বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন

লেখক: সেলিনা হোসেন

সেলিনা হোসেন

 

কলেজজীবনে প্রেমের সূচনা হয়েছিল দুজনের। ভালোলাগার প্রচ্ছন্ন ভঙ্গিতে আশ্চর্য দৃষ্টিমোহন রেশ জড়িয়ে হাত ধরল দুজনে। মুগ্ধতার ছটায় বেজে উঠল দিনযাপনের ঘণ্টা। প্রথমে ঊর্মিলা নিজেকে ছড়িয়ে দিলো আকাশের মনোভূমির সবুজ প্রান্তরে। দিগন্তরেখায় দাঁড়িয়ে বলল, তাকাও আকাশ। দেখো আমাকে। আমি তোমাকে ভালোবাসি।

হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আকাশের দৃষ্টি। বলে, আমি তোমার এই কথা শোনার অপেক্ষায় দিন গুনেছি। তুমি আমার কাছে এখন থেকে ঊর্মিলা নও। তুমি আমার ঊর্মিবাঁশি। বেজে বেজে ভরে রাখো আমার সবটুকু।

– আর তুমি আমার আকাশদীপ। তোমার কাছ থেকে আমার জ্যোৎস্না কখনো অন্ধকার হবে না। অমাবস্যা তো দূরের কথা।

দুজনে দুজনের হাত জড়িয়ে ধরে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তারপর শুরু হয় উৎফুলস্নচিত্তের দিনগোনার নবান্ন। মৃদু মনকষাকষি হলেও সেটা দীর্ঘ সময় ধরে টেকেনি। ধুয়ে গেছে আনন্দের জোয়ারে। ঊর্মিলা মাঝে মাঝে বলে, আমরা বেশ দিন কাটাচ্ছি আকাশ। আমাদের ভালোবাসায় খাদ নেই। মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার ভয় নেই।

– আমারও তাই মনে হয়। ভালোবাসার স্রোতে শাপলাফুল না, পদ্মফুল আছে।

– হ্যাঁ, তাই। তবে শাপলা থাকলে সেটা আমার প্রাণের ফুলই হবে।

দুচোখ জুড়িয়ে যায় ঊর্মিলার।

বান্ধবী মিনালি বলে, তোরা দুজনে বেশ আছিস।

– ভালোবাসা এমনই। বেশ থাকার শর্ত পূরণ না হলে সম্পর্কে মাধুর্য থাকে না।

– সবার জন্য এমন হয় না। তুইও তো জানিস আমরা কত ভালোবাসার ভাঙাঘর দেখেছি। কয়দিন আগে সুশান্ত আর রূপালি কেমন গলাবাজি করে ছাড়াছাড়ি করল দুজনে।

– ঘটনা আরো নানাভাবে ঘটে। হাসানকে দেখিসনি?

– জানি। মুক্তা আর একজনকে বিয়ে করলে ও মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। এখন ছন্নছাড়া জীবনযাপন করছে। খুব মায়া হয় ওর জন্য। ভালোবাসা এমনই।

– এমন শত শত উদাহরণ আছে। আমাদের ভালোবাসায় কালো দাগ পড়তে দেবো না। ভালোবাসার এক পাড়িতেই মৃত্যুর ঘাটে পৌঁছাব।

– বাহ্, দারুণ বলেছিস। অভিনন্দন জানাই তোদের।

ঊর্মিলা বিনম্র হাসিতে উজ্জ্বল করে তোলে সময় ও পরিবেশ। মিনালিও হাসিমুখে বলে, তোর হাসি আমার স্মৃতি হয়ে থাকল।

– ভাগ, বেশি কথা বলতে হবে না। প্রত্যেকে নিজের স্মৃতি বানালে –

– ভাগ, উপদেশ দিবি না। তোরা পেরেছিস বলে সবাই পারবে এটা ভাবা ঠিক না।

– গেলাম। কথা বাড়াব না।

মিনালির ঘাড়ে চাপড় দিয়ে ঊর্মিলা চলে যায়। বাড়িতে মায়ের সঙ্গে কাজ আছে। মায়ের শরীর খারাপ। কাজের মেয়েটি না-বলেকয়ে চলে গেছে। তাই মা একা সংসারের কাজ সামলাতে পারছে না। বাড়ি ফিরে রান্নাঘরের কাজে যুক্ত হয় ঊর্মিলা। মা অবশ্য ওকে কলেজ যেতে নিষেধ করে না। বলে, ক্লাসের ফাঁকি চলবে না। পরীক্ষা, ক্লাস সব করতে হবে। এসব বাদ দিয়ে সংসারের ঝামেলা তোমাকে নিতে দেবো না। নিজে ঠিকমতো পড়ালেখা শিখিনি। আমি জানি পড়ালেখা না শেখার কষ্ট কী!

কথা বলতে বলতে মায়ের চোখে পানি আসে। বাড়ি ফিরে মাকে রান্নাঘরে পেয়ে ঊর্মিলা জোরে জোরেই বলে, এখন তোমার ছুটি মা। বাকি রান্না আমি শেষ করব।

– হ্যাঁ করবি। তোর রান্না খেতে আমি ভালোবাসি।

– শুধু তুমি না, বাড়ির সবাই ভালোবাসে।

মা ওকে জড়িয়ে ধরে বলে, তা ঠিক মা। কপালে চুমু দিয়ে আদর করে। ঊর্মিলার মনে হয়, বেঁচে থাকা অনেক সুন্দর। বাবা-মায়ের সংসার থেকে ঢুকবে নিজের সংসারে। সেটাও এমন সুন্দর হবে।

উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজের শরীরে ঝাঁকুনি দেয় ঊর্মিলা। আকাশের কথা মনে করে মায়ের চুমুর স্পর্শ নিজের অনুভবে জড়িয়ে রাখে। নিজেকেই বলে, আহা কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে।

সবার খাওয়া শেষ হলে রান্নাঘরের কাজ শেষ করে নিজের ঘরে আসে। ফোন পায় আকাশের।

– কী করছ ফুলখুকি?

– কাজ শেষ করে নিজের ঘরে ঢুকেছি। এখন তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া হবে আকাশ-বাতাস। কলেজে আসোনি কেন?

– মাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম।

– কী হয়েছে মায়ের?

– ডাক্তার বললেন ইনফ্লুয়েঞ্জা। ওষুধ যা দিয়েছেন সব এনেছি। এখন মায়ের রেস্ট দরকার।

– খেয়েছেন?

– হ্যাঁ, দোলা সব করছে। ও মায়ের সঙ্গে রাতে থাকবে।

– যাক, ভালো খবর। কাল আসবে কলেজে?

– হ্যাঁ, আসব। এখন রাখি কাল দেখা হবে। শুভরাত্রি ঝরাশিউলি।

ফোন কেটে দেয় আকাশ। ঊর্মিলা কিছু বলার সুযোগ পায় না। নিজেও ফোন করে না। দুজনে এই সীমিত আচরণ মেনে চলে। কোথাও নিজেদের বাড়াবাড়ি নেই। ফোন রেখে বই-খাতা নিয়ে টেবিলে বসে ঊর্মিলা। পড়ায় মন বসাতে পারে না। আকাশ ওকে সবসময় নতুন একটি নামে ডাকে। সেই নামটি পারতপক্ষে দ্বিতীয়বার বলে না। ঊর্মিলা একদিন বলেছিল, এত শব্দ কী করে খুঁজে পাও?

– মনের টানে। বাংলা ভাষার এত বড় ভাণ্ডার থেকে শব্দের অভাব হবে কেন?

– অভাবের কথা বলিনি। চট করে পেয়ে যাওয়ার কথা বলেছি।

– এটা আমার ভালোবাসা। ভালোবাসার টানে শব্দভাণ্ডার মজুদ থাকে।

– আমাদের জীবন কি এভাবে কাটবে?

– মানে?

– ভালোবাসার এমন গমগমে টানে?

– তোমার ভয় হচ্ছে কেন?

– জানি না।

– আমরা দুঃখ পেলে সেটা ভালোবাসার ছায়ায় ভরে রাখব মৌটুসি।

– হ্যাঁ, তাই হবে।

এসব ভাবনা তো রাতদিনের। এই ভাবনা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চায় ও। তাহলে ঘুমের মধ্যে ভালোবাসার স্রোত গড়াবে – এখন এই ভাবনায় বাজছে ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি গান। এমন মধুর সময়ের উপভোগ জীবনজুড়ে গড়াবে ভাবতেই দুহাতে বালিশ আঁকড়ে বুকে জড়ায়। নিজেকে বলে, আকাশ-পাখির হাজার বছরের আয়ু হোক।

পড়ালেখা শেষ করতে পেরিয়ে গেল প্রায় পাঁচ বছর। দুজনের চাকরি জোগাড় হলো। তারপর শুরু হলো যৌথজীবন। ঘরের খুঁটিনাটি – বিছানার হুটোপুটি – চাকরির সুতোকাটা ইত্যাদিতে গড়াতে থাকল সময়। বছর-তিনেক ঘুরেফিরে আনন্দেই কাটল; কিন্তু সংসারে সমন্তান এলো না। প্রথমে মন খারাপ করল ঊর্মিলা। বলল, চলো ডাক্তারের কাছে যাই। সমন্তান হচ্ছে না কেন? আমাদের সমস্যা কোথায় তা আমাদের বুঝতে হবে।

– হ্যাঁ, ঠিক। সায় দেয় আকাশ। এতদিন নিজেদের মগ্নতায় ডুবে ছিলাম। আর দিন গড়াতে দেবো না। ঘরে মানুষ চাই। দুই থেকে চার হতে চাই রাশিফুল।

খলবলিয়ে হাসে ঊর্মিলা। হাসি শেষ করে বলে, ওরা শুধু সংখ্যায় বাড়বে না। ওরা আমাদের বেঁচে থাকা হবে।

– ঠিক। ঠিক। কালই যাব ডাক্তারের কাছে। হাততালি দেয় আকাশ।

ঊর্মিলা মৃদুস্বরে ক্ষুণ্ণ কণ্ঠে বলে, ডাক্তার যদি আমার দোষ খুঁজে পায়? যদি বলে আমি কোনোদিন মা হতে পারব না?

– ধুত, এসব চিমন্তা করতে হবে না। ডাক্তার তো আমাকেও বলতে পারে যে, আমি কোনোদিন বাবা হতে পারব না। তারপরও আমরা ডাক্তারের কাছে যাব।

– আমাদের সামনে এখন স্থির হয়ে আছে দুটো শব্দ।

– জানি তুমি কী বলবে; কিন্তু তোমার মুখ থেকে শব্দদুটি বেরিয়ে আসুক তা আমি চাই না। আমিই বলি। বলব?

– বলো। আমি নিজেও জানি যে তুমি কী বলবে?

– বাঁজা আর নপুংসক। তুমি বাঁজা আর আমি নপুংসক।

হা-হা করে হাসতে হাসতে আকাশ ঘর মাতিয়ে তোলে। ঊর্মিলা স্তব্ধ হয়ে থাকে। ওর মনে হয় আকাশের হাসির শব্দে কোনো প্রাণ নেই। ও অকারণে হাসছে, নাকি নিজেকে বুঝ দিচ্ছে? হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখছে কষ্ট? ও দুহাতে মুখ ঢাকে। আকাশ হাসতে হাসতে অন্য ঘরে চলে যায়। ঊর্মিলার দিকে তাকায় না।

দুদিন পরে ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়।পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে ডাক্তার বলল, সমন্তান ধারণের জন্য আপনাদের দুজনেরই কোনো সমস্যা নেই। দুজনই শারীরিকভাবে ঠিক আছেন। অপেক্ষা করুন। দেখা যাক কী হয়।

– কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

ঊর্মিলার ভাঙা কণ্ঠ ঘড়ঘড় করে।

– এমন প্রশ্নের উত্তর ডাক্তারের কাছে থাকে না।

– আসো। যাই।

আকাশ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। ঊর্মিলা মৃদুস্বরে বলে, আমাদের জন্য দোয়া করবেন। ডাক্তারের মুখে কথা নেই। তাকে তো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতেই হয়। যেখানে কিছু করার নেই সেখানে বাক্য নিষ্প্রয়োজন। কাগজপত্রের ওপর দৃষ্টি নামিয়ে রাখলে ঊর্মিলা তার চুলের ওপর দৃষ্টি রেখে বেরিয়ে আসে।

আবার শুরু হয় দুজনের দিন গড়ানোর পালা। দু-বছরের মাথায় গর্ভ হয় ঊর্মিলার। ও যেদিন টের পেল নির্ধারিত সময়ের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, সেদিন শরীরে প্রবল কাঁপুনি অনুভব করে। আকাশকে খবরটি বলার আগে নিজের সিদ্ধামেত্ম সাতদিন পার করল। ভেবেছিল যদি কোনো অঘটন ঘটে তা নিজের মধ্যেই রাখবে। আকাশের মন খারাপ করবে না। পরের মাসেও যখন মাসিক হলো না, তখন ও আকাশকে না জানিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার থেকে নিজ গর্ভের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরে আকাশকে বলল, আজ আমাদের উৎসবের দিন।

– কোনো নতুন খবর পাব?

– বলছি না উৎসব।

– উৎসব কী উপলক্ষে?

– জন্মের উৎসব।

– মানে? কী বলছ তুমি?

– তুমি বাবা হবে।

– বাবা হবো? বাবা – বাবা –

নিজের বুকের উচ্ছ্বাসে ঘর তোলপাড় করে তোলে আকাশ। জড়িয়ে ধরে উর্মিলাকে।

কেটে যায় নির্ধারিত সময়। আবার হুটোপুটি করে দিনযাপনের উৎসব চলে পুরোটা সময়ে। দুজনের দিনে ফুল ফোটে অনবরত। ডাক্তারি পরীক্ষার পরে একদিন জানতে পারে, ওরা কন্যাশিশুর বাবা-মা হবে। দুজনে মিলে নাম ঠিক করে সমন্তানের। ঊর্মিলা বলে, আমি মধুস্মৃতি ডাকব।

– ঠিক আছে ডেকো। আমার কাছে ও শুকতারা।

– ঠিক আছে ওকে আমরা হাজার নামে ডাকব।

 

বড় হতে থাকে মেয়েটি। হাসি-আনন্দে উৎফুলস্ন জীবন উপভোগ করে দুজন মানুষ। মনে হয় দ্রম্নত সময় কেটে যাচ্ছে। একদিন মেয়েটি দুজনকে প্রশ্ন করে, তোমরা আমাকে এত এত নামে ডাকো কেন?

– তুই যে আমাদের চোখের মণি। তোকে ছাড়া আমাদের পৃথিবী দেখা হয় না।

হি-হি করে হাসতে হাসতে নাচের ভঙ্গিতে শরীর দোলায় মেয়েটি। বাবা বুকে টেনে বলে, তুই আমার সরস্বতী। আমার প–ত মেয়ে হবি। তখন আমি তোকে আগুনপাখি ডাকব।

– কী যে বলো না, আগুন দিয়ে পাখি হয় নাকি?

– তুই তো লেখাপড়ার আগুন হবি। ওই যে –

– বুঝেছি, বুঝেছি। আর বলতে হবে না।

– আমার মায়ের অনেক বুদ্ধি। তুই অনেক বড় হবি রে মা।

– আমি নাচ শিখব। আমার নাচতে খুব ভালো লাগে।

– হ্যাঁ, তোকে নাচের স্কুলে ভর্তি করে দেবো।

– গান গাইতে শিখবি না?

– জানি না। আমি কি পারব গান গাইতে? মা তুমি বলো।

– পারবি মা। তোকে গানের স্কুলেও ভর্তি করে দেবো।

– আচ্ছা দিও।

নানাভাবে দিন গড়াল দুজন বয়সী মানুষের। ছোট মেয়েটি চোখের সামনে বড় হচ্ছে। হাসি-আনন্দে ভরপুর জীবনের সবটুকু। দুজন মানুষ একইরকম করে ভাবে। দুজনের ভাবনায় গোলমাল হয় না। ধৈর্যচ্যুতি ঘটে না। মেয়েটি বেঁচে থাকার আলো।

স্কুলের পড়ালেখা-নাচ-গান শিখে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে তেরো বছরে পৌঁছে যায় মধুস্মৃতি। মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয় আবার ভালো হয়ে যায়। একদিন ভোরবেলা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুম থেকে ওঠে।

– কী হয়েছে মা?

– আমার মাথাব্যথা। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। ও আলস্নাহ রে, আমি মরে যাব।

– আয়, আমার বুকে আয় মা।

– না, আমি বুকে যাব না। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও।

বিছানায় গড়াগড়ি করতে থাকে মধুস্মৃতি। বাবা-মা ধরতে এলে ছিটকে দূরে সরে যায়। কান্নায় ঘর ভরে থাকে। মেয়ের খাটের কাছে নিচে বসে কাঁদে বাবা-মাও। মেয়েটির কান্না থামছে না।

নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ডাক্তাররা বললেন, মসিত্মষ্কের জটিল রোগে ভুগছে আপনাদের মেয়ে। বাড়িতে দুর্যোগের ঘনঘটা। জটিল রোগ বোঝার সাধ্য তাদের নেই। ডাক্তারের কথা বোঝারও সাধ্য নেই। ডাক্তার যা বলে তা পালন করে দিন গড়াচ্ছে। মেয়েটি মাঝে মাঝে হাসিখুশি থাকে। মনে হয় ও বুঝি ভালো হয়ে গেছে। ঊর্মিলা আর আকাশ স্বসিত্ম পায়। মেয়ে বুঝি সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু না, স্বসিত্মর ভাবনা অল্পে কেটে যায়। আবার শুরু হয় কান্নাকাটি। ব্যথার চিৎকার। বছর গড়াতে ডাক্তারের নির্দেশে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় মধুস্মৃতিকে। ক্রমাগত নিসেত্মজ হয়ে যায় মেয়ে।

ভালোবাসার বিপরীতে এমন বুকফাটা হাহাকার দুজনকে বিধ্বস্ত করে ফেলে। বুঝে যায় ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়।

হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে দেয়ালে মাথা ঠোকে আকাশ। মেয়ের বিছানার পাশে বসে থাকলে দুকান বধির হয়ে যায় ঊর্মিলার। বুঝে যায় দিন ফুরানোর সময় এখন।

কয়েকদিন পরে ডাক্তাররা বলে, আমাদের চিকিৎসা করার আর সুযোগ নেই। ওর ব্রেন ডেথের বিষয়টি আমাদের সামনে। আমরা নিশ্চিত হয়ে গেছি।

দুজনে কাঁদতে শুরু করে। ডাক্তাররা তাদের কান্নার সুযোগ দেয়। কথা বাড়ায় না। পরদিন আকাশ আর ঊর্মিলাকে একসঙ্গে ডেকে বলে, হাসপাতালে আমাদের সহকর্মীরা চায় আপনাদের মেয়ের লিভার আর কিডনি দুটি যদি দান করেন তাহলে আমরা অন্য রোগীদের শরীরে সেগুলো সংস্থাপন করতে পারি।

– তাহলে তারা কি সুস্থ হয়ে যাবে?

– হ্যাঁ, সুস্থ হয়ে যাবে এবং অনেকদিন বাঁচবেও।

ঊর্মিলা দুহাত ওপরে তুলে বলে, আলস্নাহ, বুঝতে পারছি অন্যের শরীরে হলেও বেঁচে থাকবে আমাদের মধুস্মৃতি। কী গো ঠিক বলেছি?

আকাশের দিকে তাকালে সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আমরা চাই এভাবে বেঁচে থাকুক আমাদের মেয়েটি। আমার শুকতারা – আমার শুকতারা – কাঁদতে কাঁদতে দুজনে মেঝেতে বসে পড়ে। জীবনপ্রদীপ নিভে যায় মধুস্মৃতির।

ডাক্তাররা ওর দুটি কিডনি ও লিভার সংগ্রহ করে। আকাশকে বলে, কালকেই আমরা দুজন রোগীর শরীরে কিডনি প্রতিস্থাপন করব।

আকাশ আর ঊর্মিলা নিশ্চুপ কথা শোনে। বুঝতে পারে কথা বলার সাধ্য ওদের নেই। ভাবে, অন্য শরীরে বেঁচে থাকুক মেয়েটি। এটুকুই সান্তবনা। এখন লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। তারপরে দাফন।

দিন গড়ায়। শূন্যবাড়িতে দিন কাটে দুজনের। এভাবে কাটা তো কাটা নয়। শুধু দিনের হিসাব ফুরিয়ে যায়। বেঁচে থাকার সাধ কমে যায়। ভালোবাসার রেশ নিয়ে রাতের অন্ধকারে দুজনে বসে থাকে। দিনে কাজ থাকে, অফিসে যেতে হয়। যেটুকু ঘুমাতে পারে তাতে শরীর ঠিক থাকে না। মাথায় ঘূর্ণি ওঠে। দুর্বল অনুভব পেয়ে বসে। কেমন করে পার হবে জীবনের বাকি দিন তা ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারে না। একদিন ঊর্মিলা বলে, চলো সেই ছেলেটিকে দেখে আসি, যার শরীরে মধুস্মৃতির কিডনি আছে।

– কোথায় যাব? আমরা তো ওর বাড়ির ঠিকানা জানি না।

– হাসপাতাল থেকে ঠিকানা নেবো।

– তা হতে পারে।

– কালকে আমাদের অফিস ছুটি আছে। কালই চলো।

– আচ্ছা চলো।

– আমার মনে হচ্ছে ওকে দেখলে আমি মধুস্মৃতির ছোঁয়া পাবো। মেয়ে আমার স্মৃতির সমন্তান হয়ে শুধু থাকবে না। ওকে মানুষের আকারে পাওয়া হবে।

– তুমি আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছ। আর কথা বলব না। বারান্দা থেকে ঘুরে আসি।

আকাশ দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। ঊর্মিলাও বেরিয়ে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আকাশকে। ওর পিঠে মাথা রেখে বলে, তোমার বুকের ধুকপুকি শুনব।

– আমার বুকে ধুকপুকি নেই। বন্ধ হয়ে গেছে। আমি তো জীবিত নেই।

– ওহ্, এভাবে কথা বলো না।

রাতের অন্ধকারে পূর্ণিমার চাঁদকে সাক্ষী রেখে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে। আকাশ জোরে জোরে বলে, মেয়েটা আমাদের জীবনের অন্ধকারে এখন পূর্ণিমার আলো।

ঊর্মিলা গুনগুনিয়ে কাঁদে।

পরদিন হাসপাতালে যায় দুজনে। ছেলেটির খোঁজ করার জন্য অফিসে গেলে অফিসার ওদের বসতে বলে। চেয়ারে বসে ঊর্মিলা ব্যাকুল স্বরে বলে, আমরা সেই ছেলেটিকে দেখতে চাই, যার শরীরে আমার মেয়ের কিডনি আছে।

অফিসার একমুহূর্ত চুপ করে থেকে নিচুস্বরে বলে, কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু ছেলেটি সুস্থ হতে পারেনি। গতকাল মারা গেছে।

– মারা গেছে! মারা গেছে!

দুটো শব্দ বলার সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে যায় বুকের ভেতর। ওরা আর কথা খুঁজে পায় না। দুজনে ধাম করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অফিসারকে কোনোকিছু না বলে বেরিয়ে আসে রুম থেকে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকে। ঊর্মিলা বলে, মধুস্মৃতি সবখানে আছে। শুধু মানুষের মধ্যে নেই।

– ও কোথাও নেই। শুধু আমাদের বুকের মধ্যে আছে।

– আমরা চেয়েছিলাম ও কারো শরীরে বেঁচে থাকুক।

আকাশ কথা বলে না। গাড়ির হর্নে মিশে যায় ঊর্মিলার কণ্ঠস্বর। দুজনেরই মনে হয় চোখের পানি ছাড়া ওদের আর কিছু নেই। এটুকু সম্বল নিয়ে জীবনের দিন ফুরাতে হবে। দুজনে হাঁটতে শুরু করে। যেতে হবে শূন্যবাড়িতে। মেয়েটি নেই, আছে স্মৃতির সঞ্চয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: