বাঙালি : কাল, আজ, কাল

লেখক:

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
আজকের বক্তৃতার বিষয় ‘বাঙালি : কাল, আজ, কাল’ একটু হিন্দি সিনেমার টাইটেলের মতো শোনাচ্ছে হয়তো, কিন্তু কিছু করার নেই। বাঙালির অনেক কিছুই ইদানীং একটু হিন্দি-হিন্দি হয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে হিন্দি টেলিসিরিয়াল। আমাদের বাবা-কাকাদের জমানায়, তার মানে তিন, চার, পাঁচের দশকে কেতাদুরস্ত বাঙালি বললে দুধরনের বাঙালি বোঝাত। হয় ধুতি-পাঞ্জাবি-পাম্প শুতে নিপাট বাবুটি, নয়তো চলাফেরা, মেজাজে-মগজে একটা সাহেব-সাহেব কিছু। বাড়ির কাজের লোকরা এঁদেরকে ‘সাহেব’ বলে সম্বোধন করত। এঁরা বাড়ির বারান্দা কিংবা উঠোনে বসে পাড়া দেখিয়ে স্টেটসম্যান কিংবা অমৃতবাজার পত্রিকা পড়তেন। অচেনা কেউ কোনো কথা বলার চেষ্টা করলে এঁদের ঠোঁটের প্রথম শব্দটি হতো ‘ইয়েস?’ যার মানে-মাথা বোঝার জন্য একটু সময় লাগত অচেনার।
বাবা-কাকাদের পর আমাদের দাদারা ও আমরা যে সময়গুলো ভাগ করে নিলাম, মানে, ধরা যাক, পাঁচের দশকের শেষ থেকে ছয়, সাত হয়ে আটের দশকের গোড়া অব্দি, তখন বাঙালি বাবুর ধুতি-পাঞ্জাবি শুকিয়ে পড়েছে, ধুতির জায়গায় এসেছে পাজামা, আর ছয়ের দশকের গোড়া থেকে খেপে খেপে ড্রেনপাইপ, ২৬-২৮ ইঞ্চির ফ্লেয়ার্স কী ডেনিমের জিনস। সাদা পাঞ্জাবির জায়গায় নানা কিসিমের পাঞ্জাবির ঢল নেমেছে, ফলে নিছক পরিধান দিয়ে বাঙালি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাবা-কাকার আমলের মতো বাঙালিকে এখন আর দুটো খোপে ফেলা যাচ্ছে না। বাঙালির চেহারা আর আদব-কায়দায় বেজায় বৈচিত্র্য। তখনও তাঁর সাহেবমনস্কতা যায়নি, কিন্তু তাঁর সাহেবিয়ানা জোগাড় হচ্ছে বিলিতি ছবি দেখে, আগের জমানার বাঙালির মতো কলেজে, অফিসে, ব্যবসাক্ষেত্রে, খেলার মাঠে কী হোটেল-রেস্তোরাঁয় অতো সাহেব দেখার সুযোগ কই তখন? বাবা-কাকার আমলের বাঙালিরা ইংরেজ শাসক বিদেয় করার জন্য লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন। তারপর ইংরেজ চলে যেতে মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন; উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছেন যে, সাহেবের পরিচালনায় বাঙালি এক জিনিস, মাথায় সাহেব না থাকলে আরেক। আমার কাকার মুখে শুনেছি তাঁর অফিসের শেষ ইংরেজ বস তাঁকে ঘটা করে দেওয়া ফেয়ারওয়েলে কজন তৎপর বাঙালি অফিসারকে ডেকে একটা সৎপরামর্শ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোমরা তো দিব্যি কাজের লোক। তো সারাদিনের কাজের পরে মাঠে গিয়ে ফুটবল, হকি পেটালে তো পারো। তা না ইউনিয়ন ঘরে বসে কী গুলতানি করো?
যাদের উদ্দেশে সাহেবের এই নিদান তাদের ওই ট্র্যাডিশনই আমরা আমাদের সময়ে অফিস-কাছারিতে বহতা দেখলাম। আমি কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে থাকতে ইংরেজি ডিকশনারিতে বাঙালির এক অবদান যোগ হতে দেখলাম – ঘেরাও! রাজনীতির মহল্লার এই শব্দটা একসময় এক সমাজবাস্তবিক চেহারা নিয়েছিল। যেসব কোম্পানির অফিসাররা মাঝে-মাঝে ঘেরাও হতেন তাঁদের একটা স্টেটাস তৈরি হতো। কোম্পানির খুব আদরের লোক হতেন তাঁরা, বেশি রাতে গাড়ি করে ফিরে তাঁরা অনেকখানি সময় নিতেন ঘরে ঢুকতে, কারণ পড়শিরা তো জানলার শার্সি ফাঁক করে তাঁকেই দেখছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক গল্পে আছে, বাড়ির বউদের এক আড্ডায় একটি বউ বড্ড কষ্টে থাকে, কারণ অন্যরা গেয়ে যায় তাদের কর্তারা কবে কঘণ্টা ঘেরাও হয়ে অফিসে আটকে ছিল। আর ওর কর্তাটা ঘেরাও হওয়ার স্টেটাসেই পৌঁছল না! কর্তার ঘেরাও নিয়ে রস করে বলার একটা সুযোগই এলো না!
আমরা আসলে সেই প্রজন্ম যারা বাঙালির সাহেবিয়ানার শেষ প্রহরগুলো চাক্ষুষ করেছি। আমার নিজের একটা স্মৃতি এ-প্রসঙ্গে কাজে লাগাতে পারি। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সেইসব নি®প্রদীপের দিনে অধুনালুপ্ত হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় যোগ দিয়েছি। চাকরি পেয়ে লায়েক হয়ে যে-দীর্ঘলালিত বাসনাগুলো মেটানোয় তৎপর হয়েছিলাম তার একটা হলো মর্নিং শিফট শেষ করে লাঞ্চ আওয়ারে অফিসের হাতার মধ্যে অ্যাম্বার রেস্তোরাঁর একতলার বার-এর এক কোণে বিয়রসহযোগে মধ্যাহ্নভোজ ও তর্কে লিপ্ত কিছু বাঙালিকে চোখে দেখা ও কানে শোনা, যে-বাঙালিরা ইংরেজ গ্র্যামারিয়ন নেসফিল্ড সাহেবের মতো বলে উঠতে পারতেনই ‘My tongue is grammar’, লম্বা লম্বা উত্তর-সম্পাদকীয় অথবা মাপা দৈর্ঘ্যরে সম্পাদকীয় লিখে এঁরা এই দুপুরবেলা ওখানে জমায়েত হতেন। সে-সময় বুদ্ধিজীবী শব্দটার এতখানি চল হয়নি, আর যেটুকু তার ব্যবহার ছিল তা এই ধরনের বাঙালিদের সম্পর্কেই, যাঁরা সাহেবদের সঙ্গে লড়ে ইংরেজি শিখতে পারতেন। এঁদের একজন, নিরঞ্জন মজুমদার, একফাঁকে এক অনবদ্য রম্যগদ্য ‘শীতে উপেক্ষিত’ লিখে বাঙালির মানসপটে দার্জিলিংয়ের এক অপরূপ ছবি এঁকে দিয়েছিলেন। শীতের দুপুরে টুইডের স্যুটে নিরঞ্জনকে। যিনি বই লিখেছিলেন রঞ্জন নামে আর সাহেবি চালে যাঁকে ডাকাও হতো নাইরঞ্জন বলে। দেখে তো প্রথমে ভাবতেই পারিনি এঁরই হাত গলে ওই বাংলা গদ্য। আজকে যাঁর স্মরণে এই সভা সেই বিক্রমণ নায়ার কিন্তু বিশেষ উৎসাহ দেখাতেন না ওই তুমুল ইংরেজিয়ানার বাঙালিদের কাছে ঘেঁষতে। কারণ চোস্ত ইংরেজি লেখা ও বলার পাশাপাশি নায়ার তখন বাংলা ভাষায় লেখার জন্য উদ্গ্রীব। এর আঠারো-কুড়ি বছরের মধ্যে দু-দুখানি অপূর্ব বই ছাড়া অজস্র বাংলা প্রবন্ধ-নিবন্ধ-প্রতিবেদন লিখে ফেললেন যা ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটার এক আমূল গোত্রান্তর ঘটিয়ে দিলো। নায়ারের স্বপ্ন ছিল বাংলায় তাঁর আত্মজীবনী লিখে যাবেন, যা তাঁর অকালপ্রয়াণে না-লেখা থেকে গেল। কিন্তু সাতের দশকের এই গোড়ায় বিধাতার আনুকূল্যে আমি বেশকিছু সাহেব-বাঙালি আর এক জাগ্রত অবাঙালির মধ্যিখানে নিলম্বিত হয়ে বাঙালিজীবনের এক নিটোল অবস্থান্তর, পরিবৃত্তি, Transition- এর সাক্ষী হতে পারলাম। আজকে তিন পর্বের বাঙালি নিয়ে বলার অনুপ্রেরণা মূলত সেইসব বাল্য, কৈশোর, যৌবন, মধ্যবয়স ও প্রৌঢ়ত্বের স্মৃতি। বাঙালি নিয়ে তর্ক করার জন্য স্মৃতির চেয়ে বড় যুক্তিসম্পদ কিছু নেই। আর নায়ার আমাকে এক অদ্ভুত কথা বুঝিয়েছিলেন ১৯৭৩-এ আমার প্রথম উপন্যাস এই আমি একা অন্য বেরুবার পর। বলেছিলেন, বইপড়া ভালো কেন জানো? তাতে নিজের স্মৃতিকে বুঝতে সুবিধে হয়।
সাদা বাংলায় যাকে বলে ঢিলেমি, তা বাঙালি চেহারা-চরিত্র ও আদব-কায়দায় ক্রমশ ঢুকতে শুরু করে আমাদের সময়েই। পাঁচের দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন রুপোলি পর্দায় হাফহাতা শার্ট ও ধুতিতে উত্তমকুমারের মধ্যে আমরা আদর্শবান, মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবাকে শনাক্ত করছি সেই তখনই নকল করা শুরু করছি কিন্তু তাঁর ঘাড়ের কাছে চুলের ইউ ছাঁট, মক্শ করছি তাঁর রোমান্টিক সংলাপ বলার ধরন-ধারণ। চোখের সামনে দেখেছি কী দ্রুততায় পাঁচের দশকের শেষ পাদ থেকে ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অফিসযাত্রী বাঙালি বাবু ধুতি-পাঞ্জাবি ছেড়ে প্যান্ট-শার্টে ভর করলেন। ইংরেজি করে বললে by leaps and bounds. বদলটা এমন বহরে হলো যে, ১৯৭১-এ হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামে জেলখাটা বাঙালি অধ্যুষিত কাগজেও ধুতি-পাঞ্জাবির বাবুরা কম পড়তে শুরু করেছেন। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যে আমিই মাঝেমাঝে ধুতি-পাঞ্জাবি পরতাম এবং টিপন্নী শুনতাম, ‘এসব পরলে কি মেয়েরা বসিয়ে গান শোনায়?’
মোটামুটি তিনটে সময়ের কথা বলব বলে শুরু করেছি। তিন নম্বর সময়ের ঈষৎ আদল ছুঁয়ে ভেতরের কথায় যাব বলে ভাবছি। তিন নম্বর সময়, যেটা আটের দশকের গোড়ায় গোড়ায় শুরু হলো, তাদের কিছুটা অপবাদ দেওয়ার চল আছে আমাদের প্রজন্মের মধ্যে। শুনি এরা নাকি airdropped, শূন্য থেকে পড়া প্রজন্ম। এরা SMS-এ রোমান হরফে দু’চার শব্দ বাংলা দিয়ে প্রেম করে, একটা গোটা প্রেমের চিঠি লিখতে শেখেনি, তিন-চারটে ব-কারান্ত শব্দ দিয়ে মনের সমস্ত অনুভূতি ব্যক্ত করে। এদের একটি শব্দ ‘ব্যাপক’ (ব্যাপক খেলাম), আরেকটি ‘বিশাল’ (বিশাল বকছিল, মাইরি), অন্যটি বেকার (বেকার বেকার পড়ে যাচ্ছি) … এই আর কি! আমরা, মানে দুনম্বর সময়ের বাঙালিরা, কিন্তু সন্তর্পণে এড়িয়ে যাই যে সাতের দশকের শেষ থেকে আমাদেরই চোখের সামনে, আমাদেরই অবহেলায় একটু-একটু করে আমাদের জীবন থেকে সরে গেছে বাংলা সিনেমা, বাংলা গান, বাংলা নাটক, বাংলার ফুটবল, বাংলার সাহিত্য, বাংলা ভাষার ছিরি-ছাঁদ-বুলি। পাঁচের দশকে বোম্বের সিনেমা মহলে বাঙালির চাঁদের হাট। বিমল রায়ের বন্দিনী ছবি দেখতে-দেখতে চোখ মুছছি আর কেবলই ভাবছি, এ তো হিন্দি ভাষায় বাংলা ছবি। জরাসন্ধের কাহিনি, শচীনদেব বর্মণের নিজের করা ভাটিয়ালি সুরে নিজের গান ‘ওরে মাঝি, মেরা সাজন হ্যায় উস পার, লে যা পার’, আর সেই গানের দৃশ্যে যে-বিভ্রান্ত, ট্র্যাজিক নায়িকা নূতন, কে বলার তিনি বাঙালি নন? কিংবা সুবোধ ঘোষের গল্প নিয়ে বিমল রায়ের আরেক ছবি সুজাতা। সেখানেও শচীনদেবের সুরে নায়ক সুনীল দত্ত গাইছেন টেলিফোনে ‘জ্বলতে হ্যায় জিসকে লিয়ে’, যাতে বাঙালির প্রিয় কাফি রাগের ছায়া আর রবীন্দ্রনাথের গানের মূর্ছনা। বোম্বাইয়ে পাকাপাকিভাবে বসত গেড়ে বিমলবাবু আরো নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরছেন বাংলার সুর, ডুব দিচ্ছেন বাংলার কথাসরিৎসাগরে। এই ট্র্যাডিশনেরই শেষ ছবিগুলোর মধ্যে ধরতে পারি শক্তি সামন্তর আরাধনা, অমর প্রেম, ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের আনন্দ কী অভিমানকে। কিন্তু এত অবলীলায় আমাদের চলচ্চিত্রকাররা বাংলা ছবি থেকেই বাঙালিয়ানা মুছে হিন্দি ছবির বিনোদনকে প্রশ্রয় যে দিতে পারলেন এবং এত অল্প সময়ে এর প্রধান কৃতিত্ব বাঙালি দর্শকের। না হলে আজো দক্ষিণ ভারতে দক্ষিণি ছবির ভাত মারতে পারেনি বলিউড, সেখানে বাংলা ছবি, বাংলা গান তো আগ বাড়িয়ে আত্মসমর্পণ করেছে। এই খাল কেটে কুমির আনার কাজটা করেছি দুনম্বর সময়কালের আমরা। আমরাই সম্ভবত সেই ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ বাঙালি। যাঁরা রবিশঙ্কর-বিলায়েৎ-আলি আকবরের উত্থান দেখেছি, সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের ছবি দেখে তর্ক জুড়েছি, জর্জ, হেমন্ত, কণিকা, সুচিত্রার গান আর শম্ভু-উৎপল-অজিতেশের নাটকের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি, চুনি-পিকে-বলরামের জন্য মাঠে গলা ফাটিয়েছি, কিন্তু প্রৌঢ়ত্বে প্রবেশ করতে করতে টেরও পেয়েছি যে, নতুন প্রজন্মকে আমরা হাতে ধরে দিয়ে গেছি শুধু ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাক্রম, হিন্দি সোপ, ইনফরমেশন টেকনোলজি, ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং, কপি গান (এরা পরে তাতে ব্যান্ড যোগ করে নিয়েছে), জে কে রওলিং (পড়–ন হ্যারি পটার), জেফ্রি আর্চার, ড্যানিয়েল স্টিল, বছরে ৩৫০ দিনের ক্রিকেট, এক লাখ টাকা মাইনের চাকরি দিয়ে জীবন শুরুর অর্থনীতি এবং ১২ ঘণ্টার চাকরি ও ছ-ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ন্যস্ত থাকার লাইফস্টাইল। ওদের বাঙালি হয়ে জন্মাতে দিয়েছি, বাঙালি হয়ে ওঠার সময় ও সুযোগ তেমন দিইনি।

দুই
এই যে এখন আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে, এই সময় একটা প্রশ্ন নিজেকে করতে ইচ্ছে করছে যা গত কয়েক দিন ধরে মনের মধ্যে চলছে। প্রশ্নটা হলো, আমার বয়েসি আমরা, যাদের দুনম্বর সময়ের লোক বলেছি, তারা আগের বাঙালি আর পরের বাঙালির মধ্যে নিজেদের কতখানি দেখি, তাঁদের সঙ্গে নিজেদের কতটা মেলাই, মিলিয়ে কতটা সুখ আর কতটা দুঃখ বোধ করি। আরও স্পষ্ট ও দর্শনীয় করে বলতে : স্বাধীনতা সবে হয়েছে, ১০-১২ বছর হলো রবীন্দ্রনাথ নেই, সাত-আট বছর হলো কাজী নজরুল মস্তিষ্ক হারিয়েছেন, এই সেদিন দেহরক্ষা করলেন শ্রী অরবিন্দ, চলে গেলেন বিভূতিভূষণ, তুমুল রহস্য বিস্তার হলো শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণে, বাঙালির বুকের মধ্যে একটা বিভেদ রেখা গড়ে দিয়েছে বঙ্গভঙ্গ আর তা রুখতে যে হিন্দু মহাসভা লড়াই করে হারল আর এক নতুন অবতার সৃষ্টির হলো জনসঙ্গে, আমার পিতা বঙ্কিমচন্দ্র ভট্টাচার্য, যিনি ও নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাসভার যুগ্ম সহসভাপতি ছিলেন, তিনি জনসঙ্গে না গিয়ে বামপন্থী সমর্থিত হয়ে স্বাধীনভাবে ১৯৫২-র লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ালেন। শেষ রাউন্ড শুরুতে চার হাজার ভোটে মেটিয়াবুরুজ কেন্দ্রে এগিয়ে থাকা বাবাকে ব্যালট বাক্স ভাঙচুর করে হারানো হলো বারোশো ভোটে। অভিমানী বাবা রাগে, দুঃখে গলায় গামছা কষে আত্মহত্যা করতে গেছিলেন। এর এক বছর পর বিশ্বকর্মা পূজার দিন চোখে ঘুড়ি ঢুকে আমার বাঁ-চোখের দৃষ্টি চলে যায়। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আমাকে কোলে বসিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, সাহেব, তুমি পড়বে, না গান করবে? তোমার যেটা করতে ইচ্ছে করে তুমি বলো। আমি এখনও জানি না একটা চোখে কতটা কী করা যায়, তবুও বলেছিলাম, আমি পড়ব, বাবা। ব্যস, ওইটুকুরই অপেক্ষায় ছিলেন বাবা। এরপর মাত্র দুবছর বেঁচেছিলেন। কোর্টে মামলা লড়ে এসে, ফাইলপত্র আর অজস্র বই পড়ার ফাঁকে আমাকে পড়াতে বসতেন। পড়ানো হতো একটু-একটু ইতিহাস, আর অনেকটা-অনেকটা ইংরেজি। বলতেন, ইংরেজি শিখতে হয়, বাংলা শেখা হয়ে যায়। ইতিহাস বলতে নেপোলিয়ন, জুলিয়াস সিজার, হ্যানিরাল আর ইংরেজি বলতে বায়রনের ‘রোল অন, রোল অন, দাও ডার্ক অ্যান্ড ডিপ ব্লু ওশন রোল।’ ভাবুন সাত-আট বছরের ছেলের মগজের ওপর কী চলছে! যার শিখর মুহূর্ত হলো ১৯৫৫-র জুন মাসে দার্জিলিংয়ের ম্যালে দাঁড়িয়ে সূর্যডোবা দেখতে-দেখতে আমাকে আর মাকে শোনাচ্ছেন স্বামী বিবেকানন্দের ইংরেজি কবিতা ‘কালী দ্য মাদার’। এর কিছুদিন পর অগস্টে, বই অন্ত্যপ্রাণ বাবা প্রথম দেখলাম বাড়ির সবাইকে বিভূতিবাবুর বই নিয়ে করা তাঁর কথায় এক নতুন ছেলের ‘বায়োস্কোপ’ দেখাতে উদ্যোগী হচ্ছেন। পথের পাঁচালী। তারপর ডিসেম্বর মাসে সেরেব্রাল স্ট্রোকে এক অদ্ভুত আনন্দের সময়ে ইতি টেনে দিচ্ছেন।
বাবার কথা বললাম বটে, তবে এটা পাঁচের দশকের প্রথম ভাগের বাঙালির গর্বিত মুখচ্ছবি। তখনও পিলপিল করে রিফিউজি আসছে পূর্ববঙ্গ থেকে, অভাব বাড়িতে-বাড়িতে, তবু বাবা-কাকা-জ্যাঠা, মা-মাসি-মামির মুখের হাসিতে টান নেই। পায়ে বুট জোটেনি, তবু খালি পায়ে ১৯৪৮-এ লন্ডন অলিম্পিকে ফুটবল খেলে এসেছেন শৈলেন মান্না। বাঙালির মেধার কীর্তন সর্বক্ষণ বাড়িতে, স্কুলে, ক্লাবে, মিটিংয়ে… কথায়-কথায় উদাহরণ আসে সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহার! এ হচ্ছে আমার জীবনে দেখা সেই Bengal Shiningমুহূর্ত। এক অদ্ভুত ট্রাম অ্যাক্সিডেন্টে জীবনানন্দ দাশের মতো কখন যে সময়টা কাটা পড়ল টের পেতে-পেতে আমি কিংবা আমার মতো আমরা স্কুল পাস করে কলেজে ঢুকে শুনছি আমাদের প্রিয় কলকাতা শহর নাকি City of Nightmares. দুঃস্বপ্নের নগরী।
আশ্চর্য! আমরা যারা দেশবিভাগ দেখিনি তারা আর কী দুঃস্বপ্নের কথা ভাববো? আর্থিক টানাটানি বাড়ছিল সে তো নিত্যদিন চোখে পড়ছিল, ম্যাট্রিক-আইএ-বিএ পাস দিয়ে বাড়ি বসে থাকা ছেলের সংখ্যা বাড়ছিল, গয়না বন্ধক দিয়ে সংসার চালানো, বাড়িভাড়া মেটানোর একটা রেওয়াজ হচ্ছিল, চায়ের দোকানে উত্তম-সুচিত্রা, হেমন্ত-সন্ধ্যা নিয়ে বাতচিতের ফাঁকে উঠে আসছিল একটি সরকারি অফিসের হালহকিকত – – Employment Exchange, এক পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে নখানা ট্রাম পোড়ানোর একই সঙ্গে বাঙালির Muscle power ও খ্যাপামির প্রসঙ্গও উঠে আসছিল যখন-তখন। তাই বলে কলকাতাকে দুঃস্বপ্নের নগরী আমরা দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি কখনও। তাই এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে আমারই বলা প্রশ্নের উত্তর জোগাতে আমি যখন পেছনের দিকে তাকাই ঠিক অনুরূপ এক বিপন্নতা বোধ করি, যা আগামীর দিকে তাকিয়ে তিন নম্বর সময়ের বাঙালির জীবনচিত্র দেখে অনুভব করি। জানতে ইচ্ছে করে, ঠিক কেন আমরা অত তোড়জোড় করেছিলাম, গতকালের বাঙালির থেকে বিচ্ছিন্ন হতে, স্বাধীন হতে? আর কেনই-বা আমাদের পরের বাঙালিরা অত হুটোপুটি করে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল।
আমার মতো দুনম্বর সময়ের বাঙালির কতকগুলো ঘরোয়া চায়ের আড্ডার ব্যাখ্যা আছে এইসব বিচ্ছিন্নতার। যেমন দেশ বিভাগে এই বঙ্গে এসেপড়া উদ্বাস্তু মানুষই বাঙালির বামপন্থী আন্দোলন জোরদার করেছে। তারা যুক্তি হিসেবে ঋত্বিকের ছবিগুলোর দিকে আঙুল দেখায়। তারা মনে করে, ছয়ের দশকের অন্তে নকশাল আন্দোলনই আমাদের বাবা-কাকার আমল থেকে আমাদের বিচ্ছিন্নতাকে সম্পূর্ণ করল। আমার এক নকশাল বন্ধুর মতে, বাঙালি যুবা ওই প্রথম নিজের পায়ে দাঁড়াল। এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত ধারণায় আনতে পারল ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’ কথাটায় কী ছবি ধরা থাকতে পারে।
আমাদের পরের প্রজন্মের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা আনল বলতে গেলে আর্থিক উন্নতি, যার পূর্বগামী দুই ঘটনা ও সংকেতও দুই প্রসিদ্ধ ভাঙনে – সোভিয়েতের ভেঙেপড়া এবং বার্লিন প্রাচীর ধ্বংস, আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, এই ম্যাক্স মুলার ভবনেরই এক সেমিনারে বিষয় : – জার্মান জগৎ – বছর বারো আগে বলেছিলাম যে, পূর্ব বাংলা থেকে উঠে আসা আমাদেরও একসময় ডাকা হতো জার্মান বলে। সেটা আমরা দেশখোয়ানো মানুষ বলে না স্বভাবে গোঁয়ার বলে তা বলতে পারব না। তবে এই ধরনের মানুষের মধ্যে ‘ভিটেমাটি’ কথাটা ঘুরে-ঘুরে আসত। প্রথম আলাপে নামধাম জানার আগেই এদের জিজ্ঞাস্য হতো, ‘কোথায় থাকা হয়?’ আমার মেজমামা খুলনা থেকে বছরে বার তিনেক কলকাতায় আমাদের বাড়িতে এসে উঠতেন মেয়েদের জন্যে মনের মতো পাত্র খুঁজতে। অনেক ভালো চাকুরে পাত্র তিনি নামঞ্জুর করতেন, তাদের নিজস্ব বসতবাড়ি ছিল না বলে। স্কুলপড়–য়া আমাকে একবার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ‘মনা, চাকরি খুঁজলে পাওয়া যায়। উঠোনবাড়ি কি এমনি-এমনি হয়?’ উঠোনবাড়ি বলতে তিনি গোটাবাড়ি বুঝিয়েছিলেন, ফ্ল্যাটবাড়ির থেকে আলাদা করতে। তখন তো ফ্ল্যাট কেনায় আসত না, শুধু ভাড়ায় আসত।
আমাদের পরের প্রজন্মের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা আরওই মর্মান্তিক কারণ ওদের জীবনের সাফল্যের সঙ্গে এ-শহর, এ-রাজ্য, এ-দেশত্যাগের একটা ঘটনা জড়িয়ে যাচ্ছে। কাউকে যেই-না বললেন, ‘আমার পুত্রটি তো মস্ত চাকরিতে এখন’, সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে, ‘কোন দেশে আছে ও?’ সন্তানাদির সাফল্য উপভোগ করার মতো প্রৌঢ়ত্ব বা বার্ধক্য নেই আর আমাদের এখন, বাড়ি বসে টেলিফোনের অপেক্ষা ছেলে বা মেয়ের কখন ফোন আসে। বিলম্ব হলে আশঙ্কা, ভালো আছে তো? আর এইখানেই আমরা পূর্বেকার বাবা-কাকা-মা-মাসির মতোই বাঙালি থেকে গেলাম। ভিটেমাটির মতো সন্তানকেও পুঁজি করে বুকে আঁকড়ে ধরে আছি। ফোনে একটু কণ্ঠস্বর আর ই-মেইলে একটু পযধঃ করে সংসার করছি আমরা। আমেরিকায় মেয়ের হোস্টেলে গিয়ে পড়তে, কবছর আগে, ওর অবাঙালি বন্ধুরা তো বিলকুল অবাক। ভাবখানা এমন – ওঁরা অত দূর থেকে চলে এলেন শুধু তোমায় দেখতে? আরও অন্তর্লীন ভাবনাখানা এমন – এ তো বেজায় নজরদারি!
দুনম্বর সময়ের আমরা যারা পরিবার ছেড়ে আলাদা হয়ে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির রেওয়াজ চালু করেছিলাম তারাই এখন প্রৌঢ়ত্বে ও বার্ধক্যে এসে এক সুপরিণত দাম্পত্যের নির্মম নির্জনতায় নিক্ষিপ্ত হচ্ছি মাঝেমাঝেই। এ কোনো নিতান্ত সমাপতন নয় যে, বছর চারেক আগের শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় তিন তিনটি আধুনিক বাংলা গল্প প্রকাশিত হলো যাদের বিষয় একটাই। অগ্নিমিত্র, শেখর বসু ও রমানাথ রায়ের সেই গল্পে তিন বৃদ্ধ দম্পতির দৈনন্দিন জীবনের অংশ তুলে ধরা আছে, যে-অংশগুলোই তাঁদের জীবনের গোটা ছবি। প্রবাসী সন্তানের ফোনের অপেক্ষা, সে-ফোনের আসা, না-আসার ওপর তাঁদের মর্যাদার নির্ভরতা, তাঁদের দিনের স্বস্তি, রাতের উৎকণ্ঠা। সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার এক ক্লাবে দৈবাৎ বসেছিলাম এক টেবিলে যেখানে সব্বারই তাড়া কোনোমতে দুপেগ খেয়ে বাড়ি ফেরার। ছেলেমেয়ের ফোন ধরতে হবে। তখন মনে আসছিল রবীন্দ্রনাথের একটা চিঠি, স্ত্রী মৃণালিনীকে লেখা, কন্যা বেলাকে মজঃফরপুরে শ্বশুরবাড়িতে রেখে এসে ১৯০১ সালের ২০ জুলাই শান্তিনিকেতন থেকে তাতে লিখছেন :
ছেলেমেয়েদের সম্বন্ধে নিজের সুখ দুঃখ একেবারেই বিস্মৃত হওয়া উচিত। তারা আমাদের সুখের জন্যে হয়নি। তাদের মঙ্গল এবং তাদের জীবনের সার্থকতাই আমাদের একমাত্র সুখ। কাল সমস্তক্ষণ বেলার শৈশবস্মৃতি আমার মনে পড়ছিল। তাকে কত যতেœ আমি নিজের হাতে মানুষ করেছিলুম। তখন সে তাকিয়াগুলোর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে কি রকম দৌরাত্ম্য করত – সমবয়সী ছোট ছেলে পেলেই কি রকম হুঙ্কার দিয়ে তার উপর গিয়ে পড়ত – কি রকম লোভী অথচ ভালোমানুষ ছিল – আমি ওকে নিজে পার্কস্ট্রীটের বাড়িতে øান করিয়ে দিতুম – দার্জিলিঙে রাত্রে উঠিয়ে উঠিয়ে দুধ গরম করে খাওয়াতুম – যে সময় ওর প্রতি সেই প্রথম øেহের সঞ্চার হয়েছিল সেইসব কথা বারবার মনে উদয় হয়। কিন্তু সেসব কথা ও তো জানে না – না জানাই ভাল। বিনা কষ্টে ওর নতুন ঘরকন্নার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নিজের জীবনকে ভক্তিতে প্রেমে øেহে সাংসারিক কর্ত্তব্যে পরিপূর্ণতা দান করুক। আমরা যেন মনে কোন খেদ না রাখি!
আমাদের পরের বাঙালিকে শুধু রুজি, শুধু ভবিষ্যতের জন্যই যে বাবা-মায়ের গোছানো সংসার, দুবেলার সাজানো পাত্র, পরিচিত পরিমণ্ডল, বাঁধা আড্ডা ছাড়তে হলো তা নয়। তাকে প্রমাণ দিতে হচ্ছিল সে বাঙালি ছাড়াও আরো কিছু। আরও কিছুটা যে কী সে নিজেও জানে না। চিন্তা-ভাবনা-সত্তার একটা নিটোল ছক ভেঙে তাকে বেরুতে হচ্ছে, যার বাইরে গোটা দেশ-দুনিয়ার মুখগুলি যেন ক্রমবিবর্তমান এক অনন্ত মুখোশ। সেখানে ভারতীয় নেই, চীনা, জাপানি, ফরাসি, ইংরেজ, মার্কিন, জার্মান নেই… কাজের ধরন, রকম, বাজারমূল্য ও গুণাগুণ দিয়ে একটা পরিচয় দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, বাঙালি পরিচয়টা সেখানে একাধিক পরিচিতির একটি ভিন্ন বর্গমাত্র। পরিচয়ের এই খোলা জমি নিয়ে এক অপূর্ব আলোচনা আছে এখনকার এক সেরা বাঙালি মস্তিষ্ক অমর্ত্য সেনের আইডেন্টিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স বইয়ের ‘মেকিং সেন্স অব আইডেন্টিটি’ পরিচ্ছেদে। সেই যুক্তি ভাঙিয়ে এমন একটি বর্গীকরণ করা একেবারেই অসংগত নয়, যেখানে আমরা লন্ডনের রাস্তায় এমন একজন যুবকের সাক্ষাৎ পাচ্ছি – যার জন্ম ও বড় হওয়া কলকাতায়, তার পিতা-মাতা ঢাকার, অধুনা বাংলাদেশের, তার এখনকার নাগরিকত্ব ব্রিটেনের, তার পড়াশোনার শেষটুকু অক্সফোর্ডে, বাড়িতে সে আজো বাংলা বলে, সপ্তায় একদিন নিজের হাতে মাছভাত রেঁধে খায়, অফিসে ইংরেজ বসের সঙ্গে ঝগড়া হলে বিড়বিড় করে বাংলায় তার মুণ্ডপাত করে, প্রচুর কাজের টেনশনে পড়লে রাতে সুবিনয় রায়ের রবীন্দ্রসংগীত, শচীন কর্তার পল্লীগীতি, হেমন্ত-গীতার আধুনিক শোনে, ফিবছর বাড়িতে নিজের জন্মদিনের পার্টিতে তুলসী চক্রবর্তীর সাড়ে চুয়াত্তর ও পরশ পাথর ছবি দেখে এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, ঈশ্বর বলে যদি সত্যিই কোনো শক্তি থেকে থাকেন তবে তাঁর মন ও মুখের ভাষা বাংলা! এবার আপনি এর সঙ্গে আরো কিছু বর্গ যোগ করুন… যুবকটি অবসর সময়ে শেয়ার খেলে, সে দাবায় পটু, সচীন টেন্ডুলকারের ভক্ত, রিরোকে শ্রেষ্ঠ কবি জ্ঞান করে এবং নিজের ইংরেজির ধার বাড়াতে জীবনানন্দ অনুবাদ করে ইংরেজিতে। কোনো পরিচয়টাই কিন্তু অন্য কোনো পরিচয়কে খারিজ করছে না, শুধু এই বিশেষ যুবকের নানা পরিচয়ের যে বর্গ আমি সযতেœ উপস্থাপন করলাম এর মধ্যে সূক্ষ্ম, ফল্গুধারায় বয়ে চলেছে একটা শিকড়ের টান। বিদেশ-বিভুঁইয়ে বসবাস, ব্রিটিশ পাসপোর্ট, অক্সফোর্ড, শিক্ষা, সাহেবদের সঙ্গে চাকরি, দিনে ১২ ঘণ্টা ইংরেজি বলা ও চর্চা, হয়তো কোনো ইংরেজ ললনার সঙ্গে প্রণয় এবং জীবনযাত্রার টানাপড়েনের যাবতীয় সন্ত্রাস যে অযান্ত্রিক, স্বভাববাঙালিয়ানাকে মুছে দিতে পারছে না। সুযোগটা পেলাম বলে এখানে একটু বলে নিই – পূর্ব বাংলার পেডিগ্রি তো, বাবা-কাকা জার্মান বলে টিটকিরি শুনেছেন, সে কি সহজে বাঙালিজীবনে ইস্তফা দেয়! কথাটা ডক্টর জনসনের, বলেছিলেন লন্ডন শহর নিয়ে : If you are tired of London you are tired of life. ১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে লন্ডন থেকে অক্সফোর্ড গিয়েছিলাম শান্তিদেব ঘোষ, তারাপদ মুখোপাধ্যায় ও ওঁর স্ত্রী এমার সঙ্গে। সেখানে শান্তিদেবের গান, আয়োজনায় ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী ও দার্শনিক বিমলকৃষ্ণ মতিলাল। আমাদের মধ্যাহ্নভোজ ছিল বিমলকৃষ্ণর বাড়িতে। আমি তো তাজ্জব! সারাবাড়ি সংস্কৃত ও বাংলা বইয়ে ভরে রেখে বাথরুমে লক্ষ্মীবিলাস তেল, মার্গো সাবান, নিম টুথপেস্ট। জয়নগর মজিলপুরের ছেলে সাহেবদের সেরা শাস্ত্রপীঠে দিব্যি এক টুকরো বাংলা সাজিয়ে বসে আছেন। এক ফাঁকে আমি কী নজর করেছি বলতে ওঁর স্বভাবমতো লাজুক হেসে বললেন, দেশ ছেড়ে কোথায় যাব? দেশ সঙ্গে করেই আছি।
রবীন্দ্রনাথের গানের কথায় বলি : দুখের কথা তোমায় বলিব না। কাল, আজ ও কালকের বাঙালি প্রসঙ্গে এবার সামান্য রসকথায় আসি। তত্ত্ব করে কতটুকুই বা ধরা যাচ্ছে? আজকে যে-বিক্রম নায়ারের স্মৃতিতে সভা তাঁর একটা মন্তব্য খুব মনে আসছে এখন। একসঙ্গে বম্বে যাচ্ছিলাম বেড়াতে বোম্বে মেলে। এ-কথা, ও-কথার মধ্যে নায়ার বললেন, আবার কলকাতা ফিরবে কেন? এখানে থেকে গেলেই তো পারো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেই হলো, হঠাৎ? এখানে থাকতে যাব কেন? হাসতে হাসতে নায়ার বললেন, বাঙালি খুব ভালো Export material .কথাটা খুব মিথ্যে বলেননি নায়ার। ইংরেজ বিদেয় করে আমাদের বাবা-কাকারা যেমন টের পেয়েছিলেন ইংরেজের তদারকিতে বাঙালি একরকম, নিজের পরিচালনায় আরেক জিনিস, তেমনি বহির্বঙ্গে এবং বহির্ভারতে কৃতী বাঙালির যে-আধিক্য দেখি তাই কীরকম সংকীর্ণ হয়ে যায় নিজের ঘাঁটিতে। কেবল মীর জাফরের ওপর দোষ দিয়ে লাভ নেই, বাঙালি কোনোকালেই বাঙালির ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। অ্যানেকডোট আছে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর স্বল্পকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ গেছেন একটি সেতুর উদ্বোধনে। শুনছেন বাঙালি ইঞ্জিনিয়াররা গর্বের সঙ্গে দাবি করছেন, স্যার, এ-ব্রিজ সম্পূর্ণ আমাদের তৈরি। আর ততোই তাঁর তলব, মাথার ওপর সায়েবরা ছ্যালো তো? তাতে তাঁরা একটু উদ্বিগ্ন হয়ে দাবি আরো জোর করেন, না, না, স্যার, এ বিলকুল আমাদের কাজ। তাতে প্রফুল্লবাবুর উৎকণ্ঠা আরও বাড়ে; বোঝলাম, বোঝলাম, তোমারই কোরেসো। তবে মাথার ওপর সায়েব ছ্যালো তো? ভয়টা এই যে সাহেব না থাকলে বাঙালিরা কি ঠিক-ঠিক কাজ করে দেখায়?
সাহেব-বাঙালি সমীকরণে আরেকটা কথাও মনে আসছে – বিবেকানন্দের। বেজায় ধমক দিয়ে বলেছিলেন, তোরা একটা আলপিন বানাতে পারিস না, তোরা আবার ইংরেজের নিন্দে করিস!
এসব কথা অজানা ছিল না নায়ার যখন উস্কোচ্ছেন আমাকে বাইরে পাড়ি দিতে। আর উস্কোচ্ছেন কে? না, যিনি বাংলা ও রবীন্দ্রনাথের টানে সুদূর থেকে কেরল সেই পাঁচের দশকে শান্তিনিকেতনে পড়তে চলে এসেছিলেন। যা হোক, সেই রেলযাত্রায় ভাবুকের মতো এক সময় বললেন, যে-বাঙালিরা দেশ ছেড়ে যায় তারাই যে Better বাঙালি হবে তা তো হতে পারে না। ভালোগুলো যারা পড়ে থাকে, তারা কী হয়? মনে আছে খুব বিজ্ঞের মতো একটা সমাধান জুগিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন, কী আর হবে? বাঙালি হয়ে যায়!
৩৮ বছর আগে এক রেলযাত্রায় প্রায় দায়সারাভাবে বলা কথাটাই আজকে ফের এক অদ্ভুত সারবত্তা নিয়ে ফিরে আসছে। বাঙালি বাঙালি হয়ে যায়, কেন বলেছিলাম সেদিন? তার মানে বাঙালি থাকতে চাওয়া একটা নির্বাচন, পছন্দ, choice? বাঙালি হয়ে জন্মানো একটা ঘটনা ঠিকই, হয়তো এককালের মতো ততোটা বগলবাজানোর মতো ঘটনা নয়, কিন্তু বাঙালি থেকে যাওয়া, বাঙালি হয়ে ওঠা, কিংবা বাঙালিত্ব থেকে সরে যাওয়া এইসব পরিচিতি নির্বাচন, choice of identity রফবহঃরঃু হয়ে হঠাৎ কেন যুগসমস্যার মতো সারাক্ষণ চোখের সামনে ভেসে উঠছে? একটা কারণ হয়তো এই যে ৯/১১-র পর জগৎজুড়ে একটা মস্ত সমস্যার আকার নিয়েছে মানুষের পরিচয় ও পরিচিতি। শুধু পরিচয় বা শুধু পরিচিতি বললে হচ্ছে না, শব্দ দুটির মধ্যেও একটা appearance ও reality -র দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। আপনি যা, আপনার পরিচয় হয়তো তাই, কিন্তু অন্যের কাছে আপনার পরিচিতিটাও কি তাই? এ সম্পর্কে প্রথম সজাগ হই প্যারিসে সাংবাদিকতা পড়তে গিয়ে। সেখানে ক্লাসে এক বাংলাদেশি ছাত্রও ছিল। আমরা নিজেদের মধ্যে মাঝেমধ্যে একই ভাষায় কথা বলি দেখে অন্যরা অবাক হতো, কারণ আমি তো অ্যাঁদিয়ঁ, Indian, আর ও বাংলাদেশি। শেষে ওরাই স্থির করে নিল যে, আমি Indian Bengali আর ও Bangladeshi Bengali. এতে আমাদের আসল পরিচয়টা যে কতখানি কী তা আমরা নিজেরাও সেভাবে স্থির করতে পারিনি। কারণ আমি দেখতাম যে, আমার পূর্বপূরুষ সব খুলনার, যা বাংলাদেশে, আর ওর পূর্বপুরুষ সব মুর্শিদাবাদের, যা ভারতে। আমার আফসোস আমি বাঙাল বুলি কইতে পারি না, ওর আক্ষেপ হুতোমের নক্শার কলকেতে বুলি ওর শোনা হলো না। তেমন করে। আমায় কবুল করতেই হয়েছিল পুরোপুরি ওই বাংলাও আমার সাধ্যের অতীত। যাঁদের শুনে-শুনে রস পেতুম তাঁরাও দিনে-দিনে গত হচ্ছেন।
বাঙালি যখন, তখন ইংরেজিতে উদ্ধৃতি দেওয়া থেকে কে ঠেকায় আমায়? তবে ভয় নেই, উদ্ধৃতিটা ইংরেজিতে হলেও একজন বাঙালিরই; পরে তিন সময়ের বাঙালির ইংরেজিতে আসবখন। আপাতত পরিচয় নিয়ে স্বয়ং অমর্ত্য সেনের এক সংকটের গল্প শুনুন…
Some years ago when I was returning to England from a short trip abroad (I was then Master of Trinity College in Cambridge), the Immigration Officer at Heathrow, who scrutinized my Indian Passport rather thoroughly, posed a philosophical question of same intricacy. Looking at my home address on the immigration form (Master’s Lodge, Trinity College, Cambridge), he asked me whether the Master, whose hospitality I evidently enjoyed, was a close friend of mine. This gave me pause since it was not altogether clear to me whether I could claim to be a friend of myself. On same reflection, I came to the conclusion that the answer must be yes, since I often treat myself in a fairly friendly way, and furthermore, when I say silly things, I can immediately see that with friends like me, I do not need any enemies. Since all this took some time to work out, the Immigration Officer wanted to know why exactly did I hesitate, and in particular whether there was some irregularity in my being in Britain. Well, that practical issue was eventually resolved, but the conversation was a reminder, if one were needed, that identity can be a complicated matter. অমর্ত্যবাবুর যে-দোটানা ‘আমি কি আমার বন্ধু নই?’, যে-সংশয়কে তিনি একটি দার্শনিক প্রশ্ন বলেছেন এবং ঠিকই বলেছেন, তা বাঙালিত্বের প্রশ্নেও বিচলিত করতে পারে বাঙালিকে। সমস্যাটা এভাবে দেখলে হয় : আমাদের বাবা-কাকারা স্থিরনিশ্চিতভাবে জানতেন তাঁরা বাঙালি। দেশবিভাগের পর ওই বঙ্গে পড়ে থাকা সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য তাঁদের অনেককেই জোর দিয়ে জানান দিতে হতো তাঁরা Indian, কারণ ততদিনে পাক সরকার সেইসব সম্পত্তির নামকরণ করেছে Enemy property! অর্থাৎ বাঙালি আর সাত পুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে বাঙালি হিসেবে সেসব উদ্ধার করতে পারছে না। আমার মেজো মামার করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলি। দেশ বিভাগের প্রায় কুড়ি বছর পর তিনি পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলিম পরিবারের সঙ্গে জমিজায়গা বদলাবদলি করে চলে আসেন। তার আগে এলে আমাদের বাড়িতেই উঠতেন। সেরকম এক সময় ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম উনি নিজেকে ভারতীয়, না পাকিস্তানি বোধ করেন। ওঁর পাসপোর্ট তখন পাকিস্তানের। আজো চোখের সামনে দেখতে পাই নিতান্ত ইশকুলের বালক আমার সামনে তাঁর দীর্ঘ উদাস নীরব চাহনি। শেষে কী এক শক্তি সঞ্চয় করে বললেন, কী আর মনে করব? নিজেকে বাঙালিই মনে করি!
আমাদের আগের জমানার বাঙালি মানুষ বাঙালি হয়ে জন্মে বাঙালি হয়েই প্রয়াত হলেন। তাঁদের মধ্যে একটা বৃহৎ সংখ্যার বৃহৎ পরিচয় থেকে গিয়েছিল ভারতীয়। তার চেয়েও এক বৃহৎ সংখ্যার পরিচয় হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি। পরে তাঁরাই আবার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে পরিচয় অর্জন করলেন বাংলাদেশি। তাঁদের অনেকেই বাংলা ভাষা বাঁচানোর জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন; এদিককার কিছু মানুষ আবার ইশকুলের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ইংরেজি হটিয়ে এক অদ্ভুত নজির খাড়া করেছিলেন। তাতে বাংলা ভাষার কী সুবিধে হয়েছিল বলা মুশকিল, তবে কয়েক প্রজন্মের বাঙালির ইংরেজি শিক্ষা গোল্লায় গিয়েছিল। আর ওই সময়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অভূতপূর্ব বাণিজ্য-বিস্তার হয়েছিল। ঘটিবাটি বন্ধক দিয়ে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ানো, টিউটর রেখে ইংরেজি, অংক, ত্রিকোণোমিতি পড়ানোর চল শুরু হলো, সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় ছেলেমেয়েকে এগিয়ে রাখার জন্য বাংলার জায়গায় Alternative Hindi-র প্রসার হলো। এই সময় থেকেই বাঙালি সুগৃহিণীদের একটা stereotype তৈরি হয়, যাঁরা বলে তৃপ্তি পেতেন, ‘আমার ছেলেটা জানেন, বাংলাটা তেমন তুলতে পারছে না। কী করি বলুন তো?’ এই ব্যাপারটা বহুত দিন ধরে চলছে এবং থামার নাম করছে না। এরই চরম অভিপ্রকাশ দেখলাম এই সেদিন আমার ও নায়ারের বন্ধু বাসুদেব মুখুজ্জের বাড়িতে, যে-বাসুদেব বিজ্ঞাপনী কোম্পানি চালান, সাহেবদের মতো ইংরেজি বলেন এবং সতীনাথ ভাদুড়ীর উপন্যাস বুকে নিয়ে শুতে যান। বাঙালির কাল, আজ ও কালের মধ্যে বাঁধা আছে আমার মতো তাঁর স্মৃতি, সত্তা, ভবিষ্যৎ। তাঁরই বাড়ির মধ্যাহ্নভোজে এবারের নববর্ষে টরন্টোর ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা এবং বঙ্গভঙ্গ নিয়ে এক প্রধান লেখিকা হিমানী বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। হাফ ডজন ছাত্রছাত্রী সেখানে রবীন্দ্রনাথ পড়ছে বাংলায় নয়, ইংরেজিতে। এবং তারা বাঙালি। আর বললেন বঙ্গভঙ্গ নিয়ে চর্চা নাকি এখন growth industry, রিসার্চ, থিওরি ও থিসিসে ভরন্ত বাজার। তাতে অবিশ্যি বাঙালি এগোচ্ছে না পিছুচ্ছে বোঝার উপায় নেই।
এবারের নববর্ষে টের পেলাম বাঙালির পোড়া কপাল তার নতুন বছর সাহেবদের নতুন বছরের মতো শীতে পড়েনি। তাই বাংলার নববর্ষও এক্সপোর্ট হয়ে যাচ্ছে বিলেত-আমেরিকায়। রবীন্দ্র ১৫০ থেকে ১৫০ দুর্গাপুজো যখন ইভেন্ট ম্যানেজারদের হাতে চলে গেছে তখন এই হুদ্দুড়ে গরমের নববর্ষটাকে saleable করা বেশ সমস্যা হয়ে পড়ছে। ওই সময়ে যে-দু’চারখান বাংলা দেওয়ালপঞ্জি বেরোয় তাও নেবার লোক নেই। মা-মাসিরা চলে যেতে পুজোআর্চা, অম্বুবাচি, উপোস, যাত্রার তিথি-লগ্ন দেখাও চুকে গেল। এরকম এক দেওয়ালপঞ্জি বেহাত করার জন্য আমাদের কাজের মেয়েটিকে দিয়েছিলাম। পরে কানে আসে সে কার কাছে গজগজ করেছে, দাদাবাবু একটা কালিন্ডার দিলে বটে। কিন্তু কী ছাই কালিন্ডার, কুনো ছপিই নাই!
নববর্ষ একটা আইটেম মাত্র। বাঙালির সব কিছুই এখন ইভেন্ট হয়ে পড়ছে, যার অর্থ কিছুকাল পর এর মধ্যে বাঙালিত্ব খুঁজতে গোয়েন্দা লাগাতে হবে। এখন যেমন আতস কাচ ধরে বাংলা গানের মধ্যে বাংলাটা খোঁজা হয়। নায়ক-নায়িকার নাম দেখে বাংলা সিনেমার রং কানেকশন। বারোয়ারি দুর্গাপুজোয় বাঙালিয়ানার ছোঁয়া দেখাতে পারলেই পুরস্কার। বন্ধুবান্ধবের জন্য থ্রো-করা পার্টিতে গিন্নিকে দিয়ে একটা বাংলা পদ রেঁধে রাখতে পারলেই ‘থ্রি চিয়ার্স ফর ম্যাডাম ঘোষ।’ এরকম একটা থ্রি চিয়ার্স করা বাংলা পদ চেখে বুঝেছিলাম সেটা হলো যাকে নিন্দুকেরা বলে কাশ্মিরি আলুর দম। ‘মাছ আর বাঙালি’র লেখক রাধাপ্রসাদ গুপ্তর কাছে এক সাহেব জানতে চেয়েছিলেন, ক্ল্যাসিক বাংলা পদ হোটেল-রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় না কেন? তাতে রাধাপ্রসাদ উত্তর দিয়েছিলেন, Because the best Bengali recipes are handed down to the next generation, not to restaurants and hotel cooks. এই কথাটা যেদিন হচ্ছে ওঁর বাড়িতে সেখানে অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী আর আমি উপস্থিত। তাতে বসন্ত জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে শাঁটুল (শাঁটুল রাধাবাবুর ডাক নাম), এই যে নতুন জমানা সেভাবে রান্নায় হাত লাগাচ্ছে না, কী বিদেশবিভুঁইয়ে পাড়ি দিচ্ছে তাতে এই অলৌকিক রান্নাগুলো কাদের হাতে যাবে? রাধাপ্রসাদ এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে বললেন, কেন? বইয়ে!
আমার মনে পড়েছিল বিক্রম নায়ারের এক প্রিয় উদ্ধৃতি, কবি মালার্মে থেকে Everything ends up in a book. সবকিছুই শেষ অবধি স্থান করে নেয় বইয়ে। একটু থেমে এরপর রাধাপ্রসাদ বলেছিলেন : দক্ষিণীরা পারলে সাদা শার্ট, লুঙ্গি ধরে রাখতে, আমরা সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি গঙ্গায় ভাসালাম। মান্কে (সত্যজিৎ রায়) চলে গেলে বাঙালির সেই সাহেবসাদা ইংরিজিটাও চলে যাবে।
সাহেবসাদা ইংরেজি বলতে রাধাপ্রসাদ সেই ইংরেজিটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন, যেভাবে ভাষাটা পড়া, শেখা ও বলা উচিত। এবং অতি অবশ্য খুব রসবোধের সঙ্গে। এই প্রসঙ্গে ৩৪ বছর আগের একটা ঘটনা মনে আসছে। কলকাতার শেষ ইংরেজ কমিশনার অফ পোর্ট জেফরি পিনচেসের পোর্টসমাথের বাড়িতে এক ছোকরা আমি অতিথি ছিলাম ১৯৭৭-এর গ্রীষ্মে। সাহেব তখন পোর্টসমাথ বন্দরের কমিশনার। এক সন্ধ্যায় ডিনার শেষে হাতে কনিয়াক আর ঠোঁটে সিগার নিয়ে জেফরি একটা কথা বললেন যা জন্মেও ভোলার না। বললেন, ‘জান, শঙ্কর, জীবনের সেরা ইংরেজি যা শুনেছি তার কিছু তোমাদের কলকাতার বাঙালির ঠোঁটে।’ এতই আপ্লুত হয়েছিলাম কথাটায় যে, জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেলাম সেসব ইংরেজি শোনা কাদের মুখে। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা হওয়ার কারণ কী? শুধু ২০০ বছর ইংরেজের কোলঘেঁষে থাকার জন্য? জেফরি একটু ভেবে বললেন, সেটা একটা কারণ। দ্বিতীয়টা এরকম : কলকাতার বাঙালি শুধু চাকরির উন্নতির জন্য ইংরেজিকে নেয়নি। তার আত্মোন্নতি এবং তার নিজের সুন্দর ভাষাটির কল্পনা ও সৌকর্য বৃদ্ধির জন্যও ইংরেজিকে গ্রহণ করেছে। কথাটা বলে সাহেব ওঁর সুন্দরী বাঙালি গৃহিণীর দিকে সøেহে হেসেছিলেন। দৃশ্যটা ভুলিনি।
আধুনিক বাঙালি ঢের বেশি ইংরেজি আওড়ায়, যা জলের মতো বলা এবং শোনা হয়ে ফুরিয়ে যায়। কোনো রেশ থাকে না। মর্মান্তিক এই যে, এই নামগোত্রহীন ইংরেজির জন্য ওরা বাংলা কত কম জানল। আমার দুঃখটা হয়তো ওদেরও হবে আরো অনেকগুলো বছর কেটে গেলে। আপাতত ওদের ব্যস্ত রাস্তার মতো অনেক কিছু আছে।
হাতে দুটো পয়সা এসেছে। সে ভালো কথা, তবে তার অভিব্যক্তি ভালো ঠেকে না যেন। যেমন, যখন-তখন মোবাইল হ্যান্ডসেট পালটানো, বছর ঘুরতে না ঘুরতে গাড়ির ব্র্যান্ড বদলানো, কিছুদিন গেলে ফ্ল্যাট পরিবর্তন এবং টাকার গরমে লাইফস্টাইলের দাবিতে জীবনসঙ্গী চেঞ্জ। এর ওপর শোনা যাচ্ছে হপ্তায় হপ্তায় ঝাঁকে-ঝাঁকে সেলিব্রিটি পয়দা হচ্ছে যাদের একটাই পরিচয় – Famous for being famous. কবি মালার্মেকে ভাঙিয়ে বলতে গেলে They all end up in page threes and page sixes. এরা এতটাই ভুবনায়িত যে, এদের বাঙালিত্ব ধরে কার সাধ্যি! ভুবনায়িত বাঙালির আবার বাঙালিত্ব কিসের – এরা জানতে চাইবে। যে-প্রজন্মের জন্য আমরা রাতে ফোনের অপেক্ষায় থাকি, তাদের আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু যাদের নিত্যদিন দেখে অপরিচিত ঠেকে, কাগজে-কাগজে দেখে কিংবা টিভির পর্দায় ক্ষণিকের অতিথি হিসেবে দেখে বিভ্রান্ত, সন্ত্রস্ত হই তাদের বোঝা দিন-দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, বাঙালি যেখানে আছে সেখানে মজুত থাকতেই তাকে নাকি সারাক্ষণ দৌড়াতে হচ্ছে। সে-সব দেখেশুনে আমাদের সময়কার অনেকেই এখন বেজায় ছুটোছুটি করছেন। আমার দ্বারা তা হয়নি, তাই এক নিতান্ত বিভ্রান্ত, পিছিয়েপড়া বাঙালি হিসেবে আপনাদের সামনে বক্তৃতা করতে এলাম।