মোবাশ্বির আলম মজুমদার ছবি আঁকেন, ছবি নিয়ে লেখেন এবং ছোটদের ছবি আঁকা শেখান। গাছপালা, লতাগুল্ম, পাহাড়-জলাধার জড়ানো প্রকৃতির প্রতি তাঁর মনের টান অসীম।
তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে আশির দশকে ভর্তি হয়ে শিল্পে পাঠ নিয়ে কর্মসূত্রে ঢাকায় এসে থিতু হয়েছেন। প্রথম একক প্রদর্শনী করেছিলেন দূর ছাত্রজীবনে।
বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের শিল্পদীক্ষা দিতে দিতে প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্য ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে তিনি এক দীর্ঘ যাত্রায় নামেন। খেলাচ্ছলে কাগজে আঁক কষতে কষতে, দাগ ঘষতে ঘষতে দীর্ঘদিনে শিল্পীর নিজের সঙ্গে নিজের যে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, সেই থেকে মোবাশ্বির এসব কাজ করেছেন এবং সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন। এরকম কিছু কাজ নিয়েই সম্প্রতি তাঁর দ্বিতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন। প্রদর্শনীর নাম রেখেছেন ‘ও মৃত্যু ও নৃত্য’।
গত ৬ই মে ঢাকার বাংলা মোটর এলাকায় অবস্থিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী এমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী। মোবাশ্বিরের শিক্ষক, শিল্পী ও শিল্পলেখক চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক আবুল মনসুর এবং গবেষক ও শিল্প-সমালোচক সৈয়দ আজিজুল হক মোবাশ্বিরের কাজ নিয়ে কথা বলেন।
শিল্পী শুধু জেলপেন ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সাদা-কালো ও রঙিন চিত্রের যে সমাহার ঘটিয়েছেন তাতে চিত্রতলকে পুরোপুরি ভরাট করেছেন অল্পসংখ্যক চিত্রে। অধিকাংশ চিত্রতলেই কাগজে নেগেটিভ স্পেসের প্রাধান্য। তবে পুষ্প ও বিহঙ্গ নিয়ে রেখার খেলা যেমন আছে তাঁর কাজে, তেমনই চিত্রতলে পজিটিভ পরিসরে ফুলের পরাগ-রেণু ও তার প্রজনন সম্ভাবনার আলো-বাতাসও যেন দৃশ্যমান করেছেন শিল্পী।
‘মোবাশ্বিরের চিত্রকর্ম : হৃদয়দহন’ শিরোনামে সৈয়দ আজিজুল হক প্রদর্শনীর ব্রোশিওরে লিখেছেন –
শিল্পী যতটা পেরেছেন পরিচিত অবয়বকে স্বচ্ছ করার চেষ্টা থেকে বিরত থেকেছেন। মৃত্যু আর নৃত্যের মধ্যেকার কাব্যিক সংশ্লেষকে রূপায়িত করার কোনো গোপন অভিসন্ধি হয়তো কোনো কোনো চিত্রতলকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। নূপুরপরিহিত পা আর উদ্যত হাতের ভঙ্গিমায় সেটি কোনো কোনো চিত্রকে করেছে রাগরঞ্জিত, গতিশীল। আবার ছুরি-কাঁচির সুস্পষ্ট রূপকল্পে অতীতের রক্তাক্ত স্মৃতি বর্তমানের আবহে হতাশা আর অস্থিরতার দাপটে কোনো কোনো চিত্রতল হয়ে উঠেছে ভয়ংকরভাবে উদ্বেল-উৎকণ্ঠায় আবিল। এরই অনুষঙ্গে এসেছে রাজা-চরিত্রের রূপক, যা ক্ষমতা, ক্ষমতা-দম্ভ, স্বেচ্ছাচার আর স্বৈরতন্ত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর বিরচন কৌশলের মধ্যে আছে নানা ফর্ম, মোটিফ আর রূপকল্পের এক ঘন সন্নিবদ্ধ জমাট-বাঁধা রূপ, যা কখনো কখনো ভয়াল আতংকগ্রস্ত অনিশ্চিত পরিবেশের দ্যোতক হয়ে ওঠে।
এই ব্রোশিওরে কবি জাফর আহমদ রাশেদ ও শাহীনুর রহমানও তাঁদের বন্ধু মোবাশ্বির আলম মজুমদারকে নিয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন তাঁদের লেখায়।
প্রদর্শনীর ছবিগুলি দেখতে দেখতে মনে মনে এই প্রশ্নের উদয় হয় – ‘ও মৃত্যু ও নৃত্য’ শিরোনামটি কেন বেছে নিয়েছেন শিল্পী? এক্ষেত্রে রাশেদের লেখার শিরোনাম – ‘হাসতে হাসতে বাঁচি নাচতে নাচতে মরি’ বেশ প্রণিধানযোগ্য। তাঁরা দুজন ছাত্রজীবন থেকে সহপাঠী ও বন্ধু। রাশেদ লেখেন, মোবাশ্বির ছবি আঁকেন, দুজনই আড্ডা দেন। তাঁদের আড্ডায় অন্যরাও থাকেন, তাঁরা শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতির আলাপ-সমালোচনাকালে হাসেন, চিৎকার করেন, নাচেন, রাত করে বাড়ি ফেরেন, কেউ আবার ফেরেন না, আড্ডার বন্ধুদের কেউ কেউ মারাও গেছেন। জীবনের এসব নানা দিক নিয়েই শিল্পীর প্রদর্শনীর এই শিরোনাম। এবং সব চিত্রকর্মের একই নাম! একের পর এক ছবি দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, শিল্পী যেন রেখার বুননে রূপসাগরে ডুব দিয়েছেন! অসংখ্য দাগ দিয়ে ডাক দিয়েছেন সুন্দরকে। এর সঙ্গে হঠাৎ আলোর মতো বর্ণিল মায়ার উদ্ভাস শিল্পীর কাজগুলোকে করেছে দৃষ্টিনন্দন।
একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে আমি মনে করি – কালি ও কলম মাধ্যমে চিত্রকর্ম রচনা করার জন্য অনেক নিষ্ঠা এবং ধৈর্য প্রয়োজন। চিত্রনির্মিতিতে শিল্পীর দৃষ্টিশক্তির মায়া ও রেখা প্রয়োগে তাঁর দক্ষতার গভীরতা, অনুপাত, আয়তন এবং শৃঙ্খলা – সবকিছু মিলে যে অনুভূতি তৈরি হয় তা শেষ অবধি সৌন্দর্যবোধ ও রহস্যময়তার সংশ্লেষ।
প্রদর্শনীতে মোবাশ্বির মজুমদারের আঁকা আধা-বিমূর্ত শিল্পকর্মগুলোয় কলমের স্ট্রোক ও তাঁর ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলোর উপর তার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ ও পরিমিতিবোধ বোদ্ধা দর্শকদের চোখ ও মনের তৃষ্ণা মেটায়। শিল্পীর চিত্রিত রেখাগুলো স্পষ্ট, সাহসী এবং শক্তিশালী। অঙ্কনের পেছনে কৌশল এবং উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে একটি নিশ্চিত অনুভূতির বিষয় নিহিত আছে। তবে দিকনির্দেশনা, প্রবাহ, গতি, আকারের অপ্রত্যাশিত বাঁক বা রূপবদল চিত্রকর্মগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলে। এসব রূপ গতিশীল এবং স্থানিক আয়তনের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে, যা অঙ্কনগুলিকে ত্রিমাত্রিক অবয়ব দেয়। আজকের শিল্পজগতে এই ধরনের দৃষ্টিবিভ্রমের গুরুত্ব অনেক বেশি।
রঙের প্রতি শিল্পীর বোধ সহজ-সাবলীল এবং দুর্দান্ত। কালোর সঙ্গে তাঁর অন্যান্য রঙের প্রয়োগ আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। শিল্পীর রেখাঙ্কনে সৃষ্ট প্রাণবন্ত টোনগুলি একধরনের জটিলতা তৈরি করেও হঠাৎ মুক্ত হয়ে যায়! তখন সামগ্রিক অঙ্কনগুলি গভীর এবং প্রশান্তিদায়ক মনে হয়। কখনো কখনো এক-বিন্দু দৃষ্টিকোণে ভবনের ঝলক দেখা যায়, ফুলের নকশায় সজ্জিত, প্রজাপতির ডানার সৌন্দর্য, মানবদেহের আকস্মিক উদ্ভাসে সৃষ্ট রহস্যময়তা যেন রূপকথার গল্পের মায়া সৃষ্টি করে। শিল্পী তাঁর অঙ্কন দিয়ে দর্শককে নানাকিছু নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছেন। উদাহরণস্বরূপ তাঁর আঁকায় দাবার ছক দিয়ে তৈরি রচনাগুলির পেছনে হয়তো রাজনীতির দাবাখেলাকে তিনি প্রতীকায়িত করেছেন।
শিল্পীর সমস্ত চিত্রকর্মের একটি নির্দিষ্ট ভাষা যেমন আছে, তেমনই নানা অভিব্যক্তিতেও বেশ মিল রয়েছে। তবু, বলা বাহুল্য, প্রতিটি চিত্রই একটি থেকে অপরটি আলাদাই।
মোবাশি^র আলম মজুমদারের শিল্পকর্মগুলি অপ্রচলিত এবং সূক্ষ্ম নকশা এবং চিন্তা-উদ্দীপক দৃশ্যের মাধ্যমে কল্পনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার তাঁর ক্ষমতার পরিধিকে প্রমাণ করে। এই একক চিত্রপ্রদর্শনীটি ৬ থেকে ১০ মে পর্যন্ত চলেছে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.