রঙের রেখায় স্বদেশের আচড়

ইব্রাহিম ফাত্তাহ

যমুনা নদীর শাখা এক নদী সিরাজগঞ্জের হুরাসাগর। এই নদীতীরে জন্ম যাঁর, তাঁর সৃষ্টিতে চরাঞ্চলের চেহারা ফুটে ওঠাই তো স্বাভাবিক। ভেজাবালুর ওপর মুখ গুঁজে থাকা শামুক, বালুর বুকে কাঁকড়ার চলাচলের রেখা এমন অনেক কিছুর দেখা যেন আমরা পেয়ে যাই রেজাউল করিমের চিত্রকলায়। চিত্রপটে তিনি তুলে আনেন নদী ও বৃষ্টিধারার আবেশ, বাংলা নিসর্গের নানা ঋতুরূপ আর তার লাবণ্য। তাঁর বর্ণ বড় নমিত, শান্ত, স্নিগ্ধ – যেন বাংলারই অন্য এক রূপমাধুর্য।
ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাস সম্প্রতি শিল্পী রেজাউল করিমের একটি একক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। গত ৬ থেকে ১৩ এপ্রিল ‘পোড়ামাটির গাথা’ শীর্ষক আট দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ-প্রদর্শনীতে শিল্পীর সম্প্রতি অাঁকা অর্ধশতাধিক চিত্রকর্ম স্থান পায়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে অবস্থানরত অনেক বাঙালির সরব উপস্থিতিতে প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের। প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত ব্রোশিওরে শিল্পী রেজাউল করিমের চিত্রকলা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা লেখেছেন আমাদের দেশের বিশিষ্ট শিল্প-সমালোচক ও পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস।
এটি শিল্পীর অষ্টম একক। প্রথম একক আয়োজিত হয়েছিল ময়মনসিংহ টাউন হলে ১৯৬৭ সালে তাঁর ছাত্রজীবনে। এরপর ঢাকায় তিনটি একক ১৯৭৬, ১৯৯১, ১৯৯৬ যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, জাতীয় জাদুঘর ও গ্যালারি টোনে অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৭ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়, ২০০৮ সালে চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে, ২০০৯-এ বেঙ্গল শিল্পালয়ে ‘প্রদোষের আলো’ নামে শিল্পীর একক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন হয়। এছাড়া দেশে-বিদেশে আয়োজিত বহু গুরুত্বপূর্ণ যৌথ প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।
রেজাউল করিমের জন্ম ১৯৪৬ সালে সিরাজগঞ্জে। ১৯৬৩ সালে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়েছেন ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে। ১৯৬৮ সালে ঢাকার তৎকালীন চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে স্টুডিও ডিজাইনার হিসেবে পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগ দেন এবং পরিচালক ডিজাইন হিসেবে ২০০৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পেশাগত জীবনে মানসম্মত শিল্প-নির্দেশনার পাশাপাশি নিয়মিত ছবি এঁকে গেছেন। কবিতা রচনাতেও তাঁর বিশেষ ঝোঁক আছে। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম – রোদেরা মরে যায়। এছাড়া নিজের কতক চিত্রপটেও মাঝে মাঝে কবিতার পঙ্ক্তি প্রয়োগ করে থাকেন।
‘পোড়ামাটির গাথা’ শিরোনামটি বেশ জুতসই হয়েছে। কাব্যিক এ-শিরোনামটি দিয়েছেন শিল্পী ও শিল্প-সমালোচক অধ্যাপক মতলুব আলী। অনেকটা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত রাশিয়ান চলচ্চিত্র ব্যালাড অব এ সোলজার – এ-নামটির সঙ্গে মিলিয়ে রাখা।
রেজাউল করিমের ওয়াশ, বর্ণলেপন, বর্ণপ্রয়োগের সঙ্গে দারুণ সখ্য হয়েছে শিরোনামটির। শিল্পী তাঁর কাজের পরিকল্পনায় হাত বাড়িয়েছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি। ১৯৭১ সালে হানাদার পাকিস্তানিদের পোড়ামাটি নীতির বলি হতে হয়েছে আমাদের মাতৃভূমি ও জনগণকে। কোনো অবয়ব ব্যবহার না করে বর্ণলেপন আর প্রতীকের মধ্য দিয়ে সেই দুঃসহ যন্ত্রণা আর রক্তাক্ত সময়ের স্বাক্ষর তুলে ধরেছেন শিল্পী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন রোপিত হয়েছিল বাংলাভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। ষাটের দশকে রেজাউল করিম যখন ঢাকায় চারুকলার শিক্ষার্থী, তিনি দেখেছেন বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ-নির্যাতন। পুরো ষাট দশকজুড়ে পাকিস্তানি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থেকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। এভাবে নিজের মনটাও তৈরি হয়েছে তাঁর। একাত্তরে একদিকে দেখেছেন হানাদারদের ধ্বংসযজ্ঞ, অন্যদিকে বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধের গৌরবময়তার আত্মশ্লাঘাও অনুভব করেছেন। এই বোধে উৎসারিত তাঁর সমসাময়িক চিত্রকর্ম আমাদের আলোড়িত করে, ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেইসব দিনে।
ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে ‘পোড়ামাটির কান্না’ সিরিজের ১১ সংখ্যক চিত্রকর্মটিতে আমরা প্রত্যক্ষ করি একটি দেয়াল। প্রতীকী এ-দেয়ালে দেখি দরজার সংকেত আর অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে দুটি অবয়বের আভাস। কাছাকাছি কয়েকটি রং চিত্রপটে ছেড়ে গড়াতে দিয়ে যে-সারফেস তৈরি করেন শিল্পী তার ওপর আরো রং লেপন করে, রেখা ও ফর্ম ব্যবহার করে বর্ণের নানা পর্দার পরতে পরতে কাজ করে চিত্রগুণ তৈরি করেন। ফলে তাঁর কাজ হয়ে ওঠে গভীর ভাবব্যঞ্জক ও দৃষ্টিনন্দন।
একই শিরোনামের ১২ সংখ্যক কাজটি কোলাজ মাধ্যমের। এ-কাজটিতে যেন একাকার হয়ে ফুটে উঠেছে নির্যাতিত মানবাত্মার ক্রন্দন, মৃত্যু আর শোকের মাতম। গণহত্যা শিরোনামে দুটি ছবি এঁকেছেন শিল্পী, যার একটি ১৫২ গুণিতক ৫৬ সেন্টিমিটার আকারের কাগজে অ্যাক্রিলিক রঙে অাঁকা। যুদ্ধের বীভৎসতা বোঝানোর জন্য প্রয়োগকৃত ফর্মগুলোকে এলোমেলোভাবে উপস্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞের প্রতীকরূপ সৃষ্টি করেছে। আবার যুদ্ধজয়ের আনন্দবারতা যেন পেয়ে যাই ক্যানভাসে মিশ্রমাধ্যমে অাঁকা ‘বিজয়ের পথে’ শিরোনামের চিত্রকর্মে।
শিল্পীর আরো কটি সিরিজ চিত্রকর্মের শিরোনাম – ‘বৃষ্টির শব্দ’, ‘নদী ও বৃষ্টির গান’, ‘সোনার বাংলা’, ‘পোড়া প্রকৃতির শব্দ’, ‘কুমারীর গান’, ‘ধূসর জমিন’, ‘পোড়া মাঠের পদ্য’, ‘ধ্বংসযজ্ঞ’ প্রভৃতি। নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া টুইন টাওয়ার ও মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে লম্বাটে পটে বেশ কটি ছবিও তিনি এঁকেছেন। ওখানকার পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রদর্শনীর সংবাদ প্রকাশ করেছে। প্রদর্শনী থেকে শিল্পীর সাতাশটি চিত্রকর্ম সংগ্রহ করেছেন শিল্পবোদ্ধারা। সবমিলিয়ে এ-আয়োজনটি সফলই হয়েছে।
শিল্পী রেজাউল করিমের কাজে তাঁর সমসাময়িক শিল্পী গিয়াসউদ্দিনের কাজের বর্ণলেপনের সঙ্গে খানিকটা মিল পাওয়া যায়। এ বুঝি শৈশবের বিশাল ক্যানভাসে কাদা-মাটি-জলের মিল। শিল্পী রেজা নিজেই স্বীকার করেন, কিবরিয়া স্কুলের প্রভাব আছে তাঁর চিত্রকলায়। প্রিয় শিক্ষককে দেখেছেন বর্ণের পর্দার পরতে পরতে কাজ করতে। তাঁর সেই কাজের ধরনকে আত্মস্থ করে রেজাউল ছবি অাঁকছেন অনেকদিন ধরে। বিশেষ করে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ছবি অাঁকায় পুরো আত্মনিয়োগ করেছেন। এবং এর সুফলও তিনি পেয়েছেন। শিল্পীজীবনের শুরু থেকে প্রথম কুড়ি বছরে যেখানে তাঁর একক প্রদর্শনীর সংখ্যা চারটি সেখানে গত পাঁচ বছরে তিনি আরো চারটি একক প্রদর্শনী করেছেন।
একক প্রদর্শনী করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আরো তিনটি নগর ঘুরেছেন। নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট দেখেছেন প্রবাসী বাংলাদেশি লেখক বেলাল বেগের সঙ্গে। শিল্পী রেজাউল করিমের একটি বড় অর্জন হলো, ওয়াশিংটন ডিসির মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট তাঁর চিত্রকর্ম সংগ্রহ করেছে, যেটি এ-অঞ্চলের শিল্পীদের জন্য গৌরবময় এবং বলা বাহুল্য, প্রথম ঘটনা। 

Leave a Reply

%d bloggers like this: