রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা

রবার্ট ফ্রস্ট, ইংরেজি সাহিত্যের সেরা কবিদের অন্যতম। আমেরিকান কবি ১৮৭৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোয় ফ্রস্টের জন্ম। তাঁর বেড়ে ওঠা নিউ ইংল্যান্ডের ছোট্ট একটি গ্রামে। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে এর মধ্যেই নিজের আবেগ, বেদনাবোধ এবং অতৃপ্তির ছবি এঁকেছেন তিনি কবিতার রংতুলি দিয়ে।
বাবার মৃত্যুর পর এক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে রবার্ট ফ্রস্টকে। তবু থেমে থাকেনি তাঁর সাহিত্যসাধনা। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে শরতের পাতাঝরা রং-ঝলমলে দিন, গ্রীষ্মের আলোকিত লম্বা দুপুর আর বসন্তের সন্ধিক্ষণে পরিযায়ী পাখিদের ফিরে আসার গল্প। সাহিত্যসাধনার প্রথমদিকে তাঁকে উপহাসের পাত্র, হতে হয়েছিল আপনজনদের কাছেই। কিন্তু অদম্য মনোবল আর কবিতার প্রতি প্রচ- ভালোবাসা তাঁকে সাহিত্যের পথচ্যুত হতে দেয়নি।
তাঁর কবিতা প্রথম ছাপা হয় ১৮৯০ সালে, স্কুল বুলেটিনে। ১৮৯৪ সালে দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় তাঁর কবিতা ‘মাই বাটারফ্লাই’ এবং ‘অ্যান এলিজি’ প্রকাশিত হয়। এজন্য তিনি ১৫ ডলার সম্মানী পান। এই অর্থ দিয়ে টোয়াইলাইট বইয়ের দুটি কপি প্রকাশ করেন ফ্রস্ট। ১৯১৩ সালে এ বয়েজ উইল নামে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ-বইটি তাঁকে সে-সময়ের খ্যাতিমান লেখকদের সান্নিধ্যে আসতে সাহায্য করে। এরপরের বছর নর্থ অব বোস্টন নামে তাঁর আরেকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যা নজর কাড়ে সাহিত্যামোদীদের। আলোচনায় চলে আসেন তিনি ও তাঁর কবিতা।
১৯২৪ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ার কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৩১ সালে পুলিৎজার পান কালেক্টেড পোয়েমসের জন্য। পরবর্তীকালে ১৯৩৭ সালে এ ফার্দার রেন্জ এবং ১৯৪৩ সালে এ উইন্টার এজ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি তৃতীয় ও চতুর্থবারের মতো পুলিৎজারে ভূষিত হন। রবার্ট ফ্রস্ট নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও শেষ পর্যন্ত সে-সম্মান তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।
১৯৬৩ সালে বস্টনের ম্যাসাচুসেটসে ৮৮ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন এ কীর্তিমান পুরুষ।

আমার শৈশবে, আমার কাব্যচর্চার প্রাক্কালে, আমি রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে পরিচিত হই। আমার এক বন্ধু আমাকে এক পাঠচক্রে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে আমার এক কবিবন্ধু রবার্ট ফ্রস্টের একটি কবিতা অনুবাদ করে। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কবিতার অনুবাদটি আমার মনকে আবেশিত করে। সেটি ছিল রবার্ট ফ্রস্টের খুব জনপ্রিয় একটি কবিতা। টেলিফোনের ওপর অসম্ভব সুন্দর একটি কবিতা। আমি মনে মনে বলি, একজন মানুষ এত সুন্দর কবিতা লিখতে পারে! কবিতার রূপ ঠিক এমন হয়। আমার মনে কবিতার যে-অবকাঠামো ছিল তা ভেঙে যায়। আমি রবার্ট ফ্রস্টের জীবনী পড়তে শুরু করি। লক্ষ করে দেখি, এই কবি ইংরেজি সাহিত্যে আমেরিকানদের এক ধাপ ওপরে রেখেছেন। আমি জানতে পারলাম, এই কবির লেখাকে আমেরিকানরা বাইবেলের মতো মানে। যেমন :
One for sorrow
Two for joy
Three for none
Four for boy
Five for silver
Six for gold
Seven for a secret
Never to be told.
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতেও এই কবি গভীরভাবে মিশে আছেন। যেমন আমরা বলি, এক শালিক দেখলে দুঃখ হয়, দুই শালিক দেখলে সুখ। প্রতিভাধর গুণী এ-কবির কয়েকটি কবিতার অনুবাদ তুলে দেওয়া হলো পাঠকদের জন্য।
– অনুবাদক

একটি খোলাভীতি

আমি বসে আছি
যেন মনে হয় সর্বদা
হাডসনের তীরে আছি
এবং অনেক দূরের কোনো বিষয়
একটি ছোট খাদি
এবং একটি পায়েচলা পথ ছাড়া
আর কিছু নয়

আমি আমার তাঁবু দেখতে পাই
আমাকে পাই মেঝেতে
পা ভাঁজ করে বসা
এবং দরজায় মৃদু পায়েতে
দূরে ভেসে যাই

তার নাম জো
এলিয়াস জন
এবং সে যা জানে না
এবং বলবে না
সেথায় হেনরি হাডসন যায়
আমি বলব না
খুব বেশি সাহায্য তাকে করতে পারি।

বরফের পিঠায়
যে-চিহ্ন আঁকা
তা কোনো লোকেদের
ভুলক্রমে ঘটা নয়
না,
কোনো আত্মা নয়
বাতাসের ক্ষণিক বিরতির জন্য
আমি এবং আমার দক্ষিণতীরে

জন জো ছাড়া অন্য কেউ
আমার ফরাসি ইন্ডিয়ান ইকুইম্যাক্স

যে-রাস্তায় যাইনি

দুটি পথ গেছে বেঁকে দুটি হলুদ বনে
একটি মাত্র পথিক হলে
যতদূর যায় চোখ চেয়ে রইলাম একদৃষ্টে
যেখানে গুল্মময় এক ঝোপ গেছে বেঁকে

তারপর গেলাম যতখানি সম্ভব অন্যপথে
এনে হয় তা আরো ভালো দাবিদার
তা ছিল ঘাসময় এবং পোশাকের সাথে
যদিও আমি ছিলাম ওই পথেরই সওয়ার
তাদের পরালাম উপস্থিতির পোশাকের অলংকার

উভয় পথই পেয়েছে সমান সকালে
পথের পাতা হয়নি কালো পায়ের আঘাতে
আমি অপরটি রাখলাম অন্যদিনের কোনো কালে
তবু জেনে নিই কোন রূপে যাব ওই পথে
সন্দেহ হয় যদি না ফিরি কোনো প্রাতে

এই কথা বললাম আমি প্রগাঢ় দীর্ঘশ্বাস
এই যুগে অথবা অন্য কোনো আলাদা যুগে
দুটি পথ গেছে বেঁকে কোন বনে
শুধু বৈষম্য এঁকে দিলো এই মনে।

আগুন ও বরফ

কেউ বলে এই পৃথিবী ধ্বংস হবে আগুনে
কেউ বলে বরফে
আমার কিছু আকাঙ্ক্ষা আছে বলায়
আমি তারই সাথে যে-আগুনের পক্ষে
কিন্তু আমার মনে হয় আমি হারাবো দুবার
আমার মনে আমি জানি কথামালা ঘৃণার
বরফ বিধ্বংসের জন্য ঘৃণাই যথেষ্ট মানবতার
কোনো স্বর্ণই থাকবে না

প্রকৃতির প্রথম সবুজ হলো স্বর্ণ
তার আপ্রাণ চেষ্টা ধরে রাখা তার বর্ণ
তার প্রথম পাতার ফুলটা সে ধরে রাখে এক ঘণ্টা
তারপর লতিয়ে পড়ে পাতায় পাতায়
তা লেখা থাকে আদিম দুঃখের খাতায়
প্রভাত তিরোহিত হয় অজান্তে
কোনো স্বর্ণ থাকে না এ-প্রান্তে।

নীল প্রজাপতির দিন

আজ বসন্তে এসেছে এক নীল প্রজাপতি দিন
এবং তাদের ডানায় ডানায় বিক্ষোভ
তাদের ডানায় অমিশ্রিত বর্ণ
যদি ত্বরায় না যায় সে, মেটাবে তাদের ঋণ

এই ফুলগুলো উড়ে এবং গান গায়
এখন রয়ে গেছে তার পরিত্রাণের আকাঙ্ক্ষায়

বাতাসের সঙ্গে লেগে থাকে তারা
এপ্রিল কদর্যে হয়ে যায় সারা

শাস্তিপ্রিয় মেষপালক

স্বর্গ যদি আসে নেমে
চারণভূমিতে
আমি হেলে বসি
দুই তারার মূর্তিতে

আমি ভুলে যাই ওসব
ভাবি আমি নিয়মের মুকুট
ব্যবসার পালস্না আর সত্যের সীমা
খুব কঠিন যা নবায়ন করা

আমাদের জীবনে তার পরিচালনা
মানুষের যুদ্ধের গল্প আছে জানা
ত্রাস, মুকুট ও মাপকাঠি
সব এনেছে এ-তরবারি

Leave a Reply

%d bloggers like this: