সংগীতের সমাজতত্ত্ব সিমেল থেকে মার্কস

লেখক: মুহাম্মদ হাসান ইমাম

মিউজিকোলজি সীমা থেকে অসীমের প্রতি ধাবমান এক শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। পূর্বে বিখ্যাত কম্পোজার, তাঁদের সাধনা, হস্তলিপি থেকে বর্ণ, যৌনতা, জ্যাজ বা রকের উৎপত্তি ও সম্পৃক্ততা নিয়ে আজ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সংগীতের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে পাঠ্য-সমালোচনা, আনুষ্ঠানিক বিশ্লেষণ, প্যালিওগ্রাফি, বর্ণনার ইতিহাস বা আর্কাইভভিত্তিক গবেষণা থেকে বর্তমানে ডিকনস্ট্রাকশন, উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্লেষণ; অবভাসতত্ত্ব ও পারফরম্যান্স পাঠের বিষয়গুলো চলে এসেছে। অর্থাৎ দার্শনিকতা, সমালোচনাতত্ত্বের বিতর্ক ও সাক্ষ্য-প্রমাণের নতুনতর পদ্ধতিতত্ত্বের হাওয়া মিউজিকোলজির সমগ্র পরিম-লকে প্রসারিত করেছে। নতুনভাবে সাংগীতিক টেক্সের ধারণা, নতুন বিশ্লেষণী কৌশল ও বিষয়-সম্পর্কিত নতুন ভাবনা-চিন্তা একত্রিত হচ্ছে। আর সংগীতের সমাজতত্ত্ব সমাজ পরিসরে সংগীতের উদ্ভব, বিকাশ ও প্রভাবের দিকটি গভীরভাবে জানতে চায়। সংগীত নিঃসন্দেহে হৃদয়গ্রাহী, সংহতি-শক্তির আধার। মানুষকে এবং মানুষের আন্তঃক্রিয়াকে বহুমুখী করতে প্রভাব রাখে। আবার সংগীতের আবহে মানুষ উন্মনা, স্থির ও আধ্যাত্মিকভাবে নিমজ্জিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সংগীত কথার চেয়ে বেশি অর্থপূর্ণ। কবে কখন সংগীত কী আকারে আবির্ভূত হয়েছে, তা স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে মানুষের ভাষার আগে শব্দের বা ইঙ্গিতের যে-ব্যবহার শুরু হয়েছিল তাতেও সংগীত লুকিয়ে ছিল। আমরা যাকে বাজনা বলি সংগীতের এই অনিবার্য উপাদানটি পূর্ণাঙ্গ সংগীতের পূর্বসূরি বলা যায়। মানুষ যখন ভাষা শিখল, অর্থময়তায় আবদ্ধ হলো, বাণীর সৃষ্টি হলো, তখন পূর্ব থেকে চর্চিত বাজনার তালে তালে সেই বাণী উচ্চারিত হতে থাকল। এই উচ্চারণ ক্রমাগত পরিশীলিত হতে হতে সুসংবদ্ধ সুরের সৃষ্টি করল। এর সঙ্গে রাগ-তাল যুক্ত হয়ে সংগীতকে সর্বোৎকৃষ্ট একটি শিল্প হিসেবে মানবীয় সংস্কৃতির অঙ্গীভূত করল।

সংগীতের সমাজতত্ত্ব দেখতে চায় সমাজের উৎসমুখগুলো কীভাবে সংগীত-সৃষ্টি, অনুশীলন ও সম্পাদনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে আত্মসুখ লাভের জন্য সংগীত সাধনা করা হয়ে থাকে, কিন্তু সে-সংগীতের বাণীও অনেক ক্ষেত্রে সমাজসঞ্জাত। সংগীতের শ্রবণ, শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে এক ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই সম্পর্ক যে একমুখী তা নয়, শ্রোতা তার শ্রবণের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ভাষায়, আচরণে, কখনো সমাজে, কখনো শিল্পীর উদ্দেশে। শ্রবণ একটি অনিঃশেষ ক্রিয়া; কোথায় কখন যে কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে বলা কঠিন। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে সংগীত সৃষ্টি ও সম্পাদন একটি দলীয় তথা সামাজিক ব্যাপার। শুরু থেকেই সংগীতের দলীয় অভিব্যক্তি-আয়োজন সংগীতের সামাজিকতাকেই প্রকাশ করে। আমরা জানি, সংগীতের ধরনগত পার্থক্য রয়েছে। দেশে দেশে সংগীত তার নিজস্ব মূর্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষত উচ্চাঙ্গসংগীত, আধুনিক সংগীত ও জনপ্রিয় সংগীতের ধারা যেন অনেকটা সাধারণ। সংগীতের উৎপত্তি যে জঙ্গলেই হোক, রাজদরবারে স্থান ও পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার গৌরব সে পেয়েছে। আবার গণমানুষের সংগীত হিসেবে ঈশ্বরবাদী, অধ্যাত্মবাদী, দেহতাত্ত্বিক প্রভৃতি সংগীতের স্বসৃষ্ট জগৎ লক্ষ করা যায়। এদের শ্রোতাকেও আলাদা করা যায়। যদিও শ্রোতাদের স্থান পরিবর্তন হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তারতম্য ঘটেছে, তবে একটি শ্রেণিচরিত্র পাওয়া যায়। অর্থাৎ শ্রেণিভিত্তিক সংগীত-শ্রোতাদের একটা বিভাজন লক্ষণীয়।

আজকের দিনে সংগীত অনেক স্থায়ী ও সহজলভ্য হয়েছে রেকর্ডিং ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার সুযোগে। এতে করে সংগীত শুধু শিল্প হিসেবে বিস্তৃতি লাভ করেছে তা-ই নয়, পণ্য হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। এই পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যারা সংযুক্ত তাদের সংখ্যা অজস্র। এসব কারণে সংগীতের সমাজতত্ত্ব ক্রমশ গভীরতর হচ্ছে, ত্বরান্বিত হচ্ছে, প্রতর্কের সৃষ্টি করেছে। সাধারণভাবে বলা যায়, সামাজিক ক্রিয়া হিসেবে সংগীতের সৃষ্টি ও শ্রবণ সতত মতৈক্যের ও পুনর্গঠনের বিষয়বস্তু রয়ে গেছে।

শ্রোতার কাছে সংগীত স্বীকৃত হয় প্রথাগত ধারা ও অনুশীলনের ধরন এবং নিয়মনীতির কারণে। সুতরাং অপ্রথাগত ও অসংগত সংগীতকে শ্রোতৃম-লী প্রত্যাখ্যান করে। শ্রোতার এই প্রত্যাখ্যানের একটি বড় কারণ হলো প্রজন্ম পরম্পরায় এক ধরনের সংগীত-চেতনার সঙ্গে বসবাস করে আসছে। কোনো সংগীত যখন তার অন্তর্নিহিত সংগীত-চেতনার সঙ্গে মেলে না তখন তা পরিত্যাজ্য হতে পারে। তবে এখানে আরেকটি বিষয় চলে আসে, তা হলো, যারা কম সংগীত শুনেছে, বা যাদের মধ্যে সংগীতের ঐতিহ্য সৃষ্টি হতে পারেনি, তারা যা কিছু নতুন শুনবে তাকেই গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চালাবে। দলগত হলে এটি আরো সহজেই লক্ষণীয় হয়। এখানে বলে রাখা ভালো যে, দলগত একাত্মতা দৃষ্টিগ্রাহ্য সংগীতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহজ-অনুধাবনীয় একটি দিক। আমরা জনপ্রিয় সংগীত

বা ভাব-সংগীতের ক্ষেত্রে এই দলগত শ্রবণ ও পরিবেশন লক্ষ করলেও অন্যান্য সংগীতের ক্ষেত্রেও এলাকা, দেশ এমনকি জাতিগত একাত্মতা আবিষ্কার করা সম্ভব। যেমন রবীন্দ্রসংগীতের শ্রোতৃম-লী অনেক বেশি একাত্ম ও সংগঠিত। আবার লালন-ভক্তদের একাত্মতা ও নিবিড় বন্ধন তাদের শ্রবণের একটি বিশেষ প্রলক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত এমনকি নিরক্ষর মানুষেরাও সমানভাবে পল্লীগীতির পিপাসু।

সিস্টেম্যাটিক মিউজিকোলজি একটি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান হতে পারে যা মনোসংগীততত্ত্ব, সমাজসংগীততত্ত্ব ও সংগীত-বিশ্লেষণের তিনটি ধারাকে সমুন্নত রাখবে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ‘সংগীতের সমাজতত্ত্ব’ নয়, বরং ‘সিস্টেম্যাটিক মিউজিকোলজি’ গুরুত্ব পেয়েছে। সংগীতের সমাজতত্ত্ব এখনো সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এরকম সমস্যা অন্যান্য শাস্ত্রীয় শাখায়ও রয়েছে। এছাড়া সংগীতের মতো একটি বহুমুখী মানবীয় শাখার সমাজতাত্ত্বিক অনুধাবন এখনো ব্যাপক নয়। শাস্ত্রীয়সংগীত, সংগীত থেরাপি, সংগীতের ইতিহাস, গণযোগাযোগ, সংগীতশিল্পীর পরিবেশন, সংগীতশিক্ষা প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে গবেষণা ও আলোকপাত সমাজবিজ্ঞানের এই নতুন শাখাকে করতে হবে। যদিও সমাজতত্ত্ব-অনুরাগী বিশ্লেষকরা সংগীতের মধ্যে ও বাইরে আন্তঃক্রিয়াশীল মানুষকে খুঁজেছেন, আলোচক-সমালোচক কিন্তু ‘সংগীতের সমাজতত্ত্ব’ বিষয়টিকে বাঁকাভাবেই দেখেছেন। এই

যৌথতার কথা আমরা ভুলে যাই বলেই সমাজ-উদ্ভূত বিষয়কে সমাজবিচ্যুত ভাবি। সমাজের বিমূর্ততা আমাদেরকে তার অস্তিত্বহীনতার কথা ভাবতে শেখায়। সংগীতের মধ্যে সমাজ-অনুসন্ধান সে-কারণে দৃষ্টিকটু মনে হয়।

অনেকের মূল্যায়নে এটি স্পষ্ট যে, সংগীতকে বিশ্লেষণ করার মতো সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত আয়োজন সমাজবিজ্ঞানের নেই। মারটিন সঠিকভাবেই বলেছেন যে,  A key position of the book is that the task of sociologists of music is not to make judgement about the nature of music, about musical meaning or musical values, but rather to examine the processes by which music, its meanings and values come to be produced, accepted, maintained and contested by particular social groups in particular times and places। যা হোক, পর্যালোচকদের অনেকে ‘সংগীতের সমাজতত্ত্বের’ তেমন অযৌক্তিকতা আবিষ্কার করতে সমর্থ হননি। বরং সার্বিকভাবে ‘সংগীতের সমাজতত্ত্বের’ মৌলিকত্ব ও গ্রাহ্যতা স্বীকৃত হয়েছে।

 

জর্জ সিমেল

সিমেলের প্রথম প্রকাশিত গবেষণা সংগীতের সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্দীপনাময়। যদিও সংগীতের সমাজতত্ত্ব সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংবদ্ধ তত্ত্ব এখানে পাওয়া যায় না, তবুও সংগীতে তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণা বলতে চেষ্টা করে যে, সংগীতে কীভাবে সামাজিক অর্থ ব্যক্ত হয় এবং সমাজে সংগীতের অবস্থান ও ক্রিয়া কীভাবে চিহ্নিত করা যায়। সিমেল ১৮৫৮ সালে জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁর রচনার নতুন করে মূল্যায়ন হয়েছে। তবে তাঁর প্রথমদিকের লেখাগুলোর মধ্যে মানবজীবনের শিল্পসত্তা, সংগীত ও লোকসংগীততত্ত্বের যে-সম্ভার লক্ষ করা যায়, তা এখনো যথেষ্ট মূল্যায়নের অপেক্ষা রাখে। জীবন সম্পর্কে সিমেলের শিল্প ও নন্দনতত্ত্ববিষয়ক দার্শনিক ভাবনা আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর ÔPsychologische und ethnologische Studien über MusikÕ প্রবন্ধ সংগীতের সমাজতত্ত্বের জগতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সিমেলের সংগীতবিষয়ক আলোচনা সমকালীন লেখকরা অবহেলা করার একটি প্রধান কারণ হলো তিনি মনে করতেন, জনতাত্ত্বিক লোকসংগীতের সঙ্গে সামাজিক গোষ্ঠী-মনস্তত্ত্বের সংযোগ রয়েছে। এছাড়া সমষ্টিগত সচেতনার ধারণা জার্মানিতে দেরিতে আসে। সিমেলের আলোচনার যেটি উল্লেখযোগ্য দিক তাহলো ব্যক্তি-যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সংগীতের তাৎপর্য উপস্থাপন। তিনি মানবীয় সম্পর্কের কাঠামো তৈরি ও সংগীতের গুরুত্বসহ সর্বোপরি সংস্কৃতির বৃহত্তর পরিধিতে এর নান্দনিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

সিমেল সংগীতকে সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা আবার নান্দনিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। সে-কারণে সিমেলের আদি রচনা, বিশেষত তাঁর প্রবন্ধটি, আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সংগীত ও শিল্পের আওতাভুক্ত। প্রথমে দেখা যাক সিমেল সংগীত সম্পর্কে কী ভাবেন। সিমেল তাঁর বক্তব্যের শুরুতে সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে ডারউইনের তত্ত্ব আলোচনা করেন। ডারউইনের মতে, মানুষ বাচন ও তাল উন্নয়নের আগে কণ্ঠসংগীতের উন্নতি ঘটায়। সিমেল বিশ্বাস করতেন, কণ্ঠসংগীতের বা কণ্ঠ-নিঃসৃত যে-কোনো কৌশলে শারীরিক ভিত্তি কাজ করে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এটি কতটা প্রতিষ্ঠা করা যাবে সে-ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিঃসন্দিগ্ধ হতে পারেন না। তিনি কণ্ঠের শারীরিক ভিত্তি স্বীকার করলেও কণ্ঠপ্রতিভার ক্ষেত্রে জেনেটিক গুণাবলি স্বীকার করেন He views music as an acoustic medium of communication which conveys feelings of the performer । তিনি বারবার বিভিন্ন তথ্যসহকারে বোঝাতে চেয়েছেন যে, সংগীত ভাষা বিবর্তনের একটি উন্নত ধাপ, যা ভাষানির্ভর যোগাযোগের বিশেষ পর্যায় নির্দেশ করে, ভাষানির্ভর যোগাযোগের উৎপত্তিকে নয়। মানুষের বাক্যবিনিময় সব সময় আবেগকে যথার্থভাবে প্রকাশ করতে পারে না। আর সেক্ষেত্রে সংগীতের প্রয়োজনীয়তা প্রতিভাত হয়। এছাড়া ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহের আবেগাপ্লুত প্রকাশ সংগীতে সম্ভব হয়েছে। মানুষের কথা থেকেই চিন্তার জন্ম আর কণ্ঠসংগীত থেকে ভাষার উৎপত্তি হয়নি। বরং বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা, শ্রুতিমাধুর্য ও ছন্দময়তা বৃদ্ধির পেছনে সংগীতের প্রভাব অনস্বীকার্য। সংগীত হলো যোগাযোগের মাধ্যম, যার সঙ্গে ব্যক্তির আবেগ জড়িত থাকে। সিমেল তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে প্রচুর পরিমাণ জাতিতাত্ত্বিক উপাত্ত উপস্থাপন করেন। সিমেলের সংগীততত্ত্ব ক্রিয়াবাদী, বিবর্তনবাদী নয়। তাঁর কাছে কণ্ঠসংগীত ছন্দ-আরোপিত ও কণ্ঠস্বর-সমৃদ্ধ বক্তব্য। অন্যদিকে যন্ত্রসংগীত বা যন্ত্রের সাংগীতিক ব্যবহার হলো কণ্ঠসংগীত চর্চার বিস্তৃত রূপ। স্বাভাবিকভাবেই যন্ত্রসংগীত কণ্ঠসংগীতকে সুমধুর এবং শ্রুতিমধুর করে। তবে যন্ত্রসংগীতকে আবেগহীন বলা যাবে না। যা আবেগের অর্থ ও বহিঃপ্রকাশকে বাক্সময় করে তাকে নিছক যন্ত্রের ঝনঝনানি ভাবা ঠিক নয়। যন্ত্রসংগীত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজস্বতায় সমৃদ্ধ হয়েছে এবং পরিশীলনের উপযুক্ত শিল্প হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যদিও যোগাযোগের ক্ষেত্রে যন্ত্রসংগীতের মূল্য রয়েছে এবং এক্ষেত্রে তার ভূমিকা অনেক অপ্রত্যক্ষ, তবে কণ্ঠসংগীতের ভূমিকা যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক প্রত্যক্ষ। যা হোক, সিমেলের শিল্পতত্ত্বও সমাজ-কাঠামোর সম্পর্কের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়েছে। শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৌশল ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষঙ্গ যা এর সঙ্গে জড়িত তা সমাজতাত্ত্বিক শিল্প-মূল্যায়নের জন্য জরুরি। মানুষ কীভাবে সামাজিক উদ্গাতা হিসেবে সাংগীতিক গুণাবলি ধারণ করল; কীভাবে সংগীত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মকা- হিসেবে স্বীকৃত হলো এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের সংগীতের আয়োজন দেখা যায়, তা জানা প্রয়োজনীয়। সংগীতের সামাজিক সম্পাদন ও গ্রহণ আবার সংগীতকে আরো সংহত ও সুচারু করে। সিমেল শেষ বয়সে শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যা তাঁর প্রথম জীবনের সংগীতবিষয়ক লেখার পরিপূরকও বটে। ১৯১১ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ Philosophische Kultur ও ১৯১৭ সালে Grundfragen der Soziologie  লিখিত গ্রন্থটি এক্ষেত্রে উল্লেখ্য। দ্বিতীয় গ্রন্থটিতে সিমেল বলেন, শিল্প তার নিজস্ব গুণেই শিল্প এবং এক্ষেত্রে শিল্পের স্বায়ত্তশাসিত জগৎ আছে বলে তিনি মনে করেন। চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত শিল্প মানবীয় জীবনাশ্রয়ী হলেও জীবনমুক্ত অস্তিত্বের অধিকারী। উপকরণ হিসেবে যা গ্রহণের দরকার তা জীবন থেকে গ্রহণ করে, কিন্তু পরিণতি ও পরিপক্বতা লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে তা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। জীবন থেকে শিল্প সেটুকুই গ্রহণ করে, যা তার স্বভাবের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। তবে অনেকটা দুরখার মতো বলতে চেয়েছেন, এই শিল্পের একটা সামাজিক পরিণতি ও প্রভাব রয়েছে। বিশেষ মানুষের কর্মকা-ের ওপর নির্ভরশীল না হয়েও সামাজিক ফলশ্রুতি বয়ে আনে। দুরখার ‘সামাজিক ঘটনা’ প্রত্যয়টি এক্ষেত্রে স্মরণীয়। অন্যদিক থেকে বলা যায়, শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের স্বাধীনতাকে বোঝাতে গিয়ে সিমেল কিছুটা দার্শনিকতার আলোকে শিল্পের স্বয়ম্ভূ সত্তার কথা বলেছেন। তবে এটি সত্য যে, শিল্পের বিচারে অগ্রসর হলে তার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে বাদ দেওয়া যায় না। তাছাড়া শিল্পের উপকরণ ও ফলাফলকে সামাজিকভাবে অনুসন্ধানের মধ্যে শিল্পের সমাজতত্ত্ব নিহিত। প্রথম দিকের রচনা সংগীতের সামাজিক যোগাযোগ ক্রিয়াকে দেখার ও বোঝার চেষ্টা করে। কোনো বিশেষ সংগীত অনপেক্ষ (absolutistic) বা আনুষঙ্গিক(referentialistic) অভিধা ব্যক্ত করে।

সিমেল আনুষঙ্গিক অর্থকেই প্রথম জীবনে গুরুত্ব দিতেন। এক্ষেত্রে সংগীত-বহির্ভূত জগতের ধারণা, ক্রিয়া ও আবেগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মধ্যেই গীতিকার ও সংগীতশিল্পী বসবাস করেন। এ বিশেষ সাংগীতিক কর্মকা- ও সংগীতের বিষয়বস্তু সমাজ-নির্ধারিত পছন্দ-অপছন্দের মধ্য দিয়েই পল্লবিত হয়। শেষ জীবনে সিমেল অনপেক্ষ বা সংগীতের মূলার্থ নিয়েই ব্যাপৃত থেকেছেন বেশি। সংগীতের উপাদানসমূহের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কই এখানে গুরুত্ব পায়, কারণ সংগীত-রচনার কাঠামো নির্মাণে এসব সম্পর্ক নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। যেহেতু সংগীতের সংজ্ঞায় আবেগের সঞ্চারণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তাই সিমেল জানতে চান, ‘সামাজিক যোগাযোগের কাঠামো’ আসলে কী? এখানে সিমেলের আগের কথা স্মরণ করা যেতে পারে যে – যন্ত্রসংগীত কণ্ঠসংগীতের মতো আবেদনশীল ও যথার্থ নয়। এজকোর্ন বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, যদি শ্রোতৃম-লী যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে তবে তারা যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে সমান মনোযোগী হবে। যেমন, সিনেমার দৃশ্যে যন্ত্রসংগীত এমন দক্ষতার পরিচয় দেয় যে, দর্শকবৃন্দ ঘটনার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। যন্ত্রসংগীত এখানে কণ্ঠসংগীতের চেয়ে কোনো অংশে কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

সার্বিক বিচারে সিমেলের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো :

শব্দযোজনা মূলত অর্থহীন থাকে যদি না তাতে আবেগময় ভাষার জন্য শ্রোতৃম-লী শিক্ষণ লাভ করে।

সংগীত মানুষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী বিভিন্ন সাংগীতিক শৈলী পছন্দ করে।

বড় শিল্প হবার জন্য সংগীতকে অবশ্যই সামাজিক বা জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করতে হবে। এভাবেই তা সকলের জন্য আবেদনশীল শিল্প হয়ে উঠতে পারে।

সংগীতকে তাই বলে দেশপ্রেমভিত্তিক হতেই হবে এমন নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিশৃঙ্খল সমাজ সবচেয়ে সুন্দর সংগীত উপহার দিয়েছে।

শিল্পীকে বড় হতে হলে তাঁকে একটি শিল্প-ঐতিহ্যের মধ্যে গড়ে উঠতে হবে, যা প্রকারান্তরে তাঁর অন্তর্গত প্রতিভার বিকাশকে সহজসাধ্য করবে।

 

ম্যাকস্ ওয়েবার

ওয়েবারের সংগীতবিষয়ক চিন্তা খুঁজে পাওয়া যায় Economy and Society (1921) শীর্ষক গ্রন্থে। ওয়েবার পুঁজিবাদের উৎস নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন ধর্ম, নৈতিকতা ও কাজের যৌক্তিকীকরণ কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজকে সম্প্রসারিত করেছে। Weber saw the rationalization of the Western cultures as the unique element that led to capitalist rise in the West. Part of this nationalization process was the growth of bureaucracies, as the increasing capitalistic division of labor compartmentalized and structured traditional organizations, like education and government, into bureaucracies। ওয়েবার মনে করেন, চার্চের ক্ষেত্রে যেভাবে আমলাতন্ত্র বিকশিত হয়েছে সেরূপ অন্যত্র দেখা যায় না। রোমান ক্যাথলিক চার্চের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অত্যন্ত সত্য। চার্চের গানের একটি ব্যাপার আছে। চার্চের জন্য গানের আয়োজন, প্রস্তুতকরণ ও সদস্যদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। রোমান ক্যাথলিক চার্চে সংগীতের নোটেশন সংরক্ষণ করা হয়। আর এই নোটেশন উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ব্যাপারটিকে ওয়েবার তাঁর পদ্ধতিতাত্ত্বিক বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, চার্চের পুরোহিত নোটেশনের পরিশীলন ও শিক্ষাদানেই কাজটি করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের এই দালিলিক প্রমিতকরণ ও যৌক্তিকীকরণকে ওয়েবার তাঁর গবেষণামূলক ফোকাস হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি ইউরোপকেন্দ্রিক ও আন্তঃসাংস্কৃতিক তুলনার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে, সংগীতের ক্ষেত্রে যৌক্তিকীকরণ হয় এবং চার্চের বৃহত্তর আমলাতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে তা বেড়ে ওঠে।

সংগীত সম্পর্কে ওয়েবারের অনুরাগ ছিল বিচিত্র। তিনি যেমন দীর্ঘ পরিসরে সংগীতের ঐতিহাসিক বিকাশ দেখেছেন, তেমন ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব নিয়েও ভেবেছেন। ওয়েবারের সময়টি ছিল পা-িত্যের সঙ্গে শিল্পের সংযোগের সময়। অর্থাৎ যে-কোনো বড়মাপের মানুষ শিল্পবোদ্ধা ও সংগীত-চেতনায় সমৃদ্ধ ছিলেন। ওয়েবারের শিল্পবোধ ও সংগীত-ভাবনা সে-কারণে ঐতিহ্যলালিত ও জর্মন সংস্কৃতিসঞ্জাত। যৌক্তিকীকরণ ওয়েবারের সকল রচনার প্রাণপাখি। তিনি ঐতিহাসিকতার দিক থেকে বলতে চেয়েছেন যে, প্রাচীন সংগীত আধুনিক সংগীতের রূপ নিয়েছে ক্রমাগত অযৌক্তিক গুণাগুণের প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। কর্ডভিত্তিক হারমনির বিকাশ এই সময়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে। সংগীতকার বা শিল্পী আগে তাঁদের ইচ্ছামাফিক তরঙ্গ সৃষ্টি করতেন, আর বর্তমানে সুসংগঠিত, পরিমিত ও করডাল হারমনির যৌক্তিক নীতির দিকে তা অগ্রসর হতে থাকে। রোমান ক্যাথলিক যাজকতন্ত্র, মধ্যযুগের সামন্তকাঠামো, স্বরলিপি, গিল্ড কর্তৃক সংগীতযন্ত্রের উদ্ভাবন, সংগীতে সুরেলা কথ্যভাষার ব্যবহার ইত্যাদি করেছেন এগুলোর সম্পর্ক ও পারম্পর্য অনুধাবনের জন্য। সংগীতের ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে দুটি মুহূর্তের কথা গুরুত্বসহকারে তিনি উল্লেখ করেন। আর তা হলো, যন্ত্রের আবিষ্কার ও স্থায়ীভাবে একটি কারিগর শ্রেণির উৎপত্তি এবং দ্বিতীয়ত শিল্পীর অধিষ্ঠান। কারিগর শ্রেণির কাজ ছিল সংগীতযন্ত্রের ক্রমাগত উৎকর্ষসাধন এবং যন্ত্রীর কাজ ছিল যন্ত্রের চাহিদা ও বাজার সৃষ্টি করা। সংগীতযন্ত্রের প্রমিতকরণ ও লিখিত স্বরলিপি একটি সংগঠিত আধুনিক সমাজের যৌক্তিক কর্মকা-। সেই তেরো শতকেই বিভিন্ন সামন্ত সভাকেন্দ্র নতুন নতুন যন্ত্রের চাহিদা সৃষ্টি করে এবং জটিল সংগীত-উপযোগী সূক্ষ্মতা দাবি করে। এমন চাহিদা সংগীত-শিল্পী ও সংগীত-সংকলকদের অনুপ্রাণিত করে।

অর্কেস্ট্রা ও তারযন্ত্রসমূহের উত্থান মধ্যযুগের পরেই সাধিত হয়। এখানে উল্লেখ্য, ওয়েবার তাঁর ঐতিহাসিক যৌক্তিকীকরণের

মধ্যে সংগীতকে সংযুক্ত করেন সংগীতযন্ত্রের অর্থনৈতিক মূল্য যাচাইয়ের মাধ্যমে। বলা হয়ে থাকে, শুধু অর্থনীতি নয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, কৃৎকৌশলগত, এমনকি জলবায়ুগত ফ্যাক্টর সংগীতযন্ত্রের যৌক্তিক উদ্ভাষণে যুক্ত হয়েছে। যেহেতু জলবায়ুগত কারণে ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের মানুষকে ঘরাবদ্ধ ও ঘরকেন্দ্রিক করে রেখেছিল সে-কারণে পিয়ানো দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংগীতচর্চা ও মর্যাদার সূচক হিসেবে পিয়ানোকে গণ্য করা হতো। ভোগ ও উৎপাদনের পুঁজিবাদ প্রসার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রচালিত পিয়ানোর চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। সমস্ত পশ্চিমা দেশে এবং তাদের উপনিবেশসমূহে উনিশ শতক থেকে সাংস্কৃতিক প্রলক্ষণবস্তু হিসেবে পিয়ানোর ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে পিয়ানোর বিবর্তন, ব্যবহার ও বিস্তারকে ওয়েবার পুঁজিবাদী সমাজের যৌক্তিকীকরণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতিতাত্ত্বিক পরিমাপের গভীরতা লক্ষ করা যায়, যা সংগীতের সমাজতত্ত্ব অধ্যয়নে অপার কৌশলিক অবদান হিসেবে অনস্বীকার্য। টারলির মূল্যায়নে ওয়েবারের সংগীত সম্পর্কীয় বক্তব্যের আরো বিস্তারিত সমালোচনা পাওয়া যায়, যা এখানে উল্লেখ না করে পারা যায় না। যেমন, ওয়েবারের পদ্ধতিকে শুধু যৌক্তিকীকরণ প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে না নিয়ে, ‘সংগীতের সত্যিকার অধ্যয়নের’ কাজে লাগানো যায়। স্বরলিপি, ছন্দ, লয়

প্রভৃতির আনুষ্ঠানিকতা সংগীতের সঞ্চরণকে স্বাধীন শিল্পের রূপ-পরিগ্রহ করতে সাহায্য করে। এমন স্বমহিমা সহজেই সংগীতকে প্রকাশনের উপযুক্ত পণ্যে পরিণত করে। পুঁজিবাদে সংগীতের এই বাজারিকরণ পরবর্তীকালে আরো জটিল পথ অতিক্রম করে।

টারলি মনে করেন, শিল্প ও সংস্কৃতি সমাজের শেষ প্রান্তিক উপাদান, যা পুঁজিবাদী যৌক্তিকীকরণের শিকার হলো। অবশ্য বিষয়টি আরো গভীর বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে। কারণ সমাজতাত্ত্বিক অর্থে সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। আমাদের প্রতিটি কাজ, স্থাপনা, বিশ্বাস, আইন ও প্রথা-প্রতিষ্ঠানই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। যদিও আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ক্ষেত্রে পণ্যায়ন সহজ-লক্ষণীয়, শিল্পের পণ্যায়ন একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে নয়। কারিগরি কাজ ও শিল্পকর্ম অনেক আগে থেকে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে আসছে। এ-ব্যাপারে অন্যত্র ব্যাপক আলোচনার সুযোগ আসবে। কিছু ক্ষেত্রে যেমন লোকসংগীত, আধ্যাত্মিক সংগীত, ও ধর্মীয় সংগীত অনেক পরে বাজার পেয়েছে। একথাও সত্য যে, ধর্মীয় সংগীত হয়েও পশ্চিমে তা অগ্রণী পণ্যায়নের শিকার হলেও আগে তেমনটি হয়তো হয়নি। কিন্তু পশ্চিমের বাইরে সংগীতের বিকাশও যে কত বিচিত্র ও চমকপ্রদ বিশেষায়ণের দৃষ্টান্ত রেখেছে তা ওয়েবারের যৌক্তিকীকরণের সমতুল্য তো বটেই, বেশি কিছুও বটে। যেমন, ভারতে সংগীতচর্চার ইতিহাস নিঃসন্দেহে দীর্ঘ ও বিচিত্র। উল্লেখ্য,

ইউরোপকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পশ্চিমা পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা ওয়েবারের সংগীতের সমাজতত্ত্বের প্রাথমিক ত্রুটি।

যৌক্তিকীকরণকে ব্যাখ্যার জন্য আমলাতন্ত্র ও সংগীতের বিকাশকে ব্যবহার করা অনেকটা মনগড়া মনে হতে পারে।

চীন, জাপান, মিশর ও ভারতের মতো দেশে সংগীতের দীর্ঘ ও ঐতিহ্যবাহী বিকাশধারা ওয়েবার না দেখার চেষ্টা করেছেন।

ইউরোপের বাইরের সমাজজীবনকে ও ক্ষমতার বলয়ে সংগীত ও সংগীতকেন্দ্রিক আমলাতন্ত্রের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে মনে হয় ওয়েবার তাঁর তত্ত্বকে আত্মকেন্দ্রিক করে ফেলেছেন।

হ্যাবারমাসের মতে, সংগীতের প্রতীকী ব্যঞ্জনা এমন একটি উৎকর্ষ-মাত্রা লাভ করে যা সাধারণ পুঁজিবাদী যৌক্তিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

হ্যাবারমাস মনে করেন, সাংগীতিক স্বরলিপি ও মানুষের অন্যান্য সংগীতবিষয়ক অবদান সংগীতকে যতটা গণমাধ্যমের সাথে সম্পৃক্ত করে, পুঁজিবাদী উদ্যোগ ততটা পারেনি।

হ্যাবারমাস Theory of Communicative Action প্রকাশের মাধ্যমে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, মার্কস শ্রমের ওপর যেভাবে এবং যতটা গুরুত্ব আরোপ করেছেন সেভাবে মানুষের আন্তঃক্রিয়া বা ভাবনা-চিন্তার লেনদেনকে মূল্যায়ন করেননি। সে-কারণে যোগাযোগমূলক ক্রিয়া নতুনভাবে মূল্যায়িত হওয়া দরকার।

যৌক্তিক ক্রিয়া, স্বরলিপি, যাজকতন্ত্র ও গিল্ড পশ্চিমা সংগীতের বিকাশের প্রধান কারণ নাও হতে পারে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, নগরায়ণ নাগরিক সংস্কৃতির উৎপাদনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। সম্প্রদায়, গতিময়তা ও সংস্কৃতি নগরায়ণকে পরিপূর্ণতা দিয়ে থাকতে পারে, যৌক্তিকীকরণ নয়। অবশ্য, নগরের বিকাশ ও নগরের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি এক অর্থে যৌক্তিকীকরণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

সংগীতকারদের সম্প্রদায়, অঞ্চল, সংগীতকেন্দ্রিক ব্যবসা, সংগীতের উৎপাদন ও প্রসিদ্ধি লাভের জন্য প্রয়োজনীয় বলে দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক পর্যায়ে জনপ্রিয়তাপ্রাপ্ত বিভিন্ন সংগীত দলের বিকাশ বিশ্লেষণ করলে অনেক নতুন উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়, যা ওয়েবারের ব্যাখ্যাকে নিতান্ত ক্ষুদ্রপরিসর গবেষণা হিসেবে নির্দিষ্টতা দেয়।

আজকের পুঁজিবাদী সংগীত আয়োজন, উৎপাদন ও বিতরণের সাথে কতিপয় কোম্পানির সম্পৃক্ততা লক্ষ করা যায়। এরা শুধু সংগীতকে পণ্যে পরিণত করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ উপার্জন করছে তাই নয়, শ্রোতাদের স্বাদকেও নির্মাণ করছে। সুতরাং যৌক্তিকীকরণের মাত্রা, পরিধি ও গুণাগুণ নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ এসে যাচ্ছে।

ওয়েবার সমাজবিজ্ঞানী হলেও সংগীতকার ও সংগীতের ওপর সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নগরায়ণ, নরগোষ্ঠী, সংগঠন ও সম্প্রদায়গত কাঠামোর প্রভাব যথেষ্টভাবে আসেনি। সুতরাং সংগীতের সমাজতত্ত্ব বিবেচিত হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদানও সন্নিবেশিত হয়নি।

তবে ওয়েবারের পদ্ধতিতাত্ত্বিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আজকের সংগীতভিত্তিক ব্যবসা ও তার ঐতিহাসিক প্রবণতাকে বোঝার জন্য সহায়ক হতে পারে।

যে-কাঠামোগত অধিষ্ঠান সংগীত সৃষ্টির পেছনে কাজ করেছে তার অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ সত্যই দুরূহ ব্যাপার। ওয়েবার এ-কাজে কিছুটা সাফল্য দেখিয়েছেন বলা যায়। ওয়েবার সংগীতের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আজকের সমাজবিজ্ঞানীদের সে-কাজটি করার জন্য ওয়েবারীয় যৌক্তিকতা, পুঁজিবাদ, ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত উপাদান উৎসাহিত করতে পারে। মারটিন মনে করেন, অ্যাডর্নো মূলত ওয়েবারের পথেই অগ্রসর হয়েছিলেন সংগীত গবেষণার ক্ষেত্রে। সার্বিক বিচারে বলা যায়, ওয়েবার সংগীতের সমাজতত্ত্বের পুরোধাপুরুষ।

 

হার্বার্ট স্পেনসার

উনিশ শতকের মধ্যভাগে বিবর্তনতত্ত্বের প্রাধান্য লক্ষণীয়। ডারউইনের The Origin of Species প্রকাশিত হলো ১৮৫৯ সালে। জীবজগতের বিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর এই তত্ত্ব প্রচলিত সমস্ত জ্ঞানের ধারণায় বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এলো। হার্বার্ট স্পেনসার বিবর্তনবাদের দ্বারা প্রভাবিত কিনা সে-প্রশ্নে না গিয়েও এ-ধারণা করা সম্ভব যে, স্পেনসারের চিন্তা সামাজিক বিবর্তনবাদের সূচনা করে। তিনি বিজ্ঞানের সমস্ত আবিষ্কারকে সংযুক্ত করে ক্রমান্বয়ে সামাজিক বিকাশের তত্ত্ব প্রদান করেন। এক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে অগ্রগণ্য। সংগীত-সম্পর্কীয় তাঁর চিন্তা ও রচনা সংক্ষিপ্ত হলেও তাৎপর্যহীন নয়। দি ইকোনমিস্ট পত্রিকায় কাজ করার সময় তিনি অপেরা, প্রদর্শনী ও কনসার্টগুলোতে যেতেন এবং বলতে গেলে এ-সময়েই সংগীত সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ জন্মায়। এ-সময় তিনি লেখক হিসেবেও নিজেকে তৈরি করার সুযোগ খোঁজেন। সংগীতের প্রশ্নে তাঁর আগ্রহ আনুষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা থেকে উদ্বুদ্ধ নয়, বরং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা থেকে পরিপুষ্ট। সুতরাং সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পেনসার খুব গভীরে যাওয়ার সুযোগ পাননি। তবে বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট উদ্দীপনাময় বক্তব্য রাখেন। যেমন, সংগীতের উৎপত্তি সম্পর্কে। এছাড়া ফ্যাক্টস অ্যান্ড কমেন্টস গ্রন্থেও কিছু প্রান্তিক মন্তব্য করেন। ১৮৫৭ সালের The Origin and Function of Music রচনায় তিনি এমন অভিমত ব্যক্ত করেন যে, সংগীত উৎপত্তিগতভাবে এবং স্বকীয়ভাবে কণ্ঠ-নিঃসৃত এবং সে-কারণেই স্বরযন্ত্রের ব্যবহার এখানে অত্যন্ত মৌলিক অবদান রাখে। তিনি বলেন, Vocal sounds are produced by the agency of certain muscles. These muscles, in common with those of the body at large, are excited to contraction by measurable and painful feelings. And therefore it is that feelings demonstrate themselves in sounds as well as in movement।

স্পেনসারের কাছে কণ্ঠের বৈচিত্র্য হলো অনুভূতির পার্থক্যের শারীরিক ফলাফল। সুতরাং মৌখিক অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে আমাদের অবশ্যই মানসিক ও মাংসপেশির উদ্দীপনার মধ্যকার সম্পর্ক জানতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি গুণাগুণ, উচ্চগ্রাম-লঘুগ্রাম, বিরতি এবং পরিবর্তনের হার হিসেবে কণ্ঠস্বরের পার্থক্য করেছেন। পরবর্তীকালে স্পেনসার মনে করেন, সংগীতের উৎপত্তি-সংক্রান্ত তত্ত্ব প্রদানের মতো যথেষ্ট উপাত্ত তাঁর কাছে আছে। তিনি মনে করেন, Vocal peculiarities which indicate excited feelings are those which especially distinguished song from ordinary speech. Every one of the alterations of voice which we have found to be a physiological result of pain or pleasure is carried to an extreme in vocal music।

স্পেনসার এ-কথাও বলেন যে, কণ্ঠসংগীত আবেগাপ্লুত বক্তব্যের চেয়ে আলাদা। এটি ক্রমবিকশিত ও সন্তর্পণে বিকশিত। তবে কিছুটা হেঁয়ালিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় যখন স্পেনসার আবার বলেন, সংগীত আবেগাপ্লুত মানবীয় কণ্ঠস্বরে ধ্বনির পর্দার পরিবর্তন (modulation) থেকে উত্থিত। অফার অবশ্য স্পেনসারের প্রথম লেখাটি আরো গভীরভাবে বিবেচনার যুক্তি দেখান। তিনি বলেন, সংগীত বিশেষভাবে একটি মানবীয় প্রপঞ্চ। স্পেনসার এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, That music is a product of civilization is manifest: for though some of the lowest savages have their dance-chants, these are of a kind scarcely to be signified by the title musical: at most they supply but the vaguest rudiment of music properly so called। ডারউইন এবং গারনির বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে স্পেনসার বিস্তৃতভাবে সংগীতের উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করেন। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর বিবর্তনতত্ত্বের আলোকে সংগীতের সাধারণ বিবর্তন সূত্রকে ক্রমাগত বৈসাদৃশ্যের দিকে ধাবমান ধরে নিয়েছেন। আবেগ সাধারণত মাংসপেশির সংকোচন ঘটায়। এটি শ্বাসক্রিয়া ও স্বরযন্ত্রের সংকোচনও ঘটায়। এভাবে আবেগ-সঞ্চারিত শব্দের উচ্চারণ স্বরযন্ত্র ও কণ্ঠসংগীতকে বিশিষ্টতা প্রদান করে। বিবর্তনের ধারা যেহেতু সরল থেকে জটিলতার দিকে ধাবমান এবং সমসত্ত্বতা থেকে অসমসত্ত্বতার দিকে ধাবমান, সে-কারণে আদিম বাদ্যসংগীত থেকে আজকের সংগীত অনেক সূক্ষ্ম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। এ-সময় ডারউইন সংগীত সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য উত্থাপন করে আসছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে সংগীতের পেছনে ক্রিয়াশীল আবেগকে সাধারণ না বলে যৌনতাধর্মী বলেছেন। অবশ্য স্পেনসার পাশবিক ইন্দ্রিয়জ শব্দ থেকে মানবীয় আবেগ-নিঃসৃত শব্দকে আলাদা করতে গিয়ে ডারউইনের এমন সাধারণ মত গ্রহণ করতে পারেননি।

সংগীতের সঙ্গে সঙ্গে হারমনি সম্পর্কেও তিনি আলোকপাত করেন। তাঁর মতে, হারমনি বিবর্তনের ফলাফল নয়। আবেগের প্রাকৃতিক ভাষার সঙ্গে একে সংযুক্ত করা ঠিক হবে না। হারমনির মধ্যে একাধিক সুরের সংমিশ্রণ ঘটে। সুতরাং একে মেলোডির বিবর্তিত ফলাফল বলা যায় না। বিবর্তনের প্রতিটি ধারার মধ্যে অতিক্রমণের সুনির্দিষ্ট স্তর থাকে। হারমনি পর্যবেক্ষণ করলে তার বিবর্তনের কোনো স্তর-অতিক্রমণের ধারা লক্ষ করা যায় না। মেলোডির সঙ্গে হারমনিকে তাই এক করে ভাবার তেমন কোনো কারণ নেই। সংগীতের ক্রিয়া এবং শতাব্দীব্যাপী এর প্রবণতা এবং সংগীত সংকলনের সমালোচনাও স্পেনসারের আলোচনায় এসেছে। সংগীতের ক্রিয়া বলতে তিনি সংগীত-নিঃসৃত আনন্দের গভীরে প্রবেশ করেন। সাধারণভাবে সংগীত আমাদের বক্তব্যকে আশ্রয় করে আবেগকে ত্বরান্বিত করে। সেদিক থেকে সংগীতকে সমবেদনার আধার বলা যায়। সংগীতকে তিনি শিল্পের অতুঙ্গমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করেন, যে পর্যায়ে শিল্পের অন্যান্য শাখার উত্থান সম্ভব হয়নি। তাঁর মতে, The primary purpose of music is neither instruction nor culture but pleasure; and this is an all-sufficient purpose ।

তিনি সংগীতের অনেকগুলো বিভক্তির উল্লেখ করেন। যেমন, কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত এবং কণ্ঠসংগীতের অনুবিভাগ (চ্যান্ট, মোটেট এবং এনথেম)। এখানে উল্লেখ্য, বিবর্তন হলো বস্তুর সংহতি এবং একই সঙ্গে গতির স্তিমিতি; এ-সময় বস্তু আপেক্ষিকভাবে অনির্দিষ্ট, অসংবদ্ধ ও সমসত্ত্বতা থেকে অপেক্ষাকৃত সুনির্দিষ্ট, সুসংবদ্ধ অসমসত্ত্বতার দিকে অগ্রসরমান; এই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি গতিরও একটি সমান্তরাল রূপান্তর ঘটে। সংগীত সমালোচনার ক্ষেত্রে স্পেনসারের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্ববাহী। যদিও সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পত্রিকার জন্য তিনি অপেরা ও সংগীত-আয়োজনসমূহে উপস্থিত থাকতেন, কিন্তু অতিমাত্রায় প্রত্যক্ষবাদী দর্শন, বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা ও নিজস্ব ভাষাশৈলীর কারণে সেসব সমালোচনা তেমন সমাদর পায়নি। এসব কারণে স্পেনসারের সংগীত-সমালোচনা সংগীত-আয়োজনসমূহের সরলীকৃত সমাজপাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আসলে উনিশ শতকে বিবর্তনবাদী চিন্তা তিনভাবে সংগীতের ইতিহাস ব্যাখ্যা করে। এর একটি হলো সংগীত-সংকলকদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা, সংগীতের বিকাশে বিবর্তনধারার ব্যাখ্যা এবং সংগীতের প্রশ্নে স্পেনসারীয়

বিবর্তনবাদের প্রভাব। ব্রিটেনের সংগীতের বিকাশের ঐতিহাসিকতার বিচারে স্পেনসারের প্রভাব নিঃসন্দেহে ব্যাপক। তবে অন্যান্য লেখকের প্রভাব স্পেনসারের তত্ত্বকে অনেকটা খাটো করে দেয়। ১৮৭০-৮০ সালের মধ্যে স্পেনসারের বিবর্তন তত্ত্ব যথেষ্ট উচ্চতা অর্জন করে। কিন্তু পরবর্তীকালে তা ক্রমাগত নিম্নগামী হতে থাকে। পরবর্তীকালে অনেক তাত্ত্বিক আসেন, যাঁদের অবদান নিঃসন্দেহে স্পেনসারের তুলনায় সুসংহত। যেমন, The Evolution of the Art of Music এমন একটি গ্রন্থ, যা ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত হয় এবং এ-গ্রন্থে প্যারি যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেন। প্যারি তাঁর গ্রন্থে স্পেনসারের সংগীতবিষয়ক বিবর্তন তত্ত্বের আলোচনা করেন। তিনি বলেন, স্পেনসারের প্রগতি ও বিবর্তন সম্পর্কীয় তত্ত্ব সংগীতের ইতিহাসকারদের কিছুটা সমাধান দিলেও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হওয়ার মতো যথেষ্ট যুক্তি সেখানে ছিল না।

তিনি সরাসরি স্পেনসারের এমন ধারণা নাকচ করে দেন যে, সংগীত উজ্জীবিত বক্তব্য থেকে উৎসারিত। তিনি অবশ্য মনে করেন, বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে সংগীতকে একটি জীবদেহ হিসেবে ভাবতে হবে। তিনি স্পেনসারের বিবর্তনবাদের সরলতা থেকে জটিলতার দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি প্রশংসাসহকারে উল্লেখ করেন। তিনি স্বীকার করেন, অপরিপক্ব অবস্থায় কোনো জিনিস সমধর্মী এবং ক্রমাগত বৈচিত্র্য ও নির্দিষ্টতার দিকে অগ্রসর হয়। সুতরাং সংগীতও সেরকম ক্রমাগত বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিস্তারিত হয়েছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজ নিজ শাখায় সংগীত সুনির্দিষ্ট ও সংহত হয়েছে। সংক্ষেপে প্যারির মূল্যায়নকে এভাবে উল্লেখ করা যায় যে :

১) সংগীত অন্যান্য জীবদেহের মতোই নিজেকে সৃষ্টি করে।

২) সংগীতের অন্তর্নিহিত বিভিন্ন ধারা প্রথমে সংবদ্ধ থাকে।

৩) এই সংবদ্ধ রূপকে অবিকশিত সমধর্মিতা বলা যায়।

৪) প্রগতিশীল বিবর্তন সংগীতসহ সমস্ত শিল্পকলাকে ধীরে ধীরে সুনির্দিষ্ট ও পরিচ্ছন্ন রূপ প্রদান করে। পার্সি কার্টার বাক তাঁর The Scope of Music (১৯২৪) গ্রন্থে বলেন, ডারউইন যেখানে শিল্পের উৎপত্তির সঙ্গে যৌনতাকে সংশ্লিষ্ট করেছেন, স্পেনসার সেখানে বাক্যের স্বতঃস্ফূর্ত নতুনতর পুনরুৎপাদনকে দায়ী করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হার্বার্ট স্পেনসারের সংগীতবিষয়ক চিন্তাধারা প্রসঙ্গে তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন – ‘হার্বাট স্পেন্সারের একটা লেখার মধ্যে পড়িয়াছিলাম যে, সচরাচর কথার মধ্যে যেখানে একটু হৃদয়াবেগের সঞ্চার হয় সেখানে আপনিই কিছু না কিছু সুর লাগিয়া যায়। বস্তুত, রাগ দুঃখ আনন্দ বিস্ময় আমরা কেবলমাত্র কথা দিয়া প্রকাশ করি না, কথার সঙ্গে সুর থাকে। এই কথাবার্তার আনুষঙ্গিক সুরটারই উৎকর্ষসাধন করিয়া মানুষ সংগীত পাইয়াছে। স্পেন্সরের এই কথাটা মনে লাগিয়াছিল। ভাবিয়াছিলাম এই মত অনুসারে আগাগোড়া সুর করিয়া নানা ভাবকে গানের ভিতর দিয়া প্রকাশ করিয়া অভিনয় করিয়া গেলে চলিবে না কেন। আমাদের দেশে কথকতায় কতকটা এই চেষ্টা আছে; তাহাতে বাক্য মাঝে মাঝে সুরকে আশ্রয় করে, অথচ তাহা তালমানসংগত রীতিমত সংগীত নহে। ছন্দ হিসাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দ যেমন, গান হিসাবে এও সেইরূপ; ইহাতে তালের কড়াক্কড় বাঁধন নাই, একটা লয়ের মাত্রা আছে; ইহার একমাত্র উদ্দেশ্য, কথার ভিতরকার ভাবাবেগকে পরিস্ফুট করিয়া তোলা, কোনো বিশেষ রাগিনী বা তালকে বিশুদ্ধ করিয়া প্রকাশ করা নহে।’

১) মহাযুদ্ধদ্বয়ের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে স্পেনসার ও অন্য লেখকদের সংগীত সম্পর্কীয় উৎপত্তিতত্ত্ব প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, তাঁদের আলোচনা সংগীতবিষয়ক অনুসন্ধিৎসাকে উৎসাহিত করেছে নিঃসন্দেহে।

২) পঞ্চাশের দশকে এমন ধারণা পোষণ করা হয় যে, সংগীত বিবর্তিত হয়নি, বরং মানুষ বিভিন্ন ধরনের সংগীত তৈরি করেছে।

৩) তবে সমাজবিজ্ঞানে সংগীতের বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা আজো যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।

৪) হারমনির উৎপত্তিসংক্রান্ত স্পেনসারের ধারণা তাঁর সংগীতের উৎপত্তিসংক্রান্ত বিবর্তন তত্ত্বকে খাটো করেছে।

৫) স্পেনসারের বক্তব্য সংগীতের সমাজতত্ত্ব ও সংগীতের জীবতত্ত্বের মধ্যে একধরনের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, যার কারণে কণ্ঠস্বরের জীবতাত্ত্বিক বিকাশ ও সংস্কৃতিগত উৎকর্ষ অস্পষ্টতার দোষে দুষ্ট হয়েছে।

৬) তবে কেউ কেউ মনে করেন কণ্ঠস্বরের বিকাশের ব্যাপারটি মূলত ভাষা ও শারীরতত্ত্ব ও পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়। শিল্পের এখানে তেমন কোনো ভূমিকা নেই।

৭) সংগীতের উৎপত্তিকে সমাজতাত্ত্বিকভাবে বিচার করার ক্ষেত্রে সামাজিক বিভিন্ন উপাদানকে সন্নিহিত করার প্রশ্নে স্পেনসার সরলীকরণের আশ্রয় নেন। সে-কারণে স্পেনসারের শিল্পবিষয়ক রচনা একপেশে, শুষ্ক ও যান্ত্রিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৮) ‘মানবিক সংগীত’ প্রত্যয়টি ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে অন্য ধরনের সংগীতের অস্তিত্বের দিকে ইংগিত করা হয়েছে। এমন ধারণা বা ইংগিত স্পেনসারের বক্তব্যকে জটিল করে।

 

কার্ল মার্কস

মার্কসীয় চিন্তা ও তত্ত্ব শুরু থেকেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে একত্রে বিবেচনায় এনেছে। সে-কারণেই সংস্কৃতিমনা যে-কোনো লেখক বা পাঠককে মার্কসীয় বীক্ষণ আকর্ষণ করে। মার্কসের মৌলকাঠামো ও উপরিকাঠামোর ভিত্তিতে সমাজকাঠামোর বিচার শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, আইন, মতাদর্শ বিষয়ক যাবতীয় চিন্তন-ক্ষমতাকে উপরিকাঠামোর ভেতর ফেলেছে। মৌলকাঠামো মূলত উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন শক্তির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সমাজের ভিত্তিভূমি। এই ভিত্তিভূমির সঙ্গে উপরিকাঠামোর সম্পর্ক তাঁর আলোচনায় চমকপ্রদ এক দিকদর্শন প্রদান করে। যে-কারণে, সম্ভবত সমাজদর্শনের আলোচনায় মার্কস চির-অপরিত্যাজ্য এক চিন্তাধারার সূচনা করেছেন। উপরিকাঠামো এমনটাই আদর্শিক পরিকাঠামো সৃষ্টি করে বা সৃষ্টি হয়, যা মৌলকাঠামোকে স্থিরতা দেওয়ার জন্য সবসময়ই সাহায্য করে। তবে এই সহযোগিতার মধ্যেও একধরনের দ্বন্দ্বের উপস্থিতি তিনি আবিষ্কার করেন। যার ফলে মৌলকাঠামোর পরিবর্তন উপরিকাঠামোয় গুণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। আর মৌলকাঠামোর মধ্যে উৎপাদন শক্তির বিকাশ উৎপাদন সম্পর্ককে পুনর্বিন্যস্ত করে। যার কারণে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে। সামাজিক বিবর্তনে মৌলকাঠামো বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উপরিকাঠামোর মধ্যেও পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তন কতটা ব্যাপক ও শ্রেণিচরিত্র-নির্ভর তা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও মার্কসের কাছে উপরিকাঠামো সমাজের অভিজন শ্রেণির হাতিয়ার হিসেবেই গণ্য হয়। যে-হাতিয়ার অভিজন শ্রেণি সমাজ-শাসনে ও অর্থনৈতিক শোষণে ব্যবহার করে। এ পর্যায়ে এসে, একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় আর তা হলো, শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের মতো বিষয়গুলো আদৌ কোনো স্বাধীনতা, স্বকীয়তা ও স্বয়ম্ভরতা উপভোগ করে কিনা। তবে একথা সত্য যে, মার্কসের আলোচনায় সরাসরি সংগীত সম্পর্কে বিশ্লেষণ পাওয়া না গেলেও তাঁর দর্শন এতটাই সূক্ষ্মদর্শী যে, শিল্পকলার বিশ্লেষণের জন্য একটি পরিক্ষেপ লাভ করা এখানে সম্ভব। উল্লেখ্য, অনেকের প্রত্যক্ষ সংগীতবিষয়ক আলোচনা পাওয়া যায়; কিন্তু একটি সামগ্রিক পরিক্ষেপ পাওয়া দুষ্কর; সেখানে মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষায় পরিক্ষেপ থেকে অগ্রসর হলে সংগীতের ওপর আলোকপাত করা কঠিন হয় না। কোরেশি বলেছেন যে, এ-গ্রন্থ সংগীতের মধ্যে সামাজিক অথবা সামাজিকের মধ্যে সংগীতকে আবিষ্কারের সহায়ক হবে। আজকের দিনে পশ্চিমা সংগীত-বিজ্ঞানীদের মধ্যে জেন্ডার, নরগোষ্ঠী ও শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কিত করে সাংগীতিক পা-িত্য বিশ্লেষণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এ-ধরনের বিশ্লেষণ সংগীতের ওপর বিশ্ব পুঁজিবাদের ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিস্তারকে পরিস্ফুটিত করেছে। কোরেশি তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থে চারটি বিশ্লেষণী নির্দেশনার উল্লেখ করেছেন, যা মার্কসীয় সংগীত-নির্দেশক অনুসন্ধানের পথ করে দিতে পারে :

১) পণ্যায়ন ও পণ্যপূজার (ফেটিসিজম) সাথে সম্পর্কিত করে সংগীত চিন্তার ভিতর থেকে ‘গবেষণা সমস্যা’ নির্ধারণ করা।

২) সংগীতের গীতিময়তা, কাব্যিকতা ও শৈলীপনাকে পুঁজিবাদ কর্তৃক সামাজিকভাবে মোথিত ‘গবেষণা সমস্যা’ হিসেবে দাঁড় করানো।

৩) সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আবির্ভূত অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে সংগীত সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ‘গবেষণা সমস্যা’ হিসেবে নির্ধারণ করা।

৪) সংগীতবিজ্ঞান ও সংগীত অনুশীলনের সাথে মার্কসবাদী রাষ্ট্রনীতিকে সম্পর্কিত করে গবেষণা সমস্যা প্রণয়ন।

প্রথমটির ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে ডেভিড গ্রামিট বলেছেন, সংগীত বিষয়ে অ্যাকাডেমিক মননশীলতা বলতে কী বোঝায়? সংগীতবিজ্ঞানে সংগীত কীভাবে নির্মিত তা জানা আদৌ সম্ভব কি? এ-ব্যাপারে একটি উপায় হতে পারে সংগীত শ্রবণ। আসলে সংগীতবিজ্ঞান সংগীতের শ্রবণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সংগীতের অন্যদিকগুলো যেন অদেখা থেকে যায়। এক্ষেত্রে মার্কসের পণ্যের কথা বলা যায়, যা এই পণ্য তৈরির পেছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্ককে অবগুণ্ঠিত করে রাখে। সংগীতের অ্যাকাডেমিক পর্যালোচনা সংগীতকে বস্তুনিষ্ঠ সত্তা হিসেবে পা-িত্যপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয় করতে গিয়ে ক্রিয়াশীল মানবীয় ও সামাজিক তাৎপর্যের কথা ভুলে যায়। তবে মার্কসীয় প্রত্যয়, যেমন, পুনরুৎপাদন, শ্রেণি সম্পর্ক প্রভৃতি ব্যতীত সংগীতের যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সংগীতবিজ্ঞানের শাস্ত্রীয় সংজ্ঞায় অনেক সময় সংগীতের বিদ্যায়তনিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে গিয়ে সংগীত সৃষ্টির সামাজিক উপাদানকে লঘু করতে পারে। সংগীতের মননশীল বিশ্লেষণ বিশ্লেষকের আবেগমূলক সংযুক্তি, ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ও বিষয়ীমূলক উপাদানকে প্রশ্রয় দেবে – এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে বলা যায়, সংগীতের সাধারণ শ্রবণ ও বিদ্যায়তনিক সমীক্ষায় নন্দনতত্ত্বকে উপেক্ষা করা যায় না। প্রকারান্তরে এরকমটি হলেই কেবল তা শ্রোতা, বোদ্ধা, শিক্ষিত এবং পরিশীলিতের পক্ষে সংগীতের সার্বিক প্রকাশযজ্ঞকে বোঝা সম্ভব।

মোটকথা, সংগীতকে একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে বলার মধ্যে যেমন নতুনত্ব নেই, সেরকম সাংগীতিক পা-িত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ অনেক ক্ষেত্রে, অনেক সময়, এই সামাজিকতাকে দেখতে পায় না। মার্কস তাঁর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তত্ত্বায়নে সংগীতকর্মকে সংযুক্ত করেননি। মার্কসের পণ্য এবং বিনিময়ের বিশ্লেষণের সঙ্গে নন্দনতত্ত্বের পেছনে অপস্রিয়মাণ সাংগীতিক কর্মকা-কে তুলনা করার প্রবণতা তাঁর এই আলোচনায় আনার প্রয়োজন আছে। এখানে আমরা আবার একবার দেখে নিতে পারি পণ্য বলতে মার্কস কী বুঝিয়েছেন : পণ্য হলো প্রথমত একটি বাহ্যিক বস্তু, যা তার গুণাবলি দিয়ে মানুষের প্রয়োজন পরিপূরণ করে। এই প্রয়োজনের প্রকৃতি ক্ষুধা বা কল্পনা যা-ই হোক না কেন, তা খুব ব্যবধান বোঝায় না। তাছাড়া কীভাবে প্রয়োজন পরিপূরণ হয় – সরাসরি পরিপোষণের উপায় বা ভোগের সামগ্রী, পরোক্ষভাবে উৎপাদনের উপায় হিসেবে। কিন্তু প্রয়োজন পরিপূরণের ক্ষেত্রে পণ্যের এই ব্যবহারমূল্য মোটকথা একটি দিক। পণ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ গুণটি হলো, এটি বিমূর্ত মূল্য ধারণ করে, যা অন্য পণ্যের সঙ্গে বিনিময়ের পরিমাণের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। বিনিময়কালে গুণাত্মক মূল্য অদেখা থাকে এবং বিনিময়মূল্য আসলে সব পণ্যের সাধারণমূল্যকে প্রতিনিধিত্ব করে। শ্রমের দ্বারা তৈরি উৎপন্ন হিসেবেই পণ্যটি প্রতিভাত হয়। কিন্তু বিনিময়মূল্য বিশেষ কোনো ধরনের শ্রমকে নির্ণয় করতে পারে না, যদিও বিভিন্ন পণ্য বিভিন্ন ধরনের শ্রমে উৎপাদিত হয়। সুতরাং মূল্য নির্ধারণে মানবীয় শ্রমের বিমূর্ত রূপটি গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যবিষয়ক মার্কসের আলোচনায় গভীরভাবে যে-জিনিসটি আসে তা হলো, বস্তুর মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের পুঁজিবাদী বিমূর্তায়ন। পরিমাণের বিমূর্ত শ্রমমূল্য হিসেবে যখন পণ্যের বিনিময় ঘটে তখন সেই পণ্যের পেছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্ক প্রতিভাত হয় না। মোটকথা, পণ্য নিজেই একটি মূল্যে পরিণত হয় না, বরং একটি ব্যবহারমূল্য বিনিময়মূল্য অর্জন করে।

যেহেতু সামাজিক সম্পর্কের অর্থটি পণ্যের চরিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, সেহেতু অর্থের (meaning) ব্যাপারটি মননশীল গভীর অনুশীলনে প্রয়োগ করা যায়। সংগীত সম্পাদনের বিষয়টি মার্কসীয় বিবেচনায় উৎপাদনী শ্রম না হলেও সমাজে মানুষ সংগীতকে পণ্যের মতোই ভোগ করে আসছে। রেকর্ডকৃত সংগীত তো বটেই ‘লাইভ পারফর্মার’রা বিভিন্ন অবস্থায় মজুরি-শ্রমিক হিসেবেই কাজ করে। বেতনভোগী অ্যাকাডেমিক ব্যক্তিত্ব একই কায়দায় মজুরি-গ্রহীতা। সংগীতবিষয়ক প্রকাশনা পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখার জন্য রসদ বা উপকরণ হিসেবে কাজ করে। সুতরাং সরাসরি আর্থিক লাভ না হলেও পেশাগত স্বীকৃতির আদলে এসব অর্জনকে

‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও মননশীল উৎপাদনের চাহিদা যে সাংগীতিক বস্তুকে চায় তার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক উঠে আসে না। অর্থাৎ যে-সামাজিক সম্পর্কের মধ্য থেকে পণ্য হিসেবে সংগীতের উৎপাদন হয়, সেই পণ্যের চাহিদা থাকলেও তার পেছনে ক্রিয়াশীল সামাজিক সম্পর্কের কোনো মূল্য থাকে না। এ-কারণে আমরা সংগীতের সামাজিক সত্তাকে স্বীকৃতি দিতে ভুলে যাই।

যখন শ্রবণের দৃষ্টিকোণ থেকে নন্দনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয় তখন সংগীতকে আমরা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলি। যেমন, বিমূর্ত সংগীতকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্থান দিয়ে থাকি এবং দক্ষতা অনুসারে অন্যগুলোকে এর পরের পর্যায়গুলোতে বিবেচনা করি। এভাবেই আমরা শিল্প থেকে শিল্পের দক্ষতা অর্জনকে নিচু স্তরে স্থান দিই। এভাবেই সমাজে সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষার্থীর মর্যাদাগত ব্যবধান স্বীকৃতি পায়। সংগীতের মূল্যায়নে শ্রবণের বহুমুখী সংযুক্তি লক্ষ করা যায়। এক অর্থে সংগীতকারের কাজ গুরুত্বপূর্ণ, তেমন শ্রবণ ও শ্রোতৃম-লীও গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামিট অবশেষে বলেন, সংগীতবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সংগীত এবং শিক্ষার্থী। যদি বলা হয় সংগীতবিজ্ঞান অবজেক্ট (সংগীত) এবং সাবজেক্ট (পরিশীলিত শ্রোতা) তৈরি করে। এভাবে সংজ্ঞায়িত করার সমস্যা হলো, বস্তুগত পণ্যের

বিপরীতে সংগীতকে উপস্থাপন করা। সংগীতবিজ্ঞান উচ্চাঙ্গীয় সংগীত-সংস্কৃতিকে ব্যক্তির ভাবের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। গ্রামিট পরিশেষে বলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংগীত বিভাগসমূহে নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ সংগীতচর্চার ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে, যদিও সেসব বিভাগে পণ্ডিতজন ও অনুশীলনকারীদের অংশগ্রহণের দক্ষতা সমান নাও হতে পারে।

এটি সহজেই বোধগম্য যে, একটি পণ্যকেন্দ্রিক শাস্ত্র হিসেবে সমকালীন সংগীততত্ত্ব এমন কিছু প্রক্রিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যাকে মার্কসের ভাষায় ফেটিসিজম বলা যায়। সংগীতের ওপর এই ফেটিসের প্রভাব মতাদর্শিক এবং মনস্তাত্ত্বিক হতে পারে। এ-কারণে ফেটিসের প্রভাব আলোচনার জন্য সমকালীন সংগীতের মতাদর্শিক পরিবেশ জানা দরকার। সংগীতের মধ্যে একে খুঁজে নাও পাওয়া যেতে পারে। মার্কস এবং ফ্রয়েড উভয়ে এই ফেটিসিজম সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ক্লাপেনহাওয়ার তাঁর আলোচনা সংগীততত্ত্ব, পণ্য ও ফেটিসিজমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। যেমন, কমোডিটি সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি সমাজের সম্পদের মধ্যেই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার পরিচয় পাওয়া যায় বলে মার্কস উল্লেখ করেন।

মার্কস পণ্যের দুটি ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা পুঁজিবাদী সমাজে পণ্যের প্রকৃতিকে বুঝতে সাহায্য করে। এখানে উল্লেখ্য, এ-ধরনের পণ্যভেদে সাধারণ, কিন্তু এর দুটি পরস্পর দ্বান্দ্বিক দিক রয়েছে। প্রথম দিকটি হলো পণ্যের ব্যবহারমূল্য, যা পণ্যের গুণাগুণের ওপর নির্ভর করে এবং ভোগের উপযোগিতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এই গুণাগুণের ওপর নির্ভরশীল। পণ্যের এই ব্যবহারমূল্য প্রাকৃতিক। তবে এটি পণ্য ও পণ্যের ক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এই সম্পর্ককে জানতে হলেও পণ্যের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলি জানা দরকার। অনেক আলোচক ব্যবহারমূল্যের প্রাকৃতিক-ভৌত গুণাবলিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচারে পণ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।

যা-হোক, আমরা এই ‘ব্যবহারমূল্যের’ সামাজিক চরিত্র সম্পর্কে প্রথমে জানার চেষ্টা করব। প্রথমেই যা উল্লেখযোগ্য তা হলো, ব্যবহারমূল্যগুণেই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও ভোগ্য হয়ে থাকে। সুতরাং ব্যবহারমূল্যের সৃষ্টি সমসময় পণ্যের জন্য উৎপাদন হিসেবে চিহ্নিত হয়। একটি পণ্য যখন বিভিন্ন শ্রেণির লোক ভোগ করে তখন তা পণ্যের মধ্যে ক্রিয়াশীল সামাজিক বৈশিষ্ট্যাবলিকে দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে দেয় না। দ্বিতীয়ত, ব্যবহারমূল্য অবশ্যই এককের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়, বিশেষত, যখন তা অন্য পণ্যের সঙ্গে বিনিময় করা হয়। দেখা যায় একই পণ্যের ব্যবহারমূল্যই সবসময় তার চাহিদা ও ব্যবহারকে নির্ধারণ করে না। সুতরাং এ-অর্থে ব্যবহারমূল্য যেমন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যাবলি ধারণ করে সেরকম সামাজিকও বটে। তবে পণ্য সমাজের মানুষকে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক প্রদান করে।

পণ্যের দ্বিতীয় যে ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো বিনিময়মূল্য। বিনিময়মূল্যের মাধ্যমেই পণ্যের মূল্য প্রকাশিত হয়, যেহেতু ব্যবহারমূল্য নিয়েই পণ্যের জন্ম। সুতরাং বিনিময়মূল্যকে বাজারের প্রেক্ষাপটে প্রদত্ত মূল্য বলে ধরা যায়। আমরা যে ব্যবহারমূল্যের বিনিময়ের কথা বলছি সেই ব্যবহারমূল্য সম্পর্কে যথার্থ বলা হয়েছে যে, একে খাটো করে দেখলে আর যেটুকু থাকে তা হলো শ্রমমূল্য। অর্থাৎ ব্যবহারমূল্যকে বিমূর্ত ভাবলে পণ্যের পেছনে প্রদত্ত যাবতীয় শ্রম, মেধা, বস্তুর মতো যাবতীয় উপাদানের অবলুপ্তি ঘটে। তখন এক কথায় পণ্য বলতে ‘মানবীয় শ্রমের বিমূর্ত মূল্য’ আর কিছুই থাকে না। বাজারে যখন পণ্যটি বিনিময়মূল্য লাভ করে তখন পণ্যে প্রদত্ত ব্যক্তিক শ্রম-সময় বা মূল্য বিবেচিত হয় না। সামগ্রিক শ্রমব্যবস্থায় পণ্যে একটি বিনিময়মূল্য নির্ধারণে সাহায্য করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কসীয় প্রত্যয় হলো ফেটিসিজম। এর মাধ্যমে পণ্যের রহস্যময়তাকে বোঝানো হয়েছে ‘ফেটিস’ পূজার নৃতাত্ত্বিক সংকট থেকে। সোজা কথায়, আমরা এমন অনেক কিছুর শক্তিকে পূজা-অর্চনা করি, যা আসলে তার নেই। পণ্যের এমন প্রত্যক্ষণ অনেকটা বাহ্যিক মনস্তাত্ত্বিক ও গুণাগুণের একচেটিয়া ধারণা থেকে আসে, যা আসলে সত্য নয়। পুঁজিবাদে পণ্যের এমন ফেটিসিজম দেখা যায়। সমকালীন প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতের তত্ত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত প্রত্যয়সমূহের নানা রকম ব্যবহার হতে পারে। বিভিন্ন শাস্ত্রে এ-ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভ্রান্তি ঘটতে পারে। চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের আলোকে সংগীতকে পণ্য বিবেচনা করা হয় না। সুতরাং বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আমরা কীভাবে ফেটিসিজমের ধারণা সংগীতের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করব? অথবা আর কোনো মার্কসবাদী বিকল্প আছে কি, যা সংগীতের তত্ত্বায়নের কাজে লাগে?

পুঁজিবাদ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে মার্কস পণ্য-পূজার তাড়না লক্ষ করলেও এমন ঘটনা অন্যান্য শাস্ত্রেও ঘটে। বিশেষত সংগীতের আলোচনায় কষ্টকর বলেও ফেটিসভিত্তিক চিন্তা-পদ্ধতির প্রয়োজন আছে। কারণ এখানেও পণ্যের ব্যাপারটি চলে আসে। সংগীত যতই ‘অ্যাকাডেমিক’ বিষয় হোক না কেন তার সঙ্গে মতাদর্শের চেয়ে পাঠের বিষয়বস্তু পুনরুৎপাদনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সংগীত শাস্ত্রের অধ্যয়নের প্রশ্নে পেশাগত ও বিদ্যায়তনিক ভূমিকাদ্বয়ের মধ্যে একটা জবরদস্তির ভাব রয়েছে। এছাড়া সংগীততত্ত্বের বিষয় কী হবে এ-নিয়েও মতানৈক্য রয়েছে। সংকলকের চিন্তা, কাজের কাঠামো, বিশ্লেষণের ব্যক্তিগত নান্দনিক প্রতিক্রিয়া, একজন প্রাজ্ঞ শ্রোতার প্রতিক্রিয়া, একটি বিশেষ ঐতিহাসিক স্টাইলের প্রেক্ষাপটে সংকলকের গৃহীত ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয় আসতে পারে। অন্যান্য শিল্পঘেঁষা শাস্ত্রের ক্ষেত্রেও এমন মতানৈক্য লক্ষ করা যায়। তবে সংগীতের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, ‘সংগীত-অধ্যয়ন’ একটি একক প্রত্যয় হিসেবে গ্রহণ করা মুশকিল। চতুর্থত সংগীতকে একটি শ্বাশত, আধ্যাত্মিক ও অন্তর্গত বিষয় হিসেবে জ্ঞান করলে সংগীত-ইতিহাস বা সংগীততত্ত্বের মতো ব্যাপারগুলো স্পষ্ট হয় না। সে-কারণে সংগীতকে পণ্য হিসেবে প্রত্যক্ষ করার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসেছে। শেষত, সংগীততত্ত্বের মার্কসীয় বিশ্লেষণ-আকাক্সক্ষী উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না।

সমালোচকরা মনে করেন, সংগীতের ব্যবহারমূল্য তার নান্দনিক মূল্যের মধ্যেই প্রোথিত। সুতরাং মার্কসীয় পণ্যমূল্যের সঙ্গে নান্দনিক মূল্যের একটা বিরোধ দেখা যায়। মার্কসীয় মূল্যতত্ত্ব অনুসারে অবশ্য সংগীতের রহস্যময়তার মাধ্যমেই এই নান্দনিক মূল্যের উত্থান হয়েছে। অর্থাৎ মূল্য আরোপের ক্ষেত্রে মার্কসীয় ও অমার্কসীয় পার্থক্যটি

মূল্য-সংগীতের ফেটিসকৃত উপায়নের ধারণাকে গ্রহণ করা বা করার ওপরে নির্ভরশীল। ফেটিসিজমের কারণে সংগীতের ইতিহাস, সংগীততত্ত্ব, লোকসংগীততত্ত্ব প্রভৃতি পরস্পর আলাদা শাস্ত্রের উদ্ভব হয়েছে। সংগীত সৃষ্টির বিষয়টিকে খ-িতভাবে দেখার প্রবণতা ও নান্দনিকতার খোলস পরানোর পেছনে অধিবস্তুর ধারণা কাজ করে। পরিশেষে বলা যায়, সংগীতের ফেটিস চরিত্রের সন্তোষজনক শেষ বিশ্লেষণ পাওয়া যায়নি। তবে সংগীতের নান্দনিকতা যেভাবে মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, মার্কসীয় মূল্যতত্ত্বের বিচার সেভাবে হয়নি। অ্যাডর্নোর বক্তব্য সেভাবে মার্কসীয় বিশ্লেষণের সহযাত্রী হতে পারেনি। ÔOn the fetish character in music and that of listening|’ পুঁজিবাদের আগমন যৌন বিকৃতি ও সমকালীন শ্রোতাদের বালসুলভতাকেই তুলে ধরে।

পুঁজিবাদের আগমনের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্ক বিধান করতে গিয়ে সামাজিক বাস্তবতার সার্বিক নিরিখে সংগীতের মূল্যায়ন খুব একটা হয়নি বলে জানা যায়। মার্কসীয় সূত্রের প্রয়োগ আরো সংকীর্ণভাবে বলেছে। তবে সংগীতের কর্ম কীভাবে পরিবর্তিত হয় সে প্রসঙ্গে জানা যায় যে, পুঁজিবাদী আধুনিকতা ও বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের একটা সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত এ-সময়কালের সংগীত সীমাবদ্ধ ও অন্তর্গতভাবে কাঠামোবদ্ধ। সোনাটাও ‘সং’ ফর্মে এদের দেখা যায়। প্রাক-পুঁজিবাদী বা প্রাক-রেনেসাঁস বা

প্রাক-আধুনিক সমাজের সংগীতে নাটকীয় উত্থান-পতন লক্ষ করা যায় না। সাদৃশ্য, পুনরুক্তি, অর্থগত ও সুরের মধ্যে ‘াবৎংব’ ভিত্তিক সম্পর্ক বিরল, স্বরের উত্থান-পতনসহ যৌক্তিকতা বক্তব্য ও অন্তর্গত বিভাগ লক্ষ করা যায় না। প্রাক-আধুনিক সংগীতে মাত্রার বৃদ্ধি দিয়ে একই বক্তব্য উচ্চারিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার কাওয়ালি অথবা উত্তর ভারতের ভোজপুরী চৌতালের উল্লেখ পাওয়া যায়। উচ্চাঙ্গসংগীত অনেকটা উন্মুক্ত। এখানে কাঠামো যথেষ্ট সহজভাবে সংবদ্ধ ও দৈর্ঘ্য অনেকটা স্থানীয় প্রথাগতভাবে নির্ধারিত। পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া সমাজ সংগীতের এই ফর্মের ক্ষেত্রে অদৃশ্যপূর্ব যৌক্তিকীকরণ ঘটায়।

আরেকটি বিষয় হলো, সংগীতের এই পুঁজিবাদী ধরন সমষ্টিগত ধ্যান-ধারণার পরিবর্তে ব্যষ্টিকেন্দ্রিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কণ্ঠ, ছন্দ, তাল ও মধুরতার দিক থেকে সংগীত ছোট এবং ব্যক্তিগত বা কখনো কখনো নিতান্তই ব্যক্তিক অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে, যা কাঠামোগতভাবে সুসংবদ্ধ। বুর্জোয়া সমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তির মুক্তি। মার্কস বলেছেন, মানুষের ব্যক্তিসত্তার আবির্ভাব ইতিহাসের পথ বেয়ে এসেছে। প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ একটি সাধারণ সত্তার অধিকারী ছিল। একজন কৌম-সদস্য গোষ্ঠীচেতনার মধ্যে সমাহিত থাকে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে নতুন দ্বৈতাবস্থার সৃষ্টি করল। বুর্জোয়া সমাজে যুক্তিবাদের গুরুত্বের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া অহমের অভ্যুদয় ঘটল। শিল্পের প্রতিটি শাখায় এই অহমের কারণে একক সংগীত, একক চিত্র অংকন, একক সাধনার জগৎ তৈরি হলো।

আজকের আবেগময় রোমান্টিক গান দুজন স্বাধীন সত্তার মধ্যে গীত হতে দেখা যায়, যারা অনেকভাবেই সামাজিক বিধিনিষেধমুক্ত। এরা ইতিহাসহীন ভার্চুয়াল জগতের আবেগতাড়িত শুকশারি। সুতরাং আজকের আধুনিক সংগীত বর্ণনামূলক এক অন্তরঙ্গলোকের কথা বলে, সম্পর্কের কথা বলে, যা একান্ত ব্যক্তিগত ও প্রেমজ। মার্কস ও সংগীতের আলোচনার এ-পর্যায়ে আমরা হিন্দুস্তানি সংগীতের বিশ্লেষণ দেখব। কোরেশি দুজন হিন্দুস্তানি ওস্তাদ – গায়ক নাসিরউদ্দীন খান ও সারেঙ্গিবাদক বাহাদুর খানকে অন্তরঙ্গভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁদের মজলিস-মাহফিলে যাওয়া-আসা করেন এবং সে সুবাদে সামন্ত-আমল থেকে পুঁজিবাদী পর্বে উত্তরণের সময় হিন্দুস্তানি সংগীতের পরিবর্তন সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

সামন্তবাদ সংগীত ও শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে সাধারণভাবে জানা যায়। এ-ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চালু ছিল। সামন্ত সময়ের পৃষ্ঠপোষকতাকেই সবাই শ্রদ্ধাসহ স্মরণ করেন। তাদের খাবার আসত রাজদরবার থেকে। বিয়ে, সামাজিকতা অথবা নিজস্ব বিনোদনের জন্য তাদের গান গাওয়ার ডাক পড়ত দরবারে। এসব মাহফিলে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আসতেন আমন্ত্রিত হয়ে। শ্রোতাদের সবাই সংগীতের কদর বুঝতেন এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধা, শালীনতা ও মনোযোগসহকারে সংগীত ও যন্ত্রসংগীত শ্রবণ করতেন।

উত্তরাধিকার সূত্রে সামাজিক স্বীকৃতপ্রাপ্ত এসব সংগীতকার সামাজিক অক্ষমতা ও অপমানের মুখোমুখি হননি এমন নয়। আসলে ভূম্যধিকারী শ্রেণি তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা বিভিন্ন রকম বৈষম্যের শিকার হন। ব্রিটিশ শাসনের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সামন্তশ্রেণির মধ্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবারগুলো অমর্যাদা ও অর্থকষ্টের সম্মুখীন হয়। রেডিও স্টেশন ও অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থা ক্রমাগত নিচে নামতে থাকে। বংশগত পেশাকে ধারণ করে টিকে থাকা ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কোরেশি বলতে চেয়েছেন, সাংগীতিক উৎপাদ ছাড়াও শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম যেমন সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতির সঙ্গে সামন্ত-আমল থেকেই একটি সমাজ অর্থনীতিক-কাঠামো কাজ করেছে। এই কাঠামোর মধ্যে একটি শ্রেণি, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা, ভূমি, মজুর শ্রেণি ও সেবার সম্পর্ক জড়িত। এখানে উত্তমর্ণ-অধমর্ণের সম্পর্ক রচিত হয়। সুতরাং মার্কসীয় উৎপাদন সম্পর্কেও বিষয়টি এসে পড়ে। সমাজে প্রচলিত প্রধান উৎপাদন-পদ্ধতি শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়,

সাংস্কৃতিক-ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পণ্য উৎপাদনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পণ্য উৎপাদনব্যবস্থার বাইরে শোষণমূলক উৎপাদনরীতি প্রচলিত আছে বলে মনে করা হয়। অনুরূপভাবে উৎপাদন-সম্পর্ক-ব্যবস্থাও উদ্বৃত্ত শ্রমশোষণের সহায়ক। সমাজের বৈষম্যমূলক কাঠামো ও শ্রমশোষণের জন্য ক্ষমতার অসম ব্যবস্থার সঙ্গে এই উৎপাদন সম্পর্ককে দায়ী করা যায়। সংগীতসহ যাবতীয় উৎপাদন-কৌশলের ওপর উৎপাদন সম্পর্ক শোষণমূলক প্রক্রিয়ায় কাজ করে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: