মাহমুদ দারবিশের স্বদেশচেতনা

নাজিব ওয়াদুদ

মাহমুদ দারবিশ হচ্ছেন সেরকম কবি, যাঁর কবিতার প্রত্যেকটি শব্দ মানবপ্রগতি ও মানবিকতার প্রচলিত মিথকে চুরমার করে দিয়ে এই জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নতুনতর উপলব্ধি ও কর্মস্পৃহা জাগ্রত করে। তাঁর ক্ষুব্ধ ও দুঃখাভিভূত কাব্যিক বয়ান, তাঁর এবং তাঁর জনগণের পরাধীনতা ও নির্বাসন সম্পর্কে, যাদের জন্মভূমিটাকে হঠাৎই পরিণত করা হয়েছে অন্য একটা দেশে, তাদের হত্যা করে ও তাড়িয়ে দিয়ে, তাঁকে কেবল প্যালেস্টাইনের জাতীয় কবির মর্যাদাই এনে দেয়নি, তিনি হয়ে উঠেছেন দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার আকাঙক্ষার প্রতীক। তাঁর এই পরিচিতি বিশ্বব্যাপী। মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে তিনি তাঁর নিজের এবং স্বজাতির প্রত্যেকের আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্য দিয়ে প্রতীকায়িত করেছেন। তিনি তাঁর নির্বাসনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কবিতার ভাষায় বলেছেন, ‘অনুপস্থিতি… আমি এসে পড়েছি অনুপস্থিতির বাড়িতে’। আর যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি কে, তখন তিনি বলেন, ‘আমি এখনো জানি না।’ তাঁর এই উত্তরকে অনুধাবনীয় করতে তিনি আর একটু এগিয়ে বলেন, ‘সম্ভবত আমার মতো আপনারও কোনো ঠিকানা নেই।’ তারপর সেই মানুষটির দুর্দশা ফুটে ওঠে আরো একরাশ প্রশ্নের মধ্য দিয়ে –

সেই মানুষের কী-ই বা দাম –

যার কোনো স্বদেশভূমি নেই,

নেই কোনো পতাকা

কোনো ঠিকানা-

এরকম মানুষের কী দাম, বলো?

 

প্যালেস্টাইন থেকে যারা বিতাড়িত, তারা তো প্রকাশ্যেই স্বদেশহারা – শরণার্থী, আর যারা ভেতরে (ইসরায়েল অধিকৃত প্যালেস্টাইনে) থেকে যেতে পেরেছেন কোনোভাবে, তাদের আইনি পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘উপস্থিত-অনুপস্থিত বহিরাগত’ বলে। এই পরিচয়-সংকট এবং স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও স্বাধীনতা লাভের আকাঙক্ষা দারবিশের কবিতাকে কখনো প্রতিবাদী, কখনো প্রতীকী, কখনো স্বপ্নময়, কখনো নৈসর্গিক, কখনো বিষাদ, কখনো আলোড়িত ও আলোড়ক করে তুলেছে। ২৫ বছরের নির্বাসিত জীবন – মস্কো, কায়রো, বৈরুত, তিউনিস, প্যারিস – যেন এক লম্বা ভ্রমণ; কিন্তু তাঁর মোদ্দা কথা – ‘আমি না আছি এখানে, না আছি সেখানে।’ মানব অসিত্মত্বের এই ট্র্যাজেডি প্যালেস্টাইনিদের ভোগ করতে হচ্ছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগব্যাপী; কিন্তু পৃথিবীর আরো আরো মানুষও এই ভোগান্তির কম শিকার নয়। সেজন্য দারবিশের কবিতার এই আবেদন কেবল প্যালেস্টাইনিদের জন্যই প্রযোজ্য নয়, বরং তা সর্বজনীন। এখানেই দারবিশের কৃতিত্ব এবং বিশ্বব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণ নিহিত।

প্যালেস্টাইনের পশ্চিম গ্যালিলির আল-বিরওয়া গ্রামে ১৯৪১ সালের ১৩ মার্চ মাহমুদ দারবিশের জন্ম। তাঁর পিতা সালিম দারবিশ, মা হুরিয়াহ দারবিশ। তাঁরা ছিলেন কৃষক, নিজেদের জমিতে চাষবাস করতেন। ১৯৪৮ সালে ইহুদিবাদী ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসরায়েলি সৈন্যরা প্যালেস্টাইনিদের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ চালায়। জোরপূর্বক দখল করে নেয় প্যালেস্টাইনি ভূমি। ধ্বংস করে দেয় তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য – সব। জাতিসংঘের হিসাবে সাত লাখ ছাবিবশ হাজার থেকে নয় লাখ প্যালেস্টাইনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। দারবিশের গ্রামও আক্রান্ত হয়, তাঁরা অন্যদের সঙ্গে পালিয়ে যান লেবাননে, সেখানে প্রথমে জেজিন, পরে দামুরে আশ্রয় নেন। ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইসরায়েলিরা তাদের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও বাগান সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে ফেলে, যেন আসল বাসিন্দারা আর কখনো তা চিনতে না পারে এবং ফিরতে না পারে।

বছরখানেক পরে দারবিশের পরিবার প্যালেস্টাইনে ফিরে আসে অবৈধভাবে, কিন্তু না পারেন নিজ গ্রামে যেতে, না পারেন তাঁদের জমিজমা উদ্ধার করতে। তাঁরা শেষ পর্যন্ত দিয়ার আল-আসাদ গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এই গ্রাম থেকে তাঁদের নিজেদের বেদখল হয়ে যাওয়া জমিজমা-বাগান সবই দেখা যেত। তাঁরা ফিরলেন বটে, কিন্তু ততদিনে ইসরায়েল জনজরিপ সম্পন্ন করে ফেলেছে। যেসব প্যালেস্টাইনি জরিপের সময় নিজ ভিটায় বসবাসরত ছিল তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকত্ব দেওয়া হলো। সে-সুযোগ দারবিশের পরিবার পায়নি। সুতরাং তাঁদের থাকতে দেওয়া হলো, কিন্তু তাঁদের আইনি স্ট্যাটাস হলো ‘উপস্থিত-অনুপস্থিত বহিরাগত’, অর্থাৎ না নাগরিক, না অ-নাগরিক। যেহেতু তাঁরা আছেন, সেহেতু উপস্থিত; কিন্তু অনুপস্থিত এ-কারণে যে, ‘সঠিক’ সময় তাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। জায়নবাদী ইসরায়েল কর্তৃক আবিষ্কৃত এ এক অভূতপূর্ব পরিচয়পত্র। এই পরিচয়পত্রের বলে দারবিশের পিতা ওয়ার্ক পারমিট পেলেন। ১২ বছর বয়সে ইসরায়েলের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দারবিশ একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন। সেই কবিতায় তিনি দেখছেন তাঁর বাড়িতে বহিরাগতরা ঢুকে পড়েছে, তারা তাঁদের বিছানায় শুয়ে আছে, তাঁদের জমিতে চাষ করছে। ইসরায়েলি সামরিক শাসকের কাছে এ-খবর পৌঁছলে তাঁর পিতাকে ডেকে শাসানো হয় – এরকম কথা বললে বা লিখলে তাঁর ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করা হবে। এই কবিতাটি এখন আর পাওয়া যায় না; কিন্তু বোঝা যায়, প্যালেস্টাইনিদের দুর্দশা দারবিশের মধ্যে সেই কৈশোরেই ক্ষোভ ও বিদ্রোহ ভাব তৈরি করেছিল। তাঁর প্রাথমিক জীবনে লেখা যেসব কবিতা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তার মধ্যে ‘পরিচয়পত্র’ বিশেষ জনপ্রিয়। এটা ২০ বছর বয়সে লেখা। এই কবিতায় দারবিশ আগ্রাসনের শিকার প্যালেস্টাইনিদের সত্যিকার দুর্দশাকে শনাক্ত এবং তাকে প্রত্যাখ্যানও করেছেন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে যেমন সৃষ্টিকর্তার অহি এসেছিল – ইক্করা! – পড়ো!, তাকে অনুসরণ করে তিনি বলেছেনসাজ্জিল! – লেখো! তারপর তিনি বলছেন, আমি একজন আরব। তিনি গর্ব করে বলছেন, তাঁর আটটা সন্তান, আরেকটার জন্ম আসন্ন, তাদের ত্রাণের দরকার নেই, তাঁর পিতা কৃষক পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারী –

তোমরা আমার পূর্বপুরুষের বাগান চুরি করে নিয়েছ

যে জমি আমি চাষ করতাম আমার সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে।

 

এভাবে তিনি ইহুদিবাদী প্রকল্পকে চুরি-ডাকাতি বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তিনি শান্তি চান, বলেন – ‘আমি মানুষকে ঘৃণা করি না’। আবার একই সঙ্গে সতর্ক করেও দেন এই বলে –

সাবধান হও…

… আমার ক্ষুধা থেকে

এবং আমার ক্রোধ থেকে।

 

তাঁর এই কবিতাকে তূর্যনিনাদ হিসেবে দেখা হয়।

 

দারবিশের পড়াশোনা শুরু হয় প্রথমে বাড়িতে, তাঁর দাদার কাছে, তারপর তিনি কাফর ইয়াসিফে হাইস্কুলে ভর্তি হন। তারপর চলে যান হাইফায়। তিনি ১৯৬১ সালে ইসরায়েলি কমিউনিস্ট পার্টি রাকাহর সদস্য হন। এই রাজনৈতিক দলের সাহিত্য পত্রিকা আল-জাদিদে কবিতা লিখতে শুরু করেন। একসময় তিনি এই পত্রিকার সম্পাদকও হয়েছিলেন। তিনি ইসরায়েলি ওয়ার্কার্স পার্টির সাহিত্য পত্রিকা আল-ফজরের সহকারী সম্পাদকের কাজও করেন কিছুকাল। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ইসরায়েল-অধিকৃত প্যালেস্টাইনি এলাকায় জরুরি সামরিক শাসন চালু ছিল। নিজ বসবাসস্থল বা কর্মস্থল থেকে অন্যত্র যেতে সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হতো। অনুমতি ছাড়া যাতায়াত করার জন্য দারবিশকে ১৯৬১ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বারবার কারাভোগ করতে হয়েছে। দারবিশ ১৯৭০ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান উচ্চশিক্ষা নিতে। সেখানকার লমোনোসভ মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এক বছর কাটিয়ে তিনি চলে যান মিসরে। সেখানে আল-আহরাম পত্রিকায় কাজ নেন। ১৯৭৩ সাল লেবাননে (বৈরুত) পাড়ি দেন। সেখানে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। বৈরুতে অবস্থানকালে ১৯৭৩ সালে তিনি প্যালেস্টাইনি লিবারেশন অরগানাইজেশনে (পিএলও) যোগ দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েল তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তাঁকে পিএলওর প্যালেস্টিনিয়ান রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক নিযুক্ত করা হয়। ১৯৮২ সালে ইসরায়েল বৈরুতে আক্রমণ করলে অন্য পিএলও নেতাদের সঙ্গে তিনি বৈরুত ত্যাগ করেন। যাযাবরের মতো সিরিয়া, সাইপ্রাস, কায়রো ও তিউনিস হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি প্যারিসে থিতু হন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্যারিসে অবস্থান করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি পিএলওর নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে ‘প্যালেস্টিনিয়ান পিপলস ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্সে’র মেনিফেস্টো রচনা করেন। ১৯৯৩ সালে আমেরিকার উদ্যোগে পিএলও ও ইসরায়েল তথাকথিত শান্তিচুক্তি (অসলো চুক্তি) স্বাক্ষর করে। তার প্রতিবাদে তিনি পিএলওর নির্বাহী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, তাঁর প্রতিবাদের কারণ এই নয় যে, তিনি শান্তি চান না বরং এজন্য যে, এই চুক্তি শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হবে। বাস্তবে তা-ই হয়েছে। ১৯৯৫ সালে তাঁর বন্ধু, এককালের সহকর্মী, ইসরায়েলি নেসেটের সদস্য, বিশিষ্ট কথাশিল্পী এমিলি হাবিবি মারা যান। তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁকে মাত্র চারদিন ইসরায়েলে অবস্থান করার অনুমতি দেওয়া হয়। অবশ্য পরে তিনি স্বায়ত্তশাসিত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় থাকার অনুমতি পান।

দারবিশ দুবার বিয়ে করেন। তাঁর প্রথম বিয়ে হয় সিরীয় লেখিকা রানা কাববানির সঙ্গে। বিয়ের বছরচারেক পরে ক্যামব্রিজে পিএইচডি করতে যান কাববানি। এভাবে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং আশির দশকের মাঝামাঝি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তারপর তিনি মিসরীয় অনুবাদক হায়াত হিনিকে বিয়ে করেন। এই বিয়েও এক বছরের বেশি টেকেনি। দারবিশের কোনো সন্তান হয়নি। এ-ব্যাপারে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘একাকী থাকা আমার নেশার মতো ছিল… আমি কখনো সন্তানাদি চাইনি, হয়তো দায়িত্বের ভয় ছিল। …আমার আরো স্থিতি প্রয়োজন ছিল। আমার মন, বসবাসের জায়গা আর লেখার স্টাইল সবসময় পরিবর্তমান ছিল। আমার কবিতাকে কেন্দ্র করেই আমার জীবন আবর্তিত হতো।’ তাঁর কবিতায় ‘রিতা’ নামে এক দয়িতার নাম পাওয়া যায়। হাইফায় অবস্থানকালে এই ইহুদি তরুণীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক হয়েছিল। তখন ইসরায়েলি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও সমর্থক ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটত। দারবিশের এই প্রেমের ঘটনা নিয়ে লেখ, আমি একজন আরব নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

দারবিশের দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়। একবার ১৯৮৪ সালে, আরেকবার ১৯৯৮ সালে। তার হৃৎপি–র জটিলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০০৮ সালের ৬ আগস্ট আমেরিকার টেক্সাসে মেমোরিয়াল হারম্যান হাসপাতালে তার হার্টের অপারেশন করা হয়। কিন্তু তিনি আর সেরে ওঠেননি। অপারেশনের তিনদিন পর, ৯ আগস্ট, তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্যালেস্টাইনি কবি ইবরাহিম মুহাভি বলেছেন, দারবিশের হার্টের অসুখ বেশ জটিল হয়ে উঠেছিল, কিন্তু জরুরি অপারেশন করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। আর তিনি তাঁর অপারেশনের জন্য যে-দিনটি বেছে নিয়েছিলেন, ৬ আগস্ট, সেটা ছিল হিরোশিমায় এবং লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের দিন। দারবিশ লিখেছেন, ‘এইদিন, হিরোশিমায় বোমাবর্ষণের দিন, তারা আমাদের মাংসে ভ্যাকুয়াম বোমাবর্ষণের চেষ্টা করছে, আর তাদের পরীক্ষাটা সফলকাম। অপারেশনের জন্য এই দিনটিকে বেছে নেওয়ার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইবরাহিম মুহাভি বলেছেন, দারবিশ প্যালেস্টাইনি জনগণের সামনে যে-শূন্যতা প্রত্যক্ষ করছিলেন তাকে মূর্ত করতে চেয়েছেন। তিনি বলে গিয়েছিলেন তাঁকে যেন প্যালেস্টাইনে দাফন করা হয়। তাঁর কবরের জন্য তিনটি জায়গা নির্বাচন করা হয় – তাঁর জন্মস্থান আল-বিরওয়া, কিংবা তাঁর পার্শ্ববর্তী গ্রাম জাদেইদা যেখানে তাঁর অনেক আত্মীয়স্বজনের বসবাস, অথবা পশ্চিম তীরের রামাল্লা। তাঁর লাশ আমেরিকা থেকে প্রথমে জর্দানে, তারপর রামাল্লা নেওয়া হয়। সেখানে প্যালেস অব কালচারের পাশে একটা পাহাড়ের চূড়ায় তাঁর লাশ দাফন করা হয়। তাঁর দাফন অনুষ্ঠানে প্যালেস্টাইনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আববাস, ফ্রান্সের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দোমিনিক দে ভিল্লেপিনসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। ইসরায়েলি নেসেটের কয়েকজন বামপন্থি সদস্যও এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। তাঁর সম্মানে প্যালেস্টাইন তিনদিনের জাতীয় শোক পালন করে।

 

দুই

১৯৬৭ সালে ইসরায়েল নতুন করে আগ্রাসন চালিয়ে পশ্চিম তীর, গাজা, সিনাই উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান হাইটস দখল করে নেয়। এ ঘটনার পরে প্যালেস্টাইনি জাগরণ নতুন মাত্রা লাভ করে। সাহিত্যেও দেখা দেয় নবতর উন্মেষ। ফাদওয়া তুক্কান, গাসান কানাফানি, এমিলি হাবিবি, মাহমুদ দারবিশ, শহর খলিফা, সামিহ আল-ক্কাসিম, তাওফিক জাইয়াদ প্রমুখ কবি ও কথাশিল্পী এই জাগরণের ফসল। দেশপ্রেম, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা, প্রতিবাদ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের রচনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। বৃহত্তর আরবি সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েও প্যালেস্টাইনি সাহিত্য এভাবে স্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা লাভ করে। মাহমুদ দারবিশ তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল। তিনিই প্যালেস্টাইনি সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও সম্মান এনে দেন।

দারবিশের কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা ৪২, গদ্যগ্রন্থ ১০টি। প্রায় ২৫টি ভাষায় তাঁর গ্রন্থাদি অনূদিত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিদের একজন তিনি। তাঁর কবিতার বই লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়। তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – ইউনিয়ন অব আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্সের দ্য লোটাস প্রাইজ (১৯৬৯), সোভিয়েত ইউনিয়নের লেনিন পিস প্রাইজ (১৯৮৩), ফ্রান্সের সর্বোচ্চ পুরস্কার দ্য নাইট অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স (১৯৯৩), আমেরিকার ল্যান্নান ফাউন্ডেশনের প্রাইজ ফর কালচারাল ফ্রিডম (২০০১), দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর অ্যারাবিক পোয়েট্রি প্রাইজ (২০০৭) ইত্যাদি।

আরবি কবিতার ঐতিহ্য অনেক পুরনো এবং ঋদ্ধ। এই ঐতিহ্যকে অস্বীকার না করলেও সমকালীন লেখকরা নিজস্ব ঐতিহ্য থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসে ইউরোপীয় আধুনিকতাকে আশ্রয় করেছেন। দারবিশও এই ধারার লেখক। তাঁর বেশিরভাগ কবিতাই গদ্যছন্দ ও মুক্তগদ্যে লেখা। কিন্তু আরবি কবিতার সংগীতময়তাকে তিনি কখনো উপেক্ষা করেননি। এই গুণের কারণে তাঁর অনেক কবিতায় সংগীতকাররা সুরারোপ করেছেন, সেগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তাও পেয়েছে।

একজন নির্বাসিত, নিয়ত ঠিকানা বদলকারী যাযাবর মানুষ হিসেবে দারবিশ যে অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক কষ্ট ও দুর্ভোগ সয়েছেন তা-ই নানান কাব্যিক রূপ-কাঠামোর মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়েছে তাঁর কবিতায়। দেশ হারানোর যাতনাকে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি। এমনকি যখন তিনি অন্য কিছু নিয়ে লিখেছেন, যেমন নারী, সেটাও প্রতীকী অর্থে তাঁর হৃত-স্বদেশভূমিকেই বুঝিয়েছে। লেখাপড়ার জন্য মস্কো যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন তাঁর স্বদেশভূমিতেই, যদিও ইসরায়েলের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ হিসেবে, যাঁকে বাস করতে হয়েছে সামরিক কর্তৃপক্ষের কঠোর বাধানিষেধের মধ্যে, যাঁর ছিল না কোনো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি। তবু তখন তিনি অন্তত প্রিয় মাতৃভূমির রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করতে পেরেছেন। কিন্তু মস্কোয় যাওয়ার পর, যখন আর স্বদেশভূমিতে ফিরতে পারলেন না ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞার কারণে, তখন স্বদেশের সঙ্গে যথার্থ অর্থেই তাঁর পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটল, তিনিও হয়ে উঠলেন লাখ লাখ স্বদেশবাসীর মতো স্থায়ী শরণার্থী। এগুলোই তাঁর কবিতার বিষয়-কিন্তু তাঁর শৈল্পিক সাফল্য এখানে যে, তিনি তাঁর এসব ব্যক্তিগত ও জাতীয় অভিজ্ঞতাকে সর্বমানবের হৃদয়োপলব্ধি করে তুলতে পেরেছেন। তাঁর অসামান্য সব কবিতা এতটাই আবেগময় ও অনুপ্রেরণামূলক এবং মর্মস্পর্শী যে, তা পাঠ করে একদিকে প্যালেস্টাইনিরা যেমন শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও স্বদেশের জন্য লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে, তেমনি বিশ্ববাসী এই লড়াইয়ের সমর্থক হয়ে উঠেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত ইসরায়েলি সরকারের প্রচারণার মোকাবেলায় দারবিশের একেকটি কবিতা অধিকতর শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু দারবিশের দৃষ্টিভঙ্গি উগ্র জাতীয়তাবাদ কিংবা অন্ধ দেশপ্রেমে আবদ্ধ হয়নি, তাঁর মেসেজ সবসময় মানবতাবাদ ও সর্বজনীনতায় ম–ত। তথাকথিত রাজনৈতিক ও প্রতিবাদী সাহিত্যে সাধারণত নিপীড়কের বিরুদ্ধে যে নিন্দাবাদ ও গালাগালি এবং অন্ধ বিরোধিতা পরিদৃষ্ট হয়, তা থেকে দারবিশ মুক্ত ছিলেন। তাঁর শত্রুও যে মানুষ, তাঁর মতোই, এ-কথা তিনি কখনো বিস্মৃত হননি। অন্যায় ও নিপীড়নের প্রতিবাদ এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করার অনমনীয়তাকে উদারতা, ক্ষমা ও মানবতাবাদী নীতিবোধে ম–ত করেছেন দারবিশ, আর সেটাই তাঁকে মহান লেখকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। ২০০২ সালে ইসরায়েল যখন রামাল্লা আক্রমণ ও অবরোধ করে তখন তিনি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘অ্যা স্টেট অব সিজ’ (অবরোধ অবস্থা) লেখেন। তিনি নিজেও এই অবরোধের শিকার হয়েছিলেন, ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন বোমার আঘাত থেকে। এই কবিতার এক জায়গায় তিনি ইসরায়েলি সেনার উদ্দেশে বলেছেন-

তুমি, দাঁড়িয়ে আছ কেন দোরগোড়ায়, আসো না ভেতরে

এসো একসাথে পান করি আরবীয় কফি

তাতে হয়তো তোমার মনে হবে তুমিও আমাদের মতোই

মানুষ;

হন্তারককে বলছি শোনো, তুমি যদি ভ্রূণটাকে আর

তিরিশটা দিন সময় দিতে

তাহলে সবকিছু অন্যরকম হতে পারত :

অবরোধ থাকত না, শিশুরা আর স্মরণ করত না

অবরোধকালের কথা,

 

একজন স্বাস্থ্যবান ছেলে হয়ে উঠতো সে,

পড়তো এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস

তোমার কোনো এক কন্যার সাথে একই কলেজে।

তাদের মধ্যে প্রেম হতে পারত।

আর তাদের হতে পারত একটা কন্যাসন্তান (হয়তো বা

জন্মগতভাবে ইহুদিই)

অথচ তুমি এখন কী করলে?

বিধবা বানালে তোমার মেয়েকে,

তোমার নাতনিকে এতিম করে দিলে?

তোমার ছন্নছাড়া পরিবারের প্রতি তোমার এ কী আচরণ,

একটি বুলেটের আঘাতে তিনটি পায়রাকে হত্যা করলে?

কীভাবে পারলে তুমি!

 

দারবিশের শেষ কবিতা, যা তাঁর মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে ছাপা হয়েছিল, তাতে তিনি দুজন শত্রুর একটি গর্তে পড়ে যাওয়ার গল্প বলেছেন। দুজন শত্রু যখন একই দুর্দশায় পতিত হয় তখন তারা কীভাবে অতীতকে স্মরণ করে, এবং আবার তা ভুলে গিয়ে কীভাবে আগ্রাসী সাপকে মারে, কীভাবে ভাবাদর্শের ওপর সহজাত প্রবৃত্তির বিজয় এবং একই সাধারণ সংকট শত্রুতার ধারণাকে অবাস্তব ও অর্থহীন করে দেয় তার চিত্র রয়েছে এ-কবিতায়। এই রূপক কবিতায় প্যালেস্টাইনি ও ইসরায়েলিদের কথাই তিনি বলতে চেয়েছেন। আসন্ন মৃত্যুকে সামনে রেখে তিনি বলেন-

সে বললো : এসো আমরা এখন আপস-মীমাংসা করি

আমি বললাম : কিসের মীমাংসা এখন, এই কবরের গর্তে?

সে বললো : এই কবর ভাগ করবো আমার আর তোমার মধ্যে

আমি বললাম : কী কাজে লাগবে সেটা?

সময় আমাদের ছেড়ে গেছে

আমাদের ভাগ্য নিয়মের ব্যতিক্রম

এখানে শুয়ে আছে হন্তারক এবং নিহত দুজনই, একই গর্তে ঘুমোচ্ছে তারা।

এই দৃশ্যের সমাপ্তি টানবে অন্য কোনো কবি, তার জন্য অপেক্ষা করো।

 

আরব সংস্কৃতিতে ‘জন্মভূমি’, ‘জন্মস্থান’ বা ‘স্বদেশভূমি’ বলতে সাধারণত নিজের ‘জন্মগ্রাম’কে বোঝায়। ১৯৪৮ সালে সে-গ্রামটিকে নিশ্চিহ্ন করে তার নামটাও বদলে ফেলে ইসরায়েল। তবু পরাধীন ও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হলেও, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্যালেস্টাইনেই, নিজ গ্রামে না হলেও তার পাশেই ছিলেন। তার পর থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি নির্বাসিত জীবন কাটান পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে, এমনকি কখনো কখনো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পালিয়ে বেড়াতেও হয়েছে। ইসরায়েলিদের আক্রমণের মুখে লেবানন থেকে প্রথমে সাইপ্রাস, তারপর তিউনিস, শুরু হয় এখান থেকে সেখানে আশ্রয়ের সন্ধান। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘আমি এসেছি ওখান থেকে, এখান থেকে, আসলে আমি এখানেও নেই, ওখানেও নেই।’ তারপর বলেন-

আমি এসেছি ওখান থেকে এবং আমার রয়েছে স্মৃতি

যেমন জন্মলাভ করে মৃতেরা

আমার একজন মা আছে

আছে অনেকগুলো জানালাওয়ালা একটা বাড়ি

আমার ভাইরা আছে, আছে বন্ধুরাও

আর আছে ঠান্ডা জানালাওয়ালা একটা বন্দিশালা-

আমি যত শব্দ শিখেছি তার সবগুলোকে ভেঙে

একটাই শব্দ বানিয়েছি কেবল, সেটা হলো – ‘স্বদেশভূমি’।

 

নির্বাসনে যেখানেই থেকেছেন দারবিশ শেকড়হীনতার অনুভূতি তাঁকে সবসময় তাড়া করে ফিরেছে। তাই কবিতার মধ্য দিয়ে স্বদেশভূমিতে ফেরার পথ তৈরি করেছেন –

আমি ভ্রমণ করতে পছন্দ করি এমন একটা গ্রামে

যেখানে সাইপ্রেসগুলোর ওপর ঝুলে থাকে না আমার শেষ

সন্ধ্যাকাল।

 

কিন্তু তিনি জানেন নিজ ভিটাতে ফিরে যাওয়ার পথ কুসুমাসত্মীর্ণ নয় – ‘গ্যালিলির গোলাপের কাছে পৌঁছার জন্য আমাকে অনেক গোলাপ হারাতে হবে।’

১৯৯৫ সালের পর থেকে দারবিশ তাঁর বাকি জীবন কাটিয়েছেন পশ্চিম তীরের রামাল্লায়। কিন্তু তাতে তাঁর মর্যাদার হেরফের হয়নি। তাঁর নিজের ভাষায়-‘আমি লেবাননে শরণার্থী ছিলাম, এখন আমার নিজের দেশেও আমি শরণার্থী।’ এই ‘নিজের দেশ’টা ‘হারিয়ে যাওয়া স্বদেশভূমি’। দারবিশ মনে করেন, স্বদেশভূমি পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ। এটা জন্মসূত্রে পাওয়া, তাই এর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যায় না। কেউ যখন নিজেকে প্রকাশ করে, তখন সে তার সেই জন্মগত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়েই নিজেকে প্রকাশ করে, বিশেষভাবে যখন সেটা হয় নিজ ভাষায়। ১৯৮৯ সালে লন্ডনে প্রকাশিত ‘মা’সাত আল-নারজিস ওয়া মালহাত আল-ফিদ্দা’(দ্য ট্র্যাজেডি অব নার্সিসাস অ্যান্ড দ্য কমেডি অব সিলভার) নামক দীর্ঘ কবিতায় দারবিশ বলেন, ‘মাতৃভাষার মতো স্বদেশভূমিও মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পায়।’ এই কবিতার এক জায়গায় তিনি তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে-

আমাদের স্বদেশভূমি সেটাই যেটা আমাদের স্বদেশভূমি

আর আমরা যার স্বদেশভূমি সেটাই আমাদের স্বদেশভূমি

এটা সেটাই আমরা যার গাছপালা এবং পাখি

এবং তার সকল প্রাণহীন বস্ত্ত।

আমাদের স্বদেশ হচ্ছে আমাদের জন্ম

আমাদের পূর্বপুরুষ

আমাদের নাতিপুতি

আমাদের শিশুরা, আমাদের হৃৎপি-

কাঁটাঝোপের কাঁটার ওপর দিয়ে

বনমোরগ বেড়ায় চরে

আমাদের স্বদেশভূমি হচ্ছে সে-ই

যার আগুন এবং ছাইকে আমরা লতার বেড়ায় ঘিরি।

তার মানে আমরাই তার স্বদেশভূমি

তার মানে আমরাই তার স্বদেশভূমি।

এটা বেহেসেত্মর কানন

নাকি একটা অগ্নিপরীক্ষা-

যাই হোক, একই ব্যাপার।

 

১৯৭০ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হাবিবাতি তানহাদু মিন সাওমিহার (মাই সুইট হার্ট রাইজেস ফ্রম হার সিস্নপ) একটি কবিতায় তিনি বলেছেন –

স্মৃতি তর্পণের প্রয়োজন নেই আমাদের :

কারণ কারমিল পাহাড় রয়েছে আমাদের অন্তরে

আর গ্যালিলির ঘাস হচ্ছে আমাদের চোখের পাতা।

‘যদি নদীর মতো তার দিকে বয়ে যেতে পারতাম।’ – বলবেন

না এ-কথা।

বলবেন না!

আমরা রয়েছি আমাদের স্বদেশভূমির মাংসের ভেতর… আর সে আমাদের ভেতর!

 

প্রখ্যাত সাহিত্য-সমালোচক ঈসা জে বুলাতা মাহমুদ দারবিশের স্বদেশপ্রেমের মূল প্রবণতা ও কারণ আবিষ্কার করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছেন-

‘দেশপ্রেমের আগুন প্রজ্বলিত রাখার জন্য তার বাহ্যিক বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। স্বদেশ যখন বস্ত্তগতভাবে দূরে, তখন তার প্রতি ভালোবাসাকে জীবন্ত রাখার জন্য কবিকে স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে হয়, যেমনটি ঘটেছে সকল প্যালেস্টাইনির ক্ষেত্রেই, যাদেরকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করা হয়েছে। স্মৃতি ছাড়া মানবিক প্রেম শুকিয়ে মরে যায়; যেরকম পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সংস্কৃতিকে আসন্ন ভবিষ্যৎ সন্তানদের মধ্যে প্রবাহিত করে দিতে হয়। মাহমুদ দারবিশ এবং সকল প্যালেস্টাইনির বোধগম্যের কারণেই প্যালেস্টাইনকে হারিয়ে ফেলার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ এটা গভীরভাবে অনুভূত তাদের জাতির এবং জীবনের ন্যায্য অধিকার হারানোর ক্ষতি, যা তারা এর আগে নিজেদের দেশে ভোগ করেছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। তারা মনে করেন তাদের অন্তরে এবং স্মৃতিতে প্যালেস্টাইনের টিকে থাকা উচিত। সেজন্য, দারবিশের কবিতায়, প্যালেস্টাইন-প্রেমকে অব্যাহতভাবে পুনঃপুন বৃদ্ধি করা হয়, এটা সম্পাদিত হয়েছে অতীতের স্মৃতি এবং স্বদেশের হ্রদ ও নদী, পাহাড় ও সমতলভূমি, সমুদ্র ও তার তীর, প্রাণী ও উদ্ভিদ, জলপাই ও কমলালেবু, গাছপালা ও পাখি, লোকসমাজ ও লোকসাহিত্য, এবং তার সকল বস্ত্তগত জিনিসের বারবার স্মরণের মাধ্যমে।’

(আল-জাদিদ, নবম বর্ষ, ৪৪ সংখ্যা, গ্রীষ্ম ২০০৩)

দারবিশের ক্ষেত্রে স্মৃতি এবং স্বদেশ অবিচ্ছেদ্য যমজস্বরূপ, আর এটাই একটা কারণ যে তাঁর কবিতা তাঁর স্বদেশ হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে তিউনিসে প্রকাশিত হিসার লি মাদায়িন আল-বাহর (সমুদ্র নগরীর অবরোধ) কাব্যগ্রন্থের ‘রিহলাত আল-মুতানাবিব ইলা মিসর’ (‘আল-মুতানাবিবর মিসর ভ্রমণ’) শীর্ষক কবিতায় দারবিশ বলেন – ‘আমার সবচেয়ে নতুন কবিতাটিই আমার মাতৃভূমি।’ এই মাতৃভূমির চেতনা তাঁর সমগ্র কাব্যসৃষ্টির মূল থিম ও বিষয়। r

Leave a Reply

%d bloggers like this: