বৈশাখ,  এসো  হে

লেখক: বদরুন নাহার

সুমিত চলে যাওয়ার পর, সেই মার্চেই বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু কুইন্সের জ্যামাইকায় পথঘাট ছিল বৃষ্টির পানিতে ভেজা আর স্যাঁতসেঁতে। পারসন্স বুলেভার্ড থেকে জ্যামাইকা অ্যাভিনিউ বা উঁচুতে উঠে হিলসাইড সবখানের ফুটপাতগুলো যেন কালো আর চকচকে হয়ে উঠল। সেইসঙ্গে দুই-এক বস্নক পরপর জেব্রাক্রসিংয়ের ঢালগুলোতে জমাট পানি। বৃষ্টিতে আমার খুব একটা অসুবিধা হয় না। বরং ভালোই লাগছিল এই ভেবে যে, বাংলাদেশে এখন চলছে কালবৈশাখি, আমি না-হয় খানিকটা ভেজাপথেই হাঁটি। যদিও এদেশে আসার সঙ্গে সঙ্গে অতিহিতৈষী একজন খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, ‘আপনি নিজের লোক বলেই বলছি ভাবি, এই দেশে ঢুকতে হলে নিজের আগের সব পরিচয়কে দেশেই কবর দিয়ে আসতে হবে। তা না হলে এদেশে থাকতে পারবেন না। কী ছিলেন? কী ছিল! এইসব ছুঁতমার্গ ধরে বসে থাকলে কিচ্ছুটি করতে পারবেন না। এ আপনার নতুন জীবন, তাকে শুরু থেকেই শুরু করতে হবে।’

কথাটা আমার খুব মনে ধরেছিল। যদিও তিনি নিজেই নিজেকে কবর দিতে পেরেছেন কি না তা নিয়ে আমার সন্দেহ তৈরি হলো। যখন তিনি মিসেস রহমানের প্রসঙ্গে গল্প বলতে শুরু করলেন। মিসেস রহমানের পোশাক-আশাক আর তাঁর ছেলেমেয়েদের ডরমিটরিতে থাকা প্রসঙ্গটির উপস্থাপনা ছিল বেশ সেকেলে, আর তাই গল্পটি আমার সন্দেহের উদ্রেক ঘটায়। তবে তাঁর হিতোপদেশ প্রায়শ আমার মনে পড়ে, সে-বিষয়টি আমি ভুলতে পারি না। আসলে তিনি না বললেও আমার ইচ্ছা ছিল জীবনটাকে নতুন করে শুরু করা। আমি আসলে সে-পথেই হাঁটছি। নিউইয়র্ক ইজ অ্যা মেল্টিং পট অ্যান্ড ডাইভারসিটি ইজ দ্য বিউটি, আমাকে আচ্ছন্ন করেছে। মি. মার্ক জনসনের ক্লাসে ভর্তি হয়ে আমি বেশ খুশি। মি. মার্ক, জার্মান থেকে এসেছেন। ক্লাসে অন্তত পাঁচটি দেশের নাগরিক রয়েছে। এ তো এক নতুন জীবনই, আমি বেশ উপভোগ করছিলাম। কিন্তু নিজের সবটা কবর দেওয়া নিয়ে নিজের ভেতর তখনো যুদ্ধ চলছে। বিশেষত এটা তো সত্য, যতদিন সুমিত দেশে থাকবে ততদিন তা সম্ভব নয়। আমাদের সমস্যাটা দূরত্বের, নাকি সময়ের, সে-বিষয়ে এখনো মীমাংসা হয়নি। তবে সুমিতের মতে, পিএম-এএম সমস্যা। মি. মার্ক আমাদের প্রতিদিন নতুন নতুন ট্রু স্টোরি পড়াচ্ছেন। কিন্তু গল্প কখনো সত্য হয় কি না সে-বিষয়ে আমার বেশ সন্দেহ থেকে যায়। তবু আমি নতুন জীবনে মনোযোগী। এপ্রিলের শুরুতেই আমার মনে ভয় ঢুকে গেল! গল্প সত্যি হোক আর না-ই হোক, আমি অনেক আগে থেকেই ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতার এই লাইনগুলোকে সত্যি বলে মেনে নিয়েছি।

April is the cruellest month, breeding

Lilacs out of the dead land, mixing

Memory and desire, stirring

Dull roots with spring rain.

যদিও প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবেশীর উঠোনে টিউলিপের হাসিতে পিংক-ইয়েলো-হোয়াইট আর পারপেল রঙের বাহারে কখনো কখনো মনে হতো টি এস এলিয়ট কেন ওরকম বলেছিলেন! অমন বরফের মাটি ফুঁড়ে এমন সব ফুলেল হাসি আমাকে বিভ্রান্ত করে, বিশ্বাস হারাতে বসি। ছিয়াশি বছরের মি. মার্ক যখন হাসতে হাসতে বলেন, ‘বিলিভ মি, অ্যাই অ্যাম এ ইয়াং গাই।’ তখন আমার তাঁর কর্মচঞ্চলতায় তা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। সহসা আমি দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে যাই অনায়াসে, মেট্রোর পেটে ঢোকা পর্যন্ত মনেই থাকে না, কতটা পথ এলাম? সত্যি সবটুকু নয়, কিছু কিছু কবর তো ইতোমধ্যে খুঁড়ে ফেলেছি! আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভয়ংকর এপ্রিল মাসেও আমি সুখ অনুভব করছি! রাস্তার চেরিঝাড়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে পোস্ট দিলাম, জাপানি বাবল টি-র দোকানের দেয়াল জুড়ে যে-পাখির পালকের ডানা মেলে রাখা আছে সেই ডানা দুটোকে টেনে পড়ে নিয়েছিলাম। ৮৬ বয়সের মি. মার্ক যদি ইয়াং গাই হয় তবে তাঁর থেকে অর্ধেক বয়স নিয়ে আমি সিক্সটিন হতেই পারি। ছবি পোস্ট হতেই ইনবক্সে মেইল এলো, সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পার হতে। আমি হাডসনের তলদেশ দিয়ে ফিরছিলাম। বাংলাদেশ থেকে আমার ছেলেবেলাকার বান্ধবী লিখেছে, ‘বাহ্, শিখা তুমি তো এখনো ছোটই আছ! আমরা কেবল বড় হয়ে গেছি!’

পৃথিবীটা আসলেই ছোট, না হলে আমার মফস্বল শহরের সেই বন্ধুটি ছবি আপলোড হওয়ার মাত্র এক মিনিটের মাথায় এমন চিঠি পাঠাতে পারত! আমার বেশ মজা লাগে, রিপস্নাই দিই, ‘তাই নাকি?’ উত্তরও চলে আসে, ‘হ্যাঁ, আমরা তো মা হয়ে গেছি, তুমি সেই খুকিটিই রইছো।’

আহা্! এ যেন আমার স্মৃতি খুঁড়ে বের করা। মায়ের শেস্নাকটিই প্রথম মনে এলো, ‘হাসতে হাসতে কইব কথা, মগজে গিয়ে লাগবে ব্যথা।’ আমি একটা হাসির ইমো দিয়ে লিখলাম, ‘ইরাবতী, তুমি পারোও বটে!’ ও একটা লাভ ইমো পাঠালো। আমি মোবাইলটা ব্যাগে পুরে, শতবর্ষ পেরোনো রংহীন পাথুরে মেট্রোর সিঁড়ি ভেঙে উঠে পড়ি। কিউ-৬৫ বাস নিয়ে চলে যাই গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল পার্কওয়েতে, তারপর হাঁটতে থাকি। ইরাবতী আর আমি একসময় হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। বেড়াডাঙ্গা, সজ্জনকান্দা, রেলকলোনি পেরিয়ে জলার পাড় গার্লস হাইস্কুল। ইরাবতীর সঙ্গে দেখা হয় না কতকাল! ফেসবুকে দেখেছি, দারুণ সংসারি একটা মেয়ে হয়েছে। একটাই মাত্র প্রোফাইল ছবি। হিজাবপরা ইরাবতীর দুই কাঁধের কাছে দুটি ছেলেসন্তান। দারুণ সুখী-সুখী মুখের ইরাবতী। আসলেই ওর মুখে একটা মা মা ভাব প্রকটভাবে জেগে আছে। এতো বছর পরও ইরাবতীর কথার ধরন কিন্তু একটুও পালটায়নি। ও খুব ভালো করেই জানে, আমার আর সুমিতের কোনো ছেলেমেয়ে নেই। তাই সেই জায়গাটি তুলে ধরতে ওর ভুল হলো না। আমাকে যেন স্মৃতির তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ইরা। ম্যাপল গ্রোভ পার্কের বেঞ্চিতে  বসে আমি সেই অমস্নমধুর স্মৃতিতে ফিরে যাই।

কত সাল তখন? নববই, নাকি বিরানববই? আমাদের ফিরোজা রঙের স্কুল ড্রেস ছিল, আমি খাটো, ইরাবতী লম্বা। আমার গায়ের রং তামাটে, ইরাবতীর খানিকটা গাঢ়। আমার লালচুল, ইরাবতীর কালোচুল। আমাদের বইখাতা সব একই রকম ছিল; কিন্তু ভাবনাগুলোর ফারাক ছিল বিস্তর। আজ এত বছর পর আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে, ইরাবতী! আমার বয়সকে অবজ্ঞা করতে, নাকি আমার মাতৃত্বের শূন্য আকাশে মেঘ সঞ্চার করতে এমন বলল?  খুব একচোট হেসে উঠলাম। পার্কে এক ভদ্রমহিলা কবুতরের ঝাঁককে ভুট্টা খাওয়াচ্ছিলেন, চকিতে তিনি থেমে গেলেন। আর আমার দিকে উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘হ্যাভ অ্যানি গুড নিউজ?’

আমি বললাম, ‘ঠিক ধরেছো।’

তিনি আমাকে গডের কৃপা পেতে আশীর্বাদ করলেন। আসলেই জীবনটা কত অদ্ভুত, নাহ্। চাইলেই সবকিছু কবর দেওয়া যায় না। আমার মায়ের শেস্নাকগুলো ফিরে ফিরে আসে, মা বলতেন, ‘অতিবড় সুন্দরী না পায় বর, অতিবড় ঘরনি না পায় ঘর।’ আর আমি তো দেশছাড়া! একবার আমরা মানবতা রক্ষার নাম করে একটা সংগঠন করেছিলাম। আমাদের মফস্বল শহরের ছিন্নমূল শিশুদের পড়াশোনা আর চিকিৎসার ভার তুলে নিতে। অথচ একদিন আমাদের পড়াশোনার পাট চুকে গেল, আমরা শহর ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। আর নিজেদের উপার্জিত আয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে ওইসব শিশুর কথা মনেই থাকল না! আমরা ছুটতে ছুটতে অনেক কিছুই ভুলতে বসেছি! আমাদের চিন্তাগুলোও বদলে যেতে লাগল! বহু বছর পর আমার খুব মনে পড়ল সেই প্রথম প্রেমিকের কথা! সুমিতের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আমি যার প্রেমে পড়েছিলাম। সেই ছোট শহরে বসে কেউ প্রেম করলেই একটা ঢিঢি পড়ে যাওয়ার ব্যাপার ছিল। আমার ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো অবকাশই বা কই! যথেষ্ট আগ্রহী প্রেমিককে ডিঙিয়ে আমি বিপুলকে বেছে নিয়েছিলাম। বাকি সবার তখন এছাড়া কী আর উপায় ছিল? কানে কানে কথাটা মা জেনে গেলেন। বাড়িতে নানা অনুশাসন নেমেছিল ঠিকই, তবে তা অতিক্রম করা আমার জন্য খুব একটা কষ্টের ছিল না। সবার ছোট বলে অতটা কঠোর হবার ধৈর্য মায়েরও অবশিষ্ট নেই। তাই চলছিল ভালোই, কিন্তু বিপুলের মা যেদিন আমার পথের মাঝে এসে দাঁড়ালেন, সেই পাহাড় ডিঙাবার ভাষা তখনো রপ্ত করিনি। আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, ‘আচ্ছা শুনেছি তোমার বড়বোনের বিয়ে হয়েছে ম্যালাদিন, বাচ্চা-কাচ্চা নেই ক্যানো?’ কথাটায় আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু সে-কারণে আমার আর বিপুলের প্রেম ভেঙে যায়নি। প্রেমটা বিপুলই ভেঙে দিয়েছিল, আমি নাকি অতিবাচ্চা একটা মেয়ে! সেই দুঃখে আমি কতদিন স্বপ্নে সুইসাইড করেছিলাম! ভাগিস সত্যি সত্যি করিনি। আর এতো বছর পর ইরাবতীর কথায় মনে হলো সেই প্রেমটা ভেঙে গিয়ে ভালোই হয়েছে। বিপুলের মা আমার বোনের বাচ্চা হওয়া নিয়েই যে চিন্তিত হয়েছিলেন! আমার আর বিপুলের বিয়ে হলে যদি বাচ্চাই না হতো, তখন নিশ্চয়ই তিনিই সুইসাইড করতে যেতেন। আমি আবারো হো-হো করে হেসে উঠি। এই দেশে এই একটা বিষয় খুব মজার, নিজের ইচ্ছা হলে অনেক কিছুই করা যায়। পাছে কেউ বলার নেই। ইচ্ছে হলো ট্রেনে চেপে চলে যাওয়া যায় কনি আইল্যান্ড বা স্ট্যাটেন্ট আইল্যান্ডে। যদিও ওই সংরক্ষিত সমুদ্রসৈকত বা স্ট্যাটেন্ট আইল্যান্ডের স্ট্যাচু অব লিবার্টির মোহ প্রথম দর্শনেই কেটে যায়। বরং এর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ওয়েস্ট ভিলেজের যে-কোনো বার উইথ রেস্টুরেন্ট। হ্যাং-আউটের জন্য সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। একটা হ্যাপি আওয়ার ড্রিংকসের স্বাদে পার করে দেওয়া যায় আরো দশটি উইকস ডেজ। আমি পৃথিবীর রাজধানীতে বসে অতীত-বর্তমানের সুখগুলো খুঁজে নিই। এই বিকেলবেলায় সুমিতের ফোন পেয়ে চমকে উঠলাম। কী ব্যাপার? এখনো ঘুমাওনি?

সুমিত জড়ানো কণ্ঠে বলে, ‘ঘুমটা ভেঙে গেল। তুমি কোথায়?’

বাংলাদেশে এখন রাত সাড়ে তিনটা বাজে। আমি বলি, ‘এখন বেশি কথা বলো না, কথা বললে ঘুম দূর হয়ে যাবে। বরং আবার ঘুমানোর চেষ্টা করো।’

না, বলো তুমি কোথায়?

আমার মাথায় মুহূর্তে দুষ্টুমি ভর করে, ‘বলি, পার্কে, প্রেম করছি।’

তাই নাকি? কার সঙ্গে?

নিজের সঙ্গে।

উনিশ বছরের সঙ্গ কাটিয়ে কেবল নিঃসঙ্গ হতে চাইছিলাম আমরা। কিন্তু পৃথিবীটা বেশ ছোট, চাইলেই কবর খোঁড়া যায় না।

এলহামের সঙ্গে হঠাৎই পরিচয় আমার। এই দেশে আমি বাঙালি কমিউনিটিতে খুব একটা মিশি না। এই বিষয়টিকে নানাভাবে ভাবতে পারেন। আমাকে উন্নাসিক বলে বাজেয়াপ্তও করতে পারেন। কিন্তু সত্যি করে বলছি, আমাদের ক্লাসের আনিতা যখন ডেকে উঠলেন, ‘অ্যাই ভাবি …।’ আমি শুরুতে বুঝতে পারিনি কাকে ডাকছে। পরে তিনি আবার বললেন, ‘শিখা ভাবি।’ তখন আমি ফিরে তাকাই, আনিতার চোখের দিকে হাসি ছুড়ে দিয়ে বলি, ‘আমার হাসব্যান্ডকে আপনি চেনেন?’

তিনি বোকা বনে যান। আমি তখন অমায়িক কণ্ঠে বলি, ‘ওই যে, আমাকে ভাবি বললেন যে! আপনার স্বামীকেও আমি এখনো দেখিনি। আমাকে শিখা বলতে পারেন, কিংবা আপা।’ আনিতাও হেসে ওঠে, ‘আসলেই, কেন যে ভাবি বলি! বুঝলেন, অভ্যেস।’

ভাবি বা বউদি ডাক আমার একেবারেই সহ্য হয় না। আর বাঙালি কমিউনিটির পার্টিতে ভাবি ভাবি ভাবভঙ্গি ছাড়া আপনি গল্পই জমাতে পারবেন না। আর ওই মোটা মোটা মুরগির মাংসের বিরিয়ানি খেতে খেতে গুষ্টি উদ্ধার করা গল্পের স্রোতে ভেসে বেড়াতে আমি এখানে আসিনি। নিজেকে বাঁচাতেই আমি এসব পার্টি এড়িয়ে চলি। এলহামের সঙ্গে পরিচয়টা কোনো পার্টি-সূত্রে নয়। কদিন আগে উডহ্যাভেনে মেট্রোর সিঁড়িতে পরিচয়। আমি মল থেকে কিছু কেনাকাটা করে ফিরছিলাম। সিঁড়ি বেয়ে নামছি, হঠাৎ দেখি স্ট্রলারে বাচ্চা একটা ছেলে বসে, পেছনে কেউ নেই, ওটা চলছে! আমি দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেললাম। দৌড়ের সময় আমার মুখ থেকে স্বভাবতই চিৎকার বেরিয়ে এলো, ‘হায় আল্লাহ্!’

সেই শব্দে এলহামও দৌড়ে এলো। তখনই পরিচয়। এই দেশে হাজারো প্রবাসগল্পের মধ্যে এলহামের বিষয়টা একেবারেই আলাদা। আর তাই কি ক্রমশ এলহাশ আর তাঁর ছেলেটি আমার সর্বক্ষণের চিন্তায় ঢুকে গেল! আমি এখন নিজেকেই খুব ভালোবাসি। ভাবছিলাম এতদিনে শুধু নিজেকেই ভালোবাসতে শিখেছি। কিন্তু তাদের মুখ আমাকে আচ্ছন্ন করে, আমি নিজেই কথার পৃষ্ঠে কথা সাজাই। অতি আগ্রহী হয়ে এলহামকে উইকএন্ডে অফার করলাম, ‘চলুন কনি আইল্যান্ডে সবচেয়ে পুরনো হটডগ খেয়ে আসি। এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রেসিপি।’ তারপর কারণে-অকারণে দেখা হতে থাকে আমাদের।

এলহাম বাংলাদেশে পেশায় একজন ডাক্তার ছিল। একদিন সন্ধ্যায় স্টারবার্কসের ছোট কফিশপের ভেতর বসে জানছিলাম তাঁর কথা। তখন ম-ম কফির গন্ধ চারপাশটা ছেয়ে ছিল। আমি বললাম, ‘একটা বিষয় লক্ষ করেছেন এলহাম? এই স্টারবার্কসের দোকানময় যে কফির ফ্লেভার তীব্রভাবে জড়িয়ে আছে তা কিন্তু এই কফির মগে চুমুক দিলে পাবেন না।’

এলহাম তুমুল হেসেছিল, হাসতে হাসতে সে কফির চুমুকে বিষম খেল। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল পানি, বলল, ‘আমেরিকায় এসে এই প্রথম এমন মন খুলে হাসতে পারলাম। এত সুন্দর করে সত্য কথাটি বলে না কেউ! কেবল সত্যের মুখোমুখি হই।’

আমি তাঁর হাসিটি তাকিয়ে দেখছিলাম, আর ভাবছি সত্য কথা সবসময় হাসি আনে না, তা আমার চেয়ে হয়তো অনেকেই আরো ভালো করে বুঝে থাকবেন, কিন্তু আমি বুঝেছিলাম ডা. রামেছা বেগমের সামনে বসে। ভদ্রমহিলা বেশ আন্তরিক আর বিনয়ী স্বভাবের ছিলেন। আমি কি নিজের অজান্তেই তাঁকে দুঃখ দিয়েছিলাম? না হলে আমার কথাটি শুনে তিনি অমন সপ্তাশ্চর্য দেখার মতো করে বাকহীন হয়ে চেয়ে থাকলেন কেন? নিজেকে সামলে নিতে বেশ সময় লেগেছিল ভদ্রমহিলার। তিনি তাঁর বিস্ময় লুকাননি। স্বীকার করলেন, তাঁর ডাক্তারি পেশার ২৫ বছর জীবনে কোনো মহিলাকে বলতে শোনেননি যে, সে কোনো সন্তান নিতে চায় না। ডা. রামেছার বিভ্রান্তি দূর করতে বললাম, ‘কিছু মনে করবেন না, আগে একবার চেয়েছিলাম, কিন্তু মিসকারেজ হলো। কষ্টটা সামলে উঠতে উঠতে সিদ্ধান্ত নিলাম আর নয়।’

এবার তিনি স্বস্তি পেলেন, আন্তরিকতায় ফিরে এসে বললেন, ‘আসলে খুব কষ্টের বিষয়টি। তবে হতাশ হবেন না, আশা রাখতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। একটা সন্তান না থাকলে নারীজীবনের পূর্ণতার অভাব থেকে যাবে।’

আমি তাঁকে হতাশ করতে চাইনি, কেবল আমার সিচুয়েশনটা বোঝালাম, ‘দেখুন আমার বয়সটা তো চলিস্নশ হয়ে গেছে, এখন সন্তান নেওয়ার ঝুঁকি মারাত্মক হতে পারে। আমার জন্য যেমন, তেমনি নাকি সন্তান বিকলাঙ্গ বা কোনো সমস্যা নিয়ে জন্ম নিলে, এই বয়সে সামলাতে পারব না।’

ডাক্তার হিসেবে মিসেস রামেছা আমাকে অনেক ভরসার খবর দিতে চাইলেন, কিন্তু আমি তাঁকে থামাতে বাধ্য হলাম। ‘দেখুন, আমি এ-বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আপনি বরং পিরিয়ডের সার্কেলটার সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার একটা সমাধানের পথ বলুন।’ এ-কথার পর ডা. রামেছা আমাকে রেফার করে দিয়েছিলেন। অথচ এখন আমি যখনই এলহামের দিকে তাকাই, তার মুখে কেবল তাঁর সন্তানের ছায়া দেখতে পাই। এখন কেন আমার মনটা ওই শিশুটির জন্য কাঁদছে?

এলহাম অবৈধ অভিবাসী। সন্তানের জন্য জীবনের অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছে। এখনো নানা ফন্দি খুঁজতেই সে ব্যস্ত। কী উপায়ে বৈধতা পাবে? দেশ থেকে কতদিনে শিশুটির মাকে আনতে পারবে? কিংবা আদৌ আনতে পারবে কি? আমার আর এলহামের জীবনের যুদ্ধটা ঠিক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আমি বাকিটা জীবন নিজেকে ভালোবেসে বাঁচতে চাই। এলহাম সন্তানের জন্য নিজের অতীতকে কবর দিতে চায়। এলহাম বলল, ‘সবচেয়ে সহজ উপায়টি কি জানেন?’

কী?

একজন বৈধ অভিবাসীকে বিয়ে করা।

এ-কথায় আমার ভীষণ হাসি পেল। ‘তাই নাকি? গাছ কেটে গাছের মাথায় পানি ঢালবেন?’

হাসবেন না, শিখা। আমি কিন্তু সিরিয়াস।

আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়ি, আমাকে এফ ট্রেন ধরতে হবে। এটা এপ্রিল মাস। দারুণ সব ফুলের আয়োজনে নিউইয়র্কের প্রকৃতি শ্বেতশুভ্র বরফের কষ্ট ভুলে গিয়েছে। কাঁধ থেকে ভারী পোশাকের বহর নামিয়ে রেখে তারা উন্মুক্ত পোশাকে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশে দ্বিধাহীন। আমাকে এফ ট্রেন ধরতে হবে। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা থেকে কালো আমেরিকানদের দাপট কমিয়ে শক্তিশালী হচ্ছে বাঙালি কমিউনিটি, বেশ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে সেদিন এক উবার চালক জানালেন। জ্যামাইকা মসজিদে সবচেয়ে বড় ঈদের নামাজে রাস্তা বন্ধ থাকে, খুশিতে মেতে ওঠে প্রবাসী বাঙালি। আমার চোখে শুধু এলহামের শিশুটির মুখ, শিশুমুখ দেখব না বলে বহুপথ পেরিয়ে এসেছি। একজন বৈধ অভিবাসীর সঙ্গে এলহামের সম্পর্ক হলে শিশুটি পাবে বৈধতা! নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য যে অটিস্টিক শিশুটিকে নিয়ে এলহাম ছুটে এসেছে অবৈধ উপায়ে। আমাকে এফ ট্রেনেই ফিরতে হবে। তা না হলে অনেকটা পথ পিছিয়ে যাব। বহু দূর হেঁটে হেঁটে ফিরতে হবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: