মুর্তজা বশীর : স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যের বিরল সমন্বয়

বাংলাদেশের দৃশ্যকলা জগতে সৃজনশীলতায় সবচেয়ে ঝলমলে ও বর্ণাঢ্য চরিত্রের মানুষটি চলে গেলেন। চলে গেলেন মুর্তজা বশীর, পঞ্চাশের দশকের একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পীর শেষ জন, সম্ভবত সর্বাপেক্ষা স্বতন্ত্র ও বৈচিত্র্যময় প্রতিভার মানুষটি। অবসিত হলো বাংলাদেশের দৃশ্যকলা জগতের সূচনাপর্বের একটি তারকাখচিত যুগ।
বাংলাদেশের শিল্পকলার পরিসরে মুর্তজা বশীর আজ অপরিহার্য ও অবশ্য-উল্লেখ্য নাম। ১৯৪৭-এর দেশবিভাগের পর সদ্য বিকাশমান এই অঞ্চলের দ্বিধাগ্রস্ত শিল্পকলাকে যাঁরা পর্যাপ্ত আস্থা ও উপাদান জুগিয়েছেন তিনি অবশ্যই তাঁদের অন্যতম। দৃশ্যশিল্পের বিভিন্ন শাখায় যেমন বিচরণ করেছেন তিনি, তেমনি সৃজনকলার অন্য দুটি মাধ্যম সাহিত্য ও চলচ্চিত্রেও রেখেছেন সৃজন-প্রতিভার স্বাক্ষর। নানান বিপরীত বৈশিষ্ট্যের বর্ণাঢ্য এক চরিত্র ছিলেন মুর্তজা বশীর – শিল্পী হিসেবে, মানুষ হিসেবেও। তাঁর সৃষ্টিকর্ম অনুধাবনের যে-কোনো প্রয়াসের সূচনায় তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমিটি একটু দেখে নেওয়া দরকার।
বাংলাভাষার অন্যতম পণ্ডিত ও ভাষাবিদ হিসেবে যাঁর পরিচিতি উভয় বঙ্গে বিস্তৃত, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মুর্তজা বশীরের পিতা। শহীদুল্লাহ্ ছিলেন গভীরভাবে ধার্মিক, কিন্তু ভাষার প্রশ্নে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে বাংলার পক্ষে দ্ব্যর্থহীন অবস্থানগ্রহণকারীদের অগ্রগণ্য। পুত্রের চারুকলা বিষয়ে অধ্যয়নের বিপক্ষে ছিলেন তিনি, কিন্তু নিজের মত চাপিয়ে দিয়ে তাকে বিরত করেননি। শহীদুল্লাহ্ উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন প্যারিসের সরবনে, ফলে চিত্র ও ভাস্কর্যের শিল্পমূল্য তিনি জানতেন। তবে শিল্পীদের ছন্নছাড়া ও কষ্টকর জীবনসংগ্রামও তিনি দেখেছেন, তাঁর আপত্তি ওইখানেই। পঞ্চাশের দশকের প্রারম্ভে পাকিস্তান পর্বের সূচনাকালে পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজের মধ্যে ঘটেছে নানাবিধ আলোড়ন। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধের উন্মাদনা কিছু কবি-সাহিত্যিককে আরবি-ফার্সি শব্দঝংকৃত রচনার পথে আগ্রহী করেছে, আবার শিক্ষিত সংস্কৃতিবান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বামপন্থী সমাজচেতনা ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রভাবনারও প্রসার ঘটেছে। ড. শহীদুল্লাহ্র পুত্রদের কেউ কেউ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, মুর্তজা বশীরও তাই। অতি অল্প বয়সেই কমিউনিস্ট পার্টির পোস্টার সাঁটতে গিয়ে মুর্তজা বশীর গ্রেফতার হন, তখনকার আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তিও হন পার্টির নির্দেশে। ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে তিনি শামিল ছিলেন না, ঘটনাচক্রে উপস্থিত হলেও বরকতের শরীর বহনে তাঁর অংশ নেওয়া, রক্তসিক্ত জামায় বাড়ি ফেরার পর ড. শহীদুল্লাহ্র প্রতিক্রিয়া ও নিজের আচকান ছিঁড়ে কালো ব্যাজ পরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ – তাঁর এসব জবানিতে আমরা গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রত্যয়ের ইঙ্গিত দেখি। যাঁদের সঙ্গে ওই সময় তিনি গভীর বন্ধুত্বে জড়িয়েছেন তাঁরা প্রায় সকলে এদেশের প্রগতিশীল সংস্কৃতি জগতের পুরোধাজন। ছাত্রজীবনে ও অনতিপরে মুর্তজা বশীরের শিল্পপ্রয়াসে এই রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দেখা মেলে। এছাড়াও তখনকার চারুকলার শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই আসতেন একেবারে গ্রামীণ পটভূমি থেকে, সংস্কৃতির ভিন্ন অঙ্গন থেকে। মুর্তজা বশীর আর সামান্য কয়েকজন ছিলেন ব্যতিক্রম, যাঁরা এসেছিলেন শহুরে ও সচেতন পারিবারিক আবহ থেকে। বশীরের এই রাজনৈতিক ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পৃক্ততার পশ্চাৎপট তাঁর শিল্পভাবনার পেছনে সম্ভবত কিছু ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে চারুকলার অঙ্গনে প্রবেশের পর মুর্তজা বশীরের মধ্যে ক্রমশ দানা বাঁধছিল পশ্চিমা শিল্পের জ্যামিতিক সংগঠন ও বর্ণের বিবেচনার প্রতি আগ্রহ, শিল্পীদের উদ্দাম জীবনচর্যার প্রতি আর পারিবারিক গণ্ডির বাইরে ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ। কিছুটা বা স্বর্ণকেশী শ্বেতকায়া রমণীর প্রতি যৌবনের স্বপ্নিল আবেশ। আর্ট ইনস্টিটিউটের পাঠ সমাপ্ত করার পর ১৯৫৫ সালে স্বল্পকাল ঢাকার সরকারি নবাবপুর হাই স্কুলে শিক্ষকতার পর তিনি পিতার অর্থানুকূল্যে চলে যান ইতালির ফ্লোরেন্সে, পশ্চিমের শিল্পজগতেই তাঁর চিত্রচর্চার স্বপ্ন ডানা মেলার শক্তি পাবে – এই বিশ্বাসে। এখানেও ড. শহীদুল্লাহ্র ইতিবাচক ও মুক্ত মনের পরিচয় মেলে। ১৯৫৬-৫৮ দু-বছর ফ্লোরেন্স-বাস মুর্তজা বশীরকে প্রায় পুরোদস্তুর প্রতীচ্যের জীবন ও শিল্পধারায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। এর নেতির দিক আমরা সহজেই শনাক্ত করতে পারি, তবে এর ইতিবাচকতার সন্ধান মুর্তজা বশীরের জীবনচর্যা ও শিল্পকর্মের অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। রাজনীতি ও সমাজদর্শনের দিক থেকে মুর্তজা বশীরের শিল্পকর্মকে বিবেচনা করতে হলে তাঁর মনোজগতের এই বিবর্তন ও বহুমাত্রিক বৈপরীত্যকে আমলে নিতে হবে।
ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়েছেন ১৯৫৪ সালে, জয়নুল-কামরুলের কাছ থেকে যেটি অর্জন করেছেন তার মধ্যে ছিল প্রখর শক্তিশালী ড্রইং এবং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি। শিল্প-ইতিহাস ও নন্দনতত্ত্বের প্রতি তাঁর আগ্রহ শিল্পশিক্ষালয় থেকে আসেনি, এটি তাঁর নিজস্ব অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার ফসল, যা আজীবন অটুট থেকেছে; যার প্রতিফলন দেখি শিক্ষা সমাপ্ত করেই নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়ামে আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশন বিষয়ে প্রশিক্ষণে আগ্রহের মধ্যে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮-তে মুর্তজা বশীর শিক্ষালাভ করেছেন ইতালিতে, চিত্রকলা ও ফ্রেস্কো বিষয়ে। মোজাইক ও ছাপচিত্র শিখেছেন প্যারিসে ১৯৭১-৭৩ সময়ে। পাশ্চাত্য শিক্ষা তাঁকে দান করেছে চিত্রে দ্বিমাত্রিকতা সম্পর্কে, চিত্রের গঠন ও জ্যামিতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান, বিষয়কে ত্রিমাত্রিক বাস্তবতা থেকে দ্বিমাত্রিক চিত্রতলে সংহত করার কৌশল ও শৈলী। চিত্র, ছাপাই ছবি, ফ্রেস্কো ও মোজাইক – দ্বিমাত্রিক শিল্প নির্মাণের প্রায় সকল শাখায় প্রশিক্ষণের এ-সুযোগ তাঁকে দৃশ্যকলার নানান মাধ্যমে বিচরণে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল একটি সহজাত ইতিহাস-সচেতন অনুসন্ধানী দৃষ্টি, যেটি তাঁকে বারংবার শিল্পের নানান পথ অনুসরণে এবং নিজেকে পরিবর্তনে উৎসাহিত করেছে। দৃশ্যকলার প্রায় সকল মাধ্যমেই তাঁর এই সৃজনশীল বিচরণের তুলনা বাংলাদেশের শিল্পজগতে দ্বিতীয়টি নেই।
তাঁর নিজস্ব শিল্পশৈলী অনুসন্ধানের সূচনাপর্বে পরস্পর-ছেদযুক্ত রেখা দ্বারা চিত্রতলে একটি দৃঢ় কাঠামো নির্মাণ ও বিভিন্ন গতিপথ নির্দেশের দ্বারা দর্শকের দৃষ্টিকে চালিত করার দিকে তাঁর প্রয়াস লক্ষ করা যায়। অবশ্যই এর অন্যতম প্রেরণা পিকাসো, ব্যাপক অর্থে কিউবিজম। তাঁর বিষয় নির্বাচনেও প্রাথমিকভাবে পশ্চিমের জনজীবনের আনাগোনা থাকলেও শিগগির দেশীয় বিষয় দেখা দিতে শুরু করে। তবে জ্যামিতি ও গঠনের প্রতি এই পরিকল্পিত মনোযোগ তাঁর সৃষ্টির প্রাণহরণ করতে পারেনি। খুব সম্ভবত এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এদের অতি শক্তিশালী ও মনোহর রেখার লালিত্য। পঞ্চাশের দশকে পশ্চিমের শিল্পজগতে বিমূর্ততার যে-আধিপত্য ছিল তার প্রভাব প্রবল হয়েছিল আমাদের ওই দশকের শিল্পীদলের ওপর, বিশেষ করে যাঁরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন তাঁরা বিমূর্ততার ঝলকে বিমোহিত হয়ে পড়েছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ শিল্পীরা বিমূর্ত ধারাতেই স্থিত হন। পঞ্চাশের দশকের রশিদ চৌধুরী ও কাইয়ুম চৌধুরীর বাইরে মুর্তজা বশীরকেই দেখি বিমূর্ততার চর্চা করেও পরবর্তী পর্যায়ে বাংলার লোককলার বিবিধ অনুষঙ্গকে সমকালের ভাবনার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করতে। তবে এর আগে মুর্তজা বশীর পাড়ি দিয়েছেন অনেকগুলি পর্যায়।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরে আঁকা ছবিতে প্রসাধন, অবসর বা কর্মরত নারীর গতানুগতিক বিষয় বিধৃত হলেও জ্যামিতিক সংস্থাপন ও বর্ণের বিন্যাস বিষয়ে তাঁর নিরীক্ষাধর্মিতা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে মুর্তজা বশীরের চরিত্রগত অস্থিরতা তাঁকে নিয়ে যায় এক অনিশ্চিত যাযাবর জীবনের পানে। ১৯৫৯ থেকে ’৭০ পর্যন্ত তিনি লাহোর, করাচি, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, সারগোদা আর ঢাকার মধ্যে যাতায়াত অব্যাহত রাখেন, অধিকাংশ সময় অবস্থান করেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শহরগুলিতে। কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজসহ পাকিস্তানের প্রথিতযশা লেখক-শিল্পী মহলে মুর্তজা বশীরের বিচরণ তাঁকে পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান সমসাময়িক শিল্পী হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
১৯৬০ সাল থেকে লাহোরে বসে আঁকা তাঁর ছবিতে দেখি সমস্ত প্রচলিত সৌন্দর্যবোধকে দলিত করে একটি প্রচণ্ড ক্ষোভ ও যন্ত্রণাকে ক্যানভাসে মূর্ত করার আকুতি। জ্যামিতিক পরিমাপ ও পরিশীলিত ড্রইংয়ের জায়গায় ক্ষুব্ধ ও কম্পমান ভঙ্গুর রেখা, প্রশান্ত ও স্নিগ্ধ রঙের স্থলে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত চিৎকৃত রং, মসৃণ ক্যানভাসের বদলে পুঞ্জ-পুঞ্জ টেক্সচার। এ-সময় তাঁর ছবি অবয়বধর্মী, কিন্তু সময়ের আর্তি ও সংকটের চিহ্ন এর মধ্যে প্রবল হয়ে উঠছে। সমস্তটা মিলে এক ভয়াবহ সময়ের ছিন্ন মুখোশের তলায় লুকানো ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের চেহারা। ১৯৬৭-৭২ সময়কালে আঁকা তাঁর ‘দেয়াল’ শীর্ষক চিত্রমালায় প্রতীকায়িত হয়েছে বন্দি মানুষের চারদিকে শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর। নিষেধের ঘেরাটোপে আবদ্ধ মানুষের আত্মার আকুতি প্রতিফলিত হয়েছে ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালের দাঁত-বের-করা ইটে, খসে-যাওয়া পলেস্তারায়, শ্যাওলা-ধরা মলিনতায়, অমসৃণ টেক্সচারের কর্কশ অনুভবে। এ-সময়ে তিনি যুক্ত হয়েছেন ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে, চলচ্চিত্রের মঞ্চ-নির্দেশনার সঙ্গে, সর্বোপরি রচনা করেছেন গল্পগ্রন্থ যা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গেই চিহ্নিত করেছে এক শক্তিমান গদ্যলেখক হিসেবে। চিত্রকর হিসেবেও এই সময়ে তিনি অতিক্রম করেছেন তাঁর জীবনের এক উল্লেখযোগ্য পর্যায়।
১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষকতায় যোগদান মুর্তজা বশীরের জীবনে ইতিবাচক কিছু পরিবর্তন সূচিত করে। দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চারুকলা শিক্ষার প্রথম শিক্ষালয় হিসেবে বিভাগটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত নিয়মিত শিক্ষকতার বৃত্তি তাঁর জীবনে নিয়ে আসে স্থিতি ও শৃঙ্খলা। দ্বিতীয়ত প্রখ্যাত শিল্পী রশিদ চৌধুরীর সৃজনশীল নেতৃত্বে বিভাগটির পাঠক্রমে ছিল নতুনত্ব ও আধুনিকতার মিশেল, আর সহকর্মী দেবদাস চক্রবর্তী ও নাটক শাখার জিয়া হায়দার সমন্বয়ে প্রথিতযশা শিক্ষকদের প্রতিভার একটি সমন্বয় ঘটেছিল এতে। মুর্তজা বশীরের উপস্থিতি একে যেমন সমৃদ্ধ করে, তেমনি তাঁর মধ্যেও শিল্পভাবনার বিকাশ আরো গভীর হয়ে ওঠে। শিক্ষকতা মুর্তজা বশীরের নিজের জ্ঞানপিপাসা, বিশেষ করে চিত্রতলের নির্মাণবিষয়ক ভাবনা ও শিল্পোপকরণ চয়ন ও ব্যবহারের চিন্তাকে আরো উজ্জীবিত করে তোলে, যা তাঁর এবং ছাত্রদের – উভয়ের জন্য সহায়ক হয়। চট্টগ্রামে স্থিত হয়ে ভাবনার পরিশীলনের ভেতর দিয়ে এক নতুন মুর্তজা বশীর নির্মিত হতে শুরু করেন, যাঁর শিল্পে দেশ ও কাল ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।
১৯৭৩-৯৮, তাঁর চট্টগ্রাম অবস্থানের এই সিকি শতাব্দী সময়কালের সকল সৃজনকর্মকে এখানে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, মুর্তজা বশীরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিরিজ কাজ ১৯৭৫ থেকে আঁকা ‘এপিটাফ ফর দ্য মার্টায়ার্স’ – মুক্তিযুদ্ধে নিহত নাম-না-জানা শহিদদের উদ্দেশে নিবেদিত চিত্রমালা চট্টগ্রামে বসে আঁকা। সাদা পটভূমিতে বিভিন্ন আকৃতির ভাসমান বর্তুলাকার ধরনের ফর্ম, ভেতরের আকৃতিসমূহ বিভিন্ন মোলায়েম রঙের সূক্ষ্ম পর্দায় পরস্পর-বিলীয়মান, মৃত মানুষের জন্য আদি মানব-সমাজে প্রচলিত পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ রচনার সঙ্গে যার সাযুজ্য মেলে। এখানে আকৃতি ও রঙের ব্যবহার নম্র ও কমনীয়, সম্পূর্ণ পরিহার করা হয়েছে টেক্সচার। চিত্রতলের সংগঠনের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই সিরিজের চিত্রমালা বাংলাদেশে প্রচলিত চিত্রধারা থেকে একেবারেই ভিন্ন, এর ব্যঞ্জনাও একবারে আলাদা। এসবের মাঝে মাঝে নানা ধরনের নিরীক্ষা চালিয়েছেন – কখনো কোলাজ, কখনো গাড়ির ডেন্টিং থেকে প্রেরণায় আঁকা ছবি, কখনো পর্দার দুলুনির ছন্দোময়তার চিত্ররূপ, এমনকি কখনো কলেমা তৈয়বায় অনুপ্রাণিত লিপিশিল্প। এসব নিরীক্ষা সবসময় তেমন ফলপ্রসূ হয়নি, তবে ঢাকাবাসের আগে থেকে শুরু করা বাংলার চিত্রশিল্পের বর্ণবিন্যাসকে ভিত্তি করে যে-চিত্রধারা তিনি সূচিত করেছিলেন তার মধ্যে নানামুখী সম্ভাবনার ইঙ্গিত চট্টগ্রাম-বাসকালেই দেখা দিয়েছিল। চট্টগ্রামে শিক্ষকতাকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ১৯৭৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে করা তাঁর ‘অক্ষয় বট’ তাঁর আরেকটি অতিগুরুত্বপূর্ণ শিল্পকৃতি। চট্টগ্রাম-বাসের পরে মুর্তজা বশীর ঢাকায় স্থায়ী হন এবং জীবনের শেষ বিশ বছরের বেশি সময়ও সক্রিয় ছিলেন। এই সময় তাঁর প্রজাপতির পাখা দ্বারা অনুপ্রাণিত ‘দ্য উইং’ সিরিজচিত্র এবং লোককলা-অনুপ্রাণিত মানব-অবয়বধর্মী চিত্রমালা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মুর্তজা বশীরের রেখাঙ্কনের দক্ষতা জীবনের শেষ পর্বেও অটুট থেকেছে। আটাশি বছরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শারীরিক নানান জটিলতা সত্ত্বেও তাঁর মানসিক সক্রিয়তা ছিল বিস্ময়কর।

দুই
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষকতার সূত্রে বিশ বছরের অধিক সময় শিল্পী মুর্তজা বশীরের সঙ্গ আমার জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। ১৯৭৪ সালে যখন শিক্ষকতায় যোগ দিলাম তখন আমার চার তারকা সহকর্মী বয়সে আমার চেয়ে অনেকটাই বড়। রশিদ চৌধুরী ও দেবদাস চক্রবর্তীকে আগে থেকে চিনতাম, নাট্যকলার জিয়া হায়দারের সঙ্গেও খানিক পরিচয় ছিল, মুর্তজা বশীরের সঙ্গে ছিল না। এঁদের মধ্যে অপরিচয় আর দুরধিগম্যতার বেড়া ডিঙিয়ে মুর্তজা বশীরের সঙ্গেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে হয়ে উঠল প্রায় বন্ধুপ্রতিম। অবসর গ্রহণ ও কয়েক বছর পর স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে যাওয়ার পরে যোগাযোগ কমেছে, তবে কখনোই একেবারে বন্ধ হয়নি। আজ মৃত্যু এসে চিরবিচ্ছেদ রচনার প্রেক্ষাপটে দৃশ্যশিল্প ও সৃজনকলার বিবিধ এলাকায় বিচরণ করা বশীরভাইকে নানান অনুভবে স্মরণ করি।
স্মরণে আনি দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশক সহকর্মী হিসেবে তাঁর সাহচর্যের অম্ল-মধুর স্মৃতি। মুর্তজা বশীর এমন একটি চরিত্র, পছন্দ কিংবা অপছন্দের সীমাকে ডিঙিয়ে যিনি স্মৃতির কোঠায় স্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারেন। বয়সের ভার কিংবা অসুস্থতা নিষ্ক্রিয় করতে পারে – এমন মানুষ তিনি নন। শেষ তাঁকে দেখতে গিয়েছি সম্ভবত মৃত্যুর ছ-সাত মাস আগে। অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া চলতে পারেন না সাতাশি বছরের সে-মানুষটি বলছেন বিশটি ক্যানভাস তৈরির কথা, ছবি এঁকে প্রদর্শনী করার কথা। এমনই এক ব্যতিক্রমী চরিত্র ছিলেন তিনি। বশীরভাইকে দেখেছি কিছুটা দুর্বিনীত, অননুমেয় মেজাজের, আত্মসচেতন, কিছুটা বা আত্মকেন্দ্রিক রূপে। আবার বাসায় কিংবা বাইরে তাঁকে সর্বত্র পেয়েছি সদা-সক্রিয় উন্মুখ মানসিকতা এবং নিরলস কর্মোদ্যমী প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা মানুষ হিসেবে। তাঁর শিল্পকলার জগৎ গড়ে উঠেছে এই উভয়বিধ মানসিকতার সংশ্লেষ ও সংঘাতে। নানা বিপরীত বৈশিষ্ট্যের সমাহার এ-মানুষটির সঙ্গে মতের মিলের চেয়ে অমিল হয়েছে অধিক, তবু তাঁর সাহচর্য বিস্মৃত হওয়ার নয়। এমনও হয়েছে মতানৈক্য হয়ে সম্পর্ক ছিন্ন থেকেছে দীর্ঘদিন, আবার এই অসম সখ্য এতটা গাঢ় হয়েছে সারাটি দিন কেটেছে একসঙ্গে। শহরের পথে পথে তাঁর সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে দেখেছি প্রতিটি বস্তুর প্রতি তাঁর অপার ও সজাগ কৌতূহল, যেটি এক অনুসন্ধিৎসু শিল্পীমনের লক্ষণ।
পরিচয়ের সূত্রপাতে তাঁর যে-প্রতিভাটিতে প্রথম আকৃষ্ট হয়েছিলাম সেটি তাঁর রেখাঙ্কনের নৈপুণ্য, সামনে বসা যে-কারো মুখচ্ছবি হুবহু মিলিয়ে আঁকার বিরল দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর সে-রেখা বাস্তবিকের প্রতিচ্ছবিতেই শেষ নয়, প্রবহমান রেখার সৃজনশীল উৎকর্ষে সমৃদ্ধ। দ্বিমাত্রিক চিত্রপটে বস্তুপুঞ্জের মধ্যে সম্পর্ককে কীভাবে একটি জ্যামিতিক বাঁধনের আওতায় আনতে হয় সে-বিষয়ে তাঁর কাছে ছাত্রের মতো শেখার আছে। এটি স্বীকার করতেই হয় – গথিক ভাস্কর্য, বাইজেন্টিনীয় মোজাইক বা ইতালির প্রাগ-রেনেসাঁসের চিত্রকলার আপাত-প্রাণহীন স্থবিরতার মধ্যে যে সুঠাম-সমুন্নত শিল্পের ঝলকানি আছে তা অনুধাবনের চোখ, অন্তত আমার ক্ষেত্রে, তিনিই খুলে দিয়েছিলেন। তাঁর লেখা গল্পের সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল, পরিচয় ঘটল তাঁর উপন্যাস ও কবিতার সঙ্গে, চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্যকার, সহপরিচালক ও সেট-ডিজাইনার হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। আরো পরে মুদ্রাতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর গবেষণা তাঁকে এ-বিষয়ে উপমহাদেশে পরিচিতি ও খ্যাতি এনে দেয়। সৃজনশীলতার বহুমাত্রিকতায় সম্ভবত বাংলাদেশের চারুশিল্প পরিমণ্ডলে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
তাঁর জীবনের একটি পর্যায়ে রাজনৈতিক সক্রিয়তা থাকলেও আমরা যে-বশীরভাইকে চিনেছি সত্তরের দশক থেকে, তাঁর মধ্যে তেমন কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দেখা মেলে না। এর বদলে পাই এ-অঞ্চলের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর গবেষকসদৃশ উদ্যম, প্রভূত জ্ঞান ও সচেতনতা, সেইসঙ্গে বাঙালির লোককলা ও কারুকর্ম বিষয়ে গভীর আগ্রহ। তাঁর ‘এপিটাফ ফর দ্য মার্টায়ার্স’ সিরিজচিত্রের কথা মনে রেখেই বলা যায়, এপিটাফ যত না শহিদ যোদ্ধার প্রতি শোক-স্মরণিকা তার চেয়ে বেশি শিল্পী মুর্তজা বশীরের ব্যক্তিগত শিল্পকাঠামো সন্ধানের ফসল। আবার যখন নতুন করে অবয়বধর্মী কাজে ফিরেছেন, সেখানে দেখি নেহাত মানবরূপের উপস্থাপনেই তিনি সন্তুষ্ট নন, বাংলার লোকচিত্র ধারা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি অর্থবহ পথ নির্মাণে তাঁর আগ্রহ।
বেশকিছু উল্লেখযোগ্য দেয়ালচিত্র করেছেন মুর্তজা বশীর। এর মধ্যে ১৯৬৮ সালে তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান, ঢাকা অফিসের জন্য টাকার ক্রমবিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালচিত্র, যাতে মুদ্রার বিবর্তন বিষয়ে তাঁর অধ্যয়ন ও প্রস্তুতি ধরা পড়ে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, ১৯৭৪-এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে ঝামা-ইটের টুকরোর মোজাইকে করা ‘অক্ষয় বট’ আমাদের দেয়ালচিত্রের অঙ্গনে একটি অনন্য ও শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ হিসেবে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে, এদেশের সার্বিক শিল্পকৃতির বিবেচনায়ও এটিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি শিল্পনিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা দরকার। এখানে একদিকে বটবৃক্ষটি প্রতীকায়িত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার চিহ্ন হিসেবে, অন্যদিকে তার ডালপালার মধ্যে শহিদের দেহ মিশে গিয়ে একে করেছে আরো অর্থবহ। ফুল ছড়ানো নারী জ্ঞাপন করছে আত্মদানকারীদের জন্য ভালোবাসা যা তারা হয়ে ঝরে পড়ছে, এতেও মূর্ত হয়ে উঠেছে প্রতীকের মনোরম ব্যঞ্জনা। পরিসরের বিন্যাস আর প্রতীক নির্বাচনের মুন্সিয়ানার বিবেচনায়, একেবারে দেশীয় ঐতিহ্যকে বহন করে এমন একটি উপাদান পোড়ামাটির ইটের ব্যবহারে মুর্তজা বশীরের এই শিল্পকর্মটির তুল্য কিছু বাংলাদেশের মুক্ত পরিসরের শিল্পে আছে বলে মনে হয় না। এখানে কল্পনা ও প্রয়োগের সমন্বয়ে শিল্পী তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতার সেরা স্বাক্ষর রেখেছেন।
পরবর্তীকালে তাঁর মধ্যে শিল্পকলায় দেশজ প্রেক্ষাপটকে প্রকাশের যে-আকুতি পরিদৃশ্যমান হচ্ছিল, ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তাঁর যে গবেষকপ্রতিম আগ্রহ, এবং বিষয় হিসেবে পুনরায় মূর্ত মানবের যে আবির্ভাব তাঁর ক্যানভাসে দেখা দিতে শুরু করেছিল – মনে হয় এগুলোই সংহত রূপ লাভ করে মুর্তজা বশীরের হাতে নূতন পরিপ্রেক্ষিত লাভ করার একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। যে কর্মস্পৃহা এবং অভিনব পথে যাত্রার আগ্রহ মুর্তজা বশীরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সে-বৈশিষ্ট্যই তাঁকে নূতন একটি সৃজনশৈলী নির্মাণে সমর্থ করে তুলবে – এমনটি আশা করা গিয়েছিল, মৃত্যু এসে সে-প্রত্যাশায় যবনিকা টেনে দিলো।
নানান বৈপরীত্য সত্ত্বেও আমার ধারণা, ভাবনা ও মননে বশীরভাই ছিলেন সমকালীন জগতেরই বাসিন্দা। চরিত্রগতভাবে তিনি ছিলেন মূলত নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন, এবং অনেকখানি আত্মকেন্দ্রিক। তাঁর গল্প, তাঁর উপন্যাস, এমনকি তাঁর কবিতাও মূলত আত্মজৈবনিক। তাঁর বিবিধ মাধ্যমে করা শিল্পকর্ম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সার্থক, ব্যক্তিক অনুভূতিকে সর্বজনীন বোধের ব্যাপ্তি প্রদানে তাঁর চিত্রভাবনা অন্য সকল সৃজনকর্মের চেয়ে অনেক ব্যাপক ও অনুসন্ধানী। সেই সঙ্গে কেমন করে ভোলা যায় সেই বহুমুখী আগ্রহের মানুষটিকে যাঁর সংগ্রহে ছিল মূল্যবান ও বিরল ডাকটিকেটের সংগ্রহ, দেশলাইয়ের বাক্সো, দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা, যাঁর আগ্রহ বিস্তৃত ছিল হাতে-লেখা কোরান শরিফ থেকে মন্দিরগাত্রে পোড়ামাটির ফলক পর্যন্ত। সুলতানি আমলের মুদ্রা বিষয়ে যে-মানুষটির মৌলিক গবেষণা ভারতেও স্বীকৃত হয়েছে, অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের মন্দির-অলংকরণে ব্যবহৃত মৃৎফলকের আলোকচিত্র তোলার জন্য যে-মানুষটি প্রৌঢ় বয়সেও পশ্চিমবঙ্গের দুর্গম গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, তাঁকে কী করে বিস্মৃত হওয়া যায়? মুর্তজা বশীর বাংলাদেশের দৃশ্যকলা-চর্চার জগতে একটি মৌলিক ও স্বতন্ত্র কণ্ঠ, বর্ণাঢ্য জীবনের প্রাণময়তায় এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর মতো ইতিবাচক মানসিক শক্তির অধিকারী মানুষ অতি বিরল। মুর্তজা বশীরের তিরোধান আমাদের জীবনচর্যা ও সৃজনশীলতার জগৎকে অনেকটাই বর্ণহীন করে দিয়েছে। এক অনন্য সদাজাগ্রত মননের সৃজনশীল মানুষ হিসেবে তাঁর স্মৃতি জাগরূক থাকবে।

Leave a Reply