আজ রাতে তোমার সঙ্গে দেখা হবে বাবা। কত রাতে, ঘড়িতে ঠিক কটা বাজবে তখন, এখনই তা বলতে পারব না। তবে সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে রাত বারোটার কাছাকাছি। ব্যস্ত শহর কলকাতা একটু ক্লান্ত হয়ে যখন শোয়ার জন্য উশখুশ করবে তার কাছাকাছি কোনো সময়েই আমরা আজ তোমার কাছে যাব।

আজ সকাল থেকেই আমাদের কত কাজ। যাব বললেই তো চট করে চলে যাওয়া যায় না। হাতে জমে থাকা কাজগুলোর কী হবে! তার ওপর তোমার ওই বড় মেয়ে, আমার ওপর সারাজীবন দিদিগিরি ফলিয়ে গেল যে, তার নানা রকম খুঁটিনাটি। সব মিটিয়ে দিয়ে যাওয়া। যেমন কাল রাতেই আমায় খেতে বসে বলেছে, তোর এ-মাসের এলআইসির প্রিমিয়াম বাকি। মনে রাখিস।

এলআইসির প্রিমিয়ামে হাসি পেয়েছিল আমার। মনের মধ্যে হাসির একটা ছোট ঢেউ। কিন্তু মুখে কিছু বলিনি। তার ওপর তুমি তো জানোই দিদিকে অগ্রাহ্য করার অধিকার আমার কোনো কালে ছিল না। ওর মুখে কথা বলিনি কোনো দিন। কারণ একেবারে ছোটবেলা থেকে তুমি আর মা দিদিকে আমার গার্জিয়ান বানিয়ে দিয়েছিলে। দিদির সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, ওর নির্দেশে খেলা, এমনকি অনার্সে কী পড়ব তাও খানিকটা ওর ঠিক করে দেওয়া। ফলে আজ সকাল দশটায় কাছাকাছির অফিসটা খুলতেই আমি পুরনো রসিদ নিয়ে গিয়ে এলআইসির টাকাটা জমা করে দিয়ে এলাম।

শেষ কদিন দিদির ব্যস্ততাও কম নেই কিছু। ও-ও দেখি ছুটছেই, সারাদিন ছুটছে। যাব বলা আর চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করে ফেলা, এর মধ্যে টানাপড়েন কম নয়। আর দিদির যেমন গোছানো আর মেলানো স্বভাব তা তো তুমি জানতেই। যাওয়ার সিদ্ধান্ত যেমন ওর, যাবে এটাও যেমন পাকা, তেমনি সবকিছুকে নিখুঁত করে রেখে যাওয়াতেও মনোযোগ। আমাদের চলে যাওয়ার পর কোথাও কারো এতোটুকু ঝামেলা না হয়। যেমন আমাদের পরিবারের মোটামুটি যেটুকু অ্যাসেট সেটা রবীন্দ্রভারতীর হাতে পৌঁছতে কোনো অসুবিধা না থাকে। ডানকুনির কাছাকাছি যে ছোট প্লটটা, যাতে নাকি তোমার একটা বাংলোগোছের বাড়ি বানানোর শখ ছিল, কেন ছিল কে জানে, সে-জমির মিউটেশন কাগজে কী একটা নাকি খুঁত রয়ে গিয়েছিল। দিদি দুদিন ছুটে, ওদিকের মিউনিসিপালিটিতে ধরনা দিয়ে, লোক লাগিয়ে তাও মেটালো। তারপর মোটামুটি একটু স্বস্তি। আজ সকালে আমাকে বলল, না, আর কোনো অসুবিধা নেই। আমাদের অনুপস্থিতিতে সম্পত্তির সবটুকু সহজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছবে।

এখানে একটা কথা তোমাকে জানাই। সম্পত্তি কোথায় দেওয়া হবে সেই সিদ্ধান্তটা এই চৌষট্টি বছর বয়সেও মায়ের। এ-ব্যাপারে আমরা কিছু বলিনি, কোনো মতামত তৈরি করতে চাইনি। কলকাতার একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের যেটুকু সম্পদ থাকে আমাদের তো সেই রকমই। দিদি শুধু মাকে বলেছিল সবটা গুছিয়ে হস্তান্তর করে না গেলে মহাঝামেলা, কে কোথা থেকে এসে দখলদারি ফলাবে তার ঠিক নেই। তাছাড়া এই-ছিল ওই-ছিল, কত প্রশ্ন উঠবে তাই বা কে জানে। দিদি তাই গুছিয়ে দিয়েছে। এই ফ্ল্যাটের কাগজ, ডানকুনির কাগজ, ব্যাংকের টাকা-পয়সার অধিকার। এমনকি আমাদের ছোট গাড়িটার ব্লু-বুক সংক্রান্ত একটা দানপত্রও। মা তারপর দুদিন ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রবীন্দ্রভারতীর কথা মায়ের মনে হয়েছে হয়তো রবীন্দ্রনাথের নামে দুর্বলতার কারণে। দিদি স্বস্তি পেয়েছে এই জন্য যে, খুব দূরে বা কলকাতার বাইরে ছুটে যেতে হলো না। মা ইচ্ছে দেখালে তা-ই করতে হতো আমাদের। আমরা আমাদের আর মায়ের ইচ্ছা জানাতে উপাচার্যের কাছে গেছি। কাগজ দেখিয়েছি, তারপর সহজেই মিটে গেছে বিষয়টা। মাত্র দুদিনে। এখন সেভাবে আমাদের আর কোনো পিছুটান নেই।

পিছুটান বললেই কত কথা মনে হয়। মানুষের পেছনের টান বলতে তো শিকড়বাকড়। তার বেশিরভাগটা পরিবারে, বাকিটা ছিটকে বাইরেও। উপড়ে নেওয়ার দিন সেসবেই সজোরে টান পড়ে। অথচ দেখো আমাদের যা কিছু তা এই চারজনের মধ্যে। গুচ্ছমূলের মতো চারজনের পরস্পরকে জড়িয়ে বেঁচে থাকা। তার বাইরে কিছু সত্যিই তো দরকার হয়নি কোনো দিন। দিদি টেনিস খেলত। সেই সময়টায় কত নাম হলো ওর। কাগজে একবার ছবিও বেরিয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে কিছু মানুষের সঙ্গে আলাপ, কিছু যাতায়াত। তারপর হঠাৎ কী হলো একদিন। সবকিছু থেকে সরে এলো। হঠাৎই বন্ধ করে দিলো খেলার জগৎ। কেন তার উত্তর কেউ জানতে পারেনি। আবার আমারও কলেজ বা ইউনিভার্সিটির হাতেগোনা বন্ধুরা টিকল না কেন! ছোটখাটো যে-খবরের কাগজটায় কাজ শুরু করেছিলাম সেখানেও একসময় যাওয়া বন্ধ করেছি। কেন, তার উত্তর আমার কাছেও স্পষ্ট নয়। তবে এটা ঠিক আমি বা দিদি যখন বাইরের কাজ ছেড়েছি, যোগাযোগ কমিয়েছি, তুমি বা মা আমাদের কিছু বলোনি। ছেড়ে আসার জন্য মৃদু ভর্ৎসনা তো নয়ই, হয়তো স্বস্তি পেয়েছ। তোমাদের এই স্বস্তিই কি পরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল আমাদের?

যেমন আমাদেরও কিছু পরিজন ছিল একসময়। রায়গঞ্জে তোমার যে মাসতুতো বোন, যাকে আমরা সুনুপিসি বলতাম, সঙ্গে পিসেমশাই, তাদেরও তো যাতায়াত ছিল। মনে আছে একবার খুব ছোটবেলায় দুর্গাপুজোয় রায়গঞ্জ গিয়েছিলাম। সেখানেই কাটিয়েছিলাম পুজোটা। সেই ছোট্ট শহর, অদূরে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদী কুলিক, এখনো স্মৃতির পাশে সরু নদীর মতোই শুয়ে আছে। ওরাও তো এসেছিলেন কয়েকবার। তারপর কীভাবে কী মনে হলো, নদী শুকানোর মতো সম্পর্কও শুকিয়ে গেল একদিন। তোমার আর মায়ের কীভাবে কী – সে-খটকা লেগে গেল, রায়গঞ্জ পর্ব মিটে গেল আমাদের জীবন থেকে। এ নিয়ে কোথাও কোনো আক্ষেপ দেখিনি। কোনো আলোচনা হয়নি। ওরাও এলেন না, আমরাও গেলাম না আর। চারজন আবার নিজস্ব চতুর্ভুজে ফিরে এলাম।

দিদির টেবিল টেনিসের সাফল্য নিয়েও তো উদ্বেগ হয়েছিল তোমাদের। বিশেষ করে সাফল্যের সঙ্গে যেদিন লোকপাল সিং এলো বাড়িতে। লোকপাল তখন সাউথ ক্লাবে টেনিসের কোচ। রাজ্যজুড়ে নাম। ঝকঝকে চেহারা, অল্প বড় হবে দিদির চেয়ে। এক সন্ধেবেলা দিদি নিয়ে এসেছিল ওকে। আর দিদিও তো তখন খুকিটি নয়। এমএ পাশ করে গেছে, কাজের খোঁজ নিচ্ছে এখানে-ওখানে। তারপর বেহালা ফ্লাইং ক্লাব থেকে চারশো ঘণ্টা উড়ানের অভিজ্ঞতা। শান্তিনিকেতনে আশ্রমের পাশ বরাবর পাঁচিল তোলা নিয়ে যে-ঝামেলা হচ্ছিল তা নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ওখানের কজনের সঙ্গে জেল খেটেছে দুদিন। সেই থেকে অনেকেই চেনে ওকে। কিন্তু লোকপাল বাড়িতে আসার পর থেকে সব বদলে গেল কেমন। তুমি আর মা হঠাৎ যেন ফ্রিজের ভেতর ঢুকে গেলে। দিদির কাজকর্ম নিয়ে তোমাদের যে-উৎসাহ তা রাতারাতি শেষ। কোনো কথা নেই। খাওয়া, পেপার পড়া আর ঘুমানো ছাড়া কাজ নেই কোনো। আবার আমারও সেই সময় অর্কর সঙ্গে নতুন নতুন আলাপ। দুজনে একটা ছোট দলের সঙ্গে সান্দাকফু হাঁটার কথা ভাবছি। দিদি জেনেও কোনো মতামত দেয়নি তখনো। অথচ তোমার আর মায়ের লোকপাল আসা নিয়ে রিঅ্যাকশন দেখে আমরা তো থ। দিদি বরাবর একগুঁয়ে, তোমাদের বিরক্তি আর চুপ থাকার মধ্যে জানিয়ে ফেলল একদিন। সেটা শীতকালের সন্ধেবেলা হবে। গড়িয়াহাটের মোড় আর তার আশেপাশে যখন কুয়াশা জমে ওঠে, গাড়ির সংখ্যা সামান্য হলেও কমে, দিদি বলল লোকপালকেই বিয়ে করতে চায় ও। কবে বিয়ে হবে তার ঠিক নেই। তবে দুজনের কথা হয়ে গেছে।

সেই সময় দিদির বিয়ে নিয়ে অল্প হলেও আবছা কথাবার্তা তৈরি হচ্ছিল বাড়িতে। যোগাযোগের ব্যাপারে তোমরা কোনো পরিজনের ওপর নির্ভর করতে চাওনি। এক্তিয়ারের মধ্যে ছিলও না তেমন কেউ। তোমরা ভেবেছিলে কাগজে দেওয়ার কথা, বাংলায় আর ইংরেজিতে। মা আমাকে বলেছিল দিদির মতামত নেওয়ার কথাও। কোথাও ওর কেউ ঠিক করা আছে কি  না। সেই সময়ই লোকপালের প্রবেশ, যে জন্মসূত্রে কলকাতার এবং ঝরঝরে বাংলায় কথা বলে।

সেই সন্ধেয় দিদির কথার পর মা থমকে গিয়েছিল। থমকানোর কারণ বলেনি কোনো। কিন্তু বাবা, তুমিও চুপ ছিলে অনেকক্ষণ। রাতেও কিছু বলোনি। শুধু পরদিন সকালে বলেছিলে, বিয়ে মানে কিন্তু একদিনের ব্যাপার নয়, লম্বা পথ, সবটাই ভেবে দেখা দরকার।

দিদি কথা বলল পরদিন সকালে। আমাদের বাড়ির যা রীতি। আজ একটা কথা তো উত্তর দুদিন পর। দিদি বলল, সব দিক ভেবেই ও এগিয়েছে। কলকাতায় অনেকেই জানে। ওর পক্ষে পিছু ফেরা অসম্ভব।

শীতের আবহ চলতেই থাকল বাড়িতে। তোমার অফিস। ফিরতে ফিরতে সন্ধে গড়াত। মা সারাদিন ঘরে। কিন্তু নির্বাক। তুমিও ফিরে এসে কথা বলছিলে না কোনো। যেটুকু কথা তা আমার আর দিদির। তাও সাধারণ। কাজকমের্র টুকিটাকি বিষয়ে। কিন্তু একটা চাপ আমরা টের পাচ্ছিলাম। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সেই চাপের প্রবর্তক তোমরা, আবার অনিচ্ছার ভিকটিমও। আমি দেখছিলাম চারজনের যে এতোদিনের গণ্ডিবাঁধা এবং আত্মসুখী জীবন, তা উধাও। দিদিও একটা অস্বাভাবিক মানুষ। অথচ এরকম চলতেই থাকল।

সবকিছুর ইতি থাকে একটা। এদিক নয় ওদিক। কেউ জেতে, পিছিয়ে আসে কেউ। দিদি জেদি, কঠোর মনোবলের, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। তেমনি বাড়ি, চারজনের জীবন, গণ্ডির স্থিরাবস্থা, এসবেও দায়বদ্ধ তো কম নয়। ও হেরে গেল কি না বোঝা গেল না। হারের কোনো চিহ্ন তৈরি হলো না চোখমুখে। শুধু একদিন জানাল লোকপালের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে ও। খুব অল্প কথা, সংক্ষিপ্ত ঘোষণা। কেন, তার বৃত্তান্ত ব্যাখ্যা করেনি।

সেটা ছিল একটা শনিবার বিকেল। অফিস থেকে শনিবার তাড়াতাড়ি ফিরতে তুমি। বিকেলের পর সাধারণত আমরাও বাড়িতে। বাড়ি ফিরতে তোমাকে খবরটা জানিয়ে দিলো মা। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যে জমে থাকা বরফটা কীভাবে যে গলে যেতে থাকল। সেটা এক আশ্চর্য পরিবর্তন। তুমি তোমার পুরনো রেকর্ড প্লেয়ারে অনেকদিন পর সায়গল চালিয়ে দিলে। পাড়ার মোড়ে একটুখানি বেরিয়ে হঠাৎই চিকেন কিনে আনলে। মায়ের রান্নার প্রস্তুতি। গন্ধ আসতে থাকল রান্নাঘর থেকে। তুমি আমার সামনে হঠাৎই আমাদের ছোটবেলার দিনগুলোর কথা তুললে। সেই যখন আমরা দমদম এলাকায় থাকতাম। অনেকদিন আগের দমদম। যখন এতো দোকান, ভিড় আর ব্যস্ততা আসেনি। আমাদের হাত ধরে তুমি আর মা এইচএমভির মোড়ে যশোর পার করে স্কুলে দিয়ে আসতে। মিশনারি নামের কলকাতার প্রথমদিকের স্কুল। আমাদের সাদা ফ্রক, সাদা গাউন। দিদি আর আমার টান করে চুল বাঁধা। তুমি বললে, দিদি নাকি বরাবর চাইত তোমার হাত ধরে হাঁটতে। আমি মায়ের। এভাবেই রোজ সকালে স্কুলে যেতাম আমরা।

তুমি আরো বললে আমাদের দার্জিলিং যাওয়ার গল্প। দিদির তখন দশ, আমার পাঁচ। সেই আমাদের প্রথম বাইরে যাওয়া। তোমাদেরও নাকি তার আগে বেড়ানোর কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি। শিয়ালদা থেকে তখন উত্তরবঙ্গে যাওয়ার দুটো মাত্র ট্রেন। তার একটায় চড়ে এনজেপি নেমে প্রায় খুঁজে খুঁজে দার্জিলিং পৌঁছানো। তারপর এক ভোরে সূর্য ওঠা দেখতে টাইগার হিল। তুমি বলছিলে, সে নাকি আমাদের জীবনের এক আশ্চর্য সূর্য দেখা। তোমার তখন ছোট চাকরি অল্প আয়; সদাগরি অফিসে খাতা লেখায় নিরাপত্তাও তেমন ছিল না। বাড়িতে হাতে চালানো মায়ের একটা সেলাই মেশিন। এইরকম দুজনে দুই মেয়ের হাত ধরে একদিন চলে গিয়েছিলে টাইগার হিল। সেখানে পাহাড়ের মাথায় সূর্যোদয় দেখাবে বলে।

আর এইরকম গল্পে আমরাও আটকে গেলাম একসময়। যেমন আগেও কয়েকবার হয়েছে। এসব গল্প একেবারেই আমাদের চারজনের। পঞ্চম কেউ নেই। এসব কথা উঠতে আমরা চিরকালই আপ্লুত হয়ে যাই। দার্জিলিংয়ের গল্পে আমি প্রথম প্রথম তোমার সঙ্গে অংশ নিচ্ছিলাম। দিদি তখনো চুপ। কিন্তু এ-গল্পের টান এমনই, এমনটাই হয়ে এসেছে আমাদের ছেলেবেলা থেকে, চারজনের কথা শুরু হলে বাকি পৃথিবী অদৃশ্য হয়ে যায়। যেন কোথাও আর কেউ নেই। কোনো পরিজন, সম্পর্ক, কাজের জায়গার বন্ধু নয়, কারো দরকার নেই কোথাও। বাবা-মা আর তাদের দুটি মেয়ে, যথেষ্ট বড় তারা এখন, তবু এই চারজনের কাছে বাইরের প্রয়োজন তুচ্ছ, নগণ্য, অদরকারি। আমাদের কাউকে লাগে না।

বাবা, তুমি বেশ হেসে কথা বলছিলে। বললে, সেবার দার্জিলিং থেকে ফেরার সময় সেই কাণ্ডটা মনে আছে?

সেই যে সোনাদার কাছে বাস দাঁড়িয়েছে, তুমি চারপাশ দেখব বলে নেমেছো। আর দিয়েছে বাস ছেড়ে!

মায়ের রান্না শেষ। একটু পরে খেতে বসব আমরা। গুটিগুটি পায়ে মা এসে দাঁড়িয়েছে গল্পের পেছনে। বলল, আমি আর কী বলব! তোমার দুই মেয়ে যা শুরু করেছে তখন। ছোটজনের কান্না। আর বড়জন গিয়ে ড্রাইভারকে এক নিশ্বাসে ধমকে বাস থামিয়ে দিলো!

এই সময় দিদি হাসল একটু। যেন হাসল অনেকদিন পর। অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো। চারজনের মধ্যের

মান-অভিমান গলে সারা। অনেক কথা, পুরনো কথায় জমে থাকা মজা আর হাসি। সেইসঙ্গে মায়ের হাতের মুরগির ঝোল। সেই রাতে তার স্বাদ যেন অনন্য। আমরা আবার ছুঁয়ে ফেললাম হয়তো জড়িয়ে ধরলাম একে অপরকে।

আর তারপরেই দিদি ছেড়ে এলো লোকপালকে। সঙ্গে টেনিসকেও। এলোমেলো কিছু যুক্তি দেখাল লোকপালকে নিয়ে। যেমন ওর কানে আসা কিছু কথা। কিন্তু আমি বুঝলাম সেই সন্ধ্যায়

যে-আয়োজন সাজিয়েছিলে তুমি আর মা, দিদি তার থেকে বেরোতে পারল না। পারিবারিক সম্পর্কের যে-ঘনঘটা তোমরা দেখালে তা ছাড়িয়ে যেতে ইচ্ছে হলো না দিদির। চারজনের গণ্ডিকে ও আবারো অনিবার্য ও অটুট বলে মানল।

তারপর থেকে কী হলো, সারা পৃথিবী থেকেই যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ও।

সে-বিচ্ছিন্নতা ওর একার জন্য নয়। বাকি তিনজনকে জড়িয়েই। বাইরে যা চেনাজানা ছিল আমাদের, সবকিছুতে এক আশ্চর্য অনীহা। উদাসীন থাকা প্রায় অভ্যাসের মতো হয়ে এলো। পরে আমি দেখলাম ওর এই যে বদল, ভাবনার ভেতর উলটো-পথ-হাঁটা, এর অনেকটা আমাদের উত্তরাধিকার। ছোটবেলার দিনগুলো হাতড়ে হাতড়ে ভাবি দমদমের পাড়ায় হোক বা পরে দক্ষিণ কলকাতায়, কোথাও কী মানুষের সঙ্গে বা ছোট গণ্ডির সমাজে মিশতে গেছি আমরা। যাইনি, তার কারণ তোমরা যেতে শেখাওনি। তুমি বারবার বলেছো, না-মেশা কোনোভাবে কারো ক্ষতি করা নয়। কাউকে আঘাতও নয়। নির্লিপ্ত থাকার স্বাধীনতা থাকবে না কেন?

স্বাধীনতা! ফলে প্রথম থেকেই দিদি আর আমি অতিমাত্রায় স্বাধীন। বেপরোয়া কখনো নয়, কিন্তু দিদি চিন্তায় স্বাধীন, সিদ্ধান্তেও। দিদির মতো আমারও অর্কর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে একসময়, তারপর কেমন যেন স্বাভাবিকভাবে ভেঙে গেছে। আবার আপন বৃত্তে ফিরে এসেছি আমরা। মা বয়স হওয়া মেয়েদের বিয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবু সম্পর্ক ভেঙে বেরিয়ে আসায় কেমন যেন তৃপ্তি পেয়েছে।

ভাবনার স্বাধীনতা ছিল বলেই দিদি হয়তো তোমার অন্তিম অসুখের সময় ওর সিদ্ধান্তের কথাটা আমাদের জানাতে পেরেছে। তুমি চলে যাবে এ-কথাটা ডাক্তারদের কথায় যখন নিশ্চিত হলো তখনই ও বাড়িতে এসে বলল, তোমার সঙ্গেই চলে যেতে চায় ও। আমাকে আর মাকে আগেভাগেই জানিয়ে রাখল।

সহমরণ নাকি! বিদ্যুতের মতো আমার ছোঁয়া লেগেছিল দিদির কথায়। মা দিদিকে বলল, তুই এমন সিদ্ধান্ত নিলে আমার কী হবে!

দিদি বলল, তুমি আগে গেলেও আমি এই করতাম। চারজনের একজন চলে গেলেই আমার পক্ষে সিদ্ধান্ত একই।

মা ধরা গলায় বলল, তাহলে আমি কী করব! তোকে ছাড়া তোর বাবাকে ছাড়া এই বয়সে!

অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিলো দিদি, তাহলে তুমিও চলো আমার সঙ্গে।

এই কথাবার্তার এক পাশে আমিও ছিলাম। ঘরের এক কোনায়। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম দিদিকে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে মা একটি কথাও বলল না। দিদির সিদ্ধান্তের বিপক্ষে একটি শব্দও নয়। চৌষট্টি বছরের মা ভাবিত হলো তার বড় মেয়ে চলে গেলে কীভাবে থাকবে সে। আর আমিও বরাবরের মতো দিদির দিকে প্রশ্ন তোলার কোনো সাহসই পেলাম না।

বাবা, তোমার শেষ সময় ঘনিয়ে আসতে থাকল। চারতলা হাসপাতালটির ওপরের যে-কেবিনে তুমি ছিলে সেটি প্রায় ভালো হোটেলের একক স্যুটের মতো। একক, তার কারণ তুমি চেয়েছিলে অসুস্থতায় এমনকি অন্তিম শয্যায়ও অনেকের ঘরে তোমাকে যেন না রাখা হয়। আবার আমরাও তেমন চেয়েছি। তবু সেই শীতল দামি ঘরে তোমার শেষ অচেতন দিনগুলোয় আমি মৃত্যুর উপস্থিতি টের পাচ্ছিলাম। যেন কুয়াশার মধ্যে দেখা কোনো প্রাগৈতিহাসিক জন্তু, যে তোমার কেবিনের আশেপাশে সারাদিন ঘুরত। আমি বা দিদি গেলে একটু আড়ালে সরে যায়।

মা রাজি হয়ে গেল। দিদিকে বলল, তুই যদি না থাকিস, বাবার সঙ্গে চলে যেতে চাস, তবে আমাকেও নে না। যদিও ছোটর বেশ অসুবিধা হবে সবাই গেলে।

বাবা, তোমাকে নিয়ে তখন আমাদের ব্যস্ততা কমে এসেছে। একজন মানুষ যতক্ষণ চিকিৎসার নাগালে ততক্ষণই তার জন্য ছোটাছুটি, প্রতিদিনের দৌড়ঝাঁপ। কিন্তু ডাক্তারেরা যেই খুব কিছু করার নেই জানালেন তখন তোমার জন্য আর কোনো ব্যস্ততা থাকল না। আর কোথাও যাওয়ার নেই। দুষ্প্রাপ্য ওষুধের স্লিপ আঙুলে নিয়ে সারাশহরে খোঁজার দিনও শেষ। তখন শুধু অন্তিম অপেক্ষা। দিদি অবশ্য তার মধ্যে মাকে নিয়ে তোমার পেছনে পাড়ি দেওয়ার ভাবনা ভেবে ফেলেছে।

আর এই সময়টায়, তোমাকে বিকেলের ভিজিটিং আওয়ার্সে একবার দেখতে যাওয়া ছাড়া হাতে কাজ না থাকায়, মাঝেমাঝেই ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরে যেতাম। কারণ আমি দেখতাম তুমি অচেতন। মৃত্যু আর জীবনের মাঝখানে। মাকে সঙ্গে নিয়ে তোমার পিছুপিছু যাওয়ার জন্য দিদি প্রতিদিন আরেকটু তৈরি হচ্ছে। ওর আত্মহত্যার ইচ্ছা বা মাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার বিপক্ষে আমার কথা নেই কোনো। কারণ আমরা স্বাধীন ইচ্ছার পক্ষে। আমি এসব দেখতাম আর বুঝতাম একা হতে চলেছি। সে এক মারাত্মক নিঃসঙ্গতা। চারের মধ্য থেকে মাত্র একজনের টিকে থাকা। তখনই মুখ ঢাকতে বা নিজের কাছ থেকে নিজেকে আড়ালের জন্য শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে যেতাম। দিদির নতুন ইশকুলে ক্লাস সেভেন, আমার থ্রি। তুমি অফিস থেকে ফিরছো। লম্বা সুঠাম চেহারা। স্কুলের গেটে মা আমাদের আনতে গেলে অন্য মায়েরা চেয়ে থাকত মায়ের দিকে। চারজনের এক আশ্চর্য পরিবার। একেকটা রবিবার বা ছুটির দিনে আমরা চলে যেতাম গঙ্গার ধারে। কখনো বরানগর, বা বাগবাজারে। যে উত্তর কলকাতার পরিবার ও পাড়ায় বড় হয়ে তোমার ছিটকে চলে যাওয়া, সেরকম কোনো পাড়ায়

রক-বাঁধানো গলির ভেতরে ঘুরতাম চারজন। দিদি মায়ের গা-ঘেঁষা, আমি হাত ধরা তোমার। তুমি স্বর্গভ্রষ্ট পৌরাণিক চরিত্রের মতো কী যে খুঁজতে, কী যে দেখাতে চাইতে আমাদের! এ-গলি ও-গলি দিয়ে কোথায় যে নিয়ে যেতে চাইতে! এবং অনিবার্যভাবে গলির মোড়ে চোখ পড়তেই আমার ফুচকার বায়না শুরু হয়ে যেত। দিদি এসব ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে কখনো বলেনি। কোনো কালেই বায়না নেই ওর। আমি মায়ের বকা খেতাম আর তুমি আমাকে ফুচকাঅলার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে। এই রকম কত ছুটির দিনে, বর্ষার দুপুর কিংবা পুজোর রোদ ওঠা সকালে আমরা চারজন, শুধু চারজনই গলিতে গলিতে ঘুরেছি …!

এর মধ্যে এক সন্ধেবেলা, সেদিন আমি তোমার ওখানে যাইনি, দিদি তোমাকে দেখে ফিরে এসে বলল, ভালো করে ভেবে দ্যাখ, আমরা তিনজনই চলে গেলে একা একা থাকতে পারবি তুই?

আমি তো একেবারে থ। কী বলতে চায় ও। আত্মহত্যার দল ভারী করার চেষ্টা! একা থাকতে হবে এটা তো আমি বুঝতেই পারছিলাম। তবু কথা তুলেছে বলে আমিও বললাম।

… শোনো দিদি, বাবা-মা কারো চিরকাল থাকে না। আমাদের বাবার যথেষ্ট বয়স হয়েছে, প্রায় আশি। এই সময় তার সঙ্গে সহমরণে যাওয়ার মাথার দিব্যি কে দিলো?

দিদি ব্যাগ ছুড়ে ফেলল খাটে। ঘুরে দাঁড়াল। আমার কাছ থেকে কদাচিৎ ও এমন প্রতিরোধ শুনেছে। গলার স্বর শক্ত। বলল, তুই যে স্বার্থপর এটা বরাবরই মনে হয়েছে আমার। না হলে এতো কঠিনভাবে দাঁড়িয়ে থাকবি কেন! বাবা চলে যাচ্ছে, মাও থাকছে না, আমার সিদ্ধান্তও জানিস। তাহলে তোর কি সম্পত্তির লোভ?

গলা তুললাম আমিও। তেমন লোভ যে নয়, এটা আমি ছাড়া যে সব চাইতে ভালো জানে সে তুমি। ফলে তোমার কথার উত্তর হয় না। বরং আমি তোমাকে বলব ভাবো, আরো ভাবো। মাকে বোঝাও। ছেলেমেয়ে সঙ্গে গেলে কোনো বাবা-মায়ের আত্মা শান্তি পেতে পারে না।

দিদি গম্ভীর হলো একটু। কী যেন ভাবল। তারপর বলল, এই জায়গাতেই পৌঁছতে চাই আমি। এটা আমার ভাবনা, শেষ পর্যন্ত তুইও তার কাছাকাছি এলি। আত্মা! কী মহান আশ্চর্য ব্যাপার। সেই আত্মার শান্তিতেই এতো কিছু। আমার এই প্রস্তুতি। আমরা চারটে প্রাণী পৃথিবীতে আলাদা। সেই জন্যই কোনো একজন একা গেলে ভীষণ কষ্ট পাবে সে। আর তুই যদি একা রয়ে যাস তাহলে আমরা তিনজনও শান্তি পাব না। তোকে একা রেখে গিয়ে ছটফট করব বাকিরা।

আমি সরে গেলাম অন্য ঘরে। বললাম, ছাড়ো দিদি। আমার এসব শুনতে ভালো লাগছে না। আমি বেঁচে থাকতে চাই …

দিদি চিৎকার করে উঠল –    কিন্তু আমরা তোকে একা রেখে যেতে চাই না …

আমি শান্ত স্বরে উত্তর দিলাম, আমিও একা থাকতে চাই না। কিন্তু বেঁচে থাকতে তো চাই!

এসব কথার মাঝে মা-ও উপস্থিত। অথচ তার কোনো মতামত নেই। কথা নেই। আর কথা নেই মানেই আমি টের পাই দিদির কথাকেই গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে। সেদিকেই তার সমর্থন। কারণ মাও তো যৌথ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। দিদির হাত ধরেই যে-কোনো উপায়ে চলে যাবে মা। ফলে দিদির দলে-টানার বক্তৃতায় মায়ের নীরব সমর্থন।

বাবা, এটা তোমার অন্তিম দুটো দিন। তুমি নিথর পাথর। কেবিনে মাথার কাছে রাখা মনিটরের গ্রাফেই একমাত্র বেঁচে ছিলে তখন। হাতের শিরায় ড্রিপ ড্রিপ করে বয়ে যাওয়া স্যালাইন, যেন অনন্ত সময়ের হিসাবরক্ষক। সেই লোম-ওঠা অদৃশ্য প্রাগৈতিহাসিক জন্তুটার ঘোরাফেরা কেবিনে গেলেই টের পেয়ে যেতাম। বারবার পর্দার আড়ালে সরে বসত ও। এক বিকেলে যখন আমি তোমার ওখানে হাজির তখন দিদি এলো। কথা নেই। ফাঁকা টুল একটা টেনে

 বসল তোমার মাথার পাশে। তোমার

মাথায় হাত বোলাতে শুরু করে দিলো। আমি ঘুরছি ফিরছি। কাজ তো কিছু নেই। বিকেল শেষ হয়ে আসছে কলকাতার রোদে। একটা সামগ্রিক বিষাদ, সে-বিষাদ শুধু তুমি চলে যাচ্ছো বলে নয়। আর এই সময় চোখের পলকে খেয়াল করি সেই অদ্ভুত প্রাগৈতিহাসিক জন্তুটা পর্দার আড়াল থেকে দিদিকেও মেপে নিল একবার। আড়ালে জিভ চাটল। দিদি বুঝল না কিছুই। দিদির পাতা-না-পড়া দৃষ্টি তোমার মুখে। আমি আবার তাকালাম পর্দার আড়ালে। আর তখনই এই প্রথমবার সেই ভ্রƒ-হীন শান্ত বিদ্ঘুটে চোখ দুটোর সঙ্গে চোখাচোখি হলো। ও দেখলাম আমাকেই দেখছে, আড়ালে সরে না গিয়েই দেখছে। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতলতা নয়, অন্য এক অনুভূতি নেমে গেল। আমার প্রতিরোধের বাইরেও কি তবে অন্য পরোয়ানা তৈরি হয়ে যাচ্ছে!

রাতে বাড়ি ফিরে দিদি বলল, বাবা চলে যাওয়ার পর বেশি হলে দিন চার-পাঁচ তোর জন্য অপেক্ষা করব আমরা। তোর মতামতের জন্য। তারপর আর নয়।

খানিক কৌতুকের স্বরেই কথা বললাম আমি, কী ভাবে যাবে সে-পথটা ভেবে রেখেছো কি?

দিদি ব্যাগ নামাল। হাতঘড়ির চেইন খুলল। মনুমেন্ট যদি খোলা পাই ভালো, তবে আজকাল তো শুনি উঠতে দেয় না। না হলে অন্য কোনো বহুতল। আঁতকে উঠলাম আমি। চোখের সামনে যেন বাজ আর বিদ্যুৎ। সে তো ভয়ংকর! স্লিপিং পিল নয় কেন? দিদি নিরুত্তাপ। বলল, বিকজ আই লাইক টু ফিল দ্য ডিপার্চার মোস্ট ফিজিক্যালি। আদারওয়াইজ ইউ কান্ট রিচ …। আমি হতবাক। বললাম, কোথায়? দিদি হাসল। বেশ খোলামেলা হাসি। টু দ্য আননোন নো-হয়্যার … ডু ইউ লাইক টু অ্যাকমপেনি?

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

দিদির অন্য ভাবনায় ঢুকে যাওয়া, অন্য মানুষ হয়ে যাওয়া, এসব চলতেই থাকল। এমনকি দুদিন পর তুমি যখন মারা গেলে তখনো তাই। তবে আর একটু বেশি চুপ। আমার ভয় ছিল তোমার শেষ দিনটায় দিদি তোলপাড় হয়ে যাবে। সামলানো শক্ত হবে। মাকে দেখার চাইতে ওকে দেখাই হয়তো বড় হয়ে উঠবে। কারণ তোমার আর দিদির সম্পর্ক তো জানতাম। তোমাদের চিরকালীন বন্ধুত্বের কথা। দিদির জীবনের অনেক টানাপড়েন, বাইরের অনেক সম্পর্ক ভাঙাগড়ার পরও তোমার আশ্রয়ে ফিরে ফিরে আসা। সেই সম্পর্ক অটুট রাখার ভাবনা থেকেই ওর হয়তো আত্মহত্যার বাসনাও। তবু আমি জানতাম শেষের সেদিন ভয়ংকর। তোমার শেষ দিনে দিদির যা খুশি হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তোমার অন্তিম দিনটা দিদি বেশ সহজে নিল। অন্তত বাইরে তো তাই। সহজ অথচ কাজেকর্মে নিখুঁত ও স্থির। নিজের মোবাইল থেকে ফোন করে শববাহী গাড়ি ডেকে আনল। অবাক হয়ে দেখলাম ওর ফোনে কলকাতার গোটা চারেক শব-যানের ফোন নম্বর লোড করা। বিদ্যুৎ-চুল্লিতে লাইনের অবস্থান জানতে শ্মশানে ফোন, কাজে আসতে পারেন এমন এক-দুজনকে হাসপাতাল বা শ্মশানে আসতে বলা, সব একা একাই। কাঁধে ঝোলানো একটা সাইড-ব্যাগ। তার ভেতর তোমার ডেথ-সার্টিফিকেট এবং ওর টাকাপয়সা, গুছিয়ে যেখানে যেমন দরকার পরপর পেমেন্ট করে যাচ্ছিল। মাঝখানে আমাকে একবার ফুল আনতে পাঠাল। কোন ফুল কতটা তাও ঠিক করল নিজে। সাদা কাপড়, আতর, ধূপকাঠি, শেষ অনুষঙ্গের খুঁটিনাটি ওর মাথায় যেন প্রোগ্রাম করা। আমি আজ্ঞাবহের মতো খাটছিলাম। রওনা হওয়ার পর তোমাকে বহন করা গাড়িটার ঠিক পেছনে আমাদের গাড়ি। চালকের আসনে আমি, দিদি পাশে। কলকাতার ছোট-বড় রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়ার মাঝে দিদি বলল, আমাকে শ্মশানের মুখে নামিয়ে তুই সোজা বাড়ি যাবি। মা একা।

আমি অবশ্য যাইনি। ওর কথাতেও নয়। তোমার একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত   থাকতে   চেয়েছি   পাশে।   ছাড়তে   ইচ্ছে হয়নি। দিদির তুমি বন্ধু ছিলে ঠিকই, কিন্তু শ্মশানেও সবকিছুর আড়ালে আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই দিনগুলো, যখন তোমার হাত ধরে দমদমের রাস্তায় স্কুলে যেতাম আমি। দিদির তখন বড় স্কুল, আমার প্রাইমারি। একদিন বর্ষার দুপুরে স্কুল ছুটি হওয়ার পর দেখি গেটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছো তুমি। আমাকে খুঁজছো। কী মনে হওয়ায় মাঝ-অফিস থেকে চলে এসেছো আমার কাছে। শাটার তুলে বৈদ্যুতিক চুল্লির গনগনে আগুনে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো তোমাকে। ভেতরের হলকা লাগল আমাদের মুখে। এই প্রথম এক পরিপূর্ণ শূন্যতা, বুঝলাম তুমি নেই। সবার যা হওয়ার তা হলো, আমায় রেখে পাকাপাকি তুমি দূরে কোথাও চলে গেলে। দিদি হাতঘড়ি দেখে পাশে দাঁড়ানো একজনকে বলল, মোটামুটি কত সময় লাগে?

শ্মশান থেকে ফিরে দেখি মা-ও দিদির মতোই। সন্ধের পর প্রতিদিনের অভ্যেসে রাতের খাওয়া সেরে মশারি গুঁজে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা আসায় উঠে দরজা খুলল। এই বয়সে সুখের অনুভব চলে যায় যেমন দুঃখের অনুভূতিও হয়তো তলানিতে পৌঁছোয়। মা খুনখুন করে কাঁদল একটু। তারপর বালিশে মাথা দিলো। দিদি বলল, দুঃখ করার খুব কিছু নেই। আর তো ক-টা দিন।

ঠিক পরের দিন বিকেলে দিদি গাড়ি বার করতে বলল আমাকে। কোথায় যাবে বলল না ঠিক করে। আগের দিনের মতোই আমার পাশে ও। ওর নির্দেশে চালাতে লাগলাম। দক্ষিণ কলকাতা ছেড়ে সোজা পথে ধর্মতলা, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে মধ্য কলকাতা, তারপর উত্তর। বিটি রোডে টালার কাছে এসে গলির ভেতর একটা বহুতল আবাসনের সামনে গাড়ি রাখতে বলল। পাঁচিলের ওপাশে আকাশছোঁয়া গোটা চারেক টাওয়ার। নতুন। আমাকে নিয়ে সিকিউরিটির খাতায় ওর চেনা কারো নাম লিখে ভেতরে চলে এলো।

তারপর লিফট ধরে ওপরে।

সর্বোচ্চ তলাটা কত নম্বরে মনে নেই। পনেরো-ষোলো হতে পারে। দিদি সিকিউরিটির খাতায় যে-ফ্লোরে যার নাম লিখেছিল সেখানে থামল না। একদম ওপরে গিয়ে নামলাম আমরা। কিন্তু সেখানেও কারো দরজায় নয়। লিফট শেষের পর যে-সার্ভিস সিঁড়ি থাকে তা ধরে ছাদে। এবং এসে আমি অবাক।

সে এক আশ্চর্য কলকাতা। খোলা ছাদে বাতাস আর বাতাস। একদিকে তাকালে বোঝা যায় শহর কীভাবে ঢুকে গেছে মফস্বলের সীমানায়। অন্যদিকে কংক্রিট। দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলেছে সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো কংক্রিটের মাথা। হাওড়া ব্রিজের দুটো পিঠ যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। আরো দূরে দ্বিতীয় হুগলি সেতুটা আকাশের নিচে আবছা একটা ধনুক।

গঙ্গার ওপাশে মাঝেমাঝেই ওপরে মাথা তোলা চিমনি, এলোমেলো, কোনো চিমনিতে ধোঁয়া নেই। তবে পূর্ব কলকাতা, মানে এয়ারপোর্টের ও-পাশটা এখনো অনেক সবুজ। ওপর থেকে দেখা শহরের ওই সীমানা সবুজেই মিশে আছে।

আমার পিঠে আলতো হাত রাখল দিদি, জায়গাটা কেমন লাগছে তোর?

আমার মনে দুদিন আগে বাবা চলে যাওয়ার ক্ষত। বাড়িতে মৃত্যুর কোনো ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই, তবু সকলের মনেই শোকের একটা চাপ। এই ছাদে পৌঁছে হঠাৎই যেন চাপ-মুক্তি ঘটল। দিদিকে বললাম, দারুণ!

আমি দূর দেখছিলাম। কিন্তু দিদি উঠে থেকে ঝুঁকে ঝুঁকে চারপাশটা দেখছিল। আমার মুগ্ধতা শুনে বলল, এখান থেকে কি অন্তিম ঝাঁপটা দেওয়া যেতে পারে?

চমকে গেলাম আমি। চেয়ে রইলাম ওর মুখে। ও আবারো একপাশ থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, না রে জায়গাটা মনমতো হলো না। নিচে চেয়ে দ্যাখ, বাইরের চারপাশটা বড্ড ঘিঞ্জি …।

মরণ-ঝাঁপের সঙ্গে আবাসনের বাইরে ঘিঞ্জির সম্পর্ক কী? প্রশ্নটা এসে গিয়েছিল আমার মুখে। কিন্তু করলাম না। দেখলাম দিদি কেমন ব্যস্ত আর খুঁতখুঁতে হয়ে রয়েছে। ছটফটে গলায় বলল, মা-ও এই জায়গাটা পছন্দ করবে না। হয়তো শেষ মুহূর্তে নাকচ করে দেবে। তখন ঝামেলা। চল অন্য কোথাও দেখি।

পরের দুটো দিন দিদির এই দেখার পেছনেই কেটে গেল। প্রায় সারা কলকাতা ঘুরল আমাকে সঙ্গে নিয়ে। সমস্ত বহুতল আবাসনের মাথায় মাথায়। দেখলাম কলকাতার প্রায় সমস্ত বহুতলের খোঁজ জানে ও। এমনকি কোনটা কত তলা তাও বলে দিচ্ছে অনায়াসে। এই পরিকল্পনা কি তবে অনেকদিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল ওর! মোবাইলে শববাহী গাড়ির নাম্বার গুছিয়ে রাখার মতো! জানি না। তবে ওর পেছনে সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে আমিও অন্তিম ঝাঁপ নিয়ে মতামত দিতে শুরু করলাম। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই ও আমার কাছে জানতে চাইছিল। ঘিঞ্জি এলাকায়, চারপাশে গায়ে গা-লাগানো বাড়ির মাঝে আমারও গা গুলিয়ে উঠছিল। যেন চলে যাওয়ার জন্য এই ঠাসাঠাসি বাড়ি, সরু রাস্তা ও জ্যাম সুখকর নয়। যেন তারা চাপ আর অস্বস্তি বাড়িয়ে দেবে বাতাসের কাছে শরীর ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে। কিন্তু কে বাতাসের কাছে হালকা করবে শরীর! কারা ভাসিয়ে দেবে নিজেদের! দিদি আর মা, তাই তো? তাহলে আমি অযথা জড়িয়ে যাচ্ছি কেন! মৃত্যুর পছন্দ নিয়ে কেন মতামত তৈরি হচ্ছে আমারও!

রাতে ফিরে দিদি বলল, কাল একটা অদ্ভুত জায়গায় যাব। কলকাতা অথচ কলকাতার মতো নয়। জায়গাটা হয়তো পছন্দ হবে তোর।

শুনে সারারাত ঘুম আর জেগে থাকার মাঝে স্বপ্ন দেখি আমি। বাবা, তোমাকে দেখি বারবার। ছোটবেলায় বেড়াতে যাওয়া কোনো পাহাড়ি জায়গা। নির্জন উঁচু পথ, বাঁক নিয়ে মিলিয়ে গেছে দূরে। সেই পথে তুমি একলা হেঁটে যাচ্ছো। দমদমে রাস্তা পার হওয়া স্কুলবালিকার মতো আমি পেছনে। কিন্তু তুমি ফিরে তাকাচ্ছো না। আমার ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না। তবু ভ্রƒক্ষেপ নেই তোমার। আমার ঘুম হালকা হয়। ছটফট করি। তখন আবার দিদির কথাগুলো মনে পড়ে। ও বলে, কালকের জায়গাটা পছন্দ হবে তোর। কলকাতা অথচ কলকাতার মতো নয়। তখন আবার ঘুমের মাঝে দেখি পাহাড়ের সেই নির্জন পথে তুমি একা নও। তোমার পেছনে দিদি আর সঙ্গে মা-ও রওনা হয়ে গেছে। উঁচু পাহাড় টপকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছো তোমরা। ধীরপায়ে হাঁটছো নিজেদের মনে। যেন এক অলৌকিক ট্রেকিং। কিন্তু আমি একা, একদম একা। অভিমান জমছে আমার। ভাবছি আমিই বা যেতে পারব না কেন?

পরদিন দিদি যেখানে নিয়ে গেল সেটা পূর্ব কলকাতা। কোনো বিস্মৃত অতীতে পুব কলকাতার গ্রাম আর জলাভূমির ধারে রাজাদের কেমন হাট ছিল কে জানে, তবে নামে এখন সেটা নতুন শহর। সেখানেও আকাশে মাথা তোলা বেশ কিছু নির্মাণের ক্লাস্টার। তেমন একটার গেটে গাড়ি রাখলাম আমি। দিদি ওর চেনাজানা কার নাম সিকিউরিটিদের কাছে লিখে আমাকে নিয়ে ভেতরে চলে এলো। তারপর সোজা লিফট।

বাবা, তোমাকে কী বলব, এ যেন গতরাতে দেখা পাহাড় আর স্বপ্নের দেশ। বিমানবন্দর আর তার লাগোয়া কিছু এলাকা বাদ দিলে অন্য দিকগুলো আশ্চর্য সবুজ। সেই সবুজ মিলে গেছে দিগন্তের দিকে। সেখানে অল্প-অল্প গ্রামের আভাস। বাতাস এখানে কলকাতার বাতাসের মতো ধোঁয়া ভরা নয়। আকাশ যেন ডাক দিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আকাশের নিজস্ব ডাক থাকে এই প্রথম জানলাম আমি। এমনকি বাতাসের থাকে। সবুজের থাকে। এই সবুজ কি মিলে গেছে পৃথিবীর শেষ গাছগুলোর সঙ্গে! সমুদ্রের নুন আর ঢেউ তোলা নির্জন বালিয়াড়ির পাশে দাঁড়িয়ে যে গুটিকয় গাছ তাদের দিকে! যেসব দ্বীপ আর খাঁড়িতে আদি মানুষের পায়ের ছাপ পড়েছিল, মানুষের সেই ঘোলাঘোলা ইতিহাস যেন পর্দায় ছবির মতো একের পর এক আমার চোখে ভেসে উঠতে থাকল। তারা সবাই দেখি ডাকছে আমায়। তাদের অতীত ডাকছে। এমনকি ভবিষ্যৎও। বালিয়াড়িতে আটকে যাওয়া মাস্তুল ভাঙা পরিত্যক্ত জাহাজের মতো এই সভ্যতার ভবিষ্যৎ, আমার কেমন মায়া হয়। যেন শেষ পর্যন্ত এক মৃত নগরীতে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হই আমি। আমার থামতে ইচ্ছে করে, বসতে ইচ্ছে হয়।

দিদি এক পাশের কার্নিশের দিক থেকে ঝুঁকেপড়া মুখ তুলে বলে, কী  হলো, যাবি?

আমি বলি, বাড়িতে? এতো তাড়াতাড়ি!

দিদি আলগা হেসে বলে, তাড়াতাড়ির কিছু নয়, এখনো দিন তিনেক বাকি। সব কাজ গোছাতে ওই সময়টুকু লাগবে। তারপর আমি আর মা রওনা হয়ে যাচ্ছি। তুই কী করবি ঠিক কর।

আমি স্বপ্নের বালিয়াড়ির গা থেকে উঠে এসে বলি, ভেবে দেখি।

যদিও তারপর খুব আর কিছু ভেবে দেখা নয়। পরের কটা দিন শুধু কাজ আর কাজ। এদিক-ওদিক ছোটা। সম্পত্তি সমর্পণের নানা পর্ব। সেসব কথা বাবা তোমাকে গোড়াতেই বলেছি। দিদি আমাকে এখানে-ওখানে পাঠায়। কখনো একটা সই আনতে আইনজীবীর বাড়িতে, কখনো পোস্ট-অফিসের বারান্দায় সময়ের অপেক্ষা। চলে যাওয়ার জন্য কত ব্যস্ত হতে পারে মানুষ দিদিকে দেখে তা বুঝি। চলে যাওয়া মানে সবকিছু গুছিয়ে তুলে দিয়ে যাওয়া। কোথাও এতটুকু খুঁত না থাকে। মা-ও প্রহর গোনে অন্তিম সময়ের। আর আমি দিদির নির্দেশমতো কাজ করে যাওয়ার পাশাপাশি আরো দুদিন সেই আবাসন টাওয়ারের মাথা থেকে ঘুরে আসি। সবুজ দিগন্ত, বাতাস আর বালিয়াড়ি আবারো ডাক পাঠায় আমাকে।

তারপর আজ এই দিন। সকালে স্নান সেরেছে মা আর দিদি। আমাকেও বলেছে। আমি করিনি। আমি বরং দুপুরে এক ফাঁকে বেরিয়ে গলির মোড়ের দোকানটা থেকে আমার প্রিয় এক প্লেট মিক্সড মানচুরিয়ান খেয়ে এসেছি। কারণ আমি জানি ওরা যেভাবেই যাক আমি এই ছোট্ট ইচ্ছেটা না মিটিয়ে তোমার কাছে গেলে মোটেই ভালো লাগবে না তোমার। হয়তো ধমকে দেবে শেষ পর্যন্ত। কিংবা অভিমান করবে। সেই নির্জন বালিয়াড়িতে কেন অভিমান থাকবে তোমার আর আমার মাঝখানে!

Leave a Reply