মান্টোর সঙ্গে একদিন

লেখক:  আদনান সৈয়দ

(উর্দ সাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টোর একটি কাল্পনিক সাক্ষাৎকার)

গোটা দুনিয়া থেকে সেরা একশটি গল্প বাছাই করা সহজ কাজ নয়। তার ওপর আবার শর্ত হলো যে, গল্পগুলো মানবমন বিভিন্নভাবে আলোড়িত করেছে, মানুষের মনকে প্রবলভাবে বিদ্ধ করেছে এবং সেইসঙ্গে গল্পের সান্নিধ্যে এসে মানুষের মন ও মননের পরিবর্তন ঘটেছে। এই দুঃসাধ্য কাজটি করেছিল বিবিসি (ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন) গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের এপ্রিলে। পরের মাসে অর্থাৎ মে মাসে হে ফেস্টিভ্যালে এই একশটি গল্প নিয়ে বিবিসি কর্তৃপক্ষ একটি বিদগ্ধ আলোচনার সৃষ্টি করে। আনন্দের খবর হলো, বিবিসির জরিপে অংশ নেওয়া গোটা পৃথিবীতে নির্বাচিত মোট একশটি মহৎ গল্পের মধ্যে আমাদের উপমহাদেশের সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ও স্থান পেয়েছে। হোমারের ওডিসি, হ্যারিয়েট বেচার স্টোর অ্যাংকল টমস কেবিন, জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটিফোর, শেক্সপিয়রের হ্যামলেটের পাশে সাদাত হাসান মান্টোর গল্প পশ্চিমা বাঘা বাঘা সাহিত্যের মাঝে জায়গা করে নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আগেই বলেছি, যে-গল্পগুলো মানুষকে ভাবায়, সমাজকে নতুন রূপে গড়তে সাহায্য করে সেই মাপকাঠিতে মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ গল্পটি নির্বাচিত হওয়া খুব সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। বিবিসি শিল্প-সাহিত্য বিভাগকে এমন একটি মহতী উদ্যোগ হাতে নেওয়ার জন্যে সাধুবাদ। খুব জানতে ইচ্ছে করে পশ্চিমাবিশ্ব মান্টোকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করলেও আমাদের উপমহাদেশে মান্টো কেমন আছেন? মান্টো তার গল্পে সমাজে পিছিয়েপড়া মানুষের কথা বলেছেন, নারী অধিকার নিয়ে তিনি তাঁর লেখায় সবসময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। কিন্তু সমাজ পরিবর্তন করতে যে-লড়াইকে তিনি তাঁর গল্পের মূল সারবস্ত্ত তৈরি করেছিলেন সেই লড়াইয়ে তিনি কতটুকু জিততে পেরেছেন তাও প্রশ্নের খোরাক দেয় বইকি! মান্টোর মৃত্যুর দীর্ঘ সত্তর বছর পরেও আমাদের সমাজ কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে, এটাও এখন বড় একটি প্রশণ। নারী অধিকার নিয়ে মান্টো তাঁর সাহিত্যের প্রতিটি শব্দে যে আর্তচিৎকার করেছেন তাতে তিনি কতটুকু সফল হয়েছেন, সেটিও এখন বিবেচনায় আনতে হবে।

সাদাত হাসান মান্টোর জন্ম ১৯১২-এ, মৃত্যু ১৯৫৫ সালে। মাত্র ৪৩ বছরের জীবন তাঁর। সময়ের দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে সেটি ছিল আমাদের উপমহাদেশের জন্যে অশান্ত এক সময়। একদিকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, ধর্মের নামে নারীদের ওপর নির্যাতন – সবমিলিয়ে মান্টোর জন্মসময়টা খুব একটা ভালো সময় ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই কুৎসিত সমাজের ছায়া পড়েছিল মান্টোর সাহিত্যেও। দেশ বিভাগের দাঙ্গা, আমাদের বুর্জোয়া সমাজের ভ-ামি এবং তাদের অপকর্ম নিয়ে মান্টো সারাজীবন লড়াই করেছেন। মান্টোর সাহিত্য অশস্নীলতার দায়ে নিষিদ্ধ হয়েছে এবং এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তিনি ভারত ও পাকিসত্মানের আদালতের কাঠগড়ায় পর্যন্ত দাঁড়িয়েছেন; কিন্তু কখনো নতি স্বীকার করেননি। সালমান রুশদী তাঁকে আধুনিক ভারতীয় ছোটগল্পের অবিতর্কিত শ্রেষ্ঠ রূপকার (undisputed master of modern Indian short story) বলে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। লেখক খালিদ হাসান মান্টো সম্পর্কে বলেছেন, ‘মান্টো শুধু আমাদের দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের নয়, সারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লেখকদের একজন।’ তাঁর বিখ্যাত গল্পের মধ্যে রয়েছে ‘বু’, ‘টোবাটেক সিং’, ‘তামাসা’, ‘ঠান্ডা গোস্ত’, ‘কালি সালোয়ার’, ‘খালি বোতল’, ‘ধুঁয়া’ ইত্যাদি। তাঁর রচনায় দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা, মানব চরিত্রের বীভৎসতার ছবি বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রগতিশীল চিন্তায় উজ্জীবিত নতুন এক সমাজ। যে-সমাজকে সাম্প্রদায়িক বিষ ছুঁতে পারবে না, যে-সমাজে মানুষ হবে মুখ্য। প্রগতিশীল এই চিন্তাভাবনা তাঁর সাহিত্যে প্রবলভাবে চলে আসে। শুধু কথাসাহিত্য নয়, পাশাপাশি মান্টো চলচ্চিত্রেও নিজেকে জড়িয়ে রাখেন। দেখতে পাই, বোম্বাই চলচ্চিত্রজগতেও তাঁর অজস্র কাজ রয়েছে। আট দিন, চল চলরে নওজোয়ান, মির্জা গালিব ইত্যাদি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট রাইটিং তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছে।

সেদিন কাকতালীয়ভাবেই ঘটনাটি ঘটল। মান্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ। সেটাও কি সম্ভব? আজ থেকে অর্ধশতরও বেশি বছর আগে মান্টো আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন; কিন্তু তাও সম্ভব হলো। সেদিন ম্যানহাটন ফিফথ এভিনিউর একটি জমজমাট পাবে বসে একা একাই গলা ভেজাচ্ছি। ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটি। চোখের সামনেই দেখি হনহন করে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক হেঁটে পাবে ঢুকছেন। তাঁর মুখটি দেখতে অবিকল ঠিক সেই চেনা মুখটির মতোই। চোখে হালকা ফ্রেমের কালো চশমা। মাঝারি গড়ন। গায়ে সাদা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা। পায়ে কালো চামড়ার ফিতে আটা চপ্পল। আর কাঁধে সেই পরিচিত ঝোলা ব্যাগ। আমাদের চোখাচোখি হতেই বলে ফেললাম, ‘মান্টো না? সাদাত হাসান মান্টো?’ নিজের নাম শুনে ভদ্রলোক যেন একটু আঁতকে উঠলেন! সম্ভবত এই ম্যানহাটনের ফিরিঙ্গিপাড়ায় এভাবে কেউ মান্টো বলে চিৎকার দেবে তিনি তা ভাবতেও পারেননি। আমার দিকে হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে তিনি শুধু বললেন, ‘জি আমিই মান্টো।’ আমি এবার উঠে দাঁড়িয়ে মান্টোকে অভিবাদন জানালাম এবং আমার টেবিলের কোনার চেয়ারটায় বসার জন্যে ইঙ্গিত করলাম। মান্টো কোনো কিছু চিন্তা না করে সোজা আমার টেবিলে এসে বসলেন। এবার আমরা মুখোমুখি। বললাম, ‘চলবে?’

মান্টোর উত্তর, ‘চলবে।’

চলতে চলতেই আমাদের কথাবার্তা শুরু হলো। আমাদের সেদিনের সেই বাক্যবিনিময় আপনাদের সঙ্গেও শেয়ার করছি।

ধর্ম নিয়ে মানুষে মানুষে বৈষম্য আপনি দেখেছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে টোবাটেক সিংয়ের মতো নাটকও লিখলেন। বর্তমান এই সময়ে আপনার সেই ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে কী সাদাত হাসান?

আমার প্রশ্ন শুনে মান্টো প্রচ- অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। তারপর গলায় এক পেগ চালান করে দিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাকে হাসালেন। বলুন ধর্ম নিয়ে আমি সেই ১৯৪৩ সালে যা লিখেছিলাম আমার সেই কথা এখন পর্যন্ত খাঁটি। এখন পর্যন্ত ধর্মই মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আমাদের গোটা উপমহাদেশের প্রায় সব দেশের অবস্থাই একরকম। ধর্ম নিয়ে মারামারি, কাটাকাটি আগেও ছিল এখনো ঠিক আগের মতোই আছে। তবে আগের চেয়ে সমস্যাটা আরো প্রকট হয়েছে। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে মানুষ আগের চেয়েও বর্বর হয়ে গেছে। আগে হত্যাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। আর এখন হত্যা করা ধর্মীয় হাতিয়ার। দেখুন, সিরিয়া ধ্বংস হয়ে গেল, ইয়েমেন ধ্বংসসত্মূপের এক শহর। খোদ ভারতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় একদল উঠেপড়ে লেগেছে। পাকিসত্মান তো আগেই পচে গেছে। সব দেখেশুনে আমি প্রায় সময়ই নিজেকে বলি, ‘মান্টো, তুই এই বদমাশদের থেকে অনেক আগেই ভেগে চলে এসে বেশ ভালো কাজটিই করেছিস।’ আচ্ছা, আপনার গল্পের নায়ক সবসময়ই নির্যাতিতদের পক্ষে কথা বলে, মধ্যবিত্তদের অন্তরে পোষণ করা জ্বালা-যন্ত্রণাকে যেন উগরে দেয়। প্রখ্যাত ‍উর্দু লেখক আলি সর্দার জাফরির এ-মন্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখেন?

মান্টো : দেখুন, আমার গল্প নিয়ে আমি বহুবার বহু জায়গায় অনেক কথা বলেছি। আবারো বলছি। এই গল্পগুলোর চরিত্র, জীবনযুদ্ধ, ভাষা সবই আমার খুব কাছ থেকে দেখা। যে-জীবন আমি জানি না সে-জীবন নিয়ে গল্প হয় কী করে? যে-কারণে আমার গল্পের নায়ক-নায়িকারা যুদ্ধংদেহী। তারা মারমুখো। তাদের মুখের ভাষা এই আপনাদের ভদ্রসমাজের মানুষের মতো ঠিক পরিশীলিত না। তারা রাসত্মায় ঘুমায়, ফুলবাবু হয়ে গাড়িতে চড়ার লোভ তাদের হয়; কিন্তু সুযোগ কখনো হয় না। সর্দার জাফরির সঙ্গে একমত না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।

তাহলে প্রশ্ন একটা থেকেই যায়। আপনার গল্পের পাত্র-পাত্রী সবাই এতো মারমুখো কেন? পাশাপাশি খুবই প্রতিশোধকামী। একজন দালাল বেশ্যাদের অপমান করে নিজের ঝাল মেটায়, একজন হতাশাগ্রস্ত যুবক জীবনে কিছু না পেয়ে শুধু কল্পনায় একজন প্রেমিকার ছবি আঁকে। অবাক হই যখন এই বিক্ষিপ্ত চিত্রগুলো কোলাজ হয়ে আপনার গল্পের ফাঁদে এসে ধরা পড়ে।

গলায় আরেক পেগ ঢালতে ঢালতে মান্টো এবার চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর দুই চোখের মোহনায় নাকের উৎসস্থল কুঞ্চিত করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওপরে যতই শান্ত থাকুন না কেন, মনের ভেতরে যে দ্রোহটা নিত্য দাউদাউ করে জ্বলছে সেটি কি সত্য নয়? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো দেখি এই সমাজ, রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র-উৎপাদিত কলকব্জায় আপনি বন্দি না? আপনার কি বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে না? এই সমাজকে ভেঙে নতুন করে গড়তে ইচ্ছে করে না? দেখুন, এই শতাব্দীতে যখন আপনারা আপনাদের সভ্য বলছেন, তখন ট্রাম্পের মতো এক উগ্রবাদী প্রেসিডেন্টকেও আপনারা প্রেসিডেন্ট বানাচ্ছেন। লোকটা মানুষে মানুষে দেয়াল তৈরি করছে না? শুধু আপনার দেশ আমেরিকা কেন? গোটা পৃথিবী কি এই দোজখের আগুনে পুড়ছে না? তখন যে-কোনো বিবেকবান মানুষ কি প্রতিবাদী হবে না? আপনি হবেন না?

এবার ঠিক অন্যরকম একটি প্রশ্ন। আপনাকে কেন এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হলো? বয়স আর কতই বা হয়েছিল? ৪৩। নিজের শরীরের কোনো খেয়াল আপনি করেননি। প্রচুর উলটোপালটা গিলেছেন। হাতের কাছে যা পেয়েছেন তাই। এত পলায়ন ছিল আপনার মধ্যে? একটু ভাবলেন না আপনার ভালোবাসায় মাখা একজন স্ত্রী আছেন, আপনার ফুটফুটে কন্যা আছে? এই ভাবনাগুলো কাজ করেনি আপনার মধ্যে?

মান্টোর গলা এখন ভারি হয়ে গেছে। মাথা দুলিয়ে এবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, ‘ঠিক, এবার আসল জায়গায় আপনি ঝাঁকি দিয়েছেন। নাহ্! প্রথম প্রথম বুঝতে পারিনি। নেশা করে শালার এই সমাজটা থেকে দূরে থাকতে চাইতাম। মনে হতো পলায়নই মুক্তির উপায়। কিন্তু মৃত্যু বিষয়টা যে এত ভয়াবহ তা আমি উপলব্ধি করতে পারেনি। বিশ্বাস করুন আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক সামাজিক মানুষ। আমি জীবনকে ভালোবাসি। আমার স্ত্রীকে আমি ভালোবাসি।  মমতাজউদদীন আহমদ : অকুতোভয় নাট্যজন

 মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন

প্রভূত প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ বাংলাদেশের নাট্যভুবনে যাঁরা মুক্তবাতাস সঞ্চারণ এবং সজীব পরিবেশ নির্মাণে সর্বদা সচেষ্ট, মমতাজউদদীন আহমদ তাঁদের দলভুক্ত হয়েও ভিন্নমাত্রিক কর্মগুণে অনন্য। প্রতিভাদীপ্ত নাট্যকার, অভিনেতা, প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও কথক হিসেবে তাঁর পরিচয় দেশ-বিদেশে বিসত্মৃত। আন্তরিকতা, শ্রমনিষ্ঠা, প্রজ্ঞা, স্বদেশপ্রীতি এবং মানবিক মূল্যবোধ তাঁর এ-পরিচিতিকে করেছে অধিক সমৃদ্ধ। সমাজজীবন এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ বলেই তাঁর নাটকগুলো মৃত্তিকানির্ভর; ভিনদেশি নাটকও রূপান্তরগুণে পেয়েছে মৌলিকতার মর্যাদা। ব্যক্তিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক সমস্যা কিংবা অবস্থা চিহ্নিতকরণ, বিশেষত ভাষা-আন্দোলন ও স্বাধীনতাভিত্তিক নাট্যরূপায়ণে তিনি কুশলী কারিগর। তাঁর নাটকের চরিত্রগুলো কথা বলে কখনো ধীরলয়ে, কখনো উচ্চস্বরে, কখনো তির্যকভঙ্গিতে, কখনো রসালোভাবে, কখনোবা প্রতীকী ঢঙে। কথার পিঠে কথা সাজিয়ে গঠিত হয় সতেজ নাট্যসংলাপ, রচিত হয় সাহসিক বক্তব্য। নাটকের বাস্তবতায়, অভিনেতার ঋজুতায়, প্রাবন্ধিকের প্রাতিস্বিকতায়, সংগঠকের মমতায় এবং কথকের দৃঢ়তায় মমতাজউদদীন আহমদ উজ্জ্বল আর অকুতোভয় নাট্যজন।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুনীর চৌধুরী, নুরুল মোমেন ও আসকার ইবনে শাইখ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ ছাত্রছাত্রীর সমন্বয়ে নাট্যচর্চায় সংযুক্ত করেন নতুনমাত্রা। স্বাধীন বাংলাদেশে এসব নবীন নাট্যকর্মীই নাট্যান্দোলনের নেতৃত্ব দেন, গড়ে তোলেন গ্রম্নপ থিয়েটার কর্মকা-। মমতাজউদদীন আহমদ এ-নাট্যচর্চার অগ্রজ এবং সক্রিয় সদস্য। অভিনয় ছাড়াও স্বাধীনতার এক দশক আগে, ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রথম নাটক রচিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর রচিত ও মঞ্চায়িত নাটকগুলো যেন শত্রম্ন হননের হাতিয়ার এবং জনগণকে জাগরণের মন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। সাহসী মুক্তিযোদ্ধার মতো তিনিও এক নাট্যসৈনিক, যাঁর নাট্যায়োজন দেখে হাজার হাজার দর্শক স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তবে তাঁর এসব নাটক কেবল সেস্নাগানসর্বস্ব নয়, শৈল্পিক মানদ– অবশ্যই উত্তীর্ণ।

পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিকভাবে মমতাজউদদীন আবাল্য নাট্যিক পরিবেশে লালিত ও সমৃদ্ধ। মায়ের কোলে বসে নাটক-যাত্রা দেখা, স্বজনের অভিনয়-নেশা এবং বাবার নীরব নাট্যশিল্পপ্রেম তাঁর নাট্যকর্মী হিসেবে বেড়ে ওঠার অনুকূল স্রোত হিসেবেই বিবেচিত। তাঁর পেশা অধ্যাপনা, কিন্তু নেশা নাট্যচর্চা। তিনি বলেছেন, ‘নাটকের নেশায় যে একবার মজেছে তার আর উপায় নেই। বারবার তাকে আসতে হবে। তার ক্ষুদ্র ক্লিষ্ট সংসারে দারিদ্রে্যর শতছিদ্র বেদনা জড়িয়ে থাকুক, তার রুগ্ণ স্বাস্থ্যে অবক্ষয়ের যন্ত্রণা ঘিরে থাকুক, তবু তাকে আসতে হবে পাদপ্রদীপের সামনে। … সে চায় জীবনের সংলাপ যথাযথভাবে উচ্চারণ করতে।’ জীবনবাদী মমতাজউদ্দীন এই নাটক নাটক করে সত্তর বছরে উপনীত হলেন। নাট্যকর্মীদের জন্য তিনি বরাভয়। সত্যের কাছে মাথা নত করা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। তিনি ‘ভয়াবহ সব সত্য কথা বলেন, কোনো পরিণাম বিবেচনা না করেই।’ এজন্য তিনি অনেক সময় ক্ষমতাসীন শক্তির বিরাগভাজন হলেও মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন অকুণ্ঠ। শওকত ওসমানের দ্বিধাহীন স্বীকারোক্তি, ‘মমতাজউদদীন আহমদকে তখন থেকে ভালবাসতে শুরু করেছি, যখন থেকে দেখলাম, শোষকের ঘাস আর দানা ও খায় নি।’

নাটকের সাহিত্যমূল্য ও মঞ্চায়নসাফল্য একই সূত্রে গাঁথা। তাই নাট্যকলার প্রকৃত বিকাশের লক্ষ্য উপযুক্ত মঞ্চ প্রয়োজন। কিন্তু মঞ্চ কোথায়? মঞ্চের সাধ মিলনায়তনে মিটাতে হয়। এ-ব্যাপারে সরকারের তেমন মাথাব্যথা নেই। মঞ্চ মঞ্চ করে মাথা ঠোকেন কেবল নাট্যকর্মী দল। এক্ষেত্রে মমতাজউদদীনের পরিষ্কার অভিমত, ‘আসলে বাংলাদেশে একটিও নাট্যমঞ্চ নাই। প্রসেনিয়াম থিয়েটারের জন্য চার ফুট উঁচু একটা ঢিবি বেঁধে দিলেই তো হলো না। মঞ্চ মানে অনেক কিছু। আলো, দৃশ্যপট, মহড়াস্থল, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ইত্যাদি যাবতীয় আয়োজন ছাড়া মঞ্চ হয় না। ব্যবস্থা ছাড়াই কম্বল সম্বল করে নাট্যকর্মীরা মোক্ষ লাভের সন্ধান করছেন, নাট্যকর্মীদের এ অমানুষিক উদ্যোগ ও পরিশ্রমকে বাহবা দিতেই হবে।’ অনেকেই আছেন প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই প্রতিবাদহীন কাজ করে যান। আবার কেউ কেউ কাজও করেন, প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের জন্য সোচ্চারও হন। মমতাজ শেষোক্ত শ্রেণিভুক্ত। এতে কিছু ভালো কাজও হয়েছে। যেমন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চ।

শিল্পীর মানসিক স্বস্তি ও শামিত্ম ছাড়া কোনো সুস্থ শিল্পকর্ম হতে পারে না। মঞ্চ নাট্যশিল্পীদের ভাগ্যে এ-শামিত্ম খুব কমই জুটেছে। পারিবারিকভাবে মনে করা হয়েছে নাটক করা মানেই ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানো। আর রং মেখে সং সেজে কেউ নাটক করবে, এটা সমাজ যেমন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি, অনেক সময় রাষ্ট্রপক্ষও নয়। কারণ নাটক সত্য উদ্ঘাটন করে, শোষণ-নির্যাতন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, দর্শক-জনতাকে জাগিয়ে তোলে। ফলে প্রশাসনযন্ত্রের ভিত নড়বড়ে হতে পারে। এ-আশঙ্কায় নাট্যকর্মী ও নাট্যগোষ্ঠীর ওপর জারি হয় নানা বিধিনিষেধ। নাট্যকর্মীদের চাপের মুখে অশুভ নিষেধাজ্ঞা খানিকটা শিথিল হলেও অলক্ষে থাকে খবরদারিত্ব। এ-অবস্থার মধ্যেই নাটক করতে হয়। মমতাজউদদীন তাঁর যথার্থ চিত্র এবং জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন এভাবে, ‘নাট্যকর্মীদের আকাশে সারা রাত শুকতারা জ্বলে না। পূর্ণিমার আলোতে নরম ঘাসে আয়েশি পদচারণ নাট্যকর্মীদের ভাগ্যবিধাতা দিওয়ানুসুস রচনা করে যান নি। এদেশে রাহুকবলিত অবজ্ঞাত শত শত নাট্যকর্মীর ভাগ্য বড় নিদারুণ হতাশায় অকালে ঝরে গেছে। … নাট্যকর্মীদের একটি স্বাধীন ফেডারেশন গঠন করুন। নিরাপত্তার জন্য, বন্ধুত্বের জন্য। প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতায় সকলের বন্ধুত্ব নির্মিত হোক। কে করবে এ দায়িত্ব পালন? আমি, আপনি – আমরা।’ একজন সৎ, নির্ভেজাল, নিষ্ঠাবান ও নির্ভীক নাট্যজন ছাড়া এ-আহবান জানাতে পারেন না।

সত্য প্রকাশে বাধা থাকলে লেখকরা রূপকের আশ্রয় নেন। নাটক পাঠ করে এই রূপকের অর্থ অনুধাবন প্রজ্ঞাবান পাঠকের জন্য যত সহজ, মঞ্চদর্শকের জন্য তত সহজ নয় – বিশেষত বাংলাদেশের সহজ-সরল মানুষের কাছে। তাই মমতাজ বলেন, ‘আমরা রূপকে প্রকাশ করতে বসে রূপকের আশ্রয় গ্রহণ করছি। রূপই যখন অন্ধকার সেখানে আরো অন্ধকার রূপকে নিয়ে কতকাল চলব। বালুর মধ্যে মুখ লুকিয়ে উটপাখির আত্মগোপন স্বভাব আর কতকাল। সত্যকে সহজে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে যদি নির্ভর না হয়, আনন্দের আলো যদি পর্যাপ্ত শক্তি না পায়, তাহলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে আমাদের নাটক কিছুকাল গোলকধাঁধায় ঘুরবে। তারপর একদিন পালাবে।’ তার মানে এ নয় যে, মমতাজউদদীন রূপক ও নিরীক্ষাধর্মী নাটক রচনার বিপক্ষে কিংবা কেবলই ক্ষোভ ও ক্রোধ প্রকাশের পক্ষে। তিনি সত্যকে সাবলীল, রসালো, ব্যঙ্গাত্মক ও আন্তরিক দরদে চিত্রিত করতে অভ্যস্ত। তাঁর নাটকে জীবন ও শিল্পের মধ্যে কোনো বিরোধ না চরিত্রায়ন ও সংলাপের স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলীগুণে জীবনই প্রধান প্রতীয়মান হয়। এটি তাঁর সদর্থক জীবনভাবনা ও সমকাল সচেতনতার শিল্পিত রূপায়ণ-কৌশল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে। এ-আন্দোলন নিয়ে রচিত হয়েছে অমর গান, কবিতা, নাটক ও কথাসাহিত্য। মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকের পর ভাষা-আন্দোলনভিত্তিক দ্বিতীয় কোনো সার্থক নাটকের নাম উচ্চারিত হলে তা অবশ্যই হবে মমতাজউদদীন আহমদের বিবাহ। দুটো নাটকেই রয়েছে ভাষা ও দেশের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা এবং মানুষের অস্তিত্ববাদী চেতনা। ভাষা-আন্দোলনের পরের বছর রচিত বলেই কবর নাটকের শহিদ মূর্তিদের প্রতিবাদ ও বাঁচার আবেদন সুস্পষ্ট। তারা কবরে যাবে না। তারা মরেনি, মরতে পারে না। প্রকৃত অর্থে এখানে মৃত ব্যক্তির সদর্থক চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে জীবিতদের মধ্য। তারপর বীর বাঙালি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে কেউ কেউ স্বার্থের পাহাড় গড়েছে। কেউবা আশাভঙ্গের বেদনা কিংবা ত্যাগের মহিমাকে বছরের পর বছর লালন করে চলেছে। বিবাহ নাটকের সখিনারও সাধ ছিল, স্বপ্ন ছিল। সে যখন গায়েহলুদ আর হাতে মেহেদি মেখে বধূবেশে বসেছিল, তখন তার হবু বর বায়ান্নর উত্তাল মিছিলে ছুটে গিয়ে নিজ রক্তের বিনিময়ে ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করে। সখিনার চেতনায় সেই হলুদের রং রক্তের মতোই গভীর। মোছা যায় না। তাই স্মৃতি আর স্বপ্নের সাগরে ভাসমান কঠিন-করুণ সখিনার আবেদন, ‘আমার আনন্দ, গৌরব, সুখ, সংসার। কাকে দেব, কেমন করে দেব ছোট মামা। হলুদ শাড়ি – আমার ওই শাড়িতে যে বেঁচে থাকার প্রদাহ, দাহ লেগে আছে। না জানা ভালোবাসা ছোট মামা, আমার এক এক করে অনেক বছরের ফাল্গুন জমে আছে। আমি যে নীড় রচনার কাজে নিমগ্ন আছি। এই দেখলাম হাঁড়িতে ভাত টগবগ করে ফুটছে, কখনো শুনছি একটি সবল নরম কণ্ঠ এসে আমাকে বলছে : চল না নৌকায় চড়ে নদীর মোহনায় যাই। কখনো শুনি একটি কচিকণ্ঠের অমৃত কান্না বলছে : মা, ওমা আমাকে কোলে নাও, ঘুম যাব। ছোট মামা আকাশ, ঘর, পানি ভরা কলসি, বর্ণপরিচয়, দুঃখ, অভিমান, আমি যে এক এক করে এত বছর, সাতশো বছর – অন্ধকার, আলো, জীবন বুনছি – আমি বাঁচার জন্য।’ সখিনার বাবাকেও মমতাজউদদীন বাংলাভাষা, স্বাধীনতা ও মানবতার পক্ষের একজন দরদি মানুষ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকাতে শুনছি ছাত্ররা খুব ক্ষেপে গিয়েছে আতিয়া। মিছিল করবে, হরতাল করবে। করবেই তো। বাংলাভাষা যদি না থাকে তো কিসের দেশ, কিসের স্বাধীনতা।’ এবং ‘আমার মেয়ের জামাই জালেমের গুলিতে শহীদ হয়েছে। বাংলাভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। এ তো একটা ঘটনা না। এ তো ইতিহাস, এ তো একটা অগ্নিগিরি। আমি বলছি, আমার দেল বলছে – ওই ছেলেকে আমরা মাটির নিচে রাখব না। আমার ছেলেকে হরগিজ কবরে যেতে দেব না।’১০ আন্দোলন কিংবা যুদ্ধে নিহত ব্যক্তিদের কবরে না যাওয়া অথবা যেতে না দেওয়া Irwin Shaw-র Bury the Dead, মুনীর চৌধুরীর কবর এবং মমতাজউদদীন আহমদের বিবাহ নাটকে প্রতিবাদ হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে। এখানে কেউ কারো দ্বারা প্রভাবিত নন, বরং তিনজনই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মমতাজউদদীন মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ছিলেন চট্টগ্রামে কর্মরত। তাঁর পেশা অধ্যাপনা, নেশা নাট্যচর্চা। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং মুক্তির শুদ্ধচেতনায় জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্য তিনি নাট্যরচনা ও মঞ্চায়নে নিমগ্ন হন। এখানে নেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল তাঁর দেশপ্রেম। স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা নাটকে স্বাধীনতাবিরোধী চরিত্র নূর মোহাম্মদ যখন বলে, প্রয়োজন হলে লাখো মানুষের জীবন যাবে তবু দেশ ভাগ করা চলবে না, তখন নাট্যকার জনতার প্রতিনিধির মাধ্যমে জানান দেন, ‘প্রেমের জ্বালা আর স্বাধীনতার আগুন কখনো নিভে না।’১১ এবারের সংগ্রাম নাটকেও একজন নির্যাতিত মানুষ শত্রম্নর উদ্দেশ্যে বলে, ‘আমার হৃদয়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে এ আকাশ এ মাঠ আর সমুদ্রকে বলে দিচ্ছি, ভাইসব, এদের চিনে রাখ, এরা ধর্মের নামে, সংহতির নামে, নানা ফন্দির জাল বিসত্মার করে আমাদের শোষণ করছে। আর এদের ছেড়ে দিও না। এবার এরা ঘরে ঘরে ঢুকে প্রত্যেকের সন্তানকে হত্যা করবে। এরা খুনী। মানুষের রক্তের বিনিময়ে এরা সাম্রাজ্যবাদীদের ডেকে আনে, তোমরা এদের নির্মূল কর।’১২ স্বাধীনতার সংগ্রাম নাটকের জহুরুল এবং বর্ণচোরার মতিউরের কণ্ঠেও একই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার স্পৃহা ব্যক্ত করেছেন নাট্যকার মমতাজউদদীন।

স্বাধীন দেশের সূচনালগ্নে মানুষের যে বিপুল কল্যাণ-প্রত্যাশা ছিল, যুদ্ধ-উত্তর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে তা বহুলাংশে পূরণ হয়নি। বিত্তবান ও বিত্তহীনের বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যুবসমাজ প্ল্যানচেট

সাত্যকি হালদার

কথা হয়েছিল এক বছর পরে আসার। কিন্তু তা হলো না। ফিরে আসতে এক বছর পার হয়ে গেল।

গতবার এসেছি বর্ষা আসার মুখে মুখে। দক্ষিণবঙ্গে অসহ্য গরম তখন। কিন্তু এখানে বাতাসের তাপ হালকা হয়ে এসেছিল। এখানে কালচে মেঘ জমতে শুরু করেছিল পাহাড়ের মাথায়। সারাদিন ধরে বোঝা নিয়ে চলা মেঘের সারি, তার নিচে পাহাড়ের সবুজ যেন বৃষ্টির অপেক্ষায় হাত তুলে রয়েছে। পুলকদাই আমাদের টেনে এনেছিলেন এখানে। জায়গাটা চিনিয়েও ছিলেন উনি। এমন কত জায়গা যে আমাদের চিনিয়ে দিয়ে গেলেন তার সত্যিই শেষ নেই।

কিন্তু এ-কথা নিশ্চিত জানতাম পুলকদা থাকলে দ্বিতীয়বারের আসা আমাদের হতো না। কোনো ফিরে আসায় বিশ্বাস ছিল না ওঁর। বেড়ানোর জায়গায় নয়, সম্পর্কেও নয়। এই যে ডুয়ার্সের প্রামেত্ম পাহাড় জঙ্গল আর নদীর ত্রিভুজে ঘেরা একটুকরো ভুটিয়া জনপদ, যেখানে হাতড়ে হাতড়ে গিয়ে পৌঁছলে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায়, এ-কথা উনিই একদিন শুনিয়েছিলেন আমাদের। বালুরঘাটের পাড়ার আড্ডাতেই কথা আর শব্দের টানে মেলে ধরেছিলেন ছবিটা। তারপর ফিসফিস করে বলেছিলেন, যাবি নাকি!

আমরা কেউ নেচে উঠিনি। বরং ব্যাগ গুছিয়েছি গোপনে। পুলকদা বলেছেন, এই বেড়ানোটা কিন্তু সকলের জন্য নয়। অন্তত দিপুদাদের জন্য তো নই। (‘দিপুদা’ আমাদের ঠেকের একটি সান্ধ্য ভাষা, যারা বেড়ানো বলতে দিঘা-পুরী-দার্জিলিং বা ওই গোত্রের জায়গাগুলোই শুধু বোঝে।) পুলকদা আরো বলেছেন, তৈরি থাক। যেকোনো দিনই কিন্তু বেরিয়ে যেতে পারি।

দল বলতে খুব ছোট একটা দল। জলজ, অলয়, আমি, সঙ্গে বসুধা। পুলকদার তিন শিষ্য-বন্ধু, সঙ্গে ওর মেয়ে। বসুধার বিয়ে হয়ে গেছে, ওর বর রাউরকেল্লায় উঁচু ইঞ্জিনিয়ার, তবু বাপের সঙ্গে টো-টো করার অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। বেড়ানোর একদিন আগে ও ঠিক এসে হাজির হয়েছিল।

ডুয়ার্সের একটা অ-দরকারি স্টেশন। দূরপাল্লার ট্রেন আর মালগাড়িরা গতি না কমিয়ে ঝমঝম করে বেরিয়ে চলে যায়। সারাদিন এক-দুটো লোকাল ট্রেন দাঁড়ায়। তার জন্য পোঁটলা-পুঁটলি বেঁধে অপেক্ষা করে মানুষ। সকালের শেষদিকে তেমন একটা লোকাল ট্রেনেই এসে নেমেছিলাম আমরা।

স্টেশনের চারপাশে অজস্র সবুজ। দূরে ঝুঁকে থাকা পাহাড়ের ছায়া হাতছানি দিচ্ছে চোখের ইশারায়। অলয় বলে উঠেছিল, পুলকদা আগে কেন নিয়ে আসেননি আমাদের!

রিটায়ারমেন্টের কাছাকাছি পৌঁছে দাদাই যেন আমাদের মধ্যে সব-চাইতে তরুণ। ওঁর ফরসা গাল, টান চেহারা, পিঠের মাঝখানে স্পোর্টস ব্যাগ। রক্তে শর্করা কিছুদিন হলো উঁকিঝুঁকি মারছে, কিন্তু বাইরে তার কোনো চিহ্ন নেই। বেঁচে থাকার টানে সবকিছুকেই অগ্রাহ্য। স্টেশন ছেড়ে নামতে নামতে অলয়ের কথার উত্তরে বললেন, আগে নিয়ে আসিনি যেমন, পরেও কিন্তু আর নয়।

স্টেশন চত্বর ছাড়ালে সংক্ষিপ্ত একটি মোড়। গাছতলা। একটি মাত্র মুদিদোকান। দোকানিই আমাদের জন্য জিপ জোগাড় করে দিলো। সেই দোকান থেকেই তিনদিনের মতো রেশনিং সংগ্রহ। তারপর পাঁচ কিলোমিটার জিপ, ঘণ্টাদুয়েকের হাঁটা, পাহাড়ের ঠিক পায়ের কাছে এসে পৌঁছেছিলাম আমরা।

কিন্তু দু-ঘণ্টার হাঁটায় পুলকদা এই প্রথম বুঝলেন এবড়োখেবড়ো পথে খানিক চললে ওর দমের কষ্ট হচ্ছে। খুব হালকা করে বুকে ব্যথাও। জলজ ওর লাগেজ নিয়ে নিয়েছিল। পুরো পথ বসুধা হাত ধরে ছিল। পথে মাঝেমাঝেই একটি-দুটি সোঁতা। পাহাড়ি জলধারা শান্ত সাপের মতো রাসত্মায় রোদ পোহাচ্ছে। তার একটির পাশে টান হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন পুলকদা। যদিও ঠোঁটে তখনো আলগা একটু হাসি, চোখে ক্লামিত্ম নয়, ভালোবাসার ঝিলিক। বসুধা ঝরনার জল ছুঁইয়ে গিয়েছিল চোখে-মুখে। চুলের ভেতর উদ্বিগ্ন আঙুল। অল্পক্ষণেই উঠে বসেছিলেন পুলকদা। চোখ জঙ্গলের দিকে। সে-চোখে নরম হয়ে ভালোবাসা লেগে ছিল। পুলকদা বিড়বিড় করে বলেছিলেন, পায়রার পাখার এই মুখর হাততালি/ স্থির জলে শিশুটির ছুড়ে দেওয়া ঢিল/ এই ঢেউয়ে ঢেউয়ে ঢল/ তবু নিঃশব্দে অলীক রাত নামে …

আমাদের অনেকবার শোনা। শালবনি বা কুসুমপুরের রাতে এসব তো এসেছে-গেছে অনেক। কবিতা মানেই পুলকদার পুনর্জাগরণ। চাকরিটা ছিল একটা বেসরকারি অফিসের কেরানিগিরিতে। অনিশ্চয়তায় ভরা। পুলকদার ছেলে কলেজ শেষ করে চাকরির খোঁজ পেয়ে নাসিক না কোথায় চলে যায়, তার তখন একুশ-বাইশ, কখনো ফিরে আসেনি। ফোন ছাড়া যোগাযোগ নেই। বউদি খানিকটা রুগ্ণ। আমরা প্রায় ২৫ বছর ধরে দেখেছি আড্ডাই পুলকদাকে বাঁচিয়ে রেখে দিয়েছে। যেটুকু লেখালেখি তা নামমাত্র, নিজের লেখা নিয়ে কোনো উৎসাহ দেখাননি। বরং কবিতায় কথা বলতে ভালোবেসেছেন, যার প্রায় সবই অন্যের কবিতা। ফলে মাটি-পাথরে গা এলিয়ে শুয়ে পড়া পুলকদাকে আরো একবার বিড়বিড় করতে দেখে আমাদের মনে আশার সঞ্চার হয়। পুলকদা বসুদার হাত ধরে উঠে বসেন। বসেই থাকেন কিছুক্ষণ। গাছ দেখেন, আমাদের থামিয়ে দিয়ে ঝিঁঝিঁ আর পাখির ডাক শুনতে চান। তারপর একসময় উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, কী হলো, চলো হাঁটি! পথ আর খুব বেশি নেই।

তিনটে দিন যে কীভাবে কেটে গিয়েছিল তা আমরাই জানি। সকাল একটু বাড়লে গোড়ালি ডোবানো জলের সোঁতা পার হয়ে বেরিয়ে চলে যেতাম। পিঠে রুকস্যাক, তাতে জল আর অল্প কিছু খাবার। ঘন বনের আলোছায়ার মধ্য দিয়ে পাহাড়ের পায়ে পায়ে ঘুরতাম। পথজুড়ে ছিল নাম-না-জানা পাখির ডাক, বনমোরগের হঠাৎ মাটি ছেড়ে গাছের মাথায় উড়ে যাওয়া। রাক্ষুসে ঝিঁঝিঁর অবিশ্রান্ত কানে তালা লাগানো শব্দ, আমরা কোথা থেকে কোথায় চলে যেতাম। ফিরে আসতে শেষ-বিকেল।

পুলকদা এই তিনদিনের বেরোনোয় হাঁটলেন না আমাদের সঙ্গে। মানে এই প্রথম হাঁটতে পারলেন না। কিংবা বিশ্রাম নিতে চাইলেন। বসুধাও রয়ে গেল দুদিন। আমরা বিকেলে ফিরে এসে দেখতাম পুলকদা কোনো গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসা অথবা কাছেই ডিমা নদীর
পাড়ে সামান্য হাঁটছেন। মুখ তুলে মৃদু তাকাতেন আমাদের দেখে। সূর্য  ডোবার নরম আলো ঝিলিক মারত ওঁর চোখে। উঁচু আকাশে পাখিদের ঘরে ফেরার ডাক শুনে পুলকদা আবারো একটি-দুটি পঙ্ক্তি বলে ফেলতেন। সে-কবিতা হয়তো সূর্যাস্ত নিয়েই, কিংবা পাকাপাকিভাবে কোনো সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার। টেনিসন বা জীবনানন্দ দাশ। তখন দিন শেষ হয়ে যেত। চরাচর অন্ধকারে ঢাকা। কাঁধে বোঝা নেওয়া হাট-ফেরতা মানুষের মতো পাহাড়েরা চলে যেত অন্ধকারের দিকে। ভুটিয়া ঘরের মোমবাতি আলোয় আমরা একে-একে পানীয়ের গস্নাস হাতে তুলে নিতাম।

নিতান্ত কথার পিঠে কথার মতো আড্ডা শুরু হতো। খানিকটা পেছনে লাগা, খুনসুটি, পাড়ায় রয়ে যাওয়া কোনো দিপুদাকে নিয়ে আলোচনা। কিন্তু ক্রমশ এক-দুই-তিন পেগের পর পুলকদা সব আড্ডাকেই কবিতার দিকে টেনে নিয়ে যেতেন। সেখানে কোনো কবির ব্যক্তিগত জীবন নয়, কবিতার অদ্ভুত উচ্চারণে মদ নেমে যেত মুখ থেকে গলায়। পুলকদার কাছ ঘেঁষে বসুধা বারবার বলছিল, তোমার অসুবিধা হচ্ছে না তো!

নবমীর রাত শেষ হওয়ার মতো সেই তিনদিনও শেষ হলো। আমাদের পাঁচজনের একসঙ্গে বেরোনোর শেষ। আমরা হাসিমুখে ফিরে আসছিলাম। কিন্তু তারপর সবই অন্য রকম হয়ে গেল। চলন্ত ট্রেনে মৃত্যু এলো সেই বুকে ব্যথা হয়েই। মাঝরাতে, মাঝপথে। পুলকদা হাত নেড়েছিলেন, কিছু বলার সুযোগ পাননি। ভোরবেলা পাতা থেকে শিশির পড়ার মতো পুলকদা এভাবেই চলে গেলেন হঠাৎ। ট্রেনের মধ্যে।

দুই

ওঁর লেখা শেষ গল্পটা কি পড়েছিস তোরা? গস্নাসে প্রথম ঠোঁট ছুঁইয়ে জলজের প্রশ্ন।

পুলকদার গল্পের চেষ্টা হাতেগোনা। আমাদের এদিকে মানে বালুরঘাট-রায়গঞ্জের কিছু ছোট পত্রিকা, সেসবেই কখনো-সখনো বেরোনো। কবি হিসেবে তাঁর যেটুকু পরিচিতি গল্প-লিখিয়ে হিসেবে তাও নয়। আমরা যারা কাছের তারাই যা একটু জানি। যদিও শেষের গল্পটার কথা শুনিনি। জলজ বলল, বিষয়টা ভারি অদ্ভুত। একটি দেহাতি পরিবার। তারা অসুস্থ কিশোরী মেয়েটির চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসছে। ট্রেনে করে নিয়ে যাওয়ার পথে চলন্ত ট্রেনেই মৃত্যু ঘটল মেয়েটির।

প্রথম পেগ থেকে সবারই একটু করে নেওয়া হয়ে গেছে। বাইরে শিশিরের শব্দ। জলজের কথার পর আমরা অনেকক্ষণ চুপ। বসুধা খানিক পরে বলল, জীবনের সঙ্গে গল্পের খানিকটা মিল ওঁর লেখায় এর আগেও এসেছে।

পুলকদার সঙ্গে এসেছিলাম গত বছর বর্ষার মুখে। তখন মেঘ জমছিল পাহাড়ের গায়ে। চারপাশ ঘন সবুজ। পুলকদাকে ছাড়া এলাম যখন, বর্ষা তখন চলে গেছে। আকাশ নীল। ডিমা নদীর জলে নুড়িপাথর দেখা যায়। গাছের সবুজে মিশেছে সোনালির ছোঁয়া। ঠিক একই ভুটিয়া বস্তিতে ফিরে এসেছি আমরা। পুলকদা পুনরুক্তিতে অবিশ্বাসী ছিলেন। তবু খানিকটা বাৎসরিক উদযাপনের মতো ওঁর টানেই আমরা আবার এসেছি। ওঁর পছন্দের পানীয় নিয়েই আমাদের সন্ধেবেলার ঘরটিতে বসা।

এবারে চারজন। শুরুতে অদ্ভুত একটা প্রসত্মাব দিয়েছিল অলয়। বলেছিল, আমরা চার, কিন্তু গস্নাস থাকবে পাঁচটা। প্রত্যেকবার নেওয়ার সময় দাদার নাম করে একটা গস্নাসে ঢালা হবে। সবশেষে ওটাই চারজন মিলে খাওয়া। দাদার প্রসাদ।

প্রসত্মাবটা মনে শুধু নয়, হৃদয়ে লেগে গিয়েছিল। এ যেন পুলকদাকে নিয়ে বসে খাওয়া। বসুধা শুধু বলেছিল, প্রসাদে কিন্তু বিশ্বাস ছিল না ওঁর। তোমরা বরং অন্য কিছু ভাবো।

জলজ বলেছিল, ভাগ করে খাই ভালোবাসা!

আমি চিরকালই দলের পার্টটাইম সঙ্গী। কখনো কোনো আকস্মিক দুপুর বা নির্জন সন্ধেতে পুলকদা হঠাৎ ডাক পাঠাতেন আমাকে। কী করছিস! চলে আয়। তখন সব ব্যস্ততা ছেড়েছুড়ে বেরিয়ে যেতে হতো। আড্ডা হতো পুলকদার বাড়িতে বা কোনো অদ্ভুত ঠেকে। গল্পগুজব, কবিতা, গান এবং পানও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা উধাও হয়ে যেত কীভাবে। কিন্তু অলয় আর জলজ ছিল ছায়াসঙ্গী ওঁর। জলজ কবি, অলয় ঘোরতর অ-কবি। একজন স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক, অন্যজন ফার্নিচারের দোকানদার। কিন্তু কোথাও আমরা সবাই এক। বছরে এক-দুবার পুলকদার বেরিয়ে পড়ার ডাকে আমাদের কাজ থাকত না কোথাও।

প্রথম পেগটা শেষ করে জলজ বলল, ওই বাইরে থেকে ডাক দেওয়ার মানুষটাই জীবনের জন্য দরকারি। আদারওয়াইজ ইউ আর ডেসটাইনড্ টু নো-হয়্যার।

অলয় বলল, তার মানে!

আমি বললাম, তার কোনো মানে নেই। আমরা মিলেছি আজ দাদার ডাকে।

আবছা আলোয় দেখি পুলকদার গস্নাসে জমে ওঠা পেগ টলটল করছে।

কবিতার টানেই যে জলজ শুরুতে পুলকদার দলে জুটেছিল এমন নয়। টানের অন্য গল্প ছিল। অন্য কোথাও। পুলকদার আরেক মেয়ে পিয়া, বালুরঘাট কলেজে পড়ার সময় পিয়া আর জলজের আলাপ। পিয়ার সূত্র ধরেই জলজ একদিন হাজির হয়েছিল পুলকদার কাছে।

দাদারও ভালো লেগেছিল ওকে। সে ভালোলাগা শুধু পিয়ার নিকট বন্ধু বলে নয়। পুলকদা পরে বলেছেন, জলজের ভেতরে উনি নিজের কলেজ আর প্রথম জীবনের ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। পুলকদা লেখেন। জলজ চেষ্টা করে যায়। জলজ প্রেমিক, অথচ কোথাও একটু উদাসী। পুলকদা চির-উদাসীন। পিয়ার চাইতে যেন পুলকদারই কাছের হয়ে ওঠে জলজ।

দ্বিতীয় পেগের পর ইংরেজির মাস্টার বলে, দ্যাট ম্যান অব লাইট অ্যান্ড শ্যাডো হ্যাজ রিয়ালি ডিপার্টেড আস। নাউ দেয়ার ইজ নো হ্যান্ড টু হোল্ড …

জলজের সঙ্গে বিয়ে হয়নি পিয়ার। হয়নি তার কারণ জলজ নয়, পুলকদাও নয়। তার কারণ পিয়া। পিয়া বিয়ে করেনি জলজকে। অনেকদূর এগিয়েও ও কী ভেবেছে, সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে চলে গেছে। আমাদের মফস্বল শহরে সদ্য পাশ করে ফেরা এক এমবিবিএসের সঙ্গে দুদিনের প্রেমে বিয়ে হয়ে গেছে ওর। পুলকদা একেবারে চুপ হয়ে গেছেন। যদিও পুলকদার স্ত্রী মানে আমাদের আরতি বউদি ভীষণ উৎসাহিত ছিলেন সেই বিয়েতে। জলজ কষ্ট পেয়েছে; কিন্তু একদিনও কোথাও প্রকাশ করেনি।

গস্নাস নামিয়ে জলজ সামান্য ঝুঁকে পড়ে বলল, আমি একটা জিনিস বরাবর বুঝে এসেছি। পিয়ার জন্য কোনো ক্ষতি হয়নি আমার। একেবারেই নয়। বরং ওর জন্যই দাদার কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছি। সেটাই আমার জীবনের অন্য রকম পাওয়া, অন্য অভিজ্ঞতা। কথাটা পুলকদাকে অনেকবার বলব-বলব করেছি। কিন্তু পরিস্থিতি তো আসেনি, তাই হয়তো বলে ওঠা হয়নি।

জলজ চুপ করে গেল। তিনজনের হাতে গস্নাস। বসুধার গস্নাসটা সামনে নামানো।

সেই নির্জন ভুটিয়া জনপদে কখনোই কোনো উচ্চকিত শব্দ নেই। দিনে নয়, রাতে তো নয়ই। কখনো আবছা কিছু বাতাসের মতো ঘরে এসে পৌঁছয়। আপাত অর্থহীন নারী-পুরুষের সংলাপ। কিন্তু এই সন্ধের পর সেসবও আর নেই। বাইরে বরং ডিমা নদীর একভাবে বয়ে চলার শব্দ, ছোট নদী চলছে তো চলছেই।

বসুধা তুলে নিয়ে ছোট্ট চুমুক দিলো নিজের গস্নাসে। তারপর নামিয়ে রেখে বলল, জলজদা, তোমার এই প্রাপ্তির কথা আজ অন্তত মনে মনে ওঁকে জানাও। শহর থেকে এত দূরে, যেখানে শেষবার উনি নিয়ে এসেছিলেন আমাদের।

জলজ গস্নাস হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে চলে গেল। বাইরে তখন আধো জ্যোৎস্না খানিক অন্ধকার। আমরা ওকে পিছু ডাকলাম না।

জলজের খাওয়ার ধরন একরকম। অলয়ের আলাদা। শুরু থেকেই জলজ ধীরু ও খানিকটা বিলাসী। কথা বলবে, শুনবে, মাঝে ঠোঁট ছোঁয়াবে একটু। অনেকটা পুলকদার মতো। তুলনায় অলয়ের ধরনই আলাদা। প্রথম পেগটা একটানে খাবে। নেশা হয়ে যাবে চটপট। তারপর ধরে ধরে এগোবে। জলজ অন্ধকারে বেরিয়ে চলে যেতে অলয় সোজা হয়ে বসল। তারপর বলল, আমি কী অবস্থা থেকে দাদার কাছে এসেছি তা তোরা জানিস। আমার তো তোদের সঙ্গে থাকারই কথা নয়।

আমরা চুপ। বাইরে কোনো শব্দ নেই। বসুধা তাকিয়ে অলয়ের মুখে। পুলকদার গস্নাসটা চোখের সামনে তুলে অলয় দেখল কিছুক্ষণ। স্বচ্ছ গস্নাসের ভেতর গাঢ় খয়েরি। মোমবাতির আলোর সঙ্গে যে ছায়া মিশে থাকে তাই গা চুঁইয়ে নামছে গস্নাসের। অলয় বলল, এত তাড়াতাড়ি আমাদের রেখে গিয়ে ভালো করেননি মানুষটা।

বালুরঘাটে আমাদের ছোট নদী আত্রেয়ী। তার ও-পাশের গ্রাম থেকে একটি লোক পুলকদার নতুন ছোট বাড়িতে কাঠের কাজ করতে আসত। সে প্রায় একযুগ আগে, লোকটির সঙ্গে থাকত এক সদ্য যুবক। ঢোলা জামা ফ্যাকাশে প্যান্ট, অনিল মিস্ত্রির ছেলে। বাবার ইচ্ছেয় বাবার সঙ্গেই কাজ শিখতে শুরু করেছিল। বারো ক্লাস পাশ করে কলেজে গেছে। কিন্তু সে আর তার বাবা জানত আদতে লেখাপড়া শিখে কোনো লাভ নেই। অথচ ছেলেটির কলেজের টান প্রবল। তাদের পরিবারে তার আগে কেউ প্রাইমারির গ–ও পেরোয়নি।

সেই অবস্থায় সে বাবার সঙ্গে কাজে আসত পুলকদার বাড়িতে। দরজা-জানালার কাজ। বসার ঘরে ক-টা চেয়ার, পুরনো আসবাবের মেরামতি। বাবার সঙ্গে সকালবেলা আসত। কাজ করত, কাজ শিখত। মাঝে একফাঁকে কলেজে চলে যাওয়া। ফিরতে বিকেল। তখন এসে আবার বার্নিশ লাগাত পুরনো পালঙ্কে।

এই ছেলেটিই একদিন নজরে পড়ে গেল পুলকদার। নজরে পড়ার প্রাথমিক কারণ কলেজের টানে দুপুরবেলা অন্তর্ধান হয়ে যাওয়া। পুলকদা ওকে ডেকে কথা বললেন একদিন। ওর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, বাড়ির খবর। কাঠের কাজ শিখেও ওর মনের কোথাও অন্য কোনো বাসনা। খুব আবছা সেই ভাবনার কথা ছেলেটি নিজেও তখন ভালো করে জানে না। পুলকদা শুনলেন সব। কিচ্ছু বললেন না। শুধু নিজের সংগ্রহ থেকে একদিন একটি বই দিয়েছিলেন ওকে। জলধর সেনের হিমালয়

সে-বই পড়ে ছেলেটি অবশ্য পাহাড়ের মতো উঁচু হতে পারেনি। আবার পাথরের মতো শক্তও নয়। কলেজের দু-বছর শেষ করে ও কার-কার বুদ্ধিতে হঠাৎই চলে গেছে সুরাট। সেখানে কাপড়ে জরি বসানোর কাজ শিখবে। পুলকদার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। নিজের বাড়ির সঙ্গেও ক্ষীণ। ও এমন কিছু হয়ে উঠতে পারেনি যে, আমাদের মফস্বল শহর তখনো মনে রাখবে ওকে। জরির কাজ শিখতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত স্মৃতি থেকে ছেলেটি হারিয়েই গেল একদিন।

ফিরে যখন এলো তখন ওর চারপাশটাই বদলে গেছে অনেক। পুরনো পাড়া নেই, পুরনো বন্ধুরা নেই। নদীর ও-পাশে ওদের গ্রামেও নগরের ছোঁয়া। ওর বাবা অনিল মিস্ত্রি মারা গেছেন অনেককাল। সে খবর ও সুরাটে থাকতে পেয়েছিল। আসতে পারেনি। ওর মা কোনো দিদির বাড়িতে গিয়ে থাকছে। ফলে ওর মাথাগোঁজার সামান্য জায়গা থাকলেও চারপাশ অন্ধকার। আয়ের ব্যবস্থা তেমন কিছু নেই। চেনাজানা লোক নেই। ফলে ও ভাবছিল সুরাটের দিন-রাতের খাটুনির কাজে আবার ফিরে যাবে কি না।

এই সময় ওর আরো একবার পুলকদার সঙ্গে দেখা। পুলকদা নিজেই ডাকলেন ওকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব শুনলেন। ওর লেখাপড়া শেষ না হওয়ার কথা। ওর সংক্ষিপ্ত জীবনের ইতিহাস। তারপর নিজেই জুড়ে গেলেন ওর সঙ্গে। ওকে দাঁড় করানোর চেষ্টায়।

বাজারের এখন যেটা মডার্ন ফার্নিচার তার মালিক আজকের অলয়। পুলকদার মাধ্যমে আমাদেরও কাছে আসা। বিক্রি হতে যাওয়া খুব ছোট এক চা-দোকান কিনে নিয়ে পাঁচ বছর আগে সংক্ষিপ্ত সূচনা। কেনার টাকা পুলকদারই দেওয়া। তবে অলয় দাঁড়িয়ে গেছে চটপট। টাকাও নাকি শোধ করে দিয়েছে। এখন ভালো চলে দোকান। হাল ফ্যাশনের খাট, ড্রেসিং টেবিল, সোফা। অলয় নিজে প্রায় কিছু করে না। সব কর্মচারী মারফত। দোকানের সামনে ছোট একটা তাকে কাচের ভেতর ও ওর বাবার পুরনো যন্ত্রপাতি সাজিয়ে রেখে দিয়েছে। যে স্কুলটায় লেখাপড়ার শুরু সেই প্রাইমারিতে গত বছর ছোট বাচ্চাদের বেঞ্চ পাঠিয়েছে ও।

এর বাইরে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। বিয়েশাদি এখনো করেনি। হুটপাট বেরিয়ে পড়ে আমাদের সঙ্গেই। কবিতার আড্ডায় একটিও কথা না বলে চুপ হয়ে বসে থাকে। চুমুক চুমুক মদ খায়। সব শেষ হয়ে গেলে জড়ানো গলায় বলে – এসব আমি ঠিক বুঝি না। আমি বুঝি, ছায়ার ঘোমটা মুখে টানি, আছে আমাদের পাড়াখানি। দিঘি তার মাঝখানটিতে …

পুলকদার লেখক-বন্ধুরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আমরা ওকে জোর করে থামাই। কেউ নিয়ে বাইরে চলে যায়। আর এসবের পরও ও অনাবিল স্নেহ আর প্রশ্রয় পেয়ে গেছে দাদার।

অলয় তিন নম্বর পেগও দেখলাম তাড়াতাড়ি শেষ করে দিলো। পুলকদার গস্নাস জল ছাড়াই অনেকটা ভরাট। জলজ তখনো বাইরে। বসুধা একবার ওকে ডাকার কথা বলেছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কেউ উঠে যায়নি। এমনকি বসুধা নিজেও নয়। মোমবাতির আবছা আলোয় অলয় জড়ানো গলায় বলল, আমি লিখি না। খবরের কাগজটাও ঠিক করে পড়ার সময় পাই না। ব্যবসা করি আর পুলকদা বা তোরা যখন ডেকেছিস বেড়াতে চলে গেছি। দাদা শেষ পর্যন্ত তবু সম্পর্ক রেখে গেছেন আমার সঙ্গে। … সন্ধেবেলা হপ্তায় দুদিন তো হবেই আমার দোকানে এসে বসতেন। আমাকে নিয়ে হঠাৎই দোকান শেষের পর হাঁটতে চলে গেছেন নদীর দিকে। তখন একেক দিন বিড়বিড় করে নিজের মৃত্যুর কথা বলতেন। নিচু গলায় খুব আশ্চর্য কিছু কথা। আমার মনে হতো দাদা যেন মৃত্যুকে ভালোবাসতে চান!

বসুধা বলল, পিস্নজ অলয়দা, আজ অন্তত ওই কথাগুলো থাক। অলয় বলল, আজ কেন, কোনোদিনই বলা হবে না সেসব। দাদা তো শুধু আমার সঙ্গেই বলেছেন।

পুলকদা মারা যাওয়ার প্রায় মাসদুয়ের মাথায় একটা স্মৃতিসভা হয়েছিল। যাদের করার কথা ছিল তারা কেউ নয়, আয়োজনে ফার্নিচার দোকানদার। একটা ক্লাবের দোতলায় ছোট দল আমাদের মফস্বলি ভিড়ে উপচে পড়েছিল। পারিবারিক সম্পর্কে নয়, এমনকি লেখালেখি সম্পর্কেরও বাইরে, এমন যে কত মানুষ। আমরা একেবারেই চিনতাম না বা কম চিনতাম এমন অনেকে। সবাই তারা দাদার টানে হাজির। সেই সভায় মাইকে পুলকদাকে নিয়ে একটি কথাও হয়নি। স্মৃতিচারণ নয়, নীরবতা পালনও নয়। অনেকদিন আগে অন্ধকার নদীর ব্রিজে দাঁড়িয়ে আকাশের তারা খসা দেখতে দেখতে দাদা নাকি এমনই এক স্মরণসভার কথা অলয়কে বলে গেছেন। যেখানে কথা নয়, অল্পকিছু গান হবে। হয়েছিলও তাই। ওঁর প্রিয় গান। লালন, কুবির গোঁসাই, রবিঠাকুর। একদা এলাকায় দাদাগিরি করে বেড়ানো মোটা-তারক ওরফে মনাকে আমরা পেছন দিকে বসে চোখ মুছতে দেখেছি।

পুলকদার গস্নাসটা তুলে নিয়ে অলয় মোমবাতির আলোয় চোখের সামনে দেখল। জল মেশানো হয়নি সেখানে। আর এই সময় জলজ ঢুকে এলো ঘরে। ওর পাত্র খালি। বলল, পাহাড়ের পেছন থেকে এতক্ষণে একফালি চাঁদ উঠে এলো। বনের ভেতর সেই আবছা আলো। দাদা বলতেন, এদিকে এ-সময় হরিণেরা নাকি নদীতে জল খেতে আসে।

বসুধা বলল, আজ রাতে আমরা সেই জল খাওয়া খুঁজতে বেরোব। নাও, ভাগ করো।

অনেকক্ষণ পর বসুধার গলা। ও সবারটা শুনছিল আর একটু একটু করে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছিল। যদিও এর মধ্যে ওর-ও দুটো শেষ। পুলকদা থাকতেও দেখেছি পুলকদার এই প্রিয় মেয়ে আড্ডাতে বেশিটা নীরব। সবারটা শুনবে, অল্প করে খাবে, শেষদিকে হয়তো কিছু বলল বা বলল না।

বেশ ধীরে অলয় দাদার গস্নাসে জমে ওঠা পানীয় চারজনেরটায় ভাগ করে দিলো। খানিক নেশায় খানিক মোম আলোর আবছায়ায়, বাকিটা কোনো না-জানা বোধে বুকের মাঝখানটা কেঁপে উঠল হঠাৎ। বসুধাকে বললাম, আজ অন্তত তুই বাবার কথা একটুখানি বল।

বাইরে খসখসে কোনো শব্দ। এ-শব্দ বাতাসের বা কোনো ছোট প্রাণীর চলে যাওয়ার। বসুধা জলহীন গাঢ় পানীয়টা চোখের সামনে দেখল একবার। ওর আয়ত তীক্ষন চোখে। তারপর একটানে ঢেলে দিলো গলায়। গস্নাস নামিয়ে রেখে নিজেকে সামলাল কিছুক্ষণ। তারপর বলল – কে বাবা?

আমরা চুপ। বসুধা বুড়ো আঙুল দিয়ে চেপে ঠোঁটের চারপাশ মুছে নিচ্ছে। কাজুবাদামের একটা দানা ওর বাঁহাতের তালুতে। বলল, বাবা তো আমার এগারো বছর বয়সে মাকে আর আমাকে ফেলে পালিয়ে অন্য কোথাও বিয়ে করে নিয়েছে …।

চকিতে একটা পুরনো অধ্যায় যেন একটুখানি উঁকি দিয়ে গেল। যে-অধ্যায় আমরা জানি, কিন্তু কখনো বলি না। এমনকি ভাবিও না বহু দিন। আমাদের চিন্তার গভীরে বসুধা পুলকদার মেয়েই।

বসুধা ধীরে ধীরে বলে গেল – যিনি পুনর্জন্ম দিলেন তাকেই অবশ্য শেষ পর্যন্ত বাবা বলে ডেকেছি। যেখানে হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে তিনি হাত ধরে নিয়ে এলেন। আসলে বাবা নন, তিনি আমার বন্ধু। তাঁর ভালোবাসা এখন আমার গলায়।

পুলকদার গস্নাস ভাগ হওয়ার পর সেই ভালোবাসা তখন আমাদের সবার গলায়। অলয় জড়ানো স্বরে কী একটা বলতে চাইছিল। বসুধা ওকে হাত তুলে থামাল। বলল, এই শেষ ভাগটুকু নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকি না কেন! পাতা ঝরার শব্দ শুনি। নদীর জলে নুড়িপাথরের শব্দ। তারপর আবার যদি কিছু ইচ্ছে হয় তো বলি …।

অলয় থেমে গেল। আমরাও। যদিও আমার মাথায় সাদা-কালো বাংলা ছবির মতো কিছু ছবির আঁকিবুঁকি। দশ-এগারো বছরের মেয়ে আর তার মাকে ফেলে শহরের বড়লোক বাড়ির এক লম্পট যুবক পালিয়ে গেছিল একদিন। মা দিশেহারা মেয়েকে নিয়ে কী করে কোথায় যায়, শেষ পর্যন্ত গেঞ্জি মিলে কাজ করা ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয়। সেখানে থেকে মা লোকের বাড়িতে ঠিকে কাজ করে। কাজ করে মেয়েকে পড়ায়। সেই মেয়ে বড় হয়ে উঠল একটু একটু করে। ক্লাসে মোটামুটি করল। তারপর আর একটু বড় হতে তার চেহারা আর চোখেমুখে এসে পড়ল লম্পট বাবার পরিবারের পুরনো আভিজাত্যের ছায়া। তখন তার দিকে হঠাৎ গোটা এলাকার নজর।

কিন্তু তাদের তো আশ্রয় নড়বড়ে। আশ্রয় নড়বড়ে তাই আত্মরক্ষাও নড়বড়ে। এলাকার গু-া-বদমাশ, নেতার ছেলে, সবাই হাত বাড়াতে চায়। মামা রূপ দেখিয়ে আগাম পার করার জন্য সম্বন্ধ আনে। মাতাল বাবাও খোঁজখবর পেয়ে কোনো মাতাল বন্ধুকে তার ছেলের জন্য কথা দিয়ে দিলো।

এই বিষের মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে মেয়েটি কলেজে যায়। আর পরিত্রাণ খোঁজে। এ-সময় পুলকদার সঙ্গে আলাপ। পুলকদার মেয়ে পিয়ার সমবয়সীই সে। সেই সূত্রে কোনোভাবে এসে পড়েছিল।

তারপর বাকি অংশ এক মফস্বলি ইতিহাস। সে-ইতিহাসের মূল চরিত্র দুই অসমবয়সী বন্ধু। একজনের কৈশোর ছাড়িয়ে যুবতী হয়ে ওঠা। অন্যজনের প্রৌঢ়ত্বের পথে যাত্রা। একজন তার রূপ আর ক্রমশ প্রকাশিত গুণের জন্য সবার কাছে চেনা। বসুধা এদিকের নাট্যদলে অবশ্যম্ভাবী মুখ হয়ে উঠল দিনে দিনে। গ্রম্নপ থিয়েটারে তার অভিনয়ের কথা আমাদের শহর ছাড়িয়ে শিলিগুড়ি-বহরমপুরেও পৌঁছয়। অন্যজন মামাবাড়ির গলিঘুঁজির জীবন থেকে বার করে তাকে যিনি আকাশ চিনিয়েছিলেন, পৌঁছে দিয়েছিলেন আলোর পৃথিবীতে, অনন্ত প্রশ্রয়ে তিনি তার হাত ধরে রেখেছিলেন।

বাতাসে গুঞ্জন অবশ্য ছিল। আমরা তখন একটু-একটু করে পুলকদার বন্ধু। বছরে এক-দুবার একসঙ্গে বেড়াতে যাই। বসুধাও যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। গোপালপুর থেকে শঙ্করপুর বিচ-ট্রেকিংয়ে জেলেদের খটিতে রাত কাটাই। সেখানে বালিয়াড়ির পূর্ণিমায় সারারাত লালন গায় বসুধা। গাইতে গাইতে নেচে ওঠে। তার ‘বাবা’কে হাত ধরে টেনে নেয়। আর এসব খবর বাতাসের সঙ্গে ভেসে ভেসে বালুরঘাটেও এসে পৌঁছয়। পথচলতি গুজব প্রথম থেকে ছিলই, পুলকদার বাড়িতেও বাতাস গম্ভীর হয়ে ওঠে। সব থেকে অশামিত্ম করে পিয়া। যার হাত ধরে বসুধা এ-বাড়িতে পৌঁছেছিল। পুলকদার স্ত্রী সন্দেহপ্রবণ। ফলে আগুনে ঘিয়ের ফোঁটা পড়ে তখন। পুলকদা কোনো ক্রমে অশান্ত সাগরে নৌকো বেয়ে যান। আড্ডায় এসে আগের মতোই মুচকি হাসেন আর পছন্দের কবিদের কবিতা শুনিয়ে ফেলেন।

পিয়া আর বসুধার বিয়ে হয়েছিল ছ-মাসের তফাতে। পিয়ার বিয়ে হলো এলাকায়। বসুধা রাউরকেল্লা চলে গেল। বসুধার চলে যাওয়াটা আমাদের সবার কাছেই ছিল বন্ধুবিচ্ছেদের মতো। পুরনো আড্ডাটা যেন খাপছাড়া হয়ে গেল। অবশ্য সময় থাকতে খবর দিলে বছরে ও এক-দুবার আসছিল। যেমন এসেছিল গত বছর এইখানে এবং এবার পুলকদার মৃত্যুবার্ষিকীর বেড়ানোয়।

অলয় পুরোপুরি টাল হয়ে গেছে। জলজ পুলকদার নামে জমিয়ে রাখা পানীয়টুকুসহ সবাইকে নিয়ে বাইরে যেতে চাইল। মোমবাতির বেশিরভাগটা পুড়ে প্রায় শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। বসুধা আবছা গলায় বলল, বালুরঘাটে এই শেষ আসা আমার। আর কখনোই ফিরব না। তোমাদের সবাইকে তাই কিছু কথা বলে যাই।

এত নেশা, এত নীরবতা, মাথার মধ্যে স্মৃতির নানা এলোমেলো দৌড়। জলজ গস্নাস হাতে বাইরে চেয়ে আধখোলা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমি অলয়কে ঠেলে ঠেলে দাঁড় করাতে চাই। বসুধা ধীর সংলাপের মতো কথা বলে যায়। মোমবাতি পোড়ে।

বসুধা বলে, এতদিন যাকে বাবা বলে ডাকলাম, অন্তত তোমরা যাকে বাবা বলে ডাকতে শুনেছ, তোমাদের সেই পুলকদা আমার বাবা শুধু নন, প্রেমিকও। সবচাইতে ভালোবাসার মানুষ। আমার প্রাণের মানুষ। আর প্রাণের মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে তো কোনো বাছবিচার থাকে না। আমাদেরও ছিল না। আমরা রাখতে পারিনি, চাইওনি হয়তো। একাধিকবার আমাদের শরীর সম্পর্কও হয়ে গেছে …

আমরা কথা বলি না। বসুধাকে নিয়ে অলয়কে নিয়ে বাইরে যেতে চাই। যেন জঙ্গল ডাকছে, পাহাড় ডাকছে, রাতের পাহাড়ি নদী আর নুড়িপাথর ডাকছে। বসুধা উঠে দাঁড়ায়। ওর হাতে নিজের গস্নাস নয়। পুলকদার শেষ হয়ে যাওয়া গস্নাসটা। সেটা ধরে রেখেই ও বলে, আমাদের শেষ সম্পর্ক হয় গত বছর। এইখানে। যখন ওঁকে আর আমাকে রেখে তোমরা সারাদিনের মতো বেড়াতে চলে গেলে। তার আগে আসার পথে ওঁর বুকে ব্যথা হয়েছে। উনি কী বুঝেছেন কে জানে। আমাদের শেষ মিলনে মৃত্যু ছায়া ফেলছিল বারবার। উনি ওই সময়ও পাতা ঝরার শব্দ শুনতে চাইছিলেন …।

ঘর ছেড়ে আমরা চারজন বাইরে বেরিয়ে আসি। জঙ্গলে বেরোই। আধো জ্যোৎস্না লাগা জঙ্গল, কুয়াশার ঝোপ, ছোট প্রাণীদের পাতা সরিয়ে চলে যাওয়া। আমরা হেঁটে বেড়াই। জলজ স্থির পায়ে। আমিও মোটামুটি তাই। অলয়কে ধরে রাখতে হয়। বসুধাও হাঁটে, নিঃশব্দে, আঙুল ছুঁইয়ে মাঝে মাঝে গাল থেকে চোখের জল মুছে নেয়।

আমরা নদীর কাছাকাছি আসি। নদী, নুড়িপাথরের নদী। আমাদের পাশে পাশে বয়ে চলেছে সে। যেন আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে হাজার বছর ধরে তার এই চলে যাওয়া। পাহাড়, জঙ্গল, সম্পর্কের ভাঙাগড়া নদী দেখেছে। আরো কত দেখবে কে জানে!

Leave a Reply

%d bloggers like this: