‘নারীরা ভাস্কর্য নির্মাণের যোগ্য নয়, তাদের উচিত চিত্রকলার চর্চা করা’ – এমনটা অনেকেই বিশ্বাস করলেও সেই বিশ্বাসকে অনেক ক্ষেত্রে শিল্পীরা তাঁদের প্রতিভা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে মিথ্যা প্রমাণিত করেছেন। লুইস বোর্জোয়ার নাম আমরা স্মরণ করতে পারি। নির্ভীক এই শিল্পী তাঁর দীর্ঘ জীবন শিল্পকলার আরাধনায় ব্যয় করেছিলেন। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আহরণ করা প্রজ্ঞা আর নান্দনিকতার সমন্বয়ে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন অসংখ্য অভূতপূর্ব শিল্পকর্ম, যেগুলো তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি মূলত তাঁর বিমূর্ত এবং মনোজাগতিক ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত। দানবীয় মাকড়সার ভাস্কর্যের জন্য তিনি সুপরিচিত হলেও চিত্রকলা ও ছাপচিত্রের মাধ্যমে তাঁর শিল্পীজীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাঁর সামগ্রিক শিল্পচর্চাকে আত্মজীবনীমূলক বলা যেতে পারে, যা খুব প্রকটভাবে যৌনতা এবং মানব-মানবীর সম্পর্কের জটিলতার কথা বলে। লুইস নিজেকে বিচক্ষণ ‘নারীবাদী শিল্পী’ বলে গণ্য করতেন।

লুইস অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। একই সঙ্গে ইস্পাতের মতো কঠিন এবং ফুলের মতো ঋজু ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। শীর্ণকায়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ কিন্তু শক্ত হাত দুটো সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, মুখে অজস্র বলিরেখা, তাঁর সৌন্দর্য এবং অভিজ্ঞতার সাক্ষী। জীবনের শেষ সময়গুলোতে তাঁর কর্মোদ্দীপনাও তরুণদের থেকে শতগুণ বেশি ছিল। ফরাসি-আমেরিকান এই শিল্পী ১৯১১ সালে প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০১০ সালে মৃত্যুর পূর্বে দীর্ঘ একটি সময় মূলত তিনি নিউইয়র্কে কাটিয়েছেন। শিক্ষার পথ পরিবর্তন করে তিনি গণিত থেকে শিল্পকলায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং শিল্পী হিসেবে সফলতা অর্জন করেন। ফ্রান্সে তাঁর পরিবার পারিবারিক একটি ব্যবসা পরিচালনা করত – তাঁত শিল্পসঞ্জীবনী, মেরামত বা সংরক্ষণের কাজ। সেই কাজে মেরামতের জন্য প্রায়ই লুইস নষ্ট হয়ে যাওয়া বা ক্ষয়ে যাওয়া তাঁতের শূন্যস্থানগুলো পুনরায় অংকন করতেন। তিনি প্যারিসেই শিল্পকলায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত অনেক শিল্পীর কাছ থেকেও শিল্পকলার শিক্ষা নেন। প্রায়ই তিনি দোভাষী হিসেবে কাজ করার বিনিময়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে নিয়েছিলেন। প্যারিসের ল্যুভ মিউজিয়ামে গাইড হিসেবেও তিনি বেশ কিছুদিন চাকরি করেন। শিক্ষাপর্ব শেষে তিনি বাবার দোকান ও প্রদর্শনশালার পাশে প্রিন্টের বা ছাপচিত্রের একটি দোকান পরিচালনা শুরু করেন নিজেই। সেখানেই তাঁর ভবিষ্যৎ স্বামী ক্রেতা হিসেবে আসতেন; তিনি ছিলেন শিল্পকলা ইতিহাসের শিক্ষক রবার্ট গোল্ডওয়াটার। লুইস ১৯৩৮ সালে স্বামীর সঙ্গে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান। সে-সময়ে নিউইয়র্ক ছিল শিল্পকলা চর্চার জন্য উপযুক্ত স্থান – শিল্পকলার পুণ্যভূমি। তখন অস্থির ইউরোপ ছেড়ে বিখ্যাত শিল্পীরা নিউইয়র্কে তাঁদের সৃজনশীলতার প্রত্যয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।

লুইসের মা তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো ছিলেন। ভাইবোনদের মধ্যে লুইস ছিলেন সবার বড়। স্প্যানিশ ফ্লুতে তাঁর মা আক্রান্ত হওয়ার পর সেই অসুস্থতা থেকে আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। বাবা ছেলেমেয়ের ইংরেজি শিক্ষার জন্য একজন বিলেতি গভর্নেন্স নিয়োগ করেছিলেন। একপর্যায়ে শিল্পীর বাবা সেই গৃহশিক্ষিকার সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। স্পষ্টতই লুইসের মায়ের সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ক ছিল বেশ অমসৃণ। বাবার প্রতি একটি বিরাগ তিনি আজীবন পোষণ করেছেন। তাঁর বহু সাক্ষাৎকার এবং লেখায় তিনি তাঁর বাবাকে বিকৃত মানসিকতার একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। লুইসের মা যতটা সহজে তাঁর বাবার অন্য সম্পর্কটিকে মেনে নিয়েছিলেন, বয়ঃসন্ধিকাল অতিক্রম করা আবেগপ্রবণ লুইস তা কখনোই মেনে নিতে পারেননি। পারিবারিক এই নাটকীয়তাগুলো তিনি তাঁর শিল্পকর্মে প্রকাশ করেছিলেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। দীর্ঘ দশ বছর অসুস্থতার পর যখন তাঁর মা মারা যান, সেসময় লুইস মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, এমনকি আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলেন। জীবনের এই হতাশ মুহূর্তে তাঁকে উদ্ধার করেছিল তাঁর নিজের সৃজনশীলতা – শৈল্পিক অভিব্যক্তিগুলো তাঁর জীবনের কঠোর মুহূর্তগুলোকে মূর্তমান করেছিল। এমনকি তাঁর বাবার মৃত্যুও তাঁকে পীড়িত করেছিল। কারণ লুইস ছিলেন সেই নিষ্পাপ শিশুর মতো যার মনে জীবনের কষ্টগুলো অমোচনীয় চিহ্ন রেখে যায়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এই অন্ধকার কূপ থেকেই তিনি মুক্তি খুঁজেছিলেন তাঁর অকপট শিল্পকর্মে।

ভাস্কর কামিল ক্লদেলের এবং লুইসের জীবনের মধ্যে যেমন কিছু পার্থক্য ছিল, তেমনি ছিল স্বল্পমাত্রায় সাদৃশ্য। কামিল বাবার সম্পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছিলেন, লুইসের জীবনে যা ছিল অনুপস্থিত। লুইসের মা ছিলেন লুইসের প্রিয় আর কামিলের মা কামিলের দুঃসহ নিয়তির লেখক। তবে তাঁরা দুজনেই ছিলেন একরোখা এবং সন্দেহপ্রবণ। দুজনেই সৃষ্টি ও ধ্বংসে সমান পারদর্শী; কিন্তু এই দুই শিল্পী শিল্পকলার জগৎকে করেছেন ঋদ্ধ। আমরা এই দুই গুণী শিল্পীর কাছে ঋণী।

লুইস প্রথাগত উপাদানের সঙ্গে সমসাময়িক উপাদান, যেমন কাঠ, ইস্পাত, কংক্রিট, রাবার, কাপড়, পাথর, ব্রোঞ্জ ইত্যাদির সংমিশ্রণে ভাস্কর্য সৃষ্টি করতেন। জীবনসায়াহ্নে শিল্প সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে যুক্ত হয়েছিল তাঁর নিজের ব্যবহৃত কাপড়। কাপড়ের নরম ভাস্কর্য সৃষ্টিতে তাঁর বিশেষ সুনাম রয়েছে। সূচিকর্মের বেশকিছু কাজ তিনি করেছিলেন। সেগুলোয় অপ্রতিসম আকারে স্তন কিংবা একাধিক স্তনসহ কোনো প্রাণীর শরীর, গর্ভবতী নারী, জরায়ু- প্রকোষ্ঠে শিশু কিংবা নারী-পুরুষের যৌনাঙ্গ ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। বোর্জোয়া প্রায়ই তাঁর সৃষ্ট ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলতেন অথবা রং পরিবর্তন করে আবার নতুন রূপ দিতেন। এই স্ব-সৃষ্টি ধ্বংস করার প্রক্রিয়াটি তাঁর সৃষ্টি প্রক্রিয়ারই অংশ ছিল। প্রায়ই শব্দ আর অক্ষর ব্যবহার করে কবিতাও লিখতেন।

ত্রিশের দশকে পরাবাস্তব ভাস্কর আর শিল্পীরা – যেমন জোয়ান মিরো, জ্যাঁ আর্প – তাঁদের সৃষ্টিতে বিমূর্ত সেই রূপগুলো সৃষ্টি করতে শুরু করেছিলেন, পরবর্তীকালে যে-প্রচেষ্টাটি ‘বায়োমরফিজম’ নামে পরিচিত হয়েছিল। হেনরি মুর এবং বারবারা হেপওয়ার্থের মতো লুইস বোর্জোয়াও কিছু অসাধারণ ও স্মরণীয় বায়োমরফ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বায়োমরফটি ১৯৯৯ সালে তিনি সৃষ্টি করেন ব্রোঞ্জ, ইস্পাত এবং মার্বেল ব্যবহার করে। সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাকড়সা আকৃতির ত্রিশ ফুট উঁচু এই ভাস্কর্য – মামঁ (ফরাসি ভাষায় যে-শব্দের অর্থ মা)। সেটি সৃষ্টি করেছিলেন লন্ডনের টেট মডার্ন গ্যালারির জন্য, ২০০০ সালে প্রথম ইউনিলিভার সিরিজের কমিশন হিসেবে। মাকড়সার ধারণাটিতে তিনি প্রায়ই ফিরে এসেছেন; প্রথমে ১৯৪৭ সালের একটি চারকোল ড্রইং, পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে স্পাইডার নামে একটি ভাস্কর্যও তিনি সৃষ্টি করেন।

মামঁ মূলত মায়ের জন্য এক কন্যার স্তবগাথা। মাকড়সারূপী মামঁ বোর্জোয়ার মা জোসেফাইনের কথা বলেছে, বুনন, প্রতিপালন আর সুরক্ষার রূপক হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, ‘মাকড়সার মতো আমার মাও ছিলেন একজন বুননশিল্পী – মাকড়সার মতোই আমার মা ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতী। মাকড়সার উপস্থিতি আমাদের জন্য উপকারী, কারণ তারা মশা খেয়ে ফেলে, আর আমরা জানি

মশা রোগ ছড়ায়, আর সে-কারণেই অবাঞ্ছিত। সুতরাং মাকড়সা আমাদের সহায়তা করে … আমাদের সুরক্ষা দেয়, ঠিক আমার মায়ের মতো।’ মাকড়সা মানুষের বন্ধু এবং উপকারী প্রাণী। মাকড়সা মশার ডিম খেয়ে ফেলে। মশা মানুষকে কামড়ায়, রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটায়। মাকড়সা তা করে না। কেউ যদি মাকড়সার জাল ভেঙে দেয় মাকড়সা কোনো প্রতিবাদ করে না, রেগে গিয়ে কামড়ে দেয় না। সে আবার জাল বুনতে শুরু করে, সে তার ডিমকে রক্ষা করে। তার আট পায়ের ওপর ভর করা শরীরে সেই ডিম বয়ে নিয়ে চলে। লুইস ভাবতেন, তাঁর মাও সেই মাকড়সার মতো। তাঁদের আগলে রাখতেন অথবা লুইস নিজেকেই সেই মাকড়সারূপে দেখিয়েছেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন মা, নিজের দুই পুত্র ছাড়াও আরেক পুত্র দত্তক নিয়েছিলেন। দত্তক পুত্রের মৃত্যু তাঁকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছিল।

লুইসের শিল্পচর্চার মূল বিষয়বস্তু নারীজীবনের নানা কথকতা; কিন্তু তিনি একজন পুরুষের মতো শক্তিশালী ব্যক্তিত্বধারী ছিলেন। লুইস বোর্জোয়া নামেই বোর্জোয়া, তিনি মূলত বুর্জোয়া স্বভাবের নন। তিনি একরোখা ও বদমেজাজি হলেও তাঁর হৃদয় ছিল মাতৃস্নেহে পরিপূর্ণ। তাঁর সৃষ্টিতে বহুমাত্রিক মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা পৌনঃপুনিক একটি বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কন্যা হিসেবে তাঁর নিজের মায়ের সঙ্গে, একজন মা হিসেবে তাঁর নিজের পুত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা তাঁর শৈল্পিক অভিব্যক্তির মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল।

মূলত আত্মজৈবনিক হওয়ার কারণে শৈল্পিক সৃষ্টির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় এবং অতিপ্রজ। তিনি তাঁর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের অনেক চিত্র এঁকেছেন, তবে সবচেয়ে গভীর যে-ক্ষতটি তাঁকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছিল সেটি ছিল বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপড়েন, যার ভিত্তিতে ছিল বেশ জটিল আর অস্বস্তিকর কিছু ঘটনা। স্থাপনাশিল্প, চিত্রকলা এবং ছাপচিত্রে সমান পারদর্শী – তাঁর শিল্পকলাকে বিমূর্ত-অভিব্যক্তিময় বলে বিবেচনা করা গেলেও, তাঁর বিষয়বস্তু বা শৈলীকে পরাবাস্তব বলা যায়, কিংবা তিনি নিজেকে নারীবাদী শিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন বেশি।

লুইস শেষজীবনে এসে যে ভাস্কর্যটি সৃষ্টি করেছেন, তাতে তাঁর কাজ যেন সম্পূর্ণ মনে হয়, পৃথিবীর বিখ্যাত সংগ্রহশালাগুলোর সামনে শোভা পায় তাঁর এই বিরাটাকার ভাস্কর্যটি। লুইসের লম্বা পায়ের এই মাকড়সাগুলো দেখলে মনে হয় রূপকথার কোনো প্রাণী বা মনে হয় সায়েন্স ফিকশনের কোনো কাল্পনিক চরিত্র। অজস্র জলরং করেছেন লুইস। তাঁর মতো ক্রমাগতভাবে কাজ করে যাওয়া বা সৃষ্টি করে যাওয়া শিল্পীজীবন বেশ বিরল। তিনি একটি শিল্পকর্ম শেষ করলেই অন্যটি শুরু করতেন এবং আগেরটির প্রতি খুব দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন।

 শিল্পী হিসেবে ব্যাপক স্বীকৃতি আসতে শুরু করেছিল তাঁর জীবনে সপ্তম দশকে। লুইসের কথা বললে যে-মানুষটির কথা না বললেই নয় তিনি হলেন তাঁর সহকারী জেরি গরোভয়। জেরির সঙ্গে লুইসের দেখা হয় ১৯৮০ সালের দিকে, তখন লুইসের বয়স সত্তর বছর এবং সবেমাত্র বিখ্যাত হতে শুরু করেছেন। সেই থেকে আজ অবধি জেরি লুইসের সব শিল্পকর্ম দেখাশোনা করছেন। লুইস  সবসময় তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে সংশয়ে থাকতেন, তিনি প্রদর্শনীর জন্য শিল্পকর্ম জমা দিয়েও ফেরত চাইতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তিনি একক প্রদর্শনীর আয়োজন করেও বাতিল করে দিতেন, কারণ তিনি সাহস করে উঠতে পারতেন না, অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করার পর থেকে এই সমস্যাগুলো জেরি দেখাশোনা ও তদারকি করতেন। ফলে আমরা আজ লুইসের অসংখ্য প্রদর্শনী দেখতে পারছি। এছাড়া তিনি কবিতা এবং নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন; যেখানে আমরা খুব সংবেদনশীল, প্রায়শ উৎকণ্ঠিত, শঙ্কিত আর নিরাপত্তাহীনতা আক্রান্ত একজন লুইসকে খুঁজে পাই।

 লুইস বোর্জোয়া শিল্পকলার ইতিহাসের অনন্যসাধারণ একটি অধ্যায়। তাঁর শিল্পকলায় তিনি ধ্রুপদী শৈলীর সঙ্গে আধুনিক শৈলীর সঙ্গম ঘটাতে সফল হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আধুনিক শিল্পীদের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। সমসাময়িক ব্রিটিশ শিল্পী ট্রেসি এমিনের সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রদর্শনী করেছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যুর পর প্রদর্শনীটি উদ্বোধন হওয়াতে তা আর দেখে যেতে পারেননি।

লুইসের কাজের মাধ্যমে আমরা তাঁর জীবন সম্পর্কে জানতে পারলেও তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেননি। তিনি ছিলেন রহস্যে ঘেরা একজন মানুষ – অত্যন্ত ভঙ্গুর ও নাজুক। আজীবন তিনি মনোবিশ্লেষণ করেছেন। মনোবিজ্ঞান নিয়ে অগাধ আগ্রহ তাঁর শিল্পচর্চাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। যেহেতু তাঁর সঙ্গে মায়ের সখ্য ছিল গভীর, তাই মায়ের মৃত্যুতে সেই শূন্যস্থান তিনি পূরণ করতে শিল্পকলার চর্চা করে গেছেন। আজীবন তাঁর সেই মাতৃবিয়োগের কষ্টের ওপরে বাবার ধোকা, সেই বয়ঃসন্ধিতে তিনি সহ্য করতে পারেননি। সেই মনোযন্ত্রণা তিনি সবসময়ই ভোগ করেছেন, সেই আগুনে পুড়েছেন এবং সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁর শিল্পকলা নিয়ে একবার বলেছিলেন  – ‘আমি আমার নিজের কষ্ট এবং স্মৃতির কারাগারে বন্দি। আমার শিল্পকলার উদ্দেশ্য হলো এর থেকে মুক্তি পাওয়া। এভাবেই আমি আমার ঋণ শোধ করতে পারব অতীতের কাছে এবং আমি মুক্ত হতে পারব।’

Leave a Reply