প্রাগৈতিহাসিক নয়, ঐতিহাসিক

মুল্লুকযাত্রা

বদরুন নাহার – ঐতিহ্য

ঢাকা, ২০২৪ – ২৭০ টাকা

চারাগাছের নূতন পাতা সবুজ বরণ টিলা লো

কালো লুগা (কুলি কামিনদের নিম্নাঙ্গের আভরণ) সাফা নইলে ভাল কি আর লাগে লো

ওরে পেটে নাই রে খানি

তাই খালি চায়ের পানি …

ছোটবলায় সিলেটের চা-বাগানে থাকতে কুলি মেয়েদের মুখে এই গান এবং তাদের সেই নাচ দেখেছি। সিলেটের

চা-বাগানকে কেন্দ্র করে বদরুন নাহারের মুল্লুকযাত্রা উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বহু যুগ পেরিয়ে গানটি আবার মনে পড়ল। এ-উপন্যাসটি লিখে বদরুন নাহার একটা বিশাল শূন্যস্থান ভরাট করলেন। সত্যিই তো অখণ্ড ভারতের অসংখ্য চা-বাগান – পুরুলিয়া, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্র, তামিলনাড়ুর আদিবাসী অঞ্চল থেকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে আড়কাঠিরা যেন এক ভিন্ন গোলার্ধে নিয়ে এলো হাজারে হাজারে আদিবাসীকে – তাদের এই কথা বলে যে, এমন দেশে চল যেখানে গাছকে নাড়া দিলে টাকা ঝরে পড়ে। আদিবাসীদের এই বঞ্চনার কথা ‘যদুরাম, ফাঁকি দিয়া পাঠাইলি আসাম’ গানে খুব মর্মস্পর্শী কথা ও সুরে ধরা পড়েছে। আদিবাসীদের বঞ্চনা নিয়ে বাংলা ভাষায় লেখা কোনো গল্প-উপন্যাসের কথা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। মুলকরাজ আনন্দের দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তো ইংরেজিতে লেখা। সেদিক দিয়ে দেখলে বদরুনের মুল্লুকযাত্রা একটি দিকদর্শনকারী প্রচেষ্টা সন্দেহ নেই।

উপন্যাসটার শুরু সিলেটের মধ্যযুগের ইতিহাস থেকে যখন মধ্য এশিয়া থেকে মুসলমান সিকান্দার গাজী প্রমুখ অভিযাত্রীদল অখণ্ড ভারতের নানা স্থান দখল করে নিজেদের ভূম্যধিকারী হিসেবে কায়েম করছিলেন, তাঁদের কথা দিয়ে। যুগে যুগে কিভাবে অন্যান্য ভূখণ্ডের মতো সিলেটও শক্তিমানের কাছে পদানত হয়েছে তার একটা সুরালাপের মতো যেন অতীতের এই ইতিহাসের উন্মোচন কাজ করেছে।

মুল্লুকযাত্রার দ্বিতীয় কাজের কথা কামিন গুণোমণি এবং তার কন্যা শুক্রমণিকে উপন্যাসের কেন্দ্রে স্থাপন করে, বিশেষ করে গুণোমণিকে অভিবাসী কুলিগোষ্ঠীর আদিমাতার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে। মানবসভ্যতার আদিযুগে যখন গোষ্ঠীর মধ্যে মায়েরাই বড় ছিলেন, তারপর পুরুষতন্ত্র কিভাবে মেয়েদের স্থানচ্যুত করে দিলো – সেই ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করে বদরুন আবার মেয়েদের-মায়েদের পুরনো জায়গাতেই ফিরিয়ে আনলেন।

উপন্যাসটির এক-একটা উপমা এত সুন্দর, যেমন চা-গাছের একটা মরা ডালের সঙ্গে জনৈক বৃদ্ধ কুলির হাতের কনুইয়ের তুলনা। বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার জামাল অনেক দিকে একজন সুমানুষ হয়েও বাস্তব পরিস্থিতির চাপে সে সুবিধাবাদী, তথা চা-বাগানের মালিকপক্ষের পেটোয়া দালালেই পরিণত হয়। তার অবস্থান আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাইয়ের প্রধান চরিত্র রঞ্জু বা ওসমানকে মনে করিয়ে দেয়, যারা ব্যক্তিগত জীবনে খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হয়েও নিজেদের মধ্যবিত্ত অবস্থানের কারণে প্রতাপশালীদের হাতকেই শক্তিশালী করে।

মুল্লুকযাত্রায় মুখের ভাষা নিয়ে বেশ ভ্রান্তি আছে মনে হয়। যেমনটা আছে এর সমাপ্তিতেও। তলে তলে উপাখ্যানকে যেন প্রেরণাদায়ক হওয়ারও একটা শর্ত থাকে। না হলে গোষ্ঠী বাঁচবে কী করে?

মুল্লুকযাত্রা যেভাবে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ইতিহাস হতে চেয়েছে, বিন্দুতে যদি সিন্ধুর আভাস পাওয়া যায় – মাঝে মাঝেই যেন গার্সিয়া মার্কেজ উঁকিঝুঁকি দিয়ে যান।

বদরুন নাহারের মুল্লুকযাত্রা উপন্যাসে কী আছে আর কী নেই সেটা আমরা একটু খতিয়ে দেখব। আছে তো অনেক কিছুই, যেমন এমন একখানি বিষয়বস্তু অবলম্বন করে একটা উপন্যাস লেখার উদ্যমটাই অনেক কিছু। কারণ অখণ্ড ভারতবর্ষে চা-শিল্প একটা বৃহৎ শিল্প। কিন্তু যে-শ্রমিকরা এই শিল্পের প্রাণপুরুষ তারা পাদপ্রদীপের অন্ধকারেই রয়ে গেছে। যেভাবে আড়কাঠির সাহায্যে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উৎখাত করে দূরদেশে চালান করে দেওয়া হলো, আর শেষ পর্যন্ত তাদের স্বপ্নভঙ্গ তো ঘটলোই। কারণ চা-বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এসে তারা দেখল যে, সারাদিন ধরে কোমরভাঙা খাটুনি খেটেও প্রতিদিন দু-বেলা চুলা ধরানো যায় না। দিনভর রোদজল ভেঙে কুলিকামিনরা যে-পাতা তোলে বাবুরা তা ওজন করার সময় কারচুপি করে তাদের ঠকায়। আর সাধে কি সেই বঞ্চনা নিয়ে গান বাধা হয়েছে ‘যদুরাম ফাঁকি দিয়া পাঠাইলি আসাম’।

তবু আমাদের বলতেই হবে মুল্লুকযাত্রায় যা নেই তার বিবরণ। আশা করি কাউকে বলে দিতে হবে না , খুঁত বের করার জন্য আমাদের চেষ্টা নয় এটা। বদরুন নাহার যে একজন সিরিয়াস লেখিকা, তাঁর বিভিন্ন লেখায় সে-স্বাক্ষর রয়েছে। সমাজের খুরে খুরে যে ঠকবাজি তার দিকে বারবার পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছেন বদরুন নাহার, তাঁর বিভিন্ন লেখা পাঠককে এই প্রত্যয় জোগায়।

বলেছিলাম মুল্লুকযাত্রার যে খামতিগুলি আমার চোখে ধরা পড়েছে তার উল্লেখ করব : ন্যায্য মজুরির অধিকার কায়েম করাতে বিশ্বাসী, সামাজিক সম্পদের ওপর সর্বহারাদের কর্তৃত্ব কায়েমের লক্ষ্যনিবদ্ধ কতিপয় নেতাগোছের লোকেদের নেতৃত্বে ‘সুন্দরী’ চা-বাগানের কুলিদের যে লড়াই (এই লেখায় বারবার আমাদের কুলি শব্দটি ব্যবহার করতে হবে, সেজন্য একটু অস্বস্তি হচ্ছে যেহেতু বাংলায় এই শব্দটিকে ঘিরে কিছুটা অবমাননাসূচক ভাব আছে। কিন্তু

চা-বাগানের শ্রমিকদের বোঝাতে এই শব্দই ব্যবহৃত হয়, যার মূলে রয়েছে একটি চীনা শব্দ যেটি অর্থ বিশেষ কৌশলপ্রাপ্ত নয় যে শ্রমিক। চায়ের চাষ তো প্রথমে চীন দেশেই শুরু হয়, অনুমান হয় ‘চা’-এর মতো ‘কুলি’ শব্দটিও সারা পৃথিবীর শব্দভাণ্ডারে চীন দেশের অবদান) তা বাগানমালিক এবং তাদের লেজুড়দের কারসাজিতে ব্যর্থ হলো। নেতারা কুলিদের নিজেদের অধিকার বিষয়ে সচেতন, পোড়খাওয়া শ্রমিক হিসেবে তৈরি হওয়ার শিক্ষা দিতে অপারগ হয়েছেন। মে দিবসের মিছিলে লাল পতাকা হাতে শহরের পথে চা-বাগান শ্রমিকদের অবশ্যই নিয়ে যান নেতারা, কিন্তু কী উদ্দেশ্যে এই মে দিবস পালিত হয় তা কি কোনোদিন এই চা-শ্রমিকদের বোঝাতে চেয়েছেন এসব লাল পার্টির নেতারা? তার তো কোনো ইঙ্গিত নেই উপন্যাসের কোথাও। মুল্লুকযাত্রার অনেক জায়গায়ই দেখি যে, বাগানের কুলিরা গুণোমণি বা শুক্রর নেতৃত্বে যখন মালিকের কাছে কিছু আদায় করতে উদ্যত হয়েছে, মালিককে কিন্তু নিজের ‘মাই-বাপ’, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি বলেই ভেবেছে। ন্যায্য অধিকারের দাবিতে তাদের প্রাপ্য অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার দাঁত-নখ এই শ্রমিকদের নেই। কারণ তাদের নেতারা অধিকার অর্জনের কোনো রাজনৈতিক শিক্ষা কুলিদের দেয়নি (কুলিদের সামূহিক অধিকার অর্জনের লড়াই একটা রাজনৈতিক লড়াই, পোড়খাওয়া রাজনৈতিক রণনীতির সাহায্যে যে-লড়াই জিততে হয়, গুণোমণির মেয়ে শুক্র যে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নিজের সাধারণ বুদ্ধি খাটিয়ে কুলিদের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে গিয়েছিল, আন্দোলনের সময়ে সে জখম হয়ে পড়লে মালিকপক্ষ এক ধুরন্ধর চাল খাটিয়ে তার জীবন বাঁচাতে অকুস্থলে অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে শুক্রকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যায়। মালিকপক্ষের অভিসন্ধি ছিল কুলিদের ফেরার নেতা, শুক্রর স্বামী রতনকে বেড়াজালে আটকে ফেলা। রতন হাসপাতালে শুক্রকে দেখতে এলে মালিকপক্ষের হাতে তার ধরা পড়ার মধ্যে সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধও হয়। নেতা হিসেবে রতনের পক্ষে সাংঘাতিক কাঁচা কাজ ছিল সেটা। কেননা, যে-কোনো লড়াইয়ে জিততে হলে প্রতিপক্ষের চাল অনুধাবন করতে হয়, না হলে ফাঁদে ধরা পড়তে হয়, যে-কারণে শুক্র বারবারই গোপনে রতনকে খবর পাঠাচ্ছিল যে, সে যেন হাসপাতালে কিছুতেই না আসে। রতনের মতো শ্রমিকনেতার এতখানি আবেগতাড়িত হওয়া আন্দোলনের পক্ষে সম্পূর্ণ বেমানান, যার ফলে ঘটে মালিক বনাম কুলিদের লড়াইয়ে কুলিদের ঘোরতর পরাজয়।

এখানে পাঠকের হয়তো মনে পড়বে যে, গৃহবন্দি মায়ানমার নেত্রী অং সাং সু চি যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন, তখন সে-দেশের তৎকালীন শাসকবৃন্দ চেয়েছিলেন যে, অং সাং সু চি যেন সুইডেনে গিয়ে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। কিন্তু পোড়খাওয়া রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে ভদ্রমহিলা জানতেন যে, একবার দেশ ছাড়লে তিনি চিরতরে নির্বাসিত হবেন, যেমন ক্যান্সার-আক্রান্ত মুমূর্ষু স্বামীকে দেখতেও একই কারণে অং সাং সু চি মায়ানমার ছেড়ে যাননি, যে কারণে স্বামীর সঙ্গে আর জীবনে কখনো তাঁর সাক্ষাৎ ঘটেনি। এই প্রতিতুলনার একমাত্র লক্ষ্য এই যে, জননেতাকে লড়াইয়ের সাফল্যের জন্য কতখানি ব্যক্তিগত আবেগ বিসর্জন দিতে হয় তার একটা দৃষ্টান্ত দেখানো।

মুল্লুকযাত্রার দ্বিতীয় খামতি এর ভাষাপ্রয়োগ। শুধু বাংলা ভাষায় নয়, সব ভাষার সাহিত্য রচনাতেই এটা একটা বড় সমস্যা। বদরুন সিলেটের একটা চা-বাগানের কুলিদের জীবনচিত্র আঁকছেন। চরিত্রদের মুখে তাদের নিজস্ব ভাষা না বসালে চরিত্রগুলো ফুটবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, যে-পাঠকের কাছে লেখিকা কুলির জীবন তাদের নিজের ভাষার মাধ্যমে তুলে ধরলেন – যেটা তিনি চাইছেন – পাঠক কি সেই ভাষা বুঝতে পারবে? যদি তা না হয় তাহলে বদরুনের সমস্ত প্রচেষ্টাটাই মাঠে মারা গেল। হয়তো কুলিরা পুরুষানুক্রমে সিলেটে বসবাস করে সিলেটি ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু তাদের মুখে ‘দিবাবম’ (পৃ ৭৭), ‘দিবে নানে’ (১১৭), ‘আসবে নানে’র (১১৮) ব্যবহার কতটুকু খাঁটি? আর এই পদগুচ্ছ কি আদৌ সিলেটি? আচ্ছা, বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের নিত্যব্যবহৃত শব্দ ‘লোকমা’ (১১১) কি কুলিরা ব্যবহার করে?

কুলিরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত। অঞ্চলভেদে তাদের নিজস্ব দেবদেবী আছে। কিন্তু মুল্লুকযাত্রার বিরুয়া বড়াইক, মকাই দাস কথায় কথায় হিন্দু দেবতা মা-কালীর প্রসঙ্গ আনে, শুক্রর চেহারায় দেবীমায়ের আদল খুঁজে পায়। এগুলো কতখানি বাস্তবসম্পন্ন? যেমন কুলিকামিন তুশির মা লবঙ্গ পাত্রর ‘টয়লেটে গিয়ে’ (পৃ ২৫) সর্পদষ্ট হওয়ার বর্ণনা পাঠককে ঈষৎ বিমুখ করে দেয় এই বইয়ের প্রতি। কারণ কুলিদের ভাষাসংসারে ‘টয়লেট’ শব্দটি অস্তিত্বহীন। যে-শব্দ কুলিদের নয়, সেটার সাহায্যে কুলির জীবন বোঝাতে চাইলে উল্টো ফল হবে না? অবশ্য ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী এম এন শ্রীনিবাস (১৯১৬-৯৯) পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমাজের অগ্রসর গোষ্ঠী থেকে চুইয়ে আসা ভাবগুলির সেঁধানোর কথা বলেছেন। কিন্তু কোন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে এই ‘সংস্কৃতায়ন’ ঘটেছে বা ঘটতে পারে তা গভীর জরিপসাপেক্ষ। মুল্লুকযাত্রায় তা বাস্তবতার পথ ধরে আসেনি। লেখকের কাজ হচ্ছে বাস্তবসম্মতভাবে জীবনের ছবি আঁকা। সেই ছবি একটি গোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সঞ্চরণশীল স্রোতটা পাঠকের সামনে প্রতীত করবে, তবেই না পাঠক লেখাটির স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে। পাঠকের এই প্রাপ্তি লেখকের লক্ষ্য। চিরদিনের কথা এটা।