শিল্পের অনন্য সাধক

লেখক:

রফিকুন নবী

চল্লিশের দশকের শেষ নাগাদ (১৯৪৮) ঢাকায় একটি চারুকলা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান স্থাপনে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) এবং নিজেদের সৃষ্টিশীল শিল্পকলাচর্চাকে আন্দোলনে রূপান্তরিত করে দেশের জন্যে যে-চারজন শিল্পী নান্দনিক রুচিবোধ সঞ্চারণের মতো মহৎ কর্ম সাধন করেছিলেন তাঁদের অগ্রতম মহান শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদও চলে গেলেন প্রায় নববই বছর পূর্তির কাছাকাছিতে। তাঁর প্রয়াণে আমরা শিল্পকলা-জগতের সর্বশেষ অভিভাবককে হারালাম। তাঁর এ-শূন্যস্থানটি আর পূরণ হওয়ার নয়।
প্রায় পঁচিশ বছর আগে কাঁচা হাতে তাঁকে নিয়ে একটি লেখা লিখতে হয়েছিল দৈনিক সংবাদে। সে-লেখাটির শেষ বাক্যে শিল্পীর দীর্ঘায়ু কামনা করেছিলাম। সে-আশাবাদের আংশিক পূর্তি ঘটতে পেরেছে বটে, কিন্তু তাঁর কর্মক্ষম শতায়ু প্রাপ্তির দিকটি অপূর্ণই থেকে গেল। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।
কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদক আবুল হাসনাত স্যারকে নিয়ে সে-লেখাটি পুনর্মুদ্রণের ইচ্ছা ব্যক্ত করায় তা খুঁজে বের করা হলো অগাধ কাগজ আর বইপত্রের স্তূপ থেকে। বলা বাহুল্য, লেখাটি জোর করে লিখিয়েছিলেন আবুল হাসনাতই। বহু আগের প্রচেষ্টাপ্রসূত লেখাটি পুনরায় পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করলাম যে, ভাষার দিকটি অতীব নাজুক। যা বলতে চেয়েছিলাম তা তেমন আসেওনি। তবে খুঁটিনাটি তথ্য এবং বক্তব্য স্যারের নিজের দেওয়া। আমার ভালো লাগে ভাবতে যে, পরবর্তীকালে তাঁর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে অনেকেই আমার লেখাকে সহায়ক জ্ঞান করেছেন। লেখার দুরূহ কাজটি কী করে সমাধা করেছিলাম তা একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি এ-সুযোগে।
১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সাংবাদিক-কবি আবুল হাসনাত তখন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতার সম্পাদক। মাসের মাঝামাঝিতে হঠাৎ একদিন অতিকঠিন একটি লেখার বায়না ধরলেন। কঠিন ভাবার কারণ দুটি। প্রথমত, শিল্পকলা এবং শিল্পীদের নিয়ে লেখার মতো হাত মকসোর অভাব, দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত প্রচারবিমুখ এবং মেজাজি শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ স্যারকে নিয়ে লিখতে হবে। শুধু তাই নয়, বড় একটি লেখা তৈরি করতে হবে। আর তা হবে আলাপচারিতা-নির্ভর।
প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও কীভাবে যেন সম্মতও হয়েছিলাম। তবে শর্ত ছিল, যদি স্যারের সম্মতি থাকে তবেই চেষ্টাটি করার। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, তাঁকে নিয়ে লেখা হবে এ-কথা জানার পর নিষেধ তো করবেনই, এমনকি প্রিয় ছাত্রদের একজন হিসেবে যে-আশকারাটুকু পেয়ে থাকি তা নিমেষে বাতিল করে দেবেন।
আবুল হাসনাত অবশ্য নাছোড় ভাব নিয়ে চাপ দিয়েই যাচ্ছিলেন। তাঁর কী করে যেন ধারণা জন্মেছিল যে, স্যার অন্তরে গচ্ছিত দীর্ঘকালের ব্যক্তিজীবন, শিল্পীজীবনের অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বলতে দ্বিধা করবেন না। গল্পচ্ছলে আমি স্যারের প্রায় সাক্ষাৎকার নেওয়ার মতন কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলতে পারব।
অবশেষে একদিন আর্ট কলেজে স্যারের কাছে হাসনাতের কথাটি পাড়লাম। অবাক হলাম জেনে যে, এ-ব্যাপারটি জানেন। হাসনাতের সঙ্গে তাঁর এ-সংক্রান্ত আলাপ-সালাপ হয়েছে। তবে স্যারের পরের বাক্যটি শুনে আনন্দে আমার লেখাটি শুরুর স্পৃহা দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। স্যার বলেছিলেন, ‘আমি হাসনাতকে বলেছি, তুমি হলে ঠিক আছে। আপত্তি নেই।’
এ-কথা শুনে তো পরদিনই শুরু করে দিলাম তাঁর স্বামীবাগের বাসায় যাওয়া। যাওয়ার আগে অবশ্য স্যার কয়েকটি কঠিন শর্ত আরোপ করলেন। টেপ রেকর্ডার নিয়ে যাওয়া যাবে না, নোটবই বা খাতাপত্র নিয়ে কথার মাঝখানে টোকাটুকি চলবে না। প্রশ্ন করাও চলবে না। আর লেখার পর তাঁকে পান্ডুলিপি দেখিয়ে নিতে হবে। এসব শুনে তো অথই জলে পড়ার দশা। কিন্তু তারপরও উদ্যমটিকে ধাতস্থ করে ‘নার্ভাস’চিত্তে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম তাঁর বাসায়। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম সাইমন গার্ফুঙ্কেলের সাউন্ড অব সাইলেন্স ‘এলপি’টি। কয়েকদিন আগেই তিনি এটি শুনতে চেয়েছিলেন।
এরপর তো যাওয়া-আসা শুরু। প্রায় প্রতিদিন বিকেলে গিয়ে হাজির হই, কিন্তু কথা আর এগোয় না। আলুর দম আর লুচি খাওয়া হয়। সংগীত নিয়ে কথা হয়, নতুন কী রেকর্ড বাজারে এসেছে তাও আলাপ হয়। গানের যন্ত্র দিনকে দিন যে বদলে যাচ্ছে দ্রুত, তাতে সাউন্ড সিস্টেমের অসাধারণ উন্নতিতে কতটা গানের গলার মধুরতায় স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে তাও আলাপ হয়। এমনকি তাঁর অতিপ্রিয় বিশালাকার সারমেয় অ্যালসেশিয়ানটিকে নিয়েও কথা হয়। কিন্তু নিজের সম্বন্ধে, নিজের অাঁকাজোখা সম্পর্কে কোনো কথাই বলেন না। জিজ্ঞেস করা নিষেধ, তাই ও-পথও মাড়াই না। সাহসই হয় না ভেবে যে, যদি পুরো ‘মিশন’টিতে যতি টেনে দেন।
অবশেষে দিন সাতেক পর জীবনের নানান স্মৃতির কপাট ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেন। অত্যন্ত ‘সেনসিটিভ’ মানুষ, তায় আবার অতোবড় মাপের শিল্পী, দেখেছি কোনো কোনো পর্যায়ের কথা বলতে গিয়ে ক্রমশ ‘ইমোশনাল’ হয়ে যেতে।
কয়েকদিন পর আমার উপস্থিতিতে নিজের সম্বন্ধে কথা বলার ব্যাপারটি স্যারের গা-সওয়া হয়ে গেলে একসময় তাঁর বিভিন্ন সাফল্যের ডকুমেন্টস আমাদের অনেকেরই অদেখা সব ছবি ড্রইং, ব্যক্তিগত পারিবারিক ফটো ইত্যাদি দেখালেন। আমার সেসব দেখে মনে হয়েছিল, যেন কোনো হীরকখনির মধ্যে প্রবেশ করছি দিনকে দিন। ভালো লেগেছিল তাঁর নিজের সহজ হওয়া দেখে যেমন, তেমনি আমাকেও সহজ করে ফেলা দেখে।
এভাবেই লেখাটির রসদ আহরণ। কোনো টেপ করা নয়, খাতার পাতায় কোনো নোট করা নয়, কোনোরকম জিজ্ঞাসাবাদও ছিল না। নেহায়েত আবেগপ্রবণ কথা শুনে সেসবকে মনে পষিয়ে তবেই লেখায় এগোনো। এ-ব্যাপারে আমার মেধায় কিছু খামতি রয়েছে। একে তো মুখস্থ শক্তির অভাব, সেইসঙ্গে কথার গভীরে প্রবেশের অসমর্থতা। তাতে অনেক ঘটনার বিবরণই হারিয়ে গিয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস। তারপরও লিখেছিলাম এবং আবুল হাসনাত সেই অসম্পূর্ণ এবং কাঁচা ভাবের অনেক বড় হয়ে যাওয়া লেখাটি ধারাবাহিক করে ছেপেছিলেন। স্যার ধৈর্য ধরে সেটি পড়েছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন, ভালো হয়েছে। তাতে আমার ভীত অবস্থাটি কেটেছিল। বলা বাহুল্য, তখন পর্যন্ত এই লেখাটিই স্যারের ব্যাপারে সবচাইতে বড় হতে পেরেছিল শুনেছি। তবে একটি শর্ত মানা হয়নি। তাঁর কথা অমান্যই করেছিলাম। তা হলো, ছাপার আগে স্যারকে পড়তে দেওয়া হয়নি। আমার ধারণা জন্মেছিল যে, পড়া শেষে তা বাতিল বলে ঘোষণাটি দিয়ে দিলে আর কিছুই করার থাকবে না। তো সে-লেখাটি আবার ছাপা হচ্ছে জেনে ভালো লাগল।

সফিউদ্দীন আহমেদ এক বড়মাপের শিল্পী
প্রায় ছফুটের একজন সৌম্যকান্তি পুরুষ। মেপে চলেন, মেপে কথা বলেন, কিন্তু সদালাপী। স্বভাবে বিনয়ী, চলনে মার্জিত। চোখা উইট। জ্ঞানী শিল্পবোধ। কথায় ও কাজে সুরুচির সম্ভার। শিল্পকলা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সারা জীবনটা একবার প্রদক্ষিণ করে আসেন। স্মৃতিচারণ করেন নিজের শিল্পীজীবনের। নিজ কর্ম, সেইসঙ্গে আপন সময়টিকে একের পর এক কথার মালা দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। কখনো উচ্ছ্বাস, কখনো আবেগ, আবার কখনো ক্ষোভ, হতাশা কিংবা উষ্মায় আন্দোলিত। কালো ফ্রেমের চশমার কাচের ভেতরে চিকচিক করে ওঠে তখন স্মৃতির পাতা। দুটি চোখ তখন কী যেন খুঁজে বেড়ায়।
তিনি চিন্তা আর কর্মে নিজের কাছেই জেদি। হার না মানার প্রত্যয় সেই জেদে। শিল্পীর চোখে পৃথিবীকে দেখার আনন্দ তাঁর বুকের নিশ্বাসে। স্ত্রী, দুই পুত্র, এক কন্যা আর সারাজীবনে সৃষ্ট অসংখ্য ছবি নিয়ে সুখী সংসারী একজন পরিপূর্ণ অভিজ্ঞ মানুষ আমাদের প্রবীণতম এই শিল্পীর নাম সফিউদ্দীন আহমেদ। শিল্পীর জন্ম ১৯২২ সালে পশ্চিমবঙ্গে।
অভিজ্ঞতা তাঁর সীমাহীন। তাঁর সময়ের ঘটনাবহুল অনেক ভালো-মন্দ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞজন তিনি। কলকাতা তথা গোটা ভারতবর্ষের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উত্তরণের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোকে তিনি যেমন দেখেছেন কাছ থেকে, তেমনি পর্যবেক্ষণ করেছেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আর তার ভয়ংকর দুঃসময়কে। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে মানুষের দুর্গতি দেখেছেন। প্রত্যক্ষ করেছেন দেশভাগ আর সেই সময়ের ঔপনিবেশিক শাসকচক্রের রাজনীতি-সৃষ্ট মানুষের নিকৃষ্টতম সাম্প্রদায়িক ক্রোধকে। নিজ জন্মভূমি ত্যাগের বেদনাকে উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা যেমন তাঁকে ধারণ করতে হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশকে আপন করে পাবারও। দু-দুটি ঔপনিবেশিক শাসনের কুটিলতায় জীবনের সিংহভাগকে অতিক্রম করতে হয়েছে তাঁকে।
ইংরেজদের শাসনামলের অন্তিম মুহূর্তগুলোতে শৈশব আর তারুণ্য কাটিয়েছেন কলকাতায়। তারপর আটচল্লিশ সাল থেকে ঢাকায়। সেই থেকে বাংলাদেশের শিল্পকলা-আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকার আর্ট কলেজ স্থাপনে যোগ দিয়েছিলেন জয়নুল, আনোয়ারুল এবং কামরুলদের সঙ্গে। বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে এমন রুচিমান, এমন সংস্কৃতিমনস্ক আর একটি মানুষ আছে কিনা সন্দেহ। ষাট-উত্তীর্ণ এই শিল্পিত মানুষ তাঁর অসংখ্য অনুজ চিত্রীকে কতভাবেই না দীক্ষিত করেছেন অথচ আজীবন থেকেছেন আড়ালে প্রচ্ছন্নে।
তিনি যখন তাঁর সৃষ্ট ফসল নিয়ে মোড় ফিরেছেন এবং আমূল পালটে দিয়েছেন গতানুগতিক ধারণা, তখনো কোনো বিলোড়ন হয়নি। কারণ বড় মাপের রুচিমান একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কোনো কোনো সময় আড়ালেই থেকে যায়। সমকাল তাকে নিয়ে খুব একটা স্পন্দিত হয় না, হয়তো সত্যভাষী মহাকাল তাকে তুলে আনে। মাঝে মাঝে আমার জিজ্ঞাসা জাগে যাঁর সৃষ্টির ফসল অফুরন্ত, যাঁর চিত্রগুচ্ছে রয়েছে অসামান্য জীবন উপলব্ধির নতুন মাত্রা ও গহন জিজ্ঞাসা তিনি কেন এমন প্রচ্ছন্নেই রয়ে গেলেন। হয়তো তাঁর প্রতিবেশ এবং স্বভাবও এর জন্য দায়ী। তিনি নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন চিত্রকলাচর্চাকে সঙ্গী করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা থেকে বিদায় নিলেও তা থেকে নিবৃত্তি পাননি। শিল্পকলার অনুসন্ধিৎসু ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা তো আছেই। বলতে গেলে বাংলাদেশের সব প্রথিতযশা শিল্পীরই তিনি শিক্ষক। সবাইকেই তাঁর কাছে উপস্থিত হতে হয়। শিল্পকলা নিয়ে আলোচনার আসর বসে শিল্পীর বৈঠকখানায়। নতুন ছবি নিয়ে আলাপ জমে। বিশ্বের শিল্পকলা-জগতে কোথায় কী হচ্ছে তা নিয়ে কথাবিনিময় হয়।
শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের জীবন স্বভাবে এবং আচরণে একজন খাঁটি বাঙালির। রুচিশীল শিল্পকলার সাধক, সুস্থ কবিতা-সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক এবং রুচিগ্রাহ্য সংগীতের অনুরাগী শ্রোতা তিনি। এসবের প্রতি ভালোলাগার পরিধি তাঁর বিশাল। প্রকৃত রস-আস্বাদনের জ্ঞান প্রসারিত অসাধারণ গভীরে। যে-কোনো একটিকে নিয়ে আলোচনায় বসলে সবকটির রসকে একত্রিত করে উপস্থিত করেন। কলা-কৈবল্য আর নন্দনতাত্ত্বিক চর্চার সব দিকেই কী ধ্রুপদী, কী সমকালীন অত্যাধুনিকতা, সর্বক্ষেত্রেই তিনি তাঁর অনুপুঙ্খ বিচার শেষের মতামতটি ব্যক্ত করেন।
বেটোফেন, মোসার্ট, বাখ, চাইকোভস্কি, রাখমানিনভ কিংবা রুবেনস্টাইন, সেগুভিয়া বা ইয়াহুদি মেনুহিন যেমন তাঁর প্রিয়, তেমনি বিটলস, ববদাইলান, জোয়ানবায়েজ বা তার চাইতেও সাম্প্রতিক অতি আধুনিক যাঁরা তাঁরাও। ফৈয়াজ খাঁ, বড়ে গোলাম আলী, ডি ভি পালুশকার, ওংকারনাথ ঠাকুর, ভীমসেন যোশী, বিসমিল্লাহ খাঁ, বেগম আখতার থেকে শুরু করে রবিশঙ্কর, আলি আকবর, আমজাদ খাঁ, বেলায়েৎ খাঁ, বাহাদুর খাঁ যেমন তাঁকে মুগ্ধ করে, তেমনি মুগ্ধ হন আঙ্গুর বালা, কনক দাস, পঙ্কজ মল্লিক, সন্তোষ সেনগুপ্ত, শান্তিদেব ঘোষ, শচীন দেব বর্মণ, হেমন্ত, সুচিত্রা মিত্র, কনিকা এমনকি চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠও।
রবীন্দ্রনাথ, ডিএল রায়, অতুল প্রসাদ, নজরুলকে তিনি ভালোবাসেন যতখানি, ততখানিই ভালোবাসেন লালনকে। লালন বা অন্যসব বাউলগীতি যেমন তাঁকে আন্দোলিত করে, মীরা কিংবা সুরদাসের ভজনও তেমনি আসলে ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল এবং লোকজ বা আধুনিকতা, কোনোটাকেই তিনি প্রত্যাখ্যান করেন না। আদি থেকে বর্তমান সবই তাঁকে সমানভাবে কাছে টানে। অর্থাৎ শুদ্ধতা থেকে অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবই তাঁর পছন্দের, যদি তা রসগ্রাহী হয়। শিল্পকলার মৌলিকত্ব এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধরন অনুসন্ধান উভয়কেই প্রশ্রয় দেন। তার অর্থ এই যে, স্থিতিতেও যেমন তাঁর অনুরাগ, বিবর্তনেও তেমনি।
শিল্পকলার নিজের অঙ্গনটির বাইরে শুধু সংগীতের প্রতি পক্ষপাতিত্বই যে তিনি পোষণ করেন তা নয়, সাহিত্য কবিতাকেও প্রশ্রয় দেন। কারণ তিনি মনে করেন এ সবকিছুই একে অপরের পরিপূরক। একটিকে ছাড়া অন্যটির প্রকাশ সম্পূর্ণতা পেতে পারে না। শিল্পীর অন্তর্গত বোধে যে শৈল্পিক মানসিকতা, তার রূপটি পরিপূর্ণ হতে পারে না যদি ললিতকলা, সাহিত্য কিংবা কবিতার রসকে উপলব্ধি থেকে সরিয়ে রাখা হয়। শিল্পী মনটির বিকাশ ঘটে না, যদি এসবের রস গ্রহণে কেউ ব্যর্থ হয়। তাঁর এসব ধারণার প্রমাণ তাঁর নিজের চিত্রকলায় বিদ্যমান রয়েছে। রং, গঠন, বিন্যাস এবং ছবির বক্তব্য পেশের স্বভাবটিতে এসবের অন্তনির্হিত ভাবের মিশ্রণ লক্ষণীয়ভাবে উপস্থিত তাঁর চিত্রে। তাঁর ছবি কখনো সংগীতের সুরমূর্ছনায় আবিষ্ট, আবার কখনো বা কবিতায় ছন্দময়তায় আচ্ছন্ন। তাঁর ক্যানভাস কখনো উপন্যাসের মতো বৃহৎ বিস্তৃতির, আবার কখনো ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ততা আর স্বাচ্ছন্দ্য-সাবলীলতায় সমৃদ্ধ।
শিল্পী বলেন, ‘চিত্রকর, সংগীতজ্ঞ আর কবির মধ্যে পার্থক্য করার কোনো অর্থ নেই। বোধ, উপলব্ধি একই। অনুভূতিশীলতা আর সৃষ্টিস্পৃহার উৎসটি একই সূত্রে গাঁথা। সবার শুধু প্রকাশের মাধ্যমটি আলাদা।’
তিনি বলেন, ‘একজন চিত্রকর আর একজন ক্লাসিক্যাল সংগীতের স্রষ্টা যেন একই দায়িত্বে নিয়োজিত। সংগীতজ্ঞ তাঁর সৃষ্ট সুরের ব্যঞ্জনাকে জটিল এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রতিটি প্রয়োজনে বিস্তার ঘটান আবার প্রয়োজনে বিক্ষিপ্ত করেন, সময়ে প্রায় বিশ্রস্ত বা ছিন্ন-বিছিন্ন করে আবার তা গুটিয়ে এনে বিন্যাস করেন, তেমনি একজন চিত্রকরও রং আর রেখার সমন্বয়ে একই রকমভাবে সে-ঘটনাটিকে প্রমাণ করেন। একই রকম করে তাঁর চিত্র সৃষ্টি করেন। তবে একজন সংগীতস্রষ্টাকে কন্ডাক্টরের ভূমিকা পালন না করলেও চলে কিন্তু একজন চিত্রকরকে দুটো দায়িত্বই পালন করতে হয়। একজন কনসার্ট কন্ডাক্টর সৃষ্ট সুরকে ধরতে হাজারো যন্ত্রীকে এবং সুরের হরেক ব্যঞ্জনা বিস্তৃতিকে পরিচালনা করতে, খুঁটিনাটিকে শ্রুতিগ্রাহ্য করতে নিজের অভিজ্ঞানকে কাজে লাগান। সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাকে রাখতে হয়। সেইসঙ্গে নিজের ওপরও। একজন চিত্রকরও তেমনি। বিষয়কে বিষয়ের রং, ফর্ম, স্পেস, গতি, রেখা – এ-ধরনের যা কিছু ছবির অঙ্গ এবং অংশ সেসবের স্বাভাবিক ধর্মকে প্রয়োজনে ভাংচুর করা আবার ছবির প্রকাশের প্রয়োজনে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সেসবের বিস্তারকে পুনর্বিন্যাসিত করার যোগ্যতা রাখতে হয়। এবং তা করতে গিয়ে নিজের ওপরও নিয়ন্ত্রণটি অপরিহার্য। উভয় ক্ষেত্রেই রস সৃষ্টি এবং তা বিতরণের ব্যাপারটিই প্রধান। ব্যাপারটি কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রেও একই। একই রকমভাবে একজন কবি তাঁর অনুভবের বিস্তৃতিকে নিয়ন্ত্রণ যেমন করেন, তেমনি শব্দচয়ন আর ছন্দময়তার পারদর্শী বিন্যাসের মধ্য দিয়ে রস সৃষ্টি করে অনুভূতিগুলোকে প্রকাশও করতে হয় তাঁদের। আর তা করতে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণটিও প্রয়োজন।
শিল্পীর চিত্রকলা চর্চার এ-ধরনের অভিজ্ঞ বিশ্লেষণ থেকে একটা কথা পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, তাঁর এই সংগীত আর কবিতাপ্রীতির ছায়া তাঁর সমগ্র কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে। কিংবা বলা যায়, হৃদয়কে স্পর্শ করে এমন কবিতা, সংগীত বা সুরের যে না দেখা রসটি পঠনে অথবা শ্রুতিতে অনুভূত হয় সেটি শরীর পায় তাঁর ছবিতে। দৃষ্টিগ্রাহ্য কায়া উপস্থিত হয় তাঁর রেখা, রং, ফর্মের বিন্যাসিত রূপকে অবলম্বন করে। প্রকাশ ঘটে অত্যন্ত সংবেদজ আর সুগ্রাহী অনুভূতিগুলো একেকটি রঙিন কবিতা বা বর্ণময় সংগীত হয়ে।
অতএব, এসব ক্ষেত্রের প্রাচীন অবস্থান থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সবই তিনি জ্ঞাতব্যে রাখেন। হোমার থেকে শেক্সপিয়র কিংবা বোদলেয়ার, বার্নার্ডশ’ থেকে শুরু করে কাফকা-লোরকা কিংবা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, জীবনানন্দ দাশ বা শামসুর রাহমান কেউই তাঁর পছন্দের বাইরে নন। একই কথা তাঁর নিজ ক্ষেত্রেও সমান। গুহাচিত্রের বাইসন কিংবা হরিণ। পরবর্তীকালে মিসর কিংবা মেসোপটেমিয়া, গ্রিক, বাইজানটাইন, ইসলামিক শিল্পকলা, রেনেসাঁস, ভারতীয় বা আরো প্রাচ্যের দেশ চীন, জাপানের বিভিন্ন সময় এবং যুগের চিত্ররীতির প্রাচীনত্ব ছুঁয়ে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসা শিল্পকলা সৃষ্টির যেসব পরিবর্তন আর বিবর্তন ইতিহাসে প্রত্যক্ষ করা যায়, তার সবটাতেই শিল্পীর রস আহরণের এবং অনুশীলনের স্পৃহা চিরকালই বিদ্যমান। সেইসঙ্গে পরবর্তীকালের ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, ফভিজম, কিউবিজম, স্যুররিয়ালিজমসহ এযাবৎকাল পর্যন্ত ক্রমাগত যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে এবং চলছে বিশ্বের শিল্পকলার জগতে, তার প্রতিও তাঁর সচেতন দৃষ্টি এবং অনুরাগ তো রয়েছেই।
কোনো কিছুকেই তিনি বাতিল বলে গণ্য করেন না এটাই প্রমাণিত হয়। অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কিছুকে বাতিল গণ্য করা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। শিল্পী হিসেবে অন্যের কাছ থেকেও তিনি তাই আশা করেন। তিনি মনে করেন, শিল্পকলার মতো জটিল কর্মকান্ডকে চর্চার অন্তর্গত করতে হলে কিংবা শুধুমাত্র তার মূল্যায়ন করতে হলেও এর আদ্যোপান্ত সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন। শিল্পকলার মতো অশেষ আর অজানা বিষয়ের সীমারেখা টেনে দেবার পক্ষপাতী তিনি নন। অতএব, শিল্পকলা-সমালোচনার ব্যাপারেও তিনি একই মতটিই প্রকাশ করে থাকেন। শুধু ইতিহাস এবং ভাসা ভাসা জ্ঞানের মধ্য দিয়ে সমালোচনা বা আলোচনা পূর্ণতা পায় না। সঙ্গে শিল্পকলাচর্চারও প্রয়োজন আছে। শিল্পকলা ভীষণভাবে একটি টেকনিকপ্রধান বিষয়। এর পদ্ধতিগত দিককে অন্যভাবে বিজ্ঞানও ধরা যেতে পারে। সে-টেকনিক বা বিজ্ঞানকে ধাতস্থ না করতে পারলে এর শুধুমাত্র বাইরের প্রকাশ আর ভাব বা দর্শনকে ধরে বিচার করলে তা সম্পূর্ণ হওয়ার নয়। বরং এর ফলে শিল্পকলার সমালোচনায় এর কিছু দিকের অনুপস্থিতি ঘটে, যা প্রকারান্তরে বস্ত্তনিষ্ঠতার অভাব, প্রকৃত রস আস্বাদনের অভাব দ্বারা বেষ্টিত থেকে যায়। এ-ধরনের সমালোচনা তিনি অগ্রাহ্য করেন এবং প্রত্যাখ্যান করেন যদি মূল্যায়ন করার এইসব যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়েও কোথাও সমালোচনার প্রচেষ্টা দেখেন।
তিনি নিজে প্রচারবিমুখ। প্রচার বা আত্মপ্রচার একালে একটি অনিবার্য বিষয় বলে যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁদের সে-বিশ্বাসকে তিনি আহত করেন না। অর্থাৎ কারো ব্যক্তিগত উপলব্ধিকে আঘাত দেবার পক্ষপাতী তিনি নন। নিজ কর্ম এবং কর্মফলে তিনি বিশ্বাসী আজীবন। শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদকে অনুধাবন করতে গেলে তাঁর এসব বৈশিষ্ট্যকে দিয়ে বিচার করলেই তা সম্পূর্ণ হওয়ার নয়। সফিউদ্দীনকে আবিষ্কার করতে হলে তাঁর এযাবৎকাল অবধি রচিত বিশাল কর্মকান্ডে প্রবেশ করা বাঞ্ছনীয়। তাঁর কর্মসমগ্রকে দিয়েই তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব এবং সে-মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁর সময়কালটিকে জানা প্রয়োজন। কারণ তাঁর ব্যক্তিচরিত্রের রূপকার যে-সময়কালটি, তার পুরোটাই প্রতিফলিত তাঁর কর্মে।
শিল্পীর জীবনটি নিখাদ, নিটোল, চলমানতা সমৃদ্ধ ছিল না, তাঁর আমলেও আর সবার মতোই তিনিও তাঁর কর্মে এবং চিন্তায় তা সরাসরি হোক কিংবা ভাবগত দিকেই, সেসবের ছাপ স্পষ্টই প্রত্যক্ষ করা যায়। যে-সময়টি তাঁকে বিভ্রান্ত করেছে কখনো, আবার পথও দেখিয়েছে। তাঁর যে-সময়কালটি একদিকে হতাশার পিছুটানে সহায়ক ছিল, আবার তা আধুনিকতায় মনোনিবেশের জ্ঞানদানও করেছে, সে-ই ছিল তাঁর অভিজ্ঞতার একমাত্র বন্ধু, সঙ্গী, শক্তি অথবা শত্রু। বড় শিল্পী হওয়ার এবং অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো ভাগ্য যেমন নির্ধারিত হয়েছে তাঁর এ-সময়টিতে, তেমনি ইচ্ছেমতো কাজ করবার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার দুর্ভাগ্যও বহন করে এনেছে তাঁর এ-সময়কালটি। আর এই শিল্পী হওয়ার সময়কাল তাঁর শুরু হয় ১৯৩৮-এ।
ছবি অাঁকার হাত তাঁর ছেলেবেলা থেকেই। ব্যাপারটি ঠিক আর দশটা শিল্পীর মতোই। হাতে চমৎকার ড্রইং আসা আর সেইসঙ্গে জগতের এটা-ওটাকে আর সব সাধারণ ছেলেদের চাইতে ভিন্ন চোখে দেখতে পাওয়ার সামর্থ্যকে যদি প্রতিভাজ্ঞান করা যায় তাহলে সে-দুর্লভ প্রতিভার একজন মালিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন তিনি ছোটবেলা থেকেই। অতএব, ক্রমশ জ্ঞানবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃত শিল্পী হওয়ার বাসনা তাঁকে পেয়ে বসলে ১৯৩৮ সালে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে যান। তখনকার আমলে বাংলাদেশে মুসলমান ছেলেমেয়েদের এই ইচ্ছে পোষণ করাটাই ছিল অপরাধের। তাছাড়া এই বিশেষ লেখাপড়া সমাপ্তির পর অর্থনৈতিক দিকের কোনো সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল নিতান্তই হতাশাব্যঞ্জক। সুতরাং পরিবার এবং সমাজের বিরুদ্ধে মানসিক লড়াই করে তবেই এই ক্ষেত্রটিতে যাওয়া সম্ভব হতো। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শিল্পী মঈন প্রমুখকে এ লড়াই করে বাধা ডিঙাতে হয়েছিল। শিল্পী সফিউদ্দীনও তা থেকে বাদ পড়েননি। আসলে জীবনের ভূত-ভবিষ্যৎকে বাজি রেখে এসবে মনোনিবেশ করার দুঃসাহস রাখতে হতো তখন। শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদও সে-দুঃসাহসকে ধারণ করে ভর্তি হয়েছিলেন আর্ট কলেজে। তাঁর মার্জিত রুচি, ছবি অাঁকার স্পৃহা আর হাত এবং বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্য কলকাতা আর্ট কলেজের মতো ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পকলার বিদ্যাপীঠে ভর্তির ব্যাপারটিকে অনায়াসেই সমাধা করে। তিনি যখন ছাত্র তখন ইউরোপে শিল্পকলার ক্ষেত্রে তোলপাড় চলছে। আধুনিক রীতিনীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সেখানকার শিল্পীরা তখন দারুণভাবে আসক্ত। কিউবিজম, ফভিজম, স্যুররিয়ালিজম, ডাডাইজম ধরনের চর্চা স্থিতিলাভ করে শিল্পকলার নতুন যুগ সৃষ্টি করেছে। চিরাচরিত নিয়মের ভাঙচুরের রস শিল্পকলায় আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে তখন। পাবলো পিকাসো, জর্জেস ব্রাক, মাতিস, পল ক্লি, জুয়ান গ্রিস, ক্যানডিনস্কি, মিরো, শ্যাগাল, হেনরি মুর, পিয়েত মনদ্রিয়ান, সালভাদর দালি প্রমুখ শিল্পীসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নিজ নিজ পর্বে সেরা ব্যক্তিত্ব। তাঁদের সৃষ্ট সব ধরন এবং রীতিগুলোর ঢেউয়ে এ-সময় সারাবিশ্বের শিল্পকলার জগৎ মোহাবিষ্ট। ভারতবর্ষও তা থেকে পিছিয়ে ছিল না। ভারতবর্ষের তৎকালীন বহু শিল্পীই এসবে আকৃষ্ট হয়ে কাজ করছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন নিজেদের ক্যানভাসে। ভারতীয় শিল্পকলার আধুনিকতায় প্রবেশের ক্রান্তিকাল তখন।
সফিউদ্দীন আহমেদ এ উল্লেখযোগ্য সময়টিতে শিল্পকলার একজন মেধাবী এবং একনিষ্ঠ ছাত্র হওয়ার সুবাদে এসবকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন অত্যন্ত কাছাকাছি থেকে। দেশ-বিদেশের শিল্পীদের নতুনতর ভাবনাগুলোকে উপলব্ধি করবার সুযোগ পেয়েছিলেন শিল্পকলার জগতের ভেতরে থাকার সুবাদে। কলকাতার শিল্পীদের শিল্পকলাচর্চার পরিবেশটি তিনি অবলোকন করার সুযোগ পান খুব কাছে থেকে। সুতরাং এসব থেকে আধুনিকতার প্রতি মোহ জন্মে। ছাত্রাবস্থায় অ্যাকাডেমিক অনুশীলনের আওতায় থেকেও অতএব শিল্পীর মধ্যে আধুনিক রুচির প্রাপ্তি ঘটে, যা তাঁর পরবর্তীকালের শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
শিল্পীর এই পর্যায়টিতে তাঁর পরবর্তী শিল্পীজীবনের খুঁটিটি প্রোথিত হয়েছিল এবং এই পর্যায়ের সুখী সমাপ্তি তাঁর শিল্পীসত্তার সঠিক দিকনির্দেশক হতে পেয়েছিল বলাই বাহুল্য। তার পরের পর্যায়টি শিল্পীর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুদ্ধের কিন্তু সারাবিশ্বে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাডোলে আর সবার মতো তাঁর জীবনের চলমানতাও ব্যাহত হয়। শিল্পকলাচর্চা বিপদগ্রস্ত হয়। দেশে দুর্ভিক্ষ এলে অর্থাভাবের মুখোমুখি হতে হয় শিল্পীকেও। তিনি বিভ্রান্ত হন। সংসারে মা আছেন, অতএব, অর্থাভাবকে কাটিয়ে উঠতে চাকরির দিকে ঝুঁকতে হয়। আর্ট কলেজের টিচারশিপ কোর্স ছেড়ে দিয়ে ড্রাফটসম্যানের চাকরি নেন তিনি। অধ্যক্ষ তাঁর মতো মেধাবী ছাত্রের এহেন মতিগতিতে রুষ্ট হন। কিন্তু শিল্পীকে চাকরিটি নিতেই হয়। স্বাভাবিকভাবেই চাকরিটি ভালো লাগে না তাঁর মোটেই। একদিকে সৃষ্টিশীল ছবি অাঁকায় প্রবেশের অদম্য স্পৃহা এবং আর্ট কলেজের অতিদুর্লভ উচ্চশিক্ষাটির প্রতি অনুরাগ, অন্যদিকে একজন শিল্পীর জন্যে বেমানান একটি চাকরি এবং তা থেকে প্রাপ্ত বেতন দিয়ে মাকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা দানের প্রচেষ্টা – এসবের টানাপড়েনে দমে যেতে থাকেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা কারণে চাকরিটি ছেড়ে দিতেই হয়। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। চাকরি শেষে আবার শুরু করেন টিচারশিপ।
এই সময় তিনি ছাপচিত্রে আকৃষ্ট হন। ভারতবর্ষে তখন ছাপচিত্র বা গ্রাফিক শিল্পকলাচর্চার প্রসার শিল্পীদের মধ্যে তেমন গুরুত্বের সঙ্গে গৃহীত ছিল না। ছাপচিত্রের ইদানীংকালের নানা ধরন আর পদ্ধতিরও চর্চা ছিল না সে-সময়ে। শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমের চর্চার বাইরে সখ করে কিছু ছাপচিত্র মাঝে মাঝে বিভিন্ন শিল্পী বিভিন্ন সময়ে করে থাকতেন। কলকাতা আর্ট কলেজের শিক্ষক শিল্পী আবদুল মঈন ছিলেন ছাপচিত্রে তখন অন্তপ্রাণ। ড্রাই পয়েন্টে চমৎকার কাজ করতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর যশও ছিল প্রচুর। (শিল্পী আবদুল মঈন খুব কম বয়সে মারা যান হঠাৎ করেই। সফিউদ্দীন আহমেদসহ তৎকালীন তাঁর সব ছাত্র, বন্ধু, সহকর্মী এবং শিল্পীদের কাছে শিল্পী আবদুল মঈন ছিলেন অনুকরণীয় একজন শিল্পী ব্যক্তিত্ব। শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ এখনো তাঁকে, তাঁর কাজকে স্মরণ করে বলেন, শিল্পী মঈন বেঁচে থাকলে আরো অনেক বড় হতেন। অনেক কিছু আমরা তাঁর কাছ থেকে পেতে পারতাম।) এছাড়া ছিলেন রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সফিউদ্দীন আহমেদকে গ্রাফিক্সের প্রতি ঝুঁকে যেতে সহায়তা করেন অনেকখানি। কলেজের ছাপচিত্রের মুদ্রণযন্ত্রটি এবং নিজের স্টুডিওটি তিনি প্রিয় ছাত্র হিসেবে তাঁকে ব্যবহার করতে দিতেন উদ্বুদ্ধ করতে। এই সময় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনও কলকাতা আর্ট কলেজের একজন তরুণ উদ্যোগী শিক্ষক এবং উঠতি খ্যাতিমান শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম একজন সফল শিল্পী হিসেবে নিজ কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। জয়নুল আবেদিন এবং অনিল কুমার ভট্টাচার্য ছিলেন নিষ্ঠাবান ছাত্র সফিউদ্দীনের অত্যন্ত কাছের মানুষ। শিল্পী জয়নুল আবেদিন, শিল্পী অনিল কুমার ভট্টাচার্য, শিল্পী আবদুল মঈন এবং আনোয়ারুল হকদের সাহচর্য সফিউদ্দীন আহমেদকে শুধু কর্মে উৎসাহিত করে তুলেছিল তাই নয়, শিল্পীর অর্থকষ্টকে লাঘব করতেও সহায়তা করেছিল। তাঁরা প্রায়শই কমার্শিয়াল টুকটাক কাজ দিয়ে সফিউদ্দীন আহমেদকে সহযোগিতা করেছেন, সুষ্ঠুভাবে তাঁর ছাত্রজীবনের শেষ ধাপের পর্বটি সমাধা করতে।
ইতিমধ্যে শিল্পী তাঁর উড এনগ্রেভিং ড্রাই পয়েন্ট এচিংয়ের মতো ছাপচিত্রের মাধ্যমগুলোতে টেকনিক্যাল পারদর্শিতা এবং নিজস্ব রসসৃষ্টির জন্যে শিল্পকলা অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অবশেষে কোর্স শেষ করে ১৯৪৬-এ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হলে কলকাতা আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগদানের আমন্ত্রণ পান। তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রখ্যাত শিল্পী অতুল বসু তাঁকে কমার্শিয়াল বিভাগে যোগ দিতে বলেন। কিন্তু শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের মজ্জায় তখন ছাপচিত্র চর্চার ইচ্ছা প্রবল। কমার্শিয়ালে ঢুকলে তা ব্যাহত হতে পারে ভেবে তা থেকে তিনি বিরত থাকেন। পরিবর্তে শিল্পী আনোয়ারুল হক যোগ দেন সে-পদে। শেষ পর্যন্ত ছাপচিত্রের শিক্ষক সুশীল সেন চাকরি বদলে দিল্লি চলে গেলে তাঁর পদে সফিউদ্দীনের যোগদানের সুযোগ আসে। ১৯৪৬ সালেই তিনি শিক্ষক হয়ে যান। শিল্পীর নতুন জীবন শুরু হয়। আর্ট কলেজের চাকরি প্রাপ্তিতে স্বস্তি আসে। তিনি পুরোপুরিভাবে ছবি অাঁকায় মনোনিবেশ করেন। প্রচন্ড গতি আসে তাঁর কর্মস্পৃহায়।
লক্ষণীয় যে, ১৯৪৬ সালটি শিল্পীজীবনের নানাদিকের দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করেছে। পরীক্ষায় ভালো ফল, আনন্দিত হওয়ার মতো একটি চাকরি এবং খ্যাতি প্রাপ্তির প্রথম সোপানটি তাঁর নির্দিষ্ট হয় এই সালে। দুমকায় তিনি এ-সময়ে অসংখ্য ছবি অাঁকেন বিভিন্ন মাধ্যমে। সাঁওতাল এবং তাদের জীবন, দুমকার প্রকৃতি ইত্যাদিকে বিষয় করে অনেক ছবি অাঁকেন সফিউদ্দীন এই সময়। অ্যাকুয়াটিন্ট, তেলরং, স্কেচ, উড এনগ্রেভিং, ড্রাই পয়েন্টে অসংখ্য কাজ করেন যা তাঁকে খ্যাতির প্রথম স্বাদটি পেতে এবং পরবর্তীকালের জন্যে নিজেকে প্রস্ত্তত করতে সহায়ক হয়। শিল্পী এই সময় তাঁর নিষ্ঠা, প্রতিভা, ধৈর্য, পারদর্শিতা এবং তাঁর সৃষ্টিশীলতার স্বীকৃতি পান নানাভাবে। পুরস্কার তার মধ্যে অন্যতম।
দুমকায় করা একটি তেলরঙে অাঁকা স্কেচ পাটনায় দ্বারভাঙ্গার মহারাজা-আয়োজিত তখনকার ভারতবর্ষের অন্যতম একটি বড় প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পায় ১৯৪৬-এ। তার আগে ১৯৪৫-এ তাঁর তখনকার সফল তৈলচিত্র ‘কবুতর’-এর জন্য প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল লাভ করেছিলেন। অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন অ্যাকুয়াটিন্টের জন্য, ১৯৪৬-এ। ইন্টারন্যাশনাল কনটেমপরারি আর্ট এক্সিবিশনে প্রথম পুরস্কারটি করায়ত্ত করেন তিনি। ১৯৪৭-এ নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত নামিদামি এবং উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনী ইন্টার এশিয়ানে তিনি শুধু অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার গৌরবই অর্জন করেননি, তার এচিং এবং ড্রইংয়ের জন্যে প্রথম পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন। এই প্রদর্শনীতে জয়নুল আবেদিন পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ জলরং পুরস্কার। এসব কৃতকার্যের ফলে ১৯৪৬-৪৭-এ অলইন্ডিয়া ফাইন আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটস সোসাইটির কাউন্সিল সদস্য হওয়ার দুর্লভ গৌরবটি অর্জন করতে পেরেছিলেন। ১৯৪৬-এ প্যারিসের মডার্ন আর্ট মিউজিয়ামের ইউনেস্কো-আয়োজিত তখনকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে ভারতের অন্যান্য প্রথিতযশা শিল্পীর সঙ্গে তাঁরও ছবি নির্বাচিত হয় ভারতের পক্ষে। এই প্রদর্শনীটি তাঁর ওই বয়সের হয়তো সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ শিল্পীর শিল্পীসত্তা বিকাশের পরবর্তী পর্যায়গুলোর জন্যে উদ্দীপনা জোগানোর অন্যতম সহায়ক ছিল, তা ধারণা করা মোটেই অমূলক নয়। প্রদর্শনীটিতে বিশ্বের সেরা শিল্পী পিকাসো, ব্র্যাক, মাতিস, বাজিন, ভিলন, ভিলাউ, উৎরিল্লো, বুকান্ত, ম্যাসন, ডিলনি, বনার্ড, শ্যাগাল, দুফি, ম্যাক্স আর্নস্ট লেজার, রুয়াল্ট, সুতিনসহ বহু পুরনো এবং সমকালীনদের ছবির সঙ্গে ভারতবর্ষের অমৃত শেরগিল, অবনী ঠাকুর, গগন ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়ের ছবি প্রদর্শিত হয়। বিশ্বের এবং ভারতবর্ষের এসব বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে তরুণ শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের অংশগ্রহণ তখন শুধু তাঁর জন্যেই নয়, তৎকালীন বাংলায় শিল্পকলা অঙ্গনের একটি গৌরবের ব্যাপার ছিল। একই সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আর্ট অব বেঙ্গল প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে ক্রিটিক্স অ্যাপ্রেসিয়েশন অর্জিত হয় তাঁর অভিজ্ঞতার খাতে।
শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ তখন সারা ভারতের শিল্পকলা মহলে একটি পরিচিত নাম। তাঁর যে-কোনো মাধ্যমের ছবি তখন সারা ভারতের যে-কোনো প্রদর্শনীতে সমাদৃত। পুরস্কার, প্রশংসা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে সফিউদ্দীন আহমেদ তরুণ অথচ তখন পরিপূর্ণ, একজন সফল শিল্পী। এই সময়ে এক প্রদর্শনীবাণীতে কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ শ্রী অতুল বসু বিশেষভাবে সফিউদ্দীন আহমেদকে উদ্দেশ করে উক্তি করেছিলেন : ‘অ্যামাং দ্য ইয়াং আর্টিস্টস, সফিউদ্দীন আহমেদ হ্যাজ অলরেডি মেড অ্যা নেম ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড অ্যাব্রোড।’
১৯৪৭-৪৮-এ বিলাতে প্রদর্শিত আর্ট অব ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান প্রদর্শনীতে খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০০ থেকে শুরু করে ১৯৪৬-এর সমকালীন শিল্পকলার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রদর্শনীতেও তাঁর চিত্রকলা অংশগ্রহণ করে। শিল্পীর এসব সাফল্য থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সে-সময়টি তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মের ধারা এবং বড় একজন শিল্পী হওয়ার মানসিকতা প্রতিষ্ঠার সেরা লগ্ন হতে পেরেছিল। যদিও ছাত্রাবস্থা থেকেই পুরস্কার পাওয়া প্রায় দস্ত্তর হয়ে গিয়েছিল তাঁর কলকাতা আর্ট কলেজে। অর্থাৎ কলেজের শ্রেণি পুরস্কারগুলো ছাড়াও অন্যান্য স্থানে পুরস্কৃত হয়েছেন। কলকাতা ভার্সিটি ইনস্টিটিউটের বার্ষিক শিল্পকলা প্রদর্শনী তার মধ্যে অন্যতম। আর্ট কলেজে ভর্তির মাত্র বছরখানেক পরেই তিনি এই প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের তৃতীয় পুরস্কারটি পান ১৯৩৯ সালে। এটি তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম পুরস্কার। শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরুর প্রথম স্বীকৃতি বলে শিল্পীর কাছে পুরস্কারটি যেমনই হোক আজো এত সাফল্যের পরও তা তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
১৯৪৭-এ আসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিদায়লগ্ন এবং দেশভাগের পালা। চতুর্দিকে শুরু হয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা। আর সবার সঙ্গে শিল্পীর উঠতি শিল্পীজীবনে স্থিতি আর প্রতিষ্ঠা আসার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মুহূর্তটি বিপর্যস্ত হয়। সমস্ত ইচ্ছের সাজানো বাগানে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। সবাই দলে দলে দেশ ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসতে শুরু করলে তিনিও দুশ্চিন্তায় পড়েন। শেষ পর্যন্ত তাঁকেও সে-পথ অবলম্বন করতে হয়। কষ্টার্জিত নাম, যশ, প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব হিতৈষীসহ ছাপচিত্রের তাঁর অতিপ্রিয় ছাপার মেশিন মায় জীবনের সবকিছু ছেড়ে চলে আসতে হয় তাঁকে। ঢাকায় নতুন করে ঘরবাড়ি বাঁধেন। এখানে আর্ট কলেজ তো দূরের কথা, শিল্পকলাচর্চার কোনো পরিবেশ কিংবা সুযোগ কিছুই ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি চাকরি মেলে শিক্ষকতার। ঢাকা কলেজিয়েট হাই স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পান। এই স্কুলে তখন হেড মাস্টার হিসেবে নিযুক্ত হন ভাষাবিদ ডক্টর এনামুল হক। এনামুল হক শিল্পীর কদর বুঝতেন এবং শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের খ্যাতি ও শিল্পীর নিজ কর্মশক্তির খবরাখবর তাঁর জানা ছিল। শিল্পীর দুর্গতিকে তিনি বুঝতে পেরে এমনি সাধারণ বিষয়ের ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করতেন। বরং শিল্প-সাহিত্যের অবস্থাটি পাকিস্তানে কী দাঁড়াবে এবং কী করে আবার নতুন করে এসবের গোড়াপত্তন করে যাত্রা শুরু করবে তারই আলাপ-আলোচনা করতেন শিল্পীকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে।
হঠাৎ বিপর্যস্ত হয়ে পড়া জীবনে বিভ্রান্তি এবং হতাশায় যখন শিল্পী ক্রমশ মুষড়ে পড়ছেন ঠিক এ-সময়ে জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে একটি আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হয়ে পড়েন। অবশেষে ডক্টর কুদরত-এ-খোদা, ফিরোজ খান নুন প্রমুখের সহায়তায় ১৯৪৮-এ ঢাকা আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে আর সব শিল্পীর মতো তাঁরও জীবনে নিশ্চিন্তি আসে। শুরু হয় নতুন করে শিল্পচর্চার অধ্যায়। আরম্ভ হয় নতুন করে জীবন গড়ার পর্যায়। শিল্পীর নিজ অঙ্গনটি পুনরাবিষ্কৃত হয়। তিনি আবার পূর্ণোদ্যমে ছবি অাঁকায় মনোযোগী হন। তবে একদিকে নতুন আর্ট স্কুলকে সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব, অন্যদিকে সম্পূর্ণ নতুন জায়গায় ক্রমশ নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কায়িক এবং মানসিক প্রস্ত্ততি শিল্পীর কাজের গতিকে ব্যাহত করে। এ-ব্যাপারটি তখন শুধু তিনিই নন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, শফিকুল আমীন প্রমুখ শিল্পীর প্রায় সবার ক্ষেত্রেই কমবেশি খাটে। পরে এ নিয়ে দেশের তরুণ শিল্পীদের (যাঁরা তাঁদের প্রথম দিকের ছাত্র) মুখে অভিযোগ উঠেছিল কাজের কমতিটুকু নিয়ে। কিন্তু তখনকার সেই মানসিক বিপর্যস্ততা যে সৃষ্টিশীল কাজের জন্যে মোটেই সহায়ক ছিল না এ-কথা বোধহয় ভুক্তভোগী শিল্পীবৃন্দ ছাড়া অন্য কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না। জীবন গড়ার পরিকল্পনায় হঠাৎ পুরোপুরি ওলট-পালট কিছু ঘটলে ফের জোড়া লাগানোর যে-বিপত্তি তা উপলব্ধি করা আর কারো পক্ষে হয়তো সম্ভব ছিল না শুধু তারা ছাড়া।
নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তবু কাজ করে যাচ্ছিলেন। তিনি ছাপচিত্রের শিল্পী কিন্তু মেশিনটি ফেলে আসায় ইচ্ছেমতো সে-কাজে গতি আনতে পারছিলেন না। সুতরাং অন্যান্য মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গে এসে এখানকার শিল্পকলার নিজস্ব ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করেন শিল্পীরা এবং এ-ব্যাপারে পূর্ববঙ্গের শিল্পকলার আদি উৎস শিল্পের অফুরন্ত ভান্ডারকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়াস পান সবাই। লোকজ শিল্পকলার ঢং, রং এবং অাঁকার ভঙ্গি তাঁদের সবাইকে আকৃষ্ট করে। পশ্চিমবঙ্গে এসবকে এবং কালিঘাটের পটকে কেন্দ্র করে, পটের অঙ্কন প্রক্রিয়ার সাবলীলতাকে কাঁচা রঙের ব্যবহার, রেখার ছন্দময়তা ইত্যাদিকে গ্রহণ করে অনেক শিল্পীই আধুনিক করে ছবি অাঁকছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে যামিনী রায় তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রণী এবং সফল শিল্পী হিসেবে শুধু ভারতবর্ষেই নয়, সারাবিশ্বেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বলা যায়, শিল্পী যামিনী রায় ভারতের শিল্পকলায় একটি নতুন ঢঙের আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন, যা একাধারে লোকজ ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে প্রয়াসী এবং আধুনিক চিত্রকলার একটি অংশ বলে গণ্য হয়েছিল। তখনকার তরুণ শিল্পীদের মধ্যে তাঁর প্রভাব পড়েছিল দারুণভাবে। বাংলাদেশে চলে আসা শিল্পীদের মধ্যেও সে-প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। জয়নুল আবেদিন যামিনী রায়ের মতো লোকশিল্প থেকে ধরন নিয়ে নিজস্ব ঢং সৃষ্টি করতে সমর্থ হন। কামরুল হাসান একইভাবে সরাসরি লোকশিল্প থেকে প্রভাবিত হয়ে নিজস্ব ধরন আবিষ্কার করে ফেলেন। সফিউদ্দীন আহমেদ ব্যাপারটিকে চর্চায় আনেন অন্যভাবে। লোকশিল্পের মোটিভ বা লক্ষণগুলোকে ছবির গ্রামবাংলার বিষয়ের, ফর্মের বা আকারের আধুনিক রীতিতে ভাঙচুর করার প্রক্রিয়া ব্যবহার করে চিত্র রচনা করার প্রচেষ্টা নেন। কিউবিজমের প্রায় কাছাকাছি ধরনে বিষয়কে ভেঙে প্রকাশ করতে বিশ্বাসী হয়ে পড়েন। এ-সময়ে তাঁর অতি প্রিয় বিষয় ‘খেটে খাওয়া মানুষ’ যা তিনি অত্যন্ত রিয়ালিস্টিক ধরনে প্রায়শই অাঁকতেন কী তেলরঙে কী ড্রইং বা এচিং, উড এনগ্রেভিংয়ে তাকেই আবার বেছে নেন। তাঁর ‘কাঠমিস্ত্রি’ এই ধরনের একটি ছবি। ছবিটির বিষয়ে বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা, ধরনে লোকশিল্পের ধাঁচ লক্ষণীয়ভাবে উপস্থিত। কিন্তু ছবির মূল রসটির সৃষ্টি এসবকে আধুনিক ঢঙে রূপান্তর করার মধ্যে। সফিউদ্দীন এই রীতিতে যখন তাঁর চিত্রচর্চাকে প্রায় স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই দেশে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। গড়িয়ে যায় বায়ান্নর বিক্ষোভে। গুলি চলে। শহীদ হয় সালাম, বরকত, রফিকসহ অনেক ছাত্র-জনতা।
বাংলা ভাষা-আন্দোলন এবং রাজপথে বয়ে যাওয়া রক্তের ঢল সফিউদ্দীনের শিল্পীমনকে আন্দোলিত করে, ক্ষুব্ধ করে, ব্যথিত করে। তিনি তাঁর বিষয় পরিবর্তন করেন। বাংলা ভাষা, মিছিল, বাংলার সহজ-সরল মানুষের আর্তচিৎকার, রোষ ইত্যাদি উপস্থিত হয় বিষয় হিসেবে। এসবকে বিষয় করে বেশ কিছু ড্রইং রচনা করেন। প্রতীকী করতে ভীতসন্ত্রস্ত অথচ প্রতিবাদী অসংখ্য চোখ নিয়ে কম্পোজিশন রচনা করেন। ড্রইংয়ের মধ্যেই নকশার ভাব রাখেন চোখগুলোকে সাজিয়ে। এসব ড্রইং রেখার গতিশীলতা বলিষ্ঠ কম্পোজিশন, টোনের সঠিক বিভক্তি ইত্যাদিতে ড্রইংগুলো যেমন শৈল্পিক রসের, তেমনি অভিব্যক্তিতে আন্দোলনের প্রতিজ্ঞা আর নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ সবকিছু মিলেমিশে প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশের স্লোগানও বটে। সবচেয়ে বড় কথা, চিরকাল তিনি এই ছবিগুলোকে অমূল্য ধন গণ্য করে আগলে রেখেছেন। অতি অর্থকষ্টেও কোনো দিন বিক্রি করার কথা ভাবেননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, বাঙালির নিজস্বতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে যে বুকের রক্ত ঝরেছিল সেই বীরত্বের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলিস্বরূপ তাঁর এসব ড্রইং। অতএব, তাঁর এই ড্রইংয়ের বিনিময়ে তিনি অন্য কোনো কিছু প্রাপ্তির কথা চিন্তাই করতে পারেন না। এবং এসব কারণে তিনি এগুলো কোনোদিন কোথাও প্রদর্শনও করেননি।
১৯৫৫-তে তাঁর কাজের মোড় পরিবর্তন হয়। কলকাতায় ফেলে আসা মেশিনটি আনতে পারার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যা তিনি সেখান থেকে আসার সময় হারিয়ে ফেলেছিলেন, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও যার হদিস তিনি করতে পারেননি, সেটি ১৯৫৫-এর এক সময়ে হঠাৎ করেই পেয়ে যান। এবং মেশিনটি আনতে কলকাতায় যান। কপাল তাঁর ভালো। যে-বাড়িতে তিনি মেশিনটি গচ্ছিত রেখে এসেছিলেন সে-বাড়ির সবাই বহুকাল ধরে মেশিনটি আগলে রেখে শেষ পর্যন্ত মালিকের কোনো খবরাখবর না পেয়ে যেদিন ওটিকে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন, ঠিক সে-সময়টিতে শিল্পী সশরীরে সেখানে গিয়ে হাজির। শিল্পী এখনো মনে করেন, হঠাৎ অতকাল পরে কাগজটি খুঁজে পাওয়া এবং ঠিক সময়মতো মেশিনটি বিক্রি হয়ে যাবার মুহূর্তে সেখানে পৌঁছে যাওয়া কাকতালীয় হলেও তা তাঁর ভাগ্য নির্ধারণী একটি ঘটনা। কারণ এ-মেশিনটি কেনার পর তাঁর যেমন ছবি অাঁকার ব্যাপারে, বিশেষ করে ছাপচিত্রে দক্ষতা এসেছিল, তেমনি তাঁর প্রথম জীবনে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা আর সুনামও তিনি পেয়েছিলেন মেশিনটির ব্যবহার শুরু করার পর থেকেই বেশি। মেশিনটির ওপর তাঁর দুর্বলতা অনেক। এটা বলাই বাহুল্য।
মেশিনটি কলকাতা থেকে নিয়ে আসার পর তাঁর ছাপচিত্রের চর্চা বেড়ে যায়। পূর্ণোদ্যমে এচিং অ্যাকুয়াটিন্টে কাজ শুরু করেন। ছাপচিত্রে আরো খ্যাতি বাড়ল, আরো সুন্দর কিছু ছবি তিনি উপহার দিলেন শিল্পকলার জগৎকে কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সন্তুষ্ট হতে পারেন না। ছাপচিত্রের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক টেকনিকগুলোকে না জানতে পারলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সন্তোষজনক হতে পারে না। অতৃপ্তি থেকে যায়। সুতরাং বিদেশ যাবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন তিনি। ১৯৫৬-তে বিলাতের বিখ্যাত সেন্ট্রাল কলেজ অব ফাইন আর্টে গিয়ে হাজির হলেন নতুন করে পড়তে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেলেন সে-দেশের ছাপচিত্রের অন্যতম একজন খ্যাতিমান শিল্পী মেলউইন ইভারসকে। ইতোমধ্যেই অত্যন্ত দক্ষ একজন ছাপচিত্রের শিল্পীকে পেয়ে মি. ইভানস নতুন করে শেখাবার কোনো উদ্যোগ না নিয়ে সফিউদ্দীনকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাধর্মী ছবিতে মনোযোগী হতে সহায়তা করেন।
সফিউদ্দীনের শিল্পীজীবনে ভিন্ন অভিজ্ঞতা প্রাপ্তি ঘটে। জগদ্বিখ্যাত শিল্পীদের ছবি দেখা, তাঁদের টেকনিকগুলোকে অতি কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আসে তাঁর। তিনি উদ্বুদ্ধ বোধ করেন তাঁদের কাজ দেখে এবং এই নতুন করে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ’৫৯ পর্যন্ত ছাপচিত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষাধর্মী অসংখ্য সফল ছবি রচনা করেন, যা সফিউদ্দীনকে আন্তর্জাতিক মানের শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৫৮-তে তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স তিনি দুবছরে শেষ করে ডিসটিংশন পান। এই সময় ‘পেইন্টিংস অ্যান্ড এচিংস অব সফিউদ্দীন আহমেদ’ নামে তাঁর প্রথম সফল একক প্রদর্শনীটিও অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনের নিউ ভিশন সেন্টার গ্যালারিতে। এ-সময়ের তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য প্রদর্শনীর মধ্যে ১৫ জন প্রথিতযশা ব্রিটিশ শিল্পীর সঙ্গে ‘এক্সিবিশন অব এচিং অ্যান্ড লিথোগ্রাফে’ অংশগ্রহণের সুযোগ পান। প্রদর্শনীটি মোট ১৬ জন শিল্পীর ছবিকে নিয়ে ছিল। শিল্পী সফিউদ্দীন ছিলেন তাতে একমাত্র বিদেশি শিল্পী। লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীটি তাঁর প্রবাসী জীবনের অন্যতম একটি সুন্দর প্রদর্শনী বলে তিনি মনে করেন। আগে ১৯৫৮-তে মুর্তজা বশীর এবং পাকিস্তানের আলি ইমাম, শেমজা, পারভেজ প্রমুখ শিল্পীর সঙ্গে একটি প্রদর্শনী করেন। লন্ডনের কাগজে প্রদর্শনীটির সম্বন্ধে ফলাও করে যে-খবর ছাপানো হয় তাতে তাঁকেই প্রদর্শনীর মুখ্য আকর্ষণ হিসেবে গণ্য করে উল্লেখ করা হয় যে, ‘লন্ডন আর্ট লাভিং পাবলিক হ্যাভ সিন দ্য ওয়ার্ক অব সফিউদ্দীন আহমেদ অ্যাট ইন্ডিয়া হাউস ইন নাইনটিন ফর্টি সেভেন অ্যান্ড অ্যাট বালিংটন হাউস ইন নাইনটিন ফর্টি এইট’ ইত্যাদি। এ থেকে বোঝা যায় যে, শিল্পীর ১৯৪৭ এবং ’৪৮-এর প্রদর্শনীগুলোর কাজ কতখানি আকর্ষণীয় এবং দৃষ্টান্ত মতন ছিল। এ সময় প্রদর্শনীর অসংখ্য ছবির মধ্য থেকে তাঁর দুমকা সিরিজের উড এনগ্রেভিংকে বেছে নিয়ে প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক সি হারকোর্ট রবার্টসন বলেছিলেন, ‘সফিউদ্দীন আহমেদ শোজ ট্রু ক্র্যাফটসম্যানশিপ ইন উড এনগ্রেভিং।’
লন্ডনে শিল্পীর কাজের দক্ষতা এবং সাফল্যের কারণে ইউরোপের অন্যান্য দেশের বড় বড় প্রদর্শনী থেকেও তাঁর ছবি আমন্ত্রিত হতে থাকে এই সময়। ১৯৫৮-তে এমনি একটি মূল্যবান আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘ফার্স্ট ইন্টারশ্যানাল ট্রাইশিয়াল অব অরিজিনাল কালারড গ্রাফিক-সুইজারল্যান্ড’। এতে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৯-এ তাঁর ‘ইন গ্রিপ অব ফ্লাড’ এচিংটি রয়াল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের ১২১তম প্রদর্শনীতে নির্বাচিত হয়।
শিল্পী বিলাত থেকে সাফল্য আর খ্যাতি নিয়ে ঘরে ফেরেন ১৯৫৯-এ। ফিরে এসে পুনরায় ঢাকার আর্ট কলেজে যোগ দিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেইসঙ্গে ছাপচিত্রে নতুন লব্ধ স্টাইলকে অবলম্বন করে কাজ শুরু করেন। আজ অবধি তিনি সে-ধরনকে আঙ্গিক ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। পাকিস্তানি আমলে সবকটি জাতীয় এবং উল্লেখযোগ্য দলগত প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সঙ্গে আরসিডি দেশসমূহ আয়োজিত বিয়েনিয়ালগুলোসহ আরো অনেক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জাতীয় প্রদর্শনীগুলোতে শুধু অংশগ্রহণই করেননি, অনেকগুলোতেই বিচারক থাকতে হয়েছে তাঁকে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘এশিয়ান আর্টে’রও তিনি অন্যতম একজন বিচারক। জাপানের ফুকুওকায় অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান আর্ট প্রদর্শনীতে এশিয়ান শিল্পীদের মধ্যে তাঁর ছবিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রদর্শনীর বিশেষ পরিচয়পত্রে ব্যবহার করা হয়।
সংক্ষিপ্ত আকারে একনজরে শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের বিশাল ঘটনাবহুল শিল্পীজীবনের কর্মকান্ডকে এভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। এবং এভাবে তাঁর শিল্পকলাচর্চার পর্যায়গুলোকে মোট চারটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। (এক) ছাত্রজীবন, (দুই) ছাত্রোত্তর এবং দেশভাগের পরবর্তীকালের ১৯৫৬ পর্যন্ত অধ্যায়, (তিন) বিলাতে অবস্থান এবং স্বাধীনতাপূর্ব অধ্যায়, (চার) স্বাধীনতা-পরবর্তী এবং সাম্প্রতিক অধ্যায়।
ছাত্রজীবনের অধ্যায়টি অনুশীলন পর্বের হেতু অ্যাকাডেমিক পদ্ধতির যাবতীয় আঙ্গিকে যে কাজ করার চল রয়েছে সেটিতে মনোযোগী থাকতে হয়েছে তাঁকে। পঠনকালীন অাঁকাজোখায় শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার নিয়মটিকে পরম শ্রদ্ধা আর নিষ্ঠার সঙ্গে সমাধা করতে ব্রতী ছিলেন তিনি। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে মনীন্দ্রভূষণ গুপ্ত (নন্দলালের ছাত্র), আব্দুল মঈন, সত্যেন ঘোষাল, বসন্ত গাঙ্গুলী, প্রহলাদ কর্মকার, অতুল বসু, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ শিল্পীর কাজের এবং শিক্ষকতার ওপর তাঁর শ্রদ্ধা আজো অম্লান রয়েছে। তিনি এখনো তাঁদের স্মরণ করে বলেন, ‘যে-কোনো শিক্ষকের কাজ থেকে কিছু পাওয়াটাই বড়। সে-চেষ্টাই চিরকাল করেছি। কলকাতাতেও করেছি, বিলাতেও। শিক্ষকদের কাছে নিজের বিদ্যা জাহির করলে ঠকতে হয়, শেখা যায় না।’ তিনি মনে করেন শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি তাঁর ‘বেইস’ তৈরি করার সব কিছুই পেয়েছিলেন। অ্যাকাডেমিক পদ্ধতির সঠিক রপ্তকরণই প্রতিটি শিল্পীর ‘বেইস’। ব্যাকরণ জানার জন্যেই ‘অ্যাকাডেমিক স্টাডি’ অবশ্যই প্রয়োজন। যে-কোনো শিল্পকলার ছাত্রের বা শিল্পীরই এটা রপ্ত করা বাঞ্ছনীয়। তিনি নিজে তাই মেনে চলেছিলেন। এবং সে-কারণে তাঁর ছাত্রাবস্থায় কৃত অ্যাকাডেমিক পদ্ধতির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছিল। এই সময়ের অাঁকা তাঁর বাস্তবধর্মী ছবি যে কোন ‘স্টিল-লাইফ’, ‘নিসর্গচিত্র’, ‘প্রতিকৃতি’ বা ‘মানুষ’ কিংবা ‘কম্পোজিশন’, ড্রইং অথবা স্কেচ তা-ই প্রমাণ করে।
শিল্পীর পরবর্তী অধ্যায়টি স্কেচধর্মী তৈলচিত্র এবং উড এনগ্রেভিং পর্বের সাফল্যজনক চর্চার। এ-সময়ের দুমকা থেকে বিষয় নিয়ে তাঁর সৃষ্ট তৈলচিত্র এবং উড এনগ্রেভিংয়ে আলোছায়া নিয়ে কাজ করেছেন। সেক্ষেত্রে পুরোপুরি অ্যাকাডেমিক যে-পদ্ধতি তাঁকে বর্জন করে বরং ইম্প্রেসানিজমের দিকেই ঝুঁকেছিলেন বেশি। প্রকৃতি থেকেই বিষয় নিলেও অর্থাৎ গাছ, মানুষ, আকাশ, মাটি, ঘরবাড়ি বা পশুপাখির মূল অবয়বকে বা এগুলোর গঠন এবং ভঙ্গিকে অবলম্বন করলেও সরাসরি অনুকরণের চেষ্টা না করে এসবের উপস্থিতিকে ধারণা মতন করে ব্যবহার করে তাতে আলো-ছাড়া, রং আর সময়কে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। এ-ধরনের একটি দুমকা সিরিজের ‘কুইক-স্কেচকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। ছবিটিতে দুমকার শুকনো আবহ আনতে ব্রাউন বা আম্বার সেইসঙ্গে ওকারের ব্যবহার করেছেন, ঈষৎ ভিরিডিয়ানের সঙ্গে এখনো উজ্জ্বলতা হায়ায়নি একটুও। উড এনগ্রেভিংয়ের কাজে কালোর বিপরীতে আলো হিসেবে কাগজের সাদাকে ছাড়ার অভূতপূর্ব কারিগরি, দক্ষতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সাদা-কালো ছবির এই আলো বিতরণে সুন্দর মিনিমাইজেশন থাকায় কোথাও কাটা বা শার্প-এজড থাকার দোষে দুষ্ট হতে তিনি দেননি। উড এনগ্রেভিং এবং এচিংয়ের এই আলো তখন একান্তই সফিউদ্দীনের নিজস্ব একটি আবিষ্কার আর দক্ষতার বলে পরিচিত ছিল।
দেশভাগের পর তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল খেটে খাওয়া মানুষ। কৃষক, কাঠমিস্ত্রি, শ্রমিক কিংবা মাঝি এবং এদের হাড়ভাঙা খাটুনি ছিল শিল্পী সফিউদ্দীনের অন্যতম প্রধান বিষয়। এসব বিষয়েও আলোছায়া ছিল মুখ্য। কিন্তু তার সঙ্গে কিছু ছবিতে বিষয়ের আদলকে ড্রইংয়ের ফর্মের, রঙের এবং টোনের ভাঙা ছকে রেখে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। লোকশিল্পের ঢংও খানিকটা রাখার চেষ্টা ছিল এ-সময়। পূর্বে তৈলচিত্র এবং স্কেচ বা ড্রইংধর্মী কাজই তিনি বেশি করেছেন এবং তাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেষ্টা করেছেন।
পরবর্তী অধ্যায়টি তাঁর বিলেতে যাওয়ার পর যে-ধারায় এবং মাধ্যমে কাজ করেছেন সেখান থেকে শুরু করে দেশের মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত সময় কালটিতে করা কাজগুলোকে নিয়ে। বিলেতে এচিং-অ্যাকুয়াটিন্টেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন বেশি। অতএব পরবর্তীকালে সেখান থেকে ফিরে এসেও সে-মাধ্যমেই তাঁর রচনা অব্যাহত রেখেছিলেন। তবে তৈলচিত্র এবং ড্রইংয়ের চর্চাকে সরিয়ে রাখেননি। শিল্পীর এই পর্যায়ের ছবি ভিন্ন স্বাদের। অাঁকার পদ্ধতি, মাধ্যমের ব্যবহার এবং প্রকাশে তিনি সময়টিতে অত্যন্ত সচেতনভাবে রোমান্টিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন।
চমৎকার দক্ষতা আর ‘মিনিমাইজড ডিসটরশান’ শিল্পীর ছবিতে এ-সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রধান পর্যায় ছিল। অ্যাকুয়াটিন্ট ডাস্ট ব্যবহারের নিজস্বতা অন্যান্য রঙের সঙ্গে কালোকে সঠিকভাবে প্রয়োগের নিজস্বতা, বিষয় বিন্যাস এবং প্রকাশের নিজস্বতা, তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ধরন বলে পরিচিতি পায়। এক্ষেত্রে সবার ওপরে যে-কথাটি আসা উচিত বলে শিল্পী মনে করেন তা হলো ‘দেশাত্মবোধ’। বিলেতে বসবাসকালে চর্চায়ও দেশের বিষয় এবং ধরন নিয়ে কাজ করেছেন। বন্যা, দেশের প্রকৃতি, নদী-নৌকা, মাঝি আর জেলে, মানুষের দুর্গতি-দুর্ভোগ ইত্যাদি ছিল তাঁর প্রবাস জীবনেও ছবির বিষয়। তাঁর বিখ্যাত রেসিডিং-ফ্লাড, ফ্লাডেড ভিলেজ ফিশিং, বিক্ষুব্ধ মাছ ছবিগুলো তাঁর সে-ধরনের বিখ্যাত কয়েকটি ছবি।
সফিউদ্দীন আহমেদের ছবিতে শুধু বিষয়েই নয়, ধরনের মধ্যেও দেশীয় লোকশিল্পের কিছু কিছু উপাদান তিনি ব্যবহার করেছেন। বিদেশের সুখী পরিবেশে অবস্থান করেও বিড়ম্বনাময় দেশকে ছবিতে অত সুন্দর আর স্বার্থক করে তুলে ধরার দৃষ্টান্ত বোধহয় নেই বললেই চলে। বিলেতে থাকার সময় ছাপচিত্রের টেকনিকগুলো জানবার, অনুধাবন করবার চেষ্টা করেছেন, ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করেছেন ইউরোপীয় কায়দাতেই। কারণ মাধ্যমটির পুরো আধুনিক পদ্ধতিটি ইউরোপ থেকেই উৎসারিত। ধাতব পাতের গঠন তাতে সফট কিংবা হার্ড গ্রাউন্ড তৈরি করে অাঁচড় দেওয়া, অ্যাসিড দিয়ে একেক প্লেটের প্রয়োজন অনুসারে তাকে খাওয়ানো, পাতের কিনারে ঘষে ঘষে বিভলিং-ঢাল সৃষ্টি করে মেশিনের চাপে সমতল কাগজে ছাপের এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং কাগজের ঘনত্ব বানানো ইত্যাদি পুরো ব্যাপারটিই ইউরোপ থেকে আবিষ্কৃত। এসবে এক এক শিল্পী তাঁর নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে নতুন নতুন ‘অফেক্ট’ সৃষ্টি করেন। শিল্পী সফিউদ্দীনও তা করতে পেরেছিলেন। আবিষ্কার করেছিলেন নিজস্ব অনেক কিছু। এবং একটি ছবিতে কাজ করতে গিয়ে কিছু নতুন বা অভিনব জিনিসের সন্ধান ঘটলে এমনকি ‘অ্যাক্সিডেন্টাল’ হলেও তাকে তিনি অন্য ছবিতে আবার রাখার চেষ্টা করেছেন। এ-প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, ‘এক ছবি থেকে কিছু আবিষ্কার করলে পরবর্তী ছবিতে তাঁর ব্যবহার করা এবং তার ফলাফল দেখে আবার কিছু পেলে পুনরায় আরেকটিতে তার ব্যবহার করা, এভাবে দেখতে দেখতে খুঁজতে খুঁজতে চলাতেই আনন্দ। নতুন কিছু পাওয়ার আশায় যে এগিয়ে যাওয়া সেটিই তো আসলে শিল্পীদের অনুপ্রেরণা। এইটিই আসল। শিল্পকলার ক্ষেত্রে শিল্পীর এ-কথাটি হয়তো অত্যন্ত সত্যি। নতুন কিছু সৃষ্টি আর পাওয়ার আশাটি মরীচিকার মতো আকর্ষণ করে বলেই শিল্পীরা একের পর এক ক্যানভাস সাজিয়ে তোলেন।
শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের ছাপচিত্রে দক্ষতাই শুধু নয়। এর নানাদিকে নতুনতর রস সৃষ্টির জন্যেই তাঁর এ-অধ্যায়ের কাজ দেশে-বিদেশে সমাদৃত এবং মানের দিক দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত হয়েছে। এসবের জন্যে প্যারিসে পিকাসো তাঁর গ্রাফিক্সের ছাপার জন্যে যে বিখ্যাত স্টুডিওটি ব্যবহার করতেন সেই মাদাম লা কুরিয়ারের স্টুডিওটিতে কাজ করার তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন।
সফিউদ্দীন আহমেদের গ্রাফিক্স বা ছাপচিত্রের প্রধান নিজস্বতা রয়েছে তামার ওপর নির্ভুল সাবলীল অাঁচড়ে ড্রইং রাখার, নিজস্বতা রয়েছে অ্যাকুয়াটিন্টের টোন ব্যবহারের পরিমিতিবোধে, নিজস্বতা রয়েছে কালো রংকে গ্রহণযোগ্য করে তোলায়। কালো রেখার মধ্যে ‘ডাইমেনশন’ আনতে টেক্সচারের কাজ কালোর ‘ফ্ল্যাটনেসে’ আলোকে ধরে রাখতে, দৃষ্টিকে কালোর মধ্যে বেমালুম হারিয়ে না ফেলে তাকে আটকে রাখতে তিনি যেভাবে চিন্তা করেছেন এবং এসবের ব্যবহার করে তা প্রমাণ করেছেন তা একান্তই তাঁর নিজস্ব আবিষ্কার আর উপলব্ধি। নিজস্ব অনুভূতি থেকেই তিনি তা ছবিতে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য তখন তাঁকে ছাপচিত্রের ব্যাপারে দেশে এবং বিদেশে প্রথম শ্রেণির একজন সৃষ্টিশীল শিল্পীর মর্যাদায় পরিচিত এবং অধিষ্ঠিত করেছে।
শিল্পীর পরবর্তী অধ্যায়টি শুরুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত শিল্পী একইসঙ্গে, একই রকমভাবে ছবি এঁকেছেন। ছাপচিত্রের পাশাপাশি তৈলচিত্রও রচনা করেছেন এমনিভাবে। তৈলচিত্রে শিল্পীর প্যালেটের পুরো রং ব্যবহারের প্রবণতা থাকলেও নীলকে প্রাধান্য দেন বেশি। ‘টেক্সচার্ড-গ্রাউন্ডে’ পরতে-পরতে, প্রতিটি ধাপে সব রকম রঙের ছোঁয়া লাগলেও অত্যন্ত টোনাল আচ্ছাদনে রংকে ব্যবহার করলেও, নীলকে তিনি চমৎকারভাবে বিস্তৃত করে রাখেন তাঁর ছবির বিন্যাসে। ছবিকে ঠান্ডা একটি মেজাজ দেয় সেই নীল এবং জ্যোৎস্নার আমেজ সৃষ্টি করে। এখানেও শিল্পীর রোমান্টিকতা প্রকাশিত। কি ছাপচিত্রে, কি অন্যান্য মাধ্যমে শিল্পী সফিউদ্দীন খুঁটিনাটির প্রতি অত্যন্ত যত্নবান চিরকালই। ছবির ব্যাপারেও অত্যন্ত খুঁতখুঁতে মেজাজের। এসব কারণে কোনো ছবিকেই তাৎক্ষণিকভাবে সমাপ্ত বলে ঘোষণা দিয়ে ছবিটিকে সরিয়ে রাখেন না। ‘ছবির শেষ বলে কিছু নেই’ – এ-কথাটিকে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। অতএব, আর সবার কাছে তাঁর যে-ছবি শেষ বলে মনে হতে পারে, তাঁর কাছে তা নয়। মোট কথা তিনি তৃপ্ত হতে পারেন না। একধরনের অতৃপ্তি সব সময়েই তিনি পোষণ করেন, যার দরুন একটি ছবিতেই তিনি বহুদিন ধরে কাজ করেন। এবং তা করেন অতি নিষ্ঠা আর ধৈর্যের সঙ্গে। এ-কারণেই হয়তো তাঁর ছবির সংখ্যা আর সব শিল্পীর চেয়ে কমের দিকে থাকে। তবু শিল্পী, তাঁর নিজের মতে অনড়, অটল থাকতেই বিশ্বাসী।
এ-ব্যাপারে শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ শিল্পীদের স্বাভাবিক চিন্তাধারা এবং বিশ্বাসের অনেক কিছুতেই দ্বিমত পোষণ করেন। এভাবে তিনি যেমন কাজের অহেতুক অসংখ্যতায় বিশ্বাস করেন না, তেমনি বিশ্বাস করেন না শিল্পীদের নিজের কাজের প্রতি অনীহাকেও। নিজের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার অতএব, উপদেশ তাঁর চর্চা দিয়েই তিনি প্রকাশ করেন। শিল্পকলার অন্তর্নিহিত রস আর রূপকে খোঁজার অনুসন্ধিৎসা এবং নিয়মিত চর্চায় তিনি বিশ্বাসী, এটাই যথেষ্ট বলে তিনি মনে করেন। এ দুইয়ের মধ্যে থেকেই শিল্পীর বোধ এবং ঢঙে নিজস্বতা প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে। একজন শিল্পীর রসপ্রাপ্তি এভাবেই ঘটতে সহায়ক হয় এবং সৃষ্টিশীলতাও এই প্রক্রিয়াতেই আত্মস্থ করা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
শিল্পীর পরবর্তী পর্যায়ে সর্বশেষ ধাপটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অর্থাৎ একাত্তর থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত। একাত্তরের পাক বাহিনীর গণহত্যার ভয়াবহ দিনগুলো শিল্পীকে একাধারে যেমন আতঙ্কগ্রস্ত করে, তেমনি প্রতিটি বাঙালির আতঙ্কগ্রস্ত হতবাক চেহারাগুলো মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে চিন্তিত করে, বেদনাহত করে। শিল্পী এ-সময়ের অনুভূতিগুলোকে, ঘটনাগুলোকে নিয়ে ছবি অাঁকেন। বেশিরভাগই ড্রইং। মানুষ প্রধান বিষয় হয়ে উপস্থিত হয় সেসব ড্রইংয়ে। একাত্তর তাঁকে এতই আলোড়িত করে যে, তিনি পরবর্তীকালেও অর্থাৎ এখনো একাত্তরকে স্মরণ করে তাঁর চিত্র রচনা করে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিককালের এরকমের একটি রঙিন এনগ্রেভিং ‘একাত্তরের স্মরণে’। অসংখ্য চোখকে বিন্যাস করে তাঁর এ-ছবিটি রচিত। উল্লেখ্য, বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময়ও শিল্পী চোখ নিয়ে কম্পোজিশন করেছিলেন, বায়ান্নতে যে-যুদ্ধের শুরু, যে- আন্দোলনের শুরু হয়েছিল ’৭১ তারই চরমসীমা। অতএব শিল্পী দুটি সময়কে একই সূত্রে গেঁথে রেখেছেন একই অনুভূতিতে। এনগ্রেভিংগুলো মূলত ড্রইংপ্রধান। অত্যন্ত শক্তিশালী, গতিশীল অথচ ছন্দময় রেখার বিন্যাসে রচিত শিল্পীর এসব এনগ্রেভিং। সেইসঙ্গে এনগ্রেভিংয়ের মূল করণশৈলী ও বৈশিষ্ট্যে শিল্পীর চিরাচরিত দক্ষতা তো আছেই। অাঁচড়ে রেখার পার্থক্য রক্ষা করার কৌশলগত দক্ষতার সঙ্গে বিষয়কে ফুটিয়ে তোলার যে তাঁর এনগ্রেভিংয়ের নিজস্ব ধরন রয়েছে তার পূর্ণতার প্রকাশ ছবিগুলোকে শৈল্পিক রসের মাধুর্য দিয়েছে।
একাত্তরের পর তৈলচিত্রে হাত দিয়েছেন শিল্পী ভিন্নভাবে। ফর্ম ভেঙে কাজ করেছেন। বিষয়কে ভেঙে কাজ করেছেন এবং এভাবে কাজ করতে গিয়ে ছবিতে সূর্যের মতো গোল ফর্মের ব্যবহার করেছেন। শিল্পী এ-সম্পর্কে বলেন, ‘আমি আগে কখনো ছবিতে গোলাকৃতি ফর্মকে প্রশ্রয় দিইনি। কিন্তু স্বাধীনতার পর হঠাৎ করেই ওই সূর্যের মতো আকারটি এসে গেছে হয়তো অবচেতন থেকেই। ছবি ভীর্ষণভাবে ওটা ডিমান্ড করে। বাদ দিতে পারি না।’ ফর্মটি ভাঙা গেল না। প্রয়োজন বলে ভাঙলাম না। তাঁর ’৭১-এর ওপর অাঁকা মুষড়েপড়া কান্নাময় প্রকৃতিতে অসংখ্য চোখ এসেছিল ফর্ম হয়ে স্বাধীনতার পর আনন্দ আর উচ্ছ্বাসকে ধারণ করতে আর তা ব্যবহৃত হয়েছে মিষ্টি রং আর টেক্সচারে সমৃদ্ধ অাঁকার ধরনে।
সফিউদ্দীন আহমেদ এখন প্রচন্ডবেগে কাজ করছেন। অনেক ছবি জমা হয়েছে। নানা ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। নানা মাধ্যমে করছেন। বিষয় হিসেবে ‘স্টিল-লাইফ’ও করেছেন। জড়-জীবনের বিষয়কে ফর্মকে, রেখাকে ভেঙে বিস্তৃত করে এবং সেসবের ফর্মকে মিশ্রিত করে তার ইচ্ছামতো বিন্যাস করেছেন। জড়-জীবনের স্থবিরতাকে ভেঙে ছবিতে স্পেসে বিষয়কে চলমান করার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। শিল্পী বলেন, ‘জড়-জীবন বাস্তবে আপাতদৃষ্টিতে নিষ্ফল জড় হলেও ছবিতে এসে তা থাকে না। শিল্পীর হাতে তা জীবন পায় রং, ফর্ম, রেখা, স্পেস, ঘনত্ব ইত্যাদি ছবির মূল উপাদানগুলোকে সঙ্গী করে বিষয় তার গতি পায়, মুভমেন্ট আসে। ছবির মধ্যে সে-চলমানতা অন্যান্য অনুষঙ্গের সঙ্গে মিশে নিজেকে প্রকাশ করে। এটি একটি উপলব্ধির ব্যাপার। শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের বিষয় হিসেবে জড়-জীবন চিরকালই খুব প্রিয়। চিরকালই জড়-জীবন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন। অতএব, শিল্পী বলেন, ‘স্টিল-লাইফ’ দিয়ে জীবনের ছবি অাঁকা শুরু করেছিলাম, সেটিতে শেষ কাজটিও করতে চাই,& এবং দেখতে চাই তখনকার দেখা আর এখনকার দেখার মধ্যে তফাৎটুকুকে।’ এ-ব্যাপারে শিল্পী এখনো এই জড় জীবন অাঁকাকে স্টাডি জ্ঞান করেন, অনুশীলনী পর্যায় চিন্তা করেন। এবং তিনি তাঁর অভিমতটি ব্যক্ত করেন এভাবে যে, সব বয়সেই সব সময়েই সৃষ্ট রং, ফর্ম, আকার-আকৃতি, পরিপ্রেক্ষিত, গতি, ছন্দ, বিস্তৃতি, পুনরাবৃত্তি, ডাইমেনশন, টেক্সচার, নকশা ইত্যাদি ধরনের যা কিছু আছে তার অনুশীলন প্রয়োজন। এসবকে সঠিকভাবে জানলে এগুলোর বৈশিষ্ট্যকে উপলব্ধি করতে পারলেই ভাঙা-গড়ার কাজটি সম্ভব হয়।
শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের সাফল্য এভাবেই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে খ্যাতির চূড়ায়। তিনি অন্যদের জন্যে অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় শিল্পীব্যক্তিত্ব হতে পেরেছেন তাঁর সারা জীবনের কর্মসাধনা দিয়ে। তাঁর কর্ম, তাঁর নিষ্ঠা, তাঁর সুস্থ ভাবনাচিন্তা, রুচির উপলব্ধি আর সবার জন্যে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে চিরকাল। আমরা শিল্পীর দীর্ঘায়ু কামনা করছি। 

[রচনাকাল : অক্টোবর, ১৯৮৭, সংবাদে প্রকাশিত : নভেম্বর-১৯৮৭]