গত তিনদিন ধরে শহিদুলের বউ কাঁদছে। যেনতেন কান্না নয়, চিৎকার করে বস্তি মাথায় ওঠানোর মতো কান্না। প্রথম প্রথম আশেপাশের লোকজন আহারে-উহারে করলেও এখন তারা আর ব্যাপারটা নিতে পারছে না। ফরিদা ডুকরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় চড়-ঘুষি দিয়ে মুখ খিস্তি করে গালাগাল করছে।

ফরিদার অবশ্য তাতে কিছু আসে-যায় না। একমাত্র মেয়ের জন্য সে শোক করবেই। আহারে, কত আদরের মেয়ে ছিল! হাসলে গালে টোল পড়ত। কয়েক মাস পরই পনেরো বছর বয়স হতো। এখন আর নেই। ক্ষণে ক্ষণে সে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানায়, যেই করোনায় তার আছিরন গেছে, সেই করোনা যেন তাকেও তুলে নেয়, আর সঙ্গে নেয় এই বস্তির সবাইকে।

সিগারেট টানতে টানতে শহিদুল সেই দৃশ্য দেখে আর মনে মনে টাকা-পয়সার হিসাব করে। আছিরনের প্রতি তার মায়া-মমতা যে ছিল না, তা নয়। সারাদিন রিকশা চালানোর পর ঘরে ঢুকলে মেয়েটা খুশি খুশি গলায় বলে উঠত, ‘বাপ্পা আইছৈন?’ শুনে বুকটা ভরে

যেত, যদিও সেটা সে প্রকাশ করত না। ‘বাজান’ বা ‘আব্বা’ না বলে ‘বাপ্পা’ বলার রহস্য হচ্ছে, আছিরন ফরিদার আগের ঘরের মেয়ে, শহিদুলের মেয়ে নয়। পরের মেয়ের জন্য ভালোবাসা খরচ করে লাভ নেই। চোখের পানি ফেলেও নেই।

ঘরে আছে মাত্র আড়াইশো টাকা। এই বাজারে আড়াইশো টাকা মানে আসলে বিশ টাকা। চাল-ডাল সবকিছুর দামই আকাশছোঁয়া। আমলিগোলায় যেখানে বাসি জিনিসপাতি একটু কম দামে পাওয়া যেত, সেখানে গতকাল এক মাছওয়ালা তার কাছে এক ভাগা পোয়া মাছের দাম চেয়েছে ছয়শো টাকা। বড় ভাগা হলে তবু একটা কথা ছিল, আট-নয়টার বেশি মাছ উঠবে না।

মাছওয়ালার ভাবভঙ্গি দেখে শহিদুল মাথা নিচু করে চলে এসেছে। বাসায় ফিরেছে শুধু একটা এনার্জি বিস্কুটের প্যাকেট হাতে নিয়ে। সেটা খেয়েই বাপ-বেটা এখন পর্যন্ত টিকে আছে। রাসেল অবশ্য ভালোই আছে, বস্তির আরো কিছু গুঁড়া-গাড়ার সঙ্গে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। ফরিদা এখন পর্যন্ত কিছু খায়নি।

‘ভালাই হইছে মাছ না কিইন্যা’, শহিদুল নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। ‘রান্তো কে?’

তার বউয়ের কান্নাই তো শেষ হচ্ছে না। ঘরে চাল আছে কি না সেটাও নিশ্চিত নয়। ফরিদা যে গার্মেন্টসে কাজ করে, সেটা নাকি এখনো খোলা। কোনোভাবেই তাকে কাজে যেতে রাজি করানো যাচ্ছে না। টাকা যেটুকু আছে – ওই আড়াইশো – সেটা আক্ষরিক অর্থেই রক্তের টাকা। সিগারেটের খরচ ওঠানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়ে একসময় কোচিংয়ে যাবে, সেজন্য শহিদুল মাঝে মাঝে নিজের রক্ত বেচত। তার রক্তে ও-নেগেটিভ বলে একটা ব্যাপার আছে।

এখন অবশ্য রক্ত বেচারও সুযোগ নেই। সবার মুখে খালি একই চিন্তা, করোনা। ঢাকা খালি হয়ে গেছে অনেক আগেই। যারা আছে, লকডাউনের জন্য তাদের পুলিশ রাস্তায় নামতে দিচ্ছে না। তবু সে আশায় আশায় রিকশা নিয়ে বের হচ্ছে। পুলিশ দেখলে সটকে পড়ে, ধরা খেলে লাঠির বাড়ি খায়। তবু নিরস্ত হয় না – কী করবে?

ভাগ্যিস রিকশাটা তার নিজের। ডেইলি ডেইলি জমার টাকা শোধ দিতে হলে এতোদিনে মরা লাগত। যদিও শেষ পর্যন্ত মনে হচ্ছে মরাই লাগবে। আজ দুপুরে পুরা আমলিগোলাতেও চাল পাওয়া যায়নি। আরামবাগে নেই, কাঁঠালবাগানেও নেই। কারওয়ান বাজারে একজন বলল আছে, কিন্তু পরে দেখা গেল ফাউ কথা, সেখানেও নেই। খালি রিকশার প্যাডেল মারতে মারতে কাঁহাতক এসব সহ্য করা যায়, তাই শহিদুল ফিরে এসেছে।

বসে বসে এখন সে ফরিদার অভিশাপ-বিলাপ শোনে আর ভাবে, কীভাবে বেঁচে থাকা যায়।

দুই

ফরাশউদ্দিন সাহেব আত্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর খুবই বিরক্ত। আড্ডার সময় চা খাওয়া, দাওয়াতের সময় পোলাও খাওয়া আর অসুস্থ হলে হাসপাতালে সেলফি তোলা – এসব ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনকে কাছে পাওয়া যায়। দরকারের সময় পাওয়া যায় না।

ইদানীং তাঁর স্ত্রীর অ্যাজমা বেড়ে গেছে; কিন্তু বাসায় ইনহেলার নেই। ভুলটা ফরাশউদ্দিনেরই – চার মাসের খাবার-দাবার কিনে স্টক করে ফেলেছেন, প্যারাসিটামল-টলও কিনেছেন। ইনহেলার কেনার কথা মনে ছিল না। এখন পস্তাচ্ছেন। রাতে হামিদার এমনই হাঁপানির টান ওঠে যে দুজনের কেউই ঘুমাতে পারছেন না। ফরাশউদ্দিন তন্নতন্ন করে খুঁজছেন, কিন্তু কোথাও অ্যাজমাসল ইনহেলার পাওয়া যাচ্ছে না। ফার্মেসিগুলা যে তাঁকে পুরোপুরি নিরাশ করছে তাও নয় – বলছে, আজ-কালের মধ্যে এসে যাবে। নিরাশ করলেই হয়তো ভালো ছিল, তিনি যা করার করেছেন ভেবে কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পারতেন।

অথচ এতোটা ভোগান্তিতে ফরাশউদ্দিনের পড়ার কথা নয়। তাঁর জন্ম ঢাকায়, চৌদ্দগুষ্টি ঢাকায়। হাতেগোনা কয়েকজন   বাদে   এই   শহরের   আনাচে-কানাচে তাঁর সব প্রিয়জন। একটু চেষ্টা করলেই কেউ না কেউ তাঁকে উদ্ধার করতে পারে। কারো সেই হুঁশ আছে? এই যে তিনি কারফিউ ভেঙে প্রতিদিন যত্রতত্র অ্যাজমাসল খুঁজতে বের হচ্ছেন, একটা বার কেউ সাধলও না – আমি খুঁজে দিচ্ছি, আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না, বা এটুকুও যদি কেউ বলত – অমুক দোকানে এক পিস আছে, যান। কত বড় উপকারই না হতো!

রিকশা চলতে শুরু করে।

চিন্তার বিষয়, ফার্মেসিগুলো আগে আগে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আজ তাই ৬টার আগেই ‘ইয়া নফসি, ইয়া নফসি’ করতে করতে ফরাশউদ্দিন বেরিয়ে পড়েছেন। লকডাউনে নাকি কাজ হয়নি, তাই অনির্দিষ্টকালের জন্য সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ। কেন কারফিউ দিয়েছে সেটা এক রহস্য – শহর এমনিতেই ফাঁকা। লাঠালাঠি করতে চাইলে এখন হারিকেন দিয়ে লোক জোগাড় করতে হবে। যারা বাইরে, তারা সবাই ফরাশউদ্দিনের মতো – নিতান্তই নিরুপায়। সেটা বুঝেই হয়তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রিকশা-সিএনজিচালিত অটোরিকশা টুকটাক যা বের হচ্ছে সেগুলোকে ধরছে না। ধরলেও ধমক-ধামক দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে।

হালকা বাতাস বইতে শুরু করে। ভ্যাপসা গরমে গরিবের এসি। রিকশাওয়ালা ছোকরাটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ফরাশউদ্দিন অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, রিটায়ার করার এতোদিন পরও জনতা ব্যাংকের হাতিরপুল শাখা দেখে তাঁর বুকটা খালি খালি লাগছে।

তিনি গম্ভীর গলায় ছোকরাটাকে বললেন, ‘অন্য রাস্তা দিয়ে যা।’

সে ঘাড় কাত করে হ্যান্ডেল ঘোরায়। আগে রিকশাওয়ালারা লুঙ্গি পরত, সেই সঙ্গে সাধ্য অনুযায়ী ফতুয়া বা গেঞ্জি। এর পরনে গার্মেন্টসের শার্ট-প্যান্ট। মুখে মাস্কও আছে। আজকাল সবাই মাস্ক পরছে। তাঁর নিজেরটা কি বেশি পুরনো হয়ে গেছে? এখনো কাজ করছে? ফরাশউদ্দিন চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমনিতেই হামিদাকে নিয়ে টেনশন, তার ওপর করোনা।

কী যন্ত্রণা, কী যন্ত্রণা! মাথাটা ঝিমঝিম করছে, গলাটা খটখটা শুকনো। সংক্রমণের ভয় না থাকলে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খেতেন। রিকশাওয়ালাটাকেও খাওয়াতেন। সেটা সম্ভব নয়। আজকাল নাকি করোনার কারণে স্ট্রোকের রোগীও হাসপাতালে যেতে চায় না। এই যে তিনি রিকশায় চড়ছেন, সেটাই তো নিরাপদ নয়। সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘিত হচ্ছে। কতদিন এই অদ্ভুত তাণ্ডবের মধ্যে বসবাস করতে হবে? আল্লাহতায়ালা কি কেয়ামতের সুইচ অন করে দিয়েছেন? একটাই সান্ত্বনা, মেরি বিদেশে।

মেরি তাঁর একমাত্র মেয়ে। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে থাকে। সেখানেও করোনার টেনশন আছে, কিন্তু এতোটা নেই, এবং অন্যান্য অনেক টেনশন নেই। বাবা-মা হিসেবে এটা ফরাশউদ্দিন ও হামিদার অনেক বড় স্বস্তি। গোল্ড কোস্ট অভিজাত জায়গা। নামটার মধ্যেই একটা বড়লোক বড়লোক ভাব – যেন প্লাটিনাম প্লাস ক্রেডিট কার্ডের নাম রাখতে গিয়ে কেউ শহরের নাম রেখে ফেলেছে। সাগরঘেরা, সূর্যদীঘল একটা শহর। ‘নয়নাভিরাম’ বললে শুধু কম বলা হয় না, মনে হয় যে বলেছে তাকে চড় মারা উচিত। ফরাশউদ্দিন কখনো গোল্ড কোস্টে যাননি, তবে ইন্টারনেটে প্রচুর ছবি দেখেছেন। কোনো একদিন হামিদাকে নিয়ে যাওয়ার আশা রাখেন।

হয়তো মেরি আছে বলেই গোল্ড কোস্টকে তাঁর খুব আপন মনে হয়। প্রায়ই গুগল ম্যাপস আর কল্পনার মিশেলে ফরাশউদ্দিন সেখানে ঘোরাঘুরি করেন। এই তো গতকাল অ্যাশমোরে মেরিদের আলিশান বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে, নির্যাং নদীর তীরে ঝালমুড়ি খেয়ে, সাউথপোর্ট মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ে তিনি বাসায় ফিরলেন। চাকরি অবস্থায় তাঁর অফিস ডেস্কে সবসময় একটা ছবি থাকত। ম্যাজেন্টা কালারের ফ্রেমের ভেতর মেরি, জামাই ও তাদের দুই মেয়ে। জামাই ছাড়া সবার ঠোঁটে হাসি। ফ্রেমের পাশে মুন্নু সিরামিকের

একটা ফুলদানি থাকত। ফরাশউদ্দিন অফিস  পিয়নকে দিয়ে ফুলদানিটায় সবসময় ফ্রেশ রজনীগন্ধা রাখতেন – তাঁর মেয়ের ও তাঁর প্রিয় ফুল।

অনেকেই ছবিটা দেখে প্রশংসা করত। তিনি তখন স্মিত হেসে বলতেন, ‘থ্যাংক ইউ। ওরা গোল্ড কোস্টে থাকে, অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্ট।’ রিটায়ারমেন্টের পর তিনি ছবিটা ভিন্ন একটা ফ্রেমে ভরে দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন। মেরির বিয়ের পর থেকেই দুই কাঠার ওপরে বানানো তাঁর নিজের বাসাটাকে প্রকাণ্ড মনে হতো। এখন অসীম মনে হয়। কে জানে, গোল্ড কোস্টের বাসাগুলো হয়তো এরকম প্রকাণ্ডই হয়, বা এর চেয়েও বড়। গুগল ম্যাপস দিয়ে বাসার ভেতরে ঢোকা যায় না।

তিন

হঠাৎ ফরাশউদ্দিনের মোবাইল বেজে ওঠে। কোনো আশ্চর্য কারণে কলটা রিসিভ করার আগেই তাঁর বুকের ভেতর খামচে ধরার মতো একটা অনুভূতি হয়।

কয়েক মিনিট কথা বলার পর তিনি লাইন কেটে দেন। ততোক্ষণে আত্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর তাঁর রাগ আরো বেড়ে গেছে। বেশি মেজাজ খারাপ হলে সবসময় তাঁর শুকনা কাশি হয়। সেটাই হলো – ফরাশউদ্দিন তিন-তিনটা মাঝারি সাইজের কাশি ছাড়লেন।

সঙ্গে সঙ্গে রিকশাওয়ালা ঘুরে তাকায়। চোখে রাজ্যের সন্দেহ। ফরাশউদ্দিন কঠিন দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আরেকটা কাশি দিলেন, যার অর্থ – আরে গাধা, এটা এমনি কাশি, করোনা নয়।

তবু সে চোখ সরায় না। শেষে ফরাশউদ্দিন বিরক্ত গলায় বললেন, ‘রাস্তা দ্যাখ, অ্যাক্সিডেন্ট করবি তো।’ যদিও ফাঁকা রাস্তায় সে-আশঙ্কা প্রায় শূন্য।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিকশাচালক আবার প্যাডেল মারতে শুরু করে।

প্রিয় পাঠক, দুঃখিত। এভাবে আমাকে দিয়ে হচ্ছে না। গল্পে হালকা বিরতি দিয়ে বরং অন্য প্যাঁচাল হোক। যেহেতু আপনার-আমার পরিচয় নেই, এবং আপনি যে কেউই হতে পারেন, তাই প্যাঁচালটা এমন কিছু নিয়ে হওয়া উচিত যেটা ইউনিভার্সাল। যেমন নাম।

মানুষ মাত্রেরই নাম থাকে। একটা বয়সে নামকরণের সার্থকতা নিয়ে পরীক্ষার খাতায় নানা খিচুড়িও রচনা করতে হয়। তবে নাম জিনিসটার একটা সমস্যা আছে। সেটা এক ধরনের এক্সপেক্টেশন তৈরি করে – বাস্তবে এবং গল্পে। কারো নাম যদি হয় ‘তাশনুভা’ তাহলে আমরা ধরেই নিই সে উচ্চ বা মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো তরুণী। সকাল ৭টায় টিফিন ক্যারিয়ার হাতে করে সে গার্মেন্টসে যায় না। ঠিক না?

‘মানুষ’ পরিচয়টাই আসল। কিন্তু দেখলেন তো, সেই পরিচয়টা কত সহজে নামের ভারে চাপা পড়ে? সঙ্গে হালকা ডেসক্রিপশন থাকলে তো কথাই নেই। কাকে ‘আপনি’ বলা যায়, আর কাকে বলার দরকার নেই – সেই গায়েবি প্রপাগান্ডা শুনে আমরা মনে মনে মাথা নাড়তে থাকি। আমাদের এই গল্পের কথাই ধরুন। শহিদুল ‘সে’, কিন্তু ফরাশউদ্দিন ‘তিনি’। ফরাশউদ্দিন আবার শহিদুলকে বলছেন ‘তুই’ করে।

আরে আরে, কী মুশকিল! পাঠক! আপনি এজন্য আমাকে দুষছেন? বলছেন এসব আমার দোষ, আপনি সরল মনের মানুষ হয়ে ফেঁসে গেছেন? কিন্তু আপনি যে ব্যাপারটা খেয়াল না করেই এতোদূর পড়ে ফেললেন, আপনার কোনো দায় নেই? আপনাদের পছন্দের প্রশ্রয় না পেলে তো আমরা এভাবে লিখতে পারতাম না।

আচ্ছা থাক, আসুন সামনে তাকাই – চলুক গল্প, এখন থেকে নাম-টাম বাদ।

চার

এইমাত্র বৃদ্ধের মোবাইলে কলটা এসেছিল তাঁর ছোট বোনের নম্বর থেকে। আজ সন্ধ্যায় তার বাসায় দাওয়াত, বড় ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে।

‘আসতেই হবে’, ‘ছয়টার পরে তো’, ‘কোন সিম্পটম নাই তো’, ‘তোমরা না আসলে   কেমনে   হয়’   –   ইত্যাদি  ইনিয়ে-বিনিয়ে তিন মিনিট পনেরো সেকেন্ডের আবদার। বৃদ্ধ সেই দাওয়াতে যাবেন বলে কথা দেন; কিন্তু অভিমানে তাঁর মনটা ভার হয়ে গেছে।

ইদানীং ফেসবুক খুললেই তাঁর চোখে পড়ে বিভিন্ন ‘করোনা পার্টি’র ছবি। সেসব দেখে তাঁর মনে হয়, একশ্রেণির মানুষ এই সময়ে শুধু ভালো নয়, বেটার আছে। তারা ভালো ভালো খাবার খায়, গলাগলি করে আড্ডা মারে, আবার হাসিমুখে ‘ভি’ সাইন দেখানো সেলফি তোলে।

অন্যদিকে খবরের কাগজ খুললেই সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। দেশে তীব্র খাদ্য সংকট চলছে। বেকার হয়ে গেছে লাখ লাখ মানুষ। চিকিৎসার অভাবে খুব সম্ভবত মহামারি হতে যাচ্ছে। হাসপাতালে টানা ডিউটি দিতে দিতে ডাক্তার-নার্স নিজেরাই মুমূর্ষুপ্রায়। কী হবে? কী হতে যাচ্ছে? বৃদ্ধ অসহায় বোধ করে। এসব বৈসাদৃশ্য তিনি মেনে নিতে পারেন না; কিন্তু এই বয়সে এসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তিনি আর কি-ই বা করতে পারেন?

পেটের দায়ে কারফিউভাঙা যুবক অন্যমনস্কভাবে প্যাডেল মারতে থাকে। স্যালাইনের ড্রিপের মতো রিকশাটা টিপটিপ করে ঢাকার ধমনী-উপধমনী দিয়ে এগোয়।

একটা মসজিদের কাছাকাছি এসে বৃদ্ধ ঠিক করেন, আজ তিনি দাওয়াতটায় যাবেন না। শুধু তাই নয়, যতদিন এই অলক্ষুণে ভাইরাস দেশ থেকে বিদায় না হচ্ছে, তিনি কোনো গ্যাদারিংয়েই শরিক হবেন না। ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরি হয়ে গেছে; একটা ফার্মেসিও খোলা নেই। আজকে এতো আগেই সব বন্ধ হয়ে গেল? ওষুধ সব শেষ? সাপ্লাই আসবে না?

বুকের মধ্যে খামচেধরা ব্যথাটা তীব্র হয়। হঠাৎ বৃদ্ধ আবিষ্কার করেন, তাঁর নিশ্বাস নিতে কেমন যেন কষ্ট হচ্ছে। ব্যথাটা ছড়িয়ে পড়ছে গলায়, চোয়ালে, ঘাড়ে …

এদিকে যুবকের পা দুটো যন্ত্রের মতো ঘুরতে থাকলেও মনটা থাকে অন্য কোনো আবর্তে। নিজের কলিজার ভেতর সে হাতড়ে বেড়ায়, কী যেন নেই, ঘরে ভাত নেই, ঘরে কে যেন নেই, নেই  …  আচ্ছা, না-থাকা মানুষগুলো কোথায় থাকে? সেখানে কি মেইন রোড আছে? রিকশা দিয়ে যাওয়া যায়? যাওয়া গেলে সে শুধু একটা বার একজনকে বলে আসতে চায়, ‘বাপ্পা, ভালো থাইকো। ভালো থাইকো রে বাপ্পা।’

গোঙানির শব্দে যুবক চমকে ওঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, অল্প পানিতে খইলসা মাছ যেভাবে খাবি খায়, রিকশার সিটে বৃদ্ধ সেভাবে খাবি খাচ্ছেন।

হার্ট অ্যাটাক কী জিনিস সে জানে না, তার ওপর অসুখ বলতে এখন একটাই – যুবক তাই ভীষণ ভয় পায়। করোনা! রে করোনা! এই রোগটা কি তাকে কোনোদিন রেহাই দেবে না? চিন্তাটা শেষ হওয়ার আগেই বৃদ্ধ সিট থেকে প্রায় পড়ে যান। অজস্র কুচকুচে কালো ঘামের বিন্দু দিয়ে গড়া রাস্তাটায় আছড়ে পড়ার আগেই যুবক তাঁকে ধরে ফেলে।

লোকটার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। যুবক তবু কান পেতে বোঝার চেষ্টা করে। ‘আপ্নের নাম কী? বাসার ফোন নম্বর মনে করতে পারবেন?’

ততক্ষণে বৃদ্ধের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। হাঁসফাঁস করতে করতে তার দুই চোখ দিয়ে স্মৃতি বা অশ্রু ঝরতে থাকে। যুবক চোখে অন্ধকার দেখে – কাছেই হাসপাতাল, কিন্তু পথে ব্যারিকেড দেওয়া। ঘুরে যেতে হবে। তার ওপর হাসপাতালে হাজার হাজার রোগী। কোনো লাভ হবে গিয়ে? গেলেও কি করোনা ভাইরাসের রোগী নিয়ে ঢুকতে দেবে? আদৌ কি লোকটা এতোক্ষণ বাঁচবে?

হুডের সঙ্গে বৃদ্ধকে বেঁধে রেখে সে কাঁপতে কাঁপতে রিকশা চালানো শুরু করে। এমন সময় খুব অদ্ভুত একটা জিনিস হয়। যুবকের দৃষ্টি কেমন যেন ডাবল হয়ে যায়। স্পষ্ট চোখে সে রাস্তা দেখে, আবার সেই সঙ্গে তার দৃষ্টির সীমানায় খুব প্রিয় একটা মুখ জ্বলজ্বল করতে থাকে। যে-মানুষটাকে কখনো বলাই হয়নি সে তার কতটা প্রিয়।

মানুষটা তাকে দেখে কিছু বলে না, শুধু মুখ টিপে হাসে। বছরে একবার নতুন জামা পেলে যেমন করে হাসত।

শিরদাঁড়া সটান করে যুবক প্রাণপণে প্যাডেল মারা শুরু করে। আজ সে জান দিয়ে দেবে; কিন্তু করোনার কাছে হারবে না।

পাঁচ

রিকশার চাকা ঘোরে।

এপ্রিলের শুরু থেকেই কোয়ারেন্টাইন সেন্টারগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ঊনসত্তর জন, মারা গেছেন আটজন। কিন্তু এসব পরিসংখ্যান কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। তার ওপর অন্যান্য দেশের অবস্থা দেখে সন্দেহ জাগাটাই স্বাভাবিক।

করোনার তাণ্ডবে ভারতে হিন্দু-মুসলমান রায়ট বন্ধ হয়ে গেছে। সংক্রমণের ভয়ে পাকিস্তান আর্মি রাতের অন্ধকারে কাশ্মিরে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করে পালিয়ে গেছে। খোদ আমেরিকায় আক্রান্ত দুই লক্ষাধিক মানুষ। চীন বাদে সবার একই আফসোস – ইস্, আরেকটু আগে যদি সতর্ক হওয়া যেত! আর এখন? যেখানে শ্বাস, সেখানেই বাঁশ। সোনার বাংলায় স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়নি, পহেলা বৈশাখ-ফৈশাখ তো কোন ছাড়। কে জানে সেজন্যই কি না এপ্রিল যেন শেষই হচ্ছে না।

‘মে, তবে কি তুমি আর আসবে না?’

‘করোনা তুমি কি কষ্টে আছ?’

(ফেসবুকের মরমি কবিদের কিছু অনুভূতি)

বর্ষাশেষে যোগ-বিয়োগ করে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে ক্ষুধায়। লাশের সাপ্লাই বেড়ে যাওয়ায় কবরস্থানগুলো গণকবরের জন্য বিভিন্ন প্যাকেজ অফার করা শুরু করে। বন্যার কারণে সংকট আরো তীব্র হয়। কেউ বলে, গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ বলে, রাজধানীর অবস্থাই বেশি খারাপ। বিস্ময়, অভিমান এবং হতাশার সঙ্গে সরকার উপলব্ধি করে, গুজব জিনিসটাকে কোনোভাবেই দমানো যায় না।

বহুল আলোচিত রামপাল প্ল্যান্ট দখল করে নেয় রাজকীয় বাঘ, ঢুলুঢুলু চোখের কুমির আর ঘের-পালানো নীলচে-বেগুনি রঙের চিংড়ি। সামাজিক দূরত্বের কারণে ধর্ষণ, শিশুধর্ষণ ও গণধর্ষণ যথাক্রমে ৫৭, ১২ এবং ৯২ শতাংশ হ্রাস পায়। অনেক বছর পর ঢাকার আকাশে শকুন ওড়ে। হাইওয়েতে ফাঁকা রাস্তা পেয়েও ট্রাক ড্রাইভাররা মন খারাপ করে একজন আরেকজনকে ওভারটেক করে। তাতে খুব একটা লাভ হয় না, বিশ্ব সড়ক দুর্ঘটনা চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে আমরা ক্রমেই নামতে থাকি।

প্রায়ই নগরবাসীকে হাঁ করে তালাবন্দি কাজের মেয়েদের মতো জানালার গ্রিল ধরে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। কতক্ষণ আর অনলাইন জীবন ভালো লাগে? তাদের দেখতে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় কোত্থেকে যেন বানরের দল এসে হাজির হয়। দূর থেকে বানরগুলো নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করে, মাঝেমধ্যে ঝুলন্ত মানুষগুলোর দিকে বাদাম ছুড়ে মারে। সেই বাদাম পেয়ে কেউ কেউ মাইন্ড করে, কেউ কেউ গপগপ করে খায়।

পাহাড় কাটা বন্ধ থাকায় জুমচাষিদের বাম্পার ফলন হয়। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ছাদকৃষি। রমজান মাসে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বেগুনি বেশ জনপ্রিয় হয়। ঈদের জামাত বাতিল হলেও চাঁদরাত পর্যন্ত মার্কেট ঠিকই খোলা থাকে। পূজার সিজনে মন্দিরের প্রতিমা অক্ষত থাকে – মালো দেবীগুলো যেই নোংরা, একটা হাতেও গ্লাভস পরে না। কে যাবে করোনার রিস্ক নিয়ে ভাঙতে?

একসময় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা কর্মকর্তারা ইন্টারনেট এক্সপার্ট হয়ে পেপ্যালে ঘুষ নেওয়া শুরু করেন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনীতিবিদরা সোশাল মিডিয়ায় নিয়মিত আপডেট দেন। অখণ্ড অবসর পেয়ে সবারই কম-বেশি বিবর্তন হয়, শুধু লেখকরা ছাড়া। তারা রবীন্দ্রনাথ, মার্কস, মানিক, জীবনানন্দ, ইলিয়াস, কাফকা, মার্কেজ, জয়েস্, একটু নজরুল, একটু ইসলাম এবং সেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকেন। সেই দুঃখে বা হিংসায় এক উঠতি লেখক তার ফেসবুক ওয়ালে লেখে – ‘বাংলা সাহিত্য যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই আছে।’ তখন ভদ্রতা করে এক প্রকাশক তার ভুল শুধরে দেন – ‘আমাদের সাহিত্য তমসাচ্ছন্ন না, নিশাচর।’

মোটের ওপর জীবন যেন অদৃশ্য একটা রেলস্টেশনে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। কিসের অপেক্ষা, কেন অপেক্ষা, কেউ বলতে পারে না।

তাই বলে একদমই যে শুকনা কাটে সময়টা, তা নয়। কিছু সাড়া জাগানো ঘটনায় মাঝে মধ্যে জীবনে যাত্রার পরশ লাগে। ‘মুভমেন্ট’ অর্থে যাত্রা না, যাত্রাপালা অর্থে। এর মধ্যেও কিছু উন্মাদ কীভাবে কীভাবে যেন মলম পার্টির খপ্পরে পড়ে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে পুলিশ বাহিনীকে টিয়ার গ্যাসের শেল মেরে বসুন্ধরা সিটির ফুড কোর্ট বন্ধ করাতে হয়। শহরে গুজব ছড়ায় করোনা হলে নাকি আর মশা কামড়ায় না; সেই সুযোগে ডেঙ্গুর হাত ধরে চিকনগুনিয়া, নিউমোনিয়া, চিকেন পক্স আর টাইফয়েডে দেশটা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। মহাসমারোহে কোরবানির হাট বসে; হাসিলের দাম ঠিক হওয়ার আগেই করোনার আতঙ্কে গরুগুলো হাম্বা হাম্বা করতে করতে নিজেদের পেশাব চাটা শুরু করে এবং সঙ্গে সঙ্গে ম্যাড কাউ ডিজিজে মারা যায়।

আস্তে আস্তে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে। একদিন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা এক মহিলাকে কাঁদতে কাঁদতে তার বাবার কবরে এক তোড়া রজনীগন্ধা রাখতে দেখা যায়।

অতঃপর সেখান থেকে ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’ গাইতে গাইতে সে বঙ্গোপসাগরের দিকে চলে যায়। সংকট কবে কাটবে, বা কেটে গেছে, বা আদৌ এটা সর্দি-জ্বরের চেয়ে সিরিয়াস কিছু কি না – সেসব ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে এ-ব্যাপারে সতেরো কোটি সদস্যের একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে।

যথারীতি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একদিন দৌলতদিয়া থেকে ভেসে আসা দুজন পতিতা চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খাচ্ছিল। এই জাতীয় মানুষের নাম থাকা-না-থাকায় যেহেতু কারো কিছু যায়-আসে না, তাই ধরে নিচ্ছি তাদের নাম ১ আর ২।

দোকানের ধুলাজমা টিভির পর্দায় টক শো চলছে। ১-২ সেটা হাঁ করে গেলে, যেন বাংলা সিনেমা দেখছে।

আলোচনার তাপমাত্রা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। এক বক্তা অনর্গল ব্যাখ্যা করেন, এই সরকারের দক্ষতার কারণেই জাতি আজ করোনামুক্ত। অন্য বক্তা একই সময়ে বলতে থাকেন, তারা সরকারে থাকলে অনেক আগেই রোগটা বাপ বাপ বলে দেশ থেকে বিদায় হতো। মাথার ওপর বুড়া সিলিং ফ্যানটা হেলেদুলে বাতাসে চক্কর কাটে। ২-কে দেখে ১ চোখ টিপে হাসে, তারপর ১-২ মিলে কী যেন ফিসফিস করে খিলখিল করে হেসে ওঠে।

সেটা দেখে দোকানদার খ্যাচখ্যাচ করতে করতে তাদের দিকে একটা সিগারেটের নিতম্ব ছুড়ে মারে। মেয়ে দুটো চুপ করে; কিন্তু তাদের সেই নীরবতা সাময়িক। এক পর্যায়ে বক্তারা ইতিহাস নিয়ে টানাটানি শুরু করে। তখনো ১-২ হাসিটাকে সামলে রেখেছিল। আলোচনার ট্রেন যখন আগামী নির্বাচন হয়ে মানবাধিকারের দিকে যায় তখন তাদের আর কিছু করার থাকে না।

প্রথমে মুখে আঁচল চেপে খিলখিল হাসি, তারপর অট্টহাসি, তারপর হাসতে হাসতে ১-২ চেয়ার থেকে পড়ে যায়।

তাদের কাজলঘন চোখ দিয়ে আনন্দের বান নামে। চায়ের ধোঁয়ায় ভাসতে থাকা দোকানটা বাস্তবে আছাড় খেয়ে বোকার মতো তাকায়। দোকানদারটা অসহায়ভাবে গালাগালি করতে থাকে। বুড়া সিলিং ফ্যানটা মাথার ওপর তখনো হেলেদুলে চক্কর কাটতে থাকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য হাসিটা শহরের আনাচে-কানাচে প্রকম্পিত হয়, কিন্তু কেউ সেটা শুনল না। সেই বিদগ্ধ সর্বগ্রাসী হাসি ফাল্গুনের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারত; কিন্তু সেরকম কিছুও শেষ পর্যন্ত ঘটল না।

Leave a Reply