মুখোমুখি তরুণ মজুমদার ….

বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণে তরুণ মজুমদার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর বা অসিত সেনের পাশে তাঁর নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়। অতি সরল,  স্নিগ্ধ, মাটির গন্ধমাখা ছবি করেছেন তিনি। মানব-হৃদয়ের জটিল গহন অন্ধকারে আলো ফেলেছেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে অসংখ্য সফল ছবি তৈরি করে বাংলা ছায়াছবির ভা-ারকে ঋদ্ধ করেছেন। এই সহজ-সরল নিরহং মানুষটির মুখোমুখি হয়েছিলেন সুশীল সাহা ও শৌভিক মুপোপাধ্যায়।

* যাত্রিকের প্রসঙ্গ থেকেই শুরু করি। সাক্ষাৎকারের সময় তথ্য সংগ্রহের জন্য ইন্টারনেটের দ্বারস্থ হলে দেখেছিলাম, আপনার পরিচালিত ছবির তালিকা শুরু হয়েছে চাওয়া পাওয়া থেকে। অথচ আমরা জানি, যান্ত্রিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চাওয়া পাওয়া ছাড়া কাঁচের স্বর্গস্মৃতিটুকু থাক এই তিনটি ছবি তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে যদি একটু জানান …

** আসলে প্রথম তিনটি ছবি আমি এবং আমার দুই বন্ধু মিলে, ‘যাত্রিকে’র নামে করেছিলাম। তারপর আমি নিজে আলোর পিপাসা ছবি থেকে পরিচালনায় আসি। যাত্রিকে দিলীপ মুখোপাধ্যায় ছিলেন, আর আমি ছাড়া অন্য আরেকজন ছিলেন শচীন মুখোপাধ্যায়।

* পরিচালনার দিকটা কি আপনিই বেশি দেখতেন?

** আমরা তিনজনে যখন একসঙ্গে ছিলাম, তখন এটা বলাই উচিত নয় যে, আমিই বেশি দেখতাম কি না।

* কিন্তু ফিল্মোগ্রাফিতে যেহেতু আপনার নাম পাচ্ছি তাই একটা কৌতূহল তৈরি হয় আর কি!

** আমি তো ছবির সঙ্গে জড়িত ছিলামই।

* আপনার জন্ম পূর্ববাংলায়। কত বছর বয়সে দেশত্যাগ করেছিলেন মনে আছে?

** সম্ভবত চোদ্দো বছর বয়সে।

* সেই সময়ে দেশত্যাগের কারণ, সাধারণভাবে ধরে নেওয়া যায় নিরাপত্তার অভাববোধ থেকেই উঠে এসেছিল। আপনার কাছে এই বিচ্ছেদ কীভাবে ধরা দিয়েছে …

** ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে দেশভাগ এসেছিল অত্যন্ত মর্মাস্তিকভাবে। উত্তর বাংলার যে ছোট্ট শহরটায় আমরা থাকতাম, বগুড়ায়, বাইরে থেকে দেখলে অবশ্যই মুসলমানপ্রধান জায়গা, তবু আমরা কখনো কোনোদিন বুঝতে পারিনি যে ওখানে হিন্দু-মুসলমান বলে আলাদা আলাদা কোনো বিভাগ আছে। তখন গাঁথুনিটাই এরকম ছিল, আমাদের যদি শাসন করতে হয়, বাড়ির লোকে যত না শাসন করতেন আশপাশের লোকেরা করতেন তার চেয়েও বেশি। তার ভেতরে যেমন হিন্দুরাও ছিলেন, মুসলমানরাও ছিলেন। আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাইরা বেশিরভাগই মুসলমান। তাঁরা যে কি ভালোবাসা দিয়েছেন আমাকে তার সীমা-পরিসীমা নেই। বন্ধুবান্ধবের ক্ষেত্রেও একই কথা বলব। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল একজন মুসলিম ছেলে। সে পাঁচ মাইল দূর থেকে পায়ে হেঁটে পড়তে আসত। আমরাও ছেলেবেলায় স্কুলে যেতাম খালি পায়ে হেঁটে। সে অতটা পথ হেঁটে আসত, আবার একইভাবে পাঁচ মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরত। ওর সাংসারিক অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিল যে, রাত্রিবেলা পড়ার জন্য লণ্ঠনের কেরোসিনটুকু সংগ্রহ করারও সামর্থ্য ছিল না। তাই স্কুল থেকে ফেরার পথে, আমাদের বাড়ির লণ্ঠনের আলোয় আমাদের সঙ্গে ও পড়ত, তারপর বাড়ি যেত। এ-রকমই ছিল সম্পর্ক। প্রতিবেশী দাদারা, স্কুলের দাদারা, বেশিরভাগই মুসলমান। আমরা সেভাবে কোনোদিন তেমনভাবে হিন্দুদের সঙ্গে থাকিনি, ফলে হয়েছে কি, যখন ছেড়ে চলে আসতে হলো আমরা একেবারে অপ্রস্ত্তত হয়ে পড়েছিলাম। এবং এই ঘটনাটা স্থানীয় লোকেরা করেনি। অন্য জায়গা থেকে কিছু লোক এসে বিচ্ছিন্নতার ধুয়ো তুলে ক্রমশ এই বিভেদের ধারণাটা ঢোকায়। শেষকালে আমার সেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুটি, একদিন বাবাকে এসে বলল, আমার মনে হয় আর আপনাদের এখানে থাকাটা ঠিক হবে না, মানে আমাদেরই এবার ভয় লাগছে।

* সেটা কোন সাল আপনার মনে আছে?

** হ্যাঁ, ১৯৪৫। তারপরই আমরা চলে আসি।

* ’৪৫-এই চলে আসছেন। গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং তাহলে …

** আমার চোখের সামনে হয়েছিল।

* … এসেই কি কলকাতায়?

** হ্যাঁ। কলকাতায় আসার আগে আমি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে এসেছিলাম। একটু অল্পবয়সেই দিয়েছিলাম। রেজাল্টও খুব খারাপ হয়নি। স্কলারশিপও পাই, যাতে পরবর্তী সময়ে অনেক সুবিধে হয়েছিল। আমার ঝোঁক ছিল সায়েন্সের দিকে। কিন্তু বাকি সব সাবজেক্টে লেটার পেলেও অংকে লেটার পাইনি। অংকে লেটার পাইনি বলে প্রেসিডেন্সি, সেন্ট জেভিয়ার্স, স্কটিশ চার্চ ইত্যাদিতে আমি ভর্তি হতে পারলাম না। তারা সবাই বলল, তুমি আর্টস নিয়ে ভর্তি হও, আমরা এক্ষুনি নিয়ে নিচ্ছি।

* কিন্তু আপনার ইচ্ছে সায়েন্সে যাবেন …

** হ্যাঁ। তখন খুঁজে পেতে সেন্ট পলস কলেজে ঢুকে গেলাম। ওখানকার হোস্টেলেই থাকতাম। তার কিছুদিন পরপরই গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংটা হয়। আমার চোখের সামনেই।

* আপনি ওখানে আবাসিক হিসেবে রইলেন আর পরিবারের  বাকি সদস্যরা?

** মা-বাবা এঁরা তখন অনেক কষ্টে উত্তর কলকাতার গ্যালিফ স্ট্রিট অঞ্চলে একটা আস্তানা জুটিয়ে নিয়েছিলেন।

* এপারে আসার সময়ে ওপারে সব ছেড়ে এসেছেন কি?

** হ্যাঁ, সব ছেড়ে এসেছি।

* স্কলারশিপের টাকাটা ছিল বলে তবু পড়াটা চলছে …

** হ্যাঁ! তা ছিল। তাছাড়া বাবা স্বদেশি করতেন। জেল-টেলও খাটতেন। আমাদের বাড়ির অনেকের মধ্যেই এ ব্যাপার ছিল। আমার একটি ছোটভাই ছিল। যদিও কলকাতাতেই আমাদের মামার বাড়ি এবং তারাও সাহায্য করতে খুব উৎসুক ছিলেন; কিন্তু আমার মা ওই সময়টাতে ইচ্ছা করেই কোনো সাহায্য নেননি! ওঁরাও সবসময় পাশে ছিলেন। আরো অনেকের গল্পের মতোই আমার গল্প। সাধারণত যেরকমটা হয় আর কি। আমার এক কাকা ছিলেন, অনেকদিন বুঝতেই পারিনি যে, তিনি আমার আপন কাকা নন, আমাদের বাড়িতে মানুষ হয়েছিলেন। তাঁরাও এখানে এলেন। সবারই জীবনযুদ্ধ একসঙ্গে শুরু হয়ে গেল।

* সেন্ট পলস থেকেই কি গ্র্যাজুয়েশন করলেন?

** না! না! সেন্ট পলসে তখনো গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত প্রভিশন ছিল না। আইএসসি পর্যন্ত পড়া যেত। তারপর আমি স্কটিশ চার্চে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে ভর্তি হই। সেখানেও আবার ওই এক ব্যাপার, যখন ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলাম তখন ম্যাথমেটিক্স আর ফিজিক্সে লেটার ছিল। কেমিস্ট্রিতে ছিল না। আর আমি কেমিস্ট্রিতেই অনার্স নিলাম। পড়াশোনার পর্ব স্কটিশেই শেষ।

* পড়াশোনা মিটল। ছবির জগতে কীভাবে এলেন? দারিদ্রে্যর সঙ্গে লড়াই করছেন, সংসার চালাতে হবে, এর মধ্যে ছবি করার কথা ভাবলেন কখন?

** সে অনেক পরে …

* তার আগে কোনো প্রস্ত্ততি ছিল?

** আসলে আমরা যেখানে থাকতাম বগুড়াতে, সেখানে দুটো সিনেমা হল ছিল। তখন মফস্বলের ফিল্ম কালচার একটু অন্যরকম ছিল। আমাদের ওখানে যেসব ছবি আসত, তাদের মধ্যে হয় এখানকার নিউ থিয়েটার্সের ছবি অথবা বোম্বে টকিজের ছবি। ইংরেজি ছবি তো বেছে বেছে আসত, যেমন চার্লি চ্যাপলিনের ছবি ইত্যাদি।

আমাদের বাড়ি থেকে সেরকমভাবে, ছবি দেখায় কোনো বাধানিষেধ ছিল না। পারিবারিক অবস্থার কারণে খুব ঘনঘন হয়তো দেখতে পারতাম না, কিন্তু আগ্রহ বজায় ছিল সমানতালে। ছবি দেখতে দেখতে একটা মজার ব্যাপার হতো সেটাই বোধহয় আমায় সিনেমায় টেনে নিয়ে এসেছিল। যখন অন্ধকার হলে পর্দায় ছবি দেখছি তখন আমার অজান্তেই ওই পাত্রপাত্রীদের নিয়ে আমি অন্য একটা গল্প বুনতে শুরু করতাম। অনেকক্ষণ পরে আমার খেয়াল হতো, আরে! আমি তো মূল সিনেমা থেকে সরে এসেছি। পুরোটাই নিজের মতো করে ভাবছি। এটাকে সিনেমা দেখার নেশায় বা শখেই বলুন, এরকম খেয়াল একটু ছিল।

* তখন তো অল্প বয়স, স্কুলে পড়েন?

** হ্যাঁ। তারপর কলকাতায় চলে আসি। তখন আমরা জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছি আর কি, কিন্তু ওই যে ইচ্ছেটা, সেটা মনের ভেতর রয়ে গেছে। এখনকার মতো এত ফিল্ম লিটারেচার সে-সময় পাওয়া যেত না। ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনও স্তিমিত। আমি তখন সেই  আন্দোলনের ধারেকাছেও নেই। কোথায় গেলে কী হয়, জানতাম না। এদিকে পড়াশোনায়ও মন দিতে হবে।

একজন হঠাৎ একদিন এসে বলল, মেট্রো সিনেমার গলিতে সাইক্লোস্টাইল করা স্ক্রিপ্ট বিক্রি হয় খুব সস্তায়। বোধহয় চার আনা দাম ছিল।

* এটা কোন সময়? পঞ্চাশের দশকেই?

** হ্যাঁ। ’৪৫-৫৪। সময় করে আমিও একদিন গেলাম। দেখলাম সত্যি সত্যি রাস্তার ধারে কিছু মুসলমান স্ক্রিপ্ট ঢেলে, ছড়িয়ে অবহেলায় বিক্রি করছে। আসলে মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ারের যেসব ছবি আসত, তাদের সঙ্গে এক কপি করে সাইক্লোস্টাইল স্ক্রিপ্ট পাঠানো হতো সেন্সরের জন্য। সেন্সর হয়ে যাওয়ার পর ছবি রিলিজ হয়ে গেল, ওইগুলো ওরা হয়তো সের দরে বিক্রি করত। সেগুলো কিনে নিয়ে এরা আবার চার আনা দরে বেচত। এছাড়াও সেই সময়ের কিছু কিছু পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়ে জানাচেনা ইত্যাদি এগিয়ে চলছে। মনের মধ্যকার সুপ্তবাসনাটা হারিয়ে যায়নি।

* সেসব স্ক্রিপ্টের বেশিরভাগই কি ইংরেজি ছবির স্ক্রিপ্ট?

** বেসিক্যালি ইংরেজি ছবির স্ক্রিপ্ট, বাংলা ছবির স্ক্রিপ্টের চল ছিল না, তাছাড়া মেট্রোতে দেখাতও না। এই করতে করতে, আগ্রহ জন্মাতে শুরু করল। স্ক্রিপ্টের স্ট্রাকচার সম্পর্কে ধারণা জন্মাতে শুরু করল। একটা স্ক্রিপ্টে কী কী হয়, কী কী থাকে ইত্যাদি। আমার মামাবাড়িতে আমার বড়মামা ফিল্মের সঙ্গে রিমোটলি কানেক্টেড ছিলেন। যখন আমার পড়াশোনো শেষ হয়ে গেল তখন আমি বড়মামাকে বললাম, আমি ফিল্ম লাইনে যোগ দিতে চাই।

* তখন ফিল্ম লাইনকে খুব সম্মানের বলে মনে করা হতো কি!

** আমার দিক থেকে কোনো অসুবিধা হয়নি, আমার বাড়িতে আমার মা-বাবা দুজনেই বললেন, মন যেদিকে চায় তুমি সেদিকে কাজ করো। Inspite of family, পরিচিতদের দিক থেকে খুব প্রেসার ছিল। দূরের আত্মীয়রা অনেকেই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আমার বাবা, মা, কাকা, অন্য কাকারা বললেন, তোমার মন যেদিকে চায় তুমি তাই করো, আমরা ঠিক চালিয়ে নেব। তখন আমি মামাকে ফের বলতেই মামার এক পরিচিতকে মামা আমার কথা বললেন। তিনি ছিলেন একটি ফিল্ম স্টুডিওর মালিক। পার্ক সার্কাসের ঝাউতলা লেনে তাঁদের স্টুডিও ছিল। এখন অবশ্য সেটা আর নেই। একদিন সেখানে মামা আমায় নিয়ে গিয়ে ওই মালিক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে বললেন যে, আপনাকে আমরা তো এমনি নিতে পারব না, মাইনেও দিতে পারব না, আপনি ক্যামেরা ডিপার্টমেন্টে অবজারভার হয়ে থাকতে পারেন। কেননা ডিরেকশন ডিপার্টমেন্টে বাইরের ডিরেক্টর এসে কাজ করেন, সেখানে আমার কোনো কথা খাটবে না, কিন্তু ক্যামেরা স্টুডিও থেকে নেওয়া হয় …

প্রথম দু-তিনদিন আমি জাস্ট এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতাম, লজ্জা লজ্জা করত। অবশ্য কেউ আমাকে বিশেষ লক্ষও করত না। টিফিন খাওয়ার সময় সবার জন্য খাবার এলে আমি আস্তে আস্তে এক কোণে সরে যেতাম, আবার পরে চলে আসতাম। কিন্তু কদিন পরে দেখা গেল আমাকে নিয়েও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ওখানকার যিনি সাউন্ড রেকর্ডিস্ট তিনি একদিন এসে বললেন, আপনি এখানে কেন ঘোরাফেরা করছেন, আপনি তো আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার নন। ফলে এখানে খুব একটা সুবিধে হবে না। CTAB বলে একটা সংস্থা ছিল সেই সময় Cine Technicians Association of Bengal। আমি বললাম, আমি যদি মেম্বার হই? বললেন, না। এখন আর মেম্বার নেওয়া হচ্ছে না, কারণ এমনিতেই চারদিকে অনেক বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুতরাং আপনার কাজ করা চলবে না। স্টুডিও মালিকও মুখ চুন করে আমাকে এসে বললেন, দেখতেই তো পাচ্ছেন কী অবস্থা! এখন আর আমার কিছু করার নেই।

অগত্যা আমি বেরিয়ে এলাম। এটা স্টুডিওতে ঢোকার দিন পাঁচ-ছয় পর।

* মানে খুব বেশিদিন নয়।

** না! দিন চার-পাঁচ-ছয় পরই আমাকে অন্যপথ দেখতে হয়েছে।

* আপনি কি তখন শুটিং দেখেছেন?

** শুটিং দেখেছি, ওই এক কোণে দাঁড়িয়ে যেটুকু দেখা যায়। ক্যামেরাম্যান এবং তার অ্যাসিস্ট্যান্টরা আমার প্রতি খুবই সদয় ছিলেন কিন্তু অন্যরা, যাঁরা ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, হয়তো ইউনিয়নের নেতাগোছের কেউ কেউ, বাধা দিলেন। মজার কথা হলো, পরে যখন আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর হই, যিনি বাধা দিয়েছিলেন তিনিই আবার আমার সাউন্ড ডিরেক্টর হয়ে কাজ করেছিলেন। সে অনেক পরের কথা। তখন তাদের প্রিন্সিপাল অনুযায়ী তারা কাজ করেছেন, এতে তাদের কিছু অন্যায় দেখি না। সে-কারণে ব্যক্তিগতভাবে কখনো সম্পর্ক নষ্ট হয়নি।

এরপর কী করি! কী করি! কী করি! অন্য একটি চাকরি পেয়ে ঢুকে গেলে, ফিল্ম থেকে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব, এই ভেবে তখন আমি যারা শুধু ফিল্মেরই পাবলিসিটি করে, এমন একটি পাবলিসিটি কনসার্নে চাকরি নিয়ে ঢুকলাম। খুব অল্প টাকায়, শুধু যোগাযোগটা রাখার জন্য। একটু কষ্ট হলেও ফিল্মের লোকজনের কাছাকাছি আসতে পারব, এটুকুই ছিল বড় পাওনা। যাঁরা ওই কনসার্নে পাবলিসিটির ভার দিতেন, তাঁদের মধ্যে কানন দেবী,
দেবকী বাবু ছিলেন। এঁদের সঙ্গে আমার আস্তে আস্তে আলাপ শুরু হলো। শেষ পর্যন্ত কানন দেবীই একদিন বললেন, আমি শুনেছি যে, আপনার ফিল্মে আসার ইচ্ছে আছে। আপনি আমার অর্গানাইজেশন শ্রীমতী পিকচার্সে অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে জয়েন করুন। আমার দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে। আমি তো মাইনে দিয়ে রাখতে পারব না, কিন্তু আপনি অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ করুন। দ্বিতীয়বার আমি ফিল্ম-আঙিনায় পা দিলাম।

* তখন মেজদিদি হচ্ছে, না হয়ে গেছে …

** মেজদিদি আমার চোখের সামনে হয়েছে। তারপর নববিধান, দেবত্র, আশা, আঁধারে আলো, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত ইত্যাদি হলো।

* তখন থেকেই আপনি কাজ করছেন …

** হ্যাঁ। আমি অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছি without any pay। পরের দিকে ওঁরা আমাকে রেমুনারেশন নিতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি দেখলাম ওঁদের সঙ্গে এত সুন্দর সম্পর্ক হয়ে গেছে, টাকা-পয়সা মাঝখানে এসে যদি তাকে নষ্ট করে দেয়, সেজন্য আমি আর কিছু বলিনি। ওইখানে থাকতে আমার ওপর যে দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন তারাই হলেন দিলীপ বাবু আর শচীনবাবু। ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। তারপর আমরা ঠিক করলাম আমরা নিজে পরিচালনায় আসব।

* দিলীপবাবু তো পরে অভিনয়ে এলেন।

** আমাদেরই ছবি কাঁচের স্বর্গতে এলেন। আমরা তিনজনে মিলে কানন দেবীকে তখন বললাম যে আমরা এরকম ভাবছি। শুনে তিনি আমাদের খুব আশীর্বাদ করলেন; কিন্তু একই সঙ্গে বললেন, এটা খুব কঠিন জায়গা। তারপর যখন রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত হয়, শুটিং হয়, শুটিং হতে হতেই একদিক থেকে উত্তমবাবু আরেকদিক থেকে মিসেস সেন, সুচিত্রা সেন, দুজনেই আলাদাভাবে বললেন – আপনারা যদি কখনো নিজের ছবি ডিরেকশন দেন আর আমাদের প্রয়োজন হয়, আমরা আছি।

* ওঁদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল? ভালো ছিল?

** হ্যাঁ, ভালোই। আমার ধরন হলো, আমি কখনো কারো সঙ্গে বেশি মিশে যেতে পারি না। কিন্তু এক ধরনের সম্পর্ক থাকে। উত্তমই আমাকে বলেছিল যে, ভবিষ্যতে আপনি যদি কোনো ছবি করেন আর আমাকে দরকার হয়, তাহলে বলবেন, আমি আছি। আমি ভাবলুম, এ বোধহয় কথার কথা। রাতেই আবার আমরা যেখানে ছিলাম, রাজগিরে, সেখানে এসে বললেন, আমি কিন্তু তখন এমনি এমনি বলিনি। সত্যি সত্যি বলেছি। যদি দরকার হয় তো বলবেন।

* তখন ওঁরা তো খ্যাতির শীর্ষে …

** একদম। আর মিসেস সেনও আলাদাভাবে এরকমই বলেছিলেন। এই খবর কী করে বাইরে প্রচার হয়ে যায়, তখন যারা রূপবাণী, ভারতী, অরুণা সিনেমা হলের মালিক, তাদের একটা প্রোডাকশন অর্গানাইজেশন ছিল। তারা আমাদের ডেকে বললে, তোমরা সৎপথে থেকে কাজ করো।
খেটে-খুটে ছবি করো, আমরা তোমাদের পেছনে আছি।

এই হলো চাওয়া-পাওয়া ছবির শুরু।

* চাওয়া-পাওয়া হচ্ছে, ঊনষাট সাল। তারপরই স্মৃতিটুকু থাক

** স্মৃতিটুকু থাক

* এ-প্রশ্নটা এই সূত্রেই করে নিচ্ছি কারণ পরে এ-প্রশ্ন আসতই, উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের সঙ্গে আপনার এতো ভালো সম্পর্ক, ওঁরা এতো ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী, তবু এরপর আর কখনো ওঁদের সঙ্গে কাজ করেননি। কেন?

** স্মৃতিটুকু থাক-এ আমি মিসেস সেনের সঙ্গে কাজ করেছি, আর করিনি মানে, অন্যকিছু নয়, আমার মনে হলো এঁদের নিয়ে কাজ করার যেমন অনেকগুলো সুবিধে আছে, তেমন অসুবিধেও আছে। অসুবিধে মানে হচ্ছে যে, আমি যেরকম ছবি করতে চাই, এতে যেহেতু ওঁরা Stars, আমি যদি খুব সাতসকালে আউটডোর লোকেশনে এঁদের চাই তা হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর এঁদের নিয়ে অনেক টানাটানিও হয়, সবাই চায় এঁদের। আমি চাই ফ্রি আর্টিস্ট। কিন্তু একটি মজার ব্যাপার হলো, ওঁদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমার সঙ্গে ওঁদের সম্পর্ক ছিল, উত্তমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, মিসেস সেন তো  অন্তরালে চলে গেলেন।

* কিন্তু সম্পর্ক ছেদ হয়নি …

** না। অনেক শুভেচ্ছা পেয়েছি। আমি যে আলাদা ট্র্যাকে ছবি করছি, আলাদা ধরনের ছবি করছি এতে উত্তম আমাকে বারবার বলেছেন, একটা খুব কাজের কাজ করছেন আপনি। পরে আমাদের একসঙ্গে একটা ছবি করার কথা হয়েছিল, টিনের তলোয়ার। উত্তমই ইন্টারেস্টেড হয়েছিল, বীরকৃষ্ণদার চরিত্রটি করার ব্যাপারে। তখন আমি একটা ছবি করছিলাম, ওটার স্ক্রিপ্ট তৈরি করছিলাম, দুর্ভাগ্যবশত উত্তমের সেই সময় মৃত্যু হয় …

* কিন্তু তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন …

** খুবই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আমাদের তো সেরকম ফরমাল রিলেশন ছিল না তখন। আমার অফিসে এসে বললেন, একটু গস্নাসে করে চা খাব। এই রকম …

* যাত্রিক তৈরির কথা জানলাম। বন্ধ হলো কী করে?

** এমনি এমনি বন্ধ হয়নি। কাঁচের স্বর্গতে তখন নানারকম আর্টিস্টকে চেষ্টা করেও কাউকেই মানাচ্ছে না, এই করতে করতেই আমি হঠাৎ একদিন আমাদের প্রোডিউসার ভদ্রলোককে বললাম, আচ্ছা আমাদের দিলীপবাবুর কথা ভাবলে কেমন হয়! উনি বললেন, আপনি যেটা ভালো মনে হয় তাই করবেন। সেই দিলীপবাবু এলেন অভিনয় করতে। এবং কাঁচের স্বর্গতে অভিনয় করে ওনার বেশ সুনাম হলো। এবার যেই তিনি অভিনয় করতে শুরু করলেন ওঁর হয়তো মনে হলো অভিনয়টাই ওঁর ক্ষেত্র, এখান থেকেই আস্তে আস্তে মানে যাত্রিক ভাঙতে শুরু করল। শচীনবাবুও তখন ক্রমশ নিজেকে সরিয়ে … মানে আমরা একটু আলাদা আলাদা হয়ে গেলাম।

আমি তখন মিস্টার শান্তারামের ডাকে পলাতক করছি। আমি জানতাম না যে যাত্রিক ভাঙবে।

* ভি. শান্তারামের সঙ্গে যোগাযোগ হলো কী করে?

** পলাতকের স্ক্রিপ্টটা আমি যখন তৈরি করি তখন, গোড়াতেই ভেবেছিলাম যে, এর নায়ক এমন একজন হবে, যে দেখতে ইম্পারফেক্ট। কেননা চরিত্রটাই ইম্পারফেক্ট। মানে সর্বগুণসম্পন্ন নায়ক এক্ষেত্রে অচল।

* কিন্তু অনুপকুমারের কথা মাথায় এলো কী করে …

** শুরু থেকেই আমার অনুপের কথা মনে হয়েছিল।

* কিন্তু ততদিনে তো অনুপকুমার কমেডি অভিনেতা হিসেবে সাংঘাতিক পরিচিত। সিরিয়াস কোনো অভিনেতার কথা ভাবেননি একবারও?

** না! আমার মনে হয়েছিল ওর ভেতরে জিনিস আছে। অনুপকে হিরো হিসেবে নেওয়ার ফলে, বেঙ্গলের কোনো প্রোডিউসার এগিয়ে আসেনি। অথচ তার আগে আমার তিনটে ছবি হিট, যার মধ্যে একটা জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছে। এমন চলতে চলতে একদিন হঠাৎ সকালবেলা মিস্টার ভি. শান্তারামের ইস্টার্ন রিজিয়নের ডিস্ট্রিবিউটর ছিলেন একজন গুজরাটি ভদ্রলোক, মি. মনসাদা, তিনি এসে হাজির। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমায় এসে বললেন, শোনো! তোমায় একবার বোম্বে যেতে হবে। আমি বললাম, কেন? বললেন, মিস্টার শান্তারাম একটা ছবির পরিকল্পনা করছেন হাতিমহল বলে। তিনি একটা হাতি কিনেছেন। হাতিটা স্টুডিওতে কলাগাছ খেয়ে যাচ্ছে রেগুলার, কিন্তু স্ক্রিপ্টটা কমপিস্নট হচ্ছে না। তো তিনি আমাকে খবর পাঠিয়েছিলেন যে তোমার জানাশোনা যদি কেউ থাকে যে স্ক্রিপ্ট কমপিস্নট করে ছবিটার ডিরেকশন দিতে পারবে তাহলে পরে তুমি তাকে নিয়ে এসো। আমায় তিনি, মি. মনসাদা, বাবার মতো স্নেহ করতেন। বললেন, আমার সঙ্গে তুমি বোম্বে চলো। আমি ভাবলাম, ঠিক আছে যাওয়া যাক। একবার দেখি অন্তত। তখন পলাতকের স্ক্রিপ্টের জাস্ট একটা ভার্সন শেষ হয়েছে। ওটা আমি ওখানে একটু ব্রাশআপ করার জন্য নিয়ে গেলাম। কাজের ফাঁকে ফাঁকে হোটেলেই থাকব, স্ক্রিপ্টের কাজও এগোবে।

* ওটা তো মনোজ বসুর একটা ছোট্টগল্প …

** হ্যাঁ! ‘আংটি চাটুজ্জ্যের ভাই’। ওটায় অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে।

 বোম্বেতে গিয়ে মি. শান্তারামের সঙ্গে দেখা হতেই তিনি বললেন এটা কী? আমার হাতে তখন স্ক্রিপ্টটা ছিল। আমি বললাম, এটা স্ক্রিপ্ট। একটা বাংলা ছবি করব। তিনি বললেন, May I have a look at it?

আমি দিলাম। তিনি পাতা-টাতা উলটে হঠাৎ বললেন, তুমি একটা কাজ করতে পারবে? তুমি একবার পড়ে শোনাতে পারবে? The way you write …

আমি সংলাপ বাংলায় আর ডেসক্রিপশন পার্টটা ইংলিশে লিখেছিলাম। বললেন, যেভাবে তুমি তোমার আর্টিস্টদের দিয়ে অভিনয় করাতে চাও, সেটাকে বজায় রেখে তুমি আমায় এটা ট্রান্সলেট করে শোনাও।

কঠিন কাজ, তাও করলাম। অনেকটা সময় নিল। যখন শেষ হলো তখন রাত হয়ে গেছে। তিনি বসে আছেন চুপ করে। অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে আছেন, আমিও বসে আছি। ঘরে কেউ নেই। হঠাৎ বললেন, চা খাবে? তোমরা বাঙালিরা তো খুব চা ভালোবাসো। আমি বললাম, হ্যাঁ খেতে পারি। কথা বলতে বলতেই তিনি ফোন করে সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজনকে ডেকে পাঠালেন। সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, ডিস্ট্রিবিউশনের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, প্রোডাকশনের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, জেনারেল ম্যানেজার ইত্যাদি। ওঁরা আসতেই তিনি বললেন, আলাপ করিয়ে দিই। আমাদের ব্যানারের নেক্সট ডিরেক্টর তরুণ মজুমদার। এ পুরো ইউনিট নিয়ে এখানে আসছে, অমুক অমুক জায়গা খালি করো। ডিস্ট্রিবিউশন অফিসটা খালি করে দাও। ছেলেরা সব ওখানে থাকবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ভদ্রলোক মৃদু আপত্তি করে বললেন, তাহলে আমার ডিস্ট্রিবিউশন অফিস? তিনি বললেন, আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে যাচ্ছি এঁনাকে নিয়ে ভিজিট করতে। ওটাকে খালি করতে হবে।

মানে উনি এরকমই ছিলেন। একটা কিছু ঝোঁক চাপল তো কি, উনি সেটা করে ছাড়তেন।

ওর স্টুডিওর নাম ছিল রাজকমল কলামন্দির। এখনো সেটা আছে, তবে অন্যরকম হয়ে গেছে।

ঠিক হলো এখানকার আর্টিস্টরা সব ওখানে যাবে। টেকনিশিয়ান্সরাও এখান থেকে যাবে। আমার আর্ট ডিরেক্টর ছিল বংশী, বংশী চন্দ্রগুপ্ত। ও বলল, গ্রামের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি, ওখানে এসব স্পেশাল প্রপার্টি কিন্তু পাওয়া মুশকিল হবে। এই ধামা, কুলো প্রভৃতি সব ওখানে অন্যরকম। এমনকি গরুগাড়ির চাকাও অন্যরকম। যা হোক আমাদের কাজটা তো করতে হবে। হেমন্তবাবু আমাদের মিউজিক ডিরেক্টর ছিলেন। ওদের স্টুডিওতে আমাদের গানটান সব রেকর্ডিং হলো।

হঠাৎ একদিন মিস্টার শান্তারাম এসে আমায় বললেন যে, আমি একটা ব্যাপারে তোমার কাছে খুব দুঃখ প্রকাশ করতে চাই। বললাম, কেন? তিনি একটা ছবি করছিলেন, শেরা বলে, তার ছবিটা তখন কমপিস্নট হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ ওর মনে হলো কিছু অংশ রি-শুট করা দরকার। এদিকে তার আগেই আমাকে কমিট করেছিলেন, ওঁর ওখানে দুটো ফ্লোর আছে। দুটো ফ্লোরই আমাকে দিয়ে দেবেন। কেননা কলকাতা থেকে আর্টিস্টরা যাবে, তারা তো বসে থাকতে পারবে না। তাই টানা কাজ হবে।

এখান থেকে ওখানে শিফট হয়ে খানিকটা শুট হলো। ইতোমধ্যে পরের সেট তৈরি হয়ে গেল, এরকম ভাবা হয়েছিল।

আমায় বললেন, আমার অন্তত একটা সেট চাই। একটা ফ্লোর চাই আমার নিজের কাজটা করার জন্য, তা নইলে আমার ছবিটা আটকে যাবে। আমি বললাম, তাহলে কিন্তু আপনার খরচা অনেক বেড়ে যাবে। তখন তিনি অনেক কিন্তু কিন্তু করে, by that time আমার সঙ্গে ওনার ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে, বললেন, আমরা একটা কাজ করতে পারি না? আমরা তোমার ছবিটা কলকাতায় নিয়ে গিয়ে শুট করতে পারি না? আমি বললাম, তাহলে খুব ভালো হয়। সেই ছবিটি কলকাতায় চলে এলো। ছবিতে বাংলার নিসর্গ যেভাবে ব্যবহার হয়েছে সেটা বোম্বেতে পাওয়া যেত না। মহারাষ্ট্রের গ্রামও সুন্দর কিন্তু রুক্ষ, ওখানের মাটি লালচে, ওই যে বললাম গরু  গাড়ির চাকা পর্যন্ত আলাদা।

তারপর পলাতক রিলিজ করল। তখন পর্যন্ত যাত্রিক ছিল। আমি শান্তারামজির সঙ্গে এ নিয়ে ঝগড়া করেছি। তিনি বলেছিলেন, আমি যাত্রিক-ফাত্রিক বুঝি না। আমি তোমাকে চিনি।

* আপনি স্বাধীনভাবে করতে চাননি তখন …

** না। আমি তখনো জানি না যে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দিয়েছে। আমি বললাম যে, আপনার কোথায় আপত্তি, আপনি আমাকে যা রেমুনারেশন দেবেন, সেটাই দিন। আমরা তিন ভাগ করে নেব। আর আমার নামের বদলে যাত্রিক নামটা থাকবে। এইটা নিয়ে চার-পাঁচবার বৈঠক হলো।

তিনি বললেন, আমি ওইসব বুঝতে পারি না। ডিরেকশন দেওয়াটা একটা মাথার কাজ। তারপর শেষ অবধি তিনি রাজি হয়ে গেলেন।

By that time যখন এখানে কাজ হচ্ছে তখনই আমি বুঝতে পেরেছি যে যাত্রিকে ভাটার টান ধরে গেছে, ওটা আর থাকবে না।

তারপর আমি নিজের নামে আলোর পিপাসার কাজ শুরু করলাম।

* আলোর পিপাসা নিয়ে আসছি। তার আগে পলাতক নিয়ে আরেকটু বলছি, হেমন্তবাবুর গান কিন্তু এই ছবির বড় সম্পদ।

** নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই।

হেমন্তবাবু আমার সঙ্গে ২৫ বছর কাজ করেছেন। পলাতক দিয়ে যার শুরু। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, সকালবেলায় হেমন্তবাবু স্ক্রিপ্ট শুনে অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে গেলেন, বিকেলবেলায় এসে বললেন, শুনুন! আমি কিন্তু এই ছবিটা করতে চাইছি না। আমি বললাম, কেন? তিনি তো কিছুতেই বলবেন না। তারপর বললেন যে, গানগুলো সমস্ত ফোক অঙ্গের, আমি আবার ফোকে একটু খাটো আছি। আমি ওনাকে জোর করেই করালাম।

* আর সে-গান সুপার-ডুপার হিট …

** গীতা দত্তের গান আছে। হেমন্তবাবুর গান আছে।

এই সম্পর্কটা আমাদের পরবর্তী ২৫ বছর অবধি ছিল। ওঁর মৃত্যু অবধি ছিল। শেষ অবধি তিনিই বললেন আমি আর পেরে উঠছি না। এটা বোধহয় রেকর্ড, একজন ডিরেক্টর একজন মিউজিক ডিরেক্টর একসঙ্গে একটানা ২৫টা ছবির কাজ করেছেন।

* আলোর পিপাসা প্রসঙ্গে আসি। স্বাধীনভাবে আপনার প্রথম ছবি আলোর পিপাসা ’৬৫ সালে। সেই বছরই আপনি একটুকু বাসা করেছেন। একই সঙ্গে রিলিজ হচ্ছে। নির্ভেজাল হাসির ছবি। পরবর্তী সময়ে এই হাসির ঝিলিক দাদার কীর্তি, শ্রীমান পৃথ্বীরাজে দেখেছি। কিন্তু আপনি তারপর আর হাসির ছবির দিকে যাননি।
এ-রকম নয় যে, একটুকু বাসা লোকেরা নেয়নি। আমার তো অসম্ভব ভালো লেগেছিল, সেই যে অনুপকুমার রানিং কমেন্ট্রি নিচ্ছেন অথবা রবি ঘোষের রুমালের বদলে লুচি বের করে মুখ মুছতে যাওয়া – এগুলো হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে দিয়েছিল।

** ব্যাপারটা হচ্ছে আমি এখনো গল্প খুঁজে যাই। ভালো কমেডি গল্প। কিন্তু আপনি নিজে ভেবে দেখুন, তখন যে-ধরনের কমেডি গল্প লেখা হতো, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় লিখতেন, মনোজ বসু লিখতেন, এখন কি সেই ধরন আছে?

* মনের মতো গল্প পাননি আর কি!

** না। গল্প পাইনি সেজন্য পরবর্তী ছবিগুলোয় কমেডি আছে; কিন্তু অন্যরকমভাবে।

* হ্যাঁ! উৎপল দত্ত যেমন শ্রীমান পৃথবীরাজে

** হ্যাঁ তা ঠিক, তখন সময়টা অন্যরকম ছিল। ওরকম গল্প পাওয়া যেত। এখন পাওয়া মুশকিল।

* এরপর ’৬৭-তে বালিকা বধূ করলেন। বালিকা বধূতে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। কিন্তু এই সিনেমা থেকে একটা প্রবণতার জন্ম হলো। আপনি কিশোর প্রেমের ওপর সিনেমা শুরু করলেন এবং কিশোর প্রেমের সাইকোলজি আপনি ধরতে পেরেছিলেন। তাই একে একে আমরা দাদার কীর্তি দেখতে পাচ্ছি, শ্রীমান পৃথ্বীরাজ দেখতে পাচ্ছি। এসব ছবি নির্মাণের চিন্তা আপনার কাছে কীভাবে এলো?

** কিছুই না। এটা অটোমেটিক হয়েছে। এর জন্য কিছু change করতে হয়নি। বালিকা বধূ বিমল করের গল্প। দেশ পত্রিকায় দুটো ইস্যুতে বেরিয়েছিল।

* সাতের দশকের মাঝামাঝি সময় …

** সে-সময় প্রথম ইন্সটলমেন্ট পড়ে আমার মনে হয়েছিল, এটা থেকে ছবি হতে পারে। যদিও ওখানে তেমন একটা ঘটনা কিছু নেই, তবু একটা ফ্লেভার আসে না! আমি সাগরময় বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী সপ্তাহে যেটা বেরোবে সেটা আগেই পড়ে নিয়েছিলাম।

* তখন আপনার মোটামুটি পরিচিতি হয়ে গেছে …

** ওই সূত্রপাত। পরে এমন হলো আমার ইউনিটের ছেলেরা বলতে শুরু করল এটার ভেতর আছেটা কী! একটা মেয়ে, তার একটা অল্পবয়সী ছেলের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে। মেয়েটা অনবরত বাপের বাড়ি চলে যায়। ঝগড়া করে। শেষ অবধি শ্বশুরবাড়ি আসে। এই তো গল্প। এটা নিয়ে কী এমন ছবি হবে? একমাত্র বংশী আমায় বলেছিল, আপনি যদি এ-ছবিটা না করেন আমি আর কোনোদিন আপনার সঙ্গে কাজ করব না। ওটা খানিকটা আমার মনে হয়েছিল যে, গল্পটা নিয়ে ছবি করা যায়। একটা সিক্সথ সেন্স গ্রো করে না যে, এটা নিয়ে ছবি করা যায়। আসলে আমি এখন ঠিক ডিফাইন করতে পারব না; কিন্তু তখন মনে হয়েছিল এটা নিয়ে ছবি হয়।

* আপনার আরেকটি ছবি নিমন্ত্রণ। আমরা দেখেছি আপনি নিজে গল্প বলার চেয়ে সাহিত্য থেকে উপাদান নিতেই স্বচ্ছন্দ।
গল্প-উপন্যাসের পাতায় আপনার অনায়াস যাতায়াত। এ প্রসঙ্গে যদি কিছু বলেন …

** আমি বরাবরই মনে করি যে, ছবি করতে গেলে সবসময় নিজে কলম তুলে গল্প লিখে ফেললাম – এটা উচিত কাজ নয়। যদিও আমি অনেক গল্পে, খুব খ্যাতনামা লেখকদের গল্পেও চিত্রনাট্য নিয়ে প্রচুর বদল করেছি। সে-ক্ষেত্রে আমাকে লিখতেই হতো। যেমন দাদার কীর্তিতে সেন্ট্রাল যে ক্যারেক্টারটা ছিল তা ছবির যে-ক্যারেক্টার তার ঠিক উলটো।

সাহিত্যিকদের একটা আলাদা ব্যাপার আছে। তাঁদের দেখার চোখ, চরিত্র রচনার ক্ষমতা, এর থেকে আমি যদি সমৃদ্ধ হতে পারি, কেন নেব না?

* বড় বেশি মেলোড্রামাটিক। নিন্দুকরা এই অভিধায় আপনার ছবিগুলোকে বারবার বিঁধবার চেষ্টা করেছেন। পলাতকের পরে ফুলেশ্বরীর মধ্যে অতিনাটকীয়তা খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। আপনি এই অভিমতকে কীভাবে নিয়েছিলেন …

** পলাতক ছবির টাইটেল কার্ডের লেখাটি আবার যদি দেখেন, পলাতক লেখাটি চলে যাওয়ার পরই আসে, একটি অবাস্তব ও অতিনাটকীয় কাহিনি। তার মানে হচ্ছে আমি এই নিয়ে সচেতন ছিলাম যে, একদল সমালোচক একে অতিনাটকীয় বলবেই। আমি দেখতে চাইছিলাম যে দর্শকরা কী বলে। দর্শকরা যদি অতিনাটকীয় বলে বুঝতে পারে, তাহলে দর্শকদের সঙ্গে মনের একটা ফারাক হয়ে যায়। একাত্ম হলে তবেই না একজন দর্শক ছবি দেখতে আসবেন। এটা আমার একটা খেলা ছিল আর কি, তোমরা এ-ছবিকে অতিনাটকীয় বলতে পার, তোমরা বলার আগে আমিই বলে দিচ্ছি।

* শমিত ভঞ্জর অভিনয় ফুলেশ্বরীর অন্যতম সম্পদ। শিল্পী বাছাইয়ের পেছনে কি কোনো পরিকল্পনা ছিল?

** এগুলোর জবাব আমি খুব ভালো দিতে পারব না। আমার মনে হয়েছিল এদের দিয়ে হবে। এরা আমার কথা শুনেওছে। খুবই কথা শুনেছে।

* হরিধন মুখোপাধ্যায় এই ছবিতে গানও গেয়েছিলেন…

** হ্যাঁ! আসলে আমি নিজেও এখনো বুঝতে পারি না কী হলে পরে অতিনাটকীয় হয় আর কী হলে পরে হয় না, এর শেষকথা কে বলবে?

* সুলতা চৌধুরীর কথায় আসি। একসময়ের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী। আপনার অনেক ছবিতেই তাঁকে আমরা পেয়েছি। অল্প সময়ের উপস্থিতি অথবা অপেক্ষাকৃত গৌণ চরিত্রে, কিন্তু অভিনয়ের জোরে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন।

** সুলতা খুব ভালো অভিনেত্রী। দাদার কীর্তিতে ও যে-রোলটা করেছে, ও ভালো মানুষ, তাই রাজি হয়েছে। আজকাল এমনটা খুব কম হয়।

* রাহগির করলেন। কলকাতাতেও ভালো সাড়া পেয়েছিল। বালিকা বধূও। কিন্তু বলিউডে এরপর আর ছবি করলেন না কেন?

** আমার কলকাতায় একটা ইউনিট ছিল। তারা আমার সঙ্গেই অ্যাটাচড ছিল, অন্য কোথাও কাজ করত না। যখন আমি কিছুদিনের জন্য বোম্বে গিয়েছিলাম এদের বলেই গিয়েছিলাম, কিন্তু দেখলাম যে সবাইকে বোম্বে নিয়ে আসা মুশকিল, সবারই নিজের নিজের পরিবার আছে, ব্যক্তিগত সমস্যা আছে। আমি বোম্বেতে কাজ করতে করতে কিছু অফারও পেয়েছিলাম, কিন্তু ঠিক করি আমি কলকাতায় ফিরে আসব। তাই নিজের ইচ্ছেতেই পরে ফিরলাম। কোনো অসূয়া ছিল না।

* সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক …

** আমার সঙ্গে ওনার যোগাযোগ ছিল। অনেক স্নেহ পেয়েছি। সেটা অন্য চ্যাপ্টার। তিনি বলতেন, দেখো, আজকাল কেউ গল্প বলতেই পারছে না। মাঝেমধ্যেই কথা হতো।

* পথের পাঁচালী দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া …

** ব্যাপারটা হচ্ছে আমি সেটাই করব, যেটা আমি করতে পারি এবং আমার করতে ইচ্ছে করছে। তাই না? এটা তো নকল করা যায় না। আমি চার্লি চ্যাপলিন দেখে ভীষণ অনুপ্রাণিত, কিন্তু আমি কি চার্লির মতো ছবি করতে পারব? অনুপ্রেরণা এক জিনিস আর নিজের কাজ এক জিনিস।

* আপনি চাঁদের পাহাড় করার কথা ভেবেছিলেন। একটা বুকলেটের পেছনে আমরা তার বিজ্ঞাপনও দেখেছি। শেষ পর্যন্ত ছবিটা হলো না কেন …

** সংসার সীমান্ত খুব ভালো রেসপন্স পেয়েছিল। তখন যে প্রডিউসারের হয়ে আমি এই ছবিটা করেছিলাম তিনি খুশি হয়ে এই ছবির পর বললেন, আপনি যা ছবি করতে চাইবেন করুন। সে-সময় আমি চাঁদের পাহাড়ের কথা ওঁকে বলতে তিনি বললেন, ঠিক আছে, আমি বুকলেটের পেছনে এটা ছেপে দিচ্ছি। তারপরই ওঁর একটা স্যাড ডেথ হয়ে যায় এবং সিনেমাটাও থমকে যায়।

আমি আফ্রিকাতেই শুটিং করার কথা ভেবেছিলাম। প্রাথমিক কথাবার্তার পর লিটারেচার এনে কী করে সেরেঙ্গাটি পেস্নইন্সের ওপর নরেস ক্রিয়েট না করে শুটিং করা যাবে অথবা বেলুন থেকে কি শুটিং করা হয় – এ-সম্পর্কে পড়াশোনাও শুরু করেছিলাম। অর্থ নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। তিনি বলেছিলেন, আপনি আপনার মতো ছবি করুন, অন্যদিকে আপনাকে ভাবতে হবে না। চিত্রনাট্যের কাজও সামান্য এগিয়েছিল। এমন সময়েই দুর্ঘটনাটা ঘটে।

* আজীবন আপনি মার্কসবাদে বিশ্বাস রেখেছেন। বামপন্থার মূল সুর কীভাবে আপনার ছবিতে উঠে এসেছে …

** এক্ষেত্রে আমার ব্যাখ্যাটা একটু অন্যরকম। বামপন্থার শেষ লক্ষ্যটা কী? মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকা। ভালো মন নিয়ে বেঁচে থাকা। ছবিতে আমি সেই জায়গাটা ছুঁতে চেয়েছি। বামপন্থা বহু সময় সোজা পথে চলেছে। বহু সময় হোঁচট খেয়ে পড়েছে। বহু সময় আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, এর ডকুমেন্টেশন আমার কাজ নয়। আমার কাজ হলো বামপন্থার সর্বশেষ স্তরে, যেখানে মানুষ ভালো মানুষ হবে সেই জায়গায় গিয়ে পৌঁছনো। আমার ছবি দিয়ে আমি সে-জায়গায় পৌঁছতে চেয়েছি।

* আপনার টিভি সিরিয়াল দুর্গেশনন্দিনীর কথা কিছু বলুন …

** দুর্গেশনন্দিনী এসেছিল ইনভিটেশনের মাধ্যমে। ইটিভি থেকে। এবং আপনারা হয়তো দেখে বুঝতে পারবেন, এখন
যে-ধরনের সিরিয়াল হয়, এই প্রজেক্ট সেটা ছিল না। আমি ইচ্ছে করে লম্বাও করিনি। বঙ্কিম যেখানে শেষ করেছেন, আমিও সেখানে শেষ করেছি। এখনকার সিরিয়াল যেভাবে তৈরি হয়, খানিকটা লুচি ভাজার মতো। সকালে স্ক্রিপ্ট তৈরি হচ্ছে, রাতে নেমে যাচ্ছে, এটা সেরকম ছিল না। অনেকটা প্ল্যানড ব্যাপার।

নিজের মতো ছবি করব এই শর্ত ছাড়া আমি কোনোদিন ছবি করিনি। ভালো ছবি করে থাকি আর খারাপ করে থাকি। আমার ছবি করতে হলে পুরো স্বাধীনতা আমার চাই। দুর্গেশনন্দিনী করার সময় আমার টিম নিয়ে যথেষ্ট রিসার্চ ওয়ার্ক করেছিলাম। আকবরের সময় থেকে কিংবা তার আগে বাবরের সময় থেকে আকবরের শাসনকার্য পরিচালনা-পদ্ধতি, তার রাজস্ব প্রণয়নরীতি পুরোটাকেই বা যতটা পারা যায় অবিকলভাবে নিয়ে আসা এবং আপনি যে-বামপন্থার কথা বলছিলেন একটু আগেই, সেটাকেও গল্পের মধ্যে দেখানো। অনেকেই বলেন বঙ্কিম হিন্দু সাম্প্রদায়িক। সীতারাম, আনন্দমঠে যেমন হিন্দুমত প্রবল। এদিকে আমি আবার বঙ্কিমের থেকে এমন জিনিসও বের করেছি সেটা চূড়ান্ত অসাম্প্রদায়িক। এটাই হচ্ছে আমার দৃষ্টিভঙ্গি। দুর্গেশনন্দিনীতে জগত সিং যখন আহত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায়, তখন পাঠান সেনাপতি ওসমান তাকে কোথায় নিয়ে গেল? পাঠান নবাবজাদি আয়েশার অন্দরমহলে এবং আয়েশা সব জেনে-বুঝেও শত্রম্নকে ভালোবেসে ফেলল। এটা যদি, বামপন্থার মূল ব্যাপার না হয়!

* বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ নিয়ে এখন কোনো আক্ষেপ …

** এটা হঠাৎ হয় না। আপনাকে একটা কথা বলি। পরে আমি আলো বলে একটা ছবি করি। তখন বাংলা সিনেমার দুর্দশা শুরু হয়ে গেছে। আলো বিভূতিভূষণের গল্প নিয়ে তৈরি। ট্র্যাজেডিতে শেষ। তখন অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল এটা চলবে কিনা। কিন্তু দেখা গেল, ফার্স্ট উইকের যা সেল, সেকেন্ড উইকে তার চেয়ে বেশি। সেকেন্ড উইকে যা সেল, থার্ড উইকে তার চেয়ে বেশি। অর্থাৎ ক্রমেই সবাই বেশি বেশি করে আসছে। একই লোক
তিন-চারবার করে আসছে এবং ছবিটা গোল্ডেন জুবিলি করল। তার মানে, এখনো সেই দর্শক আছে। তাদের যদি ভালো ছবি দেওয়া যায়, যদিও ভালো-খারাপ আমি বলব না, মোদ্দা কথা তাদের পছন্দমতো ছবি যদি দেওয়া যায়, তারা এখনো ছবি দেখতে আসতে চায়; কিন্তু ভালো ছবি তারা পাচ্ছে কোথায়? বর্তমানে বেশিরভাগ ছবি যা তৈরি হচ্ছে তা মানুষ দেখতে আসবে কেন? তার গল্প বলে কিছু নেই, কোথা থেকে নকল করা একটা জিনিস, থাকার মধ্যে আছে বিদেশে গিয়ে একটা গানের পিকচারাইজেশন, যতসব কৃত্রিম ব্যাপার। আমাদের বাংলা ছবির একটা গল্পের ঘরানা যেটা, সেটা নেই, তার ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আর একটা কারণ হলো এখন ফিল্ম-সমালোচক ভালো নেই, যার থেকে আমরা বকুনিও শুনতে পাব, আবার অ্যাট দ্য সেম টাইম কন্সট্রাক্টিভ ক্রিটিসিজমও শুনতে পাব। এখন বেশিরভাগ সমালোচনাই আমি বুঝতে পারি না।

আগে যেমন কাউকে এন্টারটেইন্ড হতে হলে গাড়ি ডেকে সিনেমা হলে আসতে হতো, এখন বাড়ি বসেই দেখতে পারে, ফলে খুব বেশি ভালো রিপোর্ট না হলে তারা আসতে চায় না।

আর এসেই বা কী লাভ! অনেকে যদিও মোবাইলে দেখে নেয় কিন্তু সেই তৃপ্তি কি তারা পাবে? পাবে না। একের পর এক সিনেমা হল ভেঙে শপিংমল তৈরি হচ্ছে।

আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে লিভ অ্যান্ড লেটলি পলিসিটা কোনোদিনই ফলো করা হয়নি। আমিও বাঁচি, তুমিও বাঁচো; এসো! এমন একটা ফর্মুলা তৈরি করি।

ডিস্ট্রিবিউটররা নিজের টাকা নিয়ে চলে গেছেন, হল মালিকরা নিয়ে চলে গেছেন, প্রডিউসাররা নিয়ে চলে গেছেন।

সমস্ত রকম আমাদের নিতে হচ্ছেই তারপর এই আক্রমণগুলোও আসছে।

* বর্তমানে যে-সিরিয়ালগুলো হচ্ছে, সে-সম্পর্কে আপনার কী মত?

** আজকালকার বাংলা সিরিয়ালগুলো হচ্ছে কতরকম নীচতা, কতরকম ক্রূরতা, কতরকমভাবে ঝগড়া করা যায়, এটার একটা টেক্সট বুক। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসের প্রবল অভাব। কারো দুই স্ত্রী থাকলে সেটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য এবং সেটা আদৌ রিপ্রেজেন্ট করা যায় কি! কিন্তু এতে ঝগড়াটা আরো ভালোভাবে দেখানো যায়।

* হলিউড সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়। ওদের ফিল্ম-সংস্কৃতি যেভাবে ক্রমশ উন্নত হয়ে প্রায় একটা ডিসিপিস্ননের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে …

** ওরা ধাপে ধাপে এগিয়েছে। আমরা যদি আজ সরাসরি সেই ধাপ থেকে শুরু করি আমরা বিচ্যুত হয়ে যাব। এখানে দর্শকই তৈরি হয়নি। আমাদেরও ধাপে ধাপে এগোতে হবে। এই দর্শকই গুপি গাইন বাঘা বাইন দেখেছে। তপন বাবুর ছবি দেখেছে। দর্শকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। গরুর খাবার ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে তুলে দিলে একসময় তারা সেই খাবার খেতেই শুরু করে।

* অনেকদিন পরে আপনি প্রচেত গুপ্তর গল্প ‘ভালবাসার বাড়ি’ অবলম্বনে ছবি করেছেন। তাহলে কি আস্তে আস্তে আপনি ছবির জগৎ থেকে সরে যাচ্ছেন?

** ঠিক তা নয়। ছবি তো করতেই চাই। এখন পড়ছি, ভালো গল্প পেলে করব। ছবি করার জন্য প্রযোজকের কাছে যাইনি কখনো। যদি কেউ আসে তাহলে করি, নইলে পড়াশোনা করি। চেষ্টা করি আর কি। এখন গল্পের খোঁজে আছি। যদি কেউ আসে, খুঁজে পাই, অবশ্যই করব।

* এতদিন পেরিয়ে এসে কোনো আক্ষেপ বা বিষণ্ণতা …

** না! কোনো অতৃপ্তি নেই। ছবির জগতে পেরিয়ে এলাম প্রায় পঞ্চাশ বছর। যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, যাদের সান্নিধ্য পেয়েছি, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, কমল মিত্র, মলিনা দেবী, জহর গাঙ্গুলী, ছায়া দেবী, তুলসী চক্রবর্তী; পরবর্তীকালে বিকাশ রায়, উত্তমকুমার; এঁদের আমি খুব মিস করি। আমরা বয়সে ছোট বলে আমাদের যেভাবে আগলে রাখতেন, স্নেহ করতেন সেটা মিস করি।

সম্মান জিনিসটা তো চেয়ে পাওয়া যায় না, ওটা আসলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আসবে। দর্শকরা আমায় যেভাবে গ্রহণ করেছেন সেটাই আমার পরম পাওয়া, চরম প্রাপ্তি। আশীর্বাদ।

* অন্য পরিচালকদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক সম্পর্কে যদি বলেন …

** আমার এখন জানতে ইচ্ছে করে এক ডিরেক্টরের সঙ্গে আরেক ডিরেক্টরের ইন্টার‌্যাকশন হয় কিনা! আমাদের সময় এরকম খুব হতো। আমরা যুক্তি করে পাঁচ-ছয়জন মিলে ঢুকে পড়তাম। তপনবাবু, সত্যজিৎবাবু, অজয় কর প্রমুখের ঘরে ঢুকে পড়তাম। আমাদের একটা বিষয়ই ছিল, যে-কোনো অকেশনে গিয়ে চা খাওয়া ইত্যাদি এবং অনেক জরুরি কথাও হতো। আমার মনে হয় ফিল্মে রাইভ্যালরির কথা যারা ভাবেন তারা মূর্খ ছাড়া আর কিছু না।

ফিল্মের কারা থাকবে কারা যাবে এটা যিনি ফিল্ম করছেন তিনি ঠিক করেন না। এটা দর্শক ঠিক করেন। আর আমি কার সঙ্গে রাইভ্যালরি করব? আমি সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে রাইভ্যালরি করব? করে কি আদৌ কোনো লাভ আছে?

* আর শিল্পীদের সঙ্গে …

** শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা খুব সুখের। কোনো বিরূপতা নেই।

* ধন্যবাদ আপনাকে। এতক্ষণ ধরে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য। ** ধন্যবাদ আপনাদেরও। এতক্ষণ ধরে আমার কথা শোনার জন্য।

Leave a Reply

%d bloggers like this: