইয়ের ওপর একটা পিঁপড়া হাঁটছিল। আমি সেটা একদম খেয়াল করিনি। খেয়াল করার মতো অবস্থায় নেই আমি। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এজলাস চলাকালীন সময় এটি। এ-সময়ে কে কার দিকে দৃষ্টি রাখে। সবার মনোযোগ বিচারকের বিচারিক কর্মের দিকে নিবদ্ধ থাকে। এমনিতে পুলিশি ধরপাকড় করায় সদর ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আসামি সোপর্দ হয় বেশি, তার ওপর আজ সরকারি কর্মদিবসের প্রথম দিন। পেইন্ডিং মামলার সংখ্যা অনেক। যার দরুন এজলাস কক্ষ একেবারে পরিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। গ্যাদারিং হয় বেশি। কিছুসংখ্যক আইনজীবীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
আমি পেছনের দিকে বসা ছিলাম। আমার পাশে বসা একজন বলে, ভাই আপনার ডান বাহুতে একটা পিঁপড়া হাঁটছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখি বিশাল এক পিঁপড়া। তেমন গুরুত্ব না দিয়ে কোটের হাতা ঝেড়ে পিঁপড়াটাকে সরিয়ে দিয়ে মামলা পরিচালনায় মনোনিবেশ করি। কিছুক্ষণ পর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। একজন আমার ঘাড়ের পেছনে টোকা দিয়ে বলে, আপনার ঘাড়ে পিঁপড়া তো দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে গো! আমি বিরক্ত হয়ে পেছনের দিকে তাকাই। লোকটি জুনিয়র আইনজীবী বলে আমার দৃষ্টি হয় কড়া চোখের। জুনিয়রটি একটু থতমত খেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে আরেকটা পিঁপড়া ধরে, বাঁ-হাতের মুঠোয় দ্বিতীয় পিঁপড়াটাকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি। আগেরটার চেয়ে এ-পিঁপড়াটা আকারে বেশ বড়, ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় তাকে ‘মানজাইল’ বলে। ছোটবেলায় নানা-দাদার বাড়ির ঝোপঝাড়ে ঘুরতে গিয়ে কত পিঁপড়ার কামড় যে খেয়েছি, সেটার ক্ষতচিহ্ন না থাকলেও মনে হলে এখনো শরীর শিউরে ওঠে। বিষপিঁপড়ার কামড়ে শরীর ফুলে ফুলে ওঠে।
কথা হলো, আমার শরীরে পিঁপড়া এলো কোত্থেকে? কোর্ট বিল্ডিংয়ের চিপায়-চাপায় পিঁপড়াদের বসবাস কিংবা আনাগোনা
থাকতে পারে। পিঁপড়াদের যা অভ্যাস, তাতে সারবেঁধে চলতে পারে আবার একাকীও ঘোরাঘুরি করে। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের দশতলা অট্টালিকার বিশাল গেটের পাশে ডিভাইডার দিয়ে পথচারীদের চলাফেরার জন্য একটা ফুটপাত রয়েছে। ফুটপাতে আবুল কাসেম নামে একজন লোক মাছ ধরার টোপ হিসেবে পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করে। কিছুক্ষণ আগে আমি গেটের দিকে যাচ্ছিলাম। আবুল কাসেম যে-জায়গায় পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করে তার পাশের ফুটপাতে আমার এক ক্লায়েন্টের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে দু-তিন মিনিট কথা বলি। এতেই যা হওয়ার হয়েছে, সম্ভবত তখনই বিষপিঁপড়া আমার শরীর বেয়ে অবস্থান নেয়।
পিঁপড়ার ডিম-বিক্রেতার বৃত্তান্ত এই Ñ তার প্রকৃত নাম আবুল কাসেম। লোকজন পিঁপড়া-কাসেম নামে তাকে চেনে এবং জানে। পিঁপড়া-কাসেমের আদি ব্যবসা এটি। পূর্বপুরুষরা এ-পেশায় ছিল কি না আমি জানি না, তবে আবুল কাসেমকে দীর্ঘদিন থেকে
কোর্ট-কাছারি এলাকায় এই ব্যবসা করতে দেখে আসছি।
একটু ক্ষোভের সঙ্গে আবুল কাসেমের দিকে তাকাই। বলি, ‘আবুল কাসেম এদিকে এসো।’ পিঁপড়া-কাসেম তখন হাত-পা ঝাড়ছে। বোঝা যাচ্ছে, তার শরীরে অনেক পিঁপড়া। শরীর থেকে পিঁপড়া সরাতে গিয়ে আবুল কাসেমকে বেশ কসরত করতে হচ্ছে। সে জবাব দেয়, ‘স্যার এট্টু খাড়–ইন, আমি এহনি আইতাছি।’
তাকে আমি বলি, ‘তুমি যে ফুটপাতের পাশে পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করছ, এদিক দিয়ে চলাফেরা করলে শরীরে পিঁপড়া ওঠে।’
আবুল কাসেম খুব বিনীতভাবে বলে, ‘স্যার মাফ চাই, তবে একটা কথা আপনে ঠিক বলেন নাই।’
‘মানে, আমাকে তুমি উচিত-অনুচিত শেখাচ্ছ?’
‘স্যার রাগ কইরেন না, আমি জানি বইলাই কইতাছি।’
আমি একটু রেগেই যাই। বলি, ‘তুমি আমাকে জ্ঞান দিতে চাইছ।’
পিঁপড়া-কাসেম বলে, ‘না স্যার। আপনেরা কন এইডা পিঁপড়ার ডিম।’
‘তোমার সামনের খাঁচার এগুলো তাহলে কী?’
‘ধরবার পারুন, এইগুলো পিঁপড়াসহ ডিম।’
‘বলছ কী তুমি! আমরা তো জানি মৎস্য শিকারিরা পিঁপড়ার ডিম দিয়ে মাছ শিকার করে।’
আবুল কাসেম পা-িত্যসুলভ জবাব দেয়, ‘কতা ঠিকই কইছেন স্যার, পিঁপড়া সম্পূর্ণ মাডির ডিবিতে ঘর বানায় কিংবা জঙ্গলের গাছের কোঠরে অবস্থান লয়। তহন তো ওইসব জায়গায় বেশ কয়েকদিন ধইরা ডিম পাড়তে থাহে; হেই সময় ওইগুলি মাছের টোপ হিসাবে জোগাড় করা অয়।’
আমার কাছে বিষয়টি অবাক করার মতো মনে হয়। এতদিন জেনে এসেছি পিঁপড়ার ডিম ব্যবহার হয় মাছের টোপ হিসেবে। এখন জানি, ডিমের সঙ্গে ডোল পিঁপড়াও থাকে। টোপের সঙ্গে ওগুলো ব্যবহার হয়।
আমি আবুল কাসেমকে জিজ্ঞেস করি, ‘পিঁপড়া ডিম ছাড়ার কতদিন পরে টোপ হিসেবে এর প্রক্রিয়াজাত শুরু হয়?’ মনে হয় প্রশ্নের মর্মার্থ আবুল কাসেম অনুধাবন করতে পারেনি। আমি তাকে বিষয়টি পরিষ্কার করে বললে সে বলে, ‘পিঁপড়া যহন গাছের ডালে কিংবা মাডির ঢিবিতে ডিম ছাড়ে, এর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ওইগুলা মাছের টোপের লাইগ্যা সংগ্রহ করা অয়। নাইলে ডিম ফুইটা বাচ্চার থাইক্যা বড় অইয়া মানজাইল অইয়া যায়।’
‘তুমি এসব সংগ্রহ করো কোত্থেকে?’
‘আমি হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকার গারোদের কাছ থাইক্যা কিইন্যা লই।’
আলাপচারিতায় আবুল কাসেম বিশদ বর্ণনায় আমাকে যা জানায় তাতে কেন জানি আমার মনে হয়, এ-ব্যাপারে অর্থাৎ পিঁপড়াবিষয়ক অভিজ্ঞতার বিশাল ভা-ার জমিয়ে ফেলেছে আবুল কাসেম। এ-ব্যবসায় যেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তেমনি জানাশোনা লোকেরা তাকে এখন পিঁপড়া-কাসেম বলেই ডাকে। এজন্য তার কোনো খেদ কিংবা অভিমান নেই। কারণ এ-অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবসায়ী হচ্ছে সে। পিঁপড়া-কাসেমের কাছ থেকে আরো অনেক কিছু জানা গেল। মাছের টোপ পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করার এ-অঞ্চলে বেশ কয়েকটি স্পট রয়েছে, যেমন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শেষ মোড়, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন বাইপাস সড়ক, বড় মসজিদ মোড় এলাকায় মৎস্য শিকারের টোপ পিঁপড়ার ডিম বিক্রি হয়।
আমি আবুল কাসেমকে প্রশ্ন করি, ‘তুমি এই ব্যবসা করছ ঠিক কতদিন ধরে ?’
আবুল কাসেম বলে, ‘ধরুইন বিশ বছর অইবো।’
‘তাহলে তুমি কি হালুয়াঘাট থেকে এসব নিয়ে আসো?’
‘না স্যার, আমার এক গারো প্রিয়মানুষ আছে, হের নাম অইলো সুবেশ চিসিম। ওই দোস্ত আমার এইহানে দিয়া যায়।’
‘তাহলে তোমার খাটুনি কিছুটা বেঁচে যায়, না?’
আবুল কাসেম খুব করুণ দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকায়। করুণ দৃষ্টির সঙ্গে তার মুখাবয়ব কুঁচকে যায়, শরীর দেখিয়ে বলে, ‘দেহুইন স্যার, আমার সারা শরীরে খালি পিঁপড়ার কামড়ের দাগ, খাউজায় স্যার, খালি খাউজায়।’
গভীরভাবে আবুল কাসেমকে অবলোকন করতে গিয়ে খেয়াল করি, ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গার চামড়া ওঠা। বোঝা যাচ্ছে, এই লোকটি ভীষণ পোড়-খাওয়া মানুষ। খাটাখাটুনি আর অভাবে বয়সের তুলনায় বয়স্ক লোক বলে ভ্রম হয় তাকে। আমার ধারণা জন্মেছে, আবুল কাসেম বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোটই হবে।
আবুল কাসেমের প্রকৃত বয়স কী হতে পারে, সেটা আন্দাজের মধ্যে ধরে নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘তোমাকে তো কোর্টে
আসা-যাওয়ার পথে দেখি। তোমার সম্পর্কে জানা হলো না। থাকো কোথায় তুমি?’
অত্যন্ত বিনীতভাবে আবুল কাসেম জবাব দেয়, ‘স্যার, আমার গেরামের বাড়ি ফুলবাড়িয়ায়। ওইহানে আমার বউ আর ছোড মাইয়াডা থাহে। একখান পোলা আছে আমার, হে কলেজে আইএ পড়ে।’
‘ভালো কথা, রাতে ঘুমাও কোথায়?’
‘হারুনের চায়ের দোহানে, হের বদলে রাইতের খাওনডা আমার পাক কইরা দিতে অয়।’
সারাদিন অমানুষিক খাটাখাটুনির পর আবুল কাসেমের নিরাপদ আশ্রয় এটিই। শহরে ওর কোনো নির্দিষ্ট বা স্থায়ী জায়গা নেই। ছেলে কলেজের হোস্টেলে থাকে, হারুনের চায়ের দোকান রাতযাপনের জন্য খুব উৎকৃষ্ট জায়গা নয়। কারণ সিজনে রাতের বেলায় ওখানে ক্রিকেট-জুয়াড়িদের একটি গ্রুপ বাজির দরে হার-জিতের পর টাকার ভাগাভাগিটা করে থাকে। ক্রিকেটের টি-টোয়েন্টি ভার্সনের বাজির এ-খেলাটাকে ইস্টু খেলা বলা হয়ে থাকে। ইস্টু মানে একজন একদলের পক্ষে যে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ধরবে, প্রতিপক্ষ অন্যজন আরেক দলের পক্ষে বেশি দরের বাজি অর্থাৎ ইস্টু ধরবে। ভাগাভাগির টাকাটা জুয়াড়িরা সাধারণত জমা রাখে আবুল কাসেমের কাছে। ভাগের টাকা থেকে একটা পার্সেন্টেজ সে পায়। আইপিএলের বাজির দরটি এখানে হয় বেশি। বিপিএল বা বিগব্যাশের বাজির দর থাকলেও তার সংখ্যা খুব কম। জীববৈচিত্র্যের অবলম্বন যা-ই হোক, মানুষ তার নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বিশেষ একটি প্ল্যাটফরম বেছে নেয়। আবুল কাসেমের ক্ষেত্রে যদি তার জীবনযাপনে এ-ধরনের অভ্যাস পরিলক্ষিত হয়, তাতে দোষের কী!

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার মন-মানসিকতায় আবুল কাসেমের কর্মজীবনের ওপর দৃষ্টিপাত করা অনেকাংশে সম্ভব হয় না, জটিল পেশায় থেকে আর বিস্তর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কখনো কখনো আত্মনিমগ্ন থাকি। তথাপি আবুল কাসেমের সঙ্গে একধরনের গাঢ় সম্পর্ক হয়ে যায়। নিম্নবিত্তের মানুষ হলেও আবুল কাসেমের জীবনযাপনে অন্য ধরনের বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। নিজের পরিশ্রমের ফসল হিসেবে সংসার ধরে রাখতে পেরেছে। না হলে সন্তানদের লেখাপড়ার ট্র্যাকে রাখতে পেরেছে কীভাবে! ফুলবাড়িয়ার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এসে শহরে মাথা গুঁজে ক্ষুদ্র ব্যবসা চালিয়ে দিনাতিপাত করাটা কঠিন সংগ্রামের বিষয়।
বিড়ম্বনা মাঝপথে আবুল কাসেমের বৈচিত্র্যময় জীবনে হুমকি হয়ে দাঁড়ালে নিষ্কণ্টক থাকা যায় কীভাবে! কমাস আগের কথা ধরলে আমার কাছেও ব্যাপারটি পীড়াদায়ক মনে হয়। যা ঘটেছে, তা থেকে সহজে নিষ্কৃতি পাওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিছুটা অপারগতা আবুল কাসেমের নিজেরও আছে। যেখানে সে পিঁপড়ার ডিমের ডালি রেখে ব্যবসা করে আসছে, সেখানে ডিমের ডালি রাখতে গেলে কিংবা ব্যবসা চালাতে গেলে এলাকার কিছু সন্ত্রাসীকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হতো। এখন সে-রেওয়াজ পালটে গেলেও সেই ধারাবাহিকতায় চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে ওই গ্রুপের একজনকে ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে রাখতে বাধ্য হয়েছে। আবুল কাসেমের ধারণা : পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা আর কী!
কর্মব্যস্ততার বাইরে অন্য কিছুতে সময় ক্ষেপণ করার ইচ্ছে আদৌ আমার না হলেও পিঁপড়ার ডিমবিষয়ক ব্যাপারগুলো খুব ভাবায়। একধরনের আগ্রহবোধ থাকায় দিনের শেষে সময় পেলেই আবুল কাসেম আমার চেম্বারে আনাগোনা করে। সমীহের দৃষ্টিতে তাকে দেখি বলেই শান্তি-অশান্তি সব বিষয়ই আমার সঙ্গে শেয়ার করতে আসে।
দরজার ঝুলপর্দা একটু ফাঁক হতেই সালাম দিয়ে আবুল কাসেম চেম্বারে ঢোকে। তার হাতে একটা খাম দেখা যাচ্ছে। তাকে চেম্বারে বসতে বললে কাচুমাচু হয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকে, বলে, ‘আমার মতো ছোড মানুষ আপনের চেম্বারে বওয়াডা ঠিক অইতো না, হের চাইতে আমি খাড়াইয়া থাহি।’
আমি তাকে ইশারায় চেয়ারে বসতে বলি, ‘তুমি এসেছো ভালোই হয়েছে। দেখো, সেদিন একটি পত্রিকায় পিঁপড়ার ডিমের ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন পড়লাম। জামাল হোসেন নামের এক লোক কীভাবে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করে।’
আবুল কাসেম বিশেষজ্ঞের মতো ভাষ্য দিলো। মুচকি হেসে বলল, ‘আমিও তো পয়লা জীবনে গাছে, পাহাড়ে নানা জায়গায় ঘুইরা পিঁপড়ার ডিম জোগাড় করতাম। হেই কামে কষ্ট বেশি। পোলা-মাইয়ারা বড় অইয়া গেছে, হেরাও এট্টু শরম পায়। কইতো, তুমি অন্য কাম পাও না? হেরপর থাইক্যা আমি ডিম জোগাড় করতে যাই না। কিন্তু নিজেই ব্যবসায় নাইম্যা পড়লাম।’
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা কি লাল পিঁপড়ার ডিম, নাকি কালো পিঁপড়ার?’
আবুল কাসেমের হাসি খুব প্রসারিত হয়। বলে, ‘না স্যার, এইডা অইলো গিয়া ডোল পিঁপড়ার। এর রং অয় লাল আবার এইডারে বিষপিঁপড়াও কয়। কোনো কোনো এলাকায় লাল পিঁপড়ারে লালশোও কয়।’
আমি আবুল কাসেমকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, ‘লাল পিঁপড়ার ডিম কি একেবারে সাদা হয়?’
‘ডিম সাদাই অয় কিন্তু মা পিঁপড়া সব সময় সাদা ডিমের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে, নজরে রাহে, এইগুলারে
মানজাইল কয়।’
‘তোমার তো দেখি বেশ ভালো জানাশোনা আছে।’
‘ছোডবেলা থাইক্যা এই কাম করি স্যার, আপনেই কইন, আমি যাই করি, জাইন্যা-বুইঝ্যা করতে অইবো না?’ আবুল কাসেম খুব বিশারদের মতো জবাব দেয়।
‘মৎস্য শিকারিদের কাছে আকর্ষণীয় টোপ কোনটি, তুমি জানো?’
‘যারা বড়শি দিয়া মাছ ধরে, তাগোর কাছে লাল পিঁপড়ার ডিমের চাহিদা বেশি। কারণ অইলো পানির মইধ্যে দিশা করা একটা জায়গায় আধার ফালা অয় মাছ ডাইক্যা আনার লাইগ্যা, হেই কামে লাল পিঁপড়ার সাদা ডিমের চাহিদা অইতাছে বেশি।’
‘তুমি এ-বিষয়ে ভালোই জানো দেখছি। যাক, কেন এসেছ সেটা বলে ফেলো। ’
হাতের খামটা দেখিয়ে আবুল কাসেম বলে, ‘ওরসের দাওয়াত স্যার। আমার দোস্ত জয়নাল আপনেরে তার দয়াল বাবার ওরস শরিফের দাওয়াত দিছে।’
আমি তাকে বলি, ‘জয়নালকে চিনলাম না!’
আবুল কাসেম বলে, ‘স্যার জয়নাল আমার মতোই, ইউনিভার্সিটির শেষ মোড় এলাকায় পিঁপড়ার ডিম বেচে।’
‘তো আমি সেখানে গিয়ে কী করব?’
‘জয়নালে খুব আশা কইরা কইয়্যা দিছে, আপনেরে যাইতে অইবো।’

রাতের বেলায় আলোকসজ্জাকে দিনের উজ্জ¦লতা মনে হয়। জয়নালের দয়াল বাবার ওরশে ভক্ত-আশেকানের একটি মিলনমেলার মতো হয়েছে। জিকির-আজকার তো চলছেই, আরেক পাশে চলছে বাউলশিল্পী রেশমা আক্তারের বিচ্ছেদি গান। মূল ফটকের সামনে একটা সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে। সেটার কোনো কোনো জায়গায় ঘষামাজা, আবার কিছু লেখা বেশ চকচকে। সাইনবোর্ডে লেখা আছে Ñ ‘এখানে পিঁপড়ার ডিম বিক্রয় করা হয়। প্রোঃ মোঃ জয়নাল মিয়া।’
সাইনবোর্ডের ব্যাপারটি আমার মনে খটকা লাগায়। আবুল কাসেমকে জিজ্ঞেস করি, ‘জয়নালের সাইনবোর্ডের অবস্থা এরকম কেন? ঝাপসা সাইনবোর্ড বদলে ফেলে নতুন করে লাগালেই তো পারে।’
আবুল কাসেম সবজান্তার হাসি হেসে বলে, ‘বুঝলাইন না স্যার, তার মানে অইলো, সাইনবোর্ডটা অনেক পুরান, মানে জয়নাল বহুদিন ধইরা পিঁপড়ার ব্যবসায় আছে আর কী!’
এটি জয়নালের ব্যবসায়িক চালাকি। আমাদের দেখে একটি লোক এগিয়ে এলো। শীত এখনো জাঁকিয়ে বসেনি অথচ তার মাথায় একটা মাংকি টুপি যা কান পর্যন্ত ঢাকা, গলায় মাফলার। আবুল কাসেম তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, এ হচ্ছে জয়নাল। সে আমাদের রেশমা আক্তারের বাউল গানের আসরে বসায়। রেশমার গান শেষ হতেই জয়নাল মাউথপিস হাতে নিয়ে বলে, ‘রেশমা আক্তারের গান শুনে অমুক সাহেব খুশি হইয়া দুইশো টাকা করলো দান।’ এতে করে রেশমা আক্তার বিপুল উৎসাহে আবার গান গাইতে শুরু করল। জানতে পারলাম, রাতব্যাপী বাউল গানের আসর চলবে। আসরের পালা বদলের এক পর্যায়ে জয়নাল ও আবুল কাসেম বাউলশিল্পী রেশমা আক্তারকে আমার কাছে এনে পরিচয় করিয়ে দিলে রেশমা আমার পা ছুঁয়ে সালাম করে, দোয়া চায়। আমি রেশমার মাথায় হাত রেখে বলি, ‘আরেকদিন তোমার গান শোনা হবে।’ আয়োজকদের সবাই মিলে আরো কিছুক্ষণ থেকে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করলে আমাকে একটু থেকে যেতেই হয়।
বিরতির পরে রেশমা আক্তার আবার গান ধরে, ‘দয়াল বাবা কেবলা কাবা আয়নার কারিগর/ আয়না বসাইয়া দে মোর কলবের ভিতর।’ এটি বাউল সংগীতের প্রসিদ্ধ একটি গান। বহুবার শুনেছি। তবে রেশমা আক্তারের দরাজ কণ্ঠে গাওয়া গানটি বাউল আসরে একটি বহুমাত্রিকতা এনে দিলো। দেখার মতো বিষয় হলো, গানের সঙ্গে জিকিরের তাল। জয়নালকে ইশারায় কাছে ডেকে সংকেত দিতেই মাউথপিস হাতে নিয়ে জয়নাল ঘোষণা করল, ‘রেশমা আক্তারের গান শুনে আমাদের স্যার পাঁচশো টাকা করলো দান।’ এতে উপস্থিত সবার হাততালি পাওয়া গেল।
এ-ধরনের অভিজ্ঞতা আমার আগে থেকেই আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, পিঁপড়ার ডিম বিক্রির আয়ে সংসার চালালেও জয়নাল মিয়া বাউল সংগীতের বিশাল আয়োজন করে ফেলেছে। আবুল কাসেম আর জয়নাল মূলত পিঁপড়ার ডিমের ব্যবসা করে। নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ হলেও তারা গ্রামবাংলার প্রাণের সম্পদকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে, মনে করতে পারি। তাদের চিন্তাশক্তি সৃজনশীল কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এসব জানা-বোঝার ব্যাপার ঘটে Ñ নিয়মিত এসবের খবর রাখলে, নয়তো যোগাযোগ রাখলে।
পেশাগত কারণে বেশ কিছুদিন এসবের বাইরে থাকি। আমার যাত্রাপথে নিয়মিত দেখা হওয়ার কথা আবুল কাসেমের সঙ্গে। ব্যস্ততা মানুষকে অবসরের ফুরসত দেয় খুব কম। কর্মচাঞ্চল্যের কারণে এমনটি হতে পারে। যাত্রাপথে হঠাৎ হঠাৎ-ই একটি বিষয় আমার নজরে থাকে আর তা হলো আবুল কাসেমের অঙ্গভঙ্গি, মানে
হাত-পায়ের খুজলি-পাঁচরা চুলকানো। পিঁপড়ার ডিমের সঙ্গে মানজাইল পিঁপড়া থাকবেই। পিঁপড়া ডালি বেয়ে রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে পড়ে আর আবুল কাসেমের শরীরে সেগুলো বিচরণ করে। মানজাইল পিঁপড়া আবুল কাসেমের শরীরে জায়গায় জায়গায় কামড়ায়। যখন থেকে পিঁপড়ার ডিমের ব্যবসা করে আসছে, তখন থেকেই তার শরীরের এ কাহিল অবস্থা। এটি তার জন্য কষ্টদায়ক হলেও
জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সহ্য-ক্ষমতা থাকতেই হবে।
পেশাগত কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা ভিন্নমুখী হয়, হতে পারে। আমার পেশার মানের সঙ্গে আবুল কাসেমের পেশার তুলনা চলে না! তদুপরি পিঁপড়ার ডিমবিষয়ক আগ্রহের কারণে আবুল কাসেমের চরিত্র আমাকে বেশ আগ্রহী করে রেখেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হলেও জীববৈচিত্র্যের একটি আকর্ষণীয় মাধ্যমে সে বিচরণ করছে, যার শাখা-প্রশাখা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ধারায় প্রবহমান মনে হয়। আমি পেশাজীবী হিসেবে আইন অঙ্গনে বিচরণ না করলে আর আবুল কাসেমের পিঁপড়ার ডিমবিষয়ক ব্যবসা না হলে হয়তো আমারও অনেক কিছু জানার বাইরে থেকে যেত।

বিকেলের অবসর সময় আমি একা থাকলে চিন্তার খোরাক জোগাই। এমন সময়ে আবুল কাসেম একজন লোক নিয়ে আমার চেম্বারে এলো। লোকটিকে দেখে চেহারা-সুরতে আমার কাছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক মনে হলো।
আবুল কাসেম সালাম দিয়ে লোকটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো, ‘এইডা অইলো সুবেশ চিসিম, আমার দোস্ত, যার কাছ
থাইক্যা আমি পিঁপড়ার ডিম কিইন্যা আনি।’
নাম সুবেশ হলেও চেহারা-সুরতে কালো নিগ্রোদের মতো।
আমি বললাম, ‘ভালো কথা, বসো তোমরা। কেন এসেছ?’
আবুল কাসেম বলল, ‘আমার খুব পরানের দোস্ত সুবেশ, আপনের কথা আমি তারে সব সময় কই। কই, আপনে খুব
দিল-দরাজ মানুষ। আমার মতো খাইট্টা খাওয়া মানুষেরে আপনে খুব দাম দেন।’
‘এজন্যই সুবেশকে নিয়ে এসেছ?’
‘না স্যার, আপনেরে জানবার সুবেশের বহুত আগ্রহ। আমারে কয়, তর সাইবের লগে আমারে পরিচয় করাই দে। হের লাইগ্যা লইয়া আইলাম।’
‘ভালো করেছ। তো বলো সুবেশ আমার কাছে কী জানবে?’
সুবেশের অবয়বে কিছু বোঝা না গেলেও তার কথা বলার স্টাইল
দেখে একজন স্মার্ট লোক মনে হলো। বোঝা যাচ্ছে, সমাজে ওর বেশ চলাফেরা আছে। তেমনি জানাবোঝাও আছে।
সুবেশ চিসিম বলে, ‘আমরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক। আমাদের সামাজিক একটা অবস্থান থাকলেও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অনেকে যেমন আমাদের খোঁজ রাখতে চায় না, তেমনি আমাদের কথা মিডিয়ায় উঠে আসে খুব কম।’
আমি বললাম, ‘পারস্পরিক সম্পর্ক হলে, একজন আরেকজনকে খুব কাছ থেকে বুঝতে পারে, আর এখন তোমরা যেভাবে সমাজের উঁচুস্তর পর্যন্ত উঠে আসছ, সেটা যোগ্যতার ভিত্তিতে, কারো দয়ায় নয়।’
‘স্যার, আমাদের তো মাতৃকুলভিত্তিক গারো সমাজ, সংখ্যাগরিষ্ঠে আমরা খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী। দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও সামাজিকভাবে আমাদের নিজেদের মধ্যে বৈষম্য একেবারে কম।’
‘তুমি তো বেশ ভালোই জানো দেখছি! পড়াশোনা কদ্দুর?’
‘ব্যাচেলর ডিগ্রিটা নিতে পারিনি, তবে আইকম পাশ। শুনেছি আপনি লেখালেখি করেন, আমাদের নিয়ে একটু লেখেন স্যার।’
‘দেখি কী করা যায়। তুমি আজ আবুল কাসেমের ওখানে থাকছ?’
‘আজ থাকতে পারছি না, এখন কার্তিক মাস। মৌসুমি ফসল তোলা শেষের দিকে। ফিনিশিং দেওয়ার অনেক কাজ বাকি আছে। এরপর আমাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ওয়ানগালা উৎসবে আপনাকে নিমন্ত্রণ দিতে এসেছি। আপনাকে আশা করবো স্যার।’
যদ্দুর জানি, গারো সমাজের ওয়ানগালা উৎসব হয় ঘরে ফসল তোলার আনন্দঘন মুহূর্তে। উৎসবে নৃত্যগীত হয়। গারোদের আদি ধর্ম ছিল উৎসবময়। এ-উৎসবের মাধ্যমে দেবতাদের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করে বিনম্রভাবে। ভালো ফসল উৎপাদন, সুন্দর জীবনের অভিব্যক্তি প্রকাশ, অন্যায়, মহামারি থেকে মুক্তি পাওয়া, নৃত্যগীতের মাধ্যমে দেবতাদের আনুকূল্য পাওয়া এসব নির্ভর করে। ঐতিহ্যগতভাবে গারো সমাজ পারিবারিকভাবে ওয়ানগালা উৎসব পালন করে আসছে। আমি কথা দিই সুবেশ চিসিমদের উৎসবে যাবো।
গ্রামীণ আবহে শীতের আগমনী বার্তা দেয় একটু আগেভাগে। ছায়াশীতল প্রকৃতি দূরপ্রান্ত পর্যন্ত অবগাহনের অনুভূতি জাগায়। আমি আর আবুল কাসেম সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে যাচ্ছি। দুপাশের খোলা মাঠে রবিশস্যের বিপুল সমারোহ। বিশেষ করে শর্ষেক্ষেতের উপস্থিতি মনোজগতের পার্থিব উপাদানগুলোকে একধরনের সুড়সুড়ি জাগানিয়া। কিছুটা দূরে একটা বিল দেখা যাচ্ছে। বিলের মাঝখানে একটা বাঁশের খুঁটির আগায় একটা সাদা বক শিকার ধরতে একমনে বিলের পানির দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবা যায়, এমন নিসর্গের সরব জানান দেওয়া আর কোথায় পাওয়া যাবে!

সুবেশ চিসিমের বসতবাড়ি বিশাল দোচালা টিনের ঘর। এ-অঞ্চলের পিঁপড়ার ডিমের পাইকার বলে কথা! বহুদিন থেকে তারা একান্নবর্তী পরিবারের মতো। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, নৃগোষ্ঠী গারো সমাজের একেক গোষ্ঠী একেক প্রকৃতিতে বসবাস করে। পূর্বপুরুষ থেকেই সুবেশ চিসিমদের গোষ্ঠী সমতলভূমিতে বসবাস করে আসছে। এতে করে তাদের প্রধান উপজীব্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় কৃষিকাজ।
সুবেশ আমাদের বাড়ির উঠানের একটি চাতালে বসতে দেয়। এখনো সন্ধ্যা নামেনি। ওয়ানগালা উৎসবের রুপালি ভার্সনের প্রস্তুতি চলছে। তরুণ-তরুণীরা আকর্ষণীয় সাজে একে একে জড়ো হচ্ছে। কেউ কেউ আমাদের হাত-মাথা নেড়ে ভক্তি জানায়। দেবতাদের ভক্তি জানাতে এ বিশাল আয়োজনে পরিবারের ছোট-বড় সবাই একত্রিত হয়েছে। মূল আকর্ষণ নৃত্যগীত শুরু হলে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রথমে নৃত্যগীতের কোরাস সেøা-মোশনে শুরু হলে পর্যায়ক্রমে তা দ্রুতলয়ে চলে যায়। সেইসঙ্গে উল্লাসের পাশাপাশি চিৎকারের আওয়াজ পাওয়া যায়। এক ফাঁকে সুবেশ চিসিম ইশারায় আবুল কাসেমকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে কী যেন বোঝায়। তখন আবুল কাসেম আমার দিকে তাকালে আমি কিছু ঠাহর করতে পারিনি।
আবুল কাসেম কথাটি আমার কানে কানে জানালে ব্যাপারটি বোধগম্য হয়। অভ্যাস একটু-আধটু যে আমার নেই, তা নয়। ‘চু’ পানের ব্যাপারে আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। এখন সেটা চাক্ষুস করলে দোষের কী! আমাকে একটা ঘরে বসালে সেখানকার কিছু পরিপাটি তৈজসপত্র চোখে পড়ে। জানার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। মাটির একটা মটকা, জগ-গ্লাস, পানির বোতল এসব তো রয়েছেই।
সুবেশ চিসিমকে কাছে ডেকে বলি, ‘এটি তো চুয়ের আয়োজন করেছ মনে হচ্ছে।’
সুবেশ মুচকি হেসে বলে, ‘জি স্যার, আপনার সম্মানে ব্যবস্থা করেছি।’
‘এটি তো মদ্যপান, তোমাদের ভাষায় চু বলে, তাই তো?’
‘জি, স্যার। আপনি আসবেন বলে মানসম্পন্ন করে বানিয়েছি।’
‘নেশা কি এতে বেশি হবে?’
‘পরিমাণমতো খেলে নেশা বেশি হবে না। তবে গায়ে যত বেশি বাতাস লাগবে, নেশা ততো বেশি চাগিয়ে উঠবে। মনে তখন অন্য ধরনের একটি অনুভূতি সৃষ্টি হবে।’
‘যা হোক, আমাকে লিমিটেশনের মধ্যে রেখো।’
‘চিন্তা করবেন না, আপনার সেবাযতেœর কোনো ত্রুটি হবে না।’
সারারাত চুয়ের আসরে সময় কাটানোর পর আমার বেশ ঘুম পাচ্ছিল। ঘুমের রাজ্যে কখন প্রবেশ ঘটেছে আর বাস্তবিক অবস্থায় কখন এলাম তা টের না পেলেও মনোজগতের চিন্তা-চেতনা কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে সেটা কিছুটা বুঝতে তো পারলাম! জাগতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে এটির অনেক তফাৎ রয়েছে। অভ্যস্ততার সম্পর্ক না থাকলে চুয়ের আসরকে জাগতিক বলা যাবে না।

কর্মব্যস্ততার কারণে অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থার খোঁজখবর রাখতে পারিনি। তবে জেনেছি, আবুল কাসেমকে যারা পিঁপড়া-কাসেম হিসেবে বিশেষায়িত করেছে তাদের কেউ কেউ খোঁজ রাখে ঠিকই। তাছাড়া কোর্টে যাওয়ার পথে কিছুদিন আগেও আবুল কাসেমকে দেখেছি শারীরিক কসরত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। তার সারাশরীরে বিষপিঁপড়ার দগদগে ক্ষত রয়েছে, যা বহুদিন ধরে তাকে ভোগাচ্ছে।
কর্মব্যস্ত জীবনে অবসর বের করে নেওয়াটা খুব কষ্টকর। সংসারের মায়াজগৎ থেকে চাইলেও দায়িত্ববান মানুষ ছুটি নিতে পারে না। এর মাঝে আবুল কাসেমের পিঁপড়ার ডিমবিষয়ক জীবনপ্রণালির খোঁজখবর রাখতে পারাটা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ফুরসত কম বলেই হয়তো এমনটি হয়েছে। কলেজপড়–য়া ছেলেকে আবুল কাসেমের পিঁপড়ার ডিমের ডালির কাছে একদিন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাছে ডেকে ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটি করুণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। চোখের কোণে কান্নার পানি টলমল করছে। ব্যাপারটি আমাকে খুব আবেগপ্রবণ করে তোলে। জানা গেল, আবুল কাসেমের অবস্থা নাকি বেশ খারাপ। শরীরে ঘা নিয়ে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছে। দেশের বড় ডাক্তার দেখিয়েও রোগ নিরাময় করা যাচ্ছে না। চিকিৎসার জন্য বিশাল অংকের টাকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। একমাত্র বসতভিটা ছাড়া জমিজমা তার তেমন একটা নেই, যা বিক্রি করে ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ মেটাবে।
দেরি না করে একদিন আবুল কাসেমকে দেখতে গেলাম। আবুল কাসেমের ছেলেটির দেখানো পথে এককক্ষবিশিষ্ট একটা ঘরে ঢোকার পর দেখা গেল বিবর্ণ একটা খাটে লম্বা হয়ে সে শুয়ে আছে। আমাকে দেখে উঠে বসার চেষ্টা করলে তাকে শুইয়ে দিই। আবুল কাসেম হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। তার শারীরিক অবস্থা দেখে আমি নিজেও খুব ভেঙে পড়ি। লোকটি আমাকে মান্য করে। অবুঝের সান্ত¡না দিলেই কী হবে! পিঁপড়ার ডিমের ব্যবসায় তার যে খুব প্রসার ঘটেছিল সেটাও বলা যাবে না। পরিণতি কারো জন্য বসে থাকে না। তা আপনাআপনি ঘটে যায়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে আবুল কাসেমের পরিবারের কতদিন লাগে – এটিই হচ্ছে এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: