অনুবাদ : আলম খোরশেদ
দ্বিতীয় কিস্তি
গোলচত্বরে একসঙ্গে চারটি গাধা ছিল, যেগুলো বাবা-মায়েরা পরিচালনা করছিলেন। তাদের পথটা ত্রিশ মিটারের বেশি নয় লম্বায়, কিন্তু অধিকাংশ গাধাই সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে অনেক সময় নিচ্ছিল, কেননা সেগুলো গাধা, ঘোড়ার বাচ্চা নয়, এবং গাধারা যখন-তখন মর্জিমাফিক দাঁড়িয়ে যায়। মরিয়া অভিভাবকেরা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে লাগাম ধরে টানে, কিন্তু প্রাণীগুলো তাতেও সাড়া দেয় না। বৃথাই তারা তাদের পিঠ চাপড়ায়, অভিশপ্ত গাধাগুলো যেরকম স্থাণু, সেরকমই থাকে। একটা বাচ্চা কাঁদছিল। টিকিটবেচা নারীটি অভিভাবকদের উদ্দেশে উপদেশ দিচ্ছিল চিৎকার করে। ‘যতটা শক্ত করে সম্ভব টানুন। আরো জোরে! স্রেফ টানতে থাকুন, তারা রাগ করে না! জোরে! হ্যাঁ, ঠিক আছে, এভাবেই টানুন!’
‘দেখলে ভানইয়া?’ আমি বলি। ‘গাধাগুলো নড়তে অস্বীকার করছে!’
সে হাসে। তাকে খুশি দেখে আমিও খুশি হই। একই সঙ্গে আমি একটু উদ্বিগ্নও হই লিন্দা এটা কীভাবে নেবে ভেবে; সে ভানইয়ার চেয়ে নিজে খুব বেশি ধৈর্যশীল নয়। কিন্তু যখন তার পালা আসে, সে উল্লাসের সঙ্গেই তা করতে সক্ষম হয়। গাধাটা যখনই থামছিল, সে ঘুরে দাঁড়িয়ে গাধার গায়ে পিঠ দিয়ে মুখে আদেশের আওয়াজ করছিল। তার যৌবনে সে ঘোড়ায় চড়েছে, তারা তার জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে, সেভাবেই সে সম্ভবত শিখেছে এমন পরিস্থিতিতে কী করতে হয়।
গাধার পিঠে চড়ে হ্যাইদি খুশিতে চকচক করছিল। গাধাটি যখন লিন্দার কৌশলে আর সাড়া দিচ্ছিল না, সে তার লাগাম ধরে এত জোরে টানছিল যেন অবাধ্যতার কোনো স্থান নেই তার কাছে।
‘তুমি এমন ভালো চড়তে পার!’ আমি হ্যাইদিকে ডেকে বলি। ভানইয়ার দিকে নিচু হয়ে বলি, ‘তুমিও চড়তে চাও?’
ভানইয়া দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ে। তার চশমা সোজা করে। আঠারো মাস বয়স থেকে সে বাচ্চা-ঘোড়ায় চড়ে অভ্যস্ত, এবং যে-শরতে আমরা মালমোয় চলে আসি, তখন তার বয়স আড়াই, সে একটা ঘোড়ায় চড়ার স্কুলে ভর্তি হয়। এটা ছিল পাবলিক পার্কের মাঝে, একটা বিষণ্ন নোংরা ঘোড়ায়-চড়ার পাঠশালা, মাটিতে কাঠের গুঁড়ো ছড়ানো, সেটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল তার জন্য; সে সেখানকার সবকিছু শুষে নেয়, এবং সেইসব কথা সে ক্লাস শেষের পরে সবাইকে শোনাতে চাইত। সে তার বদখত বাচ্চা-ঘোড়াটার ওপর সোজা হয়ে বসে আর লিন্দা তাকে চক্করের পর চক্কর দিয়ে যায়। অথবা সেইসব দিনে যখন আমি একাই তাকে নিয়ে যেতাম, একটা এগারো কি বারো বছরের মেয়ে সেই কাজটা করত, যাকে দেখে মনে হতো সে তার সারাটা জীবন সেখানেই কাটিয়েছে, আর একজন শিক্ষক মাঝখানে ঘুরেফিরে সবাইকে কী করতে হবে বলে যেত। এটা কোনো ব্যাপার না যে ভানইয়া সবসময় সেই নির্দেশনাসমূহ বুঝত না, আসল বিষয় ছিল ঘোড়াগুলোর সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের পরিবেশটা। আস্তাবল, সেখানকার খড়ের গাদায় বাচ্চাসমেত একটা বিড়াল, সেই বিকেলে কে কোন ঘোড়ায় চড়বে তার তালিকা, যে-হেলমেটটা সে পছন্দ করত, খোদ ঘোড়ায় চড়ার আনন্দ, দারুচিনি রুটি ও আপেলের জুস, যা সে ঘোড়া-চড়ার শেষে ক্যাফেতে বসে খেত। সেটাই ছিল সপ্তাহের সবচেয়ে উত্তেজনাকর বিষয়। কিন্তু পরবর্তী শরৎ নাগাদ বিষয়গুলো পালটে যেতে থাকে। তাদের এক নতুন শিক্ষক আসে, ভানইয়া তখন, যাকে চার বছরের তুলনায় বড়ই লাগত, এমনসব পরীক্ষার মুখে পড়ে যা সে উতরাতে পারত না। যদিও লিন্দা শিক্ষককে বুঝিয়ে বলে, কিন্তু অবস্থার কোনো বদল হয় না এবং ক্লাসে যাওয়ার সময় ভানইয়া প্রতিবাদ করতে শুরু করে – সে যেতে চাইত না, একেবারেই না – এবং শেষমেষ আমরা তা বন্ধ করে দিই। এমনকি পার্কে হ্যাইদিকে কোনোরকম ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই ছোট্ট গাধাটায় চড়তে দেখেও সে তাতে উঠতে চাইত না।
আরেকটা জিনিসের জন্য আমরা তার নাম নিবন্ধন করি, সেটা হচ্ছে ছোটদের একটা খেলার দল যেখানে বাচ্চারা মাঝেমধ্যে গান গায়, একসঙ্গে ছবি আঁকে এবং নানারকম সৃজনশীল কাজকর্ম করে। দ্বিতীয়দিন যখন সে সেখানে যায় তখন তাদের একটা বাড়ি আঁকার কথা, আর ভানইয়া সেখানে তার ছবির ঘাসগুলোকে নীল রং করে। খেলার ক্লাসের দলনেতা ভানইয়ার কাছে গিয়ে বলে, ঘাস তো নীল হয় না, হয় সবুজ। সে কি আরেকটা ছবি আঁকতে পারে? ভানইয়া তার আঁকা কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে এবং তার বিরক্তি এমনভাবে প্রকাশ করে, যা বাচ্চাদের অভিভাবকদের ভুরু কপালে তোলে এবং তারা নিজেদের ভদ্র ও সুশীল বাচ্চার পিতামাতা ভেবে ভাগ্যবান মনে করে। ভানইয়া একসঙ্গে অনেককিছু; তবে সবার ওপরে সে সাংঘাতিক স্পর্শকাতর, এবং এই বিষয়টা যে আরো বেশি জোরালো হচ্ছে, বা হয়েই গেছে, তা আমার উদ্বেগের কারণ হয়। তাকে বড় হতে দেখাটা আমার নিজের বড় হয়ে ওঠার বিষয়টা সম্পর্কে মনোভাব পালটায়, তবে সেটা যতটা নয় গুণগত কারণে তারচেয়ে বেশি পরিমাণগত, যে-পরিমাণ সময় আপনি বাচ্চাদের সঙ্গে কাটান, সেটা বিপুল। এত-এত ঘণ্টা, এত-এত দিন, এমন অসীম সংখ্যক ঘটনার জন্ম হয় এবং আপনাকে তার মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়। আমার ছোটবেলা থেকে আমি কেবল হাতেগোনা কয়েকটা ঘটনার কথা মনে করতে পারি, সবগুলোকেই আমি সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, কিন্তু এখন সেগুলোকে অনেক ঘটনার মধ্যে মাত্র কয়েকটা বলেই মনে হয় আমার, যেগুলোর অর্থ পুরোটাই মুছে গেছে, তা না হলে আমি আমার মনে গেঁথে-থাকা সেই বিশেষ অধ্যায়গুলোকেই কেন শুধু অর্থবহ ভাববো, বাকিগুলোকে কেন নয়, যেগুলো সম্পর্কে আমার কিছুই মনে নেই?
আমি যখন এইসব বিষয় নিয়ে গাইয়েরের সঙ্গে আলোচনা করি, যার সঙ্গে সাধারণত আমি প্রতিদিনই ঘণ্টাখানেক কথা বলি, – তার অভ্যাস হচ্ছে সভেন স্তুল্পেকে উদ্ধৃত করা, যিনি কোনো এক জায়গায় বিয়ারিমান সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি যেখানেই বেড়ে উঠতেন না কেন বিয়ারিমানই হতেন। অন্যকথায়, তিনি বলতে চান যে, আপনার পরিবেশ যা-ই হোক না কেন আপনি যা, আপনি তা-ই। যা আপনাকে আকার দেয় সেটা পরিবার নয়, পরিবারের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি। আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম তখন আমাকে শেখানো হয়েছিল মানুষের প্রতিটি গুণ, কর্মকাণ্ড ও অভ্যাসের ব্যাখ্যা খোঁজা উচিত যে-পরিবেশে তাদের জন্ম হয়েছে সেখানে। জৈবিক অথবা বংশানুক্রমিক কারণ, উপাত্তসমূহ একটা সম্ভাবনা রূপেই বিদ্যমান, এবং সে-কারণেই সেগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়ে থাকে। এই ধরনের মনোভাব প্রথম দৃষ্টিতে মানবতাবাদী মনে হতে পারে, এতটাই যে, এই ধারণাটিকে সত্য মনে হয় যে, সব মানুষই সমান; কিন্তু নিকটতর অনুসন্ধানে এটিকে মানুষের একটি যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যও মনে হতে পারে, যে কি না শূন্যতার মধ্যে জন্ম নিয়ে ক্রমে তার পরিবেশ দ্বারা গঠিত হয়। এই বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমি একটি তাত্ত্বিক অবস্থান ধরে রেখেছিলাম, যা কার্যত এতটাই মৌলিক, তা যে-কোনো বিতর্কের ভিত্তিভূমি হিসেবেই ব্যবহৃত হতে পারে – পরিবেশই যদি চালিকাশক্তি হয়, উদাহরণস্বরূপ, মানুষ যদি আদিতে সমান ও নমনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ভালো মানুষদের স্রেফ তার পরিবেশের প্রকৌশল দিয়েই তৈরি করা সম্ভব, যে-কারণে আমাদের
বাবা-মায়ের প্রজন্ম রাষ্ট্রের, রাজনীতির ও শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকায় বিশ্বাস করতেন, এজন্যই তাঁদের আকাক্সক্ষা, যা এতদিন বিদ্যমান ছিল সবকিছুকে প্রত্যাখ্যান করায়, এবং তাদের এই নতুন সত্য, যা মানুষের অন্তর্গত সত্তায় নয়, নয় তার নৈর্ব্যক্তিক অভিনবত্বে, বরং তার অবস্থান সত্তার বাইরের কোনো অঞ্চলে, সামষ্টিক ও সর্বজনীন ক্ষেত্রে, সম্ভবত সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে যা পরিস্ফুট হয়েছে দাগ সুলস্তাদে, যিনি বরাবরই তাঁর সময়ের ভাষ্যকার ছিলেন; ১৯৬৯ সালের এক লেখায় যেখানে তাঁর এই বিবৃতিটি ছিল, ‘আমরা কফির পাত্রে পাখা যোগ করব না’ : আধ্যাত্মিকতাবাদ, অনুভূতিবাদ, এক নতুন বস্তুবাদের আগমন, অবশ্য এটা তাদের কখনোই বিচলিত করেনি যে, একই মনোভাব বিদ্যমান থাকতে পারে শহরের পুরনো অংশকে ধ্বংস করে দিয়ে একটা নতুন রাস্তা ও কারপার্ক নির্মাণের মধ্যে, স্বাভাবিকভাবেই বুদ্ধিজীবী বামেরা যার বিরোধিতা করে, এবং হয়তোবা এটার বিষয়ে সচেতন হওয়াও সম্ভব ছিল না আজ অবধি, যখন সাম্য ও পুঁজিবাদের ধারণার মধ্যেকার সম্পর্ক, কল্যাণরাষ্ট্র ও উদারতাবাদ, মার্কসীয় বস্তুবাদ ও ভোগবাদী সমাজের সম্পর্কটি খুবই দৃশ্যমান, কেননা সবচেয়ে বড় সমতাকারক হচ্ছে টাকা; এটা সব পার্থক্যকে সমান করে দেয়, এবং আপনার চরিত্র ও সত্তাকে যদি আকার দেওয়া যায়, টাকাই হচ্ছে সবচেয়ে
প্রাকৃতিক আকারপ্রদানকারী, এবং এটাই সেই বিস্ময়কর ধারণার জন্ম দেয় যে, যেখানে মানুষের সমাজ তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করে একইরকমভাবে বাজার করার মাধ্যমে, যেখানে যারা আদিতে এইসবের সূত্রপাত করেছিল সাম্যের নিশ্চয়তায়, বস্তুগত মূল্য ও পরিবর্তনের বিশ্বাসে জোরারোপ আজ তাদের নিজেদের অর্জনেরই বিরোধিতা করছে, যা তারা বিশ্বাস করে তাদের শত্রুদের সৃষ্টি বলে, কিন্তু সকল সহজ যুক্তির মতোই এটাও সম্পূর্ণ সত্য নয় : জীবন কোনো গাণিতিক পদার্থ নয়, এর কোনো তত্ত্ব নেই, কেবলই বাস্তব অনুশীলন, এবং একটা প্রজন্মের সমাজবিষয়ে বৈপ্লবিক পুনর্বিবেচনাকে বংশানুক্রম ও পরিবেশের মধ্যেকার সম্পর্ক হিসেবে দেখাটা যদিও লোভনীয়, এই লোভ সাহিত্যিক এবং অনুমানের আনন্দের ওপরই গঠিত বেশি, যা সত্য ঘোষণার আনন্দের চেয়েও আমাদের চিন্তাকে অনেক বেশি করে মানবিক তৎপরতার বিষম অঞ্চলে বুনে তোলা হয়। সুলস্তাদের বইয়ে আকাশেরা নিচু, তারা বর্তমান সময়ের ধারাগুলো বিষয়ে আশ্চর্য সচেতনতার পরিচয় দেয়, ষাটের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি থেকে, সত্তরের শুরুর রাজনৈতিক উদ্যোগসমূহের, এবং তারপর পরিবর্তনের বাতাস যখন ঠিক বইতে শুরু করেছে, তখনই শেষমেষ দূরত্ব বজায় রাখার অবস্থান। এইসব আবহাওয়ার পূর্বাভাসসুলভ অবস্থা একজন লেখকের জন্য শক্তি কিংবা দুর্বলতা কোনোটাই হওয়ার দরকার নেই, এরা স্রেফ তার উপকরণের অংশ, তার অভিমুখের অংশ এবং সুলস্তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি সবসময়ই অন্যত্র অবস্থিত ছিল, যার নাম তাঁর ভাষা, যা তাঁর পুরনো কায়দার উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বল করে, এবং এক অদ্ভুত আভা বিকিরণ করে, অননুকরণীয় এবং উচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ। এই ভাষা শেখা যায় না, এই ভাষা টাকা দিয়ে কেনা যায় না, এবং এখানেই এর মূল্য নিহিত। এটা সত্য নয় যে, আমরা সমান হয়ে জন্মাই, জীবনের শর্তসমূহ আমাদের অসমান করে তোলে; বরং এর বিপরীতটাই সত্য, আমরা অসমান হয়েই জন্মাই, এবং জীবনের বাস্তবতা আমাদের আরো বেশি সমান করে দেয়।
আমি যখন আমার তিন বাচ্চার কথা ভাবি, তখন তাদের তিন স্বতন্ত্র মুখচ্ছবিই শুধু আমার সামনে ভেসে ওঠে না, বরং তাদের পুরো আলাদা অনুভূতিগুলোও বিচ্ছুরিত হয়। এই অনুভূতি, যা ধ্রুব, সেটাই ‘তারা’ আমার কাছে। এবং ‘তারা’ যা, সেটা আমি যেদিন প্রথম দেখি তাদের, সেদিন থেকেই অদ্যাবধি বর্তমান। সেই সময় তারা প্রায় কিছুই করতে পারত না, এবং যেটুকুই পারত, যেমন একটা স্তন চোষা, নিজের অবচেতনেই হাত তোলা, চারপাশে তাকানো, অনুকরণ করা, তারা সবাই সেটুকু করতে পারত, ফলে ‘তারা’ যা করত সেটা আসলে তাদের কোনো গুণ নয়, তারা যা করতে পারে বা পারে না, তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং এমন একটা আলো যা তাদের ওপর প্রতিভাত হয়।
তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা কয়েক সপ্তাহ পরেই প্রকাশিত হতে থাকে, তা আর কখনোই পালটায়নি, এবং তাদের প্রত্যেকের ভেতরে সেগুলো এতই আলাদা ছিল যে, এটা কল্পনা করা কঠিন, আমাদের কর্মকাণ্ড কিংবা স্রেফ অস্তিত্বের মাধ্যমে আমরা তাদের যে পরিবেশটুকু দিয়েছি তার আদৌ কোনো দৃশ্যমান তাৎপর্য ছিল। ইয়নের ছিল মৃদু ও বন্ধুতাসুলভ মন, সে তার বোনদের ভালোবাসত, প্লেন, ট্রেন ও বাস ভালোবাসত। হ্যাইদি বহির্মুখী এবং যাকে দেখে তার সঙ্গেই কথা বলে; সে জুতা ও পোশাক দ্বারা আচ্ছন্ন, কেবল কাপড় পরতে চাইত এবং তার ছোট্ট শরীর নিয়ে বেশ স্বচ্ছন্দ ছিল, এতটাই যে, সে যখন সুইমিংপুলের আয়নার সামনে ন্যাংটো দাঁড়িয়ে, তখনো লিন্দাকে ডেকে বলতে পারে, দেখো মা আমার নিতম্বটা কী সুন্দর! তাকে কেউ বকা দিক সেটা সে ঘেন্না করে, আপনি যদি তার ওপর গলা তোলেন সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দূরে গিয়ে কাঁদতে শুরু করে। ভানইয়া, অন্যদিকে, যতটা পায় ততটাই ফিরিয়ে দেয়, দারুণ এক মেজাজ তার, জোরালো ইচ্ছাশক্তি, খুবই স্পর্শকাতর এবং সবার সঙ্গেই ভালো মিশতে পারে। দুর্দান্ত স্মৃতিশক্তি তার, আমাদের পড়ে শোনানো অধিকাংশ বই এবং একসঙ্গে দেখা সিনেমার সব সংলাপ তার মুখস্থ। তার মধ্যে একটা রসিকতাবোধও আছে, এবং আমরা যতক্ষণ বাড়িতে থাকি ততক্ষণই সে আমাদের হাসিয়ে মারে; কিন্তু সে যখন বাইরে থাকে তখন পরিপার্শ্বের অবস্থা তাকে স্পর্শ করে, পরিস্থিতি বেশি নতুন কিংবা তার কাছে অপরিচিত ঠেকলে সে তার খোলসের মধ্যে ঢুকে যায়। সাত মাসের মাথায় তার মধ্যে লজ্জার অনুভূতি জাগে, এবং তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন কোনো অতিথির আগমন ঘটে এবং সে তখন ঘুমিয়ে থাকার ভান করে চোখ মুদে ফেলে। সে এখনো দুর্লভ কিছু মুহূর্তে এমনটি করে থাকে, সে যদি তার স্ট্রলারে বসে থাকে এবং নার্সারির কোনো অভিভাবকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় আমাদের, তার চোখ হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। স্টকহোমের নার্সারিতে, যেটা আমাদের ফ্ল্যাটের সরাসরি উল্টোদিকে ছিল, একটা অনিশ্চিত শিথিল শুরুর পর তার বয়সী একটা ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়, নাম আলেক্সান্দার এবং তারা দুজনে মিলে খেলার মাঠে লঙ্কাকাণ্ড বাধায়, এতটাই যে, কর্মচারীরা জানায়, তারা প্রায়শই আলেক্সান্দারকে তার হাত থেকে বাঁচাতো – ভানইয়ার প্রচণ্ডতার সঙ্গে সবসময় পেরে উঠত না সে। তবে মোটের ওপর সে যখন তাকে দেখত তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠত এবং সে চলে গেলে বিষণ্ন বোধ করত, এবং তখন থেকেই সে ছেলেদের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করত; তাদের শারীরিকতা ও উদ্দামতার ব্যাপারটায় এমন একটা কিছু ছিল যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত সে, হয়তো তা কোনোপ্রকার জটিলতামুক্ত বলেই তাকে একধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণের বোধ এনে দিত।
আমরা যখন মালমোতে চলে যাই তখন তাকে একটা নতুন নার্সারিতে ঢুকতে হয়, পশ্চিম বন্দরের নিকটে, শহরের নবনির্মিত অংশে, যেখানে সবচেয়ে ধনীরাই থাকত, এবং যেহেতু হ্যাইদি ছিল খুব ছোট সেহেতু আমিই ছিলাম একমাত্র মানুষ, যার দায়িত্ব ছিল তাকে সেখানে থিতু করানো। প্রতিদিন সকালে আমরা সাইকেলে করে শহরের ভেতর দিয়ে যেতাম, পুরনো জাহাজনির্মাণ মাঠের পাশ দিয়ে সমুদ্রের দিকে, ভানইয়ার মাথায় তার ছোট্ট হেলমেট, এবং তার হাত আমার কোমর জড়িয়ে ধরা, আমি আমার হাঁটুজোড়াকে পেট বরাবর এনে বেঢপরকম ছোট, মেয়েদের বাইকের চালক, খুশি ও হালকা, কেননা শহরের সবকিছুই তখন আমার কাছে নতুন ছিল, এবং সকালের ও বিকেলের আলোর বদলটুকু তখনো প্রাত্যহিক রুটিন-চোখে ঝাপসা হয়ে আসেনি। আমি ভেবেছিলাম, এটা একটা সাময়িক রূপান্তর পর্বের বিষয় হবে, ভানইয়া প্রতিদিন সকালে প্রথমেই আমাকে বলত, একধরনের কান্নাভেজা গলায়, সে নার্সারিতে যেতে চায় না; কিছুদিন বাদে অবশ্য সেটা সে পছন্দ করবে, করতে হবে তাকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরেও সে আমার কোলছাড়া হতে চাইত না, তিন তরুণীকর্মী তাকে যত লোভই দেখাক না কেন। আমি একবার ভেবেছিলাম সবচেয়ে ভালো হতো ঘরের একেবারে শেষমাথায় তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সোজা হেঁটে চলে আসা এবং তাকে তার নিজের ব্যবস্থা করতে দেওয়া, কিন্তু সেই তরুণীত্রয় ও লিন্দা কেউই আমার এই নিষ্ঠুরতার কথা মানতে চাইত না, তাই আমি ঘরের এক কোনায় একটা চেয়ারে বসে থাকতাম ভানইয়াকে কোলে নিয়ে, চারদিকে ক্রীড়ারত ছেলেমেয়ে, বাইরে চড়া সূর্য, যদিও দিন যত যাচ্ছিল আবহাওয়া ততই শরৎসুলভ হয়ে উঠছিল। বিরতির সময়, যখন কর্মীরা উঠোনের মাঝখানে একটা আপেল ও কয়েক টুকরো পেয়ার পরিবেশন করত, সে তাতে তখনই অংশ নিত যদি আমরা অন্যদের চেয়ে দশ মিটার দূরে বসতাম, এবং আমি যখন তাতে রাজি হই, আমার মুখে একধরনের মাফচাওয়া হাসি, সেটা আমার কাছে বিস্ময়ের মনে হয় না, কেননা এটাই অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার পদ্ধতি ছিল আমার। কিন্তু সে, মাত্র আড়াই বছর বয়সে কীভাবে তা শিখে নিয়েছিল? অবশ্যই একপর্যায়ে কর্মীরা তাকে আমার কোল থেকে সরিয়ে নিতে সমর্থ হয়েছিল, এবং আমি সাইকেলে চড়ে বাড়ি ফিরে কিছু লেখার কাজ করতে পেরেছিলাম, পেছনে তার হৃদয়বিদারক কান্নার শব্দ নিয়ে, এবং মাসখানেকের মধ্যে আমি তাকে স্বাভাবিকভাবেই সকালে নামিয়ে দেওয়া এবং বিকেলে তুলে আনতে সক্ষম হই। তবে সকালে মাঝে মাঝে তখনো সে যেতে চাইত না, তখনো মাঝেমধ্যে কাঁদত, এবং আমাদের ফ্ল্যাটের কাছে আরেকটা নার্সারির লোক যখন একদিন বেল টিপে আমাদের জানায় যে, তাদের একটা জায়গা খালি হয়েছে, আমরা তখন আর দ্বিধা করিনি। এটার নাম ছিল লডজুরেট এবং তা ছিল অভিভাবকদের চালানো একটা সমবায় প্রতিষ্ঠান। তার মানে, প্রত্যেক অভিভাবককে বছরে দু-সপ্তাহ কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে হতো সেখানে এবং কোনো না কোনো প্রশাসনিক ও প্রায়োগিক কাজের পদ পূরণ করতে হতো। এই নার্সারিটি আমাদের জীবনের কত বড় একটা অংশ খেয়ে ফেলবে আমার ধারণা ছিল না; আমরা শুধু এটা কী কী সুবিধা দেবে সেই কথাই আলোচনা করেছিলাম; আমরা ভানইয়ার খেলার সাথিদের চিনতে পারব, এবং স্বেচ্ছাশ্রম ও সভাসমূহের দৌলতে তাদের
বাবা-মায়েদেরও। আমাদের বলা হয়েছিল, বাচ্চারা একসঙ্গেই বাড়ি ফিরবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে আমরা ভেবেছিলাম দ্রুতই আমরা কিছুটা সময়ের জন্য পরিত্রাণ পাব, যা আমাদের অত্যন্ত দরকার ছিল। তার ওপরে, সম্ভবত এটাই সবচেয়ে জোরালো যুক্তি, আমরা মালমোতে কাউকে চিনতাম না, একজনকেও না, এবং এটা সেই পারস্পরিক চেনাজানার একটা সহজ উপায় ছিল। এবং সেটা সত্যি ছিল : সপ্তাহদুয়েক পর একটা বাচ্চার জন্মদিনে আমাদের নিমন্ত্রণ করা হয়। ভানইয়া এটার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিল, এজন্য নয় যে, সে সম্প্রতি একজোড়া সোনালিরঙা পার্টিজুতো পেয়েছে, যা সে সেদিন পরতে পারবে, আবার একইসঙ্গে সে যেতেও চাচ্ছিল না, কেননা সেখানে সে বেশি কাউকে চেনে না। এক শুক্রবার বিকেলে নার্সারির শেলফে আমন্ত্রণপত্রটা পড়ে ছিল, পার্টিটা আরো এক সপ্তাহ পরের শনিবারে, এবং সেই সপ্তাহের প্রতিদিন সকালেই ভানইয়া জিজ্ঞেস করত সেদিন স্তেলার জন্মদিনের অনুষ্ঠান কি না। যখন আমরা বলতাম – না, সে তখন জিজ্ঞেস করত, সেটা কি তাহলে পরের দিনের পরদিন মানে পরশু কি না, সেটাই ছিল তার কাছে ভবিষ্যৎকালের দূরতম বিন্দু। যেদিন সকালে আমরা অবশেষে মাথা নেড়ে বলতে পারলাম, হ্যাঁ আমরা আজ স্তেলার পার্টিতে যাচ্ছি, সে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে সোজা আলমারির দিকে এগিয়ে যায় তার সোনালি জুতোজোড়া পরবে বলে। প্রতি ঘণ্টায় অন্তত দুবার করে সে জানতে চাইত, আমাদের যাওয়ার সময় হয়েছে কি না, এবং এটা তার ঘ্যানঘ্যানানির দৃশ্যে ভরা একটা অসহ্য সকাল হয়ে উঠতে পারত, যদি না সৌভাগ্যক্রমে দিনটাকে ভরিয়ে তোলার মতো কিছু কাজকর্মও থাকত আমাদের। লিন্দা তাকে একটা বইঘরে নিয়ে যায় উপহার কেনার জন্য, তারপর তারা রান্নাঘরের টেবিলে বসে একটা জন্মদিনের কার্ড বানায়। আমরা মেয়েদের গোসল করিয়ে চুল আঁচড়ে তাদের সাদা মোজা ও পার্টির পোশাক পরিয়ে দিই। তখন আচমকা ভানইয়ার মেজাজ পালটে যায় – সে মোজা কিংবা পোশাক পরতে চায় না, তার কোনো পার্টিতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, এবং সে তার সোনালি জুতোজোড়াকে দেয়ালে ছুড়ে মারে; কিন্তু তার এই রাগের বহিঃপ্রকাশ যে-কয়েক মিনিট স্থায়ী হয় আমরা সে-সময়ে ধৈর্য ধরে, তার সঙ্গে বসে থেকে তাকে আবার সবকিছু করার জন্য রাজি করাতে সক্ষম হই, এমনকি সাদা হাতে-বোনা শালটা পরাতেও, যেটা হ্যাইদির ব্যাপটাইজিং অনুষ্ঠানের সময় তাকে দেওয়া হয়েছিল, এবং শেষমেষ যখন মেয়েরা আমাদের সামনে থাকা স্ট্রলারে এসে বসে, তারা আবার আশায় উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। ভানইয়া গম্ভীর ও শান্ত ছিল, একহাতে তার সোনালি জুতো এবং অন্য হাতে উপহার; কিন্তু সে যখন ঘুরে কিছু একটা বলতে চায় আমাদের, তখন তার মুখে হাসি ছিল। তার পাশে বসেছিল হ্যাইদি, উত্তেজিত ও আনন্দিত, যদিও সে ঠিক বুঝতে পারছিল না আমরা কোথায় যাচ্ছি, পোশাক ও প্রস্তুতি নিশ্চয়ই তাকে এমন ধারণা দিয়েছিল যে, খুব নতুন একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। পার্টিটা যে-অ্যাপার্টমেন্টে হওয়ার কথা সেটা আমাদের বাসা থেকে কয়েকশো মিটার সামনেই। শেষ শনিবারের বিকেলের স্বাভাবিক ব্যস্ততায় ভরা ছিল চারপাশ, হাতবোঝাই সওদা নিয়ে সর্বশেষ ক্রেতারা, বার্গার কিং কিংবা ম্যাকডোনাল্ডসের পাশে ঘুরঘুর করার উদ্দেশ্যে শহরকেন্দ্রে আসা কিশোরদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার, এবং ট্রাফিকের স্রোত দেখে মনে হচ্ছিল না তাদের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য কিংবা গন্তব্য রয়েছে, অনেকগুলো পরিবারকে দেখা যায়, হয় বহুতল কারপার্কের দিকে যাচ্ছে অথবা সেখান থেকে আসছে। এখন সেখানে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে দেখা যাচ্ছে বছর কুড়ির কোঠার অভিবাসী যুবকদের চালানো চকচকে কালো, নিচু গাড়িগুলোকে, যেগুলোর পলকা শরীর থেকে ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ ফুঁড়ে বেরুচ্ছে। সুপারমার্কেটের বাইরে এত মানুষের ভিড় যে, আমাদের মুহূর্তের জন্য থামতে হয়েছিল, সাধারণত দিনের এই সময়টাতে সেখানে হুইলচেয়ারে বসে-থাকা শীর্ণকায়, থুত্থুরে বুড়িটি ভানইয়া ও হ্যাইদিকে দেখে তাদের প্রতি ঝুঁকে আসে, তার হাতে ধরা লাঠিটির ঘণ্টা বাজায়, এমন গালভরা একটা হাসি দেয় যা স্পষ্টতই তাদের আকৃষ্ট করার জন্য, কিন্তু সেটা বাচ্চাদের কাছে ভীতিকর মনে হয়। তবে তারা কিছু বলে না, শুধু বুড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রবেশমুখের অন্যপাশে আমার বয়সী এক নেশাখোর বসে থাকে, তার বাড়ানো হাতে একটা টুপি। তার পাশে খাঁচার মধ্যে একটি বেড়াল এবং ভানইয়া সেটিকে দেখে আমাদের দিকে ঘোরে।
‘আমরা যখন শহরের বাইরের দিকে চলে যাব, তখন একটা বেড়াল রাখব’, সে বলে।
‘বেড়াল!’ হ্যাইদি বলে সেটার দিকে তাকিয়ে। আমি ফুটপাতের ওপর তিনটা অত্যন্ত ধীরে-হাঁটা মানুষকে পাশ কাটানোর জন্য স্ট্রলারটাকে একটু ঘুরিয়ে নিই, তাদের দেখে মনে হয় তারা বুঝি এই রাস্তার মালিক, কয়েক মিটার আমি যতটা দ্রুত সম্ভব হাঁটি এবং তাদের অতিক্রম করার পর আবার ফুটপাতে উঠি।
‘সেটা অনেকদিন পরে হতে পারে, তুমি জানো ভানইয়া,’ আমি বলি।
‘তুমি তো আর অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে একটা বেড়ালকে রাখতে পারো না’, সে বলে।
‘ঠিক তা-ই’, লিন্দা জানায়।
ভানইয়া আবারো সামনের দিকে তাকায়। উপহারভরা ব্যাগটাকে সে দুই হাতে চেপে ধরে।
আমি লিন্দার দিকে তাকাই।
‘তার নামটা যেন কী, স্তেলার বাবার?’
‘আমার মাথাটা খালি হয়ে গেছে …’ সে বলে। ‘ও হ্যাঁ এরিক, তাই না?’
‘ঠিক বলেছ’, আমি বলি। ‘কী কাজ করে যেন সে?’
‘আমি ঠিক নিশ্চিত নই’, সে বলে। ‘ডিজাইন জাতীয় কিছু একটা বোধহয়।’
আমরা গটগ্রুভান পেরিয়ে আসি এবং ভানইয়া ও হ্যাইদি দুজনেই ঝুঁকে এসে জানালার ভেতরে তাকায়। এর পরেই ছিল একটা বন্ধকি মালামালের দোকান। এর পাশের দোকানটা নানারকম ছোটখাটো মূর্তি, গয়না, পরি, বুদ্ধ, আগরবাতি, চা, সাবান এবং এ-যুগের ফ্যাশনদুরস্ত হেনতেন অনেককিছু বিক্রি করত। জানালায় পোস্টার সাঁটা, কবে কোন আধ্যাত্মিক গুরু ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টারা শহরে আসবেন তার কথা জানিয়ে। রাস্তার অন্যপাশের একটা পোশাকের দোকান, সস্তার ব্র্যান্ড বিক্রি হয় সেখানে, রিকো ইয়োনস অ্যান্ড ক্লোদিং, পুরো পরিবারের জন্য ফ্যাশন, তার পাশেই ট্যাবু, একটা যৌনপণ্যের দোকান, যারা রাস্তা থেকে লুকানো দরজার পাশের জানালায় সাজানো ডিলডো ও নানাবিধ পাতলা পোশাক, অন্তর্বাসপরা পুতুল ইত্যাদি দিয়ে পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তার পাশে বিয়ারিমান ব্যাগস অ্যান্ড হ্যাটস, যেটা মনে হয় চল্লিশের দশকে শুরু হওয়ার পর থেকে অন্দরসজ্জা ও দামের দিক থেকে একইরকম রয়ে গেছে, এবং রেডিও সিটি যা কিছুদিন হলো মাত্র দেউলিয়া হয়ে গেছে, কিন্তু যার জানালায় এখনো আপনি অনেক আলোকিত টিভিপর্দা দেখতে পাবেন, যার পাশে নানাবিধ ইলেকট্রনিক পণ্য ছড়ানো, যার দাম লেখা বিশাল, প্রায় জ্বলজ্বলে কমলা ও সবুজরঙা কার্ডবোর্ডের গায়ে। নিয়ম বলে, আপনি যতই রাস্তাটার ওপরের দিকে যাবেন ততই দোকানগুলো সস্তা ও সন্দেহজনক হয়ে উঠবে। একই নিয়ম প্রযোজ্য, যেসব লোকজন সেই এলাকায় ঘোরাঘুরি করে তাদের ব্যাপারেও। স্টকহোমের চেয়ে, সেখানেও আমরা শহরকেন্দ্রেই থাকতাম, এর তফাৎ এই যে, এখানে দারিদ্র্য ও দুরবস্থা খোলা রাস্তাতেই দৃশ্যমান। আমার সেটা পছন্দ হয়।
‘এই তো এখানে’, লিন্দা বলে, একটা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। একটু দূরে একটা বিঙ্গো হলের বাইরে তিনজন ফ্যাকাশে-চামড়ার নারী, বছর পঞ্চাশের হবে, সিগারেট খাচ্ছিল। লিন্দার দৃষ্টি ইন্টারকমের নিচের নামের তালিকায় নিবদ্ধ, সে একটা বেল টেপে। দুটো বাস, একটার পর আরেকটা, গর্জন করে ছুটে যায়। তারপরই দরজায় আওয়াজ হয় এবং আমরা অন্ধকার করিডোরে প্রবেশ করি, দেয়ালের পাশে স্ট্রলারটা রাখি, এবং দুইতলা সিঁড়ি পেরিয়ে সেই ফ্ল্যাটের সামনে যাই। আমার হাতে হ্যাইদি আর লিন্দা ভানইয়ার হাতধরা। আমরা যখন পৌঁছাই তখন দরজাটা খোলাই ছিল। ফ্ল্যাটের ভেতরটা অন্ধকার। সরাসরি ভেতরে যেতে আমার একটু অস্বস্তি হয়, আমি একটা ঘণ্টা টিপে ঢুকতে পছন্দ করতাম, সেটা আমাদের আগমনকে আরেকটু স্পষ্ট করে তুলত, কারণ এখন আমরা হলরুমের একেবারে মাঝখানে দাঁড়ানো এবং সেখানে একজনও নেই আমাদের দিকে সামান্যতম মনোযোগ দেওয়ার মতো।
আমি হ্যাইদিকে বসিয়ে তার জ্যাকেটটা হাতে নিই। লিন্দা ভানইয়ার ক্ষেত্রে একই কাজ করতে যায়, কিন্তু সে প্রতিবাদ করে : তার বুটগুলো আগে খুলতে হবে, তারপরই সে তার সোনালি জুতোগুলো পরবে। হলের দুপাশে দুটো ঘর। একটাতে বাচ্চারা খেলছিল উত্তেজিতভাবে, আরেকটাতে কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। হলরুমে, যেটা ঘরের আরো ভেতরে প্রসারিত ছিল, আমি এরিককে দেখতে পাই আমাদের দিকে পিঠ দিয়ে গল্প করতে, নার্সারিরই কোনো এক অভিভাবকের সঙ্গে।
‘হ্যালো’, আমি বলি।
সে ঘুরে দাঁড়ায় না। আমি চেয়ারে রাখা একটা কোটের ওপর হ্যাইদির জ্যাকেটটা রাখি এবং লিন্দার সঙ্গে চোখাচোখি হয়। সে-ও ভানইয়ার জ্যাকেটটা ঝোলানোর মতো একটা জায়গা খুঁজছিল।
‘আমরা কি তাহলে ভেতরে যাব?’ সে বলে।
হ্যাইদি তার হাত দিয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরে। আমি তাকে কোলে তুলে কয়েক পা এগিয়ে যাই। এরিক ফিরে তাকায়।
‘হাই’, সে বলে।
‘হাই’, আমি জবাব দিই।
‘হাই ভানইয়া’, সে বলে।
ভানইয়া দূরে সরে যায়।
‘তুমি কি স্তেলাকে তার উপহারটা দেবে না?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘স্তেলা, ভানইয়া এসেছে!’ এরিক বলে।
‘তুমি দাও।’ ভানইয়া বলে।
স্তেলা মেঝেতে বসে থাকা বাচ্চাদের দঙ্গল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সে হাসে।
‘হ্যাপি বার্থডে, স্তেলা!’ আমি বলি। ‘ভানইয়া তোমার জন্য একটা উপহার এনেছে।’
আমি ভানইয়ার দিকে তাকাই। ‘তুমি এটা দিতে চাও ওকে?’
‘তুমি দাও’, সে নিচু গলায় বলে।
আমি উপহারটা নিয়ে স্তেলার দিকে এগিয়ে দিই।
‘এটা ভানইয়া ও হ্যাইদির পক্ষ থেকে’, আমি বলি।
‘ধন্যবাদ’, সে বলে এবং মোড়কটা ছিঁড়ে ফেলে। সে যখন দেখে সেটা একটা বই তখন ওটাকে টেবিলে অন্যান্য উপহারের পাশে রাখে এবং বাকি বাচ্চাদের কাছে চলে যায়।
‘তাহলে?’ এরিক বলে। ‘সব ঠিকঠাক আছে তো?’
‘হ্যাঁ, ভালো’, আমি বলি। আমি বুঝতে পারি আমার শার্টটা বুকের কাছে আটকে আছে। সেটা কি দৃশ্যমান ছিল? আমি ভাবতে থাকি।
‘কী দারুণ সুন্দর অ্যাপার্টমেন্ট’, লিন্দা বলে। ‘তিনটা বেডরুম, না?’
‘হ্যাঁ’, এরিক বলে।
তাকে সবসময় এমন কৌশলী দেখায়, সবসময় মনে হয় সে যাদের সঙ্গে কথা বলছে তাদের বিষয়ে তার মনে কোনো সন্দেহ আছে, আপনি তার মনের ঠিক কোথায় আছেন এটা বোঝা কঠিন, তার সেই আধা-হাসির অর্থ হতে পারে সে আপনার প্রতি ব্যঙ্গপ্রবণ, ভদ্রজনোচিত অথবা অনিশ্চিত একইসঙ্গে। তার যদি একটা উচ্চকিত ও জোরালো চরিত্র থাকত সেটাও আমাকে বিরক্ত করত, কিন্তু সে দুর্বল ও অনিশ্চিতধরনে একটু বিভ্রান্তগোছের। ফলত সে যা-ই ভাবুক না কেন আমাকে বিন্দুমাত্র ভাবিত করে না। আমার মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল ভানইয়ার ওপর। সে লিন্দার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল এবং তার দৃষ্টি ছিল মেঝের দিকে।
‘অন্যেরা রান্নাঘরে’, এরিক বলে। ‘সেখানে কিছু ওয়াইন আছে, যদি তুমি এক গ্লাস নিতে চাও।’
হ্যাইদি এরই মধ্যে ঘরে ঢুকে গেছে, সে একটা কাঠের শেলফের সামনে দাঁড়ানো, তার হাতে একটা শামুক। সেটার চাকা ছিল এবং টানার জন্য একটা দড়িও।
আমি হলের দুইজন অভিভাবকের দিকে মাথা নাড়ি।
‘হাই’, তারা বলে।
তার নামটা যেন কী? ইয়ুহান? নাকি ইয়াকব? আর মেয়েটার? সেটা কি মিয়া? দূর ছাই! ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, রবিন।
‘হাই’, আমি বলি।
‘তুমি ঠিকঠাক আছ?’ সে বলে।
‘হ্যাঁ’, আমি বলি। ‘তোমাদের দুজনের কী খবর?’
‘সবই ঠিক আছে। ধন্যবাদ।’
আমি তাদের দিকে তাকিয়ে হাসি। তারাও ফিরতি হাসি দেয়। ভানইয়া লিন্দার হাত ছেড়ে দ্বিধাভরে সেই ঘরে ঢোকে যেখানে বাচ্চারা খেলছিল। কিছুক্ষণের জন্য সে দাঁড়িয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করে। তারপর মনে হয় সে ঝাঁপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
‘আমার একজোড়া সোনালি জুতো রয়েছে!’ সে বলে।
সে নিচু হয়ে একটা জুতো খোলে, শূন্যে ধরে রাখে, যদি কেউ দেখতে চায়। তবে কেউ তা চায়নি। সে যখন সেটা বুঝতে পারে তখন আবার পায়ে গলিয়ে দেয়।
‘তুমি কি ওখানকার বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে চাও না?’ আমি ওকে পরামর্শ দিই। ‘তুমি দেখেছ, তাদের একটা বড় পুতুলের ঘর রয়েছে।’
সে এগিয়ে যায়, তাদের পাশে বসে, তবে কিছু করে না, কেবল দেখতে থাকে।
হ্যাইদিকে কোলে তুলে নিয়ে লিন্দা কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়। আমি তাকে অনুসরণ করি। সবাই হ্যালো বলে, আমরা সেই অভিবাদনের জবাব দিই, টানা লম্বা একটা টেবিলে বসি, আমি জানালার ধারে। তারা সস্তা প্লেন টিকিটের গল্প করছিল, সেগুলো কীরকম পানির দামে শুরু হয়েছিল, তারপর কীভাবে একটু একটু করে দামি হয়ে ওঠে, এটা-সেটা ট্যাক্স যোগ করার পর, যতক্ষণ না সেগুলো মোটামুটি দামি এয়ারলাইনের টিকিটগুলোর মতোই হয়। তারপর বিষয়টা পালটে যায় কার্বন ডাই-অক্সাইড বরাদ্দ কেনায়, এবং তারপর নতুন শুরু হওয়া ভাড়া করা ট্রেন জার্নির বিষয়ে। আমি সেটা নিয়ে অবশ্যই একটা মতামত দিতে পারতাম, তবে আমি তা করিনি – এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে গালগপ্পো, সেইসব অসীম সংখ্যক বিষয়ের মধ্যেই একটা যা আমি আয়ত্ত করতে পারিনি – ফলে আমি বসে বসে যা বলা হচ্ছিল তাতে মাথা নাড়ি, হাসি, যখন অন্যরাও হাসে, এবং মনে মনে তীব্রভাবে নিজেকে হাজার মাইল দূরে সরিয়ে রাখি। কাজের টেবিলের সামনে স্তেলার মা, ফ্রিদা, সালাদের ড্রেসিংজাতীয় কিছু একটা বানাচ্ছিল। সে আর এরিকের সঙ্গে ছিল না, এবং যদিও তারা স্তেলার বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে দক্ষ ছিল, আপনি নার্সারির সভাগুলোতে তাদের মধ্যেকার বিরক্তি ও চাপা উত্তেজনাটুকু টের পেতেন। সে স্বর্ণকেশী, উঁচু চোয়াল, সরু চোখ, লম্বা চিকন শরীর এবং সে জানে কীভাবে পোশাক পরতে হয়। তবে সে নিজেকে নিয়ে বেশিরকম তৃপ্ত ছিল, অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিক, যা আমাকে তার প্রতি আকৃষ্ট করেনি। আমার কোনো সমস্যা নেই অনাকর্ষণীয় ও অমৌলিক মানুষদের ব্যাপারে – তাদের নিশ্চয়ই অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যেমন উচ্চতা, বিবেচনাবোধ, বন্ধুতা, রসবোধ, মেধা, একধরনের সহজ পরিবেশ নির্মাণে সক্ষম সংলাপ রচনার দক্ষতা, একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজনের সামর্থ্য; কিন্তু আমি একঘেয়ে মানুষদের সান্নিধ্যে রীতিমতো অসুস্থ বোধ করি, যারা নিজেদের বিশেষ আকর্ষণীয় মনে করে এবং যারা নিজেদের ঢোল নিজেরা পেটায়।
আমি যেটাকে সালাদ ড্রেসিং ভেবেছিলাম ফ্রিদা সেটাকে নামিয়ে রাখে, যা আসলে ছিল একটা সসের বাটি, একটা গাজর ও একটা শসার ডিশের পাশে। সেই মুহূর্তে ভানইয়া ঘরের মধ্যে আসে। সে যখন আমাদের দেখতে পায় তখন কাছে এসে দাঁড়ায়।
‘আমি বাড়ি যেতে চাই’, সে কোমলভাবে বলে।
‘আমরা তো মাত্র এলাম!’ আমি বলি।
‘আমরা আরেকটু সময় থাকব’, লিন্দা বলে। ‘এবং দেখো আমরা এখন কিছু মজার জিনিস পাচ্ছি!’ সে কি-বোর্ডের ওপর রাখা সেই সবজিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করছিল?
সেটাই হবে নিশ্চয়।
তারা সবাই পাগল এই দেশটাতে।
‘আমি তোমার সঙ্গে যাব’, আমি ভানইয়াকে বলি। ‘চলো।’
‘তুমি কি হ্যাইদিকেও নিয়ে যাবে?’ লিন্দা বলে।
আমি মাথা নাড়ি এবং আমার পায়ের কাছে থাকা ভানইয়াকে সেই রুমে নিয়ে যাই, যেখানে বাচ্চারা ছিল। ফ্রিদা বোর্ডটা হাতে নিয়ে আমাকে অনুসরণ করে। সে মেঝের মাঝখানের একটা ছোট টেবিলে সেটাকে নামিয়ে রাখে।
‘এখানে কিছু খাবার আছে’, সে বলে। ‘কেক আসার আগে খেতে পার।’
বাচ্চারা, তিনটা মেয়ে ও একটা ছেলে, পুতুলঘরটা নিয়ে খেলেই চলেছে। অন্য ঘরে দুটো ছেলে দৌড়াচ্ছিল কেবল। এরিক সেখানে ছিল, স্টেরিও প্লেয়ারটার কাছে, তার হাতে একটা সিডি।
‘এখানে একটা নরওয়েজিয়ান জ্যাজ রয়েছে’, সে বলে। ‘তুমি কি জ্যাজের ভক্ত?’
‘তা-আ …’ আমি বলি।
‘নরওয়ের একটা দারুণ জ্যাজের আবহ রয়েছে’, সে বলে।
‘তোমার ওটাতে কারা কারা রয়েছে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
সে আমাকে কভারটা দেখায়। এটা একটা ব্যান্ডের সিডি যাদের কথা আমি কখনো শুনিনি।
‘দারুণ’, আমি বলি।
ভানইয়া হ্যাইদির পেছনে দাঁড়িয়ে তাকে কোলে তোলার চেষ্টা করছে। হ্যাইদি প্রতিবাদ করছে।
‘সে না বলছে, ভানইয়া’, আমি বলি। ‘ওকে নামিয়ে দাও।’
সে তারপরও চেষ্টা চালিয়ে গেলে আমি ওদের দিকে এগিয়ে যাই।
‘তুমি একটা গাজর নিতে চাও না?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘না’, ভানইয়া বলে।
‘কিন্তু ওখানে কিছু সসও রয়েছে’, আমি বলি। টেবিলের কাছে যাই, একটা গাজরের টুকরা হাতে নিয়ে, সাদা, সম্ভবত ক্রিমের কোনো একটা সসে ডুবিয়ে সেটা মুখে পুরি।
‘উমম’, আমি বলি। ‘এটা দারুণ!’
তারা ওদের সসেজ, আইসক্রিম, পপ জাতীয় কিছু দিতে পারল না কেন? ললিপপ? জেলি? চকলেট পুডিং?
কী একটা ফালতু, নির্বোধের দেশ এটা। সবক’টা তরুণী এমন বিশাল পরিমাণ পানি খেয়েছে যে মনে হয় সেগুলো তাদের কান দিয়ে বেরিয়ে আসছে, তারা ভেবেছিল সেটা খুব ‘উপকারী’, ‘স্বাস্থ্যকর’, কিন্তু এর একটাই ফল হয়েছে, পেচ্ছাপ ধরে রাখতে না পারা তরুণীদের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বাচ্চারা সুষম পাস্তা, সুষম পাউরুটি এবং সবরকমের অদ্ভুত মোটাদানা চালের ভাত খেয়েছে, যা তাদের পাকস্থলী হজম করতে পারে না, তবে তাতে কিছু আসে-যায় না, কেননা এগুলো ‘স্বাস্থ্যকর’, ‘উপকারী’ ও ‘সুষম’। হায় তারা খাবারের সঙ্গে মনকে গুলিয়ে ফেলছে, তারা ভেবেছে তারা খাদ্যের মাধ্যমেই ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারবে, একথা না বুঝে যে, খাদ্য এক জিনিস আর তা যে অনুভূতির জন্ম দেয় সেটা আরেক। এবং আপনি যদি সেটা বলেন, আপনি যদি সেরকম কোনো একটা কথা বলেন, আপনি তাহলে হয় প্রতিক্রিয়াশীল, অথবা স্রেফ নরওয়েজিয়ান, অর্থাৎ দশ বছর পিছিয়ে থাকা।
‘আমি কিছু চাই না’, ভানইয়া বলে। ‘আমার খিদে নেই।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে’, আমি বলি। ‘কিন্তু এখানে দেখ। তুমি এটা দেখেছ? এটা একটা ট্রেন সেট। আমরা এটা বানাব?’
সে মাথা নাড়ে এবং আমরা অন্য বাচ্চাদের পেছনে বসে পড়ি। আমি একটা জ্যা-এর আকারে রেললাইনগুলি বসাতে থাকি এবং ভানইয়াকে টুকরোগুলি জোড়া দিতে সাহায্য করি। হ্যাইদি অন্য ঘরে চলে গেছে, সেখানে সে বইয়ের তাকের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে পুরো জিনিসটা পড়ার চেষ্টা করছিল। যখন দুটো ছেলের নাচানাচি অতিরিক্ত উদ্দাম হয়ে ওঠে, তখন সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে জ¦লজ¦লে চোখে তাকায়।
এরিক শেষ পর্যন্ত একটা সিডি ভরে আওয়াজ বাড়িয়ে দেয়। পিয়ানো, বেজ এবং অগুনতি তালবাদ্যের যন্ত্র, যা একধরনের জ্যাজ ড্রামাররা খুব ভালোবাসে – যা একগাদা পাথরের একটা আরেকটাকে আঘাত করা অথবা হাতের কাছে যা কিছু পায় তা-ই দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করার মতো। আমার কাছে মাঝেমধ্যে এর কোনো অর্থ হয় না, এবং প্রায়শই এটাকে আমার হাস্যকর মনে হয়। জ্যাজ কনসার্টে শ্রোতারা যখন এর প্রশংসা করে আমার তখন ঘেন্না হয়।
এরিক গানের তালে মাথা নাড়ছিল, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে, আমাকে একটু চোখ টিপে, রান্নাঘরের দিকে যায়। সেই মুহূর্তে দরজার ঘণ্টা বাজে। সেটা ছিল লিনুস ও তার ছেলে আকিলেস। লিনুসের ওপরের ঠোঁটের নিচে এক চিমটি গুল, পরনে কালো প্যান্ট, একটা গাঢ় রঙের কোট ও তার নিচে একটা সাদা শার্ট। তারা সাদাচুল কিছুটা অগোছালো, ফ্ল্যাটখানি পরখকরা চোখগুলো সৎ ও সরল।
‘হ্যালো’, সে বলে। ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো’, আমি বলি। ‘আপনি?’
‘হ্যাঁ, কেটে যাচ্ছে।’
আকিলেস, ছোটখাটো, তবে বড় কালো চোখ, তার জ্যাকেট ও জুতো খোলে আমার পেছনের বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে। বাচ্চারা কুকুরের মতো, তারা ভিড়ের মধ্যেও তাদের জ্ঞাতিদের খুঁজে বার করে ফেলে। ভানইয়াও তাকে লক্ষ করে। সে তার প্রিয়, তাকেই সে পছন্দ করেছিল আলেক্সান্দারের ভূমিকা নেওয়ার জন্য। তবে সে তার বাইরের পোশাক খোলার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য বাচ্চাদের কাছে চলে যায়, এবং ভানইয়া তাকে থামানোর জন্য কিছুই করতে পারে না। লিনুস রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে চুপিসারে এবং তার চোখে আমি যে আলো দেখতে পাই বলে ভাবি, সেটা নিশ্চয়ই একটা আড্ডার প্রত্যাশা থেকে উৎসারিত।
আমি উঠে দাঁড়াই এবং হ্যাইদির দিকে তাকাই। সে একটা ইয়াক্কা গাছের পাশে বসেছিল, জানালার নিচে, পট থেকে মাটি নিয়ে মেঝেতে ছোট-ছোট স্তূপ করছিল। আমি তার কাছে যাই, তাকে তুলি, আমার হাত দিয়ে যতটা পারি মাটিগুলো তুলে দিই এবং রান্নাঘরে যাই কোনো একটা ন্যাকড়া পাওয়া যায় কি না দেখতে। ভানইয়া আমাকে অনুসরণ করে। সেখানে পৌঁছলে সে লিন্দার কোলে উঠে বসে। বসার ঘরে হ্যাইদি কাঁদতে শুরু করে। লিন্দা আমাকে একটা প্রশ্নাতুর চাহনি ছুড়ে দেয়।
‘আমি তাকে দেখব’, আমি বলি। ‘কিছু একটা দরকার ওকে মোছার জন্য।’
কাজের টেবিলের চারপাশে একগাদা মানুষ, দেখে মনে হয় কোনো একটা খাবার তৈরি হচ্ছে, তবে আমি সেই ভিড়ের মধ্যে না গিয়ে টয়লেটে ঢুকে একগাদা টয়লেট পেপার নিয়ে পানিতে ভিজিয়ে লিভিংরুমে ফিরে আসি পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে। আমি হ্যাইদিকে কোলে নিই, সে তখনো কাঁদছিল এবং তাকে বাথরুমে নিয়ে যাই তার হাত ধুইয়ে দেব বলে। সে আমার কোলে প্রবলভাবে গা মোচড়াতে থাকে।
‘এই তো, এই তো, সোনা’, আমি বলি। ‘এক্ষুনি হয়ে যাবে। আর একটু বাকি, হ্যাঁ। ব্যস, হয়ে গেল।’
আমরা বেরিয়ে আসার পর তার কান্না থেমে গেল, তবে সে পুরোপুরি খুশি নয়, সে চায়নি তাকে আমি নিচে নামিয়ে দিই, আমার কোলের মধ্যেই থাকতে চেয়েছিল সে। রবিন তার হাত জোড়া করে লিভিংরুমে দাঁড়িয়ে তার মেয়ে তেরেসার কর্মকাণ্ড অনুসরণ করছিল, যে হ্যাইদি থেকে সামান্য কয়েকমাসের বড় হবে, যদিও সে তখনই বড় বড় বাক্যে কথা বলতে পারত।
‘হাই’, সে বলে। ‘এখন কিছু লিখছেন, আপনি?’
‘হ্যাঁ, টুকটাক’, আমি বলি।
‘আপনি কি বাড়িতেই লেখেন?’
‘হ্যাঁ, আমার নিজের একটা ঘর রয়েছে।’
‘এটা কি একটু কঠিন নয়? ইয়ে, মানে আমি বলতে চাইছি, আপনার কি টিভি দেখতে বা কাপড় ধুতে বা আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না, লেখার পরিবর্তে?’
‘এটা ভালোই। নিজের অফিস থাকার চেয়ে একটু কম সময় পাই আমি, তবে …’
‘হ্যাঁ, তা ঠিক’, সে বলে।
তার বেশ লম্বা সোনালি চুল, যেগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে তার ঘাড়ের কাছে এসে নেেেমছে, স্বচ্ছ নীল চোখ, চওড়া চোয়াল। সে খুব শক্তপোক্ত নয়, আবার তেমন রোগাদুবলাও নয়। সে এমনভাবে কাপড় পরেছে যেন তার বয়স কুড়ির কোঠায়, যদিও তার বয়স তিরিশের শেষদিকে। তার মনে কী চলছিল আমার কোনো ধারণা নেই, সে কী ভাবছে তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, অথচ তাকে তেমন গোপনতাপ্রিয় বলে মনে হয় না। বরং উল্টো, তার মুখ ও ভাবভঙ্গি একধরনের খোলামেলা স্বভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। তবে সেখানে আরো একটা কিছু ছিল, আমি টের পাই, আরো একটা কিছুর ছায়া। তার কাজ ছিল শরণার্থীদের সমাজের মূলধারায় মিশিয়ে দেওয়া, সে একবার আমাকে বলেছিল, কয়েকটি পালটা প্রশ্ন, যেমন কতজন শরণার্থীকে তারা দেশে ঢুকতে দেয় ইত্যাদি, আমি আলোচনাটা থামিয়ে দিই, কেননা তাদের বিষয়ে আমার যে অভিমত ও সহানুভূতি ছিল, সেটা সেই সমাজের গড় মনোভাব থেকে এতই দূরবর্তী যে, আজ হোক কাল হোক সেটা ফুটে বেরুতো এবং আমি খারাপ কিংবা নির্বোধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়তাম, যেটাকে উৎসাহিত করার কোনো কারণ দেখিনি আমি।
ভানইয়া, যে অন্য বাচ্চাদের থেকে একটু আলাদা হয়ে মেঝেতে বসেছিল, আমাদের দিকে তাকায়। আমি হ্যাইদিকে নামিয়ে রাখি, ভানইয়া মনে হয় সেটার জন্যই অপেক্ষা করছিল : সে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায় এবং আমার কাছে আসে, হ্যাইদির হাত ধরে তাকে খেলনার তাকের দিকে নিয়ে যায়, যেখান থেকে সে কাঠের শামুকটা তুলে দেয় তার হাতে, যার দড়ি টানলে সেটা মেঝেতে গড়গড় করে।
‘দেখো হ্যাইদি’, সে বলে, সেটাকে তার হাত থেকে নিয়ে মেঝেতে রেখে। ‘তুমি এর দড়িটা এভাবে টানো। দেখবে সে কীরকম আওয়াজ করে ঘুরতে থাকে। দেখলে?’
হ্যাইদি দড়ি ধরে টানে। শামুকটা তাতে উল্টে পড়ে যায়।
‘না, এভাবে নয়’, ভানইয়া বলে। ‘আমি তোমাকে দেখাচ্ছি।’
সে শামুকটাকে সোজা করে রাখে এবং মেঝে বরাবর কয়েক মিটার ধরে টানে।
‘আমার একটা ছোট বোন আছে!’ সে জোর গলায় বলে। রবিন জানালার দিকটাতে গিয়েছিল, যেখান থেকে সে পেছনের উঠোনের দিকে তাকিয়েছিল। স্তেলা, খুব প্রাণবন্ত এবং অনুমেয়ভাবেই একটু বেশি উচ্ছ্বসিত, কেননা এটা তার পার্টি, চিৎকার করে কিছু একটা বলে, যা আমি বুঝতে পারি না, দুটো ছোট বাচ্চার একজনের দিকে ইঙ্গিত করে, যে তাকে আঁকড়ে রাখা পুতুলটা দিয়েছিল, একটা ছোট টানা-গাড়ি বের করে সেখানে পুতুলটাকে রাখে এবং সেটাকে হলরুমের মধ্যে ঠেলতে শুরু করে। আকিলেস বেনইয়ামিনের কাছে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়, ভানইয়ার চেয়ে আঠারো মাসের বড় একটা ছেলে, যে সাধারণত গভীর ভাবনায় ডুবে গিয়ে কোথাও বসে থাকে, হয় কোনো ছবি আঁকা কিংবা লেগো খেলায় অথবা প্লাস্টিকের ডাকাতে ভরা জাহাজ বানানো নিয়ে ব্যস্ত। সে কল্পনাপ্রবণ, বুদ্ধিমান ও সদাচারী এবং এখন আকিলেসের সঙ্গে বসা, আমার ও ভানইয়ার শুরু করা রেলওয়ে ট্র্যাকটি বানানোতে মগ্ন। ছোট মেয়েদুটো স্তেলার পেছনে ছোটে। হ্যাইদি ঘ্যানঘ্যান করছিল। সে সম্ভবত ক্ষুধার্ত। আমি কিচেনে গিয়ে লিন্দার পাশে বসি।
‘তুমি কি গিয়ে ওদের একটু দেখবে? ’ আমি বলি। ‘আমার মনে হয় হ্যাইদি ক্ষুধার্ত।’
সে মাথা নাড়ে, আমার কাঁধে চাপড় দেয় এবং উঠে পড়ে। আমার কয়েক সেকেন্ড লাগে টেবিলে যে দুটো আলোচনা চলছিল তার বিষয়বস্তু বুঝতে। একটা ছিল কার পুল বিষয়ে এবং আরেকটা ছিল গাড়ি নিয়ে, এবং আমি সিদ্ধান্ত টানি যে, আলোচনাটা নির্ঘাৎ বিপরীত মুখে ধাবিত হচ্ছে। জানালার বাইরের অন্ধকার বেশ গভীর, কিচেনের আলো
কৃপণ, টেবিলের চারপাশে সুইডিশ মুখগুলোর ভাঁজেরা ছায়াবৃত এবং চোখেরা মোমবাতির আলোয় জ্বলজ্বল করে। এরিক ও ফ্রিদা এবং আরেকজন মহিলা, যার নাম আমি ভুলে গেছি, কাজের টেবিলের সামনে দাঁড়ানো, আমাদের দিকে পিঠ দিয়ে, খাদ্য প্রস্তুতরত। ভানইয়ার প্রতি যে কোমলতা অনুভব করি আমি তা আমাকে পূর্ণতার অনুভূতি দেয়; কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না সেখানে। আমি যে-লোকটি কথা বলছিল তার দিকে তাকাই, মৃদু হাসি যখনই কোথাও কোনো বুদ্ধির ছোঁয়া দেখি এবং আমার সামনে কেউ একজনের রেখে যাওয়া রেড ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিই।
আমার সরাসরি সামনে বসা মানুষটাই একমাত্র ব্যক্তি যে কিছুটা ব্যতিক্রমী। তার মুখ বড়, তার চিবুকে দাগ, শারীরিক গঠন কর্কশ, চোখগুলো সুতীব্র। টেবিলে পেতে রাখা হাতগুলোও বিশাল। সে পঞ্চাশের দশকের একটা শার্টপরিহিত এবং গোড়ালি পর্যন্ত গোটানো নীল জিন্স। তার চুলগুলোও পঞ্চাশের কেতায় আঁচড়ানো এবং তার জুলফিও ছিল। তবে এগুলো তাকে আলাদা করেনি; সেটা তার ব্যক্তিত্ব, সে যে সেখানে বসে আছে সেটা আপনি অনুভব করতে পারছিলেন, যদিও সে বেশি কথাই বলছিল না। (চলবে)


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.