বিবর্ণ আকাশ

লেখক: সাদিয়া সালসাবিলা

রূপার বিবাগি হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। অত নিদারুণ খবরের সঙ্গে সঙ্গে ততোধিক ঘটনাপ্রবাহ হজম করার চেয়ে বনজঙ্গলে নিবাস গড়াও সহজ মনে হচ্ছে তার। তা সে-খবর আর কিছুই নয়, আরিফ সপ্তাহখানেক হলো ছাড়া পেয়েছে।

অবশ্য কেবল খবর শুনেই হাত-পা ঠান্ডা করে বসে থাকার মেয়ে রূপা নয়। আরিফ কাল এ-বাড়িতে এসেছিল সে-খবরেও খুব ভেঙে পড়ার মতো কিছু আবিষ্কার করেনি সে। কিন্তু মা যখন বললেন, ‘অমন চেঞ্জ হলে হাজারবার ঘর করতেও ভাবতাম না আমি।’ অমনি রূপা ধসে গেল।

আশ্রয়হীন রূপা আশ্রয় হারানোর ভয়ে একেবারে কেঁচো হয়ে গেল।

আশ্রয়হীনাই বটে! বাবার বাড়িতে আপাতত তার থাকার জন্য যেমনই হোক একটা ঘর থাকার পরও আশ্রয়হীনা সে। স্বামীর ঘরে জায়গা না হলে আবার কিসের আশ্রয়? অবশ্য জায়গা হয়নি বলাটা স্বামী বেচারার ওপর একটু অপবাদই হয়ে যায়, সে তো আর রূপাকে তাড়ায়নি। রূপা এক সন্ধ্যায় পালিয়ে ওই বাড়ি ছেড়ে চুপিসারে চলে এসেছিল বাপের বাড়ি। তাও সে মাসআষ্টেক আগের কথা।

সে-সময়টার কথা রূপা ভুলতে পারে না কিছুতেই। আরিফের ছিল নেশার খাসলত। সেই কালো সন্ধ্যার আগের রাতে আরিফ খুব করে শাসিয়েছিল, ‘বালা কই রেখেছিস, বল। না দিলে…’

কথা শেষ না করেই রূপার গলা চেপে ধরেছিল আরিফ। পাশের ঘর থেকে শাশুড়ি এসে না ধরলে মরেই যেত রূপা।

তারপর আর না পালিয়ে উপায় ছিল না রূপার। শান্তিনগর থেকে মিরপুরে এসে নিশ্বাস ফেলেছিল রূপা। যাত্রাপথের জ্যামে বসে থেকে যতটা না কাহিল তার চেয়ে এক রাতের মধ্যে পালানোর সিদ্ধান্তে ঘায়েল হওয়া মেয়েকে দেখে রেহানা বললেন, ‘এই সময় তুই যে! কী হয়েছে?’

রূপা কিছু বলতে পারল না। ভেউভেউ করে কেঁদে ফেলল।

তারপর মেয়েকে শান্ত করে একটি একটি রহস্য উন্মোচন করতে করতে রেহানার মুখের ভঙ্গি কী ভীষণ যে হয়েছিল, আঁচলে কি ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুও মোছেননি? ‘আরিফ নেশা করে? টাকা চায়? মেরেছে তোকে? আচ্ছা, এইখানেই থাকবি তুই। ওই হারামজাদা কী করবে দেখে নেব না আমরা? তুই কিচ্ছুটি চিন্তা করিস না, আমার কপালে ভাত থাকলে তোর কপালেও আছে, তোকে ওই কুলাঙ্গারের কাছে যেতে হবে না।’

সেই মা সুর বদলেছেন, ভাবা যায়?

তা আরিফের গুণপনার কথাও বলতে হয় একটু। নেশা-ভাং যা-ই করুক, মানুষ পটাতে জানে। কাল সক্কাল সক্কাল এসে হাজির হয়েই কী নির্লজ্জের মতো বলল, ‘কেমন আছেন মা? বাবার শরীর ভালো তো? রূপা কই? বাড়ি খালি খালি লাগছে যে!’

কী নির্লজ্জ! ঠিক যেন নাইওরিতে আসা বউকে নিতে এসেছে এমন ভাব। আট মাস আগে তুই-ই যে বউয়ের গলা টিপে ধরেছিস সেটা ভেবেও কি একটু চক্ষুলজ্জা হয় না?

শুরুতে রেহানা অবশ্য বিশেষ পাত্তা দিচ্ছিলেন না, খুব সম্ভব মুখের ওপর ‘যাও’ বলতে বাধছিল বলেই হয়তো অভদ্রতা করে উঠে যেতে পারছিলেন না। সে-সুযোগটাই নিল আরিফ। একটার পর একটা কথা বলে পটিয়ে ফেলল রেহানাকে, ‘জি আম্মা, নিয়ে যেতে চাই ওকে, যদি আপনারা রাজি হন আর কি! না আম্মা, কী যে বলেন! এক ভুল কি বারবার করব? ন্যাড়া বেলতলায় কবার যায়, বলেন দেখি? রূপাকেই জিজ্ঞেস করেন না, ওই একদিন ছাড়া আর কিছু করেছি নাকি? সেদিন নেহাত হুঁশ ছিল না, নইলে মাশা-আল্লাহ বড় ভালো মেয়ে আপনার, মার খাবার দোষ তার থাকারই নয়।’

কথা সত্য; রেহানা মনসুর যত না আর্থিক মধ্যবিত্ত, তার চেয়ে মধ্যবিত্ত তাদের মানসিকতা। সেই সংস্কারের বশেই উচ্চবিত্ত শ্বশুরবাড়িতে মেয়েকে মুখে কুলুপ এঁটে থাকার যে-পরামর্শ রেহানা দিয়েছিলেন, সেই মাতৃ-আজ্ঞা ভোলেনি রূপাও। সুতরাং তার আদব-লেহাজের প্রশংসা করে আরিফ ভুল তো কিছু করেনি।

তবু ওই লোকটার চেহারার দিকে তাকিয়ে কেমন ঘিনঘিন লাগে রূপার। অবশ্য অমন মিথ্যাবাদীকে ঘেন্না না লেগেইবা উপায় কী? বুকে হাত দিয়ে বলুক দেখি আরিফ, রেহানার নির্দোষ মেয়েটার নরম গালে ফি সপ্তাহে কম করে একদিনও কি ওই হাতের পাঁচ আঙুল বসায়নি সে? এ তো দুগ্ধপোষ্য মার, চড়কে তো শেষের দিকে রূপা গুনতই না। তখন কথায় কথায় চুলের মুঠি ধরা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল কি না, মুঠি ধরে ধাক্কা মেরে বিছানায় ফেলার কায়দা ভালোই রপ্ত হয়েছিল আরিফের, পড়ে যাওয়া রূপার নাকে-মুখে এলোপাতাড়ি মারতে মারতে প্রায়ই বলত, ‘ফের যদি নেশা নিয়ে আমাকে গালমন্দ করেছিস, জানে মেরে ফেলব।’

তবু ভয় চেপেই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলত রূপা, সন্ধ্যায় জলদি ফেরা কি অফিস শেষে কম আড্ডা দেওয়ার কথাও স্মরণ করিয়ে দিত। সেটাও কানে যেতেই শাশুড়ির মুখ চুন, ‘আমাদের সময় অত বালাই ছিল না। ব্যাটাচ্ছেলে বাইরে থাকবে না, থাকবে কই? দেখ আহ্লাদ বউয়ের!’

ও-বাড়িতে  বউদের ওজন হয় বাপের পকেটের ওজনে, তাতেই শাশুড়ির কাছে নিজের চক্ষুশূল হওয়ার ব্যাখ্যাটা রূপা পেয়েছিল বেশ করেই। নেহাত নেশা করা ছেলের জন্য সমান ঘর আনতে গেলে ওসব মেয়ের বাপেরা দাবড়ে দিতে ছাড়বে না ভেবেই বোধহয় খবর লুকিয়ে নিচুঘরে গেছেন তাঁরা। নইলে ও-বাড়ির বউ হওয়াটা রূপার কপালে ছিল না। তবু শাশুড়ির অমন স্বার্থান্বেষী মনোভাবের বিপক্ষেও রূপা মুখ বুজেই ছিল, পাছে মুখ খুললেই বাপের আর্থিক অবস্থা নিয়ে বিশ্রী একটা গাল শুনতে হয় বলে।

তবু শুকরিয়ার কী বাহারই না ছিল শাশুড়ির। নইলে শেষে যখন টিকতে না পেরে মুখ ফসকে ছিল রূপার, বলেছিল, ‘বেশিক্ষণ বাইরে থাকার ছুতোয় মধুচক্রে না গেলেই হয়’ – তখন কী নাটকটাই না করলেন শাশুড়ি! ‘আড্ডায় যায় আমার ছেলে! যাবে না কেন? ঘরে সুখ না পেলেই তো মানুষ আড্ডায় যায়, নেশা করে! কী বউ আনলাম, ছেলের জীবন ত্যানাত্যানা করে দিলো।’ তারপরই কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে ফিরে গেলেন আঞ্চলিক ভাষায়, ‘তুই! তুই আমার ছেলেরে খাইছিস রাক্ষুসী, তুই ওরে না জানি কত কষ্ট দিছিস, সেজন্য বাছা আমার নেশা করে। তা কষ্টই দিছিস যদি মাইরাই ফেলতি, এই খবর আমারে দিয়ে কলিজা ভাঙলি কেন? ওগো, শুনছ তোমার গুণধর বউয়ের কীর্তি? ছেলেরে তো ধ্বংস কইরা ছাড়ছে।’

রূপার শ্বশুর নির্লজ্জ ছিলেন না, ওই বাড়িতে মনুষ্যত্ববোধটা ওই একজনেরই ছিল। শাশুড়ির এই নির্জলা মিথ্যাচারে ভদ্রলোক আমতা আমতা করে সরে গিয়ে খুবই মনোযোগের সঙ্গে সকালে পড়ে শেষ করা কাগজখানাই ফের পড়তে শুরু করলেন।

মিথ্যাচারই বটে! কী নিপুণভাবেই না ছেলের নেশা করার দোষ রূপার কাঁধে চাপিয়ে দিলেন মহিলা, আবার এমন একটা ভাবও করলেন যেন ছেলে নেশা করে, এই খবর আজ প্রথম শুনলেন। অথচ আরিফকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে নেশা থেকে ফেরাতে গিয়ে একটির পর একটি কথা প্রসঙ্গে বহু আগেই জেনেছে রূপা। ছাত্রাবস্থা থেকেই আরিফের এই বদভ্যাস। শাশুড়ি জানতেনও তা, দু-বছরের মতো হোমেও ছিল সে, ফিরে এসে কিছুদিন নেশা বন্ধ রেখেছে বলে

বাপ-মা ভেবেছেন ছেলে বুঝি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছে। এ-অবসরেই তারা ছেলের বিয়ে দিলেন। বিয়ের মাসতিনেকের মাথায় রূপার কাছে ধরা পড়ে আরিফ। এমনকি বাড়ির পুরনো চাকর-বাকরদের কানাঘুষাও কিন্তু রূপার পক্ষেই রায় দেয়।

তারপর ও-বাড়ির সব ফিরিস্তিই পালিয়ে এসে বাবা-মাকে বলেছিল রূপা। তখন তারা রূপাকে যেভাবে বুকে আগলে রেখেছিলেন, রূপার ভরসার অভাব ছিল না। কিন্তু আজ মা আরিফের মুখের ওপর ঢালাও প্রতিবাদের বদলে সামান্য দু-এক বাক্যে প্রতিবাদেই যখন তাঁর দায়িত্ব নিঃশেষ করলেন, তখনই মনের জোর হারিয়েছে রূপা। নইলে হোক দুর্বল রেজাল্ট, না থাকুক মামার জোর, বিএসসি করা একটা মেয়ে হিসেবে রূপা শিক্ষিত তো বটেই! আরিফ কাল এখানে আসার পরও সে রূপার মাথাব্যথা হয়ে উঠতে পারেনি; কিন্তু যেই রূপা মায়ের গলায় একটা অচেনা সুরের আভাস পেতে শুরু করেছে, মলিন হয়ে গেছে তার আস্থাটুকু। বিবাগি না হতে চেয়ে তার আর উপায়ই বা কী?

আজ সকালে এই নিয়ে রেহানার সঙ্গে লেগেও গিয়েছিল রূপার। সেই সন্ধ্যায় সোনার বালা না দেওয়ার অপরাধে গলা টিপে ধরা ছাড়াও যে আরিফ এর আগেও রূপার চার আনার স্বর্ণের আংটি বেচেছে, সেই প্রতিবাদে ঘুসিতে যে দাঁত নড়ে গেছে রূপার, সেটা মাকে স্মরণ করিয়ে দিতেই রেহানা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রূপা তাতে রেগে গিয়ে বলল, ‘পেটে ধরছিলে আমাকে? ধরো আর না ধরো – পানিতে ভাসিয়ে দাও, কিছু বলব না। কিন্তু কেমন করে পারো ওই জানোয়ারের হাতে আবার আমাকে দিতে?’

রেহানার চোখে প্রায় পানি এসে গেল। বললেন, ‘দিতে কি আমিও চাই রে মা? তোর জায়গা নাই ভেবেই দিতে চাই। এখন আমি আছি, কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু তারপর সংসার হবে বাবুর বউয়ের। ভাইবউয়ের কথার জ্বালা তখন বুঝবি, বুঝবি এর চেয়ে স্বামীর জুতা খাওয়াও ভালো।’ রূপা মরমে মরে গেল। ‘তেমন বুঝলে আলাদা থাকব’ কথাটা আর বলল না সে, বলে লাভ নেই আসলে। আদ্যিকালের ছোটখাটো এই বাড়ির দোতলাটা বাবু নিলে নিচতলাটা দুবোনের অংশ – কথা সেরকমই হয়ে আছে। কাজেই ওখান থেকে রূপার থাকার ব্যবস্থা হয়েই যায়। নতুন করে সংসার জুড়োবার ভয় থেকে রূপা আর বিয়ে যদি নাও বসে, তবু কি টিউশনি করেও তার পেট চলবে না? কিন্তু এত কথা মায়ের মাথায় ঢুকবে বলে আশা হয় না তার। ঠুনকো সম্মানের কাছে মা যে বন্দি এ সে বুঝেছে বেশ করেই। তাতেই ডিভোর্সি মেয়ে ফের বিয়ে দেওয়ার হ্যাপা তাঁরা বোঝেন আর ওতে রূপারও প্রবৃত্তি নেই জেনেই অবশেষে মুরোদহীন মরদের সঙ্গে সংসার টেনে নিয়ে সম্মান রক্ষার ফর্মুলা বাতলেই নিশ্চিত হন তাঁরা। সঙ্গে থাকে মুখে আশার বাণী, ‘ফের অনেকদিন হোমে ছিল, মতি এবারে ফিরতেও তো পারে!’

শুনে চমকে উঠেছিল রূপা, হঠাৎই মনে হয়েছিল – লোকনিন্দা কি সম্মানের বুলিগুলো কেবলই কথার কথা নয়তো? আদতে রূপাকে বোঝা লাগে বলেই কি অমন জবাব দিলেন মা? তা-ই হবে বোধহয়। অবশ্য মায়ের কথা খুব ফেলে দেওয়ার মতো কিছুও নয়। কারণ মানুষ এখনই তার দিকে ঠারেঠারে তাকায়। বছরখানেক সংসারও করতে পারল না, ফিরে এসেছে মেয়ে – কিসের নেশা জামাইয়ের? মেয়ের দেখো কি-না-কি দোষ, তাই তাড়িয়ে দিয়েছে – এমন ভাবগতিকের মুখোমুখি যদি রূপাকে হতে হয়, তবে সমাজ কি রূপার মা বলে রেহানাকে চোখ টেরিয়ে দেখে না? রূপা ফিরে গেলে মা আবার এই লোকগুলোর কাছে স্বচ্ছন্দে মুখ দেখাতে পারেন বলেই কি ফিরে যেতে বলছেন রূপাকে? তাই হবে বোধহয়।

রূপা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। চারদিকে একটু মুক্ত বাতাসের এত অভাব, উহ্! কই যায় রূপা এখন?

স্তব্ধ হয়ে রইলেন রেহানাও। কম দায়ে মেয়েকে আরেকটা সুযোগ দিতে অনুরোধ করেননি তিনি। ঘরে-বাইরে সবখানে রূপা যেন তার কলিজাতে চেপে থাকা পাথর। জোয়ান মেয়েটা যখন তাঁর সামনে হেঁটে যায়, মেয়েটার ওপর কুলাঙ্গারটার অত্যাচারের কথা ভাবলেও চোখ জ্বালা করে ওঠে রেহানার। হতভাগীর ফুলের মতো কিন্তু মলিন মুখটা দেখার জ্বালা থেকে মুক্তি পেতে ঘরের বাইরে গেলেও কি শান্তি আছে? রাস্তায় বের হলে মনে হয় সবাই বুঝি তাঁকে করুণা করছে – ওই যে অভাগী রূপার মা, সংসার পেয়েও সংসার হলো না যে রূপার, সেই রূপার মা এটা। মানুষের চোখ যেন বিঁধতে থাকে তাকে। সমাজ না থাকলে আজ মেয়েকে বুকে আগলে রাখতেন না তিনি? অমন ইচ্ছা কি তার হয় না? নাকি সত্যিই সমাজকে পাত্তা না দিয়ে মেয়ে রেখে দেবেন বাড়িতে? তাও হয়। কিন্তু পরক্ষণেই মন খচখচ করে ওঠে রেহানার। বংশে কোনো মেয়ের দুই বিয়ে দূরে থাক, স্বামীর ঘরই ছাড়েনি কোনো মেয়ে। রূপা কি সে-ঐতিহ্যটা নষ্ট করে দিলো না? ও যদি আরিফের কাছে চলে যায় তবে এখন সমাজের চোখ ঠেরানো, বংশের কলঙ্ক সব ঢেকে যায় রেহানার। বাবুর গলগ্রহ হওয়ার ভয়ও থাকে না রূপার। তবু মনের পেছনের

যে-মন সেই মন রেহানাকে তিরস্কার করতে থাকে। চোখ মুছে একলাই বিড়বিড় করেন রেহানা, ‘আমার হিসেব নিস না রে মা তুই, আমি নিরুপায়। তোর মায়ের মাতৃত্ব অনেক আগেই সমাজের রক্তচক্ষু আর গৎবাঁধা নিয়মের কাছে বিকিয়ে গেছে রে!’

রূপা সেই চোখের জল দেখে না। তাতেই সকালের মনকষাকষিতে দুপুরেও না খেয়ে এলো চুল শুকাতে শুকাতে এলিয়ে পড়ে রূপা। ঘুমিয়ে যায় না খেয়েই। মাঝে খাওয়ার জন্য ডাকতে এসে মেয়ের ক্লিষ্ট মুখ দেখে যেন বুকে বাজ পড়ে রেহানার। পাপবোধ এড়াতে যেন পালিয়ে বাঁচেন তিনি।

নাহ্, রূপাকে চাপ দেবেন না কোনো! গোল্লায় যাক সমাজ!

কিন্তু সে-কথা রূপার কানে যায় না, অবসাদগ্রস্ত একটা দিন কাটিয়ে রাত্তিরেও বিছানায় পিঠ এলিয়ে মনে হয় সব যেন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে – অতিপরিচিত এই বাপের বাড়ি যেন আর সেই বাড়ি নেই। এ-বাড়িতে স্বাগত হওয়ার সময় যে ফুরিয়ে গেছে তাও বুঝে নেয় সে। শুরুতে তাকে যারা সাহস দিয়েছিল, এখন তাদের রেওয়ামিলে আরো হিসাব ঢুকেছে, এখন তারাই রূপার জন্য তাই অন্য দাওয়াই খোঁজে; রূপা সেই দাওয়াই না মানলে তাদের রাগটা এখন আবার সেই রূপার ওপরই গিয়ে পড়ে। পরিহাস!

নয়তো কি? যেদিন সে এ-বাড়িতে এক কাপড়ে পালিয়ে এসেছিল, তখন বাবার চেহারাটা ঠিক কেমন হয়েছিল ভুলতে পারে না রূপা। তারপর পাশে বসে আস্তে আস্তে সব শুনে কোনো মন্তব্যই করতে পারেননি বাবা, শোনার মাঝেমধ্যে বারকয়েক চশমার কাচ মুছে ছিলেন কেবল, বাষ্পে ওগুলো বড্ড ঘোলা হয়ে গিয়েছিল কি না! পরদিন সকালে সমাচার বুঝতে ফোন দিয়েছিলেন শাশুড়ি, তার মুখে ‘আপনার গুণধর মেয়ে’ কথাটুকু শুনতেই ঠান্ডা মেজাজের বাবা একটা স্ফুলিঙ্গ হয়ে উঠেছিলেন যেন, ‘মুখ সামলে বেয়াইন, আমার মেয়ের গুণপনা আমি বুঝব, বরং আপনার গুণধরটিকে দেখুন উত্তম-মধ্যম কিছু দেওয়া যায় কি না, যত্তসব রাবিশ!’

ফোন ছেড়ে হাঁপাচ্ছিলেন বাবা, হার্টে ব্লক যে। সে-অবস্থাতেই মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘তোর কোনো ভয় নেই। বুড়িটাকে পাত্তাই দিবি না। ওদিককার স্কাউন্ড্রেলগুলো তোর কিচ্ছুটি করতে পারবে না, এই বলে দিলাম।’

সেই বাবাকেই কেন এত দুর্বোধ্য লাগে আজকাল?

হ্যাঁ, মনসুর বদলেছেন। রূপার এই নিয়তি মনসুরকে পর্যন্ত মধ্যবিত্ত আদর্শ বাবা থেকে বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিতে নামিয়ে ফেলেছে। তাই রূপার মুখ দেখলে আজকাল তাঁর যন্ত্রণা হয়। আদরের ছোট মেয়েটাকে কি ভালোই না বাসতেন তিনি। তাতেই অফিস কলিগ যখন তার দূর-সম্পর্কীয় ভাতিজার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব আনে, তখন তিনি রূপাকে দিয়ে দেন। বড় আশা ছিল বড়ঘরে মেয়েটা সুখে থাকবে। সেই ফুলের মতো মেয়েই যখন তাঁর সামনে হেঁটে বেড়ায়, সেই চলাফেরা কি কাঁটার মতো খোঁচায় না তাঁকে? খোঁচায় বইকি। রূপার তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। সেই ভাবনা থেকেই দুঃখ, করুণা আর বঞ্চনার যে হাহাকার তৈরি হয়, কী পরিহাস – সেই বঞ্চনা শেষে রাগ হয়ে কি-না রূপার ওপরেই পড়ে। আমার বড় বোন শুধু স্বামী নয়, সতীনের ঝাঁটাও খেয়েছে, তবু সংসার ছাড়েনি! বুবুর কি জীবন যায়নি? কেমন মেয়ে তুই? স্বামীকে কই ঠিকঠাক করবি, তা নয়; চলে এসেছিস। তাও যদি আমার সামনে না আসতি! তোর মুখ দেখলে যে কলিজা ফেটে যায় আমার, সেটা বুঝিস না?

হ্যাঁ, মনসুরের কলিজা জ্বলে। থেকে থেকে কেবল মনে হয়, এলি কেন? যাসনে কেন? চোখে ঠুলি পরে হলেও আমায় বাঁচতে দে। তা সে ঠুলিটা কী? জামাইয়ের ঘর করা। তুই ওখানটাতে গেলেই আমি ভাবতে পারি সব ঝামেলা মিটেছে। তুই সুখে আছিস। আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারি।

এসব আবোলতাবোল ভেবে যখন রোজই সকাল সকাল নিজেকে সান্ত¡না দিতে থাকেন মনসুর, তখনই রূপা আসে বাবার চা নিয়ে। তা মনসুর মেয়ের চিন্তায় দিন-রাতই মশগুল থাকেন – একেবারে সকাল থেকে রাত অবধি। রাতে চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমিয়ে সকালে উঠেই সেই চিন্তা ফের হানা দেয় মাথায়, ঠিক তক্ষুনি যদি সেই চিন্তার মূর্তিমতিকেই সামনে পাওয়া যায়, তখন কি মাথা ঠিক থাকে? রাত্তিরে মেয়ের পরিণতির জন্য দুফোঁটা অশ্রু ফেলা মনসুরই তখন বলে বসেন, ‘চা-ও ঠিকঠাক বানাতে জানিস নে? আবার চিনির কমতি হয়েছে! গুষ্টিসুদ্ধ খাবে, কেবল আমার বেলাতেই চিনির কমতি! সবকটাকে দেখে নেব!’ কে গুষ্টিসুদ্ধ খাচ্ছে, কাকে দেখবেন, কিছুই জিজ্ঞেস করা হয় না রূপার। ছাপোষা সরকারি চাকরিজীবী অথচ তুখোড় বুদ্ধিসম্পন্ন বাবার যে মনোবিকৃতি হচ্ছে এবং সেই বিকৃতির কারণটা যে সে নিজে, এটুকু বুঝতে বেগ পেতে হয় না তার। তাকে ভেবে বাবা নিঃশেষ হচ্ছেন, এই কষ্ট কই রাখে রূপা? নইলে যে মানুষটা নিজের ফতুয়া না কিনে রূপার জন্য লাল-নীল পেনসিল কিনতেন সেই মানুষের মুখে এমন কথা ভাবা যায়? ডায়াবেটিসের জন্য নিজ থেকে চিনির সংযম করা বাবা যখন অপলাপের মতো চিনির জন্যই খিটখিট করে ওঠেন, তখন সেই উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কারবার দেখে লজ্জায় মরে যায় রূপা। ধন্যি মেয়ে বটে! বাবাকে বিকারে নিঃশেষ হতে দেখেও সে সোজা আছে কী করে? জগতের সবকিছু এত পরিষ্কার কেন? লুকোবার একটা জুতসই জায়গার কেন এত অভাব? একটু যদি কেউ রূপাকে লুকাতে দিত, কেনা হয়ে যেত রূপা তার!

নাহ্, রূপা চলেই যাবে। এ-সংসার তার নয়!

চলে যাওয়ার কথা ভাবলে আজকাল তেমন কষ্টও হয় না রূপার। মানিয়ে নেওয়াটাই যে তার মতো মেয়েদের পরিণতি, বেশ বুঝেছে রূপা। তাতেই লড়াকু মানসিকতাটুকুও নড়ে গেছে তার। যদিবা কেউ পেছনে থাকত সাপোর্ট দেওয়ার জন্য, রূপা বল পেত যুদ্ধ করার, বাপের ভিটি আঁকড়ে ধরার। কিন্তু এখন বাপের ভিটিতে অধিকার থাকলেও তা ফলাতে ঘেন্না লাগে রূপার। একটা বারান্দা নিয়ে যেখানে কথা হয়, সেখানে নিজের সবটা অংশ বুঝে নিতে গেলে কী হবে, ভেবে আর কেলেঙ্কারি করতে ইচ্ছা করে না তার।

বিয়ের আগে রূপারা দুবোন যে-ঘরে থাকত, পালিয়ে এসে রূপা ওতেই উঠেছে। গোটা দোতলার একমাত্র বারান্দাওয়ালা ঘর ওটা।  আজকাল সেই ঘরের দখল নিয়ে বাবুর মন উতলা। হ্যাঁ, বাবুর বউ পোয়াতি। তার বাচ্চা হলে দোলনা খাটাবার জন্য বারান্দাটা চাই কি না? আর বাচ্চা তো এখনো মাসকয়েকের ব্যাপার। দোলনা

না-হয় আরো পরেই খাটালাম, কিন্তু আপা হলো একলা মানুষ, তার বারান্দায় কাজ কী? আপার তো আর জামাই নেই যে বসে বসে জোছনা দেখবে।

কী নিদারুণ ইঙ্গিত! অর্থাৎ আমার তো বউ আছে, জোছনা দেখার ছুতোয় হলেও বারান্দাটার দখল এবার আমার চাই।

কথাগুলো কানে আসতেই রাগ হওয়ার বদলে বরং চমকে উঠেছে রূপা, বাবু এ-কথাগুলো বললইবা কেমন করে? এই বাবু কি সেই বাবু, যে পালিয়ে আসার দিন বলেছিল, ‘একদম ভাবিস নে, আপা। এটা তোরও বাড়ি রে। এখানে থাকতে তবে তোর ভয় কী? নিঃসংকোচে থাক তুই। আর হ্যাঁ, তোর ভাই এখনো মরেনি। হারামজাদাটাকে দেখে নিতে কতক্ষণ?’

হারামজাদাটাকে দেখার বদলে বাবু রূপাকেই দেখছে এখন! শুধু কি তাই? বাবুর ধুমসো পোয়াতি বউ কেমন স্বামী-গরবে গরবিণীর মতো রূপার সামনে হেঁটে বেড়ায়, অনাগত সন্তানের অহংকারে শূন্যে পা ফেলে চলতে চায়, তাও কি চোখে লাগে না রূপার? নইলে বউটি কেন পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, ‘আপনার ভাতিজা বড় দুষ্টু আছে! কেবল ফুটবল খেলে। কেমন লাগে বলে বোঝাতে পারি না, যদি জীবনে মা হন তো বুঝবেন, আপা!’

তার মুখ থেকে তৃপ্তি যেন চুইয়ে পড়তে থাকে।

রূপার কলিজায় কিন্তু শেল বিঁধে। এ কী বলল বউ? যদি মা হন! স্বামীর ঘর না করলে রূপা যে কোলে ছেলে পাবে না, মাতৃত্বের বিচারে বাবুর বউ যে সবসময়েই তার থেকে উতরে থাকবে সে তো জানা কথাই। তবু প্রসঙ্গটা উল্লেখ না করে কি থাকা যাচ্ছিল না? মাতৃত্বের আস্বাদ নিতে থাকা এক নারী আরেক নারীর মাতৃত্বের প্রতি এই কদর্য আঘাত ছুড়ে দেয় কী করে? রূপার পায়ের নিচে তো মাটি নেই, তবু সেই ‘নেই’ কথাটা স্মরণ করিয়ে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে না দিলেই কি ষোলোকলা পুরোচ্ছিল না?

বাবুর বউকে ঘেন্না করতে ইচ্ছে করে না রূপার, ঘেন্না আপনিই চলে আসে। তখন নিজেকেই ধমকায় সে, ‘অযথাই বউকে সন্দেহ করিস নে, রূপা। সে ইনোসেন্টলি বলেছে, তোর মন পেঁচালো, তাতেই সন্দেহ আসে তোর।’ বলেটলে শান্ত হয়ে বসেও রূপার কেন যেন মনে হতে থাকে মেয়েরাই মেয়েদের বড় শত্রু।

তা বটে! শত্রুই যদি না হবে তবে এক নারীর দুঃখে আরেক নারীর জ্বলে না কেন? কেউ কেউ আবার সেটা থেকেই আড্ডায় গসিপ জুড়বার মাল-মশলা খুঁজে নেয় কেন? কেন মাসদুই ধরে কাজ করা কাজের বুয়া ঘর মুছতে মুছতে অপ্রাসঙ্গিকভাবে আঘাত করে, ‘আফার জামাই অইন্যখানে চাকরি করে বুঝি? ভালা। বাপের বাইত বউ রাইখা গেছে, বুদ্ধি আছে ভাইজানের। দিনকাল ভালা না, একলা ঘর ভাড়া না লইয়া বাপের বাইত রাখনই ভালা হইছে। তা ভাইজানের ছুটি কবে অইব, এট্টু দেখতাম শখ যায়।’

রূপা গরম চোখে বলে, ‘খবরদার রিজিয়া, বকবক বন্ধ কর। দুদিন কাজ ফাঁকি দিয়ে এখন বকবক করা হচ্ছে।’

বুয়া বলে, ‘হ আফা। বন্ধ করি বকবক। গরিবের কথা হুননের কেউ নাই। কামাইও সাধে দিছি না। দ্যাশে গেছলাম বন্ধকি জমির মিটমাটে।’ তারপরই বড় একটা হাই তুলে বলে, ‘আগেরবারও যে দুই দিন কামাই দেছলাম, মাগনা না গো। হেইবার দ্যাশে গেছলাম চেয়ারম্যানের বাইত। ছোড বুইনঝিডারে জামায়ে খ্যাদায়ে দিসে! ছেমড়ির কী কান্দন! অহন সালিশে মিলায়ে দিয়ে আইছি। জামাইরে নগদ দশও দিওন লাগছে। নাইলে মানে না।’

রূপার শরীর জ্বলতে থাকে। বুয়ার কথাগুলো কি নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক, নাকি ইঙ্গিত বহনকারী কিছু? হয়তো বাড়িতে কানাঘুষা হয়েছে, বুয়া বুঝে নিয়েছে এ-বাড়ির ছোট মেয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছে। অথবা বুয়া কি এলাকার অন্য বাড়িতেও কাজ করে না? সেখান থেকেই কি রূপার এই খবর তার কানে আসতে পারে না? আজ সেই খবর উগরে দিয়ে বুয়া কি এটাই বুঝিয়ে গেল না, আমি কাজের বুয়া বলে চোখ রাঙিও না রূপা; তোমার খবর আর গোপন নেই, আমরা সবই জানি। ঢিঢি পড়ে গেছে এলাকায়, না জেনে উপায় কী? তা আমি গরিব কাজের বুয়া হতে পারি, তবে জানি কী করে মেয়ে স্বামীর ঘরে পাঠাতে হয়। আমার সঙ্গে মেজাজ দেখিও না। দেখালেও লাভ নেই। আমি সবই বুঝি, যে-মেয়ের স্বামীর বন্ধন নেই তার মেজাজের কানাকড়ি দাম কী?

দূর, কীসব ভাবছে সে? মূর্খ বুয়া অতকিছু ভেবে কি আর বলেছে নাকি? নিজের ওপরই বিরক্ত হয় রূপা। তবু মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা খচখচানি থেকেই যায়, শান্তিনগর থেকে এসে অবধি যেটা সবসময়েই ছিল। রাস্তায় বেরোলে মাথা উঁচু করতে অস্বস্তি লাগত তার। জবুথবু হয়ে হাঁটত রূপা, যেন সে কারো চোখে পড়া থেকে বাঁচতে চাইছে। এমনকি পরিচিত কারো চোখে চোখ ফেলে কথা বলতেও এখনো সাহস পায় না সে, যদি ফট বলে বসে, ‘এই যে অনেকদিন বাপের বাড়িতে যে? জামাই কেমন? আসে-টাসে না এদিকে বুঝি?’

রূপা বাইরে খুব কমই বের হয়। কিন্তু ঘরেই কি খুব শান্তিতে আছে নাকি সে? বাসায় একটা আত্মীয় এলেও রূপার কাহিল লাগে। মনে হয় আফসোসের আড়ালে তার দৈন্যকে উপহাস করতেই বুঝি এরা এসেছে, ‘তুমি যে কী করেছ আমরা সব জানি গো। তুমি আর তোমার মা যতই জামাইয়ের নেশার দোষ দাও, ভেতরের খবর কি আর বুঝি না আমরা? ডাল মে কুছ কালা হ্যায়, একহাতে তালি বাজে না গো! ওসব নেশাটেশা বাজে কথা! মেয়ে চলে এলে এমন বুলি কতই শোনা যায়, নিজের মেয়ের দোষ কইতে কি আর কারো ভালো লাগে?’

তা আত্মীয়স্বজন মুখফুটে এসব কথা কেউ বলেননি সত্যি, কিন্তু রেহানার মুখে শুনতে শুনতে তাদের কারো কারো মুখের ভাবে কিন্তু অবিশ্বাসই ফুটে ওঠে। সম্পর্ক নষ্টের ভয়ে ‘একহাতে তালি বাজে না’ কথাটা নেহাত যুদ্ধ করেই পেটে ঠেসে রাখা হয়, রূপা জানে বাইরে গিয়ে এ-বাড়ির চা-নাশতা হজম হওয়ার আগেই কথাটা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করবে অভ্যাগতরা।

রূপার কাছে জগৎ বিস্বাদ লাগে। আত্মীয়দের অবাঞ্ছিত মনে হয়। ইস্স, কেউ যদি না আসত! সত্যি কেউ না এলে রূপা খুশিই হতো। একটু স্বস্তি কি অন্তত পেত না?

স্বস্তি? অতি দুঃখে রূপার হাসি পায়। স্বস্তি ওই অভিশপ্ত সন্ধ্যাতেই বিদায় নিয়েছে, স্বস্তি রূপার কপালে নেই। আত্মীয়রা না এলেও স্বস্তি রূপা পেত না। নিজের বোন আসবে খবর পেলেই যে রূপার হাত-পা আজকাল পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যায়, তার আবার স্বস্তি!

বটে। রুনা এসেছিল এই সেদিন। রূপা কেমন কেঁচো হয়ে রইল। আপা তো বরং মায়ের চেয়ে বেশি বন্ধু ছিল, এখনো আছে। এমনকি রূপার জন্য সেদিন কেঁদেছেও রুনা। তারপরও কেন যেন মনে হয় তাল কেটে গেছে সম্পর্কের। রূপার নিজের কাছেই এখন তার জন্য আপার অশ্রুপাতে ভালোলাগার চেয়েও আপার তুলনায় নিজের দুর্দশাটা বিঁধে বেশি। সে সন্ধ্যায়ও আপা তার জন্য কেঁদেছে – এই ভালোলাগার চেয়ে সে অসহায়-দুর্বল এই চিন্তাটাই তাকে বেশি পীড়া দিচ্ছিল। সারা সন্ধ্যা রূপা কাটিয়ে দিয়েছিল নিজেকে অবচেতনে ধিক্কার দিয়ে – এত খারাপ কপাল তার যে, বোনের হাসিমুখের বদলে তার কান্নার উপলক্ষ হতে হলো তাকে? এত পোড়াকপালি সে?

দুলাভাই রাতে খেতে আসার পর সেই অনুভূতিই বদলে গেল ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্সে – আপার জামাই মায়ের বাড়া ভাত পায়, রূপার জামাইয়েরও তো তাই পাওয়ার কথা ছিল। আরিফ কি আজ আসতে পারত না এখানে? মাতাল হোক আর যাই হোক, রূপা যদি ঘর না ছাড়ত তবে আরিফও তো ওইখানে দুলাভাইয়ের মতো কব্জি ডুবিয়ে গরুর রেজালা খেতে পারত। কপাল, রূপার পোড়া কপাল!

অথবা এই ঘরে বসে থেকেও খাবারঘরে পরিবেশনরত মায়ের মুখটা স্পষ্ট কল্পনা করতে পারে রূপা। ‘লজ্জা কেন, ফেরদৌস? আরো একটু নাও’ – বলে দুলাভাইকে রেজালা দিতে থাকা মায়ের হাসিমুখটার আড়ালে কি ছোট জামাইয়ের অনুপস্থিতির জন্য একটু হাহাকারও নেই? রূপা যদি না পালাত সেদিন মা তো কিছুই জানতেন না, বরং ভাবতেন সুখে আছে ছোট মেয়ে। এই ঘরোয়া পরিবেশে দুই জামাইকে একসঙ্গে খাইয়ে কী সুখীই না হতেন মা। রূপা সেটা হতে দিলো না। ধিক, রূপা! ধিক তোমার সহ্যশক্তিকে!

হ্যাঁ, ধিক্কার দিয়েই বুঝি রূপা নিজেকে পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার মতো শক্তি আহরণে শানিয়ে নেয়। তাই এক সকালে যখন সারাবাড়িতে একটা খবর চাউর হয়ে যায় তখন কেন যেন এ-ওর মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে খবরটা হজম করার চেষ্টা করতে থাকে।

‘রূপা চলে যাচ্ছে। ছোট আপা চলে যাচ্ছে।’

‘কই যাচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে?’

‘শান্তিনগর যাচ্ছে। শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে।’

রেহানা তীব্র প্রতিবাদ করলেন, ‘অসম্ভব। যেতে পারবি না তুই।’ রূপা তাতে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল, ‘শেষ একবার সুযোগটা দিয়েই দেখি, মা। মাসছয়েক হোমে ছিল, বুদ্ধি ফিরতেও পারে।’

রেহানার বুক ফেটে গেল। ওই যে সুযোগ দিতে বলেছিলেন, মেয়ে আজ সেই কথার শোধ নিচ্ছে! শাশুড়ি বাঁকা কথা বলবে এই ভয় দেখিয়েও ফেরানো গেল না রূপাকে, উলটো বলল, ‘কপালে থাকলে বাঁকা কথা মাটির কলসিও শোনায়। বাধা দিও না, মা!’

মনসুরের কানে খবরটা যদিবা একবারেই ঢোকে, খবরের তাৎপর্য অনুধাবন করতে তাকে বেগ পেতে হয়, অনেকক্ষণ পরে বলেন, ‘না গেলে হয় না?’

মনসুরের ঠোঁট কাঁপতে থাকে। রূপা কিন্তু খুব খুশি খুশি মুখে বলে, ‘নিশ্চিন্তে থাকো, বুড়ো খোকা, তেমন দেখলে ফিরে আসব।’

বাবু অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, এহেন খবরে একেবারে রূপার বেডরুমে এসে হাজির হলো। ভগ্নিপ্রেমের পরাকাষ্ঠায় মুখ টিপে হাসে রূপা। বাবুর ‘আচ্ছা যাও, কিছু হলে আমরা তো আছিই’ বলার ঠিক ঠিক আগে – গিয়ে কী হবে, থাকলে হতো না, আর কদিন দেখে ডিসাইড করো – বলা কথাগুলোর কোনো মূল্যই রূপার কাছে থাকে না।

রূপা দুর্মূল্যের বাজারের হাল বুঝেছে। অযথা মূল্য খরচ সে আর করবে না।

রাস্তায় নেমে আজ রূপার মনে হয় সে যেন অন্য মানুষ। হ্যাঁ, অনেক পাওয়া-না-পাওয়ার হিসাবের মাঝে রূপার ছোট্ট একটা লাভ হয়েছে। শক্ত হতে শিখেছে রূপা। রেহানার অসীম পীড়াপীড়িতেও সে কাউকে সঙ্গে আনতে রাজি হয়নি। উলটো বলেছে, ‘আমাকে তো বাবু বা বাবা কেউই আনেনি, আমি পালিয়েই এসেছিলাম। যেমন একলা এসেছিলাম তেমন একলাই ফিরব শান্তিনগরে। তুমি আর কথা বলো না তো, মা!’

হ্যাঁ, রূপা তার মধ্যবিত্তের খোলস ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

সেজন্যই বাবাকে দেওয়া কথা রূপা রাখবে না; ‘তেমন বুঝলে চলে আসব’ – কথাটার কোনো মূল্যই রূপার কাছে নেই। গৎবাঁধা নিয়মের কাছে ভালোবাসা যেখানে পরাজিত হয় সেখানে আবার ফিরে আসা কি এক নেশাখোরের হাতে চড়চাপড় খাওয়া, দুটোর মাঝে বিশেষ তফাৎ সে খুঁজে পায় না।

ও-বাড়িতে গেলে শাশুড়ির তীব্র হুলের ভয়, ‘কী, বাপের ঘরে জায়গা হলো না বুঝি’ বলে আত্মসম্মানে মরিচ ডলে দেওয়া অথবা আরিফের রণমূর্তি – কিছুই আর আশঙ্কা জাগায় না রূপার মনে। নেশাখোর স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন – এমন কোনো সংবাদ চোখের সামনে ভাসলেও হাত-পা ঠান্ডা হয় না রূপার। খবরের এক্সটেনশন হিসেবে স্বামীর মৃত্যুদ-, শাশুড়ির যাবজ্জীবন – এমন খবরও অর্থহীন মনে হয় তার। অথবা খবরে শয্যাশায়ী হওয়া বাবার পরিণতি,

মায়ের আঁচল চেপে কাঁদতে গিয়ে বারবার মূর্ছা যাওয়া, শাশুড়িকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে ইচ্ছে-অনিচ্ছেতে বাবুর বউয়ের দুফোঁটা অশ্রু ফেলা, বড় আপার ফুলে লাল হওয়া কান্নাভেজা চোখদুটো অথবা থানা-পুলিশ-মামলা-উকিলবাড়ি করে ক্লান্ত হওয়া বাবুর ঘর্মাক্ত মুখও রূপার মনের কোণে কোনো বন্ধনের দাবিতে একটুকু ঝড় তুলতে পারে না, উলটো শুকনো ঠনঠনে চোখে নির্বিকারে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে রূপা।

রূপা আজ কারো নেই। রূপা আজ নিজেতে বিলীন হয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: